اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة تفسير القرآن الكريم
[দিরাসাতু তাফসীরিল কুরআনিল কারীম]
বিষয় কোড: ২০৩৮০৯ | পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩৭
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
مجموعة (الف) – ক-বিভাগ (আয়াতসমূহের তরজমা, তাফসির ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলি)
١- اهدنا الصراط المستقيم- صراط الذين أنعمت عليهم- غير المغضوب عليهم ولا الضالين- آمين
[১. আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ, যাদের আপনি পুরস্কৃত করেছেন। তাদের পথ নয়, যারা আপনার ক্রোধে নিপতিত হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমীন।]
আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির
সূরা আল-ফাতিহার এই অংশটি মানবজাতির জন্য আল্লাহর দরবারে সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া। বান্দা রবের গুণগান বর্ণনার পর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য, কল্যাণ ও হেদায়েতের ওপর অটল থাকার প্রার্থনা জানায়। ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ হলো সেই পথ যা নবী, সিদ্দিকীন, শুহাদা ও সালেহীনের অনুসৃত পথ। আর ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মতো বিকৃতি ও পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা’আলা এই মোনাজাত শিক্ষা দিয়েছেন।
(الف) كلمة ‘الصراط’ এর তাহক্বীক্ব (صاحب الكشاف এর আলোকে)
বিখ্যাত তাফসিরবিদ আল্লামা আবুল কাসিম আল-জামাখশারী তাঁর ‘আল-কাশশাফ’ গ্রন্থে বলেন:
- ব্যুৎপত্তি: ‘الصراط’ শব্দটি মূল ‘السرط’ (সারত) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ গিলে ফেলা (الابتلاع)। রাস্তা যেহেতু পথচারীকে নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং পথচারী তাতে দ্রুত অগ্রসর হয় যেন রাস্তা তাকে গ্রাস করছে, তাই প্রশস্ত পথকে ‘সিরাত’ বলা হয়।
- ক্বিরাআতের বৈচিত্র্য: শব্দটিতে তিনটি ক্বিরাআত রয়েছে—
- ص (সোয়াদ) দ্বারা: ‘الصراط’—এটি কুরাইশ গোত্রের ভাষা এবং জুমহুর ক্বারীদের ক্বিরাআত।
- س (সীন) দ্বারা: ‘السراط’—এটি মূল আরবি শব্দ এবং ইমাম কুম্বুল ও বাজিদের ক্বিরাআত।
- ইশমাম (ص ও ز এর মিশ্রণ): ইমাম হামযাহ খাল্লাদের রিওয়ায়াতে ‘যিরাত’ সদৃশ উচ্চারণ করেছেন।
- অর্থগত ব্যাখ্যা: এটি এমন এক উন্মুক্ত, প্রশস্ত ও সুস্পষ্ট রাজপথ যা অনুসরণকারীকে সরাসরি মঞ্জিলে মকসুদ তথা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে পৌঁছে দেয়।
(ب) المغضوب عليهم ও الضالون কারা?
রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা.) বর্ণিত সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:
“المغضوب عليهم اليهود، والضالون النصارى”
(যাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হয়েছে তারা হলো ইহুদি সম্প্রদায়, আর যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তারা হলো খ্রিস্টান সম্প্রদায়)। (জামে তিরমিযী: ২৯৫৪)।
- ইহুদিদের ‘মাগদুব আলাইহিম’ হওয়ার কারণ: তারা সত্য জানা সত্ত্বেও অহংকার ও হিংসার বশবর্তী হয়ে তা অমান্য করেছে, নবীদের হত্যা করেছে এবং তাওরাত বিকৃত করেছে। জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আমল না করায় তারা আল্লাহর ক্রোধে নিপতিত।
- খ্রিস্টানদের ‘দ্বাল্লীন’ হওয়ার কারণ: তারা জাহালাত ও অজ্ঞতার কারণে দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি (গুলু) করেছে এবং হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বা খোদা বানিয়ে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়েছে।
٢- ختم الله على قلوبهم وعلى سمعهم وعلى أبصارهم غشاوة، ولهم عذاب عظيم- ومن الناس من يقول آمنا بالله وباليوم الآخر وماهم بمؤمنين- يخادعون الله والذين آمنوا وما يخدعون إلا أنفسهم وما يشعرون-
[২. আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর এঁটে দিয়েছেন, আর তাদের চোখের ওপর রয়েছে পর্দা; এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি। আর মানুষের মধ্যে কিছু এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছি, অথচ তারা আদৌ মুমিন নয়। তারা আল্লাহ ও মুমিনদের প্রতারিত করতে চায়, অথচ তারা নিজেদের ছাড়া কাউকে প্রতারিত করছে না, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করতে পারছে না।]
আয়াতসমূহের সংক্ষিপ্ত তাফসির
