জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আহকামুল কুরআন (Ahkamul Quran) – 201402, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৮৯ মিনিট পড়ার সময়
১৪ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২১
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আহকামুল কুরআন (أحكام القرآن – কুরআনী আইন ও বিধানশাস্ত্র)
বিষয় কোড: 201402 | প্রশ্নপত্র কোড: 148
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা


ভূমিকা ও পাঠ্যক্রম পরিচিতি

ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU)-এর ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম মৌলিক ও ফিকহুল কুরআন বিষয়ক শাস্ত্রীয় পাঠ্যক্রম হলো ‘আহকামুল কুরআন’ (أحكام القرآن), যার প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় কোড ২০১৪০২। পবিত্র কুরআনের বিধানসংক্রান্ত আয়াতসমূহ (আয়াতুল আহকাম) থেকে কীভাবে ফিকহী নীতিমালা, শারঈ বিধিবিধান, দণ্ডবিধি (হুদূদ ও কিসাস), পারিবারিক আইন, সাক্ষ্য আইন এবং সামাজিক বিধান উদ্ভাবন (ইস্তিম্বাত) করা হয়—তা এই পাঠ্যসূচির প্রধান উপজীব্য। ২০২১ শিক্ষাবর্ষের এই প্রশ্নপত্রে সূরা আল-আম্বিয়া, আল-হাজ্জ, আন-নূর, লুকমান, আল-আহযাব এবং আল-হুজুরাত-এর গুরুত্বপূর্ণ আয়াতুল আহকামের পাশাপাশি আহকামুল কুরআন শাস্ত্রের ক্রমবিকাশ ও ইমাম জাসসাস (রহ.)-এর অনন্য অবদান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নিম্নে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্ন ও উপ-প্রশ্নের বিশদ, তথ্যবহুল ও একাডেমিক সমাধান উপস্থাপিত হলো।


বিভাগ ‘ক’ : রচনামূলক প্রশ্নাবলি (যেকোনো ৫টি প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক)

١- قوله تعالى: ﴿اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مَّعْرِضُونَ ۝ مَا يَأْتِيهِم مِّن ذِكْرٍ مِّن رَّبِّهِم مُّحْدَثٍ إِلَّا اسْتَمَعُوهُ وَهُمْ يَلْعَبُونَ ۝ لَاهِيَةً قُلُوبُهُمْ ۗ وَأَسَرُّوا النَّجْوَى الَّذِينَ ظَلَمُوا هَلْ هَٰذَا إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ ۖ أَفَتَأْتُونَ السِّحْرَ وَأَنتُمْ تُبْصِرُونَ﴾ [الأنبياء: ১-৩]

“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। যখনই তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে কোনো নতুন উপদেশ তাদের কাছে আসে, তারা তা কেবল খেলাচ্ছলেই শ্রবণ করে। তাদের অন্তর থাকে আত্মভোলা। আর যারা যালিম তারা গোপনে পরামর্শ করে বলে: ‘এ তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ বৈ নয়! তবে কি তোমরা জেনে-শুনে জাদুর কবলে পতিত হবে?’”

(الف) بين سبب نزول الآيات- (আয়াতসমূহের শান-ই-নুযূল)

সূরা আল-আম্বিয়ার সূচনালগ্নের এই আয়াতসমূহ মক্কী জীবনের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে অবতীর্ণ হয়। ইমাম তাবারী, ইমাম ওয়াহিদী এবং ইবনে কাছীর (রহ.) নির্ভরযোগ্য সূত্রে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করেছেন:

  1. কাফিরদের পুনরুত্থান অস্বীকার ও উপহাস: রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন মক্কাবাসীদের মূর্তিপূজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত করার এবং মৃত্যুর পর কিয়ামতের ময়দানে পুনরুত্থান ও হিসাব-নিকাশের মুখোমুখি হওয়ার সতর্কবার্তা শোনাতেন, তখন কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যেমন নযর ইবনুল হারিস, আবু জাহল ও ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরহ বিষয়টিকে অসম্ভব বলে উপহাস করত। তারা বলত—‘আমরা যখন মরে পচে অস্থিতে পরিণত হব, তখন কীভাবে আবার জীবিত হব?’
  2. হিসাবকে সুদূরপরাহত মনে করা: কাফিররা ভাবত, কিয়ামত যদি সত্যিই আসবে তবে তা কেন এখনই আসছে না? তাদের এই বেপরোয়া উদাসীনতা ও আল্লাহভীতিহীন মনোভাবের জবাবে মহান আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করে জানিয়ে দেন যে, মহাবিশ্বের আয়ুষ্কালের তুলনায় কিয়ামত অত্যন্ত নিকটবর্তী; অথচ তারা চিরস্থায়ী আখেরাতের হিসাব ভুলে পার্থিব ভোগবিলাসে ডুবে রয়েছে।
  3. গোপন ষড়যন্ত্র ও অপবাদ: কুরাইশ নেতারা গোপনে সভা করে যুক্তি দিত যে, মুহাম্মদ ﷺ তো সাধারণ মানুষের মতোই পানাহার করেন, বাজারে হাঁটেন; সুতরাং তিনি নবী হতে পারেন না। আর তাঁর মুখনিঃসৃত অতুলনীয় কুরআনিক বাণী কোনো ঐশী বাণী নয়, বরং এক চিত্তাকর্ষক জাদু। সাধারণ মানুষ যাতে বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য আল্লাহ তাদের এই অভ্যন্তরীণ কানাঘুষা ও চক্রান্তকে কুরআনে উন্মোচিত করে দেন।

(ب) ما المراد بالناس؟ اكتب علامات الساعة الكبرى- (‘আন-নাস’ দ্বারা কাদের বোঝানো হয়েছে এবং কিয়ামতের বড় বড় আলামতসমূহ)

১. ‘আন-নাস’ (الناس)-এর তাৎপর্য:

মুফাসসিরগণের মতে, আয়াতে ‘আন-নাস’ দ্বারা বাহ্যিকভাবে সমগ্র মানবজাতিকে বোঝানো হলেও বিশেষভাবে মক্কার মুশরিক ও কিয়ামত অস্বীকারকারী কাফির সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। কারণ উদাসীনতা ও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার তীব্র তিরস্কার তাদের প্রতিই প্রযোজ্য। তবে আল্লামা যামাখশারী ও ইমাম রাযী বলেন, এটি সকল যুগের গাফেল ও দুনিয়াসক্ত মানুষের জন্য এক সার্বজনীন সতর্কবার্তা, যারা মৃত্যুকে অনিবার্য জেনেও পরকালীন জবাবদিহিতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে না।

২. কিয়ামতের বড় আলামতসমূহ (علامات الساعة الكبرى):

সহীহ মুসলিমে হযরত হুযায়ফা ইবনে আসীদ আল-গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত মারফূ হাদীসে (হাদীস নং ২৯০১) রাসুলুল্লাহ ﷺ কিয়ামতের ১০টি মহাবিস্ফোরণকারী বড় আলামতের কথা উল্লেখ করেছেন:

  • এক. ইমাম মাহদীর আত্মপ্রকাশ: কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে যখন অন্যায় ও জুলুমে ভরে যাবে, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বংশধর থেকে ন্যায়পরায়ণ শাসক হযরত মাহদী আবির্ভূত হবেন এবং ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন।
  • দুই. দাজ্জালের আবির্ভাব (المسيح الدجال): মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফিতনা হিসেবে কানা দাজ্জাল আবির্ভূত হয়ে অলৌকিক ধোঁকা প্রদর্শন করবে এবং নিজেকে ঈশ্বর দাবি করবে।
  • তিন. হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ: দمشকের উমায়্যা মসজিদের সাদা মিনারের ওপর দুজন ফেরেশতার ডানায় ভর করে ঈসা (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে বাবে লুদ্দে হত্যা করবেন, ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন, শূকর নিধন করবেন এবং কুরআনী শরীয়ত অনুযায়ী পৃথিবী শাসন করবেন।
  • চার. ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাদুর্ভাব (يأجوج ومأجوج): প্রাচীর ভেঙে এই মানবগোষ্ঠী পৃথিবীতে নেমে আসবে এবং পানির সমস্ত উৎস নিঃশেষ করে অরাজকতা সৃষ্টি করবে। পরিশেষে ঈসা (আ.)-এর দোয়ায় মহামারী লেগে তারা ধ্বংস হবে।
  • পাঁচ, ছয় ও সাত. তিনটি বিশাল ভূ-ধস (خسوف ثلاثة): একটি প্রাচ্যে (পূর্বাঞ্চলে), একটি প্রতীচ্যে (পশ্চিমাঞ্চলে) এবং অপরটি জাজিরাতুল আরবে (আরব উপদ্বীপে) সংঘটিত হবে।
  • আট. ধোঁয়ার কুন্ডলী (الدخان): আকাশ থেকে এক বিশাল ধোঁয়া নির্গত হয়ে সমগ্র পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করবে, যা কাফিরদের জন্য তীব্র যন্ত্রণাদায়ক হবে।
  • নয়. দাব্বাতুল আরদ (دابة الأرض): যমীন থেকে এক অদ্ভুত বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী বের হয়ে মানুষের কপালে ঈমান ও কুফরের সুস্পষ্ট সিলমোহর এঁকে দেবে।
  • দশ. পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয় (طلوع الشمس من مغربها): প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম ভেঙে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। এই আলামত প্রকাশিত হওয়ার পর তওবার দরজা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে। সর্বশেষে ইয়েমেনের আদন গহ্বর থেকে এক মহাগ্নি বের হয়ে মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।

٢- قوله تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّنَ الْبَعْثِ فَإِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ مِن نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِن مُّضْغَةٍ مُّخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِّنُبَيِّنَ لَكُمْ ۚ وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاءُ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ ۖ وَمِنكُم مَّن يُتَوَفَّىٰ وَمِنكُم مَّن يُرَدُّ إِلَىٰ أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْلَا يَعْلَمَ مِن بَعْدِ عِلْمٍ شَيْئًا ۚ وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنبَتَتْ مِن كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ﴾ [الحج: ৫]

“হে মানবজাতি! পুনরুত্থান সম্পর্কে যদি তোমরা সন্দেহে থাক, তবে অনুধাবন কর—নিশ্চয় আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি মাটি থেকে, এরপর শুক্রবিন্দু থেকে, এরপর জমাট রক্তপিণ্ড থেকে, এরপর আকৃতিবিশিষ্ট বা আকৃতিবিহীন মাংসপিণ্ড থেকে—তোমাদের নিকট সত্য সুস্পষ্ট করার জন্য। আর আমি যা ইচ্ছা করি এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে স্থিতি দান করি; অতঃপর তোমাদের শিশুরূপে বের করে আনি, যাতে তোমরা যৌবনে পদার্পণ কর। তোমাদের কারো কারো অকালেই মৃত্যু ঘটে, আবার কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় জরাগ্রস্ত বয়সে—যাতে সে জ্ঞানলাভের পরও কিছুই না জানে। আর তোমরা শুষ্ক নিষ্ফলা যমীন দেখতে পাও; অতঃপর যখন আমি তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তা সতেজ হয়ে ফেঁপে ওঠে এবং সর্বপ্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ উৎপন্ন করে।”

(الف) قولا في قوله تعالى: ‘مخلقة’ بين مرتبا- (‘মুখাল্লাক্বাহ’-এর তাৎপর্য ও মানবভ্রূণের পর্যায়ক্রমিক বিকাশ)

পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি আধুনিক মানবভ্রূণবিজ্ঞান (Embryology)-এর এক বিস্ময়কর অলৌকিক দলিল। মুফাসসির ও ফকীহগণের মতে ‘মুখাল্লাক্বাহ ও গাইরি মুখাল্লাক্বাহ’ (مخلقة وغير مخلقة)-এর ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভ্রূণের ক্রমবিকাশ সুস্পষ্ট হয়:

  1. শাব্দিক ও শারঈ তাৎপর্য:
    • মুখাল্লাক্বাহ (مخلقة): যে মাংসপিণ্ড পূর্ণাঙ্গ অবয়ব লাভ করেছে, অর্থাৎ যার হাত, পা, চোখ, কান ও মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্পষ্ট রূপ নিয়েছে।
    • গাইরি মুখাল্লাক্বাহ (غير مخلقة): যে ভ্রূণটি এখনো অপূর্ণাঙ্গ বা যার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকশিত হয়নি, অথবা যা গর্ভপাতের মাধ্যমে নষ্ট হয়ে যায়।
    • ফিকহী বিধান: জাসসাস ও অন্যান্য ফকীহগণের মতে, গর্ভপাত হওয়া ভ্রূণ যদি ‘মুখাল্লাক্বাহ’ (অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দৃশ্যমান) হয়, তবে মহিলার রক্তস্রাব নিফাস গণ্য হবে এবং বাচ্চার জানাজা ও নামকরণের বিধান কার্যকর হবে। আর যদি ‘গাইরি মুখাল্লাক্বাহ’ হয়, তবে তা সাধারণ রক্তস্রাব (ইসতিহাযা) হিসেবে বিবেচিত হবে।
  2. ভ্রূণ সৃষ্টির ধারাবাহিক পর্যায়ক্রম (পর্যায়ভিত্তিক বিন্যাস):
    • পর্যায় ১ : তুরাব (تراب – মৃত্তিকা): মানবজাতির আদি পিতা আদম (আ.)-এর দৈহিক মূল উপাদান।
    • পর্যায় ২ : নুতফাহ (نطفة – শুক্রকীট ও ডিম্বাণুর মিলন): নিষিক্ত কোষ বা জাইগোট।
    • পর্যায় ৩ : আলাক্বাহ (علقة – রক্তপিণ্ড বা জোঁকের ন্যায় ঝুলন্ত অবস্থা): জরায়ুর দেয়ালে প্রোথিত ব্লাস্টোসিস্ট, যা দেখতে ঝুলন্ত রক্তপিণ্ডের মতো।
    • পর্যায় ৪ : মুদগাহ (مضغة – চর্বিত মাংসপিণ্ড): প্রায় ২৮-৩০ দিনে দাঁতে চিবানো মাংসের মতো ক্ষুদ্র অবয়ব।
    • পর্যায় ৫ : ইযাম ও লাহম (عظاما فكسونا العظام لحما): কঙ্কাল তৈরি এবং মাংসপেশি দ্বারা কঙ্কাল আচ্ছাদিত হওয়া।
    • পর্যায় ৬ : নাফখুর রূহ (نفخ الروح – রূহ সঞ্চার): ১২০তম দিনে ফেরেশতা কর্তৃক জীবন ও তাকদীর সঞ্চার।

(ب) اكتب قصة خلق آدم فى ضوء قوله تعالى: “فانا خلقنكم من تراب”- (আদম সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ ঘটনা)

মহান আল্লাহ যখন মানবজাতিকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন ফেরেশতাদের বললেন: ﴿إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً﴾ [البقرة: ৩০]।

  1. মৃত্তিকা সংগ্রহ: হাদীস অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাদা, কালো, লাল, নরম, শক্ত ও বিভিন্ন উর্বরতার মাটি সংগ্রহ করার জন্য ফেরেশতা পাঠালেন। এই মাটির মিশ্রণের কারণেই মানবজাতির গায়ের রঙ, স্বভাব ও চরিত্রে নানা বৈচিত্র্য দেখা যায়।
  2. মাটির রূপান্তর পর্যায়: প্রথমে শুষ্ক ধূলিকণা (তুরাব), পানিতে মিশিয়ে নরম কাদা (তীন), দুর্গন্ধযুক্ত পচা কাদা (হামায়িম মাসনূন), আঠালো কাদা (ত্বীনিন লাযিব) এবং পরিশেষে পোড়া মাটির মতো শক্ত ঠনঠনে রূপ (সালসালিন কাল ফাখখার) ধারণ করে।
  3. আদম (আ.)-এর অবয়ব গঠন ও রূহ সঞ্চার: আল্লাহ তাআলা নিজ কুদরতি হাতে আদম (আ.)-এর সুন্দরতম মানবদেহ তৈরি করে দীর্ঘকাল রেখে দেন। ইবলিস এই ফাঁপা মাটির পুতুল দেখে অহংকারবশত তাচ্ছিল্য করে। অতঃপর যখন আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট বিশেষ রূহ ফুঁকে দিলেন, তা মস্তিষ্কে পৌঁছামাত্র আদম (আ.) হাঁচি দিয়ে বললেন: «الحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ العَالَمِينَ»। আল্লাহ জবাব দিলেন: «يَرْحَمُكَ رَبُّكَ يَا آدَمُ»।
  4. ইলম দান ও ফেরেশতাদের সিজদা: আল্লাহ আদম (আ.)-কে মহাবিশ্বের সকল বিষয়ের নাম ও গুণাবলি শিক্ষা দিলেন এবং ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। ফেরেশতাগণ নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। আল্লাহ আদম (আ.)-কে নির্দেশ দিলে তিনি সব নাম বলে দিলেন। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের সিজদা করতে বললেন। সকল ফেরেশতা সিজদা করলেন; কিন্তু অহংকারের কারণে ইবলিস অস্বীকার করে চিরতরে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হলো।

٣- قوله تعالى: ﴿الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ ۖ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۖ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ ۝ الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَٰلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ﴾ [النور: ২-৩]

“ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর। আর আল্লাহর দ্বীনের বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের প্রতি কোনো দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখ। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারীকে বিয়ে করবে; আর ব্যভিচারিণী নারীকেও কেবল ব্যভিচারী বা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করবে। আর মুমিনদের জন্য এটি হারাম করা হয়েছে।”

(الف) عرف الجلد والرجم- ثم بين صفة الضرب في الزنا- (আল-জালদ ও আর-রাজম-এর পরিচয় এবং বেত্রাঘাতের নিয়ম)

১. পারিভাষিক পরিচয়:

  • আল-জালদ (الجلد – বেত্রাঘাত): ‘জালদ’ শব্দের মূল অর্থ চামড়া বা ত্বক। শরীয়তের পরিভাষায়, কোনো অপরাধীকে চামড়ার চাবুক বা বেত দিয়ে পিঠে ও দেহে আঘাত করে যে শাস্তি প্রদান করা হয়, যাতে আঘাতের তীব্রতা চামড়া অতিক্রম করে হাড়ে না পৌঁছায়, তাকে ‘জালদ’ বলা হয়। অবিবাহিত (গাইরে মুহসান) নারী-পুরুষের ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে ১০০ বেত্রাঘাত নির্ধারিত।
  • আর-রাজম (الرجم – পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড): ‘রাজম’ অর্থ পাথর নিক্ষেপ করা। শরীয়তের পরিভাষায়, স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক এবং বৈধভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সহবাসে লিপ্ত হয়েছে এমন কোনো বিবাহিত (মুহসান) ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হলে প্রকাশ্যে পাথর নিক্ষেপ করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে ‘রাজম’ বলে। এটি সহীহ সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।

২. ব্যভিচারের শাস্তিতে বেত্রাঘাতের শারঈ পদ্ধতি ও নিয়মাবলী (صفة الضرب):

ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাব এবং ইমাম জাসসাসের ‘আহকামুল কুরআন’ অনুযায়ী বেত্রাঘাতের সুনির্দিষ্ট আদব রয়েছে:

  1. চাবুকের প্রকৃতি: চাবুক খুব মোটা ও শক্ত হবে না যাতে অঙ্গহানি ঘটে, আবার অতি নরমও হবে না যাতে ব্যথা অনুভূত না হয়; বরং মাঝারি ধরনের গিঁটহীন চামড়ার চাবুক হবে।
  2. আঘাতের বণ্টন: সমস্ত আঘাত দেহের এক স্থানে না করে পিঠ, ঘাড়ের নিচ, নিতম্ব ও রানে ছড়িয়ে দিতে হবে।
  3. নিষিদ্ধ অঙ্গসমূহ: মুখমণ্ডল, মাথা, বুক ও লজ্জাস্থানে আঘাত করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «اتَّقِ الوَجْهَ» (চেহারা বাঁচিয়ে মারবে)।
  4. আঘাতকারীর নিয়ম: আঘাতকারী তার বগল উন্মুক্ত করবে না, অর্থাৎ হাত খুব উঁচুতে তুলে পূর্ণ শক্তিতে আঘাত করবে না; বরং মধ্যম শক্তিতে আঘাত করবে।
  5. পুরুষ ও নারীর ভিন্নতা: পুরুষকে দাঁড় করিয়ে সাধারণ পোশাক রেখে (ভারী জ্যাকেট বা চাদর খুলে) বেত্রাঘাত করা হবে। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে সতর যাতে প্রকাশ না পায়, সেজন্য তাকে বসিয়ে কাপড় ভালোভাবে বেঁধে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

(ب) ما حكم إقامة الحدود في المساجد؟ بين بالأدلة- (মসজিদে হদ কার্যকর করার শারঈ বিধান)

মসজিদে হদ ও কিসাসের শাস্তি কার্যকর করার ব্যাপারে ফকীহগণের বিস্তারিত ফতোয়া নিম্নরূপ:

  • জমহুর উলামা ও ফকীহগণের ঐকমত্য: হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী—চার মাযহাবের সর্বসম্মত ফতোয়া হলো মসজিদের অভ্যন্তরে কোনো প্রকার হদ বা কিসাসের শাস্তি কার্যকর করা মাকরূহে তাহরীমী বা সম্পূর্ণ নাজায়েয/হারাম।
  • কুরআন ও হাদীসের দলিল:
    • সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ৪৪৯০) ও সুনানে তিরমিযীতে হযরত হাকিম ইবনে হিযাম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «لَا تُقَامُ الحُدُودُ فِي المَسَاجِدِ، وَلَا يُسْتَقَادُ فِيهَا» (মসজিদের ভেতরে হদ কার্যকর করা যাবে না এবং কোনো কিসাসও নেওয়া যাবে না)।
    • মসজিদ পবিত্র স্থান, যা কেবল আল্লাহর যিকর, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও ইলম চর্চার জন্য নির্মিত। মসজিদে শাস্তি দিতে গেলে অপরাধীর রক্তপাত, মলমূত্র ত্যাগ বা চেঁচামেচির মাধ্যমে মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।
  • শাস্তির উপযুক্ত স্থান: রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা ঈদগাহ, খোলা প্রান্তর বা কারাগারের সন্নিকটে জনসমক্ষে হদ কার্যকর করতেন।

٤- قوله تعالى: ﴿إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ ۚ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم ۖ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۚ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ ۚ وَالَّذِي تَوَلَّىٰ كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ﴾ [النور: ১১]

“নিশ্চয় যারা এই অপবাদ রচনা করেছে, তারা তোমাদেরই মধ্যকার একটি দল। একে তোমরা তোমাদের জন্য অমঙ্গলজনক মনে করো না; বরং এ তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে পাপের প্রাপ্য শাস্তি; আর তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”

(الف) بين واقعة الإفك مختصرا- (হাদিসাতুল ইফকের ঐতিহাসিক ঘটনা)

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) স্বয়ং ‘ইফক’ (الأفك – জঘন্য মিথ্যা অপবাদ)-এর বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করেছেন:

  1. যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও হার হারানো: ৫ম বা ৬ষ্ঠ হিজরীতে গাযওয়ায়ে বনী মুসতালিক (মুরাইসী যুদ্ধ) থেকে ফেরার পথে এক রাতে কাফেলা যাত্রা বিরতি করে। আয়েশা (রা.) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে কাফেলার দূরে যান। ফিরে এসে দেখেন তাঁর গলার ইয়েমেনি পুঁতির হারটি ছিঁড়ে হারিয়ে গেছে। তিনি পুনরায় তা খুঁজতে যান।
  2. কাফেলা চলে যাওয়া: আয়েশা (রা.) ছিলেন অত্যন্ত ক্ষীণকায় ও কম বয়স্কা। তাঁর শিবিকা (হাওদাহ) বহনকারী সাহাবীগণ ভাবলেন তিনি ভেতরেই আছেন। ফলে তাঁরা শিবিকা উটের পিঠে তুলে কাফেলা নিয়ে রওনা হয়ে যান। হার খুঁজে ফিরে এসে আয়েশা (রা.) দেখেন ময়দান সম্পূর্ণ জনশূন্য। তিনি এই ভেবে চাদর জড়িয়ে শুয়ে পড়েন যে, অনুপস্থিতি টের পেলে কাফেলা অবশ্যই ফিরে আসবে।
  3. হযরত সাফওয়ান (রা.)-এর আগমন: কাফেলার পেছনে ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র কুড়ানোর দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত সাফওয়ান ইবনুল মুয়াত্তাল আস-সুলামী (রা.)। ভোরে তিনি দূর থেকে এক ঘুমন্ত মানুষের অবয়ব দেখে এগিয়ে আসেন এবং পর্দাবিধানের পূর্ব থেকেই পরিচিত থাকায় আয়েশা (রা.)-কে চিনে ফেলেন। তিনি চমকে উঠে কেবল উচ্চারণ করেন: «إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ»। তিনি নিজের উট বসিয়ে দিলে আয়েশা (রা.) তাতে আরোহণ করেন এবং সাফওয়ান (রা.) নিজে উটের লাগাম ধরে হেঁটে কাফেলার সাথে মিলিত হন।
  4. মুনাফিকদের কুৎসা রটনা: তাঁদের একসাথে পৌঁছাতে দেখে মদীনার মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জঘন্য অপবাদের গল্প বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়। সরলমনা কিছু সাধারণ মুসলমানও এই বিভ্রান্তির ফাঁদে পড়েন। আয়েশা (রা.) মদীনা ফিরে কঠিন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এক মাস পর উম্মে মিসতাহর মাধ্যমে এই অপবাদের কথা জানতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং পিতার বাড়ি চলে যান।
  5. ওহী অবতীর্ণ ও পবিত্রতা ঘোষণা: সমগ্র মদীনা যখন এই বিষাক্ত কানাকানিতে উত্তাল, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর ওহী নাযিল হয়। সূরা আন-নূরের ১১ থেকে ২০ নম্বর পর্যন্ত টানা ১০টি আয়াতে স্বয়ং বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা, সততা ও সতীত্ব ঘোষণা করেন এবং অপবাদ রটনাকারীদের ওপর লা’নত বর্ষণ করেন।

(ب) من المراد بقوله تعالى ‘عصبة منكم’؟ بين بالإيضاح- (‘উসবাতুম মিনকুম’-এর পরিচয়)

‘উসবাহ’ (عصبة) বলা হয় এমন এক ঐক্যবদ্ধ দলকে, যাদের সংখ্যা ১০ থেকে ৪০ জনের মধ্যে হয়। আয়াতে ‘উসবাতুম মিনকুম’ (তোমাদের মধ্যকার একটি দল) দ্বারা সেই চক্রটিকে বোঝানো হয়েছে যারা সম্মিলিতভাবে এই অপবাদ ছড়িয়েছিল:

  • ১. আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূল (মুনাফিক সর্দার): আয়াতে যার ব্যাপারে বলা হয়েছে—﴿وَالَّذِي تَوَلَّىٰ كِبْرَهُ مِنْهُمْ﴾ (যে ব্যক্তি এই অপবাদের প্রধান দায়িত্ব নিয়েছিল)। সে এই মিথ্যা রটনার মূল নকশাকার ছিল। আখেরাতে তার জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নামের ‘মহাশাস্তি’ (عذاب عظيم)।
  • ২. মিসতাহ ইবনে উছাসাহ (مسطح بن أثاثة): তিনি হযরত আবু বকর (রা.)-এর খালাতো ভাই এবং একজন দরিদ্র বদরী সাহাবী ছিলেন। তিনি মুনাফিকদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে তা প্রচার করেছিলেন।
  • ৩. হাসসান ইবনে সাবিত (حسان بن ثابت): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিশিষ্ট কবি সাহাবী, তিনিও বিভ্রান্তির শিকার হয়েছিলেন।
  • ৪. হামনাহ বিনতে জাহাশ (حمنة بنت جحش): উম্মুল মুমিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রা.)-এর বোন। তিনি আয়েশা (রা.)-এর সতীন-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বোনকে সুবিধা দিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত এতে জড়িয়ে পড়েন।

শারঈ দণ্ড (হদ্দে কাযাফ): ওহী নাযিল হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ ﷺ এই অপবাদে লিপ্ত হওয়ার কারণে মিসতাহ, হাসসান ও হামনাহ—এই তিনজনকে অপবাদের শরয়ী হদ হিসেবে ৮০টি করে বেত্রাঘাত করেন। আর প্রধান কুচক্রী মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতের লাঞ্ছনার জন্য ছেড়ে দেন।


٥- قوله تعالى: ﴿وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ ۝ وَإِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِ آيَاتُنَا وَلَّىٰ مُسْتَكْبِرًا كَأَن لَّمْ يَسْمَعْهَا كَأَنَّ فِي أُذُنَيْهِ وَقْرًا ۖ فَبَشِّرْهُ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ﴾ [لقمان: ৬-৭]

“আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যে অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অনর্থক ও বিভ্রান্তিকর কথা ক্রয় করে এবং আল্লাহর পথকে নিয়ে উপহাস করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। আর যখন তার কাছে আমার আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন সে অহংকারের সাথে মুখ ফিরিয়ে নেয়—যেন সে তা শুনতেই পায়নি, যেন তার উভয় কানে বধিরতা রয়েছে। অতএব তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।”

(الف) بين سبب نزول الآية- (আয়াতসমূহের শান-ই-নুযূল)

মুফাসসির ইমাম কালবী, ওয়াহিদী এবং ইবনে কাসীর (রহ.) নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় উল্লেখ করেন:

  1. মক্কার অন্যতম ধনাঢ্য মুশরিক ব্যবসায়ী ছিল নযর ইবনুল হারিস (النضر بن الحارث)। সে পারস্য ও হীরায় বাণিজ্য করতে যেত।
  2. সে সেখানে রুস্তম, ইসফেন্দিয়ার এবং প্রাচীন পারস্যের রাজাদের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান ও কল্পকাহিনী সংবলিত কিতাব সংগ্রহ করে। এছাড়া সে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে সুন্দরী গায়িকা বাঁদী ক্রয় করে মক্কায় নিয়ে আসে।
  3. যখনই সে শুনত কোনো ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মুখে কুরআনের তিলাওয়াত শুনে মুগ্ধ হয়ে ইসলামের দিকে ঝুঁকছে, তখনই সে তার গায়িকাকে নির্দেশ দিত তাকে গান-বাজনা ও মদ্যপানে মগ্ন রাখতে এবং নিজে পারস্যের কল্পকাহিনী শুনিয়ে বলত—‘মুহাম্মদের কথার চেয়ে আমার কিসসা অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক!’ এভাবে সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখত। তার এই হীন চক্রান্তের প্রেক্ষিতেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।

(ب) ما المراد بقوله تعالى ‘لهو الحديث’ بين بيانا شافيا- (‘লাহওয়াল হাদীস’-এর প্রামাণ্য ব্যাখ্যা ও শারঈ বিধান)

১. সাহাবা ও তাবেয়ীদের তাফসীর:

  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.): তাঁকে ‘লাহওয়াল হাদীস’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি তিনবার আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলেছিলেন: «هُوَ الغِنَاءُ، وَاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ» (আল্লাহর কসম, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই—এর দ্বারা গান-বাজনাকেই বোঝানো হয়েছে)।
  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.): তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন: ‘লাহওয়াল হাদীস হলো গান-বাজনা এবং বাদ্যযন্ত্র।’
  • মুজাহিদ ও হাসান বসরী (রহ.): তাঁরা বলেন, যে কোনো অনর্থক কিসসা-কাহিনী, ড্রামা, বাদ্যযন্ত্র এবং যা মানুষকে সালাত ও আল্লাহর যিকর থেকে গাফেল করে দেয়, সবই ‘লাহওয়াল হাদীস’-এর অন্তর্ভুক্ত।

২. গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রের ফিকহী বিধান:

  • হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী—চার মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহগণের মতে, যে গান-বাজনায় অশ্লীলতা, শিরকী কথা, যৌন উদ্দীপনা থাকে এবং বাদ্যযন্ত্র (যেমন: বাঁশি, তবলা, গিটার ইত্যাদি) ব্যবহৃত হয়, তা হারাম ও কবিরা গুনাহ। সহীহ বুখারীতে রাসুলুল্লাহ ﷺ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন: «لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ، يَسْتَحِلُّونَ الحِرَ وَالحَرِيرَ، وَالخَمْرَ وَالمَعَازِفَ» (আমার উম্মতের মাঝে এমন কিছু দলের আবির্ভাব ঘটবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে)।
  • তবে দফ বাজিয়ে বিয়ের এলান করা বা জিহাদের ময়দানে উৎসাহমূলক সঙ্গীত পরিবেশন শর্তসাপেক্ষে জায়েয রাখা হয়েছে।

٦- قوله تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ۝ وَاتَّبِعْ مَا يُوحَىٰ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا ۝ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ وَكِيلًا﴾ [الأحزاب: ১-৩]

“হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। আর আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা ওহী নাযিল হয় তা অনুসরণ করুন; নিশ্চয় তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত। আর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন; কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।”

(الف) هل تقع المعصية من الأنبياء؟ فما معنى ‘اتق الله’- (ইসমাতুল আম্বিয়া ও নবীজীকে ‘ইত্তাক্বিল্লাহ’ সম্বোধনের তাৎপর্য)

১. ইসমাতুল আম্বিয়া বা নবীদের নিষ্পাপতা (عصمة الأنبياء):

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা অনুযায়ী সকল নবী ও রাসূলগণ নিষ্পাপ (মা’সূম)।

  • ওহী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে: দ্বীনের দাওয়াত ও ওহী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নবীদের কোনো প্রকার ভুলত্রুটি হওয়া অসম্ভব; এ ব্যাপারে উম্মতের সর্বসম্মত ইজমা রয়েছে।
  • কবিরা গুনাহ: নবুওয়াতের পূর্বে ও পরে নবীগণ সর্বপ্রকার কবিরা গুনাহ (যেমন: শিরক, ব্যভিচার, মিথ্যা, চুরি ইত্যাদি) থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র।
  • সগিরা গুনাহ ও ইজতিহাদী ভুল (যাল্লাত): কোনো কোনো মুতাকাল্লিমের মতে, নবীদের দ্বারা অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘উত্তম বিষয়টি ছেড়ে তুলনামূলক কম উত্তম’ (তর্কুল আওলা) কোনো কাজ হয়ে যাওয়া সম্ভব, যাকে ‘যাল্লাহ’ (স্খলন) বলা হয়। তবে আল্লাহ তাআলা তাৎক্ষণিকভাবে ওহীর মাধ্যমে তাঁদের সতর্ক করে সংশোধন করে দেন, যাতে তা উম্মতের জন্য সুন্নাত হয়ে না যায়।

২. রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে ‘اتَّقِ اللَّهَ’ (আল্লাহকে ভয় করুন) বলার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য:

  1. তাকওয়ার ওপর স্থায়িত্ব (الثبات والدوام): আরবি ব্যাকরণে কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিকে কোনো গুণের নির্দেশ দেওয়ার অর্থ হলো সেই গুণের ওপর অবিচল থাকা। এর অর্থ—‘হে নবী! আপনি যে তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে আছেন, তার ওপর আজীবন সুদৃঢ় থাকুন।’
  2. উম্মতকে শিক্ষা দান (إياك أعني واسمعي يا جارة): সরাসরি নবীকে সম্বোধন করার উদ্দেশ্য হলো উম্মতকে সতর্ক করা। উম্মত ভাববে—যদি স্বয়ং মা’সূম নবীকেই আল্লাহকে ভয় করার এবং কাফিরদের সাথে আপস না করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে সাধারণ মুমিনদের কতটা বেশি সাবধান হতে হবে!
  3. চাপ ও ষড়যন্ত্রের মুখে আপসহীনতা: মক্কার আবু সুফিয়ান ও মদীনার মুনাফিকরা নবীজীর নিকট প্রস্তাব এনেছিল যেন তিনি তাদের দেব-দেবীর বিরুদ্ধে কথা না বলেন। আল্লাহ নবীকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সেই কুচক্রীদের চাপ প্রত্যাখ্যানের সাহস জুগিয়েছেন।

(ب) ما معنى الكفر؟ بين أنواع الكفر بالإيضاح- (কুফরের অর্থ ও প্রকারভেদ)

১. শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:

‘কুফর’ (الكفر) শব্দের আভিধানিক অর্থ গোপন করা, ঢেকে রাখা বা অস্বীকার করা। কৃষক মাটির নিচে বীজ লুকিয়ে রাখে বলে আরবিতে কৃষককে ‘কাফির’ বলা হয়। শরীয়তের পরিভাষায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দ্বীনের যেসকল অকাট্য ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয় (যা ‘মা’লূমুম মিনাদ দ্বীন বিদ-দারূরাহ’ নামে খ্যাত) নিয়ে এসেছেন, তার কোনো একটিকে অস্বীকার বা অবিশ্বাস করাকে ‘কুফর’ বলে।

২. কুফরের প্রধান প্রকারভেদসমূহ:

কুফরের প্রকার সংজ্ঞা ও তাৎপর্য উদাহরণ
১. কুফরুল ইনকার (كفر الإنكار) অন্তর দিয়েও বিশ্বাস না করা এবং মুখেও প্রকাশ্যে অস্বীকার করা। নাস্তিক ও জড়বাদীদের কুফর, যারা স্রষ্টা ও পরকাল উভয়কেই অস্বীকার করে।
২. কুফরুল জুহূদ (كفر الجحود) অন্তরে সত্য জেনেও কেবল অহংকার বা হঠকারিতার কারণে মুখে অস্বীকার করা। ইবলিসের কুফর এবং তৎকালীন বহু ইহুদী পণ্ডিতের কুফর (কুরআন: ২:৮৯)।
৩. কুফরুল ইনাদ (كفر العناد) অন্তরে সত্যতা স্বীকার করে এবং মুখেও স্বীকার করে, কিন্তু পার্থিব ভয় বা অহংকারে ইসলাম গ্রহণ না করা। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চাচা আবু তালিবের কুফর।
৪. কুফরুন নিফাক্ব (كفر النفاق) মুখে ঈমানের দাবি করা কিন্তু অন্তরে কুফর ও শত্রুতা গোপন রাখা। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও মদীনার মুনাফিকদের কুফর (কুরআন: ৬৩:১)।
৫. কুফরুশ শাক্ক (كفر الشك) কিয়ামত, জান্নাত, জাহান্নাম বা কুরআনের সত্যতা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগা। সূরা আল-কাহফে উল্লিখিত দুই বাগানওয়ালার কুফর (কুরআন: ১৮:৩৫-৩৬)।
৬. কুফরুল ই’রাদ্ব (كفر الإعراض) দ্বীনের বিষয়কে সম্পূর্ণ অবহেলা করে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে উদাসীন থাকা। সূরা আল-আহকাফের ৩ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত কাফিরদের অবস্থা।

٧- قوله تعالى: ﴿النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنفُسِهِمْ ۖ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ ۗ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَىٰ بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ إِلَّا أَن تَفْعَلُوا إِلَىٰ أَوْلِيَائِكُم مَّعْرُوفًا ۚ كَانَ ذَٰلِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُورًا﴾ [الأحزاب: ৬]

“নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের প্রাণের চেয়েও অধিক ঘনিষ্ঠ ও অগ্রগণ্য, এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা। আর আল্লাহর বিধানে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়রা সাধারণ মুমিন ও মুহাজিরদের তুলনায় পরস্পরের অধিক নিকটবর্তী; তবে তোমরা যদি তোমাদের বন্ধুদের প্রতি কোনো কল্যাণ (অসিয়ত/অনুদান) করতে চাও (তা করতে পার)। এটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।”

(الف) اكتب سبب نزول الآية- (আয়াতটির শান-ই-নুযূল)

মুফাসসিরগণের মতে, এই আয়াতটির অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে দুটি ঐতিহাসিক যুগান্তকারী সামাজিক পটভূমি রয়েছে:

  1. তাবুক যুদ্ধের আহ্বান ও জীবনের চেয়ে নবীর প্রাধান্য: রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন চরম গ্রীষ্মে দূরবর্তী তাবুক যুদ্ধের ডাক দেন, তখন কিছু লোক নিজেদের শারীরিক আরাম ও পরিবারের মায়ায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়। আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করে জানিয়ে দেন যে, একজন মুমিনের নিকট স্বীয় জান, মাল ও পরিবারের চেয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ ও সন্তুষ্টি শতগুণ অগ্রগণ্য। তিনি মুমিনদের পার্থিব ও পরকালীন উভয় জাহানের পরম হিতাকাঙ্ক্ষী।
  2. ভ্রাতৃত্বভিত্তিক মিরাস বাতিল ও রক্তসম্পর্কীয় মিরাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা: হিজরতের পর মদীনার আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে রাসুলুল্লাহ ﷺ যে ঐতিহাসিক ‘মুওয়াখাত’ বা ভ্রাতৃত্ব চুক্তি করেছিলেন, তার ভিত্তিতে রক্তসম্পর্ক ছাড়াই একে অপরের সম্পদের উত্তরাধিকারী হতো। কিন্তু ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মাধ্যমে সেই জরুরি সাময়িক নিয়মটি মানসূখ (রহিত) করেন এবং ঘোষণা দেন যে, উত্তরাধিকার সম্পত্তি কেবল রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়রাই (উলুল আরহাম) পাবে; তবে অসিয়তের মাধ্যমে অ-আত্মীয়দের অনূর্ধ্ব এক-তৃতীয়াংশ প্রদান বৈধ রাখা হয়।

(ب) تحدث عن فضل أمهات المؤمنين مع أسمائهن- (উম্মাহাতুল মুমিনীনের ফযীলত ও পবিত্র নামসমূহ)

১. উম্মাহাতুল মুমিনীনের মর্যাদা ও ফযীলত:

  • আধ্যাত্মিক মাতৃত্ব ও সম্মান: আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবীজীর পুণ্যবতী স্ত্রীদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিনের ‘মাতা’ (أمّهاتهم) ঘোষণা করেছেন। এটি সম্মান, শ্রদ্ধা এবং চিরতরে বিবাহ হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নবীজীর ওফাতের পর তাঁদের বিবাহ করা উম্মতের জন্য চিরতরে হারাম করা হয়েছিল।
  • দ্বিগুণ প্রতিদান: তাঁরা যদি তাকওয়া অবলম্বন করেন, তবে সাধারণ নারীদের চেয়ে দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন (সূরা আল-আহযাব: ৩১)।
  • নববী সুন্নাহর সংরক্ষক: নবীজীর অভ্যন্তরীণ পারিবারিক জীবন ও শারঈ গোপন বিধানাবলি উম্মতের নিকট বিশ্বস্ততার সাথে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে উম্মাহাতুল মুমিনীন, বিশেষত হযরত আয়েশা ও উম্মে সালামাহ (রা.)-এর অবদান অবিস্মরণীয়।

২. উম্মাহাতুল মুমিনীনগণের পবিত্র নামসমূহ (মোট ১১ জন):

  1. হযরত খাদীজাহ বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.): প্রথম স্ত্রী, ইসলামের প্রথম ঈমানদার ও সর্বশ্রেষ্ঠ ত্যাগী নারী।
  2. হযরত সাওদাহ বিনতে যামআ (রা.): খাদীজা (রা.)-এর ওফাতের পর বিবাহিত বয়োজ্যেষ্ঠ ও ত্যাগী সাহাবী।
  3. হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বা বিনতে আবি বকর (রা.): সর্বাধিক ইলম ও ফিকহের অধিকারী প্রখ্যাত ফকীহা নারী।
  4. হযরত হাফসাহ বিনতে উমর (রা.): কুরআন সংকলনের মূল পাণ্ডুলিপির আমানতদার।
  5. হযরত যয়নব বিনতে খুযায়মাহ (রা.): দানশীলতার কারণে যাঁকে ‘উম্মুল মাসাকীন’ বলা হতো।
  6. হযরত উম্মে সালামাহ [হিন্দ বিনতে আবি উমাইয়্যাহ] (রা.): প্রজ্ঞাবান ও রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নারী।
  7. হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রা.): স্বয়ং আল্লাহ তাআলা আসমানে যাঁর বিবাহ সম্পন্ন করেছিলেন।
  8. হযরত জুওয়াইরিয়াহ বিনতে আল-হারিস (রা.): যাঁর বিবাহের উসিলায় এক গোত্রের শত শত যুদ্ধবন্দী মুক্তি পেয়েছিল।
  9. হযরত উম্মে হাবীবা [রমলা বিনতে আবি সুফিয়ান] (রা.): হাবশায় হিজরতকারী ও দ্বীনের ওপর পাহাড়সম অবিচল নারী।
  10. হযরত সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই (রা.): হারুন (আ.)-এর বংশধর ও সম্মানিত পুণ্যবতী।
  11. হযরত মাইমূনাহ বিনতে আল-হারিস (রা.): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের সর্বশেষ বিবাহিত স্ত্রী।

٨- قوله تعالى: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ ۝ وَاعْلَمُوا أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ اللَّهِ ۚ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِّنَ الْأَمْرِ لَعَنِتُّمْ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ﴾ [الحجرات: ৬-৭]

“হে মুমিনগণ! কোনো পাপাচারী (ফাসিক) যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই-বাছাই করে পরীক্ষা কর; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের অনিষ্ট করে না বস, যার ফলে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হতে হয়। আর জেনে রাখ, তোমাদের মাঝে আল্লাহর রাসূল রয়েছেন; তিনি যদি অধিকাংশ বিষয়ে তোমাদের কথা মেনে নিতেন তবে তোমরাই বিপদে পড়তে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন; আর কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে তোমাদের নিকট অপ্রিয় করেছেন। এরাই তো সত্যপথপ্রাপ্ত।”

(الف) ما معنى الفاسق؟ هل يعتبر خبر الفاسق فى المعاملات كالوكالات والمضاربات؟ بين موضحا- (ফাসিকের অর্থ এবং বৈষয়িক লেনদেনে ফাসিকের সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা)

১. ফাসিক (الفاسق)-এর অর্থ:

‘ফিসক্ব’ (الفسق) শব্দের মূল অর্থ খোসা থেকে বের হয়ে যাওয়া (যেমন খেজুর পেকে খোসা ভেদ করে বের হওয়া)। শরীয়তের পরিভাষায়, যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের গণ্ডি থেকে বের হয়ে প্রকাশ্য কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয় অথবা ক্রমাগত সগিরা গুনাহ করতে থাকে এবং তাওবা করে না, তাকে ‘ফাসিক’ বলা হয়।

২. লেনদেন ও মুআমালাতে (ওকালাত ও মুদারাবা) ফাসিকের সংবাদ:

ফিকহশাস্ত্রে সংবাদ (খবর) দুই প্রকার:

  • খবরুদ দিয়ানাত (ধর্মীয় সংবাদ) ও শাহাদাত (বিচারালয়ের সাক্ষ্য): ফাসিকের সাক্ষ্য বিচারালয়ে কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং বাতিল।
  • খবরুল মুআমালাত (বৈষয়িক লেনদেন সংক্রান্ত সংবাদ): হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, সাধারণ লেনদেন যেমন—ক্রয়-বিক্রয়, হাদিয়া পৌঁছানো, অনুমতি প্রার্থনা, ওকালাত (প্রতিনিধিত্ব) এবং মুদারাবার মতো বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে ফাসিকের সংবাদ গ্রহণ করা বৈধ ও কার্যকর।
    • যুক্তি: ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম জাসসাস (রহ.) বলেন, সমাজে প্রচুর মানুষ রয়েছে যারা ব্যক্তিগত জীবনে তাকওয়ার ত্রুটিতে ফাসিক কিন্তু পার্থিব লেনদেনে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত। বৈষয়িক লেনদেনে যদি কেবল দ্বীনদার ও পরহেযগার আদিল ব্যক্তির সাক্ষ্য শর্ত করা হয়, তবে মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবন চরম সংকটে পড়বে।
    • তবে যদি ফাসিকের কথার মধ্যে স্পষ্ট ধোঁকা বা মিথ্যার জোরালো আলামত থাকে, তবে সতর্কতা হিসেবে যাচাই করা ওয়াজিব।

(ب) بين شروط قبول خبر الواحد مفصلا- (খবরে ওয়াহিদ কবুলের শর্তাবলি)

উসূলুল ফিকহে যে হাদীস বা সংবাদ মুতাওয়াতির স্তরে পৌঁছেনি তাকে ‘খবরে ওয়াহিদ’ বলে। এটি আমলের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য জমহুর উলামা ও বিশেষভাবে হানাফী উসূলবিদগণ কঠোর শর্তাবলি নির্ধারণ করেছেন:

  1. বর্ণনাকারীর সাধারণ শর্তাবলি (শাফেয়ী ও জমহুর উসূল):
    • আল-আকল (العقل): বর্ণনাকারীকে সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে।
    • আল-ইসলাম (الإسلام): মুসলিম হতে হবে। কাফিরের বর্ণনা দ্বীনের বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নয়।
    • আল-বুলূগ (البلوغ): প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে (যদিও নাবালেগ অবস্থায় শোনা হাদীস বালেগ হওয়ার পর বর্ণনা করা যায়)।
    • আল-আদালাত (العدالة): মুত্তাকী ও কবিরা গুনাহমুক্ত হতে হবে।
    • আদ-দাব্ত্ব (الضبط): প্রখর স্মরণশক্তি বা লিখিত পাণ্ডুলিপির নিখুঁত হেফাজতকারী হতে হবে।
  2. হানাফী উসূলের বিশেষ অতিরিক্ত শর্তাবলি (ইমাম আবু হানিফা ও জাসসাস):
    • উমুমুল বালওয়া-এর পরিপন্থী না হওয়া: যে মাসআলাটি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে বারবার ঘটে (যেমন: নামাজের রুকুতে হাত তোলা, ওযুর নিয়ম), সে বিষয়ে কেবল একজন বা দুজন ব্যক্তির বর্ণিত বিচ্ছিন্ন খবরে ওয়াহিদ দিয়ে ওয়াজিব বা ফরজ সাব্যস্ত করা যাবে না; কারণ এমন বিষয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়াই স্বাভাবিক ছিল।
    • রাবীর নিজস্ব আমলের বিপরীত না হওয়া: বর্ণনাকারী স্বয়ং যদি তাঁর বর্ণিত হাদীসের বিপরীতে আমল করেন, তবে তাঁর আমলকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং রেওয়ায়েতটি মানসূখ বা রহিত ধরা হবে (যেমন: আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত পাত্রে কুকুর মুখ দিলে সাতবার ধোয়ার বিপরীতে তাঁর তিনবার ধোয়ার আমল)।
    • কুরআনের সাধারণ বিধান ও সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাহর বিরোধী না হওয়া: খবরে ওয়াহিদ কুরআনের কোনো প্রকাশ্য হুকুমকে রদবদল বা রহিত করতে পারবে না।
    • কিয়াসের বিপরীতে অপ্রসিদ্ধ রাবীর রেওয়ায়েত: যদি রাবী ফকীহ না হন এবং তাঁর বর্ণনাটি প্রতিষ্ঠিত সুসংগত কিয়াসের বিপরীত হয়, তবে কিয়াসকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বিভাগ ‘খ’ : সংবিধিবদ্ধ প্রশ্নাবলি (যেকোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক)

٩- ما المراد بأحكام القرآن؟ بين نشأته وتطوره وأنواعه مفصلا-

মূল প্রশ্নের তাৎপর্য: উলূমুল কুরআন ও ফিকহুল ইসলামী শাস্ত্রের মিলনস্থল হলো ‘আহকামুল কুরআন’। নিম্নে এর সংজ্ঞা, উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং প্রকারভেদ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. আহকামুল কুরআন (أحكام القرآن)-এর সংজ্ঞা:

‘আহকাম’ হলো ‘হুকুম’-এর বহুবচন, যার অর্থ নির্দেশ, নিষেধ বা বিধান। আর ‘আল-কুরআন’ হলো আল্লাহর অবতীর্ণ কালাম। পারিভাষিক সংজ্ঞায়: «هُوَ عِلْمٌ يَبْحَثُ فِي اسْتِنْبَاطِ الأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ العَمَلِيَّةِ مِنْ آيَاتِ القُرْآنِ الكَرِيمِ، مَعَ بَيَانِ طُرُقِ الدَّلَالَةِ وَالقَوَاعِدِ الأُصُولِيَّةِ»—অর্থাৎ এটি এমন এক শাস্ত্র, যা পবিত্র কুরআনের আয়াতুল আহকাম থেকে ব্যবহারিক শারঈ বিধানাবলি উদ্ভাবন এবং তার দালালাত ও উসূলী মূলনীতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করে।

২. আহকামুল কুরআন শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:

  1. নবুওয়াত যুগ: সাহাবায়ে কেরাম কোনো আয়াত অবতীর্ণ হলে সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট তার ফিকহী প্রায়োগিক বিধান জেনে নিতেন। যেমন—সালাত, যাকাত ও হজের বিধান।
  2. সাহাবা ও তাবেয়ী যুগ: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর উমর, আলী, ইবনে মাসউদ ও ইবনে আব্বাস (রা.) কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ করে নতুন উদ্ভূত সমস্যার সমাধান দিতেন। তাবেয়ীগণের যুগে কুফা ও মদীনা কেন্দ্রে আয়াতুল আহকামের ইস্তিম্বাত চর্চা ব্যাপক বিস্তার লাভ করে।
  3. দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দী (সংকলন যুগ): ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সর্বপ্রথম ‘আহকামুল কুরআন’ শিরোনামে গ্রন্থ রচনা করেন বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এরপর ইমাম কাযী আবু ইসহাক ইসমাঈল ইবনে ইসহাক আল-মালেকী এবং ইমাম তহাবী (রহ.) গ্রন্থ রচনা করেন।
  4. চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দী (মাযহাবী ক্লাসিকাল যুগ): এই যুগে প্রতিটি মাযহাবের শীর্ষ উসূলবিদগণ স্ব স্ব মাযহাবের দলিল ও ইস্তিম্বাত সমৃদ্ধ করে অমর গ্রন্থ রচনা করেন। হানাফী মাযহাবে ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (মৃত ৩৭০ হি.), শাফেয়ী মাযহাবে ইমাম কিয়া আল-হাররাসী (মৃত ৫০৪ হি.), এবং মালেকী মাযহাবে কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী (মৃত ৫৪৩ হি.) এবং ইমাম কুরতুবী (মৃত ৬৭১ হি.) কালজয়ী তাফসীর রচনা করেন।

৩. আহকামুল কুরআনের প্রকারভেদ (أنواع أحكام القرآن):

কুরআনুল কারীমে বর্ণিত সামগ্রিক বিধানাবলিকে ফকীহগণ প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করেছেন:

  • ১. আহকাম ই’তিক্বাদী বা বিশ্বাসগত বিধান (الأحكام الاعتقادية): যা মানুষের আকিদা ও বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত; যেমন: আল্লাহর অস্তিত্ব, তাওহীদ, সিফাত, ফেরেশতা, কিতাব, নবী-রাসূল ও পরকালের প্রতি ঈমান। একে ‘ইলমুল কালাম’ বলা হয়।
  • ২. আহকাম খুলুক্বী বা নৈতিক বিধান (الأحكام الخلقية): যা মানুষের আত্মিক পবিত্রতা ও চরিত্র গঠনের সাথে সম্পৃক্ত; যেমন: সত্যবাদিতা, ধৈর্য, ইনসাফ, বদান্যতা এবং অহংকার, হিংসা ও লোভ বর্জন। একে ‘ইলমুত তাসাউউফ’ বা নীতিশাস্ত্র বলা হয়।
  • ৩. আহকাম আমালী বা ব্যবহারিক বিধান (الأحكام العملية): যা মানুষের দৈনন্দিন কর্ম ও আচরণের সাথে সম্পৃক্ত। এটিই মূল ফিকহুল কুরআন। এটি পুনরায় দুই ভাগে বিভক্ত:
    • ইবাদাত (العبادات): বান্দা ও তার স্রষ্টার মধ্যকার সম্পর্ক (সালাত, সওম, যাকাত, হজ, তাহারাত)।
    • মুআমালাত (المعاملات): মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক (পারিবারিক আইন, বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, দেওয়ানি চুক্তি, ক্রয়-বিক্রয়, ফৌজদারি দণ্ডবিধি, আন্তর্জাতিক আইন ইত্যাদি)।

١٠- اكتب نبذة عن حياة أبي بكر الجصاص ثم بين خصائص أحكام القرآن له-

মূল প্রশ্নের তাৎপর্য: হানাফী উসূল ও ফিকহের সর্বশ্রেষ্ঠ ইমামগণের অন্যতম ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত এবং তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আহকামুল কুরআন’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

১. ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.)-এর জীবনচরিত:

  • নাম ও পরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম আহমদ ইবনে আলী আর-রাযী। কুনিয়াত ‘আবু বকর’ এবং উপাধি ‘আল-জাসসাস’ (الجصاص – চুন বা জিপসাম প্রস্তুতকারক পরিবারের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে এই নাম)। তিনি ৩০৫ হিজরীতে পারস্যের বিখ্যাত ‘রে’ (Rayy) নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।
  • শিক্ষা ও শিক্ষকগণ: তিনি হিজরী ৩২৫ সনে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বাগদাদে আগমন করেন। তিনি হানাফী মাযহাবের তৎকালীন প্রধান ইমাম আবুল হাসান আল-কারখী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘকাল ফিকহ ও উসূল শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি আহওয়ায ও নিশাপুরে গিয়ে হাদীস ও উলূমুল কুরআনের শীর্ষ পণ্ডিতদের নিকট শিক্ষা লাভ করেন।
  • বাগদাদের প্রধান মুফতী ও শিক্ষকতা: ইমাম কারখীর ওফাতের পর বাগদাদের প্রধান হানাফী ফিকহী সার্কেলের শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়। তিনি রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা ও বিচারপতির (কাযীর) পদ একাধিকবার প্রস্তাব পেলেও যুহদ ও পরহেযগারীর কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং আজীবন শিক্ষাদান ও গ্রন্থ রচনায় মগ্ন থাকেন।
  • গ্রন্থাবলি ও অবদান: তাঁর রচিত অমর গ্রন্থাবলির মধ্যে আহকামুল কুরআন, উসূলুল ফিকহ (যা আল-ফুসূল ফিল উসূল নামে খ্যাত), শরহু জামিউস সাগীর, শরহু আদাবুল কাযী লিল খাসসাফ অন্যতম।
  • ওফাত: ৩৭০ হিজরীর ৬ জিলহজ রবিবারে বাগদাদে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই সমাহিত হন।

২. ইমাম জাসসাস প্রণীত ‘আহকামুল কুরআন’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য বিশ্বকোষ: এটি হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রচিত সর্বপ্রাচীন, সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য ও মৌলিক আহকামুল কুরআন গ্রন্থ। হানাফী ফিকহের কোনো মাসআলার কুরআনভিত্তিক দলিল অনুসন্ধানে এটি প্রধানতম দলিল।
  2. উসূল ও ফিকহের বাস্তব প্রয়োগ: জাসসাস কেবল ফিকহী মাসআলা উল্লেখ করেননি; বরং তিনি তাঁর নিজের প্রণীত উসূলুল ফিকহের গ্রন্থ ‘আল-ফুসূল ফিল উসূল’-এর সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলি (আম, খাস, মুজমাল, মুফাসসার, নাসিখ-মানসূখ) ব্যবহার করে প্রতিটি আয়াতের শারঈ বিধান উদ্ভাবনের যুক্তি বিশ্লেষণ করেছেন।
  3. সাহাবা ও তাবেয়ীদের রেওয়ায়েত সংকলন: তিনি ফিকহী ব্যাখ্যার সমর্থনে খুলাফায়ে রাশেদীন, ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ এবং হাসান বসরী, ইবরাহীম নাখঈর ফতোয়াসমূহ বিশদ সনদের সাথে উপস্থাপন করেছেন।
  4. ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণিক গভীরতা: তিনি আরবি ভাষার প্রাচীন অভিধান, ব্যুৎপত্তি ও ব্যাকরণের সূক্ষ্ম কায়দা প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন কেন হানাফী ফকীহগণ এই অর্থ গ্রহণ করেছেন।
  5. ভ্রান্ত ও বিরোধী মতের নিরপেক্ষ খণ্ডন: মু’তাযিলাদের ভ্রান্ত আকিদা এবং অন্যান্য মাযহাবের ফকীহগণের মতভেদের ক্ষেত্রে তিনি তীব্র যুক্তি ও দলিলে সমৃদ্ধ হয়ে বস্তুনিষ্ঠ একাডেমিক পর্যালোচনা করেছেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

  1. প্রশ্ন: আহকামুল কুরআন পাঠের প্রধান লক্ষ্য কী?
    উত্তর: কুরআনের বিধানসংক্রান্ত আয়াতসমূহ (আয়াতুল আহকাম) থেকে ইজতিহাদ ও উসূলী কায়দা প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবহারিক জীবনের শারঈ আইন ও ফিকহী মাসআলা উদ্ভাবন করা।
  2. প্রশ্ন: ব্যভিচারের শাস্তিতে কি মসজিদে বেত্রাঘাত বা হদ কার্যকর করা যাবে?
    উত্তর: না; চার মাযহাবের সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী মসজিদে হদ বা কিসাসের কোনো দণ্ড কার্যকর করা মাকরূহে তাহরীমী বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; এর জন্য উন্মুক্ত প্রান্তর বা বিচারালয়ের নির্ধারিত স্থান নির্দিষ্ট।
  3. প্রশ্ন: সূরা আন-নূরের ‘ইফক’ সংক্রান্ত আয়াতের প্রধান শিক্ষা কী?
    উত্তর: কোনো ব্যক্তির চরিত্র হনন ও যাচাইহীন অপবাদ প্রচার করা কবিরা গুনাহ এবং সমাজে এমন ফেতনা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা ঈমানের দাবি।
  4. প্রশ্ন: বৈষয়িক লেনদেনে (মুআমালাত) ফাসিকের সংবাদ গ্রহণ করা কি জায়েয?
    উত্তর: হ্যাঁ, হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী মানবিক জটিলতা দূরীকরণে ওকালাত, ক্রয়-বিক্রয় ও মুদারাবার মতো আর্থিক লেনদেনে ফাসিকের সংবাদ শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর।
  5. প্রশ্ন: ইসমাতুল আম্বিয়া বলতে কী বোঝায়?
    উত্তর: ওহী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এবং সর্বপ্রকার কবিরা ও ঘৃণ্য পাপ থেকে আল্লাহ কর্তৃক নবী-রাসূলগণকে অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও মুক্ত রাখাকে ইসমাতুল আম্বিয়া বলে।
  6. প্রশ্ন: ইমাম জাসসাসের ‘আহকামুল কুরআন’-এর প্রধান স্বাতন্ত্র্য কী?
    উত্তর: এটি হানাফী মাযহাবের উসূল ও ফিকহের আলোকে আয়াতুল আহকামের এমন এক প্রামাণ্য বিশ্লেষণ, যেখানে ব্যাকরণ, হাদীসের সনদ ও যৌক্তিক ইস্তিম্বাতের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

উপসংহার ও পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা

ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাযিল সম্মান ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আহকামুল কুরআন’ (বিষয় কোড: ২০১৪০২) প্রশ্নপত্রটি অত্যন্ত উচ্চমানসম্পন্ন ও আইনতত্ত্বমূলক। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষার্থীদের সাধারণ অনুবাদের পরিবর্তে প্রতিটি আয়াতের সংশ্লিষ্ট ফিকহী পরিভাষা, ইমাম জাসসাস ও অন্যান্য ফকীহদের উসূলী দলিল, নাসিখ-মানসূখের প্রেক্ষাপট এবং মাযহাবী মতভেদের তুলনামূলক পয়েন্টগুলো খাতার উপস্থাপনায় ফুটিয়ে তোলা অপরিহার্য। এই সমাধানের প্রতিটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ প্রশ্নের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিকে পূর্ণাঙ্গ ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করবে ইনশাআল্লাহ।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