জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-ফিকহ ওয়া উসুলুহু (Al-Fiqh wa Usuluhu) – 203307, দাওয়াহ্ ও ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৬৩ মিনিট পড়ার সময়
৯ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: 203 | প্রশ্নপত্র কোড: 093
اختبار السنة الثالثة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الفقه وأصوله
[আল-ফিকহ ওয়া উসুলুহু]
বিষয় কোড: 203307
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن سؤالين من كل من المجموعتين (أ، ج) وعن أربعة من كل من المجموعتين (ب، د)
[দ্রষ্টব্য: (أ) ও (ج) প্রত্যেক গ্রুপ থেকে দুটি করে এবং (ب) ও (د) প্রত্যেক গ্রুপ থেকে চারটি করে মোট ১২টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (أ) [الفقه – أسئلة موسعة / বিভাগ ‘ক’ – ফিকহ রচনামূলক]

মান: ১০ × ২ = ২০ (যেকোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

١- عرّف البيع وبيّن أركانه وشروطه مع الأدلة-

[১. আল-বাই’ (ক্রয়-বিক্রয়)-এর সংজ্ঞা দাও এবং দলিলের সাহায্যে এর রুকন ও শর্তাবলী বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

মানবজীবনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ক্রয়-বিক্রয় (আল-বাই’)। ইসলামে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনাকে অত্যন্ত উৎসাহিত করা হয়েছে এবং সুদ, প্রতারণা ও শোষণমূলক সকল লেনদেনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফিকহে ইসলামির লেনদেন অধ্যায়ে বাই’-এর বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

আল-বাই’-এর সংজ্ঞা (تعريف البيع)

শাব্দিক অর্থ: ‘বাই’ (البيع) আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বিনিময় করা, ক্রয় করা বা বিক্রয় করা।

পারিভাষিক অর্থ: ফকিহগণের পরিভাষায়:

مُبَادَلَةُ مَالٍ بِمَالٍ بِالتَّرَاضِي عَلَى وَجْهٍ مَخْصُوصٍ

“উভয় পক্ষের পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে শরীয়তসম্মত নির্দিষ্ট উপায়ে এক সম্পদের বিনিময়ে অপর সম্পদ হস্তান্তর করাকে বাই’ বা ক্রয়-বিক্রয় বলে।”

বৈধতার দলিল: আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

“আল্লাহ তায়ালা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

বাই’-এর রুকনসমূহ (أركان البيع)

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বাই’-এর মূল রুকন হলো ঈজাব (إيجاب – প্রস্তাব) এবং কবুল (قبول – গ্রহণ)। ক্রেতা ও বিক্রেতার পারস্পরিক সম্মতি প্রকাশের মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হয়। জমহুর ফকিহগণের মতে রুকন চারটি: ১. আক্বিদাইন (বিক্রেতা ও ক্রেতা), ২. সীগাহ (ঈজাব ও কবুল), ৩. মা’কূদ আলাইহি (বিক্রিত পণ্য) এবং ৪. সামান (মূল্য)।

বাই’-এর আবশ্যকীয় শর্তাবলী (شروط البيع)

  1. চুক্তিকারীদের শর্ত (শুরুতুল আক্বিদাইন): ক্রেতা ও বিক্রেতাকে অবশ্যই বিবেকবান (আকিল) এবং ভালো-মন্দ বোঝার মতো অনুভূতিসম্পন্ন (মুমাইয়েয) হতে হবে। পাগল বা অবুঝ শিশুর চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
  2. পারস্পরিক সন্তুষ্টি (আত-তারাযী): কোনো পক্ষকে বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তির শিকার করা যাবে না: “তোমরা নিজেদের মধ্যে অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।” (সূরা আন-নিসা: ২৯)
  3. পণ্যটি শরীয়তসম্মত মাল হওয়া (মালিয়্যাত): পণ্যটি ইসলামি শরিয়তে বৈধ ও পবিত্র সম্পদ হতে হবে। মদ, শূকর, মৃত প্রাণী বা অপবিত্র বস্তুর ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ হারাম ও বাতিল।
  4. পণ্যের মালিকানা ও হস্তান্তরের সক্ষমতা: বিক্রেতার অবশ্যই পণ্যের মালিকানা থাকতে হবে অথবা বিক্রির ক্ষমতা থাকতে হবে। যা নিজের দখলে নেই বা হস্তান্তর করা অসম্ভব (যেমন সাগরের মাছ বা উড়ন্ত পাখি), তা বিক্রি করা নিষিদ্ধ: “তুমি এমন বস্তু বিক্রি করো না যা তোমার কাছে নেই।” (তিরমিজি)
  5. পণ্য ও মূল্য সুনির্দিষ্ট ও জ্ঞাত হওয়া: পণ্য ও মূল্যের পরিমাণ, গুণমান ও ধরন উভয় পক্ষের কাছে স্পষ্ট হতে হবে। কোনো ধরনের অজ্ঞতা (জাহালাত) বা জুয়ার ঝুঁকি (গারার) থাকলে সে চুক্তি ফাসিদ হয়ে যাবে।

উপসংহার

ইসলামি ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান মানবজাতিকে ধোঁকাবাজি ও শোষণ থেকে রক্ষা করে এক ভারসাম্যপূর্ণ ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিবেশ উপহার দেয়।


٢- ما هي المرابحة والمضاربة؟ واشرح شروطهما وأحكامهما في الفقه الإسلامي-

[২. মুরাবাহা ও মুদারাবা কী? ইসলামি ফিকহের আলোকে এ দুটির শর্তাবলী ও হুকুম ব্যাখ্যা কর।]

ভূমিকা

বর্তমান ইসলামি ব্যাংকিং ও আধুনিক ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বহুল ব্যবহৃত দুটি গুরুত্বপূর্ণ লেনদেন চুক্তি হলো ‘মুরাবাহা’ (লাভসহ বিক্রয়) এবং ‘মুদারাবা’ (মূলধন ও শ্রমের অংশীদারি কারবার)। ইসলাম সুদমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে এই দুটি পদ্ধতিকে অন্যতম প্রধান ভিত্তি বানিয়েছে।

১. আল-মুরাবাহা (المرابحة)

সংজ্ঞা: বিক্রেতা কোনো পণ্য যে মূল্যে ক্রয় করেছে তা ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে তার ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ পূর্বনির্ধারিত লাভ (মুনাফা) যোগ করে বিক্রি করাকে ‘বাইয়ে মুরাবাহা’ বলে।

