ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২১
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ (المذاهب الفقهية – ইসলামী আইনশাস্ত্রীয় মাযহাবসমূহ)
বিষয় কোড: 201405 | প্রশ্নপত্র কোড: 151
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ভূমিকা ও পাঠ্যক্রম পরিচিতি
ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU)-এর ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম মৌলিক ও তুলনামূলক আইনতত্ত্ব বিষয়ক শাস্ত্রীয় বিষয় হলো ‘আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ’ (المذاهب الفقهية – Schools of Islamic Jurisprudence), যার প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় কোড ২০১৪০৫। কুরআন ও সুন্নাহর গভীর থেকে আহকাম উদ্ভাবনের পদ্ধতি, চার প্রধান সুন্নী মাযহাবের ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, তাকলীদের শারঈ মর্যাদা, হানাফী মাযহাবের মূলনীতি ও মুজতাহিদগণের স্তরবিন্যাস এবং রফউল ইয়াদাইন, তারাবীর সালাত, বিতর ও আমীনের মতো প্রখ্যাত ফিকহী ইখতিলাফের দলীলভিত্তিক মীমাংসা এই পাঠ্যসূচির প্রধান আলোচ্য। ২০২১ শিক্ষাবর্ষের এই প্রশ্নপত্রে ফিকহ ও মাযহাবতত্ত্বের মৌলিক তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রশ্নাবলি সন্নিবেশিত হয়েছে। নিম্নে উক্ত প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্ন ও উপ-প্রশ্নের বিশদ ও তথ্যসমৃদ্ধ একাডেমিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো।
বিভাগ ‘ক’ : রচনামূলক প্রশ্নাবলি (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক)
١- ما الفقه؟ وما هي الأهمية العملية للفقه في حياة المسلمين؟ بين-
[ফিকহ কী? মুসলমানদের জীবনে ফিকহের আমলগত গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
১. ফিকহ (الفقه)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয়:
ক. শাব্দিক অর্থ: ‘ফিকহ’ শব্দের মূল অর্থ সূক্ষ্ম অনুধাবন, গভীর উপলব্ধি ও প্রজ্ঞা (الفهم الدقيق)। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন: ﴿قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِّمَّا تَقُولُ﴾ [هود: ৯১] (তারা বলল: হে শুয়াইব! তুমি যা বল তার অনেক কথাই আমরা বুঝি না বা অনুধাবন করতে পারি না)। রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতের কল্যাণে দোয়া করে বলেছিলেন: «مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ» [সহীহ বুখারী] (আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর ফিকহ বা প্রজ্ঞা দান করেন)।
খ. পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসূলুল ফিকহের ইমামগণের সর্বসম্মত সংজ্ঞায়: «العِلْمُ بِالأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ العَمَلِيَّةِ المُكْتَسَبُ مِنْ أَدِلَّتِهَا التَّفْصِيلِيَّةِ»—অর্থাৎ বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট শারঈ দলীলসমূহ (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস) থেকে গবেষণা ও ইজতিহাদের মাধ্যমে অর্জিত ব্যবহারিক বিধানাবলীর গভীর জ্ঞানকে ‘ফিকহ’ বলে।
২. মুসলমানদের বাস্তব জীবনে ফিকহের আমলগত গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা:
- দৈনন্দিন ইবাদতের বিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণ: নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত এবং তাহারাতের মতো মৌলিক ইবাদত কীভাবে নিখুঁতভাবে আদায় করতে হবে—তার ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব ও মাকরূহাত নির্ধারণ করে দেয় ফিকহ। ফিকহ ছাড়া ইবাদতের সহীহ রূপ অনুধাবন অসম্ভব।
- হালাল ও হারামের সীমারেখা নির্ধারণ: মুমিনের জীবিকা, খাদ্য ও পোশাক অবশ্যই পবিত্র হতে হবে। অর্থনৈতিক লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়, সুদ, জুয়া, ধোঁকা ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার শারঈ মানদণ্ড নির্ধারণে ফিকহের বিকল্প নেই।
- পারিবারিক জীবনের শৃঙ্খলা ও শান্তি: বিবাহ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, তালাক, ইদ্দত, সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং মীরাস বা উত্তরাধিকার সম্পত্তির সূক্ষ্ম বণ্টন ফিকহের আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।
- ন্যায়বিচার ও অপরাধ দমন (দণ্ডবিধি): বিচারালয়ে সাক্ষ্য আইন, চুক্তি সম্পাদন, হুদূদ ও কিসাসের বিধানাবলি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজকে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যমুক্ত রাখতে ফিকহ রাষ্ট্রকে আইনি নির্দেশনা দেয়।
- সমকালীন আধুনিক সমস্যার সমাধান: টেস্টটিউব বেবি, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ডিজিটাল কারেন্সি বা ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং আধুনিক বৈশ্বিক বাণিজ্যের মতো নিত্যনতুন জটিল প্রশ্নের শারঈ ফয়সালা ফিকহী ইজতিহাদের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়।
٢- ما هو المذهب الفقهي وما الحاجة إليه؟ وما حكم اتباع المذهب الفقهي؟ هل هو واجب على المسلمين أم اختياري؟
[ফিকহি মাযহাব কী? এর প্রয়োজনীয়তা কী? ফিকহি মাযহাব অনুসরণের বিধান কী? এটা কি মুসলমানদের উপর আবশ্যিক না কি ঐচ্ছিক?]
১. ফিকহী মাযহাব (المذهب الفقهي)-এর সংজ্ঞা ও পরিচয়:
ক. শাব্দিক অর্থ: ‘মাযহাব’ (مذهب) শব্দটি ‘যাহাব’ (ذهب) ধাতু থেকে গঠিত ‘ইসমে মাকান’ বা স্থানের বিশেষ্য, যার অর্থ চলার পথ, মতাদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি বা গন্তব্য।
খ. পারিভাষিক রূপ: ইসলামী শরীয়তে একজন বিজ্ঞ মুজতাহিদ ইমাম কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নসসমূহ থেকে আহকাম উদ্ভাবনের জন্য যে সুনির্দিষ্ট উসূলী পদ্ধতি ও গবেষণা কাঠামো অনুসরণ করে ফিকহী মাসআলাসমূহ সমাধান করেছেন, সেই সামগ্রিক ফিকহী ধারাকে ‘মাযহাব’ বলা হয়। যেমন: হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব।
২. ফিকহী মাযহাবের অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা (الحاجة إليه):
- কুরআন-হাদীসের অগাধ সমুদ্র থেকে সরাসরি ইজতিহাদের অক্ষমতা: কুরআন ও হাদীসে রয়েছে লক্ষ লক্ষ আয়াত ও বর্ণনা। এর মধ্যে নাসিখ-মানসূখ, আম-খাস, মুতলাক-মুক্বাইয়্যাদ, হাকীকত-মাজায এবং হাদীসের সনদের সহীহ-যয়ীফ মান যাচাই করার মতো যোগ্যতা সাধারণ মানুষের নেই। মাযহাব এই জটিল গবেষণাকে সহজ করে উম্মতের সামনে প্রস্তুত খাদ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
- প্রবৃত্তির অনুগমন (ইত্তিবাউল হাওয়া) থেকে রক্ষা: মাযহাব না থাকলে মানুষ নিজের খেয়ালখুশিমতো বিভিন্ন মতের সুযোগসন্ধানী অংশ (তাতাব্বুউর রুখাস) বেছে নিত, যা দ্বীনের বিকৃতি ঘটাত।
- উম্মাহর শৃঙ্খলা ও বিচারিক স্থিতিশীলতা: একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা পরিচালনার জন্য একটি একক ও সুসংহত আইনি কাঠামো অপরিহার্য, যা মাযহাব নিশ্চিত করে।
৩. ফিকহী মাযহাব অনুসরণের শারঈ বিধান (আবশ্যিক না কি ঐচ্ছিক?):
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের জমহুর উলামা ও ফকীহগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুসলমানদের দুই স্তরে বিভক্ত করে বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে:
- মুজতাহিদগণের ক্ষেত্রে (ঐচ্ছিক/নিষিদ্ধ): যিনি স্বয়ং কুরআন ও হাদীসের যাবতীয় শর্ত পূরণ করে মুজতাহিদে মুতলাকের স্তরে পৌঁছেছেন (যেমন ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী), তাঁর জন্য অন্য কারো মাযহাব অনুসরণ করা আবশ্যক নয়; বরং নিজের ইজতিহাদ অনুযায়ী চলা ওয়াজিব।
- সাধারণ মুসলিম (আমী) ও সাধারণ আলিমদের ক্ষেত্রে (ওয়াজিব): যারা ইজতিহাদের যোগ্য নন, তাদের জন্য চার মাযহাবের যেকোনো একটি প্রামাণ্য মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব বা অপরিহার্য।
- কুরআনের দলীল: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ﴿فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴾ [النحل: ৪৩] (যদি তোমরা না জান, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর)।
- উসূলী কায়দা: «مَذْهَبُ العَامِّيِّ مَذْهَبُ مُفْتِيهِ» (সাধারণ মানুষের মাযহাব হলো তার মুফতী বা ইমামের মাযহাব)। উম্মতের মধ্যে ফিতনা ও বিভ্রান্তি রোধে চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকে সুনির্দিষ্ট একটি মাযহাব অনুসরণ করাকে (তাকলীদে শাখসী) উলামায়ে কেরাম ওয়াজিব ঘোষণা করেছেন।
٣- ما هي أسباب نشأة المذاهب الفقهية؟ وما هي العوامل التي ساهمت في تطورها؟
[ফিকহি মাযহাব উৎপত্তির কারণ কী কী? অতঃপর কোন বিষয়গুলো মাযহাবের ক্রমবিকাশে সাহায্য করেছে?]
১. ফিকহী মাযহাব উৎপত্তির প্রধান কারণসমূহ (أسباب نشأة المذاهب):
- কুরআনের শব্দাবলির ভাষাতাত্ত্বিক ও অর্থগত ভিন্নতা: কুরআনের বহু শব্দে একাধিক অর্থ রয়েছে (মুশতারাক)। যেমন: সূরা বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াতে ‘কুরু’ (قُرُوءٍ) শব্দের অর্থ হানাফী মাযহাবে ঋতুস্রাব (হায়িজ); পক্ষান্তরে শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবে পবিত্রতার সময় (তুহর)।
- হাদীসের ব্যাপক বিস্তার ও ভিন্ন ভিন্ন সনদের প্রাপ্যতা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর সাহাবীগণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। ফলে কোনো হাদীস একজনের কাছে পৌঁছেছে কিন্তু অন্যজনের কাছে পৌঁছায়নি, অথবা ভিন্ন সনদে পৌঁছেছে।
- হাদীস গ্রহণের শর্তাবলিতে ইমামগণের মতভিন্নতা:
- ইমাম আবু হানিফা খবরে ওয়াহিদ গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত দিয়েছেন এবং উমুমুল বালওয়ার ক্ষেত্রে কিয়াসকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
- ইমাম মালিক মদীনার সাহাবী ও তাবেয়ীদের আমলকে (আমালু আহলিল মাদীনাহ) একক খবরে ওয়াহিদের চেয়ে শক্তিশালী মনে করতেন।
- ইমাম শাফেয়ী মুরসাল হাদীস প্রত্যাখ্যান করলেও ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক তা গ্রহণ করেছেন।
- নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি: ইসলাম যখন সিরিয়া, ইরাক, মিশর ও পারস্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে নতুন নতুন সামাজিক রীতি ও লেনদেনের সমস্যা দেখা দেয়, যার সমাধানে ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়।
- আহলুল হাদীস ও আহলুর রায়ের বৈচিত্র্য: মদীনা কেন্দ্রিক মুহাদ্দিসগণ বর্ণনার ওপর নির্ভর করতেন (আহলুল হাদীস); আর কুফা কেন্দ্রিক ফকীহগণ যুক্তি ও কার্যকারণ অনুসন্ধানে পারদর্শী ছিলেন (আহলুর রায়)।
২. মাযহাবের ক্রমবিকাশে সাহায্যকারী নিয়ামকসমূহ (العوامل المساهمة في التطور):
- উসূলুল ফিকহের সংকলন: ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সর্বপ্রথম ‘আর-রিসালাহ’ রচনা করে ফিকহ উদ্ভাবনের সর্বজনীন বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা প্রদান করেন, যা মাযহাবগুলোর বিকাশকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়।
- যোগ্য ছাত্রদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কিতাব সংকলন: ইমামদের প্রধান শিষ্যগণ (যেমন: ইমাম আবু হানিফার ছাত্র আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ; ইমাম মালিকের ছাত্র ইবনুল কাসিম; ইমাম শাফেয়ীর ছাত্র আল-বুওয়াইতী ও আল-মুযানী) তাঁদের উস্তাদদের ফতোয়া ও উসূলসমূহ বিশ্বস্ততার সাথে কিতাবাকারে লিপিবদ্ধ করেন।
- শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ও বিচারিক পদে নিয়োগ: আব্বাসীয় খলিফাগণ ইমাম আবু ইউসুফকে ‘কাযীুল কুযাত’ (প্রধান বিচারপতি) নিয়োগ করায় হানাফী মাযহাব রাষ্ট্রীয় রূপ পায়। তদ্রূপ স্পেনে মালেকী এবং মিসরে শাফেয়ী মাযহাব রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করে।
- বিতর্ক ও বাহাসের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা: বিভিন্ন মাযহাবের পণ্ডিতদের মধ্যে উচ্চাঙ্গের একাডেমিক বিতর্ক (আল-খিলাফিয়্যাত) ফিকহী যুক্তিকে শাণিত ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
٤- من هم أئمة المذاهب الأربعة؟ بين دورهم في تأسيس المذاهب وتطويرها-
[চার মাযহাবের ইমাম কারা? মাযহাবের প্রতিষ্ঠা এবং ক্রমবিকাশে তাদের ভূমিকা বর্ণনা কর।]
১. চার মাযহাবের ইমামগণের পরিচয়:
| ইমামের নাম | জন্ম ও ওফাত | মূল কর্মস্থল / কেন্দ্র | উপাধি |
|---|---|---|---|
| ১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) | ৮০ হি. – ১৫০ হি. (কুফা ও বাগদাদ) | কুফা, ইরাক | আল-ইমামুল আযম (الأمام الأعظم) |
| ২. ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) | ৯৩ হি. – ১৭৯ হি. (মদীনা মুনাওয়ারা) | মদীনা, হেজায | ইমামু দারিল হিজরাহ (إمام دار الهجرة) |
| ৩. ইমাম শাফেয়ী (রহ.) | ১৫০ হি. – ২০৪ হি. (গাযা, মক্কা ও মিসর) | বাগদাদ ও কায়রো | নাসিরুস সুন্নাহ (ناصر السنة) |
