اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۳
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الاتجاهات الفكرية المعاصرة
[আল-ইত্তি জাহাতুল ফিকরিয়্যাহ আল-মুয়াসিরাহ – সমকালীন চিন্তাধারা]
বিষয় কোড: ২০৩৮০৩ | পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩১
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
مجموعة (أ) – ক-বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
١- ما المراد بالإتجاهات الفكرية المعاصرة؟ بين أهمية دراستها مفصلا-
[১. الإتجاهات الفكرية المعاصرة বলতে কী বোঝায়? তা পাঠের গুরুত্ব বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
বর্তমান যুগ হলো চিন্তার সংঘাত ও মতাদর্শিক বিপ্লবের যুগ। সামরিক আগ্রাসনের চেয়েও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন আজ মানবসমাজকে বেশি প্রভাবিত করছে। পাশ্চাত্য রেনেসাঁর পর থেকে মানব রচিত বহু মতবাদ, দর্শন ও মতাদর্শের জন্ম হয়েছে যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ইসলামি দাওয়াতের পথকে নিরাপদ ও বিজয়ী করতে হলে এসব সমকালীন মতাদর্শ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। নিম্নে ‘আল-ইত্তি জাহাতুল ফিকরিয়্যাহ আল-মুয়াসিরাহ’ এর পরিচয় ও তা অধ্যয়নের গুরুত্ব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
সমকালীন চিন্তাধারা (الإتجاهات الفكرية المعاصرة)-এর পরিচয়
শাব্দিক বিশ্লেষণ: ‘আল-ইত্তি জাহাত’ (الاتجاهات) শব্দটি ‘ইত্তি জাহ’ (اتجاه)-এর বহুবচন, যার অর্থ গতিমুখ, অভিমুখিতা বা ধারা। ‘আল-ফিকরিয়্যাহ’ (الفكرية) অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক বা চিন্তামূলক। আর ‘আল-মুয়াসিরাহ’ (المعاصرة) অর্থ সমকালীন বা বর্তমান কালের।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: “আধুনিক যুগে মানবসমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, সমাজনীতি ও ধর্মবিশ্বাসে প্রভাব বিস্তারকারী পাশ্চাত্যে উদ্ভূত মানব রচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মতবাদসমূহ (যেমন—পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, জাতীয়তাবাদ, মুক্তচিন্তা ইত্যাদি)-কে সমকালীন চিন্তাধারা বলা হয়।”
সমকালীন চিন্তাধারা অধ্যয়নের অপরিসীম গুরুত্ব
- ইসলামের সার্বিক শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বাতন্ত্র্য অনুধাবন:
বিজাতীয় মতবাদগুলোর দুর্বলতা, স্ববিরোধিতা ও ব্যর্থতা পর্যালোচনা করলে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও ঐশী জীবনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্ধকার না দেখলে যেমন আলোর গুরুত্ব বোঝা যায় না, তেমনি ভ্রান্ত মতবাদ না জানলে তাওহিদের সৌন্দর্য উপলব্ধি করা কঠিন। - মুসলিম যুবসমাজের ঈমান রক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরক্ষা:
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও মিডিয়ার মাধ্যমে মুসলিম তরুণরা ধর্মনিরপেক্ষতা ও নাস্তিক্যবাদী সংশয়ের শিকার হচ্ছে। এসব মতবাদের তাত্ত্বিক অসারতা উন্মোচিত হলে মুসলিম প্রজন্মকে ঈমানহারা হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব। - শত্রুর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন (الغزو الفكري) প্রতিহতকরণ:
বিখ্যাত উক্তি রয়েছে: “যে ব্যক্তি শত্রুর ভাষা ও কৌশল জানে, সে তার ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকে।” শত্রুদের আগ্রাসী মতবাদের স্বরূপ না জানলে তাদের সাংস্কৃতিক ও মানসিক দাসত্ব প্রতিহত করা অসম্ভব। - যুগোপযোগী দাওয়াত ইলাল্লাহ পরিচালনা:
দাওয়াতে হিকমতের একটি অন্যতম শর্ত হলো শ্রোতার মানসিকতা জানা। একজন মার্কসবাদী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বা পুঁজিপতিকে দাওয়াত দিতে হলে তাদের দর্শনের পরিভাষা ও ভ্রান্তি সম্পর্কে জেনে তাদের যুক্তিতেই তাদের নিরুত্তর করতে হয়। - সমকালীন নাওয়াযিল ও আধুনিক ফিকহের বিকাশ:
আধুনিক রাজনীতি ও অর্থনীতির বহু নতুন সংকট (যেমন ইসলামিক ব্যাংকিং, শেয়ারবাজার, আন্তর্জাতিক আইন) ফিকহের আলোকে সমাধান করতে হলে সমকালীন ব্যবস্থাগুলোর অন্তর্নিহিত দর্শন জানা আবশ্যক।
উপসংহার
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) যথার্থই বলেছিলেন: “ইসলামের বন্ধন এক এক করে খুলে যাবে, যখন ইসলামে এমন লোকের জন্ম হবে যারা জাহিলিয়্যাত সম্পর্কে অজ্ঞ।” তাই বর্তমান যুগের আলিম ও দায়ীদের জন্য সমকালীন চিন্তাধারা অধ্যয়ন করা একটি অপরিহার্য বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ।
٢- ما الفرق بين الاشتراكية و الشيوعية والماركسية؟ بين مبادئ كل منها-
[২. সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম এবং মার্কসবাদের মধ্যে পার্থক্য কী? প্রতিটির মূলনীতি বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে বামপন্থী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়। এ দর্শনের প্রধান তিনটি ধারা হলো মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম। সাধারণ দৃষ্টিতে সমার্থক মনে হলেও এদের মধ্যে ঐতিহাসিক, তাত্ত্বিক ও প্রয়োগিক সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে এদের পারস্পরিক পার্থক্য ও মৌলিক নীতিমালাসমূহ আলোচনা করা হলো।
১. মার্কসবাদ (الماركسية – Marxism)
পরিচয়: কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক প্রণীত দার্শনিক, ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্বের সামগ্রিক নাম হলো মার্কসবাদ। এটি মূলত একটি তাত্ত্বিক দর্শন।
মৌলিক মূলনীতিসমূহ:
- দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism): বস্তুই মহাবিশ্বের আদি সত্য; কোনো আধ্যাত্মিক সত্তা বা সৃষ্টিকর্তা নেই।
- ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism): মানব ইতিহাসের সকল পরিবর্তন ও বিপ্লবের চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা।
- উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব (Surplus Value Theory): পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের শ্রমের অতিরিক্ত মূল্য শোষণ করে ধনী হয়।
- ধর্মের অস্বীকৃতি: কার্ল মার্কসের বিখ্যাত উক্তি—”ধর্ম হলো জনসাধারণের জন্য আফিম” (Religion is the opium of the people)।
২. সমাজতন্ত্র (الاشتراكية – Socialism)
পরিচয়: সমাজতন্ত্র হলো মার্কসবাদী ধারণার একটি অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
মৌলিক মূলনীতিসমূহ:
- উৎপাদন ও বণ্টনের মাধ্যমসমূহ রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মালিকানায় থাকবে।
- শ্রমিকদের সর্বহারার একনায়কতন্ত্র (Dictatorship of the Proletariat) প্রতিষ্ঠিত হবে।
- মূলনীতি: “প্রত্যেকের কাছ থেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং প্রত্যেককে তার কর্ম অনুযায়ী” (From each according to his ability, to each according to his work)।
- রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বজায় থাকে এবং বাজার অর্থনীতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
৩. কমিউনিজম (الشيوعية – Communism)
পরিচয়: এটি সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত ও তাত্ত্বিক পর্যায়। মার্কসের মতে, এটি এমন এক কাল্পনিক সমাজব্যবস্থা যেখানে কোনো শ্রেণিবৈষম্য, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং রাষ্ট্র বা সরকারের অস্তিত্ব থাকবে না।
মৌলিক মূলনীতিসমূহ:
- শ্রেণিহীন ও রাষ্ট্রহীন সমাজ (Classless and Stateless society)।
- ব্যক্তিগত সম্পত্তির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি; সবই হবে যৌথ মালিকানাধীন।
- মূলনীতি: “প্রত্যেকের কাছ থেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী এবং প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী” (From each according to his ability, to each according to his need)।
- পারিবারিক কাঠামোর শিথিলতা ও চূড়ান্ত নিরীশ্বরবাদ।
তিনটির মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য
| তুলনার ক্ষেত্র | মার্কসবাদ (الماركسية) | সমাজতন্ত্র (الاشتراكية) | কমিউনিজম (الشيوعية) |
|---|---|---|---|
| প্রকৃতি | তাত্ত্বিক ও দার্শনিক রূপরেখা। | মধ্যবর্তী বাস্তবায়নমূলক ব্যবস্থা। | চূড়ান্ত লক্ষ্য ও কাল্পনিক সমাজ। |
| রাষ্ট্রের অবস্থান | রাষ্ট্রকে শোষণের হাতিয়ার মনে করে। | রাষ্ট্র শক্তিশালী ও সর্বময় নিয়ন্ত্রক। | রাষ্ট্রের অবলুপ্তি ঘটবে (Withering away of State)। |
| বণ্টনের নীতি | উদ্বৃত্ত মূল্যের বিরুদ্ধে তত্ত্ব। | কর্ম অনুযায়ী বণ্টন। | প্রয়োজন অনুযায়ী উন্মুক্ত ভোগ। |
| বাস্তবতা | দার্শনিক বইপত্রে সীমাবদ্ধ। | সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনে প্রয়োগ হয়েছিল। | বাস্তবে কখনোই অর্জিত হয়নি। |
উপসংহার
ইসলাম এ সকল চরমপন্থী মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে ব্যক্তি মালিকানার বৈধতা, যাকাত-ভিত্তিক অর্থনীতি এবং ইনসাফপূর্ণ ভারসাম্যময় ব্যবস্থা উপহার দিয়েছে।
٣- ما الرأسمالية؟ تحدث عن أسسها وأشكالها وجذورها الفكرية-
[৩. পুঁজিবাদ কী? উহার মূলনীতি, বিবিধরূপ ও বুদ্ধি বৃত্তিক শেকড় সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ হলো পুঁজিবাদ (الرأسمالية – Capitalism)। শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপে সামন্তবাদের পতনের মধ্য দিয়ে এ ব্যবস্থার জন্ম হয়। অবাধ ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মুনাফা অর্জনের নিরঙ্কুশ অধিকারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা মানবজাতিকে একদিকে প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধি দিলেও অন্যদিকে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। নিম্নে এর বিশদ পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।
পুঁজিবাদের পরিচয় ও সংজ্ঞা
সংজ্ঞা: “পুঁজিবাদ হলো এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদনের উপাদানসমূহ ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হয়, বাজারের চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া অবাধ মুনাফা অর্জনই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।” এর প্রবক্তা ছিলেন অ্যাডাম স্মিথ (১৭২৩-১৭৯০), যিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Wealth of Nations’-এ এ তত্ত্ব দেন।
পুঁজিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক শেকড় (الجذور الفكرية)
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও রেনেসাঁ (Individualism): মধ্যযুগের চার্চের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ব্যক্তি মানুষকে সমস্ত কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা হয়।
- লেসেজ-ফেয়ার নীতি (Laissez-faire): ফরাসি এই দর্শনের মূল কথা হলো “মানুষকে তার মতো কাজ করতে দাও, কোনো বাধা দিও না” (Let do, let pass)। অর্থাৎ অর্থনীতিতে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।
- উপযোগিতাবাদ (Utilitarianism): জেরোমি বেন্থাম ও জন স্টুয়ার্ট মিলের দর্শন—পার্থিব সুখ ও আনন্দ বৃদ্ধি করাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।
- সামাজিক ডারউইনবাদ (Social Darwinism): “যোগ্যতমের টিকে থাকা” (Survival of the fittest) তত্ত্ব প্রয়োগ করে দুর্বলদের শোষণকে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়ম মনে করা।
পুঁজিবাদের মৌলিক ভিত্তিসমূহ (أسس الرأسمالية)
- অবাধ ব্যক্তিগত মালিকানা: নাগরিকের সম্পদ অর্জনের কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই; যা ইচ্ছা সেভাবে সে সম্পদ পুঞ্জীভূত করতে পারে।
- মুনাফার নিরঙ্কুশ উদ্দেশ্য (دافع الربح): যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি হলো সর্বাধিক লাভ অর্জন। এতে নৈতিকতা বা মানবিকতার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
- মুক্ত বাজার প্রতিযোগিতা (المنافسة الحرة): পণ্যের মূল্য ক্রেতা ও বিক্রেতার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
- ভোক্তার সার্বভৌমত্ব: ক্রেতা যা চাইবে উৎপাদক তা-ই তৈরি করবে, চাই তা নৈতিকভাবে ক্ষতিকর হোক (যেমন মদ, জুয়া বা পর্নোগ্রাফি)।
- সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা: পুঁজিবাদের মূল মেরুদণ্ড হলো সুদ (রিবা), যা ধনীদের আরও ধনী এবং দরিদ্রদের আরও নিঃস্ব করে।
পুঁজিবাদের বিভিন্ন রূপ (أشكال الرأسمالية)
- বাণিজ্যিক পুঁজিবাদ (Mercantilism): ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর রূপ, যেখানে বৈদেশিক বাণিজ্য ও স্বর্ণ মজুতকে প্রাধান্য দেওয়া হতো।
- শিল্প পুঁজিবাদ (Industrial Capitalism): কারখানা ও যন্ত্রপাতির মালিকানাকেন্দ্রিক রূপ।
- আর্থিক পুঁজিবাদ (Financial Capitalism): ব্যাংক, শেয়ারবাজার, হেজ ফান্ড ও মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রিত সমকালীন পুঁজিবাদ।
- বহুজাতিক বা করপোরেট পুঁজিবাদ (Monopoly Capitalism): বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিশ্ব অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ন্ত্রণ করে।
উপসংহার
ইসলাম পুঁজিবাদী অবাধ স্বার্থপরতা ও সুদভিত্তিক শোষণকে হারাম ঘোষণা করেছে এবং হালাল ব্যবসা, যাকাত ও সাদাকার মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করেছে।
٤- ما هو مفهوم الديمقراطية وما هي مبادئها الأساسية وسماتها المميزة-
[৪. গণতন্ত্রের ধারণা কী এবং এর মূলনীতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী?]
ভূমিকা
আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সর্বাধিক বহুল চর্চিত ও গৃহীত শাসনব্যবস্থা হলো ‘গণতন্ত্র’ (الديمقراطية – Democracy)। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স থেকে এর উৎপত্তি হলেও আধুনিক যুগে এটি সার্বজনীন রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। নিম্নে গণতন্ত্রের ধারণা, মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যালোচনা করা হলো।
গণতন্ত্রের ধারণা ও সংজ্ঞা
উৎপত্তি ও শাব্দিক অর্থ: গণতন্ত্রের ইংরেজি ‘Democracy’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘Demos’ (জনগণ) এবং ‘Kratos’ (শাসন বা ক্ষমতা) থেকে উদ্ভূত। যার আভিধানিক অর্থ “জনগণের শাসন”।
সংজ্ঞা: সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের বিখ্যাত সংজ্ঞানুযায়ী: “Democracy is government of the people, by the people, for the people” (গণতন্ত্র হলো জনগণের সরকার, জনগণ দ্বারা পরিচালিত এবং জনগণের কল্যাণের জন্য)। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
গণতন্ত্রের মৌলিক মূলনীতিসমূহ (المبادئ الأساسية)
- জনগণের সার্বভৌমত্ব (سيادة الشعب): রাষ্ট্রের যাবতীয় আইন প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ওপর নির্ভরশীল।
- আইনের শাসন (سيادة القانون): আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান; ধনী-দরিদ্র, শাসক-শাসিত সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য।
- মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা: বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমাবেশের অধিকারের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা।
- বহুদলীয় ব্যবস্থা ও নিয়মিত নির্বাচন: অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার হস্তান্তর নিশ্চিতকরণ।
- ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ (فصل السلطات): আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা।
গণতন্ত্রের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসমূহ (السمات المميزة)
- সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত: আইন ও নীতি নির্ধারণে ৫০%+১ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায় চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
- সংখ্যালঘুর অধিকার সংরক্ষণ: সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ শাসন করলেও সংখ্যালঘুর মৌলিক অধিকার খর্ব করা যায় না।
- জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা: সরকার তাদের কাজের জন্য বিরোধী দল ও সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে।
- রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা: ভিন্নমতকে সহ্য করা এবং গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানানো।
ইসলামের ‘শূরা’ এবং পাশ্চাত্যের ‘গণতন্ত্র’-এর তুলনামূলক পর্যালোচনা
ইসলামে পরামর্শ বা ‘শূরা’ (الشورى)-কে অপরিহার্য করা হয়েছে: وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ। তবে ইসলামের সাথে পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্য হলো—গণতন্ত্রে মানুষ সার্বভৌম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চাইলে মদ্যপান বা সমকামিতাকেও বৈধ করতে পারে। পক্ষান্তরে ইসলামে চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব একমাত্র মহান আল্লাহর (إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ); মানুষ কেবল আল্লাহর নির্ধারিত হালাল-হারামের সীমানার মধ্যে থেকে কল্যাণমূলক বিষয়ে পরামর্শ করতে পারে।
উপসংহার
গণতন্ত্র স্বৈরতন্ত্রের তুলনায় জবাবদিহিতামূলক কাঠামো দিলেও নৈতিক দিক থেকে এটি অপূর্ণাঙ্গ। ইসলামের শূরা পদ্ধতিই মানবজাতিকে ঐশী ইনসাফ উপহার দিতে পারে।
٥- ما المراد بالغز والفكرى؟ ثم بين وسائله وأهدافه في العصر الحديث-
[৫. الغز والفكرى দ্বারা উদ্দেশ্য কী? আধুনিক যুগে এর মাধ্যম ও উদ্দেশ্য বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো যখন বুঝতে পারল যে বন্দুক ও কামানের শক্তিতে মুসলিম উম্মাহকে দীর্ঘকাল পদানত রাখা সম্ভব নয়, তখন তারা মুসলমানদের ঈমানি চেতনা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য এক অদৃশ্য অথচ ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা করে। দাওয়াত ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ‘আল-গাযউল ফিকরী’ (الغزو الفكري) বা ‘সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন’ বলা হয়। নিম্নে এর স্বরূপ, মাধ্যম ও লক্ষ্য আলোচনা করা হলো।
বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন (الغزو الفكري)-এর পরিচয়
সংজ্ঞা: “কোনো সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করে পরিকল্পিত প্রচার, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কৌশলের মাধ্যমে কোনো জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও চিন্তাধারা ধ্বংস করে তাদের মন-মগজকে আগ্রাসী শক্তির মানসিক দাসে পরিণত করার সূক্ষ্ম অপতৎপরতাকে বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন বলা হয়।”
আধুনিক যুগে বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের মাধ্যমসমূহ (الوسائل)
- শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষকরণ: মুসলিম দেশগুলোর পাঠ্যপুস্তক থেকে জিহাদ, পর্দা ও ইসলামের সোনালী ইতিহাস বাদ দিয়ে বিজাতীয় ও নাস্তিক্যবাদী তত্ত্ব প্রবেশ করানো।
- বিশ্ব গণমাধ্যম ও বিনোদন শিল্প: হলিউড, নেটফ্লিক্স এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে নগ্নতা, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ও ইসলামবিদ্বেষকে সাধারণ স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে তরুণদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া।
- সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ: ফেসবুক, টিকটক ইত্যাদির মাধ্যমে অশ্লীলতা ও ট্রল কালচার ছড়িয়ে দিয়ে যুবসমাজের চিন্তাশক্তিকে ভোঁতা করে দেওয়া।
- এনজিও ও মিশনারি নেটওয়ার্ক: সমাজকল্যাণ ও মানবাধিকারের সাইনবোর্ডে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের বিপথগামী করা এবং পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া।
- আন্তর্জাতিক থিংকট্যাঙ্ক ও স্কলারশিপ: মুসলিম বিশ্বের মেধাবী তরুণদের বৃত্তি দিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে তাদের চিন্তায় প্রাচ্যবাদী সংশয় ও পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া।
বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের মূল উদ্দেশ্যসমূহ (الأهداف)
- কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি আস্থা বিনষ্ট করা: ইসলামি শরীয়তকে সেকেলে ও পশ্চাৎপদ প্রমাণ করে মানব রচিত মতবাদের প্রতি মোহ তৈরি করা।
- উম্মাহর বিশ্বজনীন ঐক্য ও খেলাফতের স্বপ্ন ধ্বংস করা: জাতীয়তাবাদ ও ভৌগোলিক সীমারেখার দেয়াল তুলে উম্মাহকে শতধা বিভক্ত করে রাখা।
- জিহাদের চেতনা ও প্রতিরোধ সংগ্রাম নিঃশেষ করা: মুসলমানদের মন থেকে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা মুছে দিয়ে তাদের ভোগবাদী ও ভীরু জাতিতে পরিণত করা।
- অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরনির্ভরশীলতা বজায় রাখা: মুসলিম দেশগুলোকে চিরকাল পশ্চিমা কর্পোরেশনগুলোর পণ্যের বাজারে পরিণত করে রাখা।
উপসংহার
বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন সামরিক আগ্রাসনের চেয়েও মারাত্মক; কারণ এতে দেহ অক্ষত থাকে কিন্তু রূহ ও ঈমান ধ্বংস হয়ে যায়। এর মোকাবেলায় কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞানে বলীয়ান বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সমকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।
٦- ما الفرق بين الهندوسية والشيخية؟ تحدث عقائدهما بالتفصيل-
[৬. হিন্দুধর্ম ও শিখধর্মের মধ্যে পার্থক্য কী? তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ভারতীয় উপমহাদেশে বহু ধর্মের সহাবস্থান রয়েছে। এদের মধ্যে প্রাচীনতম পৌত্তলিক ধর্ম হলো হিন্দুধর্ম, আর পঞ্চদশ শতাব্দীতে হিন্দুধর্ম ও ইসলামের সংস্পর্শে গুরু নানক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অপেক্ষাকৃত আধুনিক একেশ্বরবাদী একটি ধর্ম হলো শিখধর্ম। এ দুটি ধর্মের মাঝে বিশ্বাস, উপাসনা ও আচারে সুদূরপ্রসারী পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে উভয়ের বিশ্বাস ও পার্থক্যের বিশদ বিবরণ দেওয়া হলো।
১. হিন্দুধর্মের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ (عقائد الهندوسية)
- বহু ঈশ্বরবাদ ও মূর্তিপূজা: হিন্দুধর্মে লক্ষ লক্ষ দেব-দেবী ও তাদের প্রতিমার পূজা করা হয়। প্রধান তিন দেবতা হলো ব্রহ্মা (সৃষ্টিকর্তা), বিষ্ণু (পালনকর্তা) ও শিব (ধ্বংসকর্তা)।
- জন্মজন্মান্তরবাদ ও কর্মফল (تناسخ الأرواح): মানুষ মৃত্যুর পর তার পূর্বজন্মের কর্মফল অনুযায়ী পুনরায় মানুষ, পশুপাখি বা কীট-পতঙ্গ হয়ে বারবার জন্মগ্রহণ করে।
- কঠোর বর্ণপ্রথা (نظام الطبقات): সমাজ প্রধান চারটি বর্ণে বিভক্ত—ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। শূদ্ররা আজীবন অস্পৃশ্য ও নির্যাতিত।
- ধর্মগ্রন্থ: বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত ও ভগবদ গীতা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।
২. শিখধর্মের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ (عقائد الشيخية / السيخية)
- কঠোর একেশ্বরবাদ (الإيمان بإله واحد): শিখধর্মে মূর্তিপূজা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারা বিশ্বাস করে ঈশ্বর একজন, যিনি নিরাকার, শাশ্বত ও সর্বত্র বিরাজমান। তাকে ‘ওয়াহেগুরু’ বা ‘সতশ্রী আকাল’ বলা হয়।
- দশ গুরু ও গ্রন্থ সাহিব: তারা গুরু নানক থেকে শুরু করে দশম গুরু গোবিন্দ সিংহ পর্যন্ত দশ গুরুকে মান্য করে। এরপর তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’-কে চিরন্তন জীবন্ত গুরু হিসেবে গ্রহণ করেছে।
- বর্ণপ্রথার বিলুপ্তি ও মানব সমতা: শিখধর্মে কোনো বর্ণভেদ নেই। নারী-পুরুষ ও সকল বর্ণের মানুষ তাদের লঙ্গরখানায় একই সারিতে বসে আহার করে।
- পাঁচ ‘ক’ (الخمس كافات): প্রতিটি ধার্মিক শিখের জন্য পাঁচটি প্রতীক রাখা বাধ্যতামূলক—কেশ (অকাটা চুল), কঙ্গা (চিরুনি), কড়া (লোহার বালা), কাচেরা (বিশেষ অন্তর্বাস) এবং কিরপান (ছোট তলোয়ার)।
হিন্দুধর্ম ও শিখধর্মের মৌলিক পার্থক্যসমূহ
| বিষয় | হিন্দুধর্ম (الهندوسية) | শিখধর্ম (السيخية) |
|---|---|---|
| ঈশ্বর বিশ্বাস | বহু ঈশ্বরবাদী ও প্রতিমাপূজারি। | কঠোর একেশ্বরবাদী ও মূর্তিপূজাবিরোধী। |
| বর্ণভেদ | কঠোর চতুর্বর্ণ ব্যবস্থা ও অস্পৃশ্যতা বিদ্যমান। | বর্ণপ্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; সকল মানুষ সমান। |
| ধর্মগ্রন্থ | বেদ, গীতা, রামায়ণ ইত্যাদি। | কেবল ‘গুরু গ্রন্থ সাহিব’। |
| মন্দির ও উপাসনা | দেব-দেবীর মূর্তির সামনে অঞ্জলি প্রদান। | গুরুদুয়ারায় গ্রন্থ সাহিবের পাঠ ও শ্রবণ। |
উপসংহার
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের দৃষ্টিতে শিখধর্ম হিন্দুধর্মের পরিবেশ থেকে উদ্ভূত হলেও এটি ইসলামের তাওহিদ ও মানব সাম্যের ধারণায় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।
٧- ما هي المنظمات الصهيونية في العالم؟ ثم أذكر نشاطتها ومكائدها ضد الإسلام مفصلا-
[৭. বিশ্বে ইহুদিদের সংস্থাসমূহ কী? ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইহুদিবাদ বা জায়নবাদ (الصهيونية – Zionism) হলো একটি উগ্র বর্ণবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বুকে বলপ্রয়োগ করে একটি অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্র কায়েম করা এবং বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে তারা বিশ্বজুড়ে অসংখ্য দৃশ্যমান ও গোপন আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তুলেছে। নিম্নে এ সংস্থাগুলোর পরিচয় এবং ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের চক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বিশ্বের প্রধান প্রধান ইহুদি ও জায়নবাদী সংস্থাসমূহ
- বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থা (WZO – World Zionist Organization): ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে থিওডর হার্জেলের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই বিশ্বব্যাপী ইহুদি অভিবাসন ও ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল চালিকাশক্তি ছিল।
- আইপ্যাক (AIPAC – American Israel Public Affairs Committee): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক লবিস্ট গ্রুপ, যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, অস্ত্র সহায়তা ও কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে ইসরাইলের পক্ষে প্রভাবিত করে।
- মোসাদ (Mossad): ইসরাইলের কুখ্যাত আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে মুসলিম বিজ্ঞানী, সমরবিদ ও প্রতিরোধ নেতাদের গুপ্তহত্যা এবং নাশকতা চালায়।
- ইহুদি এজেন্সি (The Jewish Agency for Israel): বিশ্বজুড়ে বসবাসরত ইহুদিদের ফিলিস্তিনের মাটিতে পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার সমন্বয়কারী।
- এডিএল (Anti-Defamation League): ইহুদিদের বিরুদ্ধে যেকোনো যৌক্তিক সমালোচনাকে “ইহুদিবিদ্বেষ” (Anti-Semitism) আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্তব্ধ করে দেওয়ার কাজ করে।
ইসলামের বিরুদ্ধে জায়নবাদীদের অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্রসমূহ
- পবিত্র মসজিদুল আকসা ধ্বংসের চক্রান্ত: বায়তুল মুকাদ্দাস ও মসজিদুল আকসার ভিত্তিপ্রস্তর খনন করে তা ধসিয়ে দিয়ে সেখানে কথিত ‘হায়কালে সুলাইমানি’ (Solomon’s Temple) পুনর্নির্মাণের চক্রান্ত করছে।
- ফিলিস্তিনে মুসলিমদের ওপর গণহত্যা ও জাতিগত নিধন (Ethnic Cleansing): গাজা ও পশ্চিম তীরে শিশুদের হত্যা, বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন করে মুসলমানদের বাস্তুচ্যুত করা।
- বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ: বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসমূহ, মুদ্রা বিনিময় এবং শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া হাউসগুলোর মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্যযুদ্ধ পরিচালনা করা।
- মুসলিম বিশ্বে গৃহযুদ্ধ ও সংঘাত বাঁধানো: ‘গ্রেটার ইসরাইল’ (নীলনদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে (ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন) ধ্বংস ও খণ্ডবিখণ্ড করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা।
- ‘আব্রাহাম চুক্তি’ ও স্বাভাবিকীকরণের ফাঁদ: মুসলিম দেশগুলোকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সুরক্ষার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যুকে চিরতরে কবর দেওয়ার কূটনৈতিক চক্রান্ত বাস্তবায়ন করা।
উপসংহার
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন: لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِينَ أَشْرَكُوا — “নিশ্চয়ই মুমিনদের প্রতি শত্রুতায় আপনি ইহুদি ও মুশরিকদেরকেই সর্বাধিক কঠোর পাবেন।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮২)। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই কেবল এই বৈশ্বিক অভিশাপকে প্রতিহত করতে পারে।
٨- تحدث عن الصراع بين الحضارات والحرب ضد الإرهاب مفصلا-
[৮. সভ্যতার দ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এবং নাইন-ইলেভেনের (১১ সেপ্টেম্বর ২০০১) ঐতিহাসিক ঘটনার পর বৈশ্বিক রাজনীতি এক বিপজ্জনক মোড় নেয়। পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা বিশ্বকে বিভক্ত করতে এক নতুন সংঘাতের তত্ত্ব আবিষ্কার করেন, যার নাম ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ (Clash of Civilizations)। আর এই তত্ত্বের অজুহাতে শুরু হয় তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ’ (War on Terror)। এ দুটি প্রক্রিয়া মূলত মুসলিম বিশ্বকে পদানত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নিম্নে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হলো।
১. সভ্যতার দ্বন্দ্ব তত্ত্ব (صدام الحضارات – Clash of Civilizations)
১৯৯৩ সালে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে দাবি করেন যে, শীতল যুদ্ধোত্তর বিশ্বে সংঘাতের মূল কারণ কোনো অর্থনৈতিক বা আদর্শিক রাজনীতি হবে না, বরং মূল সংঘাত হবে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে—বিশেষ করে “পাশ্চাত্য সভ্যতা বনাম ইসলামি সভ্যতা”। তিনি ইসলামকে চরম যুদ্ধকামী হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন: “Islam has bloody borders” (ইসলামের সীমানা রক্তাক্ত)। এই বিদ্বেষমূলক তত্ত্বের উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিজমের পতনের পর পাশ্চাত্যের সামরিক অস্ত্র ব্যবসার জন্য একটি নতুন “কাল্পনিক শত্রু” হিসেবে ইসলামকে দাঁড় করানো।
২. সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (الحرب على الإرهاب – War on Terror)
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ঘোষণা করেন: “Either you are with us, or you are with the terrorists” (হয় তোমরা আমাদের সাথে আছো, অথবা সন্ত্রাসীদের সাথে আছো)। এ ঘোষণার মাধ্যমে তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা হয়।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আসল রূপ ও মুসলিম বিশ্বের ক্ষয়ক্ষতি
- আফগানিস্তান ও ইরাক আগ্রাসন: মিথ্যা ও সাজানো অভিযোগের ভিত্তিতে আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা চালিয়ে লক্ষ লক্ষ নিরীহ বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং দেশ দুটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়।
- ইসলামোফোবিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: সারা বিশ্বে মুসলমানদের দাড়ি, টুপি, হিজাব ও নামাজকে সন্দেহের চোখে দেখার পরিবেশ তৈরি করা হয় এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে মুসলিমদের হয়রানি করা হয়।
- মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন: গুয়ান্তানামো বে ও আবু গারিব কারাগারে মুসলিম বন্দীদের ওপর পৈশাচিক মধ্যযুগীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।
- প্রাকৃতিক সম্পদ ও তেলক্ষেত্র দখল: মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও খনিজ সম্পদের ওপর পশ্চিমা আধিপত্য সুদৃঢ় করা।
ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম কোনো সভ্যতার দ্বন্দ্ব বা নিরপরাধ মানুষের ওপর সন্ত্রাসে বিশ্বাস করে না। কুরআন বলে:
مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا
— “যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় ছাড়া একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২)। ইসলাম পারস্পরিক সংলাপ, ন্যায়বিচার ও শান্তির পক্ষপাতী।
উপসংহার
সভ্যতার দ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল মূলত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের একটি তাত্ত্বিক অজুহাত মাত্র।
مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত উত্তরীয় প্রশ্নাবলি)
٩- عرف القومية ثم بين تأثيرها على المجتمعات-
[৯. জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর সমাজে এর প্রভাব বর্ণনা কর।]
জাতীয়তাবাদ (القومية – Nationalism)-এর সংজ্ঞা
সংজ্ঞা: কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা, রক্ত বা বংশের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ঐক্যের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করা এবং নিজের জাতিকে অন্যান্য সকল জাতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করার ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক আদর্শকে জাতীয়তাবাদ বলা হয়।
সমাজে জাতীয়তাবাদের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ
- উম্মাহর বিশ্বজনীন ঐক্য বিনষ্ট: জাতীয়তাবাদ মুসলমানদের বৈশ্বিক ভাতৃত্ব (إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ) ধ্বংস করে ভৌগোলিক সীমানায় বিভক্ত করে ফেলেছে। এর ফলেই অটোমান খিলাফতের পতন ঘটেছিল।
- জাতিগত অহংকার ও বর্ণবাদ: এটি অন্য জাতির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আসাবিয়্যাত (জাতীয়তাবাদী গোঁড়ামি)-এর দিকে ডাকে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (আবু দাউদ)।
- যুদ্ধ ও রক্তপাত: ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদের (ফ্যাসিজম ও নাৎসিবাদ) কারণেই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল।
١٠- ما هي مفهوم العلمانية؟ بين موقف الإسلام منها موجزا-
[১০. ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কী বুঝ? এ ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান কী? সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
ধর্মনিরপেক্ষতা (العلمانية – Secularism)-এর ধারণা
সংজ্ঞা: ‘সেক্যুলারিজম’ বা ধর্মনিরপেক্ষতা হলো এমন একটি মতবাদ, যা রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন, বিচার ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও শিক্ষা থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখার দাবি জানায়। এর স্লোগান হলো: “ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত বিষয়, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।”
এ ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট অবস্থান
- ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক: ইসলাম কেবল ব্যক্তিজীবনের উপাসনা নয়; বরং এটি রাজনীতি ও রাষ্ট্রসহ একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ বলেন: ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً — “তোমরা ইসলামে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রবেশ করো।”
- আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অস্বীকার: ধর্মনিরপেক্ষতা মানব রচিত আইনকে আল্লাহর শরীয়তের ওপর প্রাধান্য দেয়, যা কুফরের শামিল: وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ (সূরা মায়িদাহ: ৪৪)।
- প্রকৃত ধর্মীয় সম্প্রীতি ইসলামেই বিদ্যমান: ইসলাম কোনো অমুসলিমকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে না (لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ) এবং তাদের পূর্ণ ধর্মীয় ও নাগরিক নিরাপত্তা দেয়। তাই ইসলামে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো প্রয়োজন নেই।
١١- ما هي اهداف حركة تحرير المرأة؟
[১১. নারীমুক্তি আন্দোলনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কী?]
নারীমুক্তি আন্দোলন (حركة تحرير المرأة – Feminism)-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
পাশ্চাত্যে নারীদের ওপর ঐতিহাসিক জুলুমের প্রতিক্রিয়ায় এ আন্দোলনের জন্ম হলেও আধুনিক যুগে এটি মুসলিম পারিবারিক মূল্যবোধ ধ্বংসের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর প্রধান লক্ষ্যসমূহ:
- হিজাব ও শালীনতার বিধান বিলুপ্তি: পর্দাকে বন্দিদশা ও নারীর পশ্চাৎপদতার প্রতীক হিসেবে প্রচার করে খোলামেলা পোশাক ও বেহায়াপনাকে উৎসাহিত করা।
- পরিবার ও মাতৃত্বের ধারণার অবমূল্যায়ন: সন্তান লালন-পালন ও গৃহস্থালি কাজকে দাসত্ব আখ্যা দিয়ে নারীদের ঘরের বাইরে করপোরেট পুঁজিপতিদের সস্তা শ্রমের পণ্যে পরিণত করা।
- শরীয়তের বিধানের বিকৃত পরিবর্তন দাবি: মিরাস বা উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অংশ, তালাকের ক্ষেত্রে সমঅধিকার এবং সমকামিতা (Lesbianism)-কে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতির দাবি তোলা।
- পুরুষের সাথে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা ও বিদ্বেষ তৈরি: দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহযোগিতার বদলে পুরুষকে নারীর আজন্ম শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা।
١٢- عرف الاستشراق والمستشرق موجزا-
[১২. সংক্ষেপে প্রাচ্যবাদ ও প্রাচ্যবিদের পরিচয় দাও।]
প্রাচ্যবাদ (الاستشراق – Orientalism)-এর পরিচয়
সংজ্ঞা: পশ্চিমা অমুসলিম পণ্ডিত ও গবেষকগণ রাজনৈতিক, ঔপনিবেশিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রাচ্যের (বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের) ধর্ম, কুরআন, হাদিস, আরবি ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে যে অ্যাকাডেমিক গবেষণা পরিচালনা করে, তাকে ‘ইস্তিশরাক’ বা প্রাচ্যবাদ বলা হয়। এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিখ্যাত ‘Orientalism’ গ্রন্থে এর সাম্রাজ্যবাদী মুখোশ উন্মোচন করেন।
প্রাচ্যবিদ (المستشرق – Orientalist)-এর পরিচয়
সংজ্ঞা: যে সকল পশ্চিমা পণ্ডিত প্রাচ্যের ইতিহাস, ইসলাম ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেন, তাদের প্রাচ্যবিদ বলা হয়। যেমন—গোল্ডজিহের, মার্গোলিউথ, জোসেফ শাখট প্রমুখ। এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের সোনালী ঐতিহ্যে সন্দেহ তৈরি করে ঔপনিবেশিক প্রভুদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা।
١٣- تحدث عن الكنفوشية وعقائدها-
[১৩. কনফুশীয় ও এর বিশ্বাস সম্পর্কে আলোচনা কর।]
কনফুসীয় মতবাদ (الكنفوشية – Confucianism)-এর পরিচয়
সংজ্ঞা: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে চীনে দার্শনিক কনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খ্রি.পূ.) কর্তৃক প্রবর্তিত নীতিশাস্ত্র, সামাজিক দর্শন ও রাজনৈতিক মতবাদকে কনফুসীয় মতবাদ বলা হয়। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্ম নয়, বরং একটি সমাজ ও রাষ্ট্রনৈতিক আচরণবিধি।
এর মৌলিক বিশ্বাস ও মূলনীতিসমূহ
- পূর্বপুরুষের পূজা ও ভক্তি: মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও পূজা করা।
- পিতা-মাতার প্রতি পরম আনুগত্য (Filial Piety): সন্তানের জীবনের মূল কর্তব্য হলো পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ও সেবা নিশ্চিত করা।
- সামাজিক স্তরবিন্যাস ও পাঁচ সম্পর্ক: শাসক ও প্রজা, পিতা ও পুত্র, স্বামী ও স্ত্রী, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা এবং বন্ধুর সাথে বন্ধুর সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি পালন।
- নীতি ও সদাচার (Ren and Li): আত্মসংযম, বিনয়, ন্যায়পরায়ণতা ও শিষ্টাচার চর্চা করা।
١٤- ما الشيوعية؟ بين أضرارها-
[১৪. কমিউনিজম কী? এর ক্ষতিকর দিকগুলো বর্ণনা কর।]
কমিউনিজম (الشيوعية)-এর সংজ্ঞা
সংজ্ঞা: কার্ল মার্কস ও লেনিনের দর্শনভিত্তিক একটি উগ্র বামপন্থী ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য হলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানা ও ধর্মবিশ্বাস নির্মূল করে সর্বহারাদের রাষ্ট্রহীন ও শ্রেণিহীন সমাজ গঠন করা।
কমিউনিজমের ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক দিকসমূহ
- নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলোৎপাটন: হাজার হাজার মসজিদ-গির্জা ভেঙে ফেলা, লাখ লাখ আলিমকে সাইবেরিয়ার বরফে নির্বাসনে হত্যা এবং আল্লাহ ও আখিরাতের বিশ্বাসকে অপরাধ গণ্য করা।
- ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সম্পূর্ণ বিনাশ: মানুষের নিজস্ব সম্পদ অর্জনের অধিকার ও মেধার বিকাশ রুদ্ধ করে রাষ্ট্রীয় পুতুলে পরিণত করা।
- রক্তক্ষয়ী গণহত্যা ও সন্ত্রাস: রাশিয়া ও চীনে বিপ্লবের নামে প্রায় ১০ কোটিরও বেশি নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
- অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষ: জোরপূর্বক যৌথ খামার ব্যবস্থা প্রবর্তন করায় কোটি কোটি মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল।
١٥- ما هي الماسونية والليونز؟ أكتب مختصرا-
[১৫. ফ্রিম্যাসনারী ও লায়ন্স কী? সংক্ষেপে লেখ।]
১. ফ্রিম্যাসনারী (الماسونية – Freemasonry)
পরিচয়: এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক, গোপনীয় ও রহস্যময় আন্তর্জাতিক জায়নবাদী সংগঠন। এর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংস করে সুলাইমানি মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ইহুদিদের বিশ্ব আধিপত্য কায়েম করা। এটি সাধারণ মানুষকে ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার স্লোগান শুনিয়ে ফাঁদে ফেলে, কিন্তু শীর্ষ পর্যায়ে ইহুদি চক্রান্ত বাস্তবায়ন করে।
২. লায়ন্স ক্লাব (أندية الليونز – Lions Club)
পরিচয়: ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত এটি ফ্রিম্যাসনারির একটি অন্যতম প্রকাশ্য সামাজিক ও সেবামূলক শাখা। চক্ষু চিকিৎসা, রক্তদান ও সমাজসেবার আড়ালে সমাজের প্রভাবশালী ধনীক শ্রেণি, বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের একত্রিত করে তাদের মগজধোলাই করা এবং জায়নবাদী স্বার্থের অনুকূলে ব্যবহার করাই এর মূল লক্ষ্য।
١٦- عرف بالروتاري- ثم بين أهدافه-
[১৬. রোটারী ক্লাব এর পরিচয় দাও। এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য বর্ণনা কর।]
রোটারী ক্লাব (الروتاري – Rotary Club)-এর পরিচয়
সংজ্ঞা: ১৯০৫ সালে মার্কিন আইনজীবী পল হ্যারিস কর্তৃক শিকাগোতে প্রতিষ্ঠিত রোটারী হলো ফ্রিম্যাসনারির অন্যতম প্রধান দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। রোটারী নামের অর্থ ‘ঘূর্ণায়মান’, কারণ শুরুতে এর সভাগুলো পর্যায়ক্রমে সদস্যদের অফিসে ঘুরে ঘুরে বসত।
রোটারী ক্লাবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ
- উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালীদের সংঘবদ্ধ করা: ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও রাজনীতিকদের ক্লাবের সদস্য বানিয়ে আন্তর্জাতিক জায়নবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ সুগম করা।
- মানবধর্মের নামে ধর্মহীনতা প্রচার: সকল ধর্মের মানুষকে একত্রিত করে দাবি করা যে ধর্মীয় অনুশাসনের চেয়ে সামাজিক সেবাই বড়, যার ফলে ইসলামি অনুশাসনের প্রতি উদাসীনতা তৈরি হয়।
- আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ: বিভিন্ন দেশে সেবামূলক প্রজেক্টের আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক তথ্য সংগ্রহ করা।
- জায়নবাদী সম্প্রীতি তৈরি: ইসরাইলের প্রতি পরোক্ষ সহানুভূতিশীল একটি ধর্মনিরপেক্ষ এলিট শ্রেণি তৈরি করা।
পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশিকা ও প্রস্তুতি কৌশল
الاتجاهات الفكرية المعاصرة (কোড: ২০৩৮০৩) বিষয়টি সমকালীন বিশ্বের সাথে ইসলামের তুলনামূলক বিশ্লেষণের এক সমৃদ্ধ শাস্ত্র। এ বিষয়ে পরীক্ষায় ভালো নম্বর অর্জনের উপায়:
- দার্শনিক পরিভাষার সঠিক ব্যবহার: পুঁজিবাদ, মার্কসবাদ, সেক্যুলারিজম, ফ্রিম্যাসনারী ইত্যাদির ইংরেজি ও আরবি পরিভাষাগুলো স্পষ্টভাবে খাতায় উল্লেখ করতে হবে।
- তুলনামূলক ছক উপস্থাপন: সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম, অথবা হিন্দুধর্ম ও শিখধর্মের পার্থক্যের মতো প্রশ্নগুলোতে তুলনামূলক টেবিল ব্যবহার করলে নিশ্চিত বেশি নম্বর পাওয়া যাবে।
- কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজন: প্রতিটি মানব রচিত মতবাদের ত্রুটি তুলে ধরার পাশাপাশি তার বিপরীতে ইসলামের বিকল্প ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান কুরআনের আয়াতের উদ্ধৃতিসহ পেশ করতে হবে।
- তথ্যবহুল ও যৌক্তিক উপস্থাপনা: আবেগী বক্তব্যের চেয়ে আন্তর্জাতিক ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি প্রদান করলে উত্তরটি অত্যন্ত মানসম্মত হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে ইসলামের মৌলিক বিরোধ কোথায়?
সেক্যুলারিজম ধর্মকে কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ রেখে রাজনীতি ও আইন থেকে আলাদা করে, পক্ষান্তরে ইসলাম বিশ্বাস করে আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌম এবং জীবন ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্র শারীয়তের অধীন পরিচালিত হতে হবে।
২. সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
সমাজতন্ত্র হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তির কাজ অনুযায়ী বণ্টন হয়, আর কমিউনিজম হলো একটি কাল্পনিক চূড়ান্ত সমাজ যেখানে কোনো রাষ্ট্র, সরকার বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে না এবং বণ্টন হবে প্রয়োজন অনুযায়ী।
৩. ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ (Clash of Civilizations) তত্ত্বের মূল বক্তব্য কী?
স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের এই তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো শীতল যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে প্রধান যুদ্ধগুলো আদর্শের কারণে নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সংঘটিত হবে, যার মূল নিশানা হলো ইসলামি সভ্যতা।
৪. ফ্রিম্যাসনারী ও রোটারী ক্লাবের গোপন উদ্দেশ্য কী?
আপাতদৃষ্টিতে মানবসেবার সাইনবোর্ড ব্যবহার করলেও এদের ভেতরের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংস করে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে জায়নবাদী ইহুদিদের আধিপত্য কায়েম করা।
৫. শিখধর্মে ‘পাঁচ ক’ (5 Ks) বলতে কী বোঝায়?
শিখধর্মের অনুসারীদের জন্য বাধ্যতামূলক পাঁচটি বাহ্যিক প্রতীক—কেশ (অকাটা চুল), কঙ্গা (চিরুনি), কড়া (লোহার বালা), কাচেরা (বিশেষ অন্তর্বাস) এবং কিরপান (ছোট তলোয়ার)।
৬. ইসলামি শরীয়ত কি পুঁজিবাদী অবাধ ব্যক্তি মালিকানাকে সমর্থন করে?
না; ইসলাম ব্যক্তি মালিকানাকে শর্তহীনভাবে মেনে নেয় না। ইসলামে উপার্জন অবশ্যই হালাল হতে হবে, সুদ, ফটকাবাজি ও শোষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং সম্পদে যাকাত ও সাদাকার মাধ্যমে সমাজের অধিকার নিশ্চিত করতে হয়।