জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-আকিদাহ মিনাল কিতাব ওয়্যাস-সুন্নাহ (Al-Aqidah minal Kitab was-Sunnah) – 408, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২০

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
৯১ মিনিট পড়ার সময়
১৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٠
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০]
القسم: الحديث والدراسات الإسلامية [বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المادة: العقيدة من الكتاب والسنة [বিষয়: আল-আকিদাহ মিনাল কিতাব ওয়্যাস-সুন্নাহ]
كود المادة [বিষয় কোড]: 408 | كود الامتحان [পরীক্ষা কোড]: 204 | كود ورقة الأسئلة [প্রশ্নপত্র কোড]: 175
الزمن [সময়]: ৪ ঘণ্টা | الدرجات الكاملة [পূর্ণমান]: ৮০

الملاحظة [দ্রষ্টব্য]: أجب عن خمسة من الأسئلة التالية، والدرجات متساوية- [নিচের যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও। সকল প্রশ্নের মান সমান (১৬ × ৫ = ৮০ নম্বর)।]


١- عرف العقيدة- ثم بين تاريخ نشأة هذا الإصطلاح وأهم الكتب المؤلفة فيها-

[১. العقيدة (আল-আকিদাহ)-এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর আকিদা পরিভাষার উৎপত্তির ইতিহাস ও এ বিষয়ে রচিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পর্কে আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: ইসলামি জীবনাদর্শের মূল ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ আকিদা বা বিশ্বাসমালা। আকিদা হলো দ্বীনের মূল শিকড় বা কাণ্ড, আর অন্যান্য নেক আমল হলো তার শাখা-প্রশাখা। কোনো মানুষের আকিদা যদি কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে বিশুদ্ধ না হয়, তবে তার কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয় না।

১. العقيدة (আল-আকিদাহ)-এর পরিচয়:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘আকিদাহ’ (العقيدة) শব্দটি আরবি ‘আল-আকদ’ (العَقْدُ) মূলধাতু থেকে উৎপন্ন। এর আভিধানিক অর্থ হলো—দৃঢ়ভাবে গিট দেওয়া, শক্ত করে বাঁধা, কোনো চুক্তি সম্পন্ন করা, অটল প্রত্যয় গ্রহণ করা এবং সন্দেহমুক্ত বিশ্বাস স্থাপন করা। যে বিশ্বাস মানুষের অন্তরে এমনভাবে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যায় যাকে খোলা যায় না, তাকে আরবিতে আকিদা বলে।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আকিদা হলো—আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত, আসমা ও সিফাত (নাম ও গুণাবলি), ফেরেশতাগণ, আসমানি কিতাবসমূহ, নবী-রাসূলগণ, পরকাল এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের ওপর অন্তরের এমন অটল, দৃঢ় ও সংশয়হীন বিশ্বাস—যাতে সামান্যতম সন্দেহ, দ্বিধা বা দোদুল্যমানতার কোনো অবকাশ থাকে না।
  • আল্লামা জুরজানী (রহ.)-এর সংজ্ঞা: “আকিদা হলো এমন প্রত্যয় যা কোনো সন্দেহ ব্যতিরেকে মানুষের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে।”
  • ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মূল্যায়ন: “আকিদা হলো অন্তরের আমল বা বিশ্বাস, যা অন্তরকে প্রশান্ত ও সুদৃঢ় করে।”

২. আকিদা পরিভাষার উৎপত্তির ইতিহাস (تاريخ نشأة اصطلاح العقيدة):

  • রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের স্বর্ণযুগ: নবুওয়াতের যুগে এবং সাহাবিদের প্রাথমিক যুগে ‘আকিদাহ’ শব্দটি একটি পারিভাষিক শাস্ত্র হিসেবে প্রচলিত ছিল না। তখন দ্বীনের মৌলিক বিশ্বাসকে সরাসরি কুরআনিক পরিভাষা ‘আল-ঈমান’ (الإيمان), ‘আত-তাওহিদ’ (التوحيد) এবং পরবর্তীতে ‘আস-সুন্নাহ’ (السنة) নামে অভিহিত করা হতো। সাহাবিদের বিশ্বাস ছিল নিষ্কলুষ, যুক্তিবাদের জটিলতামুক্ত এবং সরাসরি ওহির নির্দেশের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
  • প্রথম শতাব্দীর শেষভাগ ও বিভ্রান্ত দলসমূহের আত্মপ্রকাশ: খেলাফতে রাশেদার শেষভাগে এবং উমাইয়া শাসনামলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির ফলে বিভিন্ন অনারব সংস্কৃতি ও দর্শনের সংমিশ্রণ ঘটে। এর ফলে খারেজি, শিয়া, কাদারিয়্যা, জাবারিয়্যা ও জাহমিয়্যা নামক বিভ্রান্ত দলসমূহের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তারা তাকদির, কবিরা গুনাহগারদের পরিণতি, আল্লাহর গুণাবলি ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ে নবউদ্ভাবিত প্রশ্ন তুলে উম্মতের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
  • আব্বাসীয় যুগ ও গ্রিক দর্শনের অনুপ্রবেশ: আব্বাসীয় যুগে গ্রিক দর্শন, যুক্তিবিদ্যা (মানতিক) ও মেটাফিজিক্সের গ্রন্থাবলি আরবিতে অনূদিত হয়। এর ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিনির্ভর দল ‘মু’তাযিলা’দের উত্থান ঘটে। তারা ওহির চেয়ে মানবীয় যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে আল্লাহর সিফাত অস্বীকার এবং কুরআন সৃষ্টি (খালকুল কুরআন)-এর মতো মারাত্মক ভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করে।
  • মুহাদ্দিস ও ফকিহগণের প্রতিরোধ এবং শাস্ত্রীয় রূপদান: এই বিভ্রান্তি ও ফিতনা থেকে কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ বিশ্বাসকে রক্ষা করার জন্য আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমাম ও মুহাদ্দিসগণ কলম ধরেন। তাঁরা ওহির সুস্পষ্ট দলিলের আলোকে আকিদার বিষয়গুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে লিপিবদ্ধ করেন। ক্রমান্বয়ে এই বিশ্বাসগত শাস্ত্রটি ‘ইলমুল আকিদাহ’ (علم العقيدة) নামে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

৩. আকিদা শাস্ত্রের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নাম:

  • আল-ফিকহুল আকবার (الفقه الأكبر): ইমাম আবু হানিফা (রহ.) আকিদাকে ‘বৃহত্তর ফিকহ’ নামে অভিহিত করেছেন। কর্মগত ফিকহের চেয়ে বিশ্বাসগত ফিকহ মর্যাদায় বড় বিধায় এই নামকরণ।
  • আস-সুন্নাহ (السنة): বিদআতের বিপরীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের অনুসৃত বিশ্বাসকে চিহ্নিত করতে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলসহ মুহাদ্দিসগণ তাঁদের গ্রন্থকে ‘কিতাবুস সুন্নাহ’ নামে নামকরণ করেন।
  • উসুলুদ দ্বীন (أصول الدين): দ্বীনের অন্যান্য শাখা-প্রশাখার মূল বুনিয়াদ হলো আকিদা, তাই একে ধর্মের মূলনীতি বা উসুলুদ দ্বীন বলা হয়।
  • আত-তাওহিদ (التوحيد): আকিদার মূল বিষয় আল্লাহর একত্ববাদ হওয়ায় অনেকে একে তাওহিদ শাস্ত্র বলেছেন।

৪. আকিদা বিষয়ে রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলি:

