ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ২য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩
বিভাগ: দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: হুকূকুল ইনসান ফিল ইসলাম (حقوق الإنسان في الإسلام)
বিষয় কোড: ২০৩২০৬
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (أ) – ক বিভাগ: রচনামূলক প্রশ্নাবলী
١- بين حقوق الانسان في ضوء القرآن والسنة-
[১. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মানবাধিকার সম্পর্কে বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলাম মানবাধিকারের আদি ও অকৃত্রিম প্রবক্তা। আধুনিক জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ ঘোষণার চৌদ্দশত বছর পূর্বেই ইসলাম পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে মানুষের মৌলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকারের পূর্ণাঙ্গ ও অলঙ্ঘনীয় রূপরেখা উপহার দিয়েছে। ইসলামে মানবাধিকার কোনো মানুষের অনুগ্রহ নয়, বরং তা স্বয়ং স্রষ্টা প্রদত্ত পবিত্র আমানত।
১. মানুষের জন্মগত মর্যাদা (الكرامة الإنسانية)
ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মানুষ জন্মগতভাবে সমান ও সম্মানিত। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন: “وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا” (নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তম রিযিক প্রদান করেছি এবং আমার বহু সৃষ্টির ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি—সূরা আল-ইসরা: ৭০)।
২. জীবনের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অধিকার (حق الحياة)
ইসলাম মানুষের জীবনের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। অন্যায়ভাবে একজন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে: “مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا” (যে ব্যক্তি কোনো প্রাণের বিনিময় কিংবা পৃথিবীতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ব্যতীত কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল—সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২)।
৩. সাম্য ও বর্ণবাদহীনতার অধিকার (حق المساواة)
ইসলাম বংশ, বর্ণ, জাতীয়তা বা ভাষার ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার ধারণাকে সম্পূর্ণ বাতিল করেছে। বিদায় হজের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন: “কোনো আরবের অনারবের ওপর, কোনো অনারবের আরবের ওপর, কোনো শ্বেতাঙ্গের কৃষ্ণাঙ্গের ওপর কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের শ্বেতাঙ্গের ওপর কোনো প্রাধান্য নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।”
৪. সুবিচার লাভের অধিকার (حق العدالة)
শত্রু বা মিত্র সকলের সাথে ইনসাফ করা ইসলামের অলঙ্ঘনীয় বিধান। আল্লাহ বলেন: “وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ” (কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার কর, এটিই তাকওয়ার নিকটতম—সূরা আল-মায়িদাহ: ৮)।
৫. ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার (حرية الاعتقاد)
ইসলাম জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে: “لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ” (দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই—সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৫৬)।
উপসংহার
কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত মানবাধিকার নিছক কাগজের নীতিমালায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রতিটি ধারা আল্লাহর আদালতে জবাবদিহিতা ও আখিরাতের শাস্তির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় তা শতভাগ বাস্তবমুখী ও কার্যকর।
٢- تحدث عن الحقوق الاقتصادية والثقافية للمواطنين-
[২. নাগরিকদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে নাগরিকদের মর্যাদা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ইসলাম অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। পুঁজিবাদী শোষণ ও সমাজতান্ত্রিক ব্যক্তিস্বাধীনতাহীনতার বিপরীতে ইসলাম মানবজাতিকে এক ইনসাফভিত্তিক মধ্যপন্থা উপহার দিয়েছে।
১. নাগরিকদের অর্থনৈতিক অধিকারসমূহ (الحقوق الاقتصادية)
- মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার: অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে না খেয়ে থাকতে দিতে পারে না। খলিফা হযরত উমর (রা.) বলেছিলেন: “ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায়, তবে কিয়ামতের দিন উমরকে সে জন্য জবাবদিহি করতে হবে।”
- হালাল উপার্জনের অধিকার: প্রতিটি নাগরিকের বৈধ পন্থায় ব্যবসা, কৃষি, শিল্প ও শ্রমের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
- ব্যক্তিগত মালিকানার স্বীকৃতি: ইসলাম বৈধ উপায়ে অর্জিত ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিরাপত্তা প্রদান করেছে। অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ কেড়ে নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
- সামাজিক নিরাপত্তা বিধান (যাকাত ও বাইতুল মাল): অভাবী, এতিম, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য যাকাত ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বাইতুল মাল) থেকে স্থায়ী ভাতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
- শোষণের হাত থেকে মুক্তি: সুদ, মজুতদারি, ফটকাবাজি ও ওজনে কম দেওয়ার মতো সকল অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে ইসলাম কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
২. নাগরিকদের সাংস্কৃতিক অধিকারসমূহ (الحقوق الثقافية)
- শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের অধিকার: সকল নাগরিকের জন্য জ্ঞানার্জন উন্মুক্ত ও বাধ্যতামূলক। নবীজী (সা.) বলেছেন: “জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরয।”
- ভাষাগত ও জাতিগত বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি: নিজস্ব ভাষা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি চর্চার পূর্ণ স্বাধীনতা ইসলাম স্বীকার করে। আল্লাহ বলেন: “وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ” (আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন হলো আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য—সূরা আর-রূম: ২২)।
- অমুসলিমদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার: ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকরা (জিম্মি) তাদের নিজস্ব উপাসনালয় পরিচালনা, ধর্মীয় উৎসব উদযাপন ও নিজস্ব সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটানোর পূর্ণ অধিকার ভোগ করে।
- অশ্লীলতামুক্ত শালীন বিনোদন: মানুষের চিত্তবিনোদনের অধিকার রয়েছে, তবে তা যেন সমাজের নৈতিক চরিত্র ধ্বংস না করে এবং অশ্লীলতা না ছড়ায়।
উপসংহার
অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সমন্বয়েই একটি আদর্শ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে ওঠে, যা ইসলাম প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুনিশ্চিত করেছে।
٣- اكتب حقوق الأولاد مفصلا-
[৩. সন্তানের অধিকার বিস্তারিত লেখ।]
ভূমিকা
সন্তান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতা-মাতার কাছে এক পরম আমানত এবং নয়নের পুতুল। জাহেলী যুগে যখন কন্যাসন্তানদের হত্যা করা হতো এবং শিশুদের ওপর অমানবিক আচরণ করা হতো, তখন ইসলাম তাদের জন্মপূর্ব মুহূর্ত থেকে শুরু করে সাবালক হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সুনির্দিষ্ট অধিকার নিশ্চিত করেছে।
১. জন্মের পূর্বের অধিকারসমূহ (الحقوق قبل الولادة)
- উত্তম মাতা নির্বাচন: সন্তানের প্রথম অধিকার হলো পিতা তার জন্য একজন ধর্মপ্রাণ, সতী ও আদর্শ মাতা নির্বাচন করবেন, যাতে সন্তান সৎ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।
- গর্ভকালীন যত্ন ও ভ্রূণ হত্যার নিষেধাজ্ঞা: গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট বা গর্ভপাত ঘটানো ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও নরহত্যার সমতুল্য অপরাধ।
২. জন্মের সময় ও শৈশবের অধিকারসমূহ
- জীবনের নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অধিকার: কন্যাসন্তান হত্যার কুপ্রথা সমূলে উৎপাটন করে তাদের জান্নাতের সুসংবাদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। নবীজী (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি দুটি কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করে সৎপাত্রস্থ করবে, কিয়ামতের দিন সে আর আমি এভাবে পাশাপাশি থাকব।”
- আযান প্রদান ও তাহনীক: জন্মের পর ডান কানে আযান ও বাঁ কানে ইকামাত দেওয়া এবং মিষ্টি কিছু দিয়ে তাহনীক করানো সুন্নাত।
- সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখা: সন্তানের সুন্দর ও অর্থবহ ইসলামি নাম রাখা পিতার ওপর আবশ্যক।
- আকিকা প্রদান: জন্মের সপ্তম দিনে সামর্থ্য অনুযায়ী আকিকা করা ও মাথার চুল ফেলে রূপা সদকা করা সুন্নাত।
- মায়ের দুধ পান (রদাহ): দুই বছর পূর্ণ সময় পর্যন্ত শিশুকে মায়ের দুধ পান করানো তার মৌলিক শারীরিক অধিকার।
৩. শিক্ষা, দীক্ষা ও তারবিয়াত লাভের অধিকার
- দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা: শৈশব থেকেই সন্তানকে কুরআন শিক্ষা, নামাযের অভ্যাস গঠন এবং সত্যবাদিতা ও আখলাকের প্রশিক্ষণ দেওয়া। নবীজী (সা.) বলেন: “পিতা তার সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার ও শিক্ষার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো উপহার দিতে পারে না” (তিরমিযী)।
- পার্থিব ও কারিগরি শিক্ষা: তাকে সমাজে স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় ইলম ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করানো।
৪. অর্থনৈতিক ও আচরণগত অধিকার
- ভরণপোষণ (নাফাকাহ): সাবালক হওয়া পর্যন্ত পুত্রের এবং বিয়ে হওয়া পর্যন্ত কন্যার সকল খরচ পিতার বহন করা শরয়ীভাবে বাধ্যতামূলক।
- সন্তানদের মাঝে সমতা ও সুবিচার: ভালোবাসায় ও সম্পদ বণ্টনে সকল সন্তানের মাঝে পূর্ণ সমতা বজায় রাখা। এক সন্তানকে বেশি দেওয়া আর অপরকে বঞ্চিত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- সৎপাত্রে বিবাহ প্রদান: উপযুক্ত বয়সে সন্তানের সম্মতি নিয়ে উপযুক্ত পাত্র-পাত্রীর কাছে বিবাহ দেওয়া পিতা-মাতার অপরিহার্য দায়িত্ব।
উপসংহার
সন্তানদের এই অধিকারগুলো যথাযথভাবে পূরণ করলে তারা পিতা-মাতার জন্য দুনিয়ায় চোখের শীতলতা এবং পরকালে জান্নাতের সদকায়ে জারিয়ায় পরিণত হয়।
٤- اكتب حقوق غير المسلمين في الدولة الاسلامية-
[৪. ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকারগুলো লেখ।]
ভূমিকা
একটি ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকদের শরীয়তের পরিভাষায় ‘আহলুয যিম্মাহ’ বা জিম্মি বলা হয়। ‘যিম্মাহ’ শব্দের অর্থ নিরাপত্তা ও চুক্তি। অর্থাৎ তাদের জান, মাল ও ইজ্জতের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব স্বয়ং রাষ্ট্র ও মুসলমানদের ওপর অর্পিত। অমুসলিমদের অধিকার রক্ষায় ইসলামের মতো উদার ও সহনশীল বিধান মানব ইতিহাসের অন্য কোনো আইনে খুঁজে পাওয়া যায় না।
১. জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা (حماية الأنفس والأموال)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিম নাগরিকদের ওপর নির্যাতনকারীদের ব্যাপারে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘোষণা করেছেন: “أَلَا مَنْ ظَلَمَ مُعَاهَدًا، أَوِ انْتَقَصَهُ، أَوْ كَلَّفَهُ فَوْقَ طَاقَتِهِ، أَوْ أَخَذَ مِنْهُ شَيْئًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ، فَأَنَا حَجِيجُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ” (সাবধান! যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করবে, তার অধিকার খর্ব করবে, তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেবে কিংবা তার অমতে কোনো সম্পদ কেড়ে নেবে—কিয়ামতের দিন আমি স্বয়ং তার বিরুদ্ধে বাদীরূপে দাঁড়াব—সুনানে আবু দাউদ)।
২. ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয়ের সুরক্ষা (حرية التدين)
- তাদের ধর্মে কোনো জবরদস্তি করা যাবে না। তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও উপাসনা স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে।
- তাদের চার্চ, মন্দির বা সিনাগগ ভাঙা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খলিফা হযরত উমর (রা.) জেরুজালেমের অমুসলিমদের সাথে চুক্তিতে স্পষ্টভাবে তাদের গির্জাসমূহের নিরাপত্তার অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
৩. আইনের চোখে সমতা ও সুবিচার (المساواة والعدالة)
- দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকরা সম্পূর্ণ সমান। যদি কোনো মুসলিম কোনো জিম্মি অমুসলিমকে হত্যা করে, তবে হানাফী মাজহাবের বিধান অনুযায়ী সেই মুসলিমের কিসাস (মৃত্যুদণ্ড) কার্যকর হবে।
- হযরত আলী (রা.)-এর আমলে এক ইহুদির সাথে তাঁর বর্ম নিয়ে কাজীর আদালতে মামলা হলে প্রমাণ না থাকায় কাজী শুরাইহ খলিফার বিরুদ্ধে এবং ইহুদির পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। ইসলামের এই সুবিচার দেখে ইহুদি তৎক্ষণাৎ ইসলাম কবুল করে।
৪. সামাজিক নিরাপত্তা ও বার্ধক্য ভাতা
অমুসলিম নাগরিক বৃদ্ধ, অসুস্থ বা অক্ষম হয়ে পড়লে রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বাইতুল মাল) থেকে তাকে নিয়মিত পেনশন বা ভাতা প্রদান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রা.) বৃদ্ধ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জন্য বাইতুল মাল থেকে আজীবন ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন।
৫. সম্মান ও পারিবারিক আইনের স্বায়ত্তশাসন
- তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে (বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার) তাদের নিজস্ব ধর্মীয় আইন অনুযায়ী ফয়সালা করার পূর্ণ অধিকার স্বীকৃত।
- কোনো মুসলিম অমুসলিমদের গালিগালাজ বা উপহাস করতে পারবে না: “وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّـهِ” (তোমরা তাদের গালি দিও না যাদের তারা আল্লাহ ব্যতীত ডাকে—সূরা আল-আনআম: ১০৮)।
উপসংহার
ইসলামি রাষ্ট্রের অমুসলিমরা কোনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নয়; বরং তারা পূর্ণ ধর্মীয়, সামাজিক ও আইনি সুরক্ষাপ্রাপ্ত সম্মানিত নাগরিক।
٥- اكتب مقالة مقارنة حول حقوق الانسان في الاسلام والديانة الهندوسية-
[৫. মানবাধিকার বিষয়ে ইসলাম ও হিন্দুধর্মের মধ্যকার একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা কর।]
ভূমিকা
মানবজাতির মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য মানবাধিকারের ধারণা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। প্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন ধর্ম হিন্দুধর্ম এবং সর্বশেষ ঐশী জীবনবিধান ইসলামের মধ্যে মানবাধিকারের দর্শনে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিগত সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। নিম্নে তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
১. মানুষের জন্মগত মর্যাদা ও সাম্য
- ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলামে সকল মানুষ জন্মগতভাবে সমান। মানুষের একমাত্র আদিপিতা আদম এবং আদিমাতা হাওয়া (আ.)। কোনো মানুষ অপবিত্র বা নিচু হয়ে জন্মায় না। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড তাকওয়া বা খোদাভীতি।
- হিন্দুধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি: ঐতিহ্যবাহী হিন্দু সমাজব্যবস্থা ঋগ্বেদের ‘পুরুষসূক্ত’ এবং মনুসংহিতা ভিত্তিক কঠোর বর্ণাশ্রম বা ‘চাতুর্বর্ণ্য’ প্রথার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে মানুষকে চার বর্ণে ভাগ করা হয়েছে—ব্রাহ্মণ (ব্রহ্মার মুখ থেকে), ক্ষত্রিয় (বাহু থেকে), বৈশ্য (উরু থেকে) এবং শুদ্র (পা থেকে)। শুদ্র ও অন্ত্যজদের (দলিত) কোনো জন্মগত মানবিক অধিকার ছিল না; তারা উচ্চবর্ণের সেবার জন্যই সৃষ্ট বলে গণ্য করা হয়।
২. নারীর অধিকার ও মর্যাদা
- ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলাম নারীকে মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোন হিসেবে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। পিতার ও স্বামীর সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেছে, মোহরানা বাধ্যতামূলক করেছে, নিজের সম্পত্তিতে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে এবং বিধবা বিবাহের আইনগত অধিকার দিয়েছে।
- হিন্দুধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি: প্রাচীন হিন্দু আইনে নারীর কোনো স্বতন্ত্র স্বাধীন সত্ত্বা ছিল না। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে—নারী বাল্যে পিতার, যৌবনে স্বামীর এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীন থাকবে, সে কখনো স্বাধীনতার যোগ্য নয়। প্রাচীন ভারতে বিধবাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ‘সতীদাহ প্রথা’ প্রচলিত ছিল এবং সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার ছিল না বললেই চলে।
৩. দাসপ্রথা ও নিপীড়িতদের মুক্তি
- ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলাম দাসমুক্তির আন্দোলন শুরু করে। কাফফারার প্রধান শর্ত রাখা হয় দাসমুক্তি এবং দাসকে নিজের ভাই হিসেবে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়। হযরত বিলাল (রা.)-এর মতো হাবশী গোলামকে কাবা ঘরের মুয়াজ্জিন ও সাহাবীদের নেতা বানানো হয়।
- হিন্দুধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি: দলিত ও অস্পৃশ্যদের গ্রামের বাইরে বসবাস করতে হতো। মন্দিরে প্রবেশ তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল, এমনকি বেদ পাঠ শুনলে কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়ার বিধান মনুসংহিতায় উল্লেখ ছিল।
৪. ধর্মীয় স্বাধীনতা
- ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: জোরপূর্বক কাউকে ধর্মান্তরিত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (“لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ”)। অমুসলিমদের উপাসনালয় ভাঙা হারাম।
- হিন্দুধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি: যদিও অহিংসার কথা বলা হয়, কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে অব্রাহ্মণ বা ম্লেচ্ছদের সাথে সামাজিক মেলামেশা ও ধর্মীয় আচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।
উপসংহার
পর্যালোচনায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, হিন্দুধর্মে জন্মসূত্রে অধিকারের কঠোর শ্রেণিবিন্যাস ও বৈষম্য বিদ্যমান ছিল, পক্ষান্তরে ইসলাম বিশ্বের বুকে প্রথম জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য জন্মগত সাম্য, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বৈপ্লবিক নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করেছে।
٦- اكتب حقوق المرأة في الإسلام-
[৬. ইসলামে প্রদত্ত নারীর অধিকারসমূহ লেখ।]
ভূমিকা
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে গোটা বিশ্বে নারীজাতি ছিল চরম অবহেলিত, নির্যাতিত ও ভোগের সামগ্রী। রোমান, গ্রিক, পারসিক ও জাহেলী আরব সমাজে নারীকে আত্মা বা মানবিক মর্যাদাহীন এক অপয়া সত্ত্বা মনে করা হতো। ইসলাম এসে নারীদের সেই অন্ধকার কূপ থেকে তুলে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
১. নারীর আত্মিক ও মানবিক সমতা (المساواة الإنسانية)
ইসলাম ঘোষণা করেছে নারী ও পুরুষ একই আত্মিক উৎস থেকে সৃষ্ট। আখিরাতে সাওয়াব ও নাজাতের ক্ষেত্রে তাদের মাঝে কোনো বৈষম্য নেই। আল্লাহ বলেন: “مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً” (যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে—হোক সে পুরুষ বা নারী—আমি তাকে অবশ্যই পবিত্র আনন্দময় জীবন দান করব—সূরা আন-নাহল: ৯৭)।
২. জীবনের বিভিন্ন ধাপে নারীর অধিকার ও মর্যাদা
- মা হিসেবে মর্যাদা: মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত ঘোষণা করা হয়েছে। সাহাবী নবীজীকে জিজ্ঞেস করলেন: “আমার সর্বোত্তম সদাচরণ পাওয়ার সর্বাধিক হকদার কে?” তিনি তিনবার বললেন: “তোমার মা”, চতুর্থবার বললেন: “তোমার পিতা” (সহীহ বুখারী)।
- কন্যা হিসেবে অধিকার: কন্যাসন্তানকে আল্লাহ প্রদত্ত রহমত হিসেবে অভিহিত করে তাদের উত্তম লালন-পালনে জান্নাত নিশ্চিত করা হয়েছে।
- স্ত্রী হিসেবে অধিকার: মোহরানা পাওয়ার অধিকার, সন্তোষজনক ভরণপোষণ ও সম্মানজনক ব্যবহারের অধিকার। নবীজী বলেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।”
- উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির অধিকার: পিতা, স্বামী ও সন্তানের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীর সুনির্দিষ্ট হিস্যা কুরআন নির্ধারণ করেছে। নারী নিজ অর্জিত সম্পদের একচ্ছত্র মালিক; পিতা বা স্বামী কেউ তার সম্পত্তিতে জোরপূর্বক হাত দিতে পারে না।
- বিয়ে ও সম্মতির অধিকার: নারীর স্বাধীন সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক তাকে বিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বাতিল ও হারাম। এমনকি অপছন্দনীয় বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে মুক্তির জন্য ‘খোলা’র আইনি অধিকার দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার
ইসলাম নারীকে ঘরের বোঝা নয়, বরং সমাজের অর্ধাঙ্গিনী ও পরিবার নির্মাণের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পূর্ণ মানবিক অধিকার দিয়েছে।
٧- عرف الولاة والرعية مع بيان حقوقهم في الإسلام-
[৭. শাসক ও শাসিতের পরিচয় দাও। ইসলামে তাদের অধিকার আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নাগরিক জীবনের সম্পর্ক কোনো রাজা ও প্রজার সম্পর্ক নয়; বরং তা হলো একজন আমানতদার সেবক এবং সচেতন অংশীদারের সম্পর্ক। শাসক ও শাসিত উভয়েই আল্লাহর আইনের অধীন।
১. শাসক ও শাসিতের পরিচয় (تعريف الولاة والرعية)
- আল-উলাত বা শাসক (الولاة): যিনি জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের শান্তি, শৃঙ্খলা, দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও আইন প্রয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি বা খলিফা। তিনি কোনো একনায়ক নন, বরং সেবক ও আমানতদার।
- আর-রায়িয়্যাহ বা শাসিত (الرعية): রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকবৃন্দ—যাঁরা রাষ্ট্রের সীমানায় বসবাস করেন এবং রাষ্ট্রীয় আনুগত্য স্বীকার করেন।
২. শাসিতের ওপর শাসকের অধিকারসমূহ (حقوق الراعي على الرعية)
- আনুগত্য প্রদর্শন (السمع والطاعة): যতক্ষণ শাসক আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ না দেন, ততক্ষণ তাঁর বৈধ আইন মেনে চলা নাগরিকদের ওপর ওয়াজিব। আল্লাহ বলেন: “أَطِيعُوا اللَّـهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ” (তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের দায়িত্বশীলদের আনুগত্য কর—সূরা আন-নিসা: ৫৯)।
- সহযোগিতা ও সংহতি: দেশের নিরাপত্তা, শান্তি রক্ষা ও উন্নয়নে রাষ্ট্রকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা।
- সৎ পরামর্শ ও নসীহত দান (النصيحة): শাসক ভুল করলে তাঁকে গঠনমূলকভাবে শুধরে দেওয়া। নবীজী (সা.) বলেন: “দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা (নসীহত)—আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য এবং মুসলিম শাসকদের জন্য।”
৩. শাসকের ওপর শাসিতের অধিকারসমূহ (حقوق الرعية على الراعي)
- ইনসাফ ও সুবিচার কায়েম করা (إقامة العدل): কোনো বৈষম্য না করে সকলের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
- মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: জনগণের জান, মাল, ইজ্জত ও ধর্মবিশ্বাসের নিরাপত্তা বিধান করা।
- পরামর্শের ভিত্তিতে শাসন পরিচালনা (الشورى): জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করা।
- জনগণের সম্পদ সংরক্ষণ: সরকারি অর্থ ও বাইতুল মাল জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা, অপচয় বা আত্মসাৎ না করা।
উপসংহার
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ” (তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে—সহীহ বুখারী)।
٨- بيّن حقوق الأقارب في ضوء القرآن والسنة-
[৮. কুরআন ও সুন্নাহ এর আলোকে আত্মীয় স্বজনের অধিকার বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
পারিবারিক সৌহার্দ্য ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখার জন্য ইসলাম রক্ত ও বৈবাহিক সম্পর্কের আত্মীয়দের অধিকার রক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। শরীয়তের পরিভাষায় একে ‘সিলাতুর রাহিম’ (صلة الرحم) বা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা বলা হয়।
১. কুরআনের আলোকে আত্মীয়দের অধিকার
- আল্লাহর আনুগত্যের পরেই আত্মীয়তার হক: পবিত্র কুরআনে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের সাথে সদাচরণের নির্দেশ এসেছে: “وَاعْبُدُوا اللَّـهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ” (তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না এবং পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের সাথে সদাচরণ কর—সূরা আন-নিসা: ৩৬)।
- দান-সদকায় অগ্রাধিকার: দান করার ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়রাই প্রথম হকদার। ইরশাদ হয়েছে: “وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ” (আর আত্মীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দাও—সূরা আল-ইসরা: ২৬)।
- সম্পর্ক ছিন্নকারীর ওপর লানত: আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন: “فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ ۙ أُولَـٰئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّـهُ” (তবে কি ক্ষমতায় গেলে তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরাই তারা যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন—সূরা মুহাম্মদ: ২২-২৩)।
২. সুন্নাহর আলোকে আত্মীয়দের অধিকার ও মর্যাদা
- আয়ু ও রিযিক বৃদ্ধি: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ” (যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ু দীর্ঘায়িত হোক, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে—সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
- জান্নাত লাভের মাধ্যম: নবীজী (সা.) স্পষ্ট জানিয়েছেন: “لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ” (আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না—সহীহ মুসলিম)।
- খারাপ ব্যবহারের জবাবেও সদাচরণ: আত্মীয় খারাপ ব্যবহার করলেও তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখাই প্রকৃত সিলাতুর রাহিম। নবীজী বলেন: “প্রতিশোধকারী প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়; বরং যে ব্যক্তি অপর পক্ষ সম্পর্ক ছিন্ন করার পরও তা জোড়া লাগায়, সে-ই প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী।”
উপসংহার
আত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে সাহায্য করা এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত।
مجموعة (ب) – খ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রশ্নাবলী
٩- اكتب مراحل تطور حقوق الإنسان-
[৯. মানবাধিকার উন্নয়নের বিভিন্ন স্তর লিপিবদ্ধ কর।]
মানবজাতির ইতিহাসে মানবাধিকারের ক্রমবিকাশকে মূলত প্রধান চারটি যুগে ভাগ করা যায়:
- প্রাচীন যুগ: ব্যাবিলনের হাম্মুরাবির কোড এবং প্রাচীন পারস্যের সাইরাস সিলিন্ডার (খ্রি.পূ. ৫৩৯ অব্দ), যেখানে প্রাথমিক কিছু অধিকারের ইঙ্গিত মেলে।
- ইসলামের ঐশী মানবাধিকার যুগ (৭ম শতাব্দী): মদিনা সনদ (৬২২ খ্রি.) এবং বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণের (৬৩২ খ্রি.) মাধ্যমে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সার্বজনীন মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়।
- মধ্যযুগীয় পশ্চিমা সনদ: ইংল্যান্ডের ম্যাগনা কার্টা (১২১৫ খ্রি.), পিটিশন অব রাইটস (১৬২৮ খ্রি.) এবং বিল অব রাইটস (১৬৮৯ খ্রি.)।
- আধুনিক আন্তর্জাতিক যুগ: ফরাসি বিপ্লবের নাগরিক অধিকার ঘোষণা (১৭৮৯ খ্রি.) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’ (UDHR)।
١٠- تحدث عن الحقوق الاجتماعية-
[১০. সামাজিক অধিকার সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ইসলাম সমাজে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল সহাবস্থানের জন্য কতিপয় মৌলিক সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করেছে:
- মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার: কারও সম্মানহানি, গীবত, অপবাদ বা উপহাস করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার: অনুমতি ছাড়া কারও ঘরে প্রবেশ করা বা আড়ি পাতা নিষেধ (সূরা হুজুরাত)।
- পারস্পরিক সালাম ও ভ্রাতৃত্ব: সমাজে ভালোবাসা ছড়াতে সালামের প্রসার ঘটানো এবং অসুস্থ হলে সেবা করা।
- সমাজসেবা ও দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো: এতিম, মিসকিন ও বিধবাদের অধিকার সংরক্ষণ করা।
١١- اكتب حقوق الجيران-
[১১. প্রতিবেশীর অধিকারগুলো লেখ।]
ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকারকে এতটাই মর্যাদা দিয়েছে যে নবীজী (সা.) বলেন: “জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি তাগিদ দিচ্ছিলেন যে আমার মনে হচ্ছিল হয়তো তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন!”
প্রতিবেশীর প্রধান অধিকারসমূহ:
- প্রতিবেশীকে কোনো প্রকার কষ্ট না দেওয়া (উচ্চ শব্দ, ময়লা ফেলা ইত্যাদি)।
- ক্ষুধার্ত থাকলে তাকে খাবার দেওয়া। নবীজী বলেন: “সে ব্যক্তি মুমিন নয় যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী পাশে ক্ষুধার্ত থাকে।”
- সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, ঋণ চাইলে সাহায্য করা এবং মৃত্যুর পর জানাজায় অংশ নেওয়া।
- মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল প্রতিবেশীই এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
١٢- ما المراد بحقوق الانسان؟
[১২. মানবাধিকার বলতে কী বুঝায়?]
মানবাধিকার হলো এমন কিছু অপরিহার্য ও মৌলিক অধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং স্বাধীনতা, যা প্রতিটি মানুষ মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করার কারণে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সমভাবে ভোগ করার দাবিদার। ইসলামের পরিভাষায় মানবাধিকার হলো মহান আল্লাহ কর্তৃক বান্দাদের জন্য নির্ধারিত এমন অলঙ্ঘনীয় খোদায়ী অধিকার (হুকূকুল ইবাদ), যা ক্ষুণ্ন করলে স্বয়ং আল্লাহও মাফ করেন না যতক্ষণ না ক্ষতিগ্রস্ত বান্দা ক্ষমা করে দেয়।
١٣- اكتب حقوق الزوجين في الاسلام-
[১৩. ইসলামে প্রদত্ত স্বামী-স্ত্রীর অধিকারসমূহ লেখ।]
ইসলামে দাম্পত্য জীবন প্রেম, দয়া ও পরস্পরের অধিকার রক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত (সূরা আর-রূম: ২১):
- স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার: ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা, স্বামীর অবর্তমানে তার ঘর ও আমানত রক্ষা করা এবং স্বামীর অনুমতি ছাড়া পরপুরুষকে ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া।
- স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার: সামর্থ্য অনুযায়ী উপযুক্ত বাসস্থান, অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসা প্রদান (নাফাকাহ); যথাযথ মোহরানা পরিশোধ করা; এবং সদয় ও ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করা।
- যৌথ অধিকার: পরস্পরের গোপনীয়তা রক্ষা করা, একান্তে তৃপ্তি দান এবং সন্তানদের সুন্দর তারবিয়াত দেওয়া।
١٤- بين الحرية الشخصية وحرية التعبير في الاسلام-
[১৪. ইসলামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বাক-স্বাধীনতার বর্ণনা দাও।]
- ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (الحرية الشخصية): ইসলামে প্রত্যেক মানুষের চলাচল, বাসস্থান নির্বাচন, স্বাধীন জীবিকা অর্জন এবং ব্যক্তিসত্তার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে কাউকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার বা বন্দি করা যায় না।
- বাক-স্বাধীনতা (حرية التعبير): সত্য প্রকাশ ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার পূর্ণ বাক-স্বাধীনতা ইসলাম দিয়েছে। এমনকি খলিফার মুখের ওপর দাঁড়িয়ে সাধারণ নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার ছিল (যেমন উমর রা.-এর সামনে জনৈক সাহাবীর প্রশ্ন)। তবে এই বাক-স্বাধীনতা অপব্যবহার করে কাউকে গালি দেওয়া, পরনিন্দা, ধর্মদ্রোহিতা বা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অনুমতি নেই।
١٥- قارن بين الحرية والمساواة-
[১৫. সাম্য ও স্বাধীনতা সম্পর্কে তুলনামূলক আলোচনা কর।]
- স্বাধীনতা (الحرية): স্বাধীনতা হলো কোনো প্রকার বাহ্যিক অন্যায় চাপ বা দাসত্ব ছাড়া মানুষের নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপন, চিন্তা, মতপ্রকাশ ও বিশ্বাস অনুশীলনের ক্ষমতা। তবে এটি লাগামহীন নয়, বরং শরীয়তের নীতিমালার অধীন।
- সাম্য (المساواة): সাম্য হলো সুযোগ, মর্যাদা ও আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে সকল মানুষকে সমান চোখে দেখা; যেখানে বংশ, বর্ণ বা ধনের কারণে কোনো পক্ষপাত থাকবে না।
- সম্পর্ক: স্বাধীনতা ও সাম্য একে অপরের পরিপূরক। সাম্য ছাড়া স্বাধীনতা কতিপয় ধনীর স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নেয়; আবার স্বাধীনতা ছাড়া সাম্য মানুষের ব্যক্তিত্বকে বন্দি করে ফেলে। ইসলাম এই দুটির মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য এনেছে।
١٦- اكتب موقف الإسلام من حماية الأعراض-
[১৬. সম্মান রক্ষায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি লেখ।]
ইসলাম মানুষের মান-সম্মান ও ইজ্জতের সুরক্ষাকে রক্তের মতোই পবিত্র ঘোষণা করেছে। বিদায় হজে নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: “তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্ভ্রম (সম্মান) পরস্পরের জন্য চিরতরে অলঙ্ঘনীয়।” কারো সম্ভ্রম নষ্ট করা কবিরা গুনাহ। ইসলাম কোনো সতী নারীর ওপর অপবাদ দেওয়াকে (কযফ) কঠোর দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে আশিটি বেত্রাঘাতের হদ নির্ধারণ করেছে (সূরা আন-নূর: ৪)। এছাড়া পরনিন্দা (গীবত), চোগলখোরি, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও কুধারণা পোষণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: জাতিসংঘ সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ কত সালে ঘোষণা করে?
উত্তর: ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR) গৃহীত হয়।
প্রশ্ন ২: ইসলামে মানবাধিকারের প্রধান দুটি ঐতিহাসিক দলিল কোনটি?
উত্তর: হিজরতের পর প্রণীত ‘মদিনা সনদ’ (৬২২ খ্রি.) এবং দশম হিজরির বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ (৬৩২ খ্রি.)।
প্রশ্ন ৩: ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের কী বলা হয়?
উত্তর: ‘আহলুয যিম্মাহ’ বা জিম্মি, যার অর্থ রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ ও সার্বিক নিরাপত্তাপ্রাপ্ত অমুসলিম নাগরিক।
প্রশ্ন ৪: কন্যা সন্তানের জন্ম ও লালন-পালনের ফজিলত কী?
উত্তর: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দুজন কন্যা সন্তানকে যত্নসহকারে লালন-পালন করবে, সে কিয়ামতের দিন তাঁর সাথে জান্নাতে পাশাপাশি থাকবে।
প্রশ্ন ৫: ইসলামে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি কী?
উত্তর: তাকওয়া বা খোদাভীতি; এখানে কোনো বংশ, বর্ণ, ভাষা বা ধনসম্পদের কোনো প্রাধান্য নেই।
প্রশ্ন ৬: আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার সুফল কী?
উত্তর: আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করলে আল্লাহ তায়ালা মানুষের রিযিকে বরকত দান করেন এবং তার আয়ু বৃদ্ধি করে দেন।