পরীক্ষা কোড: 203 | প্রশ্নপত্র কোড: 087
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
أصول الدعوة الإسلامية وأخلاق الداعية
[উসুলুদ দা’ওয়াতিল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আখলাকুদ দা’ইয়াহ]
বিষয় কোড: 203301
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – রচনামূলক প্রশ্নাবলী]
মান: ১৫ × ৪ = ৬০
١- بيّن أركان الدعوة الإسلامية وحكمها الشرعي مفصلا-
[১. ইসলামি দা’ওয়াহর রুকনসমূহ ও এর শরয়ি বিধান বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলাম একটি সার্বজনীন ও শাশ্বত জীবনব্যবস্থা। মানবজাতির ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র পথ হলো ইসলামি দাওয়াহ। মহান আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূলদের প্রেরণ করেছিলেন দাওয়াতের এই মহান দায়িত্ব অর্পণের জন্য। খাতামুন্নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর নবুওয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিয়ামত পর্যন্ত দাওয়াতের এই দায়িত্ব উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর অর্পিত হয়েছে। দাওয়াতকে ফলপ্রসূ ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য এর মৌলিক রুকন এবং শরয়ি বিধান জানা অপরিহার্য।
ইসলামি দাওয়াতের রুকনসমূহ (أركان الدعوة الإسلامية)
যেকোনো প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থার অস্তিত্ব যে কয়টি মৌলিক উপাদানের ওপর নির্ভর করে, সেগুলোকে তার রুকন বলা হয়। দাওয়াত গবেষক ও ইসলামিক স্কলারদের মতে, ইসলামি দাওয়াতের মৌলিক রুকন চারটি:
- আল-মুবাশশির বা আদ-দায়ী (الداعي – আহ্বানকারী):
দাওয়াতের প্রথম রুকন হলেন ‘দায়ী’। যিনি মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানান। ইসলামি শরিয়তের আলোকে প্রত্যেক মুসলিমই তার নিজ নিজ সামর্থ্য ও জ্ঞান অনুযায়ী দায়ী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
“আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও মানুষের কাছে পৌঁছে দাও।” (সহিহ বুখারি)
- আল-মাদ’ঊ (المدعو – যাকে আহ্বান করা হয়):
দাওয়াতের দ্বিতীয় রুকন হলো ‘মাদ’ঊ’ বা শ্রোতা/আহ্বানকৃত ব্যক্তি। মানবজাতির প্রতিটি স্তরের মানুষ—মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই দাওয়াতের পাত্র। মাদ’ঊদের মানসিক অবস্থা, সামাজিক স্তর, শিক্ষা ও জ্ঞানভেদে দাওয়াতের পদ্ধতি ভিন্ন হয়। - আল-মাওদূ’ বা মাওদূ’উদ দাওয়াহ (موضوع الدعوة – দাওয়াতের বিষয়বস্তু):
দাওয়াতের তৃতীয় রুকন হলো যা প্রচার করা হয়। এর মূল বিষয়বস্তু হলো পবিত্র কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ নির্দেশিত পূর্ণাঙ্গ ইসলাম—আকাইদ, ইবাদত, মুআমালাত, মুআশারাত ও আখলাক। অর্থাৎ মানবজীবন পরিচালনার যাবতীয় ঐশী বিধান। - আল-উসলুব ওয়াল ওয়াসাইলাহ (الأسلوب والوسيلة – পদ্ধতি ও মাধ্যম):
চতুর্থ রুকন হলো দাওয়াতের কর্মপন্থা ও মাধ্যম। কুরআন নির্দেশিত হিকমত (প্রজ্ঞা), উত্তম নসিহত এবং সর্বোত্তম পন্থায় যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে দাওয়াত পৌঁছানো এবং আধুনিক মুদ্রণ, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়ার সদ্ব্যবহার করা।
দাওয়াতের শরয়ি বিধান (الحكم الشرعي للدعوة)
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে দ্বীনের দাওয়াত প্রদান একটি অপরিহার্য দায়িত্ব। তবে এর প্রকৃতি নিয়ে ফকিহগণের মাঝে দুটি মূল বিশ্লেষণ রয়েছে:
- ফরজে কিফায়াহ (فرض كفاية): জমহুর ফকিহগণের মতে, সামগ্রিকভাবে উম্মাহর ওপর দাওয়াত ফরজে কিফায়াহ। অর্থাৎ সমাজের একটি দল যদি পূর্ণাঙ্গভাবে দাওয়াত, দ্বীনের ইলম প্রচার এবং সত্যের সাক্ষ্য বহনের দায়িত্ব পালন করে, তবে অন্যরা গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর তারাই হলো সফলকাম।” (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)
- ফরজে আইন (فرض عين): প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার জ্ঞান ও সামর্থ্য অনুযায়ী সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা ফরজে আইন। প্রত্যেকে তার পরিবার, সন্তান ও অধীনস্থদের কাছে দ্বীন পৌঁছাতে বাধ্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
“তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখতে পেলে সে যেন হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়, সক্ষম না হলে মুখ দিয়ে, তাও না পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে; আর এটি ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহিহ মুসলিম)
উপসংহার
ইসলামি দাওয়াত উম্মতের অস্তিত্বের ভিত্তি। রুকনসমূহের সঠিক অনুধাবন এবং শরয়ি হুকুম বাস্তবায়নের মাধ্যমেই পৃথিবীতে শান্তি, ইনসাফ ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
٢- ما هي مصادر الدعوة الإسلامية؟ أثبت أن السنة النبوية حجة بعد القرآن الكريم بالأدلة-
[২. ইসলামি দা’ওয়াহর উৎস কী? প্রমাণ কর যে, আস-সুন্নাতুন নাবাবিয়্যাহ কুরআনুল কারীমের পর শরীয়তের অকাট্য দলিল।]
ভূমিকা
ইসলামি দাওয়াহ মানব মস্তিষ্কপ্রসূত কোনো দর্শন বা অনুমাননির্ভর চিন্তা নয়; বরং এটি পরম প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতারিত অকাট্য প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যেসকল মৌলিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে দাওয়াত পরিচালিত হয়, সেগুলো বিশুদ্ধ হওয়া অপরিহার্য। কুরআনুল কারীমের পরেই সুন্নাহ হলো ইসলামি দাওয়াহর দ্বিতীয় অপরিবর্তনীয় উৎস।
ইসলামি দাওয়াতের মৌলিক উৎসসমূহ (مصادر الدعوة الإسلامية)
- পবিত্র কুরআনুল কারীম (القرآن الكريم): দাওয়াতের সর্বপ্রথম ও মূল উৎস। এটি আল্লাহর প্রত্যক্ষ বাণী, যা মানবজাতির সার্বিক হেদায়েত ও দাওয়াতি নীতিমালার মূল উৎস।
- সুন্নাতে নাবাবিয়্যাহ (السنة النبوية): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি। এটি কুরআনের বাস্তব প্রয়োগ ও ব্যবহারিক ব্যাখ্যা।
- সাহাবায়ে কেরামের আমল ও আছার (آثار الصحابة): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রত্যক্ষ সাহচর্যে গড়ে ওঠা সাহাবিদের দাওয়াতি কর্মপদ্ধতি ও বুঝ।
- ইজমা ও কিয়াস (الإجماع والقياس): কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে মুসলিম উম্মাহর নির্ভরযোগ্য আলেমগণের ঐক্যমত ও শরয়ি গবেষণা।
- মুসলিম ইতিহাস ও সুফি-মুজাদ্দিদগণের দাওয়াতি ঐতিহ্য: যুগে যুগে ইসলাম প্রচারে মনীষীদের সফল কর্মপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতা।
সুন্নাত শরীয়তের অকাট্য দলিল (حجية السنة النبوية)
সুন্নাত হলো কুরআনের পর শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস এবং এটি দ্বীনের অকাট্য প্রমাণ (হুজ্জত)। এর সপক্ষে সুদৃঢ় দলিলসমূহ নিম্নরূপ:
১. কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
“রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।” (সূরা আল-হাশর: ৭)
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
“যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে প্রকারান্তরে আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (সূরা আন-নিসা: ৮০)
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
“তিনি নিজের খেয়ালখুশি মতো কথা বলেন না; এটি তো ওহী যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।” (সূরা আন-নাজম: ৩-৪)
২. হাদিস শরীফের দলিল:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি; যতদিন তোমরা তা শক্তভাবে আঁকড়ে থাকবে, কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ।” (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)
৩. উম্মতের ইজমা (ঐক্যমত):
সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে সকল যুগের মুজতাহিদ ফকিহগণ এ বিষয়ে সর্বসম্মত যে, সহিহ সুন্নাহকে অস্বীকার করা কুফরি এবং সুন্নাহ ব্যতীত কুরআনের সালাত, সাওম, যাকাত ও হজের ব্যবহারিক রূপরেখা জানা অসম্ভব।
উপসংহার
সুন্নাহ ছাড়া কুরআন অসম্পূর্ণভাবে উপলব্ধ হয়। অতএব, ইসলামি দাওয়াহর প্রতিটি পদক্ষেপ কুরআন ও সুন্নাহর দ্বৈত কাঠামোর ওপর ভিত্তিশীল হওয়া আবশ্যক।
٣- اكتب الأصول التي يجب اتباعها لدعوة الكفار في ضوء الكتاب والسنة-
[৩. কাফিরদের দাওয়াত প্রদানে যে সব মূলনীতি অবলম্বন করা উচিত সেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে লেখ।]
ভূমিকা
অমুসলিম বা কাফিরদের নিকট ইসলামের সত্যবাণী পৌঁছে দেওয়া দাওয়াতের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাদের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। কোনো প্রকার হঠকারিতা বা জবরদস্তির আশ্রয় না নিয়ে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে তাদের দ্বীনের দিকে আহ্বান করতে হয়।
কাফিরদের দাওয়াত প্রদানে অনুসৃত মূলনীতিসমূহ
- দ্বীনের ব্যাপারে জবরদস্তি না করা (نفي الإكراه في الدين):
কাউকে জোরপূর্বক বা ভীতি প্রদর্শন করে ইসলামে প্রবেশ করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামের প্রবেশদ্বার হলো অন্তরের আন্তরিক বিশ্বাস। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ
“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই; নিশ্চয় সত্য পথ ভ্রান্ত পথ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।” (সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)
- হিকমত ও উত্তম উপদেশের ব্যবহার (الحكمة والموعظة الحسنة):
তাদের মানসিক অবস্থা, আকল ও সামাজিক পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে যুক্তিপূর্ণ ও প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলা। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দেন:ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“তোমার রবের পথের দিকে আহ্বান কর প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ এবং সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্কের মাধ্যমে।” (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
- মৌলিক আকিদা ও তাওহিদের অগ্রাধিকার (البدء بعقيدة التوحيد):
শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে সর্বপ্রথম এক আল্লাহর ইবাদত ও শিরক বর্জনের আহ্বান জানাতে হবে। মুআজ বিন জাবাল (রা.)-কে ইয়ামেনে পাঠানোর সময় নবীজি নির্দেশ দেন:فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ أَنْ يُوَحِّدُوا اللَّهَ تَعَالَى
“তুমি তাদের সর্বপ্রথম যে বিষয়ের দিকে ডাকবে, তা হলো যেন তারা আল্লাহকে এক বলে সাক্ষ্য দেয়।” (সহিহ বুখারি)
- সাধারণ ও অভিন্ন ভিত্তির সন্ধান (البحث عن الكلمة السواء):
আহলে কিতাব ও অন্যান্য অমুসলিমদের সাথে আলোচনার সময় তাদের সাথে বিদ্যমান অভিন্ন সত্যের ভিত্তিতে কথা শুরু করা। কুরআনের নির্দেশ:قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ
“বলুন: হে আহলে কিতাবগণ! এসো এমন এক কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে অভিন্ন—তা হলো আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করব না।” (সূরা আলে ইমরান: ৬৪)
- নম্র ও শালীন ভাষা প্রয়োগ (اللين والرفق في القول):
চরম দাম্ভিক ফেরাউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার সময় আল্লাহ তায়ালা মুসা ও হারুন (আ.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন: “فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا” (তার সাথে নরম সুরে কথা বলবে—সূরা ত্বাহা: ৪৪)। - উপহার প্রদান ও আর্থিক সহানুভূতি (تأليف القلوب بالهدايا):
অমুসলিমদের মন জয় করার জন্য মানবিক সাহায্য প্রদান, সহানুভূতিশীল আচরণ ও উপহার দেওয়া সুন্নাহ নির্দেশিত একটি উত্তম কৌশল (মুআল্লাফাতুল কুলুব)।
উপসংহার
কাফিরদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে শত্রুতামূলক মনোভাব পরিহার করে কল্যাণকামী হৃদয় নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত।
٤- عرّف الأخلاق- ثم بيّن أهمية الأخلاق الحسنة وآثارها في مجال الدعوة-
[৪. আখলাকের পরিচয় দাও। দাওয়াতের ক্ষেত্রে আখলাকে হাসানার গুরুত্ব ও প্রভাব বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামে বিশ্বাসের পরেই চরিত্রের স্থান। উন্নত নৈতিক চরিত্র হলো ইসলামের ব্যবহারিক সৌন্দর্য। দাওয়াতের ময়দানে কথার চেয়ে দায়ী ব্যক্তির আচরণ ও নৈতিক মানদণ্ড মানুষকে অধিক প্রভাবিত করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল উত্তম চরিত্রের বিকাশ সাধন।
আখলাকের পরিচয় (تعريف الأخلاق)
আভিধানিক অর্থ: ‘আখলাক’ (الأخلاق) শব্দটি আরবি ‘খুলুক’ (خُلُق)-এর বহুবচন। এর আভিধানিক অর্থ স্বভাব, চরিত্র, স্বভাবজাত স্বভাব, ভদ্রতা ও মানবীয় আচরণ।
পারিভাষিক অর্থ: ইমাম আল-গাযালী (রহ.) তাঁর ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থে বলেন:
الخلق عبارة عن هيئة في النفس راسخة، عنها تصدر الأفعال بسهولة ويسر من غير حاجة إلى فكر وروية
“আখলাক হলো মানুষের অন্তরের এক সুদৃঢ় গভীর অবস্থা, যা থেকে কোনো গভীর চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভালো বা মন্দ কর্ম প্রকাশিত হয়।”
দাওয়াতের ময়দানে আখলাকে হাসানার গুরুত্ব
- নবী করিম (সা.)-এর প্রেরণের মূল লক্ষ্য: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ
“নিশ্চয় আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে সর্বোত্তম চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্য।” (মুসনাদে আহমদ)
- দাওয়াতে সফলতার মূল চাবিকাঠি: মানুষের অন্তর জয় করার জন্য সুন্দর ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ
“আপনি যদি কর্কশভাষী ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা সবাই আপনার আশপাশ থেকে দূরে সরে যেত।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
- বাস্তব দৃষ্টান্ত তৈরি (القدوة الحسنة): একজন দায়ী যখন নিজে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা ও নম্রতার প্রতীক হন, তখন তার দাওয়াত কোটি মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে।
দাওয়াতে আখলাকে হাসানার বাস্তব প্রভাব (آثار الأخلاق الحسنة)
- শত্রুকে পরম মিত্রে পরিণত করা: উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে চরম বিদ্বেষী কাফেরও ইসলামের অনুগত সেবকে পরিণত হয়। কুরআনের বাণী: “উত্তম আচরণ দিয়ে মন্দকে প্রতিহত কর, তাহলে তোমার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হবে।” (সূরা ফুসসিলাত: ৩৪)
- মুসলিম সমাজের ঐক্য ও আস্থা বৃদ্ধি: দায়ীর চারিত্রিক বিশ্বস্ততা সমাজে নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে।
- বিশ্বব্যাপী ইসলাম বিস্তারের মূল কারণ: ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশে তরবারির শক্তিতে নয়, বরং মুসলিম ব্যবসায়ীদের সততা ও সুফিদের উন্নত চরিত্রের আলোকেই ইসলাম ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছিল।
উপসংহার
চরিত্রহীন দায়ী ইসলামের উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি করে। অতএব, প্রতিটি দায়ীকে উত্তম চরিত্রে ভূষিত হয়ে ময়দানে নামতে হবে।
٥- اكتب صفات الداعية الروحانية والخلقية في ضوء السيرة النبوية-
[৫. সীরাতে নাবাবীর আলোকে একজন দায়ীর আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক গুণাবলি লেখ।]
ভূমিকা
সীরাতে নাবাবিয়্যাহ হলো দ্বীনের প্রতিটি দায়ীর জন্য পরিপূর্ণ জীবনালোক। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন জীবন্ত কুরআন। সীরাতের আলোকে একজন দায়ীকে দুটি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হয়—আধ্যাত্মিক শক্তিমত্তা এবং বাহ্যিক উন্নত চরিত্র।
