পরীক্ষা কোড: 203 | প্রশ্নপত্র কোড: 089
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
علوم الحديث
[উলূমুল হাদিস]
বিষয় কোড: 203303
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – রচনামূলক প্রশ্নাবলী]
মান: ১৫ × ৪ = ৬০
١- عرّف علم مصطلح الحديث وبيّن نشأته وتطوره-
[১. ইলমে মুসতালাহুল হাদিসের সংজ্ঞা দাও এবং এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনুল কারীমের পর ইসলামি শরীয়তের দ্বিতীয় অকাট্য উৎস হলো হাদিস বা সুন্নাতে নাবাবিয়্যাহ। হাদিসের বিশুদ্ধতা রক্ষা, জাল-বানোয়াট বর্ণনা চিহ্নিতকরণ এবং সনদের মান যাচাইয়ের জন্য মুসলিম মনীষীগণ যে অনন্য বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র উদ্ভাবন করেছেন, তাকে ‘ইলমে মুসতালাহুল হাদিস’ (উসুলুল হাদিস) বলা হয়। এটি মানব ইতিহাসের সর্বাধিক নিখুঁত ও বিস্ময়কর তথ্য যাচাইকরণ বিজ্ঞান।
ইলমে মুসতালাহুল হাদিসের সংজ্ঞা (تعريف علم مصطلح الحديث)
শাব্দিক অর্থ: ‘মুসতালাহ’ (مصطلح) অর্থ পরিভাষা বা সর্বসম্মত নিয়ম, আর ‘হাদিস’ (حديث) অর্থ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি।
পারিভাষিক অর্থ: হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.)-এর মতে:
هُوَ عِلْمٌ بِقَوَاعِدَ يُعْرَفُ بِهَا أَحْوَالُ السَّنَدِ وَالْمَتْنِ مِنْ حَيْثُ الْقَبُولُ وَالرَّدُّ
“ইলমে মুসতালাহুল হাদিস হলো এমন কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতির জ্ঞান, যার সাহায্যে হাদিসের সনদ ও মতনের গ্রহণযোগ্যতা (মাকবুল) এবং বর্জনীয়তা (মারদুদ) নিরূপণ করা যায়।”
বিষয়বস্তু (موضوعه): হাদিসের সনদ (বর্ণনাকারী পরম্পরা) এবং মতন (মূল বক্তব্য)।
উদ্দেশ্য (فائدته): সহিহ ও দুর্বল হাদিসের পার্থক্য নির্ণয় করা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামে মিথ্যা অপবাদ থেকে দ্বীনকে সুরক্ষিত রাখা।
ইলমে মুসতালাহুল হাদিসের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره)
হাদিসশাস্ত্রের উৎপত্তি ও বিকাশ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তা যুগ পরম্পরায় ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে:
- সাহাবি যুগ (প্রথম স্তর):
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় সরাসরি তাঁর কাছ থেকে হাদিস শোনা হতো। কিন্তু তাঁর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম বিশেষ করে হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রা.) হাদিস বর্ণনায় অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। বর্ণনাকারীর কাছে সাক্ষী তলব করা হতো বা শপথ নেওয়া হতো। এটিই ছিল মুসতালাহুল হাদিসের প্রাথমিক বীজ। - তাবেঈ যুগ ও ফিতনার সূচনা (দ্বিতীয় স্তর):
হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাত এবং সিফফিনের যুদ্ধের পর যখন রাজনৈতিক কোন্দল ও খারেজি-শিয়াদের দলীয় স্বার্থে হাদিস রচনার অপচেষ্টা শুরু হয়, তখন সনদের অনুসন্ধান বাধ্যতামূলক করা হয়। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) ঐতিহাসিক উক্তি করেন:لَمْ يَكُونُوا يَسْأَلُونَ عَنِ الْإِسْنَادِ، فَلَمَّا وَقَعَتِ الْفِتْنَةُ قَالُوا: سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ
“পূর্বে মানুষ সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত না; কিন্তু যখন ফিতনা দেখা দিল, তখন তারা বলতে লাগল: তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বল।” এই যুগেই জারহ ও তাদীল শাস্ত্রের বিকাশ ঘটে।
- সংকলন ও নিয়মবদ্ধকরণ যুগ (তৃতীয় স্তর):
দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরি শতকে ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘আর-রিসালাহ’-তে হাদিস গ্রহণের মৌলিক নীতিমালা প্রথম লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে ইমাম বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ নিজ নিজ কিতাবের ভূমিকায় ও তারীখ গ্রন্থে ইলমুল হাদিসের নিয়মসমূহ আলোচনা করেন। - স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনার যুগ (চতুর্থ স্তর):
চতুর্থ হিজরি শতকে উসুলুল হাদিসের ওপর সর্বপ্রথম স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেন কাজী আবু মুহাম্মদ আল-হাসান ইবনে আব্দুর রহমান আর-রামাহুরমুজী (মৃত্যু ৩৬০ হি.)। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম:
“আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বায়নাল কাঈ ওয়াল ওয়াঈ” (المحدث الفاصل بين الراوي والواعي)। - পরবর্তী প্রামাণ্য গ্রন্থাবলী:
পরবর্তীতে হাকিম নিশাপুরী রচনা করেন ‘মা’রিফাতু উলূমিল হাদিস’, খতিব বাগদাদী রচনা করেন ‘আল-কিফায়াহ ফি ইলমির রিওয়ায়াহ’, ইমাম ইবনুস সালাহ রচনা করেন অমর গ্রন্থ ‘মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ’ এবং হাফেজ ইবনে হাজার রচনা করেন কালজয়ী ‘নুখবাতুল ফিকার’ ও তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘নুযহাতুন নাযার’।
উপসংহার
মুসতালাহুল হাদিস ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার। এর মাধ্যমেই দেড় হাজার বছর ধরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হুবহু অপরিবর্তিত অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে।
٢- عرّف المشهور والعزيز والغريب مع التمثيل لكل منها-
[২. আল-মাশহুর, আল-আযীয এবং আল-গারীব হাদিসের পরিচয় দাও এবং প্রতিটির উদাহরণ পেশ কর।]
ভূমিকা
খবরে ওয়াহিদ (বর্ণনাকারীর সংখ্যার ভিত্তিতে হাদিস) প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত: মাশহুর, আযীয ও গারীব। হাদিসের সনদের প্রতিটি স্তরে বর্ণনাকারীর সংখ্যার তারতম্যের কারণে এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে।
১. আল-মাশহুর হাদিস (الحديث المشهور)
সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদের প্রতিটি স্তরে কমপক্ষে তিনজন বা ততোধিক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা মুতাওয়াতির হাদিসের সংখ্যাসীমায় পৌঁছেনি, তাকে ‘মাশহুর’ বা সুপ্রসিদ্ধ হাদিস বলা হয়।
উদাহরণ: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিস:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنَ الْعِبَادِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ
“নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের অন্তর থেকে ইলম ছিনিয়ে নিয়ে উঠিয়ে নেবেন না; বরং আলেমদের মৃত্যুর মাধ্যমেই তিনি ইলম উঠিয়ে নেবেন।” (সহিহ বুখারি)—এই হাদিসটির প্রতিটি স্তরে তিন বা ততোধিক রাবী রয়েছেন।
২. আল-আযীয হাদিস (الحديث العزيز)
সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদের যেকোনো একটি স্তরে অন্তত দুজন বর্ণনাকারী বিদ্যমান থাকে (অর্থাৎ বর্ণনাকারীর সংখ্যা দুইয়ের নিচে নামে না, যদিও কোনো স্তরে তার চেয়ে বেশি হতে পারে), তাকে ‘আযীয’ হাদিস বলা হয়।
উদাহরণ: হযরত আনাস ও হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত বিখ্যাত হাদিস:
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সমগ্র মানবজাতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)—হযরত আনাস (রা.) থেকে এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন দুইজন বিশিষ্ট তাবেঈ: কাতাদাহ ও আব্দুল আজিজ ইবনে সুহাইব। তাঁদের দুজনের কাছ থেকেও একাধিক রাবী বর্ণনা করেছেন।
৩. আল-গারীব হাদিস (الحديث الغريب)
সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদের যেকোনো স্তরে কেবল একজনমাত্র বর্ণনাকারী এককভাবে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন (তাবাররুদ), তাকে ‘গারীব’ হাদিস বলা হয়।
উদাহরণ: সহিহ বুখারির সর্বপ্রথম হাদিস:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
“নিশ্চয় যাবতীয় আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করবে তাই পাবে।” (সহিহ বুখারি)—এই বিখ্যাত হাদিসটি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে কেবল হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেছেন। ওমর (রা.) থেকে আলকামা ইবনে ওয়াক্কাস, তাঁর থেকে মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম আত-তায়মী এবং তাঁর থেকে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন। এরপর ইয়াহইয়ার কাছ থেকে শত শত রাবী বর্ণনা করেছেন।
উপসংহার
মাশহুর, আযীয ও গারীব—এই তিনটি প্রকারই খবরে ওয়াহিদের অন্তর্ভুক্ত। এদের বিশুদ্ধতা সনদের শর্তাবলি (ইত্তিসালুস সানাদ, আদল ও দ্বাবত) পূরণের ওপর নির্ভর করে; অর্থাৎ এগুলো সহিহ, হাসান বা জয়িফ যেকোনোটি হতে পারে।
٣- بيّن مكانة السنة وأهميتها في التشريع الإسلامي-
[৩. ইসলামি আইন প্রণয়নে সুন্নাহর স্থান ও গুরুত্ব বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি শরীয়তের প্রধান দুটি ভিত্তিমূলের মধ্যে পবিত্র কুরআন হলো মূল ভিত্তি এবং সুন্নাতে নাবাবিয়্যাহ হলো তার অপরিহার্য ব্যাখ্যা ও পরিপূরক ভিত্তি। সুন্নাহ ছাড়া কুরআন এবং ইসলামি আইনের বাস্তব প্রয়োগ অসম্ভব। শরীয়তের দলিল হিসেবে সুন্নাহর প্রামাণিকতা উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
ইসলামি আইন প্রণয়নে সুন্নাহর অবস্থান (مكانة السنة)
ইসলামি ফিকহ ও উসুলবিদগণের মতে, আইন প্রণয়নের উৎসের দিক থেকে সুন্নাহর মর্যাদা কুরআনের ঠিক পরেই। মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে যখন ইয়েমেনের গভর্নর হিসেবে পাঠানো হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: তুমি কীভাবে বিচার করবে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: আল্লাহর কিতাব দিয়ে। রাসূল (সা.) বললেন: যদি তাতে না পাও? তিনি বললেন: তবে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ দিয়ে। রাসূল (সা.) এ উত্তরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
কুরআনের সাথে সুন্নাহর আইনি সম্পর্ক ও গুরুত্ব (أهمية السنة في التشريع)
কুরআনের আইনের সাথে সুন্নাহ প্রধানত চারভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আইনগত রূপ প্রদান করে:
- মুওয়াক্কিদাহ বা কুরআনি বিধানের সমর্থন ও তাকীদ:
অনেক ক্ষেত্রে সুন্নাহ কুরআনের নির্দেশিত বিধানকেই পুনরুচ্চারণ করে আরও সুদৃঢ় করে। যেমন: নামাজ কায়েম করা, পিতা-মাতার সেবা করা, মিথ্যা সাক্ষ্য বর্জন করা ইত্যাদি। - মুবায্যিনাহ বা কুরআনের সংক্ষিপ্ত বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
পবিত্র কুরআনে অধিকাংশ বিধি-বিধান সংক্ষিপ্ত বা মৌলিক আকারে এসেছে। সুন্নাহ তার বিস্তারিত নিয়মাবলি বাস্তব রূপ দান করেছে:- কুরআনে সালাত কায়েমের নির্দেশ আছে, কিন্তু সালাতের ওয়াক্ত, রাকাত সংখ্যা ও রুকু-সিজদার পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা.) হাদিসে শিখিয়েছেন: “তোমরা সেভাবে সালাত আদায় কর যেভাবে আমাকে করতে দেখেছ।”
- কুরআনে যাকাত দেওয়ার নির্দেশ আছে, কিন্তু যাকাতের নেসাব ও শতকরা আড়াই টাকা সুন্নাহ নির্ধারণ করেছে।
- হজের বিস্তারিত নিয়ম সুন্নাহ শিখিয়েছে: “তোমরা আমার কাছ থেকে হজের নিয়মাবলী শিখে নাও।”
- মুকাইয়িদাহ ও মুখাসসিসাহ (কুরআনের সাধারণ হুকুমকে নির্দিষ্ট বা শর্তযুক্ত করা):
কুরআনে সাধারণভাবে সকল চোরের হাত কাটার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু হাদিস নির্দিষ্ট করেছে যে কত পরিমাণ সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা যাবে। কুরআনের সাধারণ মিরাসের আয়াত থেকে সুন্নাহ অমুসলিম ওয়ারিশ এবং নবীদের সম্পত্তিকে পৃথক করেছে। - মুজসিযাহ বা সম্পূর্ণ স্বাধীন নতুন আইনের প্রবর্তন (استقلال السنة بالتشريع):
এমন বহু বিধান রয়েছে যা কুরআনে সরাসরি আসেনি, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) সুন্নাহর মাধ্যমে তা হারাম বা হালাল করেছেন। যেমন:- গৃহপালিত গাধার গোশত এবং নখ বা দাঁতযুক্ত হিংস্র পশুর গোশত খাওয়া হারাম করা।
- একই সাথে কোনো নারী ও তার খালা বা ফুফুকে এক বিয়েতে একত্র করা হারাম করা।
- পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ও রেশমি কাপড় ব্যবহার হারাম করা।
উপসংহার
সুন্নাহকে অস্বীকার করার অর্থ প্রকারান্তরে কুরআনকেই অর্থহীন করে তোলা। অতএব, ইসলামি আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি পদক্ষেপে সুন্নাহ হলো অবিচ্ছেদ্য প্রামাণ্য উৎস।
٤- عرّف المعلق والمعضل والمرسل والمدلس والمنقطع مع التمثيل-
[৪. আল-মুআল্লাক, আল-মু’দাল, আল-মুরসাল, আল-মুদাল্লাস এবং আল-মুনকাতি’ হাদিসের পরিচয় দাও এবং উদাহরণ পেশ কর।]
ভূমিকা
হাদিসের বিশুদ্ধতা রক্ষার প্রধান শর্ত হলো সনদের অবিচ্ছিন্নতা (ইত্তিসালুস সানাদ)। সনদের কোনো স্তর থেকে রাবী বাদ পড়লে (সাকাতুস সানাদ) হাদিসটি গ্রহণযোগ্যতা হারায়। সনদ বিচ্ছিন্নতার প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে হাদিসের বিভিন্ন নামকরণ করা হয়েছে।
১. আল-মুআল্লাক (الحديث المعلق)
সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদের প্রথম দিক থেকে (অর্থাৎ হাদিস সংকলক মুহাদ্দিসের দিক থেকে) এক বা একাধিক বর্ণনাকারী ধারাবাহিকভাবে বাদ পড়ে, এমনকি পুরো সনদ বাদ দিয়ে সরাসরি রাসূল (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধ করা হয়, তাকে মুআল্লাক হাদিস বলে।
উদাহরণ: ইমাম বুখারি (রহ.) অনেক সময় সনদের উল্লেখ ছাড়া বলেন:
وَقَالَ مَالِكٌ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ أَنَسٍ: دَخَلَ النَّبِيُّ ﷺ مَكَّةَ وَعَلَى رَأْسِهِ الْمِغْفَرُ
এখানে ইমাম বুখারি নিজের ও ইমাম মালিকের মধ্যবর্তী রাবী উল্লেখ করেননি।
২. আল-মু’দাল (الحديث المعضل)
সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদের যেকোনো স্থান থেকে পরপর দুই বা ততোধিক বর্ণনাকারী বাদ পড়ে যায়, তাকে মু’দাল হাদিস বলে। এটি অত্যন্ত দুর্বল স্তরের হাদিস।
উদাহরণ: কোনো তাবেঈ যদি সাহাবি এবং অপর তাবেঈ—এই দুই স্তরকে বাদ দিয়ে সরাসরি বলেন “রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন”, তবে তা মু’দাল হবে।
৩. আল-মুরসাল (الحديث المرسل)
সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদের শেষ প্রান্তে সাহাবির নাম বাদ পড়ে যায়; অর্থাৎ কোনো তাবেঈ সরাসরি সাহাবির মাধ্যম উল্লেখ না করে বলেন “রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন”, তাকে মুরসাল হাদিস বলে।
উদাহরণ: বিখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহ.) যখন বলেন: “রাসূলুল্লাহ (সা.) মুহাকালাহ ও মুযাবানাহ ক্রয়-বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন”—এখানে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব তাবেঈ হওয়া সত্ত্বেও কোনো সাহাবির নাম নেননি।
৪. আল-মুদাল্লাস (الحديث المدلس)
সংজ্ঞা: সনদের কোনো ত্রুটি বা দুর্বল রাবীর নাম গোপন রেখে শ্রোতার কাছে বাহ্যিকভাবে সনদটি ত্রুটিমুক্ত বা সরাসরি শোনা মনে করানোর প্রক্রিয়াকে তাদলীস বলে এবং এরূপ হাদিসকে মুদাল্লাস হাদিস বলা হয়।
প্রকার: তাদলীসুস সানাদ (উস্তাদের নাম গোপন করে সমসাময়িক ঊর্ধ্বতনের নাম বলা) এবং তাদলীসুশ শুয়ূখ (উস্তাদের অপ্রসিদ্ধ নাম ব্যবহার করা)। যেমন রাবী বলে: “হাদ্দাসানা” না বলে অস্পষ্ট শব্দ “আন” (عن فلان) ব্যবহার করা।
৫. আল-মুনকাতি’ (الحديث المنقطع)
সংজ্ঞা: যে হাদিসের সনদের যেকোনো স্থান থেকে (শুরু বা শেষ ব্যতীত) একজন রাবী বাদ পড়ে যায়, অথবা একাধিক স্থানে একজন একজন করে বাদ পড়ে কিন্তু তা পরপর নয়, তাকে মুনকাতি’ হাদিস বলে।
উদাহরণ: আব্দুল রাজ্জাক সুফিয়ান সাওরি থেকে, তিনি আবু ইসহাক থেকে, তিনি যায়েদ ইবনে উছাই থেকে, তিনি হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন। এখানে সুফিয়ান ও আবু ইসহাকের মাঝে একজন রাবী বাদ পড়েছেন।
উপসংহার
সনদের বিচ্ছিন্নতার কারণে এই পাঁচ প্রকারের হাদিসই দুর্বল (দ্বয়ীফ) হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। তবে তাদলীসকারী নির্ভরযোগ্য হলে এবং স্পষ্ট শ্রবণের প্রমাণ দিলে তাঁর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
٥- اذكر مراتب الجرح والتعديل وألفاظهما-
[৫. জারহ ও তাদীল-এর স্তরসমূহ এবং এর পরিভাষাগত শব্দাবলী উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
ইলমুল জারহ ওয়াত তাদীল হলো হাদিস বর্ণনাকারীদের (রাবী) দোষ-ত্রুটি ও গুণাবলী মূল্যায়নের শাস্ত্র। মুহাদ্দিসগণের এই চুলচেরা বিশ্লেষণের ওপরই হাদিসের সহিহ ও দুর্বল হওয়া নির্ধারিত হয়। ইমাম ইবনু আবি হাতিম এবং পরবর্তীতে হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী জারহ ও তাদীলকে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন।
তাদীল (প্রশংসা ও বিশ্বস্ততা)-এর ছয়টি স্তর ও শব্দাবলী
- প্রথম স্তর (সর্বোচ্চ স্তর – অতিশয়বাচক): এমন শব্দ যা রাবীর সর্বোচ্চ বিশ্বস্ততা প্রকাশ করে। যেমন: আওসাকুন নাস (أوثق الناس – সর্বাধিক বিশ্বস্ত), আসবাতুন নাস (أثبت الناس)।
- দ্বিতীয় স্তর (দ্বৈত প্রশংসা): কোনো প্রশংসাসূচক শব্দ দুবার ব্যবহার করা। যেমন: ছিক্বাহ ছিক্বাহ (ثقة ثقة), ছিক্বাহ সাবত (ثقة ثبت)।
- তৃতীয় স্তর (একক স্পষ্ট প্রশংসা): একক শব্দে বিশ্বস্ততা প্রকাশ। যেমন: ছিক্বাহ (ثقة), সাবত (ثبت), মুতকিন (متقن), ইমাম (إمام)।
- চতুর্থ স্তর (সামান্য নিম্নমানের সততা): সত্যবাদী কিন্তু স্মৃতিশক্তি সামান্য দুর্বল। যেমন: সাদূক্ব (صدوق – সত্যবাদী), লা বা’সা বিহী (لا بأس به – কোনো সমস্যা নেই), খিয়ার (خيار)।
- পঞ্চম স্তর (পরখ করার উপযোগী): যাদের হাদিস লিখে রেখে যাচাই করতে হয়। যেমন: মাহাল্লুহুস সিদক (محله الصدق), ছাদূক্ব ইনশাআল্লাহ (صدوق إن شاء الله)।
- ষষ্ঠ স্তর (সর্বনিম্ন তাদীল): প্রশংসার শেষ সীমা, যা জারহের নিকটবর্তী। যেমন: সালেহুল হাদিস (صالح الحديث – বর্ণনায় মোটামুটি গ্রহণযোগ্য)।
জারহ (সমালোচনা ও দুর্বলতা)-এর ছয়টি স্তর ও শব্দাবলী
- প্রথম স্তর (হালকা জারহ): সামান্য ত্রুটি নির্দেশক শব্দ। যেমন: লায়্যিনুল হাদিস (لين الحديث – বর্ণনায় শিথিল), ফীহি মাকাল (فيه مقال – তার ব্যাপারে কথা আছে)।
- দ্বিতীয় স্তর (হাদিস দলিলযোগ্য নয়): যেমন: লা ইউহতাজ্জু বিহী (لا يحتج به – তার দ্বারা দলিল গ্রহণ করা যাবে না), দ্বয়ীফ (ضعيف – দুর্বল)।
- তৃতীয় স্তর (পরিত্যাজ্য হওয়ার নিকটবর্তী): যেমন: ওয়াহী (واهي – অকেজো), লা ইউকতারাবু বিহী (لا يقترب به)।
- চতুর্থ স্তর (হাদিস সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত): যেমন: মাতরূকুল হাদিস (متروك الحديث – পরিত্যক্ত), ওয়াহিয়ুল হাদিস, সাকিত (ساقط)।
- পঞ্চম স্তর (মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত): যেমন: মুত্তাহামুন বিল কিযব (متهم بالكذب – মিথ্যা বর্ণনায় অভিযুক্ত), ইয়াসরিকুল হাদিস (হাদিস চুরি করে)।
- ষষ্ঠ স্তর (সর্বনিকৃষ্ট স্তর – চরম জালিয়াত): যেমন: কায্যাব (كذاب – মহা মিথ্যাবাদী), ওয়াদ্দায়ি’ (وضاع – হাদিস জালকারী), দাজ্জাল (دجال)।
উপসংহার
জারহ ও তাদীলের এই স্তরবিন্যাস মুহাদ্দিসগণের এক অনুপম ন্যায়নিষ্ঠ বিচারব্যবস্থা, যা ব্যক্তির প্রতি রাগ-অনুরাগ মুক্ত থেকে কেবল দ্বীনের সুরক্ষায় প্রয়োগ করা হয়েছে।
٦- ما هو الخبر الضعيف؟ وبيّن حكم روايته والعمل به-
[৬. খবরে দ্বয়ীফ (দুর্বল হাদিস) কাকে বলে? এটি বর্ণনা করার এবং এর ওপর আমল করার শরয়ি হুকুম ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
হাদিসশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো খবরে দ্বয়ীফ বা দুর্বল হাদিস। যে হাদিসের মধ্যে সহিহ বা হাসান হাদিসের গুণাবলী পাওয়া যায় না, তাকে হাদিসবিদগণ জয়িফ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইসলামি শরিয়তে জয়িফ হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা ও আমলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে।
খবরে দ্বয়ীফের সংজ্ঞা (تعريف الخبر الضعيف)
পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা বাইকূনী (রহ.) তাঁর ‘মানযূমাহ’-তে বলেন:
وَكُلُّ مَا عَنْ رُتْبَةِ الْحُسْنِ قَصُرْ * فَهْوَ الضَّعِيفُ وَهْوَ أَقْسَامًا كَثُرْ
“যে হাদিস সহিহ ও হাসান হাদিসের শর্তাবলি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তাই দ্বয়ীফ বা দুর্বল হাদিস; এবং এর বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে।”
অন্য কথায়, যে হাদিসের সনদের অবিচ্ছিন্নতা নেই, অথবা বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা বা স্মৃতিশক্তিতে ঘাটতি রয়েছে এবং তা সর্বপ্রকার ইল্লত (সূক্ষ্ম ত্রুটি) ও শায (ব্যতিক্রম) মুক্ত নয়, তাকে দুর্বল হাদিস বলে।
জয়িফ হাদিস বর্ণনা করার হুকুম (حكم رواية الحديث الضعيف)
মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো:
- আকাইদ ও হালাল-হারামের ক্ষেত্রে: দ্বয়ীফ হাদিস দিয়ে কোনো ইসলামি আকিদা বা হালাল-হারামের বিধান সাব্যস্ত করা যাবে না। এগুলো বর্ণনা করা বৈধ নয়, যদি না সাথে সাথে তার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়।
- ফাযায়েল ও ওয়ায-নসিহতের ক্ষেত্রে: অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে, চরম দুর্বল বা জাল না হলে সনদ উল্লেখ না করে সতর্কতা হিসেবে দুর্বল হাদিস বর্ণনা করা যায়। তবে ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন’ (قَالَ رَسُولُ اللَّهِ) নিশ্চিতভাবে না বলে বরং ‘বর্ণিত আছে’ (رُوِيَ عَنْهُ) বা এমন পরোক্ষ শব্দ (সেগায়ে তামরীদ) ব্যবহার করতে হবে।
জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করার হুকুম ও শর্তাবলী (حكم العمل به)
ইমাম নববী এবং হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.)-এর মতে, ফজিলতপূর্ণ আমল, নফল ইবাদত ও তাগিব-তারহিবের (উদ্বুদ্ধকরণ ও ভীতিপ্রদর্শন) ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত সাপেক্ষে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করা জায়েজ:
- চরম দুর্বল না হওয়া (أن يكون الضعف غير شديد): হাদিসটি যেন অত্যন্ত দুর্বল না হয়; অর্থাৎ রাবী যেন মিথ্যাবাদী, মিথ্যার অভিযুক্ত বা মাতরূক না হন।
- শরীয়তের কোনো মূলনীতির আওতাভুক্ত হওয়া (أن يندرج تحت أصل عام): হাদিসে বর্ণিত আমলটি যেন কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর কোনো প্রতিষ্ঠিত সাধারণ মূলনীতির সাথে সংগতিপূর্ণ হয় (যেমন সালাত, জিকির, দান-সদকার সাধারণ ফজিলত)। কোনো সম্পূর্ণ অভিনব ইবাদত না হওয়া।
- সুদৃঢ় বিশ্বাস পোষণ না করা (ألا يعتقد عند العمل به ثبوته): আমল করার সময় এটি যে সুনিশ্চিতভাবে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ—এমন অকাট্য বিশ্বাস রাখা যাবে না; বরং সতর্কতা হিসেবে আমল করতে হবে।
উপসংহার
জয়িফ হাদিস মানেই জাল হাদিস নয়। তবে সতর্কতামূলক শর্তাবলী কঠোরভাবে মেনে না চললে সমাজে নানাবিধ বিদআত ও কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে।
مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী]
মান: ৫ × ৪ = ২০
٧- من هو المحدث؟ واذكر آدابه-
[৭. মুহাদ্দিস কে? তাঁর আবশ্যকীয় শিষ্টাচারসমূহ উল্লেখ কর।]
উত্তর
মুহাদ্দিসের পরিচয়: যিনি হাদিস, হাদিসের সনদ, মতন, রাবীগণের জীবনী, তাঁদের জারহ-তাদীল এবং হাদিসের বিভিন্ন স্তর ও ইল্লত সম্পর্কে গভীর ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের অধিকারী এবং বিপুল সংখ্যক হাদিসের সনদ মুখস্থ রাখেন, তাঁকে ‘মুহাদ্দিস’ (المحدث) বলা হয়।
মুহাদ্দিসের আবশ্যকীয় আদব বা শিষ্টাচার:
- খাঁটি নিয়্যাত ও ইখলাস: পার্থিব সম্মান বা অর্থোপার্জনের উদ্দেশ্য পরিহার করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হাদিস চর্চা করা।
- আমল ও সুন্নাহর বাস্তবায়ন: নিজে যা বর্ণনা করেন, নিজ জীবনে সেই সুন্নাহর পরিপূর্ণ প্রতিফলন ঘটানো।
- শ্রোতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি স্নেহশীলতা: শিক্ষার্থীদের প্রতি নম্র আচরণ করা এবং জ্ঞানের অহংকার বর্জন করা।
- পবিত্র অবস্থায় হাদিস পাঠদান: ওজু ও পবিত্রতার সাথে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে অত্যন্ত আদবের সাথে হাদিসের মজলিসে বসা। যেমন ইমাম মালিক (রহ.) হাদিস শোনানোর পূর্বে গোসল করে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।
٨- بيّن أهمية الإسناد في علم الحديث-
[৮. হাদিসশাস্ত্রে ইসনাদ (সনদ)-এর গুরুত্ব আলোচনা কর।]
উত্তর
ইসনাদের গুরুত্ব: ‘ইসনাদ’ (الإسناد) অর্থ মূল মতন পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক যোগসূত্র। এটি ইসলামি উম্মাহর এক অনন্য গৌরবময় বৈশিষ্ট্য, যা পূর্ববর্তী কোনো জাতির কিতাবে ছিল না।
- দ্বীনের অঙ্গ: প্রখ্যাত তাবেঈ ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন:
الْإِسْنَادُ مِنَ الدِّينِ، وَلَوْلَا الْإِسْنَادُ لَقَالَ مَنْ شَاءَ مَا شَاءَ
“ইসনাদ হলো দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ; যদি ইসনাদ না থাকত, তবে যার যা ইচ্ছা সে তা-ই বলত।”
- সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী: সনদের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমেই জালিয়াতদের মিথ্যা বর্ণনা থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণীকে পৃথক করা সম্ভব হয়েছে।
- ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা: সনদ হলো এমন দলিল যার সাহায্যে প্রতিটি বর্ণনার মূল বক্তা পর্যন্ত শতভাগ নিখুঁতভাবে পৌঁছানো যায়।
٩- ما هي طرق تحمل الحديث؟
[৯. হাদিস ধারণ বা গ্রহণের (তাহাম্মুলুল হাদিস) পদ্ধতিসমূহ কী কী?]
উত্তর
উস্তাদের নিকট থেকে হাদিস গ্রহণ ও সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে ‘তাহাম্মুলুল হাদিস’ (طرق تحمل الحديث) বলা হয়। মুহাদ্দিসগণের নিকট এর প্রধান ৮টি পদ্ধতি রয়েছে:
- আস-সামা’ (السماع): উস্তাদের মুখের পাঠ সরাসরি শ্রবণ করা (সর্বোচ্চ স্তর)।
- আল-কিরাআত বা আরয (القراءة على الشيخ): উস্তাদের সামনে ছাত্র কর্তৃক হাদিস পাঠ করা এবং উস্তাদ তা নীরবে শুনে সংশোধন করা।
- আল-ইজাযাহ (الإجازة): উস্তাদ কর্তৃক নির্দিষ্ট বা অনির্দিষ্ট ছাত্রকে তাঁর হাদিস বর্ণনার মৌখিক বা লিখিত অনুমতি প্রদান।
- আল-মুনাওয়ালাহ (المناولة): উস্তাদ নিজ হাতে ছাত্রকে হাদিসের পাণ্ডুলিপি দিয়ে বর্ণনার অনুমতি দেওয়া।
- আল-মুকাতাবাহ (المكاتبة): উস্তাদ নিজ হাতে হাদিস লিখে কোনো ছাত্রের কাছে প্রেরণ করা।
- আল-ই’লাম (الإعلام): ছাত্রকে জানানো যে এই হাদিসটি আমার কাছে অমুক সনদে বর্ণিত আছে (স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া)।
- আল-ওয়াসিয়্যাহ (الوصية): মৃত্যুর পূর্বে বা সফরের সময় কাউকে নিজের হাদিসের কিতাব অসিয়ত করে যাওয়া।
- আল-বিজাদাহ (الوجادة): কোনো নির্ভরযোগ্য উস্তাদের হস্তলিখিত হাদিসের কিতাব খুঁজে পাওয়া।
١٠- ما هو الخبر المقبول؟ واذكر شروطه-
[১০. খবরে মাকবুল (গ্রহণযোগ্য হাদিস) কাকে বলে? এর শর্তাবলী উল্লেখ কর।]
উত্তর
সংজ্ঞা: যে হাদিসের বর্ণনাকারীদের সত্যবাদিতা ও বর্ণনার নির্ভুলতা প্রাধান্য পায় এবং যার ওপর আমল করা আবশ্যক বা বৈধ, তাকে ‘খবরে মাকবুল’ (الخبر المقبول) বলে। সহিহ এবং হাসান হাদিস মাকবুলের অন্তর্ভুক্ত।
শর্তাবলী: খবরে মাকবুল (বিশেষত সহিহ হাদিস)-এর প্রধান শর্ত ৫টি:
- ইত্তিসালুস সানাদ (اتصال السند): সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি রাবী তাঁর পূর্ববর্তী উস্তাদের কাছ থেকে সরাসরি শুনেছেন—এমন অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্র থাকা।
- আদালাতুর রুয়াত (عدالة الرواة): সনদের প্রতিটি বর্ণনাকারী প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম, বিবেকবান, তাকওয়াসম্পন্ন এবং কবিরা গুনাহ ও নীচ স্বভাব থেকে মুক্ত হওয়া।
- দ্বাবতুর রুয়াত (ضبط الرواة): প্রতিটি রাবীর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি থাকা (স্মৃতিতে বা লিখিত কিতাবে অবিকল সংরক্ষিত রাখা)।
- শায না হওয়া (عدم الشذوذ): কোনো নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনা নিজের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনার বিপরীত না হওয়া।
- মুআল্লাল না হওয়া (عدم العلة): এমন কোনো গোপন ও সূক্ষ্ম ত্রুটি না থাকা যা হাদিসের বিশুদ্ধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
١١- ما هي شروط قبول الراوي؟
[১১. হাদিস বর্ণনাকারীর (রাবী) গ্রহণযোগ্যতার শর্তসমূহ কী কী?]
উত্তর
হাদিস বিশারদদের মতে, একজন রাবীর হাদিস গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য মৌলিক দুটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকা আবশ্যক: ১. আল-আদালাহ (عدالة) এবং ২. আদ-দ্বাবত (ضبط)। এর অধীনে বিস্তারিত শর্তাবলী নিম্নরূপ:
- ইসলাম (الإسلام): রাবীকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে (কাফির অবস্থায় হাদিস শুনলে পরে ইসলাম গ্রহণের পর তা বর্ণনা করা যায়)।
- বুলূগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া (البلوغ): বর্ণনার সময় রাবীকে প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।
- আকল বা বুদ্ধিমান হওয়া (العقل): পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির বর্ণনা বাতিল।
- তাকওয়া ও দ্বীনদারি (التقوى): কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং সগিরা গুনাহে অবিচল না থাকা।
- মুরূয়াত বা সামাজিক শালীনতা (المروءة): সমাজের চোখে লজ্জাজনক ও নীচ কার্যকলাপ থেকে মুক্ত থাকা।
- দ্বাবতে তাম বা পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিশক্তি: হাদিস মুখস্থ রাখা বা লিখিত কিতাবের যথাযথ হেফাজতের মাধ্যমে বিকৃতি ও সন্দেহমুক্তভাবে তা বর্ণনা করার যোগ্যতা থাকা।
١٢- عرّف السند والمتن والإسناد والمسند-
[১২. সানাদ, মাতান, ইসনাদ এবং মুসনাদ-এর সংজ্ঞা দাও।]
উত্তর
হাদিসশাস্ত্রের মৌলিক চারটি পারিভাষিক শব্দের সংজ্ঞা নিম্নরূপ:
- আস-সানাদ (السند):
‘সানাদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ অবলম্বন বা খুঁটি। পরিভাষায়: হাদিসের মূল বক্তব্য (মতন) পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য বর্ণনাকারীদের যে ধারাবাহিক নামতালিকা বা শৃঙ্খলা থাকে, তাকে সানাদ বলে (سلسلة الرجال الموصلة للمتن)। - আল-মতন (المتن):
‘মতন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ জমিনের উঁচু ও শক্ত স্থান। পরিভাষায়: সনদের শেষ প্রান্তে রাসূলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবির যে মূল বাণী, কাজ বা বিবরণ সমাপ্ত হয়, তাকে মতন বলে (ما ينتهي إليه غاية السند من الكلام)। - আল-ইসনাদ (الإسناد):
হাদিসের বক্তব্যকে তার মূল বক্তা পর্যন্ত বর্ণনাকারী পরম্পরার মাধ্যমে সম্বন্ধযুক্ত করা বা সনদ উল্লেখ করার প্রক্রিয়াকে ইসনাদ বলা হয়। অনেক সময় সনদ এবং ইসনাদ সমার্থক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। - আল-মুসনাদ (المسند):
শব্দটি তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়:- যে হাদিসের সনদ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবিচ্ছিন্নভাবে রাসূল (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে।
- যে কিতাবে সাহাবিদের নামের ক্রমানুসারে হাদিস সংকলন করা হয়েছে (যেমন: মুসনাদে আহমাদ)।
- সনদযুক্ত মূল হাদিসকে রূপকভাবে মুসনাদ বলা হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ইলমে মুসতালাহুল হাদিস পাঠের মূল উদ্দেশ্য কী?
হাদিসের সনদ ও মতনের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সহিহ ও দুর্বল হাদিসের পার্থক্য নির্ণয় করা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহকে সর্বপ্রকার মিথ্যা ও বিকৃতি থেকে সংরক্ষণ করা।
২. সর্বপ্রথম উসুলুল হাদিসের ওপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ কে রচনা করেন?
চতুর্থ হিজরি শতকের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস কাজী আবু মুহাম্মদ আল-হাসান ইবনে আব্দুর রহমান আর-রামাহুরমুজী (মৃত্যু ৩৬০ হি.) রচিত ‘আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল বায়নাল রাঈ ওয়াল ওয়াঈ’ হলো এ বিষয়ের প্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ।
৩. সহিহ হাদিস হওয়ার মৌলিক শর্ত কয়টি ও কী কী?
সহিহ হাদিসের প্রধান শর্ত পাঁচটি: ১. সনদের অবিচ্ছিন্নতা, ২. সকল রাবীর ন্যায়পরায়ণতা (আদল), ৩. রাবীর পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিশক্তি (দ্বাবত), ৪. শায (স্ববিরোধিতা) মুক্ত হওয়া এবং ৫. ক্ষতিকর গোপন ত্রুটি (ইল্লত) মুক্ত হওয়া।
৪. ‘খবরে ওয়াহিদ’ কয় প্রকার ও কী কী?
বর্ণনাকারীর সংখ্যার তারতম্য বিবেচনায় খবরে ওয়াহিদ তিন প্রকার: ১. মাশহুর (প্রতি স্তরে কমপক্ষে তিনজন রাবী), ২. আযীয (যেকোনো স্তরে কমপক্ষে দুজন রাবী) এবং ৩. গারীব (একক রাবী দ্বারা বর্ণিত)।
৫. দুর্বল (দ্বয়ীফ) হাদিসের ওপর কি আমল করা যায়?
আকাইদ ও হালাল-হারামের ক্ষেত্রে দ্বয়ীফ হাদিস অগ্রহণযোগ্য। তবে ফাযায়েল ও নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে চরম দুর্বল না হলে এবং প্রতিষ্ঠিত শরিয়তের নীতির অন্তর্ভুক্ত হলে শর্তসাপেক্ষে আমল করা যায়।
৬. ‘সানাদ’ এবং ‘মতন’-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
হাদিসের মূল বক্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক যোগসূত্র বা নামতালিকাকে ‘সানাদ’ বলা হয় এবং সনদের শেষে উল্লেখিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মূল বাণী বা কাজকে ‘মতন’ বলা হয়।