শর্তাবলী ও বিধান:

  • আসল ক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা: বিক্রেতাকে অবশ্যই পণ্যের প্রকৃত ক্রয়মূল্য এবং আনুষঙ্গিক খরচের হিসাব সততার সাথে ক্রেতাকে জানাতে হবে। এতে কোনো প্রকার মিথ্যাচার করলে তা আমানতদারির খেলাফ হবে।
  • মুনাফার পরিমাণ সুনির্দিষ্ট হওয়া: লাভ শতকরা হারে বা নির্দিষ্ট অঙ্কে চুক্তির সময়ই স্পষ্টভাবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত হতে হবে।
  • ব্যাংকিং রূপ: বর্তমানে ইসলামি ব্যাংকগুলো গ্রাহকের চাহিদামতো পণ্য ক্রয় করে নিজের কব্জায় নেয় এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট লাভে কিস্তিতে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে।

২. আল-মুদারাবা (المضاربة)

সংজ্ঞা: এমন এক ব্যবসায়িক অংশীদারি চুক্তি যেখানে এক পক্ষ কেবল মূলধন সরবরাহ করে (যাকে ‘রব্বুল মাল’ বা পুঁজিপতি বলা হয়) এবং অপর পক্ষ কেবল তার শারীরিক ও মানসিক মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করে ব্যবসা পরিচালনা করে (যাকে ‘মুদারিব’ বা কর্মোদ্যোক্তা বলা হয়)।

শর্তাবলী ও বিধান:

  • মূলধন নগদ ও নির্দিষ্ট হওয়া: পুঁজিপতির মূলধন সুনির্দিষ্ট ও নগদ অর্থ হতে হবে; কোনো ঋণকে মূলধন বানানো যাবে না।
  • লাভ বণ্টনের আনুপাতিক হার নির্ধারণ: ব্যবসায় যে লাভ হবে তা পূর্বচুক্তির ভিত্তিতে উভয়ের মাঝে আনুপাতিক হারে (যেমন ৫০:৫০ বা ৬০:৪০) বণ্টিত হবে। কোনো এক পক্ষের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা (যেমন প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা) নির্ধারণ করা যাবে না; করলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
  • ক্ষতির দায়ভার বহন: ব্যবসায় কোনো ক্ষতি হলে তা সম্পূর্ণভাবে মূলধন থেকেই বাদ যাবে (রব্বুল মাল বহন করবে)। মুদারিবের কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে না; তার ক্ষতি হবে তার প্রদত্ত শ্রম বৃথা যাওয়া। তবে মুদারিব যদি অবহেলা বা খেয়ানত করে, তবে সে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।

উপসংহার

মুরাবাহা ও মুদারাবা সুদের বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্ত থেকে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের অনুপম মাধ্যম।


٣- اكتب عن الكراهية وحكم لحوم الأتن وألبانها-

[৩. ফিকহের পরিভাষায় ‘কারাহিয়্যাত’ (মাকরূহ) আলোচনা কর এবং গৃহপালিত গাধার গোশত ও দুধ পানের শরয়ি হুকুম বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামি শরিয়তের আহকামে পাঁচ প্রকারের হুকুমের মধ্যে ‘মাকরূহ’ একটি বিশেষ স্তর। খাদ্যদ্রব্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম পবিত্র বস্তুসমূহকে হালাল করেছে এবং অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তুকে হারাম বা মাকরূহ করেছে। গৃহপালিত গাধা (আল-উতুন) ভক্ষণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

ফিকহের পরিভাষায় কারাহিয়্যাত (الكراهية)

সংজ্ঞা: যে কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য শরীয়ত নির্দেশ দিয়েছে, তবে তা হারামের মতো চূড়ান্ত ও অকাট্য দলিলের মাধ্যমে নয়, তাকে মাকরূহ বলা হয়। হানাফি ফিকহে এটি দুই প্রকার:

  1. মাকরূহে তাহরীমী (المكروه تحريما): যা হারামের নিকটবর্তী। এমন কোনো কাজ যা থেকে বিরত থাকার জন্য দলিল পাওয়া গেছে কিন্তু দলিলটি ‘জন্নী’ (খবরে ওয়াহিদ)। এর ওপর আমল করলে গুনাহগার হতে হবে এবং শাস্তি পেতে হবে।
  2. মাকরূহে তানযীহী (المكروه تنزيها): যা হালালের নিকটবর্তী। যা পরিহার করা উত্তম কিন্তু তা করলে কোনো শাস্তি বা গুনাহ নেই।

গৃহপালিত গাধার (الأتن الأهلية) গোশত ও দুধের শরয়ি হুকুম

১. গোশতের হুকুম:
গৃহপালিত গাধা (الحمر الأهلية)-র গোশত খাওয়া ইসলামি শরিয়তে হারাম (জমহুর ফকিহ ও চার মাযহাবের সর্বসম্মত মত)।
দলিল: খাইবারের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেন। হযরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন:

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنْ نِكَاحِ الْمُتْعَةِ يَوْمَ خَيْبَرَ، وَعَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ

“রাসূলুল্লাহ (সা.) খায়বারের যুদ্ধের দিন মুত’আ বিয়ে এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
তবে ‘হিমারে ওয়াহশী’ বা বুনো গাধা (জেব্রা) শিকার করে খাওয়া সর্বসম্মতিক্রমে হালাল।

২. দুধের হুকুম:
যে পশুর গোশত খাওয়া হারাম, ফিকহের মৌলিক নীতি অনুযায়ী তার দুধ পান করাও হারাম বা মাকরূহে তাহরীমী। কারণ গোশতের মতো দুধও অপবিত্র রক্তের নির্যাস থেকে তৈরি হয়। তবে চিকিৎসার স্বার্থে একান্ত বিকল্প কোনো হালাল ওষুধ না থাকলে জীবন বাঁচানোর জন্য তা ব্যবহারের ব্যাপারে কোনো কোনো ফকিহ শিথিলতা দিয়েছেন।

উপসংহার

গৃহপালিত গাধার গোশত ও দুধ অপবিত্র (রিজস) হওয়ার কারণে তা ভক্ষণ বর্জন করা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য ওয়াজিব।


٤- عرّف الرهن واذكر مشروعيته وأركانه وشروطه-

[৪. আর-রাহান (বন্ধক)-এর সংজ্ঞা দাও এবং এর শরয়ি বৈধতা, রুকন ও শর্তাবলী আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ঋণ লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মানুষের পারস্পরিক আর্থিক আস্থা রক্ষা করতে ইসলামি ফিকহে ‘রাহান’ বা বন্ধক ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ঋণদাতা তার পাওনা অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে নিশ্চিত নিরাপত্তা লাভ করে।

রাহানের সংজ্ঞা (تعريف الرهن)

শাব্দিক অর্থ: ‘রাহান’ (الرهن) শব্দের আভিধানিক অর্থ বন্দি রাখা, আটকে রাখা বা স্থায়ী হওয়া।

পারিভাষিক অর্থ: ইমাম কুদূরী (রহ.) বলেন:

حَبْسُ شَيْءٍ بِحَقٍّ يُمْكِنُ اسْتِيفَاؤُهُ مِنْهُ كَالدَّيْنِ

“কোনো আর্থিক অধিকার (যেমন ঋণ) আদায়ের নিশ্চয়তাস্বরূপ কোনো মূল্যবান বস্তুকে আটকে রাখাকে রাহান বা বন্ধক বলে; যেন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা থেকে পাওনা আদায় করা যায়।”

রাহানের শরয়ি বৈধতা (مشروعيته)

  • পবিত্র কুরআন: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

    وَإِنْ كُنْتُمْ عَلَى سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُوا كَاتِبًا فَرِهَانٌ مَقْبُوضَةٌ

    “আর যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোনো লেখক না পাও, তবে বন্ধক রেখে হস্তগত করবে।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৩)

  • সহিহ হাদিস: হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন:

    تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَدِرْعُهُ مَرْهُونَةٌ عِنْدَ يَهُودِيٍّ بِثَلَاثِينَ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ

    “রাসূলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেন এমতাবস্থায় যে, তাঁর লৌহবর্মটি এক ইহুদির নিকট ত্রিশ সা’ যবের বিনিময়ে বন্ধক রাখা ছিল।” (সহিহ বুখারি)

রাহানের রুকন ও শর্তাবলী

রুকনসমূহ: ১. রাহিন (যে ব্যক্তি বন্ধক রাখে/ঋণগ্রহীতা), ২. মুরতাহিন (যার কাছে বন্ধক রাখা হয়/ঋণদাতা), ৩. মারহূন (বন্ধকীকৃত বস্তু), ৪. মারহূন বিহী (পাওনা ঋণ) এবং ৫. সীগাহ (ঈজাব ও কবুল)।

শর্তাবলী:

  1. মারহূন হস্তগত হওয়া (ক্ববযা): চুক্তি কার্যকর হওয়ার জন্য বন্ধকী বস্তুটি ঋণদাতার দখলে হস্তান্তর করা আবশ্যক।
  2. বস্তুটি মূল্যবান ও বিক্রয়যোগ্য হওয়া: বস্তুটি এমন হতে হবে যা বিক্রি করে ঋণ আদায় করা সম্ভব। অপবিত্র বা মূল্যহীন বস্তু বন্ধক রাখা যায় না।
  3. বন্ধকী বস্তু থেকে লাভবান না হওয়া: ঋণদাতা বন্ধকী জমি বা বাড়ি ভোগ করতে পারবে না; কারণ ফিকহি নীতি হলো: “كل قرض جر نفعا فهو ربا” (যে ঋণ কোনো সুবিধা বা মুনাফা টানে, তা-ই সুদ)। তবে পশু বন্ধক থাকলে দুধ পান বা সওয়ারি হওয়ার বিনিময়ে তার ঘাস-পানির খরচ বহন করা যাবে।

উপসংহার

রাহান হলো একটি পরোপকারী নিরাপত্তা চুক্তি, যার মাধ্যমে সুদবিহীন ঋণ লেনদেন সহজ ও সুদৃঢ় হয়।


مجموعة (ب) [الفقه – أسئلة موجزة / বিভাগ ‘খ’ – ফিকহ সংক্ষিপ্ত]

মান: ৫ × ৪ = ২০ (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

٥- عرّف علم الفقه وبيّن موضوعه وغايته-

[৫. ইলমুল ফিকহের সংজ্ঞা দাও এবং এর বিষয়বস্তু ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বর্ণনা কর।]

উত্তর

সংজ্ঞা: ‘ফিকহ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ গভীর অনুধাবন ও সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা। পরিভাষায়: বিস্তারিত ও স্বতন্ত্র শরয়ি দলিল (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস) থেকে আহরিত মানবীয় কর্মকাণ্ডের ব্যবহারিক বিধি-বিধানের জ্ঞানকে ইলমুল ফিকহ বলে (العلم بالأحكام الشرعية العملية المكتسبة من أدلتها التفصيلية)।

বিষয়বস্তু (موضوعه): প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেকবান মুকাল্লাফ বান্দাদের যাবতীয় প্রকাশ্য কথা, কাজ ও আচরণ (ইবাদত, মুআমালাত, বিবাহ, দণ্ডবিধি ইত্যাদি)।

লক্ষ্য-উদ্দেশ্য (غايته): আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ব্যক্তি ও সমাজকে পরিচালনা করে ইহকালীন শান্তি ও ইনসাফ কায়েম করা এবং পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করা।


٦- تحدث عن نشأة تدوين الفقه الإسلامي-

[৬. ফিকহে ইসলামির সংকলন ও গ্রন্থায়নের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।]

উত্তর

ফিকহ শাস্ত্রের তদ্বীন বা সংকলন প্রধানত তিনটি ঐতিহাসিক স্তরে সম্পন্ন হয়েছে:

  1. সাহাবা ও তাবেঈ যুগ: এ যুগে কোনো আনুষ্ঠানিক কিতাব লেখা হয়নি; সাহাবিগণ (যেমন ইবনে মাসউদ ও যায়েদ ইবনে সাবিত রা.) সরাসরি ফতোয়া দিতেন এবং তা শিষ্যদের মাঝে সংরক্ষিত থাকত।
  2. উমাইয়া আমল ও প্রাথমিক সংকলন: দ্বিতীয় হিজরি শতকে মদিনায় ইমাম মালিক (রহ.) রচনা করেন ‘মুয়াত্তা’, যাতে হাদিসের পাশাপাশি মদিনাবাসীদের ফিকহি আমল সংকলিত হয়।
  3. আব্বাসীয় যুগ ও মাযহাব সংকলন: খলিফা মনসুরের যুগে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নেতৃত্বে ৪০ জন শীর্ষ ফকিহ সমন্বয়ে ‘ফিকহ সংকলন বোর্ড’ গঠিত হয় এবং প্রায় ৮৩ হাজার মাসআলা লিপিবদ্ধ হয়, যা ইমাম মুহাম্মদ ‘জাহিরুর রিওয়ায়াত’-এ গ্রন্থায়িত করেন। পরবর্তীতে ইমাম শাফেয়ী রচনা করেন ‘কিতাবুল উম্ম’ এবং ইমাম আহমদের ফতোয়া সংকলিত হয়।

٧- اكتب نبذة عن حياة الإمام أبي حنيفة النعمان-

[৭. ইমামে আজম আবু হানিফা নোমান (রহ.)-এর জীবনচরিত সংক্ষেপে লেখ।]

উত্তর

জন্ম ও বংশ: তিনি ৮০ হিজরিতে (৬৯৯ খ্রি.) ইরাকের কুফায় এক সম্ভ্রান্ত পারস্য বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম নোমান ইবনে সাবিত। তিনি তাবেঈ ছিলেন এবং কয়েকজন সাহাবির দর্শন লাভ করেছিলেন।

ইলমি জীবন: তিনি কুফার প্রখ্যাত আলেম হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমানের নিকট দীর্ঘ ১৮ বছর ফিকহ অধ্যয়ন করেন। তিনি অনন্য মেধা, অকাট্য যুক্তি এবং তাকওয়ার অধিকারী ছিলেন। তিনি পেশায় ছিলেন অত্যন্ত সৎ রেশম ব্যবসায়ী।

কারাবরণ ও ওফাত: আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর তাঁকে প্রধান বিচারপতির (কাযিউল কুযাত) পদ গ্রহণ করতে চাপ দিলে তিনি সরকারি পদ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে তাঁকে কারাগারে বন্দি করা হয় এবং বিষপ্রয়োগে ১৫০ হিজরিতে ৭০ বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তিনি হানাফি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা।


٨- ما هو خيار الشرط وما مدته؟

[৮. খিয়ারে শর্ত কী এবং এর সর্বোচ্চ সময়সীমা কত?]

উত্তর

সংজ্ঞা: ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির সময় ক্রেতা বা বিক্রেতা অথবা উভয় পক্ষ যদি এই শর্তারোপ করে যে, তারা নির্দিষ্ট কয়েক দিনের মধ্যে চুক্তিটি বহাল রাখবে নাকি বাতিল করবে—তা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখবে, তবে তাকে ‘খিয়ারে শর্ত’ (خيارات البيع – خيار الشرط) বলা হয়।

সময়সীমা (مدته):

  • ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম যুফার (রহ.)-এর মতে: খিয়ারে শর্তের সর্বোচ্চ মেয়াদ হলো তিন দিন বা তার কম। তিন দিনের বেশি সময় শর্ত রাখা জায়েজ নয়। তাঁদের দলিল হলো সাহাবি হিব্বান ইবনে মুনকির (রা.)-কে দেওয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশ: “তুমি কেনাকাটার সময় বলবে ধোঁকা নেই এবং আমার তিন দিনের এখতিয়ার রয়েছে।” (সহিহ বুখারি)
  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে: যদি নির্দিষ্ট মেয়াদ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় (যেমন এক সপ্তাহ বা এক মাস), তবে তিন দিনের বেশি মেয়াদ রাখাও বৈধ। বর্তমান আধুনিক ব্যবসায়িক বাস্তবতায় এই মতটি অধিক অনুসৃত হয়।

مجموعة (ج) [أصول الفقه – أسئلة موسعة / বিভাগ ‘গ’ – উসুলুল ফিকহ রচনামূলক]

মান: ১০ × ২ = ২০ (যেকোনো ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

٩- عرّف الخبر المتواتر وبيّن شروطه وحكمه-

[৯. খবরে মুতাওয়াতির-এর সংজ্ঞা দাও এবং এর শর্তাবলী ও হুকুম বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

উসুলুল ফিকহের দৃষ্টিতে আসমানি বিধান জানার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো বিশুদ্ধ খবর বা বর্ণনা। খবর বা হাদিস তার বর্ণনাকারীর সংখ্যার দিক থেকে প্রধানত দুই প্রকার: খবরে মুতাওয়াতির এবং খবরে ওয়াহিদ। খবরে মুতাওয়াতির হলো এমন অকাট্য খবর যা জ্ঞান ও বিশ্বাসের দিক থেকে সরাসরি প্রত্যক্ষ দর্শনের সমতুল্য নিশ্চিত জ্ঞান দান করে।

খবরে মুতাওয়াতিরের সংজ্ঞা (تعريف الخبر المتواتر)

শাব্দিক অর্থ: ‘মুতাওয়াতির’ (المتواتر) শব্দের আভিধানিক অর্থ যা একের পর এক ধারাবাহিকভাবে আসে।

পারিভাষিক অর্থ: উসুলবিদগণের মতে:

هُوَ خَبَرُ جَمْعٍ غَفِيرٍ يَسْتَحِيلُ فِي الْعَادَةِ تَوَاطُؤُهُمْ عَلَى الْكَذِبِ، وَيَرْوُونَ ذَلِكَ عَنْ مِثْلِهِمْ مِنْ أَوَّلِ السَّنَدِ إِلَى مُنْتَهَاهُ، وَيَكُونُ مُسْتَنَدُهُمْ الْحِسَّ

“যে খবর এমন বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেন যাদের পক্ষে স্বাভাবিক অভ্যাসের কারণে মিথ্যা রচনার উদ্দেশ্যে একমত হওয়া অসম্ভব; এবং সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই সমসংখ্যক লোক তা বর্ণনা করেন এবং তাদের বর্ণনার ভিত্তি হয় প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি (দেখা বা শোনা)।”

মুতাওয়াতির হওয়ার চারটি মৌলিক শর্ত (شروطه)

  1. বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী (জময়ে গাফীর): সনদের প্রতিটি স্তরে এমন বিশাল সংখ্যক বর্ণনাকারী থাকতে হবে যাদের সংখ্যা মিথ্যা ধারণার ঊর্ধ্বে। কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারিত না হলেও অধিকাংশের মতে অন্তত ১০ জন বা ততোধিক হওয়া উচিত।
  2. মিথ্যার ওপর ঐক্যমত অসম্ভব হওয়া: বর্ণনাকারীদের দেশ, ভাষা ও সামাজিক অবস্থান এমন ভিন্ন হওয়া যেন তারা একত্রিত হয়ে কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মিথ্যা রচনা করতে না পারে।
  3. সনদের সকল স্তরে সমতা রক্ষা: প্রথম স্তর (সাহাবি), মধ্যম স্তর (তাবেঈ) থেকে শুরু করে কিতাব সংকলন পর্যন্ত কোনো স্তরেই বর্ণনাকারীর সংখ্যা কমতে পারবে না।
  4. ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া: সংবাদটি চিন্তা বা যুক্তির ফল হলে চলবে না; বরং তারা যেন স্পষ্ট বলে: “আমরা শুনেছি” বা “আমরা দেখেছি”। যেমন কুরআনুল কারীম এবং পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের রাকাত সংখ্যা।

খবরে মুতাওয়াতিরের হুকুম (حكمه)

খবরে মুতাওয়াতির ‘ইলমে ইয়াক্বিনী ও ক্বাতয়ী’ (العلم القطعي الضروري) বা নিশ্চিত ও অকাট্য জ্ঞান দান করে। এর সত্যতা স্বীকার করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। মুতাওয়াতির খবরে বর্ণিত বিধানকে অস্বীকারকারী ব্যক্তি সর্বসম্মতভাবে কাফির বলে গণ্য হবে।

উপসংহার

খবরে মুতাওয়াতির হলো দ্বীনের সেই মজবুত ভিত্তি যার ওপর পবিত্র কুরআন এবং ইসলামের সর্বজনবিদিত ফরজসমূহ দেড় হাজার বছর ধরে শতভাগ অবিসংবাদিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।


١٠- ما هو الإجماع؟ واذكر مشروعيته وشروطه وأنواعه-

[১০. ইজমা কাকে বলে? এর শরয়ি প্রামাণিকতা, শর্তাবলী ও প্রকারভেদ বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামি শরীয়তের চারটি মৌলিক উৎসের মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহর ঠিক পরেই তৃতীয় অকাট্য দলিল হলো ‘আল-ইজমা’ (الإجماع)। এটি মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ঐক্য ও যৌথ সিদ্ধান্তের এক অনন্য ঐশী রক্ষাকবচ, যা উম্মাহকে সমবেতভাবে পথভ্রষ্টতা থেকে নিরাপদ রাখে।

ইজমার সংজ্ঞা (تعريف الإجماع)

শাব্দিক অর্থ: ‘ইজমা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সংকল্প করা (আল-আজম) অথবা ঐক্যমত পোষণ করা (আল-ইত্তিফাক)।

পারিভাষিক অর্থ: ইমাম আল-গাজ্জালী ও উসুলবিদগণের পরিভাষায়:

اتِّفَاقُ مُجْتَهِدِي أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ﷺ فِي عَصْرٍ مِنَ الْعُصُورِ بَعْدَ وَفَاتِهِ عَلَى حُكْمٍ شَرْعِيٍّ

“রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর যেকোনো যুগে কোনো একটি শরয়ি বিধানের ওপর উম্মতে মুহাম্মদীর সকল জীবিত মুজতাহিদগণের সর্বসম্মত ঐক্যমত পোষণ করাকে ইজমা বলে।”

ইজমার শরয়ি প্রামাণিকতা (مشروعيته وحجيته)

  • পবিত্র কুরআন: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

    وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ

    “যে ব্যক্তি তার কাছে সঠিক পথ প্রকাশিত হওয়ার পর রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, তবে আমি তাকে সেই পথেই ছেড়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব।” (সূরা আন-নিসা: ১১৫)

  • সহিহ হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:

    إِنَّ أُمَّتِي لَا تَجْتَمِعُ عَلَى ضَلَالَةٍ

    “নিশ্চয় আমার উম্মত কখনো ভ্রষ্টতা বা ভুলের ওপর একমত হবে না।” (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

ইজমার আবশ্যকীয় শর্তাবলী (شروطه)

  1. ঐক্যমতটি অবশ্যই রাসূল (সা.)-এর ওফাতের পর হতে হবে; কারণ তাঁর জীবদ্দশায় ওহী চালু ছিল।
  2. ঐ যুগের সকল মুজতাহিদ ফকিহর একমত হওয়া আবশ্যক; সাধারণ মানুষের মতামত বিবেচ্য নয় এবং কোনো একজন নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদও ভিন্নমত পোষণ করলে তা পূর্ণাঙ্গ ইজমা হবে না।
  3. ইজমার অবশ্যই একটি শরয়ি ভিত্তি (মুসনাদ বা সনদ) থাকতে হবে, যা কুরআন বা সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত।

ইজমার প্রধান প্রকারভেদ (أنواعه)

  • ১. ইজমায়ে সরীহ (الإجماع الصريح): যখন সংশ্লিষ্ট যুগের সকল মুজতাহিদ কোনো মাসআলায় স্পষ্টভাবে নিজ নিজ সম্মতি বা ফতোয়া ব্যক্ত করেন। এটি অকাট্য (কাতয়ী) দলিল।
  • ২. ইজমায়ে সুকূতী (الإجماع السكوتي): যখন কোনো একজন বা কয়েকজন মুজতাহিদ একটি ফতোয়া প্রকাশ করেন এবং অন্যান্য সমকালীন মুজতাহিদগণ তা জানার পরও কোনো আপত্তি না করে নীরব থাকেন। হানাফি ফিকহে এটিও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।

উপসংহার

সাহাবায়ে কেরামের যুগে আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত নির্বাচন, কুরআন সংকলন এবং দাদির এক-ষষ্ঠাংশ মিরাসের বিধান ইজমার আলোকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সমকালীন মুসলিম উম্মাহর জটিল সংকট নিরসনেও যৌথ ইজতিহাদ ও ইজমার প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ জরুরি।


١١- بيّن حجية القياس في الشريعة الإسلامية وأركانه-

[১১. ইসলামি শরীয়তে কিয়াসের প্রামাণিকতা এবং এর চারটি রুকন বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামি শরীয়তের চতুর্থ মৌলিক উৎস হলো ‘কিয়াস’ (القياس)। কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট মূলপাঠ (নস) সংখ্যায় সীমিত, কিন্তু কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির সমস্যার কোনো শেষ নেই। তাই পরিবর্তিত যুগে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দিতে কিয়াস হলো শরীয়তের এক চিরনবীন গতিশীল গবেষণার চাবিকাঠি।

কিয়াসের সংজ্ঞা ও হাকীকত

শাব্দিক অর্থ: অনুমান করা, পরিমাপ করা বা তুলনা করা।

পারিভাষিক অর্থ: মৌলিক অভিন্ন কারণের (ইল্লত) উপস্থিতির ভিত্তিতে কোনো পূর্ববর্তী প্রমাণিত বিষয়ের (আসল) বিধানকে একটি নতুন অভিনব বিষয়ে (ফার’) কার্যকর করাকে কিয়াস বলে।

শরীয়তে কিয়াসের প্রামাণিকতা (حجية القياس)

  1. পবিত্র কুরআনের আয়াত: আল্লাহ তায়ালা অনুধাবন ও দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন:

    فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ

    “অতএব হে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।” (সূরা আল-হাশর: ২)। শিক্ষা গ্রহণ (ই’তিবার) মানেই হলো একটির সাথে অপরটির তুলনা করা।

  2. হাদিসের দলিল (হাদিসে মুআজ): রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মুআজ (রা.)-কে ইয়েমেনে প্রেরণ করেন এবং তিনি কুরআন ও সুন্নাতে কোনো বিধান না পেলে নিজের রায় ও ইজতিহাদ প্রয়োগ করবেন বলে জানালেন, তখন নবীজি সন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের দূতকে সেই তাওফিক দিয়েছেন যাতে তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট।” (আবু দাউদ ও তিরমিজি)
  3. সাহাবায়ে কেরামের আমল: হযরত ওমর (রা.) কাজী শুরাইহ ও আবু মুসা আশআরি (রা.)-কে চিঠিতে লিখেছিলেন: “তোমার সামনে যে বিষয় উপস্থিত হবে তা কুরআন-হাদিসের সাথে মিলিয়ে দেখবে এবং সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ের সাথে কিয়াস করবে।”

কিয়াসের চারটি রুকন (أركان القياس)

কিয়াস সম্পন্ন হতে চারটি উপাদানের উপস্থিতি অপরিহার্য:

  1. আল-আসল (الأصل – মূল বিষয়): যে বিষয়ে কুরআন বা হাদিসে সুস্পষ্ট বিধান বিদ্যমান রয়েছে (যেমন: শরাব বা মদ)।
  2. আল-ফার’ (الفرع – শাখা বিষয়): নতুন উদ্ভূত বিষয় যার বিধান সরাসরি নসে নেই (যেমন: হেরোইন, ইয়াবা বা আধুনিক মাদকদ্রব্য)।
  3. হুকমুল আসল (حكم الأصل – মূল বিষয়ের বিধান): মূল বিষয়ের ওপর আরোপিত শরয়ি হুকুম (যেমন: মদের হারাম হওয়া)।
  4. আল-ইল্লত (العلة – অভিন্ন কার্যকর কারণ): যে অন্তর্নিহিত কারণের জন্য মূল বিষয়ের ওপর হুকুম প্রযোজ্য হয়েছিল এবং যা শাখা বিষয়ের মধ্যেও হুবহু বিদ্যমান (যেমন: মাদকতা বা নেশা সৃষ্টি করা)। ফলে কিয়াসের মাধ্যমে হেরোইন ও ইয়াবাও মদের মতোই সর্বসম্মতভাবে হারাম সাব্যস্ত হয়।

উপসংহার

কিয়াস কোনো নতুন শরীয়ত সৃষ্টি করে না; বরং তা ওহীর নিহিত প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে নতুন পরিস্থিতির ওপর শরয়ি বিধান উন্মোচন করে।


١٢- ما هو الاجتهاد؟ واشرح شروط المجتهد وهل يخطئ ويصيب؟

[১২. ইজতিহাদ কাকে বলে? মুজতাহিদের শর্তাবলী ব্যাখ্যা কর এবং মুজতাহিদ কি ভুল ও সঠিক উভয়টির সম্মুখীন হন?]

ভূমিকা

ইসলামি শরীয়তের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও গতিশীল প্রক্রিয়া হলো ‘ইজতিহাদ’ (الاجتهاد)। এর মাধ্যমেই প্রতিটি যুগে বিজ্ঞ ফকিহগণ সমকালীন সমস্যাবলির শরয়ি সমাধান উপহার দেন। তবে ইজতিহাদ কোনো উন্মুক্ত ময়দান নয় যে যেকেউ নিজের খেয়ালখুশিমতো ফতোয়া দিতে পারে; এর জন্য কঠোর যোগ্যতা ও ইলমি শর্ত পূরণ করতে হয়।

ইজতিহাদের সংজ্ঞা (تعريف الاجتهاد)

শাব্দিক অর্থ: কোনো কঠিন কাজে নিজের সর্বোচ্চ শক্তি ও মেধা ব্যয় করা।

পারিভাষিক অর্থ: উসুলবিদদের পরিভাষায়:

اسْتِفْرَاغُ الْفَقِيهِ وُسْعَهُ لِإِدْرَاكِ حُكْمٍ شَرْعِيٍّ ظَنِّيٍّ مِنَ الْأَدِلَّةِ التَّفْصِيلِيَّةِ

“একজন ফকিহ কর্তৃক শরীয়তের বিস্তারিত দলিলের ওপর গভীর গবেষণা চালিয়ে জন্নী বা গবেষণামূলক শরয়ি বিধান উদ্ভাবনের জন্য নিজের সর্বোচ্চ মেধা ও সাধনা নিয়োজিত করাকে ইজতিহাদ বলে।”

মুজতাহিদের আবশ্যকীয় শর্তাবলী (شروط المجتهد)

ইমাম নববী ও ইবনে কুদামা (রহ.)-এর মতে মুজতাহিদ হতে হলে নিম্নলিখিত শর্তাবলী পূরণ করতে হবে:

  1. কুরআনের আহকামের জ্ঞান: বিধান সম্পর্কিত অন্তত পাঁচশত আয়াতের শব্দ, ব্যাকরণ, শানে নুযূল এবং নাসেখ-মানসূখ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা।
  2. হাদিসের আহকামের জ্ঞান: সিহাহ সিত্তাহ ও অন্যান্য কিতাবের আহকাম বিষয়ক হাদিস, তাদের বিশুদ্ধতা ও সনদের মান (জারহ-তাদীল) জানা।
  3. আরবি ভাষায় পূর্ণ পাণ্ডিত্য: নাহু, সরফ, বালাগাত ও প্রাচীন আরবি সাহিত্যের গভীর জ্ঞান থাকা।
  4. ইজমার স্থানসমূহ জানা: উম্মতের পূর্ববর্তী ফকিহগণ কোন কোন বিষয়ে ইজমা করেছেন তা জানা, যেন নতুন ফতোয়া ইজমার বিপরীত না হয়।
  5. উসুলুল ফিকহের মূলনীতি আয়ত্ত করা: আম, খাস, মুজমাল, মুবায্যান, কিয়াস ও ইল্লত বের করার পদ্ধতিতে দক্ষ হওয়া।
  6. মাকাসিদুশ শরীয়াহ বা দ্বীনের মূল লক্ষ্য অনুধাবন: মানবকল্যাণ ও শরীয়তের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা বোঝার যোগ্যতা থাকা এবং খোদাভীতি ও নিরপেক্ষ চরিত্রের অধিকারী হওয়া।

মুজতাহিদ কি ভুল ও সঠিক উভয়টির সম্মুখীন হন? (هل يخطئ ويصيب؟)

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত সঠিকও হতে পারে আবার অনিচ্ছাকৃত ভুলও হতে পারে।
তিনি কোনো নিষ্পাপ সত্তা নন। তবে খাঁটি নিয়তে ইজতিহাদ করার পর ভুল হলেও তিনি তিরস্কৃত হবেন না; বরং সওয়াব পাবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্ট হাদিসে ঘোষণা করেছেন:

إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ

“বিচারক যখন ইজতিহাদ করে ফয়সালা দেন এবং তা সঠিক হয়, তবে তার জন্য দুটি প্রতিদান রয়েছে (একটি গবেষণার এবং অপরটি সঠিকতার); আর যদি ইজতিহাদ করার পর তার ভুল হয়, তবে তার জন্য একটি প্রতিদান রয়েছে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

উপসংহার

ইজতিহাদের দরজা কিয়ামত পর্যন্ত উন্মুক্ত। বর্তমান যুগে ব্যক্তিভিত্তিক ইজতিহাদের চেয়ে সমন্বিত বা যৌথ ইজতিহাদের (যেমন আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি) গুরুত্ব সর্বাধিক।


مجموعة (د) [أصول الفقه – أسئلة موجزة / বিভাগ ‘ঘ’ – উসুলুল ফিকহ সংক্ষিপ্ত]

মান: ৫ × ৪ = ২০ (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও)

١٣- بيّن أهمية أصول الفقه وفائدته-

[১৩. উসুলুল ফিকহ শাস্ত্রের গুরুত্ব ও উপকারিতা আলোচনা কর।]

উত্তর

গুরুত্ব ও উপকারিতা: ইলমে উসুলুল ফিকহ হলো ফিকহের ভিত্তি ও ব্যাকরণস্বরূপ। এর প্রধান উপকারিতাগুলো হলো:

  • সঠিক মাসআলা উদ্ভাবনের পদ্ধতি জানা: কুরআন ও হাদিসের অসীম জ্ঞানের মহাসমুদ্র থেকে কীভাবে হালাল ও হারামের বিধান বের করতে হয়, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এ শাস্ত্র শেখায়।
  • ভুল ব্যাখ্যা থেকে শরীয়তকে রক্ষা করা: যেকেউ যেন মনগড়াভাবে কুরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যা করতে না পারে, তার বৈজ্ঞানিক সুরক্ষাপ্রাচীর তৈরি করে।
  • নতুন সমস্যার ফিকহি সমাধান: আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কার (যেমন কৃত্রিম প্রজনন, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ডিজিটাল কারেন্সি)-এর ক্ষেত্রে কিয়াস ও উসুলের নিয়ম প্রয়োগ করে সমাধান বের করা সম্ভব হয়।
  • মাযহাবসমূহের মতপার্থক্যের কারণ অনুধাবন: চার ইমামের মতভিন্নতার পেছনের উসুলি যুক্তি বুঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য রক্ষা করা যায়।

١٤- ما الفرق بين السنة والحديث في اصطلاح الأصوليين؟

[১৪. উসুলবিদগণের পরিভাষায় সুন্নাহ ও হাদিসের মধ্যে পার্থক্য কী?]

উত্তর

মুহাদ্দিসগণের নিকট সুন্নাহ ও হাদিস প্রায় সমার্থক হলেও উসুলবিদ ফকিহগণের নিকট উভয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম ব্যবহারিক পার্থক্য রয়েছে:

পার্থক্যের ক্ষেত্র হাদিস (الحديث) সুন্নাহ (السنة)
মৌলিক ধারণা হাদিস হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত প্রতিটি মৌখিক বাণী, কর্ম বা বিবরণ, তা দলিলযোগ্য হোক বা না হোক। সুন্নাহ হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্থায়ী আদর্শ ও ব্যবহারিক কর্মপদ্ধতি যা শরীয়তের অনুসৃত আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
আইনগত মান হাদিস দুর্বল (দ্বয়ীফ) বা মওজুও হতে পারে। সুন্নাহ কখনো দুর্বল বা বর্জনীয় হতে পারে না; সুন্নাহ সর্বদা প্রমাণযোগ্য।
উসুলবিদদের দৃষ্টি উসুলবিদদের কাছে হাদিস হলো তথ্য সংগ্রহের একটি বর্ণনামূলক মাধ্যম। সুন্নাহ হলো শরীয়তের দ্বিতীয় মৌলিক বিধিবদ্ধ উৎস (مصدر تشريعي)।

١٥- عرّف الاستحسان واذكر أقسامه-

[১৫. আল-ইস্তিহসান-এর সংজ্ঞা দাও এবং এর প্রকারভেদ উল্লেখ কর।]

উত্তর

সংজ্ঞা: হানাফি উসুলের পরিভাষায়: কোনো সুস্পষ্ট ও আপাত কিয়াস (কিয়াসে জলী)-এর বিধান বর্জন করে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী কোনো সূক্ষ্ম প্রমাণ (যেমন বিশেষ নস, ইজমা বা জনস্বার্থের প্রয়োজনীয়তা)-এর ভিত্তিতে ভিন্ন একটি সহজতর বিধান গ্রহণ করাকে ‘ইস্তিহসান’ (الاستحسان) বলে। ইমাম শাফেয়ী যদিও এর কিছু রূপের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু হানাফি ফিকহে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নমনীয় দলিল।

প্রধান প্রকারভেদসমূহ:

  1. নসভিত্তিক ইস্তিহসান (الاستحسان بالنص): সাধারণ নিয়মে যা না থাকার কথা কিন্তু স্পষ্ট নসের কারণে বৈধ করা হয়েছে। যেমন: রোজা অবস্থায় ভুলক্রমে কিছু খেয়ে ফেললে কিয়াস বলে রোজা ভেঙে যাবে, কিন্তু সহিহ হাদিসের নস অনুযায়ী রোজা ভাঙবে না। এছাড়া সালাম বা আগাম ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি।
  2. ইজমাইভিত্তিক ইস্তিহসান (الاستحسان بالإجماع): সাধারণ কিয়াসে কারিগরের দ্বারা অর্ডার দিয়ে পণ্য তৈরির চুক্তি (ইস্তিসনা) পণ্য অস্তিত্বহীন থাকায় অবৈধ হওয়ার কথা, কিন্তু উম্মতের দীর্ঘদিনের ইজমার ভিত্তিতে তা বৈধ।
  3. প্রয়োজনীয়তা ও জরুরতভিত্তিক ইস্তিহসান (الاستحسان للضرورة): সাধারণ কিয়াসে অপবিত্র কূপ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি ফেলে দিলে কূপ পবিত্র হওয়ার কথা নয়, কিন্তু মানুষের তীব্র পানির প্রয়োজনে শরীয়ত একে পবিত্র ঘোষণা করেছে।
  4. উরফ বা প্রথাভিত্তিক ইস্তিহসান: সমাজে প্রচলিত কোনো নির্দোষ প্রথার ভিত্তিতে কোনো নিয়মকে শিথিল করা।

١٦- ما هو الدليل وما هي أنواعه عند الأصوليين؟

[১৬. দলিল কাকে বলে এবং উসুলবিদগণের নিকট এর প্রকারভেদ কী কী?]

উত্তর

দলিলের সংজ্ঞা: ‘দলিল’ (الدليل) শব্দের আভিধানিক অর্থ পথপ্রদর্শক। পরিভাষায়: যে বিষয়ে সঠিক চিন্তাভাবনা ও গবেষণার মাধ্যমে কোনো অন্বেষিত শরয়ি হুকুম বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাকে শরয়ি দলিল বলে (ما يمكن التوصل بصحيح النظر فيه إلى مطلوب خبري)।

উসুলবিদগণের নিকট দলিলের শ্রেণিবিন্যাস:

  1. ঐকমত্যের ভিত্তিতে (من حيث الاتفاق والاختلاف):
    • সর্বসম্মত প্রধান চার দলিল (الأدلة المتفق عليها): ১. আল-কুরআন, ২. আস-সুন্নাহ, ৩. আল-ইজমা এবং ৪. আল-কিয়াস।
    • মতবিরোধপূর্ণ পরিপূরক দলিল (الأدلة المختلف فيها): আল-ইস্তিহসান, আল-মাসলাহাতুল মুরসালাহ, আল-ইস্তিসহাব, উরফ (সামাজিক প্রথা), সাহাবির কাওল এবং পূর্ববর্তী উম্মতের শরীয়ত।
  2. অকাট্যতার ভিত্তিতে (من حيث القطع والظن):
    • দালিলে কাতয়ী (الدليل القطعي): যা সম্পূর্ণ দ্ব্যর্থহীন ও নিশ্চিত প্রমাণ দেয় (যেমন: কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত ও মুতাওয়াতির হাদিস)।
    • দালিলে জন্নী (الدليل الظني): যা প্রবল ধারণা দান করে (যেমন: খবরে ওয়াহিদ ও কিয়াস)।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘ফিকহ’ এবং ‘উসুলুল ফিকহ’-এর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

ফিকহ হলো শরীয়তের ব্যবহারিক মাসআলা-মাসায়েল (যেমন কীভাবে নামাজ পড়তে হবে বা ব্যবসা করতে হবে); আর উসুলুল ফিকহ হলো যে নিয়ম ও ব্যাকরণ প্রয়োগ করে কুরআন-সুন্নাহ থেকে সেই মাসআলাগুলো বের করা হয়।

২. গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়ার শরয়ি হুকুম কী?

খায়বারের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার কারণে চার মাযহাবের সকল ফকিহর সর্বসম্মত মতে গৃহপালিত গাধার গোশত ও দুধ খাওয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম।

৩. মুদারাবা চুক্তিতে লোকসান হলে কে বহন করে?

মুদারাবা কারবারে আর্থিক লোকসান হলে তা কেবল পুঁজিপতি (রব্বুল মাল)-এর মূলধন থেকেই সমন্বয় হবে; উদ্যোক্তা বা শ্রমিকের কোনো আর্থিক দায় থাকে না, তার ক্ষতি হলো তার শ্রম বৃথা যাওয়া।

৪. ইসলামি শরীয়তের চারটি সর্বসম্মত মৌলিক দলিল কী কী?

শরীয়তের মৌলিক চারটি দলিল হলো: ১. পবিত্র কুরআনুল কারীম, ২. সহিহ সুন্নাতে নাবাবিয়্যাহ, ৩. উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা এবং ৪. ন্যায়ানুগ কিয়াস।

৫. খবরে মুতাওয়াতিরের বিধান অস্বীকারকারীর হুকুম কী?

খবরে মুতাওয়াতির যেহেতু সুনিশ্চিত ও অকাট্য (কাতয়ী) জ্ঞান দান করে, তাই এর মাধ্যমে প্রমাণিত দ্বীনের মৌলিক বিধানকে অস্বীকারকারী ব্যক্তি সর্বসম্মতিক্রমে কাফির বলে গণ্য হবে।

৬. বন্ধকী (মারহূন) সম্পদ থেকে কি ঋণদাতা কোনো উপকার ভোগ করতে পারবে?

না, বন্ধকী সম্পদ থেকে ঋণদাতার কোনো প্রকার ব্যক্তিগত উপকার বা সুবিধা ভোগ করা সম্পূর্ণ হারাম; কারণ ফিকহি নীতি অনুযায়ী ঋণের বিনিময়ে গৃহীত যেকোনো অতিরিক্ত সুবিধাই হলো সুদ।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *