ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (السيرة النبوية)
বিষয় কোড: ২০৩২০৪
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলী
١- بين أحوال شبه الجزيرة العربية الدينية والاجتماعية والسياسية قبل البعثة النبوية-
[১. নবুওয়াত পূর্ববর্তী আরব উপদ্বীপের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী আরবের ঐতিহাসিক সময়কালকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতার যুগ বলা হয়। সেই সময় সমগ্র আরব উপদ্বীপ আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চরম অবক্ষয় ও অরাজকতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।
১. ধর্মীয় অবস্থা (الحالة الدينية)
- মূর্তিপূজা ও বহু ঈশ্বরবাদ: হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর রেখে যাওয়া তাওহীদের বিশুদ্ধ ধর্ম বিস্মৃত হয়ে আরবরা পৌত্তলিকতায় লিপ্ত হয়। আমর ইবনে লুহাই আল-খুজায়ী প্রথম সিরিয়া থেকে আরবে মূর্তিপূজা আমদানি করে। পবিত্র কাবা ঘরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে লাত, মানাত, উযযা ও হুবাল ছিল প্রধান।
- কুসংস্কার ও ভাগ্য গণনা: তীর নিক্ষেপ (আযলাম), গণক ও জ্যোতিষীদের মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ করত এবং জ্বিন-ভূতের পূজা করত। অল্প কিছু মানুষ ‘হানিফ’ বা একত্ববাদী ছিলেন (যেমন যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল)।
২. সামাজিক ও নৈতিক অবস্থা (الحالة الاجتماعية والخلقية)
- নারীর অমর্যাদা ও কন্যাসন্তান হত্যা (وأد البنات): নারীদের ভোগের পণ্য ও পরিবারের বোঝা মনে করা হতো। কন্যাসন্তানের জন্মকে চরম অসম্মানজনক বিবেচনা করে অনেকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ” (যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যেত এবং সে চরম মনোকষ্টে দম বন্ধ হয়ে থাকত—সূরা আন-নাহল: ৫৮)।
- অনাচার ও দাসপ্রথা: মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ছিল নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত। দাস-দাসীদের কোনো মানবিক অধিকার ছিল না; তাদের পশুর মতো কেনাবেচা ও নির্যাতন করা হতো।
- ইতিবাচক কিছু বৈশিষ্ট্য: অন্ধকারের মধ্যেও তাদের মধ্যে অসাধারণ মেহমানদারী, বীরত্ব, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও প্রাঞ্জল কাব্যপ্রতিভার মতো সহজাত গুণাবলী বিদ্যমান ছিল।
৩. রাজনৈতিক অবস্থা (الحالة السياسية)
- কেন্দ্রীয় শাসনের অনুপস্থিতি: সমগ্র আরবে কোনো সুসংহত কেন্দ্রীয় সরকার, আইন বা বিচারব্যবস্থা ছিল না। সমাজ গোত্রীয় শাসনে পরিচালিত হতো।
- গোত্রীয় অহমিকা ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ: তুচ্ছ কারণে এক গোত্র আরেক গোত্রের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো এবং তা পুরুষানুক্রমে চলত (যেমন—বাসূসের যুদ্ধ ৪০ বছর এবং ফিজারের যুদ্ধ বহু বছর স্থায়ী হয়েছিল)। “জোর যার মুল্লুক তার”—এটাই ছিল আরবের নীতি।
উপসংহার
এই সর্বগ্রাসী নৈতিক ও আত্মিক দেউলিয়াত্ব থেকে বিশ্ববাসীকে উদ্ধার করার জন্যই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন।
٢- تحدث عن حادثة الهجرة النبوية الشريفة وأسبابها وأهم نتائجها-
[২. ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনা, এর কারণ এবং এর প্রধান ফলাফলসমূহ আলোচনা কর।]
ভূমিকা
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা মুকাররামা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐতিহাসিক হিজরত কেবল একটি স্থান ত্যাগ ছিল না; বরং তা ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক মহা বিজয়ের বাঁক এবং বিশ্বজয়ী ইসলামি সভ্যতার সূচনাবিন্দু।
১. হিজরতের প্রধান কারণসমূহ (أسباب الهجرة)
- মক্কাবাসীদের চরম নির্যাতন ও হত্যা ষড়যন্ত্র: দারুন নদওয়ায় কুরাইশ নেতারা আবু জাহেলের পরামর্শে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক একত্রিত হয়ে রাতের আঁধারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তরবারি দিয়ে একযোগে হত্যা করবে।
- আল্লাহর ঐশী নির্দেশ: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে নবীজীকে ষড়যন্ত্রের খবর জানান এবং মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দেন।
- মদিনাবাসীদের আমন্ত্রণ ও আনুকূল্য: আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাইয়াতে ইয়াসরিবের (মদিনা) অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করে এবং নবীজী ও তাঁর সাহাবীদের জীবন বাজি রেখে নিরাপত্তা দেওয়ার শপথ গ্রহণ করে।
২. হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী (أحداث الهجرة)
- রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে নিজের বিছানায় রেখে যান মানুষের গচ্ছিত আমানতসমূহ ফেরত দেওয়ার জন্য।
- নবীজী (সা.) পরম বন্ধু হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সাথে নিয়ে রাতের অন্ধকারে মক্কা ত্যাগ করেন এবং মক্কার দক্ষিণে ‘সাওর পর্বতের গুহায়’ তিন দিন অবস্থান করেন। কাফেররা গুহামুখ পর্যন্ত পৌঁছালেও আল্লাহ মাকড়সার জাল ও কবুতরের বাসার মাধ্যমে তাঁদের রক্ষা করেন। নবীজী সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন: “لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا” (চিন্তা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন—সূরা আত-তাওবাহ: ৪০)।
- সাওর গুহা থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত নামক পথপ্রদর্শকের সাহায্যে লোহিত সাগরের উপকূল দিয়ে তাঁরা মদিনার উপকণ্ঠে কুবা পল্লীতে পৌঁছান এবং সেখানে ইসলামের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে কুবা’ প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর ১২ই রবিউল আউয়াল তিনি মদিনায় প্রবেশ করেন।
৩. হিজরতের সুদূরপ্রসারী ফলাফল (نتائج الهجرة)
- প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা: মদিনায় নবী করীম (সা.)-এর নেতৃত্বে বিশ্বের প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
- মদিনা সনদ ও ভ্রাতৃত্ববোধ: আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ঐতিহাসিক মুওয়াখাত এবং সকল ধর্মের মানুষের জন্য মদিনা সনদ কার্যকর হয়।
- হিজরি সন প্রবর্তন: খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর আমলে এই যুগান্তকারী ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে হিজরি সন গণনা শুরু হয়।
- দাওয়াতের আন্তর্জাতিকীকরণ: মক্কার অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ইসলাম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তার লাভ করে।
উপসংহার
হিজরত ছিল সত্যের বিজয়ের লক্ষ্যে আত্মত্যাগ, নিখুঁত পরিকল্পনা ও আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসার (তাওয়াক্কুল) এক অনুপম জীবন্ত শিক্ষা।
٣- اكتب عن صلح الحديبية وأسبابه وبنوده وأثره في فتح مكة-
[৩. হুদাইবিয়ার সন্ধি, এর কারণ, শর্তাবলী এবং মক্কা বিজয়ে এর প্রভাব সম্পর্কে লেখ।]
ভূমিকা
ষষ্ঠ হিজরির যিলকদ মাসে মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক স্থানে কুরাইশদের সাথে মুসলমানদের যে ঐতিহাসিক সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়, তা ইসলামের রাজনৈতিক ও দাওয়াতি ইতিহাসে এক অভাবনীয় মোড় পরিবর্তন করে দেয়। পবিত্র কুরআনে একে ‘ফাতহুম মুবীন’ বা প্রকাশ্য বিজয় বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
১. হুদাইবিয়ার পটভূমি ও কারণসমূহ
- রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি সাহাবীদের সাথে নিয়ে নিরাপদে কাবা তওয়াফ করছেন। এর ভিত্তিতে ষষ্ঠ হিজরিতে ১৪০০ নিরস্ত্র সাহাবী নিয়ে তিনি ওমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওনা হন।
- কুরাইশরা মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দেয়। রাসূল (সা.) বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য হযরত উসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠান।
- উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের গুজব ছড়িয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের কাছ থেকে মৃত্যুর মুখেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেন, যা ইতিহাসে ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ নামে পরিচিত। এই শপথের কথা শুনে কুরাইশরা ভীত হয়ে সুহাইল ইবনে আমরকে পাঠিয়ে সন্ধি প্রস্তাব দেয়।
২. সন্ধির প্রধান প্রধান শর্তাবলী (بنود الصلح)
- মুসলমানরা এ বছর ওমরাহ না করেই ফিরে যাবে এবং পরবর্তী বছর মাত্র তিন দিনের জন্য মক্কায় এসে ওমরাহ পালন করতে পারবে।
- উভয় পক্ষের মধ্যে আগামী দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ থাকবে।
- আরবের যে কোনো গোত্র স্বাধীনভাবে মুসলমানদের বা কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তি করতে পারবে। (বনু খুজাআ মুসলমানদের সাথে এবং বনু বকর কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়)।
- মক্কার কোনো লোক অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদিনায় গেলে তাকে ফেরত দিতে হবে; কিন্তু মদিনার কোনো মুসলিম মক্কায় গেলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।
৩. শর্তাবলীর বাহ্যিক রূপ ও সাহাবীদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া
বাহ্যিকভাবে সন্ধির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অসম্মানজনক ও একতরফা মনে হওয়ায় হযরত উমর (রা.)-সহ অনেক সাহাবী অত্যন্ত আবেগাপ্লুত ও ব্যথিত হয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশনায় সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ফেরার পথে নাযিল হয় সূরা আল-ফাতহ: “إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا” (নিশ্চয় আমি আপনাকে এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি—সূরা আল-ফাতহ: ১)।
৪. মক্কা বিজয়ে হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রভাব
- যুদ্ধবিরতি ও মেলামেশার সুযোগ: যুদ্ধ বন্ধ হওয়ায় অমুসলিমরা মদিনায় আসা-যাওয়া শুরু করে এবং মুসলমানদের লেনদেন, আখলাক ও ধর্মীয় সৌন্দর্য ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করে। ফলে মাত্র দুই বছরে তৎকালীন আরবের সেরা বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আসসহ অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন।
- চুক্তিভঙ্গ ও মক্কা বিজয়ের পটভূমি: সন্ধির দ্বিতীয় বছরে কুরাইশদের মিত্র বনু বকর মুসলমানদের মিত্র বনু খুজাআ গোত্রের ওপর রাতের আঁধারে আক্রমণ করে রক্তপাত ঘটায় এবং কুরাইশরা তাদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে। ফলে নবীজী (সা.) অষ্টম হিজরিতে ১০,০০০ সৈন্য নিয়ে বিনা রক্তপাতে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় সম্পন্ন করেন।
উপসংহার
হুদাইবিয়ার সন্ধি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অতুলনীয় রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও অহিংস কৌশলের অনন্য প্রমাণ, যা মক্কা বিজয়ের রাজপথ প্রস্তুত করেছিল।
٤- بين غزوة بدر الكبرى وأسبابها وأحداثها ونتائجها الحاسمة في تاريخ الإسلام-
[৪. ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ, এর কারণ, ঘটনাবলী এবং ইসলামের ইতিহাসে এর মীমাংসাকারী ফলাফল বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
দ্বিতীয় হিজরির ১৭ই রমযান সংঘটিত ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার প্রথম চূড়ান্ত সম্মুখ সমরাভিযান। কুরআনে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
১. বদর যুদ্ধের প্রধান কারণসমূহ
- কুরাইশদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র: মক্কাবাসী কাফেররা মুসলমানদের মদিনায় নিরাপদে থাকতে না দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং মদিনা আক্রমণ করার হুমকি দিচ্ছিল।
- মুহাজিরদের স্থাবর সম্পত্তি লুণ্ঠন: মক্কা ত্যাগের সময় মুহাজিরদের ফেলে আসা ঘর-বাড়ি ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ কুরাইশরা দখল করে সিরিয়ায় বাণিজ্যে বিনিয়োগ করেছিল।
- আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা ও আবু জাহেলের উদ্ধত চ্যালেঞ্জ: সিরিয়া থেকে ফেরার পথে আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে সুরক্ষা দেওয়ার অজুহাতে আবু জাহেল এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে বদরের প্রান্তরে উপস্থিত হয়।
২. যুদ্ধের ঘটনাবলী ও অলৌকিক সাহায্য
- সৈন্যসংখ্যার অসমতা: মুসলমানদের সৈন্য ছিল মাত্র ৩১৩ জন, যাদের সাথে মাত্র দুটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট ছিল। অপরদিকে কাফেরদের বাহিনী ছিল এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বহর।
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাতর প্রার্থনা: যুদ্ধের রাতে নবীজী অশ্রুসজল চোখে আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ করেন: “اللَّهُمَّ إِنْ تَهْلِكْ هَذِهِ الْعِصَابَةُ مِنْ أَهْلِ الإِسْلامِ لا تُعْبَدْ فِي الأَرْضِ” (হে আল্লাহ! মুষ্টিমেয় এই দলটিকে যদি আজ তুমি ধ্বংস করে দাও, তবে জমিনে তোমার ইবাদত করার আর কেউ থাকবে না—সহীহ মুসলিম)।
- আসমানী ফেরেশতাদের সাহায্য: আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সাহায্যে এক হাজার ফেরেশতা অবতীর্ণ করেন। হযরত আলী ও হামযাহ (রা.)-এর অদম্য বীরত্বে কাফেরদের ব্যূহ ভেঙে পড়ে।
৩. ঐতিহাসিক ফলাফলসমূহ (نتائج غزوة بدر)
- ইসলামের প্রথম সামরিক বিজয়: মাত্র ১৪ জন সাহাবীর শাহাদাতের বিনিময়ে কাফেরদের ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় কুখ্যাত নেতা (আবু জাহেল, উতবা, শায়বা, উমাইয়া ইবনে খালাফ) নিহত হয় এবং ৭০ জন বন্দি হয়।
- মদিনা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা: মদিনার আশপাশের মুনাফিক ও ইহুদিরা মুসলমানদের অপরাজেয় শক্তি হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
- যুদ্ধবন্দিদের প্রতি মানবিক দৃষ্টান্ত: শিক্ষিত বন্দিদের মুক্তিপণ হিসেবে মদিনার ১০ জন নিরক্ষর শিশুকে লেখাপড়া শেখানোর শর্ত দেওয়া হয়, যা মানব ইতিহাসে শিক্ষার প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদর্শনের নজির।
উপসংহার
বদর যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে সামরিক বিজয় অস্ত্র বা সৈন্যসংখ্যার ওপর নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য, তাকওয়া ও অটুট ঈমানের ওপরই নির্ভর করে।
٥- تحدث عن بناء المسجد النبوي والمؤاخاة بين المهاجرين والأنصار ودورهما في تأسيس الدولة-
[৫. মসজিদে নববী নির্মাণ, আনসার-মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্ব বন্ধন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এদের ভূমিকা আলোচনা কর।]
ভূমিকা
মদিনায় হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি নতুন সমাজ ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য দুটি মৌলিক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন: প্রথমত, আধ্যাত্মিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে মসজিদে নববী নির্মাণ; দ্বিতীয়ত, সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ‘মুওয়াখাত’ বা ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রতিষ্ঠা।
১. মসজিদে নববী নির্মাণ ও এর বহুমুখী ভূমিকা
- নির্মাণ ইতিহাস: মদিনায় নবীজীর উটনী সাহাল ও সুহাইল নামক দুই এতিম বালকের যে জমিতে বসেছিল, সেই জমিটি কিনে নিয়ে নবীজী নিজ হাতে পাথর বহন করে সাহাবীদের সাথে নিয়ে মসজিদ নির্মাণ করেন। এর দেওয়াল ছিল কাঁচা ইটের এবং ছাদ ছিল খেজুর পাতার।
- রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ভূমিকা:
- ইবাদতের কেন্দ্র: এক কাতারে দাঁড়িয়ে সাম্য ও শৃঙ্খলার বাস্তব প্রশিক্ষণ।
- সংসদ ও সচিবালয়: যুদ্ধের পরিকল্পনা, শান্তিচুক্তি এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সাথে কূটনৈতিক বৈঠক এই মসজিদেই অনুষ্ঠিত হতো।
- বিচারালয় ও সামাজিক সালিশ: বিরোধ মীমাংসা ও বিচারকার্যের কেন্দ্র ছিল এই মসজিদ।
- সুফফাহ তথা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়: মসজিদের পেছনে ‘আসহাবুস্ সুফফাহ’ ছিল ইসলামের প্রথম আবাসিক বিদ্যাপীঠ, যেখান থেকে আবু হুরায়রা (রা.)-এর মতো মহান হাদিস বিশারদ তৈরি হন।
২. আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন (المؤاخاة)
- পটভূমি: মুহাজিররা দ্বীনের খাতিরে মক্কায় নিজেদের ঘর-বাড়ি, জমি ও অর্থকড়ি ফেলে সম্পূর্ণ রিক্তহস্তে মদিনায় এসেছিলেন। তাদের পুনর্বাসন ছিল নবগঠিত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
- বাস্তবায়ন: হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর ঘরে নব্বই বা একশত জন সাহাবীর উপস্থিতিতে নবীজী একজন মুহাজিরের সাথে একজন আনসারকে ভাই বানিয়ে দেন। (যেমন—আব্দুর রহমান ইবনে আউফের সাথে সা’দ ইবনে রাবী আনসারী)।
- আনসারদের আত্মত্যাগ: আনসাররা তাদের অর্ধেক সম্পত্তি, ব্যবসা ও ঘর-বাড়ি মুহাজির ভাইদের সানন্দে লিখে দেন। এমনকি প্রাথমিক যুগে তারা একে অপরের উত্তরাধিকারী পর্যন্ত হতেন। মুহাজিররাও পরজীবী না হয়ে নিজ শ্রমে ব্যবসা শুরু করে দ্রুত স্বাবলম্বী হন।
উপসংহার
মসজিদে নববী মুসলিম সমাজকে আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক শক্তি জুগিয়েছিল, আর মুওয়াখাত দূর করেছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। এই দুই স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই মদিনার ইসলামি রাষ্ট্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
٦- اكتب عن حجة الوداع وخطبة النبي ﷺ وأهم المبادئ الإنسانية الواردة فيها-
[৬. বিদায় হজ, নবীজী (সা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ এবং এতে ঘোষিত প্রধান মানবিক মূলনীতিগুলো লেখ।]
ভূমিকা
দশম হিজরিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের একমাত্র ও অন্তিম পূর্ণাঙ্গ হজ পালন করেন, যা ইতিহাসে ‘হজ্জাতুল বিদা’ বা বিদায় হজ নামে চিরস্মরণীয়। আরাফাতের জাবালে রাহমাতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার সাহাবীর মহাসমাবেশে তিনি যে কালজয়ী ভাষণ প্রদান করেন, তা বিশ্ব মানবতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ।
১. বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রধান প্রধান দিকসমূহ
- জীবনের পবিত্রতা ও সম্পদের নিরাপত্তা:
নবীজী ইরশাদ করেন: “হে লোকসকল! তোমাদের রক্ত (জীবন), তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান পরস্পরের জন্য তেমনি পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়, যেমন পবিত্র আজকের এই দিন, এই মাস এবং তোমাদের এই শহর।”
- বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের মূলোৎপাটন:
“কোনো আরবের কোনো অনারবের ওপর, আর কোনো অনারবের কোনো আরবের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো শ্বেতাঙ্গের কৃষ্ণাঙ্গের ওপর বা কৃষ্ণাঙ্গের শ্বেতাঙ্গের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই—কেবলমাত্র তাকওয়া বা খোদাভীতি ব্যতীত। তোমরা সবাই আদম থেকে এবং আদম মাটি থেকে তৈরি।”
- অর্থনৈতিক শোষণ ও সুদের চিরতরে বিলুপ্তি:
“জাহেলী যুগের সকল সুদ আজ থেকে বাতিল করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সকল পাওনা সুদ সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করছি।”
- নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা:
“নারীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তাদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপরও তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে। তোমরা তাদের সাথে সদয় আচরণ কর।”
- শ্রমিক ও অধস্তনদের অধিকার:
“তোমাদের অধীনস্তদের (দাস-দাসী ও শ্রমিক) খেয়াল রাখ। তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে, যা পরিধান করবে তাদেরও তা পরিধান করাবে।”
- কুরআন ও সুন্নাহর চিরন্তন দিশারী:
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি; যতক্ষণ তোমরা এ দুটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।”
- নবুওয়াতের দায়িত্ব সমাপ্তির ঐতিহাসিক সাক্ষ্য:
ভাষণের শেষে নবীজী সমবেত উম্মতকে জিজ্ঞেস করলেন: “আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছি?” লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত হলো: “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।” তখন নবীজী আকাশের দিকে শাহাদাত আঙুল তুলে তিনবার বললেন: “اللَّهُمَّ اشْهَدْ” (হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক)।
উপসংহার
বিদায় হজের এই ভাষণ ছিল সাম্য, ইনসাফ, মানবাধিকার ও বিশ্বশান্তির এক শাশ্বত ঐশী রূপরেখা, যার প্রতিটি ধারা আজও আধুনিক বিশ্বের পথপ্রদর্শক।
٧- بين أخلاق النبي ﷺ وشمائله الكريمة في تعامله مع الأصدقاء والأعداء-
[৭. বন্ধু ও শত্রু উভয়ের সাথে আচরণে নবীজী (সা.)-এর মহান চরিত্র ও অনুপম গুণাবলী বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী। স্বীয় চরিত্র মাধুর্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন: “وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ” (নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত—সূরা আল-কলম: ৪)। তিনি ছিলেন বন্ধুদের জন্য মমতাময় পিতা এবং চরম শত্রুদের জন্যও ক্ষমা ও হেদায়েতের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
১. বন্ধুদের সাথে নবীজী (সা.)-এর আচরণ (مع الأصحاب والأصدقاء)
- অনন্য বিনয় ও সদাচরণ: তিনি সাহাবীদের সাথে অত্যন্ত খোলামেলা মিশতেন, শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন এবং দাস-দাসীদের সাথে বসে আহার করতেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন: “আমি দশ বছর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছি; তিনি কোনোদিন আমাকে ‘উফ’ শব্দটি বলেননি এবং কোনো কাজের ব্যাপারে বলেননি—এটা কেন করলে বা ওটা কেন করলে না?”
- পরামর্শ গ্রহণ (শূরা): খন্দকের যুদ্ধে সালমান ফারসির পরামর্শ, বদরের ময়দানে হুবাব ইবনুল মুনযিরের পরামর্শ সানন্দে গ্রহণ করে তিনি বন্ধুদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতেন।
- সুখে-দুঃখে পাশে থাকা: সাহাবীদের রোগ হলে সেবা করতেন, কেউ শহীদ হলে তাঁর পরিবারের ভার নিজ কাঁধে তুলে নিতেন।
২. শত্রুদের সাথে নবীজী (সা.)-এর আচরণ (مع الأعداء والخصوم)
- তায়েফের ময়দানে নিঃশর্ত ক্ষমা: তায়েফবাসীরা পাথর মেরে তাঁকে রক্তাক্ত করেছিল। পাহাড়ের ফেরেশতা এসে দুই পাহাড়ের মাঝে পিষে ধ্বংস করার অনুমতি চাইলে তিনি বললেন: “না, বরং আমি আশা করি এদের বংশধরদের মধ্য থেকে আল্লাহ এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে।”
- মক্কা বিজয়ের সাধারণ ক্ষমা: যে কুরাইশরা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল, সাহাবীদের নির্মমভাবে নির্যাতন করেছিল, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন: “لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ” (আজ তোমাদের ওপর কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা যাও, তোমরা সবাই মুক্ত)।
- ইহুদি ও কাফেরদের সাথে চুক্তি ও সততা: অমুসলিমদের গচ্ছিত আমানত হিজরতের রাতেও ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। কোনো যুদ্ধে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও উপাসনালয়ের পুরোহিতদের হত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিলেন।
উপসংহার
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই সুমহান সার্বজনীন চরিত্রই ছিল ইসলামের বিজয়ের প্রধানতম হাতিয়ার।
٨- تحدث عن فتح مكة المكرمة وأسبابه ودخول النبي ﷺ مكة متواضعاً وعفوه العام-
[৮. মক্কা বিজয়, এর কারণ, বিনীতভাবে নবীজীর মক্কায় প্রবেশ এবং তাঁর ঐতিহাসিক সাধারণ ক্ষমা আলোচনা কর।]
ভূমিকা
অষ্টম হিজরির ২০শে রমযান মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামের ঐতিহাসিক নবজাগরণের পূর্ণতা আসে। যে শহর থেকে নবীজী একদিন চোখের জলে বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেই শহরেই তিনি বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করেন সম্পূর্ণ অহিংসভাবে।
১. মক্কা বিজয়ের কারণসমূহ
- হুদাইবিয়ার সন্ধির সুস্পষ্ট শর্ত ভঙ্গ করে কুরাইশদের সহায়তায় বনু বকর গোত্র মুসলমানদের মিত্র বনু খুজাআ গোত্রের ওপর আক্রমণ চালিয়ে নারী ও শিশুদের হত্যা করে।
- বনু খুজাআর প্রতিনিধি দল মদিনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি তিনটি প্রস্তাব দেন: হয় খুজাআদের রক্তের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, নয়তো বনু বকরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, অন্যথায় হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল বলে গণ্য হবে। কুরাইশরা অহংকারবশত সন্ধি বাতিলের পথ বেছে নেয়।
২. মক্কায় বিনীত প্রবেশ ও মূর্তি অপসারণ
- রাসূলুল্লাহ (সা.) দশ হাজার সাহাবীর বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওনা হন। তাঁর নির্দেশ ছিল—কোনো অবস্থাতেই যেন আক্রমণ না করা হয় এবং রক্তপাত ঘটানো না হয়।
- বিজয়ীর বেশে প্রবেশের সময় কোনো অহংকার ছিল না; আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় তাঁর মাথা এতটাই নিচু ছিল যে তা উটনীর পিঠ ছুঁইছুঁই করছিল।
- তিনি সরাসরি পবিত্র কাবায় প্রবেশ করেন এবং সেখানে থাকা ৩৬০টি মূর্তি নিজ লাঠি দিয়ে ভেঙে ফেলেন এবং তিলাওয়াত করেন: “جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا” (সত্য সমাগত এবং মিথ্যা বিলুপ্ত, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল—সূরা বনী ইসরাঈল: ৮১)।
৩. ঐতিহাসিক সাধারণ ক্ষমা (العفو العام)
কাবার চত্বরে কুরাইশরা ভয়ে কাঁপছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন: “হে কুরাইশগণ! তোমরা আমার কাছ থেকে আজ কী আচরণ আশা কর?” তারা সমস্বরে বলল: “আপনি উদার ভাই এবং উদার ভাইয়ের সন্তান।” তখন বিশ্বনবী (সা.) ইউসুফ (আ.)-এর ভাষায় ঘোষণা করলেন: “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত।” এই ক্ষমার মহত্ত্ব দেখে আবু সুফিয়ান, ইকরিমা ইবনে আবি জাহেল, হিন্দাসহ মক্কার প্রায় সবাই স্বেচ্ছায় ইসলাম কবুল করে।
উপসংহার
মক্কা বিজয় ছিল বলপ্রয়োগের ওপর নীতি ও আদর্শের বিজয়, অহংকারের ওপর বিনয়ের বিজয় এবং প্রতিহিংসার ওপর ক্ষমার এক চিরন্তন মহাকাব্য।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্নাবলী
٩- اكتب عن حادثة شق الصدر وحكمة الله فيها-
[৯. বক্ষ বিদারণের (শাক্কে সদর) ঘটনা এবং এতে নিহিত খোদায়ী প্রজ্ঞা সম্পর্কে লেখ।]
শৈশবে বনু সাদ গোত্রে হালীমাতুস সাদিয়ার কোলে লালন-পালনকালে এবং নবুওয়াতের পূর্বে ও মেরাজের রাতে জিবরাঈল (আ.) কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে জমজমের পানিতে ধৌত করার ঘটনাকে ‘শাক্কে সদর’ বলা হয়। জিবরাঈল (আ.) তাঁর অন্তর থেকে একটি কালো জমাট রক্ত বের করে বলেন: “এটি ছিল তোমার মধ্যকার শয়তানের অংশ।” এরপর ঈমান ও হিকমত দিয়ে তাঁর অন্তর পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়। এর খোদায়ী প্রজ্ঞা ছিল—রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মানবীয় কুপ্রবৃত্তি, শয়তানের কুমন্ত্রণা ও সকল প্রকার আত্মিক কলুষতা থেকে জন্মগতভাবে পবিত্র রাখা, যাতে তিনি ওহীর মহাভার বহনের উপযুক্ত হন।
١٠- تحدث عن دار الأرقم ودورها في الدعوة السرية-
[১০. দারুল আরকাম এবং গোপন দাওয়াতে এর ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা কর।]
নবুওয়াতের তৃতীয় বর্ষে মক্কার সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত যুবক সাহাবী আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িটিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের গোপন কেন্দ্র হিসেবে মনোনীত করেন। এটিকে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা হেডকোয়ার্টার বলা হয়। কুরাইশদের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে এখানে মুসলমানরা সমবেত হয়ে সালাত আদায় করতেন, পবিত্র কুরআনের নাযিলকৃত আয়াতসমূহ মুখস্থ করতেন এবং ঈমানী তারবিয়াত গ্রহণ করতেন। হযরত হামযাহ ও উমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে এই দারুল আরকামের সদস্য সংখ্যা চল্লিশে উন্নীত হলে প্রকাশ্যে দাওয়াতের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
١١- اكتب عن بيعة العقبة الأولى والثانية وأثرهما في الهجرة-
[১১. আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাইয়াত এবং হিজরতের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে লেখ।]
নবুওয়াতের একাদশ বর্ষে মক্কার মিনার আকাবা নামক স্থানে ইয়াসরিবের (মদিনার) ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি নবীজীর হাতে শিরক, চুরি, ব্যভিচার ও মিথ্যা বর্জনের শপথ নেন, যা ‘আকাবার প্রথম বাইয়াত’ নামে পরিচিত। পরবর্তী বছর ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সমবেত হয়ে ‘আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াত’ করেন, যেখানে তাঁরা জান-মাল দিয়ে নবীজী ও মুসলমানদের রক্ষা করার রাজনৈতিক শপথ নেন। এই দুটি বাইয়াতের ফলেই মদিনায় ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং সাহাবী ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিরাপদে হিজরত করার ভৌগোলিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
١٢- ما هي أسباب غزوة أحد والدروس المستفادة منها؟
[১২. উহুদ যুদ্ধের কারণ এবং তা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ কী?]
তৃতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে সংঘটিত উহুদ যুদ্ধের মূল কারণ ছিল বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ এবং আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদিনা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার চক্রান্ত। এ যুদ্ধের প্রধান শিক্ষা হলো: নেতার (আমীরের) সুস্পষ্ট আদেশ অমান্য করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তিরন্দাজ দলের পাহাড়ের গিরিপথ ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে নিশ্চিত বিজয় সাময়িক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছিল। এছাড়া মুসআব ইবনে উমাইর ও সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত হামযাহ (রা.)-সহ ৭০ জন বীর সাহাবীর শাহাদাত প্রমাণ করে যে সত্যের পরীক্ষায় মুমিনদের রক্ত দিতে হয়।
١٣- اكتب نبذة عن غزوة الخندق (الأحزاب) وبراعة التخطيط فيها-
[১৩. খন্দক (আহযাব) যুদ্ধ এবং এর অসাধারণ কৌশলগত পরিকল্পনা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ লেখ।]
পঞ্চম হিজরিতে কুরাইশ, গাতফান ও ইহুদিদের সমন্বয়ে গঠিত দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল সম্মিলিত বাহিনী (আহযাব) মদিনা অবরোধ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত সালমান ফারসি (রা.)-এর পরামর্শে মদিনার অরক্ষিত উত্তর সীমান্তে এক বিশাল পরিখা (খন্দক) খনন করেন, যা আরব যুদ্ধের ইতিহাসে ছিল সম্পূর্ণ অভিনব কৌশল। কাফেরদের অশ্বারোহী বাহিনী এই পরিখা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ প্রায় এক মাস অবরোধের পর তীব্র শীত, ঝড়-তুফান এবং আল্লাহর গায়েবী সাহায্যে শত্রুশিবির ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায় এবং মদিনা রাষ্ট্র চিরতরে বহিরাগত আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত হয়।
١٤- تحدث عن وثيقة المدينة كأول دستور مدني في الإسلام-
[১৪. ইসলামের প্রথম নাগরিক সংবিধান হিসেবে ‘মদিনা সনদ’ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
হিজরতের পর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনার মুহাজির, আনসার এবং ইহুদি ও পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও প্রতিরক্ষার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) ৪৭ বা ৫৩টি ধারাবিশিষ্ট যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তাই ‘মদিনা সনদ’। এটি বিশ্বের প্রথম লিখিত নাগরিক সংবিধান। এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল: সকল সম্প্রদায় মিলে এক সম্মিলিত জাতি (উম্মাহ ওয়াহিদা) গঠন, ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা, রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ নিষিদ্ধকরণ, বহিঃশত্রুর আক্রমণে যৌথ প্রতিরক্ষা এবং যে কোনো বিরোধে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রধান সালিশ হিসেবে মান্য করা।
١٥- اكتب عن معجزة الإسراء والمعراج وأهميتها-
[১৫. অলৌকিক ইসরা ও মিরাজ এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে লেখ।]
নবুওয়াতের দশম বা একাদশ বর্ষে রজব মাসের রাতে সশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা ভ্রমণকে ‘ইসরা’ এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ পেরিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা ও মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে আরোহণকে ‘মিরাজ’ বলা হয়। এটি ছিল ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলৌকিক মুজিযা। এর মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায উপহার দেওয়া হয়, যা মুমিনের আত্মিক মিরাজ। চরম শোক ও নিপীড়নের মুহূর্তে এটি ছিল প্রিয় হাবীবের প্রতি মহান আল্লাহর সান্ত্বনা ও মহাজাগতিক মর্যাদা প্রদর্শনের এক পরম নিদর্শন।
١٦- ما هي أهم الدروس المستفادة من عام الوفود؟
[১৬. ‘প্রতিনিধি দলের বছর’ (আমুল উফূদ) থেকে প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষণীয় বিষয়গুলো কী?]
নবম হিজরিকে ‘আমুল উফূদ’ বা প্রতিনিধি দলের বছর বলা হয়। মক্কা বিজয় ও তাবুক অভিযানের পর আরবের প্রতিটি অঞ্চল ও গোত্র থেকে প্রায় সত্তরটিরও বেশি প্রতিনিধি দল মদিনায় এসে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে। এ থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ হলো: সত্যের বিজয় হলে মিথ্যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিলুপ্ত হয়; সঠিক কৌশল ও ক্ষমার মাধ্যমে চরম শত্রুদেরও আপন করা যায়; এবং ইসলামি দাওয়াতের জন্য রাষ্ট্রীয় শক্তি ও স্থিতিশীলতা কায়েম হওয়া কতটা অপরিহার্য তা এ ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে আরবে প্রধান ধর্ম বিশ্বাস কী ছিল?
উত্তর: মূর্তিপূজা ও পৌত্তলিকতা; পবিত্র কাবার ভেতরেই ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে তাদের পূজা করা হতো।
প্রশ্ন ২: হিজরতের রাতে সাওর পর্বতের গুহায় নবীজীর সঙ্গী কে ছিলেন?
উত্তর: হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), যিনি নবীজীর সাথে তিন দিন সাওর গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: বদর যুদ্ধে মুসলিম ও কাফেরদের সৈন্যসংখ্যা কত ছিল?
উত্তর: বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন এবং কাফেরদের সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার জন।
প্রশ্ন ৪: ইসলামের প্রথম লিখিত সংবিধান কোনটি?
উত্তর: ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’, যা ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনার সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির জন্য প্রণয়ন করেছিলেন।
প্রশ্ন ৫: হুদাইবিয়ার সন্ধিকে কুরআনে কী নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে?
উত্তর: ‘ফাতহুম মুবীন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৬: পাঁচ ওয়াক্ত নামায কোন রাতে ফরয করা হয়েছিল?
উত্তর: ঐতিহাসিক মিরাজের রাতে মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায উপহার হিসেবে ফরয করেন।