পরীক্ষা কোড: 203 | প্রশ্নপত্র কোড: 093
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢٢
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الفقه وأصوله
[আল-ফিকহ ওয়া উসুলুহু]
বিষয় কোড: 203307
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن سؤالين من كل من المجموعتين (أ، ج) وعن أربعة من كل من المجموعتين (ب، د)
[দ্রষ্টব্য: (أ) ও (ج) প্রত্যেক গ্রুপ থেকে দুটি করে এবং (ب) ও (د) প্রত্যেক গ্রুপ থেকে চারটি করে মোট ১২টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) [الفقه – أسئلة موسعة / বিভাগ ‘ক’ – ফিকহ রচনামূলক]
মান: ১০ × ২ = ২০ (যেকোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
١- ما هي المرابحة والتولية؟ واشرح شروطهما وأحكامهما في الفقه الإسلامي-
[১. মুরাবাহা ও তাওলিয়াহ কী? ইসলামি ফিকহের আলোকে এ দুটির শর্তাবলী ও শরয়ি হুকুম বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি ফিকহের ক্রয়-বিক্রয় (আল-বুয়ূ’) অধ্যায়ে আমানতদারিমূলক লেনদেনের (বাইয়্যুল আমানাহ) ক্ষেত্রে ‘মুরাবাহা’ এবং ‘তাওলিয়াহ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ্ধতি। বিক্রেতা তার আসল ক্রয়মূল্যকে ভিত্তি করে লাভসহ বা লাভে-আসলে বিক্রি করার এই বিধান বর্তমান আধুনিক ইসলামি অর্থনীতিতেও ব্যাপকভাবে কার্যকর।
মুরাবাহা ও তাওলিয়ার সংজ্ঞা
- আল-মুরাবাহা (المرابحة): বিক্রেতা কোনো পণ্য যে মূল্যে ক্রয় করেছে তা ক্রেতার কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে তার ওপর পূর্বনির্ধারিত নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা (লাভ) যোগ করে বিক্রি করাকে ‘মুরাবাহা’ বলে।
- আত-তাওলিয়াহ (التولية): বিক্রেতা কোনো পণ্য যে মূল্যে ক্রয় করেছে কোনো প্রকার লাভ বা লোকসান ছাড়া ঠিক সেই একই মূল্যে ক্রেতার নিকট হস্তান্তর করাকে ‘তাওলিয়াহ’ বলে।
মুরাবাহা ও তাওলিয়া চুক্তির আবশ্যকীয় শর্তাবলী
- আসল ক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে জানা থাকা: প্রথম চুক্তিতে পণ্যের সঠিক ক্রয়মূল্য এবং আনুষঙ্গিক খরচের পরিমাণ ক্রেতার নিকট দ্ব্যর্থহীনভাবে পরিষ্কার হতে হবে।
- আমানত ও সত্যবাদিতা: বিক্রেতাকে অবশ্যই পরম আমানতদার হতে হবে; মূল্যের ব্যাপারে কোনো প্রকার মিথ্যা বললে তা চুক্তির বৈধতা নষ্ট করে (খেয়ানত সাব্যস্ত হয়)।
- পণ্য শরীয়তসম্মত সম্পদ (মালিয়্যাত) হওয়া: পণ্যটি হালাল ও পবিত্র সম্পদ হতে হবে।
- মুনাফার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট হওয়া (মুরাবাহার ক্ষেত্রে): লাভের পরিমাণ নগদ অঙ্কে বা শতকরা হারে চুক্তির সময়ই স্পষ্টভাবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত হতে হবে।
চুক্তির শরয়ি হুকুম ও মাসআলা
উভয় প্রকার ক্রয়-বিক্রয়ই ইসলামি শরিয়তে সর্বসম্মতভাবে বৈধ ও জায়েজ। যদি পণ্য হস্তান্তরের পর ক্রেতা জানতে পারে যে বিক্রেতা আসল মূল্যের ব্যাপারে মিথ্যা বলেছিল (খেয়ানত করেছে), তবে:
- মুরাবাহার ক্ষেত্রে: ইমাম আবু হানিফার মতে ক্রেতার অধিকার রয়েছে হয় পুরো দামে পণ্য গ্রহণ করা অথবা চুক্তি বাতিল করা; আর ইমাম আবু ইউসুফের মতে অতিরিক্ত মিথ্যা দাবিকৃত মূল্য ও তার অংশের লাভ বাদ দিয়ে বাকি মূল্যে পণ্য নিতে পারবে।
- তাওলিয়ার ক্ষেত্রে: মিথ্যা দাবিকৃত অতিরিক্ত মূল্য সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাবে এবং কেবল আসল দামে পণ্য হস্তান্তরিত হবে।
উপসংহার
মুরাবাহা ও তাওলিয়াহ হলো সততা ও স্বচ্ছতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এমন এক লেনদেন ব্যবস্থা যা সমাজে অতিরিক্ত মুনাফাখোরি ও ধোঁকাবাজি প্রতিরোধ করে।
٢- عرّف السلم وبيّن شروطه وأحكامه في المعاملات المالية-
[২. বাইয়ে সালাম (অগ্রিম ক্রয়)-এর সংজ্ঞা দাও এবং আধুনিক আর্থিক লেনদেনে এর শর্তাবলী ও হুকুম ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি শরীয়তের সাধারণ নিয়ম হলো যা বর্তমানে উপস্থিত বা অস্তিত্বে নেই তা বিক্রি করা নিষেধ। কিন্তু কৃষক, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক প্রয়োজনের সুবিধার্থে ইসলাম সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে ‘বাইয়ে সালাম’ বা অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়কে শর্তসাপেক্ষে বৈধ করেছে।
বাইয়ে সালামের সংজ্ঞা (تعريف السلم)
শাব্দিক অর্থ: অগ্রিম প্রদান করা। একে ‘সালাফ’ (السلف)-ও বলা হয়।
পারিভাষিক অর্থ: ইমাম কুদূরী (রহ.) বলেন: এমন ক্রয়-বিক্রয় যেখানে পণ্যের মূল্য তাৎক্ষণিকভাবে নগদে পরিশোধ করা হয় এবং পণ্যটি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহের চুক্তি করা হয় (بيع آجل بعاجل)।
বৈধতার দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন লোকেরা ফল ও শস্যে এক-দুই বছর মেয়াদে অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় করছে। তিনি বললেন:
مَنْ أَسْلَفَ فِي شَيْءٍ فَلْيُسْلِفْ فِي كَيْلٍ مَعْلُومٍ، وَوَزْنٍ مَعْلُومٍ، إِلَى أَجَلٍ مَعْلُومٍ
“যে ব্যক্তি অগ্রিম কেনাবেচা করবে, সে যেন নির্দিষ্ট পরিমাপ, নির্দিষ্ট ওজন এবং সুনির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করে কেনাবেচা করে।” (সহিহ বুখারি)
বাইয়ে সালামের আবশ্যকীয় শর্তাবলী (شروطه)
- চুক্তির মজলিসেই পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা (ক্ববযুর রাসুল মাল): ক্রেতাকে পুরো ক্রয়মূল্য চুক্তির সময়ই নগদে পরিশোধ করতে হবে; বাকি বা ঋণ রাখা যাবে না।
- পণ্যের গুণমান ও বৈশিষ্ট্য নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট করা: পণ্যের জাত, রঙ, আকার ও মান এমনভাবে স্পষ্ট করতে হবে যাতে কোনো বিরোধের সুযোগ না থাকে।
- পণ্যের পরিমাণ ওজন বা পরিমাপে নির্দিষ্ট হওয়া: অনুমানে কেনা যাবে না; কেজি, মণ বা লিটার হিসেবে নির্দিষ্ট হতে হবে।
- নির্দিষ্ট সরবরাহের সময়সীমা নির্ধারণ: ডেলিভারির সুনির্দিষ্ট তারিখ ও স্থান উল্লেখ থাকতে হবে।
- পণ্যটি বাজারে সহজলভ্য হওয়া: এমন সাধারণ পণ্য হতে হবে যা মেয়াদের সময় বাজারে সহজে পাওয়া যায়। কোনো দুর্লভ বা একক বাগানের নির্দিষ্ট ফল বলা যাবে না।
উপসংহার
বাইয়ে সালাম কৃষকদের দাদন ব্যবস্থার শোষণ থেকে রক্ষা করে অগ্রিম পুঁজি সংগ্রহের সুযোগ দেয় এবং ব্যবসায়ীদের নির্ভরযোগ্য পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধান করে।
٣- اكتب عن الكراهية وحكم شرب أبوال الإبل وألبان الأتن-
[৩. ফিকহের পরিভাষায় ‘কারাহিয়্যাত’ ব্যাখ্যা কর এবং উটের প্রস্রাব ও গাধার দুধ পানের শরয়ি হুকুম বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি ফিকহে খাদ্য ও পানীয়ের হালাল ও হারামের ক্ষেত্রে পবিত্রতা ও মানবকল্যাণকে মূল ভিত্তি বানানো হয়েছে। কোনো বস্তুকে মাকরূহ বা হারাম ঘোষণার পেছনে সুনির্দিষ্ট শারয়ী কারণ বিদ্যমান থাকে।
ফিকহের পরিভাষায় কারাহিয়্যাত (الكراهية)
শরীয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় কাজকে মাকরূহ বলা হয়। হানাফি ফিকহে এটি দুই প্রকার: ১. মাকরূহে তাহরীমী (যা হারামের নিকটবর্তী, জন্নী দলিল দ্বারা প্রমাণিত এবং বর্জন করা ওয়াজিব), এবং ২. মাকরূহে তানযীহী (যা হালালের নিকটবর্তী, পরিহার করা উত্তম তবে কোনো শাস্তি নেই)।
১. উটের প্রস্রাব (أبوال الإبل) পানের শরয়ি হুকুম
সহিহ হাদিসের প্রেক্ষাপট: উরাইনা গোত্রের কিছু লোক মদিনায় এসে অসুস্থ হয়ে পড়লে (পেটের রোগে আক্রান্ত হলে) রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের সদকার উটের চারণভূমিতে গিয়ে উটের দুধ ও প্রস্রাব ওষুধ হিসেবে পান করার অনুমতি দিয়েছিলেন (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
ফকিহগণের অভিমত:
- ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ (রহ.): যে সকল পশুর গোশত খাওয়া হালাল (যেমন উট, গরু, ছাগল), তাদের প্রস্রাব ও গোবর অপবিত্র (নাপাক) নয়। অতএব চিকিৎসার প্রয়োজনে তা পান করা বৈধ।
- ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.): সকল প্রাণীর প্রস্রাবই মৌলিকভাবে নাপাক (নাজাসাত)। তবে সহিহ হাদিসের আলোকে মারাত্মক অসুস্থতায় জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে ওষুধ হিসেবে অন্য কোনো হালাল বিকল্প ওষুধ না থাকলে উটের প্রস্রাব পান করা চিকিৎসার প্রয়োজনে জায়েজ বা শিথিলযোগ্য। সাধারণ অবস্থায় বিনাপ্রয়োজনে তা পান করা মাকরূহ বা নিষিদ্ধ।
২. গৃহপালিত গাধার দুধ (ألبان الأتن) পানের হুকুম
গৃহপালিত গাধা খায়বারের যুদ্ধের দিন সুস্পষ্ট সহিহ হাদিসের মাধ্যমে চিরতরে হারাম করা হয়েছে। ফিকহি নীতি হলো: “মা হুরুমা লাকমুহু হুরুমা লাবানুহু” (যে পশুর গোশত খাওয়া হারাম, তার দুধ পান করাও হারাম)। অতএব, চার মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গৃহপালিত গাধার দুধ পান করা হারাম বা মাকরূহে তাহরীমী। তবে চরম জীবন-মৃত্যুর সংকটে অন্য কোনো ওষুধ না থাকলে চিকিৎসার নিয়তে সীমিত ব্যবহারের অনুমতি কোনো কোনো ফকিহ দিয়েছেন।
উপসংহার
শরীয়তের সাধারণ মূলনীতি হলো পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল এবং অপবিত্র বস্তু হারাম; তবে চরম মানবিক ও চিকিৎসা সংকটকালীন অবস্থায় সীমিত ব্যতিক্রম স্বীকৃত।
٤- عرّف الرهن واذكر أركانه وشروطه ومفسداته في الفقه الإسلامي-
[৪. রাহানের (বন্ধক) সংজ্ঞা দাও এবং এর রুকন, শর্তাবলী ও বন্ধক বাতিলকারী কারণসমূহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে ঋণদাতার পাওনা নিশ্চিত করতে বন্ধক বা রাহান ইসলামি শরীয়তের এক চমৎকার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সমাজে সুদের প্রয়োজন ছাড়া মানুষ সহজে পারস্পরিক ঋণ সহায়তা লাভ করতে পারে।
রাহানের সংজ্ঞা (تعريف الرهن)
পারিভাষিক অর্থ: ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে পাওনা অর্থ উসুল করার উদ্দেশ্যে ঋণদাতার নিকট ঋণগ্রহীতার কোনো মূল্যবান সম্পদ জামানতস্বরূপ আইনগতভাবে আটকে রাখাকে ‘রাহান’ বা বন্ধক বলে। পবিত্র কুরআনে এসেছে: “তবে বন্ধক রেখে হস্তগত করবে।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৩)
রাহানের রুকন ও শর্তাবলী
রুকনসমূহ: ১. রাহিন (ঋণগ্রহীতা), ২. মুরতাহিন (ঋণদাতা), ৩. মারহূন (বন্ধকীকৃত বস্তু), ৪. মারহূন বিহী (ঋণকৃত অর্থ) এবং ৫. সীগাহ (চুক্তি)।
আবশ্যকীয় শর্তাবলী:
- মারহূন ঋণদাতার দখলে আসা (ক্ববযা): চুক্তি কার্যকর হতে বন্ধকী মাল ঋণদাতার কব্জায় হস্তান্তর করা আবশ্যক।
- বস্তুটি বিক্রয়যোগ্য সম্পদ হওয়া: বস্তুটি হালাল ও মূল্যবান মাল হতে হবে যা বিক্রি করে ঋণ শোধ করা যায়।
- ঋণদাতার জন্য ভোগদখল নিষিদ্ধ: ঋণদাতা বন্ধকী জমি চাষ করতে পারবে না বা বাড়ি ভাড়া দিতে পারবে না; কারণ ঋণের মাধ্যমে অর্জিত অতিরিক্ত যেকোনো মুনাফাই সুদ।
রাহান বাতিলকারী কারণসমূহ (مفسدات الرهن)
- ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করা: পাওনা শোধ হয়ে গেলে বন্ধক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাপ্ত হয় এবং সম্পদ ফেরত দেওয়া ওয়াজিব হয়।
- ঋণদাতার নিঃশর্ত ক্ষমা: ঋণদাতা যদি ঋণ মাফ করে দেয়।
- বন্ধকী মাল ধ্বংস হয়ে যাওয়া: মারহূন বস্তু নষ্ট বা বিনষ্ট হলে দায় সমন্বয় হয়।
- অবৈধ শর্তারোপ করা: চুক্তিতে কোনো সুদি বা শরীয়তবিরোধী শর্ত (যেমন: ঋণদাতা সম্পদটি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করবে) আরোপ করলে পুরো চুক্তি ফাসিদ হয়ে যায়।
উপসংহার
রাহান ব্যবস্থার উদ্দেশ্য মানুষের ঋণ সুরক্ষার নিরাপত্তা প্রদান, কোনো প্রকার শোষণ বা জুলুম নয়।
مجموعة (ب) [الفقه – أسئلة موجزة / বিভাগ ‘খ’ – ফিকহ সংক্ষিপ্ত]
মান: ৫ × ৪ = ২০ (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
٥- عرّف علم الفقه وبيّن تاريخه وأهميته-
[৫. ইলমুল ফিকহের সংজ্ঞা দাও এবং এর ঐতিহাসিক পটভূমি ও গুরুত্ব আলোচনা কর।]
উত্তর
সংজ্ঞা: বিস্তারিত ও স্বতন্ত্র শরয়ি দলিল (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস) থেকে আহরিত মানবীয় দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক বিধি-বিধানের জ্ঞানকে ইলমুল ফিকহ বলে।
ইতিহাস: রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশায় ওহীর মাধ্যমে সরাসরি ফয়সালা আসত। সাহাবিদের যুগে জটিল মাসআলায় শীর্ষ সাহাবিগণ পরামর্শের ভিত্তিতে রায় দিতেন। দ্বিতীয় হিজরি শতকে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মাধ্যমে ফিকহ বিধিবদ্ধ ও সংকলিত শাস্ত্রে রূপ নেয়।
গুরুত্ব: ফিকহ ছাড়া সালাত, সাওম, হজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারিবারিক আইন কীভাবে পালন করতে হবে—তা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা অসম্ভব।
٦- من دون علم الفقه أولا؟ وتحدث عن مكانته-
[৬. সর্বপ্রথম ফিকহ সংকলন কে করেছিলেন? এবং এর মর্যাদা আলোচনা কর।]
উত্তর
ফিকহ শাস্ত্রকে সুবিন্যস্তভাবে অধ্যায়ভিত্তিক সংকলন এবং গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানকারী প্রথম ইমাম হলেন ইমামে আজম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.) (৮০-১৫০ হি.)। তিনি চল্লিশ জন শীর্ষ মুজতাহিদ শিষ্যের সমন্বয়ে ‘ফিকহ সংকলন একাডেমি’ গঠন করে প্রায় ৮৩ হাজার মাসআলা সংকলন করেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁর ঐতিহাসিক স্বীকৃতিতে বলেন:
النَّاسُ فِي الْفِقْهِ عِيَالٌ عَلَى أَبِي حَنِيفَةَ
“ফিকহের ময়দানে সমগ্র মানবজাতি ইমাম আবু হানিফার সন্তানতুল্য (মুখাপেক্ষী)।”
٧- اكتب نبذة موجزة عن حياة الإمام أبي يوسف ومكانته الفقهية-
[৭. ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং তাঁর ফিকহি মর্যাদা আলোচনা কর।]
উত্তর
পরিচয়: ইয়াকূব ইবনে ইবরাহিম আল-আনসারী, যিনি ইমাম আবু ইউসুফ (১১৩-১৮২ হি.) নামে খ্যাত। তিনি ছিলেন ইমাম আবু হানিফার প্রধান শীর্ষ ছাত্র এবং আব্বাসীয় খেলাফতের প্রথম ‘কাযিউল কুযাত’ (প্রধান বিচারপতি)।
ফিকহি অবদান:
- কিতাবুল খারাজ (كتاب الخراج) প্রণয়ন: খলিফা হারুনুর রশীদের অনুরোধে ইসলামি রাষ্ট্রের ভূমি রাজস্ব ও অর্থনৈতিক আইনের ওপর পৃথিবীর সর্বপ্রথম বিধিবদ্ধ মাস্টারপিস গ্রন্থ রচনা করেন।
- হানাফি মাযহাবের বিস্তার: প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি যোগ্য ফকিহদের বিভিন্ন প্রদেশে বিচারক নিয়োগ করে হানাফি ফিকহকে রাষ্ট্রীয় আইনি মর্যাদা দেন।
٨- اذكر عشرين آية من الآيات المحكمات في القرآن الكريم-
[৮. পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত বিশটি মুহকাম (সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন) আয়াত উল্লেখ কর।]
উত্তর
মুহকাম আয়াত হলো যার অর্থ ও বিধান সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট এবং যাতে কোনো ব্যাখ্যার অস্পষ্টতা নেই। বিশটি দৃষ্টান্তমূলক বিষয়ভিত্তিক মুহকাম আয়াত:
- সূরা আল-ইখলাস: ১ (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ – আল্লাহর একত্ববাদ)
- সূরা আল-বাকারা: ২৭৫ (وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا – ব্যবসা হালাল, সুদ হারাম)
- সূরা আল-বাকারা: ৪৩ (وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ – নামাজ ও যাকাতের আদেশ)
- সূরা আল-বাকারা: ১৮৩ (كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ – রোজার বিধান)
- সূরা আল-বাকারা: ১৮০ (পিতা-মাতার প্রতি সদয় আচরণের নির্দেশ)
- সূরা আল-ইসরা: ৩২ (وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا – ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না)
- সূরা আল-মায়েদা: ৯০ (মদ ও জুয়া হারাম হওয়ার আয়াত)
- সূরা আন-নিসা: ১১ (সন্তানের মাঝে মিরাস বণ্টনের আয়াত)
- সূরা আন-নিসা: ৩ (চার বিয়ে পর্যন্ত শর্তযুক্ত বৈধতার আয়াত)
- সূরা আল-মায়েদা: ৩ (মৃত জীব ও শূকরের গোশত হারাম হওয়ার আয়াত)
- সূরা আল-হুজুরাত: ১২ (গীবত ও খারাপ ধারণা বর্জনের আয়াত)
- সূরা আল-হুজুরাত: ১৩ (সমগ্র মানবজাতি এক পিতা-মাতার সন্তান)
- সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭ (রাসূল বিশ্বজগতের জন্য রহমত)
- সূরা আন-নূর: ৩০ (দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশ)
- সূরা আল-আহযাব: ৫৯ (পর্দার বিধানের আয়াত)
- সূরা আল-আনআম: ১৫১ (সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা না করার নির্দেশ)
- সূরা আল-ইসরা: ২৩ (পিতা-মাতাকে ‘উহ’ শব্দ না বলার নির্দেশ)
- সূরা আত-তাওবাহ: ৬০ (যাকাত বণ্টনের আটটি খাতের আয়াত)
- সূরা আল-মায়েদা: ৩৮ (চোরের হাত কাটার দণ্ডবিধি)
- সূরা আলে ইমরান: ১৪৪ (মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল ছাড়া কিছু নন)
مجموعة (ج) [أصول الفقه – أسئلة موسعة / বিভাগ ‘গ’ – উসুলুল ফিকহ রচনামূলক]
মান: ১০ × ২ = ২০ (যেকোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
٩- عرّف الإجماع واذكر مشروعيته وشروطه وأنواعه وحجيته-
[৯. ইজমার সংজ্ঞা দাও এবং এর শরয়ি প্রামাণিকতা, শর্তাবলী, প্রকারভেদ ও হুজ্জিয়াত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি শরীয়তের তৃতীয় অকাট্য মূল দলিল হলো ‘আল-ইজমা’ (الإجماع)। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর উম্মাহর সামগ্রিক ঐক্য ও ভুলভ্রান্তি থেকে সুরক্ষার ঐশী রক্ষাকবচ হিসেবে ইজমা বিশ্ব ইতিহাসের অনন্য গণতান্ত্রিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থা।
ইজমার সংজ্ঞা ও প্রামাণিকতা
পারিভাষিক অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর যেকোনো যুগে কোনো একটি শরয়ি বিধানের ওপর উম্মতে মুহাম্মদীর সকল জীবিত মুজতাহিদ ফকিহগণের সর্বসম্মত ঐক্যমতকে ইজমা বলে।
শরয়ি দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَا تَجْتَمِعُ أُمَّتِي عَلَى ضَلَالَةٍ
“আমার উম্মত কখনো ভ্রষ্টতা বা ভুলের ওপর একমত হবে না।” (তিরমিজি)
ইজমার শর্তাবলী ও প্রকারভেদ
- শর্তাবলী: মুজতাহিদগণের সর্বসম্মতি হতে হবে, সংশ্লিষ্ট যুগের সকল ফকিহ জীবিত থাকতে হবে এবং কুরআন বা সুন্নাহর কোনো একটি প্রমাণিত শরয়ি ভিত্তি থাকতে হবে।
- প্রকারভেদ: ১. ইজমায়ে সরীহ (সকল মুজতাহিদ প্রকাশ্যে মৌখিক সম্মতি প্রকাশ করা—অকাট্য দলিল), এবং ২. ইজমায়ে সুকূতী (একদল ফতোয়া দেওয়ার পর অন্যরা জেনেও কোনো আপত্তি না করে নীরব থাকা—হানাফি ফিকহে দলিলযোগ্য)।
উপসংহার
সাহাবিদের যুগে হযরত আবু বকরের খেলাফত নির্বাচন এবং পবিত্র কুরআন গ্রন্থাকারে সংকলন ইজমার আলোকেই সম্পন্ন হয়েছিল।
١٠- ما هي السنة؟ وبيّن أقسامها من حيث الاتصال والانقطاع عند الأصوليين-
[১০. উসুলবিদদের নিকট সুন্নাহর পরিচয় দাও এবং সনদের ধারাবাহিকতা ও বিচ্ছিন্নতার দিক থেকে এর প্রকারভেদ ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
উসুলুল ফিকহে কুরআনের পর শরীয়তের দ্বিতীয় বিধিবদ্ধ আইনগত উৎস হলো সুন্নাহ। উসুলবিদগণ সুন্নাহকে তার সনদের শক্তির ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছেন।
সুন্নাহর সংজ্ঞা