| ৪. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) | ১৬৪ হি. – ২৪১ হি. (বাগদাদ) | বাগদাদ, ইরাক | ইমামু আহলিস সুন্নাহ (إمام أهل السنة) |
২. মাযহাব প্রতিষ্ঠা ও ক্রমবিকাশে ইমামগণের অবিস্মরণীয় ভূমিকা:
- ইমাম আবু হানিফা নুমান ইবনে সাবিত (রহ.):
- তিনি ছিলেন ফিকহের প্রাতিষ্ঠানিক জনক। তিনি চল্লিশজন শীর্ষ বিশেষজ্ঞ আলেমের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ‘ফিকহ কাউন্সিল’ গঠন করেন।
- তিনি ‘তাক্বদীরী ফিকহ’ (Hypothetical Jurisprudence) বা ভবিষ্যৎমুখী কল্পিত সমস্যার আগাম ফিকহী সমাধান উদ্ভাবন করেন। কিয়াস ও ইস্তিহসানের সূক্ষ্ম প্রয়োগে তিনি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন।
- ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.):
- তিনি হাদীস ও ফিকহের প্রথম বিধিবদ্ধ বিশ্বকোষ ‘আল-মুওয়াত্তা’ (الموطأ) রচনা করেন।
- তিনি মদীনার সাহাবী ও তাবেয়ীদের সম্মিলিত আমলকে (আমালু আহলিল মাদীনাহ) এবং মানবকল্যাণমূলক নীতিকে (আল-মাসালিহ আল-মুরসালাহ) ফিকহের মূল স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
- ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.):
- তিনি ইরাকের যুক্তিবাদী ‘আহলুর রায়’ এবং হেজাযের বর্ণনাবাদী ‘আহলুল হাদীস’-এর মাঝে এক অনন্য সমন্বয় সাধন করেন।
- উসূলুল ফিকহের প্রথম কিতাব ‘আর-রিসালাহ’ এবং ফিকহের মহাগ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্ম’ রচনা করে তিনি ইসলামী আইনশাস্ত্রকে একটি সুসংহত বৈজ্ঞানিক শাস্ত্রের রূপ দেন।
- ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.):
- মু’তাযিলাদের ‘খালক্বে কুরআন’ ফিতনার সময় সরকারের নির্মম নির্যাতনের মুখেও সুন্নাতের ওপর অটল থেকে তিনি উম্মাহর আকিদা ও ফিকহ রক্ষা করেন।
- তিনি প্রায় ত্রিশ হাজার হাদীস সংবলিত ‘আল-মুসনাদ’ সংকলন করেন এবং সুন্নাহ ও সাহাবীদের আসারকে কিয়াসের ওপর প্রাধান্য দিয়ে হাম্বলী মাযহাবের ভিত্তি স্থাপন করেন।
٥- ما هو المذهب الحنفي؟ وما هي أصول هذا المذهب؟ اذكر بعض كتب المذهب الحنفي الرئيسية-
[হানাফি মাযহাব কী? এ মাযহাবের মূলনীতিগুলো কী কী? হানাফি মাযহাবের প্রধান প্রধান কয়েকটি কিতাবের বর্ণনা দাও।]
১. হানাফী মাযহাব (المذهب الحنفي)-এর পরিচয়:
হানাফী মাযহাব হলো চার সুন্নী মাযহাবের মধ্যে সর্বপ্রাচীন, সর্বাধিক অনুসারীবিশিষ্ট এবং ইসলামী ইতিহাসের অধিকাংশ সালতানাতে (আব্বাসীয়, উসমানীয়, সেলজুক ও মোগল সাম্রাজ্যে) রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুসৃত মাযহাব। এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইমামুল আযম আবু হানিফা (রহ.) (৮০–১৫০ হি.)।
২. হানাফী মাযহাবের মৌলিক উসূল বা মূলনীতিসমূহ (أصول المذهب):
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) স্বয়ং তাঁর অনুসৃত উসূল সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
«إِنِّي آخُذُ بِكِتَابِ اللَّهِ إِذَا وَجَدْتُهُ، فَمَا لَمْ أَجِدْهُ فِيهِ أَخَذْتُ بِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ، فَإِذَا لَمْ أَجِدْ فِيهِمَا أَخَذْتُ بِقَوْلِ مَنْ شِئْتُ مِنْ أَصْحَابِهِ وَأَدَعُ قَوْلَ مَنْ شِئْتُ، وَلَا أَخْرُجُ عَنْ قَوْلِهِمْ إِلَى قَوْلِ غَيْرِهِمْ، فَإِذَا انْتَهَى الأَمْرُ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَالشَّعْبِيِّ وَابْنِ سِيرِينَ فَهُمْ رِجَالٌ اجْتَهَدُوا فَأَجْتَهِدُ كَمَا اجْتَهَدُوا»।
- ১. কিতাবুল্লাহ (কুরআনুল কারীম): সমস্ত শারঈ বিধানের চূড়ান্ত ও অকাট্য উৎস।
- ২. সুন্নাতে রাসূল ﷺ: মুতাওয়াতির, মাশহূর ও নির্ভরযোগ্য খবরে ওয়াহিদ।
- ৩. আক্বওয়ালুস সাহাবাহ (সাহাবীদের রায়): কোনো বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহে স্পষ্ট বিধান না থাকলে সাহাবায়ে কেরামের মতামতকে অন্য সবার ওপরে প্রাধান্য দেওয়া।
- ৪. আল-ইজমা (الاجماع): কোনো যুগে উম্মতের মুজতাহিদগণের ঐকমত্য।
- ৫. আল-ক্বিয়াস (القياس): কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক কারণ (ইল্লত)-এর ভিত্তিতে নতুন সমস্যার সমাধান।
- ৬. আল-ইসতিহসান (الاستحسان): দৃশ্যমান কঠোর কিয়াসের চেয়ে জনকল্যাণ ও গভীর প্রমাণের স্বার্থে সহজ ও অনুকূল মত গ্রহণ।
- ৭. আল-উর্ফ ওয়াল আদাহ (العرف والعادة): সমাজের প্রতিষ্ঠিত ভালো ও শরীয়ত-বিরোধী নয় এমন সামাজিক প্রথা ও প্রচলনকে আইনের ভিত্তি মানা।
৩. হানাফী মাযহাবের প্রধান প্রধান কিতাবসমূহ:
- জাহিরুর রিওয়ায়াত (ظاهر الرواية): ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.) সংকলিত ৬টি মৌলিক কিতাব, যা হানাফী মাযহাবের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মূল ভিত্তি:
- আল-আসল (বা আল-মাবসূত)
- আল-জামেউল কাবীর
- আল-জামেউস সাগীর
- আস-সিয়ারুল কাবীর
- আস-সিয়ারুস সাগীর
- আয-যিয়াদাত
- আল-মাবসূত (المبسوط) – ইমাম সারাখসী (রহ.): ৩০ খণ্ডে রচিত হানাফী ফিকহের সুবিশাল ও তুলনাহীন প্রামাণ্য বিশ্বকোষ।
- বাদায়েউস সানায়ে (بدائع الصنائع) – ইমাম কাসানী (রহ.): ফিকহের বিষয়ভিত্তিক সুশৃঙ্খল বিন্যাসের এক অনন্য মাস্টারপিস।
- আল-হিদায়াহ (الهداية) – ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.): হানাফী ফিকহের সবচেয়ে নন্দিত ও বিশ্বজুড়ে মাদরাসাসমূহে পাঠ্য কিতাব।
- রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার (ফতোয়ায়ে শামী) – আল্লামা ইবনে আবেদীন আশ-শামী (রহ.): হানাফী ফিকহের আধুনিক যুগের চূড়ান্ত সমাধানকারী ফতোয়াগ্রন্থ।
٦- اكتب آراء الفقهاء حول مسئلة رفع اليدين ثم رجح الرأي الحنفي على المذاهب الأخرى-
[رفع اليدين মাসআলার ক্ষেত্রে ফকীহগণের অভিমত ব্যক্ত কর। অতঃপর অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় হানাফিদের অভিমতের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধর।]
১. রফউল ইয়াদাইন (হাত তোলা) মাসআলায় ফকীহগণের অভিমত:
নামাজের শুরুতে তাকবীরে তাহরীমার সময় উভয় হাত তোলা সকল মাযহাবের সর্বসম্মত সুন্নাত। তবে রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে ওঠার সময় হাত তোলা (রফউল ইয়াদাইন করা) হবে কি না—এ বিষয়ে ফকীহগণের মাঝে দুটি প্রধান মত রয়েছে:
- প্রথম মত (শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব): ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মতে, তাকবীরে তাহরীমা ছাড়াও রুকুতে যাওয়ার সময়, রুকু থেকে ওঠার সময় এবং দুই রাকাত পড়ে তৃতীয় রাকাতের শুরুতে হাত তোলা সুন্নাত। তাঁদের প্রধান দলীল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণিত হাদীস (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
- দ্বিতীয় মত (হানাফী ও মালেকী মাযহাব): ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মালিকের (প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী) মতে, নামাজে কেবল প্রথম তাকবীরে তাহরীমার সময়ই হাত তোলা সুন্নাত; নামাজের অন্য কোনো রুকনে (রুকুতে যাওয়া বা ওঠা) হাত তোলা সুন্নাত নয়।
২. হানাফী মাযহাবের শক্তিশালী দলীলসমূহ ও শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ (তারজীহ):
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর প্রামাণ্য হাদীস: সুনানে তিরমিযী (হাদীস নং ২৫৭), আবু দাউদ (হাদীস নং ৭৪৮) ও সুনানে নাসায়ীতে সহীহ সনদে বর্ণিত:
«عَنْ عَلْقَمَةَ، قَالَ: قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ: أَلَا أُصَلِّي بِكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ؟ فَصَلَّى، فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا فِي أَوَّلِ مَرَّةٍ»
(আলক্বামাহ থেকে বর্ণিত, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন: আমি কি তোমাদের রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামাজ পড়ে দেখাব না? অতঃপর তিনি নামাজ পড়লেন এবং কেবল প্রথমবার ব্যতীত আর কোথাও হাত তুললেন না)। ইমাম তিরমিযী এই হাদীসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন এবং আলবানীসহ বহু মুহাদ্দিস একে সহীহ বলেছেন। - বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর রেওয়ায়েত: সুনানে আবু দাউদে সহীহ সনদে বর্ণিত: «أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ كَانَ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ رَفَعَ يَدَيْهِ… ثُمَّ لَا يَعُودُ» (রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন নামাজ শুরু করতেন হাত তুলতেন, অতঃপর পুনরায় আর হাত তুলতেন না)।
- খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল: হযরত আবু বকর, উমর এবং আলী (রা.)-এর আমল ছিল তাঁরা প্রথম তাকবীর ছাড়া রফউল ইয়াদাইন করতেন না। উমর (রা.) বলতেন: নামাজের প্রথমাংশেই কেবল হাত তোলা হবে।
- নামাজে খুশু ও স্থিরতার (সুকূন) সাধারণ নির্দেশ: সহীহ মুসলিমে হযরত জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের হাত তুলতে দেখে সতর্ক করে বলেছিলেন: «مَا لِي أَرَاكُمْ رَافِعِي أَيْدِيكُمْ كَأَنَّهَا أَذْنَابُ خَيْلٍ شُمْسٍ؟ اسْكُنُوا فِي الصَّلَاةِ» (তোমাদের কী হলো, আমি তোমাদের অবাধ্য ঘোড়ার লেজের মতো হাত ওঠাতে দেখছি কেন? নামাজে স্থিরতা অবলম্বন কর!)।
- নাসিখ-মানসূখের তত্ত্ব: ইসলামের প্রাথমিক যুগে মূর্তিপূজার অভ্যাস দূর করতে বা বগলে মূর্তি লুকানোর জাহেলী রীতি বন্ধে বারবার হাত তোলার অনুমতি ছিল; পরবর্তী সময়ে নামাজে একাগ্রতা ও স্থিরতা বৃদ্ধির জন্য তা মানসূখ বা রহিত হয়ে কেবল সূচনার তাকবীরে সীমাবদ্ধ করা হয়। অতএব, হানাফী মতটি অধিক যুক্তিযুক্ত, সুন্নাতের সর্বশেষ আমলের অনুকূল এবং খুশু-খুজুর অধিক নিকটবর্তী।
বিভাগ ‘খ’ : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক)
٧- ما معنى التقليد؟ وكم قسما له؟ بين- (তাকলীদের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ)
সংজ্ঞা: ‘তাকলীদ’ (التقليد) শব্দের মূল অর্থ গলায় হার বা রশি পরানো। উসূলুল ফিকহের পরিভাষায়: «اتِّبَاعُ قَوْلِ الغَيْرِ مِنْ غَيْرِ مَعْرِفَةِ دَلِيلِهِ التَّفْصِيلِيِّ»—অর্থাৎ বিস্তারিত দলীল না জেনে কোনো নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদ ইমামের ফিকহী সিদ্ধান্তকে নির্ভুল জেনে তার ওপর আমল করাকে ‘তাকলীদ’ বলে।
প্রকারভেদ: তাকলীদ প্রধানত দুই প্রকার:
- ১. তাকলীদে মাহমূদ (প্রশংসনীয় বা ওয়াজিব তাকলীদ): সাধারণ অ-মুজতাহিদ মানুষের জন্য চার মাযহাবের যেকোনো বিজ্ঞ মুজতাহিদের ফতোয়া মেনে চলা।
- ২. তাকলীদে মাযমুম (নিন্দনীয় বা হারাম তাকলীদ): সত্য সুস্পষ্ট হওয়ার পরও বাপ-দাদার জাহেলী রীতির অন্ধ অনুকরণ করা (যেমন কাফিরদের ক্ষেত্রে কুরআন নিন্দা করেছে), অথবা কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য বিধানের বিপরীতে কোনো মানুষের অন্ধ অনুসরণ করা।
٨- ما المراد بـ حج البدل؟ وما حكمه؟ (হজ্ব আল-বদলের তাৎপর্য ও শারঈ বিধান)
১. তাৎপর্য: কোনো ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ হওয়ার পর যদি সে বার্ধক্য, পঙ্গুত্ব বা দূরারোগ্য ব্যাধির কারণে নিজে মক্কায় গিয়ে হজ পালনে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়ে, অথবা হজের অসিয়ত করে মৃত্যুবরণ করে, তবে তার পক্ষ থেকে অন্য কোনো ব্যক্তি দ্বারা সেই ফরজ হজ আদায় করানোকে ‘হজ্ব আল-বদল’ (حج البدل) বা বদলী হজ বলে।
২. শারঈ বিধান ও শর্তাবলি:
- বদলী হজ করানো জায়েয এবং আদায়কারীর পক্ষ থেকে ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত, খাসআম গোত্রের এক নারী এসে বলেছিলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতার ওপর হজ ফরজ হয়েছে কিন্তু তিনি বাহনে বসতে পারেন না; আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ করব?’ রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: ‘হ্যাঁ, তোমার পিতার ওপর ঋণ থাকলে যেমন তুমি পরিশোধ করতে, তেমনি আল্লাহর ঋণ পরিশোধ কর।’
- শর্তাবলি:
- যার পক্ষ থেকে হজ করা হচ্ছে তাকে স্থায়ীভাবে অক্ষম বা মৃত হতে হবে।
- যিনি বদলী হজে যাচ্ছেন, তাকে পূর্বে নিজের ফরজ হজ আদায় করে নেওয়া উত্তম (শাফেয়ী মাযহাবে আবশ্যক)।
- হজের সমস্ত খরচ মূল ব্যক্তির সম্পদ থেকে বহন করতে হবে।
٩- ما هي مراتب المجتهدين في المذهب الحنفي؟ (হানাফি মাযহাবে মুজতাহিদগণের স্তরবিন্যাস)
আল্লামা ইবনে কামাল পাশা (রহ.) হানাফী মাযহাবের ফকীহ ও মুজতাহিদগণকে সাতটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:
- মুজতাহিদু ফিল মাযহাব বা মুতলাক (مجتهدون في الشرع): যাঁরা নিজস্ব উসূল ও কাওয়ায়েদের ভিত্তিতে সরাসরি নস থেকে ফিকহ উদ্ভাবন করেছেন (যেমন: ইমাম আবু হানিফা)।
- মুজতাহিদু ফিল মাযহাব (مجتهدون في المذهب): যাঁরা উস্তাদের উসূলের ওপর ভিত্তি করে মাসআলা উদ্ভাবন করেছেন (যেমন: ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ)।
- মুজতাহিদু ফিল মাসায়েল (مجتهدون في المسائل): যেসকল বিষয়ে ইমামদের কোনো স্পষ্ট বর্ণনা নেই, সেগুলোতে নতুন ফতোয়া দিয়েছেন (যেমন: ইমাম খাসসাফ, তহাবী, কারখী, সারাখসী)।
- আসহাবুত তাখরীজ (أصحاب التخريج): ইমামদের সংক্ষিপ্ত বা দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্যের ব্যাখ্যা ও তাখরীজ করেছেন (যেমন: ইমাম জাসসাস)।
- আসহাবুত তারজীহ (أصحاب الترجيح): একাধিক বর্ণনার মধ্যে কোনটি বেশি সহীহ ও শক্তিশালী তা তারজীহ দিয়েছেন (যেমন: আবুল হাসান কুদূরী, ইমাম মারগীনানী)।
- আসহাবুত তাময়ীয (أصحاب التمييز): জাহিরুর রিওয়ায়াত, নাওয়াদির ও দুর্বল মতের পার্থক্য চিহ্নিত করেছেন (যেমন: কানযুদ্দাকায়েক্ব ও মুখতাসারুত তহাবীর প্রণেতাগণ)।
- মুকাল্লিদে মাহদ্ব (المقلدون المحض): সাধারণ ফতোয়াদানকারী আলেমগণ।
١٠- ما الفرق بين صلاة الرجال وصلاة النساء؟ أوضح- (পুরুষ ও নারীর নামাজের মধ্যকার শারঈ পার্থক্য)
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী পুরুষ ও নারীর সৃষ্টিগত পার্থক্য ও সতরের নিরাপত্তার কারণে নামাজে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:
| নামাজের রুকন | পুরুষের নিয়ম | নারীর নিয়ম |
|---|---|---|
| ১. তাকবীরে তাহরীমা | উভয় হাত কানের লতি পর্যন্ত তুলবে। | উভয় হাত কাঁধ বা বুক পর্যন্ত চাদরের ভেতর থেকে তুলবে। |
| ২. হাত বাঁধা (ক্বিয়াম) | নাভির নিচে হাত বাঁধবে (ডান হাত দিয়ে বাম কব্জি ধরবে)। | বুকের ওপর হাত রাখবে (ডান হাত বাম হাতের ওপর কেবল রাখবে, ধরবে না)। |
| ৩. রুকু | পিঠ সম্পূর্ণ সোজা সমান্তরাল করবে এবং হাতের আঙুল ছড়িয়ে হাঁটু আঁকড়ে ধরবে। | কেবল সামান্য ঝুঁকবে যাতে হাত হাঁটুতে পৌঁছে; আঙুলগুলো মিলিয়ে রাখবে এবং কনুই পিঠের সাথে লাগিয়ে রাখবে। |
| ৪. সিজদা | পেট উরু থেকে এবং বাহু মাটি ও পাঁজর থেকে ফাঁক রাখবে। | সম্পূর্ণ জড়সড় হয়ে পেট উরুর সাথে এবং উভয় বাহু মাটির সাথে বিছিয়ে সিজদা করবে। |
| ৫. বৈঠক (তাশাহহুদ) | বাম পা বিছিয়ে তার ওপর বসবে এবং ডান পা খাড়া রাখবে (ইফতিরাশ)। | উভয় পা ডান দিক দিয়ে বের করে মাটির ওপর নিতম্ব রেখে বসবে (তাওয়াররুক)। |
١١- اذكر حكم صلاة الوتر وعدد ركعاتها مدللا- (বিতর নামাজের হুকুম ও রাকাত সংখ্যা)
১. বিতরের হুকুম:
- হানাফী মাযহাব: বিতর নামাজ আদায় করা ‘ওয়াজিব’ (واجب)। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «الوِتْرُ حَقٌّ، فَمَنْ لَمْ يُوتِرْ فَلَيْسَ مِنَّا» [আবু দাউদ] (বিতর নামাজ সত্য ও অপরিহার্য, যে বিতর পড়ে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়)। ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর ত্যাগকারী ফাসিক গণ্য হবে এবং এর কাযা আদায় করা আবশ্যক।
- জমহুর মাযহাব (শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী): এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।
২. রাকাত সংখ্যা ও পড়ার পদ্ধতি:
- হানাফী মাযহাব অনুযায়ী বিতর নামাজ এক সালামে তিন রাকাত, যা মাগরিবের নামাজের মতো অবিচ্ছিন্নভাবে পড়তে হয়।
- দলীল: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: «كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُوتِرُ بِثَلَاثٍ لَا يُسَلِّمُ إِلَّا فِي آخِرِهِنَّ» [সুনানে নাসায়ী, বায়হাকী] (রাসূলুল্লাহ ﷺ তিন রাকাত বিতর পড়তেন এবং কেবল সর্বশেষ রাকাতেই সালাম ফিরাতেন)। তৃতীয় রাকাতে কিরাআত শেষে রুকুতে যাওয়ার পূর্বে তাকবীর বলে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে দুআয়ে কুনূত পড়া ওয়াজিব।
١٢- ما حكم التأمين في الصلاة؟ بين- (নামাজে আমীন বলার শারঈ হুকুম)
সূরা আল-ফাতিহা পাঠ সমাপ্ত করার পর ‘আমীন’ (اللهم استجب – হে আল্লাহ, কবুল করুন) বলা সকল মাযহাবের মতেই সুন্নাত। তবে এটি উচ্চৈঃস্বরে (জাহর) বলা হবে নাকি নীরবে/আস্তে (সিররান) বলা হবে—তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে:
- হানাফী ও মালেকী মাযহাব (নীরবে আমীন বলা উত্তম ও সুন্নাত):
- ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিকের মতে, ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের জন্য নীরবে মনে মনে আমীন বলা সুন্নাত।
- দলীল ১ : ‘আমীন’ একটি দোয়া; আর কুরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: ﴿ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً﴾ [الأعراف: ৫৫] (তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো বিনীতভাবে এবং গোপনে/নীরবে)।
- দলীল ২ : সুনানে তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদে হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.) থেকে বর্ণিত: «أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَرَأَ: ﴿غَيْرِ المَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ﴾ فَقَالَ: آمِينَ، وَخَفَضَ بِهَا صَوْتَهُ» (রাসূলুল্লাহ ﷺ ‘ওয়ালাদ্দাল্লীন’ পাঠ করে ‘আমীন’ বললেন এবং এর দ্বারা নিজের আওয়াজকে নিচু বা গোপন রাখলেন)।
- শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব: তাঁদের মতে জাহরী নামাজে (মাগরিব, ইশা ও ফজর) সশব্দে জোরে আমীন বলা সুন্নাত।
- অতএব, হানাফী মাযহাবের আমলটি দোয়ার আদব ও কুরআনুল কারীমের মূলনীতির সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
-
প্রশ্ন: ফিকহ শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: কুরআন ও সুন্নাহর বিস্তারিত দলিল থেকে ব্যবহারিক জীবনের বিধিবিধান উদ্ভাবন করে মানবজীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির রঙে পরিচালনা করা। -
প্রশ্ন: সাধারণ মুসলমানদের জন্য চার মাযহাবের একটি অনুসরণ করা কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ, যারা সরাসরি ইজতিহাদ করতে অক্ষম, বিভ্রান্তি ও খেয়ালখুশি পরিহারে তাদের জন্য চার মাযহাবের যেকোনো একটি মাযহাবের অনুসরণ (তাকলীদ) করা ওয়াজিব। -
প্রশ্ন: হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা কে এবং এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইমামুল আযম আবু হানিফা (রহ.); এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শূরাভিত্তিক ফিকহ চর্চা, কিয়াস ও ইস্তিহসানের বাস্তবমুখী প্রয়োগ। -
প্রশ্ন: হানাফী মাযহাবে নামাজে রফউল ইয়াদাইন কেন কেবল প্রথম তাকবীরে করা হয়?
উত্তর: হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সহীহ হাদীস এবং নামাজে খুশু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্থিরতা বজায় রাখার স্বার্থে কেবল শুরুতে হাত তোলা সুন্নাত। -
প্রশ্ন: হানাফী মাযহাব মতে বিতর নামাজের হুকুম ও রাকাত সংখ্যা কত?
উত্তর: বিতর নামাজ পড়া ওয়াজিব এবং তা মাগরিবের মতো এক সালামে তিন রাকাত পড়তে হয়। -
প্রশ্ন: নামাজে ‘আমীন’ নীরবে বলা উত্তম কেন?
উত্তর: কারণ ‘আমীন’ একটি দোয়া; আর পবিত্র কুরআনে বিনম্র চিত্তে গোপনে ও নীরবে দোয়া করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা নবীজী ও সাহাবীগণের আমলে প্রমাণিত।
উপসংহার ও পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাযিল সম্মান ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ’ (বিষয় কোড: ২০১৪০৫) প্রশ্নপত্রটি অত্যন্ত তাত্বিক ও মাসআলাভিত্তিক। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষার্থীদের সাধারণ উত্তরের পরিবর্তে মূল ফিকহী পরিভাষা, উসূলী কায়দা, প্রতিটি মাযহাবের ইমামগণের দলীল এবং হানাফী মাযহাবের তারজীহের কারণগুলো পয়েন্ট আকারে খাতার উপস্থাপনায় ফুটিয়ে তুলতে হবে। এই সমাধানের প্রতিটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ মানদণ্ড ও প্রামাণ্য ফিকহগ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জনে দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে ইনশাআল্লাহ।