ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: উলূমুল কুরআন (علوم القرآن)
বিষয় কোড: ২০৩২০৫
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলী
١- ما الوحى؟ وما أهميته وحاجته؟ وكم نوعا له؟ بين مفصلا-
[১. ওহী কী? এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কী? এবং এটি কত প্রকার? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের মূল ভিত্তি এবং মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ হেদায়েতের উৎস হলো ‘ওহী’ (الوحي)। মহান আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে নবী ও রাসূলগণের ওপর ওহী নাযিল করে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখিয়েছেন। মানুষের সীমিত বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানের ঊর্ধ্বে গিয়ে সৃষ্টিকর্তার অভিপ্রায় জানার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো ওহী।
১. ওহীর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ (تعريف الوحي)
- শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘ওহী’ (وحي) শব্দটি مصدر বা ক্রিয়ামূল। এর আভিধানিক অর্থ হলো—ইশারা করা (الإشارة السريعة), গোপনে কথা বলা (الكلام الخفي), অন্তরে কোনো কথা প্রবিষ্ট করা (الإلهام), পত্র লেখা ইত্যাদি। আল-কুরআনে মানবীয় ইলহাম, সহজাত প্রবৃত্তি এবং শয়তানি প্ররোচনা অর্থেও ওহী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
- পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় মুহাদ্দিস ও উসূলে দ্বীনের ইমামগণের মতে:
“মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক কোনো অদৃশ্য উপায়ে তাঁর মনোনীত নবী বা রাসূলের অন্তরে শরীয়তের কোনো হেদায়েত, নির্দেশ বা বাণী অবতীর্ণ বা জানিয়ে দেওয়াকে ওহী বলা হয়।” (إعلام الله تعالى من اصطفاه من عباده كل ما أراد إطلاعه عليه من هداية وعلم بطريقة خفية وسريعة).
২. ওহীর গুরুত্ব ও মানবজীবনে এর প্রয়োজনীয়তা (أهمية الوحي والحاجة إليه)
- বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ: মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয় ও আকল বস্তুগত জ্ঞানার্জনের উপযোগী হলেও রূহ, পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম ও গায়েবের জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনে সম্পূর্ণ অক্ষম। ওহীর মাধ্যমেই মানুষ এ শাশ্বত জ্ঞান লাভ করে।
- সঠিক উপাসনা ও ইবাদতের রূপরেখা: কেবল বুদ্ধি দিয়ে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করা সম্ভব হলেও, তিনি কীভাবে সন্তুষ্ট হন এবং কীভাবে তাঁর ইবাদত করতে হবে তা জানার একমাত্র মাধ্যম ওহী।
- ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও বিধান প্রতিষ্ঠা: মানুষের রচিত আইন ব্যক্তিস্বার্থ ও সীমাবদ্ধতায় আচ্ছন্ন। ঐশী ওহীর নির্ভুল আইনই পৃথিবীতে ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও শান্তি নিশ্চিত করতে পারে।
- নৈতিক ও আত্মিক উৎকর্ষ সাধন: মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের পথ ওহীর নির্দেশনার মাধ্যমেই উন্মোচিত হয়।
৩. ওহীর প্রকারভেদ (أنواع الوحي وأقسامه)
পবিত্র কুরআনে ওহী নাযিলের মৌলিক তিনটি মাধ্যমের কথা বর্ণিত হয়েছে (সূরা আশ-শূরা: ৫১):
وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ عَلِيٌّ حَكِيمٌ
উক্ত আয়াতের আলোকে ওহীর মূল পদ্ধতি তিনটি:
- ইলহাম বা অন্তরে প্রক্ষেপণ (وحياً): আল্লাহ তায়ালা সরাসরি নবীর অন্তরে কোনো কথা জাগিয়ে দেন বা সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ দেন, যাতে নবীর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না।
- পর্দার অন্তরাল থেকে বাক্যালাপ (من وراء حجاب): আল্লাহ তায়ালা সরাসরি কথা বলেন কিন্তু কোনো আকৃতি বা দর্শন ছাড়াই আড়াল থেকে বাণী পৌঁছান; যেমন তুর পর্বতে হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে কথা বলেছিলেন।
- ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী প্রেরণ (يرسل رسولا): প্রধান ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল (আ.)-এর মাধ্যমে নবীদের কাছে ওহী পৌঁছানো। এটিই ছিল আল-কুরআন নাযিলের প্রধান মাধ্যম।
শরীয়তের প্রামাণিকতার দিক থেকে ওহীর শ্রেণিবিভাগ:
- ওহী মাতলূ (الوحي المتلو): যে ওহীর শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা নামাযে তিলাওয়াত করা হয়, মুজিযা হিসেবে চিরস্থায়ী। তা হলো আল-কুরআনুল কারীম।
- ওহী গাইরে মাতলূ (الوحي غير المتلو): যে ওহীর ভাবার্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে কিন্তু শব্দ ও ভাষা নবী করীম (সা.)-এর নিজস্ব। এটি হলো সুন্নাহ বা হাদীসে নববী।
উপসংহার
ওহী হলো মানব ইতিহাসের সর্বাধিক পবিত্র ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞানভাণ্ডার। এর ওপর নির্ভর করেই মুসলিম উম্মাহর আকিদা, আমল ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে।
٢- زعموا “أن محمدا قد تلقى العلوم القرآنية على يد بشر” – فند شبهتهم بالحجج الدامغة-
[২. প্রাচ্যবিদ ও বিরোধীরা দাবি করে “মুহাম্মদ (সা.) কোনো মানবের নিকট থেকে কুরআনিক জ্ঞান লাভ করেছেন” – অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ সহকারে তাদের এই সংশয় খণ্ডন কর।]
ভূমিকা
নবুওয়াতের সূচনালগ্ন থেকেই ইসলামবিরোধীরা আল-কুরআনের ঐশী উৎসকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। মক্কার মুশরিকদের মতো আধুনিক প্রাচ্যবিদরাও (Orientalists) দাবি করে থাকে যে, মুহাম্মদ (সা.) কোনো রোমান, ইহুদি বা খ্রিস্টান মানবের নিকট থেকে তাওরাত-ইঞ্জিলের পাঠ ও কুরআনিক জ্ঞান সংগ্রহ করেছেন। ইসলামের ইতিহাস ও যৌক্তিক মানদণ্ডে এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
১. বিরোধীদের অপবাদের প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
কুরাইশ কাফেররা দাবি করত যে, মক্কায় বসবাসকারী রোমান বা আজমী কিছু ক্রীতদাস (যেমন জাবর, ইয়াসার, আদ্দাস বা বাল’আম) অথবা শাম দেশে বাণিজ্য সফরে সাক্ষাতপ্রাপ্ত পাদ্রী বাখিরা (بحيرى) কিংবা ওয়ারাখা ইবনে নাওফালের কাছ থেকে নবীজী (সা.) শিক্ষা লাভ করেছেন।
২. কুরআনিক অকাট্য খণ্ডন (الرد القرآني الدامغ)
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্বয়ং এ সংশয় খণ্ডন করে ইরশাদ করেন (সূরা আন-নাহল: ১০৩):
وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ ۗ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَٰذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ
ভাষান্তর: “আমি তো নিশ্চিত জানি যে তারা বলে—তাকে এক মানুষ শিক্ষা দেয়। অথচ যার প্রতি তারা ইঙ্গিত করে তার ভাষা অনারবি (আজমী), আর এই কুরআন তো সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ আরবি ভাষা।”
৩. ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দ্বারা সংশয় খণ্ডন
- ভাষাগত বৈপরীত্য ও অলৌকিকতা: যাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হতো তারা ছিল অনারব ক্রীতদাস বা সাধারণ ব্যক্তি, যারা ভাঙা ভাঙা আরবি বলত। পক্ষান্তরে আল-কুরআন আরবি সাহিত্যের সর্বোচ্চ অলংকার ও চরম প্রাঞ্জল ভাষা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, যার একটি সূরার সমকক্ষ রচনা করতে সমগ্র আরবের মহাকবি ও বাগ্মীরা ব্যর্থ হয়েছে। এক অনারব ব্যক্তি কীভাবে এমন মহাবিস্ময়কর আরবি সাহিত্যের শিক্ষক হতে পারে?
- রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন উম্মী (নিরক্ষর): রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো শিক্ষকের কাছে যাননি এবং কোনো গ্রন্থ পাঠ করেননি। আল্লাহ বলেন: “আপনি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব পড়েননি এবং নিজ হাতে তাও লেখেননি, তা হলে মিথ্যাবাদীরা সংশয় পোষণ করতে পারত।” (সূরা আল-আনকাবূত: ৪৮)।
- সাক্ষাতের ক্ষণস্থায়িত্ব ও বাস্তবতা:
- পাদ্রী বাখিরার সাথে রাসুল (সা.)-এর দেখা হয়েছিল বালক বয়সে (৯ বা ১২ বছর বয়সে) চাচার কাফেলার সাথে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। এক বালকের পক্ষে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় তাওরাত-ইঞ্জিল অধ্যয়ন করে ২৩ বছর ব্যাপী কুরআন প্রচার অসম্ভব।
- ওয়ারাখা ইবনে নাওফালের সাথে প্রথম ওহীর পর কেবল একদিন মাত্র সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছিল এবং এর পরপরই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
- বিকৃতিহীন তাওহীদের বিশুদ্ধতা: বাইবেল ও তৎকালীন খ্রিস্টান-ইহুদি ধর্মগ্রন্থে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করা, ত্রিত্ববাদ ও নবীদের চরিত্রে মিথ্যা অপবাদ (যেমন ব্যভিচার, মূর্তিপূজার মিথ্যা দোষ) বিদ্যমান ছিল। কুরআন সেসব বিকৃতি সংশোধন করে নিষ্পাপ নবীদের প্রকৃত মর্যাদা ও অকৃত্রিম একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছে। কোনো খ্রিস্টান শিক্ষক শিক্ষা দিলে কুরআনে ত্রিত্ববাদের খণ্ডন থাকত না।
- ভবিষ্যদ্বাণী ও বিজ্ঞানের সঠিকতা: কুরআনে বর্ণিত রোমানদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী (সূরা আর-রূম), ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণের ঘটনা, ভ্রূণতত্ত্ব ও মহাবিশ্ব সৃষ্টির নিখুঁত বর্ণনা কোনো তৎকালীন মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল।
উপসংহার
অতএব প্রমাণিত হলো যে, আল-কুরআন কোনো মানবের মস্তিষ্কপ্রসূত বা সংগৃহীত শিক্ষা নয়; বরং এটি নিখিল বিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ চিরন্তন মুজিযা।
٣- ما الآية وما عددها؟ وهل ترتيبها توقيفى؟ بين مفصلا-
[৩. আয়াত কাকে বলে এবং এর মোট সংখ্যা কত? আয়াতের বিন্যাস বা তারতিব কি তাওকীফী (আল্লাহ নির্দেশিত)? বিস্তারিত বিশ্লেষণ কর।]
ভূমিকা
আল-কুরআনুল কারীমের মূল গাঠনিক একক হলো ‘আয়াত’ (الآية)। প্রতিটি আয়াত আল্লাহর প্রজ্ঞার এক একটি নিদর্শন এবং অলৌকিক বাণীর সমষ্টি। আয়াতের সংখ্যা ও এর ধারাবাহিক বিন্যাস উলূমুল কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র।
১. আয়াতের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ (تعريف الآية)
- শাব্দিক অর্থ: ‘আয়াত’ (আয়া) শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে:
- মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন (المعجزة); যেমন: “জিজ্ঞেস কর বনী ইসরাঈলকে আমি তাদেরকে কত সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়েছি।” (বাকারা: ২১১)।
- চিহ্ন বা নিদর্শন (العلامة); যেমন: “তাঁর রাজত্বের নিদর্শন এই যে…” (বাকারা: ২৪৮)।
- উপদেশ বা শিক্ষা (العبرة); যেমন: “নিশ্চয় এতে শিক্ষা রয়েছে।” (হিজর: ৭৭)।
- দল বা জামায়াত (الجماعة); যেমন আরবরা বলে: خرج القوم بآيتهم (গোত্রটি তাদের দলসহ বের হলো)।
- পারিভাষিক অর্থ: উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ও আলেমগণের মতে:
“আল-কুরআনের সূরার অন্তর্ভুক্ত এমন বাক্য বা বাক্যাংশ যার একটি নির্দিষ্ট সূচনা ও সমাপ্তি রয়েছে এবং যা একটি একক হিসেবে গণ্য হয়, তাকে আয়াত বলা হয়।” (طائفة ذات مطلع ومقطع مندرجة في سورة من سور القرآن).
২. কুরআনের মোট আয়াত সংখ্যা (عدد آيات القرآن)
উম্মতের আলেমগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, আল-কুরআনের মূল শব্দাবলি সম্পূর্ণ সংরক্ষিত ও অপরিবর্তিত। তবে কোনো বাক্যের শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) ওয়াকফ করেছেন এবং পরবর্তীতে মিলিয়ে পড়েছেন—এর ভিত্তিতে আয়াত বিভাজনে বিভিন্ন শহরের ইমামগণের গণনায় কিছু বাহ্যিক পার্থক্য দেখা যায়:
- কূফী গণনা (العد الكوفي): ইমাম আসেম ও হামযাহ (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণিত—৬,২৩৬টি। বর্তমান বিশ্বে মুদ্রিত অধিকাংশ মুসহাফ (যেমন হাফস আন আসেম) এই গণনার ওপর ভিত্তি করেই মুদ্রিত।
- মক্কী গণনা (العد المكي): ৬,২১২টি।
- মাদানী আওয়াল ও আখির: ৬,২১৭টি অথবা ৬,২১৪টি।
- বাসরী গণনা (العد البصري): ৬,২০৫টি।
- শামী গণনা (العد الشامي): ৬,২২৬টি।
উল্লেখ্য: সাধারণ প্রচলিত যে ‘৬,৬৬৬’ সংখ্যাটি বলা হয়, তা মূলত আয়াতের বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিবিভাগের যোগফল (যেমন আদেশ, নিষেধ, ওয়াদা, সতর্কবাণী ইত্যাদি), এটি সরাসরি টেক্সট গণনার নির্ভরযোগ্য সংখ্যা নয়। বিশুদ্ধতম গণনা হলো ৬,২৩৬টি।
৩. আয়াতের বিন্যাস কি তাওকীফী? (هل ترتيب الآيات توقيفي؟)
তাওকীফী (توقيفي)-এর অর্থ: যা কোনো মানুষের নিজস্ব চিন্তা বা ইজতিহাদের ওপর নির্ভর নয়; বরং সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর অহীর নির্দেশনায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত।
জমহুর উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (الإجماع): আল-কুরআনের প্রতিটি সূরার অন্তর্গত আয়াতসমূহের ক্রম ও বিন্যাস শতভাগ তাওকীফী (توقيفي بالإجماع)। এতে সাহাবায়ে কেরাম বা কোনো মানুষের বিন্দুমাত্র ইজতিহাদের সুযোগ ছিল না।
প্রামাণিক দলিলসমূহ:
- সহীহ হাদীসের সাক্ষ্য: হযরত উসমান (রা.) বর্ণনা করেন, যখনই কোনো আয়াত নাযিল হতো রাসুলুল্লাহ (সা.) ওহী লেখকদের ডেকে স্পষ্টভাবে বলে দিতেন:
«ضَعُوا هَذِهِ الْآيَاتِ فِي السُّورَةِ الَّتِي يُذْكَرُ فِيهَا كَذَا وَكَذَا»
(তোমরা এই আয়াতগুলো অমুক সূরায় অমুক অমুক আয়াতের পর রাখ)। (তিরমিযী, আবু দাউদ)। - নামাযে ধারাবাহিক তিলাওয়াত: রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের নিয়ে জামায়াতে যে ধারাবাহিকতায় সূরা ও আয়াত তিলাওয়াত করতেন, সাহাবীগণ হুবহু সেভাবেই মুখস্থ করেছেন।
- জিব্রাইল (আ.)-এর সাথে প্রতি রমযানের দাওর: প্রতি রমযান মাসে হযরত জিব্রাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে সমগ্র কুরআন যে ধারাবাহিকতায় পুনরাবৃত্তি করতেন, ওফাতের বছরে তা দুইবার সম্পন্ন হয়।
- উম্মতের ইজমা: সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত কোনো আলেম আয়াতের তারতীবে ইজতিহাদের দাবি করেননি।
উপসংহার
কুরআনের প্রতিটি আয়াত আল্লাহ তায়ালার এক একটি জীবন্ত মুজিযা এবং এর বিন্যাস ঐশী প্রজ্ঞার এক অনুপম বিস্ময়।
٤- عرف السورة – وكم سورة في القرآن؟ اكتب خصائص السور المدنية-
[৪. সূরার সংজ্ঞা দাও। কুরআনে মোট কতটি সূরা রয়েছে? মাদানী সূরাসমূহের বৈশিষ্ট্যসমূহ লিপিবদ্ধ কর।]
ভূমিকা
আল-কুরআনুল কারীম ১১৪টি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে বিভক্ত, যার প্রত্যেকটিকে ‘সূরা’ (السورة) বলা হয়। সূরাসমূহের নাযিলের স্থান ও কালভেদে মাক্কী ও মাদানী—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মাদানী সূরাগুলো ইসলামী সমাজ, রাষ্ট্র ও সামগ্রিক আইনব্যবস্থার দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
১. সূরার সংজ্ঞা (تعريف السورة)
- শাব্দিক অর্থ: ‘সূরা’ শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ নিয়ে কয়েকটি মত রয়েছে:
- ‘সৌর’ (سور المدينة) বা নগর প্রাচীর থেকে উদ্ভূত; কারণ প্রাচীর যেমন একটি শহরকে বেষ্টন করে রাখে, তেমনি সূরা কতগুলো আয়াতকে একত্রিত করে বেষ্টন করে রাখে।
- মর্যাদা ও উচ্চস্থান (المنزلة الرفيعة والمكانة العالية); যেহেতু এর পাঠকারী এক স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে আরোহণ করে।
- পাত্রের অবশিষ্টাংশ বা অংশবিশেষ (السؤرة); কারণ এটি পূর্ণ কুরআনের একটি বিশেষ অংশ।
- পারিভাষিক অর্থ: উলূমুল কুরআনের পরিভাষায়:
“আল-কুরআনের এমন একটি নির্দিষ্ট অংশ যার একটি সূচনা ও সমাপ্তি রয়েছে এবং যা কমপক্ষে তিনটি আয়াত নিয়ে গঠিত, তাকে সূরা বলে।” (قطعة متميزة من القرآن تشتمل على ثلاث آيات فأكثر، ذات فاتحة وخاتمة).
২. কুরআনের মোট সূরা সংখ্যা
সমস্ত মুসলিম উম্মাহ ও সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত ঐকমত্যে আল-কুরআনে মোট সূরার সংখ্যা হলো ১১৪টি (مائة وأربع عشرة سورة)। এর মধ্যে প্রথম সূরা ‘আল-ফাতিহা’ এবং সর্বশেষ সূরা ‘আন-নাস’।
৩. মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص السور المدنية)
হিজরতের পর মদীনা মুনাওয়ারায় নাযিলকৃত সূরাগুলোকে মাদানী সূরা বলা হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নে বিবৃত হলো:
- শরীয়তের বিস্তারিত আহকাম ও আইনকানুন: মাদানী সূরাগুলোতে নামাযের পূর্ণাঙ্গ রূপ, যাকাত বণ্টন, রোযা, হজ, জিহাদ, হুদূদ ও কিসাস (দণ্ডবিধি), ক্রয়-বিক্রয় ও পারিবারিক আইনের বিশদ বিবরণ রয়েছে।
- মুনাফিকদের মুখোশ উন্মোচন: মক্কায় মুনাফিক ছিল না, মদীনায় মুনাফিকদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মাদানী সূরাগুলোতে (যেমন সূরা আল-বাকারা, আন-নিসা, আত-তাওবা, আল-মুনাফিকুন) তাদের গোপন ষড়যন্ত্র ও কপটতার বিশদ বর্ণনা রয়েছে।
- আহলে কিতাবদের সাথে সংলাপ ও বিতর্ক: ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ভ্রান্ত আকিদা খণ্ডন, তাদের কিতাব বিকৃতির ইতিহাস এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে (যেমন আলে ইমরান ও মায়িদাহ)।
- মুমিনদের সম্বোধন (یا أیها الذین آمنوا): মাদানী সূরাগুলোতে সাধারণত ঈমানদারদের দায়িত্ব অর্পণের লক্ষ্যে «يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا» বলে আহ্বান জানানো হয়েছে। পক্ষান্তরে মাক্কী সূরায় থাকে «يَا أَيُّهَا النَّاسُ»।
- দীর্ঘ সূরা ও আয়াত: মাদানী সূরাগুলোর আয়াত ও সূরার কলেবর সাধারণত দীর্ঘ ও ব্যাখ্যামূলক; যেমন সূরা আল-বাকারা কুরআনের দীর্ঘতম সূরা এবং এর ২৮২ নং আয়াত (আয়াতুদ দাইন) দীর্ঘতম আয়াত।
- ইসলামী রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিধান: যুদ্ধনীতি, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গণিমত), যুদ্ধবন্দীদের বিধান, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সন্ধির মূলনীতি মাদানী সূরাতেই বিধৃত হয়েছে।
উপসংহার
মাদানী সূরাগুলো একটি নবজাতক মুসলিম সমাজকে একটি পূর্ণাঙ্গ, ইনসাফভিত্তিক ও বিশ্বজয়ী রাষ্ট্রে রূপান্তরের বাস্তব বিধান উপহার দিয়েছে।
٥- تحدث عن أخر ما نزل من القرآن الكريم ثم بين فوائد معرفة زمن النزول-
[৫. পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত সম্পর্কে আলোচনা কর এবং নাযিলের সময়কাল জানার উপকারিতা বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
আল-কুরআন দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনা ও প্রেক্ষাপটে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন প্রথম নাযিলকৃত আয়াত জানা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সর্বশেষ কোন আয়াত বা সূরার মাধ্যমে ওহীর সমাপ্তি ঘটেছে তা জানা উলূমুল কুরআনের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।
১. আল-কুরআনের সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত সম্পর্কিত অভিমতসমূহ
মুফাসসির ও সাহাবায়ে কেরামের সূত্রে সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত সম্পর্কে একাধিক রেওয়ায়েত পাওয়া যায়:
- প্রথম ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত (ইমাম বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক সমর্থিত):
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ আয়াত হলো সূরা আল-বাকারার ২৮১ নং আয়াত:
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ۖ ثُمَّ تُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
(আর তোমরা সেই দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জনের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না)।
ইমাম নাসায়ী বর্ণনা করেন, এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মাত্র ৯ দিন (মতান্তরে ৭ বা ২১ দিন) জীবিত ছিলেন। - দ্বিতীয় অভিমত: সুদের আয়াতসমূহ:
হযরত উমর (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, সূরা আল-বাকারার ২৭৮ নং আয়াত (সুদ বর্জনের নির্দেশ: يا أيها الذين آمنوا اتقوا الله وذروا ما بقي من الربا) সর্বশেষ নাযিল হয়েছে। তবে অনেক গবেষকের মতে এটি এবং ২৮১ নং আয়াত একই সাথে নাযিল হয়েছিল। - তৃতীয় অভিমত: ঋণ সংক্রান্ত আয়াত (আয়াতুদ দাইন – বাকারা: ২৮২):
ইমাম ইবনে আবি হাতিমের সূত্রে বর্ণিত এটি সর্বশেষ আয়াত। - চতুর্থ অভিমত: কালালাহ বা মীরাসের আয়াত (নিসা: ১৭৬):
হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) বলেন, আহকামের দিক থেকে সর্বশেষ আয়াত হলো মীরাসের কালালাহ সংক্রান্ত আয়াত। - পঞ্চম অভিমত: সূরা আত-তাওবার শেষ দুই আয়াত (১২৮-১২৯ নং):
উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর মতে: «لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ…»। - সূরা আল-মায়িদাহর ৩ নং আয়াত প্রসঙ্গ:
অনেকে মনে করেন «الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ» সর্বশেষ আয়াত। কিন্তু এটি নাযিল হয়েছিল বিদায় হজের দিন আরাফার ময়দানে (১০ম হিজরীর জিলহজ মাসে)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পর প্রায় ৮১ দিন জীবিত ছিলেন। তাই এটি দ্বীনের পূর্ণতা ঘোষণার আয়াত হলেও সময়কাল বিবেচনায় সর্বশেষ আয়াত নয়।
২. নাযিলের সময়কাল জানার উপকারিতা (فوائد معرفة زمن النزول)
- নাসিখ ও মানসুখ (রহিতকারী ও রহিত) চিহ্নিতকরণ: যখন একই বিষয়ে দুটি আপাতবিরোধী বিধান দেখা যায়, তখন নাযিলের কাল জেনে পরবর্তী আয়াতকে পূর্ববর্তী আয়াতের ‘নাসিখ’ (রহিতকারী) হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
- ইসলামী শরীয়তের পর্যায়ক্রমিক নীতি উপলব্ধি: মদ্যপান নিষিদ্ধকরণ বা জিহাদের হুকুম কীভাবে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে, তা নাযিলের সময়কাল জানলেই অনুধাবন করা সম্ভব হয়।
- আয়াতের সঠিক অর্থ ও শানে নুযূল অনুধাবন: একটি আয়াত মক্কী যুগে নাকি মাদানী যুগে নাযিল হয়েছে তা জানলে তৎকালীন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে সঠিক ব্যাখ্যা বের করা সহজ হয়।
- সীরাত ও ইসলামী ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য ক্রম নির্ধারণ: নববী জীবনের ঘটনাবলির সঠিক কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা নির্মাণে ওহীর নাযিলকাল সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
- কুরআন সংরক্ষণের ঐশ্বরিক যত্নের প্রমাণ: কুরআনের প্রতিটি শব্দ কোন সময়ে অবতীর্ণ হয়েছে সাহাবীদের তা নির্ভুলভাবে মুখস্থ রাখা প্রমাণ করে যে এটি চরম সতর্কতার সাথে সংরক্ষিত হয়েছে।
উপসংহার
সূরা বাকারার ২৮১ নং আয়াতটি যেমন নাযিলের দিক থেকে সর্বশেষ, তেমনি এর বাণীও সমগ্র মানবজাতিকে কিয়ামতের দিনের চূড়ান্ত জবাবদিহিতার স্মরণ করিয়ে দেয়।
٦- ما خلفية جمع القرآن في عهد أبى بكر وعثمان رضى الله عنهما؟ وما الفرق بين الجمعين؟ بين مفصلا-
[৬. হযরত আবু বকর এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের প্রেক্ষাপট কী ছিল? উভয় সংকলনের মধ্যকার পার্থক্য কী? বিস্তারিত তুলে ধর।]
ভূমিকা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় আল-কুরআন সম্পূর্ণ লিপিবদ্ধ ছিল এবং শত শত সাহাবীর বক্ষে মুখস্থ ছিল; তবে তা একটি একক গ্রন্থাকারে বা দুই মলাটের মাঝে একত্রিত ছিল না। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে বিশেষ ঐতিহাসিক প্রয়োজনে হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর নেতৃত্বে কুরআন সংকলনের দুটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়।
১. হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের প্রেক্ষাপট
- ইয়ামামার যুদ্ধ ও হাফেজদের শাহাদাত: রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর দ্বাদশ হিজরীতে ভণ্ড নবী মুসায়লামা কাযযাবের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী ইয়ামামার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন (মতান্তরে কয়েকশত) শীর্ষস্থানীয় হাফেজে কুরআন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।
- হযরত উমর (রা.)-এর দূরদর্শী প্রস্তাব: হাফেজদের ব্যাপক শাহাদাতে চিন্তিত হয়ে হযরত উমর (রা.) খলীফা আবু বকর (রা.)-এর নিকট গিয়ে কুরআনকে এক খণ্ডে গ্রন্থবদ্ধ করার প্রস্তাব দেন।
- যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে দায়িত্ব প্রদান: আবু বকর (রা.) প্রথমে রাসুল (সা.) যা করেননি তা করতে ইতস্তত করলেও উমর (রা.)-এর সাথে পরামর্শের পর কল্যাণ উপলব্ধি করেন। অতঃপর ওহী লেখক হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। যায়েদ (রা.) কঠোর নীতি গ্রহণ করেন—কেবল স্মৃতির ওপর নির্ভর না করে রাসুল (সা.)-এর সামনে লিখিত পাণ্ডুলিপি এবং অন্তত দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্যসাপেক্ষে প্রতিটি আয়াত নিশ্চিত করে একটি একক মুসহাফে একত্রিত করেন। এটি খলীফা আবু বকর, অতপর উমর এবং পরবর্তীতে উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.)-এর হেফাজতে ছিল।
২. হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআন সংকলনের প্রেক্ষাপট
- ইসলামের সীমানা বৃদ্ধি ও কিরাআতের মতভেদ: হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে ইসলামী খেলাফত আর্মেনিয়া, আজারবাইজান থেকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন অনারব অঞ্চলের নবদীক্ষিত মুসলিমরা সাহাবীদের বিভিন্ন কিরাআতে তিলাওয়াত শুনে একে অপরের তিলাওয়াতকে ভুল বলে বিবাদে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
- হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)-এর সতর্কবাণী: আজারবাইজান যুদ্ধ থেকে ফিরে সেনাপতি হুযাইফা (রা.) খলীফা উসমান (রা.)-কে কাতর কণ্ঠে বলেন:
“হে আমিরুল মুমিনীন! ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মতো কিতাব নিয়ে মতভেদ করার পূর্বেই এই উম্মতকে রক্ষা করুন।” - একক প্রমিত হরফে প্রতিলিপি তৈরি: উসমান (রা.) হযরত হাফসা (রা.)-এর নিকট থেকে মূল মুসহাফটি আনেন এবং যায়েদ ইবনে সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের, সাঈদ ইবনুল আস ও আব্দুর রহমান ইবনে হারিছ (রা.)-এর সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে কুরাইশী উপভাষার ভিত্তিতে প্রমিত কপি প্রস্তুত করেন। সেই মূল কপিগুলো খেলাফতের প্রধান প্রধান কেন্দ্রসমূহে (মক্কা, মদীনা, কূফা, বসরা, শাম) প্রেরণ করেন এবং ব্যক্তিগত সব অননুমোদিত কপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।
৩. উভয় সংকলনের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য (الفرق بين الجمعين)
| তুলনার ক্ষেত্র | আবু বকর (রা.)-এর সংকলন | উসমান (রা.)-এর সংকলন |
|---|---|---|
| ১. মূল উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট | হাফেজদের শাহাদাতের কারণে কুরআন যেন বিলুপ্ত বা হারিয়ে না যায় তা সংরক্ষণ করা। | কিরাআত ও পাঠপদ্ধতির বিরোধ দূর করে উম্মতকে একটি প্রমিত পাঠে ঐক্যবদ্ধ করা। |
| ২. হরফ ও উপভাষা | কুরআন নাযিলকৃত ‘সাত হরফ’ (سبعة أحرف)-এর অবকাশ এতে সংরক্ষিত ছিল। | কেবল এক হরফে অর্থাৎ মূল কুরাইশী উপভাষার লিখিত রূপকে প্রমিত মানদণ্ড করা হয়। |
| ৩. কপির সংখ্যা ও প্রচার | একটি মাত্র একক মূল কপি প্রস্তুত করা হয়েছিল, যা জনসাধারণের জন্য ব্যাপকভাবে প্রতিলিপি করা হয়নি। | একাধিক সরকারি কপি (কমপক্ষে ৫ বা ৭টি) প্রস্তুত করে খেলাফতের প্রাদেশিক রাজধানীগুলোতে প্রেরণ করা হয়। |
| ৪. অন্যান্য কপির ব্যাপারে পদক্ষেপ | অন্যান্য সাহাবীদের ব্যক্তিগত কপিগুলোর ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। | উম্মতের ঐক্য রক্ষার্থে অন্যান্য ব্যক্তিগত ও অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা হয়। |
উপসংহার
আবু বকর (রা.) কুরআনকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন, আর উসমান (রা.) উম্মতকে অনৈক্য ও বিভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করে ‘জামেউল কুরআন’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
٧- عرف التفسير لغة واصطلاحا ثم بين أهمية التفسير وشرفه وآداب المفسر موضحا-
[৭. শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থে তাফসীরের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর তাফসীরের গুরুত্ব, মর্যাদা এবং মুফাসসিরের আদব বা শর্তাবলি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
মহান আল্লাহর কালাম আল-কুরআনকে মানবজাতির বোধগম্য করা এবং এর অন্তর্নিহিত হুকুম-আহকাম ও হেদায়েত বাস্তবায়নের একমাত্র চাবিকাঠি হলো ‘ইলমুত তাফসীর’ (علم التفسير)। এটি ইসলামী উলূমের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ ও মৌলিক জ্ঞানশাখা।
১. তাফসীরের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ (تعريف التفسير)
- শাব্দিক অর্থ: ‘তাফসীর’ (التفسير) শব্দটি বাবে তাফঈল-এর مصدر। মূল ধাতু ‘ফাসর’ (فَسْرٌ)। এর আভিধানিক অর্থ হলো—উন্মোচন করা (الكشف), স্পষ্ট করা (الإيضاح), ব্যাখ্যা করা ও বিশদভাবে প্রকাশ করা (البيان)। কোনো আবৃত বা অস্পষ্ট বিষয়কে উন্মুক্ত করে বুঝিয়ে দেওয়াকে তাফসীর বলা হয়।
- পারিভাষিক অর্থ: ইমাম সুয়ূতী ও আলেমগণের মতে তাফসীরের সর্বোত্তম পারিভাষিক সংজ্ঞা হলো:
“যে শাস্ত্রের মাধ্যমে মানবীয় সাধ্যানুযায়ী মহান আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনের অর্থ, নির্দেশনাবলী, অন্তর্নিহিত হিকমত ও বিধানাবলি আলোচনা করা হয়, তাকে ইলমুত তাফসীর বলে।” (علم يبحث فيه عن أحوال القرآن الكريم من حيث دلالته على مراد الله تعالى بقدر الطاقة البشرية).
২. তাফসীরের গুরুত্ব ও মর্যাদা (أهمية التفسير وشرفه)
ইসলামী জ্ঞানের মূলনীতি হলো—জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে তা যে বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট তার শ্রেষ্ঠত্বের ওপর (شرف العلم بشرف معلومه)। যেহেতু তাফসীরের আলোচ্য বিষয় স্বয়ংস্রষ্টা আল্লাহর বাণী, তাই এটি সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যা।
- কুরআনের মূল উদ্দেশ্য পূরণ: কেবল শব্দ তিলাওয়াত যথেষ্ট নয়; কুরআনের উদ্দেশ্য হলো তা নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা (তাদ্দাব্বুর) করা। আল্লাহ বলেন: “তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না?” (সূরা আন-নিসা: ৮২)। তাফসীর ছাড়া তাদাব্বুর অসম্ভব।
- শরীয়তের হুকুম-আহকাম অনুধাবন: নামায, রোযা, যাকাত, লেনদেন ইত্যাদি শরীয়তের বিধিবিধানের বিস্তারিত প্রয়োগ তাফসীরের মাধ্যমেই জানা যায়।
- গোমরাহী ও বিভ্রান্তি থেকে সুরক্ষা: তাফসীর ব্যতিরেকে ব্যক্তিগত খেয়ালখুশিমতো কুরআনের অর্থ করতে গেলে খারেজী ও বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের মতো পথভ্রষ্টতার সৃষ্টি হয়।
৩. মুফাসসিরের শর্তাবলি ও আদব (شروط المفسر وآدابه)
আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ও প্রখ্যাত আলেমগণ মুফাসসিরের জন্য নিম্নোক্ত অপরিহার্য শর্ত ও আদবসমূহ নির্ধারণ করেছেন:
- বিশুদ্ধ আকিদা ও তাকওয়া (صحة العقيدة): মুফাসসিরকে বিদআত ও বিভ্রান্ত আকিদামুক্ত খাঁটি সুন্নী আকিদার অধিকারী হতে হবে; কারণ অসৎ আকিদার ব্যক্তি স্বীয় মতের সমর্থনে কুরআনকে বিকৃত করে।
- পার্থিব স্বার্থ ও প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হওয়া (التجرد عن الهوى): ব্যক্তি বা রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠার তাগিদে আয়াতকে অপব্যাখ্যা না করা।
- আরবি ভাষা ও ব্যাকরণে পূর্ণ পাণ্ডিত্য: নাহু (Syntax), সরফ (Morphology), এবং বালাগাতের তিনটি শাখা—মাআনী, বায়ান ও বাদী-তে অগাধ দক্ষতা থাকা আবশ্যক। কারণ কুরআন সর্বোচ্চ মানের আরবি ভাষায় অবতীর্ণ।
- উলূমুল কুরআনে ব্যুৎপত্তি: মাক্কী-মাদানী, আসবাবুন নুযূল, নাসিখ-মানসুখ, আম-খাস, মুজমাল-মুফাসসাল ইত্যাদি উলূমুল কুরআনের মূলনীতিতে পারদর্শী হতে হবে।
- হাদীস ও আছারে পাণ্ডিত্য: কুরআনের প্রথম ও প্রধান ব্যাখ্যা হলো রাসুল (সা.)-এর হাদীস এবং সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য। সহীহ ও যঈফ হাদীসের পার্থক্য জানার জ্ঞান থাকতে হবে।
- উসূলে ফিকহের জ্ঞান: আয়াত থেকে শরীয়তের হুকুম আহকাম বের করার মূলনীতি জানা।
- ধারাবাহিক নিয়ম অনুসরণ:
- প্রথমত: কুরআনের তাফসীর কুরআনের অন্য আয়াত দ্বারা করা।
- দ্বিতীয়ত: হাদীসে নববী দ্বারা তাফসীর করা।
- তৃতীয়ত: সাহাবায়ে কেরামের আসার দ্বারা তাফসীর করা।
- চতুর্থত: তাবেয়ীগণের ব্যাখ্যা ও বিশুদ্ধ আরবি ভাষার মানদণ্ড প্রয়োগ করা।
উপসংহার
মুফাসসিরের দায়িত্ব অত্যন্ত নাজুক ও পবিত্র। উপযুক্ত যোগ্যতা ও আল্লাহর ভয় নিয়েই কেবল এই মহান খেদমতে হাত দেওয়া উচিত।
٨- عرف علم تجويد القرآن مع بيان أهميته ثم تحدث عن المد وأقسامه مفصلا-
[৮. গুরুত্বসহ ইলমুত তাজবীদের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর মাদ্দ (টান) এবং এর প্রকারভেদ বিস্তারিতভাবে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
কুরআনুল কারীম তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রতিটি হরফকে তার নিজস্ব মাখরাজ ও সিফাত অনুযায়ী সঠিকভাবে উচ্চারণ করা অপরিহার্য। এই নির্ভুল ও সুন্দর উচ্চারণের নিয়মাবলি যে শাস্ত্রে আলোচনা করা হয় তাকে ‘ইলমুত তাজবীদ’ (علم التجويد) বলা হয়।
১. ইলমুত তাজবীদের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
- শাব্দিক অর্থ: ‘তাজবীদ’ (تجويد) শব্দটি جَوَّدَ ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ—সুন্দর করা (التحسين), নিখুঁত করা ও উত্তমরূপে সম্পন্ন করা (الإتقان)।
- পারিভাষিক অর্থ: “কুরআনের প্রতিটি হরফকে তার নির্গমন স্থান (মাখরাজ) থেকে বের করে তার স্থায়ী হক (সিফাতে লাযিমাহ) এবং পরিবর্তনশীল পাওনা (সিফাতে আ’রিযাহ) প্রদানপূর্বক বিশুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করাকে তাজবীদ বলে।”
- তাজবীদের গুরুত্ব ও শরয়ী হুকুম: তাজবীদ অনুযায়ী কুরআন তিলাওয়াত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরযে আইন (فرض عين)। আল্লাহ বলেন: «وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا» (আর কুরআন তিলাওয়াত কর ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে – মুযযাম্মিল: ৪)। ইমাম ইবনুল জাযারী (রহ.) বলেন:
«وَالأَخْذُ بِالتَّجْوِيدِ حَتْمٌ لاَزِمُ ۞ مَنْ لَمْ يُجَوِّدِ الْقُرْآنَ آثِمُ»
(তাজবীদ অবলম্বন করা অপরিহার্য কর্তব্য, যে তাজবীদ মেনে কুরআন পড়ে না সে গুনাহগার)।
২. মাদ্দ (المد) ও এর প্রকারভেদ
- মাদ্দের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ: শাব্দিক অর্থ দীর্ঘ করা বা বৃদ্ধি করা (الزيادة والمط)। পরিভাষায়: মাদ্দের হরফের সাহায্যে স্বরধ্বনিকে দীর্ঘ করে টান দেওয়াকে মাদ্দ বলে।
- মাদ্দের হরফ তিনটি (حروف المد):
- আলিফ সাকিন, যার পূর্বে যবর থাকে (যেমন: قَالَ)।
- ওয়াও সাকিন, যার পূর্বে পেশ থাকে (যেমন: يَقُولُ)।
- ইয়া সাকিন, যার পূর্বে যের থাকে (যেমন: قِيلَ)।
৩. মাদ্দের মূল প্রকারভেদ (أقسام المد)
মাদ্দ প্রধানত দুই প্রকার: ১. মাদ্দে আসলী বা তবাই (المد الأصلي/الطبيعي) এবং ২. মাদ্দে ফারঈ (المد الفرعي)।
(ক) মাদ্দে আসলী বা তবাই (المد الأصلي)
যে মাদ্দ কোনো হামযাহ বা সুকূনের ওপর নির্ভরশীল নয়, কেবল মাদ্দের হরফ থাকলেই প্রাকৃতিকভাবে যতটুকু টান দিতে হয়। এর মাত্রা হলো এক আলিফ বা দুই হরকত। যেমন: نُوحِيهَا (এখানে তিনটি হরফেই মাদ্দে আসলী রয়েছে)।
(খ) মাদ্দে ফারঈ (المد الفرعي)
মাদ্দের হরফের পর কোনো বাহ্যিক কারণ (যেমন হামযাহ বা সুকূন) আসার ফলে মাদ্দে আসলীয়ের চেয়ে অতিরিক্ত দীর্ঘ করে পড়তে হয়। মাদ্দে ফারঈ প্রধানত দুই কারণে হয়:
১. হামযাহ ঘটিত মাদ্দ (المد بسبب الهمزة):
- মাদ্দে মুত্তাসিল (المد المتصل): একই শব্দের মধ্যে মাদ্দের হরফের ঠিক পরেই হামযাহ আসলে। এর হুকুম ওয়াজিব এবং টানার পরিমাণ ৪ বা ৫ হরকত। যেমন: جَاءَ، السَّمَاءِ، سُوءَ।
- মাদ্দে মুনফাসিল (المد المنفصل): প্রথম শব্দের শেষে মাদ্দের হরফ এবং দ্বিতীয় শব্দের শুরুতে পৃথক হামযাহ আসলে। এর হুকুম জায়িয এবং টানার পরিমাণ ২, ৪ বা ৫ হরকত (সাধারণত ৪ হরকত)। যেমন: إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ، بِمَا أُنزِلَ।
- মাদ্দে বাদাল (مد البدل): হামযাহ যদি মাদ্দের হরফের পূর্বে চলে আসে। এর পরিমাণ ১ আলিফ বা ২ হরকত। যেমন: آمَنُوا، أُوتُوا، إِيمَانًا।
২. সুকূন ঘটিত মাদ্দ (المد بسبب السكون):
- মাদ্দে আ’রিদ লিসসুকূন (المد العارض للسكون): মাদ্দের হরফের পরের হরফে ওয়াকফ করার কারণে অস্থায়ী সুকূন সৃষ্টি হলে। এর পরিমাণ ২, ৪ বা ৬ হরকত (৩ আলিফ)। যেমন: الْعَالَمِينَ، الرَّحِيمِ।
- মাদ্দে লাযিম (المد اللازم): মাদ্দের হরফের পর স্থায়ী বা আসল সুকূন বা তাশদীদ আসলে। এর হুকুম লাযিম এবং টানার পরিমাণ অবশ্যই ৩ আলিফ বা ৬ হরকত। এটি চার প্রকার:
- লাযিম কালমী মুসাক্কাল: শব্দের মধ্যে তাশদীদ থাকলে (যেমন: الضَّالِّينَ، الْحَاقَّةُ)।
- লাযিম কালমী মুখাফফাফ: শব্দের মধ্যে সাধারণ সুকূন থাকলে (কুরআনে কেবল সূরা ইউনুসে: آلْآنَ)।
- লাযিম হারফী মুসাক্কাল: হুরুফে মুকাত্তায়াতের মধ্যে ইদগামযুক্ত তাশদীদ হলে (যেমন: الم এর লাম)।
- লাযিম হারফী মুখাফফাফ: হুরুফে মুকাত্তায়াতে ইদগাম ছাড়া সুকূন হলে (যেমন: ق، ن، الم এর মীম)।
- মাদ্দে লীন (مد اللين): লীন হরফের (যবরের পর ওয়াও সাকিন বা ইয়া সাকিন) পরবর্তী হরফে ওয়াকফের কারণে সুকূন হলে। যেমন: خَوْفٍ، قُرَيْشٍ।
উপসংহার
তাজবীদ ও মাদ্দের নিয়মসমূহ মেনে কুরআন তিলাওয়াত করলে তিলাওয়াতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় এবং অর্থের বিকৃতি থেকে সুরক্ষিত থাকা যায়।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তরীয় প্রশ্নাবলী
٩- ما الفرق بين الحديث النبوى والحديث القدسى؟
[৯. হাদীসে নববী এবং হাদীসে কুদসীর মধ্যে পার্থক্য কী?]
উত্তর:
হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্যসমূহ নিম্নে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
| তুলনার বিষয় | হাদীসে কুদসী (الحديث القدسي) | হাদীসে নববী (الحديث النبوي) |
|---|---|---|
| ১. শব্দ ও অর্থের উৎস | এর ভাবার্থ ও মর্ম সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত, তবে ভাষা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর। | এর ভাব ও ভাষা উভয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব ইখতিয়ারে বর্ণিত (যদিও তা ওহীর নির্দেশনামূলক)। |
| ২. সনদের সম্পৃক্ততা | রাসুলুল্লাহ (সা.) এটি আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করে বর্ণনা করেন; যেমন: «قَالَ اللَّهُ تَعَالَى…»। | রাসুলুল্লাহ (সা.) সরাসরি নিজের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশ করেন; যেমন: «قَالَ رَسُولُ اللَّهِ…»। |
| ৩. বিষয়বস্তুর পরিধি | অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহর মর্যাদা, রহমত, ক্ষমা ও আধ্যাত্মিক নসিহত সংক্রান্ত। | আকিদা, আহকাম, হালাল-হারাম, লেনদেন ও রাষ্ট্রনীতিসহ জীবনের সকল শাখার বিধান সম্বলিত। |
| ৪. সংখ্যাগত পরিমাণ | হাদীসে কুদসীর সংখ্যা সীমিত (কয়েকশত মাত্র)। | হাদীসে নববীর সংখ্যা লক্ষাধিক এবং অত্যন্ত সুবিশাল। |
উল্লেখ্য: কুরআন যেমন তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইবাদত করা হয়, হাদীসে কুদসী বা নববী কোনোটিই নামাযের ভেতর তিলাওয়াতযোগ্য নয়।
١٠- بين بعض فوائد نزول القرآن بالتدريج-
[১০. পবিত্র কুরআন পর্যায়ক্রমে (ধাপে ধাপে) নাযিল হওয়ার কিছু হিকমত ও উপকারিতা উল্লেখ কর।]
উত্তর:
পবিত্র কুরআন লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে কদরের রাতে একত্রে নাযিল হলেও, সেখান থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছরে প্রয়োজনানুযায়ী ধাপে ধাপে (منجماً) অবতীর্ণ হয়েছে। এর প্রধান হিকমতসমূহ হলো:
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হৃদয়কে সুদৃঢ় করা: কাফেরদের নির্যাতন ও দাওয়াতের কঠিন মুহূর্তে জিব্রাইল (আ.) বারবার ওহী নিয়ে এসে নবীজীর মনোবল বৃদ্ধি করতেন। আল্লাহ বলেন: “এমনিভাবে আমি নাযিল করেছি আপনার অন্তরকে এর দ্বারা সুদৃঢ় করার জন্য।” (সূরা আল-ফুরকান: ৩২)।
- মুখস্থকরণ ও হৃদয়াঙ্গম করা সহজসাধ্য করা: তৎকালীন নিরক্ষর আরব সমাজের জন্য পুরো কিতাব একবারে মুখস্থ করা অসম্ভব ছিল। ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হওয়ায় সাহাবীগণ সহজেই তা মুখস্থ ও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।
- শরীয়তের পর্যায়ক্রমিক প্রবর্তন (التدرج في التشريع): জাহেলিয়াত যুগের অন্যায় প্রথা রাতারাতি বন্ধ করা কঠিন ছিল। যেমন মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা তিন ধাপে পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হয়েছে।
- উদ্ভূত পরিস্থিতির বাস্তব সমাধান প্রদান: সাহাবীদের বিভিন্ন প্রশ্ন ও সমসাময়িক সংকটময় ঘটনার তাৎক্ষণিক ঐশী সমাধান নাযিল হতো।
- কুরআনের অলৌকিকতা প্রমাণ: দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নাযিল হওয়া সত্ত্বেও পুরো কুরআনে কোথাও কোনো অসংগতি বা বৈপরীত্য নেই, যা এটি আল্লাহর বাণী হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
١١- ما هى طرق معرفة الناسخ والمنسوخ؟
[১১. নাসিখ ও মানসুখ (রহিতকারী ও রহিত) জানার উপায় বা মাধ্যমগুলো কী কী?]
উত্তর:
কোনো বিধান রহিত হওয়া বা বহাল থাকা কোনো অনুমান বা ব্যক্তিগত যুক্তির ওপর নির্ভর করে না। আলেমগণের মতে নাসিখ ও মানসুখ জানার সুনির্দিষ্ট তিনটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে:
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট ঘোষণা (النقل الصريح عن رسول الله): রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই যদি স্পষ্ট ভাষায় কোনো পূর্ববর্তী বিধান রহিত হওয়ার কথা বলে দেন। যেমন কবর যিয়ারত প্রসঙ্গে হাদীস:
«كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَزُورُوهَا»
(আমি পূর্বে তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা যিয়ারত কর)। (সহীহ মুসলিম)। - সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ বর্ণনা: কোনো নির্ভরযোগ্য সাহাবী যদি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলেন যে অমুক আয়াত পূর্বে নাযিল হয়েছিল এবং অমুক আয়াত পরে এসে তাকে রহিত করেছে। যেমন হযরত আয়েশা (রা.) কর্তৃক দুধপানের বিধানের পরিবর্তন বর্ণনা।
- ঐতিহাসিক তারিখ ও কালানুক্রম জানা (معرفة التاريخ): অকাট্য ঐতিহাসিক তথ্যের মাধ্যমে জানা যায় যে একটি আয়াত মক্কী যুগে বা হিজরতের শুরুতে নাযিল হয়েছে এবং অপর আয়াতটি পরবর্তীতে মদীনায় বা বিদায় হজের সময় নাযিল হয়েছে। ফলে পরবর্তী আয়াতটি স্বভাবতই পূর্ববর্তী আয়াতের নাসিখ হবে।
সতর্কতা: কেবল আকল বা কিয়াসের মাধ্যমে কোনো আয়াতকে মানসুখ দাবি করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
١٢- ما القدر المعجز من القرآن؟
[১২. কুরআনের মুজিযা বা অলৌকিকতার ন্যূনতম পরিমাণ (কদরুল মুজিয) কতটুকু?]
উত্তর:
পবিত্র কুরআন মানবজাতি ও জিনদেরকে এর সমকক্ষ কিছু রচনার উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষিতে কুরআনের ন্যূনতম কতটুকু অংশ স্বয়ংসম্পূর্ণ মুজিযা—এ বিষয়ে মুতাকাল্লিমীন ও উসূলে ফেকাহবিদগণের মধ্যে গবেষণা রয়েছে:
- জমহুর আলেম ও ইমামগণের অভিমত: কুরআনের যেকোনো একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা—চাই তা কুরআনের ক্ষুদ্রতম সূরাই হোক না কেন (যেমন তিন আয়াতবিশিষ্ট সূরা আল-কাওসার)—তা-ই হলো কুরআনের ন্যূনতম মুজিযার পরিমাণ (কদরুল মুজিয)। এর দলীল হলো আল্লাহর উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ:
فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ
“তোমরা এর মতো একটি মাত্র সূরা রচনা করে নিয়ে আস।” (সূরা আল-বাকারা: ২৩)। এখানে কোনো দীর্ঘ সূরার শর্ত দেওয়া হয়নি। - একটি ক্ষুদ্র সূরার সমপরিমাণ অংশ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও মুহাক্কিকীনদের মতে, একটি ক্ষুদ্রতম সূরার সমপরিমাণ তিনটি ছোট আয়াত অথবা দীর্ঘ কোনো সূরার এমন একটি দীর্ঘ আয়াত যা তিন আয়াতের সমতুল্য (যেমন আয়াতুল কুরসী বা আয়াতুদ দাইন)—তা অলৌকিকত্বের মানদণ্ড পূরণ করে।
সারকথা: কুরআনের ক্ষুদ্রতম সূরা আল-কাওসারও তার অলংকার, ছন্দ ও প্রজ্ঞার দিক থেকে সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য এক চিরন্তন ও অপরাজিত মুজিযা।
١٣- ما اللحن وما أقسامه؟-
[১৩. লাহ্ন (কুরআন তিলাওয়াতে ভুল) কী এবং এর প্রকারভেদ কী কী?]
উত্তর:
লাহ্নের সংজ্ঞা: আরবি ‘লাহ্ন’ (اللحن) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বিচ্যুতি, ভুল করা বা সঠিক পথ থেকে সরে যাওয়া। তাজবীদের পরিভাষায়: “কুরআন তিলাওয়াতকালে তাজবীদের নিয়ম ও সঠিক উচ্চারণ পদ্ধতির বিপরীত যে ভুলত্রুটি সংঘটিত হয়, তাকে লাহ্ন বলে।”
লাহ্নের প্রকারভেদ:
লাহ্ন প্রধানত দুই প্রকার:
- লাহ্নে জালী বা স্পষ্ট ভুল (اللحن الجلي):
- বিবরণ: এমন প্রকাশ্য ভুল যা সাধারণ আরবি জানা ব্যক্তিও সহজে ধরতে পারে। যেমন: এক হরফের স্থলে অন্য হরফ পড়া (যেমন: ‘ত্বা’ (ط) এর স্থলে ‘তা’ (ت) পড়া), অথবা হরকত পরিবর্তন করা (যেমন: যেরের স্থলে পেশ বা যবর পড়া; যেমন «أَنْعَمْتَ» এর তা-তে পেশ দিয়ে «أَنْعَمْتُ» পড়া)।
- শরয়ী হুকুম: এটি হারাম এবং কবিরা গুনাহ। নামাযে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত এমন ভুল হলে যার কারণে অর্থ মারাত্মক বিকৃত হয়ে যায়, তবে নামায ফাসিদ (নষ্ট) হয়ে যায়।
- লাহ্নে খাফী বা গোপন/সূক্ষ্ম ভুল (اللحن الخفي):
- বিবরণ: এমন সূক্ষ্ম ভুল যা তাজবীদবিদ আলেম ছাড়া সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারে না। যেমন: গুন্নাহ না করা, ইখফা বা ইদগাম অসম্পূর্ণ রাখা, মাদ্দের নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম বা বেশি টানা ইত্যাদি।
- শরয়ী হুকুম: এটি মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। এর কারণে নামায নষ্ট হয় না, তবে নিয়মিত এমনভাবে পড়া তাজবীদের আদবের পরিপন্থী।
١٤- ما الترقيق والتفخيم؟ بين بالأمثلة-
[১৪. তারকীক ও তাফখীম কী? উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
তাজবীদ শাস্ত্রে হরফের উচ্চারণের বলিষ্ঠতা ও কোমলতার ওপর ভিত্তি করে হরফকে দুইভাবে আদায় করা হয়—তাফখীম ও তারকীক।
১. তাফখীম (التفخيم – মোটা করে পড়া)
- সংজ্ঞা: শাব্দিক অর্থ মোটা বা ভারী করা। পরিভাষায়: হরফ উচ্চারণের সময় মুখের ভেতরের অংশ ধ্বনি দ্বারা পূর্ণ করে গাম্ভীর্যপূর্ণ ও মোটা আওয়াজে উচ্চারণ করাকে তাফখীম বলে। একে ‘ইসতি’লা’র সিফাতও বলা হয়।
- হরফসমূহ: ইসতি’লার ৭টি হরফ সর্বদা তাফখীম বা মোটা করে পড়তে হয়। সংক্ষেপে: خُصَّ ضَغْطٍ قِظْ (খ, সোয়াদ, দোয়াদ, ত্বা, যা, গইন, ক্বাফ)।
- উদাহরণ: خَالِدِينَ، الصِّرَاطَ، ضَلَّ، طَبَعَ، الظَّالِمِينَ، غَفُورٌ، قَالَ।
২. তারকীক (الترقيق – পাতলা/চিকন করে পড়া)
- সংজ্ঞা: শাব্দিক অর্থ পাতলা বা সরু করা। পরিভাষায়: হরফ উচ্চারণের সময় আওয়াজকে পাতলা ও স্বাভাবিকভাবে হালকা উচ্চারণে আদায় করাকে তারকীক বলে।
- হরফসমূহ: তাফখীমের হরফ ব্যতীত আরবি বর্ণমালার অবশিষ্ট সব হরফকে ‘হুরুফে ইসতিফাল’ বা তারকীকের হরফ বলা হয়।
- উদাহরণ: بِسْمِ، كَتَبَ، مَالِكِ، سَمِيعٌ।
বিশেষ হরফ যা কখনো তাফখীম ও কখনো তারকীক হয়:
- র (ر): র-এর ওপর যবর বা পেশ থাকলে তাফখীম (যেমন: رَبِّنَا، رُحَمَاءُ); আর র-এর নিচে যের থাকলে তারকীক হয় (যেমন: رِزْقًا، قَدِيرٌ)।
- আল্লাহ শব্দের লাম (ل): পূর্বের হরফে যবর বা পেশ থাকলে লাম মোটা হয় (যেমন: قَالَ اللَّهُ، عَبْدُ اللَّهِ); আর পূর্বে যের থাকলে চিকন হয় (যেমন: بِاللَّهِ، الحَمْدُ لِلَّهِ)।
١٥- اكتب خمس علامات للوقف مع شرحها-
[১৫. ওয়াকফের পাঁচটি চিহ্ন ব্যাখ্যাসহ লিখ।]
উত্তর:
কুরআন তিলাওয়াতকালে কোথায় থামতে হবে এবং কোথায় মিলিয়ে পড়তে হবে, তা নির্দেশ করার জন্য মুসহাফে কিছু সুনির্দিষ্ট সংকেত বা বিরামচিহ্ন ব্যবহার করা হয়। নিম্নে সর্বাধিক ব্যবহৃত পাঁচটি ওয়াকফের চিহ্ন ব্যাখ্যা করা হলো:
- চিহ্ন (مـ) – ওয়াকফে লাযিম (الوقف اللازم):
ব্যাখ্যা: এখানে থামা আবশ্যক বা ওয়াজিব। যদি এখানে না থেমে পরবর্তী শব্দের সাথে মিলিয়ে পড়া হয়, তবে বাক্যের অর্থ মারাত্মক বিকৃত বা বিপরীত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন: সূরা ইয়াসীনের ৭৬ নং আয়াতে: «فَلَا يَحْزُنكَ قَوْلُهُمْ ۘ إِنَّا نَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ»। - চিহ্ন (ط) – ওয়াকফে মুতলাক (الوقف المطلق):
ব্যাখ্যা: এখানে থামা উত্তম। কারণ এখানে একটি প্রসঙ্গের পূর্ণ সমাপ্তি ঘটে এবং পরবর্তী অংশ সম্পূর্ণ নতুন ভাব প্রকাশ করে। যেমন সূরা আল-বাকারার শুরুতে: «أُولَٰئِكَ عَلَىٰ هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ»। - চিহ্ন (ج) – ওয়াকফে জায়িয (الوقف الجائز):
ব্যাখ্যা: এখানে থামা এবং মিলিয়ে পড়া উভয়ই সমানভাবে বৈধ। থামলেও কোনো অর্থহানি হয় না, আবার মিলিয়ে পড়লেও অর্থ সঠিক থাকে। যেমন: «نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَأَهُم بِالْحَقِّ ۚ إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ»। - চিহ্ন (ز) – ওয়াকফে মুজাওয়ায (الوقف المجوز):
ব্যাখ্যা: এখানে না থেমে মিলিয়ে পড়া উত্তম, তবে দম ফুরিয়ে গেলে থামা জায়িয বা অনুমোদিত। - চিহ্ন (لا) – ওয়াকফে মামনূ’ (الوقف الممنوع):
ব্যাখ্যা: এখানে থামা নিষেধ। কারণ শব্দের সাথে পরবর্তী শব্দের ব্যাকরণগত সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য থাকে। যদি দম ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে থামতেই হয়, তবে পূর্ববর্তী শব্দ থেকে পুনরায় মিলিয়ে পড়তে হবে।
١٦- اكتب من حفظك سورة مما يلى: (الف) سورة الأعلى؛ (ب) سورة الشرح؛ (ج) سورة القدر-
[১৬. তোমার মুখস্থ থেকে নিচের যেকোনো একটি সূরা লিখ: (ক) সূরা আল-আলা; (খ) সূরা আল-ইনশিরাহ / আশ-শারহ; (গ) সূরা আল-কদর।]
[প্রশ্নপত্রে যেকোনো একটি সূরা লিখতে বলা হলেও শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও ১০০% রেফারেন্স নিশ্চিতকরণে নিচে তিনটি সূরাই পূর্ণ তাশকীলসহ উপস্থাপিত হলো:]
(ক) সূরা আল-আ’লা (سورة الأعلى) – পূর্ণাঙ্গ মূলপাঠ ও ভাবার্থ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
١- سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى
٢- الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّىٰ
٣- وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ
٤- وَالَّذِي أَخْرَجَ الْمَرْعَىٰ
٥- فَجَعَلَهُ غُثَاءً أَحْوَىٰ
٦- سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنسَىٰ
٧- إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۚ إِنَّهُ يَعْلَمُ الْجَهْرَ وَمَا يَخْفَىٰ
٨- وَنُيَسِّرُكَ لِلْيُسْرَىٰ
٩- فَذَكِّرْ إِن نَّفَعَتِ الذِّكْرَىٰ
١٠- سَيَذَّكَّرُ مَن يَخْشَىٰ
١١- وَيَتَجَنَّبُهَا الْأَشْقَى
١٢- الَّذِي يَصْلَى النَّارَ الْكُبْرَىٰ
١٣- ثُمَّ لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ
١٤- قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ
١٥- وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ
١٦- بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا
١٧- وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ
١٨- إِنَّ هَٰذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَىٰ
١٩- صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ
আয়াতভিত্তিক বাংলা রূপান্তর:
- পবিত্রতা ঘোষণা করুন আপনার মহান প্রতিপালকের নামের, যিনি সর্বোচ্চ।
- যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং সুষম ও সুবিন্যস্ত করেছেন।
- এবং যিনি পরিমিত নির্ধারণ করেছেন, অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন।
- এবং যিনি সবুজ তৃণভূমি উৎপন্ন করেছেন।
- অতঃপর তাকে রূপ দিয়েছেন কালচে আবর্জনায়।
- আমি আপনাকে পাঠ করাব, ফলে আপনি ভুলবেন না।
- তবে আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ব্যতীত; নিশ্চয় তিনি জানেন যা প্রকাশ্য এবং যা গোপন।
- এবং আমি আপনার জন্য সহজ করব সহজ পথকে।
- অতএব আপনি উপদেশ দিন যদি উপদেশ ফলপ্রসূ হয়।
- যে ভয় করে সে উপদেশ গ্রহণ করবে।
- আর তা এড়িয়ে চলবে যে পরম হতভাগ্য।
- যে প্রবেশ করবে মহা অগ্নিতে।
- অতঃপর সে সেখানে মরবেও না, বাঁচবেও না।
- নিশ্চয় সে সফলকাম হয়েছে যে আত্মশুদ্ধি অর্জন করেছে।
- এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করেছে অতঃপর নামায আদায় করেছে।
- বরং তোমরা পার্থিব জীবনকেই প্রাধান্য দিয়ে থাক।
- অথচ পরকালই উৎকৃষ্টতর এবং চিরস্থায়ী।
- নিশ্চয় এটি পূর্ববর্তী সহীফাগুলোতেও লিপিবদ্ধ ছিল।
- ইব্রাহীম ও মূসার সহীফাসমূহে।
(খ) সূরা আশ-শারহ / আল-ইনশিরাহ (سورة الشرح) – পূর্ণাঙ্গ মূলপাঠ ও ভাবার্থ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
١- أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ
٢- وَوَضَعْنَا عَنكَ وِزْرَكَ
٣- الَّذِي أَنقَضَ ظَهْرَكَ
٤- وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
٥- فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
٦- إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
٧- فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ
٨- وَإِلَىٰ رَبِّكَ فَارْغَب
আয়াতভিত্তিক বাংলা রূপান্তর:
- আমি কি আপনার বক্ষকে আপনার জন্য উন্মোচিত ও প্রশস্ত করে দেইনি?
- এবং আমি আপনার ওপর থেকে নামিয়ে দিয়েছি আপনার সেই গুরুভার,
- যা আপনার পিঠকে নুইয়ে দিচ্ছিল।
- এবং আমি আপনার মর্যাদাকে সমুন্নত করেছি।
- নিশ্চয় কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে।
- নিশ্চয় কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।
- অতএব যখনই আপনি অবসর পান, ইবাদতের কঠোর সাধনায় মগ্ন হোন।
- এবং আপনার প্রতিপালকের প্রতি গভীর অনুরাগী হোন।
(গ) সূরা আল-কদর (سورة القدر) – পূর্ণাঙ্গ মূলপাঠ ও ভাবার্থ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
١- إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
٢- وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ
٣- لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
٤- تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ
٥- سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ
আয়াতভিত্তিক বাংলা রূপান্তর:
- নিশ্চয় আমি এটি (আল-কুরআন) অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত কদরের রজনীতে।
- আর কদরের রজনী কী, সে সম্পর্কে আপনি কী জানেন?
- কদরের রজনী হলো হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ও উত্তম।
- সে রাতে ফেরেশতাগণ এবং রূহ (হযরত জিব্রাইল আ.) তাঁদের প্রতিপালকের নির্দেশে প্রতিটি কল্যাণময় নির্দেশ নিয়ে অবতরণ করেন।
- শান্তিময় এ রজনী, যা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: উলূমুল কুরআন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যে শাস্ত্রের মাধ্যমে আল-কুরআনের নাযিলকাল, মাক্কী ও মাদানী বিভাজন, সংকলন ইতিহাস, শানে নুযূল, কিরাআত, তাজবীদ, ইজায, মুহকাম-মুতাশাবিহ এবং নাসিখ-মানসুখ সম্পর্কিত বিবিধ জ্ঞান ও গবেষণার মূলনীতি আলোচিত হয়, তাকে উলূমুল কুরআন বলে।
প্রশ্ন ২: কুরআনের আয়াত সংখ্যায় মতভেদের কারণ কী?
উত্তর: মূল কুরআনের শব্দাবলী নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো কোনো বাক্যের শেষে সাহাবীদের বোঝানোর জন্য ওয়াকফ করতেন আবার কোনো সময় মিলিয়ে পড়তেন। এর ফলে কোনো ইমাম নির্দিষ্ট স্থানে থেমে একটি আয়াত ধরেছেন এবং কেউ মিলিয়ে পড়ার কারণে তাকে পূর্ববর্তী অংশের সাথে যুক্ত করেছেন।
প্রশ্ন ৩: আল-কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ বিশুদ্ধতম আয়াত কোনটি?
উত্তর: সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং ইমাম নাসায়ীর বিশুদ্ধ রেওয়ায়েত অনুযায়ী আল-কুরআনের সর্বশেষ নাযিলকৃত আয়াত হলো সূরা আল-বাকারার ২৮১ নং আয়াত। এটি নাযিলের মাত্র ৯ দিন পর রাসুল (সা.) ওফাত পান।
প্রশ্ন ৪: আবু বকর (রা.) এবং উসমান (রা.)-এর সংকলনের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: আবু বকর (রা.) হাফেজদের শাহাদাতের পর কুরআন হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে বিক্ষিপ্ত লিখিত খণ্ডগুলোকে একটি একক মুসহাফে একত্রিত করেছিলেন; আর উসমান (রা.) কিরাআতের দ্বন্দ্ব দূর করতে কুরাইশী উপভাষার ভিত্তিতে প্রমিত কপি তৈরি করে সমগ্র খেলাফতে প্রচার করেন।
প্রশ্ন ৫: তাজবীদ শিক্ষা করা এবং তিলাওয়াতে তা প্রয়োগ করার শরয়ী বিধান কী?
উত্তর: ইলমুত তাজবীদের তাত্ত্বিক খুঁটিনাটি নিয়ম জানা ফরযে কেফায়া হলেও আল-কুরআন তিলাওয়াতকালে লাহ্নে জালী (স্পষ্ট বিকৃতি) থেকে মুক্ত থেকে বিশুদ্ধভাবে তাজবীদ প্রয়োগ করে পড়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরযে আইন।
প্রশ্ন ৬: ওয়াকফে লাযিম (مـ) চিহ্নিত স্থানে না থামলে কী সমস্যা হতে পারে?
উত্তর: ওয়াকফে লাযিম হলো এমন স্থান যেখানে না থেমে পরবর্তী শব্দের সাথে মিলিয়ে পড়লে বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত বা মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে যায় এবং কখনো কখনো কুফরী অর্থের সৃষ্টি হতে পারে; তাই এখানে থামা ওয়াজিব।