জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-ফিরাকুল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আকাইদুহা (Al-Firaqul-Islamiyyah wa Aqaiduha) – 203408, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৫৬ মিনিট পড়ার সময়
১৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 172
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الفرق الإسلامية وعقائدها
[আল-ফিরাকুল ইসলামিয়্যাহ ওয়া আকাইদুহা]
বিষয় কোড: 203408
الوقت: ٤ ساعات [সময়: ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة: ٨٠ [পূর্ণমান: ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)
[দ্রষ্টব্য : (الف) অংশ থেকে চারটি এবং (ب) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (الف) [বিভাগ ‘ক’ – রচনামূলক প্রশ্নাবলী]

মান: ১৫ × ৪ = ৬০

١- تحدث عن مفهوم العقيدة وأهميتها وحاجة الناس إليها-

[১. আক্বীদা এর অর্থ, গুরুত্ব ও এর প্রতি মানুষের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামি জীবনাদর্শের প্রধান ভিত্তি ও রূহ হলো আকিদা। ভবন যেমন মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি একজন মুসলিমের নামাজ, রোজা, হজ ও যাবতীয় নেক আমলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে সহিহ আকিদার ওপর। আকিদা বিশুদ্ধ না হলে পাহাড় পরিমাণ নেক আমলও আল্লাহর দরবারে ধূলিকণার মতো উড়ে যাবে।

আকিদা (العقيدة)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

শাব্দিক অর্থ: ‘আকিদা’ শব্দটি আরবি ع-ق-د (আকদ) ধাতু থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো—দৃঢ়ভাবে বাঁধন দেওয়া (الربط والشد), গিরা দেওয়া, চুক্তি সম্পাদন করা বা এমন অটল বিশ্বাস যার মধ্যে কোনো সংশয় বা দ্বিধা থাকে না।

পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়—আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ববাদ, তাঁর সুন্দর নাম ও গুণাবলী, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাবসমূহ, নবী-রাসূলগণ, তাকদির এবং পরকালের প্রতি অন্তরের গভীর থেকে যে অটল, অবিচল ও সন্দেহমুক্ত ঈমান পোষণ করা হয়, তাকে ‘আকিদা’ বলে।

ইসলামে আকিদার গুরুত্ব (أهمية العقيدة)

  1. আমল কবুল হওয়ার একমাত্র পূর্বশর্ত: আকিদা বিশুদ্ধ না হলে কোনো সৎকাজ কবুল হয় না। কুরআনে ঘোষিত হয়েছে:

    مَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِرَبِّهِمْ أَعْمَالُهُمْ كَرَمَادٍ اشْتَدَّتْ بِهِ الرِّيحُ فِي يَوْمٍ عَاصِفٍ

    “যারা তাদের রবকে অস্বীকার করে, তাদের আমলসমূহের দৃষ্টান্ত হলো সেই ছাইভস্মের মতো, যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়।” (সূরা ইব্রাহিম: ১৮)

  2. শিরক ও কুফর থেকে সুরক্ষা: সহিহ আকিদা মানুষকে মাজারপূজা, পীরপূজা, ভাগ্যগণনা ও যাবতীয় শিরকি ধ্যানধারণা থেকে মুক্ত রেখে খাঁটি তাওহিদের আলোয় আলোকিত করে।
  3. চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে মুক্তি: যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও খাঁটি ঈমানি আকিদা থাকবে, সে একদিন না একদিন জাহান্নাম থেকে নাজাত পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে (সহিহ বুখারি)।

আকিদার প্রতি মানুষের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা (حاجة الناس إليها)

  • মৌলিক অস্তিত্বের প্রশ্নের সমাধান: মানুষ কোথা থেকে এসেছে? তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী? মৃত্যুর পর তার পরিণতি কী হবে?—বিজ্ঞান বা মানব রচিত দর্শন এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না; কেবল ইসলামি আকিদাই এগুলোর স্পষ্ট ও যৌক্তিক সমাধান দেয়।
  • মানসিক প্রশান্তি ও হতাশা মুক্তি: তাকদির ও পরকালের বিশ্বাস মানুষকে বিপদ-আপদে ধৈর্যশীল রাখে। জীবনের যেকোনো বিপর্যয়ে মুমিন নিশ্চিত থাকে যে, সবকিছু আল্লাহর হুকুমেই ঘটছে, ফলে সে আত্মহত্যার মতো মহাপাপ থেকে রক্ষা পায়।
  • নৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা: মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে অন্তর্যামী আল্লাহ সবকিছু দেখছেন এবং কিয়ামতের দিন অণু পরিমাণ পাপের বিচারও হবে, তখন সে গোপনেও চুরি, দুর্নীতি, ব্যভিচার ও জুলুম থেকে বিরত থাকে।

উপসংহার

আকিদা হলো মানব জীবনের চালিকাশক্তি। সহিহ আকিদা অর্জনের মাধ্যমেই মানুষ পাশবিকতার স্তর পেরিয়ে আশরাফুল মাখলুকাতের প্রকৃত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে।


٢- عرف الافتراق ثم بين نشأته وتطوره وأسبابه-

[২. الإفتراق এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও কারণসমূহ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলাম একটি অখণ্ড ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। পবিত্র কুরআনে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং বিভেদ থেকে দূরে থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নবুওয়তের সোনালী যুগের অবসানের পর মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক অনৈক্য দেখা দেয়। এই দলীয় বিভক্তি ও মূল পথ থেকে বিচ্যুত হওয়াকেই ইসলামি পরিভাষায় ‘ইফতিরাক’ (الافتراق) বলা হয়।