সূরা আল-বাকারার শুরুতে মুমিনদের বৈশিষ্ট্যের পর এই আয়াতগুলোতে চরমপন্থী কাফের ও কপট মুনাফিকদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা উন্মোচন করা হয়েছে। যারা অহংকারবশত সত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, আল্লাহ তাদের কলবে মোহর মেরে দেন। আর মুনাফিকরা মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে কুফর গোপন রেখে মুসলমানদের ধোঁকা দিতে চায়, কিন্তু পরিণামে তারা নিজেদেরই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
(الف) كلمة ‘غشاوة’ এর বিভিন্ন এরাব (ইমাম বায়যাভী রহ. এর আলোকে)
কাযী নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাভী (রহ.) তাঁর তাফসিরে ‘غشاوة’ (গিশাওয়াতুন) শব্দের নিম্নরূপ এরাব ও বাক্যবিন্যাস বিশ্লেষণ করেছেন:
- রফা (مرفوع) হওয়া: জুমহুর ক্বারীদের পাঠে ‘غشاوةٌ’ পেশবিশিষ্ট। এ ক্ষেত্রে এটি مبتدأ مؤخر (পরবর্তী মুক্তাদা) এবং এর পূর্বে جار ومجرور মিলে ‘وعلى أبصارهم’ হলো خبر مقدم (পূর্ববর্তী খবর)। বাক্যটি হলো: “وعلى أبصارهم غشاوةٌ”। আর পূর্ববর্তী বাক্য “ختم الله على قلوبهم وعلى سمعهم” এর ওপর তা পূর্ণাঙ্গ ওয়াকফ (الوقف التام)।
- নসব (منصوب) হওয়া: কিছু ক্বিরাআতে (যেমন শু’বার একটি বর্ণনা) ‘غشاوةً’ জবর দিয়ে পড়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এটি مفعول به (মাফউল বিহি), যার ফে’ল হলো محذوف (উহ্য); অর্থাৎ: “وجعل على أبصارهم غشاوةً” (এবং তাদের চোখের ওপর তিনি পর্দা টেনে দিয়েছেন)। অথবা পূর্বের ‘খাতামা’ ফে’লের ওপর মা’তূফ হিসেবে।
(ب) النفاق এর পরিচয় এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য
النفاق (নেফাক)-এর পরিচয়: ‘নাফাক্বা’ (النفق) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ মাটির নিচের গোপন সুড়ঙ্গ। শরীয়তের পরিভাষায়, অন্তরে কুফরি ও শত্রুতা গোপন রেখে প্রকাশ্যে মুখে মুখে ঈমান ও ইসলামের দাবি প্রকাশ করাকে নেফাক বলে।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- কুরআনের আলোকে:
- মিথ্যা শপথ করে নিজেদের রক্ষা করতে চায় (সূরা আল-মুনাফিকুন: ২)।
- সালাতে অলসতা প্রদর্শন করে এবং লোকদেখানো আমল করে (সূরা আন-নিসা: ১৪২)।
- মুমিনদের ক্ষতিসাধনের জন্য ষড়যন্ত্র ও ফিতনা সৃষ্টি করে (সূরা আত-তাওবাহ: ৪৭)।
- দ্বীনের ব্যাপারে দোলাচলে ভোগে—না এদিকে, না ওদিকে (সূরা আন-নিসা: ১৪৩)।
- হাদিসের আলোকে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “মুনাফিকের নিদর্শন চারটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখলে খেয়ানত করে এবং বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল গালিগালাজ করে।” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)।
٣- سبحان الذى أسرى بعبده ليلا من المسجد الحرام إلى المسجد الأقصى الذى باركنا حوله لنريه من آياتنا، إنه هو السميع البصير- وآتينا موسى الكتاب وجعلناه هدى لبنى إسرائيل ألا تتخذوا من دونى وكيلا-
[৩. পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি নিজ বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায়, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করি; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। আর আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম এবং বনী ইসরাঈলের জন্য তাকে হেদায়েতস্বরূপ করেছিলাম যে, তোমরা আমাকে ছাড়া কাউকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না।]
(الف) ইসরা ও মেরাজের ঐতিহাসিক ঘটনা (واقعة الإسراء والمعراج)
নবুওয়াতের দশম বর্ষে ‘আমুল হুজন’ বা শোকের বছরে (যখন উম্মুল মুমিনীন খাদিজা রা. এবং অভিভাবক আবু তালিব ইন্তেকাল করেন) তায়েফের নির্মম নির্যাতনের পর আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে সান্ত্বনা ও সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের জন্য মেরাজে নিয়ে যান।
- ইসরা: জিবরীল (আ.) বোরাক নিয়ে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) ভ্রমণ করেন। সেখানে তিনি আদম (আ.) থেকে ঈসা (আ.) পর্যন্ত সমস্ত নবীদের ইমাম হয়ে সালাত আদায় করেন।
- মেরাজ: এরপর তিনি বিশেষ সিঁড়ি ও বাহনের মাধ্যমে প্রথম আসমান থেকে একে একে সপ্তম আসমান অতিক্রম করেন, যেখানে পূর্ববর্তী নবীদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। অতঃপর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পৌঁছে জিবরীল (আ.) থেমে যান এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর খাস সান্নিধ্যে উপস্থিত হয়ে আরশে আজিমে রবের সাথে সরাসরি বাক্যালাপ করেন।
