পরীক্ষা কোড: 203 | প্রশ্নপত্র কোড: 088
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
سير الأنبياء ومناهج دعوتهم في القرآن
[সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজু দাওয়াতিহিম ফিল কুরআন]
বিষয় কোড: 203302
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – রচনামূলক প্রশ্নাবলী]
মান: ১৫ × ৪ = ৬০
١- بيّن مفهوم الرسالة والحكمة في إرسال الرسل مفصلا-
[১. রিসালাতের ধারণা এবং রাসূল প্রেরণের হিকমত ও তাৎপর্য বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
মানবজাতির সৃষ্টি ও হেদায়েতের ইতিহাসে রিসালাত একটি অবিচ্ছেদ্য এবং কেন্দ্রীয় অধ্যায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি; বরং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণের পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। মানব মস্তিষ্ক বা বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে আল্লাহর সত্তা ও সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য পূর্ণাঙ্গভাবে জানা অসম্ভব। তাই আসমানি ওহী ও রিসালাতের আলো মানুষের জন্য অপরিহার্য দিশারি।
রিসালাতের পরিচয় ও ধারণা (مفهوم الرسالة)
শাব্দিক অর্থ: ‘রিসালাত’ (الرسالة) শব্দটি আরবি ‘রাসালা’ (رسل) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ বার্তা বহন করা, পয়গাম পৌঁছানো, পত্র, প্রতিনিধিত্ব করা ইত্যাদি। পরিভাষায় الرسول (রাসূল) হলেন এমন ব্যক্তি যাকে কোনো বার্তা দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।
পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হেদায়েত ও পথপ্রদর্শনের জন্য ওহীর মাধ্যমে যে বিশেষ আসমানি দায়িত্ব ও বিধান দিয়ে কোনো পুণ্যবান বান্দাকে প্রেরণ করেন, তাকে রিসালাত বলে। যিনি এই বার্তা পৌঁছে দেন তাকে রাসূল বা পয়গম্বর বলা হয়। ইমাম রাগেব আল-ইসফাহানী (রহ.) বলেন: রিসালাত হলো আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ঐশী বার্তা যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব।
রাসূল প্রেরণের হিকমত ও তাৎপর্য (الحكمة في إرسال الرسل)
মহান প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কোনো কাজ উদ্দেশ্যহীনভাবে করেন না। রাসূল প্রেরণের পেছনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিকমতসমূহ নিম্নরূপ:
- আল্লাহর তাওহিদ ও দাসত্বের পথ প্রদর্শন: মানবজাতির মূল সৃষ্টিগত লক্ষ্য হলো আল্লাহর ইবাদত। কিন্তু আল্লাহকে কীভাবে ডাকতে হবে, কীভাবে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে—তা মানুষ নিজের বুদ্ধিতে নির্ধারণ করতে পারে না। আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
“আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।” (সূরা আন-নাহল: ৩৬)
- হুজ্জত বা অকাট্য যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা: মানুষ যেন কিয়ামতের দিন বলতে না পারে যে, আমাদের কাছে কোনো সতর্ককারী বা হেদায়েতের বার্তা পৌঁছেনি। রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে মানুষের যাবতীয় ওজর খণ্ডন করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ
“সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রাসূলগণকে প্রেরণ করা হয়েছে, যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে।” (সূরা আন-নিসা: ১৬৫)
- আদর্শ ও বাস্তব নমুনা (উসওয়াহ) উপস্থাপন: শুধু লিখিত বিধান মানুষের স্বভাব সংশোধনে যথেষ্ট নয়। তাই বাস্তব জীবনে আল্লাহর নির্দেশাবলি কীভাবে পালন করতে হবে, তার জীবন্ত আদর্শ হিসেবে রাসূলগণকে প্রেরণ করা হয়েছে।
- আত্মার পরিশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধন: মানুষের আত্মাকে পঙ্কিলতা, কুপ্রবৃত্তি ও শিরক থেকে পবিত্র করে উৎকৃষ্ট আখলাকে ভূষিত করা। যেমন কুরআনে এসেছে: “তিনি তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।” (সূরা আল-জুমুআ: ২)
- ইনসাফ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সমাজে শান্তি, সুবিচার ও ইনসাফপূর্ণ শাসনব্যবস্থা কায়েম করা রাসূলগণের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
উপসংহার
রিসালাত হলো মহান আল্লাহর করুণার অনুপম নিদর্শন। রাসূলদের প্রদর্শিত পথ অবলম্বন ছাড়া মানবতার মুক্তি অসম্ভব। খাতামুন্নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার পূর্ণতা সাধিত হয়েছে।
٢- اذكر أسماء الأنبياء المذكورين في القرآن الكريم واكتب نبذة عن حياة أحدهم-