  1. আল-ফিকহুল আকবার (الفقه الأكبر): ইমামে আজম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.) [মৃত ১৫০ হি.] রচিত। এটি আকিদা বিষয়ে সংরক্ষিত প্রাচীনতম প্রামাণ্য গ্রন্থ।
  2. কিতাবুস সুন্নাহ (كتاب السنة): ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) [মৃত ২৪১ হি.] এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ (রহ.) রচিত। এতে জাহমিয়্যা ও মু’তাযিলাদের বিভ্রান্তির দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হয়েছে।
  3. কিতাবুত তাওহিদ (كتاب التوحيد): ইমামুল আইম্মা মুহাম্মদ ইবনে খুযায়মাহ (রহ.) [মৃত ৩১১ হি.] রচিত। এতে আসমা ও সিফাত সংক্রান্ত দলিলভিত্তিক প্রমাণ সন্নিবেশিত হয়েছে।
  4. আল-আকিদাতুত তহাবিয়্যাহ (العقيدة الطحاوية): ইমাম আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আত-তহাবী আল-হানাফি (রহ.) [মৃত ৩২১ হি.] রচিত। এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও সর্বজনীন পাঠ্যগ্রন্থ।
  5. আল-ইবানা আন উসুলিদ দিয়ানা (الإبانة عن أصول الديانة): ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনে ইসমাইল আল-আশআরি (রহ.) [মৃত ৩২৪ হি.] রচিত। মু’তাযিলা মতবাদ ত্যাগের পর তিনি সালাফে সালেহীনের বিশুদ্ধ আকিদার সমর্থনে এটি রচনা করেন।
  6. শারহুস সুন্নাহ (شرح السنة): ইমাম আল-হাসান ইবনে আলী আল-বারবাহারী (রহ.) [মৃত ৩২৯ হি.] রচিত। এতে সালাফদের আকিদা ও মানহাজ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে।
  7. লুম’আতুল ই’তিকাদ (لمعة الاعتقاد): ইমাম মুয়াফফাকুদ্দীন ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি (রহ.) [মৃত ৬২০ হি.] রচিত।
  8. আল-আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ (العقيدة الواسطية): শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) [মৃত ৭২৮ হি.] রচিত। কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে রচিত এক কালজয়ী গ্রন্থ।
  9. শারহুল আকিদাতিত তহাবিয়্যাহ (شرح العقيدة الطحاوية): ইমাম সদরুদ্দীন আলী ইবনে আবিল ইয্য আল-হানাফি (রহ.) [মৃত ৭৯২ হি.] রচিত সুবিখ্যাত ও বিস্তারিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

٢- عرف التوحيد ثم بين أنواع التوحيد مفصلا-

[২. التوحيد (আত-তাওহিদ)-এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর তাওহিদের প্রকারভেদ সবিস্তারে আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: তাওহিদ হলো ইসলামের প্রাণ ও ঈমানের ভিত্তিপ্রস্তর। আদম (আ.) থেকে শুরু করে সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত যুগে যুগে যত নবী ও রাসুল পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন, তাঁদের সকলের মূল দাওয়াত ও সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এক আল্লাহর তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা।

১. আত-তাওহিদ (التوحيد)-এর পরিচয়:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘তাওহিদ’ শব্দটি আরবি ‘ওয়াহহাদা-ইউয়াহহিদে’ (وحد – يوحد) ধাতু থেকে বাবে তাফঈলের মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হলো—কোনো কিছুকে একক বা অদ্বিতীয় হিসেবে ঘোষণা করা, একত্ব নির্ধারণ করা এবং কোনো অংশীদার সাব্যস্ত না করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলাকে তাঁর রুবুবিয়্যাত (রব ও প্রতিপালক হিসেবে সার্বিক কর্তৃত্ব), উলুহিয়্যাত (ইবাদত ও আনুগত্য পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা) এবং আসমা ও সিফাত (সুন্দর নাম ও পরিপূর্ণ গুণাবলি)-এ একক, অদ্বিতীয়, অংশীদারহীন ও অতুলনীয় বিশ্বাস করা এবং কায়মনোবাক্যে তা মেনে নিয়ে জীবনে বাস্তবায়ন করার নামই হলো তাওহিদ।
  • শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: “তাওহিদ হলো এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই এবং তিনি ব্যতীত কোনো স্রষ্টা ও সার্বিক নিয়ন্ত্রক নেই।”

২. তাওহিদের প্রকারভেদ (أنواع التوحيد):

পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ এবং সুন্নাহর নির্দেশের সামগ্রিক পর্যালোচনার (ইস্তিকরা) মাধ্যমে সালাফে সালেহীন ও উম্মতের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম তাওহিদকে প্রধানত তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন:

  1. তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত (توحيد الربوبية – প্রভুত্বে একত্ববাদ):
    • সংজ্ঞা: সৃষ্টি করা, নিখিল বিশ্ব পরিচালনা করা, রিজিক প্রদান, জীবন ও মৃত্যু দান, বৃষ্টি বর্ষণ এবং বিশ্বজগতের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে ন্যস্ত—এ বিষয়ে কাউকে তাঁর সমকক্ষ বা শরিক না মেনে আল্লাহকে একক প্রভু হিসেবে বিশ্বাস করার নাম তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত।
    • কুরআনের দলিল: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

      اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ ۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ

      “আল্লাহই প্রতিটি বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত বিষয়ের ওপর কর্মবিধায়ক ও অভিভাবক।” (সূরা আয-যুমার: ৬২)। আরও ইরশাদ হয়েছে: “জেনে রেখো, সৃষ্টি যাঁর, নির্দেশ ও কর্তৃত্বও একমাত্র তাঁর।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৪)।

    • বাস্তবতা ও মুশরিকদের অবস্থা: আরবের কাফের-মুশরিকরাও তাওহিদুর রুবুবিয়্যাতকে সাধারণভাবে স্বীকার করত। তারা বিশ্বাস করত আল্লাহই আকাশ-জমিনের স্রষ্টা ও বৃষ্টিদাতা। কুরআন সাক্ষ্য দেয়: “আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে—আল্লাহ।” (সূরা লুকমান: ২৫)। কিন্তু শুধুমাত্র এটুকু বিশ্বাস তাদের মুসলমান করতে পারেনি, কারণ তারা ইবাদতে মূর্তিদের শরিক করত।
  2. তাওহিদুল উলুহিয়্যাত বা তাওহিদুর রিয়াফাত/ইবাদাত (توحيد الألوهية / توحيد العبادة – ইবাদতে একত্ববাদ):
    • সংজ্ঞা: বান্দার যাবতীয় জাহেরি (প্রকাশ্য) ও বাতেনি (অপ্রকাশ্য) ইবাদত—যেমন নামাজ, রোজা, হজ, দোয়া, সিজদা, মানত, কুরবানি, তাওয়াক্কুল (ভরসা), ভয়, ভালোবাসা ও আশা—একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা এবং এসবের কোনো অংশে অন্য কোনো নবী, ওলি, ফেরেশতা বা সৃষ্টিকে বিন্দুমাত্র শরিক না করাকে তাওহিদুল উলুহিয়্যাত বলে।
    • কুরআনের দলিল: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

      إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ

      “আমরা কেবলমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং কেবলমাত্র তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।” (সূরা আল-ফাতিহা: ৫)। আরও ইরশাদ করেন:

      وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

      “আর আমি নিশ্চয় প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।” (সূরা আন-নাহল: ৩৬)।