উসুলবিদদের পরিভাষায়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কুরআন ব্যতীত শরীয়তের অনুসরণীয় আইন হিসেবে প্রমাণিত প্রতিটি বাণী (ক্বওল), কর্ম (ফেল) ও মৌনসম্মতি (তাক্বরীর)-কে সুন্নাহ বলে।
সনদের ধারাবাহিকতার (الاتصال) দিক থেকে সুন্নাহর প্রকারভেদ
- মুতাওয়াতির (المتواتر): প্রতিটি স্তরে বিপুল সংখ্যক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত, যা নিশ্চিত অকাট্য জ্ঞান দান করে। অস্বীকারকারী কাফির।
- মাশহুর (المشهور – হানাফি উসুলে): যা সাহাবি যুগে খবরে ওয়াহিদ ছিল, কিন্তু তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈ যুগে এসে মুতাওয়াতিরের সমতুল্য ব্যাপকতা লাভ করেছে। এটি অন্তরে সুদৃঢ় প্রশান্তি দান করে।
- খবরে ওয়াহিদ (خبر الواحد): যা প্রতিটি স্তরে এক, দুই বা অল্পসংখ্যক রাবী দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। সহিহ হলে আমল করা ওয়াজিব।
সনদের বিচ্ছিন্নতার (الانقطاع) দিক থেকে প্রকারভেদ
- ইনক্বিতায়ে জাহির (প্রকাশ্য বিচ্ছিন্নতা): মুআল্লাক, মুরসাল, মু’দাল ও মুনকাতি’—যেখানে রাবীর বাদ পড়া স্পষ্ট ধরা পড়ে।
- ইনক্বিতায়ে বাতেন (গোপন বিচ্ছিন্নতা): মুদাল্লাস এবং মুরসালে খফী—যেখানে গভীর গবেষণা ছাড়া রাবীর বাদ পড়া বোঝা যায় না।
উপসংহার
সুন্নাহর এই উসুলি বিন্যাস মাসআলা ইস্তিম্বাত বা আইন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দলিলের অগ্রাধিকার নিরূপণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
١١- بيّن حجية القياس نقلا وعقلا واشرح أركانه وشروط العلة-
[১১. কুরআন, হাদিস ও যুক্তির আলোকে কিয়াসের প্রামাণিকতা প্রমাণ কর এবং এর রুকন ও ইল্লতের শর্তাবলী ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
নতুন নতুন উদ্ভাবিত পরিস্থিতির আইনি সমাধানের জন্য কিয়াস হলো শরীয়তের চতুর্থ সর্বসম্মত মূল দলিল। কুরআন ও হাদিসের النصوص (মূলপাঠ) সীমিত, কিন্তু যুগোপযোগী মানবীয় সমস্যা অসীম। তাই কিয়াসের গতিশীল বিজ্ঞান শরীয়তকে চিরনবীন রাখে।
কিয়াসের প্রামাণিকতা (حجية القياس)
- পবিত্র কুরআন: আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: “হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।” (সূরা আল-হাশর: ২)। শিক্ষা গ্রহণ মানেই একটির সাথে অপরটির সাদৃশ্য মিলিয়ে বিচার করা।
- সুন্নাহর দলিল: হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে বিচারক করে পাঠানোর সময় তিনি বলেছিলেন: “আমি কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহতে না পেলে নিজের রায় ও ইজতিহাদ প্রয়োগ করব।” রাসূল (সা.) তাঁর এই রায় অনুমোদন করেছিলেন।
- যৌক্তিক প্রমাণ (আকল): বুদ্ধিমান মানুষ মাত্রই জানে যে একই ধরনের অসুস্থতায় একই ধরনের ওষুধ কাজ করে। শরীয়তের যে কারণে একটি বস্তুকে হারাম করা হয়েছে, সেই একই কারণ অন্য বস্তুতে থাকলে তা-ও সমভাবে হারাম হবে।
কিয়াসের চারটি রুকন এবং ইল্লতের শর্তাবলী
চারটি রুকন: ১. আসল (মূল বস্তু), ২. ফার’ (শাখা বস্তু), ৩. হুকমুল আসল (মূলের বিধান), এবং ৪. ইল্লত (অভিন্ন কার্যকর কারণ)। যেমন: মদ (আসল) নেশা সৃষ্টি করে (ইল্লত) বলে হারাম (হুকুম); অতএব হালের ইয়াবাও (ফার’) নেশা সৃষ্টির কারণে হারাম।
ইল্লতের আবশ্যকীয় শর্তাবলী (شروط العلة):
- ইল্লতটি সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য (ওয়াদিহ) হতে হবে; কোনো অস্পষ্ট বা গোপন বিষয়কে ইল্লত বানানো যাবে না।
- ইল্লতটি সুনির্দিষ্ট ও সুপরিমিত (মুনদ্বাবিত) হতে হবে।
- ইল্লতটি মূল বিধানের সাথে সংগতিপূর্ণ ও মানবকল্যাণমুখী (মুনাসিব) হতে হবে।
- ইল্লতটি কেবল আসলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ (ক্বাসিরাহ) না হয়ে অন্যান্য বিষয়েও প্রসারযোগ্য (মুতা’আদ্দিয়া) হতে হবে।
উপসংহার
কিয়াস শরীয়তের মূলনীতি অক্ষুণ্ণ রেখে সমকালীন নতুন নতুন জটিল সমস্যার সমাধান উপহার দেয়।
١٢- عرّف الصريح وبيّن أقسامه مع الأمثلة-
[১২. উসুলুল ফিকহের পরিভাষায় ‘সরীহ’ (সুস্পষ্ট বক্তব্য)-এর সংজ্ঞা দাও এবং উদাহরণসহ এর প্রকারভেদ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
উসুলুল ফিকহে শব্দের অর্থ প্রকাশের স্পষ্টতার দিক থেকে শব্দকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: ‘সরীহ’ (الصريح – যা নিজের অর্থ প্রকাশে সম্পূর্ণ স্পষ্ট) এবং ‘কিনায়াহ’ (الكناية – যা রূপক বা অস্পষ্ট)। আইনি চুক্তির ক্ষেত্রে সরীহ শব্দের প্রভাব অপরিসীম।
সরীহের সংজ্ঞা (تعريف الصريح)
পারিভাষিক অর্থ: যে শব্দ দ্বারা যে অর্থটি বোঝানো উদ্দেশ্য, তা শোনার সাথে সাথেই শ্রোতার মস্তিষ্কে কোনো চিন্তা-ভাবনা বা নিয়তের অনুসন্ধান ছাড়াই স্পষ্টভাবে ভেসে ওঠে, তাকে ‘সরীহ’ বলে (ما ظهر المراد منه ظهورا بينا بحيث لا يحتاج إلى نية বা قرينة)।
সরীহের প্রকারভেদ ও উদাহরণ
- উর্ফে আম বা সাধারণ প্রথাভিত্তিক সরীহ:
যে শব্দগুলো সমাজে একক নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার হতে হতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যেমন: বেচাকেনায় “আমি তোমার কাছে এই বাড়িটি বিক্রি করলাম” এবং অপরজন বলল “আমি ক্রয় করলাম”। এখানে নিয়ত না থাকলেও চুক্তি কার্যকর হয়ে যায়। - পারিবারিক আইনে সরীহ (তালাক ও নিকাহ):
স্বামী যদি স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে বলে: “আমি তোমাকে তালাক দিলাম” (أنت طالق), তবে স্বামীর নিয়ত তালাকের থাক বা না থাক, কিংবা সে ঠাট্টা করে বললেও তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ، وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ
“তিনটি বিষয় এমন যার বাস্তবও বাস্তব এবং ঠাট্টাও বাস্তব: বিবাহ, তালাক এবং তালাক প্রত্যাহার।” (আবু দাউদ ও তিরমিজি)
উপসংহার
সরীহ শব্দে কোনো নিয়তের ব্যাখ্যার অবকাশ থাকে না; এটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথেই শরয়ি হুকুম অনিবার্যভাবে কার্যকর হয়ে যায়।
مجموعة (د) [أصول الفقه – أسئلة موجزة / বিভাগ ‘ঘ’ – উসুলুল ফিকহ সংক্ষিপ্ত]
মান: ৫ × ৪ = ২০ (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)
١٣- عرّف أصول الفقه وبيّن موضوعه وغرضه-
[১৩. উসুলুল ফিকহের সংজ্ঞা দাও এবং এর মূল বিষয়বস্তু ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আলোচনা কর।]
উত্তর
সংজ্ঞা: উসুলুল ফিকহ হলো এমন কতগুলো সাধারণ মূলনীতির জ্ঞান, যার মাধ্যমে শরীয়তের বিস্তারিত দলিল (কুরআন, সুন্নাহ ইত্যাদি) থেকে ব্যবহারিক ফিকহি বিধানসমূহ উদ্ভাবন করা যায়।
বিষয়বস্তু (موضوعه): শরীয়তের মৌলিক দলিলসমূহ (আল-আদিল্লাতুশ শারয়িয়্যাহ) এবং কীভাবে তা থেকে আহকাম বের করা যায়।
উদ্দেশ্য ও ফায়দা: সঠিক পদ্ধতিতে কুরআন-হাদিস বুঝে ইজতিহাদ করা এবং মনগড়া ভুল ব্যাখ্যা থেকে দ্বীনকে সুরক্ষা করা।
١٤- من دون أصول الفقه أولا واذكر خمس مؤلفات فيه-
[১৪. উসুলুল ফিকহ শাস্ত্রের প্রথম সংকলক কে ছিলেন? এবং এ শাস্ত্রের পাঁচটি বিখ্যাত কিতাবের নাম লেখ।]
উত্তর
প্রথম সংকলক: ইলমে উসুলুল ফিকহের ওপর সর্বপ্রথম স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করে এ শাস্ত্রের নিয়মতান্ত্রিক ভিত্তি স্থাপন করেন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস আশ-শাফেয়ী (রহ.) (১৫০-২০৪ হি.)। তাঁর রচিত বিশ্বখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘আর-রিসালাহ’ (الرسالة)।
এ শাস্ত্রের পাঁচটি বিখ্যাত কিতাব:
- আর-রিসালাহ: ইমাম শাফেয়ী (রহ.)।
- আল-মুসতাসফা: ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.)।
- উসুলুল বাযদাবী: ইমাম ফখরুল ইসলাম আল-বাযদাবী (রহ.) (হানাফি উসুলের মূল ভিত্তি)।
- আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম: আল্লামা আমেদী (রহ.)।
- উসুলুশ শাশী: ইমাম নিযामुদ্দীন আশ-শাশী (রহ.)।
١٥- عرّف الاستحسان واذكر أقسامه عند الحنفية-
[১৫. হানাফি ফিকহের আলোকে ‘ইস্তিহসান’-এর সংজ্ঞা দাও এবং এর প্রকারভেদ উল্লেখ কর।]
উত্তর
সংজ্ঞা: কোনো স্পষ্ট ও বাহ্যিক কিয়াস (কিয়াসে জলী)-এর বিধান ত্যাগ করে আরও শক্তিশালী কোনো সূক্ষ্ম প্রমাণ (যেমন স্পষ্ট নস, উম্মতের ইজমা বা তীব্র জরুরত)-এর ভিত্তিতে অপেক্ষাকৃত সহজ ও কল্যাণকর বিধান গ্রহণ করাকে ‘ইস্তিহসান’ বলে।
প্রধান প্রকারভেদ:
- নসভিত্তিক ইস্তিহসান: রোজা অবস্থায় ভুলে কিছু খেয়ে ফেললে সাধারণ কিয়াসে রোজা ভাঙার কথা, কিন্তু হাদিসের নস অনুযায়ী রোজা ভাঙবে না।
- ইজমাইভিত্তিক ইস্তিহসান: কারিগরকে দিয়ে অর্ডার দিয়ে জুতো বা কাপড় বানানোর চুক্তি (ইস্তিসনা) পণ্যহীনতার কিয়াসে বাতিল হওয়ার কথা, কিন্তু উম্মতের দীর্ঘদিনের ইজমার ভিত্তিতে তা বৈধ।
- জরুরত বা প্রয়োজনীয়তাভিত্তিক ইস্তিহসান: সাধারণ কিয়াসে কূপের নাপাক দূর করা অসম্ভব হওয়ার কথা হলেও মানুষের পানির তীব্র প্রয়োজনে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি ফেললে তা পবিত্র গণ্য হয়।
١٦- تحدث عن نشأة علم أصول الفقه وتطوره-
[১৬. উসুলুল ফিকহ শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখ।]
উত্তর
উসুলুল ফিকহের ঐতিহাসিক বিকাশ তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত:
- সাহাবি ও তাবেঈ যুগ: এ যুগে কোনো আনুষ্ঠানিক গ্রন্থ না থাকলেও সাহাবিরা কুরআন ও সুন্নাহর ভাষা ও প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বুঝে বিধান দিতেন।
- ইমাম শাফেয়ী ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি (২য় শতক): ইমাম শাফেয়ী ‘আর-রিসালাহ’ লিখে আম, খাস, নাসিখ, মানসূখ ও কিয়াসের নিয়ম বিধিবদ্ধ করেন।
- পদ্ধতিগত বিভক্তি (৩য় শতক পরবর্তী): পরবর্তীতে এ শাস্ত্রে দুটি প্রধান ধারার বিকাশ ঘটে:
- তারীক্বাতুল মুতাকাল্লিমীন (শাফেয়ী ধারা): বিশুদ্ধ যুক্তিনির্ভর তত্ত্বীয় মূলনীতি রচনা।
- তারীক্বাতুল ফুক্বাহা (হানাফি ধারা): ইমামদের প্রদত্ত ফতোয়া ও মাসআলা বিশ্লেষণ করে তার ভেতর থেকে মূলনীতি উদ্ভাবন করা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘বাইয়ে মুরাবাহা’ ও ‘বাইয়ে সালাম’-এর মূল পার্থক্য কী?
মুরাবাহা হলো আসল ক্রয়মূল্য জানিয়ে নির্দিষ্ট লাভে পণ্য বিক্রি করা; আর বাইয়ে সালাম হলো ভবিষ্যতে পণ্য সরবরাহের শর্তে ক্রেতা কর্তৃক অগ্রিম সম্পূর্ণ নগদ মূল্য পরিশোধ করা।
২. গৃহপালিত গাধার দুধ পান করার হুকুম কী?
চার মাযহাবের সকল বিজ্ঞ ফকিহর সর্বসম্মত মতে গৃহপালিত গাধার গোশত এবং দুধ পান করা সম্পূর্ণ হারাম; কারণ এটি অপবিত্র এবং খায়বারের যুদ্ধে রাসূল (সা.) এটি নিষিদ্ধ করেছেন।
৩. উসুলুল ফিকহের সর্বপ্রথম লিখিত গ্রন্থ কোনটি?
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) রচিত ‘আর-রিসালাহ’ হলো ইসলামি ইতিহাসের সর্বপ্রথম নিয়মতান্ত্রিক উসুলুল ফিকহের গ্রন্থ।
৪. কিয়াসের চারটি মৌলিক রুকন কী কী?
কিয়াসের চারটি রুকন হলো: ১. আল-আসল (মূল বিষয়), ২. আল-ফার’ (শাখা বিষয়), ৩. হুকমুল আসল (মূলের হুকুম), এবং ৪. আল-ইল্লত (উভয়ের মাঝে বিদ্যমান অভিন্ন কার্যকর কারণ)।
৫. হানাফি ফিকহে ‘ইস্তিহসান’ কেন ব্যবহার করা হয়?
কঠোর বাহ্যিক কিয়াসের কারণে মানুষের জীবনে যাতে অতিরিক্ত জটিলতা বা ক্ষতি না হয়, সেজন্য আরও শক্তিশালী নস বা জরুরতের ভিত্তিতে সহজতর বিধান গ্রহণের জন্য ইস্তিহসান প্রয়োগ করা হয়।
৬. ‘সরীহ’ শব্দে তালাক দিলে কি নিয়তের প্রয়োজন হয়?
না, সরীহ বা সুস্পষ্ট শব্দে (যেমন: “তোমাকে তালাক দিলাম”) তালাক উচ্চারণ করলে স্বামীর মনে তালাকের নিয়ত থাক বা না থাক, এমনকি ঠাট্টা করে বললেও তালাক কার্যকর হয়ে যায়।