[২. পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত নবীগণের নাম উল্লেখ কর এবং তাঁদের মধ্য থেকে একজনের জীবনবৃত্তান্ত সংক্ষেপে লেখ।]
ভূমিকা
মহান আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েতের জন্য বহু নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁদের সংখ্যা লক্ষাধিক হলেও পবিত্র কুরআনুল কারীমে তাঁদের মধ্য থেকে বিশিষ্ট ২৫ জন নবীর নাম সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের জীবন ও ত্যাগ গোটা মানবজাতির জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর।
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ২৫ জন নবীর নাম
কুরআনে যে ২৫ জন মহান নবীর নাম এসেছে, তাঁরা হলেন:
- হযরত আদম (আ.) – آدم عليه السلام
- হযরত ইদরিস (আ.) – إدريس عليه السلام
- হযরত নূহ (আ.) – نوح عليه السلام
- হযরত হূদ (আ.) – هود عليه السلام
- হযরত সালেহ (আ.) – صالح عليه السلام
- হযরত ইবরাহিম (আ.) – إبراهيم عليه السلام
- হযরত লূত (আ.) – لوط عليه السلام
- হযরত ইসমাইল (আ.) – إسماعيل عليه السلام
- হযরত ইসহাক (আ.) – إسحاق عليه السلام
- হযরত ইয়াকূব (আ.) – يعقوب عليه السلام
- হযরত ইউসুফ (আ.) – يوسف عليه السلام
- হযরত আইয়ূব (আ.) – أيوب عليه السلام
- হযরত শুআইব (আ.) – شعيب عليه السلام
- হযরত মূসা (আ.) – موسى عليه السلام
- হযরত হারূন (আ.) – هارون عليه السلام
- হযরত দাউদ (আ.) – داود عليه السلام
- হযরত সুলাইমান (আ.) – سليمان عليه السلام
- হযরত ইলিয়াস (আ.) – إلياس عليه السلام
- হযরত আল-ইয়াসা’ (আ.) – اليسع عليه السلام
- হযরত ইউনুস (আ.) – يونس عليه السلام
- হযরত যুলকিফল (আ.) – ذو الكفل عليه السلام
- হযরত যাকারিয়া (আ.) – زكريا عليه السلام
- হযরত ইয়াহইয়া (আ.) – يحيى عليه السلام
- হযরত ঈসা (আ.) – عيسى عليه السلام
- হযরত মুহাম্মদ (সা.) – محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনবৃত্তান্ত (نبذة عن حياة إبراهيم عليه السلام)
জন্ম ও বংশপরিচয়: হযরত ইবরাহিম (আ.) আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে তৎকালীন ইরাকের ব্যবিলন (উর) নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল আজর (বা তারাহ)।
তাওহিদের সন্ধান ও প্রতিবাদ: তাঁর সমাজ ও পরিবারের লোকেরা মূর্তিপূজা এবং নক্ষত্রপূজায় লিপ্ত ছিল। শৈশবেই তিনি চিন্তা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্রের পরিবর্তনশীলতা দেখে এক অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তার সন্ধান লাভ করেন। তিনি প্রকাশ্যে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং ব্যবিলনের মন্দিরের মূর্তিগুলো ভেঙে একক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেন।
নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ: জালিম শাসক নমরুদ তাঁকে বিশাল অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে আগুন তাঁর জন্য শান্তিদায়ক ও শীতল বাগানে পরিণত হয়: “হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের ওপর শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৬৯)
হিজরত ও মহান কুরবানি: তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিসরে হিজরত করেন। বার্ধক্যে আল্লাহ তাঁকে পুত্র ইসমাইলকে দান করেন। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে শিশু ইসমাইল ও স্ত্রী হাজেরাকে মক্কার নির্জন প্রান্তরে রেখে আসেন এবং মহান আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে প্রিয় পুত্রকে কুরবানি করতে প্রস্তুত হন।
কাবা গৃহ নির্মাণ ও উপাধি: হযরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্র ইসমাইলকে সাথে নিয়ে মক্কায় পবিত্র বায়তুল্লাহ বা কাবা গৃহ পুনঃনির্মাণ করেন। তিনি ‘খালিলুল্লাহ’ (আল্লাহর বন্ধু) এবং ‘আবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের পিতা) উপাধিতে ভূষিত হন।
উপসংহার
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন হলো পরম ত্যাগ, অবিচল তাওহিদ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা মুসলিম জাতির আদর্শ মিল্লাত হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত স্বীকৃত।
٣- ما هي وظائف الأنبياء والرسل؟ واشرح أسلوب دعوتهم في ضوء القرآن-
[৩. নবী ও রাসূলগণের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী কী? কুরআনের আলোকে তাঁদের দাওয়াতের কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
আল্লাহ তায়ালা নবী ও রাসূলগণকে মানবজাতির জন্য শিক্ষক, পথপ্রদর্শক ও সংস্কারকরূপে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা সমাজ থেকে জাহিলিয়্যাত দূর করে ঐশী ইনসাফ কায়েম করার গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের দাওয়াতি পদ্ধতি ছিল প্রজ্ঞা, মমতা ও যুক্তিনির্ভর।
নবী ও রাসূলগণের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ (وظائف الأنبياء)
- তাবলিগ বা ঐশী বাণী পৌঁছানো (تبليغ الرسالة): ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রতিটি হুকুম-আহকাম কোনো প্রকার কম-বেশি না করে অবিকল মানুষের নিকট পৌঁছে দেওয়া। আল্লাহ বলেন: “হে রাসূল! আপনার রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দিন।” (সূরা আল-মায়েদা: ৬৭)
- তাওহিদের আহ্বান ও শিরক নির্মূল (الدعوة إلى التوحيد): আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা এবং সর্বপ্রকার মূর্তি, প্রকৃতি ও ব্যক্তিপূজা খণ্ডন করা।
- তিলাওয়াতে আয়াত ও কিতাবের তা’লীম (تعليم الكتاب والحكمة): আসমানি কিতাব পাঠ করে শোনানো এবং তার নিহিত প্রজ্ঞা ও আইন কানুন শিক্ষা দেওয়া।
- তাযকিয়াতুন নুফুস বা আত্মশুদ্ধি (تزكية النفوس): মানুষের অন্তর থেকে হিংসা, অহংকার, লোভ ও নোংরা প্রবৃত্তি দূর করে পবিত্র চরিত্রে গঠন করা।
- ন্যায়বিচার ও ইনসাফ কায়েম (إقامة القسط والعدل): সমাজে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং মজলুমের অধিকার আদায় করা।
কুরআনের আলোকে আম্বিয়াগণের দাওয়াতি কর্মপদ্ধতি (أسلوب دعوتهم)
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আম্বিয়াগণের দাওয়াতি পদ্ধতির মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:
- ১. কওমের নিজস্ব ভাষায় দাওয়াত: সকল নবী তাঁদের জাতির নিজস্ব মাতৃভাষায় কথা বলতেন, যাতে মানুষ সহজে দাওয়াত অনুধাবন করতে পারে: “আমি কোনো রাসূলকেই তার স্বজাতির ভাষা ছাড়া প্রেরণ করিনি, যাতে সে তাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।” (সূরা ইবরাহিম: ৪)
- ২. নিঃস্বার্থ সেবা ও কোনো প্রতিদান না চাওয়া: আম্বিয়াগণ পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করতেন যে, তাঁরা কোনো পার্থিব বিনিময় চান না:
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ
“আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না; আমার প্রতিদান তো কেবল বিশ্বজগতের রবের নিকট রয়েছে।” (সূরা আশ-শুআরা: ১০৯)
- ৩. হিকমত ও কোমল আচরণ: কঠোরতা না দেখিয়ে ভালোবাসা ও কোমল উপদেশ দ্বারা মানুষকে আকর্ষণ করতেন। মূসা ও হারূনকে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন: “তোমরা ফেরাউনের সাথে নরম ভাষায় কথা বলবে।” (সূরা ত্বহা: ৪৪)
- ৪. যৌক্তিক বিতর্ক ও উপমার ব্যবহার: যুক্তিপূর্ণ প্রমাণের সাহায্যে ভ্রান্ত বিশ্বাস খণ্ডন করতেন এবং সাধারণ মানুষের বোধগম্য চমৎকার উপমা পেশ করতেন।
- ৫. চরম ধৈর্য ও অবিচলতা: শত অত্যাচার, উপহাস ও নিপীড়নের মুখেও দাওয়াতের পথ থেকে একচুলও সরে যাননি।
উপসংহার
নবী-রাসূলগণের এই বহুমুখী দায়িত্ব ও দাওয়াতি পদ্ধতিই হলো কিয়ামত পর্যন্ত সকল দায়ী ও ইসলামি কর্মীদের জন্য একমাত্র অনুসরণীয় পথরেখা।
٤- ناقش مناهج دعوة النبي محمد ﷺ في ضوء القرآن والسنة-
[৪. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতি কর্মপন্থা আলোচনা কর।]
ভূমিকা
সাইয়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দায়ী। তিনি আইয়ামে জাহিলিয়্যাতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতাকে মাত্র ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সুসভ্য জাতিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাঁর এই দাওয়াতি বিপ্লবের ভিত্তি ছিল কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত অলৌকিক কর্মপন্থা।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি কর্মপন্থার রূপরেখা
- পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি (المنهج التدريجي):
দাওয়াতের ক্ষেত্রে তিনি ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছেন:- গোপন দাওয়াত (الدعوة السرية): নবুওয়াতের প্রথম ৩ বছর অত্যন্ত গোপনে বিশ্বস্ত ও নিকটতম ব্যক্তিদের মাঝে দাওয়াত দেন (যেমন খাদিজা, আবু বকর, আলী রা.)।
- নিকটাত্মীয়দের মাঝে দাওয়াত: আল্লাহর নির্দেশ “আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন” (সূরা আশ-শুআরা: ২১৪) অনুযায়ী সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কোরাইশদের প্রকাশ্যে আহ্বান জানান।
- সাধারণ প্রকাশ্য দাওয়াত: মক্কার অলিতে-গলিতে ও হজের মৌসুমে আগত বিভিন্ন গোত্রের তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে সত্য প্রচার করেন।
- আন্তর্জাতিক দাওয়াত: মদিনা সনদের পর পারস্য, রোম, আবিসিনিয়া ও মিসরের সম্রাটদের কাছে কূটনৈতিক চিঠি প্রেরণ করেন।
- হিকমত ও প্রজ্ঞার ব্যবহার (الحكمة والموعظة الحسنة):
আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী মানুষের জ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক স্তর বুঝে কথা বলতেন। বেদুইনদের সাথে সরল ভাষায় এবং দার্শনিক বা ইহুদি পণ্ডিতদের সাথে গভীর জ্ঞানের ভিত্তিতে কথা বলতেন। - উত্তম চরিত্র ও জীবন্ত আদর্শ প্রদর্শন (القدوة الحسنة):
কথার চেয়ে কাজের প্রভাব ছিল বেশি। নবুওয়াতপূর্ব জীবনেই তিনি ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) ও ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। তাঁর অনুপম চরিত্র দেখেই শত শত কাফির ইসলাম গ্রহণ করেছিল। - কঠোরতা বর্জন ও পরম ক্ষমাশীলতা (الرحمة والعفو):
তাযায়েফের রক্তাক্ত ময়দানে ফেরেশতারা পাহাড় ধসিয়ে কাফিরদের ধ্বংস করতে চাইলেও তিনি বদদোয়া না করে দোয়া করেছিলেন: “হে আল্লাহ! আমার কওমকে ক্ষমা কর, কারণ তারা বোঝে না।” মক্কা বিজয়ের দিন চরম শত্রুদের জন্য ঘোষণা করেছিলেন সাধারণ ক্ষমা (اليوم يوم المرحمة)। - মানুষের অন্তরে আশাবাদ ও সুসংবাদ সৃষ্টি:
তিনি দাওয়াতে ভয় দেখানোর চেয়ে সুসংবাদ ও আশা দিতেন বেশি। হাদিসে এসেছে: “তোমরা সহজ কর, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিতৃষ্ণ করো না।” (সহিহ বুখারি) - সমাজ সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান:
মদিনায় হিজরতের পর তিনি মসজিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা (আসহাবে সুফ্ফা), ভ্রাতৃত্বের বন্ধন (মুয়াখাত) এবং মদিনা সনদের মাধ্যমে দাওয়াতকে রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক রূপ দেন।
উপসংহার
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি নীতি ছিল ভালোবাসা, ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও বাস্তব কর্মের এক অনুপম সমন্বয়। আধুনিক বিশ্বের জটিল সামাজিক পরিস্থিতিতে ইসলামি দাওয়াহকে সফল করতে হলে তাঁর এই সুন্নতি দাওয়াতি মানহাজের বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে বিকল্প নেই।
٥- اكتب نبذة عن حياة نوح عليه السلام واذكر مزايا دعوته لقومه-
[৫. হযরত নূহ আলাইহিস সালামের জীবনবৃত্তান্ত সংক্ষেপে লেখ এবং তাঁর কওমের প্রতি দাওয়াতের বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
হযরত নূহ (আ.) হলেন উলুল আযম (দৃঢ়সংকল্প বিশিষ্ট) রাসূলদের মধ্যে প্রথম রাসূল এবং তিনি মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা (আবুশ বাশার আস-সানী)। মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম শিরক ও মূর্তিপূজার সূচনা ঘটেছিল নূহ (আ.)-এর যুগে। তিনি দীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর নিরলসভাবে তাঁর কওমকে একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন।
হযরত নূহ (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত
বংশ ও যুগ: তিনি হযরত আদম (আ.)-এর অষ্টম বা দশম অধস্তন পুরুষ। তাঁর পিতার নাম লামাক। তৎকালীন সমাজে ওয়াদ্দ, সুওয়া’, ইয়াগূছ, ইয়াঊক ও নাসর নামক পুণ্যবান ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর মানুষ তাদের মূর্তিপূজা শুরু করে। এই শিরক থেকে রক্ষা করতে আল্লাহ নূহ (আ.)-কে নবী বানিয়ে প্রেরণ করেন।
দীর্ঘ দাওয়াতি জীবন: পবিত্র কুরআনে এসেছে: “তিনি তাদের মাঝে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ বছর কম এক হাজার বছর (৯৫০ বছর)।” (সূরা আল-আনকাবুত: ১৪)। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি অবিরাম সত্য প্রচার করেন। কিন্তু কওমের অধিকাংশ লোক তাঁর অবাধ্যতা করে। এমনকি তাঁর নিজের স্ত্রী ও এক পুত্র (কেনান) ঈমান আনেনি।
মহাপ্লাবন ও কিশতী নির্মাণ: কওমের চূড়ান্ত হঠকারিতার পর আল্লাহর নির্দেশে তিনি বিশাল নৌকা (কিশতী) নির্মাণ করেন। এরপর আল্লাহর গজব হিসেবে জমিন থেকে পানির ফোয়ারা ও আকাশ থেকে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। ফলে এক ভয়াবহ প্লাবনে সমস্ত কাফির ধ্বংস হয়ে যায় এবং নৌকায় আরোহণকারী মুষ্টিমেয় মুমিন ও জীবজন্তুর জোড়া বেঁচে যায়। জুদী পাহাড়ের চূড়ায় নৌকা নোঙর করার মাধ্যমে মানবজাতির এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়।
হযরত নূহ (আ.)-এর দাওয়াতের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
সূরা নূহ-এ বর্ণিত তাঁর দাওয়াতি পদ্ধতির অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- রাত-দিন অবিরাম দাওয়াত: তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময় বা সীমার মধ্যে দাওয়াত সীমাবদ্ধ রাখেননি: “হে আমার রব! আমি আমার সম্প্রদায়কে রাত ও দিন দাওয়াত দিয়েছি।” (সূরা নূহ: ৫)
- গোপন ও প্রকাশ্য সকল মাধ্যমের প্রয়োগ: তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে এবং গোপনে ব্যক্তিগতভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করেছিলেন।
- পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণের মেলবন্ধন: তিনি দাওয়াত দিতে গিয়ে মানুষকে তওবার ইহকালীন সুফলও দেখিয়েছিলেন—মেঘ থেকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য এবং নহর ও বাগ-বাগিচার নেকামত লাভের প্রতিশ্রুতি।
- প্রকৃতি ও সৃষ্টিজগতের নিদর্শন উপস্থাপন: আসমান, জমিন, চন্দ্র, সূর্যের সুশৃঙ্খল গতিপ্রকৃতি এবং মানুষের সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরে তাওহিদের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছিলেন।
- অসীম ধৈর্য ও সহনশীলতা: শত শত বছর ধরে কওমের মানুষের উপহাস, গালিগালাজ, কান ঢেকে রাখা ও অহংকার প্রদর্শনের মুখেও তিনি ক্ষান্ত হননি।
উপসংহার
হযরত নূহ (আ.)-এর দাওয়াতি জীবন প্রতিটি ইসলামি দায়ীর জন্য এক অনন্য পাঠশালা। কোনো অবস্থায়ই হতাশ না হয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সত্যের দাওয়াত অব্যাহত রাখাই হলো নববী চরিত্রের সারকথা।
٦- ما هي المشاكل التي واجهها النبي ﷺ في بداية الدعوة بمكة وكيف تغلب عليها؟
[৬. মক্কায় দাওয়াতের প্রাথমিক যুগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং কীভাবে তিনি তা মোকাবেলা করেছিলেন?]
ভূমিকা
মক্কায় ইসলাম প্রচারের সূচনা কোনো কুসুমাস্তীর্ণ পথ ছিল না; বরং তা ছিল চরম কণ্টকাকীর্ণ ও প্রতিকূলতায় ঘেরা। পৌত্তলিকতা, গোত্রীয় আভিজাত্য ও কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে তাওহিদের ঘোষণা দেওয়ায় কোরাইশ নেতারা নবী করিম (সা.) এবং তাঁর মুষ্টিমেয় অনুসারীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) পরম ধৈর্য ও বিচক্ষণতায় সেই সকল সংকট অতিক্রম করেছিলেন।
মক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মুখীন হওয়া প্রধান সমস্যাসমূহ
- উপহাস ও মানসিক নির্যাতন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে পাগল, জাদুকর, গণক ও কবি বলে সমাজে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হতো। তাঁর নামাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা এবং চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো।
- শারীরিক আক্রমণ ও হত্যার ষড়যন্ত্র: বায়তুল্লাহর চত্বরে নামাজরত অবস্থায় তাঁর পিঠের ওপর উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং কোরাইশ নেতারা তাঁকে হত্যার জন্য বারবার ষড়যন্ত্র করে।
- অনুসারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন: দাস ও দুর্বল সাহাবিদের ওপর কোরাইশরা অমানুষিক নির্যাতন চালাত। বিলাল (রা.)-কে তপ্ত বালুর ওপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে রাখা হতো, খাব্বাব (রা.)-কে জ্বলন্ত কয়লার ওপর শোয়ানো হতো এবং সুমাইয়া (রা.) ও ইয়াসির (রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়।
- সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট (শি’আবে আবি তালিব): নবুওয়াতের সপ্তম বর্ষে কোরাইশরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে তিন বছর পর্যন্ত শি’আবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ করে রাখে। খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সাহাবি ও শিশুরা গাছের পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করেন।
- প্রলোভন প্রদর্শন: মক্কার নেতারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ধন-সম্পদ, রাজত্ব এবং আরবের সেরা সুন্দরীর বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে দাওয়াত বন্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে।
সমস্যা মোকাবেলায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর গৃহীত পদক্ষেপ
- ১. অবিচল ঈমান ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল: সকল প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে তিনি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন: “যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদও এনে দেয়, তবুও আমি এই দ্বীনের প্রচার ত্যাগ করব না।”
- ২. দারুল আরকামে গোপন প্রশিক্ষণ: সাহাবিদের আত্মিক ও চারিত্রিক গঠনের জন্য তিনি হযরত আরকাম (রা.)-এর বাড়িকে দাওয়াতের গোপন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
- ৩. হাবশায় হিজরতের নির্দেশ: দুর্বল সাহাবিদের নিরাপত্তার জন্য তিনি আবিসিনিয়ার (হাবশা) ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান রাজা নাজ্জাশির দেশে হিজরতের অনুমতি দেন।
- ৪. তায়েফ গমন ও বহির্মুখী দাওয়াত: মক্কার পরিস্থিতি সংকুচিত হলে তিনি বিকল্প হিসেবে তায়েফ গমন করেন এবং সেখানে আঘাতপ্রাপ্ত হলেও ক্ষমার মাধ্যমে দাওয়াত জারি রাখেন।
- ৫. হজের মৌসুমে গোত্রসমূহে দাওয়াত ও আকাবার বায়াত: হজের সময় বহিরাগত গোত্রগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে ইয়াসরিবের (মদিনা) আনসারদের সাথে আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বায়াত এবং ঐতিহাসিক হিজরতের পথ উন্মুক্ত করে।
উপসংহার
মক্কার প্রতিকূলতাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈমানি শক্তি, অসাধারণ প্রজ্ঞা ও কৌশলগত দূরদর্শিতা দিয়ে জয় করেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে মদিনায় প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী]
মান: ৫ × ৪ = ২০
٧- ما الفرق بين النبي والرسول؟
[৭. নবী ও রাসূলের মধ্যে পার্থক্য কী?]
উত্তর
ইসলামি আকাইদের পরিভাষায় নবী ও রাসূল শব্দের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য বিদ্যমান:
| পার্থক্যের ক্ষেত্র | রাসূল (الرسول) | নবী (النبي) |
|---|---|---|
| শাব্দিক অর্থ | প্রেরিত ব্যক্তি বা দূত (Messenger)। | উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বা সংবাদ প্রদানকারী (Prophet)। |
| নতুন শরীয়ত ও কিতাব | যাঁর ওপর নতুন আসমানি কিতাব বা সম্পূর্ণ নতুন শরীয়ত অবতীর্ণ হয়েছে। | যিনি নতুন কিতাব পাননি; বরং পূর্ববর্তী রাসূলের কিতাব ও শরীয়তের প্রচারক ছিলেন। |
| প্রেরণের ক্ষেত্র | সাধারণত অবাধ্য, কাফির ও পথভ্রষ্ট জাতির নিকট প্রেরিত হন। | সাধারণত পূর্বের মুমিন সম্প্রদায়ের সংশোধনের জন্য প্রেরিত হতেন (যেমন বনি ইসরাইলের অধিকাংশ নবী)। |
| ব্যাপকতা | প্রত্যেক রাসূলই নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসূল নন (كل رسول نبي وليس كل نبي رسولا)। | নবীর পরিধি রাসূলের চেয়ে ব্যাপক। |
| সংখ্যা | রাসূলগণের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম (৩১৩ বা ৩১৫ জন)। | নবীগণের সংখ্যা লক্ষাধিক (প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার)। |
٨- اذكر صفات الرسول في ضوء القرآن الكريم-
[৮. কুরআনুল কারীমের আলোকে রাসূলের গুণাবলী উল্লেখ কর।]
উত্তর
পবিত্র কুরআনুল কারীমে রাসূলগণের আবশ্যকীয় ও অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলি বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
- ইসমেত বা নিষ্পাপ হওয়া (العصمة): রাসূলগণ সর্বপ্রকার কবিরা ও সগিরা গুনাহ থেকে আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত ও নিষ্পাপ।
- আমানতদারি ও সত্যবাদিতা (الأمانة والصدق): তাঁরা ওহীর বার্তা পৌঁছানো এবং ব্যক্তিগত জীবনে নিখুঁত সত্যবাদী ও পরম আমানতদার। কুরআনে তাঁদের ‘সাদিকুল ওয়াদ’ এবং ‘আমিন’ বলা হয়েছে।
- তাবলিগ বা পূর্ণাঙ্গ প্রচার (تبليغ الرسالة): আল্লাহর কোনো নির্দেশ গোপন না করে শতভাগ নির্ভুলভাবে মানুষের নিকট প্রকাশ করা।
- চরম প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা (الفطانة): তাঁরা সর্বোৎকৃষ্ট বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ও যুক্তিবোধের অধিকারী ছিলেন।
- উত্তম মানবীয় আদর্শ (الأسوة الحسنة): তাঁরা নিখুঁত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ বিশ্বনবী সম্পর্কে বলেন: “নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।” (সূরা আল-কলম: ৪)
٩- ما هي مميزات دعوة موسى عليه السلام؟
[৯. হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াতের বৈশিষ্ট্যসমূহ কী কী?]
উত্তর
হযরত মূসা (আ.) ছিলেন উলুল আযম রাসূলদের অন্যতম। তাঁর দাওয়াতের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- জালিম ও স্বৈরশাসকের মুখোমুখি হওয়া: তিনি তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে অহংকারী ও খোদাদ্রোহী শাসক ফেরাউনের রাজদরবারে সরাসরি উপস্থিত হয়ে তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছিলেন।
- নম্র কথার মাধ্যমে সূচনা: আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ফেরাউনের কাছে গিয়ে নরম ভাষায় কথা বলতে (فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا), যা দাওয়াতের প্রাথমিক নম্রতার শিক্ষা দেয়।
- সুস্পষ্ট অলৌকিক মোজেজার প্রদর্শন: লাঠি সাপে পরিণত হওয়া এবং শুভ্র হাতের ঔজ্জ্বল্য (ইয়াদে বায়যা) প্রদর্শনের মাধ্যমে জাদুকরদের ওপর সত্যের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।
- বনি ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি: শুধু আধ্যাত্মিক দাওয়াত নয়; বরং ফেরাউনের শতবর্ষের দাসত্ব থেকে একটি জাতিকে মুক্ত করে স্বাধীন ভূমিতে নিয়ে যাওয়া ছিল তাঁর আন্দোলনের অঙ্গ।
- তাওরাত কিতাবের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত প্রদান: তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে সরাসরি বাক্যালাপের মাধ্যমে তাওরাত কিতাব লাভ করেন এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে জাতিকে গড়ে তোলেন।
١٠- اكتب عن عصمة الأنبياء عليهم السلام-
[১০. আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের নিষ্পাপতা (ইসমত) সম্পর্কে লেখ।]
উত্তর
ইসমতের সংজ্ঞা: ‘ইসমত’ (عصمة) শব্দের অর্থ রক্ষা করা, হেফাজতে রাখা। ইসলামি পরিভাষায়, মহান আল্লাহ কর্তৃক নবী-রাসূলগণকে যাবতীয় কুফরি, শিরক, কবিরা গুনাহ এবং ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত চরিত্রহীনতা ও সগিরা গুনাহ থেকে মুক্ত রাখাকে ‘ইসমাতে আম্বিয়া’ বলা হয়।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা:
- নবুওয়াতপূর্ব ও পরবর্তী জীবন: নবীগণ নবুওয়াত লাভের পূর্বে এবং পরেও সর্বপ্রকার শিরক ও অশ্লীলতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ছিলেন।
- ওহী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসমত: আসমানি বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নবীগণ সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সংরক্ষিত। এতে কোনো ভুলত্রুটি হওয়া অসম্ভব: “তিনি খেয়ালখুশিমতো কথা বলেন না; এটি তো ওহী যা প্রত্যাদেশ হয়।” (সূরা আন-নাজম: ৩-৪)
- যাল্লা বা অনিচ্ছাকৃত পদস্খলন: কখনো কখনো আম্বিয়াগণের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা কোনো গুনাহ নয়; বরং উত্তম কাজের পরিবর্তে কম উত্তম কাজ করা (তর্কে আওলা), যাকে ‘যাল্লা’ বলা হয়। সাথে সাথে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে তাঁদের সংশোধন করে দিয়েছেন।
যদি নবীগণ নিষ্পাপ না হতেন, তবে মানবজাতি তাঁদের নিঃশর্ত অনুসরণ করতে পারত না এবং শরীয়তের প্রামাণিকতা বিনষ্ট হতো।
١١- اكتب نبذة عن حياة عيسى عليه السلام-
[১১. হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের জীবনবৃত্তান্ত সংক্ষেপে লেখ।]
উত্তর
অলৌকিক জন্ম: হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর এক বিশেষ কুদরতের নিদর্শন হিসেবে পিতা ছাড়া কুমারী সতীসাধ্বী হযরত মারইয়াম (আ.)-এর গর্ভ থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল লাহামে (বেথলেহেম) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দোলনায় থাকা অবস্থায়ই নিজের নবুওয়াতের সাক্ষ্য দিয়ে মায়ের পবিত্রতা ঘোষণা করেন।
নবুওয়াত ও ইনজিল কিতাব: ত্রিশ বছর বয়সে তিনি নবুওয়াত লাভ করেন। আল্লাহ তাঁকে ‘ইনজিল’ কিতাব দান করেন। তিনি বনি ইসরাইলকে তাওহিদের দিকে আহ্বান জানান এবং তাওরাতের বিকৃত বিধান সংস্কার করেন।
মোজেজাসমূহ: আল্লাহর হুকুমে তিনি কুষ্ঠরোগী ও অন্ধদের সুস্থ করতেন, মাটির পাখি বানিয়ে তাতে ফুঁ দিলে তা জীবন্ত হতো এবং মৃত মানুষকে জীবিত করতেন।
আসমানে উত্তোলন ও ভবিষ্যৎ আগমন: ইহুদিরা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে রোমানদের মাধ্যমে ক্রুশবিদ্ধ করতে উদ্যত হলে আল্লাহ তাঁকে সশরীরে জীবিত অবস্থায় দ্বিতীয় আসমানে উঠিয়ে নেন: “তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং তাদের জন্য বিভ্রম সৃষ্টি করা হয়েছিল।” (সূরা আন-নিসা: ১৫৭)। কিয়ামতের পূর্বে তিনি দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের সাদা মিনারে অবতরণ করে দাজ্জালকে নিধন করবেন এবং ন্যায়ভিত্তিক ইসলামি শাসন কায়েম করবেন।
١٢- ما هي أهداف دعوة الأنبياء عليهم السلام؟
[১২. নবী-রাসূলগণের দাওয়াতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ কী কী?]
উত্তর
নবী-রাসূলগণের দাওয়াতের মৌলিক উদ্দেশ্যসমূহ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:
- তাওহিদ প্রতিষ্ঠা: একচ্ছত্রভাবে একক আল্লাহর ইবাদত কায়েম করা এবং গায়রুল্লাহর দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করা।
- মানুষের হেদায়েত ও আত্মশুদ্ধি: মানুষের আত্মাকে জাহিলিয়্যাত ও কুপ্রবৃত্তি থেকে পরিশুদ্ধ করে খোদাভীতি ও তাকওয়া অর্জন করানো।
- আখিরাতের জবাবদিহিতা স্মরণ করানো: জান্নাত ও জাহান্নামের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে কিয়ামতের দিবসে আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগ্রত করা।
- ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা: জুলুম, বৈষম্য, অন্যায় ও শোষণমুক্ত একটি সুবিচারপূর্ণ ও নৈতিক সমাজ গড়ে তোলা।
- হুজ্জত তামাম করা: সত্যকে এত সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা যেন কিয়ামতের দিন কোনো মানুষ বলতে না পারে যে তাদের কাছে সঠিক পথপ্রদর্শক পৌঁছেনি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘সিয়ারুল আম্বিয়া’ অধ্যয়নের মূল ফায়দা কী?
কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলগণের জীবন ও দাওয়াতি পদ্ধতি অধ্যয়নের মাধ্যমে সমকালীন ইসলামি দাওয়াতের সঠিক কর্মপন্থা, বাধা-বিপত্তি মোকাবিলার কৌশল এবং অসীম ধৈর্যের প্রেরণা লাভ করা যায়।
২. পবিত্র কুরআনে মোট কতজন নবীর নাম এসেছে?
পবিত্র কুরআনুল কারীমে সুস্পষ্টভাবে ২৫ জন সম্মানিত নবী ও রাসূলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে হযরত আদম (আ.) প্রথম এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ নবী।
৩. নবী ও রাসূলের মধ্যে মূল মৌলিক পার্থক্য কী?
রাসূল হলেন তিনি যাঁর ওপর নতুন কিতাব বা সম্পূর্ণ স্বাধীন শরীয়ত অবতীর্ণ হয়েছে; আর নবী হলেন তিনি যিনি নতুন কিতাব পাননি, বরং পূর্ববর্তী রাসূলের শরীয়ত প্রচার করেছেন।
৪. আম্বিয়াগণের ‘ইসমত’ বা নিষ্পাপতা বলতে কী বুঝায়?
ইসমত হলো এমন ঐশী সুরক্ষা যার ফলে নবী-রাসূলগণ নবুওয়াতপূর্ব এবং পরবর্তী সমগ্র জীবনে সর্বপ্রকার কুফরি, শিরক, কবিরা গুনাহ ও চরিত্রহীনতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত থাকেন।
৫. হযরত নূহ (আ.) কত বছর তাঁর কওমকে দাওয়াত দিয়েছিলেন?
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনকাবুত অনুযায়ী হযরত নূহ (আ.) সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর (৯৫০ বছর) নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর জাতিকে তাওহিদের দাওয়াত দিয়েছিলেন।
৬. মক্কায় প্রাথমিক দাওয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র কোনটি ছিল?
মক্কী জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে সাহাবায়ে কেরামের ঈমানি ও আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের প্রধান গোপন কেন্দ্র ছিল হযরত আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.)-এর বাড়ি (দারুল আরকাম)।