জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আদ-দাওয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ ফিল কুরআন ওয়াস-সুন্নাহ (Ad-Dawah al-Islamiyyah fil-Quran was-Sunnah) – 203201, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2021

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৮৩ মিনিট পড়ার সময়
৮ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০২ | বিষয় কোড: ২০৩২০১ | প্রশ্নপত্র কোড: ০৫০
اختبار السنة الثانية للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ (الدعوة والدراسات الإسلامية)
বিষয়: আদ-দা’ওয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ ফিল কুরআন ওয়াস-সুন্নাহ (الدعوة الإسلامية في القرآن و السنة)
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা


مجموعة (الف) [‘ক’ অংশ – রচনামূলক প্রশ্নাবলি]

ترجم الآيات التالية ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ১৫ × ৪ = ৬০

١- قوله تعالى: ﴿وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تَذْبَحُوا بَقَرَةً ۖ قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا ۖ قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ﴾ [البقرة: ٦٧]

[১. মহান আল্লাহর বাণী: “আর স্মরণ কর, যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গাভী যবেহ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। তারা বলল, তুমি কি আমাদের সাথে উপহাস করছ? মূসা বললেন, আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” — সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান:]

বাংলা রূপান্তর ও ব্যাখ্যা

ভাষান্তর: আর যখন মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গাভী কুরবানী করার নির্দেশ প্রদান করছেন।” তারা বলল, “আপনি কি আমাদের সাথে উপহাস ও বিদ্রূপ করছেন?” তিনি বললেন, “আমি অজ্ঞ ও মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” (সূরা আল-বাকারা: ৬৭)।

(الف) لماذا أمر الله تعالى قوم موسى بأن يذبحوا بقرة؟ بيّن القصة-

[(ক) আল্লাহ তা’আলা মূসা (আ) এর কাওমকে কেন গাভী যবেহ করতে বললেন? ঘটনাটি বর্ণনা কর:]

উৎস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: তাফসিরে তাবারী, কুরতুবী ও ইবনে কাসিরে বর্ণিত হয়েছে যে, বনী ইসরাঈলের এক ধনী ব্যক্তি ছিল, যার নাম ছিল ‘আমীল’ অথবা তার কোনো সন্তান ছিল না, কেবল এক ভাতিজা ছিল। সেই ভাতিজা সম্পদের লোভে গোপনে চাচাকে হত্যা করে রাতের আঁধারে লাশ অন্য এক গোত্রের দরজার সামনে ফেলে রাখে। পরদিন সকালে সে নিজেই হত্যাকারী খোঁজার ভান করে কান্নাকাটি শুরু করে এবং রক্তপণের দাবি তুলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। উভয় পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের উপক্রম হলে প্রবীণ ব্যক্তিরা এসে বলল, “আমাদের মধ্যে আল্লাহর নবী মূসা (আলাইহিস সালাম) বিদ্যমান থাকতে আমরা কেন বিবাদে লিপ্ত হব?”

গাভী যবেহের নির্দেশের কারণ: যখন তারা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট এসে বিচার চাইল, তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ তা’আলা তাদের বিবাদের ফয়সালা ও অজ্ঞাত ঘাতককে চিহ্নিত করার অলৌকিক ব্যবস্থা হিসেবে সরাসরি কোনো নাম না বলে একটি গাভী যবেহ করার আদেশ দেন। এর অন্তর্নিহিত দু’টি প্রধান হিকমত ছিল:

  1. ঘাতককে অলৌকিকভাবে উন্মোচন করা: গাভীর একটি অংশ দ্বারা মৃতদেহে আঘাত করলে সে আল্লাহর কুদরতে জীবিত হয়ে নিজের ঘাতকের নাম প্রকাশ করে দেবে।
  2. গো-পূজার মানসিক ব্যাধি দূরীকরণ: সামেরীর প্ররোচনায় বনী ইসরাঈলের অন্তরে বাছুর পূজার যে শিরকী ভক্তি গেঁথে গিয়েছিল (﴿وَأُشْرِبُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْعِجْلَ بِكُفْرِهِمْ﴾), নিজ হাতে গাভী যবেহ করার মাধ্যমে সেই অন্ধভক্তি সমূলে উৎপাটন করা।

বনী ইসরাঈলের প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি: তারা সহজ নির্দেশে সন্তুষ্ট না হয়ে বারংবার খুঁটিনাটি প্রশ্ন (বয়স কেমন, রঙ কেমন, কর্মক্ষমতা কেমন) করতে থাকে। ফলে আল্লাহ বিধান কঠোর করে দেন। অবশেষে হলুদ বর্ণের এক অপূর্ব গাভী অতি উচ্চ মূল্যে ক্রয় করে যবেহ করে এবং তার টুকরো দিয়ে মৃতের গায়ে স্পর্শ করতেই সে জীবিত হয়ে ভাতিজার নাম বলে পুনরায় মৃত্যুবরণ করে।

(ب) أوجز مناهج دعوة موسى عليه السلام-

[(খ) সংক্ষেপে মূসা (আ) এর দাওয়াতের পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা কর:]

মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর দা’ওয়াতী মানহাজ বা কর্মপদ্ধতি কুরআন মাজীদে অত্যন্ত সুষ্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে:

  1. কোমল ভাষায় সম্বোধন (القول اللين): চরম উদ্ধত ও জালেম শাসক ফেরাউনের দরবারে প্রেরণের সময় আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দেন: ﴿فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ﴾ (সূরা ত্বা-হা: ৪৪)। দাওয়াতের সূচনা হবে নম্রতা ও শ্রদ্ধাবোধের সাথে।
  2. স্পষ্ট যুক্তি ও অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন (الحجة والبرهان والآيات): তিনি ফেরাউনের দরবারে লাঠি সাপে রূপান্তর এবং উজ্জ্বল শুভ্র হাতের মুজিযা প্রদর্শন করে তাওহীদের সত্যতা প্রমাণ করেন।
  3. সংগঠন ও দলগত মজবুতি (العمل الجماعي والمؤازرة): দাওয়াতের গুরুদায়িত্ব পালনে তিনি স্বীয় ভাই হারূন (আলাইহিস সালাম)-কে সহযোগী হিসেবে চেয়ে দোয়া করেছিলেন: ﴿وَاجْعَل لِّي وَزِيرًا مِّنْ أَهْلِي • هَارُونَ أَخِي﴾ (সূরা ত্বা-হা: ২৯-৩০)।
  4. ধৈর্য ও অবিচলতা (الصبر والثبات): ফেরাউনের অবর্ণনীয় নির্যাতন ও বনী ইসরাঈলের বারবার হঠকারিতার মুখে তিনি পরম ধৈর্য প্রদর্শন করেন এবং কাওমকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন: ﴿اسْتَعِينُوا بِاللَّهِ وَاصْبِرُوا﴾ (সূরা আল-আ’রাফ: ১২৮)।
  5. শরীআতের সুস্পষ্ট বিধিমালা প্রদান: তূর পর্বতে তাওরাত লাভের মাধ্যমে জাতিকে ইবাদত ও মুয়ামালাতের সুশৃঙ্খল বিধিমালার অধীনে দাওয়াত প্রদান করেন।

٢- قوله تعالى: ﴿قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ – إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ﴾ [الأنعام: ٧٨-٧٩]

[২. মহান আল্লাহর বাণী: “তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বস্তুকে আল্লাহর শরিক স্থির কর, নিশ্চয় আমি তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরালাম যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” — সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান:]

বাংলা রূপান্তর ও মর্মার্থ

ভাষান্তর: ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) স্বীয় জাতিকে লক্ষ্য করে ঘোষণা করলেন, “হে আমার জাতি! তোমরা যেসব সত্তাকে আল্লাহর সাথে শরিক সাব্যস্ত করছ, নিশ্চয়ই আমি তাদের থেকে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক ও দায়মুক্ত। আমি একনিষ্ঠচিত্তে আমার মুখমণ্ডল সেই মহান সত্তার অভিমুখী করলাম, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন; আর আমি কখনই অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা আল-আন’আম: ৭৮-৭৯)।

(الف) لماذا وجّه إبراهيم عليه السلام وجهه إلى الله تعالى؟ بيّن مفصّلاً-

[(ক) ইবরাহীম (আ) তাঁর চেহারাকে কেন আল্লাহর দিকে ফিরালেন? বিস্তারিত বর্ণনা কর:]

ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর চেহারা আল্লাহর দিকে ফিরানোর কারণগুলো নিম্নরূপ:

  1. নক্ষত্রপূজার অসারতা ও ক্ষণস্থায়িত্ব প্রত্যক্ষকরণ: বাবেলের মুশরিক জাতি তারকা, চন্দ্র ও সূর্যের পূজা করত। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের মাধ্যমে তাদের দেখালেন যে, রাতের উজ্জ্বল নক্ষত্র অস্ত যায় (﴿فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَا أُحِبُّ الْآفِلِينَ﴾), রূপালী চাঁদ ডুবে যায় এবং প্রখর সূর্যও দিনশেষে ডুবে অন্ধকারে বিলীন হয়। যা অস্তমিত হয়, পরিবর্তনের অধীন এবং ক্ষণস্থায়ী, তা কখনই বিশ্বজাহানের মাবুদ হতে পারে না।
  2. স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার সীমারেখা স্পষ্টকরণ: নক্ষত্ররাজি হলো সৃষ্ট ও পরিচালিত বস্তু (মখলুক), আর আল্লাহ হলেন নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের আদি স্রষ্টা (ফাত্বির/খালিক্ব)। বিবেকবান মানুষের আনুগত্য সৃষ্টির জন্য নয়, বরং স্রষ্টার জন্যই নির্ধারিত।
  3. তাওহীদে খালেস বা নির্ভেজাল একত্ববাদে নিষ্ঠা (الحنيفية): ‘হানীফ’ শব্দের অর্থ সকল মিথ্যা পথ, বাতিল ধর্ম ও মূর্তিপূজা থেকে মুখ ফিরিয়ে একমাত্র সত্য আল্লাহর পথে স্থির থাকা। তিনি ঘোষণা করলেন যে তাঁর যাবতীয় আনুগত্য, ভয় ও আশা কেবল আল্লাহ তা’আলার জন্যই নিবেদিত।
  4. শিরকের সাথে প্রকাশ্য সম্পর্কচ্ছেদ (البراءة من الشرك): তিনি পিতৃপুরুষের অন্ধ অনুকরণ ও রাজকীয় অপশক্তির ভীতি উপেক্ষা করে শিরকের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী অনাস্থা ঘোষণা করেন।

(ب) اكتب نبذة عن حياة إبراهيم عليه السلام-

[(খ) সংক্ষেপে ইবরাহীম (আ) এর জীবনী লেখ:]

জন্ম ও বংশপরিচয়: হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ইরাকের প্রাচীন বাবেল (ব্যাবিলন) শহরের এক মূর্তিপূজক ও প্রতিমা নির্মাতা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল তায়ারুখ (কুরআনে ‘আযর’ উপাধিতে উল্লেখিত)।

দাওয়াত ও ত্যাগময় জীবন:

  • পরিবারে দাওয়াত: শৈশব থেকেই গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) সর্বপ্রথম পরম স্নেহে স্বীয় পিতাকে মূর্তিপূজা ত্যাগের আহ্বান জানান (সূরা মারইয়াম: ৪২-৪৫)।
  • মূর্তি ভাঙন ও অগ্নিকুণ্ড পরীক্ষা: বাৎসরিক উৎসবের দিনে তিনি একাকী কাওমের দেবালয়ে প্রবেশ করে বড় মূর্তিটি বাদে সব মূর্তি ভেঙে দেন। নমরুদ তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার হুকুম দিলে আল্লাহ তা’আলা আগুনকে নির্দেশ দেন: ﴿يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ﴾ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯)।
  • হিজরত ও সন্তান কোরবানি: স্বদেশ ত্যাগ করে শাম ও ফিলিস্তিনে হিজরত করেন। বার্ধক্যে ইসমাইল (আলাইহিস সালাম) ভূমিষ্ঠ হলে আল্লাহর আদেশে দুধের শিশু ও স্ত্রী হাজেরাকে মক্কার নির্জন প্রান্তরে রেখে আসেন। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে স্বীয় নয়নের মণি ইসমাইলকে কুরবানির কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
  • কা’বা গৃহ নির্মাণ ও খেতাব: পুত্র ইসমাইলকে সাথে নিয়ে মক্কায় পবিত্র কা’বা গৃহ পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি ‘খলিলুল্লাহ’ (আল্লাহর বন্ধু) এবং ‘আবুল আম্বিয়া’ (নবীদের পিতা) মর্যাদায় ভূষিত হন।

٣- قوله تعالى: ﴿وَإِلَىٰ ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا ۗ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ قَدْ جَاءَتْكُم بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ ۖ هَٰذِهِ نَاقَةُ اللَّهِ لَكُمْ آيَةً﴾ [الأعراف: ٧٣]

[৩. মহান আল্লাহর বাণী: “আর সামূদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বললেন, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য মাবুদ নেই। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে; এটা আল্লাহর উষ্ট্রী, যা তোমাদের জন্য এক নিদর্শন।” — সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান:]

বাংলা রূপান্তর

ভাষান্তর: আর আমি সামূদ জাতির নিকট তাদের ভাই সালেহ (আলাইহিস সালাম)-কে পাঠালাম। তিনি বললেন, “হে আমার কাওম! তোমরা একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোনো উপাস্য নেই। অবশ্যই তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ সমাগত হয়েছে। এই যে আল্লাহর উষ্ট্রী—এটি তোমাদের জন্য এক বিশেষ নিদর্শন।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৭৩)।

(الف) اكتب ردود قوم صالح عليه السلام موضحا-

[(ক) সালেহ (আলাইহিস সালাম) এর কওম কী উত্তর দিয়েছিল স্পষ্ট করে লেখ:]

হযরত সালেহ (আলাইহিস সালাম)-এর সত্য দাওয়াতের মুখে সামূদ জাতির নেতৃস্থানীয় ও উদ্ধত ব্যক্তিরা চরম অহংকার ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। কুরআনের বর্ণনানুসারে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল নিম্নরূপ:

  1. হতাশা ও তাচ্ছিল্য প্রকাশ: তারা বলল, আপনি তো আমাদের মাঝে আশার আলো ছিলেন, আজ আপনি আমাদের পিতৃপুরুষের ধর্ম ছাড়তে বলছেন? ﴿قَالُوا يَا صَالِحُ قَدْ كُنتَ فِينَا مَرْجُوًّا قَبْلَ هَٰذَا أَتَنْهَانَا أَن نَّعْبُدَ مَا يَعْبُدُ آبَاؤُنَا﴾ (সূরা হূদ: ৬২)।
  2. জাদুকর ও প্রবঞ্চক আখ্যাদান: তারা নবীকে জাদুগস্ত বলে অপবাদ দিল: ﴿قَالُوا إِنَّمَا أَنتَ مِنَ الْمُسَحَّرِينَ﴾ (সূরা আশ-শু’আরা: ১৫৩)।
  3. অসম্ভব অলৌকিক দাবি উত্থাপন: তারা দাবি করল যে, তাদের সম্মুখস্থ কঠিন নির্জীব পাহাড়ের বিশাল পাথর ফেটে যদি এক গর্ভবতী, স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের হয়ে আসে তবেই তারা বিশ্বাস করবে।
  4. উষ্ট্রী হত্যার ষড়যন্ত্র ও হত্যাসাধন: মুজিযা হিসেবে উষ্ট্রী প্রকাশের পর তারা ক্ষুব্ধ হয়ে নবীর সতর্কবাণী অমান্য করে কুখ্যাত দুষ্কৃতকারী কুদার ইবনে সালিফের নেতৃত্বে উষ্ট্রীর পা কেটে হত্যা করে (﴿فَعَقَرُوا النَّاقَةَ وَعَتَوْا عَنْ أَمْرِ رَبِّهِمْ﴾)।
  5. আল্লাহর আযাব ডেকে আনা: নির্ভয়ে দম্ভভরে বলল, আপনি যার ভয় দেখাতেন সেই আযাব নিয়ে আসুন দেখি! ফলে প্রচণ্ড বজ্রপাত ও প্রকম্পনে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।

(ب) ما معنى ‘آية’ في قوله تعالى: هذه ناقة الله لكم آية؟ اكتب قصة الناقة موجزا-

[(খ) আল্লাহ তা’লার বাণী هذه ناقة الله لكم آية এ বর্ণিত آية এর অর্থ কী? সংক্ষেপে উটের কাহিনী লেখ:]

‘آية’ (আয়াত)-এর অর্থ: কুরআনিক পরিভাষায় ‘আয়া’ (آية) অর্থ মুজিযা (معجزة), অলৌকিক নিদর্শন, অকাট্য প্রমাণ এবং আল্লাহর সীমাহীন কুদরতের প্রত্যক্ষ দলিল। এখানে উষ্ট্রীকে ‘আয়াত’ বলার অর্থ হলো এটি স্বাভাবিক প্রজননে জন্মায়নি, বরং কঠিন শিলা ফেটে আল্লাহর কুদরতে জন্ম নিয়ে সালেহ (আলাইহিস সালাম)-এর নবুওয়তের সত্যতার প্রমাণ বহন করেছিল।

উষ্ট্রীর অলৌকিক কাহিনী:

  • সামূদ জাতির সর্দাররা সালেহ (আলাইহিস সালাম)-কে অপদস্থ করার জন্য ‘কাতেবা’ নামক এক সুবিশাল কঠিন পাথর দেখিয়ে অনুরূপ জীবন্ত গর্ভবতী উষ্ট্রী দাবি করে অঙ্গীকার করল যে এমন হলে তারা ঈমান আনবে।
  • সালেহ (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করলে পাথরটি গর্ভবতী নারীর মতো প্রসব বেদনার ন্যায় ফেটে গিয়ে অবিকল তাদের চাহিদামাফিক এক দশ মাসের গর্ভবতী বিশালাকার উষ্ট্রী প্রসব করে এবং তা তৎক্ষণাৎ একটি বাচ্চা জন্ম দেয়।
  • আল্লাহ তা’আলা তাদের পানি পানের পালা বণ্টন করে দিলেন: এক দিন পুরো শহরের কূপের পানি পান করবে উষ্ট্রী, অপর দিন জনগণ পান করবে। উষ্ট্রী যেদিন পানি খেত, সেদিন সে পুরো শহরের অধিবাসীদের জন্য প্রচুর পরিমাণ দুধ দান করত (﴿قَالَ هَٰذِهِ نَاقَةٌ لَّهَا شِرْبٌ وَلَكُمْ شِرْبُ يَوْمٍ مَّعْلُومٍ﴾)।
  • কিন্তু অকৃতজ্ঞ পাপীরা এই অনুগ্রহ সহ্য করতে পারল না। তারা উষ্ট্রীকে আঘাত করে হত্যা করল। সালেহ (আলাইহিস সালাম) ঘোষণা করলেন, তিন দিন পর তোমাদের ওপর আযাব আসবে। চতুর্থ দিন সকালে এক ভয়াল আসমানী বজ্রনাদে পুরো কওম গৃহের মধ্যেই উপুড় হয়ে ধ্বংস হয়ে গেল।

٤- قوله تعالى: ﴿آلْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ – فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً﴾ [يونس: ٩١-٩٢]

[৪. মহান আল্লাহর বাণী: “এখন বিশ্বাস করছ? অথচ তুমি ইতিপূর্বে অবাধ্যতা করেছিলে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। সুতরাং আজ আমি তোমার দেহটিকে রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তী বংশধরদের জন্য এক নিদর্শন হয়ে থাক।” — সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলির সমাধান:]

বাংলা রূপান্তর ও প্রেক্ষাপট

ভাষান্তর: (আল্লাহ বললেন,) “এখন ঈমান আনছ? অথচ ইতিপূর্বে তুমি জীবনভর নাফরমানি ও অবাধ্যতা করেছ এবং তুমি ছিলে চরম ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী। সুতরাং আজ আমি তোমার প্রাণহীন মরদেহটিকে সাগরগর্ভ থেকে উদ্ধার করে রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তী মানবজাতির জন্য এক শিক্ষণীয় নিদর্শন হয়ে থাক।” (সূরা ইউনুস: ৯১-৯২)।

(الف) اذكر الواقعة المتعلقة بالآيات المذكورة موجزًا-

[(ক) সংক্ষেপে আয়াত সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি উল্লেখ কর:]

ঐতিহাসিক পটভূমি: মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর আদেশে রাতের অন্ধকারে নিপীড়িত বনী ইসরাঈল জাতিকে নিয়ে মিসর ত্যাগ করে লোহিত সাগরের অভিমুখে রওনা হন। সংবাদ পেয়ে চরম দাম্ভিক ফেরাউন তার অশ্বারোহী সৈন্যবাহিনীসহ তাঁদের পশ্চাদ্ধাবন করে।

সাগর বিদীর্ণ হওয়া ও ফেরাউনের বিনাশ: লোহিত সাগরের তীরে পৌঁছে বনী ইসরাঈল ভয়ে বলে উঠল, “আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!” মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন: ﴿كَلَّا ۖ إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ﴾ (কখনই নয়, নিশ্চয় আমার রব আমার সাথে আছেন)। আল্লাহর আদেশে মূসা (আলাইহিস সালাম) সাগরে লাঠি দিয়ে আঘাত করতেই বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি শুষ্ক প্রশস্ত রাস্তা তৈরি হয়ে গেল। বনী ইসরাঈল নিরাপদে পার হয়ে গেল। ফেরাউন দম্ভভরে সৈন্যবাহিনী নিয়ে সেই শুষ্ক পথে প্রবেশ করতেই আল্লাহর আদেশে সাগরের জলরাশি দু’দিক থেকে ধেয়ে এসে তাদের গ্রাস করে ফেলল।

মৃত্যুকালীন নিষ্ফল তাওবা: যখন লোনা পানির ঘূর্ণিপাকে ফেরাউন নিশ্চিত নিমজ্জনের মুখোমুখি হলো, তখন আত্মরক্ষার তাগিদে চিৎকার করে বলল: ﴿آمَنتُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ﴾ (আমি বিশ্বাস করলাম যে বনী ইসরাঈল যার প্রতি ঈমান এনেছে তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত)। কিন্তু মৃত্যুযন্ত্রণার মুহূর্তে (গরগরার সময়) তাওবা কবুল হয় না। ফলে আল্লাহ বললেন: “এখন বলছ? ইতিপূর্বে তো তুমি নাফরমান ছিলে।”

মরদেহ সংরক্ষণ: বনী ইসরাঈলের কেউ কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না যে প্রতাপশালী খোয় দাবিদার ফেরাউন মারা যেতে পারে। তাই আল্লাহ সাগরের ঢেউয়ের মাধ্যমে তার অক্ষত মরদেহটি তীরে নিক্ষেপ করেন, যা হাজার বছর পর কায়রো জাদুঘরে এক জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

(ব) من كان فرعون؟ لماذا كان يتكبر في الارض؟ بيّن-

[(খ) ফির’আউন কে ছিল? সে পৃথিবীতে কেন ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত? বর্ণনা কর:]

১. ফেরাউনের পরিচয়: ঐতিহাসিক ও কুরআনিক তথ্যানুসারে ‘ফেরাউন’ ছিল প্রাচীন মিসরের অমলিকা/কিবতী রাজাদের সাধারণ উপাধি। মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সমসাময়িক ফেরাউন ছিল দ্বিতীয় রামসিস (Ramses II) অথবা তার পুত্র মারনেপতাহ (Merneptah)। সে ছিল তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম প্রবল পরাক্রমশালী, বিপুল ধনসম্পদ ও সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর অধিকারী স্বেচ্ছাচারী সম্রাট।

২. পৃথিবীতে তার ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের কারণসমূহ:

  • প্রতাপশালী রাজশক্তি ও ঐশ্বর্য: মিসরের নীল নদ, বিশাল প্রাসাদ, স্বর্ণভাণ্ডার ও অপরাজিত সামরিক শক্তিতে মদমত্ত হয়ে সে নিজেকে অপরাজেয় মনে করত। সে দম্ভভরে বলত: ﴿أَلَيْسَ لِي مُلْكُ مِصْرَ وَهَٰذِهِ الْأَنْهَارُ تَجْرِي مِن تَحْتِي﴾ (মিসরের রাজত্ব কি আমার নয়? আর এই নদীগুলো কি আমার পাদদেশে প্রবাহিত নয়?)।
  • প্রভুত্বের দাবি (الادعاء بالألوهية): অহংকারের চরম শিখরে পৌঁছে সে নিজেকেই একমাত্র সর্বোচ্চ প্রভু ঘোষণা করেছিল: ﴿أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَىٰ﴾ (আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ রব) এবং ﴿مَا عَلِمْتُ لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرِي﴾ (আমি ছাড়া তোমাদের আর কোনো মাবুদ আছে বলে আমার জানা নেই)।
  • বনী ইসরাঈলের ওপর নির্মম দাসত্ব: সে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে বনী ইসরাঈলকে ক্রীতদাসে পরিণত করেছিল। নিজের সিংহাসন হারানোর কুস্বপ্নের ভয়ে সে বনী ইসরাঈলের নবজাতক পুত্রসন্তানদের পাইকারি হারে হত্যা করত এবং কন্যাদের সেবাদাসী বানাত।

٥- (الف) ما معنى الدعوة؟ اكتب أهميتها على ضوء القرآن والسنة-

[৫. (ক) الدعوة অর্থ কী? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তার গুরুত্ব লেখ:]

১. দাওয়াতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

আভিধানিক অর্থ: ‘আদ-দাওয়াহ’ (الدعوة) শব্দটি আরবি د-ع-و মূল ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ আহ্বান করা, ডাকা, দাওয়াত দেওয়া, প্রার্থনা করা, উদ্বুদ্ধ করা বা কোনো কিছুর দিকে পথপ্রদর্শন করা।

পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, মানবজাতিকে আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর একত্ববাদ ও আনুগত্যের পথে আহ্বান জানানো এবং যাবতীয় তাগুত, কুফর ও পাপাচার থেকে বিরত রেখে দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণের পথে পরিচালিত করার নিরন্তর প্রচেষ্টাকে ‘দাওয়াত’ বলা হয়। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: “الدَّعْوَةُ إِلَى اللَّهِ هِيَ الدَّعْوَةُ إِلَى الْإِيمَانِ بِهِ، وَبِمَا جَاءَتْ بِهِ رُسُلُهُ” (আল্লাহর দিকে দাওয়াত হলো তাঁর প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁর রাসুলগণ যা নিয়ে এসেছেন তা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানানো)।

২. কুরআনুল কারীমের আলোকে দাওয়াতের গুরুত্ব

  1. শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা লাভের ভিত্তি: আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে মানবজাতির মধ্য থেকে সর্বোত্তম জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন কেবল সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের দায়িত্ব পালনের কারণে:

    ﴿كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ﴾ [آل عمران: ١١٠]

  2. উত্তম কথার অনন্য সম্মান: আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কারো হতে পারে না:

    ﴿وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ﴾ [فصلت: ٣٣]

  3. ফরয দায়িত্ব হিসেবে নির্দেশ: আল্লাহ প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুমিনের ওপর হিকমত ও উত্তম নসীহতের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়াকে আবশ্যক করেছেন: ﴿ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ﴾ (সূরা আন-নাহল: ১২৫)।

৩. সুন্নাহর আলোকে দাওয়াতের গুরুত্ব

  1. একটি আত্মার হেদায়েত লাল উটের চেয়েও মূল্যবান: খাইবারের যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হযরত আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেন:

    «فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا، خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ» [صحيح البخاري: ٣٧٠١]

    (আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ একজন মানুষকেও হেদায়েত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য মূল্যবান লাল উট থাকার চেয়েও বহু গুণ উত্তম)।

  2. দাওয়াত পরিত্যাগ আযাবের কারণ: হুযাইফা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সতর্ক করে বলেছেন: “সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে; অন্যথায় অচিরেই আল্লাহ তোমাদের ওপর আযাব পাঠাবেন। এরপর তোমরা তাঁর কাছে দোয়া করবে কিন্তু তিনি আর দোয়া কবুল করবেন না।” (জামে তিরমিযী: ২১৬৯)।

٥- (ب) من كان نوح عليه السلام؟ لماذا دعا على قومه؟ بيّن-

[৫. (খ) নূহ (আ) কে ছিলেন? তিনি কেন তাঁর কাওমের বিরুদ্ধে দোয়া করেছিলেন? বর্ণনা কর:]

১. হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর পরিচয়

হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম) ছিলেন মানবজাতির ইতিহাসের প্রথম রাসূল (الرسول الأول إلى أهل الأرض), যাঁকে শিরকে নিমজ্জিত মানবজাতিকে তাওহীদের দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য রিসালাতের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি আদম (আলাইহিস সালাম)-এর পর মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা (আদম আস-সানী বা আবুল বাশার আস-সানী) হিসেবে পরিচিত। তিনি উলুল আযম (দৃঢ়সংকল্পধারী শীর্ষ পাঁচজন) রাসুলদের অন্যতম। তিনি সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর ধরে স্বীয় কাওমের মাঝে একনিষ্ঠভাবে দাওয়াতী কাজ পরিচালনা করেছিলেন (﴿فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا﴾)।

২. স্বীয় কাওমের বিরুদ্ধে বদদোয়া করার কারণসমূহ

একজন দয়াবান নবী হয়েও দীর্ঘ ৯৫০ বছর পরম ধৈর্য ধারণের পর নূহ (আলাইহিস সালাম) কাওমের বিরুদ্ধে যে কঠোর বদদোয়া করেছিলেন (﴿رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا﴾), তার সুস্পষ্ট কারণগুলো হলো:

  1. চরম হঠকারিতা ও দাওয়াত প্রত্যাখ্যান: তিনি দিন-রাত, গোপনে ও প্রকাশ্যে প্রতিটি মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু তারা আঙুল দিয়ে কান চেপে ধরত, বস্ত্রাবৃত হয়ে অহংকার প্রদর্শন করত এবং উপহাস করত (সূরা নূহ: ৭)।
  2. ওহীর মাধ্যমে হেদায়েত লাভের পথ চিরতরে রুদ্ধ হওয়ার সুসংবাদ: দীর্ঘ দাওয়াতের পর আল্লাহ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে নূহ (আ.)-কে জানিয়ে দিলেন যে, ইতিমধ্যে যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আপনার জাতির আর কেউই কখনো ঈমান আনবে না:

    ﴿وَأُوحِيَ إِلَىٰ نُوحٍ أَنَّهُ لَن يُؤْمِنَ مِن قَوْمِكَ إِلَّا مَن قَدْ آمَنَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ﴾ [هود: ٣٦]

  3. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিরস্থায়ী গোমরাহির আশঙ্কা: কাওমের চারিত্রিক অধঃপতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তাদের থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানরাও কাফের ও পাপাচারী হিসেবেই বড় হচ্ছিল। নূহ (আ.) দূরদৃষ্টি দিয়ে বললেন: ﴿إِنَّكَ إِن تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا﴾ (হে রব! আপনি যদি তাদের ছেড়ে দেন, তবে তারা আপনার বান্দাদের বিভ্রান্ত করবে এবং পাপাচারী কাফের ছাড়া আর কোনো সন্তান জন্ম দেবে না)।
  4. মুমিনদের নিরাপত্তা ও তাওহীদের সুরক্ষা: কুফরী শক্তির নির্মূল ব্যতীত নবজাত মুমিনদের জীবন রক্ষা করা এবং পৃথিবীতে তাওহীদের বিশুদ্ধ পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে তিনি আল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থনা করেন এবং মহা প্লাবনে অবাধ্য জাতি নিমজ্জিত হয়।

٦- (الف) بيّن كيفية دعوة رسول الله صلى الله عليه وسلم في طلوع الإسلام مفصّلاً-

[৬. (ক) ইসলামের ঊষালগ্নে রাসূলুল্লাহ (স) এর দাওয়াতের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর:]

হেরা গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের মাধ্যমে নবুওয়তের শুভসূচনা ঘটার পর ইসলামের ঊষালগ্নে (মক্কী জীবনের প্রারম্ভে) বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অত্যন্ত নিখুঁত, বিজ্ঞোচিত ও দূরদর্শী কর্মপদ্ধতিতে দাওয়াত পরিচালনা করেছিলেন। এই দাওয়াত মূলত দু’টি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়েছিল:

প্রথম পর্যায়: গোপন দাওয়াত (المرحلة السرية – ৩ বছর)

  1. নিকটতম ও বিশ্বস্তদের নির্বাচন: তৎকালীন মক্কার কট্টর পৌত্তলিক সমাজব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা এড়াতে নবী করীম (সা.) সর্বপ্রথম স্বীয় পরিবার ও পরম বিশ্বস্ত বন্ধুদের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত খাদীজা (রাযি.), যুবকদের মধ্যে হযরত আলী (রাযি.), দাসদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাযি.) এবং মুক্ত বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.)।
  2. আবু বকর (রাযি.)-এর সামাজিক প্রভাব কাজে লাগানো: আবু বকর (রাযি.)-এর ব্যক্তিগত সততা ও সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে উসমান ইবনে আফফান, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসেন।
  3. দারুল আরকামকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার: সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হযরত আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িকে একটি নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। সেখানে সাহাবায়ে কেরাম একত্রিত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তাওহীদের তা’লীম গ্রহণ করতেন এবং অত্যন্ত গোপনে সালাত আদায় করতেন।

দ্বিতীয় পর্যায়: প্রকাশ্য দাওয়াত (المرحلة الجهرية)

  1. নিকটাত্মীয়দের ভীতি প্রদর্শন: আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ নাযিল হয়: ﴿وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ﴾ (সূরা আশ-শু’আরা: ২১৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের প্রায় ৪৫ জন আত্মীয়কে দুই দফায় খাবার খাইয়ে তাওহীদের সুস্পষ্ট দাওয়াত পেশ করেন।
  2. সাফা পর্বতের ঐতিহাসিক ডাক: এরপর মহান আল্লাহর সর্বজনীন নির্দেশ আসে: ﴿فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ﴾ (সূরা আল-হিজর: ৯৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে আরবের রীতি অনুযায়ী “ইয়া সাবাহা!” বলে কুরাইশদের সকল গোত্রকে সমবেত করেন। তিনি নিজের আজীবন সততার সাক্ষ্য নিয়ে বলেন: “আমি যদি বলি এই পাহাড়ের পেছনে এক শত্রু সৈন্য তোমাদের আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তোমরা কি বিশ্বাস করবে?” সবাই সমস্বরে বলল: “হ্যাঁ, আমরা আপনাকে কখনই মিথ্যা বলতে দেখিনি।” তখন তিনি বললেন: “তবে আমি তোমাদেরকে এক আসন্ন ভয়াবহ আযাবের ব্যাপারে সতর্ক করছি। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন কর।”

٦- (ب) تحدّث عن أساليب دعوة غير المسلمين على ضوء القرآن والسنة-

[৬. (খ) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে অমুসলিমদের নিকট দাওয়াত প্রদানের কৌশলসমূহ বর্ণনা কর:]

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে অমুসলিমদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত উপস্থাপনের মৌলিক কৌশলসমূহ নিম্নরূপ:

  1. হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপস্থাপন (الحكمة): দাওয়াতের ভিত্তি হতে হবে প্রজ্ঞা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন। আল্লাহ বলেন: ﴿ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ﴾ (সূরা আন-নাহল: ১২৫)। শ্রোতার মানসিকতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কথা বলতে হবে।
  2. উত্তম পন্থায় যুক্তি-তর্ক ও বিতর্ক (المجادلة بالتي هي أحسن): অমুসলিমদের সংশয় নিরসনে শালীনতা বজায় রেখে অকাট্য যুক্তি তুলে ধরতে হবে। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: ﴿وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴾ (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৬)। গালিগালাজ বা তাদের দেবতাদের উপহাস করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ (সূরা আল-আন’আম: ১০৮)।
  3. উভয়ের মধ্যকার অভিন্ন সত্যের ওপর ভিত্তি স্থাপন (التركيز على القواسم المشتركة): দাওয়াতের শুরুতে সংঘাতময় বিষয় না তুলে যেসব বিশ্বাসে ঐক্য রয়েছে তা থেকে সূচনা করা। যেমন আল্লাহ আহলে কিতাবদের প্রতি দাওয়াত প্রসঙ্গে নির্দেশ দেন:

    ﴿قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا﴾ [آل عمران: ٦٤]

  4. দ্বীনের ব্যাপারে বলপ্রয়োগ না করা (لا إكراه في الدين): ইসলাম কাউকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার অনুমোদন দেয় না (সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)। দাওয়াত হলো সত্য স্পষ্ট করে তুলে ধরা, হেদায়েত দেওয়া একমাত্র আল্লাহর কাজ।
  5. উত্তম চরিত্র ও ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত স্থাপন (حسن الخلق والقدوة الحسنة): কথা বলার চেয়ে কর্মের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য প্রদর্শন অধিক কার্যকরী। নবী করীম (সা.) তাঁর আজীবন সততা, বদান্যতা ও অমুসলিমদের সাথে করা চুক্তি রক্ষায় বিশ্বস্ততার মাধ্যমে মক্কার অমুসলিমদের মুগ্ধ করেছিলেন।
  6. সুসংবাদ দেওয়া ও ভীতি প্রদর্শন না করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) মু’আয ইবনে জাবাল ও আবু মূসা আশ’আরী (রাযি.)-কে ইয়েমেনে প্রেরণের সময় নির্দেশ দেন: «يَسِّرَا وَلَا تُعَسِّرَا، وَبَشِّرَا وَلَا تُنَفِّرَا» (তোমরা সহজ কর, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে দূরে ঠেলে দিও না)।

مجموعة (ب) [‘খ’ অংশ – সংক্ষিপ্ত উত্তরীয় প্রশ্নাবলি]

أجب عن أربعة أسئلة من الآتية (যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও): মান: ৫ × ৪ = ২০

٧- من كان ‘أحمد’؟ ومن أخبر به؟ اذكر مدلّلاً-

[৭. ‘আহমাদ’ কে ছিলেন? তাঁর সম্পর্কে কে সংবাদ দিয়েছেন? দলিলসহ উল্লেখ কর:]

১. ‘আহমাদ’ (أحمد)-এর পরিচয়

‘আহমাদ’ হলেন আমাদের প্রিয় নবী, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বরকতময় নাম। ‘আহমাদ’ শব্দটি আরবি ‘হামদ’ (حمد) ধাতু থেকে ‘তাফযীল’ (أفعل التفضيل)-এর সীগাহ, যার অর্থ: ‘যিনি আল্লাহর সর্বাধিক প্রশংসা করেন’ অথবা ‘সৃষ্টিজগতের মধ্যে যিনি সর্বাধিক প্রশংসিত’। হাদীসে এসেছে: «أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَنَا أَحْمَدُ» (আমিই মুহাম্মদ এবং আমিই আহমাদ – সহীহ বুখারী: ৪৮৯৬)।

২. তাঁর আগমনের সুসংবাদ প্রদানকারী

হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম) বনী ইসরাঈল জাতিকে সুস্পষ্টভাবে শেষ নবী ‘আহমাদ’-এর শুভাগমনের সংবাদ দিয়েছিলেন।

৩. দলিলের বিবরণ

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর সেই ঐতিহাসিক সুসংবাদ তুলে ধরে ইরশাদ করেছেন:

﴿وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُم مُّصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ﴾ [الصف: ٦]

অর্থ: “আর স্মরণ কর, যখন মারইয়াম-পুত্র ঈসা বলল: হে বনী ইসরাঈল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল, আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আগমনকারী একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা, যাঁর নাম হবে ‘আহমাদ’।”

এছাড়াও ইঞ্জিল কিতাবে ‘পারাক্লিত’ (Paraclete / Comforter) শব্দে যাঁর ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, তিনি হলেন সাইয়্যিদুনা আহমাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।


٨- مَن الداعي؟ بيّن صفاته مدلّلاً-

[৮. ‘দা’ঈ’ কে? দলিলসহ তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা কর:]

১. দা’ঈ-এর সংজ্ঞা

ইসলামী পরিভাষায় ‘দা’ঈ’ (الداعي) হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সচেতনভাবে ও নিষ্ঠার সাথে মানবজাতিকে মহান আল্লাহর দ্বীন, একত্ববাদ ও আনুগত্যের পথে আহ্বান জানান এবং পাপ ও গোমরাহী থেকে বিরত রাখার জন্য সচেষ্ট থাকেন। স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.)-কে আল্লাহ ‘দা’ঈ ইলাল্লাহ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন: ﴿وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُّنِيرًا﴾ (সূরা আল-আহযাব: ৪৬)।

২. একজন আদর্শ দা’ঈর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (দলিলসহ)

  1. বিশুদ্ধ নিয়ত ও ইখলাস (الإخلاص): দাওয়াতের উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি, কোনো পার্থিব যশ বা স্বার্থ নয়। আম্বিয়ায়ে কেরাম বলতেন: ﴿وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾ (সূরা আশ-শু’আরা: ১০৯)।
  2. শরয়ী জ্ঞান ও দূরদর্শিতা (العلم والبصيرة): সুস্পষ্ট দলিলের ভিত্তিতে দাওয়াত দিতে হবে। আল্লাহ বলেন: ﴿قُلْ هَٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي﴾ (সূরা ইউসুফ: ১০৮)। অজ্ঞতা নিয়ে দাওয়াত দিলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়।
  3. কথার সাথে কাজের মিল (مطابقة القول للعمل): দা’ঈর নিজের আমল তার কথার বিপরীত হতে পারবে না। আল্লাহ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ﴾ (সূরা আস-সফ: ২)।
  4. ধৈর্য ও সহনশীলতা (الصبر والحلم): দাওয়াতের পথে বাধা, অপমান ও বিপত্তি আসবেই, তাতে অবিচল থাকতে হবে। লোকমান (আ.) স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দেন: ﴿وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ﴾ (সূরা লুকমান: ১৭)।
  5. কোমল স্বভাব ও ক্ষমাশীলতা (اللين والرحمة): কঠোরতা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তা’আলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন: ﴿فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ﴾ (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)।

٩- اكتب حياة يونس عليه السلام موجزًا-

[৯. ইউনুস (আ) এর জীবনী সংক্ষেপে লেখ:]

১. পরিচয় ও বংশ: হযরত ইউনুস (আলাইহিস সালাম) ছিলেন বনী ইসরাঈল বংশোদ্ভূত একজন সম্মানিত নবী। কুরআনে তাঁকে ‘যুন-নূন’ (মাছের অধিকারী) এবং ‘সাহিবুল হূত’ উপাধিতেও স্মরণ করা হয়েছে।

২. নিনেভা নগরীতে দাওয়াত: আল্লাহ তা’আলা তাঁকে ইরাকের মসুল সংলগ্ন প্রাচীন ‘নিনেভা’ (نينوى) নগরীর প্রায় এক লক্ষ অধিবাসীর নিকট মূর্তিপূজা ত্যাগ ও তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে পাঠান। দীর্ঘকাল দাওয়াত দেওয়ার পরও জাতি হঠকারিতা প্রদর্শন করে অবাধ্যতায় অনড় থাকে।

৩. নগর ত্যাগ ও সাগরে নিক্ষেপ: চরম হতাশ হয়ে আল্লাহর সুস্পষ্ট আদেশের পূর্বেই তিনি নগর ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং সাগরের জাহাজে আরোহণ করেন। মাঝদরিয়ায় জাহাজ প্রচণ্ড ঝড়ে নিমজ্জিত হওয়ার উপক্রম হলে আরোহীরা ওজন কমাতে লটারি করে। পরপর তিনবার লটারিতে হযরত ইউনুস (আ.)-এর নাম ওঠে। তখন তিনি বুঝতে পারেন এটি তাঁর রবের পরীক্ষা এবং সাগরে ঝাঁপ দেন।

৪. মাছের পেট ও ঐতিহাসিক দোয়া: আল্লাহর আদেশে এক বিশালাকার তিমি মাছ তাঁকে আস্ত গিলে ফেলে। তিমিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যাতে তাঁর কোনো হাড় না ভাঙে বা গোশত বিনষ্ট না হয়। সাগরের অতল অন্ধকার ও মাছের পেটে বসে তিনি অনুনয়ভরে তাওবা করেন:

﴿لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ﴾ [الأنبياء: ٨٧]

৫. মুক্তি ও জাতির ঈমান আনয়ন: আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে তিমিকে তীরের নির্জন বালুচরে তাঁকে উগরে দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেখানে আল্লাহ তাঁর ছায়া ও পথ্যের জন্য একটি লাউ গাছ (شجرة من يقطين) উৎপন্ন করেন। সুস্থ হয়ে তিনি পুনরায় নিজ কাওমে ফিরে দেখেন যে আযাবের নিদর্শন দেখে তারা সবাই আন্তরিক তাওবা করে ঈমান এনেছে। আল্লাহ তাদের আযাব উঠিয়ে নেন (সূরা ইউনুস: ৯৮)।


١٠- كيف تحلّ مشاكل الدعوة الإسلامية؟ بيّن-

[১০. তুমি ইসলামি দাওয়াতের সমস্যাসমূহ কীভাবে সমাধান করবে? বর্ণনা কর:]

বর্তমান যুগে ইসলামী দাওয়াতের পথে বহুবিধ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এই সমস্যাগুলোর বাস্তবমুখী সমাধান নিম্নরূপ পদক্ষেপের মাধ্যমে করা সম্ভব:

  1. আধুনিক মাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার: ইসলামের বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিয়া ও অপপ্রচারের মোকাবেলায় সোশ্যাল মিডিয়া, পডকাস্ট, ওয়েব প্ল্যাটফর্ম ও আধুনিক মিডিয়াকে দাওয়াতের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
  2. দা’ঈদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ: দা’ঈদের কেবল গতানুগতিক জ্ঞান নয়, বরং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, আধুনিক দর্শন, বিজ্ঞান ও সমকালীন সংশয়বাদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
  3. আখলাক ও চারিত্রিক দৃষ্টান্তের উন্নয়ন: মুসলিমদের চরিত্র ও আচরণের অবক্ষয় দাওয়াতের বড় অন্তরায়। অতএব, আমল ও সততার মাধ্যমে ইসলামকে বাস্তব জীবনে ফুটিয়ে তুলতে হবে যাতে অমুসলিমরা আকৃষ্ট হয়।
  4. উগ্রতা ও সংকীর্ণতা বর্জন করে মধ্যপন্থা (ওয়াসাত্বিয়াত) অবলম্বন: অপ্রয়োজনীয় ফিকহী ইখতিলাফ ও দলীয় সংঘাত দূর করে উম্মাহর ঐক্যের ওপর জোর দিতে হবে এবং দ্বীনের মধ্যমপন্থী সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে।
  5. ভাষাগত দক্ষতা অর্জন: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা (ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, স্প্যানিশ ইত্যাদি) শিখে সংশ্লিষ্ট জাতির স্বীয় ভাষায় ইসলামের বার্তা পৌঁছানো।
  6. সেবামূলক ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা: শিক্ষা, চিকিৎসা ও দরিদ্রদের সহযোগিতার মতো সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষের হৃদয় জয় করা।

١١- اذكر مناهج دعوة شعيب عليه السلام موجزًا-

[১১. শো’আইব (আ) এর দাওয়াতের পদ্ধতিসমূহ সংক্ষেপে উল্লেখ কর:]

হযরত শো’আইব (আলাইহিস সালাম)-কে তাঁর চমৎকার বাগ্মিতা ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনার জন্য ‘খতীবুল আম্বিয়া’ (নবীদের বক্তা) বলা হয়। মাদইয়ান ও আসহাবুল আইকার অধিবাসীদের নিকট তাঁর দাওয়াতী মানহাজ ছিল অত্যন্ত শিক্ষণীয়:

  1. তাওহীদের মূল ভিত্তি থেকে দাওয়াত শুরু: তিনি প্রথমেই জাতিকে শিরক ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান: ﴿يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ﴾ (সূরা আল-আ’রাফ: ৮৫)।
  2. সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক অন্যায়ের সংশোধন: মাদইয়ানবাসী ওজনে কম দিত এবং ব্যবসায় প্রতারণা করত। তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন: ﴿أَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ﴾ (তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে মাপ ও ওজন পূর্ণ কর এবং মানুষকে তাদের পাওনা কম দিও না)।
  3. রাহাজানি ও পথরোধ বন্ধের আহ্বান: তারা পথিকদের পথরোধ করে অর্থ লুণ্ঠন করত এবং দ্বীনের পথে বাধা দিত। তিনি সতর্ক করলেন: ﴿وَلَا تَقْعُدُوا بِكُلِّ صِرَاطٍ تُوعِدُونَ وَتَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ﴾।
  4. আল্লাহর পার্থিব নিয়ামত স্মরণ করানো: তিনি মনে করিয়ে দিলেন যে, তোমরা পূর্বে সংখ্যায় কম ছিলে, আল্লাহ তোমাদের বংশবৃদ্ধি ও সচ্ছলতা দিয়েছেন, অতএব তাঁর শোকর আদায় কর।
  5. নিজের আমল দ্বারা আদর্শ স্থাপন: তিনি জাতিকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন: ﴿وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَىٰ مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ ۚ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ﴾ (সূরা হূদ: ৮৮) — অর্থাৎ “আমি যে ব্যাপারে তোমাদের নিষেধ করছি, নিজে তার বিপরীত কাজ করতে চাই না; আমি তো কেবল সাধ্যমতো সংশোধনই চাই।”

١٢- علّق على اثنين: (الف) القرآن والسنة (ب) ثلاثة أحاديث في الدعوة (ج) الدعوة بالرسائل والخطابة (د) أصول الدعوة

[১২. যে কোনো দুটির টীকা লেখ: (পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে চারটি বিষয়েরই প্রামাণ্য বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো):]

(الف) القرآن والسنة (আল-কুরআন ও আস-সুন্নাহ)

আল-কুরআন ও আস-সুন্নাহ হলো ইসলামের যাবতীয় বিশ্বাস, শরীয়ত ও দাওয়াতের মূল ভিত্তি ও অবিচ্ছেদ্য উৎস। কুরআন হলো মহান আল্লাহর কালাম, যা মানবজাতির হেদায়েতের চিরন্তন সংবিধান; আর সুন্নাহ হলো বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র কথা, কর্ম ও অনুমোদন, যা কুরআনের প্রয়োগিক ব্যাখ্যা ও জীবন্ত রূপ। বিদায় হজ্জের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ» (আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি; যতক্ষণ তোমরা এ দু’টিকে শক্তভাবে ধারণ করবে, ততক্ষণ কখনই পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ – মুয়াত্তা মালিক)। ইসলামী দাওয়াতের প্রতিটি বাক্য ও যুক্তি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর মানদণ্ডে যাচাইকৃত হওয়া অপরিহার্য।

(ب) ثلاثة أحاديث في الدعوة (দাওয়াত বিষয়ক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস)

দাওয়াত ও তাবলীগের অপরিসীম গুরুত্ব নির্দেশ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তিনটি অনন্য হাদিস নিচে উদ্ধৃত করা হলো:

  1. একটি বাণী হলেও পৌঁছে দেওয়া: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন:

    «بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً» [صحيح البخاري: ٣٤٦١]

    (আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও মানুষের কাছে পৌঁছে দাও)।

  2. সৎকাজের পথপ্রদর্শনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

    «مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ» [صحيح مسلم: ١٨٩٣]

    (যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথপ্রদর্শন করে, সে ঐ কাজ সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব লাভ করবে)।

  3. অন্যায় প্রতিরোধে ঈমানের স্তরভেদ: আবু সাঈদ খুদরী (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:

    «مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ» [صحيح مسلم: ٤٩]

    (তোমাদের মধ্যে যে কেউ কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে; অপারগ হলে মুখ দিয়ে নসীহত করে; আর তাতেও অপারগ হলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা পোষণ করে—আর এটিই হলো ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর)।

(ج) الدعوة بالرسائل والخطابة (পত্র ও বক্তব্যের মাধ্যমে দাওয়াত)

চিঠিপত্র ও প্রাঞ্জল বক্তৃতা হলো দাওয়াত পৌঁছানোর দু’টি সুপ্রাচীন ও অত্যন্ত ফলপ্রসূ মাধ্যম:

  • পত্রের মাধ্যমে দাওয়াত: হুদাইবিয়ার সন্ধির পর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস, পারস্য সম্রাট কিসরা, হাবশার নাজ্জাশী, মিসরের মুকাওকিসসহ বিশ্বনেতাদের কাছে চিঠির মাধ্যমে ইসলামের আনুষ্ঠানিক দাওয়াত পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে তিনি আল্লাহর নাম, নিজের রিসালাতের পরিচয় এবং “أسلم تسلم” (ইসলাম গ্রহণ কর, শান্তিতে থাকবে) এর ন্যায় সারগর্ভ বাক্য ব্যবহার করতেন।
  • বক্তৃতার মাধ্যমে দাওয়াত: প্রাঞ্জল বক্তব্য (আল-খিত্বাবাহ) মানুষের আবেগ ও বিবেককে জাগ্রত করে। জুমা ও ঈদের খুতবা, আরাফাতের ময়দানে প্রদত্ত ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণ ছিল দাওয়াতের অনন্য মাইলফলক। দা’ঈর বক্তব্য হতে হবে সংক্ষেপ, অর্থগর্ভ এবং শ্রুতিমধুর।

(د) أصول الدعوة (দাওয়াতের মূল নীতিমালা)

ইসলামী দাওয়াত কোনো এলোমেলো প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি সুনির্দিষ্ট নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ‘উসুলুদ দাওয়াহ’ বা দাওয়াতের প্রধান স্তম্ভ চারটি:

  1. আল-মাদউ (المدعو): যাঁকে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে (শ্রোতা বা পাত্র)। তার ধর্মীয় বিশ্বাস, মানসিক অবস্থা ও পরিবেশ বুঝে দাওয়াত উপস্থাপন করা।
  2. আল-মাওজু (الموضوع): দাওয়াতের বিষয়বস্তু। অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত এবং শরয়ী বিধিবিধান।
  3. আল-উসলুব (الأسلوب বা المنهج): দাওয়াতের পদ্ধতি বা কৌশল। কুরআন নির্দেশিত হিকমত, উত্তম নসীহত ও মার্জিত যুক্তি প্রয়োগ।
  4. আল-ওয়াসিলাহ (الوسيلة): দাওয়াত পৌঁছানোর উপায় বা মাধ্যম। যেমন মৌখিক নসীহত, পত্র, বই-পুস্তক, ডিজিটাল মিডিয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সেবা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: বনী ইসরাঈলকে গাভী যবেহ করার নির্দেশ দেওয়ার প্রধান হিকমত কী ছিল?

উত্তর: মূল হিকমত ছিল দু’টি: প্রথমত, অলৌকিকভাবে এক হত্যাকাণ্ডের অজ্ঞাত ঘাতককে চিহ্নিত করা; দ্বিতীয়ত, বনী ইসরাঈলের অন্তরে পূর্বেকার গো-পূজার যে গভীর শিরকী প্রভাব অবশিষ্ট ছিল, স্বহস্তে গাভী যবেহ করার মাধ্যমে তা চিরতরে মুছে ফেলা।

প্রশ্ন ২: হযরত ইবরাহীম (আ.) নক্ষত্র, চন্দ্র ও সূর্য দেখে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

উত্তর: তিনি দেখেছিলেন যে এরা সবাই সময়ের ব্যবধানে অস্ত যায় ও পরিবর্তনশীল। আর যা অস্তমিত ও ক্ষয়িষ্ণু, তা কখনই প্রভু হতে পারে না। ফলে তিনি সৃষ্টিজগত ত্যাগ করে এদের একমাত্র আদি স্রষ্টা মহান আল্লাহর দিকে একনিষ্ঠভাবে স্বীয় মুখমণ্ডল ফিরিয়ে নেন।

প্রশ্ন ৩: হযরত সালেহ (আ.)-এর কওমের ওপর কেন আযাব এসেছিল?

উত্তর: তারা নবীর আহ্বানে ঈমান না এনে চরম হঠকারিতাবশত অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে প্রেরিত আল্লাহর উষ্ট্রীটির পা কেটে হত্যা করেছিল এবং অহংকারবশত আযাব প্রত্যক্ষ করার ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল।

প্রশ্ন ৪: সাগরে নিমজ্জনের সময় ফেরাউনের ঈমান কেন কবুল হয়নি?

উত্তর: ইসলামী শরীয়তের অকাট্য নীতি অনুযায়ী, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে আযাব প্রত্যক্ষ করার মুহূর্তে (রূহ কণ্ঠনালীতে আটকে যাওয়ার সময়) তাওবা বা ঈমান আনয়ন কবুল হয় না। ফেরাউন সারাজীবন নাফরমানি করে নিশ্চিত মৃত্যুর মুহূর্তে প্রাণভয়ে ঈমানের দাবি করেছিল।

প্রশ্ন ৫: হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেটে কী দোয়া পড়েছিলেন?

উত্তর: হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেটে গভীর অন্ধকারে পড়েছিলেন: ﴿لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ﴾ (হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র-মহান! নিশ্চয়ই আমি অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি)।

প্রশ্ন ৬: ইসলামের ঊষালগ্নে গোপনে দাওয়াত পরিচালনার মূল কেন্দ্র কোনটি ছিল?

উত্তর: মক্কার সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হযরত আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রাযি.)-এর বাড়ি (দারুল আরকাম), যেখানে সাহাবায়ে কেরাম একত্রিত হয়ে দ্বীনের প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *