পরীক্ষা কোড: 203 | প্রশ্নপত্র কোড: 090
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الإسلام والأديان الأخرى
[আল-ইসলাম ওয়াল আদয়ানুল উখরা]
বিষয় কোড: 203304
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – রচনামূলক প্রশ্নাবলী]
মান: ১৫ × ৪ = ৬০
١- بيّن أهمية دراسة مقارنة الأديان في العصر الحاضر-
[১. বর্তমান যুগে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (মুক্বারানাতুল আদয়ান) অধ্যয়নের গুরুত্ব বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
বর্তমান যুগ গ্লোবালাইজেশন ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। বিশ্বের বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ এখন পরস্পরের অত্যন্ত কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। এহেন বৈশ্বিক বাস্তবতায় ইসলামের সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ চালাতে এবং সমকালীন প্রাচ্যবিদ ও ইসলামবিদ্বেষীদের সংশয় নিরসন করতে ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ (مقارنة الأديان) বা Comparative Religion অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শাস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বর্তমান যুগে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়নের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
- ইসলামের সত্যতা ও যৌক্তিক শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন:
অন্যান্য ধর্মের মূলগ্রন্থ, বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের সাথে ইসলামের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে ইসলামের তাওহিদ, ইনসাফ ও ব্যবহারিক জীবনাদর্শের অনুপম শ্রেষ্ঠত্ব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন আল্লামা ইবনে হাযম এবং ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী এই পদ্ধতির সফল প্রয়োগ করেছেন। - ইসলামি দাওয়াতের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ:
অমুসলিমদের কাছে তাদের নিজ নিজ ধর্মের শাস্ত্রীয় রেফারেন্স দিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিলে তা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হয়। কুরআনে আহলে কিতাবদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে:قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ
“বলুন: হে কিতাবিগণ! এমন এক কথার দিকে আস যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে অভিন্ন; তা এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করব না।” (সূরা আলে ইমরান: ৬৪)
- ইসলামবিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা ও সংশয় নিরসন:
প্রাচ্যবিদ (মুস্তাশরিকীন) ও খ্রিষ্টান মিশনারিরা ইসলাম, কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র নিয়ে যে সকল অপপ্রচার চালায়, তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থ থেকেই যুক্তি ও তথ্য দিয়ে তার মোক্ষম জবাব দেওয়া সম্ভব হয়। যেমনটি করেছিলেন শায়খ রহমাতুল্লাহ কিরানবী (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘ইজহারুল হক’-এ। - শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা:
একটি দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের ক্ষেত্রে অন্য ধর্মের আবেগ ও মূলনীতি জানা থাকলে ভুল বোঝাবুঝি ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত এড়ানো যায় এবং তাদের প্রতি কুরআনি ইনসাফ প্রদর্শন সহজ হয়। - বিকৃতি ও বিলুপ্ত বিশ্বাসের ইতিহাস সংরক্ষণ:
আসমানি কিতাবসমূহের মূল শিক্ষা কীভাবে যুগে যুগে পৌত্তলিকতা ও মানবীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিকৃত হয়েছে, তা জেনে নিজের ঈমান ও কুরআন সংরক্ষণের শুকরিয়া আদায় করা যায়।
উপসংহার
বর্তমান যুগের একজন দায়ীর জন্য তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের জ্ঞান অপরিহার্য হাতিয়ার। আধুনিক বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা সমুন্নত রাখতে এ শাস্ত্রের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
٢- اشرح محاسن الإسلام في الجانب الأخلاقي والاجتماعي-
[২. নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ইসলামের সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
ইসলাম কেবল কতগুলো আচার-সর্বস্ব ধর্মীয় রীতিনীতির সমষ্টি নয়; বরং এটি মানবজীবনের সার্বিক দিকদর্শন। সমাজকে পাপমুক্ত, সুশৃঙ্খল ও মানবকল্যাণমুখী করতে ইসলাম যে নৈতিক ও সামাজিক বিধান উপহার দিয়েছে, তা বিশ্ব ইতিহাসের অনন্য বৈপ্লবিক অধ্যায়।
১. নৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামের সৌন্দর্য (محاسن الإسلام الأخلاقية)
- চরিত্র গঠনের সর্বোচ্চ তাগিদ: ইসলামে চরিত্রকে ঈমানের পূর্ণতার মাপকাঠি বানানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ
“নিশ্চয় আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্য।” (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)
- সততা ও আমানতদারি: ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও ব্যক্তিগত জীবনে মিথ্যা, প্রতারণা ও দুর্নীতিকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করে সত্যবাদিতা ও আমানতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- আত্মসংযম ও লজ্জা: লজ্জাশীলতাকে ঈমানের বিশেষ অঙ্গ করা হয়েছে। ইসলাম ব্যভিচার, অশ্লীলতা, মাদক এবং চোখ ও অন্তরের কুপ্রবৃত্তি কঠোরভাবে দমন করে পবিত্র পারিবারিক জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
- ক্ষমাশীলতা ও বিনয়: অহংকারকে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে নম্রতা, ক্ষমা ও ধৈর্যকে শ্রেষ্ঠতম গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
২. সামাজিক ক্ষেত্রে ইসলামের সৌন্দর্য (محاسن الإسلام الاجتماعية)
- সার্বজনীন মানবীয় সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব: বংশ, বর্ণ, ভাষা ও ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করে ইসলাম সমগ্র মানবজাতিকে এক পিতা-মাতার সন্তান হিসেবে ঘোষণা করেছে:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
“হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি সে-ই যে তোমাদের মাঝে সর্বাধিক খোদাভীরু।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
- পিতা-মাতার সর্বোচ্চ মর্যাদা: তাওহিদের পরেই পিতা-মাতার আনুগত্য ও সেবাকে ফরজ করা হয়েছে এবং মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত ঘোষণা করা হয়েছে।
- প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা: প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, তার ক্ষুধা নিবারণ ও বিপদে পাশে দাঁড়ানোকে ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হয়েছে: “সে মুমিন নয় যে তৃপ্ত হয়ে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।”
- সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা (যাকাত ও সদকা): ধনীদের সম্পদে দরিদ্রদের সুনির্দিষ্ট অধিকার প্রতিষ্ঠা করে শোষণমুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করা হয়েছে।
- অসহায়, এতিম ও বিধবাদের পুনর্বাসন: সমাজে কোনো মানুষ যেন অসহায় না থাকে, সেজন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে তাদের ভরণপোষণের স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
উপসংহার
ইসলামের এই চমৎকার নৈতিক ও সামাজিক বিধানাবলী যখন মানবসমাজে বাস্তবায়িত হয়, তখন পৃথিবীতে এক বেহেশতি শান্তির পরিবেশ রচিত হয়।
٣- قارن بين حرية المرأة وأمنها في الإسلام وبين الغرب-
[৩. ইসলামে নারীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা এবং পাশ্চাত্যের নারী স্বাধীনতার তুলনামূলক পর্যালোচনা কর।]
ভূমিকা
নারী জাতির মর্যাদা ও অধিকার আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত বিষয়। বর্তমান পাশ্চাত্য বিশ্ব নারীকে স্বাধীনতার নামে অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করেছে। অথচ দেড় হাজার বছর পূর্বে ইসলাম নারীকে যে আত্মমর্যাদা, স্বাধীন অর্থনৈতিক অধিকার ও পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে, তা ইতিহাসে চিরন্তন ও অতুলনীয়।
ইসলামে নারীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার রূপরেখা
- মানবীয় সমমর্যাদা: ইসলাম স্পষ্ট ঘোষণা করেছে যে, আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও পরকালীন প্রতিদানের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান: “যে পুরুষ বা নারী নেক আমল করবে এবং সে মুমিন হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সূরা আন-নিসা: ১২৪)
- পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা:
- কন্যা হিসেবে সে রহমতের প্রতীক। কন্যা সন্তান হত্যাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
- স্ত্রী হিসেবে সে পরিবারের রানী ও অর্ধাঙ্গিনী। মোহরানা লাভ এবং পূর্ণ ভরণপোষণ প্রাপ্তি তার অলঙ্ঘনীয় অধিকার।
- মা হিসেবে তার সম্মান বাবার চেয়ে তিনগুণ বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
- স্বাধীন অর্থনৈতিক অধিকার: বিয়ের পূর্বে বা পরে নারীর উপার্জিত বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদে পিতা বা স্বামীর কোনো হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। সে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ব্যবসা বা লেনদেন করতে পারে।
- পর্দা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা: ইসলাম নারীকে হিজাবের মাধ্যমে পরপুরুষের কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টি ও যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষিত দুর্গের মতো নিরাপত্তা দিয়েছে। এটি তাকে অবরুদ্ধ করার জন্য নয়, বরং তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার অলংকার।
পাশ্চাত্যে নারী স্বাধীনতার বাস্তবতা
- স্বাধীনতার নামে অবাধ প্রদর্শন ও পণ্যকরণ: বিজ্ঞাপনে গাড়ি বিক্রি থেকে শুরু করে কসমেটিক্স পর্যন্ত নারীকে বাণিজ্যিক পণ্য ও যৌন উদ্দীপক হিসেবে প্রদর্শন করা হয়।
- দ্বিমুখী বোঝা চাপানো: ঘরের বাইরের শ্রমবাজারে পুরুষদের সমান কাজ করার পরেও গৃহস্থালির দায়িত্ব তার ওপর থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সমান কাজের জন্য কম মজুরি দেওয়া হয়।
- পারিবারিক ব্যবস্থার চরম ধ্বংস: উগ্র ব্যক্তিবাদের কারণে বিবাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে; ডিভোর্সের হার আকাশচুম্বী, ‘সিঙ্গেল মাদার’ সংস্কৃতি নারীকে চরম একাকীত্ব ও আর্থিক অনটনে নিমজ্জিত করেছে।
- চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতা: আধুনিক পাশ্চাত্যে প্রতিদিন অগণিত নারী ধর্ষণ, গার্হস্থ্য সহিংসতা এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, যা তাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিসংখ্যান থেকেই সুস্পষ্ট।
উপসংহার
পাশ্চাত্য নারীকে ঘর থেকে বের করে সস্তা শ্রমে পরিণত করেছে, আর ইসলাম নারীকে দিয়েছে ঘরে-বাইরে পূর্ণ আত্মমর্যাদা ও পবিত্র নিরাপত্তা। প্রকৃত নারী মুক্তি কেবল কুরআনি আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই সম্ভব।
٤- ناقش عالمية الإسلام وخصائصه العامة-
[৪. ইসলামের সার্বজনীনতা এবং এর সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
পূর্ববর্তী সকল নবী ও আসমানি কিতাব একটি নির্দিষ্ট জাতি বা নির্দিষ্ট কালের জন্য প্রেরিত হয়েছিল। কিন্তু ইসলাম কোনো গোত্র, ভাষা, বর্ণ বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়। এটি কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বের তামাম জিন ও মানবজাতির জন্য আল্লাহর একমাত্র মনোনীত এবং চিরন্তন জীবনব্যবস্থা।
১. ইসলামের সার্বজনীনতা (عالمية الإسلام)
কুরআন ও হাদিসের অকাট্য প্রমাণে ইসলামের বিশ্বজনীন রূপ সুস্পষ্ট:
- সমগ্র মানবজাতির প্রতি রাসূল প্রেরিত: আল্লাহ তায়ালা বিশ্বনবী (সা.) সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا
“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।” (সূরা সাবা: ২৮)
- বিশ্বজাহানের জন্য রহমত: “আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)
- সার্বজনীন কিতাব: কুরআন কেবল আরবদের কিতাব নয়; এটি ‘হুদাল্লিন্নাস’ (সমগ্র মানবজাতির হেদায়েত) এবং ‘যিক্রুল্লিল আলামীন’ (বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ)।
২. ইসলামের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص الإسلام العامة)
- রব্বানিয়্যাহ বা ঐশী উৎস (الربانية): ইসলাম মানুষের তৈরি কোনো দর্শন নয়; এর প্রতিটি মূলনীতি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ।
- শুমূলিয়্যাহ বা পূর্ণাঙ্গতা (الشمولية): ইসলাম মানবজীবনের কোনো একক দিক নিয়ে আলোচনা করে না; বরং ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিখুঁত সমাধান দেয়।
- তাওয়াযুন বা ভারসাম্যপূর্ণতা (التوازن والوسطية): আত্মিক ও পার্থিব জীবনের মাঝে অনন্য ভারসাম্য। ইসলামে যেমন বৈরাগ্যবাদ নেই, তেমনি চরম বস্তুবাদও নেই; এটি উম্মাতে ওয়াসাত (মধ্যমপন্থী জাতি)।
- ওয়াদূহ বা স্পষ্টতা (الوضوح والبساطة): ইসলামের আকাইদ অত্যন্ত যৌক্তিক, কুসংস্কারমুক্ত ও সহজ-সরল। আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই—যা যে কেউ সহজেই উপলব্ধি করতে পারে।
- আখলাকিয়্যাহ বা নৈতিকতাভিত্তিক (الأخلاقية): রাজনীতি, অর্থনীতি ও যুদ্ধক্ষেত্র—প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা ইসলামের অপরিহার্য নীতি।
- ছাবাত ওয়াল মুরূনাহ (স্থায়িত্ব ও গতিশীলতা): মৌলিক আকাইদ ও ইবাদতের বিধান চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়, কিন্তু পরিবর্তনশীল যুগোপযোগী সমস্যার সমাধানে ইজতিহাদের চমৎকার গতিশীল সুযোগ রাখা হয়েছে।
উপসংহার
ইসলামের এই কালজয়ী সার্বজনীনতা ও বৈশিষ্ট্যসমূহই একে পৃথিবীর সকল মতবাদ ও ধর্মের ওপর এক অনন্য শ্রেষ্ঠত্বে আসীন করেছে।
٥- ما هي اليهودية؟ وتحدث عن تاريخ نشأتها وأهم كتبها المقدسة-
[৫. ইহুদি ধর্ম কী? এর উৎপত্তি ও ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও এবং এর প্রধান পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
বিশ্বের প্রাচীনতম আসমানি ধর্মগুলোর একটি হলো ইহুদি ধর্ম (اليهودية)। এটি মূলত হযরত ইয়াকূব (আ.)-এর বংশধর অর্থাৎ বনি ইসরাইল জাতির সাথে সম্পৃক্ত। কালক্রমে একত্ববাদী ঐশী শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে এটি একটি চরম জাতিবাদী ও বিকৃত ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছে।
ইহুদি ধর্মের সংজ্ঞা ও নামকরণ (ما هي اليهودية)
হযরত ইয়াকূব (আ.)-এর বারো পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ চতুর্থ পুত্রের নাম ছিল ‘ইয়াহুদা’ (يهوذا)। এই ইয়াহুদার বংশধরদের এবং পরবর্তীতে সামগ্রিকভাবে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে ‘ইয়াহুদিয়্যাহ’ বা ইহুদি ধর্ম (Judaism) বলা হয়।
ইহুদি ধর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও উৎপত্তি (تاريخ نشأتها)
- বনি ইসরাইলের সূচনা: হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর নাতি হযরত ইয়াকূব (আ.)-এর অপর নাম ছিল ‘ইসরাইল’ (আল্লাহর বান্দা)। তাঁর সন্তানদের মাধ্যমে ১২টি গোত্রের সৃষ্টি হয়, যারা বনি ইসরাইল নামে পরিচিত।
- মিসরের দাসত্ব ও মূসা (আ.): ইউসুফ (আ.)-এর পর বনি ইসরাইল মিসরে বসবাস করতে থাকে। পরবর্তীতে ফেরাউনরা তাদের ওপর দাসত্ব চাপিয়ে দেয়। আল্লাহ হযরত মূসা (আ.)-কে নবী বানিয়ে পাঠান এবং তিনি তাদের লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেন এবং তুর পাহাড়ে তাওরাত লাভ করেন।
- মরুভূমিতে অবাধ্যতা ও ফিলিস্তিন প্রবেশ: তাওরাত পাওয়ার পরও তারা গরুর বাছুর পূজা করে শিরকে লিপ্ত হয় এবং জিহাদ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ৪০ বছর ‘তীহ’ প্রান্তরে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ায়। পরবর্তীতে হযরত ইউশা ইবনে নূন (আ.)-এর নেতৃত্বে তারা জেরুজালেম ও কেনান ভূমিতে প্রবেশ করে।
- স্বর্ণযুগ ও পতন: হযরত দাউদ ও সুলাইমান (আ.)-এর যুগে প্রথম বায়তুল মুকাদ্দাস (হায়কালে সুলাইমানি) নির্মিত হয়। কিন্তু তাঁদের ওফাতের পর জাতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পাপে নিমজ্জিত হয়।
- ব্যবিলনীয় বন্দিদশা ও ধ্বংস: খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে ব্যবিলনের রাজা বখতেনাসার (নেবুচাদনেজার) জেরুজালেম ধ্বংস করে, হায়কাল জ্বালিয়ে দেয় এবং সমস্ত ইহুদিকে বন্দি করে ব্যবিলনে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে পারস্যের সাহায্যে ফিরে এসে তারা দ্বিতীয় মন্দির তৈরি করে, যা ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সেনাপতি টাইটাস পুনরায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে তাদের বিশ্বজুড়ে বিতাড়িত করে।
ইহুদিদের প্রধান পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ (كتبها المقدسة)
- তানাক বা ওল্ড টেস্টামেন্ট (التناخ – Tanakh): ইহুদিদের মূল হিব্রু বাইবেল, যা তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত:
- তাওরাত (Torah – শশরীয়ত): মূসা (আ.)-এর প্রতি সম্বন্ধিত পাঁচটি গ্রন্থ (Genesis, Exodus, Leviticus, Numbers, Deuteronomy)। তবে খ্রিস্টীয় পণ্ডিতরাও স্বীকার করেছেন যে বর্তমান তাওরাত অবিকল মূসা (আ.)-এর নয়; এতে পরবর্তী বহু মানুষের সংযোজন ঘটেছে।
- নবীঈম (Nevi’im – পয়গম্বরদের পুস্তক): পরবর্তী নবীগণের ঐতিহাসিক বিবরণ।
- কেতুভীম (Ketuvim – ধর্মীয় রচনা ও সংগীত): দাউদ (আ.)-এর জবুর (Psalms) ও অন্যান্য নীতিকথা।
- তালমুদ (التلمود – Talmud): এটি ইহুদিদের কাছে তাওরাতের চেয়েও বেশি কার্যকরী আইনগ্রন্থ। এটি মূলত তাদের ধর্মগুরু (রাব্বি)-দের মৌখিক আইন ও ব্যাখ্যার সংকলন। তালমুদ দুটি অংশে বিভক্ত:
- মিশনাহ (Mishnah): মৌখিক আইনের মূল পাঠ।
- গেমারা (Gemara): মিশনাহর ওপর দীর্ঘ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ।
তালমুদে অন্য সকল জাতিকে পশুর সমতুল্য মনে করা এবং ইহুদিদের শ্রেষ্ঠ জাতি দাবি করার চরম বর্ণবাদী নির্দেশনা বিদ্যমান।
উপসংহার
ইহুদিরা আসমানি ধর্মের অনুসারী হলেও কিতাব বিকৃতি এবং নবীদের হত্যা ও অবাধ্যতার কারণে আল্লাহর অভিশাপের পাত্রে পরিণত হয়েছিল।
٦- اذكر مؤامرات اليهود ضد الإسلام والمسلمين عبر التاريخ-
[৬. ইতিহাসজুড়ে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের ষড়যন্ত্রসমূহ উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামের আবির্ভাব লগ্ন থেকেই ইহুদিরা ছিল ইসলামের সবচেয়ে অন্ধ, কুচক্রী ও চরম শত্রু। মহান আল্লাহ কুরআনুল কারীমে এ বিষয়ে চিরন্তন সতর্কবার্তা দিয়েছেন:
لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا
“আপনি মুমিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইহুদি ও মুশরিকদেরই সবচেয়ে উগ্র পাবেন।” (সূরা আল-মায়েদা: ৮২)
ইতিহাসজুড়ে ইসলামবিরোধী ইহুদি ষড়যন্ত্রসমূহ
- নবুওয়াত অস্বীকার ও হিংসা:
ইহুদি পণ্ডিতরা জানত যে শেষ নবী আসবেন এবং তারা তাঁর গুণাবলী নিজেদের কিতাবে চিনেছিল। কিন্তু শেষ নবী বনি ইসরাইল বংশ থেকে না এসে বনি ইসমাইল থেকে আসায় তারা কেবল হিংসার বশে তাঁকে অস্বীকার করে। - মদিনা সনদের লঙ্ঘন ও বিশ্বাসঘাতকতা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে ইহুদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়ে মদিনা সনদ স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু তারা একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতা করে:- বনু কাইনুকা: এক মুসলিম নারীর শ্লীলতাহানি করে এবং বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
- বনু নাযীর: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাথার ওপর ছাদ থেকে পাথর ফেলে তাঁকে হত্যার চক্রান্ত করে।
- বনু কুরাইযা: খন্দকের যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে মদিনার প্রতিরক্ষার চুক্তি ভঙ্গ করে বাহিরের মুশরিক শত্রুদের সাথে হাত মেলায় এবং মদিনার মুসলিম নারী ও শিশুদের ওপর পেছন থেকে আক্রমণের চক্রান্ত করে।
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিষপ্রয়োগ ও জাদু করা:
খায়বার বিজয়ের পর জায়নাব বিনতে হারেস নামক এক ইহুদি নারী ভুনা ছাগলের গোশতে বিষ মিশিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার চেষ্টা করে। এছাড়া লাবীদ ইবনুল আ’সাম নামক ইহুদি নবীজির ওপর মারাত্মক কুফরি জাদু করেছিল। - মুনাফিকি ও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি:
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মতো ষড়যন্ত্রকারী বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তাঁর শাহাদাতের পথ তৈরি করে এবং পরবর্তীতে শিয়া ফেরকা ও মুসলিম গৃহযুদ্ধের আগুন উস্কে দেয়। - উসমানি খেলাফতের পতন ঘটানো:
সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ যখন ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য থিওডর হার্জেলের কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রার প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন ডনমে (ছদ্মবেশী ইহুদি) ও ফ্রিম্যাসনদের মাধ্যমে তরুণ তুর্কি আন্দোলন তৈরি করে ১৯২৪ সালে উসমানি খেলাফতকে চিরতরে বিলুপ্ত করা হয়। - ফিলিস্তিন দখল ও বায়তুল মুকাদ্দাসে আগ্রাসন:
জায়নবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ১৯৪৮ সালে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করে এবং বায়তুল মুকাদ্দাসে মুসলমানদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আসছে।
উপসংহার
ইহুদিদের ষড়যন্ত্র প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সচেতনতাই তাদের এই শয়তানি কূটচাল রুখে দেওয়ার একমাত্র উপায়।
مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী]
মান: ৫ × ৪ = ২০
٧- ما الفرق بين الدين والشريعة والملة؟
[৭. দ্বীন, শরীয়ত এবং মিল্লাত-এর মধ্যে পার্থক্য কী?]
উত্তর
ইসলামি পরিভাষায় দ্বীন, শরীয়ত ও মিল্লাত শব্দ তিনটি গভীরভাবে সম্পর্কিত হলেও এদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:
- আদ-দ্বীন (الدين):
‘দ্বীন’ হলো সামগ্রিক আনুগত্য ও জীবনব্যবস্থা। এটি মূলত আল্লাহ প্রদত্ত মৌলিক আকিদা ও বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত। সকল নবী-রাসূলের দ্বীন ছিল এক ও অভিন্ন—তাওহিদ ও ইসলাম। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম।” (সূরা আলে ইমরান: ১৯) - আশ-শরীয়াহ (الشريعة):
‘শরীয়ত’ হলো দ্বীনের ব্যবহারিক আইন-কানুন, বিধান ও পদ্ধতির সমষ্টি। যুগ ও জাতিভেদে বিভিন্ন নবীর শরীয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল। আল্লাহ বলেন: “আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি শরীয়ত ও সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করেছি।” (সূরা আল-মায়েদা: ৪৮) - আল-মিল্লাত (الملة):
‘মিল্লাত’ হলো কোনো বিশিষ্ট নবীর প্রদর্শিত আদর্শ ও ঐতিহ্যের অনুসারী ধর্মীয় সম্প্রদায় বা জাতিসত্তা। যেমন কুরআনে এসেছে ‘মিল্লাতে ইবরাহিম’ (ইবরাহিমের জাতি)। দ্বীন যখন কোনো নবীর ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত হয়ে জাতির রূপ ধারণ করে, তখন তাকে মিল্লাত বলে।
٨- ما هي عقيدة المسلمين في عيسى بن مريم عليه السلام؟
[৮. হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে মুসলমানদের আকিদা কী?]
উত্তর
পবিত্র কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে মুসলমানদের আকিদা হলো:
- আল্লাহর বান্দা ও সম্মানিত রাসূল: তিনি কোনোভাবেই খোদা বা খোদার পুত্র নন, কিংবা ত্রিত্ববাদের অংশ নন; বরং তিনি আল্লাহর মনোনীত মহামানব ও সম্মানিত রাসূল (عبده ورسوله)।
- অলৌকিক জন্ম: পিতা ছাড়া কেবল আল্লাহর এক নির্দেশে (‘কুন’) কুমারী মারইয়ামের গর্ভে তাঁর জন্ম হয়েছে।
- ক্রুশবিদ্ধ বা নিহত হননি: ইহুদিরা তাঁকে হত্যা বা ক্রুশবিদ্ধ করতে পারেনি; বরং আল্লাহ তাঁকে সশরীরে জীবিত আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন (সূরা আন-নিসা: ১৫৭-১৫৮)।
- কিয়ামতের পূর্বে পুনরাগমন: কিয়ামতের পূর্বে তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত ও ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে পৃথিবীতে পুনরায় আগমন করবেন, দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবেন।
٩- ما هي النصرانية؟ واذكر عقائدها الأساسية-
[৯. নাসরানিয়্যাহ (খ্রিস্টধর্ম) কী? এর মৌলিক আকিদাসমূহ উল্লেখ কর।]
উত্তর
পরিচয়: হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্মস্থান ফিলিস্তিনের ‘নাসেরা’ (Nazareth) গ্রামের নামানুসারে তাঁর অনুসারীদের আরবিতে ‘নাসারা’ এবং তাঁদের ধর্মকে ‘নাসরানিয়্যাহ’ (খ্রিস্টধর্ম) বলা হয়।
খ্রিস্টধর্মের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ:
- ত্রিত্ববাদ (Trinity): এক খোদায় তিন সত্তা—পিতা (ঈশ্বর), পুত্র (যিশু) এবং পবিত্র আত্মা (Holy Spirit)। তারা বিশ্বাস করে এই তিন সত্তা মিলেই একক ঈশ্বর।
- যিশুর ঈশ্বরত্ব (Divinity of Jesus): যিশু খ্রিস্টকে ঈশ্বরের পুত্র এবং স্বয়ং ঈশ্বরের রক্ত-মাংসের অবতার মনে করা।
- আদি পাপ (Original Sin): আদম ও হাওয়া নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার কারণে সমগ্র মানবজাতি জন্মগতভাবেই পাপী হিসেবে পৃথিবীতে আগমন করে।
- প্রায়শ্চিত্তবাদ (Atonement): মানবজাতিকে আদি পাপ থেকে মুক্ত করার জন্য যিশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে নিজের রক্ত বিসর্জন দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেছেন।
١٠- اكتب نبذة عن تاريخ تحريف الإنجيل-
[১০. ইঞ্জিল কিতাব বিকৃতির ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।]
উত্তর
হযরত ঈসা (আ.)-এর ওপর অবতীর্ণ মূল আসমানি ইনজিল কিতাবটি ছিল একটি এবং তা ছিল তাঁর মাতৃভাষা আরামাইক বা হিব্রু ভাষায়। কিন্তু বর্তমান খ্রিস্টানদের কাছে বিদ্যমান ইঞ্জিলসমূহ চরমভাবে বিকৃত:
- মৌলিক ইনজিল হারিয়ে যাওয়া: ঈসা (আ.)-কে উঠিয়ে নেওয়ার পর রোমানদের দমনপীড়নের মুখে মূল ইনজিল কিতাবের কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত থাকেনি।
- গ্রিক ভাষায় বহু রচনার উদ্ভব: ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর বহু দশক পর গ্রিক ভাষায় বিভিন্ন ব্যক্তি নিজ নিজ স্মৃতি ও লোকগাথা থেকে বহু গসপেল (ইঞ্জিল) রচনা করে।
- সেন্ট পলের অনুপ্রবেশ: সেন্ট পল (যিনি পূর্বে খ্রিস্টানদের চরম শত্রু ছিলেন) পরবর্তীতে ঈসা (আ.)-এর একেশ্বরবাদী ধর্মকে গ্রিক ও রোমান পৌত্তলিক দর্শনের সাথে মিশিয়ে ত্রিত্ববাদ ও প্রায়শ্চিত্তবাদের জন্ম দেন।
- নিসিয়া কাউন্সিল (৩২৫ খ্রি.): রোমান সম্রাট কনস্টানটাইনের উদ্যোগে ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে কাউন্সিলের মাধ্যমে শত শত ইঞ্জিল পুড়িয়ে ফেলে কেবল চারটি ইঞ্জিলকে (মথি, মার্ক, লূক, যোহন) সরকারিভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়, যার কোনোটির সাথেই ঈসা (আ.)-এর প্রত্যক্ষ যোগসূত্র নেই।
١١- بيّن نظام تفاوت الطبقات في الهندوسية-
[১১. হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা বা বর্ণভেদ প্রথা ব্যাখ্যা কর।]
উত্তর
হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সমাজকে জন্মগতভাবে কঠোর চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করার ব্যবস্থা, যা ‘চতুর্বর্ণ প্রথা’ (Varna System) নামে পরিচিত। ঋগ্বেদের পুরুষসূক্ত অনুযায়ী এই চার বর্ণ হলো:
- ব্রাহ্মণ (Brahmin): তারা বিশ্বাস করে পরমাত্মা ব্রহ্মার মুখ থেকে তাদের সৃষ্টি। এরা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা ও বেদ পাঠের একমাত্র অধিকারী সর্বোচ্চ পবিত্র শ্রেণি।
- ক্ষত্রিয় (Kshatriya): ব্রহ্মার বাহু থেকে সৃষ্ট। যুদ্ধ পরিচালনা, দেশরক্ষা ও রাজ্য শাসনের দায়িত্ব এদের ওপর।
- বৈশ্য (Vaishya): ব্রহ্মার উরু থেকে সৃষ্ট। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও পশুপালন এদের পেশা।
- শূদ্র (Shudra): ব্রহ্মার পা থেকে সৃষ্ট। উপরোক্ত তিন উচ্চ বর্ণের সেবা করাই এদের একমাত্র ধর্ম।
এছাড়া এই চতুর্বর্ণের বাইরে এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে রাখা হয়েছে, যাদের ‘অস্পৃশ্য’ বা দলিত বলা হয়। তাদের স্পর্শ করলে জাত চলে যায় বলে বিশ্বাস করা হয়। ইসলাম এই অমানবিক বর্ণবাদকে সমূলে উৎপাটন করে সর্বজনীন সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে।
١٢- من هو غوتم بوذا؟ وما هي أهم عقائد البوذية؟
[১২. গৌতম বুদ্ধ কে? এবং বৌদ্ধধর্মের প্রধান ধর্মীয় বিশ্বাসসমূহ কী কী?]
উত্তর
গৌতম বুদ্ধের পরিচয়: গৌতম বুদ্ধের আসল নাম ছিল সিদ্ধার্থ। তিনি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বর্তমান নেপালের কপিলাবস্তুর শাক্য রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রাজকীয় ভোগবিলাস ত্যাগ করে তিনি মানবজীবনের জরা, ব্যাধি, বার্ধক্য ও মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে সংসার ত্যাগ করেন এবং ভারতের বিহারের বুদ্ধগয়ায় অশ্বত্থ গাছের নিচে দীর্ঘ ধ্যানের পর ‘বোধি’ (দিব্যজ্ঞান) লাভ করে ‘বুদ্ধ’ নামে খ্যাত হন।
বৌদ্ধধর্মের প্রধান বিশ্বাসসমূহ:
- চারটি আর্য সত্য (Four Noble Truths):
- জগৎ দুঃখময় (সর্বং দুঃখম)।
- কামনা-বাসনা ও আসক্তিই হলো দুঃখের কারণ।
- বাসনা পরিত্যাগের মাধ্যমেই দুঃখ নিবৃত্তি সম্ভব।
- দুঃখ মুক্তির জন্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অবলম্বন করতে হবে।
- অষ্টাঙ্গিক মার্গ: সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম, সৎ জীবন, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সৎ সমাধি।
- নির্বাণ (Nirvana): বৌদ্ধধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সকল জাগতিক তৃষ্ণা ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করা।
- ঈশ্বর সম্পর্কে নীরবতা: বৌদ্ধধর্মে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কোনো অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় না; এটি মূলত একটি নীতিবাদী ও আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক দর্শন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ অধ্যয়নের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
বিভিন্ন ধর্মের মূল বিশ্বাস, ধর্মগ্রন্থ ও ইতিহাসের তুলনামূলক পর্যালোচনা করে ইসলামের সত্যতা, অকাট্য শ্রেষ্ঠত্ব ও যৌক্তিকতা বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করা।
২. খ্রিস্টধর্মের ‘ত্রিত্ববাদ’ (Trinity) বলতে কী বুঝায়?
ত্রিত্ববাদ হলো এক ঈশ্বরে তিনটি পৃথক সত্তার মিলন—পিতা (ঈশ্বর), পুত্র (যিশু) এবং পবিত্র আত্মা। ইসলাম এই ধারণাকে শিরক ও সুস্পষ্ট কুফরি হিসেবে ঘোষণা করেছে।
৩. ইহুদিদের কাছে ‘তালমুদ’ গ্রন্থটির গুরুত্ব কী?
তালমুদ হলো ইহুদি রাব্বি বা ধর্মগুরুদের মৌখিক ব্যাখ্যা ও আইনের সংকলন। বর্তমান ইহুদি সমাজে মূল তাওরাতের চেয়েও তালমুদের বর্ণবাদী নীতিসমূহ অধিক কার্যকর ও অনুসরণীয়।
৪. হিন্দুধর্মের বর্ণপ্রথা কি ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত?
হ্যাঁ, হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদ এবং মনুসংহিতায় সমাজকে জন্মসূত্রে চারটি বর্ণে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) বিভক্ত করার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
৫. বৌদ্ধধর্মে কি সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়?
না, বৌদ্ধধর্ম মূলত একটি নিরীশ্বরবাদী নৈতিক দর্শন। এতে মহাবিশ্বের কোনো স্রষ্টার ধারণা নেই; বরং কর্মফল ও নির্বাণ লাভই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
৬. ইসলাম নারীকে কী ধরণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছে?
ইসলাম নারীকে বিবাহপূর্ব ও বিবাহোত্তর উভয় অবস্থায় নিজস্ব উপার্জিত ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর পূর্ণ ও স্বাধীন মালিকানা দিয়েছে, যাতে পিতা বা স্বামীর হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই।