জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ (As-Sirah an-Nabawiyyah) – 203204, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ২য় বর্ষ পরীক্ষা 2022

Abswer.com Abswer.com
21 September, 2026
৭২ মিনিট পড়ার সময়
৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية)
বিষয় কোড: ২০৩২০৪
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলী

١- اذكر المواقع الجغرافية للعرب – تحدث عن أثرها على حياة العرب مفصلا –

[১. আরবের ভৌগোলিক অবস্থার বিবরণ দাও। আরব অধিবাসীর জীবনে তার ভৌগোলিক প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

আরব উপদ্বীপ (شبه الجزيرة العربية) হলো এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি সুবিশাল ভূখণ্ড। প্রাচীনকাল থেকেই এ উপদ্বীপের রুক্ষ মরুপ্রকৃতি, দুর্গম পর্বতমালা এবং তিন দিক জলবেষ্টিত অবস্থান আরবদের স্বভাব-চরিত্র, মানসিক গঠন, জীবনসংগ্রাম এবং বিশ্বমঞ্চে তাঁদের উত্থানে এক অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছে।

১. আরবের ভৌগোলিক সীমানা ও অবস্থান (الموقع الجغرافي)

  • সীমানা: আরবের পশ্চিমে লোহিত সাগর (البحر الأحمر) ও সিনাই উপদ্বীপ; পূর্বে পারস্য উপসাগর (الخليج العربي) ও ওমান উপসাগর; দক্ষিণে ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর; এবং উত্তরে ঐতিহাসিক শাম (সিরিয়া-ফিলিস্তিন) ও ইরাকের সীমান্ত অবস্থিত।
  • প্রাকৃতিক বিভাগ: ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রাচীন আরব উপদ্বীপকে প্রধানত তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হতো:
    1. মরুময় আরব (Arabia Deserta): নজদ ও নফুদ অঞ্চল, যা বালুকাময় ও শুষ্ক।
    2. পাথুরে আরব (Arabia Petraea): হেজাজ ও সিনাই অঞ্চল, যা পাহাড়ি ও শুষ্ক ভূমি।
    3. উর্বর ও সুখী আরব (Arabia Felix): দক্ষিণ আরবের ইয়েমেন ও হাদরামাউত অঞ্চল, যেখানে পরিমিত বৃষ্টিপাত এবং কৃষিকাজ হতো।

২. আরব অধিবাসীদের জীবনে ভৌগোলিক প্রভাব (أثر الجغرافيا على حياة العرب)

  1. বেদুঈন ও যাযাবর মানসিকতা গঠন: শুষ্ক মরুময় জলবায়ু ও মরুঝড়ের কারণে আরবের অধিকাংশ মানুষ যাযাবর (বদভী) জীবনযাপনে বাধ্য হয়। উট ও ঘোড়া ছিল তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য বাহন এবং পানির সন্ধানে এক মরূদ্যান থেকে অন্য মরূদ্যানে ছুটে চলাই ছিল তাদের নিত্যদিন।
  2. অকৃত্রিম স্বাধীনতা ও আপসহীন শৌর্যবীর্য: আরবের দুর্লঙ্ঘ্য মরুভূমি কোনো পরাশক্তি (যেমন রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্য) আক্রমণ বা দখল করতে পারেনি। ফলে আরবরা চিরকাল স্বাধীনচেতা, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং নির্ভীক যোদ্ধা হিসেবে গড়ে উঠেছিল।
  3. অনুপম অতিথি পরায়ণতা (الكرم والضيافة): মরুভূমির চরম খাদ্য ও পানির সংকটের কারণে আরবরা আশ্রয়প্রার্থী পথচারী ও মেহমানদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও আতিথেয়তা প্রদর্শনকে তাদের প্রধান সামাজিক ধর্মে পরিণত করেছিল। নিজ বাহন জবাই করে মেহমানকে খাওয়ানো তাদের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল।
  4. ভাষার বিশুদ্ধতা ও কাব্যপ্রতিভা: শহরের কৃত্রিমতা ও বাইরের জাতির মিশ্রণমুক্ত থাকায় মরুভূমির বিশুদ্ধ আরবি ভাষা (الفصحى) অক্ষুণ্ণ ছিল। মরুভূমির অপার দিগন্ত, রাতের নক্ষত্ররাজি এবং নিঃসঙ্গ প্রকৃতি তাদের কল্পনাশক্তিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, ফলে তারা সহজাত বাগ্মী ও কালজয়ী কবিতে পরিণত হয়েছিল।
  5. গোত্রীয় সংহতি ও আসাবিয়্যাত (العصبية القبلية): কোনো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র বা বিচারব্যবস্থা না থাকায় বেঁচে থাকার তাগিদে প্রত্যেকে নিজ গোত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে বংশগৌরব ও গোত্রপ্রীতি তাদের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

উপসংহার

আরবের এই স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিবেশই আরব জাতিকে এমন এক অনমনীয়, নির্ভীক ও আত্মত্যাগী জাতিতে পরিণত করেছিল, যাদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা বিশ্বব্যাপী ইসলামের সুমহান দাওয়াত বিস্তারের জন্য মনোনীত করেছিলেন।


٢- ما الأيام الجاهلية؟ بين الأحوال السياسية والثقافية في الأيام الجاهلية –

[২. আইয়্যামে জাহেলিয়া কী? জাহেলিয়া যুগের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার বিবরণ দাও।]

ভূমিকা

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবের সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক অবক্ষয় এবং অন্ধকারের যুগকে ইসলামের পরিভাষায় ‘আইয়্যামে জাহেলিয়া’ বলা হয়। এটি ছিল ওহীর আলো থেকে বঞ্চিত এবং মানব রচিত বর্বরতা ও নৈতিক পতনের এক যুগ।

১. আইয়্যামে জাহেলিয়ার সংজ্ঞা ও সময়কাল

আরবি ‘আইয়্যাম’ (أيام) হলো ‘ইয়াউম’ (দিন বা যুগ)-এর বহুবচন এবং ‘জাহেলিয়্যাত’ (الجاهلية) শব্দটির মূল হলো অজ্ঞতা, মূর্খতা ও অবিমৃশ্যকারিতা। অর্থাৎ, তাওহীদের জ্ঞানহীন এবং মানবতাবর্জিত যুগ। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে হযরত ঈসা (আ.)-এর তিরোধানের পর থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত (প্রায় ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে ৬১০ খ্রিস্টাব্দ) সময়কে ‘আইয়্যামে জাহেলিয়া’ বলা হয়।

২. জাহেলিয়া যুগের রাজনৈতিক অবস্থা (الأحوال السياسية)

  • কোনো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র বা আইনের অনুপস্থিতি: সমগ্র আরবে কোনো সুসংগঠিত সরকার, বিচারালয় বা পুলিশ বাহিনী ছিল না। ‘জোর যার মুলুক তার’ (قانون الغاب) নীতিই ছিল সমাজের প্রধান বিধান।
  • গোত্রতান্ত্রিক শাসন (النظام القبلي): সমাজ বিভক্ত ছিল অসংখ্য স্বাধীন গোত্রে। প্রতিটি গোত্রের প্রধান ছিলেন একজন ‘শায়খ’ (الشيخ), যিনি বীরত্ব ও প্রবীণতার ভিত্তিতে গোত্রের নেতৃত্ব দিতেন।
  • রক্তক্ষয়ী গোত্রীয় যুদ্ধ (حروب القبائل): তুচ্ছ বিষয় নিয়ে এক গোত্রের সাথে অন্য গোত্রের সংঘাত বাধলে তা প্রজন্মান্তরে শত বছর ধরে চলত। যেমন: ঘোড়াদৌড়কে কেন্দ্র করে বনু আবস ও জুবয়ানের মধ্যকার ‘দাহেস ও গাবরা’-এর যুদ্ধ (حرب داحس والغبراء) দীর্ঘ ৪০ বছর স্থায়ী ছিল। অনুরূপভাবে উটের পা কেটে ফেলাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ‘বাসুসের যুদ্ধ’ (حرب البسوس)।
  • পরাশক্তির ক্রীড়নক রাজ্য: আরবের সীমান্তে বাইজেন্টাইন আশ্রিত ‘গাসসানী রাজ্য’ এবং পারস্য আশ্রিত ‘হীরা বা লাখমী রাজ্য’ পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল।

৩. জাহেলিয়া যুগের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা (الأحوال الثقافية)

  • সাহিত্য ও কবিতার স্বর্ণযুগ: রাজনৈতিক ও নৈতিক অন্ধকার থাকা সত্ত্বেও ভাষাগত ও সাহিত্যিক দিক থেকে জাহেলিয়া যুগ ছিল চরম উৎকর্ষের যুগ। আরবি কবিতা ছিল আরবদের রেজিস্টার বা বিশ্বকোষ (الشعر ديوان العرب)।
  • উকাজের বার্ষিক মেলা (سوق عكاظ): প্রতি বছর আরাফাত ও তায়েফের নিকটবর্তী ‘উকাজ’ মেলায় সাহিত্য ও কবিতার মহা প্রতিযোগিতা হতো।
  • মুয়াল্লাকাত বা ঝুলন্ত সপ্তগীতিকা (المعلقات السبع): উকাজ মেলার সেরা কবিদের (যেমন ইমরুল কায়েস, তারাফা, যুহাইর, লবীদ, আনতারা প্রমুখ) কবিতাকে স্বর্ণাক্ষরে লিখে পবিত্র কাবা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো।
  • স্মৃতিশক্তি ও বংশলতিকা বিদ্যা (علم الأنساب): আরবরা লিখতে না জানলেও অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিল। তারা হাজার হাজার কবিতার চরণ এবং বহু প্রজন্মের বংশলতিকা অবলীলায় মুখস্থ রাখত।
  • অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার: ভাগ্য নির্ধারণে তীরের নিক্ষেপ (الأزلام), পাখির গতিবিধি দেখে শুভ-অশুভ নির্ণয় (الطيرة) এবং নানা ভৌতিক অন্ধবিশ্বাসে তারা ডুবে ছিল।

উপসংহার

জাহেলিয়া যুগের এই রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক অরাজকতা এবং কাব্যিক দক্ষতার প্রেক্ষাপটেই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের অনুপম অলৌকিকতা আরবের সমাজ ও মানবতাকে সত্যের আলোকে পুনর্গঠিত করে।


٣- متى وقعت حادثة أصحاب الفيل؟ أذكر هذه الحادثة مفصلا –

[৩. হস্তি বাহিনীর ঘটনাটি কখন সংঘটিত হয়? ঘটনাটি বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

আসহাবুল ফীল বা হস্তি বাহিনীর ধ্বংসের ঘটনাটি ইসলামের আবির্ভাবের প্রাক্কালে সংঘটিত বিশ্ব ইতিহাসের এক অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। পবিত্র কুরআনের ১০৫তম সূরা ‘সূরা আল-ফীল’-এ আল্লাহ তায়ালা এই ঘটনার চিরন্তন বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

১. ঘটনার সময়কাল (تاريخ الحادثة)

ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী হস্তি বাহিনীর এই ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভ জন্মের আনুমানিক ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে। আরবদের ইতিহাসে এই বছরটি ‘আমুল ফীল’ (عام الفيل – হস্তী বর্ষ) নামে খ্যাত হয় এবং তারা এ বছর থেকেই নতুন সন গণনা শুরু করত।

২. ঘটনার প্রেক্ষাপট

  • ইয়েমেনের হাবশী খ্রিস্টান গভর্নর আবরাহা সানা শহরে ‘আল-ক্বুল্লাইস’ (القليّس) নামে একটি বিশালাকার স্বর্ণখচিত গির্জা নির্মাণ করে। তার উদ্দেশ্য ছিল আরবদের কাবার বদলে এই গির্জামুখী করা।
  • বনু কিনানাহ গোত্রের এক আরব ব্যক্তি এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে রাতের অন্ধকারে গোপনে সেই গির্জায় মলত্যাগ ও আবর্জনা ফেলে অপবিত্র করে আসে।
  • এতে আবরাহা চরম ক্ষিপ্ত হয়ে পবিত্র কাবা গৃহকে সমূলে মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেওয়ার শপথ নেয় এবং ৬০ হাজার সৈন্য ও একটি বিশাল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতি (নাম ছিল ‘মাহমুদ’) নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়।

৩. মক্কা অবরোধ ও আব্দুল মুত্তালিবের ঈমানী জবাব

  • মক্কার উপকণ্ঠে এসে আবরাহার সৈন্যরা কুরাইশ নেতা এবং নবীজীর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ২০০টি উট ছিনিয়ে নেয়।
  • আব্দুল মুত্তালিব আবরাহার সাথে দেখা করতে গেলে আবরাহা ভাবল তিনি কাবার জন্য মিনতি করবেন। কিন্তু আব্দুল মুত্তালিব বললেন: “أَنَا رَبُّ الإِبِلِ، وَإِنَّ لِلْبَيْتِ رَبًّا سَيَحْمِيهِ” (আমি তো উটের মালিক, তাই উট ফেরত চাই; আর এই ঘরের (কাবার) একজন মালিক আছেন, তিনিই তাঁর ঘর রক্ষা করবেন)।
  • আব্দুল মুত্তালিব কুরাইশদের নিয়ে মক্কার পাহাড়ে আশ্রয় নেন এবং কাবার দরজার কড়া ধরে আল্লাহর দরবারে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাবার হেফাজতের জন্য প্রার্থনা করেন।

৪. আসমানী ধ্বংসযজ্ঞ ও আবরাহার পতন

  1. পরদিন সকালে আবরাহা তার হস্তি বাহিনীকে কাবার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলে হাতিটি মক্কার দিকে এক কদমও অগ্রসর না হয়ে মাটিতে বসে পড়ে। কিন্তু অন্য দিকে মুখ ঘোরালে তা দ্রুত চলতে থাকে।
  2. ঠিক তখনই আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষুদ্র সামুদ্রিক পাখি (আবাবীল – أبابيل) আবির্ভূত হয়। প্রতিটি পাখির মুখে একটি এবং দুই পায়ে দুটি করে পোড়ামাটির পাথরকণা (حِجَارَةً مِنْ سِجِّيلٍ) ছিল।
  3. পাখিগুলো আবরাহার সৈন্যদের ওপর সেই পাথর নিক্ষেপ শুরু করে। পাথরের কণা যার মাথায় বিদ্ধ হতো তা শরীরের ভেতর দিয়ে ভেদ করে চলে যেত। মুহূর্তের মধ্যে আবরাহার সুবিশাল বাহিনী ভক্ষিত ঘাস ও খড়কুটোর মতো (عَصْفٍ مَأْكُولٍ) চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ধ্বংস হয়ে যায়।
  4. আবরাহা নিজে ক্ষতবিক্ষত ও গলিত কুষ্ঠরোগীর মতো ভয়াবহ অবস্থায় সানায় পৌঁছে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করে।

উপসংহার

আসহাবুল ফীলের এই ঐতিহাসিক ধ্বংসের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বিশ্ববাসীকে প্রমাণ দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে পবিত্র কাবা পরম সুরক্ষিত এবং অতি দ্রুতই এই ঘরের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে শেষ নবীর শুভ আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে।


٤- تحدث عن ولادة النبى صلى الله عليه وسلم ورضاعته ونشأته –

[৪. রসুল (স) এর জন্ম, দুগ্ধপান ও শৈশব সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

বিশ্বজাহানের রহমত হিসেবে আখিরী নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমন ছিল সমগ্র সৃষ্টির জন্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শুভক্ষণ। তাঁর জন্ম, শৈশব ও কৈশোর ছিল অনুপম পবিত্রতা এবং অলৌকিক ঐশী নির্দেশনায় পরিপূর্ণ।

১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শুভ জন্ম (المولد الشريف)

  • জন্মতারিখ ও স্থান: প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনামতে, ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল (বা ৯ই রবিউল আউয়াল মোতাবেক ২২শে এপ্রিল ৫৭১ খ্রি.) সোমবার সুবহে সাদেকের সময় মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে তিনি শুভাগমন করেন।
  • পিতৃহীন জন্ম: জন্মের প্রায় দুই মাস পূর্বেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ব্যবসা উপলক্ষ্যে সিরিয়া যাওয়ার পথে মদিনায় অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। ফলে নবীজী ইয়াতিম অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন।
  • শুভ নামকরণ: সপ্তম দিনে তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব আক্বীক্বা করেন এবং সমগ্র আরবে অপ্রচলিত অথচ সর্বশ্রেষ্ঠ নাম ‘মুহাম্মদ’ (محمّد – প্রশংসিত) রাখেন। তাঁর স্নেহময়ী মা আমিনা তাঁর নাম রাখেন ‘আহমাদ’ (أحمد)

২. দুগ্ধপান পর্ব (الرضاعة المباركة)

  1. প্রাথমিক স্তন্যপান: মাতার পর প্রথমে তাঁকে দুধ পান করান তাঁর চাচা আবু লাহাবের মুক্তদাসী ‘সুওয়াইবা’ (ثويبة)।
  2. হালীমাতুস সাদিয়ার আগমন: তৎকালীন আরবের সম্ভ্রান্ত প্রথা অনুযায়ী বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শেখা এবং মরুভূমির মুক্ত বাতাসে সুস্থ শারীরিক গঠনের জন্য নবজাতককে বেদুইন ধাত্রীদের কাছে পাঠানো হতো। বনু সা’দ গোত্রের বিবি হালীমা ও তাঁর স্বামী চরম দুর্ভিক্ষের বছর দুধের সন্তানের খোঁজে মক্কায় এসে শিশু মুহাম্মদ (সা.)-এর নূরানী চেহারা দেখে তাঁকে পরম ভালোবাসায় কোলে তুলে নেন।
  3. অলৌকিক বরকত ও সীনাহ চাক: হালীমার ঘরে প্রবেশের সাথে সাথেই তাঁর শুকনো স্তনে দুধের ফোয়ারা ছুটে, শুকিয়ে যাওয়া উটনীর ওলান দুধে ভরে যায় এবং বনু সা’দ গোত্রে বরকতের বন্যা বয়ে যায়। চার বছর বয়সে সেখানে অবস্থানকালে জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁর বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে (شق الصدر) হৃদপিণ্ড থেকে রক্তের পিণ্ড বের করে জমজমের পানি দিয়ে ধুয়ে নুর ও হিকমতে পরিপূর্ণ করে পুনরায় সেলাই করে দেন। এ ঘটনার পর হালীমা ভীত হয়ে তাঁকে মা আমিনার কোলে ফিরিয়ে দেন।

৩. শৈশব ও অভিভাবকত্ব (النشأة الكريمة)

  • মাতার ইন্তেকাল: ছয় বছর বয়সে মা আমিনা তাঁকে নিয়ে মদিনায় তাঁর নানার বাড়ি এবং পিতার কবর যিয়ারতে যান। ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে মা আমিনা অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। উম্মে আয়মান তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন।
  • দাদার স্নেহ ও ইন্তেকাল: দাদা আব্দুল মুত্তালিব পরম স্নেহে তাঁকে লালন-পালন করেন। কিন্তু নবীজীর আট বছর বয়সে দাদাও ইন্তেকাল করেন।
  • চাচা আবু তালিবের অভিভাবকত্ব: দাদার ওসিয়ত অনুযায়ী চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অভাবী সংসারে নবীজীর উপস্থিতির বরকতে খাদ্যে প্রাচুর্য আসত। তিনি চাচার সাথে মেষ চরাতেন এবং বারো বছর বয়সে চাচার সাথে সিরিয়ায় প্রথম বাণিজ্যিক সফরে যান, যেখানে বুহাইরা নামক খ্রিস্টান পাদ্রী তাঁর মধ্যে শেষ নবীর লক্ষণ প্রত্যক্ষ করেন।

উপসংহার

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত “أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَىٰ” আয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিল নবীজীর এই শৈশব, যা তাঁকে পার্থিব মানুষের নির্ভরতামুক্ত করে সরাসরি আল্লাহর আশ্রয়ে গড়ে তুলেছিল।


٥- تحدث عن نزول الوحى وبث الدعوة بالسر –

[৫. ওহি নাজিল ও গোপনে ইসলামের দাওয়াত প্রচার সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

হেরা গুহায় ওহী নাযিল ছিল মানবজাতির মুক্তির মহা সনদের সূচনা। ঘোর অন্ধকারের মাঝে একাকী আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন বিশ্বনবীর ওপর জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে প্রথম ওহী অবতরণ করে এবং অতঃপর তিন বছর ধরে সুকৌশলে গোপনে দাওয়াত প্রচারের মাধ্যমে ইসলামের মূল ভিত্তিমূল তৈরি হয়।

১. ওহী নাযিলের ঐতিহাসিক সূচনা (بدء الوحي)

  • হেরা গুহায় নির্জনবাস: নবুওয়াত লাভের কয়েক বছর পূর্ব থেকেই রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কার চরম সামাজিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়ে ব্যথিত হয়ে জাবালে নূরের হেরা গুহায় খাদ্য ও পানি নিয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদত ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন।
  • প্রথম ওহী অবতরণ (৬১০ খ্রি.): রমজান মাসের ক্বদরের রাতে (৪০ বছর বয়সে) প্রধান ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) হেরা গুহায় স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে বললেন: “اقْرَأْ” (পড়ুন)। নবীজী বললেন: “مَا أَنَا بِقَارِئٍ” (আমি তো পড়তে জানি না)। জিবরাঈল (আ.) তাঁকে বুকে চেপে ধরে সজোরে আলিঙ্গন করলেন এবং ছেড়ে দিয়ে পুনরায় পড়তে বললেন। এভাবে তিনবার আলিঙ্গনের পর সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিল হয়:

    “اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ¤ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ ¤ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ¤ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ¤ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ”

  • খাদিজা (রা.)-এর প্রবোধ ও ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল: এই অভাবনীয় অভিজ্ঞতায় নবীজী প্রকম্পিত হৃদয়ে ঘরে ফিরে খাদিজা (রা.)-কে বললেন: “زَمِّلُونِي زَمِّلُونِي” (আমাকে কম্বল দিয়ে আবৃত করো)। খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন: “কখনোই নয়, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না; কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায়ের বোঝা বহন করেন, মেহমানদারী করেন এবং সত্যের বিপদে সাহায্য করেন।” এরপর খাদিজা (রা.) তাঁকে তাঁর চাচাতো ভাই প্রবীণ পণ্ডিত ওয়ারাকা বিন নাওফালের কাছে নিয়ে গেলে ওয়ারাকা নিশ্চিত করেন যে ইনিই সেই ‘নামূস’ (জিবরাঈল), যিনি মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন।

২. গোপনে দাওয়াত প্রচার (الدعوة السرية)

  1. গোপন দাওয়াতের সময়কাল ও যৌক্তিকতা: নবুওয়াত লাভের পর সূরা মুদ্দাসসিরের মাধ্যমে প্রকাশ্যে প্রচারের আদেশ পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রথম তিন বছর নবীজী অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গোপনে দাওয়াত দেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিকূল মক্কায় একটি খাঁটি ঈমানদার অগ্রবর্তী কাফেলা প্রস্তুত করা।
  2. অগ্রবর্তীদের ইসলাম গ্রহণ (السابقون الأولون):
    • নারীদের মধ্যে প্রথম: উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা (রা.)।
    • পুরুষদের মধ্যে প্রথম: পরম বন্ধু হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
    • বালকদের মধ্যে প্রথম: নবীজীর পিতৃব্যপুত্র হযরত আলী (রা.) (বয়স ছিল আনুমানিক ১০ বছর)।
    • মুক্তদাসদের মধ্যে প্রথম: হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)।
    • আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াতে শ্রেষ্ঠ যুবকদের ইসলাম গ্রহণ: উসমান বিন আফফান, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)।
  3. দারুল আরক্বাম—ইসলামের প্রথম কেন্দ্র: সাহাবী হযরত আরক্বাম ইবনে আবিল আরক্বামের বাড়িটিকে গোপন দাওয়াত, কুরআন তিলাওয়াত ও নামাযের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। হযরত উমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে এই গোপন দাওয়াতের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে এবং প্রকাশ্যে আজান দিয়ে কাবায় নামায আদায়ের ঘোষণা দেওয়া হয়।

উপসংহার

গোপন দাওয়াতের এই সুদূরপ্রসারী কৌশল প্রমাণ করে যে ইসলামের প্রচার ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা, সতর্কতা ও প্রজ্ঞায় সুবিন্যস্ত।


٦- ما الإسراء والمعراج؟ بين مدللا من القرآن والسنة –

[৬. ইসরা ও মিরাজ কী? কুরআন সুন্নাহর দলিলসহ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসরা ও মিরাজ হলো বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের অলৌকিকতম মুজিযা এবং বিশ্ব ইতিহাসের এক মহাশ্রেষ্ঠ মহাকাশীয় ভ্রমণ। মক্কার চরম দুঃখ-কষ্টের বছর ‘আমুল হুযন’-এর পর আল্লাহ তায়ালা স্বীয় হাবীবকে আসমানী জগতের সান্নিধ্য ও প্রত্যক্ষ দর্শন দান করে সম্মানিত করেছিলেন।

১. ইসরা ও মিরাজের পরিচয়

  • আল-ইসরা (الإسراء): আভিধানিক অর্থ নৈশভ্রমণ। শরীয়তের পরিভাষায়, জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত অলৌকিক বাহন বোরাকে চড়ে ভ্রমণ করাকে ‘ইসরা’ বলা হয়।
  • আল-মিরাজ (المعراج): আভিধানিক অর্থ ঊর্ধ্বারোহণ বা সিঁড়ি। বায়তুল মুকাদ্দাসে সকল নবীদের ইমামতি করার পর সেখান থেকে প্রথম আসমান ভেদ করে সপ্ত আসমান, সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করে আরশে আযীমে আল্লাহর খাস দরবারে উপস্থিতি ও দিদার লাভ করাকে ‘মিরাজ’ বলা হয়।

২. পবিত্র কুরআনের দলিলসমূহ (الأدلة من القرآن)

  1. ইসরা সম্পর্কে সূরা আল-ইসরা-এর ১ নং আয়াত:

    “سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ”

    বাংলা মর্মার্থ: “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায়—যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করি।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ১)

  2. মিরাজ সম্পর্কে সূরা আন-নাজম-এর আয়াতসমূহ:

    “ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّىٰ ¤ فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَىٰ ¤ فَأَوْحَىٰ إِلَىٰ عَبْدِهِ مَا أَوْحَىٰ ¤ مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَىٰ … وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ ¤ عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَىٰ”

    বাংলা মর্মার্থ: “অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন এবং আরও কাছে আসলেন। ফলে তাদের মধ্যে ধনুকের দুই প্রান্তের মতো বা তার চেয়েও কম দূরত্ব রইল। তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার ছিল তা ওহী করলেন… নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।” (সূরা আন-নাজম: ৮-১৪)

৩. সহীহ হাদিস ও সুন্নাহর দলিল (الأدلة من السنة)

সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ প্রামাণ্য হাদিস গ্রন্থে হযরত আনাস ইবনে মালিক, মালিক ইবনে সা’সাআ এবং আবু জর গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:

  • রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বোরাক নামক জ্যোতির্ময় বাহন আনা হয়, যা চোখের দৃষ্টিসীমার দূরত্বে কদম রাখত। তিনি বোরাকে চড়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে দুই রাকাত নামাযে পূর্ববর্তী সকল আম্বিয়াদের ইমামতি করেন।
  • অতঃপর জিবরাঈল (আ.) তাঁকে নিয়ে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। ১ম আকাশে আদম (আ.), ২য় আকাশে ঈসা ও ইয়াহইয়া (আ.), ৩য় আকাশে ইউসুফ (আ.), ৪র্থ আকাশে ইদ্রিস (আ.), ৫ম আকাশে হারুন (আ.), ৬ষ্ঠ আকাশে মূসা (আ.) এবং ৭ম আকাশে বায়তুল মা’মুরে হেলান দিয়ে থাকা ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় হয়।
  • সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছে জিবরাঈল (আ.) থেমে যান এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) একাকী এগিয়ে গিয়ে মহান রবের সান্নিধ্যে উপস্থিত হন। সেখানে উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয় এবং সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত উপহার দেওয়া হয়।

উপসংহার

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা হলো, ইসরা ও মিরাজ স্বপ্নযোগে নয়, বরং জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে সংঘটিত হয়েছিল।


٧- تحدث عن صفات رسول الله الخَلْقِية والخُلُقِية –

[৭. রসুল (স) এর দৈহিক ও চারিত্রিক গুণাবলি আলোচনা কর।]

ভূমিকা

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ দৈহিক রূপ-সৌন্দর্য এবং সর্বোত্তম চারিত্রিক পূর্ণতা দিয়ে ধরণীতে প্রেরণ করেছিলেন। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে: “وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ” (নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত—সূরা আল-ক্বলম: ৪)।

১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৈহিক সৌন্দর্য ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য (الصفات الخَلْقِية)

হযরত আলী, বারা ইবনে আযিব এবং উম্মে মা’বাদ (রা.)-এর প্রামাণ্য বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর দৈহিক রূপ ছিল অতুলনীয়:

  • উচ্চতা ও অবয়ব: তিনি অতিরিক্ত দীর্ঘদেহী ছিলেন না, আবার খর্বাকৃতিরও ছিলেন না; বরং মাঝারি আকারের চেয়ে কিছুটা দীর্ঘ এবং অত্যন্ত সুঠাম ও মনোহর গড়নের ছিলেন।
  • চেহারা ও ত্বক: তাঁর চেহারা মোবারক ছিল পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও কমনীয়। গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল শ্বেত-গোলাপী আভা মিশ্রিত। হযরত আলী (রা.) বলেন: “আমি তাঁর পূর্বে বা পরে তাঁর মতো কাউকে দেখিনি।”
  • চক্ষুযুগল ও মুখাবয়ব: তাঁর চোখ দুটি ছিল ডাগর, মায়াবী এবং চোখের সাদা অংশে রক্তিম লালিমা ছিল। ভ্রু দুটি ছিল ধনুকের মতো বাঁকা অথচ পরস্পরে মিলিত নয়। দাঁত মোবারক ছিল মুক্তার মতো উজ্জ্বল, কথা বললে যেন শুভ্র জ্যোতি বিচ্ছুরিত হতো।
  • চুল ও দাড়ি মোবারক: চুল মোবারক পুরোপুরি সোজা বা অতি কোঁকড়ানো ছিল না, বরং ঢেউখেলানো ছিল এবং কানের লতি বা কাঁধ পর্যন্ত ঝুলত। দাড়ি মোবারক ছিল ঘন ও সুন্দর। ওফাতের সময় তাঁর মাথায় ও দাড়িতে বিশটির বেশি সাদা চুল ছিল না।
  • মোহরে নবুওয়াত ও সুগন্ধি: তাঁর দুই কাঁধের মধ্যস্থলে কবুতরের ডিমের ন্যায় উঁচুতে লালচে বর্ণের নবুওয়াতের মোহর অঙ্কিত ছিল। তাঁর পবিত্র শরীর ও ঘাম থেকে মৃগনাভী ও মেশকের চেয়েও সুবাস ছড়াত। যে পথ দিয়ে তিনি হেঁটে যেতেন, পরে সে পথ সুবাসিত থাকত।

২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুপম চারিত্রিক গুণাবলী (الصفات الخُلُقِية)

  1. সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা: নবুওয়াতের পূর্বেই আরবের ঘোর শত্রুরাও তাঁকে একবাক্যে ‘আল-আমীন’ (الْأَمِينُ – পরম বিশ্বস্ত) এবং ‘আস-সাদিক্ব’ (الصَّادِقُ – সত্যবাদী) বলে স্বীকার করেছিল।
  2. ক্ষমা ও কোমলতা: ব্যক্তিগত আক্রোশে তিনি জীবনে কারও ওপর প্রতিশোধ নেননি। তায়েফে রক্তাক্ত হয়েও তিনি ধ্বংসের বদদোয়া না করে বলেছিলেন: “হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন, তারা তো অবুঝ।” মক্কা বিজয়ের দিন চরম নির্যাতনকারী কুরাইশদের তিনি ঘোষণা দেন: “لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ” (আজ তোমাদের ওপর কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত)।
  3. অকৃত্রিম বিনয় ও সহমর্মিতা: তিনি কখনো বাদশাহদের মতো চলাফেরা করতেন না। মাটিতে বসতেন, নিজের জুতো নিজে সেলাই করতেন, সেবকের সাথে এক সাথে খেতেন এবং কোনো গোলাম বা দাসী ডাকলে তিনি সানন্দে সাড়া দিতেন।
  4. উদারতা ও দানশীলতা: দানশীলতায় তিনি ছিলেন মুক্ত বাতাসের মতো। যাঁর যা অভাব তা তিনি পূরণ করতেন, নিজের ঘরে সঞ্চয় করে রাখতেন না।
  5. কুরআনী চরিত্র: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-কে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: “كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ” অর্থাৎ, পবিত্র কুরআনই ছিল তাঁর জীবন্ত চরিত্র।

উপসংহার

নবীজীর এই অনুপম রূপ ও অনন্য চরিত্রের কারণেই তিনি কোটি কোটি মুমিনের হৃদয়ের চিরন্তন ভালোবাসা ও অনুসরণের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ।


٨- تحدث عن غزوة بدر – ثم اكتب أثرها في تاريخ الإسلامية –

[৮. বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা কর। অতঃপর ইসলামের ইতিহাসে তার প্রভাব লিপিবদ্ধ কর।]

ভূমিকা

১৭ই রমজান দ্বিতীয় হিজরিতে (৬২৪ খ্রি.) সংঘটিত ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ (غزوة بدر الكبرى) ছিল ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মুখ সমর। পবিত্র কুরআনে এই দিনটিকে ‘ইয়াউমুল ফুরকান’ (يَوْمَ الْفُرْقَانِ – সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী দিন) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

১. বদর যুদ্ধের কারণ ও প্রেক্ষাপট

  • মক্কার কুরাইশদের অবিরাম আগ্রাসন: হিজরতের পরও কুরাইশরা মদিনা আক্রমণের ষড়যন্ত্র করছিল এবং মুসলমানদের বাস্তুচ্যুত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল।
  • আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা: আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে বিশাল বাণিজ্য কাফেলা আসছিল, যার অর্জিত অর্থ মুসলমানদের ধ্বংসের জন্য অস্ত্র ক্রয়ে ব্যয় করার পরিকল্পনা ছিল। নবীজী ৩১৩ জনের একটি ছোট দল নিয়ে কাফেলা অবরোধের জন্য বের হন।
  • আবু জাহেলের রণপ্রস্তুতি: আবু সুফিয়ান সাগরের তীর ঘেঁষে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও অহংকারী আবু জাহেল মক্কা থেকে এক হাজার সশস্ত্র সৈন্য, সাতশত উট ও একশত ঘোড়া নিয়ে বদরের প্রাঙ্গণে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।

২. যুদ্ধক্ষেত্রের অসম চিত্র ও অলৌকিক বিজয়

  1. সৈন্যসংখ্যার অসমতা: মুসলিম বাহিনীতে সদস্য ছিলেন মাত্র ৩১৩ জন (মতান্তরে ৩১৪ বা ৩১৫ জন)। তাঁদের সাথে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট, যা তারা পালাক্রমে আরোহণ করতেন। বিপরীতে কুরাইশরা ছিল এক হাজার আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ও বর্মাবৃত সৈন্য।
  2. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আকুল মোনাজাত: যুদ্ধের রাতে নবীজী অশ্রুসিক্ত নয়নে দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে আরজি জানান: “اللَّهُمَّ إِنْ تَهْلِكْ هَذِهِ الْعِصَابَةُ مِنْ أَهْلِ الإِسْلَامِ لَا تُعْبَدْ فِي الْأَرْضِ” (হে আল্লাহ! আজ যদি এই ছোট্ট দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত যমীনে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ থাকবে না)।
  3. আসমানী ফেরেশতাদের অবতরণ: আল্লাহ তায়ালা দোয়া কবুল করে এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করেন (সূরা আনফাল: ৯)। বদরের প্রান্তরে প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টি বর্ষণ করে মুমিনদের কদম দৃঢ় করেন।
  4. চূড়ান্ত ফলাফল: মাত্র কয়েক ঘণ্টার অসম যুদ্ধে কাফের সেনাপতি আবু জাহেল, উতবা, শায়বা ও উমাইয়া ইবনে খালাফসহ প্রধান ৭০ জন কাফের সর্দার নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন যুদ্ধবন্দী হয়। পক্ষান্তরে মাত্র ১৪ জন মুসলিম (৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসার) শাহাদাত বরণ করেন।

৩. ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব (أثرها في التاريخ)

  • ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া: বদরের বিজয়ের মাধ্যমে মদিনা সনদভিত্তিক ক্ষুদ্র ইসলামি রাষ্ট্র আরব উপদ্বীপের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
  • কুরাইশ নেতৃত্বের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া: মক্কার ঔদ্ধত্য ও কাফের শক্তির প্রধান নেতারা বদরে নিহত হওয়ায় মক্কার একক কর্তৃত্ব চিরতরে খর্ব হয়।
  • মুনাফিক ও ইহুদিদের ষড়যন্ত্র স্তব্ধ হওয়া: মদিনার অভ্যন্তরে থাকা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নেতৃত্বাধীন মুনাফিক এবং চুক্তিভঙ্গকারী ইহুদি গোত্রগুলো প্রকাশ্যে ইসলামের বিরোধিতা করতে সাহস হারিয়ে ফেলে।
  • ঈমানী আত্মবিশ্বাসের নবজাগরণ: মুমিনরা বাস্তবভাবে প্রমাণ পান যে সংখ্যা ও অস্ত্র নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও মজবুত ঈমানই বিজয়ের আসল শক্তি।

উপসংহার

বদরের যুদ্ধ ছিল একটি সামরিক বিজয়ের চেয়েও অনেক বড় এক সভ্যতার মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায়, যা বিশ্বমঞ্চে তাওহীদের বিজয়ের পথ উন্মুক্ত করেছিল।


مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্নাবলী

٩- تحدث عن حلف الفضول –

[৯. হিলফুল ফুজুল সম্পর্কে আলোচনা কর।]

হিলফুল ফুজুল (حلف الفضول – শান্তিসংঘ): হরবুল ফিজারের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ এবং এক ইয়েমেনী বণিকের পণ্য ছিনতাইয়ের প্রতিবাদে তৎকালীন আরবের সুবোধ ও শান্তিপ্রিয় যুবকদের নিয়ে গঠিত ঐতিহাসিক শান্তিসংঘ। ৫৮৯ বা ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে মক্কার বিশিষ্ট নাগরিক আব্দুল্লাহ ইবনে জুদ’আনের গৃহে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাত্র কুড়ি বছর বয়সে এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
চুক্তির মূল ধারা: ১. মক্কার কোনো দেশি বা বিদেশি নাগরিকের ওপর জুলুম হতে দেওয়া হবে না; ২. মজলুমকে তার পূর্ণ হক ফেরত পাইয়ে দিতে ঐক্যবদ্ধ সাহায্য করা হবে; ৩. অত্যাচারীর হাত ভেঙে দেওয়া হবে এবং ৪. সমাজে দুর্বল ও পথিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
নবুওয়াতের পরেও নবীজী এই মহৎ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলতেন: “আব্দুল্লাহ ইবনে জুদ’আনের ঘরে আমি এমন এক চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম, যার বিনিময়ে যদি আমাকে লাল উটও দেওয়া হতো তবুও আমি তা পছন্দ করতাম না। ইসলামেও যদি কেউ আমাকে এমন চুক্তির আহ্বান জানায়, তবে আমি অবশ্যই সাড়া দেব।”


١٠- تحدث عن الرحلة التجارية التي قام بها رسول الله صلى الله عليه وسلم قبل البعثة –

[১০. রসুল (স) এর নবুয়তপূর্ব জীবনের ব্যবসায়িক সফর সম্পর্কে আলোচনা কর।]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতপূর্ব জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা ছিল খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায়িক কাফেলা নিয়ে সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফর (২৫ বছর বয়সে)। মক্কার সম্ভ্রান্ত, ধনবতী ও পুণ্যবতী নারী হযরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) নবীজীর সততা, বিশ্বস্ততা ও পবিত্র চরিত্রের সুনাম শুনে তাঁর কাছে প্রস্তাব পাঠান যে, তিনি অন্যান্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে দ্বিগুণ লভ্যাংশের বিনিময়ে তাঁর পণ্য নিয়ে সিরিয়া যাবেন।
নবীজী রাজী হন এবং খাদিজা (রা.) তাঁর বিশ্বস্ত দাস ‘মায়সারা’কে নবীজীর সেবক ও সফরসঙ্গী হিসেবে পাঠান। এই সফরে নবীজীর অসাধারণ ব্যবসায়িক সততা, বিনম্র আচরণ ও হিসাবের স্বচ্ছতায় অভূতপূর্ব ও কল্পনাতীত মুনাফা অর্জিত হয়। এছাড়াও পথিমধ্যে ‘নাসতুরা’ নামক এক খ্রিস্টান সাধু নবীজীর মধ্যে শেষ নবীর লক্ষণ দেখতে পান এবং মায়সারা প্রচণ্ড রোদে নবীজীর মাথার ওপর মেঘের ছায়া দেওয়ার অলৌকিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। ফিরে এসে মায়সারার মুখে এসব বিবরণ শুনে খাদিজা (রা.) মুগ্ধ হয়ে নবীজীর কাছে আনুষ্ঠানিক বিয়ের প্রস্তাব পাঠান।


١١- تحدث عن صلح الحديبية –

[১১. হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে (৬২৮ খ্রি.) রাসূলুল্লাহ (সা.) এক সহস্রাধিক সাহাবীকে নিয়ে শুধুমাত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছালে কুরাইশরা বাধা দেয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ আলোচনার পর কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমরের সাথে একটি ঐতিহাসিক দশ বছরের শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত।
সন্ধির প্রধান শর্তাবলী: ১. এ বছর মুসলমানরা ওমরাহ না করে ফিরে যাবে, আগামী বছর মাত্র তিন দিনের জন্য অস্ত্রহীন অবস্থায় আসবে; ২. আগামী দশ বছর যুদ্ধবিরতি থাকবে; ৩. মক্কার কোনো ব্যক্তি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদিনায় গেলে তাকে ফেরত দিতে হবে, কিন্তু মদিনা থেকে কেউ মক্কায় গেলে ফেরত দেওয়া হবে না; ৪. আরবের যেকোনো গোত্র যেকোনো পক্ষের সাথে মিত্রতা করতে পারবে।
দৃশ্যত এই শর্তগুলো মুসলমানদের প্রতিকূলে মনে হলেও আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে একে ‘ফাতহুম মুবীন’ (فَتْحًا مُبِينًا – সুস্পষ্ট বিজয়) ঘোষণা করেন; কারণ এই শান্তির সুযোগে মানুষ স্বাধীনভাবে মেলামেশা করে ইসলাম গ্রহণ করে এবং পরবর্তী মাত্র দুই বছরে বিগত বিশ বছরের চেয়েও বেশি লোক মুসলমান হয়।


١٢- تحدث عن الهجرة إلى الحبشة –

[১২. আবিসিনিয়ায় হিজরত সম্পর্কে আলোচনা কর।]

মক্কায় কুরাইশদের অমানবিক জুলুম ও শারীরিক নির্যাতন চরমে পৌঁছালে নবুওয়াতের পঞ্চম বছরে (৬১৫ খ্রি.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরতের অনুমতি দিয়ে বলেন: “তোমরা আবিসিনিয়ায় চলে যাও, সেখানে এমন একজন ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান বাদশাহ (নাজ্জাশী) আছেন, যাঁর দেশে কারও ওপর জুলুম করা হয় না।”
প্রথম হিজরত: রজব মাসে হযরত উসমান (রা.) ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাহ (রা.)-সহ ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন।
দ্বিতীয় হিজরত: কুরাইশদের নির্যাতন আরও বেড়ে যাওয়ায় হযরত জাফর ইবনে আবি তালিবের নেতৃত্বে ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন নারী পুনরায় আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। কুরাইশরা আমর ইবনুল আসকে দামি উপহারসহ নাজ্জাশীর দরবারে পাঠিয়ে মুসলিমদের ফেরত আনার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু জাফর ইবনে আবি তালিব নাজ্জাশীর দরবারে সূরা মারইয়ামের আয়াত তিলাওয়াত করে কুরআনের তাওহীদ ও ঈসা (আ.)-এর সঠিক পরিচয় তুলে ধরলে বাদশাহ নাজ্জাশী কেঁদে ফেলেন এবং কুরাইশদের ফিরিয়ে দিয়ে মুসলমানদের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদান করেন।


١٣- اكتب المؤاخاة بين الانصار والمهاجرين التي قام بها النبى صلى الله عليه وسلم –

[১৩. আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নবিজি (স) এর অবদান আলোচনা কর।]

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম দূরদর্শী ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল মক্কার সর্বস্বান্ত মুহাজির এবং মদিনার স্থানীয় আনসারদের মধ্যে ‘মুওয়াখাত’ (المؤاخاة) বা দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রতিষ্ঠা।
হযরত আনাস ইবনে মালিকের ঘরে নবীজী আনুমানিক ৪৫ বা ৫০ জন মুহাজিরকে সমসংখ্যক আনসারের সাথে একে অপরের ভাই হিসেবে ঘোষণা দেন (যেমন: আব্দুর রহমান ইবনে আউফের সাথে সা’দ ইবনে রাবী)।
এই ভ্রাতৃত্বের ফলে আনসারগণ নিজেদের বাড়ি-ঘর, জমি-জমা ও সম্পদের অর্ধেক স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুহাজির ভাইদের দিয়ে দেন। এমনকি তৎকালীন পরিস্থিতিতে বদরের যুদ্ধ পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে রক্তসম্পর্কের মতোই মিরাসী বণ্টন চালু ছিল। এই অনন্য ঈমানী ভ্রাতৃত্বের ফলে মুহাজিরদের পুনর্বাসন সমস্যা সমাধান হয় এবং মদিনায় একটি সুদৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ সামাজিক ভিত্তি গড়ে ওঠে।


١٤- تحدث عن أهل بيت النبى صلى الله عليه وسلم –

[১৪. নবি (স) এর আহলে বায়ত সম্পর্কে আলোচনা কর।]

‘আহলে বায়ত’ (أهل البيت) বলতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র পরিবারবর্গকে বোঝায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাঁদের পবিত্রতা ঘোষণা করে বলেন: “إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا” (সূরা আহযাব: ৩৩)।
আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত সদস্যগণ:
১. উম্মাহাতুল মুমিনীন: নবীজীর পবিত্র সহধর্মিণীগণ, যেমন হযরত খাদিজা, সওদা, আয়েশা, হাফসা ও উম্মে সালামাহ (রা.)।
২. আসহাবুল কিসা (চাদরাবৃত পুণ্যবানগণ): নবীজীর কন্যা হযরত ফাতিমাতুয যাহরা, জামাতা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব এবং দুই দৌহিত্র হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রা.)।
৩. বনু হাশিম ও মুত্তালিবের বংশধর: যাদের জন্য সাদাক্বাহ ও যাকাত গ্রহণ চিরতরে হারাম করা হয়েছে (হযরত আলী, জাফর, আক্বীল ও আব্বাস রা.-এর পরিবার)। আহলে বায়তের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সম্মান পোষণ করা প্রতিটি খাঁটি মুমিনের জন্য ঈমানের অবিচ্ছেদ্য দাবি।


١٥- تحدث عن بناء مسجد النبوى صلى الله عليه وسلم –

[১৫. মসজিদে নববি নির্মাণ সম্পর্কে আলোচনা কর।]

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় পদার্পণ করে রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বপ্রথম যে ঐতিহাসিক কাজটি করেন তা হলো মসজিদে নববী নির্মাণ। নবীজীর উটনী বনু নাজ্জার গোত্রের দুই এতিম বালক সাহল ও সুহাইলের জমিনে যেখানে বসে পড়েছিল, নবীজী দশ দিনার মূল্যে সেই জমি ক্রয় করেন।
নবীজী সাহাবায়ে কেরামের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজে কাঁচা ইট ও মাটি বহন করে মসজিদে নববীর নির্মাণে অংশ নেন। এর দেয়াল ছিল কাঁচা ইটের, স্তম্ভ ছিল খেজুর গাছের কাণ্ডের এবং ছাদ ছিল খেজুর পাতার। মসজিদের একপাশে একটি ছাউনিযুক্ত উঁচু স্থান নির্মাণ করা হয় যাকে ‘আসহাবুস্ সুফফাহ’ (أصحاب الصفة) বলা হয়, যা ছিল দ্বীনের নিঃস্ব জ্ঞানপিপাসু সাহাবীদের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। মসজিদে নববী কেবল নামাযের স্থান ছিল না, বরং তা ছিল প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের সংসদ ভবন, বিচারালয়, সামরিক হেডকোয়ার্টার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কেন্দ্র।


١٦- تحدث عن فتح مكة –

[১৬. মক্কা বিজয় সম্পর্কে আলোকপাত কর।]

অষ্টম হিজরির ২০শে রমজান (৬৩০ খ্রি.) সংঘটিত মক্কা বিজয় (فتح مكة الأعظم) ছিল ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রক্তপাতহীন সামরিক ও নৈতিক বিজয়। কুরাইশরা হুদাইবিয়ার সন্ধি লঙ্ঘন করে মুসলমানদের মিত্র বনু খুযাআ গোত্রের ওপর রাতের আঁধারে আক্রমণ করলে এই সন্ধি ভেঙে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) দশ হাজার সাহাবীর এক সুবিশাল বাহিনী নিয়ে অত্যন্ত গোপনে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন এবং মক্কার উপকণ্ঠে মাররুয জাহরানে ক্যাম্প স্থাপন করেন। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান পরিস্থিতি উপলব্ধি করে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবীজী বিনম্রভাবে কাবার দিকে অগ্রসর হয়ে ঘোষণা দেন: “যে ব্যক্তি কাবার চত্বরে থাকবে সে নিরাপদ, যে আবু সুফিয়ানের ঘরে থাকবে সে নিরাপদ, এবং যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে সেও নিরাপদ।”
নবীজী কাবার ভেতর প্রবেশ করে ৩৬০টি প্রতিমা ভেঙে দেন এবং উচ্চারণ করেন: “جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ ۚ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا” (সত্য সমাগত এবং মিথ্যা বিলুপ্ত, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল)। অতঃপর কুরাইশদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তিনি সমগ্র মানবজাতিকে ক্ষমার শ্রেষ্ঠতম নজির উপহার দেন।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: আমুল ফীল বা হস্তী বর্ষ কী?

উত্তর: আবরাহার হস্তি বাহিনী কাবা ধ্বংস করতে এসে পাখির পাথরে ধ্বংস হওয়ার বছরটিকে (৫৭০/৫৭১ খ্রি.) আমুল ফীল বলা হয়, যে বছর মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

প্রশ্ন ২: হেরা গুহায় সর্বপ্রথম পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতগুলো নাযিল হয়?

উত্তর: সূরা আল-আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত (اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ…)।

প্রশ্ন ৩: হুদাইবিয়ার সন্ধি কত হিজরিতে সংঘটিত হয়?

উত্তর: ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে কুরাইশদের সাথে মুসলমানদের ঐতিহাসিক হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।

প্রশ্ন ৪: বদরের যুদ্ধে কতজন মুসলিম শহীদ হয়েছিলেন?

উত্তর: ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধে সর্বমোট ১৪ জন সাহাবী (৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসার) শাহাদাত বরণ করেছিলেন।

প্রশ্ন ৫: ইসলামের প্রথম কেন্দ্র বা গোপন শিক্ষাকেন্দ্র কোনটি ছিল?

উত্তর: মক্কার সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হযরত আরক্বাম ইবনে আবিল আরক্বাম (রা.)-এর বাড়ি (দারুল আরক্বাম)।

প্রশ্ন ৬: আসহাবুস সুফফাহ কী ছিল?

উত্তর: মসজিদে নববীর উত্তর পাশে খেজুর পাতার ছাউনিযুক্ত একটি উন্মুক্ত চত্বর, যা ছিল নিঃস্ব সাহাবীদের ইলম ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রথম আবাসিক প্রতিষ্ঠান।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *