ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: আরবি ভাষা ও সাহিত্য
বিষয়: আরবি সাহিত্যের ইতিহাস-২ (تاريخ الأدب العربي-٢ – العصر العباسي)
বিষয় কোড: ২০৪৩০৮ | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
المجموعة (أ)
[মৌলিক ও বিস্তারিত রচনামূলক প্রশ্নাবলি – পূর্ণমান: ৬০]
١- ما المراد بالعصر العباسي في تاريخ الأدب العربي؟ تحدث عن الخصائص العامة للأدب العربي في هذا العصر-
[১. আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে আব্বাসী যুগ বলতে কী বোঝায়? এ যুগের আরবি সাহিত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো বিশদ আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. আব্বাসী যুগের পরিচয় ও সময়সীমা:
আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে ১৩২ হিজরি (৭৫০ খ্রি.) উমাইয়া খেলাফতের পতনের পর আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ কর্তৃক আব্বাসী খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে স্বর্ণযুগের সূচনা হয় এবং ৬৫৬ হিজরিতে (১২৫৮ খ্রি.) হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের মাধ্যমে যার সমাপ্তি ঘটে—সেই সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দীর অধিক (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) সময়কালকে ‘আব্বাসী যুগ’ (العصر العباسي) বলা হয়। সাহিত্যের ইতিহাসবিদগণ রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক বিবর্তনের আলোকে এ যুগকে দুটি প্রধান পর্বে ভাগ করেছেন:
– প্রথম আব্বাসী যুগ (العصر العباسي الأول – ১৩২-২৩২ হি. / ৭৫০-৮৪৭ খ্রি.): সমৃদ্ধি, অনুবাদ আন্দোলন (বাইতুল হিকমাহ), পারসিক ও গ্রিক সংস্কৃতির সংমিশ্রণ এবং সাহিত্য-বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ উৎকর্ষের যুগ।
– দ্বিতীয় আব্বাসী যুগ (العصر العباسي الثاني – ২৩২-৬৫৬ হি. / ৮৪৭-১২৫৮ খ্রি.): তুর্কি প্রাধান্য, রাজনৈতিক বিভক্তি এবং আঞ্চলিক সালতানাত (বুওয়াইহিদ, সেলজুক, হামদানি, ফাতেমী) গড়ে ওঠার যুগ; যেখানে রাজনৈতিক অনৈক্য সত্ত্বেও সাহিত্যের বহুমাত্রিক নতুন রূপ ও আঞ্চলিক কেন্দ্র বিকশিত হয়।
২. আব্বাসী সাহিত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. বিদেশি সভ্যতা ও দর্শনের গভীর প্রভাব (التأثر بالحضارات الأجنبية): আরব মুসলিমদের সাথে পারসিক, গ্রিক ও ভারতীয়দের ঘনিষ্ঠ মেলামেশা এবং ব্যাপক অনুবাদের ফলে যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান আরবি চিন্তাধারা ও সাহিত্যিক উপমায় প্রবেশ করে।
২. সহজ, মার্জিত ও সুমধুর ভাষাভঙ্গি (رقة الألفاظ وسهولتها): প্রাচীন জাহেলি ও উমাইয়া যুগের কঠিন, শুষ্ক ও জটিল মরুভাষার পরিবর্তে নগরজীবনের উপযোগী কোমল, প্রাঞ্জল ও সুমধুর ভাষারীতি প্রবর্তিত হয়।
৩. নতুন শিল্পালংকারের প্রাচুর্য (ظهور البديع): বাশ্শার ইবনে বুরদ ও মুসলিম ইবনুল ওয়ালিদের হাত ধরে কবিতায় ‘বাদী’ (মহসিনাতুল লাফজিয়্যাহ ওয়াল মা’নাবিয়্যাহ)—যেমন: ত্বিবাক, জেনাস, ইস্তিআরা ইত্যাদির সচেতন ও শৈল্পিক প্রয়োগ চরম জনপ্রিয়তা পায়।
৪. কাব্যিক বিষয়ের বৈচিত্র্য ও আধুনিকায়ন (تجدد الأغراض الشعرية): প্রাচীন মরুর উট ও তাঁবু ধ্বংসাবশেষের রোদন (বুকায়ে আতলাল) ত্যাগ করে নগরসৌধ, মনোরম বাগান, ফোয়ারা, সুরা (খামরিয়্যাত), প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ (জুহদিয়্যাত) এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গকবিতা শীর্ষস্থান লাভ করে।
৫. শিল্পসম্মত গদ্যের স্বর্ণযুগ (ازدهار النثر الفني): আব্বাসী যুগে আরবি গদ্য প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ও শৈল্পিক রূপ লাভ করে। মাকামাত, তৌকিআত, প্রাতিষ্ঠানিক পত্রসাহিত্য (রিসালাহ), ব্যঙ্গাত্মক গদ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্বকোষ রচনার মাধ্যমে গদ্য সাহিত্যের নবজন্ম ঘটে।
৬. জ্ঞানতাত্ত্বিক গভীরতা ও দার্শনিক বিশ্লেষণ: সাহিত্যিকরা কেবল অনুভূতির কবি থাকেননি, বরং তাঁরা দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানীতে রূপান্তরিত হন (যেমন: জাহিজ, মুতানাব্বি ও মা’আররি)।
٢- تحدث عن موضوع الشعر العربي وخصائصه في العصر العباسي-
[২. আব্বাসী যুগে আরবি কবিতার মূল বিষয়বস্তু ও বৈশিষ্ট্যাবলি আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. আব্বাসী কবিতার প্রধান প্রধান বিষয়বস্তু (موضوعات الشعر العباسي):
আব্বাসী যুগে সামাজিক পরিবর্তন ও নগরজীবনের প্রসারের সাথে সাথে কবিতার বিষয়বস্তুতে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়:
১. সুরার বন্দনা (الخمريات): রাজদরবার ও অভিজাত শ্রেণির ভোগবিলাসের প্রেক্ষাপটে সুরার রূপ, গুণ ও মজলিসের চমৎকার বর্ণনা সম্বলিত এক স্বতন্ত্র কাব্যধারার জন্ম হয়, যার পুরোধা ছিলেন আবু নুওয়াস।
২. প্রকৃতি বর্ণনা (الوصف): বাগদাদের সুরম্য প্রাসাদ, ফোয়ারা, ফুলবাগান, নদী এবং প্রকৃতির নৈসর্গিক রূপের চিত্রায়ন নতুন মাত্রায় পৌঁছায়, যা আল-বুহতুরী ও ইবনুল মু’তাযের কবিতায় সবিশেষ দৃশ্যমান।
৩. দুনিয়াবিমুখতা ও বৈরাগ্য (الزهديات): অতিরিক্ত ভোগবিলাস ও নৈতিক স্খলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আল্লাহভীতি, মৃত্যুচিন্তা ও পরকালের স্মরণভিত্তিক ধারার বিকাশ ঘটে, যার অগ্রনায়ক ছিলেন আবু আল-আতাহিয়াহ।
৪. বীরত্ব ও সমরগাথা (الحماسة والفتوح): বাইজেন্টাইন রোমানদের বিরুদ্ধে সীমান্ত যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের বীরত্বগাথা নতুন অলংকারে প্রস্ফুটিত হয়, যার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ আবু তাম্মামের আম্মুরিয়া বিজয় কাসিদা এবং মুতানাব্বির সাইফুদ্দৌলাহ-প্রশস্তি।
৫. দার্শনিক প্রজ্ঞা (الحكمة والتأمل): জীবনের অর্থ, ভাগ্যের নির্মমতা এবং মানব চরিত্রের জটিল মনস্তত্ত্ব কবিতার উপজীব্য হয় (মুতানাব্বি ও আবুল আলা আল-মা’আররি)।
৬. শোকগাথা (الرثاء): শুধু ব্যক্তিদের নয়, বরং শহর-নগর ধ্বংস (যেমন বাগদাদ বা বসরার পতন) এবং এমনকি পোষা প্রাণীদের জন্যও হৃদয়গ্রাহী শোকগাথা রচিত হয়।
২. আব্বাসী কবিতার অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলি (خصائص الشعر العباسي):
– ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়: কবিতা প্রাচীন ছন্দ ও ওজন রক্ষা করলেও তার ভাব, উপমা ও শব্দচয়ন সম্পূর্ণ আধুনিক নগরজীবনের ছোঁয়ায় রঞ্জিত হয়।
– উপমা ও রূপকের অভিনবত্ব: বাস্তব জীবনের বিমূর্ত ধারণাকে প্রাত্যহিক দৃশ্যমান বস্তুর সাথে তুলনা করার অসাধারণ উদ্ভাবনী ক্ষমতা কবিরা প্রদর্শন করেন।
– অলংকাররীতির প্রাগ্রসরতা: তসবীহ, ইসতিআরা, ত্বিবাক ও জেনাসের মতো অলংকারশাস্ত্রে নতুন শৈলী যুক্ত হয়।
– একক ভাব ও বিষয়ের ঐক্য (الوحدة الموضوعية): জাহেলি কাসিদার মতো বহু বিচ্ছিন্ন বিষয়ের পরিবর্তে একটি একক ভাবকে কেন্দ্র করে সুসংহত কবিতা রচনার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
٣- من الجاحظ؟ تحدث عن مساهمته في النثر العربي-
[৩. আল-জাহিজ কে? আরবি গদ্য সাহিত্যে তাঁর অবদান মূল্যায়ন কর:]
উত্তর:
১. আল-জাহিজের পরিচয়:
আরবি গদ্য সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট, বিশ্বকোষীয় পণ্ডিত ও মুতাজিলা দার্শনিক হলেন আবু উসমান আমর ইবনে বাহর আল-কিনানী আল-বাসরী (১৬৩-২৫৫ হি. / ৭৭৬-৮৬৯ খ্রি.), যিনি ইতিহাসে ‘আল-জাহিজ’ (الجاحظ) নামে অমর হয়ে আছেন। তাঁর চোখের মণি দুটি কোটর থেকে কিছুটা বের হওয়া ছিল বলে তাঁকে ‘জাহিজ’ উপনামে অভিহিত করা হতো।
২. শিক্ষা ও পাণ্ডিত্য:
তিনি বসরার বিখ্যাত ‘মিরবাদ’ মেলায় পণ্ডিতদের বক্তৃতা শুনে, আল-খলিল ও আবু উবাইদার মতো দিকপালদের নিকট ভাষা ও সাহিত্য এবং মুতাজিলা গুরুদের নিকট কালামশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তিনি ছিলেন গ্রন্থপাঠের পরম অনুরক্ত এক জ্ঞানপিপাসু মনীষী।
৩. আরবি গদ্যে আল-জাহিজের অবদান ও রচনাবলি:
১. কিতাবুল হাইওয়ান (كتاب الحيوان): সাত খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থটি প্রাণিবিজ্ঞানের আড়ালে সমাজবিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, চিকিৎসা, প্রাচীন কবিতা ও প্রবাদের এক বিশাল বিশ্বকোষ।
২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন (البيان والتبيين): আরবি অলংকারশাস্ত্র, বাগ্মিতা ও বক্তৃতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভিত্তিগ্রন্থ। এতে বাগ্মিতার শর্ত, স্বরভঙ্গি, সাহাবী ও কবিদের শ্রেষ্ঠ ভাষণ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
৩. কিতাবুল বুখালা (كتاب البخلاء): সমাজের কৃপণ ব্যক্তিদের মনস্তত্ত্ব ও অদ্ভুত যুক্তি নিয়ে রচিত আরবি ব্যঙ্গসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মাস্টারপিস।
৪. জাহিজের গদ্যশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট্য:
– হাস্যরস ও গম্ভীরতার মেলবন্ধন (الجد في الهزل): গুরুগম্ভীর দার্শনিক ও সামাজিক আলোচনার মাঝে সূক্ষ্ম কৌতুক ও রম্য পরিবেশন করে পাঠককে মুগ্ধ রাখতেন।
– প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তর (الاستطراد): এক বিষয়ের অবতারণা করতে করতে প্রাসঙ্গিক শত ঘটনার নিখুঁত বর্ণনা এনে জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন করতেন।
– শব্দ ও অর্থের অপূর্ব সামঞ্জস্য: তিনি বলতেন—শব্দ এবং অর্থ যেন একে অপরের পরিপূরক হয় («المعاني مطروحة في الطريق وإنما الشأن في إقامة الوزن وتخير اللفظ»)।
٤- اكتب نبذة من حياة الشاعر أبي نواس مع ذكر مساهمة في الشعر العربي-
[৪. কবি আবু নুওয়াসের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত লেখ এবং আরবি কবিতায় তাঁর অবদান উল্লেখ কর:]
উত্তর:
১. আবু নুওয়াসের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত:
– নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর আসল নাম আল-হাসান ইবনে হানি আল-হাকামী (১৪৫-১৯৮ হি. / ৭৬২-৮১৪ খ্রি.)। মাথার দুপাশে দুটি মনোরম ঝুলন্ত জুলফি বা চুল থাকার কারণে তিনি ‘আবু নুওয়াস’ (أبو نواس) নামে ভূষিত হন।
– জন্ম ও বেড়ে ওঠা: তিনি পারস্যের আহওয়াজ অঞ্চলে এক আরব পিতা ও পারসিক মাতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে তিনি বসরায় সুগন্ধির দোকানে কাজ করতেন এবং কবি ওয়ালিবা ইবনুল হুবাবের সান্নিধ্যে কাব্যচর্চা শুরু করেন।
– উচ্চশিক্ষা: তিনি বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষার জন্য কুফা ও আরবের মরুভূমিতে বেদুঈনদের সাথে অবস্থান করেন এবং বিখ্যাত ভাষাবিদ খালাফ আল-আহমারের নিকট কাব্য দীক্ষা নেন।
– দরবারি সান্নিধ্য ও কারাবরণ: তিনি বাগদাদে এসে খলিফা হারুনুর রশীদ ও আল-আমিনের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। তবে তাঁর লাগামহীন সুরার কবিতা ও উদ্ধত আচরণের কারণে তাঁকে একাধিকবার কারারুদ্ধ হতে হয়।
– জীবনের শেষ ভাগ: জীবনের শেষলগ্নে তিনি অতীতের ভোগবিলাসের জন্য চরম অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেন এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ বৈরাগ্য ও ক্ষমা প্রার্থনার অপূর্ব কবিতা রচনা করে ১৯৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।
২. আরবি কবিতায় আবু নুওয়াসের অবদান:
১. সুরা কাব্যের (الخمريات) পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব: তিনিই প্রথম কবি যিনি সুরার বর্ণনাকে প্রাচীন কাসিদার ভূমিকা থেকে বের করে এনে একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পে রূপ দান করেন। সুরার রং, গন্ধ, পাত্র, পানশালা ও পরিবেশনার নিখুঁত চিত্রায়নে তিনি অদ্বিতীয়।
২. প্রাচীন প্রথা ভাঙার বিদ্রোহ: মরুভূমির পরিত্যক্ত তাঁবু ও উটের স্মৃতিতে অশ্রু বিসর্জনের প্রাচীন কৃত্রিম রীতির তীব্র বিরোধিতা করে তিনি সরাসরি নগরজীবনের বাস্তব সৌন্দর্য ও সুরার প্রশংসায় কবিতা শুরুর আধুনিক ধারা প্রবর্তন করেন।
৩. শব্দের মাধুর্য ও প্রাঞ্জলতা: তাঁর কবিতায় কোনো কর্কশ মরুশব্দ ছিল না; বরং তা ছিল অত্যন্ত সুমধুর, সংগীতময় ও প্রাঞ্জল।
৪. শেষ জীবনের তাওবানির্ভর কবিতা: তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে রচিত নাজাত ও ক্ষমা প্রার্থনার পংক্তিগুলো—যেমন: «يا رب إن عظمت ذنوبي كثرة * فلقد علمت بأن عفوك أعظم»—আরবি ভক্তিগীতির অমর সম্পদ।
٥- من الشاعر الزاهد؟ تحدث عن خصائص شعره-
[৫. ‘আশ-শা’ইরুজ জাহেদ’ (বৈরাগ্যের কবি) কে? তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্যাবলি আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. আশ-শা’ইরুজ জাহেদ (الشاعر الزاهد)-এর পরিচয়:
আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে ‘আশ-শা’ইরুজ জাহেদ’ বা জুহদ (দুনিয়াবিমুখতা ও বৈরাগ্য)-এর অবিসংবাদিত কবি হলেন আবু ইসহাক ইসমাইল ইবনুল কাসিম, যিনি আবু আল-আতাহিয়াহ (أبو العتاهية) নামে জগদ্বিখ্যাত (১৩০-২১১ হি. / ৭৪৭-৮২৬ খ্রি.)।
২. বৈরাগ্যের পটভূমি:
প্রাথমিক জীবনে তিনি কুফায় মৃৎপাত্র তৈরি করতেন এবং হালকা প্রণয়ধর্মী গজল লিখতেন। খলিফা আল-মাহদীর রাজপ্রাসাদের বাঁদি ‘উতবাহ’-র প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এবং তৎকালীন সমাজের লাগামহীন বিলাসিতা ও পাপাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ভোগবিলাস সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেন। তিনি সুফিদের পশমি বস্ত্র পরিধান করে আজীবন মৃত্যু, কবর, পরকাল ও আল্লাহভীতির কবিতা রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।
৩. তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলি:
১. সহজ ও সর্বজনীন ভাষা (سهولة الألفاظ والوضوح): তিনি প্রাচীন মরুভাষার দুর্বোধ্য শব্দ সম্পূর্ণ বর্জন করে অত্যন্ত সাবলীল ও সাধারণের বোধগম্য ভাষায় কবিতা লিখেছেন; ফলে তাঁর বাণী সমাজের সর্বোচ্চ খলিফা থেকে শুরু করে দিনমজুর পর্যন্ত সবার অন্তরে প্রবেশ করত।
২. মৃত্যু ও কবরের অনিবার্য স্মরণ: পার্থিব ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও রূপ-লাবণ্যের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং কবরের একাকী অন্ধকারের বাস্তবতা তাঁর প্রতিটি চরণে ধ্বনিত হয়েছে।
৩. প্রজ্ঞাপূর্ণ নসীহত (الحكمة والموعظة): তিনি মানুষকে লোভ-লালসা পরিহার করে অল্পে তুষ্টি (القناعة) এবং আখিরাতের অনন্ত জীবনের জন্য পাথেয় সংগ্রহের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
৪. ছন্দের স্বাভাবিক প্রবাহ: তিনি কোনো প্রথাগত ছন্দশাস্ত্রী ছিলেন না, বরং তাঁর ছন্দ ছিল প্রাকৃতিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। তিনি গর্বভরে বলতেন: «أنا أكبر من العروض» (আমি নিজেই ছন্দশাস্ত্রের চেয়ে বড়)।
৫. সামাজিক বিবেক জাগরণ: আব্বাসী যুগের চরম ভোগবাদী অবক্ষয়ের যুগে তাঁর জুহদীয় কবিতা একটি শক্তিশালী নৈতিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
٦- ماذا تفهم بحضارة الأندلس؟ تحدث عن أثرها في الشعر-
[৬. আন্দালুসীয় সভ্যতা বলতে কী বোঝ? কবিতায় এর প্রভাব ও অবদান আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. আন্দালুসীয় সভ্যতার ধারণা:
৯২ হিজরিতে (৭১১ খ্রি.) সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে যে অনন্য জ্ঞানদীপ্ত সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে গ্রানাডার পতনের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় আট শতাব্দীকাল ধরে স্থায়ী হয়—তা-ই ইতিহাসে ‘আন্দালুসীয় সভ্যতা’ (حضارة الأندلس) নামে খ্যাত। কর্ডোবা, সেভিল ও গ্রানাডার এই সভ্যতা ছিল মধ্যযুগের অন্ধকার ইউরোপের বুকে আলোকময় ইউরোপীয় রেনেসাঁর একমাত্র প্রসূতিগার।
২. কবিতায় আন্দালুসীয় সভ্যতার গভীর প্রভাব ও অবদান:
১. অনুপম প্রকৃতি বর্ণনা (شعر الطبيعة الغناء): আন্দালুসের মনোরম বরফাবৃত পাহাড়, সবুজ উপত্যকা, বহতা নদী এবং সুরম্য আল-হামরা প্রাসাদের ফোয়ারা ও বাগান কবিতার প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। ইবনে খাফাজা তো ‘প্রকৃতির কবি’ (صناع الطبيعة) উপাধি লাভ করেন।
২. মুওয়াশশাহ ও যাযালের আবিষ্কার (الموشحات والأزجال): আন্দালুসীয় সভ্যতার সবচেয়ে বৈপ্লবিক অবদান হলো ‘মুওয়াশশাহ’ কাব্যের উদ্ভাবন। একঘেয়ে একক অন্ত্যমিলের বিপরীতে একাধিক স্তবক ও স্থানীয় সুরযুক্ত এই গান সমগ্র ইউরোপীয় ট্রুবাডুর (Troubadour) কবিতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
৩. শহর ও সাম্রাজ্য পতনের শোকগাথা (رثاء المدن والممالك): খ্রিস্টানদের পুনর্দখল অভিযানে একে একে কর্ডোবা, ভ্যালেন্সিয়া ও সেভিলের পতনে রচিত হয় বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম করুণতম শোকগাথা, যেমন কবি আবু আল-বাকা আর-রুন্দির অমর নুনিয়্যাহ কাসিদা: «لكل شيء إذا ما تم نقصان * فلا يغر بطيب العيش إنسان»।
৪. মার্জিত প্রেম ও আত্মিক প্রণয় (الغزل العذري والأفلاطوني): ইবনে হাযমের বিখ্যাত প্রণয়তত্ত্ব গ্রন্থ ‘তাওকুল হামামাহ’ (طوق الحمامة) এবং ইবনে যায়দুনের ওয়ালাদাহ বিনতে মুসতাকফির সাথে প্রেমকাব্য আত্মিক প্রণয়ের শীর্ষ শিখরে পৌঁছায়।
٧- من الفاطميون؟ تحدث عن دورهم في رعاية الأدب العربي-
[৭. ফাতেমীয় কারা? আরবি সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের ভূমিকা আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. ফাতেমীয়দের পরিচয়:
ফাতেমীয়রা (الفاطميون) হলো একটি শিয়া ইসমাইলি খিলাফত বংশ, যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যা হযরত ফাতিমাতুজ জাহরা (রা.)-এর বংশধর বলে দাবি করতেন। ২৯৭ হিজরিতে (৯০৯ খ্রি.) উত্তর আফ্রিকায় উবায়দুল্লাহ আল-মাহদী কর্তৃক এই খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে সেনাপতি জওহর আস-সিকিল্লীর নেতৃত্বে ৩৫৮ হিজরিতে (৯৬৯ খ্রি.) মিশর বিজিত হয় এবং খলিফা আল-মুইয লিদীনিল্লাহর নির্দেশে নতুন রাজধানী ‘কায়রো’ (القاهرة) প্রতিষ্ঠিত হয়। ৫৬৭ হিজরিতে (১১৭১ খ্রি.) সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর হাতে এ বংশের অবসান ঘটে।
২. আরবি সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় ফাতেমীয়দের ভূমিকা:
১. দারুল হিকমাহ ও আল-আজহার প্রতিষ্ঠা: জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের প্রচারের জন্য ফাতেমীয়রা ৩৯৫ হিজরিতে কায়রোতে বিখ্যাত ‘দারুল হিকমাহ’ বা ‘দারুল ইলম’ প্রতিষ্ঠা করে এবং বিশাল কুতুবখানা স্থাপন করে। এর পূর্বে জামে আল-আজহার প্রতিষ্ঠা সাহিত্যের শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়।
২. শিয়া মতাদর্শ প্রচারমূলক সাহিত্য (الأدب الدعوي): কবি ও সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে তাঁরা আহলে বাইতের মর্যাদা ও ইসমাইলি দর্শনভিত্তিক সাহিত্য রচনার বিশাল ধারা সৃষ্টি করেন।
৩. উৎসব ও ধর্মীয় উপলক্ষভিত্তিক কাব্য: ঈদে মিলাদুন্নবী, আশুরা, ঈদুল ফিতর এবং নীল নদের প্লাবন উৎসবে কবিদের বিপুল অর্থ পুরস্কার দেওয়া হতো, যা প্রশংসামূলক ও ঐতিহাসিক কবিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে।
৪. বিখ্যাত কবি ও গদ্যশিল্পীদের লালন: ফাতেমীয় দরবারে ইবনে হানি আল-আন্দালুসী (যাঁকে ‘মাগরিবের মুতানাব্বি’ বলা হতো), কবি তামিম ইবনুল মুইয, এবং উমারা আল-ইয়ামানী প্রভূত খ্যাতি ও রাজকীয় মর্যাদা লাভ করেন।
৫. দীওয়ানুল ইনশা ও প্রাতিষ্ঠানিক গদ্য: কূটনৈতিক চিঠিপত্র ও রাষ্ট্রীয় ফরমান রচনার জন্য উচ্চাঙ্গের আলংকারিক গদ্যরীতির বিশেষ বিকাশ ঘটে।
٨- قيم بشار بن برد في الشعر العربي-
[৮. আরবি কবিতায় বাশ্শার ইবনে বুরদের স্থান ও কাব্যপ্রতিভা মূল্যায়ন কর:]
উত্তর:
১. বাশ্শার ইবনে বুরদের পরিচয়:
উমাইয়া ও আব্বাসী উভয় যুগের মিলনসেতু (مخضرم الدولتين) এবং আব্বাসী আধুনিক কাব্যধারার পথিকৃৎ হলেন বাশ্শার ইবনে বুরদ আল-উকাইলী (৯৬-১৬৭ হি. / ৭১৪-৭৮৩ খ্রি.)। তিনি পারসিক বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং জন্মগতভাবেই অন্ধ ছিলেন; কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে এক অলৌকিক স্মৃতিশক্তি ও কাব্যপ্রতিভা দান করেছিলেন।
২. আরবি কবিতায় তাঁর যুগান্তকারী স্থান ও মূল্যায়ন:
১. আধুনিক কাব্যধারার জনক (رائد المحدثين): বাশ্শার হলেন সেই প্রধান কবি যিনি প্রাচীন উমাইয়া যুগের কঠিন বেদুইন কাঠামো ভেঙে আধুনিক আব্বাসী কাব্যরীতির ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনিই প্রথম প্রখ্যাত কবি যাঁকে কেন্দ্র করে ‘কাদিম’ (প্রাচীন) ও ‘মুহদাস’ (আধুনিক)-এর বিভাজন শুরু হয়।
২. অন্তর্দৃষ্টি ও নিখুঁত দৃশ্যকল্প: অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি চক্ষুষ্মান ব্যক্তিদের চেয়েও চমৎকার দৃশ্যের বর্ণনা দিতেন। বিশেষ করে রণক্ষেত্রের ধূলিঝড় ও তরবারির চমকের বর্ণনায় তাঁর অমর পংক্তিটি বিশ্বসাহিত্যে অতুলনীয়:
«كَأَنَّ مُثَارَ النَّقْعِ فَوْقَ رُؤُوسِنَا * وَأَسْيَافَنَا لَيْلٌ تَهَاوَى كَوَاكِبُهُ»
(আমাদের মাথার ওপরের রণধূলি এবং তরবারির ঝিলিক যেন একটি অন্ধকার রাত, যার বুক থেকে খসে পড়ছে উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজি!)
৩. অলংকারশাস্ত্রে ‘বাদী’ রীতির প্রবর্তন: তিনি কবিতায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ত্বিবাক, জেনাস ও ইস্তিআরার সমন্বয় ঘটিয়ে পরবর্তী কবিদের জন্য এক নতুন অলংকারময় রাজপথ তৈরি করে দেন।
৪. প্রেম ও গজলে নতুন সুর: গজল রচনায় তিনি প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভূতিকে চমৎকার সুরে ফুটিয়ে তোলেন। যেমন তাঁর বিখ্যাত উক্তি: «والأذن تعشق قبل العين أحياناً» (কখনো কখনো চোখের দেখার আগেই কান কারও প্রেমে পড়ে যায়)।
৫. সমালোচনা ও শেষ পরিণতি: তাঁর মধ্যে তীব্র পারসিক জাতীয়তাবাদী অহংকার (শুউবিয়্যাহ) ছিল। আগুনের প্রশংসায় কবিতা বলা এবং খলিফা আল-মাহদীর তীব্র ব্যঙ্গ (হিজা) করার অপরাধে খলিফার নির্দেশে ১৬৭ হিজরিতে তাঁকে চাবুক মেরে হত্যা করা হয়।
٩- ناقش تطور الأدب العربي بمصر في العصر الفاطمي-
[৯. ফাতেমীয় যুগে মিশরে আরবি সাহিত্যের বিকাশ ও সমৃদ্ধি আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. পটভূমি:
৩৫৮ হিজরিতে (৯৬৯ খ্রি.) ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইয লিদীনিল্লাহর সেনাপতি জওহর আস-সিকিল্লী মিশর বিজয় করে কায়রো নগরী প্রতিষ্ঠা করলে মিশর ইসলামি বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই দুই শতাব্দীর শাসনামলে মিশরে আরবি সাহিত্যের অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটে।
২. সাহিত্যের বিকাশের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ:
১. কবিতার বহুমুখী সমৃদ্ধি:
– আহলে বাইত ও খলিফাদের প্রশংসা: দরবারে কবিরা খলিফা ও তাঁদের বংশমর্যাদার ওপর উচ্চাঙ্গের প্রশংসাগীতি রচনা করতেন।
– উৎসব ও মেলাকেন্দ্রিক কবিতা: ফাতেমীয়রা ধর্মীয় উৎসব অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করত। মিলাদুন্নবী, আশুরা এবং বিশেষ করে নীল নদের প্লাবন (وفاء النيل) উপলক্ষে কবিরা বর্ণনামূলক দীর্ঘ কাসিদা লিখতেন।
২. জ্ঞান ও গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার:
– জামে আল-আজহার ও দারুল হিকমাহ: এই দুটি প্রতিষ্ঠান আরবি ব্যাকরণ, হাদিস, তাফসির এবং সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্রে রূপ নেয়। ৩৯৫ হিজরিতে প্রতিষ্ঠিত দারুল হিকমাহর গ্রন্থাগারে লক্ষাধিক প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগৃহীত ছিল।
৩. গদ্য ও পত্রসাহিত্যের (الإنشاء) চরম উৎকর্ষ:
ফাতেমীয় দরবারের রাষ্ট্রীয় দফতর ‘দীওয়ানুল ইনশা’ ছিল উচ্চমানের অলংকৃত গদ্যের প্রধান কারখানা। আল-কাদী আল-ফাদিল (পরবর্তী আইয়ুবী যুগের হলেও ফাতেমীয় প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা) এবং অন্যান্য কাতিবগণ ছন্দময় অলংকৃত গদ্যকে এক অনন্য শিল্পে পরিণত করেন।
৪. স্থানীয় ও বহিরাগত সাহিত্যিকদের মিলনমেলা:
আন্দালুস থেকে আগত মহাকবি ইবনে হানি আল-আন্দালুসী এবং ইয়েমেন থেকে আগত উমারা আল-ইয়ামানী মিশরে এসে সাহিত্যচর্চাকে উচ্চ শিখরে নিয়ে যান। একই সাথে মিশরের নিজস্ব কবিরা দেশপ্রেম ও নীলনদের মোহময় প্রকৃতি নিয়ে কবিতা রচনা করেন।
١٠- من المتنبي؟ قدر عبقريته الشعرية-
[১০. আল-মুতানাব্বি কে? তাঁর অনন্য কাব্যপ্রতিভা মূল্যায়ন কর:]
উত্তর:
১. আল-মুতানাব্বির পরিচয়:
আরবি সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকবি হলেন আবু আত-ত্বায়্যিব আহমাদ ইবনুল হুসাইন আল-জু’ফী আল-কিন্দি (৩০৩-৩৫৪ হি. / ৯১৫-৯৬৫ খ্রি.), যিনি ‘আল-মুতানাব্বি’ (المتنبي) নামে সমগ্র বিশ্বে প্রাতঃস্মরণীয়। বাল্যকালে ইরাকের সামাওয়াহ মরুভূমিতে নবুওয়াত দাবি করার অভিযোগে অথবা তাঁর কবিতার অনন্য আলৌকিক শক্তির কারণে তাঁকে ‘মুতানাব্বি’ বলা হয়।
২. তাঁর কাব্যজীবনের প্রধান পর্বসমূহ:
– সাইফুদ্দৌলার দরবার (আলেপ্পো পর্ব): তিনি হামদানি শাসক সাইফুদ্দৌলার দরবারে নয় বছর অবস্থান করেন এবং রোমানদের বিরুদ্ধে সাইফুদ্দৌলার যুদ্ধ ও বীরত্ব নিয়ে বিশ্বখ্যাত হামাসাহ কাসিদাসমূহ রচনা করেন।
– কাফুর আল-ইখশিদীর দরবার (মিশর পর্ব): মিশরের শাসক কাফুরের কাছে গিয়ে কোনো প্রদেশ বা গভর্নর পদের আশা করেছিলেন; কিন্তু ব্যর্থ হয়ে কাফুরের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নির্মম ব্যঙ্গকবিতা (هجاء) লিখে রাতে পালিয়ে যান।
– ইন্তেকাল: ৩৫৪ হিজরিতে বাগদাদ থেকে কুফা ফেরার পথে ফাতাক আল-আসাদী নামক এক ব্যক্তির হাতে নিহত হন।
৩. আল-মুতানাব্বির কাব্যিক প্রতিভা ও বৈদগ্ধের মূল্যায়ন:
১. কালের অবিসংবাদিত কণ্ঠস্বর: সমালোচক ইবনে রাশিক বলেন—মুতানাব্বির আবির্ভাবে অন্যান্য সমস্ত কবির আলো ম্লান হয়ে গিয়েছিল। এক প্রবাদে বলা হয়: «شغل الناس وملأ الدنيا» (তিনি গোটা বিশ্বকে ভরিয়ে দিয়েছেন এবং মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছেন)।
২. প্রজ্ঞাপূর্ণ দর্শন (الحكمة الخالدة): তাঁর কবিতায় জীবনদর্শন, মানবচরিত্রের দুর্বলতা, আত্মমর্যাদা ও সাহসিকতা প্রবাদের মতো চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। যেমন: «إذا رأيت نيوب الليث بارزة * فلا تظنن أن الليث يبتسم» (যখন সিংহের দাঁত বের হতে দেখবে, ভেবো না যে সিংহটি হাসছে!)।
৩. অহংকার ও আত্মমর্যাদাবোধ (الفخر الذاتي): তাঁর নিজের আত্মমর্যাদাবোধ ছিল অতুলনীয়। তাঁর সেই অমর চরণ যা তাঁর মৃত্যুরও কারণ হয়েছিল:
«الخَيْلُ وَاللَّيْلُ وَالبَيْدَاءُ تَعْرِفُنِي * وَالسَّيْفُ وَالرُّمْحُ وَالقِرْطَاسُ وَالقَلَمُ»
(যুদ্ধাশ্ব, নিশীথ রাত্রি ও উন্মুক্ত মরুপ্রান্তর আমাকে চেনে; তরবারি, বর্শা, কাগজের পাতা ও কলম আমাকে ভালো করেই জানে!)।
١١- تحدث عن أوضاع الأدب العربي في عهد الخلافة العثمانية-
[১১. উসমানীয় খেলাফত আমলে আরবি সাহিত্যের সার্বিক অবস্থা ও গতিপ্রকৃতি আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. ঐতিহাসিক পটভূমি:
১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান সেলিম কর্তৃক মামলুক সালতানাতের পতনের মাধ্যমে মিশর ও শাম বিজয়ের পর আরব বিশ্ব উসমানীয় খেলাফতের অধীনে আসে এবং ১৯১৭ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত প্রায় চারশত বছর এই শাসন স্থায়ী হয়। সাহিত্যের ইতিহাসে এই দীর্ঘ পর্বকে প্রায়শই ‘অন্ধকার যুগ’ বা স্থবিরতার কাল (عصر الركود والانحطاط) বলা হয়।
২. উসমানীয় যুগে সাহিত্যের দুর্বলতার প্রধান কারণসমূহ:
১. তুর্কি ভাষার রাজকীয় প্রাধান্য: উসমানীয় দরবার, প্রশাসন ও সামরিক বিভাগে তুর্কি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়, ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরবি সাহিত্যিক পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
২. দরবারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব: বাগদাদ ও কায়রো তাদের সাবেক জৌলুস হারিয়ে ইস্তাম্বুলের অধীনস্থ প্রাদেশিক শহরে পরিণত হয়; ফলে কবিদের প্রতিভা বিকাশের কোনো রাজকীয় অনুপ্রেরণা ছিল না।
৩. কৃত্রিম অলংকারের মোহ (الصنعة اللفظية): বিষয়বস্তুর গভীরতা হারিয়ে কবিতা ও গদ্য কেবল শব্দ নিয়ে খেলা, শব্দের মারপ্যাঁচ, ইতিহাস গণনা (হিসাবুল জুম্মাল) এবং দুর্বোধ্য ধাঁধায় পর্যবসিত হয়।
৩. সাহিত্যের ইতিবাচক দিক ও টিকে থাকা সম্পদ:
স্থবিরতা সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক ধারা সম্পূর্ণ সচল ছিল:
– ইসলামি ঐতিহ্য ও বিশ্বকোষ সংকলন: ধর্মীয় বিজ্ঞান, তাফসির ও হাদিসের বিশাল সংকলন অব্যাহত ছিল। শায়েখ মুরতাজা আজ-জাবিদি ‘তাজুল আরূস’ নামক সুবিশাল আরবি অভিধান সংকলন করেন।
– আল-আজহারের ভূমিকা: মিশরের জামে আল-আজহার আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের ঐতিহ্যকে অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে প্রদীপের মতো জ্বালিয়ে রাখে।
– বদিইয়্যাত ধারার নাত রচনা: সাফিয়্যুদ্দীন আল-হিল্লীর অনুসরণে নবীজির প্রশংসায় বহু অলংকৃত দীর্ঘ ‘বদিইয়্যাত’ কাসিদা এ যুগে রচিত হয়।
١٢- من هو بديع الزمان الهمذاني؟ تحدث عن خدماته في الأدب العربي-
[১২. বদিউজ্জামান আল-হামাদানি কে? আরবি সাহিত্যে তাঁর অবদান ও মাকামার রূপায়ন আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. বদিউজ্জামান আল-হামাদানির পরিচয়:
আরবি কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ‘মাকামাত’ শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা হলেন আবু আল-ফাদল আহমদ ইবনুল হুসাইন আল-হামাদানি (৩৫৮-৩৯৮ হি. / ৯৬৯-১০০৮ খ্রি.), যিনি তাঁর অলৌকিক পাণ্ডিত্য ও বাচনভঙ্গির কারণে ‘বদিউজ্জামান’ (بديع الزمان – যুগের বিস্ময়) উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি পারস্যের হামাদান শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং হেরাত (বর্তমান আফগানিস্তান) শহরে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
২. আরবি সাহিত্যে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান ও মাকামার উদ্ভাবন:
১. মাকামাত শিল্পের আবিষ্কার (ابتكار فن المقامات):
৩৭৫ হিজরিতে হামাদানি আরবি সাহিত্যে সর্বপ্রথম ‘মাকামাহ’ নামক অভিনব ক্ষুদ্র নাট্যগল্পরীতির উদ্ভাবন করেন। তিনি ‘ঈসা ইবনে হিশাম’ (عيسى بن هشام)-কে কথক বা বর্ণনাকারী এবং ‘আবু আল-ফাতাহ আল-ইসকান্দারী’ (أبو الفتح الإسكندري)-কে ধূর্ত ও চতুর ভবঘুরে নায়ক বানিয়ে প্রায় চারশত মাকামা রচনা করেন, যার মধ্যে প্রায় ৫২টি সংকলিত আকারে টিকে রয়েছে।
২. অলংকৃত ছন্দময় গদ্যের প্রবর্তন (السجع الفني):
তিনি মাকামায় ছন্দময় অন্ত্যমিলযুক্ত গদ্য (সাজ’) প্রয়োগ করে গদ্যে কবিতার মতো সংগীতময় সুর ও দ্যোতনা তৈরি করেন, যা পরবর্তীকালে আরবি গদ্যের প্রধান অলংকারে পরিণত হয়।
৩. সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চিত্রায়ন:
তিনি ভবঘুরে নায়কের মাধ্যমে আব্বাসী যুগের চরম সামাজিক সংকট, শ্রেণিভেদ, ভণ্ডামি ও মানুষের অন্ধ বিশ্বাসকে নিখুঁত ব্যঙ্গ ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুকের মাধ্যমে চিত্রায়িত করেছেন।
৪. রিসালাহ বা পত্রসাহিত্য (الرسائل):
মাকামাত ছাড়াও তাঁর রচিত ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক পত্রাবলি আরবি গদ্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
৫. উত্তরসূরিদের পথপ্রদর্শক:
তাঁর উদ্ভাবিত এই ধারাকে পরবর্তীতে আল-হারিরি ‘মাকামাতে হারিরি’ এবং আধুনিক যুগে নাসিফ আল-ইয়াজিজি পুনরুজ্জীবিত করেন।
المجموعة (ب)
[সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রশ্নাবলি – পূর্ণমান: ২০]
١٣- اكتب مساهمة ابن قتيبة في النثر العربي-
[১৩. আরবি গদ্যে ইবনে কুতায়বাহর অবদান সংক্ষেপে লেখ:]
উত্তর:
আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে মুসলিম ইবনে কুতায়বাহ আদ-দিনাওয়ারী (২১৩-২৭৬ হি.) ছিলেন আব্বাসী স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও সমালেচক। আরবি গদ্যে তাঁর প্রধান অবদানসমূহ:
১. ‘আদাবুল কাতিব’ (أدب الكاتب): সরকারি কর্মকর্তা ও লেখকদের জন্য ব্যাকরণ, ভাষার শুদ্ধতা ও অলংকার ব্যবহারের এক অতুলনীয় নির্দেশিকা গ্রন্থ।
২. ‘আশ-শি’রু ওয়াশ শুআরা’ (الشعر والشعراء): এতে তিনি প্রাচীন আরবি কবিতার কাঠামো ও সমালোচনার প্রামাণ্য ভিত্তি স্থাপন করেন।
৩. ‘উয়ূনুল আখবার’ (عيون الأخبار): রাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধ, নেতৃত্ব, ইলম ও আদব বিষয়ক ১০ খণ্ডের এক বিশাল সাহিত্যিক বিশ্বকোষ।
৪. সহজ ও মার্জিত ভাষা: আল-জাহিজের দীর্ঘ ও জটিল শৈলীর বিপরীতে ইবনে কুতায়বাহ সংক্ষিপ্ত, সুশৃঙ্খল ও স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক গদ্যধারার প্রবর্তন করেন।
١٤- من ألف ‘كتاب الاغاني’؟ بين موضوع هذا الكتاب-
[১৪. ‘কিতাবুল আগানী’ কে সংকলন করেছেন? এ গ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা কর:]
উত্তর:
১. সংকলকের পরিচয়:
বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক বিশ্বকোষ ‘কিতাবুল আগানী’ (كتاب الأغاني) সংকলন করেছেন আব্বাসী যুগের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ আবু আল-ফারাজ আল-ইসফাহানী (২৮৪-৩৫৬ হি. / ৮৯৭-৯৬৭ খ্রি.)। এই সুবিশাল গ্রন্থটি রচনা করতে তাঁর দীর্ঘ ৫০ বছর সময় লেগেছিল।
২. গ্রন্থের বিষয়বস্তু:
খলিফা হারুনুর রশীদের জন্য তৎকালীন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ইবরাহীম আল-মাওসিলীর বাছাইকৃত একশত গানের ওপর ভিত্তি করে গ্রন্থটির সূচনা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি জাহেলি যুগ থেকে শুরু করে চতুর্থ হিজরি শতক পর্যন্ত সমগ্র আরব জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত, কবিদের পূর্ণাঙ্গ জীবনী ও সামাজিক ইতিহাসের এক অনন্য মহাসমুদ্র। এতে কবিদের বংশপরিচয়, তাঁদের বিখ্যাত কবিতার প্রেক্ষাপট এবং আরবদের যুদ্ধের ইতিহাস চমৎকারভাবে সংকলিত হয়েছে।
١٥- ما الموشحات؟ بين بالوضاحة-
[১৫. মুওয়াশশাহ (الموشحات) কী? তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দাও:]
উত্তর:
১. সংজ্ঞা ও আভিধানিক অর্থ:
‘মুওয়াশশাহ’ শব্দটি এসেছে ‘উশাহ’ (الوشاح) থেকে, যার অর্থ রত্নখচিত কোমরবন্ধনী বা নারীদের অলংকৃত কণ্ঠহার। যেহেতু এই কবিতাটি বিভিন্ন স্তবক ও ছন্দের বৈচিত্র্যে সুসজ্জিত থাকে, তাই একে মুওয়াশশাহ বলা হয়।
২. সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও আবিষ্কারক:
তৃতীয় হিজরি শতকের শেষভাগে আন্দালুসের কবি মুকাদ্দাম ইবনে মুয়াফা আল-কবরী সর্বপ্রথম এই গীতিকাব্য ধারার প্রবর্তন করেন। প্রাচীন আরবি কবিতার একক অন্ত্যমিলের কঠোর নিয়ম ভেঙে এতে একাধিক স্তবক, বৈচিত্র্যময় মিল এবং শেষে স্থানীয় রোমান্স ভাষার সাথে মিশ্রিত এক বিশেষ অন্তরা বা ‘খারজাহ’ (الخرجة) ব্যবহার করা হয়। গান ও বাদ্যযন্ত্রের সাথে পরিবেশনের উপযোগী এ কাব্যধারা আন্দালুসীয় সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মৌলিক আবিষ্কার।
١٦- ما التوقيعات؟ بين بالأمثلة-
[১৬. তাওকিআত (التوقيعات) কী? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা কর:]
উত্তর:
১. তাওকিআতের সংজ্ঞা:
আরবি ‘তাওকিআত’ (التوقيعات) হলো আব্বাসী যুগের এক বিশেষ গদ্যরীতি; যেখানে খলিফা, উজিরে আজম বা উচ্চপদস্থ শাসকগণ তাঁদের কাছে পেশ করা কোনো আবেদনপত্র, প্রশাসনিক অভিযোগ বা বিচার্য নথির ওপর তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও বাক্যালংকারযুক্ত নির্দেশনামূলক মন্তব্য লিখে দিতেন।
২. উদাহরণসমূহ:
১. খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর এক নির্যাতিত প্রজার আবেদনের ওপর জালেম গভর্নরের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন: «مَنْ حَرَسَهُ العَدْلُ لَمْ يَخَفْ، وَمَنْ أَهْمَلَهُ لَمْ يَأْمَنْ» (ন্যায়বিচার যাকে পাহারা দেয় সে ভয় পায় না, আর যে ন্যায়বিচার অবহেলা করে সে কখনো নিরাপদ থাকে না)।
২. জাফর ইবনে ইয়াহইয়া বারমাকী এক কর্মচারীর দুর্নীতি ও অর্থলোভের জবাবে লিখেছিলেন: «قَلِّلْ كَلَامَكَ تَكْثُرْ صَوَابُكَ» (কথা কমাও, তোমার সঠিক কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে)।
١٧- علق على كتاب ‘العقد الفريد’-
[১৭. ‘আল-ইকদুল ফরিদ’ গ্রন্থের ওপর একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখ:]
উত্তর:
১. গ্রন্থ ও লেখকের পরিচয়:
‘আল-ইকদুল ফরিদ’ (العقد الفريد – অনুপম কণ্ঠহার) স্পেনের কর্ডোবার বিশিষ্ট আন্দালুসীয় সাহিত্যিক ইবনে আবদে রাব্বিহি আল-আন্দালুসী (২৪৬-৩২৮ হি. / ৮৬০-৯৪০ খ্রি.) রচিত এক অমর সাহিত্য সংকলন।
২. গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য:
গ্রন্থটি ২৫টি অধ্যায়ে বিভক্ত, এবং প্রতিটি অধ্যায়কে একটি দুর্লভ রত্নপাথরের (যেমন: ইয়াকুত, জমরুদ, মুক্তা, প্রবাল) নামে নামকরণ করা হয়েছে। মাঝের অধ্যায়টিকে বলা হয়েছে ‘আল-ওয়াসিতাহ’ (মধ্যমণি)। এতে রাষ্ট্র পরিচালনা, যুদ্ধবিদ্যা, বাগ্মিতা, কবিতা, ইতিহাস, কৌতুক ও ধর্মীয় উপদেশ সংকলিত হয়েছে। প্রাচ্যের সাহিত্যপ্রেমী সাহেব ইবনে আব্বাদ গ্রন্থটি পড়ে বলেছিলেন: «هذه بضاعتنا ردت إلينا» (এটি তো প্রাচ্যেরই জ্ঞানভাণ্ডার যা আমাদের কাছেই ফেরত পাঠানো হয়েছে); কারণ এতে আন্দালুসের চেয়ে প্রাচ্যের আব্বাসী সাহিত্যের উপাদানই প্রাধান্য পেয়েছিল।
١٨- ما الخطابة؟ اذكر أنواعها في العصر العباسي-
[১৮. খুতবা বা বক্তৃতা (الخطابة) কী? আব্বাসী যুগে এর প্রকারভেদ উল্লেখ কর:]
উত্তর:
১. খুতবার সংজ্ঞা:
‘আল-খিতাবাহ’ (الخطابة) হলো সাধারণ জনতার উপস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তাদের অন্তরে কোনো বিশেষ আদর্শ সঞ্চার করা, উদ্বুদ্ধ করা বা তাদের কোনো মতামত গ্রহণে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বাগ্মী ও প্রাঞ্জল বক্তৃতা।
২. আব্বাসী যুগে খুতবার প্রধান প্রকারভেদসমূহ:
১. ধর্মীয় বক্তৃতা (الخطابة الدينية): জুমুআ, দুই ঈদ এবং হজ উপলক্ষে মিম্বরে দাঁড়িয়ে দেওয়া আধ্যাত্মিক উপদেশমূলক খুতবা।
২. রাজনৈতিক বক্তৃতা (الخطابة السياسية): নতুন খলিফার বায়াত গ্রহণ, কোনো বিদ্রোহের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি অথবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা ঘোষণার জন্য দেওয়া খুতবা।
৩. যুদ্ধকালীন বক্তৃতা (الخطابة الحماسية والعسكرية): রোমান বা শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনীকে জিহাদ ও শাহাদাতের অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য সেনাপতিদের খুতবা।
৪. সামাজিক ও বিয়ে-শাদির বক্তৃতা (الخطابة الحفلية): সামাজিক বিবাহ ও সমঝোতার মজলিসে প্রদত্ত ভাষণ। তবে লিখিত গদ্য ও পত্রসাহিত্যের অভাবনীয় উন্নতির কারণে উমাইয়া যুগের তুলনায় আব্বাসী যুগে মৌখিক খুতবার ব্যবহার কিছুটা কমে এসেছিল।
١٩- تحدث عن أهم أعمال الخليل بن احمد الفراهيدي-
[১৯. আল-খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদির প্রধান প্রধান বৈজ্ঞানিক ও ভাষাতাত্ত্বিক অবদান আলোচনা কর:]
উত্তর:
আবু আবদুর রহমান আল-খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদি আল-বাসরী (১০০-১৭০ হি. / ৭১৮-৭৮৬ খ্রি.) ছিলেন আরবি ভাষাবিজ্ঞান ও সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জিনিয়াস ও উদ্ভাবক। তাঁর প্রধান কীর্তিসমূহ:
১. ছন্দশাস্ত্রের আবিষ্কার (علم العروض): তিনি প্রাচীন আরবি কবিতার সুর ও বিন্যাস গবেষণা করে কবিতার ১৫টি মূল ছন্দ বা ‘বহর’ (بحور الشعر) আবিষ্কার করেন (পরবর্তীতে আল-আখফাশ ১৬তম বহর যোগ করেন)।
২. সর্বপ্রথম আরবি অভিধান সংকলন (معجم العين): তিনি ধ্বনিতত্ত্বের ভিত্তিতে মাখরাজ অনুযায়ী বর্ণ সাজিয়ে আরবি সাহিত্যের ইতিহাসের সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ অভিধান ‘কিতাবুল আইন’ সংকলন করেন।
৩. আরবি হরকতের আধুনিকীকরণ: তিনিই আরবি লিপিতে যের, যবর, পেশ, সুকুন, তাশদীদ ও হামযার আধুনিক চিহ্নগুলো উদ্ভাবন করেন যা আজও গোটা মুসলিম বিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৪. সিবাবাইহির মতো শিষ্যের দীক্ষাদান: আরবি ব্যাকরণের জনক সিবাবাইহির প্রধান উস্তাদ ছিলেন আল-খলিল।
٢٠- ما هي حركة الشعوبية؟
[২০. শুউবিয়্যাহ আন্দোলন (حركة الشعوبية) কী? আরবি সাহিত্যে এর প্রভাব আলোচনা কর:]
উত্তর:
১. শুউবিয়্যাহর সংজ্ঞা:
‘শুউবিয়্যাহ’ (الشعوبية) হলো আব্বাসী যুগে অনারব বিশেষত পারসিক বংশোদ্ভূত বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকদের মাঝে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন; যার মূল উদ্দেশ্য ছিল আরব জাতির কথিত শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করা, সাম্যের দাবি তোলা এবং পরবর্তীতে উল্টো আরবদের উপহাস করে পারসিক প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে জাহির করা। শব্দটি পবিত্র কুরআনের সূরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াত (شعوباً وقبائل) থেকে নেওয়া হয়েছে।
২. আরবি সাহিত্যে এর প্রভাব:
১. তীব্র কাব্যিক বিতর্ক: বাশ্শার ইবনে বুরদ ও আবু নুওয়াসের মতো পারসিক বংশোদ্ভূত কবিরা আরবের মরুজীবন, গুই সাপ ভক্ষণ ও যাযাবর স্বভাব নিয়ে ব্যঙ্গ করতেন এবং সানজান ও পারস্যের সুউচ্চ প্রাসাদের প্রশংসা করতেন।
২. আরব আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক সাহিত্যের সৃষ্টি: শুউবিয়্যাহর মোকাবিলার জন্য আল-জাহিজ ‘আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন’ এবং ইবনে কুতায়বাহ ‘ফাদলুল আরব’ রচনা করে আরবের ভাষা, প্রজ্ঞা ও বাগ্মিতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।
৩. অনুবাদ সাহিত্যের জোয়ার: পারসিক ইতিহাস, দর্শন ও গল্প (যেমন: কালিলহ ওয়া দিমনাহ) আরবিতে অনূদিত হয়ে আরবি সাহিত্যের পরিধিকে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে আব্বাসী যুগকে কেন স্বর্ণযুগ বলা হয়?
উত্তর: আব্বাসী যুগে বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা, পারসিক-গ্রিক-ভারতীয় দর্শনের ব্যাপক অনুবাদ, নতুন কাব্যধারা ও অলংকৃত গদ্যের বিকাশ এবং আল-জাহিজ, মুতানাব্বি ও হামাদানির মতো কালজয়ী সাহিত্যিকদের আবির্ভাবের কারণে এই সুদীর্ঘ সময়কালকে আরবি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়।
প্রশ্ন ২: আল-মুতানাব্বির কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: আল-মুতানাব্বির কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো গভীর জীবনদর্শন ও প্রজ্ঞা (হিকমাহ), তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ ও বীরত্বগাঁথা (হামাসাহ), এবং অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও শক্তিশালী শব্দশৈলী যা শত শত বছর ধরে প্রবাদের মর্যাদা পেয়ে আসছে।
প্রশ্ন ৩: ‘মাকামাত’ সাহিত্য বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মাকামাত হলো আব্বাসী যুগে বদিউজ্জামান আল-হামাদানি কর্তৃক উদ্ভাবিত এক বিশেষ ধরনের রূপক ক্ষুদ্র নাট্যগল্প; যা অত্যন্ত অলংকৃত ছন্দময় গদ্যে (সাজ’) রচিত হয় এবং যাতে একজন নির্দিষ্ট কথক ও একজন ধূর্ত ভবঘুরে কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকে।
প্রশ্ন ৪: স্পেনে মুওয়াশশাহ কাব্যের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল?
উত্তর: আন্দালুসের প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্য ও সংগীতপ্রিয় পরিবেশের কারণে কবি মুকাদ্দাম ইবনে মুয়াফা আল-কবরী প্রাচীন আরবি কবিতার কঠোর একক অন্ত্যমিল ভেঙে একাধিক স্তবক ও স্থানীয় সুরযুক্ত ‘মুওয়াশশাহ’ কাব্যের উদ্ভাবন করেন।
প্রশ্ন ৫: শুউবিয়্যাহ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য কী ছিল?
উত্তর: শুউবিয়্যাহ আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল অনারবদের সামাজিক সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা, কিন্তু কালক্রমে তা আরবদের মরুজীবন ও সংস্কৃতির বিরোধিতা করে প্রাচীন পারসিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চরমপন্থী সাহিত্যিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
প্রশ্ন ৬: আল-খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদির প্রধান আবিষ্কার কোনটি?
উত্তর: আল-খলিল ইবনে আহমদ সর্বপ্রথম আরবি কবিতার ছন্দশাস্ত্র বা ইলমুল আরূজের ১৫টি মৌলিক বহর আবিষ্কার করেন এবং ধ্বনিতত্ত্বের ভিত্তিতে ইতিহাসের প্রথম আরবি অভিধান ‘কিতাবুল আইন’ সংকলন করেন।