    • গুরুত্ব: এই তাওহিদই হলো কুফর ও ইসলামের মধ্যকার সুস্পষ্ট সীমারেখা। এটি প্রতিষ্ঠার জন্যই যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন।
  3. তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত (توحيد الأسماء والصفات – নাম ও গুণাবলিতে একত্ববাদ):
    • সংজ্ঞা: মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এবং তাঁর প্রিয় রাসূল (সা.) সহিহ হাদিসে আল্লাহর যেসব সুন্দর নাম (আল-আসমাউল হুসনা) এবং সুউচ্চ গুণাবলি (সিফাত) সাব্যস্ত করেছেন, সেগুলোকে অবিকল সত্য বলে বিশ্বাস করা।
    • আহলুস সুন্নাহর মৌলিক নীতি: এই গুণাবলি বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহর মূলনীতি হলো—কোনো প্রকার বিকৃতি (তাহরিফ), অস্বীকার (তা’তিল), স্বরূপ নির্ধারণ (তাকয়িফ) কিংবা সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য স্থাপন (তামসিল) ব্যতিরেকে বিশ্বাস করা।
    • কুরআনের অকাট্য দলিল: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

      لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

      “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শুরা: ১১)।

    • যেমন: আল্লাহর কুদরত, রহমত, ইলম, চেহারা, হাত ইত্যাদি সিফাত যা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর ওপর এমনভাবে বিশ্বাস রাখতে হবে যা আল্লাহর শানের উপযুক্ত; সৃষ্টির হাতের মতো বা সৃষ্টির দৃষ্টির মতো নয়।

৩. তাওহিদের তিন প্রকারের পারস্পরিক সম্পর্ক:

তাওহিদের এই তিনটি অংশ একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কোনো ব্যক্তি যদি তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত মানে কিন্তু উলুহিয়্যাত না মানে, সে কাফের বা মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে, যিনি তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত ও আসমা ওয়াস-সিফাত যথাযথভাবে জানবেন, তিনি অবধারিতভাবে যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদন করবেন।


٣- بين أن رسالة محمد صلى الله عليه وسلم عامة، خالدة وناسخة للأديان السابقة-

[৩. আলোচনা কর যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাত সার্বজনীন (عامة), সর্বকালীন (خالدة) ও পূর্বেকার সব ধর্মকে রহিতকারী (ناسخة للأديان السابقة)।]

উত্তর:

ভূমিকা: আখেরি নবী সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াত ও রিসালাত মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশী নেয়ামত। পূর্ববর্তী সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের নবুওয়াতের তুলনায় মহানবী (সা.)-এর রিসালাতের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অনন্য। তাঁর রিসালাতের প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো—এর সার্বজনীনতা, চিরন্তনতা এবং পূর্ববর্তী শরিয়তসমূহের রহিতকরণ।

১. মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতের সার্বজনীনতা (عمومية الرسالة المحمدية):

  • পূর্ববর্তী নবীদের তুলনায় স্বাতন্ত্র্য: আদম (আ.) থেকে ঈসা (আ.) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূল একটি নির্দিষ্ট জাতি, অঞ্চল বা বিশেষ গোত্রের জন্য সাময়িকভাবে প্রেরিত হয়েছিলেন। যেমন: হযরত মূসা ও হযরত ঈসা (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন কেবল বনি ইসরাঈল জাতির জন্য। কিন্তু বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা কোনো বিশেষ বর্ণের মানুষের জন্য পাঠানো হয়নি; বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত পৃথিবীর সমস্ত মানবজাতি এবং জিন জাতির জন্য তিনি বিশ্বনবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন।
  • কুরআনুল কারিমের অকাট্য দলিলসমূহ:
    1. আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন:

      وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا

      “আর আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা সাবা: ২৮)।

    2. আরও ইরশাদ হয়েছে:

      قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا

      “বলুন, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” (সূরা আল-আ’রাফ: ১৫৮)।

    3. তিনি সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত:

      وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

      “আর আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)।

  • সহিহ হাদিসের সুস্পষ্ট প্রমাণ:

    রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের অন্যতম প্রধান মোজেজা ও স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে ইরশাদ করেছেন:

    «وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً، وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً»

    “পূর্বে প্রত্যেক নবীকে বিশেষভাবে কেবল তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হতো, আর আমাকে সমগ্র মানবজাতির নিকট (সার্বজনীনভাবে) প্রেরণ করা হয়েছে।” (সহিহ বুখারি: ৩৩৫; সহিহ মুসলিম: ৫২১)।

২. মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতের চিরন্তনতা (خلود الرسالة المحمدية):

  • খাতামুন নাবিয়্যীন (نبوة خاتمة): মহানবী (সা.)-এর রিসালাত হলো সর্বকালীন ও চিরস্থায়ী। তাঁর আগমনের মাধ্যমে নবুওয়াতের ধারার পূর্ণ সমাপ্তি ঘটেছে। কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন নবী বা রাসূল আগমন করবেন না। আল্লাহ তাআলা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন:

    مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ

    “মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের কারো পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।” (সূরা আল-আহযাব: ৪০)।

  • ঐশী কিতাবের স্থায়ী সংরক্ষণ: পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ বিকৃত হওয়ার কারণে নতুন নবীর প্রয়োজন হতো। কিন্তু মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষত ও অবিকৃত রাখার দায়িত্ব স্বয়ং গ্রহণ করেছেন: “নিশ্চয় আমিই এ উপদেশগ্রন্থ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর পূর্ণ সংরক্ষক।” (সূরা আল-হিজর: ৯)।
  • সর্বকালের সমাধান: মুহাম্মদ (সা.)-এর আনীত ইসলামি শরিয়ত কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সকল সমস্যার সুষম সমাধান দিতে সক্ষম। এর কোনো বিধান কখনো অচল বা সেকেলে হবে না।

৩. পূর্বেকার সব ধর্ম ও শরিয়তকে রহিতকারী (ناسخة للأديان والشرائع السابقة):

  • নাসখের হাকিকত: আল্লাহর হিকমত অনুযায়ী যখন কোনো পূর্ণাঙ্গ বিধান নাজিল হয়, তখন পূর্ববর্তী সাময়িক বিধানসমূহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা রহিত (মানসূখ) হয়ে যায়। ইসলাম হলো আসমানি দ্বীনের চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ। আল্লাহ বলেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদা: ৩)।
  • কুরআনের ঘোষণা: মহানবী (সা.)-এর আগমনের পর তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুরসহ পূর্ববর্তী সমস্ত ধর্ম ও শরিয়ত চূড়ান্তভাবে রহিত হয়ে গেছে। এখন মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র পথ হলো মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতের আনুগত্য করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

    إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ

    “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম।” (সূরা আলে ইমরান: ১৯)। আরও ইরশাদ করেন:

    وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

    “আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অন্বেষণ করবে, তা কখনো তার থেকে কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান: ৮৫)।

  • হাদিসের অকাট্য সাক্ষ্য:
    1. রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! এই উম্মতের যে কোনো ইহুদি বা নাসারা আমার আগমনের খবর শুনবে, অতঃপর আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তার প্রতি ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে, সে অবশ্যই জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সহিহ মুসলিম: ১৫৩)।
    2. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার তাওরাতের কিছু অংশ পাঠ করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন: “হে খাত্তাবের পুত্র! তোমরা কি এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছ? সেই সত্তার শপথ! যদি আজ মূসাও জীবিত থাকতেন, তবে আমার অনুসরণ করা ছাড়া তাঁরও কোনো গত্যন্তর থাকত না।” (মুসনাদে আহমাদ: ১৫১৫৬; সুনানে দারেমী)।

٤- عرف الإيمان- ثم تحدث عن الإيمان بالملائكة والكتب السماوية مفصلا-

[৪. الإيمان (আল-ঈমান)-এর পরিচয় দাও। অতঃপর ফেরেশতা ও আসমানি গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন সম্পর্কে আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: ঈমান হলো একজন মুমিনের পরকালীন মুক্তির একমাত্র পাথেয়। ‘হাদিসে জিবরাইল’-এ বর্ণিত ঈমানের ছয়টি মূল রুকনের মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাওহিদের পরই ফেরেশতামণ্ডলী এবং আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা অপরিহার্য শর্ত।

১. الإيمان (আল-ঈমান)-এর পরিচয়:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘ঈমান’ (الإيمان) শব্দটি আরবি ‘আল-আমন’ (الأمن) ধাতু থেকে গঠিত। এর আভিধানিক অর্থ হলো—কোনো বিষয়ে দৃঢ় সত্যায়ন করা (التصديق), অকুণ্ঠ বিশ্বাস স্থাপন করা, স্বীকৃতি দেওয়া এবং নিরাপত্তা লাভ করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীনের যা কিছু অকাট্য সত্য (মায়লুমুম মিনাদ্দীন বিদ-দারূরাহ) নিয়ে এসেছেন, সেগুলোকে অন্তরে কোনো সংশয় ছাড়া সত্য বলে বিশ্বাস করা, মুখে তা উচ্চারণ ও স্বীকৃতি দেওয়া এবং শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তা কাজে পরিণত করার নাম হলো ঈমান।
  • মুহাদ্দিস ও ফকিহগণের সংজ্ঞা:

    «الإِيمَانُ تَصْدِيقٌ بِالجَنَانِ، وَإِقْرَارٌ بِاللِّسَانِ، وَعَمَلٌ بِالأَرْكَانِ»

    “ঈমান হলো অন্তরের গভীর বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে বাস্তব আমল।”

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও জমহুর হানাফিগণের দৃষ্টিভঙ্গি: ঈমানের মূল রুকন হলো অন্তরের তাসদিক (দৃঢ় প্রত্যয়) এবং মুখে ইকরার (স্বীকৃতি)। নেক আমল হলো ঈমানের সৌন্দর্য ও পূর্ণতা লাভের মাধ্যম। আমল কম-বেশি হওয়ার কারণে ঈমানের নূর ও ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি পায় বা হ্রাস পায়।

২. ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান (الإيمان بالملائكة):

  • ফেরেশতাদের পরিচয় ও সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য:
    • ‘মালাইকা’ শব্দটি ‘মালাক’ (مَلَك) শব্দের বহুবচন, যার অর্থ দূত বা বার্তাবাহক।
    • ফেরেশতাগণ আল্লাহর এক বিশেষ অদৃশ্য ও নিষ্পাপ সৃষ্টি। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (দিব্য জ্যোতি) থেকে, জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে নির্ধূম প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা থেকে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে।” (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৬)।
    • তাঁরা পুরুষ বা নারী নন, পানাহার করেন না, নিদ্রা যান না এবং ক্লান্তি অনুভব করেন না। তাঁরা সর্বদা আল্লাহর তাসবিহ পাঠে মগ্ন থাকেন এবং আল্লাহর দেওয়া নির্দেশ বাস্তবায়নে সদা তৎপর। আল্লাহ বলেন:

      لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

      “তারা আল্লাহ যা আদেশ করেন তা অমান্য করে না এবং যা নির্দেশিত হয় তা নিখুঁতভাবে পালন করে।” (সূরা আত-তাহরিম: ৬)।

  • ফেরেশতাদের প্রতি ঈমানের আবশ্যকতা ও ক্ষেত্রসমূহ:
    1. অস্তিত্বে বিশ্বাস: তাঁদের বাস্তব অস্তিত্ব আছে বলে কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
    2. মর্যাদা ও দায়িত্ব বিশ্বাস: আল্লাহ তাআলা নিখিল বিশ্বের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে ফেরেশতাদের নিয়োজিত রেখেছেন।
    3. প্রধান চার ফেরেশতা:
      • হযরত জিবরাইল (আ.) [রূহুল কুদুস]: নবী-রাসূলগণের নিকট ওহি ও আসমানি বাণী পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত।
      • হযরত মিকাইল (আ.): মেঘমালা সঞ্চালন, বৃষ্টি বর্ষণ এবং সৃষ্টির রিজিক বণ্টনের দায়িত্বে নিয়োজিত।
      • হযরত ইসরাফিল (আ.): শিংগা (সূর) মুখে নিয়ে কিয়ামতের মহাপ্রলয় ও পুনরুত্থানের জন্য আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় দণ্ডায়মান।
      • হযরত আজরাইল (আ.) বা মালাকুল মাউত: বান্দার রূহ কবজ করার দায়িত্বে নিয়োজিত।
    4. অন্যান্য বিশিষ্ট ফেরেশতাবর্গ: আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ (হামালাতুল আরশ), কবরে সওয়াল-জওয়াবকারী ফেরেশতাদ্বয় (মুনকার ও নাকির), মানুষের ভালো-মন্দ আমল লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাগণ (কিরামান কাতিবীন), মানুষের হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ (মুআক্কিবাত), জান্নাতের তত্ত্বাবধায়ক (রেদওয়ান) এবং জাহান্নামের প্রহরী (মালেক ও যাবানিয়া)।

৩. আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান (الإيمان بالكتب السماوية):

  • আসমানি কিতাবের পরিচয়: মানবজাতির হেদায়েত ও সত্য পথপ্রদর্শনের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যুগে যুগে তাঁর রাসূলগণের ওপর যে ঐশী বাণী ও গ্রন্থাবলি অবতীর্ণ করেছেন, তাকে আসমানি কিতাব বলা হয়। এগুলো কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং মহান আল্লাহর প্রত্যক্ষ কালাম (বাণী)।
  • আসমানি কিতাবের প্রতি ঈমানের অপরিহার্য রুকনসমূহ:
    1. ঐশী বাণীতে বিশ্বাস: সকল আসমানি কিতাব আল্লাহর সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠ কালাম—এ বিষয়ে অটল বিশ্বাস রাখা।
    2. নামকরণকৃত কিতাবসমূহে বিশ্বাস: কুরআন ও সহিহ হাদিসে যেসব কিতাবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোতে সুনির্দিষ্টভাবে বিশ্বাস রাখা। আর যাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তাদের ওপর সাধারণভাবে (ইজমালী) বিশ্বাস রাখা।
    3. প্রধান চারটি বিখ্যাত কিতাব:
      • ১. তাওরাত (التوراة): হযরত মূসা (আ.)-এর ওপর হিব্রু ভাষায় অবতীর্ণ।
      • ২. যাবুর (الزبور): হযরত দাউদ (আ.)-এর ওপর সুরিয়ানী ভাষায় অবতীর্ণ।
      • ৩. ইঞ্জিল (الإنجيل): হযরত ঈসা (আ.)-এর ওপর আরামাইক বা সুরিয়ানী ভাষায় অবতীর্ণ।
      • ৪. মহাগ্রন্থ আল-কুরআন (القرآن الكريم): সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর আরবি ভাষায় অবতীর্ণ।
    4. সহিফাসমূহ: বড় কিতাব ছাড়াও আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.), হযরত শীছ (আ.), হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ওপর ক্ষুদ্র পুস্তিকা বা সহিফা অবতীর্ণ করেছিলেন।
    5. কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব ও পূর্ববর্তী কিতাবের বিকৃতি: আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ সংরক্ষণের দায়িত্ব তৎকালীন আহলে কিতাব পন্ডিতদের দিয়েছিলেন। তারা নিজেদের পার্থিব স্বার্থে সেগুলোকে পরিবর্তন ও বিকৃত (তাহরিফ) করে ফেলে। কিন্তু আল-কুরআনকে আল্লাহ তাআলা সমস্ত বিকৃতি থেকে মুক্ত রেখে চিরকালের জন্য অবিকৃত রেখেছেন। আল-কুরআন নাজিলের পর পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের বিধান মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে এবং একমাত্র কুরআনের অনুসারী হওয়া গোটা মানবজাতির জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

٥- تحدث عن الإيمان باليوم الآخر مع بيان أشراط الساعة وأحوال القيامة والشفاعة في ضوء الكتاب والسنة-

[৫. পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস, কিয়ামতের আলামত, হাশর-নাশর ও শাফাআত সম্পর্কে আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: আখেরাত বা পরকালের প্রতি বিশ্বাস ইসলামি আকিদার অন্যতম মৌলিক বুনিয়াদ। পার্থিব জীবন মানুষের চূড়ান্ত ঠিকানা নয়, বরং এটি পরকালের শস্যক্ষেত্র (আদ-দুনয়া মাজরাআতুল আখেরাহ)। পরকালে আল্লাহর সামনে কৃতকর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে—এই অনুভূতিই মানুষকে যাবতীয় অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত রেখে সৎকর্মশীল করে গড়ে তোলে।

১. আখেরাতের প্রতি ঈমানের তাৎপর্য ও বিষয়বস্তু:

  • আখেরাতের প্রতি ঈমান আনার অর্থ হলো—মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে কবরের জিন্দেগী, পুনরুত্থান, শেষ বিচার এবং চিরস্থায়ী জান্নাত বা জাহান্নাম পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা.) যা কিছু বর্ণনা করেছেন, তার সবটুকু কায়মনোবাক্যে সত্য বলে মেনে নেওয়া।
  • এর অন্তর্ভুক্ত প্রধান বিষয়সমূহ:
    1. মৃত্যু ও কবরের জগত (আলমে বারযাখ): রুহের বিচ্ছেদ, মুনকার-নাকিরের সওয়াল-জওয়াব এবং নেককারদের জন্য কবরের নেয়ামত ও বদকারদের জন্য কবরের শাস্তি (আজাবুল কবর) অকাট্য সত্য।
    2. পুনরুত্থান (আল-বা’স বা’দাল মাউত): ইসরাফিল (আ.)-এর দ্বিতীয় ফুৎকারের পর সমস্ত মানবজাতি পুনরায় জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে। আল্লাহ বলেন: “তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনিই পুনরুজ্জীবিত করবেন।” (সূরা আর-রূম: ২৭)।
    3. হাশর ও আমলনামা প্রকাশ: ৫০ হাজার বছরের সমপরিমাণ দীর্ঘ দিনে সূর্য অতি নিকটে থাকবে এবং মানুষের আমলনামা ডান অথবা বাম হাতে প্রদান করা হবে।
    4. মিজান (দাঁড়িপাল্লা) ও হিসাব: মানুষের ভালো-মন্দ আমল ওজন করার জন্য ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে।
    5. সিরাত (পুলসিরাত): জাহান্নামের ওপর স্থাপিত চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম ও তলোয়ারের চেয়ে ধারালো পুল পার হতে হবে। নেককারগণ বিদ্যুতের গতিতে তা পার হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন, আর কাফের-পাপীরা জাহান্নামে পতিত হবে।
    6. হাউজে কাওসার: রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বহস্তে তাঁর খাঁটি উম্মতদের দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি হাউজের পানি পান করাবেন।

২. কিয়ামতের আলামতসমূহ (أشراط الساعة):

কুরআন ও হাদিসের আলোকে কিয়ামতের আলামতসমূহকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • ক. ছোট আলামতসমূহ (الأشراط الصغرى):
    1. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াত ও ওফাত।
    2. ইলম ও দ্বীনি জ্ঞানের বিলুপ্তি এবং মূর্খতার বিস্তার।
    3. অশ্লীলতা, ব্যভিচার ও মাদকাসক্তির ব্যাপকতা।
    4. অযোগ্য ও নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের নেতা নির্বাচিত করা এবং আমানতের খেয়ানত।
    5. দাসীর গর্ভ থেকে তার মনিবের জন্ম হওয়া এবং রাখালদের সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা।
  • খ. বড় আলামতসমূহ (الأشراط الكبرى):
    1. ইমাম মাহদীর আত্মপ্রকাশ: শেষ জামানায় উম্মতের নেতৃত্ব দিতে হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর থেকে ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে ইমাম মাহদীর আগমন।
    2. মহাপ্রতারক দাজ্জালের আবির্ভাব: অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনকারী কানা দাজ্জালের আবির্ভাব এবং মানুষকে কুফরির দিকে আহ্বান।
    3. হযরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ: দামেস্কের সাদা মিনারে তিনি অবতরণ করবেন, দাজ্জালকে হত্যা করবেন, ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর শরিয়ত মোতাবেক ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন।
    4. ইয়াজুজ ও মাজুজের আগমন: জুলকারনাইনের প্রাচীর ভেঙে এক বর্বর মানবগোষ্ঠীর বিশ্বজুড়ে বিপর্যয় সৃষ্টি।
    5. তিনটি বিশাল ভূ-ধস: প্রাচ্যে, পাশ্চাত্যে ও আরব উপদ্বীপে তিনটি বড় ভূমিধস সংঘটিত হওয়া।
    6. ধোঁয়াশা (আদ-দুখান): সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাসকারী এক বিশেষ ধোঁয়ার প্রকাশ।
    7. পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়: এরপর তাওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
    8. দাব্বাতুল আরদের প্রকাশ: জমিন ফুঁড়ে এক অদ্ভুত প্রাণীর আত্মপ্রকাশ, যা মুমিন ও কাফেরকে চিহ্নিত করে দেবে।
    9. ইয়ামেন থেকে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড: এক অগ্নিকাণ্ড বের হয়ে মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে।

৩. শাফাআত (الشفاعة)-এর হাকিকত ও প্রকারভেদ:

  • শাফাআতের সংজ্ঞা: অন্যের কল্যাণ সাধন বা বিপদ দূর করার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করাকে শাফাআত বলে।
  • শাফাআতের দুটি অপরিহার্য শর্ত: ১. আল্লাহর অনুমতি (ইযন) থাকা এবং ২. যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা (সূরা আল-আম্বিয়া: ২৮)। মুশরিকদের জন্য কোনো শাফাআত হবে না।
  • শাফাআতের প্রকারভেদ:
    • ১. শাফাআতে কুবরা বা উজমা (সর্বশ্রেষ্ঠ সুপারিশ): হাশরের ময়দানে অসহ্য ভিড় ও গরমে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে আদম, নূহ, ইব্রাহিম, মূসা ও ঈসা (আ.)-এর কাছে যাবে এবং তাঁরা অপারগতা প্রকাশ করবেন, তখন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) আরশের নিচে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে মহান আল্লাহর স্তুতি গাইবেন। অতঃপর আল্লাহর অনুমতি পেয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য যে ঐতিহাসিক সুপারিশ করবেন, তাকে শাফাআতে কুবরা বলে। এটিই হলো রাসূল (সা.)-এর জন্য নির্ধারিত ‘মাকামে মাহমুদ’।
    • ২. জান্নাতের দরজা খোলার সুপারিশ: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুপারিশের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম জান্নাতের তোরণ উন্মুক্ত হবে।
    • ৩. কবিরা গুনাহগারদের ক্ষমার সুপারিশ: যেসব ঈমানদার কবিরা গুনাহের কারণে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়েছিল বা জাহান্নামে প্রবেশ করেছিল, তাদের মুক্তির জন্য নবীজি সুপারিশ করবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

      «شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي»

      “আমার শাফাআত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের জন্য নির্ধারিত।” (সুনানে তিরমিজি: ২৪৩৫; আবু দাউদ)।

    • ৪. অন্যান্যদের সুপারিশ: আল্লাহর অনুমতিক্রমে অন্যান্য নবী-রাসূলগণ, শহীদগণ, ওলামায়ে কেরাম, হাফেজে কুরআন এবং নিষ্পাপ সন্তানরাও তাদের আত্মীয়দের জন্য সুপারিশ করার সৌভাগ্য লাভ করবে।

٦- عرف القضاء والقدر لغة واصطلاحا، ثم بين مراتب القدر وأثره في حياة المسلم-

[৬. কাজা ও কদর (তাকদির)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা কর। অতঃপর তাকদিরের স্তরসমূহ এবং মুসলিম জীবনে তাকদিরে বিশ্বাসের প্রভাব আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: তাকদির বা ভাগ্যের ভালো-মন্দের ওপর ঈমান রাখা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদার অন্যতম মৌলিক রুকন। মহাবিশ্বের প্রতিটি অনু-পরমাণুর গতিবিধি এবং মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর চিরন্তন পরিকল্পনা ও জ্ঞানের অধীন—এই বিশ্বাস মানুষকে আত্মপ্রত্যয়ী ও অহংকারমুক্ত করে।

১. কাজা ও কদর (القضاء والقدر)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • কদর (القدر)-এর অর্থ:
    • আভিধানিক অর্থ: পরিমাপ করা, নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা, পরিমাণ স্থির করা এবং সম্মান দান করা।
    • পারিভাষিক অর্থ: বিশ্বজগৎ সৃষ্টির পূর্বেই প্রতিটি সৃষ্টির রূপরেখা, কর্ম, রিজিক, জীবনকাল এবং চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর অনাদি-অনন্ত জ্ঞান অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট পরিমাপ নির্ধারণ করার নাম কদর।
  • কাজা (القضاء)-এর অর্থ:
    • আভিধানিক অর্থ: ফায়সালা করা, হুকুম দেওয়া, কোনো বিষয় সুসম্পন্ন করা এবং বাস্তবায়ন করা।
    • পারিভাষিক অর্থ: অতীতে নির্ধারিত কদর বা পরিমাপ অনুযায়ী যথাসময়ে আল্লাহর ইচ্ছা ও হুকুমে বাস্তব জগতে কোনো ঘটনা ঘটিয়ে দেওয়ার নাম কাজা।
  • কাজা ও কদরের পার্থক্য ও সমন্বয়: কদর হলো মূল নীলনকশা বা পরিমাপ, আর কাজা হলো সেই নকশার বাস্তব রূপায়ণ। তবে ব্যাপক অর্থে উভয় পরিভাষাকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

২. তাকদিরের চারটি স্তর (مراتب القدر الأربعة):

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদা অনুযায়ী তাকদিরের প্রতি ঈমান পূর্ণ হওয়ার জন্য চারটি স্তর মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা অপরিহার্য:

  1. প্রথম স্তর: আল-ইলম (مرتبة العلم – সর্বব্যাপী জ্ঞান):

    আল্লাহ তাআলা অনাদি কাল থেকে সব বিষয়ে পরিপূর্ণ ও নিখুঁত জ্ঞান রাখেন। অতীতে কী ঘটেছে, বর্তমানে কী ঘটছে এবং ভবিষ্যতে কী ঘটবে—তা সবই তিনি জানেন। এমনকি যা ঘটেনি, তা যদি ঘটত তবে কেমন হতো তাও তিনি জানেন। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-আনকাবুত: ৬২)।

  2. দ্বিতীয় স্তর: আল-কিতাবাহ (مرتبة الكتابة – লিপিবদ্ধকরণ):

    আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির সমস্ত বিষয় লওহে মাহফুজে কলম দিয়ে লিখে রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

    «كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلَائِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ»

    “আল্লাহ তাআলা আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সমস্ত সৃষ্টির তাকদির নির্ধারণ করে লিখে রেখেছেন।” (সহিহ মুসলিম: ২৬৫৩)।

  3. তৃতীয় স্তর: আল-মাশিয়াহ ওয়াল ইরাদাহ (مرتبة المشيئة والإرادة – আল্লাহর ইচ্ছা):

    মহাবিশ্বে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কোনো কিছুই সংঘটিত হতে পারে না। তিনি যা চান তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হয়, আর যা তিনি চান না তা কোনোদিন হতে পারে না। ভালো বা মন্দ—সবই তাঁর সৃষ্টিগত ইচ্ছার অধীন। আল্লাহ বলেন: “আর বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ না চাইলে তোমরা কোনো ইচ্ছাই করতে পার না।” (সূরা আত-তাকভীর: ২৯)।

  4. চতুর্থ স্তর: আল-খালক (مرتبة الخلق – সৃষ্টি):

    আল্লাহ তাআলাই হলেন সমস্ত বস্তুর একমাত্র স্রষ্টা। বান্দা নিজে এবং বান্দার কর্ম—সবকিছুর মূল স্রষ্টা হলেন আল্লাহ। তবে আল্লাহ মানুষকে ভালো ও মন্দের মধ্যে বাছাই করার সীমিত স্বাধীনতা ও ইচ্ছা (ইখতিয়ার) দিয়েছেন, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষের জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারিত হবে। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা কর তাও।” (সূরা আস-সাফফাত: ৯৬)।

৩. মুসলিম জীবনে তাকদিরে বিশ্বাসের বাস্তব সুদূরপ্রসারী প্রভাব:

  • বিপদে ধৈর্য ও মানসিক প্রশান্তি: জীবনে কোনো দুঃখ-কষ্ট বা আর্থিক ক্ষতি এলে মুমিন হতাশায় নিমজ্জিত হয় না। সে মনে করে—এটি আল্লাহর ফায়সালা ছিল, যা কোনো সৃষ্টির পক্ষে রোধ করা সম্ভব ছিল না। ফলে সে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে অবিচল থেকে ধৈর্য ধারণ করে।
  • সাফল্যে অহংকার থেকে মুক্তি: কোনো পরীক্ষায় ভালো ফল করলে বা ব্যবসায় প্রভূত উন্নতি হলে মুমিন আত্মঅহমিকায় লিপ্ত হয় না; বরং সে উপলব্ধি করে যে এটি আল্লাহর অপার অনুগ্রহ ও কদরের নির্ধারণ। ফলে সে কৃতজ্ঞতায় সিজদাবনত হয়।
  • অসীম সাহস ও নির্ভীকতা: মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে জীবন ও মৃত্যুর মালিক একমাত্র আল্লাহ এবং তাকদিরে নির্ধারিত সময়ের এক সেকেন্ড আগেও মৃত্যু আসবে না, তখন সে বাতিলের সামনে বুক চিতিয়ে সত্য উচ্চারণের অদম্য সাহস অর্জন করে।
  • পরনির্ভরশীলতা ও হতাশা দূরীকরণ: তাকদিরে বিশ্বাসী ব্যক্তি কখনো রিজিকের জন্য মানুষের তোষামোদ করে না এবং আত্মহত্যার মতো জঘন্য পাপে লিপ্ত হয় না।

٧- بين عقيدة أهل السنة والجماعة في الصحابة الكرام رضي الله عنهم، وعدالتهم، وأهل البيت، والخلافة الراشدة-

[৭. সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর মর্যাদা, তাঁদের সার্বজনীন ন্যায়পরায়ণতা (আদালাতুস সাহাবা), আহলে বাইত এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের খিলাফত সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: সাহাবায়ে কেরাম (রা.) হলেন উম্মতে মুহাম্মদীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত মানবমণ্ডলী। আম্বিয়ায়ে কেরামের পর এই জমিনের বুকে তাঁদের চেয়ে উত্তম মানুষ আর কেউ আসেনি এবং কিয়ামত পর্যন্ত আসবেও না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হলো সকল সাহাবির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা পোষণ করা এবং তাঁদের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা।

১. সাহাবির পরিচয় ও আদালাত (عدالة الصحابة الكرام):

  • সাহাবির সংজ্ঞা: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মতে: “সাহাবি হলেন সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যিনি ঈমানের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ঈমানের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন।”
  • আদালাতুস সাহাবা (সার্বজনীন ন্যায়পরায়ণতা): আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ঐকমত্যপূর্ণ (ইজমা) আকিদা হলো—«الصَّحَابَةُ كُلُّهُمْ عُدُولٌ» অর্থাৎ সকল সাহাবিই সামগ্রিকভাবে ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত। শরিয়তের বর্ণনাকারী হিসেবে তাঁদের কাউকে কোনো প্রকার সন্দেহ বা জেরা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
  • কুরআনুল কারিমের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা:

    وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ

    “আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণ করেছে—আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।” (সূরা আত-তাওবাহ: ১০০)।

  • সহিহ হাদিসের সতর্কবাণী:

    রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

    «لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ، وَلَا نَصِيفَهُ»

    “তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিও না! সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তবুও তাদের এক মুদ (অঞ্জলি) বা অর্ধ মুদ দানের সমকক্ষ হতে পারবে না।” (সহিহ বুখারি: ৩৬৭৩; সহিহ মুসলিম: ২৫৪০)।

  • পারস্পরিক মতানৈক্যে আহলুস সুন্নাহর অবস্থান: পরবর্তীতে সাহাবিদের মধ্যে যেসব যুদ্ধ বা রাজনৈতিক মতভেদ সংঘটিত হয়েছিল (যেমন সিফফীন ও জামালের যুদ্ধ), সে বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর সুদৃঢ় অবস্থান হলো—সবাই নিষ্ঠাবান মুজতাহিদ ছিলেন। সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত ব্যক্তি দুটি সওয়াব এবং ভুলকারী একটি সওয়াব লাভ করবেন। সুতরাং তাঁদের প্রতি জবান সংযত রাখা এবং তাঁদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করাই মুমিনের কর্তব্য।

২. আহলে বাইত (রাসূলুল্লাহর পরিবারবর্গ)-এর প্রতি আকিদা:

  • আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পূত-পবিত্র আহলে বাইত—তাঁর পুণ্যবতী স্ত্রীগণ (উম্মাহাতুল মুমিনীন) এবং হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান, হুসাইন (রা.) ও তাঁদের বংশধরদের গভীর ভক্তি, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করে।
  • কুরআনে তাঁদের পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়েছে: “হে নবী পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণ পবিত্র করতে।” (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)।
  • ভারসাম্যপূর্ণ পথ: আহলুস সুন্নাহ এক্ষেত্রে চরমপন্থীদের মতো তাঁদেরকে নিষ্পাপ (মা’সুম) মনে করে খোদায়ি মর্যাদায় আসীন করে না (যেমন শিয়ারা করে), আবার নাসেবি বা খারেজিদের মতো তাঁদের অবমূল্যায়নও করে না; বরং ইনসাফের সাথে তাঁদের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে।

৩. খুলাফায়ে রাশেদীনের খিলাফত ও ফজিলতের স্তরবিন্যাস:

আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত বিশ্বাস অনুযায়ী নবুওয়াতের নীতিতে পরিচালিত খেলাফতে রাশেদার মেয়াদ ছিল ত্রিশ বছর। চার খলিফার ফজিলত ও মর্যাদার ক্রমধারা তাঁদের খিলাফত প্রাপ্তির ধারাক্রম অনুযায়ী নির্ধারিত:

  1. হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.): নবীদের পর সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, রাসুলের গুহার সঙ্গী এবং ইসলামের প্রথম খলিফা।
  2. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.): বাতিলের আতঙ্ক, সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী ফারুক এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা।
  3. হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.): দুই নূরের অধিকারী (জুন্নুরাইন), কুরআনের সংকলক ও তৃতীয় খলিফা।
  4. হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.): আসাদুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ), মহাবীর, প্রজ্ঞার আধার ও চতুর্থ খলিফা।

ইমাম তহাবী (রহ.) বলেন: “আমরা আবু বকর সিদ্দিকের খিলাফতকে সর্বপ্রথম সাব্যস্ত করি, অতঃপর উমর ইবনুল খাত্তাব, অতঃপর উসমান ইবনে আফফান, অতঃপর আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর খিলাফতকে বিশ্বাস করি। তাঁরাই হলেন সত্যনিষ্ঠ খুলাফায়ে রাশেদীন।”


٨- بين مفهوم الشرك والبدعة وأقسامهما، وخطر نواقض الإيمان في ضوء القرآن والسنة-

[৮. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শিরক ও বিদআতের পরিচয়, প্রকারভেদ এবং ঈমান ভঙ্গের কারণসমূহ (নাওয়াকিদুল ঈমান)-এর ভয়াবহতা আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা: মানুষের ঈমান ও আমলকে ধ্বংসকারী সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাধি হলো শিরক, বিদআত ও কুফর। একজন মুসলমানের জন্য সহিহ আকিদা গ্রহণের পাশাপাশি যেসব কারণে আকিদা বিনষ্ট হয়ে যায় তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনে সেগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা অপরিহার্য।

১. الشرك (শিরক)-এর পরিচয় ও প্রকারভেদ:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘শিরক’ (الشرك) শব্দের অর্থ অংশীদারিত্ব, সমকক্ষ নির্ধারণ বা শরিক করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: যেসব বিশেষত্ব ও অধিকার একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত (যেমন: সৃষ্টি করা, পরিচালনা, গায়েব জানা, সেজদা ও দোয়া পাওয়া)—সেগুলোতে সৃষ্টিজগতের কোনো সত্তাকে আল্লাহর সমকক্ষ বা অংশীদার সাব্যস্ত করার নাম শিরক।
  • শিরকের ভয়াবহতা: শিরক হলো ক্ষমার অযোগ্য সবচেয়ে বড় জুলুম ও মহাপাপ। আল্লাহ বলেন:

    إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

    “নিশ্চয় শিরক হলো চরমতম মহাপাপ ও জুলুম।” (সূরা লুকমান: ১৩)। আরও ইরশাদ করেন:

    إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ

    “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আন-নিসা: ৪৮)।

  • শিরকের প্রকারভেদ:
    1. শিরকে আকবার (بزرগ বা বড় শিরক): যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে পুরোপুরি খারিজ করে দেয় এবং তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে চিরস্থায়ী জাহান্নামি করে। যেমন: আল্লাহ ছাড়া কোনো কবর, মাজার বা পীরকে সেজদা করা, মৃত ব্যক্তির কাছে সন্তান বা আরোগ্য প্রার্থনা করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু উৎসর্গ করা।
    2. শিরকে আসগার (ছোট শিরক): যা ব্যক্তিকে কাফের বানায় না কিন্তু কবিরা গুনাহের চেয়েও মারাত্মক। যেমন: লোকদেখানো ইবাদত (রিয়া), গাইরুল্লাহর নামে শপথ করা বা কথায় কথায় বলা—”আল্লাহ এবং আপনি যা চান”। রাসূল (সা.) বলেছেন: “আমি তোমাদের ওপর যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই তা হলো ছোট শিরক বা রিয়া।” (মুসনাদে আহমাদ)।

২. البدعة (বিদআত)-এর পরিচয় ও ক্ষতিসাধন:

  • আভিধানিক অর্থ: পূর্ববর্তী কোনো নমুনা ছাড়াই নতুন কিছু উদ্ভাবন করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: সওয়াবের আশায় দ্বীনের ভেতর এমন কোনো নতুন বিশ্বাস, ইবাদত বা আচার-পদ্ধতি সংযোজন করা যার কোনো সরাসরি বা ইঙ্গিতপূর্ণ ভিত্তি কুরআন, হাদিস বা সাহাবিদের আমলে ছিল না।
  • বিদআতের ব্যাপারে হাদিসের হুঁশিয়ারি:

    রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেছেন:

    «مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ، فَهُوَ رَدٌّ»

    “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের ভেতর এমন কোনো নতুন বিষয়ের সংযোজন করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)। তিনি আরও ইরশাদ করেন: “প্রতিটি নবউদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত, আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা, এবং প্রতিটি ভ্রষ্টতার পরিণতিই জাহান্নাম।” (সুনানে আবু দাউদ ও নাসায়ী)।

  • বিদআতের ক্ষতি: বিদআত সুন্নাতকে হত্যা করে, মনগড়া ইবাদত দ্বারা আল্লাহর নৈকট্যের বদলে দূরবর্তী হওয়া ছাড়া আর কিছুই লাভ হয় না।

৩. ঈমান ভঙ্গের প্রধান কারণসমূহ (نواقض الإيمان):

ইসলামি ফিকহ ও আকিদা বিশারদগণ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এমন দশটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন যা সংঘটিত হলে একজন মানুষের ঈমান তৎক্ষণাৎ বাতিল হয়ে যায় এবং সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য হয়:

  1. ইবাদতে আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা: আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট বিপদমুক্তি বা সন্তান চাওয়া।
  2. আল্লাহ ও বান্দার মাঝে মাধ্যম স্থাপন করা: কোনো ওলি বা পীরকে মাধ্যম বানিয়ে তাদের ওপর তাওয়াক্কুল করা এবং তাদের সুপারিশ ছাড়া আল্লাহ শুনবেন না এমন বিশ্বাস করা।
  3. মুশরিক ও কাফেরদের কাফের মনে না করা: ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু বা মুরতাদদের কুফরিতে সন্দেহ পোষণ করা বা তাদের ধর্মকে সঠিক মনে করা।
  4. রাসূল (সা.)-এর হেদায়েত অপেক্ষা মানবীয় আইনকে শ্রেষ্ঠ মনে করা: আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে মানবপ্রণীত ধর্মনিরপেক্ষ বা কুফরি শাসনব্যবস্থাকে ইসলামি বিচার ব্যবস্থার চেয়ে উত্তম মনে করা।
  5. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনীত কোনো বিধান বা সুন্নাতকে অন্তরে ঘৃণা করা: পর্দা, দাড়ি, জিহাদ বা ইসলামি শরিয়তের কোনো হুকুমকে অপছন্দ করা।
  6. দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে উপহাস বা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা: কুরআন, হাদিস, জান্নাত-জাহান্নাম বা শরিয়তের কোনো নিয়ম নিয়ে ঠাট্টা করা। আল্লাহ বলেন: “তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে? কোনো ওজর পেশ করো না, তোমরা ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।” (সূরা আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)।
  7. জাদু-টোনা করা বা জাদুর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা: তন্ত্র-মন্ত্র ও শয়তানি কুফরি দ্বারা কাউকে বশীভূত বা বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস চালানো।
  8. মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফের-মুশরিকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা: মুসলমানদের ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ইসলামবিরোধীদের সাহায্য করা।
  9. শরিয়তের ঊর্ধ্বে অবস্থান করার দাবি করা: এমন বিশ্বাস করা যে মারিফতের বিশেষ স্তরে পৌঁছালে নামাজ-রোজার শরিয়তি বিধান বাতিল হয়ে যায়।
  10. দ্বীন ইসলাম শেখা ও আমল করা থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ থাকা: ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন না করা এবং শরিয়তকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করা।

উপসংহার: একজন মুসলিমকে সহিহ আকিদার ওপর আমৃত্যু টিকে থাকতে হলে অবশ্যই শিরক, বিদআত এবং ঈমান বিধ্বংসী এই কারণগুলো থেকে সতর্কতার সাথে বেঁচে থাকতে হবে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (Frequently Asked Questions – FAQ)

প্রশ্ন ১: ফাজিল ৪র্থ বর্ষের হাদিস বিভাগে ‘আল-আকিদাহ মিনাল কিতাব ওয়্যাস-সুন্নাহ’ (বিষয় কোড: 408) পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৌশল কী?

উত্তর: প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে প্রামাণ্য সংজ্ঞা দিয়ে ভূমিকা শুরু করতে হবে। এরপর কুরআনুল কারিমের সংশ্লিষ্ট আয়াতের আরবি পাঠ ও অর্থ এবং সিহাহ সিত্তাহ থেকে প্রামাণ্য সহিহ হাদিসের রেফারেন্স উল্লেখ করতে হবে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সালাফে সালেহীনের বক্তব্য সুস্পষ্ট সাব-হেডিং আকারে সাজিয়ে লিখলে সর্বোচ্চ নম্বর নিশ্চিত করা যায়।

প্রশ্ন ২: আকিদার প্রশ্নের উত্তরে কি আরবি দলিল ও উদ্ধৃতি দেওয়া বাধ্যতামূলক?

উত্তর: হুবহু আরবি উদ্ধৃতি দেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও মৌলিক আয়াতাংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ হাদিসের বাক্য আরবিতে লিখে নিচে অর্থ উল্লেখ করলে উত্তরের মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় এবং পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হয়।

প্রশ্ন ৩: তাওহিদের প্রকারভেদ বর্ণনার সময় সালাফ ও পরবর্তী ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় কীভাবে করতে হয়?

উত্তর: সালাফে সালেহীন কুরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে তাওহিদকে রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত এবং আসমা ওয়াস-সিফাত—এই তিন ভাগে বিন্যস্ত করেছেন। অন্যদিকে কালাম শাস্ত্রবিদগণ তাওহিদ ফিল জাত, সিফাত ও আফ’আল হিসেবে ভাগ করেছেন। উভয় বিভাজনের সারবস্তু একই—অর্থাৎ আল্লাহকে সত্তা, গুণাবলি এবং ইবাদতে অদ্বিতীয় মানা। এই বিষয়টি উত্তরে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা বাঞ্ছনীয়।

প্রশ্ন ৪: ফাজিল পরীক্ষার মূল উত্তরপত্রে কি আরবি পরিভাষাগুলো বাংলা ও আরবি উভয় লিপিতে লেখা যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, বরং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি পরিভাষাগুলো (যেমন: توحيد الألوهية, عدالة الصحابة, مراتب القدر ইত্যাদি) বাংলা লিপির পাশাপাশি ব্র্যাকেটে আরবিতে লিখে দিলে উত্তর আরও অধিক প্রাঞ্জল ও আন্তর্জাতিক মানের হয়।

প্রশ্ন ৫: এই উত্তরমালায় কি নির্ভরযোগ্য আকিদার কিতাবসমূহের তথ্য অনুসরণ করা হয়েছে?

উত্তর: হ্যাঁ, এতে ইমাম আবু হানিফার ‘আল-ফিকহুল আকবার’, ইমাম তহাবীর ‘আল-আকিদাতুত তহাবিয়্যাহ’, ইমাম ইবনে আবিল ইয্য আল-হানাফির ‘শারহুত তহাবিয়্যাহ’ এবং ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ‘আল-আকিদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ’ সহ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের প্রামাণ্য শাস্ত্রগ্রন্থের আলোকে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