ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: আরবি ভাষা ও সাহিত্য
বিষয়: আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية – Prophet’s Biography)
বিষয় কোড: ২০৪৩০৩ | পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (أ) : الأسئلة المقالية (ক-অংশ: রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
١- صف الحالات الاجتماعية والسياسية والثقافية في شبه الجزيرة العربية قبل المبعث النبوي-
[১. নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে আরব উপদ্বীপের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার বিবরণ দাও।]
ক. ঐতিহাসিক পটভূমি ও জাহেলী যুগের পরিচয়
নবী করীম ﷺ-এর আবির্ভাবের পূর্ববর্তী যুগকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়। এ যুগে আরব সমাজ সার্বিক দিক থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
খ. প্রাক-ইসলামী আরবের সার্বিক অবস্থা
- সামাজিক অবস্থা (الحالة الاجتماعية):
সমাজ ছিল বহুবিবাহ, ব্যভিচার ও মাদকাসক্তিতে নিমজ্জিত। নারীদের কোনো মানবিক অধিকার ছিল না; কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়াকে চরম অপমানের বিষয় মনে করে জীবন্ত প্রোথিত (ওয়াদুল বানাত) করা হতো। দাস-দাসীদের ওপর চালানো হতো অবর্ণনীয় পাশবিক নির্যাতন। শ্রেণিভেদ ও গোত্রীয় অহমিকা সমাজকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে রেখেছিল। - রাজনৈতিক অবস্থা (الحالة السياسية):
গোটা আরবে কোনো কেন্দ্রীয় সরকার বা সুসংহত শাসনব্যবস্থা ছিল না। আরবরা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল এবং গোত্রপ্রধানের (শায়খুল কাবীলাহ) আদেশই ছিল চূড়ান্ত আইন। সামান্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর রক্তক্ষয়ী গোত্রীয় যুদ্ধ সংঘটিত হতো (যেমন—বাসুস যুদ্ধ, ফিজার যুদ্ধ)। আইন ছিল যার শক্তি আছে তারই অধিকার (Might is Right)। - ধর্মীয় অবস্থা (الحالة الدينية):
তাওহীদের ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে শির্ক ও মূর্তিপূজায় সমাজ ডুবে গিয়েছিল। পবিত্র কা’বা গৃহেই ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল (যেমন লাত, মানাত, উয্যা, হুবাল)। এছাড়া অগ্নিপূজা ও নক্ষত্রপূজার প্রচলন ছিল। - সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক অবস্থা (الحالة الثقافية):
নৈতিক অবক্ষয় চরম মাত্রায় থাকলেও আরবরা ভাষা, স্মৃতিশক্তি ও কাব্যচর্চায় পৃথিবীর মধ্যে অনন্য মর্যাদার অধিকারী ছিল। তারা অনারবদের ‘আজম’ (বোবা) বলত। উকাজের মেলায় কবিরা কাব্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিত এবং শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো কা’বা ঘরের দেয়ালে স্বর্ণাক্ষরে ঝুলিয়ে রাখা হতো (মুআল্লাকাত)। বক্তৃতাদান ও অশ্বারোহণে তাদের বিশেষ পারদর্শিতা ছিল।
٢- ما هي أسباب الهجرة النبوية إلى المدينة؟ وبين تأثيرها في تاريخ الإسلام-
[২. মদিনায় হিজরতের কারণসমূহ কী ছিল? ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের প্রভাব আলোচনা কর।]
ক. হিজরতের কারণসমূহ (أسباب الهجرة النبوية)
হিজরত অর্থ দ্বীনের খাতিরে জন্মভূমি ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে গমন। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবীগণের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের প্রধান কারণগুলো ছিল:
- ১. মক্কার কুরাইশদের অবর্ণনীয় নির্যাতন: তেরো বছর ধরে মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে সাহাবী ও স্বয়ং রাসূলুল্লাহর ওপর কুরাইশরা পাশবিক জুলুম চালায়। বয়কট (শে’বে আবি তালিবের অবরোধ) এবং শীর্ষ সাহাবীদের হত্যার ষড়যন্ত্র চরমে পৌঁছে।
- ২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যার ষড়যন্ত্র: ‘দারুন নাদওয়া’য় কুরাইশ নেতারা আবু জাহেলের পরামর্শে সর্বগোত্রীয় যুবকদের দ্বারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে অবহিত করে হিজরতের আদেশ দেন (সূরা আল-আনফাল: ৩০)।