দায়ীর আধ্যাত্মিক গুণাবলী (الصفات الروحانية)
- খালেস নিয়্যাত ও ইখলাস (الإخلاص لله تعالى): যেকোনো কাজ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। খ্যাতি, নেতৃত্ব বা সম্পদের মোহ বর্জন করা।
- গভীর তাওয়াক্কুল (التوكل على الله): সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। হিজরতের সময় গুহার মুখে শত্রুদের উপস্থিতিতে নবীজির অবিচল উক্তি: “لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا” (চিন্তা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন—সূরা আত-তাওবাহ: ৪০)।
- নফল ইবাদত ও কিয়ামুল লাইল (قيام الليل والعبادة): রাতের নির্জনতায় তাহাজ্জুদের নামাযে রবের সামনে অশ্রু বিসর্জন দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে দাওয়াতের প্রস্তুতি হিসেবে তাহাজ্জুদের নির্দেশ দিয়েছিলেন (সূরা আল-মুযযাম্মিল: ১-৫)।
- অবিচল জিকর ও রবের সাথে সম্পর্ক: জিহ্বা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে সিক্ত রাখা এবং অন্তরকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত রাখা।
দায়ীর চারিত্রিক গুণাবলী (الصفات الخلقية)
- সততা ও বিশ্বস্ততা (الصدق والأمانة): নবুওয়তের পূর্বেই মক্কার সমাজ নবীজিকে ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) ও ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত) খেতাবে ভূষিত করেছিল।
- ধৈর্য ও আত্মসংযম (الصبر والحلم): তায়েফের ময়দানে পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েও নবীজি অভিশাপ দেননি; বরং তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেছিলেন।
- ক্ষমাশীলতা ও উদারতা (العفو والرحمة): মক্কা বিজয়ের দিনে পরম শত্রুদের সামনে ঘোষণা করেছিলেন: “لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ” (আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত)।
- অহংকারহীন বিনয় ও নম্রতা (التواضع): বিশ্বজগতের নেতা হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ দরিদ্র মানুষের সাথে মাটিতে বসে খেতেন এবং সবার আগে সালাম দিতেন।
- সাহসিকতা ও বীরত্ব (الشجاعة): হুনাইনের যুদ্ধে যখন অনেকে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল, তখন নবীজি একাকী দাঁড়িয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন:
أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبْ، أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ
উপসংহার
আধ্যাত্মিক শক্তি অন্তরে প্রেরণা যোগায় আর চারিত্রিক সৌন্দর্য বাহ্যিক আকর্ষণ সৃষ্টি করে। এ দুটির সমন্বয়েই একজন সফল দায়ী গড়ে ওঠে।
٦- ما معنى التقوى؟ وما فوائدها الدنيوية والأخروية؟ تحدث عن أثر التقوى في حياة الداعي والمدعو-
[৬. তাকওয়া অর্থ কী? তাকওয়ার ইহকালীন ও পরকালীন উপকারিতা কী? দায়ী ও মাদ’ঊ এর জীবনে তাকওয়ার প্রভাব আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি দর্শনে তাকওয়া হলো মানুষের সমস্ত নেক আমলের আত্মা ও সর্বোত্তম সম্বল। তাকওয়ার ভিত্তি যার জীবনে নেই, তার কোনো দাওয়াতি বা ধার্মিক প্রচেষ্টাই আল্লাহর নিকট ফলপ্রসূ হয় না। এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ মাপকাঠি।
তাকওয়ার অর্থ ও সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ‘তাকওয়া’ (التقوى) শব্দটি وقاية ধাতু থেকে গৃহীত। এর আভিধানিক অর্থ বেঁচে থাকা, আত্মরক্ষা করা, ভয় করা ও নিজেকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় নিষিদ্ধ ও সন্দেহজনক কাজ থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আদেশসমূহ পালন করার নাম তাকওয়া। হযরত উমর (রা.)-কে উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেছিলেন: “কণ্টকাকীর্ণ পথে চলার সময় মানুষ যেমন কাপড় গুটিয়ে সাবধানে পা ফেলে, তাকওয়া হলো পাপের দুনিয়ায় নিজেকে পাপমুক্ত রেখে সাবধানে জীবনযাপন করা।”
তাকওয়ার ইহকালীন ও পরকালীন উপকারিতা
ইহকালীন উপকারিতা (الفوائد الدنيوية):
- সঙ্কট থেকে মুক্তি ও অপ্রত্যাশিত রিজিক লাভ: আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য মুক্তির পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” (সূরা আত-ত্বালাক: ২-৩)
- সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী জ্ঞানের আলো (ফুরকান) লাভ: সূরা আনফালের ২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে, তাকওয়া অবলম্বনকারীকে সত্য-অসত্যের ফারাক করার বিশেষ প্রজ্ঞা দেওয়া হয়।
- কর্মে বরকত ও জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য: প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর সাহায্য ও সার্বিক নিরাপত্তা লাভ।
পরকালীন উপকারিতা (الفوائد الأخروية):
- জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভ: “নিশ্চয় মুত্তাকিদের জন্যই রয়েছে জান্নাত।” (সূরা আল-ক্বলম: ৩৪)
- আল্লাহর দরবারে সর্বোচ্চ মর্যাদা: “তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক মুত্তাকি।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
- গুনাহ মাফ ও বিশাল প্রতিদান লাভ।
দায়ী ও মাদ’ঊ-এর জীবনে তাকওয়ার প্রভাব
- দায়ীর জীবনে প্রভাব: তাকওয়াবান দায়ীর কথার ভেতরে অলৌকিক প্রভাব ও তাছির সৃষ্টি হয়। সে কখনো লোকদেখানো বা পার্থিব স্বার্থে কথা বলে না। তাকওয়া দায়ীকে রিয়া (অহংকার) থেকে মুক্ত রাখে।
- মাদ’ঊর জীবনে প্রভাব: তাকওয়া মাদ’ঊর অন্তরকে নম্র করে, সত্য গ্রহণের অনুভূতি জাগ্রত করে এবং অন্যায় ও পাপের প্রতি তীব্র অনুশোচনা তৈরি করে। ফলে সে সহজে হেদায়েতের পথে ফিরে আসে।
مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী]
মান: ৫ × ৪ = ২০
٧- بيّن أصناف المدعوين-
[৭. মাদ’ঊর শ্রেণিগুলো বর্ণনা কর।]
উত্তর
দাওয়াতের ময়দানে যাদের নিকট আহ্বান পৌঁছানো হয় (মাদ’ঊ), মেধা, মানসিকতা ও আকিদার ভিত্তিতে তাদের প্রধানত কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) কুরআনের সূরা নাহলের ১২৫ নং আয়াতের আলোকে মাদ’ঊদের তিন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছেন:
- সত্যের অনুসন্ধিৎসু সজ্জন ব্যক্তি (طالب الحق الراغب فيه): এরা সত্যের অন্বেষণকারী। কোনো জেদ বা পক্ষপাতিত্ব এদের মধ্যে থাকে না। সামান্য হিকমত ও দলিলের মাধ্যমে ইসলামের সত্যতা তুলে ধরলেই এরা সন্তুষ্টচিত্তে ঈমান আনে। এদের ক্ষেত্রে ‘আল-হিকমাহ’ প্রযোজ্য।
- গাফেল বা উদাসীন সাধারণ মানুষ (الغافل المعرض غير المعاند): যারা সত্যের শত্রু নয়, কিন্তু পার্থিব মোহে বা অজ্ঞতায় ডুবে আছে। এদের অন্তরে ভীতি ও আশা জাগিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন হৃদয়গ্রাহী উপদেশ বা ‘আল-মাউইজাতুল হাসানাহ’।
- সংশয়বাদী ও বিতর্কপ্রবণ হঠকারী ব্যক্তি (المعاند المشاغب): যারা বিভিন্ন যুক্তি ও দর্শনের অজুহাত দেখিয়ে ইসলামকে আক্রমণ করে। এদের সাথে উচ্চতর জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও দার্শনিক প্রমাণের মাধ্যমে ভদ্র ভাষায় বিতর্ক করতে হয়, যা কুরআনে ‘আল-মুজাদালাহ বিল আহসান’ নামে অভিহিত।
٨- بيّن آثار السيرة النبوية المطهرة في حياة الداعي-
[৮. দায়ীর জীবনে সীরাতে নাবাবী এর প্রভাব বর্ণনা কর।]
উত্তর
সীরাতে নাবাবিয়্যাহ কেবল ইতিহাসের কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়; বরং এটি একজন দায়ীর সার্বক্ষণিক ব্যবহারিক দিকনির্দেশক। দায়ীর জীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবসমূহ নিম্নরূপ:
- কর্মপদ্ধতি ও হিকমতের পাঠশালা: মক্কী জীবনের গোপন ও প্রকাশ্য দাওয়াত, দারুল আরকামের প্রশিক্ষণ, তায়েফের সবর এবং মদিনার রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে প্রতিটি প্রতিকূলতায় করণীয় কী—তা সীরাত শেখায়।
- হতাশা দূরীকরণ ও মানসিক বলবৃদ্ধি: দাওয়াতের ময়দানে অবহেলা, অপবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হলে নবীজির জীবনের চরম আত্মত্যাগ স্মরণ করে দায়ী ব্যক্তি সান্ত্বনা পায় ও নতুন উদ্যমে উজ্জীবিত হয়।
- মানুষের মনস্তত্ত্ব অনুধাবন: নবী করিম (সা.) কোন শ্রেণির মানুষের সাথে কীভাবে কথা বলতেন (বেদুইন, ইহুদি পণ্ডিত, মক্কার অভিজাত), তা সীরাত থেকে শিখে একজন দায়ী বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে।
٩- اكتب دور أبي بكر الصديق رضي الله عنه في الدعوة إلى الإسلام-
[৯. ইসলামের প্রতি আবু বকর (রা)-এর দা’ওয়াহ এর ভূমিকা লেখ।]
উত্তর
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী এবং দাওয়াতের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠ সহযোগী। দাওয়াতে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়:
- শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের ইসলামে প্রবেশ: ইসলাম গ্রহণের পরপরই আবু বকর (রা.) দাওয়াতি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর মাধ্যমেই ইসলামের শীর্ষস্থানীয় স্তম্ভ—উসমান ইবনে আফফান, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, যুবায়ের ইবনুল আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।
- অসহায় মুসলিমদের আর্থিক মুক্তি: মক্কায় কাফেরদের চরম নির্যাতনে নিষ্পেষিত হযরত বেলাল, খাব্বাব ও আমের ইবনে ফুহাইরা (রা.) সহ অসংখ্য ক্রীতদাসকে নিজ অর্থে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন।
- হিজরত ও সর্বাত্মক আত্মত্যাগ: সাওর পর্বতের গুহায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নবীজির সঙ্গী হন এবং তাবুক যুদ্ধের সময় ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র আল্লাহর রাস্তায় এনে উপস্থিত করেন।
١٠- ما معنى الصبر؟ وكم قسماً له؟
[১০. সবর এর অর্থ কী? উহা কত প্রকার ও কী কী?]
উত্তর
সবরের অর্থ: ‘সবর’ (الصبر) আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বিরত রাখা, বাধা দেওয়া, সংযত করা ও ধৈর্য ধারণ করা। শরীয়তের পরিভাষায় বিপদের সময় অস্থিরতা প্রকাশ না করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের প্রবৃত্তি ও নফসকে আল্লাহর নির্দেশের অধীন রাখার নাম সবর।
সবরের প্রকারভেদ: উলামায়ে কেরামের মতে সবর প্রধানত তিন প্রকার:
- আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের ওপর অবিচল থাকার সবর (الصبر على طاعة الله): প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিয়মিত নামায, রোজা ও দাওয়াতের ময়দানে অটল থাকা।
- গুনাহ ও পাপকাজ থেকে আত্মসংযমের সবর (الصبر عن معصية الله): নফসের কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
- বিপদ-আপদ ও তাকদীরের ফয়সালায় ধৈর্য ধারণ (الصبر على أقدار الله المؤلمة): রোগ-শোক, ক্ষতি ও পার্থিব বালা-মুসিবতে বিচলিত না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা।
١١- أثبت أن ‘الإخلاص’ شرط لقبول سائر العبادة على ضوء القرآن والسنة-
[১১. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণ কর যে, ইখলাস সকল ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য শর্ত।]
উত্তর
যেকোনো নেক আমল বা ইবাদত আল্লাহর দরবারে গৃহীত হওয়ার জন্য মৌলিক দুটি শর্ত রয়েছে—সুন্নাহ মোতাবেক হওয়া এবং খালেস নিয়্যাত বা ‘ইখলাস’ থাকা। ইখলাসবিহীন আমল ধূলিকণার মতো উড়ে যায়।
কুরআনের অকাট্য প্রমাণ:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ
“তাদেরকে কেবল এই আদেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করে।” (সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৫)
فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
“অতএব যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।” (সূরা আল-কাহফ: ১১০)
হাদিসের দলিল:
হযরত উমর (রা.) বর্ণিত বিখ্যাত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
“নিশ্চয় সমস্ত আমলের ফলাফল নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল।” (সহিহ বুখারি)
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন: “আমি অংশীদারদের শিরক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি এমন আমল করে যাতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি তাকে ও তার শিরককে বর্জন করি।” (সহিহ মুসলিম)
١٢- تحدث عن أضرار ‘الكبر’ وآثاره في الداعي والمدعو-
[১২. দায়ী ও মাদ’ঊর জন্য ‘অহংকারের’ ক্ষতি ও প্রভাব আলোচনা কর।]
উত্তর
অহংকারের পরিচয়: রাসূলুল্লাহ (সা.) অহংকারের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন: “الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ” (অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা—সহিহ মুসলিম)। অহংকার সকল ধ্বংসের মূল।
দায়ী ও মাদ’ঊর ওপর অহংকারের কুফল:
- দায়ীর জন্য ক্ষতি: অহংকারী দায়ী নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে। ফলে তার কথায় অহমিকা ও রূঢ়তা প্রকাশ পায়, যা মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে ঠেলে দেয়। অধিকন্তু অহংকার অন্তরে থাকলে জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
- মাদ’ঊর জন্য ক্ষতি: মাদ’ঊ যদি অহংকারী হয়, তবে সত্য তার সামনে সুস্পষ্ট হলেও জাতিগত বা সামাজিক মর্যাদার মিথ্যা অহমিকায় সে তা প্রত্যাখ্যান করে। যেমন মক্কার আবু জাহেল ও অন্যান্য কুরাইশ নেতারা কেবল বংশীয় অহংকারের কারণেই ইসলাম গ্রহণ করেনি।
- আমল বরবাদ হওয়া: ইবলিস যেমন অহংকারের কারণে চিরকালের জন্য অভিশপ্ত হয়েছিল, তেমনি অহংকার মানুষের সমস্ত নেক আমল জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. উসুলুদ দাওয়াহ বিষয়ের প্রধান আলোচ্য বিষয় কী?
এ বিষয়ের মূল আলোচ্য বিষয় হলো কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত ইসলামি দাওয়াত প্রচারের মূল ভিত্তি, রুকনসমূহ, দাওয়াতের শরয়ি হুকুম এবং একজন দায়ীর আবশ্যকীয় আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক গুণাবলী।
২. দাওয়াতের মৌলিক রুকন কয়টি ও কী কী?
ইসলামি দাওয়াতের মৌলিক রুকন চারটি: ১. আদ-দায়ী (আহ্বানকারী), ২. আল-মাদ’ঊ (যাকে আহ্বান করা হয়), ৩. মাওদূ’উদ দাওয়াহ (দাওয়াতের বিষয়বস্তু—কুরআন ও সুন্নাহ), এবং ৪. উসলূব ও ওয়াসিলাহ (পদ্ধতি ও মাধ্যম)।
৩. দাওয়াত প্রদান কি ফরজে আইন নাকি ফরজে কিফায়াহ?
সামগ্রিকভাবে পুরো মুসলিম সমাজের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক দাওয়াত হলো ফরজে কিফায়াহ; তবে ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরজে আইন।
৪. ইসলামি দাওয়াতে ‘হিকমত’ বলতে কী বুঝায়?
হিকমত হলো উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত কথা বলা। শ্রোতার মেধা, মানসিকতা, পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে সবচেয়ে যৌক্তিক ও সহজ পন্থায় দ্বীনের সত্য উপস্থাপন করাই হলো হিকমত।
৫. কাফিরদের দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইসলামের মূল দৃষ্টিভঙ্গি কী?
ইসলামে জোরজবরদস্তির কোনো স্থান নেই। কাফিরদের দাওয়াত দিতে হয় তাওহিদের মূল বাণী দিয়ে, তাদের সাথে বিদ্যমান অভিন্ন বিশ্বাসের ভিত্তিতে এবং অত্যন্ত নম্র, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও শালীন যুক্তি দ্বারা।
৬. একজন দায়ীর জন্য ‘ইখলাস’ কেন সবচেয়ে বেশি জরুরি?
কারণ ইখলাস বা আল্লাহর একমাত্র সন্তুষ্টি ছাড়া কোনো আমলই কবুল হয় না। ইখলাসবিহীন লোকদেখানো দাওয়াতে অন্তরের তাছির থাকে না এবং তা পরকালে জাহান্নামের কারণ হতে পারে।