ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২১
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তারীখুল ইসলামী (التاريخ الإسلامي – ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা)
বিষয় কোড: 201403 | প্রশ্নপত্র কোড: 149
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ভূমিকা ও পাঠ্যক্রম পরিচিতি
ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU)-এর ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের পাঠ্যক্রমের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ও রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসতত্ত্ব বিষয়ক বিষয় হলো ‘আত-তারীখুল ইসলামী’ (التاريخ الإسلامي – Islamic History), যার প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় কোড ২০১৪০৩। ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ শাসনব্যবস্থা, উমাইয়া ও আব্বাসীয় খেলাফতের উত্থান-পতন, স্পেনে মুসলিম শাসন ও সভ্যতার স্বর্ণযুগ, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ফিকহী অবদান, উসমানীয় খেলাফতের কুসতানতিনিয়া (কনস্টান্টিনোপল) বিজয় এবং সিন্ধু ও বাংলায় ইসলামের আগমন—এই পাঠ্যসূচির কেন্দ্রীয় বিষয়। ২০২১ শিক্ষাবর্ষের এই প্রশ্নপত্রে ইতিহাসের এই সকল সন্ধিক্ষণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি সংযোজিত হয়েছে। নিম্নে উক্ত প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্ন ও উপ-প্রশ্নের বিশদ, বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যসমৃদ্ধ একাডেমিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
বিভাগ ‘ক’ : রচনামূলক প্রশ্নাবলি (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক)
١- ماذا تفهم عن الخلفاء الراشدين؟ بين التنظيم الإداري للخلفاء الراشدين-
[খোলাফায়ে রাশেদীন বলতে কী বুঝ? খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসন পদ্ধতি বর্ণনা কর।]
১. খোলাফায়ে রাশেদীন (الخلفاء الراشدون)-এর পরিচয় ও তাৎপর্য:
ক. শাব্দিক অর্থ: ‘আল-খুলাফা’ (الخلفاء) হলো ‘খলীফা’ (خليفة)-এর বহুবচন, যার অর্থ প্রতিনিধি, স্থলাভিষিক্ত বা উত্তরাধিকারী। আর ‘আর-রাশিদূন’ (الراشدون) হলো ‘রাশিদ’-এর বহুবচন, যার অর্থ সত্যপথপ্রাপ্ত, সৎপথপ্রদর্শক, ন্যায়পরায়ণ ও সুশাসক।
খ. পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামী ইতিহাসের পরিভাষায়, রাসূলে কারীম ﷺ-এর ওফাতের পর (১১ হিজরী/৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাত ও হযরত হাসান (রা.)-এর ক্ষমতা হস্তান্তর (৪০-৪১ হিজরী/৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত যে চারজন মহান সাহাবী নববী আদর্শে খেলাফতের দায়িত্ব পালন করে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, তাঁদেরকে ‘আল-খুলাফাউর রাশিদূন’ বলা হয়। তাঁরা হলেন:
- হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) [১১–১৩ হিজরী / ৬৩২–৬৩৪ খ্রি.]
- হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) [১৩–২৩ হিজরী / ৬৩৪–৬৪৪ খ্রি.]
- হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) [২৩–৩৫ হিজরী / ৬৪৪–৬৫৬ খ্রি.]
- হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) [৩৫–৪০ হিজরী / ৬৫৬–৬৬১ খ্রি.]
রাসূলে কারীম ﷺ ইরশাদ করেছেন: «عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ» [সুনানে আবু দাউদ, তিরমিযী] (তোমাদের ওপর আবশ্যক হলো আমার সুন্নাত এবং আমার সত্যপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা)।
২. খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো (التنظيم الإداري):
খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনব্যবস্থা কোনো রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্র ছিল না; বরং তা ছিল কুরআন ও সুন্নাহর সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত বিশ্বের প্রথম জনকল্যাণমূলক ও গণতান্ত্রিক খিলাফত। নিম্নে এর প্রধান প্রশাসনিক কাঠামো তুলে ধরা হলো:
- ১. মজলিসুশ শূরা বা পরামর্শ সভা (مجلس الشورى):
- শাসন পরিচালনার প্রধান স্তম্ভ ছিল ‘শূরা’ বা পারস্পরিক পরামর্শ। কুরআন নির্দেশ দেয়: ﴿وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ﴾ [الشورى: ৩৮]।
- মজলিসুশ শূরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল: ক. সাধারণ পরিষদ (المجلس العام): রাষ্ট্রের জরুরি সংকটে আনসার ও মুহাজিরদের সাধারণ সমাবেশ; খ. বিশেষ বা নির্বাহী পরিষদ (المجلس الخاص): শীর্ষ প্রবীণ সাহাবীগণের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা, যাদের পরামর্শ ছাড়া খলিফা কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না।
- ২. প্রাদেশিক শাসন ও গভর্নর নিয়োগ (الولايات والعمال):
- বিশাল সাম্রাজ্যকে সুশাসনের সুবিধার্থে বিভিন্ন প্রদেশে (যেমন: মক্কা, মদীনা, কুফা, বসরা, শাম, মিসর, ইয়েমেন, বাহরাইন) বিভক্ত করা হয়েছিল।
- প্রদেশের প্রধান প্রশাসককে ‘ওয়ালী’ (والي) বা ‘আমীর’ বলা হতো। গভর্নর নিয়োগের পূর্বে তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব লিখে নেওয়া হতো এবং প্রতি বছর হজের মৌসুমে সাধারণ জনগণের সামনে তাঁদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হতো।
- ৩. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা (استقلال القضاء):
- শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পৃথক করা হয়েছিল। হযরত উমর (রা.) হযরত শুরাইহ ও আবু মুসা আশআরী (রা.)-কে কাজী নিয়োগ করে ঐতিহাসিক নির্দেশনামা পাঠান। খলিফা স্বয়ং সাধারণ নাগরিকের মতো কাজীর আদালতে উপস্থিত হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতেন।
- ৪. বায়তুল মাল ও দেওয়ান ব্যবস্থা (بيت المال والديوان):
- জাতীয় রাজস্ব ও কেন্দ্রীয় কোষাগার হিসেবে ‘বায়তুল মাল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। হযরত উমর (রা.) সর্বপ্রথম ‘দেওয়ান’ (রেজিস্টার খাতা) চালু করে রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব এবং সকল নাগরিকের জন্য বয়সভিত্তিক ভাতার ব্যবস্থা করেন। আয়ের প্রধান উৎস ছিল যাকাত, উশর, জিযিয়া, খরাজ ও গনীমত।
- ৫. সামরিক সংগঠন ও ডাক বিভাগ (الجيش والبريد):
- স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন, সেনা ব্যারাক ও সেনানিবাস (যেমন: বসরা, কুফা, ফুসতাত) স্থাপন এবং দ্রুত সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য ‘বারীদ’ (ডাক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা) প্রতিষ্ঠা করা হয়।
- ৬. জনগণের জবাবদিহিতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা:
- যে কোনো সাধারণ নাগরিক খলিফাকে জুমার খুতবার মাঝে প্রশ্ন করতে পারত। হযরত উমর (রা.)-এর গায়ের জামার কাপড় নিয়ে এক সাধারণ বদরীর প্রশ্ন এবং খলিফার বিনীত উত্তর মানব ইতিহাসের শাসন ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।
٢- كيف استخلف أبو بكر رضي الله عنه؟ اكتب خدماته في الإسلام-
[আবু বকর (রা) কীভাবে খলিফা নির্বাচিত হয়েছিলেন? ইসলামে তাঁর অবদান লিপিবদ্ধ কর।]
১. হযরত আবু বকর (রা.)-এর খলিফা নির্বাচিত হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
- সাকীফা বনী সায়েদার সম্মেলন: রাসূলে কারীম ﷺ-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহ চরম শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। খাযরাজ গোত্রের আনসার সাহাবীগণ খিলাফতের নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য সাকীফা বনী সায়েদায় সমবেত হন এবং সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.)-কে নেতা বানানোর প্রস্তাব করেন।
- মুহাজিরদের আগমন ও ঐক্য প্রয়াস: এই সংবাদ পেয়ে হযরত আবু বকর, উমর ও আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.) সেখানে পৌঁছান। আনসারগণ প্রস্তাব দেন: «مِنَّا أَمِيرٌ وَمِنْكُمْ أَمِيرٌ» (আমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর হবেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে একজন আমীর হবেন)।
- হযরত আবু বকর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ: আবু বকর (রা.) পরম প্রজ্ঞার সাথে আনসারদের সীমাহীন ত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। অতঃপর তিনি আরবদের মনস্তত্ত্ব তুলে ধরে বলেন যে, নেতৃত্বের প্রশ্নে সমগ্র আরব কেবল কুরাইশদের ঐক্যবদ্ধ আনুগত্য মেনে নেবে। তিনি হযরত উমর ও আবু উবাইদাহর হাত ধরে তাঁদের যে কোনো একজনকে খলিফা নির্বাচনের প্রস্তাব দেন।
- হযরত উমর (রা.)-এর বাইয়াত ও যুক্তি: হযরত উমর (রা.) প্রত্যুত্তরে বলেন: ‘আল্লাহর শপথ! যার জীবদ্দশায় রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বয়ং সন্তুষ্টচিত্তে আমাদের নামাজের ইমামতির দায়িত্ব তাঁর ওপর সোপর্দ করেছিলেন (رضيه رسول الله لديننا، أفلا نرضاه لدنيانا؟), তাঁর উপস্থিতিতে অন্য কারো খলিফা হওয়া অসম্ভব।’ এই বলে উমর (রা.) সর্বপ্রথম আবু বকর (রা.)-এর হাতে আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করেন। উপস্থিত সকল আনসার ও মুহাজির সানন্দে বাইয়াত গ্রহণ করেন। পরদিন মসজিদে নববীতে সাধারণ বায়আত (البيعة العامة) সম্পন্ন হয়।
২. ইসলামে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর অমর অবদানসমূহ:
- ১. নবুওয়াতের সূচনালগ্নে আত্মত্যাগ ও সম্পদ দান: তিনি বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। উসমান, তালহা, যুবায়ের, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর মতো শীর্ষ সাহাবীগণ তাঁর দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হযরত বিলাল ও খাব্বাব (রা.)-সহ বহু নির্যাতিত ক্রীতদাসকে নিজ অর্থে ক্রয় করে মুক্ত করেন। তাবুক যুদ্ধে তিনি ঘরের সমস্ত মালসামান আল্লাহর রাস্তায় এনে দেন।
- ২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতকালে উম্মাহর সান্ত্বনা: নবীজীর ইন্তেকালে উমর (রা.) তরবারি হাতে নিয়েছিলেন। আবু বকর (রা.) ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে উম্মাহকে অটল রাখেন: «أَلَا مَنْ كَانَ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ، وَمَنْ كَانَ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَيٌّ لَا يَمُوتُ»।
- ৩. মুরতাদ ও ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে আপসহীন জিহাদ (حروب الردة): নবীজীর ওফাতের পর আরবের বিভিন্ন গোত্রে ধর্মত্যাগ (রিদ্দাহ), যাকাত অস্বীকার এবং মুসায়লামা কাযযাব, আসওয়াদ আনসী, তুলাইহা, সাজাহ প্রমুখ ভণ্ড নবীদের ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আবু বকর (রা.) গর্জে উঠে বলেন: ‘দ্বীনের একটি ছাগলের দড়িও যদি কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে আমি একাকী হলেও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।’ তিনি খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে ১১টি সেনাদল পাঠিয়ে সমগ্র আরব উপদ্বীপকে ফিতনামুক্ত করেন।
- ৪. উসামা বাহিনীর প্রেরণ: অভ্যন্তরীণ মহা সংকট সত্ত্বেও নবীজীর অন্তিম ইচ্ছা পূরণে রোমানদের বিরুদ্ধে হযরত উসামা ইবনে যায়েদের বাহিনীকে প্রেরণ করেন, যা ইসলামের শক্তি ও স্থায়িত্ব বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করে।
- ৫. পবিত্র কুরআনের প্রথম রাষ্ট্রীয় সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধে শত শত হাফেযে কুরআন শহীদ হলে হযরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে পবিত্র কুরআনকে প্রথম গ্রন্থাকারে (মুসহাফ) সংকলন করান।
- ৬. রোম ও পারস্য বিজয়ের সূচনা: আরবের সীমানা পেরিয়ে তিনি ইরাক ও শাম বিজয়ের লক্ষ্যে খালেদ বিন ওয়ালিদ ও আবু উবাইদাহ (রা.)-কে পাঠান, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বজয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
٣- اذكر أسباب سقوط الدولة الأموية موضحا-
[উমাইয়া সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ কর।]
মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক ৪১ হিজরীতে প্রতিষ্ঠিত উমাইয়া খেলাফত প্রায় এক শতাব্দী (৬৬১–৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) শাসন করার পর ১৩২ হিজরীতে পতনের মুখে পতিত হয়। একটি বিশাল সাম্রাজ্যের এই আকস্মিক পতনের পেছনে বহুমুখী রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কার্যকর ছিল:
- বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও উত্তরাধিকার সংঘাত: খেলাফতের গণতান্ত্রিক ‘শূরা’ পদ্ধতি বাতিল করে খলিফা মনোনীত করার বংশানুক্রমিক রাজতান্ত্রিক ধারা চালু করা হয়। পরবর্তী উমাইয়া খলিফাগণ একাধিক ব্যক্তিকে একযোগে উত্তরাধিকারী (ওয়ালীউল আহাদ) মনোনীত করায় রাজপরিবারের ভেতরেই ক্ষমতা দখলের ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়।
- মায়ালী বা অনারব মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি: ইরান, মেসোপটেমিয়া, মধ্য এশিয়া ও মিসরের যেসব অনারব নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদেরকে ‘মায়ালী’ (الموالي) বলা হতো। আরব জাতীয়তাবাদী উমাইয়া শাসকগণ তাদেরকে সমান মর্যাদা দেয়নি; বরং তাঁদের ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে ইসলাম গ্রহণের পরেও জিযিয়া করের বোঝা চাপিয়ে রাখা হতো। এতে অনারবদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
- কায়সী ও ইয়েমেনী গোত্রীয় দ্বন্দ্বের পুনরুজ্জীবন: জাহেলী যুগের প্রাচীন গোত্রীয় কলহ মুদারী (কায়সী বা উত্তর আরবীয়) এবং কাহতানী (ইয়েমেনী বা দক্ষিণ আরবীয়দের) মধ্যে নতুন করে উস্কে ওঠে। কোনো খলিফা কায়সীদের তোষণ করতেন, আবার কোনো খলিফা ইয়েমেনীদের তোষণ করতেন। এই গোত্রীয় হানাহানি উমাইয়া সামরিক শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
- কারবালা ট্র্যাজেডি ও আহলে বাইতের প্রতি নির্দয় আচরণ: ৬১ হিজরীতে কারবালার প্রান্তরে নবী দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের নির্মম শাহাদাত এবং মক্কা ও মদীনায় ইয়াযীদের বাহিনীর আক্রমণ সমগ্র মুসলিম জাহানের মনস্তত্ত্বে উমাইয়াদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। সাধারণ মুসলমানরা তাঁদেরকে ন্যায়সঙ্গত খলিফা মনে করত না।
- পরবর্তী খলিফাদের বিলাসিতা ও অযোগ্যতা: হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)-এর মতো মুজাদ্দিদ খলিফা ছাড়া পরবর্তী অধিকাংশ উমাইয়া শাসক—যেমন দ্বিতীয় ইয়াযীদ, দ্বিতীয় ওয়ালীদ চরম বিলাসিতা, শিকার, গান-বাজনা ও অপচয়ে মত্ত ছিলেন। ফলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
- সুসংগঠিত আব্বাসীয় দাওয়াত ও প্রোপাগান্ডা: আব্বাসীয় বংশধররা ‘আহলে বাইতের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ (الرضا من آل محمد)-এর আকর্ষণীয় স্লোগান তুলে খোরাসান ও পারস্যে এক গোপন অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী বিপ্লবের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
- আবু মুসলিম খোরাসানীর সামরিক অভ্যুত্থান ও যাবের যুদ্ধ: বিপ্লবী সেনাপতি আবু মুসলিম খোরাসানীর নেতৃত্বে কৃষ্ণ পতাকা নিয়ে আব্বাসীয় বাহিনী অগ্রসর হয়। ১৩২ হিজরীতে (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ঐতিহাসিক ‘যাবের যুদ্ধে’ (معركة الزاب) উমাইয়াদের সর্বশেষ খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ান শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং দামেস্ক পতনের মাধ্যমে উমাইয়া খেলাফতের অবসান ঘটে।
٤- اذكر مآثر الخليفة هارون الرشيد كحاكم الدولة-
[শাসক হিসেবে খলিফা হারুন অর-রশিদ এর কৃতিত্ব পর্যালোচনা কর।]
আব্বাসীয় খেলাফতের পঞ্চম খলিফা হারুন অর-রশিদ (১৭০–১৯৩ হিজরী / ৭৮৬–৮০৯ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের এক কিংবদন্তি শাসক। তাঁর শাসনকালকে ইসলামের ইতিহাসের ‘স্বর্ণযুগ’ (العصر الذهبي) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একজন দূরদর্শী ও সার্বভৌম শাসক হিসেবে তাঁর প্রধান কৃতিত্বসমূহ নিম্নরূপ:
- ১. জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ‘বাইতুল হিকমাহ’ প্রতিষ্ঠা:
- হারুন অর-রশিদ বাগদাদে বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও অনুবাদ প্রতিষ্ঠান ‘বাইতুল হিকমাহ’ (دار الحكمة / بیت الحكمة)-এর ভিত্তি স্থাপন করেন।
- তিনি গ্রিক, পারসিক, সংস্কৃত ও সিরিয়াক ভাষার চিকিৎসা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের গ্রন্থাবলি আরবিতে অনুবাদের ব্যবস্থা করেন এবং অনুবাদকদের স্বর্ণ দিয়ে পুরস্কৃত করতেন।
- ২. সুবিচার ও অর্থনৈতিক সংস্কার (ইমাম আবু ইউসুফের ‘কিতাবুল খরাজ’):
- তিনি প্রজাদের ওপর আরোপিত অন্যায্য কর বিলোপ করে ইমাম আবু হানিফার প্রধান শিষ্য কাযীুল কুযাত ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-কে দিয়ে ইসলামী অর্থনীতির প্রথম বিধিবদ্ধ সংবিধান ‘কিতাবুল খরাজ’ (كتاب الخراج) রচনা করান। ফলে রাজস্ব আদায়ে জুলুম বন্ধ হয় এবং জাতীয় অর্থনীতি ফুলেফেঁপে ওঠে।
- ৩. বাগদাদের নগর উন্নয়ন ও ‘আরব্য রজনী’র রূপকথা:
- তাঁর যুগে বাগদাদ পৃথিবীর বৃহত্তম বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। হাসপাতাল, গবেষণাগার, পাঠাগার, প্রশস্ত সড়ক, খাল খনন এবং সুরম্য সেতু নির্মাণ করে তিনি প্রজাদের জীবনমানকে চরম সমৃদ্ধিতে উন্নীত করেন। বিশ্বখ্যাত ‘সহস্র এক রজনী’ (আলিফ লায়লা ওয়া লায়লা) তাঁর সমৃদ্ধ যুগের পটভূমিতেই রচিত।
- ৪. আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্বদরবারে প্রতিপত্তি:
- ইউরোপের পরাশক্তি রোমান সম্রাট শার্লিমেন (Charlemagne)-এর সাথে তাঁর কূটনৈতিক মিত্রতা ছিল। তিনি শার্লিমেনকে একটি অত্যাধুনিক পানিচালিত ঘড়ি (Clepsydra) উপহার পাঠিয়েছিলেন, যা দেখে ইউরোপীয় দরবার স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। চীনের তাং রাজবংশের সাথেও তাঁর সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।
- ৫. রোমানদের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয়:
- বাইজেন্টাইন (রোমান) সম্রাট নাইসিফোরাস যখন উগ্র ভাষায় চিঠি লিখে বাৎসরিক কর প্রদান বন্ধের হুমকি দেয়, তখন হারুন অর-রশিদ চিঠির উল্টো পিঠে লিখেছিলেন: «مِنْ هَارُونَ أَمِيرِ المُؤْمِنِينَ إِلَى نَقْفُورَ كَلْبِ الرُّومِ، الجَوَابُ مَا تَرَاهُ لَا مَا تَسْمَعُهُ» (আমীরুল মুমিনীন হারুনের পক্ষ থেকে রোমের কুকুর নাইসিফোরাসের প্রতি; উত্তর তুমি নিজ চোখে দেখবে, কানে শুনবে না)। তিনি বিশাল বাহিনী নিয়ে হেরাক্লিয়া বিজয় করেন এবং রোমানদের কর প্রদানে বাধ্য করেন।
- ৬. ব্যক্তিগত ধার্মিকতা ও পরহেযগারী:
- তিনি প্রতি বছর এক বছর জিহাদে যেতেন এবং পরবর্তী বছর সাধারণ মানুষের সাথে পায়ে হেঁটে হজে যেতেন। প্রতিদিন নফল নামাজে ১০০ রাকাত সালাত আদায় করতেন এবং আলিম ও দরবেশদের অপরিসীম শ্রদ্ধা করতেন।
٥- تحدث عن قدوم المسلمين في الأندلس وانتشار الاسلام فيها مفصلا-
[স্পেনে মুসলমানদের আগমন এবং সেখানে ইসলাম বিস্তৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. স্পেনে মুসলমানদের আগমনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
- গথিক রাজাদের জুলুম ও আর্তনাদ: অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) খ্রিস্টান ভিসিগোথ রাজা রডারিকের (Roderic) নির্মম স্বৈরতন্ত্র চলছিল। সামন্তবাদী ভূস্বামী ও খ্রিষ্টান পাদ্রীরা সাধারণ প্রজাদের দাসে পরিণত করেছিল এবং ইহুদীদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত বা হত্যা করা হচ্ছিল।
- কাউন্ট জুলিয়ানের আবেদন: সিউটার গভর্নর কাউন্ট জুলিয়ানের কন্যা ফ্লোরিণ্ডা টলেডোর রাজদরবারে রডারিক কর্তৃক নিগৃহীতা হলে প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে জুলিয়ান উত্তর আফ্রিকার মুসলিম গভর্নর মুসা ইবনে নুসাইরের সাহায্য প্রার্থনা করেন।
- প্রাথমিক অভিযান: উমাইয়া খলিফা প্রথম ওয়ালীদের অনুমতিক্রমে ৭১০ খ্রিষ্টাব্দে তারিফ ইবনে মালিকের নেতৃত্বে চারশত সৈন্যের একটি সফল প্রাথমিক অনুসন্ধানী দল প্রেরিত হয়।
২. তারিক বিন যিয়াদ ও মুসলিম বিজয় অভিযান (৭১১ খ্রিষ্টাব্দ):
- জাবালুত তারিক ও ঐতিহাসিক অবতরণ: ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে বীর সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ (طارق بن زياد) সাত হাজার বার্বার ও আরব মুজাহিদ নিয়ে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করেন। যে পাহাড়ের পাদদেশে তিনি অবতরণ করেন, তাঁর নামানুসারে এর নাম হয় ‘জাবালুত তারিক’ (جبل طارق) বা জিব্রাল্টার।
- জাহাজ পোড়ানো ও অবিস্মরণীয় ভাষণ: অবতরণের পর তিনি সৈন্যদলের সমস্ত যুদ্ধজাহাজ জ্বালিয়ে দেন এবং মুজাহিদদের উদ্দেশে সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দেন: «أَيُّهَا النَّاسُ، أَيْنَ المَفَرُّ؟ البَحْرُ مِنْ وَرَائِكُمْ، وَالعَدُوُّ أَمَامَكُمْ، وَلَيْسَ لَكُمْ وَاللَّهِ إِلَّا الصِّدْقُ وَالصَّبْرُ» (হে লোকসকল! পলায়নের পথ কোথায়? পেছনে উত্তাল সমুদ্র, সামনে দুর্ধর্ষ শত্রু! আল্লাহর শপথ, সত্যনিষ্ঠা ও ধৈর্য ছাড়া তোমাদের আর কোনো অবলম্বন নেই)।
- গুয়াডালেটের যুদ্ধ (معركة وادي لكة): ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জুলাই রিও বারবেট নদীর তীরে রডারিকের এক লক্ষ সুসজ্জিত সেনার মুখোমুখি হন তারিকের বারো হাজার সৈন্য। এক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রডারিকের বাহিনী সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ হয় এবং রডারিক নদীতে ডুবে মারা যায়।
- দ্রুত বিজয় ও মুসা ইবনে নুসাইরের আগমন: তারিক একে একে কর্ডোভা, মালাগা ও রাজধানী টলেডো জয় করেন। এরপর ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে মুসা ইবনে নুসাইর আঠারো হাজার সৈন্য নিয়ে সেভিল ও মেরিডা জয় করে সমগ্র উপদ্বীপে ইসলামী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
৩. স্পেনে ইসলামের বিস্তার ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব:
- ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সমতা: মুসলমানরা খ্রিষ্টান ও ইহুদীদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়, গির্জা রক্ষা করে এবং ভূমিদাসদের জমির মালিকানা প্রদান করে। ইসলামি ন্যায়বিচারে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয় অধিবাসীরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। এদের বলা হতো ‘মুওয়াল্লাদুন’ (المُوَلَّدون)।
- কর্ডোভার উমাইয়া খিলাফত ও ইউরোপের আলোকবর্তিকা: আব্দুর রহমান আদ-দাখিল ১৩৮ হিজরীতে স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। কর্ডোভা হয়ে ওঠে ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের রাজধানী। সেখানে ৭০টি লাইব্রেরি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য সুবিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
- বিজ্ঞানের জাগরণ: ইবনে রুশদ (দর্শন), ইবনে ফারনাস (উড্ডয়নবিদ্যা), আল-যাহরাবী (শল্যচিকিৎসা), ইবনে বাজ্জাহ এবং ইবনে আরাবীর মাধ্যমে স্পেনের মুসলিম সভ্যতা অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপকে আধুনিক রেনেসাঁর আলো দেখায়। প্রায় আট শতাব্দী (৭১১–১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ) স্পেন বিশ্বসভ্যতার শীর্ষে অবস্থান করে।
٦- اكتب نبذة عن حياة الملك المغولى أورنك زيب ثم بين مساهمته في نشر الفقه الحنفى-
[মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের জীবনী সংক্ষেপে লেখ এবং ফিকহে হানাফির বিস্তারে তাঁর অবদান বর্ণনা কর।]
১. সম্রাট মুহিউদ্দীন আওরঙ্গজেব আলমগীর (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:
- জন্ম ও বংশপরিচয়: মোগল সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মপ্রাণ শাসক আওরঙ্গজেব ১০২৭ হিজরীর ১৫ জিলকদ (১৬১৮ খ্রিষ্টাব্দ) গুজরাটের দাহুদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন সম্রাট শাহজাহান এবং মাতা মমতাজ মহল। তাঁর উপাধি ছিল ‘মুহিউদ্দীন’ এবং রাজকীয় উপাধি ছিল ‘আলমগীর’ (বিশ্বজয়ী)।
- জ্ঞানার্জন ও ব্যক্তিগত চরিত্র: বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও গভীর দ্বীনদারির অধিকারী। তিনি সম্পূর্ণ কুরআন হিফয করেন এবং আরবি, ফারসি ও তুর্কি ভাষায় অসামান্য দখল অর্জন করেন। তিনি হাদিস, ফিকহ ও ক্যালিগ্রাফিতে পারদর্শী ছিলেন। তিনি কোনোদিন রাজকোষ (বায়তুল মাল) থেকে নিজের ব্যক্তিগত খরচের জন্য এক পয়সাও নিতেন না; বরং নিজের হাতে টুপি সেলাই করে এবং পবিত্র কুরআন স্বহস্তে লিখে তা বিক্রির অর্থে ব্যক্তিগত জীবিকা নির্বাহ করতেন।
- সিংহাসনে আরোহণ: ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ভাইদের সাথে উত্তরাধিকার যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তিনি দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং সুদীর্ঘ ৪৯ বছর (১৬৫৮–১৭০৭ খ্রি.) শাসন করেন। তাঁর আমলে মোগল সাম্রাজ্য উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে কর্ণাটক এবং পূর্বে চট্টগ্রাম/আসাম থেকে পশ্চিমে আফগানিস্তান পর্যন্ত সর্বকালের বৃহত্তম সীমানায় বিস্তৃত হয়।
- ওফাত: ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ ৮৯ বছর বয়সে আহমদনগরে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে ওসিয়ত অনুযায়ী মাত্র চৌদ্দ রুপির টুপি বিক্রির টাকায় মহারাষ্ট্রের খুলদাবাদে এক উন্মুক্ত মাটির কবরে এই মহান শাসককে সমাহিত করা হয়।
২. ফিকহে হানাফীর সম্প্রসারণ ও সুরক্ষায় অনন্য অবদান:
- সম্রাট আকবরের অনৈসলামিক ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র মূলোৎপাটন: মোগল দরবারে আকবরের প্রবর্তিত বিদআতী নীতি, ঝারোকা দর্শন, নওরোজ উৎসব, মদ্যপান ও জুয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন এবং বিশুদ্ধ সুন্নাত ও হানাফী শরীয়তের অনুশাসন রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
- মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামের বোর্ড গঠন: ভারতবর্ষে হানাফী মাযহাবের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ ফতোয়া ও বিচারিক নজিরকে সংকলিত করে একটি প্রামাণ্য একক আইনি সংহিতা তৈরির লক্ষ্যে তিনি সাম্রাজ্যের শীর্ষ ৫০০ জন প্রখ্যাত আলিম ও ফকীহ নিয়ে একটি সর্বোচ্চ বোর্ড গঠন করেন। এই বোর্ডের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন যুগের শীর্ষ ফকীহ শায়খ নিযामुদ্দীন বুরহানপুরী (রহ.)।
- বিশ্ববিখ্যাত ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’ (الفتاوى العالمجيرية) প্রণয়ন:
- দীর্ঘ আট বছরের নিরবচ্ছিন্ন গবেষণায় এবং রাজকোষের প্রায় দুই লক্ষ রূপি ব্যয়ে সংকলিত হয় হানাফী ফিকহের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রীয় আইনি বিশ্বকোষ ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’, যা আরব বিশ্বে ‘আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ’ (الفتاوى الهندية) নামে জগদ্বিখ্যাত।
- সম্রাট স্বয়ং প্রতিদিন বোর্ডের খসড়া পাণ্ডুলিপির প্রতিটি অধ্যায় গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ করতেন এবং নিজের ফিকহী প্রস্তাবনা দিতেন।
- বিচারালয়ে হানাফী আইনের বাধ্যতামূলক প্রয়োগ: তিনি সাম্রাজ্যের প্রতিটি নগর ও পরগনায় মুফতী ও কাযী নিয়োগ করেন এবং রায় প্রদানের ক্ষেত্রে কেবল ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’র বিধান অনুসরণের আইনি বাধ্যবাধকতা জারি করেন।
- মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা: তিনি লাহোরের সুবিশাল ঐতিহাসিক বাদশাহী মসজিদ, দিল্লীর লালকেল্লার মতি মসজিদ এবং সহস্রাধিক দ্বীনি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে হানাফী ফিকহের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকে স্থায়ী রূপ দেন।
বিভাগ ‘খ’ : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক)
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: মূল প্রশ্নপত্রে বিভাগ ‘খ’-তে মোট ৬টি প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল এবং যেকোনো ৪টির উত্তর দিতে বলা হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে নিম্নে ৭ ও ৮ নম্বর ক্রমিকে ৩টি করে মোট ৬টি প্রশ্নেরই প্রামাণ্য সমাধান তুলে ধরা হলো।]
৭- [বিভাগ ‘খ’ : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি – প্রথম অংশ]
(أ) متى وكيف أسلم عمر رضي الله عنه؟ بين- (হযরত উমর (রা.) কখন এবং কীভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন?)
- সময়কাল: নবুওয়াতের ষষ্ঠ বর্ষে (৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে), হযরত হামযা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের মাত্র তিন দিন পর হযরত উমর (রা.) ৩৩ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ দোয়া করেছিলেন: «اللَّهُمَّ أَعِزَّ الإِسْلَامَ بِأَحَبِّ هَذَيْنِ الرَّجُلَيْنِ إِلَيْكَ: بِأَبِي جَهْلٍ أَوْ بِعُمَرَ بْنِ الخَطَّابِ» (হে আল্লাহ! আবু জাহল অথবা উমর ইবনুল খাত্তাব—এই দুজনের মধ্যে যে আপনার নিকট অধিক প্রিয়, তার মাধ্যমে ইসলামকে সম্মানিত ও শক্তিশালী করুন)।
- ঘটনা: উমর (রা.) খোলা তরবারি নিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বের হন। পথিমধ্যে নুআইম ইবনে আব্দুল্লাহর সাথে দেখা হলে তিনি বলেন, ‘মুহাম্মদকে মারার আগে নিজের ঘরের খবর নাও; তোমার বোন ফাতিমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইসলাম গ্রহণ করেছে।’ উমর ক্রুদ্ধ হয়ে বোনের বাড়ি যান এবং সেখানে খাব্বাব (রা.) কর্তৃক সূরা ত্বা-হার তিলাওয়াত শুনতে পান। বোন ও ভগ্নিপতিকে মারধর করার পর তাঁদের অবিচলতা দেখে তিনি শান্ত হন এবং পাণ্ডুলিপিটি দেখতে চান। পবিত্র হয়ে তিনি সূরা ত্বা-হার ১৪ নম্বর আয়াত পাঠ করেন: ﴿إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي﴾। কুরআনের অলৌকিক বাণীতে তাঁর হৃদয় বিগলিত হয়। তিনি তৎক্ষণাৎ দারুল আরকামে উপস্থিত হয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে হাত রেখে কালেমা পাঠ করে মুসলমান হন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানরা কাবা প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে সালাত আদায় শুরু করেন এবং নবীজী তাঁকে ‘আল-ফারূক্ব’ (সত্য-মিথ্যার প্রভেদকারী) উপাধিতে ভূষিত করেন।
(ب) تحدث عن الحرب التي وقعت بين علي رضي الله عنه ومعاوية رضي الله عنه موجزا- (আলী (রা.) ও মুআবিয়া (রা.)-এর যুদ্ধ: সিফফীনের সংক্ষেপ বিবরণ)
- যুদ্ধের পটভূমি: ৩৫ হিজরীতে খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর হযরত আলী (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সিরিয়ার গভর্নর হযরত মুআবিয়া (রা.) দাবি করেন যে, আলী (রা.)-এর প্রতি বাইয়াত গ্রহণের পূর্বে উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে কিসাস কার্যকর করতে হবে। আলী (রা.) যুক্তি দেন যে, সাম্রাজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পরই কেবল আইনি বিচার কার্যকর করা সম্ভব। এই মতভেদের জের ধরে ৩৭ হিজরীর সফর মাসে ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদীর তীরে ‘সিফফীন’ নামক স্থানে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়।
- যুদ্ধ ও তাহকীম (সালিশী): একটানা কয়েকদিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলার পর যখন হযরত আলী (রা.)-এর সেনাপতি মালিক আশতারের নেতৃত্বে বিজয় নিশ্চিত হচ্ছিল, তখন মুআবিয়া (রা.)-এর পক্ষে আমর ইবনুল আসের পরামর্শে সৈন্যরা বর্শার অগ্রভাগে কুরআন বেঁধে চিৎকার করে ওঠে: ‘আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব ফয়সালা করবে!’ ফিতনা বন্ধে আলী (রা.) যুদ্ধবিরতি মেনে নেন। আলী (রা.)-এর পক্ষে আবু মুসা আশআরী (রা.) এবং মুআবিয়া (রা.)-এর পক্ষে আমর ইবনুল আস (রা.) সালিশ নিযুক্ত হন। কিন্তু সালিশের সিদ্ধান্তে জটিলতা দেখা দিলে যুদ্ধ মীমাংসাহীনভাবে শেষ হয় এবং এই ঘটনার ফলেই মুসলিম সমাজে ‘খারিজী’ নামক চরমপন্থী উগ্র দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
(ج) اذكر أسباب سقوط الدولة العباسية بالإيجاز- (আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের পতনের সংক্ষেপ কারণসমূহ)
- কেন্দ্রীভূত শক্তির দুর্বলতা ও স্বাধীন রাজবংশের উত্থান: বিশাল সাম্রাজ্যে খলিফার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়লে স্পেন, উত্তর আফ্রিকা ও পারস্যে ফাতিমী, তাহিরী, সামানী ও বুওয়াইহী ইত্যাদি স্বাধীন সালতানাত গড়ে ওঠে।
- তুর্কী সেনাপতিদের একনায়কতন্ত্র ও পুতুল খলিফা: মুতাসিম বিল্লাহর সময় থেকে সেনাবাহিনীতে তুর্কী দাস-সৈন্যদের আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে খলিফাগণ তুর্কী প্রধানদের হাতের পুতুলে পরিণত হন।
- শিয়া-সুন্নী অন্তর্দ্বন্দ ও ধর্মীয় বিভেদ: বিশেষ করে বুওয়াইহী শিয়াদের প্রভাব এবং তৎকালীন উজির মুআইয়্যিদুদ্দীন ইবনুল আলকামীর মতো বিশ্বাসঘাতকদের কারণে অভ্যন্তরীণ ঐক্য বিনষ্ট হয়।
- হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণ ও পতন (১২৫৮ খ্রি.): আব্বাসীয় খেলাফতের চূড়ান্ত ধ্বংস ডেকে আনে মোঙ্গলদের আক্রমণ। ৬৫৬ হিজরীতে (১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) চেঙ্গিস খানের পৌত্র হালাকু খান বাগদাদ অবরোধ করেন। সর্বশেষ খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, বাগদাদের বিশ্বখ্যাত লাইব্রেরি পুড়িয়ে টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষেপ করা হয় এবং লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে গণহত্যার মাধ্যমে আব্বাসীয় খেলাফতের অবসান ঘটে।
৮- [বিভাগ ‘খ’ : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি – দ্বিতীয় অংশ]
(ঘ) تحدث عن فتح القسطنطينية بأيدي العثمانيين- (উসমানীয়দের কুসতানতিনিয়া বিজয়)
- ঐতিহাসিক পটভূমি ও ভবিষ্যদ্বাণী: কুসতানতিনিয়া (কনস্টান্টিনোপল – বর্তমান ইস্তাম্বুল) ছিল এক হাজার বছরের অপরাজেয় বাইজেন্টাইন রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন: «لَتُفْتَحَنَّ القُسْطَنْطِينِيَّةُ، فَلَنِعْمَ الأَمِيرُ أَمِيرُهَا، وَلَنِعْمَ الجَيْشُ ذَلِكَ الجَيْشُ» [মুসনাদে আহমাদ] (অবশ্যই কুসতানতিনিয়া বিজিত হবে; কতই না উত্তম সেই সেনাপতি আর কতই না চমৎকার সেই সেনাবাহিনী!)।
- সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ (فاتح)-এর অনন্য কৌশল: মাত্র ২১ বছর বয়সে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে শহরটি অবরোধ করেন। তিনি হাঙ্গেরীয় প্রকৌশলী আরবানকে দিয়ে তৈরি করান ইতিহাসের বৃহত্তম ‘শাহী কামান’। রোমানরা গোল্ডেন হর্ন প্রণালীতে বিশাল লোহার শিকল বেঁধে জলপথ রুদ্ধ করে রাখলে সুলতান এক অবিশ্বাস্য কৌশল প্রয়োগ করেন—তিনি এক রাতেই কাঠের গুঁড়িতে চর্বি মাখিয়ে প্রায় ৭০টি রণতরী পাহাড়ের ওপর দিয়ে টেনে গোল্ডেন হর্নের পানিতে নামিয়ে দেন।
- চূড়ান্ত বিজয়: ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ মে মঙ্গলবার উসমানীয় বাহিনী শহরের প্রাচীন প্রাচীর ভেঙে প্রবেশ করে। সম্রাট একাদশ কনস্টানটাইন যুদ্ধে নিহত হন। সুলতান নগরীতে প্রবেশ করে সকলকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, বিখ্যাত হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করেন এবং শহরের নাম দেন ‘ইসলামবুল’ (শান্তির নগরী/ইসলামের নগরী)। এই বিজয়ের মাধ্যমেই মধ্যযুগের অবসান ঘটে এবং আধুনিক যুগের সূচনা হয়।
(ঙ) بين أسباب فتح السند بقيادة محمد بن قاسم مختصرا- (মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের কারণ)
- সিংহলের রাজার উপহারবাহী জাহাজে জলদস্যুদের আক্রমণ: সিংহলের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) রাজা খলিফা ওয়ালীদ এবং ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জন্য আটটি জাহাজে করে মূল্যবান উপহারসামগ্রী এবং সেখানে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম বণিকদের অনাথ সন্তান ও বিধবাদের পাঠাচ্ছিলেন। সিন্ধুর দেবল বন্দরের সন্নিকটে হিন্দু জলদস্যুরা জাহাজগুলো লুট করে এবং নিরীহ মুসলিম নারী ও শিশুদের বন্দি করে।
- নির্যাতিতা নারীর আর্তনাদ: বন্দিনী এক মুসলিম নারী ‘ইয়া হাজ্জাজ! ইয়া হাজ্জাজ!’ বলে আর্তনাদ করে চিঠি পাঠালে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এই অপমান সহ্য করতে পারেননি।
- রাজা দাহিরের উদ্ধত্যপূর্ণ প্রত্যাখ্যান: হাজ্জাজ সিন্ধুর ব্রাহ্মণ রাজা দাহিরের কাছে বন্দীদের মুক্তি ও ক্ষতিপূরণ দাবি করলে দাহির অহংকারভরে উত্তর দেয়—‘জলদস্যুরা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, আমি তাদের শাস্তি দিতে পারব না।’
- মুহাম্মদ বিন কাসিমের অভিযান (৭১২ খ্রি.): হাজ্জাজ মাত্র ১৭ বছর বয়সী তরুণ সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে ৬,০০০ সিরীয় অশ্বারোহী সৈন্যসহ সিন্ধুতে পাঠান। ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দেবল, নিরুন ও সেহওয়ান জয় করেন। রাওয়ারের যুদ্ধে রাজা দাহির নিহত হয়। এরপর তিনি ব্রাহ্মণাবাদ ও মুলতান জয় করে ভারতবর্ষে ইসলামের বিজয়ী তোরণ উন্মোচন করেন।
(চ) متى وكيف جاء الإسلام في بنغلاديش؟ بين بالإيجاز- (কখন ও কীভাবে বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে?)
- ১. সূচনাকাল (বাণিজ্যিক কাফেলা ও সুফিদের মাধ্যমে): রাজনৈতিক বিজয়ের শত শত বছর পূর্বেই অষ্টম-নবম শতাব্দীতে আরব ও পারসিক মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের আলো পৌঁছে। চট্টগ্রাম ও মেঘনা অববাহিকা হয়ে আরবরা চীনে বাণিজ্য করত। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও ময়নামতিতে আব্বাসীয় খলিফা হারুন অর-রশিদ ও মুসতাসিম বিল্লাহর যুগের রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হওয়া এর ঐতিহাসিক প্রমাণ।
- ২. আউলিয়া-কেরাম ও সূফী সাধকদের আত্মিক দাওয়াত: বাংলায় ইসলামের গণ-বিস্তার ঘটেছে মূলত মহান সূফী সাধকদের চারিত্রিক মাধুর্য, মানবসেবা ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম:
- হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহীসওয়ার (বগুড়া ও বরেন্দ্র অঞ্চল)
- হযরত বাবা আদম শহীদ (মুন্সীগঞ্জ)
- হযরত শাহ জালাল ইয়ামানী ও তাঁর ৩৬০ আউলিয়া (সিলেট)
- হযরত খান জাহান আলী (বাগেরহাট ও দক্ষিণাঞ্চল)
- হযরত শাহ মাখদুম রূপোশ (রাজশাহী)।
- ৩. ইখতিয়ারুদ্দীন বখতিয়ার খলজীর রাজনৈতিক বিজয় (১২০৪ খ্রি.): ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে নদীয়া আক্রমণ করে রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করার মাধ্যমে বাংলায় সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।
- ৪. বর্ণপ্রথার বৈষম্য ও দলে দলে ধর্মান্তর: হিন্দু সমাজের কঠোর বর্ণপ্রথা, অস্পৃশ্যতা ও জাতপাতের নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট নিম্নবর্ণের বৌদ্ধ ও সাধারণ মানুষ ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক ইনসাফে মুগ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
-
প্রশ্ন: খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি কী ছিল?
উত্তর: কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুশাসন, মজলিসুশ শূরার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরামর্শ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং জনগণের নিকট শাসকের জবাবদিহিতাই ছিল এর মূল ভিত্তি। -
প্রশ্ন: হযরত আবু বকর (রা.)-কে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ বলা হয় কেন?
উত্তর: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর উম্মাহর চরমতম সংকটে মুরতাদ, যাকাত অস্বীকারকারী ও ভণ্ড নবীদের ফেতনা কঠোর হস্তে দমন করে তিনি ইসলামকে চিরতরে সুরক্ষিত করেছিলেন। -
প্রশ্ন: উমাইয়া খেলাফতের পতনের প্রধান অভ্যন্তরীণ কারণ কী ছিল?
উত্তর: রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব, অনারব নও-মুসলিমদের (মাওয়ালী) প্রতি সামাজিক বৈষম্য এবং প্রাচীন কায়সী-ইয়েমেনী গোত্রীয় কলহের পুনরুজ্জীবনই ছিল এর প্রধান কারণ। -
প্রশ্ন: ‘বাইতুল হিকমাহ’ কেন বিখ্যাত?
উত্তর: আব্বাসীয় খলিফা হারুন অর-রশিদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাইতুল হিকমাহ ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অনুবাদ ও বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ রচনা করেছিল। -
প্রশ্ন: ফতোয়ায়ে আলমগীরী কেন সংকলিত হয়েছিল?
উত্তর: মোগল ভারতে আকবরের বিভ্রান্তিকর নীতি দূর করে বিচারালয়ে হানাফী ফিকহের একক ও অভিন্ন শারঈ বিধান কার্যকর করার লক্ষ্যে সম্রাট আওরঙ্গজেব ৫০০ আলিমের মাধ্যমে এটি সংকলন করান। -
প্রশ্ন: বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের প্রধান মাধ্যম কী ছিল?
উত্তর: আরব বণিকদের সততা, শাহ জালাল ও খান জাহান আলীর মতো মহান সূফী-দরবেশদের আধ্যাত্মিক মানবসেবা এবং ইসলামের সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধই ছিল বাংলায় ইসলাম বিস্তারের প্রধান চালিকাশক্তি।
উপসংহার ও পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাযিল সম্মান ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আত-তারীখুল ইসলামী’ (বিষয় কোড: ২০১৪০৩) প্রশ্নপত্রটি ইতিহাসতত্ত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইসলামী সভ্যতার গভীর জ্ঞানের সমন্বয়ে গঠিত। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক সন-তারিখ, খলিফা ও শাসকদের সঠিক নাম, গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের নাম ও স্থান এবং প্রশাসনিক সংস্কারের পয়েন্টগুলো স্পষ্ট আকারে উপস্থাপন করা আবশ্যক। এই সমাধানের প্রতিটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ মানদণ্ড এবং প্রামাণ্য ইতিহাসগ্রন্থের উৎসের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনে অনন্য সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।