- ৩. মদিনাবাসীর আন্তরিক আমন্ত্রণ ও বাইয়াত: আকাবার দুটি ঐতিহাসিক শপথের মাধ্যমে মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়।
- ৪. স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা: দ্বীন ইসলামের সার্বিক বিধান—ইবাদত, আইন, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি স্বাধীন ভৌগোলিক ঘাঁটির অপরিহার্যতা দেখা দিয়েছিল।
খ. ইসলামের ইতিহাসে হিজরতের প্রভাব (تأثير الهجرة في تاريخ الإسلام)
- নতুন যুগের সূচনা ও হিজরী সন: হিজরত ইসলামের দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তির যুগে প্রবেশের সন্ধিক্ষণ। খলীফা উমর (রা.) হিজরতকে কেন্দ্র করেই ইসলামী বর্ষপঞ্জিকা (হিজরী সন) প্রবর্তন করেন।
- মদিনা রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন: হিজরতের ফলেই বিশ্বে প্রথম ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র ও লিখিত সংবিধান (মদিনা সনদ) প্রতিষ্ঠিত হয়।
- মুহাজির ও আনসারদের অনন্য ভ্রাতৃত্ব: মক্কার নিঃস্ব মুহাজিরদের সাথে মদিনার আনসারদের যে আত্মিক ও অর্থনৈতিক ভ্রাতৃত্ব (মুআখাত) প্রতিষ্ঠিত হয়, তা মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন।
- বিশ্বজয়ের পথ উন্মোচন: মদিনা থেকেই বদর, ওহুদ ও খন্দকের প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয় এবং শেষ পর্যন্ত মক্কা বিজয় ও বৈশ্বিক বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়।
٣- اكتب عن معراج النبي صلى الله عليه وسلم وأهميته وإمكانيته بالأدلة-
[৩. মিরাজের ঐতিহাসিক ঘটনা, এর গুরুত্ব এবং যৌক্তিক ও শরয়ী সম্ভাব্যতা দলিলসহ লেখ।]
ক. ইসরা ও মিরাজের পরিচয়
‘ইসরা’ অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ (মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত) এবং ‘মিরাজ’ অর্থ ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ (বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে সিদরাতুল মুনতাহা ও মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ)। নবুওয়াতের একাদশ বর্ষে রজব মাসের ২৭ তারিখে জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই অলৌকিক ভ্রমণ সংঘটিত হয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: «سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى» (সূরা আল-ইসরা: ১)।
খ. মিরাজের যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা (إمكانية المعراج)
- কুদরতে ইলাহীর প্রমাণ: সর্বশক্তিমান আল্লাহ যিনি এক মুহূর্তে কোটি কোটি নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কুদরতের কাছে একজন সৃষ্টিকে মহাবিশ্ব ভ্রমণ করানো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সহজ। আয়াতে ‘বি-আবদিহি’ (তাঁর বান্দাকে নিয়ে গেছেন) শব্দ ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে ভ্রমণকারী রাসূল নন, ভ্রমণ করিয়েছেন স্বয়ং সর্বশক্তিমান আল্লাহ।
- আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের আলোর গতি ও মহাকাশযানের সফল অভিযাত্রা প্রমাণ করে যে মহাকর্ষ বল ভেদ করে স্থান-কালের সীমানা পেরোনো বৈজ্ঞানিকভাবেও যুক্তিসঙ্গত।
গ. মিরাজের তাৎপর্য ও শিক্ষা
- দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উপহার: মিরাজ রজনীতে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়, যা মুমিনের আত্মিক মিরাজস্বরূপ।
- আল্লাহর কুদরত ও পূর্ববর্তী নবীদের সাথে সাক্ষাৎ: ঊর্ধ্বাকাশে আদম, মূসা, ঈসা ও ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ এবং জান্নাত-জাহান্নামের চাক্ষুষ দৃশ্য রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রত্যক্ষ করেন।
- মুমিনের ঈমানের কষ্টিপাথর: মিরাজের ঘটনা শোনার পর আবু বকর (রা.) একবিন্দু সংশয় ছাড়া বিশ্বাস স্থাপন করে ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে ভূষিত হন।
٤- بين الأعمال الهامة التي قام بها النبي صلى الله عليه وسلم بعد وصوله إلى المدينة-
[৪. মদিনায় পৌঁছার পর নবী করীম ﷺ যেসব ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন তা আলোচনা কর।]
মদিনায় হিজরতের পর গৃহীত প্রধান কার্যাবলি
- মসজিদে নববী নির্মাণ (بناء المسجد النبوي): মদিনায় পদার্পণ করে রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বাগ্রে কুবায় মসজিদ এবং মদিনায় মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এটি কেবল ইবাদতের স্থান ছিল না, বরং পার্লামেন্ট, সুপ্রিম কোর্ট, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় (আসহাবুসুফফাহ) হিসেবে কাজ করত।
- মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্ব স্থাপন (المؤاخاة بين المهاجرين والأنصار): মক্কা থেকে সহায়-সম্বলহীনভাবে আসা মুহাজিরদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মদিনার আনসারদের সাথে রক্তের সম্পর্কের মতো এক অনন্য ঐতিহাসিক ভ্রাতৃত্ব চুক্তি স্থাপন করেন।
- মদিনা সনদ প্রণয়ন (ميثاق المدينة): মদিনায় বসবাসকারী মুসলিম, অমুসলিম ও ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ৪৭ বা ৫৩টি ধারাবিশিষ্ট বিশ্বের প্রথম লিখিত রাষ্ট্রীয় সংবিধান ‘মদিনা সনদ’ রচনা করেন।
- মদিনার সুদমুক্ত বাজার প্রতিষ্ঠা (سوق المدينة): ইহুদিদের সুদী ও অনৈতিক বাজার সিন্ডিকেটের হাত থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করতে স্বাধীন সুদমুক্ত বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
- প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনী গঠন: বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে গোয়েন্দা শাখা গঠন এবং বিভিন্ন গোত্রের সাথে নিরপেক্ষতার সামরিক মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেন।
٥- اذكر أسباب فتح مكة ونتائجه وتأثيره على نشر الإسلام-
[৫. মক্কা বিজয়ের কারণ, ফলাফল এবং ইসলাম প্রচারে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বর্ণনা কর।]
ক. মক্কা বিজয়ের প্রত্যক্ষ কারণ (৮ম হিজরী / ৬৩০ খ্রি.)
হুদাইবিয়ার ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি অনুযায়ী মক্কার কুরাইশদের সাথে বনু বকর এবং মুসলিমদের সাথে বনু খুযাআ গোত্র মিত্র হিসেবে আবদ্ধ ছিল। কুরাইশরা গোপনে অস্ত্র ও লোকবল দিয়ে হুদাইবিয়ার চুক্তি লঙ্ঘন করে রাতের আঁধারে মুসলিম মিত্র বনু খুযাআর ওপর হামলা চালায়। খুযাআ গোত্র রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট নিরাপত্তা ও বিচার চাইলে তিনি কুরাইশদের তিনটি শর্ত দেন। কুরাইশরা অহংকারবশত চুক্তি বাতিল করলে ৮ম হিজরীর রমজান মাসে ১০,০০০ সাহাবীর বাহিনী নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় সম্পন্ন করেন।
খ. মক্কা বিজয়ের ফলাফল ও ইসলাম প্রচারে প্রভাব
- সাধারণ ক্ষমা ও মানবীয় মহানুভবতা: দীর্ঘ ২১ বছর যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল, সেই চরম শত্রুদের সামনে তিনি ঘোষণা করলেন: «لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ، اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ» — “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই; যাও, তোমরা সবাই মুক্ত-স্বাধীন!” এই ক্ষমার পরাকাষ্ঠা দেখে আবু সুফিয়ান ও ইকরামা সহ কুরাইশরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।
- মূর্তি ধ্বংস ও তাওহীদের পুনরুজ্জীবন: কা’বা গৃহের ৩৬০টি মূর্তি নিজ হাতে অপসারণ করে রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেন: «جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا» — “সত্য সমাগত এবং মিথ্যা অপসৃত, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” (সূরা আল-ইসরা: ৮১)।
- গোটা আরবে ইসলামের বিজয়: মক্কা বিজয়ের পর গোটা আরব উপদ্বীপের গোত্রসমূহ দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। কুরআন এটিকে ‘ফাতহুম মুবীন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছে।
٦- اكتب عن شمائل النبي صلى الله عليه وسلم وخصاله الحميدة في ضوء القرآن والحديث-
[৬. কুরআন ও হাদিসের আলোকে নবী করীম ﷺ-এর চারিত্রিক মাধুর্য ও অনুপম গুণাবলি আলোচনা কর।]
ক. কুরআনুল কারীমে নববী চরিত্রের প্রশংসাগাথা
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবীবের চরিত্র সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন: «وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ» — “নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের সর্বোত্তম শিখরে অধিষ্ঠিত।” (সূরা আল-কলম: ৪)। অপর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: «لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ» — “নিশ্চয় আল্লাহর রাসূলের মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।” (সূরা আল-আহযাব: ২১)। হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসূলুল্লাহর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: «كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ» — “কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।”
খ. শামায়েলে নববীর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- পরম করুণা ও রহমত: তিনি শুধু মুমিনদের জন্য নন, বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ (রহমাতুল্লিল আলামীন)। তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত হয়েও তিনি শত্রুদের ধ্বংসের বদলে তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেছিলেন।
- বিনয় ও সাদাসিধে জীবনযাপন: অর্ধ-পৃথিবীর একচ্ছত্র শাসক হয়েও তিনি খেজুর পাতার পাটিতে ঘুমাতেন। কখনো নিজের খাবার নিয়ে কোনো খুঁত ধরতেন না এবং শিশুদের ভালোবেসে জড়িয়ে ধরতেন।
- সত্যবাদিতা ও আমানতদারি: নবুওয়াত পূর্ব জীবনেই মক্কার ঘোর শত্রুরাও তাঁকে ‘আল-আমীন’ (বিশ্বস্ত) ও ‘আস-সাদিক’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
- সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা: যুদ্ধের ময়দানে চরম সংকটেও সাহাবীগণ তাঁর পেছনে আশ্রয় নিতেন। তিনি যেমন ছিলেন স্নেহময় পিতা, তেমনি দূরদর্শী সেনাপতি ও রাষ্ট্রনায়ক।
مجموعة (ب) : الأسئلة الموجزة (খ-অংশ: সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
٧- اكتب نبذة عن هجرة المسلمين الأولى والثانية إلى الحبشة-
[৭. হাবশায় মুসলমানদের প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।]
হাবশায় হিজরতের পটভূমি ও ঘটনাবলি
মক্কার মুশরিকদের চরম নির্যাতনের মুখে নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে (৬১৫ খ্রি.) রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান রাজা নাজ্জাশীর শাসনাধীন হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরতের অনুমতি দেন।
প্রথম হিজরত: হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাহ (রা.)-সহ ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী গোপনে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে হাবশায় গমন করেন।
দ্বিতীয় হিজরত: অল্প কিছুদিন পর জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী হাবশায় দ্বিতীয়বার হিজরত করেন। কুরাইশরা নাজ্জাশীর দরবারে তাদের ফিরিয়ে নিতে প্রতিনিধি পাঠালে হযরত জাফর (রা.) সূরা মারইয়ামের আয়াত পাঠ করে ইসলামের সত্যতা তুলে ধরেন। নাজ্জাশী অশ্রুসিক্ত হয়ে মুসলমানদের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় আশ্রয় প্রদান করেন।
٨- بين أحداث بيعة العقبة الثانية وأهميتها-
[৮. আকাবার দ্বিতীয় শপথের ঘটনাবলি ও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
আকাবার দ্বিতীয় শপথ (৬২২ খ্রি.)
নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে হজের মৌসুমে মদিনা থেকে আগত ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী (মোট ৭৫ জন) মক্কার অদূরে আকাবা নামক স্থানে রাতের অন্ধকারে গোপনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (যিনি তখনও প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেননি) মদিনাবাসীদের কাছ থেকে রাসূলের সুরক্ষার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি আদায় করেন।
গুরুত্ব: মদিনাবাসী অঙ্গীকার করেন যে, তারা নিজেদের স্ত্রী-সন্তানকে যেভাবে রক্ষা করে, ঠিক সেভাবেই জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে পাহারা দেবে। এই বায়আতের মাধ্যমেই মদিনায় হিজরতের ভিত্তি রচিত হয় এবং বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়।
٩- هل كان قتال الرسول صلى الله عليه وسلم دفاعيا أم هجوميا؟ وضح بالأدلة-
[৯. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুদ্ধ কি আত্মরক্ষামূলক ছিল নাকি আক্রমণাত্মক? দলিলসহ বিশ্লেষণ কর।]
প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধের স্বরূপ ও দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় সংঘটিত প্রতিটি সামরিক অভিযান ছিল আত্মরক্ষামূলক (Defensive), যা আগ্রাসন প্রতিরোধ ও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছিল। ইসলাম কখনোই জোরপূর্বক ধর্ম চাপানোর যুদ্ধকে অনুমোদন করে না («لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ»)।
- কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা: যুদ্ধের অনুমতি দিয়ে প্রথম নাজিলকৃত আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: «أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ» — “যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে যাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে, কারণ তারা নির্যাতিত।” (সূরা আল-হজ: ৩৯)।
- যুদ্ধনীতি: রাসূলুল্লাহ ﷺ নারী, শিশু, বৃদ্ধ, পুরোহিত এবং অমুসলিম কৃষকদের হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন; ফলবান বৃক্ষ কর্তন ও জনপদ ধ্বংস নিষিদ্ধ করেছেন। এগুলো প্রমাণ করে যে তাঁর যুদ্ধ ছিল নিছক আত্মরক্ষা ও ইনসাফ কায়েমের যুদ্ধ।
١٠- ما هو ميثاق المدينة؟ واذكر خمسة بنود أساسية منه-
[১০. মদিনা সনদ কী? এর পাঁচটি মৌলিক ধারা উল্লেখ কর।]
মদিনা সনদের পরিচয় ও ৫টি মৌলিক ধারা
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পর মুসলিম (মুহাজির ও আনসার), ইহুদি এবং অন্যান্য পৌত্তলিক গোত্রগুলোর পারস্পরিক নিরাপত্তা ও ঐক্য নিশ্চিত করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক প্রণীত ৪৭/৫৩ ধারাবিশিষ্ট ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিকে মদিনা সনদ বলে।
- একক জাতি গঠন: সনদে স্বাক্ষরকারী সকল মুসলিম ও অমুসলিম গোত্র অন্য সব মানুষের বিপরীতে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় জাতি (উম্মাহ ওয়াহিদা) গঠন করবে।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা: মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্ম এবং ইহুদি ও অন্যান্যদের জন্য তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে।
- যৌথ প্রতিরক্ষা: মদিনার ওপর বহিঃশত্রুর কোনো আক্রমণ হলে সকল পক্ষ ঐক্যবদ্ধভাবে মদিনা রক্ষা করবে এবং যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে।
- সর্বোচ্চ বিচারিক ক্ষমতা: স্বাক্ষরকারীদের মাঝে কোনো বিরোধ বা মতানৈক্য সৃষ্টি হলে তার চূড়ান্ত বিচারক হবেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ ﷺ।
- কুরাইশদের কোনো আশ্রয় নয়: মক্কার কুরাইশ আগ্রাসীদের কোনো পক্ষই কোনো প্রকার আশ্রয় বা অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে পারবে না।
١١- لخص الخطبة التاريخية للنبي صلى الله عليه وسلم في حجة الوداع-
[১১. বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণের মূল বক্তব্য সংক্ষেপে তুলে ধর।]
বিদায় হজের ভাষণের (১০ম হি. / ৬৩২ খ্রি.) মূল শিক্ষা
আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতে লক্ষাধিক সাহাবীর বিশাল সমাবেশে প্রদত্ত বিদায় হজের ভাষণকে মানবজাতির প্রথম সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ বলা হয়। এর প্রধান মূলনীতিসমূহ:
- মানবধিকার ও রক্তের পবিত্রতা: প্রতিটি মুসলমানের রক্ত, ধন-সম্পদ ও সম্মান আজকের এই পবিত্র দিনের মতোই পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়।
- বংশীয় অহমিকা ও বর্ণবাদ বিলোপ: আরবের ওপর কোনো অনারবের এবং অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো প্রাধান্য নেই—একমাত্র শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তাকওয়া।
- সুদের মূলোৎপাটন: জাহেলী যুগের সমস্ত সুদ রহিত করা হলো (সর্বপ্রথম নিজের চাচা আব্বাস রা.-এর সুদ মওকুফ করেন)।
- নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা: নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর; তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের তেমনি অধিকার রয়েছে।
- হেদায়াতের উৎস: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতদিন তোমরা তা আঁকড়ে থাকবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।”
١٢- اذكر أسماء أزواج النبي صلى الله عليه وسلم وأولاده الشرفاء-
[১২. নবী করীম ﷺ-এর পবিত্র সহধর্মিণীগণ (উম্মাহাতুল মুমিনীন) এবং সম্মানিত সন্তানদের নাম উল্লেখ কর।]
ক. উম্মাহাতুল মুমিনীন (নবী করীম ﷺ-এর পবিত্র সহধর্মিণীগণ)
- হযরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) [প্রথম স্ত্রী]
- হযরত সাওদা বিনতে জামআ (রা.)
- হযরত আয়েশা সিদ্দীকা বিনতে আবি বকর (রা.)
- হযরত হাফসা বিনতে উমর (রা.)
- হযরত যাইনাব বিনতে খুযাইমাহ (রা.)
- হযরত উম্মে সালমা (হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়্যাহ) (রা.)
- হযরত যাইনাব বিনতে জাহাশ (রা.)
- হযরত জুওয়াইরিয়াহ বিনতে হারিস (রা.)
- হযরত উম্মে হাবীবা (রমলা বিনতে আবি সুফিয়ান) (রা.)
- হযরত সফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই (রা.)
- হযরত মাইমুনা বিনতে হারিস (রা.)
- হযরত মারিয়া কিবতিয়াহ (রা.)
খ. নবী করীম ﷺ-এর সম্মানিত সন্তানগণ
নবী করীম ﷺ-এর মোট ৭ জন সন্তান ছিলেন (৩ পুত্র ও ৪ কন্যা)। হযরত ইব্রাহিম ব্যতীত বাকি ৬ জনই হযরত খাদিজা (রা.)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন:
- পুত্রসন্তানগণ (৩ জন): ১. হযরত কাসিম (রা.), ২. হযরত আব্দুল্লাহ (যাঁকে ত্বইয়িব ও ত্বাহির বলা হতো), ৩. হযরত ইব্রাহিম (রা.) [মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্ম]। (শৈশবেই তাঁরা মৃত্যুবরণ করেন)।
- কন্যা সন্তানগণ (৪ জন): ১. হযরত যাইনাব (রা.), ২. হযরত রুকাইয়্যাহ (রা.), ৩. হযরত উম্মে কুলসুম (রা.), ৪. হযরত ফাতিমাতুজ জাহরা (রা.)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ৩য় বর্ষের আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ বিষয়ের বিষয় কোড কত?
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল (অনার্স) ৩য় বর্ষের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ পত্রের কোড হলো ২০৪৩০৩।
২. মদিনা সনদ কত সালে সম্পাদিত হয় এবং এর গুরুত্ব কী?
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পর এটি সম্পাদিত হয় এবং এটি বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
৩. মক্কা বিজয় কত হিজরীতে এবং কীভাবে সম্পন্ন হয়?
৮ম হিজরীর ২০ রমজান তারিখে রক্তপাতহীনভাবে ১০,০০০ সাহাবীর উপস্থিতিতে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়।
৪. বিদায় হজের ভাষণ কত হিজরীতে প্রদত্ত হয়?
১০ম হিজরীর ৯ জিলহজ তারিখে আরাফাতের ময়দানে রাসূলুল্লাহ ﷺ এই কালজয়ী ভাষণ প্রদান করেন।
৫. নবী করীম ﷺ-এর মোট কতজন সন্তান ছিলেন?
তাঁর মোট ৭ জন সন্তান ছিলেন—৩ জন পুত্র (কাসিম, আব্দুল্লাহ, ইব্রাহিম) এবং ৪ জন কন্যা (যাইনাব, রুকাইয়াহ, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা)।
৬. আকাবার দ্বিতীয় শপথে কতজন মদিনাবাসী বায়আত গ্রহণ করেছিলেন?
৭৩ জন পুরুষ এবং ২ জন নারীসহ মোট ৭৫ জন আনসার সাহাবী ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ করেছিলেন।