- উপহার: সেখানে উম্মতের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত হাদিয়া দেওয়া হয়।
(ب) “الذي باركنا حوله” (যার চারপাশকে বরকতময় করেছি)-এর ব্যাখ্যা
পবিত্র কুরআনে মসজিদুল আকসার চারপাশকে বরকতময় ঘোষণা করার তাৎপর্য হলো—
- ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বরকত: এটি অসংখ্য নবী-রাসূলগণের বাসস্থান, বিচরণভূমি ও দাফনস্থল। হযরত ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব, দাউদ, সুলাইমান ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) এই ভূমিতে দাওয়াহর কাজ পরিচালনা করেছেন এবং এটি ছিল দীর্ঘকাল পর্যন্ত মুসলমানদের প্রথম কিবলা।
- ভৌগোলিক ও জাগতিক বরকত: ফিলিস্তিন ও সিরিয়া অঞ্চলটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর; নদীনালা, সুমিষ্ট পানির ঝর্ণাধারা, সুস্বাদু ফলমূল (যেমন যায়তুন, ডুমুর ও খেজুর), সবুজ শ্যামল শস্যক্ষেত এবং মনোরম জলবায়ুর কারণে জাগতিক দিক থেকেও চিরন্তন প্রাচুর্যপূর্ণ।
٤- إن الذين يغضون أصواتهم عند رسول الله أولئك الذين امتحن الله قلوبهم للتقوى، لهم مغفرة وأجر عظيم-
[৪. নিশ্চয় যারা রাসূলুল্লাহর সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু রাখে, তারাই সে সব লোক যাদের অন্তরকে আল্লাহ তাকওয়ার জন্য খাঁটি করেছেন; তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।]
(الف) আলোচ্য আয়াতটির শানে নুযূল (سبب نزول الآية الكريمة)
ইমাম আহমদ, তিরমিযী ও বুখারীতে হযরত ইবনে আবি মুলাইকা থেকে বর্ণিত হয়েছে:
একদা বনী তামীম গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে আসে। তাদের অঞ্চলের জন্য কাকে গভর্নর নিযুক্ত করা হবে—এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে হযরত আবু বকর (রা.) প্রস্তাব দেন কা’কা ইবনে মা’বাদের নাম, আর হযরত উমর (রা.) প্রস্তাব দেন আক্বরা ইবনে হাবিসের নাম। এ নিয়ে উভয় সম্মানিত সাহাবীর মধ্যে মতদ্বৈধতা সৃষ্টি হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উপস্থিতিতেই তাঁদের দুজনের কণ্ঠস্বর কিছুটা উঁচু হয়ে যায়।
তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁদের সতর্ক করে সূরা হুজুরাতের ২ নম্বর আয়াত নাজিল করেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠের ওপর নিজেদের কণ্ঠ উঁচু করো না…”।
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর উভয় সাহাবী এত ভীত-সন্ত্রস্ত হন যে, হযরত উমর (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এত নিম্নস্বরে ফিসফিস করে কথা বলতেন যে পুনরায় জিজ্ঞেস না করলে তা শোনা যেত না। তাঁদের এই পরম ভক্তি, বিনয় ও খোদাভীতির প্রশংসা করে আল্লাহ তা’আলা সান্ত্বনা হিসেবে এই ৩ নম্বর আয়াতটি নাজিল করেন যে—“নিশ্চয় যারা রাসূলুল্লাহর কাছে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু রাখে, আল্লাহ তাদের কলবকে তাকওয়ার জন্য বাছাই করে নিয়েছেন।”
(ب) “لهم مغفرة وأجر عظيم” অংশের তারকীব ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (إعراب)
- لهم: ‘اللام’ حرف جر (হারফে জার), ‘هم’ ضمير متصل مبني على السكون في محل جر (দমিরে মুত্তাসিল মাজরুর)। জার ও মাজরুর মিলে متعلق হলো محذوف خبر مقدم (পূর্ববর্তী উহ্য খবর ‘কায়েনুন’ বা ‘সাবিতুন’ এর সাথে মুতাআল্লিক)।
- مغفرة: مبتدأ مؤخر مرفوع وعلامة رفعه الضمة الظاهرة على آخره (পরবর্তী মুক্তাদা, যার রফা স্পষ্ট পেশ দ্বারা হয়েছে)।
- و: حرف عطف (হারফে আতফ)।
- أجر: معطوف على مغفرة مرفوع بالضمة (মাগফিরাতের ওপর মা’তুফ হওয়ায় এটিও মারফু)।
- عظيم: نعت / صفة لـ “أجر” مرفوع وعلامة رفعه الضمة (আজরের সিফাত বা বিশেষণ হওয়ায় পেশবিশিষ্ট মারফু)।
- মোট জুমলা: “لهم مغفرة وأجر عظيم” হলো একটি جملة اسمية (জুমলায়ে ইসমিয়্যাহ), যা প্রথমোক্ত ‘إن’ এর খবর হিসেবে অথবা স্বতন্ত্র বাক্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
٥- يايها الذين آمنوا إن جاءكم فاسق بنبإ فتبينوا أن تصيبوا قوما بجهالة فتصبحوا على ما فعلتم نادمين- واعلموا أن فيكم رسول الله لو يطيعكم فى كثير من الامر لعنتم، ولكن الله حبب إليكم الإيمان وزينه فى قلوبكم وكره إليكم الكفر والفسوق والعصيان، أولئك هم الراشدون-
[৫. হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই-বাছাই করো; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধন না করে ফেল, যার ফলে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের লজ্জিত হতে হয়। এবং জেনে রেখো, তোমাদের মাঝে আল্লাহর রাসূল রয়েছেন; তিনি যদি বহু বিষয়ে তোমাদের কথা মেনে নিতেন তবে তোমরাই কষ্টে পতিত হতে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন, আর কুফরি, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে তোমাদের কাছে অপ্রিয় করেছেন; তারাই তো সৎপথপ্রাপ্ত।]
(الف) আয়াতটির শানে নুযূল (سبب نزول الآية الكريمة)
ইমাম আহমদ ও তাবারীসহ মুফাসসিরগণ বর্ণনা করেন:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ওয়ালিদ ইবনে উক্ববাকে বনী মুসতালিক গোত্রের নিকট তাদের প্রদানকৃত যাকাত সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেন। বনী মুসতালিক গোত্রের লোকেরা যখন শুনল যে রাসূলের দূত আসছেন, তখন তারা তাঁকে সম্মান জানাতে এবং সানন্দে যাকাতের মাল অর্পণ করতে নগরীর বাইরে দলবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসে।
জাহেলি যুগে ওয়ালিদের সাথে তাদের শত্রুতা ছিল, তাই দূর থেকে তাদের অস্ত্র ও সমাগম দেখে ওয়ালিদ ভয় পেয়ে যান এবং ভাবেন তারা বুঝি তাকে হত্যা করতে আসছে। তিনি মদিনায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! বনী মুসতালিক মুরতাদ হয়ে গেছে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করতে চেয়েছে।”
এ সংবাদে সাহাবীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণের প্রস্তুতি নেন। তখন বনী মুসতালিকের প্রতিনিধিদল এসে ঘটনা খুলে বলে এবং সত্য উদঘাটিত হয়। তখনই আল্লাহ তা’আলা তদন্ত ও যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো সংবাদে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়ে এই আয়াত নাজিল করেন।
(ب) الرسول (সা.)-এর আনুগত্যের অপরিহার্য গুরুত্ব (أهمية إطاعة الرسول)
- আল্লাহর ভালোবাসার শর্ত: আল্লাহ বলেন: “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন।” (সূরা আলে ইমরান: ৩১)।
- রাসূলের আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্য: ইরশাদ হয়েছে: “যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল।” (সূরা আন-নিসা: ৮০)।
- ঈমানের পূর্বশর্ত: রাসূলের ফায়সালাকে দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে না নেওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারে না (সূরা আন-নিসা: ৬৫)।
- শান্তি ও হেদায়েতের একমাত্র পথ: রাসূলের সুন্নাহর অবাধ্যতা মানুষের ওপর আসমানী ফিতনা ও যন্ত্রণাদায়ক আজাব ডেকে আনে (সূরা আন-নূর: ৬৩)।
٦- والنجم إذا هوى- ما ضل صاحبكم وما غوى- وما ينطق عن الهوى- إن هو إلا وحى يوحى- علمه شديد القوى- ذو مرة فاستوى- وهو بالأفق الأعلى- ثم دنا فتدلى-
[৬. শপথ নক্ষত্রের যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মদ সা.) পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি। আর তিনি নিজের খেয়ালখুশিমতো কোনো কথা বলেন না। এ তো ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। তাকে শিক্ষা দান করেছে প্রবল শক্তিধর (জিবরীল), বলবান; সে নিজ আকৃতিতে স্থির হয়েছিল, যখন সে ছিল ঊর্ধ্ব দিগন্তে; অতঃপর সে নিকটবর্তী হলো, তারপর আরও কাছে ঝুঁকে এলো।]
(الف) ওহীর গুরুত্ব ও এর প্রকারভেদসমূহ (أهمية الوحي وأقسامه)
ওহীর গুরুত্ব: ‘ওহী’ হলো মানুষের সীমিত বুদ্ধি ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আসমানী হেদায়েত ও শরীয়ত জানার একমাত্র অভ্রান্ত ঐশী মাধ্যম। ওহী ব্যতীত মানুষ তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও পরকালের পরিণাম জানতে সক্ষম নয়।
কুরআনের আলোকে ওহীর প্রকারভেদ (সূরা আশ-শূরা: ৫১):
- ইলহাম বা অন্তরে প্রক্ষেপণ (الوحي المباشر/الإلهام): কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি নবীর অন্তরে ভাব জাগ্রত করা অথবা সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে (যেমন ইবরাহীম আ.-এর কুরবানির স্বপ্ন)।
- পর্দার অন্তরাল থেকে বাক্যালাপ (من وراء حجاب): আল্লাহ সরাসরি নবীর সাথে কথা বলেন কিন্তু নবী আল্লাহকে চাক্ষুষ দেখতে পান না (যেমন তূর পাহাড়ে হযরত মুসা আ.-এর সাথে কথা বলা)।
- ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী (إرسال رسول): জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে নবীর নিকট বাণী পৌঁছানো।
অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে ওহী দুই প্রকার: ১. ওহীয়ে মাতলূ (তিলাওয়াতকৃত ওহী তথা আল-কুরআন) এবং ২. ওহীয়ে গায়রে মাতলূ (অ-তিলাওয়াতকৃত ওহী তথা সুন্নাহ ও হাদিস)।
(ب) রাসূলুল্লাহ (সা.) কতবার জিবরীল (আ.)-কে তাঁর আসল আকৃতিতে দেখেছেন?
সহিহ হাদিসের বিশুদ্ধতম বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.) সমগ্র জীবনে হযরত জিবরীল (আ.)-কে তাঁর মূল ছয়শত নূরের পাখাবিশিষ্ট দিগন্ত বিস্তৃত আসল আকৃতিতে দুইবার (مرتان) স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন:
- প্রথমবার: নবুওয়াতের প্রারম্ভে মক্কার হেরা গুহার নিকটে দিগন্ত জোড়া আসনে উপবিষ্ট অবস্থায়, যা দেখে নবীজী অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন (আলোচ্য সূরা নাজমের ৬-৭ নম্বর আয়াতে বর্ণিত)।
- দ্বিতীয়বার: মেরাজের রজনীতে সপ্তম আসমানের ওপরে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’র নিকটে। যেমন আল্লাহ বলেন: “ولقد رآه نزلة أخرى عند سدرة المنتهى” (নিশ্চয় তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে)। (সূরা আন-নাজম: ১৩-১৪)।
٧- فكان قاب قوسين أو أدنى- فأوحى إلى عبده ما أوحى- ما كذب الفؤاد ما رأى- أفتمارونه على ما يرى- ولقد رآه نزلة أخرى-
[৭. অতঃপর তাদের মাঝে ব্যবধান রইল মাত্র দুই ধনুকের বা তার চেয়েও কম। তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার ছিল তা ওহী করলেন। তাঁর চোখ যা দেখেছে তাঁর অন্তর তা অস্বীকার করেনি। তবে কি তোমরা তিনি যা দেখেছেন সে বিষয়ে তাঁর সাথে বিতর্ক করবে? আর অবশ্যই তিনি তাকে আরেকবার দেখেছিলেন।]
(الف) মেরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) যা যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন (সংক্ষিপ্ত বিবরণ)
- বায়তুল মামুর: আসমানের কিবলা, যেখানে প্রত্যহ ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের আর ফিরে আসার সুযোগ হবে না।
- সিদরাতুল মুনতাহা: সৃষ্টিজগতের জ্ঞান ও ঊর্ধ্বগমনের শেষ সীমানা, যার সৌন্দর্য কোনো মানুষ বর্ণনা করতে সক্ষম নয়।
- জান্নাত ও তার অনুপম নেয়ামত: জান্নাতের চারটি নদী (কাওসার, সিলসাবিল ইত্যাদি), হূর-গেলমান এবং মুত্তাকীদের রাজকীয় বাসস্থান।
- জাহান্নাম ও পাপীদের শাস্তি: সুদখোর, বেনামাযী, গীবতকারী ও ব্যভিচারীদের রক্তের নদীতে সাঁতার ও আগুনের হাতুড়ি দ্বারা শাস্তির দৃশ্য।
- পূর্ববর্তী নবীদের সাথে সাক্ষাৎ: আদম, ঈসা, ইয়াহিয়া, ইউসুফ, ইদ্রিস, হারুন, মুসা ও ইবরাহীম (আলাইহিমুস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়।
(ب) ইসরা ও মেরাজের তাৎপর্য ও শিক্ষা (أهمية الإسراء والمعراج)
- সালাতের পরম মর্যাদা: সালাত কোনো ওহীর মারফতে জমিনে আসেনি, বরং রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আরশে আজিমে ডেকে নিয়ে সরাসরি হাদিয়া দেওয়া হয়েছে; তাই সালাত মুমিনের মেরাজস্বরূপ।
- বায়তুল মুকাদ্দাসের গুরুত্ব: এটি প্রমাণ করে মসজিদুল আকসার হেফাজত মুসলিম উম্মাহর ঈমানের সাথে অবিচ্ছেদ্য।
- বিজ্ঞানের ওপর মুজিযার শ্রেষ্ঠত্ব: সময়ের আপেক্ষিকতা ও মহাকাশ ভ্রমণ আল্লাহ তা’আলার অসীম কুদরতের সামনে অতি সাধারণ বিষয়।
- সত্যবাদিতার পরীক্ষা: মেরাজের ঘটনা কাফেরদের উপহাসে পরিণত হলেও হযরত আবু বকর (রা.) তাৎক্ষণিক বিশ্বাস করে ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত হন।
٨- قالت الاعراب آمنا، قل لم تؤمنوا ولكن قولوا أسلمنا و لما يدخل الإيمان فى قلوبكم، وإن تطيعوا الله ورسوله لا يلتكم من أعمالكم شيئا، إن الله غفور رحيم-
[৮. মরুচারী বেদুঈনরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা তো ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো, আমরা আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করেছি, কারণ ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, তবে তিনি তোমাদের আমলের কোনো সওয়াব হ্রাস করবেন না; নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।]
(الف) الإيمان ও الإسلام এর সংজ্ঞা ও পারস্পরিক সম্পর্ক
الإيمان (ঈমান): শাব্দিক অর্থ বিশ্বাস ও স্বীকৃতি। শরীয়তের পরিভাষায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) যা কিছু নিয়ে এসেছেন তাকে অন্তর দিয়ে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা, মুখে উচ্চারণ করা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে কাজে পরিণত করাকে ঈমান বলে। ঈমানের স্থান মূলত ‘অন্তর’ (القلب)।
الإسلام (ইসলাম): শাব্দিক অর্থ আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য। শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সমস্ত আদেশ-নিষেধের সামনে মাথা নত করে জাহেরি বা বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে তা বাস্তবায়ন করাকে ইসলাম বলে। ইসলামের স্থান মূলত ‘বাহ্যিক অঙ্গ’ (الجوارح)।
উভয়ের সম্পর্ক: যখন শব্দ দুটি পৃথকভাবে ব্যবহৃত হয় তখন একটি অপরটির অর্থ ধারণ করে। কিন্তু যখন একই সাথে ব্যবহৃত হয় (যেমন এই আয়াতে), তখন ইসলাম দ্বারা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিক আনুগত্য এবং ঈমান দ্বারা অন্তরের গভীর আন্তরিক বিশ্বাসকে বোঝায়।
(ب) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈমান কি বাড়ে ও কমে? (زيادة الإيمان ونقصانه)
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের (যেমন ইমাম বুখারী, শাফেয়ী ও আহমদ রহ.) মতে নেক আমলের দ্বারা ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহের কারণে ঈমান হ্রাস পায়।
- কুরআনের দলিলসমূহ:
- “তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাজিল করেছেন যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়।” (সূরা আল-ফাতহ: ৪)।
- “আর যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে।” (সূরা আল-আনফাল: ২)।
- “যাতে ঈমানদারদের ঈমান আরও বেড়ে যায়।” (সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৩১)।
- হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো।” (সহিহ মুসলিম)। আমলের শাখাগুলো থাকলে ঈমান বাড়ে, আর কমে গেলে ঈমানের পূর্ণতা হ্রাস পায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, মূল বিশ্বাসের দিক থেকে ঈমান সমান হলেও তার নূর, দৃঢ়তা ও আমলের ক্ষেত্রে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে।
٩- الم- ذلك الكتاب لا ريب فيه هدى للمتقين- الذين يؤمنون بالغيب ويقيمون الصلاة ومما رزقناهم ينفقون- والذين يؤمنون بما أنزل إليك وما أنزل من قبلك وبالآخرة هم يوقنون-
[৯. আলিফ-লাম-মীম। এ সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; পথপ্রদর্শক মুত্তাকীদের জন্য। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। আর যারা বিশ্বাস করে যা আপনার প্রতি নাজিল হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাজিল হয়েছে, আর তারা আখেরাতের প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাস রাখে।]
(الف) التقوى এর অর্থ ও এর অপরিসীম গুরুত্ব
শাব্দিক অর্থ: ‘ওয়াকায়া’ (الوقاية) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নিজেকে রক্ষা করা, বেঁচে থাকা ও ঢাল গ্রহণ করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: হযরত আলী (রা.) তাকওয়ার চমৎকার সংজ্ঞা দিয়েছেন: “التَّقْوَى هِيَ الْخَوْفُ مِنَ الْجَلِيلِ، وَالْعَمَلُ بِالتَّنْزِيلِ، وَالْقَنَاعَةُ بِالْقَلِيلِ، وَالاسْتِعْدَادُ لِيَوْمِ الرَّحِيلِ” (মহামহিম আল্লাহকে ভয় করা, ওহী অনুযায়ী আমল করা, অল্পে তুষ্ট থাকা এবং মৃত্যুর পর যাত্রার জন্য পাথেয় সংগ্রহ করা)।
তাকওয়ার গুরুত্ব:
- আল্লাহর দরবারে সম্মানের একমাত্র মানদণ্ড: “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকী।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)।
- কুরআন থেকে হেদায়েত লাভের পূর্বশর্ত: কুরআন সকলের জন্য পথপ্রদর্শক হলেও কেবল মুত্তাকীগণই এর থেকে প্রকৃত হেদায়েত পায়।
- বিপদ থেকে মুক্তি ও অপ্রত্যাশিত রিজিক লাভ (সূরা আত-তালাক: ২-৩)।
(ب) আল্লাহর পথে খরচের মর্যাদা (فضل الإنفاق في سبيل الله)
- সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি: আল্লাহ তা’আলা বলেন: “যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা একটি শস্যবীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয় এবং প্রতিটি শীষে শত শস্যদানা থাকে।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৬১)।
- সম্পদ পবিত্র ও প্রাচুর্যময় হয়: রাসূলুল্লাহ (সা.) কসম করে বলেছেন: “সদকা করার কারণে কখনো কোনো সম্পদ কমে যায় না।” (তিরমিযী)।
- কিয়ামতের দিন আরশের ছায়া লাভ: যে ব্যক্তি গোপনে আল্লাহর পথে এমনভাবে দান করে যে ডান হাত যা দেয় বাম হাত তা জানে না, সে কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাবে।
١٠- وقضينا إلى بنى إسرائيل فى الكتاب لتفسدن فى الأرض مرتين ولتعلن علوا كبيرا- فإذا جاء وعد أولهما بعثنا عليكم عبادا لنا أولى بأس شديد فجاسوا خلال الديار، وكان وعدا مفعولا-
[১০. আর আমি কিতাবে বনী ইসরাঈলকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, তোমরা পৃথিবীতে অবশ্যই দুইবার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং অত্যন্ত অহংকার প্রদর্শন করবে। অতঃপর যখন সেই দুইটির প্রথমটির নির্ধারিত সময় এলো, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে আমার এমন বান্দাদের পাঠালাম যারা ছিল ঘোরতর যুদ্ধবাজ; তারা ঘরে ঘরে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাল; আর এ অঙ্গীকার পূর্ণ হওয়ারই ছিল।]
(الف) আয়াত সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা (الواقعة المتعلقة بالآية)
মুফাসসিরগণ (যেমন ইবনে কাসির, কুরতুবী ও তাবারী) উল্লেখ করেন যে, বনী ইসরাঈল ইতিহাসে দুটি বড় বিপর্যয় ও বিদ্রোহ করেছিল:
- প্রথম বিপর্যয় ও আসিরীয়/ব্যাবিলনীয় আগ্রাসন: তারা তাওরাতের আইন অমান্য করে, জাকারিয়া (আ.)-কে হত্যা করে এবং সীমাহীন দুর্নীতি ও অনাচারে লিপ্ত হয়। ফলে আল্লাহ তাঁদের শাস্তিস্বরূপ ব্যাবিলনের পরাক্রমশালী অত্যাচারী রাজা বুখতানাস্সার (নেবুচাদনেজার)-কে তাদের ওপর বিজয়ী করেন। সে ৫৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে জেরুজালেম সম্পূর্ণ ধ্বংস করে, বায়তুল মুকাদ্দাসে আগুন লাগিয়ে তাওরাতের কপিগুলো পুড়িয়ে ফেলে এবং ৪০ হাজার বনী ইসরাঈলকে বন্দি করে ব্যাবিলনে ক্রীতদাস হিসেবে নিয়ে যায়।
- দ্বিতীয় বিপর্যয় ও রোমানদের ধ্বংসযজ্ঞ: পরবর্তীতে পারস্যের সাহায্যে তারা ফিরে এসে পুনরায় শক্তিশালী হয়; কিন্তু আবারও তারা ইয়াহিয়া (আ.)-কে হত্যা করে এবং ঈসা (আ.)-কে হত্যা করার অপচেষ্টা চালায়। তখন আল্লাহ রোমান সেনাপতি টাইটাসকে প্রেরণ করেন (৭০ খ্রিষ্টাব্দে), যে দ্বিতীয়বারের মতো বায়তুল মুকাদ্দাস মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং বনী ইসরাঈলকে সারা বিশ্বে চিরতরে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
(ب) بنو إسرائيل (বনী ইসরাঈল)-এর পরিচয়
ইসরাঈল: ‘ইসরাঈল’ (إسرائيل) ছিল হযরত ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম)-এর উপাধি। হিব্রু ভাষায় এর অর্থ ‘আবদুল্লাহ’ বা আল্লাহর অনুগত বান্দা।
বনী ইসরাঈল: হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর বারো পুত্রের মাধ্যমে যে বারোটি বংশধারার সৃষ্টি হয়, তাদের সমষ্টিকে ‘বনী ইসরাঈল’ বলা হয়। তাঁদের বংশেই হযরত ইউসুফ, মুসা, হারুন, দাউদ, সুলাইমান ও ঈসা (আ.)-সহ হাজার হাজার নবীর আগমন ঘটেছিল। আল্লাহ তাদের তৎকালীন বিশ্বে সবচেয়ে সম্মানিত করেছিলেন, কিন্তু ক্রমাগত নাফরমানির কারণে তারা আল্লাহর লানতে পতিত হয়।
مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (তাফসির শাস্ত্রের গ্রন্থ ও মুফাসসিরদের পর্যালোচনা)
١١- اكتب نبذة عن حياة أبى عبد الله محمد الأنصارى القرطبى، ثم بين مزايا تفسيره-
[১১. আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ আল-আনসারী আল-কুরতুবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ, অতঃপর তাঁর তাফসিরের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]
ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
নাম ও পরিচয়: আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আবু বকর আল-আনসারী আল-কুরতুবী (রহ.)। তিনি আন্দালুসের (বর্তমান স্পেন) সুবিখ্যাত কর্ডোভা (কুরতুবা) নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।
শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য: তিনি মালেকী মাযহাবের শীর্ষ ফকীহ, জাহিদ ও মুফাসসির ছিলেন। কর্ডোভা খ্রিস্টানরা দখল করলে তিনি মিসরে হিজরত করেন এবং সেখানে মিনিয়ার মুনইয়াতু বনী খাসিব নামক স্থানে ইবাদত ও জ্ঞানসাধনায় মগ্ন থেকে ৬৭১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।
তাফসিরে কুরতুবী (‘আল-জামে লি আহকামিল কুরআন’)-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (مزايا تفسيره)
- আহকাম ও ফিকহের বিশ্বকোষ: এটি কেবল তাফসির নয়, বরং তুলনামূলক ফিকহের এক সুবিশাল আকর গ্রন্থ। কুরআনের প্রতিটি আহকাম সংক্রান্ত আয়াত ধরে চার মাযহাবের ইমামদের দলীলভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
- পক্ষপাতহীন ও মধ্যপন্থী বিশ্লেষণ: মালেকী মাযহাবের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো গোঁড়ামি দেখাননি; যেখানে হানাফী বা শাফেয়ী মাযহাবের দলীল শক্তিশালী পেয়েছেন, অকপটে তা গ্রহণ করেছেন।
- আরবি ব্যাকরণ ও ভাষা তত্ত্ব: আরবি কবিতা, নাহু ও সরফের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে আয়াতের মর্মার্থ উদ্ধার করা হয়েছে।
- ইসরাঈলী রেওয়ায়েত পরিহার: অন্যান্য প্রাচীন তাফসিরের মতো ভিত্তিহীন বানোয়াট ইসরাঈলী কিচ্ছা-কাহিনী তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বর্জন করেছেন এবং সেগুলোর অসারতা তুলে ধরেছেন।
١٢- بين خصائص “معالم التنزيل للبغوى” مع بيان منهجه فى تأليفه-
[১২. “মাআলিমুত তানযীল লিল বাগাভী” এর বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং তাঁর রচনার কর্মপদ্ধতি বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইমাম মুহিউস সুন্নাহ আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন ইবনে মাসউদ আল-ফাররা আল-বাগাভী (রহ.) (৪৩৩-৫১৬ হি.) রচিত ‘মাআলিমুত তানযীল’ (معالم التنزيل) বিল-মা’ছূর ধারার তাফসিরের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ।
তাফসিরটির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص التفسير)
- বিশুদ্ধ হাদীসভিত্তিক তাফসির (التفسير بالماثور): কুরআনের আয়াতের তাফসিরে তিনি সহিহ হাদিস, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের বিশ্বস্ত আসারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছেন।
- মুহিউস সুন্নাহর ছোঁয়া: হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অনন্য বুৎপত্তি থাকার কারণে এতে জাল ও চরম দুর্বল বর্ণনার অনুপ্রবেশ ঘটেনি।
- সহজ ও সাবলীল উপস্থাপনা: জটিল দার্শনিক তাত্ত্বিকতা পরিহার করে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল ভাষায় আয়াতের অর্থ স্পষ্ট করা হয়েছে।
- ক্বিরাআত ও শানে নুযূলের সমন্বয়: বিভিন্ন মুতাওয়াতির ক্বিরাআত এবং সহিহ শানে নুযূল উল্লেখের মাধ্যমে আয়াতের মর্ম বিস্তৃত করা হয়েছে।
গ্রন্থটির সংকলন পদ্ধতি বা মানহাজ (منهجه في تأليفه)
- প্রথমে আয়াত উল্লেখ করেন এবং আয়াতটি মাক্কী না মাদানীয় তা স্পষ্ট করেন।
- আয়াতের শব্দার্থ ও শাব্দিক ব্যাখ্যা দেন।
- আয়াত সংশ্লিষ্ট সহিহ হাদিস সনদ বাদ দিয়ে সরাসরি মাতন উল্লেখ করেন যাতে সাধারণ পাঠকের জন্য তা সহজ হয়।
- ফিকহী মাসআলা বিস্তারিত বিতর্কে না গিয়ে সালাফদের সাধারণ আমলের ওপর ছেড়ে দেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘মাগদুব আলাইহিম’ এবং ‘দ্বাল্লীন’ দ্বারা কাদের বোঝানো হয়েছে?
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সহিহ হাদিসের সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী মাগদুব আলাইহিম হলো ইহুদি জাতি এবং দ্বাল্লীন হলো পথভ্রষ্ট খ্রিস্টান জাতি।
২. রাসূলুল্লাহ (সা.) জিবরীল (আ.)-কে তাঁর আসল আকৃতিতে কতবার দেখেছেন?
সহিহ হাদিসের বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.) জিবরীল (আ.)-কে তাঁর মূল ছয়শত ডানা বিশিষ্ট আসল আকৃতিতে সমগ্র জীবনে দুইবার দেখেছেন।
৩. ওহী মূলত কয় প্রকার?
সাধারণভাবে ওহী দুই প্রকার: ১. ওহীয়ে মাতলূ (যা তিলাওয়াত করা হয়, যেমন পবিত্র কুরআন) এবং ২. ওহীয়ে গায়রে মাতলূ (যা তিলাওয়াত করা হয় না, যেমন হাদিস ও সুন্নাহ)।
৪. ‘বনী ইসরাঈল’ নামের উৎপত্তি কীভাবে?
হযরত ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম)-এর আরেক নাম ছিল ‘ইসরাঈল’ (অর্থ আল্লাহর অনুগত বান্দা); তাঁর বারো পুত্রের বংশধরদের বনী ইসরাঈল বলা হয়।
৫. তাফসিরে কুরতুবীর মূল গ্রন্থের নাম কী?
ইমাম কুরতুবী (রহ.) রচিত বিশ্ববিখ্যাত আহকামুল কুরআনের এই তাফসির গ্রন্থের মূল নাম হলো ‘আল-জামে লি আহকামিল কুরআন’ (الجامع لأحكام القرآن)।
৬. নেফাক শব্দের অর্থ কী এবং এর প্রধান আলামত কয়টি?
নেফাক শব্দের অর্থ কপটতা বা অন্তরে কুফর রেখে মুখে ঈমানের দাবি করা; হাদিস অনুযায়ী মুনাফিকের প্রধান আলামত হলো মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, আমানতে খেয়ানত করা এবং ঝগড়ায় অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা।