পরীক্ষা কোড: 203 | প্রশ্নপত্র কোড: 091
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
مساهمة الأصفياء في الدعوة الإسلامية
[মুসাহামাতুল আসফিয়া ফিদ দাওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ]
বিষয় কোড: 203305
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – রচনামূলক প্রশ্নাবলী]
মান: ১৫ × ৪ = ৬০
١- عرف الولي، واذكر شروط الولاية وفضائل الأولياء في ضوء القرآن والسنة-
[১. ওলীর পরিচয় দাও এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিলায়েতের শর্তাবলী ও আউলিয়ায়ে কেরামের ফজিলত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে আধ্যাত্মিক সাধনা, চরিত্র গঠন এবং বিশ্বব্যাপী দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রিয় বান্দা তথা আউলিয়ায়ে কেরামের অবদান অবিস্মরণীয়। কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত শাশ্বত পথে আত্মশুদ্ধি অর্জনকারী ব্যক্তিরাই হলেন প্রকৃত ওলী। তাঁদের সান্নিধ্য মানুষকে আল্লাহর ভালোবাসার পরম স্তরে পৌঁছে দেয়।
ওলীর পরিচয় (تعريف الولي)
শাব্দিক অর্থ: ‘ওলী’ (الولي) আরবি শব্দ, বহুবচনে ‘আউলিয়া’ (أولياء)। এর আভিধানিক অর্থ নিকটবর্তী, বন্ধু, সাহায্যকারী, অভিভাবক ইত্যাদি।
পারিভাষিক অর্থ: ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: যে ব্যক্তি মুমিন এবং মুত্তাকী, সে-ই আল্লাহর ওলী। পবিত্র কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ ওলীর সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় তুলে ধরেছেন:
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ * الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
“জেনে রাখ! নিশ্চয় আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা চিন্তিতও হবেন না; যাঁরা ঈমান এনেছেন এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছেন।” (সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩)
বিলায়েতের মৌলিক শর্তাবলী (شروط الولاية)
- বিশুদ্ধ ঈমান ও তাওহিদ: সর্বপ্রকার শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত হয়ে খাঁটি ঈমানের অধিকারী হওয়া।
- পূর্ণাঙ্গ তাকওয়া ও শরীয়তের অনুসরণ: আল্লাহর যাবতীয় ফরজ বিধান নিখুঁতভাবে পালন করা এবং সকল হারাম কাজ বর্জন করা। শরীয়ত বর্জন করে কখনো ওলী হওয়া যায় না। বায়োজিদ বোস্তামী (রহ.) বলেছেন: “কাউকে যদি আকাশে উড়তেও দেখ, তবুও বিভ্রান্ত হয়ো না যতক্ষণ না দেখবে সে শরীয়তের হালাল-হারাম কতটা মেনে চলে।”
- ইখলাস ও সুন্নাহর অনুকরণ: সকল কাজে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা করা এবং প্রতিটি পদক্ষেপে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর হুবহু অনুসরণ করা।
- দুনিয়াবিমুখতা ও অন্তরের পবিত্রতা: লোভ, অহংকার, রিয়া, হাসাদ ইত্যাদি অন্তরের ব্যাধি থেকে মুক্ত হয়ে সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকা।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আউলিয়াগণের ফজিলত
- আল্লাহর বিশেষ বন্ধুত্ব ও অভিভাবকত্ব: আল্লাহ তায়ালা নিজেই তাঁদের অভিভাবক হন: “আল্লাহ হলেন মুমিনদের অভিভাবক।” (সূরা আল-বাকারা: ২৫৭)।
- হাদিসে কুদসিতে ঘোষিত সম্মান ও প্রতিরক্ষা: হাদিসে কুদসিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন:
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
“যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেই।” (সহিহ বুখারি)
- দোয়া কবুল হওয়া ও মুস্তাজাবুদ দাওয়াত হওয়া: আল্লাহর প্রিয় ওলীগণ কোনো বিষয়ে প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা কবুল করেন এবং বিপদে রক্ষা করেন।
- উভয় জাহানে ভয় ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি: মৃত্যু, কবর, হাশর ও মিজান—সর্বত্র তাঁরা আল্লাহর বিশেষ রহমতের ছায়াতলে নিরাপদ থাকবেন।
উপসংহার
আল্লাহর নৈকট্য লাভের চাবিকাঠি হলো ঈমান ও তাকওয়া। আউলিয়ায়ে কেরাম শরীয়ত ও মারিফতের সমন্বয়ে মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখিয়েছেন।
٢- ما هو التصوف؟ وتحدث عن نشأة الصوفية وتطورها عبر العصور-
[২. তাসাউফ কী? যুগ পরম্পরায় সুফিবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি পরিভাষায় আত্মশুদ্ধি, নৈতিক উৎকর্ষ এবং আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসার মাধ্যমে ইহসানের স্তরে পৌঁছানোর ইলমকে ‘তাসাউফ’ বলা হয়। এটি কোনো স্বতন্ত্র ধর্ম নয়, বরং কুরআনের ‘তাযকিয়া’ এবং হাদিসে জিবরিলে বর্ণিত ‘ইহসান’-এরই ব্যবহারিক রূপরেখা।
তাসাউফের সংজ্ঞা ও উৎপত্তিগত অর্থ (تعريف التصوف)
শাব্দিক বিশ্লেষণ: ‘তাসাউফ’ শব্দের উৎস নিয়ে পণ্ডিতদের বিভিন্ন মত রয়েছে:
১. সুফ (صوف – পশম): সুফিগণ দুনিয়াবিমুখতার প্রতীক হিসেবে মোটা পশমী কাপড় পরতেন বলে তাঁদের সুফি বলা হয়।
২. সুফফাহ (صفة): মসজিদে নববীর আসহাবে সুফফার ত্যাগ ও ইবাদতের অনুসরণের কারণে।
৩. সাফা (صفاء – পবিত্রতা): অন্তরকে কলুষমুক্ত ও পবিত্র রাখার কারণে।
পারিভাষিক অর্থ: ইমাম জুনাইদ বাগদাদী (রহ.) বলেন: তাসাউফ হলো আল্লাহ তোমাকে নিজের থেকে মৃত্যু দিয়ে তাঁর মাধ্যমে জীবিত রাখবেন; অর্থাৎ নফসের গোলামি ত্যাগ করে সম্পূর্ণ আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুগত হওয়া।
যুগে যুগে সুফিবাদের ক্রমবিকাশের স্তরসমূহ
- যুগ-১: নবুওয়াত ও সাহাবি যুগ (বীজবপন কাল):
এ যুগে তাসাউফ নাম না থাকলেও এর হাকীকত পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জিকির, তাহাজ্জুদ, মোরাকাবা এবং সাহাবিদের চরম ত্যাগ ও দুনিয়াবিমুখতাই ছিল এর ভিত্তি। - যুগ-২: তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈ যুগ (যুহদ বা বৈরাগ্যের স্তর):
উমাইয়া যুগে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দেখা দেয়, তখন হাসান বসরি, সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব, রাবেয়া বসরী, ইব্রাহিম ইবনে আদহাম প্রমুখ মনীষীগণ দুনিয়াত্যাগী হয়ে খাঁটি ইবাদতে নিমগ্ন হন। একে ‘যুহদ’ (الزهد) বলা হতো। - যুগ-৩: ইলমি সংকলন ও তত্ত্বীয় বিকাশ (৩য় ও ৪র্থ হিজরি শতক):
বাগদাদে জুনাইদ বাগদাদী, মারূফ কারখী, সিররি সাকাতী প্রমুখ মুহাদ্দিস ও সাধকগণ তাসাউফকে একটি সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রে রূপ দেন। আবু নসর সাররাজ রচনা করেন ‘কিতাবুল লুমা’ এবং আবু বকর কালাবাদী রচনা করেন ‘আত-তাআররুফ’। - যুগ-৪: শরীয়ত ও তাসাউফের সমন্বয় (৫ম হিজরি শতক):
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহ.) তাঁর কালজয়ী ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থের মাধ্যমে তাসাউফকে দর্শন ও বিদআত থেকে মুক্ত করে কুরআন-সুন্নাহর মূলধারায় পুনরুজ্জীবিত করেন। - যুগ-৫: ত্বরিকা ও খানকাহভিত্তিক দাওয়াতি যুগ (৬ষ্ঠ শতক পরবর্তী):
এ যুগে কাদেরিয়া, চিশতিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া ও নকশবন্দিয়া ত্বরিকার উদ্ভব ঘটে। সুফিগণ খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও আফ্রিকায় লক্ষ লক্ষ অমুসলিমকে ইসলামে দীক্ষিত করেন।
উপসংহার
কুরআন-সুন্নাহ সম্মত তাসাউফ হলো দ্বীনের রূহ। এটি অন্তরকে জাহিলিয়্যাতের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে খাঁটি আল্লাহর বান্দা হিসেবে গড়ে তোলে।
٣- ما هي السلسلة والطريقة؟ واشرح دورها في نشر الدعوة الإسلامية-
[৩. সিলসিলা ও ত্বরিকা কী? ইসলামি দাওয়াহর প্রসারে এদের ভূমিকা ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সুফি ত্বরিকা এবং আধ্যাত্মিক সিলসিলাসমূহের অবদান ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়। রাষ্ট্রীয় শক্তির কোনো সহযোগিতা ছাড়া কেবল পীর-মাশায়েখ ও সুফিদের আধ্যাত্মিক আলোয় কোটি কোটি মানুষ তাওহিদের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।
সিলসিলা ও ত্বরিকার পরিচয়
১. ত্বরিকা (الطريقة): ‘ত্বরিকা’ অর্থ পথ বা পন্থা। পরিভাষায়: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আত্মশুদ্ধি অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও শিক্ষাদান পদ্ধতিকে ত্বরিকা বলা হয় (যেমন: কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া, চিশতিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া)।
২. সিলসিলা (السلسلة): ‘সিলসিলা’ অর্থ শিকল বা ধারাবাহিক শৃঙ্খলা। পরিভাষায়: আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও খেলাফতের যে অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্র বর্তমান শায়খ থেকে শুরু করে রাসূলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাকে সিলসিলা বলা হয়। অধিকাংশ সিলসিলার সূত্র হযরত আলী (রা.) এবং নকশবন্দিয়া সিলসিলা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর মাধ্যমে রাসূল (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে।
ইসলামি দাওয়াত প্রসারে ত্বরিকা ও সিলসিলার অনন্য ভূমিকা
- ব্যক্তিগত চরিত্র ও জীবন্ত আদর্শের মাধ্যমে দাওয়াত: সুফি সাধকগণ বক্তৃতার চেয়ে নিজেদের নিষ্কলুষ চরিত্র, সততা, কোমলতা ও মানবপ্রেম দিয়ে অমুসলিমদের মোহিত করতেন। ফলে হিন্দুস্তানে ও পূর্ব এশিয়ায় দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
- খানকাহ প্রতিষ্ঠা ও গণমানুষের আশ্রয়স্থল: খানকাহগুলো ছিল আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমাজকল্যাণ কেন্দ্র। সেখানে লঙ্গরখানা চালু থাকত, যেখানে ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই একসাথে খাবার গ্রহণ করত। হিন্দুধর্মের বর্ণবাদের শিকার দলিতরা এই সাম্য দেখে ইসলামে দাখিল হয়।
- দূরবর্তী অঞ্চলে ইসলাম প্রচার: মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সুদূর ভারতীয় উপমহাদেশ (খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী), মধ্য এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় বণিক ও সুফিদের সিলসিলার মাধ্যমেই সর্ববৃহৎ মুসলিম ভূখণ্ড গড়ে ওঠে।
- স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির রূপান্তর: সুফিগণ স্থানীয় ভাষায় সাহিত্য রচনা করে ও মারফতি গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রেম ও নবীর মোহাব্বত প্রবেশ করিয়েছেন।
- সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মদ্রোহিতা প্রতিরোধ: সুলতান ও রাজাদের জুলুম এবং মুঘল সম্রাট আকবরের ‘দ্বীনে এলাহী’র বিরুদ্ধে মোজাদ্দেদে আলফে সানী (রহ.) নকশবন্দিয়া সিলসিলার মাধ্যমেই তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
উপসংহার
সিলসিলা ও ত্বরিকা ছিল সুশৃঙ্খল দাওয়াতি আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। এর মানবিক ও আধ্যাত্মিক কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করলে সমকালীন দাওয়াতি কর্মকাণ্ডেও অভাবনীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব।
٤- اكتب ترجمة موجزة عن الشيخ عبد القادر الجيلاني مبينا جهوده الدعوية والإصلاحية-
[৪. শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ এবং তাঁর দাওয়াতি ও সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব হলেন সুলতানুল আউলিয়া, গাউসুল আযম শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)। তিনি একাধারে প্রখ্যাত ফকিহ, মুহাদ্দিস, যুগশ্রেষ্ঠ বক্তা এবং কাদেরিয়া ত্বরিকার প্রতিষ্ঠাতা। সমকালীন ক্রুসেড যুদ্ধ ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম মুহূর্তে তিনি এক ঐতিহাসিক দাওয়াতি জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন।
শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম ও বংশপরিচয়: তিনি ৪৭০ হিজরি (১০৭৭ খ্রি.) পারস্যের তাবরিস্তানের ‘জিলান’ (বা গায়লান) নগরীতে এক সম্ভ্রান্ত হাসানী ও হুসাইনী সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হযরত আবু সালেহ মুসা জেন্গী দোস্ত এবং মাতা উম্মুল খায়ের ফাতেমা উভয়েই আল্লাহর ওলী ছিলেন।
শিক্ষা ও আত্মিক সাধনা: আঠারো বছর বয়সে তিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য তৎকালীন বিশ্বের জ্ঞানের রাজধানী বাগদাদে গমন করেন। সেখানে তিনি প্রখ্যাত আলেমদের নিকট তাফসির, হাদিস ও হাম্বলি ফিকহ অধ্যয়ন করেন। এরপর দীর্ঘ ২৫ বছর ইরাকের মরুপ্রান্তরে কঠোর রিয়াযত, মোজাহাদা ও নির্জন সাধনায় কাটিয়ে আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেন।
বাগদাদে প্রত্যাবর্তন ও ওফাত: ৫২১ হিজরিতে তিনি বাগদাদে ফিরে আসেন এবং শায়খ আবু সাদ আল-মাখযুমীর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ও ওয়াজ শুরু করেন। ৫৬১ হিজরিতে (১১৬৬ খ্রি.) ৯০ বছর বয়সে তিনি বাগদাদে ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁর মাজার শরীফ অবস্থিত।
তাঁর দাওয়াতি ও সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা (جهوده الدعوية والإصلاحية)
- বিশাল গণওয়াজ ও লাখো মানুষের আত্মশুদ্ধি: বাগদাদে তাঁর সাপ্তাহিক ওয়াজের মজলিসে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ উপস্থিত হতো। চার শতাধিক লেখক তাঁর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতেন। তাঁর বক্তৃতায় হাজার হাজার খ্রিস্টান ও ইহুদি ইসলাম গ্রহণ করে এবং লাখ লাখ পাপী মুসলমান তওবা করে সৎপথে ফিরে আসে।
- শরীয়ত ও মারিফতের নিখুঁত সমন্বয়: তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে শরীয়তবিহীন তাসাউফ কুফরি। তিনি হাম্বলি মাযহাবের একজন প্রখ্যাত মুফতি ছিলেন এবং প্রতিদিন শরীয়তের জটিল মাসআলার সমাধান দিতেন।
- দাওয়াতি গ্রন্থাবলী রচনা: তিনি বহু কালজয়ী কিতাব রচনা করেন, যার মধ্যে অন্যতম: ‘গুনয়াতুত তালেবীন’ (الغنية لطالبي طريق الحق), ‘ফুতুহুল গায়ব’ (فتوح الغيب), ‘আল-ফাতহুর রব্বানী’ (الفتح الرباني) ইত্যাদি।
- সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর বিজয়ের মানসিক ভিত্তি তৈরি: তিনি মাদ্রাসার মাধ্যমে এমন এক ঈমানদার ও মুজাহিদ প্রজন্ম গড়ে তুলেছিলেন, যারা পরবর্তীতে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।
- কাদেরিয়া ত্বরিকার প্রতিষ্ঠা: তিনি কাদেরিয়া ত্বরিকা প্রবর্তন করেন, যা আজও মুসলিম বিশ্বে সর্ববৃহৎ ও সুশৃঙ্খল আধ্যাত্মিক ত্বরিকা হিসেবে ইসলামের আলো ছড়াচ্ছে।
উপসংহার
শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর জীবন ছিল ইলম, আমল ও দাওয়াতের এক উজ্জ্বল সমন্বয়। উম্মাহর ক্রান্তিকালে তাঁর সংস্কারমূলক বিপ্লব চিরকাল পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
٥- تحدث عن حياة الإمام الغزالي ومساهمته في التوفيق بين الشريعة والتصوف-
[৫. ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর জীবনচরিত আলোচনা কর এবং শরীয়ত ও তাসাউফের মাঝে সমন্বয় সাধনে তাঁর অবদান তুলে ধর।]
ভূমিকা
হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-গাজ্জালী (রহ.) ছিলেন পঞ্চম হিজরি শতকের মুজাদ্দিদ। দর্শন, কালামশাস্ত্র, ফিকহ ও তাসাউফের ইতিহাসে তাঁর নাম এক স্বতন্ত্র দিগন্তের উন্মোচন করেছে। বিভ্রান্ত দার্শনিক চিন্তা ও বিচ্যুত সুফিবাদের কবল থেকে ইসলামি বিশ্বাসকে রক্ষা করে শরীয়ত ও আত্মশুদ্ধির যে অভূতপূর্ব সমন্বয় তিনি সাধন করেছিলেন, তা ইতিহাসে অতুলনীয়।
ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর জীবনচরিত
জন্ম ও শিক্ষা: তিনি ৪৫০ হিজরিতে (১০৫৮ খ্রি.) বর্তমান ইরানের খোরাসানের তুস নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। নিশাপুরের বিখ্যাত নিজামিয়া মাদ্রাসায় ইমামুল হারামাইন আবুল মাআলী আল-জুওয়াইনী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে ফিকহ, উসুল ও যুক্তিশাস্ত্রে গভীর বুৎপত্তি লাভ করেন।
বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসার প্রধান: তাঁর প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে সেলজুক উজির নিজামুল মুলক ৪৮৪ হিজরিতে তাঁকে বাগদাদের বিশ্বখ্যাত নিজামিয়া মাদ্রাসার প্রধান অধ্যাপক পদে নিযুক্ত করেন। অল্প দিনেই তিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃতি পান।
আধ্যাত্মিক সংকট ও আত্মত্যাগ: জাগতিক খ্যাতি ও সম্মানের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় তাঁর অন্তরে সত্যের সন্ধানে এক গভীর আধ্যাত্মিক আলোড়ন শুরু হয়। তিনি অধ্যাপনা ও রাজকীয় পদমর্যাদা ত্যাগ করে সাধারণ সুফিবেশে দামেস্ক ও বায়তুল মুকাদ্দাসে দীর্ঘ ১০ বছর নির্জন সাধনা ও ধ্যানে কাটান।
ওফাত: ৫০৫ হিজরিতে (১১১১ খ্রি.) মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এই মহান মনীষী নিজ জন্মভূমি তুসে ইন্তেকাল করেন।
শরীয়ত ও তাসাউফের মাঝে সমন্বয় সাধনে তাঁর অবদান
- ইহয়াউ উলুমিদ্দীন রচনা: নির্জন সাধনা শেষে তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী মাস্টারপিস ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দীন’ (إحياء علوم الدين – দ্বীনি ইলমের পুনরুজ্জীবন)। এ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে নামাজের রুকু-সিজদা, রোজা ও হজের বাহ্যিক শরয়ি রূপের ভেতর গভীর আত্মিক প্রাণশক্তি (খুশু-খুজু) নিহিত রয়েছে।
- বাতেনিয়া ও বিভ্রান্ত সুফিদের বিভ্রান্তি নিরসন: তৎকালীন কিছু ভণ্ড সুফি প্রচার করছিল যে আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছালে শরীয়তের নামাজ-রোজার প্রয়োজন থাকে না। ইমাম গাজ্জালী অকাট্য দলিল দিয়ে প্রমাণ করেন যে শরীয়ত হলো ভিত্তি আর মারিফত হলো তার সৌধ; ভিত্তি ছাড়া সৌধ কখনোই টিকে থাকতে পারে না।
- শুষ্ক ফিকহের ভেতরে আত্মিক প্রাণের সঞ্চার: তিনি তৎকালীন ফকিহদের সতর্ক করে বলেন যে কেবল বাহ্যিক শর্তপূরণই যথেষ্ট নয়; অন্তরের ইখলাস ও তাকওয়া ছাড়া কোনো ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না।
- দর্শনের ওপর ইসলামের বিজয়: তিনি ‘তাহাফুতুল ফালাসিফাহ’ (تهافت الفلاسفة) গ্রন্থ লিখে গ্রিক দর্শনের বিভ্রান্তি সমূলে ধ্বংস করেন এবং প্রমাণ করেন যে মানব মস্তিষ্ক দিয়ে আল্লাহর পরম সত্তা জানা অসম্ভব; এর জন্য আসমানি ওহী ও আধ্যাত্মিক কাশফ প্রয়োজন।
উপসংহার
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) ইসলামি চিন্তাচেতনার গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। তাঁর সমন্বয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম উম্মাহকে চিরদিনের জন্য এক সুষম ও পরিপূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ পথের সন্ধান দিয়েছে।
٦- بيّن جهود الشيخ أحمد السرهندي (مجدد ألف ثاني) في تجديد الدين ومقاومة البدع-
[৬. দীন পুনরুজ্জীবন এবং বিদআত প্রতিরোধে শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (মুজাদ্দিদে আলফে সানী)-এর প্রচেষ্টা বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
দ্বিতীয় হিজরি সহস্রাব্দের মুজাদ্দিদ (مجدد ألف ثاني) হিসেবে খ্যাত হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.) ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আসল রূপ সুরক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। মুঘল সম্রাট আকবরের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যখন ইসলামকে বিকৃত করে ‘দ্বীনে এলাহী’ নামক কুফরি মতবাদ চালু করা হয়েছিল, তখন তিনি একাই বুক ফুলিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
তিনি ৯৭১ হিজরিতে ভারতের পাঞ্জাবের সিরহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নকশবন্দিয়া ত্বরিকার প্রখ্যাত সাধক খাজা বাকিবিল্লাহ (রহ.)-এর নিকট বায়াত হয়ে আধ্যাত্মিকতার চরম উৎকর্ষ অর্জন করেন। ১০৩৪ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
দ্বীনের পুনরুজ্জীবন ও সংস্কারমূলক প্রচেষ্টাসমূহ
- মুঘল সম্রাট আকবরের ‘দ্বীনে এলাহী’ খণ্ডন:
সম্রাট আকবর হিন্দু, জৈন ও অন্যান্য ধর্মের সমন্বয়ে ‘দ্বীনে এলাহী’ তৈরি করে সাজদায়ে তাজিমি (বাদশাহকে সিজদা করা), সুদের বৈধতা, গরুর গোশত নিষিদ্ধকরণ এবং নবুওয়াতের বিরোধিতাকে প্রশ্রয় দেন। মুজাদ্দিদে আলফে সানী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এর বিরুদ্ধে ফতোয়া দেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে গিয়ে বাদশাহকে সিজদা করতে অস্বীকার করে গয়ালিয়র দুর্গে কারাবরণ করেন। - ‘মাকতূবাত’ বা চিঠিপত্রের মাধ্যমে বিপ্লব:
কারাগার থেকে এবং বাইরে থাকা অবস্থায় তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী উজির, সেনাপতি ও দরবারের আমলাদের কাছে শত শত চিঠি প্রেরণ করেন, যা ‘মাকতূবাতে ইমামে রব্বানী’ নামে সংকলিত। এই চিঠিগুলোর মাধ্যমে তিনি মুসলিম দরবারীদের ঈমানি চেতনা জাগ্রত করেন, যার ফলে সম্রাট জাহাঙ্গীর পরবর্তীতে তওবা করে শরীয়তের অনুগত হতে বাধ্য হন। - ওয়াহদাতুশ শুহূদের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা:
তৎকালীন ভ্রান্ত সুফিগণ ইবনুল আরাবীর ‘ওয়াহদাতুল উজূদ’ (সর্বেশ্বরবাদ – সবকিছুই খোদা) ধারণার অপব্যাখ্যা করে সকল ধর্মকে এক মনে করছিল। মুজাদ্দিদে আলফে সানী দর্শন ও গভীর আধ্যাত্মিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে স্রষ্টা এবং সৃষ্টি কখনো এক হতে পারে না (হামাহ উস্ত নয়, বরং হামাহ আয উস্ত—সবকিছু তাঁর থেকে সৃষ্ট)। এই তত্ত্বকে বলা হয় ‘ওয়াহদাতুশ শুহূদ’। - বিদআত ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন:
তিনি সমাজ ও খানকাহ থেকে সকল প্রকার বিদআতে সাইয়িআহ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন এবং ঘোষণা করেন যে যে ব্যক্তি একটি বিদআত চালু করল, সে প্রকারান্তরে একটি সুন্নাহকে ধ্বংস করল।
উপসংহার
শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.)-এর আপসহীন সংগ্রামের ফলেই ভারত উপমহাদেশে ইসলাম চিরতরে বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তাঁর কারণেই পরবর্তী মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের মতো ন্যায়পরায়ণ শাসকের আবির্ভাব ঘটেছিল।
مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী]
মান: ৫ × ৪ = ২০
٧- بيّن أهمية الوعظ والإرشاد في الدعوة الإسلامية-
[৭. ইসলামি দাওয়াতে ওয়াজ ও নসিহতের গুরুত্ব আলোচনা কর।]
উত্তর
ওয়াজ ও নসিহত হলো ইসলামি দাওয়াতের প্রাচীনতম ও সর্বাধিক কার্যকর মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: “আপনি তাদের সদুপদেশ দিন এবং তাদের উদ্দেশ্যে এমন কথা বলুন যা তাদের অন্তরে প্রভাব ফেলে।” (সূরা আন-নিসা: ৬৩)
- অন্তরে খোদাভীতি জাগ্রত করা: সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী ওয়াজের মাধ্যমে কঠিন অন্তর গলে যায় এবং অশ্রুসিক্ত চোখে মানুষ তওবা করে।
- গণসচেতনতা ও শরীয়তের শিক্ষা বিস্তার: সাধারণ মানুষের নিকট কোরআন-হাদিসের হালাল-হারাম ও ফরজ বিধান পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো ওয়াজের মাহফিল।
- শর্তাবলী: ওয়াজকারীকে অবশ্যই জ্ঞানী, মুখলিস এবং নিজ বক্তব্যের ওপর আমলকারী হতে হবে। বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী ও মিথ্যা হাদিস পরিহার করা অপরিহার্য।
٨- ما هي مراتب الأولياء ودرجاتهم عند الصوفية؟
[৮. সুফি পরিভাষায় আউলিয়াগণের বিভিন্ন স্তর ও পদমর্যাদা কী কী?]
উত্তর
সুফি পরিভাষায় আধ্যাত্মিক বিশ্ব পরিচালনার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা হিসেবে আউলিয়াগণের বিভিন্ন স্তরের বিবরণ পাওয়া যায়:
- আল-গাউস বা কুতুবুল আকতাব (الغوث / قطب الأقطاب): সমকালের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ওলী, যিনি সমগ্র জগতের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের কেন্দ্রবিন্দু।
- আল-আকতাব (الأقطاب): নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা আধ্যাত্মিক অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সাধকগণ।
- আল-আওতাদ (الأوتاد): চারজন বিশিষ্ট ওলী, যাঁরা চার দিকের বা পৃথিবীর চারটি স্তম্ভের সাথে রূপকভাবে সম্পর্কিত।
- আল-আবদাল (الأبدال): চল্লিশজন পুণ্যবান ওলী, যাঁদের একজনের ওফাত হলে আল্লাহ তৎক্ষণাৎ অপর একজনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন (হাদিসে এদের উল্লেখ পাওয়া যায়)।
- আন-নুজাবা ও আন-নুকাবা (النجباء والنقباء): পরবর্তী নিম্নস্তরের আধ্যাত্মিক সাধকগণ যাঁরা গণমানুষের হেদায়েত ও খেদমতে নিয়োজিত থাকেন।
٩- اكتب عن تزكية النفوس وتهذيب الأخلاق عند الصوفية-
[৯. সুফিদর্শনে আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নফস) ও চরিত্র সংশোধন সম্পর্কে লেখ।]
উত্তর
তাযকিয়ার অর্থ: ‘তাযকিয়া’ অর্থ পবিত্র করা ও পরিশীলিত করা। মানুষের অন্তরে থাকা কুপ্রবৃত্তি (নফসে আম্মারা) দমন করে তাকে প্রশান্ত আত্মা (নফসে মুতমাইন্না)-য় রূপান্তর করাই হলো তাযকিয়া। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় সে-ই সফলকাম হলো, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করল।” (সূরা আশ-শামস: ৯)
পদ্ধতিসমূহ:
- তাখাল্লিয়া (التخلية): অন্তর থেকে হিংসা, লোভ, অহংকার, রিয়া ও কৃপণতার মতো আত্মিক ব্যাধিগুলো দূর করা।
- তাহাল্লিয়া (التحلية): অন্তরে ধৈর্য, শোকর, তাওয়াক্কুল, ইখলাস ও মহব্বতের মতো স্বর্গীয় গুণাবলিতে সজ্জিত করা।
- মোরাকাবা ও জিকির: সর্বদা অন্তরে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা এবং জিহ্বা ও কলবে অবিরাম জিকির জারি রাখা।
١٠- ما هي مساهمة الشاه ولي الله الدهلوي في خدمة علم الحديث بالهند؟
[১০. ভারতে হাদিস চর্চায় শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রহ.)-এর অবদান উল্লেখ কর।]
উত্তর
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (১৭১৩-১৭৬২ খ্রি.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের হাদীস চর্চার পিতা। তাঁর পূর্বে ভারতে কেবল ফিকহে হানাফির জটিল মাসআলার চর্চা হতো, হাদিসের সরাসরি পাঠদান ছিল সীমিত।
- মক্কা-মদিনা থেকে সনদ আনয়ন: তিনি হারামাইনে গিয়ে শায়খ আবু তাহের আল-কুরদী মাদানী (রহ.)-এর নিকট থেকে সিহাহ সিত্তাহ সহ হাদিসের উচ্চতর সনদ ও সনদসহ কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করেন।
- মুয়াত্তা ইমাম মালিকের প্রচার: তিনি মুয়াত্তাকে হাদিসের মূল ভিত্তি ঘোষণা করে তার আরবি ও ফারসি দুটি জগদ্বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ (আল-মুসাফ্ফা ও আল-মুসাওওয়া) রচনা করেন।
- মাদ্রাসায়ে রহীমহিয়ায় হাদিসের ধারা চালু: তিনি দিল্লিতে বুখারি ও মুসলিম সহ সিহাহ সিত্তাহর দরস চালু করেন। তাঁর সুযোগ্য সন্তান শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলবীর মাধ্যমে তা ভারতের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচলিত উক্তি আছে: “আজ ভারতবর্ষে যে হাদিসের সনদই দেখা যাক না কেন, তা ঘুরেফিরে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবীর কাছে গিয়েই শেষ হয়।”
١١- اذكر باختصار خدمات الشاه أحمد رضا خان البريلوي-
[১১. ইমাম আহমদ রেজা খান বেরলভী (রহ.)-এর দ্বীনি খিদমতের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।]
উত্তর
ইমাম আহমদ রেজা খান বেরলভী (১৮৫৬-১৯২১ খ্রি.) ছিলেন উত্তর ভারতের প্রখ্যাত আলেম, বহুভাষাবিদ গবেষক এবং বেরলভী চিন্তাধারার মূল তাত্ত্বিক।
- ফাতাওয়া রেজভিয়া প্রণয়ন: তিনি হানাফি ফিকহের ওপর ৩০ খণ্ডে প্রায় ২২ হাজার পৃষ্ঠার এক মহাবিস্ময়কর ফতোয়াগ্রন্থ ‘আল-আতায়ান নাবাবিয়্যাহ ফিল ফাতাওয়া রেজভিয়্যাহ’ রচনা করেন, যা তাঁর গভীর ফিকহ জ্ঞানের অনন্য নিদর্শন।
- ইশকে রাসুল (সা.)-এর জাগরণ: তিনি তাঁর না’ত ও কবিতার মাধ্যমে মুসলিম হৃদয়ে রাসূলপ্রেমকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় তুলে ধরেন। তাঁর রচিত উর্দু না’ত ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম’ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
- কুরআনের অনুবাদ (কানযুল ঈমান): তিনি উর্দু ভাষায় কুরআনের অত্যন্ত সুললিত ও ভক্তিমূলক অনুবাদ ‘কানযুল ঈমান’ রচনা করেন।
- সুন্নি আকিদা সংরক্ষণ: সমকালীন ওয়াহাবি ও অন্যান্য নব্য মতবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরে ঐতিহ্যবাহী সুন্নি ও সুফি মতাদর্শ রক্ষায় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।
١٢- اكتب نبذة موجزة عن حياة وأعمال الشيخ نثار الدين أحمد الفرفروي-
[১২. শায়খ নেসারুদ্দীন আহমদ ফুরফুরাবী (রহ.)-এর জীবন ও কর্ম সংক্ষেপে লেখ।]
উত্তর
পরিচয়: শায়খুল ইসলাম মাওলানা নেসারুদ্দীন আহমদ (১৮৭৩-১৯৫২ খ্রি.) ছিলেন বাংলার এক অবিসংবাদিত সুফি সাধক, সমাজ সংস্কারক এবং পীর সাহেব ছারছীনা দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ভারতের ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে জামান মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.)-এর শীর্ষ খলিফা ছিলেন।
প্রধান কর্মসমূহ:
- ছারছীনা দারুসসুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা (১৯১৫ খ্রি.): পিরোজপুরের প্রত্যন্ত ছারছীনায় তিনি একটি ঐতিহাসিক দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম বৃহৎ কামিল মাদ্রাসা ও হাদিস চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
- পর্দা ও সুন্নতের প্রতিষ্ঠা: তিনি দক্ষিণ বাংলায় শক্ত হাতে শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার দমন করেন এবং মুসলিম সমাজে সুন্নতি পোশাক ও কঠোর পর্দা প্রথা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
- জমিয়তে হিযবুল্লাহ গঠন: মুসলমানদের দ্বীনি, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার জন্য এবং সুশৃঙ্খল দাওয়াতি কাজের লক্ষ্যে তিনি ‘বাংলাদেশ জমিয়তে হিযবুল্লাহ’ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. সুফিবাদের মূল লক্ষ্য কী?
সুফিবাদের মূল লক্ষ্য হলো অন্তর থেকে অহংকার, রিয়া ও লোভ দূর করে আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়া) অর্জন করা এবং হাদিসে জিবরিল নির্দেশিত ইহসানের স্তরে পৌঁছে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা।
২. শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর প্রধান গ্রন্থ কোনটি?
তাঁর রচিত অন্যতম প্রধান প্রামাণ্য গ্রন্থ হলো ‘গুনয়াতুত তালেবীন’ (الغنية لطالبي طريق الحق), যেখানে তিনি ফিকহ, সুন্নাহ এবং তাসাউফের চমৎকার সমন্বয় উপস্থাপন করেছেন।
৩. ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-কে কেন ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ বলা হয়?
দর্শন ও বিভ্রান্ত বিদআতের যুগে যুক্তি ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামের অকাট্য প্রামাণিকতা প্রতিষ্ঠা করে ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করার কারণে তাঁকে ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ (ইসলামের অকাট্য প্রমাণ) বলা হয়।
৪. ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ কাকে বলা হয় এবং কেন?
হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.)-কে মুজাদ্দিদে আলফে সানী বলা হয়, কারণ তিনি হিজরি দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে সম্রাট আকবরের ভ্রান্ত ‘দ্বীনে এলাহী’ ও বিদআত নির্মূল করে ইসলামকে রক্ষা করেছিলেন।
৫. ভারতে হাদিস শিক্ষার প্রসারে কার অবদান সর্বাধিক?
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রহ.) হারামাইন থেকে সনদসহ হাদিসের কিতাবসমূহ এনে দিল্লিতে শিক্ষাদানের মাধ্যমে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে সিহাহ সিত্তাহর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা চালু করেন।
৬. ছারছীনা দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?
বাংলার প্রখ্যাত সংস্কারক ও সুফি সাধক আল্লামা শাহ সূফী নেসারুদ্দীন আহমদ (রহ.) ১৯১৫ সালে ছারছীনা দরবার শরীফ ও দারুসসুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।