اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الدعوة والدراسات الإسلامية
[দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المذاهب الفقهية
[আল-মাযাহিবুল ফিকহিয়্যাহ]
বিষয় কোড: ২০৩৮০৬ | পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৩৪
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
مجموعة (الف) – ক-বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
١- اذكر أهمية علم الفقه وضرورته وغرضه-
[১. ফিকহ শাস্ত্রের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের বিধানাবলিকে মানবজীবনের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে যথাযথভাবে প্রয়োগের জন্য যে শাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছে, তা হলো ‘ইলমুল ফিকহ’ বা ইসলামী আইনশাস্ত্র। এটি কুরআন ও সুন্নাহর বিধানাবলিকে অনুধাবন ও বাস্তব জীবনের সাথে সমন্বয় সাধনের এক অনন্য বিজ্ঞান।
علم الفقه (ইলমুল ফিকহ)-এর পরিচয়
শাব্দিক অর্থ: ‘আল-ফাহমু’ (الفهم) অর্থাৎ সূক্ষ্ম ও গভীর উপলব্ধি। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে: “তাদের কী হলো যে, তারা কোনো কথা বুঝতেই পারছে না (লা ইয়াফক্বাহূন)?” (সূরা আন-নিসা: ৭৮)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: “الفقه معرفة النفس مالها وما عليها” (নিজের লাভ ও ক্ষতি সম্পর্কে আত্মার অবগতিই হলো ফিকহ)। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে: “العلم بالأحكام الشرعية العملية المكتسبة من أدلتها التفصيلية” (বিস্তারিত শরঈ দলীল-প্রমাণাদির ভিত্তিতে অর্জিত ব্যবহারিক শরঈ আহকাম সংক্রান্ত জ্ঞানই হলো ফিকহ)।
ফিকহ শাস্ত্রের গুরুত্ব (أهمية علم الفقه)
- কুরআনের তাগিদ: আল্লাহ তা’আলা দ্বীনের গভীর ফিকহ অর্জনের নির্দেশ দিয়ে বলেন: “তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান (তাফাক্কুহ ফিদ-দ্বীন) অর্জন করতে পারে এবং ফিরে এসে তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে?” (সূরা আত-তাওবাহ: ১২২)।
- হাদিসের সুসংবাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “আল্লাহ তা’আলা যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা (ফিকহ) দান করেন।” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)। অন্য হাদিসে এসেছে: “একজন ফকীহ শয়তানের বিরুদ্ধে হাজার জন সাধারণ আবেদের চেয়েও অধিক শক্তিশালী।” (তিরমিযী)।
ফিকহ শাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা (ضرورته)
- সঠিকভাবে ইবাদত সম্পাদন: নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদির ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ও মুস্তাহাব শর্তাবলি জানা এবং কী কারণে ইবাদত বাতিল বা মাকরূহ হয় তা জানার জন্য ফিকহ অপরিহার্য।
- হালাল ও হারামের সুস্পষ্ট জ্ঞান: ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, খাদ্যদ্রব্য ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আল্লাহর বৈধ ও অবৈধ সীমারেখা ফিকহের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়।
- যুগোপযোগী সমস্যার সমাধান (নাওয়াযিল): আধুনিক যুগের জটিল ও নিত্যনতুন অর্থনৈতিক (যেমন ক্রিপ্টোকারেন্সি, শেয়ার বাজার) ও চিকিৎসাগত (যেমন অঙ্গ প্রতিস্থাপন, টেস্টটিউব বেবি) সমস্যার ইসলামী সমাধান উদ্ভাবনে ফিকহ শাস্ত্রের কোনো বিকল্প নেই।
ফিকহ শাস্ত্রের উদ্দেশ্য (غرض علم الفقه)
ফিকহ শাস্ত্রের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো পার্থিব জীবনে মানবজাতিকে সুশৃঙ্খল, ন্যায়নিষ্ঠ ও পুণ্যময় পথে পরিচালিত করা এবং পরকালে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চিরস্থায়ী জান্নাত অর্জন করা।
٢- اذكر نبذة عن حياة الامام الشافعي (رح) مع بيان مصادر الفقه الشافعي وخصائصه مختصرا-
[২. ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনীসহ শাফেয়ী ফিকহের উৎসসমূহ ও বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম, উসূলে ফিকহের জনক হযরত ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) ছিলেন হাদীস ও কিয়াস—উভয় ধারার এক অপূর্ব সমন্বয়ক।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
জন্ম ও বংশ: তিনি ১৫০ হিজরিতে (যেই বছর ইমাম আবু হানিফা রহ. ইন্তেকাল করেন) ফিলিস্তিনের গাজায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কুরাইশ বংশীয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাদা মুত্তালিবের বংশধর।
শিক্ষা ও উস্তাদবৃন্দ: মক্কায় শৈশবেই কুরআন হিফজ করেন এবং সুফিয়ান ইবনে উয়াইনার নিকট শিক্ষা নেন। এরপর মদিনায় গিয়ে ইমাম মালিক (রহ.)-এর কাছে ‘মুয়াত্তা’ মুখস্থ পাঠ করেন। পরবর্তীতে বাগদাদে গিয়ে ইমাম আবু হানিফার প্রধান ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ আশ-শায়বানীর কাছে হানাফী ফিকহ অধ্যয়ন করেন।
কালজয়ী গ্রন্থাবলি: উসূলে ফিকহের প্রথম প্রণীত মূল গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’ এবং শাফেয়ী ফিকহের আকর গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্ম’ তাঁর অমর সৃষ্টি।
ওফাত: তিনি ২০৪ হিজরিতে মিসরে ইন্তেকাল করেন।
শাফেয়ী ফিকহের মূল উৎসসমূহ (مصادر الفقه الشافعي)
- আল-কুরআনুল কারীম: শরীয়তের সর্বপ্রথম ও সর্বোচ্চ প্রামাণ্য উৎস।
- আস-সুন্নাহ আন-নাবাবিয়্যাহ: সহিহ হাদিস পেলে তিনি রায় ও কিয়াসের ওপর হাদিসকে প্রাধান্য দিতেন। তাঁর সুবিখ্যাত উক্তি: “إذا صح الحديث فهو مذهبي” (হাদিস সহিহ হলে সেটাই আমার মাযহাব)।
- আল-ইজমা: সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফদের সর্বসম্মত ঐক্যমত।
- সাহাবায়ে কেরামের আসার বা ফতোয়া: সাহাবীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া।
- আল-কিয়াস: কুরআন ও সুন্নাহর ইল্লত (কার্যকারণ)-এর ভিত্তিতে সমজাতীয় বিধান উদ্ভাবন।
শাফেয়ী ফিকহের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائصه)
- হাদিস ও যুক্তির ভারসাম্য: হিজাজের হাদিস নির্ভরতা এবং ইরাকের রায়/যুক্তি নির্ভরতার চমৎকার সমন্বয়।
- কাদীম ও জাদীদ মাযহাব: ইরাকে থাকাকালীন তাঁর ফতোয়া ছিল ‘কাদীম’ (পুরাতন) এবং মিসরে এসে সামাজিক পরিবর্তন ও নতুন হাদিস যাচাই করে তিনি যে মতামত দেন তা ‘জাদীদ’ (নতুন) নামে পরিচিত, যা ফিকহের গতিশীলতা প্রমাণ করে।
- উসূলে ফিকহের ভিত্তি স্থাপন: নাসেখ-মানসুখ, আম-খাস, মুতলাক-মুকাইয়্যাদ ইত্যাদির তাত্ত্বিক নিয়ম সর্বপ্রথম সুসংহত করেন।
٣- ما الخلاف؟ اذكر اسباب اختلاف الفقهاء في استنباط الاحكام الشرعية وفوائده-
[৩. ইখতিলাফ কী? শরঈ বিধান উদ্ভাবনে ফকীহগণের মতপার্থক্যের কারণ ও উপকারিতা উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
ইসলামী ফিকহে চার মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে শাখাগত বা মাসআলাগত মতপার্থক্য এক স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা। এটি কোনো শত্রুতা বা বিভেদ নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহর বিধানাবলিকে মানুষের কল্যাণে প্রয়োগের বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য।
الخلاف (ইখতিলাফ বা মতপার্থক্য)-এর পরিচয়
সংজ্ঞা: শরীয়তের শাখাগত ও গবেষণালব্ধ (ফরয়ী ও ইজতিহাদী) মাসআলায় দলীল ও নصوص-এর ব্যাখ্যার তারতম্যের কারণে একাধিক মুজতাহিদ ফকীহর ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোকে ‘ইখতিলাফুল ফুক্বাহা’ বা ফিকহী মতপার্থক্য বলে। উল্লেখ্য, দ্বীনের মৌলিক আকিদা ও কাতয়ী বিধানে কোনো ইখতিলাফ নেই।
ফকীহগণের মতপার্থক্যের মূল কারণসমূহ (أسباب اختلاف الفقهاء)
- আরবি শব্দের বহুবিধ অর্থ (اشتراك الألفاظ): কুরআনের কিছু শব্দ একই সাথে একাধিক অর্থ প্রকাশ করে। যেমন: সূরা বাকারার ‘কুরূ’ (قروء) শব্দের অর্থ ইমাম আবু হানিফার মতে ‘হায়েজ’ (ঋতুস্রাব), কিন্তু ইমাম শাফেয়ীর মতে ‘তুহর’ (পবিত্রতার সময়কাল)।
- হাদিস পৌঁছানো ও বিশুদ্ধতার মানদণ্ড: কোনো ফকীহর নিকট যে হাদিস পৌঁছেছে, দূরবর্তী অন্য ফকীহর নিকট তা হয়তো পৌঁছেনি, অথবা হাদিসের সনদের শর্তাবলি (যেমন খবরে ওয়াহিদ কবুলের শর্তে) ইমামগণের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ছিল।
- হাদিসের বিরোধ নিরসনের পদ্ধতি: আপাতবিরোধী দুটি হাদিস পেলে কোনো ইমাম ‘নাসখ’ (রহিতকরণ), কেউ ‘তারজীহ’ (অগ্রগণ্যতা), আবার কেউ ‘জাম্বা’ (সমন্বয়)-এর নীতি অনুসরণ করেছেন।
- উসূলে ফিকহের ভিন্নতা:
- ইমাম মালিক ‘আমালু আহলিল মদিনা’ (মদিনাবাসীর আমল)-কে দলীল মানতেন।
- ইমাম আবু হানিফা ‘ইস্তিহসান’ প্রয়োগ করতেন।
- অন্যান্য ইমামগণ ‘মাসালিহে মুরসালাহ’ ও ‘সাদ্দে জারায়ি’-কে প্রাধান্য দিয়েছেন।
- সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিবেশের ভিন্নতা: স্থানীয় সংস্কৃতি ও উরফ (প্রথা)-এর ভিন্নতার কারণেও ফতোয়ায় পার্থক্য ঘটেছে।
ফিকহী মতপার্থক্যের উপকারিতা (فوائد الخلاف)
- উম্মাহর জন্য সহজতা ও প্রশস্ততা (رحمة وتوسعة): উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.) বলতেন: “সাহাবায়ে কেরামের মতপার্থক্য আমাকে আনন্দিত করে, কারণ তাঁরা একমত হলে মানুষের জন্য কোনো অবকাশ বা প্রশস্ততা থাকত না।”
- ইসলামী আইনের সমৃদ্ধি: বিভিন্ন মতামতের কারণে ইসলামী ফিকহ এক সুবিশাল বিশ্বকোষে রূপ নিয়েছে, যা সর্বযুগে যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য সমাধান দিতে সক্ষম।
- গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত থাকা: অন্ধ অনুকরণ রোধ করে কিয়ামত পর্যন্ত মুজতাহিদদের জন্য গবেষণার গতিশীলতা অব্যাহত রাখে।
٤- اذكر خدمات الائمة الكرام من تدوين علم الفقه-
[৪. ফিকহ শাস্ত্র সংকলনে সম্মানিত ইমামগণের খেদমত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে ফিকহ কোনো গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ ছিল না। পরবর্তীতে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তৃত হলে সম্মানিত ইমামগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করে শরীয়তের বিধানাবলিকে অধ্যায়ভিত্তিক সুসংকলিত বিদ্যায় রূপ দান করেন।
ফিকহ সংকলনে চার ইমামের অবিস্মরণীয় অবদানসমূহ
- ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর ফিকহ একাডেমি (৮০-১৫০ হি.):
- তিনি বিশ্বের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ফিকহ সংকলন পরিষদ (ফিকহ বোর্ড) গঠন করেন, যার সদস্য ছিলেন ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, জুফার, হাসান ইবনে জিয়াদসহ ৪০ জন শীর্ষ মুহাদ্দিস ও আইনজ্ঞ।
- তাঁরা পবিত্রতা (তাহারাত) থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থা পর্যন্ত প্রতিটি অধ্যায় ধরে প্রায় ৮৩ হাজার (মতান্তরে পাঁচ লাখ) মাসআলা ইজতিহাদের মাধ্যমে সমাধান করে সংকলন করেন।
- ইমাম আবু ইউসুফের ‘কিতাবুল খারাজ’ এবং ইমাম মুহাম্মদের ‘জাহিরুর রিওয়ায়াত’-এর ছয়টি মূল কিতাব হানাফী ফিকহের মূল ভিত্তি।
- ইমাম মালিক ইবনে আনাস (৯৩-১৭৯ হি.):
- মদিনায় বসে হাদিস ও ফিকহের সমন্বয়ে ইসলামের সর্বপ্রথম সংকলিত গ্রন্থ ‘আল-মুয়াত্তা’ প্রণয়ন করেন, যা ছিল হাদীসভিত্তিক ফিকহের এক অনুপম আকর।
- তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র ইবনুল কাসিম মিসরে ইমাম মালিকের ফতোয়াসমূহ সংকলন করে সুবিখ্যাত ‘আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা’ রচনা করেন।
- ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (১৫০-২০৪ হি.):
- তিনি সর্বপ্রথম আইন প্রণয়নের বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলি লিপিবদ্ধ করে ‘আর-রিসালাহ’ প্রণয়ন করেন, যা উসূলে ফিকহের প্রথম গ্রন্থ।
- পরবর্তীতে ফিকহের বিশাল বিশ্বকোষ ‘কিতাবুল উম্ম’ রচনা করে সংকলন ধারাকে চরম উৎকর্ষে পৌঁছান।
- ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হি.):
- তিনি সহস্রাধিক হাদিসের সমন্বয়ে প্রণয়ন করেন সুবিশাল ‘মুসনাদে আহমদ’।
- তাঁর ছাত্র ইমাম আবু বকর আল-খাল্লাল তাঁর সংগৃহীত ফতোয়া ও মাসআলাগুলো বিশ খণ্ডে ‘আল-জামে আল-কাবীর’ নামে সংকলন করে হাম্বলী ফিকহের মজবুত বুনিয়াদ গড়ে তোলেন।
٥- عرف المذهب- ثم بين نشأته وتطوره مع بيان الحاجة الى اتباع المذهب-
[৫. মাযহাবের পরিচয় দাও। এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশসহ মাযহাব অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধর।]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের বিধানাবলি ব্যক্তিজীবনে পালন করার ক্ষেত্রে সালাফে সালেহীন থেকে চলে আসা চার মাযহাবের অনুসরণ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিভ্রান্তি দূরীকরণে এক সুদৃঢ় প্রাচীরস্বরূপ।
المذهب (মাযহাব)-এর পরিচয়
শাব্দিক অর্থ: ‘মাযহাব’ শব্দের অর্থ চলার পথ, মতাদর্শ বা দৃষ্টিভঙ্গি।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: কোনো মুজতাহিদ ফকীহ কুরআন ও সুন্নাহ গভীরভাবে গবেষণা করে শরঈ আহকাম উদ্ভাবনের জন্য যে নিজস্ব পদ্ধতি, উসূল ও নীতিমালা অনুসরণ করেন এবং তাঁর সেই উসূলের ভিত্তিতে নির্ধারিত ফতোয়াসমূহের সমষ্টিকে ‘মাযহাব’ বলা হয়।
মাযহাবের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره)
- সাহাবী ও তাবেয়ীদের যুগ: সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ইরাকের কুফায় এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) মদিনায় ফতোয়া দিতেন। স্থানীয় জনগণ তাঁদের ফতোয়া অনুসরণ করত।
- ইমামদের যুগ (দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরি শতক): কুফার ফিকহী ধারা থেকে হানাফী মাযহাব, মদিনা থেকে মালেকী মাযহাব, অতঃপর শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
- সংকলন ও সার্বজনীনতা: চার ইমামের শীর্ষ ছাত্রদের নিরলস প্রচেষ্টা, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং কিতাবাবলি লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে এই চার মাযহাবই উম্মাহর মধ্যে টিকে থাকে এবং বাকি ব্যক্তি-মাযহাবগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।
মাযহাব অনুসরণের (তাকলীদের) প্রয়োজনীয়তা (الحاجة إلى اتباع المذهب)
- কুরআনের দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ: আল্লাহ বলেন: “যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের (আহলে জিকির) নিকট থেকে জেনে নাও।” (সূরা আন-নাহল: ৪৩)। সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি লাখ লাখ হাদিস ও আরবির ব্যাকরণ যাচাই করে বিধান বের করা অসম্ভব।
- মনগড়া ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি রোধ: মাযহাব না মানলে প্রত্যেকে নিজের খামখেয়ালি ও প্রবৃত্তির পূজা করে সুবিধাবাদী ফতোয়া দিতে শুরু করবে, ফলে দ্বীন খেয়ালখুশির বস্তুতে পরিণত হবে।
- সুশৃঙ্খল বিচারব্যবস্থা: একটি রাষ্ট্র ও সমাজের বিচারিক স্থিতিশীলতার জন্য নির্দিষ্ট আইনের কোড থাকা জরুরি, যা মাযহাবের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
٦- ما الفقه المقارن؟ اذكر ضرورة دراسة الفقه المقارن-
[৬. তুলনামূলক ফিকহ কাকে বলে? তুলনামূলক ফিকহ পাঠের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ কর।]
ভূমিকা
উচ্চতর ফিকহ গবেষণায় কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ না করে বিভিন্ন মাযহাবের দলীল-প্রমাণ ও যুক্তিতর্কের তুলনামূলক পর্যালোচনা করাকে ‘তুলনামূলক ফিকহ’ বা ‘আল-ফিকহুল মুকারান’ (الفقه المقارن) বলা হয়।
الفقه المقارن (তুলনামূলক ফিকহ)-এর সংজ্ঞা
সংজ্ঞা: যে শাস্ত্রে ইসলামী ফিকহের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখাগত মাসআলায় ইমাম ও ফকীহগণের ভিন্ন ভিন্ন মতামত, তাঁদের গৃহীত দলিল-প্রমাণাদি (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস) এবং পরস্পরের যুক্তি-প্রতিযুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মতামতটি নির্ণয় করা হয়, তাকে তুলনামূলক ফিকহ বলে। যেমন: ইমাম ইবনে রুশদের ‘বিদায়াতুল মুজতাহিদ ওয়া নিহায়াতুল মুক্তাসিদ’ এবং ইমাম কাসানীর ‘বাদায়িউস সানায়ি’।
তুলনামূলক ফিকহ পাঠের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব (ضرورة دراسته)
- অন্যান্য মাযহাবের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংকীর্ণতা দূরীকরণ: তুলনামূলক ফিকহ পড়লে স্পষ্ট হয় যে প্রত্যেক ইমামের মতামতের পেছনেই কুরআন-সুন্নাহর মজবুত দলিল রয়েছে। ফলে গোঁড়ামি, হঠকারিতা ও দলীয় অন্ধত্ব দূর হয়ে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
- আইনের দলীলভিত্তিক অন্তর্দৃষ্টি লাভ: শুধু ফতোয়া মুখস্থ না করে কোনো বিধানের গভীরতম দর্শন, হেকমত ও ইল্লত অনুধাবন করা যায়।
- তারজীহ ও গবেষণার যোগ্যতা অর্জন: সমকালীন নতুন নতুন মাসআলায় বিভিন্ন মাযহাবের দলিল যাচাই করে কোন মতটি জনকল্যাণে অধিক উপযোগী ও সহীহ তা বাছাই করার যোগ্যতা অর্জিত হয়।
- আন্তর্জাতিক ফতোয়া বোর্ড পরিচালনায় সহায়তা: বর্তমানে ওআইসি ফিকহ একাডেমি, মক্কা ফিকহ কাউন্সিল ইত্যাদি সংস্থা তুলনামূলক ফিকহের আলোকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকে।
٧- بين اسماء أجلة الفقهاء عن اصحاب الامام احمد بن حنبل (رح) والكتب المشهورة للحنبلي مختصرا-
[৭. ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ ছাত্রগণ এবং হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও।]
ভূমিকা
ইমামে আহলে সুন্নাত আহমদ ইবনে হাম্বল আশ-শাইবানী (১৬৪-২৪১ হি.)-এর একনিষ্ঠ ছাত্র ও পরবর্তী হাম্বলী ফকীহগণের অসাধারণ মেধা ও লেখনীর মাধ্যমেই হাম্বলী মাযহাব মুসলিম বিশ্বের একটি অন্যতম প্রভাবশালী ধারায় পরিণত হয়েছে।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের বিশিষ্ট ছাত্র ও ফকীহবৃন্দ (أجلة أصحابه)
- সালেহ ইবনে আহমদ (ওফাত ২৬৬ হি.): ইমাম আহমদের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও ফকীহ, যিনি পিতার বহু মাসআলা ও জীবনচরিত সংকলন করেছেন।
- আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ (ওফাত ২৯০ হি.): ইমাম আহমদের কনিষ্ঠ পুত্র, যিনি পিতার সুবিশাল ‘মুসনাদে আহমদ’ বর্ণনা ও সম্পাদনা করেন এবং নিজে হাদীস ও ফিকহের একনিষ্ঠ ইমাম ছিলেন।
- আবু বকর আল-আছরাম (ওফাত ২৬১ হি.): ইমাম আহমদের অন্যতম শীর্ষ ছাত্র ও ফতোয়া সংকলক।
- ইব্রাহীম আল-হারবী (ওফাত ২৮৫ হি.): প্রখ্যাত আলেম ও জুহদ সংক্রান্ত কিতাবের রচয়িতা।
- আবু বকর আল-মারওয়াযী (ওফাত ২৭৫ হি.): ইমাম আহমদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছাত্র ও তাঁর বহু ইলমী বিষয়ের বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী।
- আবু বকর আল-খাল্লাল (ওফাত ৩১১ হি.): তিনি ইমাম আহমদের সকল ছাত্রের কাছ থেকে ফতোয়া ও মাসআলা একত্র করে হাম্বলী ফিকহকে পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
হাম্বলী মাযহাবের সুপ্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ (الكتب المشهورة للحنبلي)
- মুখতাসার আল-খিরাক্বী: ইমাম আবুল কাসিম আল-খিরাক্বী (ওফাত ৩৩৪ হি.) রচিত হাম্বলী ফিকহের সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংক্ষিপ্ত মূল মাতন।
- আল-মুগনী (المغني): আল্লামা ইবনে কুদামা আল-মাকদিসী (ওফাত ৬২০ হি.) রচিত হাম্বলী ফিকহ ও তুলনামূলক ফিকহের এক মহাবিস্ময়কর বিশ্বকোষ (১০ খণ্ডে)।
- যাদুল মুস্তাক্বনি (زاد المستقنع): আল-হাজ্জাবী রচিত প্রসিদ্ধ মাতন, যার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক যুগে ফতোয়া চর্চা হয়।
- কাশশাফুল ক্বিনা আন মাতনিল ইক্বনা: ইমাম মানসুর আল-বুহুতী (ওফাত ১০৫১ হি.) রচিত প্রামাণ্য বিশদ ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
- আল-ইনসাফ ফি মারিফাতির রাজিহ মিনাল খিলাফ: ইমাম আল-মারদাবী রচিত হাম্বলী মাযহাবের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মত নির্ণয়ের আকর গ্রন্থ।
٨- وازن الفقه الحنفي والفقه المالكي تأسيسا وتفريعًا-
[৮. ফিকহে হানাফী ও ফিকহে মালেকীর মাঝে মৌলিক ও শাখাগত তুলনামূলক আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী আইনশাস্ত্রের বিকাশে দুটি প্রাচীনতম ও সর্বজনীন ধারা হলো ইরাকের কুফা কেন্দ্রিক ‘ফিকহে হানাফী’ (ইমাম আবু হানিফা রহ.) এবং হেজাজের মদিনা কেন্দ্রিক ‘ফিকহে মালেকী’ (ইমাম মালিক রহ.)। উভয়ের মধ্যে উসূল ও শাখাগত মাসআলায় কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
১. মৌলিক উসূলের ক্ষেত্রে তুলনা (المقارنة في التأسيس)
| তুলনার বিষয় | ফিকহে হানাফী | ফিকহে মালেকী |
|---|---|---|
| কেন্দ্র ও পরিবেশ | ইরাকের কুফা (নগরায়ণ, বহুজাতিক সংস্কৃতি ও যুক্তিবাদ প্রধান)। | মদিনা মুনাওয়ারা (হাদিস ও সালাফের ঐতিহ্যের কেন্দ্রস্থল)। |
| মদিনাবাসীর আমল | আমালু আহলিল মদিনাকে একক কোনো বাধ্যতামূলক দলীল মনে করে না। | ‘আমালু আহলিল মদিনা’-কে খবরে ওয়াহিদের চেয়েও শক্তিশালী মুতাওয়াতির সমমানের দলীল গণ্য করে। |
| খবরে ওয়াহিদ গ্রহণ | খবরে ওয়াহিদ কুরআন বা উসূলে আম্মাহর বিপরীত হলে শর্ত আরোপ করে। | মদিনাবাসীর আমলের সাথে সাংঘর্ষিক হলে খবরে ওয়াহিদ বর্জন করে। |
| সহায়ক উসূল | ‘ইস্তিহসান’ (উত্তমতর যুক্তি গ্রহণ) ও কিয়াসের ব্যাপক প্রয়োগ। | ‘মাসালিহে মুরসালাহ’ (জনকল্যাণ) ও ‘সাদ্দে যারায়ি’-এর ওপর বিশেষ জোর দেয়। |
২. শাখাগত মাসআলার ক্ষেত্রে তুলনা (المقارنة في التفريع)
- সালাতে হাত বাঁধার বিধান: হানাফী মাযহাবে পুরুষরা নাভির নিচে হাত বাঁধে। মালেকী মাযহাবে বিখ্যাত মতানুসারে ফরয সালাতে হাত ছেড়ে দেওয়া (সাদ্ল) এবং নফলে বাঁধা মুস্তাহাব।
- সমুদ্রের প্রাণীর হুকুম: হানাফী মাযহাবে মাছ ব্যতীত অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী খাওয়া মাকরূহ বা অনুচিত। মালেকী মাযহাবে সমুদ্রের সকল প্রকার মৃত ও জীবিত প্রাণী সম্পূর্ণ হালাল (“হুওয়াত তুহূরু মাউহু আল-হিল্লু মায়তাতুহু”)।
- বিসমিল্লাহ পাঠ: হানাফীদের মতে সূরা ফাতিহার শুরুতে বিসমিল্লাহ নিঃশব্দে পড়া সুন্নাত। মালেকীদের মতে ফরজ সালাতে ফাতিহার আগে বিসমিল্লাহ উচ্চৈঃস্বরে বা অনুচ্চস্বরে কোনোটাই না পড়ে সরাসরি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ দিয়ে শুরু করা উত্তম।
- অজুর তারতীব ও মুওয়ালাত: হানাফীদের মতে অঙ্গসমূহ পর্যায়ক্রমে ধোয়া এবং একটানা ধোয়া (মুওয়ালাত) সুন্নাত; কিন্তু মালেকী মাযহাবে মুওয়ালাত হলো অজুর ফরজ রুকন।
مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
٩- ما حكم التأمين بالجهر في الصلاة؟ اذكر الاختلاف بين الائمة فيه مختصرا-
[৯. নামাজে উচ্চস্বরে আমিন বলার হুকুম কী? এ ব্যাপারে ইমামদের মতামত সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
উত্তর: জামায়াতে জেহরী (উচ্চস্বরের) সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠের পর ‘আমীন’ বলা সর্বসম্মত সুন্নাত। তবে এটি উচ্চস্বরে নাকি নীরবে বলবে—এ বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে দুটি অভিমত রয়েছে:
- ১. নীরবে আমীন বলা (التأمين بالسر): ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে আমীন অত্যন্ত নিম্নস্বরে ও নীরবে বলা সুন্নাত। তাঁদের দলীল: আমীন একটি দো’আ, আর কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “তোমরা তোমাদের রবকে বিনীতভাবে ও গোপনে ডাকো।” (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৫)। তাছাড়া শু’বা (রহ.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমীন বলেছেন এবং তাঁর আওয়াজ নিচু করেছেন (“ওয়া খাখাফাদা বিহা সাওতাহু”)।
- ২. উচ্চস্বরে আমীন বলা (التأمين بالجهر): ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মতে জেহরী সালাতে ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের উচ্চস্বরে আমীন বলা সুন্নাত। দলীল: আবু হুরায়রা ও ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বর্ণিত হাদিস, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) আওয়াজ টান দিয়ে আমীন বলতেন (“মাদ্দা বিহা সাওতাহু”)।
١٠- ما عدد الفاظ الاذان والاقامة؟ اذكر الاختلاف بين الائمة فيها اختصارا-
[১০. আযান ও ইকামতের শব্দাবলি কয়টি? এ ব্যাপারে ইমামদের অভিমত সংক্ষেপে লেখ।]
উত্তর: আযান ও ইকামতের শব্দসংখ্যা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে নিম্নরূপ মতপার্থক্য রয়েছে:
- হানাফী মাযহাব: আযানের শব্দ সংখ্যা ১৫টি (শুরুতে চার তাকবীর, এরপর প্রতি বাক্য দুইবার করে এবং শেষে এক তাকবীর ও তাওহিদ)। আর ইকামতের শব্দ সংখ্যা ১৭টি (আযানের মতো সব বাক্য দুইবার এবং অতিরিক্ত ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ দুইবার)।
- শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব: আযানের শব্দ সংখ্যা ১৫টি (তবে তারজীহসহ ১৯টি)। কিন্তু ইকামতের শব্দ সংখ্যা ১১টি (তাকবীর দুইবার, ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ দুইবার এবং বাকি সকল শব্দ একবার করে)।
- মালেকী মাযহাব: আযানের শব্দ সংখ্যা ১৭টি (শুরুতে দুই তাকবীর এবং শাহাদাতের তারজীহসহ)। আর ইকামতের শব্দ সংখ্যা ১০টি (তাঁদের মতে ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ মাত্র একবার বলা হয়)।
١١- ما حكم وضع اليدين تحت السرة؟ اذكر مدللا-
[১১. নাভির নিচে হাত বাঁধার বিধান কী? দলিলসহ আলোচনা কর।]
উত্তর: হানাফী ফিকহ অনুসারে পুরুষদের জন্য সালাতে নাভির নিচে হাত বাঁধা সুন্নাত।
দলিলসমূহ:
- হযরত আলী (রা.) বলেন: “مِنَ السُّنَّةِ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِي الصَّلَاةِ تَحْتَ السُّرَّةِ” (সালাতে হাতের তালুর ওপর অন্য হাতের তালু রেখে নাভির নিচে স্থাপন করা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত)। (সুনানে আবু দাউদ: ৭৫৭, মুসনাদে আহমাদ)।
- ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছি তিনি সালাতে তাঁর ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে নাভির নিচে রেখেছেন।” (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, সহিহ সনদে)।
- যৌক্তিক কারণ: নাভির নিচে হাত বাঁধা চরম বিনয়, দাসত্ব ও শ্রদ্ধার প্রতীক, যা সালাতের একাগ্রতার জন্য সর্বাধিক উপযোগী।
١٢- ما حكم الجمع بين الصلاتين في السفر؟ اذكر بالاختصار-
[১২. সফর অবস্থায় দু’ওয়াক্ত নামাজকে একত্রীকরণের বিধান কী? আলোচনা কর।]
উত্তর: সফর অবস্থায় জোহর-আসর এবং মাগরিব-ইশার সালাত একত্র করা (জামা বাইনাস সালাতাইনি) সংক্রান্ত বিধান:
- জুমহুর ফুক্বাহা (মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী): তাঁদের মতে সফরে কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যে এই দুই ওয়াক্তের সালাত একসাথে অগ্রবর্তী করে (জামে তাকদীম) অথবা পেছনের ওয়াক্তে এনে (জামে তাখীর) প্রকৃত জমা করা (জমায়ে হাকীকী) জায়েজ।
- হানাফী মাযহাব: হানাফীদের মতে হজ্জের সময় আরাফাতের ময়দানে (জোহর-আসর) এবং মুযদালিফায় (মাগরিব-ইশা) ব্যতীত অন্য কোনো সফরে সময়ের ক্ষেত্রে এক ওয়াক্তের সালাত অন্য ওয়াক্তে নিয়ে জমা করা জায়েজ নয়। তবে ‘জমায়ে সূরী’ (রূপক জমা) করা সুন্নাতসম্মত; অর্থাৎ প্রথম ওয়াক্তের একেবারে শেষ সময়ে প্রথমটি পড়ে সালাম ফিরিয়ে দ্বিতীয় ওয়াক্তের ঠিক শুরুতে দ্বিতীয়টি আদায় করা।
١٣- هل يجوز خروج النساء الى المساجد للجماعة؟ اذكر بالدلائل مختصرا-
[১৩. মহিলাদের জন্য জামায়াতের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করা বৈধ কি না? সংক্ষেপে দলিলসহ লেখ।]
উত্তর: মূল শরীয়তে নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি ছিল; রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা আল্লাহর বান্দীদের আল্লাহর মসজিদে আসতে বাধা দিও না।” (সহিহ বুখারী)। তবে পরবর্তীতে ফিতনা ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে ফকীহগণ বাস্তবতার আলোকে মতামত দিয়েছেন:
- হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঐতিহাসিক অভিমত: তিনি বলেন: “নারীরা আজ যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে রাসূলুল্লাহ (সা.) যদি তা দেখতেন, তবে অবশ্যই তাদের মসজিদে আসা নিষিদ্ধ করতেন যেভাবে বনী ইসরাঈলের নারীদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।” (সহিহ বুখারী)।
- হানাফী ফিকহের সিদ্ধান্ত: সাহাবায়ে কেরামের ইজমা এবং ফিতনার আশঙ্কায় হানাফী মাযহাবে যুবতী ও নারীদের জন্য জামায়াতের উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়া মাকরূহে তাহরীমী। নারীদের জন্য নিজ ঘরের নির্জন কোণে সালাত আদায় করা মসজিদে নববীতে সালাত আদায়ের চেয়েও অধিক সওয়াব ও মর্যাদাপূর্ণ। (আবু দাউদ)।
١٤- ما الفرق بين الرجال والنساء في اداء الصلوة- اذكر هذه المسئلة في ضوء الحديث-
[১৪. পুরুষ ও নারীদের নামাজে পার্থক্য কী? হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে আলোচনা কর।]
উত্তর: সালাতের মূল আরকানগুলোতে পুরুষ ও নারী এক হলেও পর্দার স্বার্থে তাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে সুন্নাহভিত্তিক পার্থক্য বিদ্যমান:
- তাকবীরে তাহরীমা: পুরুষরা কান পর্যন্ত হাত উঠায়, আর নারীরা বুক বা কাঁধ পর্যন্ত হাত উঠাবে যাতে পর্দা ক্ষুণ্ণ না হয়।
- হাত বাঁধার স্থান: পুরুষরা নাভির নিচে হাত বাঁধে, আর নারীরা বুকের ওপর হাত রাখবে।
- রুকু ও সিজদা: পুরুষরা রুকুতে পিঠ সোজা রাখবে এবং বাহু পার্শ্বদেশ থেকে আলাদা রাখবে। বিপরীতে নারীরা রুকু ও সিজদায় সংকুচিত (সমেট) হয়ে থাকবে, পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে যাতে গোপনীয়তা রক্ষা পায়।
- হাদিসের দলিল: ইমাম বায়হাকী বর্ণিত মুরসাল হাদিসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) দুই মহিলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: “যখন তোমরা সিজদা করবে, তখন শরীরের কিছু অংশ মাটির সাথে মিলিয়ে রাখবে; কারণ মহিলারা এ ক্ষেত্রে পুরুষদের মতো নয়।” (আস-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী)।
١٥- ما حكم قرأة الفاتحة في الجنازة؟ وما قولك في هذه المسئلة بين مختصرا-
[১৫. জানাযায় সূরা ফাতিহা পাঠ করার বিধান কী? এ বিষয়ে তোমার মতামত লেখ।]
উত্তর: জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করার বিধান নিয়ে ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নরূপ:
- ইমাম শাফেয়ী ও আহমদ (রহ.): জানাযার নামাযে প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা ফরজ/ওয়াজিব। দলীল: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) জানাযায় ফাতিহা পড়ে বললেন: “যাতে তোমরা জানতে পারো যে এটি সুন্নাত।” (সহিহ বুখারী)।
- ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক (রহ.): জানাযার নামায মূলত একটি দো’আ ও ইসতিগফার, এতে সাধারণ সালাতের মতো কিরাত নেই। তাই সূরা ফাতিহা কিরাতের নিয়তে পাঠ করা যাবে না; তবে দো’আ ও আল্লাহর প্রশংসার নিয়তে পাঠ করা জায়েজ ও উত্তম।
- ব্যক্তিগত মূল্যায়ন: উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে জানাযার সালাতে প্রথম তাকবীরের পর সানা ও আল্লাহর প্রশংসার নিয়তে সূরা ফাতিহা পাঠ করে নেওয়াই অধিক সতর্কতা ও সমন্বয়মূলক আমল।
١٦- ما عدد ركعات قيام رمضان؟ بين بالدلائل بالاختصار-
[১৬. তারাবীর নামায কত রাকাত? সংক্ষেপে দলিলসহ উল্লেখ কর।]
উত্তর: পবিত্র রমজান মাসের অন্যতম প্রধান সুন্নাত হলো কিয়ামু রমাদান বা সালাতুত তারাবীহ। চার মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহদের মতে তারাবীর সালাত বিশ (২০) রাকাত পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
দলিলসমূহ:
- সাহাবায়ে কেরামের ইজমা: হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকালে উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর ইমামতিতে সকল সাহাবীর সর্বসম্মত উপস্থিতিতে বিশ রাকাত তারাবীহ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। (মুয়াত্তা মালিক, বাইহাকী)। কোনো সাহাবী এর বিরোধিতা করেননি।
- খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত: হযরত উসমান (রা.) ও আলী (রা.)-এর যুগেও মক্কা ও মদিনায় ২০ রাকাত তারাবীহই অব্যাহত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা আমার সুন্নাত এবং আমার পরবর্তীতে হেদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরো।” (আবু দাউদ ও তিরমিযী)।
- চার মাযহাবের ঐক্যমত: হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবে ২০ রাকাত এবং মালেকী মাযহাবে ৩৬ রাকাত (মক্কার তওয়াফের সমকক্ষ হিসেবে) তারাবীহ আদায় করা সুন্নাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ‘ফিকহ’ শব্দের পারিভাষিক অর্থ কী?
বিস্তারিত শরঈ দলীল-প্রমাণাদির (কুরআন, সুন্নাহ ইত্যাদি) ভিত্তিতে মানুষের ব্যবহারিক জীবনের বিধিবিধান আহরণ ও উদ্ভাবন সংক্রান্ত জ্ঞানকে ফিকহ বলা হয়।
২. উসূলে ফিকহের প্রথম প্রণীত গ্রন্থের নাম কী?
উসূলে ফিকহের সর্বপ্রথম নিয়মতান্ত্রিক ও লিখিত মৌলিক গ্রন্থের নাম ‘আর-রিসালাহ’ (الرسالة), যার রচয়িতা হলেন হযরত ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.)।
৩. ইসলামী ফিকহে মতপার্থক্যের মূল কারণ কী?
কুরআনের শব্দের বহুবিধ অর্থ, হাদিস পৌঁছানো ও সনদের ভিন্ন মানদণ্ড এবং আইনি গবেষণার নীতিমালার (উসূল) ভিন্নতার কারণেই ফকীহগণের মধ্যে শাখাগত মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।
৪. হানাফী মাযহাব অনুসারে পুরুষদের হাত বাঁধার স্থান কোথায়?
সহিহ হাদিস ও সাহাবীদের আমলের আলোকে হানাফী মাযহাবে পুরুষদের জন্য সালাতে নাভির নিচে হাত বাঁধা সুন্নাত।
৫. চার মাযহাবের অনুসরণের বিধান কী?
সাধারণ মুসলমানদের জন্য প্রবৃত্তির অনুসরণ ও ফিতনা থেকে রক্ষা পেতে সালাফে সালেহীন কর্তৃক স্বীকৃত চার মাযহাবের যেকোনো একটি অনুসরণ করা ওয়াজিব বা অপরিহার্য।
৬. সাহাবায়ে কেরামের যুগে তারাবীর সালাত কত রাকাত ছিল?
হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকাল থেকে সকল সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত ঐকমত্যের (ইজমা) ভিত্তিতে বিশ (২০) রাকাত তারাবীহ সুন্নাত হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।