ইফতিরাক (الافتراق)-এর পরিচয়

আভিধানিক অর্থ: ইফতিরাক শব্দটি আরবি ف-ر-ق ধাতু থেকে বাবে ইফতিয়াল-এর মাসদার। এর অর্থ বিচ্ছিন্ন হওয়া, বিভক্ত হওয়া, দলীয় কোন্দল বা মতভেদ সৃষ্টি হওয়া।

পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায়—কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের অনুসৃত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূল আকিদা ও পথ বর্জন করে নতুন নতুন বাতিল ও বিভ্রান্তিকর মতবাদ গ্রহণ করে দলে দলে বিভক্ত হওয়াকে ইফতিরাক বলে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ইফতিরাক সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে ইরশাদ করেছেন:

وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً، قَالُوا: مَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي

“আর আমার উম্মত তেহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামে যাবে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! সেই মুক্তিপ্রাপ্ত দলটি কারা? তিনি বললেন: আমি ও আমার সাহাবিগণ যার ওপর প্রতিষ্ঠিত।” (সুনানে তিরমিজি: ২৬৪১)

ইফতিরাকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস

  1. সূচনা পর্ব (প্রথম হিজরি শতক – ফেতনার যুগ): তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুনাফিক ও ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে মুসলিম উম্মাহয় প্রথম রাজনৈতিক বিভেদের সূত্রপাত হয়। এরপর জঙ্গে জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হিজরি ৩৭ সনে সর্বপ্রথম দুটি চরমপন্থী দলের উদ্ভব ঘটে:
    • খারেজী সম্প্রদায় (الخوارج): যারা হযরত আলী ও মুয়াবিয়া (রা.) উভয়কে কাফির ফতোয়া দিয়ে জামায়াত থেকে বের হয়ে যায়।
    • শিয়া সম্প্রদায় (الشيعة): যারা হযরত আলী (রা.)-এর ভক্তিতে চরম সীমালঙ্ঘন করে তাঁকে নিষ্পাপ ইমাম ঘোষণা করে।
  2. আকিদাগত দর্শন ও বালামুক্তির যুগ (উমাইয়া আমলের শেষভাগ): মানুষের কর্মে স্বাধীনতা ও তাকদির নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে ‘কাদারিয়া’ ও ‘জাবারিয়া’ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। এরপর ওয়াছিল ইবনে আতা হাসান বসরীর মজলিস ত্যাগ করে ‘মু’তাযিলা’ দলের পত্তন করে।
  3. গ্রিক দর্শনের অনুবাদ ও বাতেনী দলসমূহ (আব্বাসীয় আমল): খলিফা মামুন ও মুতাসিমের যুগে গ্রিক যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের অবাধ অনুবাদের ফলে জাহমিয়া, কাররামিয়া এবং ইসমাইলি বাতেনী চরমপন্থী ফির্কার প্রসার ঘটে।

ইফতিরাকের প্রধান প্রধান কারণসমূহ (أسبابه)

  • অন্ধ দলীয় গোঁড়ামি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার লিপ্সা: খিলাফত ও নেতৃত্ব নিয়ে গোত্রীয় অহমিকা ও পক্ষপাতিত্ব।
  • দ্বীনের মূলনীতি ছেড়ে রূপক ও অস্পষ্ট (মুতাশাবিহাত) আয়াতের পেছনে ছোটা: কুরআনের অকাট্য মহকাম আয়াত উপেক্ষা করে নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়া।
  • গ্রিক ও বিজাতীয় দর্শনের অন্ধ অনুকরণ: ওহীর জ্ঞানকে মানবীয় ত্রুটিপূর্ণ যুক্তির অধীনস্থ করার দুঃসাহস।
  • ইহুদীবাদী আবদুল্লাহ ইবনে সাবার মতো ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্ত: ইসলামের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বে বিষবাষ্প ছড়ানো।

উপসংহার

ইফতিরাক উম্মাহর শক্তিমত্তা ও খিলাফতকে ধ্বংস করেছে। কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর ভিত্তিতে সাহাবায়ে কেরামের বুঝ অনুযায়ী ঐক্যবদ্ধ হওয়াই ইফতিরাক থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।


٣- من الشيعة؟ أذكر عقائدهم وفروعهم وكتبهم المشهورة-

[৩. শিয়া সম্প্রদায় কারা? তাদের আক্বীদা, শাখা-প্রশাখা ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও আকিদাগত দল হলো শিয়া সম্প্রদায়। তারা নিজেদের আহলে বায়াতের অনুসারী দাবি করলেও মূলত চরমপন্থী আকিদা ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষের কারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

শিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয়

আভিধানিক অর্থ: ‘শিয়া’ (الشيعة) শব্দের অর্থ দল, সমর্থক, অনুসারী বা সহযোগী।

পারিভাষিক পরিচয়: ইসলামের পরিভাষায়—যারা বিশ্বাস করে যে, হযরত আলী (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রত্যক্ষ অসিয়ত অনুযায়ী খেলাফতের একমাত্র হকদার ও প্রথম ইমাম ছিলেন এবং প্রথম তিন খলিফা (আবু বকর, উমর ও উসমান রা.) অন্যায়ভাবে খিলাফত দখল করেছিলেন, তাদেরকে শিয়া বলা হয়।

শিয়াদের প্রধান প্রধান আকিদাসমূহ

  1. ইমামত নবুওয়তের চেয়েও শ্রেষ্ঠ (عقيدة الإمامة): তাদের মতে ইমামত কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পদ নয়, বরং এটি ঈমানের অন্যতম মৌলিক রুকন। বারোজন ইমাম আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষ্পাপ (মাসূম) এবং তারা আসমানি ইলম ও গায়েবের অধিকারী।
  2. সাহাবায়ে কেরামের ওপর তাবররা ও গালিগালাজ: তাদের দাবি, নবীজির ওফাতের পর হযরত আলী, সালমান ফারসি, মিকদাদ ও আবু জর (রা.) ব্যতীত সমস্ত সাহাবি মুরতাদ (নাউযুবিল্লাহ) হয়ে গিয়েছিলেন। তারা প্রথম দুই খলিফার ওপর লানত দেওয়াকে সওয়াবের কাজ মনে করে।
  3. তাকিয়্যাহ বা মিথ্যা আশ্রয় (التقية): নিজেদের বিশ্বাস গোপন রাখা এবং প্রয়োজনে বিপরীত প্রকাশ করাকে তারা তাদের ধর্মের নয়-দশমাংশ মনে করে।
  4. কুরআন বিকৃতির দাবি (تحريف القرآن): তাদের প্রাচীন উলামারা দাবি করেন যে বর্তমান কুরআন পরিবর্তিত হয়েছে এবং মূল কুরআন ইমাম মাহদির কাছে রয়েছে।
  5. মুতা বিবাহ বৈধ মনে করা: নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে সাময়িক বিবাহ বা মুতাকে তারা সাওয়াবের কাজ মনে করে।

শিয়াদের প্রধান প্রধান শাখা-প্রশাখা

  • ইমামীয়া বা ইসনা আশারিয়া (الإثنا عشرية): শিয়াদের মূল ও সর্ববৃহৎ দল (ইরান, ইরাক, লেবাননের শিয়া)। তারা বারোজন ইমামে বিশ্বাসী, যার শেষ ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আল-আসকারী এক সুরঙ্গে আত্মগোপন করেছেন বলে বিশ্বাস করে।
  • ইসমাইলিয়া বা বাতেনিয়া (الإسماعيلية): যারা সপ্তম ইমাম হিসেবে ইসমাইল ইবনে জাফর আস-সাদিককে মানে। এদেরই একাংশ বর্তমান আগাখানি সম্প্রদায়।
  • জায়দিয়া সম্প্রদায় (الزيدية): ইমাম জায়েদ ইবনে আলীর অনুসারী (ইয়েমেনের হুতিরা)। তারা সাহাবিদের কাফির বলে না এবং সুন্নিদের তুলনামূলক কাছাকাছি।
  • গোলাত বা চরমপন্থী শিয়া: যারা হযরত আলী (রা.)-কে আল্লাহর অবতার দাবি করেছিল।

শিয়াদের প্রসিদ্ধ চারটি হাদীসগ্রন্থ (আল-কুতুবুল আরবাআহ)

  1. আল-কাফী (الكافي) – আল্লামা কুলিনী (শিয়াদের নিকট বুখারির সমতুল্য)।
  2. মান লা ইয়াহদুরুহুল ফকীহ (من لا يحضره الفقيه) – শায়খ সাদূক ইবনে বাবুওয়াহ।
  3. তাহযীবুল আহকাম (تهذيب الأحكام) – আবু জাফর আত-তূসী।
  4. আল-ইসতিবসার (الاستبصار) – আবু জাফর আত-তূসী।
  5. এ ছাড়া শরিফ রাজি সংকলিত ‘নাহজুল বালাগা’ তাদের পরম প্রামাণ্য গ্রন্থ।

উপসংহার

শিয়াদের আকিদা কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষার সরাসরি বিরোধী। তাদের সাহাবি-বিদ্বেষ ইসলামি ইতিহাসের সৌধকে বিনষ্ট করার নামান্তর।


٤- متى نشأت فرقة المعتزلة؟ وكم فرعاً لها؟ تحدث عن أصول عقائدهم مفصلاً-

[৪. কখন মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়েছে? এর শাখা কয়টি? তাদের আক্বীদার মূলনীতিগুলো বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামের ইতিহাসে বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিবাদী চরমপন্থী দলগুলোর মধ্যে মু’তাযিলা (المعتزلة) সর্বাধিক প্রভাবশালী। তারা ওহীর সুস্পষ্ট বাণীর ওপর মানবীয় বুদ্ধিবৃত্তিকে প্রাধান্য দিয়ে ইসলামের বহু প্রতিষ্ঠিত আকিদাকে বিকৃত করেছিল। আব্বাসীয় খেলাফতের আমলে তারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে সুন্নি আলেমদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালায়।

মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও সময়কাল

দ্বিতীয় হিজরি শতকের প্রথম ভাগে (প্রায় ১১০ হিজরিতে) ইরাকের বসরা নগরীতে মু’তাযিলা দলের উৎপত্তি হয়।
উৎপত্তির ঐতিহাসিক পটভূমি: তাবেঈনদের ইমাম হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর পাঠচক্রে কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির বিধান নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এমতাবস্থায় তাঁর এক ছাত্র ওয়াছিল ইবনে আতা (واصل بن عطاء) নিজ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন: “কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি মুমিনও নয়, কাফিরও নয়; বরং সে এই দুইয়ের মধ্যবর্তী স্তরে (ফাসেক)।” এ কথা বলে সে হাসান বসরীর মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মসজিদের এক কোণে পৃথক হালাক্বা কায়েম করল। তখন ইমাম হাসান বসরী বললেন: “اعْتَزَلَ عَنَّا وَاصِلٌ” (ওয়াছিল আমাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে)। এখান থেকেই তাদের নাম হয় ‘মু’তাযিলা’ (বিচ্ছিন্ন দল)।

মু’তাযিলাদের প্রধান প্রধান শাখাসমূহ

মু’তাযিলাদের প্রধানত দুটি ভৌগোলিক ও ফিকহি শাখা ছিল:

  1. বসরা শাখা (مدرسة البصرة): ওয়াছিল ইবনে আতা, আমর ইবনে উবাইদ, আবুল হুযাইল আল-আল্লাফ ও ইবরাহিম আন-নাজ্জাম এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা তুলনামূলক তাত্বিক আলোচনায় মশগুল থাকতেন।
  2. বাগদাদ শাখা (مدرسة بغداد): বিশর ইবনুল মু’তামির, সুমামা ইবনে আশরাস ও সাহিত্যিক আল-জাহিয এর নেতৃত্ব দেন। তারা খলিফা মামুনকে প্রভাবিত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘খালকে কুরআন’ (কুরআন সৃষ্টি) মতবাদ চাপিয়ে দিয়েছিল।

মু’তাযিলাদের পঞ্চ মূলনীতি (الأصول الخمسة للمعتزلة)

মু’তাযিলা আকিদা পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত:

  1. আত-তাওহিদ (التوحيد): তাওহিদ প্রমাণের নামে তারা আল্লাহর চিরন্তন গুণাবলী (সিফাত) যেমন ইলম, কুদরত, হায়াত ইত্যাদিকে সরাসরি অস্বীকার করে। তাদের চরম বিভ্রান্তি হলো তারা কুরআনকে আল্লাহর চিরন্তন কালাম না বলে ‘সৃষ্ট’ (খালকে কুরআন) বলে দাবি করে।
  2. আল-আদল (العدل – ন্যায়বিচার): তাদের মতে মানুষ নিজেই তার ভালো-মন্দ কাজের একক স্রষ্টা। বান্দার কোনো কাজ সৃষ্টিতে আল্লাহর কোনো দখল নেই। আর আল্লাহ ভালো কাজের পুরস্কার ও মন্দ কাজের শাস্তি দিতে আইনগতভাবে বাধ্য।
  3. আল-ওয়াদ ওয়াল ওয়াইদ (الوعد والوعيد – প্রতিশ্রুতি ও হুঁশিয়ারি): আল্লাহ মুমিনদের জান্নাত এবং কবিরা গুনাহগারদের জাহান্নামের যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তা পরিবর্তন করতে পারবেন না। কবিরা গুনাহগার তওবা ছাড়া মারা গেলে কোনো শাফায়াত পাবে না এবং চিরকাল জাহান্নামে জ্বলবে।
  4. আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন (المنزلة بين المنزلتين): কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি দুনিয়াতে পূর্ণ মুমিনও নয় আবার পূর্ণ কাফিরও নয়, বরং সে উভয়ের মধ্যবর্তী ফাসেক স্তরে থাকবে।
  5. আল-আমর বিল মা’রুফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার: তারা প্রয়োজনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধেও সশস্ত্র বিদ্রোহ করাকে ওয়াজিব মনে করত।

উপসংহার

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) অটল ধৈর্যের সাথে মু’তাযিলাদের ‘খালকে কুরআন’ ফিতনার মোকাবেলা করেন। পরবর্তীতে ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী শক্তিশালী যুক্তির মাধ্যমে মু’তাযিলাদের ভ্রান্ত মতবাদকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন।


٥- من هم الجبرية؟ تحدث عن نشأتهم وتطورهم وأصول عقائدهم مع ذكر فروعهم-

[৫. জাবারিয়া সম্প্রদায় কারা? তাদের উৎপত্তি, ক্রম বিকাশ ও মূল মতবাদ এবং তাদের শাখা দলগুলো সম্পর্কে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

তাকদির ও মানুষের ইচ্ছা স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে চরমপন্থী বিভ্রান্ত দলগুলোর আবির্ভাব ঘটেছিল, তার অন্যতম হলো ‘জাবারিয়া’ (الجبرية) সম্প্রদায়। তারা মানুষের কর্মের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মানুষকে নিরেট জড় পদার্থের মতো পরাধীন মনে করত।

জাবারিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয়

আভিধানিক অর্থ: ‘জাবার’ (الجبر) শব্দের অর্থ বাধ্য করা, জবরদস্তি করা বা বাধ্যবাধকতা।

পারিভাষিক পরিচয়: যে বিভ্রান্ত দল বিশ্বাস করে যে, মানুষের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা, ইচ্ছা বা স্বাধীনতা নেই; মানুষ তার সমস্ত কাজে সম্পূর্ণভাবে বাধ্য এবং বাতাস যেমন গাছের শুকনো পাতাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়, মানুষও তেমনি ভাগ্যের পুতুল মাত্র—তাদেরকে জাবারিয়া বলা হয়।

উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস

  • উৎপত্তি কাল: উমাইয়া খিলাফতের শেষভাগে প্রথম হিজরি শতকের সমাপ্তিতে দামেস্কে জাদ ইবনে দিরহাম প্রথম এই মতবাদের বিষবাষ্প ছড়ায়।
  • বিকাশ ও প্রসার: পরবর্তীতে খুরাসানের জাহম ইবনে সাফওয়ান (মৃত্যু: ১২৮ হিজরি) এই মতবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তাই জাবারিয়াদের ‘জাহমিয়া’ও বলা হয়। উমাইয়া শাসকদের কেউ কেউ নিজেদের জুলুম ও অপকর্মকে আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য বলে জায়েজ করার জন্য এই মতবাদকে পরোক্ষভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

জাবারিয়াদের প্রধান প্রধান আকিদাসমূহ

  1. মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও ক্ষমতার পূর্ণ অস্বীকৃতি: মানুষের নামাজ পড়া বা চুরি করা—সবকিছুই আল্লাহর নির্দেশে বাধ্য হয়ে করে। মানুষ যেন বাতাসের মুখে খড়কুটো। তাই মানুষের কোনো কাজের বাস্তব অস্তিত্ব নেই; কাজের কৃতিত্ব রূপক মাত্র।
  2. ঈমানের বিকৃত সংজ্ঞা: কেবল অন্তরে আল্লাহর মারিফত বা জানাই হলো পূর্ণ ঈমান। মুখে স্বীকার করা বা নেক আমল করার কোনো প্রয়োজন নেই। সুতরাং অন্তরে জানলেই ইবলিস ও ফেরাউনও তাদের দৃষ্টিতে পূর্ণ ঈমানদার হতে পারে (নাউযুবিল্লাহ)!
  3. জান্নাত ও জাহান্নামের বিনাশ: তারা দাবি করে জান্নাত ও জাহান্নাম চিরস্থায়ী নয়; একসময় সমস্ত সৃষ্টি ও জাহান্নাম ধ্বংস হয়ে কেবল আল্লাহ একা অবশিষ্ট থাকবেন।
  4. আল্লাহর সমস্ত সিফাত অস্বীকার: তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে এক বিমূর্ত শূন্যতায় পৌঁছে যায়।

জাবারিয়াদের শাখাসমূহ

  • ১. জাবারিয়া খালেসাহ (চরমপন্থী জাবারিয়া): জাহম ইবনে সাফওয়ানের অনুসারী (জাহমিয়া)। এরা বান্দার কোনো ক্ষমতা বা ইচ্ছার লেশমাত্র স্বীকার করে না।
  • ২. জাবারিয়া মুতাওয়াসসিতাহ (মধ্যমপন্থী জাবারিয়া): যেরারিয়া ও নাজ্জারিয়া দল। এরা বান্দার জন্য নামমাত্র ক্ষমতার কথা বললেও কার্যত সে ক্ষমতা কোনো প্রভাব ফেলে না বলে দাবি করে।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের জবাব

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত জাবারিয়া ও কাদারিয়া—উভয় চরমপন্থার বিপরীতে ভারসাম্য রক্ষা করেছে। বান্দার ইচ্ছা ও ক্ষমতা রয়েছে যার ভিত্তিতে সে পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত হবে, কিন্তু বান্দার সেই ক্ষমতাও শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কুদরত ও ইচ্ছার আওতাভুক্ত।


٦- عرف الأشعرية مع بيان نشأتهم وتطورهم وأصول عقائدهم-

[৬. আশআরী সম্প্রদায়ের পরিচয় দাও। অতঃপর তাদের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং মূল মতবাদগুলো আলোচনা কর।]

ভূমিকা

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূলধারার আকিদাকে যুক্তি ও কালাম শাস্ত্রের সাহায্যে সুসংহতভাবে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সর্বাধিক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে ‘আশ’আরী’ (الأشعرية) মাযহাব। মু’তাযিলাদের যুক্তিবাদী ফিতনা এবং মুশাব্বিহাদের অন্ধ রূপবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইমাম আবুল হাসান আল-আশ’আরী যে মধ্যমপন্থার বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন, তা বিশ্ব মুসলিমের সিংহভাগ আলেম কর্তৃক সাদরে গৃহীত হয়েছে।

আশ’আরী মাযহাবের পরিচয় ও প্রতিষ্ঠাতা

প্রতিষ্ঠাতা: ইমামুল মুতাকাল্লিমীন আবুল হাসান আলী ইবনে ইসমাঈল আল-আশ’আরী (রহ.) (২৬০–৩২৪ হিজরি / ৮৭৪–৯৩৬ খ্রি.)। তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু মূসা আল-আশ’আরী (রা.)-এর বংশধর ছিলেন এবং ইরাকের বসরায় জন্মগ্রহণ করেন।

উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস

  1. মু’তাযিলা জীবনের চল্লিশ বছর: ইমাম আশ’আরী প্রথম জীবনে বসরায় মু’তাযিলা প্রধান আবু আলী আল-জুব্বায়ীর অধীনে চল্লিশ বছর মু’তাযিলা দর্শনের গভীর অধ্যয়ন ও নেতৃত্ব দেন।
  2. ঐতিহাসিক তওবা ও প্রত্যাবর্তন: মু’তাযিলা দর্শনের অসঙ্গতি উপলব্ধি করে ৩০০ হিজরির দিকে তিনি বসরার জামে মসজিদে জুমার নামাজের পর মিম্বরে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাক খুলে ঘোষণা করেন: “আমি যেভাবে এই পোশাক খুলে ফেললাম, সেভাবে মু’তাযিলাদের আকিদা (যেমন কুরআন সৃষ্টি ও রূহ অস্বীকার) চিরতরে পরিত্যাগ করলাম। আজ থেকে আমি সাহাবা ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের সুন্নাহর পক্ষে কিতাব রচনা করব।”
  3. আশ’আরী ঘরানার প্রসার: তাঁর পর কাজী আবু বকর আল-বাকিল্লানী, ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনী, হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী এবং ইমাম ফখরুদ্দীন আল-রাযীর মতো বিশ্বখ্যাত মনীষীগণ এই ধারাকে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করেন। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও মিসর-শামের আলেম সমাজ আশ’আরী ধারার অনুসারী।

আশ’আরীদের প্রধান প্রধান আকিদাসমূহ

  1. আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলী সাব্যস্তকরণ: মু’তাযিলাদের মতো সিফাত অস্বীকার না করে এবং মুশাব্বিহাদের মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কল্পনা না করে তারা আল্লাহর সাতটি মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক সিফাত অকাট্যভাবে সাব্যস্ত করেন: জীবন (হায়াত), জ্ঞান (ইলম), ক্ষমতা (কুদরত), ইচ্ছা (ইরাদা), শ্রবণ (সামা’), দর্শন (বাসার) এবং কালাম (কথা)।
  2. কালামে নাফসি ও কুরআনের অবস্থান: তাদের মতে আল্লাহর মূল কালাম হলো চিরন্তন অভ্যন্তরীণ কথা (কালামে নাফসি), যা সৃষ্টি নয়। আর আমাদের পঠিত আরবির হরফ ও শব্দাবলি সেই চিরন্তন কালামের বহিঃপ্রকাশ।
  3. আমল ও তাকদিরে ‘কাসব’ (الكسب) তত্ত্ব: বান্দার কর্মের প্রকৃত স্রষ্টা হলেন মহান আল্লাহ, তবে বান্দা নিজের ইচ্ছা প্রয়োগের মাধ্যমে কাজটি ‘অর্জন’ বা কাসব করে। এই কাসবের কারণেই বান্দা পুরস্কার বা শাস্তির মুখোমুখি হবে।
  4. পরকালে আল্লাহকে দর্শন (রূ’ইয়াতুল্লাহ): মুমিনগণ কিয়ামতের দিন জান্নাতে আল্লাহ তায়ালাকে কোনো প্রকার দেহ, দিক বা স্থান ছাড়া স্বচক্ষে দর্শন লাভ করবে (সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩)।
  5. কবিরা গুনাহগারের বিধান: কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি মুমিন থাকবে; তার ফায়সালা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর—আল্লাহ চাইলে নিজ ক্ষমায় মাফ করবেন অথবা শাস্তি দিয়ে জান্নাতে দেবেন।

উপসংহার

আশ’আরী আকিদা হলো সুন্নাহ ও সুস্থ বুদ্ধির এক অতুলনীয় মিলনমেলা। এটি গত এক হাজার বছর ধরে উম্মাহর আকিদাগত দুর্গ হিসেবে বিশ্বস্ত ভূমিকা পালন করে আসছে।


مجموعة (ب) [বিভাগ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী]

মান: ৫ × ৪ = ২০

٧- من هم القرآنيّة (أهل القرآن)؟ صفهم بالإيجاز-

[৭. আল-কুরআনিয়া (আহলে কুরআন) কারা? সংক্ষেপে তাদের পরিচয় দাও।]

উত্তর:

আহলে কুরআন বা হাদিস অস্বীকারকারী দল:
যারা দাবি করে যে কেবল কুরআনই ধর্মের একমাত্র উৎস এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিসের কোনো শরয়ী প্রামাণিকতা নেই, তাদেরকে ‘আহলে কুরআন’ বা কুরআনিস্ট বলা হয়। আধুনিক যুগে ভারতীয় উপমহাদেশে আব্দুল্লাহ চকড়ালভী, আহমদ উদ্দীন অমৃতসরী এবং গোলাম আহমদ পারভেজ এই বিভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করে।

তাদের গোমরাহী ও বিভ্রান্তির স্বরূপ:

  1. হাদিস বাদ দিলে দ্বীন পালন অসম্ভব: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের রাকাত সংখ্যা, রুকু-সিজদার নিয়ম, জাকাতের শতকরা আড়াই টাকার নিসাব, হজের তওয়াফের নিয়ম কুরআনে নেই; এগুলো হাদিস দ্বারাই জানা যায়। হাদিস অস্বীকার করলে পুরো নামাজ-রোজা ভেঙে পড়ে।
  2. কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ লঙ্ঘন: পবিত্র কুরআনে রাসূলের আনুগত্যকে ফরজ ঘোষণা করা হয়েছে:

    وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

    “রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” (সূরা আল-হাশর: ৭)

অতএব, সহিহ হাদিস অস্বীকার করা প্রকারান্তরে কুরআনকেই অস্বীকার করার নামান্তর। উম্মাহর সর্বসম্মত ফতোয়ায় এরা ইসলাম বহির্ভূত বিভ্রান্ত সম্প্রদায়।


٨- تحدث عن القول الصحيح في اسماء الله وصفاته-

[৮. আল্লাহর নাম ও সিফাতের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ অভিমত আলোচনা কর।]

উত্তর:

আল্লাহ তায়ালার নাম ও গুণাবলী (আসমা ওয়া সিফাত)-এর ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূলনীতি হলো মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নিজেই এই মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন:

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শূরা: ১১)

বিশুদ্ধ মতের চারটি বর্জনীয় স্তম্ভ:

  1. তাকয়ীফ (التكييف – ধরণ নির্ধারণ না করা): আল্লাহর হাত, পা, চেহারা বা আরশে ইস্তাওয়া কেমন—তার ধরণ অনুসন্ধান করা নিষেধ। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন: “ইস্তাওয়া বিদিত, এর ধরণ বা কাইফিয়াত অজ্ঞাত, এর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এ নিয়ে প্রশ্ন করা বিদআত।”
  2. তামসিল (التمثيل – সৃষ্টির সাথে উপমা না দেওয়া): আল্লাহর কোনো গুণ সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নয়।
  3. তাহরীফ বা তা’বীল (التحريف): ইচ্ছামতো শব্দের অর্থ পরিবর্তন না করা।
  4. তা’তীল (التعطيل – গুণাবলী অস্বীকার না করা): মু’তাযিলাদের মতো আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার না করে আল্লাহ যেভাবে নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন সেভাবেই বিশ্বাস স্থাপন করা।

٩- عرف فرقة الخوارج مع بيان عقائدهم-

[৯. খারেজী সম্প্রদায়ের পরিচয় দাও এবং তাদের আক্বীদাগুলো বর্ণনা কর।]

উত্তর:

খারেজী (الخوارج)-এর পরিচয়:
খারেজী শব্দের অর্থ দলত্যাগী বা বিদ্রোহী। হিজরি ৩৭ সনে সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে রক্তপাত বন্ধের জন্য যখন সালিশি চুক্তি (তাহকীম) স্বাক্ষরিত হয়, তখন একদল উগ্র সৈন্য “لَا حُكْمَ إِلَّا لِلَّهِ” (আল্লাহ ছাড়া কারও ফয়সালা মানি না) স্লোগান তুলে হযরত আলীর সৈন্যদল ত্যাগ করে বের হয়ে যায়। এদেরকেই খারেজী বলা হয়।

খারেজীদের মূল আকিদাসমূহ:

  1. কবিরা গুনাহগারকে কাফির ঘোষণা (تكفير مرتكب الكبيرة): কোনো মুমিন মিথ্যা বললে, চুরি করলে বা ব্যভিচার করলে সে সরাসরি কাফির ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যায়।
  2. মহান সাহাবিদের তাকফির: তারা হযরত আলী, উসমান, মুয়াবিয়া, আমর ইবনুল আস (রা.) সহ সালিশি মান্যকারী সমস্ত সাহাবিকে কাফির ফতোয়া দেয় এবং হযরত আলী (রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করে।
  3. শাসকের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ ওয়াজিব মনে করা: কোনো শাসকের মধ্যে সামান্য ত্রুটি দেখলে তাকে কাফির ঘোষণা করে সশস্ত্র বিদ্রোহ করা।
  4. কুরআনের স্থূল ও আক্ষরিক অপব্যাখ্যা: গভীর ইলম ছাড়া বাহ্যিক অর্থ ধরে চরমপন্থা অবলম্বন করা।

١٠- تحدث عن ضلالة القاديانية بالإيجاز-

[১০. কাদিয়ানিদের গোমরাহী সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা কর।]

উত্তর:

কাদিয়ানি বা আহমদীয়া সম্প্রদায়ের পরিচয়:
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাদিয়ান নিবাসী মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৩৫–১৯০৮ খ্রি.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি চরম ধর্মত্যাগী কাফির দল।

তাদের প্রধান প্রধান কুফরি আকিদাসমূহ:

  1. খতমে নবুওয়ত অস্বীকার: তারা বিশ্বাস করে মুহাম্মদ (সা.)-এর পরও নবুওয়তের দরজা খোলা এবং মির্জা গোলাম আহমদ নাকি ছায়া নবী ও প্রতিশ্রুত মসীহ (নাউযুবিল্লাহ)। অথচ কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে: “مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ” (সূরা আল-আহযাব: ৪০)।
  2. মির্জার ওপর মিথ্যা ওহী নাযিলের দাবি: তারা মির্জার বানোয়াট কথাকে আসমানি ওহী মনে করে।
  3. সাধারণ মুসলিমদের কাফির মনে করা: যারা মির্জা কাদিয়ানিকে নবী মানে না, শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে তারা সমস্ত মুসলিমকে কাফির ও জাহান্নামী ঘোষণা করে।
  4. জিহাদ রহিতকরণের ফতোয়া: ব্রিটিশদের পা চাটার জন্য মির্জা গোলাম আহমদ ঘোষণা করেছিল যে ভারতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ হারাম।

সর্বসম্মত ফতোয়া: মক্কার রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী, ওআইসি এবং বিশ্ব মুসলিমের সর্বসম্মত ঐকমত্যে কাদিয়ানিরা অমুসলিম কাফির।


١١- عرف بالفرقة الناجية-

[১১. الفرقة الناجية এর পরিচয় দাও।]

উত্তর:

আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ (الفرقة الناجية)-এর অর্থ: মুক্তিপ্রাপ্ত দল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মতের বিভক্তি প্রসঙ্গে যে ৭৩ দলের হাদিস বর্ণনা করেছেন, তার মধ্যে যে একটিমাত্র দল জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাকেই হাদিসের ভাষায় ‘আল-ফিরকাতুন নাজিয়াহ’ বলা হয়।

হাদিসের আলোকে এই দলের পরিচয়:
হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের দুটি স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন:

  1. “مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي” (আমি এবং আমার সাহাবায়ে কেরাম যার ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছি)। অর্থাৎ ওহীর জ্ঞান এবং সাহাবিদের অনুসৃত মানহাজ যারা অক্ষরে অক্ষরে আঁকড়ে ধরবে।
  2. অন্য রেওয়ায়াতে এসেছে: “هِيَ الْجَمَاعَةُ” (তারা হলো মূল জামায়াত বা বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী)।

উম্মাহর পরিচয়: ইসলামি স্কলারদের সর্বসম্মত মতে, এই মুক্তিপ্রাপ্ত দলই হলো ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’। তারা কোনো নতুন মতবাদ তৈরি করে না; বরং সকল প্রকার বিদআত, চরমপন্থা (গুলু) ও শৈথিল্য (তাফরীত) বর্জন করে কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যমপন্থায় জীবন পরিচালনা করে।


١٢- عرف بالماتريدية-

[১২. মাতুরীদিয়্যাহ সম্প্রদায়ের পরিচয় দাও।]

উত্তর:

মাতুরিদিয়া (الماتريدية) মাযহাবের পরিচয়:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা রক্ষার ক্ষেত্রে আশ’আরী মাযহাবের সমান্তরাল দ্বিতীয় প্রধান প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় ধারা হলো মাতুরিদিয়া মাযহাব। হানাফি ফিকহের অনুসারী কোটি কোটি মুসলিমের আকিদাগত ভিত্তি হলো এই মাতুরিদিয়া ধারা।

প্রতিষ্ঠাতা: ইমামুল হুদা আবু মনসুর মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মাতুরিদী আস-সামারকান্দী (রহ.) (২৩৮–৩৩৩ হিজরি)। তিনি মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের সমরকন্দের মাতুরিদ মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন।

মাতুরিদিয়া আকিদার মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর প্রণীত ‘আল-ফিকহুল আকবার’ ও অন্যান্য আকিদার কিতাবের ওপর ভিত্তি করে কালাম শাস্ত্রীয় নিয়মে আহলে সুন্নাতের আকিদাকে যৌক্তিকভাবে রক্ষা করা।
  2. তাকবীন (التكوين) সিফাত: তারা আল্লাহর কাজের সিফাতসমূহের মূল হিসেবে ‘তাকবীন’ (সৃষ্টি করার গুণ)-কে আল্লাহর চিরন্তন জাতী সিফাত হিসেবে গণ্য করেন।
  3. বুদ্ধি ও ওহীর ভারসাম্য: ওহী আসার পূর্বেই সুস্থ মানব বিবেক দ্বারা আল্লাহকে এক বলে চেনার বাধ্যবাধকতা তারা স্বীকার করেন। তবে বিস্তারিত শরয়ী হুকুম ওহী ছাড়া জানা সম্ভব নয়।
  4. তাঁদের বিখ্যাত মৌলিক গ্রন্থ হলো ইমাম মাতুরিদী রচিত ‘কিতাবুত তাওহিদ’ এবং ‘তা’বীলাতু আহলিস সুন্নাহ’।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ‘আল-ফিরাকুল ইসলামিয়্যাহ’ শাস্ত্র অধ্যয়নের উদ্দেশ্য কী?

ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন বিভ্রান্ত ও বাতিল ফিরকাগুলোর আকিদা ও স্বরূপ চেনা এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের খাঁটি আকিদার ওপর অটল থাকা।

২. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূল ধারা কোনগুলো?

আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী ও ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরিদীর অনুসারী আলেমগণই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের মূল প্রতিনিধিত্বকারী।

৩. মু’তাযিলাদের প্রধান ভ্রান্তি কী ছিল?

ওহী ও সহিহ হাদিসের ওপর মানুষের অপূর্ণ জ্ঞান ও যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া এবং আল্লাহর চিরন্তন কালাম কুরআনকে সৃষ্ট বস্তু (খালকে কুরআন) দাবি করা।

৪. খারেজীদের সবচেয়ে বিপজ্জনক আকিদা কী?

যেকোনো কবিরা গুনাহগার মুমিনকে সরাসরি কাফির ফতোয়া দেওয়া এবং জান-মাল হালাল মনে করে মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করা।

৫. কাদিয়ানিরা কেন কাফির ও অমুসলিম?

তারা কুরআনের অকাট্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শেষ নবুওয়ত (খাতামুন্নাবিয়্যীন) অস্বীকার করে মির্জা গোলাম আহমদকে নতুন নবী বিশ্বাস করে।

৬. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের ফিরাক পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার উপায় কী?

প্রতিটি ফিরকার প্রতিষ্ঠাতার নাম, সাল, উৎপত্তির স্থান, তাদের মূল ভ্রান্ত আকিদাসমূহ এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সেগুলোর খণ্ডন পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *