ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: তারিখুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়্যাহ (تاريخ الدعوة الإسلامية)
বিষয় কোড: ২০৩২০২
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলী
١- بين تاريخ الدعوة في عهد الخلفاء الراشدين-
[১. খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে দাওয়াতের ইতিহাস বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর ইসলামের ইতিহাসে এক স্বর্ণালী যুগের সূচনা হয়, যা ‘খিলাফতে রাশেদা’ (১১-৪০ হিজরি / ৬৩২-৬৬১ খ্রিস্টাব্দ) নামে খ্যাত। চার খলিফা—হযরত আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী (রা.)-এর ত্রিশ বছরের শাসনকাল ছিল ইসলামি দাওয়াতের ভৌগোলিক বিস্তার, নীতিগত সংহতি ও প্রশাসনিক উৎকর্ষের এক অনন্য যুগ।
১. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর আমলে দাওয়াত (১১-১৩ হিজরি)
- রিদ্দাহ বা ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে অভিযান: নবীজীর ওফাতের পর আরবের বহু গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করে এবং মুসায়লামাতুল কাযযাবের মতো ভণ্ড নবীদের উত্থান ঘটে। হযরত আবু বকর (রা.) অটল ঈমানী সাহসে ভণ্ড নবীদের দমন করেন এবং আরবে তাওহীদের ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
- কুরআন সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজে কুরআন শাহাদাত বরণ করলে হযরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে তিনি কুরআনকে গ্রন্থাকারে সংকলন করান, যা দাওয়াতের মূল উৎসকে চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত করে।
- সীমান্তে দাওয়াত ও অভিযানের সূচনা: পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের আগ্রাসন রোধে তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও মুসান্না ইবনে হারেসার নেতৃত্বে পারস্য সীমান্তে এবং উসামা ইবনে যায়েদ ও আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে সিরিয়া সীমান্তে দাওয়াতি বাহিনী প্রেরণ করেন।
২. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর আমলে দাওয়াতের স্বর্ণযুগ (১৩-২৩ হিজরি)
- বিশাল ভূখণ্ডে দাওয়াতের বিস্তার: হযরত উমর (রা.)-এর আমলে পারস্য সাম্রাজ্য (কাদিসিয়া ও নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ) এবং রোমান সাম্রাজ্যের সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিশর বিজয় সূচিত হয়।
- জেরুজালেম বিজয় ও ঐতিহাসিক চুক্তি: তিনি জেরুজালেমের খ্রিস্টানদের সাথে এক ঐতিহাসিক নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করে দাওয়াতের চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
- প্রশাসনিক সংস্কার ও মুয়াল্লিম প্রেরণ: বিজিত অঞ্চলসমূহে তিনি প্রখ্যাত সাহাবীগণকে কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষক (মুয়াল্লিম ও দায়ী) হিসেবে নিয়োগ দেন (যেমন কুফায় আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.)।
৩. হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর আমলে দাওয়াত (২৩-৩৫ হিজরি)
- কুরআনের সর্বসম্মত প্রমিতকরণ: বিভিন্ন অঞ্চলে কিরাত নিয়ে মতানৈক্য দেখা দিলে তিনি কুরাইশ ভাষার কিরাত অনুযায়ী কুরআনের মূল কপি থেকে প্রমিত কপি তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে প্রেরণ করেন। এটি উম্মাহর মধ্যে দাওয়াতি ঐক্য রক্ষা করে।
- নৌ-বাহিনীর প্রতিষ্ঠা ও ভূমধ্যসাগরে দাওয়াত: আমীর মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে প্রথম ইসলামি নৌ-বহর তৈরি হয় এবং সাইপ্রাস ও রোডস দ্বীপসহ উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ায় দাওয়াতের পথ সুগম হয়।
৪. হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর আমলে দাওয়াত (৩৫-৪০ হিজরি)
- বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক দাওয়াত: রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের মধ্যেও হযরত আলী (রা.) তাঁর অসাধারণ ইলম, বালাগাত ও তাকওয়ার মাধ্যমে খারেজিদের বিভ্রান্তিকর চিন্তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক পরিচালনা করেন।
- ন্যায়বিচার ও ইনসাফের দৃষ্টান্ত: একজন ইহুদির সাথে বর্ম নিয়ে কাজীর আদালতে সাধারণ নাগরিকের মতো উপস্থিত হয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা ইসলামের ইনসাফ দেখে বহু মানুষকে মুগ্ধ করেছিল।
উপসংহার
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ প্রমাণ করে যে ইসলাম তরবারির জোরে নয়, বরং সাহাবায়ে কেরামের অনন্য চরিত্র, সুবিচার, ধর্মীয় সহনশীলতা ও ওহীর শিক্ষাদর্শনের মাধ্যমেই মানব হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল।
٢- تحدث عن انتشار الإسلام في شبه القارة الهندية-
[২. ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তার সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন বিশ্ব ইতিহাসের এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ঘটনা। আরব সাগরের উপকূলীয় বাণিজ্য, ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বিজয় এবং সুফি-সাধকদের নিঃস্বার্থ প্রচারণার মাধ্যমে এই ভূখণ্ডে ইসলামের চিরন্তন আলো ছড়িয়ে পড়ে।
১. প্রাথমিক বাণিজ্য ও শান্তির মাধ্যমে আগমন (৭ম শতাব্দী)
- ইসলাম আবির্ভাবের বহু পূর্ব থেকেই আরব বণিকদের সাথে ভারতের মালাবার, গুজরাট ও করমণ্ডল উপকূলের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল।
- নবীজী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে মুসলিম বণিকরা তাদের অনুপম সততা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক মাধুর্যের মাধ্যমে স্থানীয় ভারতীয়দের মুগ্ধ করেন। কেরালায় তৎকালীন চেরামান পেরুমল নামক রাজা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সেখানে ভারতের প্রথম মসজিদ ‘চেরামান জুমা মসজিদ’ নির্মিত হয়।
২. মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় (৭১২ খ্রি.)
- ৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের আমলে সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু আক্রমণ করেন। অত্যাচারী রাজা দাহিরকে পরাজিত করে তিনি সিন্ধু ও মুলতানে ইসলামি শাসন কায়েম করেন।
- তিনি স্থানীয় হিন্দুদের ‘আহলে কিতাব’-এর সমমর্যাদা দিয়ে জিম্মি হিসেবে ধর্মীয় স্বাধীনতা, মন্দির রক্ষা ও ন্যায্য কর নির্ধারণ করেন, যার ফলে সিন্ধুর নিচু বর্ণের নিপীড়িত মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।
৩. সুলতানি ও মুঘল আমলের ভূমিকা
- সুলতান মাহমুদ গজনবী ও শিহাবুদ্দীন মুহম্মদ ঘুরীর অভিযানের পর ১২০৬ সালে কুতুবুদ্দীন আইবেকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় দিল্লি সালতানাত।
- পরবর্তীতে মুঘল সাম্রাজ্যের আমলে (১৫২৬-১৮৫৭ খ্রি.) উপমহাদেশে শান্তি, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ন্যায়বিচারের বিকাশ ঘটে, যা ইসলামি ভাবধারাকে স্থানীয় সমাজের গভীরে প্রবেশ করায়।
৪. বর্ণপ্রথায় নিপীড়িতদের মুক্তি
তৎকালীন হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোর বর্ণপ্রথা (চাতুর্বর্ণ্য) দ্বারা শুদ্র ও অস্পৃশ্যদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো। ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং “সকল মানুষ সমান”—এই মানবিক দর্শন কোটি কোটি নিপীড়িত মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
উপসংহার
ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম কোনো আকস্মিক সামরিক বলপ্রয়োগে বিস্তার লাভ করেনি; বরং সততা, সামাজিক সাম্য ও মানবকল্যাণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয়ে শিকড় গেড়েছিল।
٣- اكتب عن دور الصوفية في نشر الإسلام في بنغلاديش-
[৩. বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফিদের ভূমিকা সম্পর্কে লেখ।]
ভূমিকা
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনপদ। এই অঞ্চলে ইসলামের মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল নিঃস্বার্থ সুফি, পীর-মাশায়েখ ও দরবেশদের অক্লান্ত সাধনা, মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবের মাধ্যমে। অস্ত্র বা বলপ্রয়োগ নয়, বরং সুফিদের অনুপম চরিত্রই বাংলার মানুষকে ইসলামের পতাকাতলে একত্রিত করেছিল।
১. বাংলায় আগমনকারী প্রখ্যাত সুফি-সাধকগণ
- হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী (রহ.) ও ৩৬০ আউলিয়া: ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা গৌরগোবিন্দের অত্যাচারের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ জন অনুসারী নিয়ে সিলেটে আসেন। তাঁর তাকওয়া, কারামত ও আদর্শে মুগ্ধ হয়ে সমগ্র সিলেট ও আসাম অঞ্চলে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন।
- হযরত শাহ পরান (রহ.): শাহজালাল (রহ.)-এর ভাগ্নে, যিনি সিলেট ও আশপাশের অঞ্চলে দ্বীনি শিক্ষার প্রসার ঘটান।
- হযরত খান জাহান আলী (রহ.): দক্ষিণ বাংলার বাগেরহাট অঞ্চলে তিনি শুধু দাওয়াত দেননি, বরং রাস্তাঘাট, দিঘি খনন ও বিশ্বখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করে মানবসেবা ও দাওয়াতের অপূর্ব সমন্বয় করেন।
- বাবা আদম শহীদ (রহ.): মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে বল্লাল সেনের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্যের সংগ্রামে শাহাদাত বরণকারী অন্যতম প্রাচীন প্রচারক।
- শাহ মাখদুম রূপোশ (রহ.): রাজশাহী ও উত্তরবঙ্গে ইসলামের প্রচার ও শিক্ষায় নেতৃত্ব দেন।
- শাহ আমানত (রহ.) ও বদর পীর (রহ.): চট্টগ্রামকে ‘বার আউলিয়ার দেশ’ হিসেবে গড়ে তুলে আরাকান ও উপকূলীয় এলাকায় ইসলাম বিস্তার করেন।
২. সুফিদের দাওয়াত পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- উদার মানবপ্রেম ও সেবা (خدمة الخلق): সুফিরা কোনো জাত-পাত দেখতেন না। তাঁদের খানকাগুলোতে ধনী-গরিব, হিন্দু-মুসলিম সবার জন্য উন্মুক্ত লঙ্গরখানা পরিচালিত হতো। ক্ষুধার্তকে অন্নদান ও অসুস্থের সেবা ছিল তাঁদের ব্রত।
- স্থানীয় সংস্কৃতির ইতিবাচক রূপান্তর: সুফিরা স্থানীয় বাংলা ভাষার মাধ্যমে তাওহীদের মর্মবাণী বুঝিয়েছেন। জারি, সারি ও আধ্যাত্মিক মারফতি গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রেম জাগ্রত করেছেন।
- বর্ণবাদের নিগড় থেকে অবহেলিতদের উদ্ধার: তৎকালীন বাংলার বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা সামন্তবাদী নির্যাতনে নিষ্পেষিত ছিল। সুফিদের খানকায় এসে তারা মানুষের পরিপূর্ণ মানবিক মর্যাদা লাভ করে স্বেচ্ছায় ইসলাম কবুল করে।
- খানকা ও মাদরাসা কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা: প্রতিটি খানকার সাথে গড়ে তোলা হতো মক্তব ও মাদরাসা, যা নৈতিক শিক্ষার বিস্তার ঘটায়।
উপসংহার
বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সাথে ইসলামকে একাত্ম করার পেছনে অলী-আউলিয়াদের অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁদের রেখে যাওয়া আধ্যাত্মিক ও মানবিক পথই এদেশের মুসলিম সংস্কৃতির প্রাণশক্তি।
٤- بين جهود الدعوة الإسلامية في العهد الأموي-
[৪. উমাইয়া যুগে ইসলামি দাওয়াতের তৎপরতা বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
উমাইয়া খিলাফত (৪১-১৩২ হিজরি / ৬৬১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ) ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এ যুগে ইসলামি দাওয়াত কেবল আরব উপদ্বীপ ও মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং পূর্বে চীন ও সিন্ধুর সীমানা থেকে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর ও স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত তিন মহাদেশীয় বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।
১. ঐতিহাসিক ভৌগোলিক দিগ্বিজয় ও দাওয়াতের প্রসার
- সিন্ধু ও ভারত সীমান্ত: ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু ও মুলতান জয় করে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি দাওয়াতের স্থায়ী প্রবেশদ্বার উন্মোচন করেন।
- মধ্য এশিয়া ও মাওরাউন নাহার: প্রখ্যাত সেনাপতি কুতাইবা ইবনে মুসলিম বুখারা, সমরখন্দ, তাশখন্দ ও খাওয়ারিজমে ইসলামি দাওয়াত প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে উলূম ও ইলমের বিশ্বকেন্দ্রে পরিণত হয়।
- উত্তর আফ্রিকা: উকবা ইবনে নাফে মরক্কো ও তিউনিসিয়ায় দাওয়াত পৌঁছান এবং ঐতিহাসিক কায়রোয়ান শহর প্রতিষ্ঠা করেন।
- স্পেন ও ইউরোপ: ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন জিয়াদ ও মুসা বিন নুসাইর জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে আন্দালুসিয়া (স্পেন) জয় করেন, যার ফলে ইউরোপের বুকে এক দীপ্তিমান ইসলামি সভ্যতার বিকাশ ঘটে।
২. উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.)-এর দাওয়াতি সংস্কার (৯৯-১০১ হিজরি)
উমাইয়া খলিফা হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহ.), যাঁকে খলিফায়ে রাশেদ হিসেবে গণ্য করা হয়, তিনি দাওয়াতের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন:
- তিনি বিজিত অঞ্চলের নওমুসলিমদের ওপর আরোপিত অন্যায় জিজিয়া কর সম্পূর্ণ রহিত করেন। মিসরের গভর্নর জিজিয়া কমার অজুহাত দেখালে তিনি ঐতিহাসিক জবাব দেন: “إِنَّ اللَّهَ بَعَثَ مُحَمَّدًا هَادِيًا وَلَمْ يَبْعَثْهُ جَابِيًا” (আল্লাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পথপ্রদর্শক ও দায়ী হিসেবে পাঠিয়েছেন, রাজস্ব সংগ্রাহক হিসেবে নয়)।
- তিনি দূর-দূরান্তের অমুসলিম রাজা-বাদশাহদের কাছে দাওয়াতি পত্র ও পণ্ডিত আলেমদের প্রেরণ করেন, ফলে সিন্ধু ও উত্তর আফ্রিকার বহু নৃপতি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা
- আরবি ভাষার রাষ্ট্রীয়করণ: খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান রাষ্ট্রীয় দাপ্তরিক ভাষা আরবি করেন, ফলে অনারবরা সহজে কুরআন ও হাদিস বোঝার সুযোগ পায়।
- স্থাপত্য ও মসজিদ নির্মাণ: জেরুজালেমের কুব্বাতুস সাখরা (ডোম অব দ্য রক) এবং দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ নির্মাণ ইসলামের শান-শওকত ও আভিজাত্য অমুসলিমদের সামনে তুলে ধরে।
উপসংহার
উমাইয়া যুগে দাওয়াতের যে অপ্রতিরোধ্য অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ইসলামকে একটি বৈশ্বিক ধর্মে উন্নীত করে এবং কোটি কোটি মানুষের হেদায়েতের পথ উন্মুক্ত করে।
٥- تحدث عن حركة الدعوة والإصلاح للإمام محمد بن عبد الوهاب-
[৫. ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের দাওয়াত ও সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
দ্বাদশ হিজরি / অষ্টাদশ শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপে যখন তাওহীদের বিশুদ্ধ আকিদা বিস্মৃত হয়ে কবরপূজা, বৃক্ষপূজা, তাবিজ-কবচ ও শিরক-বিদয়াতের সয়লাব বয়ে যাচ্ছিল, তখন আরবের নজদ অঞ্চলে এক বিপ্লবী সংস্কারকের আবির্ভাব ঘটে। তিনি হলেন শায়খুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (১১১৫-১২০৬ হি. / ১৭০৩-১৭৯২ খ্রি.)।
১. আন্দোলনের পটভূমি ও কারণসমূহ
- আরব অঞ্চলের তৎকালীন সামাজিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়—কবরের কাছে মাগফিরাত প্রার্থনা, পাথর ও গুহার কাছে মানত করা।
- সুন্নাহর পথ ত্যাগ করে অন্ধ তাকলীদ ও গোঁড়ামির বিস্তার।
- রাজনৈতিক অনৈক্য ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি।
২. দাওয়াত ও সংস্কার আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যসমূহ
- বিশুদ্ধ তাওহীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা: তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতে একমাত্র আল্লাহর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সব ধরনের শিরকের মূলোৎপাটন করা।
- সুন্নাহর অনুসরণ ও বিদয়াত উচ্ছেদ: দ্বীনের নামে আবিষ্কৃত সকল কুসংস্কার ও বিদয়াতি প্রথা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা।
- সালাফে সালেহীনের আদর্শে প্রত্যাবর্তন: কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের বুঝ অনুযায়ী গ্রহণ করা।
- কিতাবুত তাওহীদ প্রণয়ন: তাওহীদের মৌলিক দলিল সংবলিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুত তাওহীদ’ (كتاب التوحيد) রচনা করে জনগণের মধ্যে বিশুদ্ধ আকিদা শিক্ষা দেওয়া।
৩. দিরইয়াহ চুক্তি ও দাওয়াতের রাজনৈতিক শক্তি লাভ
১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে নজদের দিরইয়াহর শাসক মুহাম্মদ বিন সৌদের সাথে ইমামের ঐতিহাসিক ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। ইমাম দাওয়াত ও ইলমি দিক পরিচালনার দায়িত্ব নেন এবং আমীর মুহাম্মদ বিন সৌদ দাওয়াত রক্ষা ও রাজনৈতিক শক্তির জিম্মাদারি গ্রহণ করেন। এই মৈত্রী প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের জন্ম দেয় এবং দাওয়াত দ্রুত সারা আরবে ছড়িয়ে পড়ে।
৪. আন্দোলনের প্রভাব ও মূল্যায়ন
- আরব উপদ্বীপ শিরক ও কুসংস্কারের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হয়ে তাওহীদি চেতনাতুষ্টি লাভ করে।
- উপমহাদেশের শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি আন্দোলন, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফারায়েজী আন্দোলন ও বিশ্বের অন্যান্য সংস্কার আন্দোলনে এটি নবজাগরণের প্রেরণা জোগায়।
উপসংহার
মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাবের আন্দোলন ছিল নিছক কোনো রাজনৈতিক অভ্যুত্থান নয়, বরং তা ছিল দ্বীনের মূল উৎসে ফিরে যাওয়ার এক আপসহীন ঈমানী ও তাওহীদি সংস্কার আন্দোলন।
٦- اكتب عن دعوة الإمام الشاه ولي الله الدهلوي وجهوده الإصلاحية-
[৬. ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির দাওয়াত ও সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা সম্পর্কে লেখ।]
ভূমিকা
অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক পতন এবং মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় বিশৃঙ্খলার চরম মুহূর্তে উপমহাদেশে এক ক্ষণজন্মা মনীষীর আবির্ভাব ঘটে। তিনি হলেন মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.) (১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.)। তাঁকে আধুনিক ইসলামি রেনেসাঁসের রূপকার বলা হয়।
১. কুরআনিক দাওয়াত ও ইলমি সংস্কার
- ফার্সি ভাষায় কুরআনের তরজমা: তৎকালীন সাধারণ শিক্ষিত মানুষের বোধগম্য ফার্সি ভাষায় তিনি ‘ফাতহুর রহমান ফি তারজামাতিল কুরআন’ নামে পবিত্র কুরআনের তরজমা করেন। রক্ষণশীল আলেমদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ওহীর বাণী সহজলভ্য করেন।
- উসূলে তাফসীর: তাফসীর শাস্ত্রের মূলনীতি ব্যাখ্যা করে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ফাওযুল কাবীর ফি উসূলিত তাফসীর’।
২. হাদিস শাস্ত্রের পুনরুজ্জীবন
- মক্কা-মদিনা থেকে হাদিসের উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করে এসে তিনি দিল্লির ‘মাদরাসা-ই-রহিমিয়্যাহ’কে বিশ্বমানের হাদিস চর্চা কেন্দ্রে পরিণত করেন।
- ইমাম মালিকের মুয়াত্তা-র দুটি অনন্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ (মুসাফ্ফা ও মুসাওওয়া) লেখেন এবং হাদিসের বিশুদ্ধতার মানদণ্ড নির্ধারণ করেন।
৩. দর্শন ও ফিকহী সমন্বয় সাধন (التوفيق بين المذاهب)
- হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (حجة بالغة): এটি তাঁর অমর শাহকার গ্রন্থ। এতে তিনি ইসলামি শরীয়তের প্রতিটি হুকুম-আহকামের যুক্তিনির্ভরতা, বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য ও সামাজিক কল্যাণময় দর্শন অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন।
- মাজহাবী গোঁড়ামি দূরীকরণ: হানাফী, শাফেঈ প্রভৃতি মাজহাবের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব দূর করে তিনি দলিলের ভিত্তিতে সমন্বয় সাধন (তাতবীক) করেন। তাঁর গ্রন্থ ‘আল-ইনসাফ ফি বায়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ’ এ ক্ষেত্রে অনন্য।
৪. রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার
- মুঘল দুর্বলতার সুযোগে মারাঠা ও জাঠদের অত্যাচারে যখন মুসলিমদের অস্তিত্ব বিপন্ন, তখন তিনি আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালীকে চিঠি লিখে ভারতে আমন্ত্রণ জানান। ১৭৬১ সালের পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠা শক্তির চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং মুসলিমরা ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়।
উপসংহার
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)-এর চিন্তা ও দর্শন পরবর্তীকালে দারুল উলুম দেওবন্দ, আলিগড় এবং উপমহাদেশের সামগ্রিক ইসলামি আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
٧- بين دور الصحابة في نشر الإسلام خارج الجزيرة العربية-
[৭. আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলাম প্রচারে সাহাবিদের ভূমিকা বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন নবুওয়াতি মাদরাসায় সরাসরি প্রশিক্ষিত একদল নিঃস্বার্থ বীরপুরুষ। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর তাঁরা নিজেদের সুখ-শান্তি, বাড়ি-ঘর ও মাতৃভূমি ত্যাগ করে ইসলামের চিরন্তন সত্যকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আরব উপদ্বীপের সীমানা পেরিয়ে দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়েন।
১. সাহাবায়ে কেরামের আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক চিত্র
বিদায় হজের ময়দানে উপস্থিত প্রায় এক লক্ষ চব্বিশ হাজার সাহাবীর মধ্যে মাত্র দশ থেকে বারো হাজার সাহাবীর কবর মক্কা-মদিনায় রয়েছে। অবশিষ্ট এক লক্ষাধিক সাহাবী এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দূর-দূরান্তে দাওয়াত দিতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন।
২. অঞ্চলভিত্তিক সাহাবীদের দাওয়াতি অবদান
- সিরিয়া ও ফিলিস্তিন: হযরত আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ, মুয়াজ ইবনে জাবাল ও বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.) সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে ইসলামের সুমহান আদর্শ ছড়িয়ে দেন।
- পারস্য ও ইরাক: সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও সালমান ফারসি (রা.) পারস্যের প্রাচীন অগ্নিপূজকদের দেশে তাওহীদের দাওয়াত প্রতিষ্ঠা করেন।
- মিশর ও উত্তর আফ্রিকা: হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) মিশরে এবং উকবা ইবনে নাফের মতো পরবর্তী প্রজন্মের সাহাবী-তাবেয়ীগণ উত্তর আফ্রিকায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন।
- তুর্কি ও কনস্টান্টিনোপল সীমান্ত: হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) বৃদ্ধ বয়সে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) পর্যন্ত দাওয়াতি অভিযানে গিয়ে সেখানে সমাহিত হন।
- চীন ও দক্ষিণ এশিয়া: ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) নৌপথে চীন দেশে গমন করেন এবং গুয়াংঝুতে চীনের প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন।
৩. সাহাবীদের দাওয়াতের মূল বৈশিষ্ট্য
- বাস্তব চারিত্রিক সৌন্দর্য: ব্যবসায়িক সততা, ওয়াদা রক্ষা ও অমুসলিমদের সাথে সুবিচার দেখে মানুষ অভিভূত হতো।
- জুলুমের অবসান ও মুক্তিদাতার ভূমিকা: পারস্য ও বাইজেন্টাইন শাসকদের অত্যাচার থেকে স্থানীয় প্রজারা সাহাবীদেরকে নিজেদের মুক্তিদাতা হিসেবে বরণ করে নেয়।
- স্থানীয় ভাষার প্রতি গুরুত্ব ও বিনম্রতা: অহংকারহীন আচরণে তাঁরা মানুষের আপনজন হয়ে ওঠেন।
উপসংহার
সাহাবায়ে কেরামের এই অতুলনীয় আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়েই আজ বিশ্বজুড়ে প্রায় দুইশত কোটি মুসলমান ঈমানের নিয়ামত উপভোগ করতে পারছে।
٨- تحدث عن تاريخ الدعوة الإسلامية في إفريقيا-
[৮. আফ্রিকায় ইসলামি দাওয়াতের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
আফ্রিকা মহাদেশ ইসলামের ইতিহাসে এক অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মদিনায় হিজরতের পূর্বেই আফ্রিকার দেশ আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরতের মাধ্যমে ইসলামের প্রথম আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল। কালক্রমে আফ্রিকা পরিণত হয় ‘ইসলামের মহাদেশে’।
১. নবুওয়াতি যুগে আফ্রিকার সাথে সম্পর্ক
- নবুওয়াতের ৫ম বর্ষে কুরাইশদের অত্যাচারের মুখে রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে সাহাবীগণ ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশীর (আসহামা) দেশ হাবশায় হিজরত করেন।
- নাজ্জাশী হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর মুখ থেকে সূরা মারইয়ামের তিলাওয়াত শুনে কেঁদে ফেলেন এবং মুসলমানদের আশ্রয় দেন। পরবর্তীতে নাজ্জাশী নিজে ইসলাম গ্রহণ করেন।
২. উত্তর আফ্রিকায় দাওয়াতের বিস্তার (৭ম শতাব্দী)
- হযরত উমর (রা.)-এর আমলে ২১ হিজরিতে হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) মিশর বিজয় করেন। তিনি ফুস্তাত নগরী ও মসজিদ নির্মাণ করেন।
- উমাইয়া আমলে বীর সেনাপতি উকবা ইবনে নাফে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা অতিক্রম করে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে পৌঁছান এবং কায়রোয়ানে দাওয়াতের স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করেন।
৩. পূর্ব আফ্রিকা ও বাণিজ্যিক কাফেলা
- লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগর দিয়ে আরব বণিকদের মাধ্যমে সোমালিয়া, তানজানিয়া, জাঞ্জিবার ও কেনিয়ায় ইসলাম বিস্তার লাভ করে।
- সোয়াহিলি ভাষা ও সংস্কৃতির সৃষ্টি হয় আরবি ও স্থানীয় ভাষার মিলনে, যা ইসলামি ভাবধারায় সমৃদ্ধ।
৪. পশ্চিম আফ্রিকা ও সাহারা অঞ্চলের ইসলামি সাম্রাজ্যসমূহ
- মরক্কোর মুরাবিতুন ও মুওয়াহহিদুন আন্দোলনের মাধ্যমে সেনেগাল ও নাইজারে ইসলামের আলো পৌঁছায়।
- ঘানা, মালি ও সোংহাই সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। মালির বিখ্যাত সুলতান মানসা মুসার হজ সফর এবং তিমবুকতু শহরের বিশ্ববিখ্যাত ‘সানকোর বিশ্ববিদ্যালয়’ জ্ঞান ও দাওয়াতের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করে।
উপসংহার
আফ্রিকায় ইসলাম ছিল আত্মমর্যাদা, বর্ণবাদহীন সাম্য ও শিক্ষার আলো। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের শতাব্দীপ্রাচীন আগ্রাসন সত্ত্বেও আফ্রিকার সিংহভাগ মানুষ আজও ইসলামের শাশ্বত আদর্শে অবিচল রয়েছে।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্নাবলী
٩- اكتب نبذة عن الفتوحات الإسلامية في بلاد السند-
[৯. সিন্ধু অঞ্চলে ইসলামি বিজয় সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ লেখ।]
৭১২ খ্রিস্টাব্দে লংকাদ্বীপ থেকে ফেরার পথে মুসলিম বিধবা ও অনাথ শিশুদের জাহাজ সিন্ধুর দেবল বন্দরে জলদস্যু কর্তৃক লুণ্ঠিত হয়। রাজা দাহির জলদস্যুদের শাস্তি দিতে অস্বীকার করলে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ও ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশে ১৭ বছর বয়সী তরুণ সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি দেবল, নিরুন ও সেহওয়ান জয় করে রাওয়ারে রাজা দাহিরকে পরাজিত ও নিহত করেন। পরবর্তীতে তিনি মুলতান জয় করেন। তিনি সেখানে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে অমুসলিমদের সকল নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেন।
١٠- ما هو أثر التجارة في نشر الإسلام في جنوب شرق آسيا؟
[১০. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম প্রচারে বাণিজ্যের প্রভাব কী ছিল?]
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে কোনো সামরিক অভিযান ছাড়াই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। আরব, পারস্য ও ভারতীয় মুসলিম বণিকরা মসলা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এসব দেশে গমনাগমন করতেন। তাঁদের অনুপম লেনদেনের সততা, মাপে কম না দেওয়া, নামাজ ও ইবাদতে নিষ্ঠা দেখে স্থানীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজন্যবর্গ এবং সাধারণ জনগণ ব্যাপকভাবে ইসলামে আকৃষ্ট হন এবং বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে এক বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্ম হয়।
١١- اكتب عن جهود السلطان صلاح الدين الأيوبي في خدمة الدعوة-
[১১. দাওয়াতের সেবায় সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর প্রচেষ্টা সম্পর্কে লেখ।]
সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী (রহ.) কেবল একজন মহান দিগ্বিজয়ী বীরই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সুন্নাহর অতন্দ্র প্রহরী। তিনি ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে হিত্তিনের ঐতিহাসিক যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে দীর্ঘ ৮৮ বছর পর মুসলমানদের প্রথম কিবলা পবিত্র বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করেন। বিজয়ের পর তিনি খ্রিস্টানদের প্রতি যে অতুলনীয় মানবিক ক্ষমা ও উদারতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা সমগ্র ইউরোপের খ্রিস্টানদের ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। তিনি অসংখ্য মাদরাসা ও খানকা প্রতিষ্ঠা করে বিশুদ্ধ সুন্নাহর দাওয়াত সুদৃঢ় করেন।
١٢- ما هو دور المنظمات الإسلامية الحديثة في نشر الدعوة؟
[১২. দাওয়াত প্রচারে আধুনিক ইসলামি সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী?]
আধুনিক যুগে প্রাতিষ্ঠানিক দাওয়াত পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। যেমন—রাবেতায়ে আলমে ইসলামী (Muslim World League), ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইউথ (WAMY), দাওয়াহ একাডেমি প্রভৃতি। এ সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক ভাষায় ইসলামি সাহিত্য প্রকাশ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, কুরআন অনুবাদ বিতরণ, নওমুসলিমদের সহায়তা এবং অমুসলিম বিশ্বে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈশ্বিক দাওয়াতকে গতিশীল রাখছে।
١٣- اكتب عن فتح القسطنطينية وأثره في انتشار الإسلام-
[১৩. কনস্টান্টিনোপল বিজয় ও ইসলাম প্রচারে এর প্রভাব সম্পর্কে লেখ।]
১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয় তরুণ সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুর্ভেদ্য রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় করেন, যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুসংবাদপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়। এ বিজয়ের ফলে পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চল—বসনিয়া, আলবেনিয়া, কসোভো ও মেসিডোনিয়ায় ইসলামের দ্বার উন্মোচিত হয়। সুলতান বিজিত অঞ্চলের খ্রিস্টান ও ইহুদিদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দান করেন, যার ফলে বলকান অঞ্চলের বহু মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে।
١٤- تحدث باختصار عن حركة المجاهدين بقيادة السيد أحمد الشهيد-
[১৪. সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ এর নেতৃত্বে মুজাহিদীন আন্দোলন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও শিখদের অত্যাচারের হাত থেকে ভারতীয় মুসলমানদের রক্ষা এবং ইসলামি খেলাফত কায়েমের লক্ষ্যে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ বেরলভী ও শাহ ইসমাইল শহীদ (রহ.) মুজাহিদীন আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে এক ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তবে দেশীয় বিশ্বাসঘাতক ও ষড়যন্ত্রের কারণে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বালাকোটের ঐতিহাসিক ময়দানে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ ও তাঁর সহযোদ্ধাগণ বীরদর্পে শাহাদাত বরণ করেন। এই আন্দোলন উপমহাদেশের মুসলমানদের মনে স্বাধীনতার অদম্য চেতনা জাগিয়ে তোলে।
١٥- اكتب عن دخول الإسلام في إسبانيا (الأندلس)-
[১৫. স্পেনে (আন্দালুসে) ইসলামের আগমন সম্পর্কে লেখ।]
৭১১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ মাত্র বারো হাজার মুজাহিদ নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে ভিসিগথ রাজা রডারিককে পরাজিত করেন। এর মাধ্যমে স্পেনে (আন্দালুস) মুসলিম শাসনের সূচনা হয়, যা প্রায় আটশত বছর স্থায়ী ছিল। মুসলিম আন্দালুসের কর্ডোভা ও গ্রানাডা ইউরোপের অন্ধকার যুগে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনের আলো ছড়ায়। স্পেনের বহু খ্রিস্টান সাম্য ও মুক্তির বাণী হিসেবে ইসলামকে বরণ করে নেয়।
١٦- ما هي عوامل انتشار الإسلام في عصر النبوة؟
[১৬. নবুওয়াত যুগে ইসলামের বিস্তারের কারণসমূহ কী?]
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় মাত্র তেইশ বছরে সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলাম বিজয়ের প্রধান কারণসমূহ হলো:
- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অতুলনীয় নিষ্পাপ চরিত্র, বিশ্বস্ততা ও ক্ষমাশীলতা।
- পবিত্র কুরআনের অলৌকিক সাহিত্যসৌন্দর্য ও হৃদয়গ্রাহী যুক্তি।
- ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ, যা গোত্রীয় অহমিকা ও দাসপ্রথার অবসান ঘটায়।
- সাহাবায়ে কেরামের অপরিসীম ত্যাগ ও শাহাদাতের তামান্না।
- যুদ্ধবন্দি ও বিরোধীদের প্রতি ক্ষমা ও মানবিক আচরণ (যেমন মক্কা বিজয়ের সাধারণ ক্ষমা)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মুসলিম সেনাপতি কে ছিলেন?
উত্তর: মুহাম্মদ বিন কাসিম, যিনি ৭১২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের মাধ্যমে উপমহাদেশে ইসলামি শাসনের গোড়াপত্তন করেন।
প্রশ্ন ২: সিলেটে ইসলাম প্রচারে নেতৃত্ব দেন কোন সুফি সাধক?
উত্তর: হযরত শাহজালাল মুজাররদ ইয়ামেনী (রহ.), যিনি ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে ৩৬০ জন আউলিয়াসহ সিলেটে এসে দ্বীনের দাওয়াত প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রশ্ন ৩: হিত্তিনের যুদ্ধে কে বিজয় লাভ করেছিলেন?
উত্তর: সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী (রহ.), যিনি ১১৮৭ সালে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করেন।
প্রশ্ন ৪: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কীভাবে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল?
উত্তর: আরব ও মুসলিম বণিকদের বাণিজ্যিক সততা, অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য ও বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে সম্পূর্ণ রক্তপাতহীনভাবে ইসলাম বিস্তার লাভ করে।
প্রশ্ন ৫: বালাকোটের যুদ্ধ কত সালে সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর: ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ৬ মে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ ও শাহ ইসমাইল শহীদ (রহ.)-এর নেতৃত্বে মুজাহিদীনরা শিখদের বিরুদ্ধে বালাকোটে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন।
প্রশ্ন ৬: স্পেনে (আন্দালুসে) ইসলামের আগমন ঘটেছিল কার নেতৃত্বে?
উত্তর: ৭১১ খ্রিস্টাব্দে বীর সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী জিব্রাল্টার পাড়ি দিয়ে স্পেনে প্রবেশ করে।