জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-মুসনাদ লিল ইমাম আবী হানীফা ওয়াশ শাফিঈ ওয়া আহমাদ (Al-Musnad) – ২০২৮০৩, আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
১৬২ মিনিট পড়ার সময়
১৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২২
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الحديث والدراسات الإسلامية [আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المسند لأبي حنيفة والشافعي وأحمد [আল-মুসনাদ লি আবি হানিফা ওয়া আল-শাফিঈ ওয়া আহমাদ]
বিষয় কোড: ২০২৮০৩
الوقت — ٤ ساعات [সময়— ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান— ৮০]
[الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (الف) وعن اثنين من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج) وعن اثنين من مجموعة (د) والأعداد بالهامش تدل على الدرجات الكاملة]
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘ক’ বিভাগ থেকে ২টি, ‘খ’ বিভাগ থেকে ২টি, ‘গ’ বিভাগ থেকে ২টি এবং ‘ঘ’ বিভাগ থেকে ২টি—মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের মান ডান পার্শ্বস্থ সংখ্যায় নির্দেশিত।]


مجموعة (الف) — مسند الإمام أبي حنيفة

[‘ক’ বিভাগ: মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা (রহ.) — পূর্ণমান: ১০ × ২ = ২০]
(ترجم الاحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها / হাদিসসমূহের অনুবাদ করো এবং তৎসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও)

١- أبو حنيفة عن حماد عن ابراهيم عن علقمة عن عبد الله بن مسعود رضى الله عنه قال : جاء جبرئيل الى النبىّ صلى الله عليه وسلم فى صورة شاب عليه ثياب بيض فقال : السلام عليك يا رسول الله! قال رسول الله صلى الله عليه وسلم وعليك السلام، فقال يا رسول الله أدْنُ فقال : حتى جلس إلى النبىّ صلى الله عليه وسلم فأسند ركبتيه إلى ركبتيه و وضع كفّيه على فخذيه فقال : يا رسول الله! ما الإيمان؟ قال : الإيمان بالله وملائكة وكتبه ورُسله والقدر خيره وشره- قال : صدقت-

[১. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বর্ণনা করেন— তিনি হাম্মাদ (রহ.) থেকে, তিনি ইবরাহিম আন-নাখয়ী (রহ.) থেকে, তিনি আলক্বামাহ্ (রহ.) থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: জিবরিল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে শুভ্র বসন পরিহিত একজন রূপবান যুবকের বেশে আগমন করলেন। অতঃপর তিনি আরজ করলেন: ‘আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ!’ (হে আল্লাহর রাসুল! আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)। রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিলেন: ‘ওয়া আলাইকাস সালাম’ (তোমার ওপরও শান্তি বর্ষিত হোক)। অতঃপর তিনি বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি আপনার নিকটবর্তী হতে পারি?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্মতি দিলেন; পরিশেষে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এতো নিকটবর্তী হয়ে বসলেন যে, তিনি স্বীয় উভয় হাঁটু নবিজি (সা.)-এর উভয় হাঁটুর সাথে মেলালেন এবং স্বীয় উভয় হাত নবিজির দুই উরুর ওপর রাখলেন। অতঃপর তিনি আরজ করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসুল! ইমান কী?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন: ‘ইমান হলো— তুমি অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাকুলের প্রতি, তাঁর অবতীর্ণ কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর প্রেরিত রাসুলগণের প্রতি এবং তাকদিরের ভালো ও মন্দের প্রতি।’ তিনি (জিবরিল আ.) বললেন: ‘আপনি সত্য বলেছেন।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
جَبْرَئِيلُ জিবরিল اسم علم أعجمي، ممنوع من الصرف، فاعل للفعل (جاء) مرفوع بالضمة। ওহির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ফেরেশতা। জিবরিল (আ.)
شَابٍّ শাব্বিন اسم فاعل، مجرد ثلاثي، مضاف إليه مجرور بالكسرة। যৌবনপ্রাপ্ত সুঠাম ব্যক্তি। যুবক / তরুণ
بِيضٌ বিদুন جمع (أبيض)، صفة لـ (ثياب)، مرفوع بالضمة। শুভ্রতা নির্দেশক বহুবচন। সাদা / শুভ্র বস্ত্রসমূহ
أَدْنُو আদনূ فعل مضارع مرفوع بضمة مقدرة، والهمزة للاستفهام বা طلب الإذن। বাব نصر-ينصر। আমি কি নিকটে আসব?
فَأَسْنَدَ ফা-আসনাদা فعل ماض، باب إفعال، معطوف على ما قبله، والفاعل ضمير مستتر (هو)। অতঃপর তিনি ঠেস দিলেন / মেলালেন
رُكْبَتَيْهِ রুকবাতাইহি مفعول به منصوب بالياء لأنه مثنى، وحذفت النون للإضافة، والهاء مضاف إليه। তাঁর উভয় হাঁটু
كَفَّيْهِ কাফফাইহি اسم مثنى، مفعول به منصوب بالياء، وحذفت النون للإضافة। হাতের তালুদ্বয়। স্বীয় উভয় হস্ততালু
فَخِذَيْهِ ফাখিযাইহি مجرور بعلى وعلامة جره الياء لأنه مثنى، والهاء مضاف إليه। উরুদ্বয়। তাঁর দুই উরু মোবারকের ওপর
الْقَدَرِ আল-ক্বাদারি معطوف على لفظ الجلالة مجرور بالكسرة। আল্লাহর সার্বভৌম নির্ধারণ ও পরিমাপ। তাকদির / ভাগ্য নির্ধারণ

(الف) ما معنى الإيمان؟ هل الإيمان يزيد وينقص؟ بيّن-

[(ক) ইমান-এর অর্থ কী? ইমান কি বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাস পায়? বিস্তারিত ব্যাখ্যা করো।]

ভূমিকা:
ইসলামি শরিয়তের সর্বাধিক মৌলিক ও কেন্দ্রীয় পরিভাষা হলো ‘ইমান’ (الإيمان)। আলোচ্য প্রশ্নে হাদিসে জিবরিলের আলোকে ইমানের আভিধানিক ও পারিভাষিক তাৎপর্য এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমামগণের মাঝে ইমানের হ্রাস-বৃদ্ধি (زيادة الإيمان ونقصانه) সম্পর্কিত গভীর ইলমি বিতর্কের বিশ্লেষণ চাওয়া হয়েছে। নিচে এর পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য উত্তর উপস্থাপন করা হলো:

১. ইমান (الإيمان)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:

(ক) আভিধানিক অর্থ:
‘ইমান’ শব্দটি আরবি باب إفعال থেকে নিষ্পন্ন একটি মাসদার (مصدر)। এর মূল ধাতু হলো (أ – م – ن) ‘আলিফ-মীম-নূন’। এর দুটি মূল আভিধানিক অর্থ রয়েছে:
১. التصديق (তাসদিক): আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন ও সত্য বলে প্রত্যয়ন করা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَمَا أَنتَ بِمُؤْمِنٍ لَّنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ﴾ (সুরা ইউসুফ: ১৭), অর্থাৎ ‘আপনি আমাদের কথা বিশ্বাসকারী নন, যদিও আমরা সত্যবাদী’।
২. الأمن والأمان (আমন ও আমানাত): অন্তরে শঙ্কা দূর করে প্রশান্তি ও নির্ভীক নিরাপত্তা লাভ করা।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ইমাম ও ফকিহগণের মতে ইমানের সংজ্ঞা নিম্নরূপ:
– ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফি ফুকাহাগণের মতে:
الإيمان هو الإقرار باللسان والتصديق بالجنان অর্থাৎ, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নিকট থেকে যা কিছু দ্বীনের অপরিহার্য বিষয় হিসেবে নিয়ে এসেছেন, তা অন্তরে মনে-প্রাণে সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং মুখে তা প্রকাশ্যে স্বীকার করা।’
– জমহুর মুহাদ্দিসিন (ইমাম মালিক, শাফিয়ী ও আহমদ রহ.)-এর মতে:
الإيمان قول باللسان، واعتقاد بالجنان، وعمل بالأركان অর্থাৎ, ‘ইমান হলো মুখে স্বীকারোক্তি, অন্তরের অবিচল বিশ্বাস এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে শরিয়তের হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করার সমন্বিত রূপ।’

২. ইমান কি বৃদ্ধি পায় এবং হ্রাস পায়? (هل الإيمان يزيد وينقص؟):
ইমানের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে ইসলামি আকিদা শাস্ত্রে ইমামগণের মাঝে চমৎকার ও গভীর ইলমি দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:

(ক) ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও কূফা ঘরানার অভিমত (ইমানের মূল সত্তা হ্রাস-বৃদ্ধি মুক্ত):
ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবি (রহ.) এবং কূফার উলামায়ে কেরামের মতে— ইমানের মূল সত্তা (أصل الإيمان / جوهر التصديق) হ্রাস বা বৃদ্ধি পায় না। তাঁদের অকাট্য যুক্তি ও দলিলসমূহ:
১. বিশ্বাস অবিভাজ্য: তাসদিক বা অন্তরের প্রত্যয়ন হলো এমন একটি অখণ্ড সত্য, যাতে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটলে তা আর অবিচল বিশ্বাস থাকে না, বরং তা সন্দেহ (الشك) বা দ্বিধায় রূপ নেয়। আর সন্দেহের উপস্থিতি ইমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
২. মুতলাক ইমানের সমতা: সাহাবায়ে কেরাম ও সাধারণ মুমিনের মূল বিশ্বাসের বিষয় এক ও অভিন্ন। আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করার ক্ষেত্রে কোনো মধ্যবর্তী স্তর নেই।
৩. আমল ইমানের অংশ নয় বরং ফল: হানাফি আকিদা অনুযায়ী আমল হলো ‘ইমানের পূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ’ (كمال الإيمان), কিন্তু মূল ইমানের সত্তাগত অংশ (রুকন) নয়। তাই আমলের কারণে মূল ইমান হ্রাস পায় না, বরং এর জ্যোতি ও মর্যাদা বাড়ে-কমে।

(খ) জমহুর সালাফ ও মুহাদ্দিসিনের অভিমত (ইমান বাড়ে এবং কমে):
ইমাম বুখারি, ইমাম শাফিয়ী, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-সহ অধিকাংশ মুহাদ্দিসিনের মতে— ইমান নেক আমলের দ্বারা বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহ ও পাপাচারের দ্বারা হ্রাস পায় (يزيد بالطاعة وينقص بالمعصية)।
দলিলসমূহ:
১. কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ﴿لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ﴾ ‘যাতে তাদের ইমানের সাথে আরও ইমান বৃদ্ধি পায়।’ (সুরা আল-ফাতহ: ৪)। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا﴾ ‘এবং যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে।’ (সুরা আল-আনফাল: ২)।
২. হাদিস শরিফের দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও দ্বীনি ঘাটতি উল্লেখ করতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন: «ما رأيت من ناقصات عقل ودين…» (সহিহ বুখারি), যা প্রমাণ করে দ্বীন বা ইমানের ঘাটতি ও আধিক্য বাস্তবসম্মত।

(গ) উভয় মতের চমৎকার সমন্বয় (التوفيق والتحقيق):
মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম (যেমন আল্লামা তাফতাযানী ও ইবনে আব্দিল বার রহ.) স্পষ্ট করেছেন যে, এই মতপার্থক্যটি মূলত দৃষ্টিভঙ্গিগত (خلاف لفظي اعتباري):
– ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইমানের ‘মূল সত্তা ও হাকিকত’ (أصل التصديق) বিবেচনা করেছেন, যা হ্রাস-বৃদ্ধির উর্ধ্বে।
– অন্যদিকে জমহুর মুহাদ্দিসিন ইমানের ‘নূর, জ্যোতি, প্রফুল্লতা ও আমলি পূর্ণতা’ (ثمار الإيمان ونوره وكماله) বিবেচনা করেছেন, যা আনুগত্যে বৃদ্ধি পায় এবং পাপে হ্রাস পায়।
অতএব, মূল বিশ্বাসে সবাই এক, তবে আমল ও তাকওয়ার বিচারে এক মুমিনের ইমানের স্তর অপর মুমিন অপেক্ষা বহুগুণ উন্নত ও শক্তিশালী হতে পারে।


٢- أبو حنيفة عن علقمة عن ابن بريدة عن أبيه، قال: رسول الله صلى الله عليه وسلّم: لعن الله القدريّة، وما من نبيّ ولا رسولٍ إلاّ لعنهم ونهى أُمّته عن الكلام معهم-

[২. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[২. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বর্ণনা করেন— তিনি আলক্বামাহ্ (রহ.) থেকে, তিনি ইবনে বুরাইদাহ্ (রহ.) থেকে এবং তিনি স্বীয় পিতা হজরত বুরাইদাহ্ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘আল্লাহ তাআলা কাদারিয়া সম্প্রদায়ের ওপর অভিসম্পাত (লানত) করেছেন। আর এমন কোনো নবি বা রাসুল অতিবাহিত হননি যিনি তাদের ওপর লানত বর্ষণ করেননি এবং স্বীয় উম্মতকে তাদের সাথে বাক্যালাপ ও মেলামেশা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেননি।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
لَعَنَ লা‘আনা فعل ماض مبني على الفتح، يفيد الإخبار أو الدعاء للطرد من الرحمة। আল্লাহ লানত / অভিসম্পাত করেছেন
الْقَدَرِيَّةَ আল-ক্বাদারিইয়্যাতা مفعول به منصوب بالفتحة، فرقة ضالة تنفي القدر। ভ্রান্ত সম্প্রদায়। কাদারিয়া সম্প্রদায়কে
نَبِيٍّ নাবিয়্যিন مجرور لفظًا بمن الزائدة، فاعل محلى للاستغراق। নবুওয়তপ্রাপ্ত দূত। কোনো নবি
نَهَى নাহা فعل ماض معتل اللام بالياء، مبني على الفتح المقدر। বাব ضرب। নিষেধ করেছেন
أُمَّتَهُ উম্মাতাহূ مفعول به منصوب بالفتحة، والهاء ضمير متصل مضاف إليه। তাঁর উম্মতকে
الْكَلاَمِ আল-কালামি اسم مجرور بعن وعلامة جره الكسرة। কথোপকথন বা বাক্যালাপ। কথা বলা / বাক্যালাপ করা থেকে

(الف) مَن هم القدريّة؟ بيّن موضحًا-

[(ক) কাদারিয়া কারা? বিস্তারিত ব্যাখ্যা করো।]

ভূমিকা:
ইসলামের আকিদাগত ইতিহাসে যে কয়টি ভ্রান্ত ফেরকার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, তন্মধ্যে ‘কাদারিয়া’ (القدرية) ছিল অন্যতম মারাত্মক বিভ্রান্ত গোষ্ঠী। তারা আল্লাহর সর্বজনীন ক্ষমতা ও তাকদিরকে অস্বীকার করে মানবীয় কর্মে চরম স্বেচ্ছাচারী মতবাদ প্রচার করেছিল। নিচে কাদারিয়াদের বিস্তারিত পরিচয় ও ভ্রান্ত মতবাদের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:

১. কাদারিয়া শব্দের পরিচয় ও নামকরণের তাৎপর্য:
– শব্দগত ব্যুৎপত্তি: ‘কাদারিয়া’ শব্দটি ‘আল-ক্বাদার’ (القدر) ধাতু থেকে সম্পর্কিত نسبة (সম্বন্ধসূচক বিশেষ্য)। এর অর্থ পরিমাপ, ভাগ্য বা নির্ধারণ।
– পারিভাষিক পরিচয়: পরিভাষায় যারা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য (তাকদির) অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে মানুষ নিজেই তার যাবতীয় কর্মের স্বাধীন স্রষ্টা এবং আল্লাহর ইলমে পূর্বে এসব নির্ধারিত ছিল না, তাদের ‘কাদারিয়া’ বলা হয়।
– নামকরণের কারণ: তারা তাকদির অস্বীকার করা সত্ত্বেও তাদেরকে কাদারিয়া বলা হয় এই জন্য যে, তারা তাকদির নিয়ে চরম বিতর্ক ও বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের ব্যাপারে সতর্ক করে আগেই নাম নির্ধারণ করেছিলেন।

২. কাদারিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব ও ঐতিহাসিক পটভূমি:
– প্রথম হিজরি শতাব্দীর শেষভাগে উমাইয়া খিলাফতের যুগে বসরায় এদের উৎপত্তি ঘটে।
– মূল প্রবক্তা: মা’বাদ আল-জুহানি (معبد الجهني) সর্বপ্রথম বসরার জামে মসজিদে প্রকাশ্যভাবে তাকদির অস্বীকার করে বলে: ‘কোনো তাকদির নেই এবং মানুষের কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে (الأمر أُنُف)’। পরবর্তীতে গায়লান আদ-দিমাশকি (غيلان الدمشقي) এই পথভ্রষ্ট আকিদার বিস্তার ঘটায়।
– সাহাবিগণের প্রতিরোধ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.), হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) প্রমুখ প্রখ্যাত সাহাবি জীবিত থাকাকালে তাদের ভ্রষ্টতার সংবাদ পেয়ে তাদের থেকে দায়মুক্তি ঘোষণা করেন এবং তাদের সাথে সালাম-কালাম বর্জন করার নির্দেশ দেন।

৩. কাদারিয়াদের মৌলিক ভ্রান্ত বিশ্বাসসমূহ:
১. তাকদির ও আজলি ইলম অস্বীকার: তারা দাবি করত আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার কর্ম পূর্বে নির্ধারণ করেননি এবং কাজ সংঘটিত হওয়ার আগে আল্লাহ তা জানেনও না (নাউযুবিল্লাহ)।
২. বান্দাকে কর্মের স্বয়ংসম্পূর্ণ স্রষ্টা মানা: তাদের মতে মানুষ তার ভালো-মন্দ সমস্ত কাজের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন স্রষ্টা (خالق أفعال العباد)। এখানে আল্লাহর কোনো কুদরত বা নিয়ন্ত্রণ কার্যকর নয়।
৩. দুই স্রষ্টায় বিশ্বাস (মাজুসিয়াত): ভালো কাজের স্রষ্টা আল্লাহ এবং মন্দ কাজের স্রষ্টা মানুষ—এহেন দ্বৈতবাদী বিশ্বাস পোষণের কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের ‘মাজুস’ (অগ্নিপূজক) আখ্যা দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে: «الْقَدَرِيَّةُ مَجُوسُ هَذِهِ الأُمَّةِ، إِنْ مَرِضُوا فَلاَ تَعُودُوهُمْ، وَإِنْ مَاتُوا فَلاَ تَشْهَدُوهُمْ» (আবু দাউদ)।

৪. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সুদৃঢ় আকিদা:
আহলুস সুন্নাহর আকিদা হলো— সমস্ত বস্তুর একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা (﴿وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ﴾ – সুরা আস-সাফফাত: ৯৬)। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ইচ্ছা ও ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা দিয়েছেন। বান্দা সেই ক্ষমতা দিয়ে কাজ ‘উপার্জন’ (كسب) করে, আর আল্লাহ তাআলা তা ‘সৃষ্টি’ (خلق) করেন। ফলে বান্দা তার ইচ্ছাকৃত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ ও জবাবদিহি করতে বাধ্য। কাদারিয়াদের ভ্রান্ত আকিদা কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিলের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।


٣- أبو حنيفة عن يزيد بن صُهَيبٍ عن جابر بن عبد الله رضى الله عنه عن النبىّ صلى الله عليه وسلّم انه قال: يُخرج الله تعالى من النار من أهل الإيمان بشفاعة محمّد صلى الله عليه وسلّم، قال يزيد : فقلت : إنّ الله تعالى يقول: وما هم بخَرجين من النار- قال جابر: إقرأ ما قبلها: “ان الذين كفروا” إنّما هى فى الكفار-

[৩. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[৩. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বর্ণনা করেন— তিনি ইয়াজিদ ইবনে সুহাইব আল-ফাক্বীর (রহ.) থেকে, তিনি হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে এবং তিনি নবি করিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সা.)-এর শাফাআতের (সুপারিশের) বরকতে ইমানদারদের এক দলকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করে বের করে আনবেন।’ বর্ণনাকারী ইয়াজিদ বলেন: তখন আমি জাবির (রা.)-কে বললাম, আল্লাহ তাআলা তো পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন: “তারা কিছুতেই জাহান্নামের আগুন থেকে বের হতে পারবে না” (সুরা আল-মায়িদাহ: ৩৭)। জাবির (রা.) প্রতিউত্তরে বললেন: তুমি এর পূর্ববর্তী আয়াতটি পাঠ করো: “নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে…” (সুরা আল-মায়িদাহ: ৩৬)। মূলত এই আয়াতটি কেবল কাফিরদের পরিণতি সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে (মুমিনদের সম্পর্কে নয়)।]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
يُخْرِجُ ইউখরিজু فعل مضارع مرفوع بالضمة، باب إفعال، والفاعل لفظ الجلالة (الله)। বের করে আনবেন
بِشَفَاعَةِ বি-শাফা‘আতি جار ومجرور متعلق بـ (يخرج)، شفاعة مصدر مضاف إلى محمد। সুপারিশের মাধ্যমে। শাফাআত / সুপারিশের মাধ্যমে
بِخَارِجِينَ বি-খারিযীনা الباء حرف جر زائد لتأكيد النفي، خارجين اسم فاعل مجرور لفظًا منصوب محلاً خبر (ما)। কোনোমতেই নির্গমনকারী নয়
اقْرَأْ ইক্বরা’ فعل أمر للمخاطب مبني على السكون، فاعله ضمير مستتر (أنت)। বাব فتح। তুমি পাঠ করো
مَا قَبْلَهَا মা ক্বাবলাহা (ما) اسم موصول مفعول به مبني في محل نصب، (قبلها) ظرف زمان متعلق بصلة محذوفة। এর পূর্ববর্তী আয়াত
الْكُفَّارِ আল-কুফ্ফারি جمع كافر، اسم مجرور بفي وعلامة جره الكسرة। অস্বীকারকারী ও অবিশ্বাসীবৃন্দ। কাফিরদের ক্ষেত্রে

(الف) هل الشفاعة ثابتة لأهل الكبائر؟ بيّن موضحًا-

[(ক) কবিরা গুনাহগারদের জন্য কি শাফাআত প্রমাণিত? বিস্তারিত ব্যাখ্যা করো।]

ভূমিকা:
আখিরাতের বিচার দিবসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত লাভ করা মুমিন জীবনের চরম পরম প্রাপ্তি। তবে উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের জন্য শাফাআত প্রযোজ্য হবে কি না—তা নিয়ে আহলুস সুন্নাহ এবং পথভ্রষ্ট খারিজি ও মুতাজিলাদের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ দেখা দিয়েছিল। কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যার আলোকে শাফাআতের প্রামাণিকতা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. শাফাআত (الشفاعة)-এর পারিভাষিক তাৎপর্য:
শাফাআত শব্দের মূল অর্থ মধ্যস্থতা করা বা অন্যের কল্যাণার্থে সুপারিশ করা। শরিয়তের পরিভাষায়— কিয়ামতের কঠিন ময়দানে আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.), অন্যান্য নবিগণ, ফেরেশতাকুল ও সালেহিন বান্দাদের পক্ষ থেকে গুনাহগার মুমিনদের পাপমোচন ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য যে সুপারিশ পেশ করা হবে, তাকে শাফাআত বলে।

২. কবিরা গুনাহগারদের জন্য শাফাআত প্রমাণিত হওয়ার অকাট্য দলিলসমূহ:
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা অনুযায়ী— যে ব্যক্তি শিরক ছাড়া কবিরা গুনাহ সহকারে তাওবা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করেছে, সেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআতের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।
(ক) হাদিস শরিফের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা:
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন: «شَفَاعَتِي لأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي» অর্থাৎ, ‘আমার শাফাআত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৩৯, সুনানে তিরমিজি: ২৪৩৬—সহিহ সনদ)।
(খ) জাহান্নাম থেকে মুমিনদের উদ্ধারের সুসংবাদ:
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত দীর্ঘ শাফাআতের হাদিসে এসেছে, নবিজি (সা.) বারবার সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এবং আল্লাহ তাআলা বলবেন: ‘হে মুহাম্মদ! মাথা ওঠান, সুপারিশ করুন, কবুল করা হবে।’ পরিশেষে যার অন্তরে একটি শস্যদানা পরিমাণও ইমান থাকবে, তাকেও শাফাআতের বরকতে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করা হবে।
(গ) কুরআনের শর্তযুক্ত শাফাআত:
কুরআনে কাফিরদের জন্য শাফাআত অস্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু মুমিনদের জন্য আল্লাহর অনুমতিসাপেক্ষে শাফাআত সাব্যস্ত করা হয়েছে: ﴿مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ﴾ (সুরা আল-বাকারাহ: ২৫৫)।

৩. খারিজি ও মুতাজিলাদের ভ্রান্তির খণ্ডন ও হজরত জাবির (রা.)-এর অনন্য হেকমত:
– খারিজি ও মুতাজিলাদের দাবি: তারা দাবি করে যে, যে ব্যক্তি কবিরা গুনাহ করে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি; তার জন্য কোনো শাফাআত নেই। তারা দলিল হিসেবে সুরা মায়িদার ৩৭ নং আয়াত (﴿وَمَا هُم بِخَارِجِينَ مِنْهَا﴾) পেশ করত।
– হজরত জাবির (রা.)-এর অকাট্য জবাব: বর্ণনাকারী ইয়াজিদ ইবনে সুহাইব আল-ফাক্বীর নিজেই প্রথমে খারিজিদের এই মতবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু সাহাবি হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) যখন তাঁকে আয়াতের পূর্বাপর (سياق وسباق) দেখিয়ে দিলেন যে, পূর্ববর্তী আয়াতেই আল্লাহ স্পষ্টভাবে ﴿إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا﴾ বলে কাফিরদের কথা উল্লেখ করেছেন, তখন ইয়াজিদের চোখ খুলে যায় এবং তিনি তওবা করে খারিজি আকিদা চিরতরে বর্জন করেন।

উপসংহার:
অতএব প্রমাণিত হলো যে, কবিরা গুনাহগার মুমিন ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামি নয়; বরং সে আল্লাহর ইচ্ছা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআতের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।


٤- أبو حنيفة عن عطيّة عن ابى سعيد الخدرى رضى الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلّم: مَن كذب عَلَىّ متعمّدًا فليتبوّأ مقعده من النار-

[৪. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[৪. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বর্ণনা করেন— তিনি আতিয়্যাহ আল-আউফী (রহ.) থেকে, তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর কোনো মিথ্যা আরোপ করবে (আমার নামে মিথ্যা কথা বলবে), সে যেন নিশ্চিতরূপে জাহান্নামে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নেয়।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
كَذَبَ কাযাবা فعل ماض مبني على الفتح، وهو فعل الشرط لـ (من) الجازمة। বাব ضرب। মিথ্যা বলেছে / মিথ্যা আরোপ করেছে
مُتَعَمِّدًا মুতা‘আম্মিদান اسم فاعل من تعمّد، منصوب على الحالية من فاعل كذب। জেনেশুনে বা সংকল্পবদ্ধ হয়ে। ইচ্ছাকৃতভাবে / সংকল্পবদ্ধ হয়ে
فَلْيَتَبَوَّأْ ফাল-ইয়াতাবাওওয়া’ اللام لام الأمر الجازمة، يتسوّأ فعل مضارع مجزوم بالسكون، وهو جواب الشرط المقترن بالفاء। সে যেন তার স্থান নির্ধারণ করে নেয়
مَقْعَدَهُ মাক্ব‘আদাহূ مفعول به منصوب بالفتحة، والهاء مضاف إليه، اسم مكان। বসার বা বসবাসের স্থান। তার বাসস্থান / আসন
النَّارِ আন-নারি اسم مجرور بمن وعلامة جره الكسرة। জাহান্নামের প্রজ্বলিত আগুন। জাহান্নামের আগুন থেকে

(الف) ما هو الحديث الموضوع؟ وما حكمه؟ بيّن-

[(ক) হাদিসে মাওদু (জাল হাদিস) কী? এর বিধান কী? বিস্তারিত ব্যাখ্যা করো।]

ভূমিকা:
হাদিস শাস্ত্রের অন্যতম সংবেদনশীল ও ক্ষতিকর অধ্যায় হলো ‘হাদিসে মাওদু’ বা জাল হাদিস। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জবানে যা উচ্চারিত হয়নি, তা তাঁর নামে চালিয়ে দেওয়ার চরমতম অপরাধ রোধেই উম্মতের মুহাদ্দিসগণ জীবনের সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করে আসমাউর রিজাল ও সনদ যাচাইয়ের বিজ্ঞান উদ্ভাবন করেছিলেন। নিম্নে হাদিসে মাওদু-এর সংজ্ঞা ও বিধান বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:

১. হাদিসে মাওদু (الحديث الموضوع)-এর সংজ্ঞা:
– আভিধানিক অর্থ: ‘মাওদু’ (الموضوع) শব্দটি وضع ধাতু থেকে اسم مفعول-এর রূপ। এর অর্থ মনগড়া, কৃত্রিম, মিথ্যা, রচিত বা অধপতিত।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: উসুলুল হাদিসের পরিভাষায়—
هو الكذب المختلق المصنوع المنسوب إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم زورًا وبهتانًا
অর্থাৎ, ‘যে মনগড়া, কৃত্রিম ও বানানো বক্তব্যকে মিথ্যা ও অপবাদমূলকভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী, কাজ বা সম্মতি হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়, তাকে হাদিসে মাওদু বা জাল হাদিস বলা হয়।’
মুহাদ্দিসিনের দৃষ্টিতে মাওদু মূলত হাদিসই নয়; বরং মানুষের বানোয়াট কথাকে অপবাদস্বরূপ হাদিস নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

২. হাদিস জালকরণের নেপথ্য কারণসমূহ:
ইতিহাসে বিভিন্ন কুচক্রী মহল হাদিস জাল করার পেছনে সক্রিয় ছিল:
১. ইসলামের ক্ষতিসাধন ও বিকৃতি: জিন্দিক ও বিধর্মীরা মুসলমানদের আকিদা ধ্বংস করার জন্য হাজার হাজার কুফরি ও অবান্তর কথা হাদিস নামে ছড়াত। (যেমন—আব্দুল করিম ইবনে আবিল আওজা ফাঁসির পূর্বে স্বীকার করেছিল যে সে চার হাজার জাল হাদিস প্রচার করেছে)।
২. মাযহাবি ও রাজনৈতিক অন্ধ পক্ষপাতিত্ব: শিয়া, খারিজি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকেরা নিজ দলের নেতার প্রশংসা ও প্রতিপক্ষের কুৎসা রটাতে জাল হাদিস তৈরি করত।
৩. অজ্ঞ সুফি ও দরবেশদের ফাজায়েল তৈরি: কিছু অতি ধার্মিক মূর্খ লোক মানুষকে আমলের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য কোরআনের সুরা বা আমলের মনগড়া ফজিলত বানিয়ে নবিজির নামে চালিয়ে দিত।
৪. পার্থিব স্বার্থ ও শাসকদের সন্তুষ্টি অর্জন: দরবারি চাটুকাররা শাসকদের খেয়ালখুশিকে শরিয়তসম্মত রূপ দিতে মিথ্যা হাদিস তৈরি করত।

৩. হাদিসে মাওদু-এর বিধান (حكم الحديث الموضوع):
– হাদিস জাল করার হুকুম: জেনেশুনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে হাদিস রচনা করা সম্পূর্ণ হারাম এবং অন্যতম সর্বনিকৃষ্ট কবিরা গুনাহ। ইমামুল হারামাইন জুওয়াইনি (রহ.)-এর মতে হাদিস জালকারী ব্যক্তি শরিয়ত পরিবর্তনের চেষ্টা করায় কাফির বলে গণ্য হতে পারে। তবে জমহুর উলামার মতে সে চরম ফাসিক ও কঠিনতম কবিরা গুনাহগার, যার স্থান সুনিশ্চিত জাহান্নাম।
– জাল হাদিস বর্ণনা করার হুকুম: জাল হাদিস জানা সত্ত্বেও তা ‘জাল বা বানোয়াট’ বলে স্পষ্ট না করে সাধারণ মানুষের সামনে বর্ণনা করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «مَنْ حَدَّثَ عَنِّي بِحَدِيثٍ يُرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبِينَ» অর্থাৎ, ‘যে ব্যক্তি আমার পক্ষ থেকে এমন কোনো হাদিস বর্ণনা করল যা মিথ্যা বলে তার জানা আছে, তবে সেও মিথ্যাবাদীদেরই একজন।’ (সহিহ মুসলিমের ভূমিকা)।
– ব্যতিক্রম: কেবল মানুষকে সতর্ক করার জন্য এবং মিথ্যা প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে (للتحذير والبيان) জাল হাদিস উল্লেখ করা বৈধ ও প্রশংসনীয়।

উপসংহার:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দ্বীনকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করার জন্য হাদিসে মাওদু বর্জন করা এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রে হাদিস গ্রহণ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব।


مجموعة (ب) — مسند الإمام الشافعي

[‘খ’ বিভাগ: মুসনাদুল ইমাম আশ-শাফিয়ী (রহ.) — পূর্ণমান: ১০ × ২ = ২০]
(ترجم الاحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها / হাদিসসমূহের অনুবাদ করো এবং তৎসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও)

٥- أخبرنا الشافعى قال أخبرنا إبراهيم بن محمّد قال: حدثنى عبد الله بن عبد الرّحمن بن جابر بن عتيكٍ عن جده جابر بن عتيك صاحب النبى صلى الله عليه وسلم قال إذا خرجت إلى الجمعة فأمش على هيئتك-

[৫. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[৫. আমাদের ইমাম শাফিয়ী (রহ.) অবহিত করেছেন— তিনি বলেন, আমাদেরকে ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদ অবহিত করেছেন— তিনি বলেন, আমাকে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে জাবির ইবনে আতীক্ব বর্ণনা করেছেন তাঁর পিতামহ নবি করিম (সা.)-এর সম্মানিত সাহাবি হজরত জাবির ইবনে আতীক্ব (রা.) থেকে, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘যখন তুমি জুমার নামাজের উদ্দেশ্যে বের হবে, তখন তুমি স্বীয় স্বাভাবিক চালে ধীরস্থির ও পরম শান্তভাবে গমন করবে।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
أَخْبَرَنَا আখবারানা فعل ماض مبني على السكون لاتصاله بـ (نا)، و(نا) ضمير متصل مفعول به। বাব إفعال। আমাদেরকে অবহিত করেছেন
صَاحِبِ সাহিব نعت لـ (جابر) مجرور بالكسرة، اسم فاعل। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহচর। সঙ্গী / সাহাবি
خَرَجْتَ খারাজতা فعل ماض مبني على السكون لاتصاله بضمير الفاعل، وهو فعل الشرط لـ (إذا)। বাব نصر। তুমি যখন বের হবে
فَامْشِ ফামশি الفاء رابطة لجواب الشرط، امش فعل أمر مبني على حذف حرف العلة (الياء)، والفاعل ضمير مستتر (أنت)। বাব ضرب। তবে তুমি স্বাভাবিক গতিতে চলো
هَيْئَتِكَ হাই’আতিকা اسم مجرور بعلى وعلامة جره الكسرة، والكاف مضاف إليه। السكينة والوقار والحال المعتادة। তোমার স্বাভাবিক ধীরস্থির গতিতে

(الف) قال الله تعالى : “يا ايّها الذين أمنوا إذا نُودى للصلاة من يوم الجمعة فَاسْعَوا إلى ذكر الله”— فما التوفيق بين القران والحديث؟ بيّن موضحًا-

[(ক) আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “হে মুমিনগণ! যখন জুমার দিন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও (সাঈ করো)।”—পবিত্র কুরআন ও হাদিসের এই দুই নির্দেশের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা যাবে? সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করো।]

ভূমিকা:
পবিত্র কুরআনে জুমার আজান হলে দ্রুত ‘সাঈ’ (ধাবিত) হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিস শরিফে নামাজে আসার সময় দৌড়াদৌড়ি না করে ধীরস্থির ও শান্তভাবে স্বাভাবিক চালে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই নির্দেশের মাঝে যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়, উসুলুল ফিকহ ও তাফসিরের মূলনীতির আলোকে তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে সমন্বিত হয়েছে। নিম্নে এর প্রামাণ্য বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:

১. পবিত্র কুরআনে ‘সাঈ’ (السعي)-এর তাফসির ও ভাষাগত তাৎপর্য:
আল্লাহ তাআলা সুরা আল-জুমুআহর ৯ নং আয়াতে ইরশাদ করেন: ﴿فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ﴾ (তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং কেনাবেচা বন্ধ করো)।
– মুফাসসিরিনের ব্যাখ্যা: প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), প্রখ্যাত তাবেয়ি ইমাম হাসান বসরি, মুজাহিদ ও কাতাদাহ (রহ.)-সহ সর্বসম্মত মুফাসসিরিন স্পষ্ট করেছেন যে, এখানে ‘সাঈ’ শব্দের অর্থ পায়ে দৌড়ে আসা নয় (ليس المراد به السعي على الأقدام والعدو)।
– প্রকৃত অর্থ: আরবি ভাষায় ‘সাঈ’ শব্দটি আন্তরিক সংকল্প, নিষ্ঠার সাথে প্রস্তুতি গ্রহণ, কর্মতৎপরতা এবং গুরুত্ব দেওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন কুরআনে এসেছে: ﴿وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ﴾ (সুরা আন-নাজম: ৩৯)—এখানে সাঈ অর্থ মানুষের আমল ও প্রচেষ্টা। অতএব, জুমার আজান শোনামাত্র পার্থিব ব্যস্ততা ফেলে মন-প্রাণ দিয়ে নামাজের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে রওয়ানা হওয়াকেই কুরআনে ‘সাঈ’ বলা হয়েছে।

২. হাদিস শরিফে ধীরস্থির ও শান্তভাবে চলার তাগিদ:
রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে গমনের বাহ্যিক আদব সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন:
«إِذَا ثُوِّبَ بِالصَّلاَةِ فَلاَ تَأْتُوهَا وَأَنْتُمْ تَسْعَوْنَ، وَأْتُوهَا وَأَنْتُمْ تَمْشُونَ، وَعَلَيْكُمُ السَّكِينَةُ، فَمَا أَدْرَكْتُمْ فَصَلُّوا، وَمَا فَاتَكُمْ فَأَتِمُّوا»
‘যখন নামাজের ইকামত দেওয়া হয়, তখন তোমরা দৌড়ে এসো না; বরং শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে হেঁটে আসো। অতঃপর নামাজের যতটুকু অংশ পাও তা আদায় করো, আর যা ছুটে যায় তা পরে পূর্ণ করো।’ (সহিহ বুখারি: ৯০৮, সহিহ মুসলিম: ৬০২)।
– দৌড়ের অপকারিতা: তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে আসলে শরীর হাঁপিয়ে ওঠে, অন্তরের একাগ্রতা ও নামাজের খুশু-খুজু বিনষ্ট হয়, যা নামাজের আত্মিক সৌন্দর্যের পরিপন্থী।

৩. পবিত্র কুরআন ও হাদিসের চমৎকার সমন্বয় (وجه التوفيق والجمع):
ইসলামের ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণ উভয়ের মাঝে চমৎকার সমন্বয় সাধন করেছেন:
১. কুরআনের নির্দেশ অন্তরের প্রতি: কুরআনের ‘সাঈ’ হলো অন্তরের গভীর তাগিদ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অলসতা ত্যাগ করা এবং আজানের সাথে সাথে দুনিয়াবি বাণিজ্য ছেড়ে মসজিদের দিকে পদার্পণ করা।
২. হাদিসের নির্দেশ শারীরিক পদচারণার প্রতি: হাদিসের নির্দেশ হলো পথের শারীরিক আদব রক্ষা করা—অর্থাৎ রাস্তায় চলার সময় মুমিন ব্যক্তি ব্যক্তিত্বহীনভাবে দৌড়াবে না, বরং গাম্ভীর্য ও তাকওয়ার সাথে পা ফেলবে।
৩. পরিপূরক সম্পর্ক: অন্তরে থাকবে জুমার প্রতি তীব্র ব্যাকুলতা ও দ্রুত ছুটে চলার অনুভূতি (কুরআনি সাঈ), আর বাহ্যিক শরীরে থাকবে বিনম্র ও শান্ত পদচারণা (হাদিসের হুকুম)।

উপসংহার:
অতএব কুরআন ও হাদিসের মধ্যে কোনো ধরনের বৈপরীত্য নেই; বরং কুরআন নির্ধারণ করেছে ইবাদতের অগ্রাধিকার ও সংকল্প, আর হাদিস শিক্ষা দিয়েছে সেই ইবাদতে উপস্থিতির বাহ্যিক শিষ্টাচার ও সৌন্দর্য।


٦- أخبرنا الشافعى قال: أخبرنا مالك عن ابن شهاب عن ابن المسيّب عن ابى هريرة رضى الله عنه، ان النبىّ صلى الله عليه وسلم قال: إذا قلت لصاحبك انصت والإمام يخطب فقد لَغَوتَ-

[৬. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[৬. আমাদের ইমাম শাফিয়ী (রহ.) অবহিত করেছেন— তিনি বলেন, আমাদেরকে ইমাম মালিক (রহ.) অবহিত করেছেন ইবনে শিহাব আয-যুহরি (রহ.) থেকে, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবি করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দিচ্ছেন, তখন যদি তুমি তোমার সঙ্গীকে (এমনকি ভালো উদ্দেশ্যেও) বলো ‘চুপ থাকো’, তবে নিশ্চয়ই তুমি অনর্থক (ত্রুটিযুক্ত) কাজ করলে।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
أَنْصِتْ আনসিত فعل أمر للمخاطب مبني على السكون، فاعله ضمير مستتر وجوبًا (أنت)। বাব إفعال। الاستماع مع السكوت। চুপ থাকো / মনোযোগ দাও
يَخْطُبُ ইয়াখতুবু فعل مضارع مرفوع بالضمة، والجملة في محل نصب حال من الإمام، والواو واو الحال। বাব نصر। খুতবা প্রদান করছেন
لَغَوْتَ লাযাওতা فعل ماض مبني على السكون لاتصاله بتاء الفاعل، والتاء فاعل। لغا يلغو অর্থ অনর্থক কাজ করা। তুমি অনর্থক কাজ করলে

(الف) بيّن حكم الكلام أثناء الخطبة-

[(ক) জুমার খুতবা চলাকালীন কথা বলার শরিয়তের হুকুম বিশদভাবে বর্ণনা করো।]

ভূমিকা:
জুমার খুতবা ইসলামের এক অনন্য ইবাদত ও ধর্মীয় দিকনির্দেশনার মাধ্যম। খুতবা শ্রবণ করার সময় মুসল্লিদের ওপর পূর্ণাঙ্গ নীরবতা রক্ষা করা শরিয়তের অপরিহার্য দাবি। আলোচ্য হাদিসে নবিজি (সা.) খুতবার সময় অপরকে ‘চুপ থাকো’ বলাকেও অনর্থক কাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন। নিম্নে খুতবা চলাকালে কথা বলার শরিয়তসম্মত হুকুম চার মাযহাবের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. নীরবতা অবলম্বনের সাধারণ বিধান ও মূলনীতি:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: ﴿وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ﴾ ‘যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমাদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়।’ (সুরা আল-আ’রাফ: ২০৪)। মুফাসসিরিনের মতে এই আয়াতের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো জুমার খুতবা।

২. চার মাযহাবের ফুকাহাগণের বিস্তারিত মতামত:
(ক) হানাফি মাযহাব (মাকরূহে তাহরিমি ও নিষিদ্ধ):
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদ্বয় ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে— ইমাম খুতবার জন্য মিম্বরে ওঠার পর থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত যেকোনো ধরনের পার্থিব কথা বলা, এমনকি সালাম দেওয়া, সালামের উত্তর দেওয়া, হাঁচির উত্তর (ইয়ারহামুকাল্লাহ) বলা এবং সৎকাজের আদেশ বা অসৎকাজে নিষেধ করাও মাকরূহে তাহরিমি (হারামের কাছাকাছি গুনাহ)। হানাফি মূলনীতি হলো: «كل ما حرم في الصلاة حرم في الخطبة» অর্থাৎ নামাজের মধ্যে যা কিছু নিষিদ্ধ, খুতবার মধ্যেও তা নিষিদ্ধ।
(খ) মালিকি মাযহাব (হারাম):
ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে— খুতবা চলাকালীন সময়ে সাধারণ মুসল্লিদের জন্য কোনো প্রকার কথা বলা সম্পূর্ণ হারাম। যে ব্যক্তি কথা বলে সে খুতবার মর্যাদা পদদলিত করে।
(গ) হাম্বলি মাযহাব (হারাম):
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে— যে ব্যক্তি ইমামের খুতবার আওয়াজ শুনতে পায়, তার জন্য খুতবা চলাকালে কথা বলা দ্ব্যর্থহীনভাবে হারাম। তবে যে ব্যক্তি এতো দূরে রয়েছে যে খুতবা শুনতে পায় না, সে নীরবে জিকির করতে পারে।
(ঘ) শাফিয়ী মাযহাব (মাকরূহে তানজিহি):
ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী— খুতবা চলাকালে কথা বলা মাকরূহে তানজিহি এবং সুন্নতে মুয়াক্কাদার খেলাফ। তবে কোনো জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে (যেমন অন্ধ মানুষকে গর্তে পড়া থেকে বাঁচানো) কথা বলা জায়েজ।

৩. খতিবের সাথে কথা বলা বা খতিবের পক্ষ থেকে কথা বলার ব্যতিক্রমী বিধান:
যদি স্বয়ং খতিব কোনো প্রয়োজনে মুসল্লির সাথে কথা বলেন অথবা কোনো মুসল্লি দ্বীনি বা সার্বিক জরুরি বিষয়ে খতিবের সাথে কথা বলেন, তবে তা সর্বসম্মতভাবে জায়েজ। যেমন—সহিহ বুখারিতে এসেছে, এক সাহাবি খুতবারত অবস্থায় এসে দাঁড়িয়ে থাকলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘তুমি কি দুই রাকাত পড়েছ?’ সাহাবি বললেন: ‘না’। নবিজি বললেন: ‘ওঠো এবং সংক্ষেপে দুই রাকাত আদায় করে নাও।’

৪. কেউ কথা বললে উপস্থিত মুসল্লির করণীয়:
যদি খুতবা চলাকালে কাউকে কথা বলতে দেখা যায়, তবে মুখে ‘চুপ করো’ বলা যাবে না; কারণ হাদিস অনুযায়ী এতে নিজের জুমার সওয়াবও নষ্ট হবে। বরং কেবল চোখের ইশারায় বা আঙুল দিয়ে মুখে ইঙ্গিত করে তাকে বারণ করতে হবে।


٧- أخبرنا إبراهيم بن محمّد قال حدثنى صفوان بن سليم عن إبراهيم بن عبد الله ابن مَعْبَد عن أبيه عن عكرمة عن ابن عباس رضى الله عنه، ان النبى صلى الله عليه وسلم قال: من ترك الجمعة من غير ضرورة كُتب مُنافقًا فى كتاب لا لمحى ولا يبدل-

[৭. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[৭. আমাদেরকে ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদ অবহিত করেছেন— তিনি বলেন, আমাকে সাফওয়ান ইবনে সুলাইম বর্ণনা করেছেন ইবরাহিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মা’বাদ থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি প্রখ্যাত তাবেয়ি ইকরিমাহ্ (রহ.) থেকে এবং তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবি করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘যে ব্যক্তি কোনো শরিয়তসম্মত জরুরি ওজর ও অপারগতা ছাড়া জুমার নামাজ বর্জন করবে, তাকে এমন এক গ্রন্থে ‘মুনাফিক’ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হবে—যা কখনো মুছে ফেলা হবে না এবং কখনো পরিবর্তনও করা হবে না।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
تَرَكَ তারাফা فعل ماض مبني على الفتح، وهو فعل الشرط لـ (مَن) الجازمة। বাব نصر। পরিত্যাগ করল / ছেড়ে দিল
ضَرُورَةٍ দারূরাতিন مضاف إليه مجرور بالكسرة بعد (غير)। العذر الشرعي الملجئ। জরুরি ওজর / অপারগতা
كُتِبَ কুতিবা فعل ماض مبني للمجهول، ونائب الفاعل ضمير مستتر (هو)। লিপিবদ্ধ করা হয়। লিপিবদ্ধ করা হলো
مُنَافِقًا মুনাফিক্বান حال منصوب بالفتحة من نائب الفاعل أو مفعول به ثان। কপট ব্যক্তি। মুনাফিক হিসেবে
لاَ يُمْحَى লা ইউমহা (لا) نافية، يمحى فعل مضارع مبني للمجهول مرفوع بضمة مقدرة। মুছে ফেলা হয় না। যা মোছা হবে না
يُبَدَّلُ ইউবাদ্দালু فعل مضارع مبني للمجهول، باب تفعيل، معطوف على يمحى। পরিবর্তন করা হয় না। পরিবর্তন করা হবে না

(الف) بيّن حكم ترك الجمعة موضحًا-

[(ক) জুমার নামাজ পরিত্যাগ করার শরিয়তের হুকুম বিশদভাবে ব্যাখ্যা করো।]

ভূমিকা:
ইসলামের শরিয়তে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও মুক্বিম পুরুষ মুসলমানের ওপর জুমার নামাজ আদায় করা সুনির্দিষ্টভাবে ‘ফরজে আইন’ (فرض عين)। এর গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অস্বীকার করা কুফরি। বিনা কারণে জুমার নামাজ পরিত্যাগ করার ব্যাপারে হাদিস শরিফে অত্যন্ত কঠোর ও ভীতিপ্রদর্শনমূলক হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। নিচে জুমা ত্যাগের হুকুম ও পরিণাম বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. জুমার নামাজ বর্জন করার বিধান (حكم ترك الجمعة):
– হারাম ও কবিরা গুনাহ: কোনো বৈধ ওজর ব্যতিরেকে জুমার নামাজ ত্যাগ করা সর্বসম্মতভাবে হারাম এবং জঘন্যতম কবিরা গুনাহ।
– অন্তরে মোহর এঁটে যাওয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«مَنْ تَرَكَ ثَلاَثَ جُمَعٍ تَهَاوُنًا بِهَا طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قَلْبِهِ»
‘যে ব্যক্তি অলসতাবশত অবহেলা করে পরপর তিনটি জুমা পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।’ (সুনানে তিরমিজি: ৫০০, সুনানে আবু দাউদ: ১০৫২—সহিহ সনদ)।
– ঘরে আগুন দেওয়ার ইচ্ছা: সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি (সা.) ইরশাদ করেন: ‘আমার ইচ্ছা হয় কোনো ব্যক্তিকে নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে যারা জুমার নামাজে আসে না তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিই।’

২. হাদিসে ‘মুনাফিক হিসেবে লিপিবদ্ধ’ হওয়ার তাৎপর্য:
আলোচ্য হাদিসে জুমা পরিত্যাগকারীকে ‘মুনাফিক’ বলে অভিহিত করার অর্থ হলো—
১. আমলি নিফাক (النيفاق العملي): সে বিশ্বাসের দিক থেকে কাফির না হলেও তার এই আচরণ খাঁটি মুনাফিকদের স্বভাবের সদৃশ। কারণ মুনাফিকরা জামাত ও জুমার মতো প্রকাশ্য ইবাদতে অলসতা করত।
২. লওহে মাহফুজে নির্ধারিত দলিল: এই অপরাধ এমন এক সংরক্ষিত রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ হয় যা আল্লাহর বিশেষ আজাবের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে, যদি না সে খাঁটি অন্তরে তওবা করে ফিরে আসে।

৩. জুমার নামাজ পরিত্যাগ করার বৈধ ওজরসমূহ (الأعذار المسقطة للجمعة):
শরিয়তের দৃষ্টিতে যেসব ওজরের কারণে জুমা বর্জন করা ক্ষমার্হ:
১. এমন তীব্র অসুস্থতা যার কারণে মসজিদে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব বা রোগ বৃদ্ধির প্রবল আশঙ্কা থাকে।
২. অন্ধত্ব বা পঙ্গুত্ব এবং এমন কোনো ব্যক্তি না থাকা যে তাকে হাত ধরে মসজিদে নিয়ে যাবে।
৩. প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিবৃষ্টি, হাঁটুসমান কাদা বা বিধ্বংসী ঝড়।
৪. অত্যাচারী শাসকের জুলুম, প্রাণনাশের ভয় বা মালামাল লুণ্ঠনের সুনিশ্চিত আশঙ্কা।
৫. মুসাফির অবস্থা, নারী, দাস এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু।

৪. জুমা ছুটে গেলে করণীয়:
কারো যদি কোনো ওজরে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে জুমার নামাজ ছুটে যায়, তবে তার দায়িত্ব হলো অবিলম্বে চার রাকাত জোহরের নামাজ একাকী আদায় করে নেওয়া এবং অলসতার জন্য আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে তাওবা-ইস্তিগফার করা।


٨- أخبرنا مالك عن ابى الزناد عن الأعرج عن ابى هريرة رضى الله عنه، ان رسول الله صلى الله عليه وسلم ذكر يوم الجمعة فقال: فيه ساعة لا يوافقها إنسان مسلم وهو قائم يصلى، يسأل الله شيئًا الاّ أعطاه إيّاه واشار النبىّ صلى الله عليه وسلم بيده يقلّلها-

[৮. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[৮. আমাদের ইমাম শাফিয়ী (রহ.) অবহিত করেছেন— তিনি বলেন, আমাদেরকে ইমাম মালিক (রহ.) অবহিত করেছেন আবুয যিনাদ (রহ.) থেকে, তিনি আল-আ’রাজ (রহ.) থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের মাহাত্ম্য ও ফজিলত আলোচনা করতে গিয়ে ইরশাদ করলেন: ‘এই দিনে এমন একটি বিশেষ মুহূর্ত বা সময় রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা যদি ঠিক সেই সময়টিতে সালাতরত বা একনিষ্ঠ ইবাদতেরত অবস্থায় আল্লাহর নিকট কোনো কল্যাণ প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ তাআলা নিশ্চিতরূপে তাকে তা দান করেন।’ এবং নবিজি (সা.) নিজ পবিত্র হাত মোবারকের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন যে সেই মুহূর্তটি অতি সংক্ষিপ্ত।]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
سَاعَةٌ সা‘আতুন مبتدأ مؤخر مرفوع بالضمة، وخبره شبه الجملة المقدم (فيه)। جزء من الوقت বা বিশেষ মুহূর্ত। এমন একটি মুহূর্ত / সময়
يُوَافِقُهَا ইউওয়াফিক্বুহা فعل مضارع مرفوع، والفاعل (إنسان)، والهاء مفعول به، باب مفاعلة। অর্থ কাকতালীয়ভাবে মিলে যাওয়া। তা পেয়ে যায় / তার সাথে মিলে যায়
قَائِمٌ ক্বা’ইমুন اسم فاعل، خبر للمبتدأ (هو) في الجملة الحالية (وهو قائم يصلي)। সালাতরত বা একনিষ্ঠ। দণ্ডায়মান বা রত অবস্থায়
يُقَلِّلُهَا ইউক্বাললিলুহা فعل مضارع، باب تفعيل، والفاعل مستتر (هو)، والهاء مفعول به، والجملة حالية। তা সংক্ষেপ ও সীমিত করে দেখালেন

(الف) اذكر فضيلة يوم الجمعة فى ضوء الحديث-

[(ক) হাদিসের আলোকে জুমার দিনের ফজিলত ও তাৎপর্য আলোচনা করো।]

ভূমিকা:
ইসলামে জুমার দিন হলো সপ্তাহের শ্রেষ্ঠতম দিন এবং মুসলমানদের জন্য একটি সাপ্তাহিক ঈদের দিন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই দিনটিকে অন্যান্য সমস্ত দিনের ওপর বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা দান করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের বহুবিধ ফজিলত বর্ণনা করেছেন, যার শীর্ষস্থানে রয়েছে ‘দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত’ (ساعة الإجابة)। নিম্নে হাদিসের আলোকে জুমার দিনের ফজিলত আলোচনা করা হলো:

১. সাইয়্যিদুল আইয়াম (দিনসমূহের সর্দার) হিসেবে জুমার মর্যাদা:
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «خَيْرُ يَوْمٍ طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ يَوْمُ الْجُمُعَةِ، فِيهِ خُلِقَ آدَمُ، وَفِيهِ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ، وَفِيهِ أُخْرِجَ مِنْهَا، وَلاَ تَقُومُ السَّاعَةُ إِلاَّ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ»
‘সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল, এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল, এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামানো হয়েছিল এবং এই জুমার দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ৮৫৪)।

২. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত (ساعة الاستجابة):
আলোচ্য হাদিসের মূল বিষয় হলো জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে যাতে আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া অবধারিতভাবে কবুল করেন। হাদিস বিশারদগণের মাঝে এই সময়টির সুনির্দিষ্ট নির্ধারণ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও দুটি মত সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য:
– প্রথম মত (সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী): ইমামের মিম্বরে বসা থেকে শুরু করে জুমার সালাত সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত সময়টুকু (হজরত আবু মুসা আশআরি রা.-এর সূত্রে বর্ণিত)।
– দ্বিতীয় মত (জমহুর সাহাবা ও সালাফের মত): আসরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শেষ সময়টুকু (হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ ও আনাস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: ‘তোমরা আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই শুভ মুহূর্তটি সন্ধান করো।’

৩. এই মুহূর্তটি গোপন রাখার হিকমত ও রহস্য:
আল্লাহ তাআলা যেমন রমজান মাসের শেষ দশকের মধ্যে ‘লাইলাতুল কদর’ গোপন রেখেছেন এবং মানুষের জীবনের মধ্যে ‘মৃত্যুর ক্ষণ’ অপ্রকাশিত রেখেছেন, ঠিক তেমনি জুমার দিনের এই সময়টিকেও অনির্দিষ্ট রেখেছেন। এর মূল হিকমত হলো—যাতে মুমিন বান্দারা কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের ওপর ভরসা না করে সারা দিনব্যাপী জিকির, তিলাওয়াত, সালাত, দরুদ শরিফ ও ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকে।

৪. জুমার দিনের অন্যান্য বিশিষ্ট ফজিলত ও সুন্নাত:
১. গুনাহ মাফের নিশ্চয়তা: যে ব্যক্তি উত্তমরূপে গোসল করে, সুগন্ধি মেখে মসজিদে যায়, কোনো মুসল্লির কাঁধ ডিঙিয়ে কষ্ট না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার বিগত জুমা থেকে এই জুমা পর্যন্ত এবং আরও অতিরিক্ত তিন দিনের সমস্ত সগিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
২. দরুদ শরিফের সওয়াব বৃদ্ধি: নবিজি (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘তোমরা জুমার দিনে আমার ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করো, কারণ তোমাদের দরুদ আমার দরবারে সরাসরি পেশ করা হয়।’
৩. সুরা আল-কাহাফের জ্যোতি: জুমার দিনে সুরা আল-কাহাফ তিলাওয়াতকারীর জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত বিশেষ নূর ও আলোর ব্যবস্থা করা হয়।

উপসংহার:
জুমার দিন আল্লাহপ্রদত্ত এক মহামূল্যবান নিয়ামত। এই দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে তওবা, ইস্তিগফার ও দোয়ার মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা প্রতিটি মুমিনের একান্ত কর্তব্য।


مجموعة (ج) — مسند الإمام أحمد بن حنبل

[‘গ’ বিভাগ: মুসনাদুল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) — পূর্ণমান: ১০ × ২ = ২০]
(ترجم الاحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها / হাদিসসমূহের অনুবাদ করো এবং তৎসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও)

٩- حدثنا يزيد بن هرون أخبرنا صَدَقة بن موسى عن فرقد السبخي عن مرة الطيب عن ابى بكرن الصديق عن النبىّ صلى الله عليه وسلم قال: لا يدخل الجنة خبّ ولا بخيل ولا منّان ولا سيّئ الملكة وأوّل من يدخل الجنة المملوك إذا أطاع الله وأطاع سيّده-

[৯. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[৯. আমাদের ইয়াজিদ ইবনে হারুন বর্ণনা করেছেন— তিনি বলেন, আমাদেরকে সদাক্বাহ্ ইবনে মুসা অবহিত করেছেন ফারক্বাদ আস-সাবখি থেকে, তিনি মুররাহ্ আত-তাইয়্যিব থেকে এবং তিনি প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবি করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘প্রতারক বা ধূর্ত ধোঁকাবাজ, কৃপণ, খোঁটাদানকারী (উপকার করে খোঁটা দেয় যে) এবং অধীনস্তদের সাথে দুর্ব্যবহারকারী ব্যক্তি (প্রথম পর্যায়েই) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর জান্নাতে সর্বপ্রথম প্রবেশকারী সৌভাগ্যবানদের একজন হবে সেই দাস বা অধীনস্ত ব্যক্তি, যে স্বীয় রবের আনুগত্য করেছে এবং নিজ মনিবের আনুগত্যও যথাযথভাবে রক্ষা করেছে।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
خَبٌّ খাব্বুন اسم فاعل من خبّ يخبّ، فاعل للفعل المنفي (لا يدخل) مرفوع بالضمة। المفسد المخادع المكار। প্রতারক / ধূর্ত চক্রান্তকারী
بَخِيلٌ বাখীলুন صفة مشبهة، معطوف على (خبّ)، المانع للحقوق المالية الواجبة। কৃপণ ব্যক্তি
مَنَّانٌ মান্নানুন صيغة مبالغة من المنّ، معطوف، الذي يعطي الشيء ثم يمنّ به ويؤذي। দান করে খোঁটাদানকারী
سَيِّئُ الْمَلَكَةِ সাইয়ি’উল মালাকাতি مركب إضافي معطوف، الملكة ما ملكت اليمين، والمعنى من يسيء معاملة خدمه ورعيته। অধীনস্তদের প্রতি দুর্ব্যবহারকারী
الْمَمْلُوكُ আল-মামলূকু اسم مفعول، خبر للمبتدأ (أول)، العبد الرقيق الخادم। ক্রীতদাস / অধীনস্ত সেবক
أَطَاعَ আত্বা‘আ فعل ماض مبني على الفتح، باب إفعال، وهو فعل الشرط لـ (إذا)। আনুগত্য প্রকাশ করা। অনুগত্য করেছে

(الف) اكتب نبذة من حياة أبى بكرن الصدّيق رضى الله عنه-

[(ক) হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর জীবনের ওপর একটি সংক্ষিপ্ত ও প্রামাণ্য আলোকপাত করো।]

ভূমিকা:
উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে নবি-রাসুলগণের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আজীবনের সঙ্গী ও ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.)। ইসলাম গ্রহণ, হিজরতের ঐতিহাসিক সফর, জিহাদের ময়দান এবং খিলাফতের ক্রান্তিকালে তাঁর অনন্য কুরবানি ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায়। নিম্নে তাঁর পুণ্যময় জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো:

১. নাম, বংশ ও উপাধিসমূহ:
– নাম ও কুনিয়াত: তাঁর মূল নাম আব্দুল্লাহ। জাহিলি যুগে তাঁর নাম ছিল ‘আব্দুল কা’বা’, নবিজি (সা.) তাঁর নাম রাখেন ‘আব্দুল্লাহ’। তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘আবু বকর’।
– পিতার নাম: উসমান, যিনি ‘আবু কুহাফা’ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। মাতার নাম সালমা বিনতে সাখর, কুনিয়াত ‘উম্মুল খায়ের’।
– বংশপরিচয়: তিনি কুরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের প্রায় সোয়া দুই বছর পর মক্কা মুকাররমায় জন্মগ্রহণ করেন।
– উপাধিসমূহ: ১. আস-সিদ্দিক (الصديق): মিরাজের ঘটনাকে কোনো দ্বিধা ছাড়া সত্য বলে সত্যায়ন করায় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করেন। ২. আতীক্ব (العتيق): জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত ব্যক্তি।

২. ইসলাম গ্রহণ ও ইসলাম প্রচারে অবদান:
প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম দ্বিধাহীন চিত্তে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি দ্বীনের দাওয়াত প্রদানে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর আহবানেই হজরত উসমান, তালহা, জুবায়ের, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর মতো শীর্ষ সাহাবিগণ ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার কাফিরদের চরম নির্যাতনের শিকার দুর্বল মুসলিম দাস-দাসী (যেমন হজরত বেলাল রা.)-কে তিনি নিজের বিপুল অর্থ ব্যয়ে খরিদ করে মুক্ত করে দেন।

৩. হিজরত ও রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্য:
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের বিপদসঙ্কুল রাতে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একমাত্র সফরসঙ্গী ছিলেন। সাওর পর্বতের গুহায় তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন: ﴿ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا﴾ (সুরা আত-তাওবাহ: ৪০)। বদর, ওহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়াহ ও তাবুকসহ প্রতিটি জিহাদে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা ছিলেন। তাবুক যুদ্ধের সময় তিনি নিজের ঘরের সমস্ত সহায়-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

৪. খিলাফত ও ঐতিহাসিক সোনালী খেদমত:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত ঐকমত্যে (ইজমা) তিনি ইসলামের প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। তাঁর সংক্ষিপ্ত খিলাফতকালে (১১-১৩ হিজরি) তিনি যেসব যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন:
১. ভণ্ড নবিদের দমন: মুসাইলামা কাজ্জাব, আসওয়াদ আনসি ও তুলাইহা আসাদির মতো ভণ্ড নবিদের কঠোর হস্তে দমন করেন।
২. জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: যারা নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে আপসহীন জিহাদ ঘোষণা করে দ্বীনের মূল স্তম্ভকে সুরক্ষিত করেন।
৩. পবিত্র কুরআন সংকলন: ইয়ামামার যুদ্ধে বহু সংখ্যক হাফেজে কুরআন সাহাবির শাহাদাতের পর হজরত উমর (রা.)-এর পরামর্শে হজরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে পবিত্র কুরআনকে গ্রন্থাকারে সংকলনের ঐতিহাসিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
৪. আন্তর্জাতিক বিজয় অভিযান: রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের আগ্রাসন রোধে সিরিয়া ও ইরাকে সফল সেনাদল প্রেরণ করেন।

৫. ইন্তেকাল ও চিরনিদ্রা:
হিজরি ১৩ সনের ২২ জুমাদাল উখরা ৬৩ বছর বয়সে এই মহান খলিফা ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি হজরত উমর (রা.)-কে পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে যান। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র রওজা মুবারকের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।


١٠- حدثنا عبد الوهاب بن عطاء، قال أخبرنا محمّد بن عمرو عن ابى سلمة عن ابى هريرة رضى الله عنه، أن فاطمة جاءت أبا بكر وعمر تطلب ميراثها من رسول الله صلى الله عليه وسلّم، فقال إنا سمعنا رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: إنى لا أُورث-

[১০. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[১০. আমাদের আব্দুল ওয়াহহাব ইবনে আতা বর্ণনা করেছেন— তিনি বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মদ ইবনে আমর অবহিত করেছেন আবু সালামাহ্ থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহীয়সী কন্যা সাইয়্যিদাতুনা ফাতিমা (রা.) হজরত আবু বকর ও হজরত উমর (রা.)-এর নিকট রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে স্বীয় মিরাস (উত্তরাধিকার) দাবি করে আসলেন। তখন হজরত আবু বকর (রা.) বললেন: আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে স্বয়ং ইরশাদ করতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন: ‘নিশ্চয়ই আমার কোনো ওয়ারিশ হয় না (আমাদের নবিদের পার্থিব সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয় না; বরং যা রেখে যাই তা সদকাহ)।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
تَطْلُبُ তাতলুবু فعل مضارع مرفوع، والفاعل مستتر (هي)، والجملة حالية من فاطمة। অনুসন্ধান বা দাবি করা। তিনি দাবি করে আসলেন
مِيرَاثَهَا মিরাসাহা مفعول به منصوب بالفتحة، والهاء ضمير متصل مضاف إليه। পৈতৃক সম্পদ। স্বীয় উত্তরাধিকার সম্পত্তি
سَمِعْنَا সামি‘না فعل ماض مبني على السكون لاتصاله بـ (نا)، و(نا) فاعل। বাব سمع। আমরা শ্রবণ করেছি
لاَ أُورَثُ লা ঊরাছু (لا) نافية، أورث فعل مضارع مبني للمجهول، باب إفعال، ونائب الفاعل ضمير مستتر (أنا)। আমার উত্তরাধিকার হয় না

(الف) هل يُقسم ميراث الأنبياء عليه السلام؟ بيّن-

[(ক) নবি-রাসুলগণের (আ.) মিরাস (সম্পত্তি) কি সাধারণ ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টন করা হয়? বিস্তারিত ব্যাখ্যা করো।]

ভূমিকা:
পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসের অকাট্য বিধান অনুযায়ী সাধারণ মানুষের মৃত্যুর পর যেমন তাদের পরিত্যক্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি শরিয়তের ফারায়েজ নীতি অনুযায়ী সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়দের মাঝে বণ্টিত হয়, নবি-রাসুলগণের পার্থিব সম্পত্তির ক্ষেত্রে এই বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। নবিগণের সম্পত্তি কোনো ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারীর মাঝে বণ্টিত হয় না। নিম্নে এর প্রামাণিক দলিল ও গভীর হিকমত আলোচনা করা হলো:

১. নবিগণের মিরাস বণ্টনের সাধারণ বিধান (আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত):
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী— নবি ও রাসুলগণের পার্থিব কোনো সহায়-সম্পত্তি তাঁদের ইন্তেকালের পর উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন করা জায়েজ নয়। বরং তাঁদের পরিত্যক্ত সমস্ত সম্পদ উম্মতের কল্যাণে সাধারণ ‘সদকাহ’ (صدقة) হিসেবে গণ্য হয় এবং মুসলিম রাষ্ট্রের খলিফা তা পরিচালনা করবেন।

২. হাদিস শরিফের দ্ব্যর্থহীন প্রামাণিক দলিল:
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পবিত্র জবানিতে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে গেছেন:
«لاَ نُورَثُ، مَا تَرَكْنَا فَهُوَ صَدَقَةٌ، إِنَّمَا يَأْكُلُ آلُ مُحَمَّدٍ مِنْ هَذَا الْمَالِ»
‘আমাদের (নবিগণের) কোনো উত্তরাধিকারী হয় না; আমরা যা কিছু রেখে যাই, তা সদকা বলে গণ্য হবে। তবে মুহাম্মদের পরিবার এই সম্পদ থেকে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভরণপোষণ গ্রহণ করবে।’ (সহিহ বুখারি: ৩০৯৩, সহিহ মুসলিম: ১৭৫৯)।
অন্য বর্ণনায় এসেছে: «إِنَّ الأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلاَ دِرْهَمًا، إِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ، فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ» ‘নবিগণ দিনার বা দিরহাম (টাকাপয়সা) উত্তরাধিকার রেখে যান না; বরং তাঁরা উত্তরাধিকার হিসেবে ইলম রেখে যান। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করল, সে পূর্ণ অংশ লাভ করল।’ (সুনানে আবু দাউদ, তিরমিজি)।

৩. নবিগণের পার্থিব মিরাস জারি না রাখার হিকমত ও তাৎপর্য:
১. নবুওয়তের নিষ্কলুষতা রক্ষা: যদি নবিগণের সন্তানরা তাঁদের রাজত্ব বা বিপুল সম্পদের ওয়ারিশ হতেন, তবে ইসলামের বিরুদ্ধবাদীরা অপবাদ রটানোর সুযোগ পেত যে, নবিগণ দুনিয়ার ধনদৌলত পুঞ্জীভূত করে পরিবারকে দেওয়ার জন্যই নবুওয়তের দাবি করেছিলেন।
২. পার্থিব মোহহীনতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত: নবিগণ দুনিয়ার প্রতি চরম অনাসক্ত ছিলেন। তাঁরা মানবজাতিকে আখিরাতমুখী করার জন্য এসেছিলেন, তাই দুনিয়ার সামান্য সম্পদও তাঁরা সদকা করে দিয়ে গেছেন।
৩. পবিত্র পরিবারের পবিত্রতা রক্ষা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার সদকা বা জাকাতের মাল গ্রহণ থেকে মুক্ত ও পবিত্র। তাই তাঁদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন না রেখে সাধারণ কল্যাণমুখী করা হয়েছে।

৪. সাইয়্যিদাতুনা ফাতিমা (রা.) ও হজরত আবু বকর (রা.)-এর ঘটনার স্বরূপ:
হজরত ফাতিমা (রা.) সাধারণ কুরআনি আয়াতের ভিত্তিতে পিতা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ফায় বা খাইবার-ফাদ্দাকের আয়ের বিষয়ে আবেদন করেছিলেন। কারণ এই বিশেষ হাদিসটি পূর্বে তাঁর জানা ছিল না। কিন্তু হজরত আবু বকর (রা.) যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণী শোনালেন, তখন তিনি তা মেনে নেন। হজরত আবু বকর (রা.) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন: ‘আল্লাহর কসম! আমার নিজের আত্মীয়স্বজনদের চেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারের সাথে উত্তম সম্পর্ক বজায় রাখা আমার কাছে অধিক প্রিয়। নবিজি (সা.) জীবদ্দশায় যেভাবে এই সম্পদ ব্যয় করতেন, আমি তার চুল পরিমাণও পরিবর্তন করব না।’ পরবর্তীতে খলিফা হজরত উমর ও খলিফা হজরত আলি (রা.) তাঁদের খিলাফতকালে হুবহু এই নীতিই বহাল রেখেছিলেন।

উপসংহার:
অতএব প্রমাণিত হলো যে, নবিগণের পার্থিব সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টিত হয় না; বরং তা সদকা হিসেবে মুসলিম উম্মাহ ও নবি পরিবারের প্রয়োজন পূরণে ব্যবহৃত হয়।


١١- حدثنا اسحق بن عيسى حدثنا ابن لهيعة عن جعفر بن ربيعة عن الزهرى عن محرر بن أبى هريرة عن أبيه عن عمر بن الخطاب رضى الله عنه، إنّ النبىّ صلى الله عليه وسلم نهى عن العزل عن الحُرّة الاّ باذْنها-

[১১. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[১১. আমাদের ইসহাক ইবনে ঈসা বর্ণনা করেছেন— তিনি বলেন, আমাদেরকে ইবনে লাহিআহ্ বর্ণনা করেছেন জাফর ইবনে রাবিয়াহ্ থেকে, তিনি প্রখ্যাত ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরি থেকে, তিনি মুহাররির ইবনে আবি হুরায়রা থেকে, তিনি স্বীয় পিতা হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে এবং তিনি আমিরুল মুমিনিন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবি করিম (সা.) স্বাধীন স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া ‘আজল’ (গর্ভধারণ রোধে সঙ্গমের সময় জরায়ুর বাইরে বীর্যপাত) করতে নিষেধ করেছেন।]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
نَهَى নাহা فعل ماض معتل اللام بالياء، مبني على الفتح المقدر। বাব ضرب। নিষেধ করেছেন
الْعَزْلِ আল-‘আযলি اسم مجرور بعن وعلامة جره الكسرة، مصدر عزل يعزل، إلقاء المني خارج الفرج। আজল করা থেকে
الْحُرَّةِ আল-হুররাতি مجرور بعن وعلامة جره الكسرة، ضد الأمة। স্বাধীন স্ত্রী। স্বাধীন নারীর ক্ষেত্রে
إِذْنِهَا ইযনিহা اسم مجرور بالباء وعلامة جره الكسرة، والهاء مضاف إليه، مستثنى بـ (إلا)। رضاها وموافقتها। তার সন্তুষ্টি ও অনুমতি ব্যতীত

(الف) اكتب حُكم العزل مع إختلاف الأئمة-

[(ক) ইমামগণের মতপার্থক্যসহ ‘আজল’ (বীর্য বাইরে স্খলন)-এর শরিয়তের হুকুম বিশদভাবে লেখো।]

ভূমিকা:
দাম্পত্য জীবনে পরিবার পরিকল্পনা ও জন্ম নিয়ন্ত্রণের একটি প্রাচীন ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি হলো ‘আজল’ (العزل)। ইসলামি শরিয়তে মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা, সন্তান লাভের অধিকার এবং নারীর শারীরিক তৃপ্তিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আলোচ্য হাদিসে স্বাধীন স্ত্রীর ক্ষেত্রে তার অনুমতি ছাড়া আজল করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিম্নে চার মাযহাবের ইমামগণের ফিকহি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:

১. আজল (العزل)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:
– আভিধানিক অর্থ: العزل শব্দের অর্থ কোনো কিছুকে পৃথক করা, দূরে রাখা বা বিচ্ছিন্ন করা।
– পারিভাষিক অর্থ: স্বামী-স্ত্রীর মিলনের সময় চরম পুলকের মুহূর্তে গর্ভধারণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বীর্যকে স্ত্রীর জরায়ুর ভেতরে না ফেলে বাইরে নির্গমন করাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘আজল’ বলা হয়।

২. হাদিস শরিফে আজলের সাধারণ হুকুম:
হজরত জাবির (রা.) বলেন: «كُنَّا نَعْزِلُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَالْقُرْآنُ يَنْزِلُ، فَلَوْ كَانَ شَيْئًا يُنْهَى عَنْهُ لَنَهَانَا عَنْهُ الْقُرْآنُ» অর্থাৎ, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায় যখন কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল তখন আমরা আজল করতাম; যদি তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হতো তবে কুরআন অবশ্যই আমাদের তা নিষেধ করত।’ (সহিহ বুখারি: ৫২০৯, সহিহ মুসলিম: ১৪৪০)।

৩. চার মাযহাবের ফুকাহাগণের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতপার্থক্য:
(ক) হানাফি মাযহাব (স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে মুবাহ):
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফি ফুকাহাগণের মতে— স্বাধীন স্ত্রীর অনুমতি ব্যতিরেকে আজল করা মাকরূহে তানজিহি (অপছন্দনীয়)। তবে স্ত্রীর সম্মতি থাকলে তা সম্পূর্ণরূপে বৈধ (মুবাহ)।
– ফতোয়ায়ে শামী ও পরবর্তী ফুকাহাগণের ব্যাখ্যা: যদি কোনো ফিতনাপূর্ণ জামানায় বা যুদ্ধাবস্থায় সন্তানের দ্বীন ও নৈতিকতা বিনষ্টের সুনিশ্চিত আশঙ্কা থাকে, তবে স্বামীর জন্য স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াও আজল করা জায়েজ।
(খ) শাফিয়ী মাযহাব (মাকরূহে তানজিহি):
ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী— স্ত্রীর অনুমতি থাকুক বা না থাকুক, আজল করা মাকরূহে তানজিহি (উত্তমতার পরিপন্থী); কারণ নবিজি (সা.) এক বর্ণনায় একে ‘গোপন জীবন্ত দাফন’ (الوائد الخفي) বলেছেন। তবে তা হারাম নয়।
(গ) মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব (অনুমতি ছাড়া হারাম):
ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে— স্বাধীন স্ত্রীর স্পষ্ট অনুমতি ব্যতীত আজল করা সম্পূর্ণ হারাম। কারণ সন্তান লাভের অধিকার স্বামীর যেমন রয়েছে, স্ত্রীরও সমান অধিকার রয়েছে। তবে স্ত্রী অনুমতি দিলে তা নির্বিঘ্নে জায়েজ।

৪. স্ত্রীর অনুমতির শর্ত হওয়ার কারণ ও হিকমত:
শরিয়তের দৃষ্টিতে দাম্পত্য মিলনে স্ত্রীর দুটি অনস্বীকার্য অধিকার রয়েছে:
১. পূর্ণ তৃপ্তি লাভ (قضاء الشهوة): বাইরে বীর্যপাত ঘটালে অনেক সময় স্ত্রীর চরম পুলক ও শারীরিক তৃপ্তি অপূর্ণ থেকে যায়, যা তার প্রতি জুলুমের শামিল।
২. সন্তান লাভের অধিকার (حق الولد): মা হওয়া প্রতিটি নারীর আজন্ম লালিত স্বপ্ন ও প্রাকৃতিক অধিকার। স্বামীর একতরফা সিদ্ধান্তে তাকে মাতৃত্বের স্বাদ থেকে বঞ্চিত করা শরিয়তসম্মত নয়।

৫. আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ:
আজলের ফিকহি মূলনীতির আলোকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অস্থায়ী গর্ভনিরোধক পদ্ধতিসমূহ (যেমন কনডম, পিল ইত্যাদি) পারস্পরিক সম্মতিক্রমে ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার প্রয়োজনে সাময়িকভাবে গ্রহণ করা শরিয়তে জায়েজ। তবে দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান বন্ধ করা বা স্থায়ীভাবে বন্ধ্যাত্বকরণ (Permanent Sterilization) ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম।


١٢- حدثنا سليمان بن داؤد حدثنا شريك عن عاصم بن عبيد الله عن أبيه عن عمر رضى الله عنه قال: رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلّم يمسح على الخُفّين-

[১২. হাদিসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ:]

[১২. আমাদের সুলাইমান ইবনে দাউদ বর্ণনা করেছেন— তিনি বলেন, আমাদেরকে শরিক বর্ণনা করেছেন আসিম ইবনে উবাইদুল্লাহ থেকে, তিনি স্বীয় পিতা থেকে এবং তিনি আমিরুল মুমিনিন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে অজুর সময় স্বীয় উভয় চামড়ার মোজার ওপর মাসেহ করতে স্বচক্ষে দেখেছি।’]

হাদিসের নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের তাহকিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

মূল শব্দ (আরবি) উচ্চারণ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহকিক ও তারকিব) শব্দার্থ (বাংলা)
رَأَيْتُ রা’আইতু فعل ماض مبني على السكون لاتصاله بتاء الفاعل، والتاء ضمير متصل فاعل। বাব فتح। আমি স্বচক্ষে দেখেছি
يَمْسَحُ ইয়ামসাহু فعل مضارع مرفوع بالضمة، والجملة في محل نصب حال من رسول الله বা مفعول ثان। বাব فتح। মাসেহ করছেন
الْخُفَّيْنِ আল-খুফ্ফায়নি اسم مثنى مجرور بعلى وعلامة جره الياء، وهو ساتر القدمين والكعبين من جلد। উভয় মোজার ওপর

(الف) بيّن حكم المسح على الخُفّين مفصّلاً-

[(ক) মোজার ওপর মাসেহ করার শরিয়তের হুকুম বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করো।]

ভূমিকা:
ইসলাম একটি সহজ ও মানবিক জীবনবিধান। ওজরের সময় বা তীব্র শীতে বান্দার কষ্ট লাঘবের জন্য শরিয়ত অজুতে পা ধোয়ার পরিবর্তে মোজার ওপর মাসেহ করার সুবর্ণ অবকাশ ও বিশেষ ছাড় (রুকসত) প্রদান করেছে। প্রায় আশি জন সাহাবি থেকে মোজার ওপর মাসেহের হাদিস মুতাওয়াতির বা মাশহুর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে এর বিশদ হুকুম ও শর্তাবলি আলোচনা করা হলো:

১. মোজার ওপর মাসেহের শরিয়তসম্মত বিধান (حكم المسح على الخفين):
– সুন্নাতে মুতাওয়াতিরাহ ও জায়েজ: মোজার ওপর মাসেহ করা সুন্নাহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত এবং অত্যন্ত বরকতময় একটি আমল।
– আহলুস সুন্নাহর নিদর্শন: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমামগণ মোজার ওপর মাসেহ বিশ্বাস করাকে আহলুস সুন্নাহর অন্যতম আকিদাগত বৈশিষ্ট্য গণ্য করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: ‘যতক্ষণ পর্যন্ত মোজার ওপর মাসেহের ব্যাপারে আমার নিকট দিনের আলোর মতো স্পষ্ট দলিল আসেনি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এর পক্ষে মত দিইনি।’ শিয়া ও খারিজিরা ছাড়া কেউ এই বিধান অস্বীকার করে না।

২. মোজার ওপর মাসেহ শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলি (شروط صحة المسح):
মোজার ওপর মাসেহ সহিহ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পূরণ হতে হবে:
১. পূর্ণ অজু অবস্থায় পরিধান করা: উভয় পা উত্তমরূপে ধৌত করে পূর্ণ পবিত্রতা অর্জনের পরই কেবল মোজা পরিধান করতে হবে।
২. টাখনু আবৃত রাখা: মোজা পায়ের উভয় গোড়ালি ও টাখনুসহ (الكعبين) পূর্ণরূপে ঢেকে রাখতে হবে।
৩. পুরু ও মজবুত হওয়া: মোজা এমন হতে হবে যাতে তা পরিধান করে টানা অন্তত তিন মাইল বা এক ফারসাখ পথ হাঁটা যায় এবং তা ফেটে যায় না বা নিচে খসে পড়ে না।
৪. পানি প্রবেশ না করা: মোজা এমন ঘন ও পানিরোধী হতে হবে যাতে ওপর থেকে পানি পড়লে তা চুইয়ে ভেতরে প্রবেশ না করে।
৫. ছেঁড়াফাটা না থাকা: মোজাতে পায়ের ছোট তিন আঙুল পরিমাণ উন্মুক্ত থাকার মতো বড় কোনো ছিদ্র থাকা যাবে না।

৩. মাসেহের সময়সীমা (مدة المسح):
হজরত আলি (রা.) ও অন্যান্য সাহাবিদের হাদিস অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন:
– মুক্বিম (স্বদেশী বা স্থায়ী বাসিন্দা)-এর জন্য: এক দিন ও এক রাত (২৪ ঘণ্টা)।
– মুসাফির (ভ্রমণকারী)-এর জন্য: তিন দিন ও তিন রাত (৭২ ঘণ্টা)।
সময় গণনার নিয়ম: মোজা পরিধান করার পর থেকে নয়; বরং মোজা পরা অবস্থায় প্রথমবার অজু ভঙ্গ হওয়ার পর থেকে পরবর্তী অজুর সময়সীমা শুরু হয়।

৪. মোজার ওপর মাসেহ ভঙ্গের কারণসমূহ (مبطلات المسح):
১. অজু ভঙ্গের যাবতীয় কারণে মাসেহ ভঙ্গ হয় (তবে পুনরায় মোজার ওপর মাসেহ করলেই চলবে)।
২. গোসল ফরজ হওয়া (যেমন জানাবাত, বীর্যপাত বা ঋতুস্রাব)। গোসল ফরজ হলে মোজা খুলে পুরো শরীর ধৌত করা ফরজ।
৩. মাসেহের নির্ধারিত মেয়াদ (২৪ ঘণ্টা বা ৭২ ঘণ্টা) শেষ হয়ে যাওয়া (এ অবস্থায় শুধু পা ধৌত করে নিলেই হবে, নতুন করে পূর্ণ অজু জরুরি নয়)।
৪. মোজা পা থেকে খুলে ফেলা বা কোনো এক পায়ের অর্ধেকের বেশি অংশ বের হয়ে যাওয়া।

উপসংহার:
আল্লাহর দেওয়া এই রহমতপূর্ণ বিধান মেনে নেওয়া সুন্নাতের অনুসরণ। যথাযথ শর্ত মেনে মোজার ওপর মাসেহ করলে নামাজ নিখুঁত ও পরিপূর্ণভাবে আদায় হয়ে যায়।


مجموعة (د) — সাধারণ প্রশ্নাবলি / ইমামগণের জীবনী, সংকলন পদ্ধতি ও পরিভাষা

[‘ঘ’ বিভাগ: ইমামগণের জীবনচরিত, সংকলন রীতি ও পরিভাষা — পূর্ণমান: ১০ × ২ = ২০]
(যে কোনো দুটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর দাও)

١٣- تحدث عن خصائص الكتاب “مسند الامام أبى حنيفة (رح)” ثم بين خدمات الإمام أبى حنيفة فى نشر الحديث-

[১৩. ‘মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা (রহ.)’ কিতাবের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো, অতঃপর হাদিস প্রচারে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অবদান ব্যাখ্যা করো।]

ভূমিকা:
উম্মতে মুহাম্মদির ফিকহি আকাশে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের প্রধান ফিকহি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইমামুল আযম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.)। তিনি একাধারে ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ ফকিহ এবং উচ্চপর্যায়ের হাফেজে হাদিস ও তাবেয়ি। তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদিসসমূহের ঐতিহাসিক সংকলন ‘মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা’ হাদিস সাহিত্যের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার। নিম্নে এই গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য এবং হাদিস প্রচারে তাঁর কালজয়ী অবদান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ‘মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা’-এর পরিচয় ও সংকলন ইতিহাস:
– সংকলন পদ্ধতি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) স্বহস্তে ‘মুসনাদ’ নামে কোনো স্বতন্ত্র গ্রন্থ তৈরি করে যাননি। বরং তিনি তাঁর দরস ও ফতোয়া বোর্ডের সামনে যেসব হাদিস বর্ণনা করেছিলেন, তাঁর প্রখ্যাত শাগরেদগণ তা নির্ভরযোগ্য সনদে লিখে সংরক্ষণ করেছিলেন।
– মাসানিদের বহুত্ব: বিভিন্ন শাগরেদ কর্তৃক তাঁর সূত্রে বর্ণিত প্রায় ১৫টি পৃথক ‘মুসনাদ’ ইতিহাসে সংরক্ষিত রয়েছে। যেমন: ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর রেওয়ায়েত, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী (রহ.)-এর কিতাবুল আসার, ইমাম হাসান ইবনে জিয়াদ (রহ.)-এর মুসনাদ, ইমাম হাম্মাদ ইবনে আবি হানিফা (রহ.)-এর মুসনাদ এবং হাফেজ আবু নুআঈম আল-ইস্পাহানী (রহ.)-এর মুসনাদ ইত্যাদি।
– জামেউল মাসানিদ সংকলন: সপ্তম হিজরি শতকে প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা আবুল মুআইয়্যাদ মুহাম্মদ ইবনে মাহমুদ আল-খাওয়ারিজমি (রহ.) ইমাম আবু হানিফার সূত্রে বর্ণিত ১৫টি প্রাচীন মুসনাদকে একত্র করে ‘জামেউল মাসানিদ লির রিজালিল ইমামিল আযম’ (جامع المسانيد) নামে একটি সুবিশাল ও বিশ্বকোষীয় গ্রন্থ সংকলন করেন।

২. ‘মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص الكتاب):
১. আলিয়্যুল ইসনাদ বা উচ্চ স্তরের সনদ (العلو في الإسناد): যেহেতু ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন একজন সম্মানিত তাবেয়ি, তাই তাঁর বর্ণিত হাদিসসমূহের সনদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও নিকটবর্তী। তাঁর মুসনাদে বহু ‘সুলাসিয়াত’ (রাসুল ও তাঁর মাঝে মাত্র তিনজন বর্ণনাকারী) এবং ‘রুবাঈয়াত’ হাদিস বিদ্যমান।
২. ফিকহি অধ্যায়ভিত্তিক চমৎকার বিন্যাস: সাধারণ মুসনাদ গ্রন্থগুলো সাহাবিদের নাম অনুযায়ী সাজানো হলেও মুসনাদে আবি হানিফা মূলত ফিকহি আহকাম ও অধ্যায় (যেমন তাহারাত, সালাত, জাকাত, সিয়াম, হজ, বুয়ূ’ ইত্যাদি) অনুযায়ী সাজানো, যা ফকিহ ও গবেষকদের জন্য রেফারেন্স বের করা অত্যন্ত সহজসাধ্য করে তোলে।
৩. রাবি নির্বাচনে চরম সতর্কতা ও কঠোর শর্ত: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যান্য মুহাদ্দিসিনের তুলনায় অধিক কঠোর ছিলেন। তিনি শর্তারোপ করতেন যে, বর্ণনাকারীকে হাদিস শ্রবণ করার মুহূর্ত থেকে বর্ণনা করা পর্যন্ত সর্বদা মুখস্থ ও সংরক্ষণে রাখতে হবে (الحفظ من حين السماع إلى حين الأداء)।
৪. আহকাম ও আমলযোগ্য হাদিসের প্রাধান্য: এই গ্রন্থে মনগড়া বা দুর্বল কিচ্ছা-কাহিনী নেই; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের হালাল-হারাম ও ব্যবহারিক বিধানের সাথে সংশ্লিষ্ট ‘আহকামুল হাদিস’ স্থান পেয়েছে।
৫. মারফু ও আসারুস সাহাবার মেলবন্ধন: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণীর পাশাপাশি কূফা ও মদিনার শীর্ষ সাহাবিদের (যেমন হজরত আলি ও ইবনে মাসউদ রা.) ফতোয়া ও আমলের নিখুঁত সমন্বয় রয়েছে।

৩. হাদিস প্রচারে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অসামান্য অবদান (خدماته في نشر الحديث):
ইতিহাসের কিছু পক্ষপাতদুষ্ট সমালোচক প্রচার করতে চেয়েছিল যে ইমাম আবু হানিফা কেবল কিয়াস বা যুক্তিবাদী ছিলেন, যা ঐতিহাসিক সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। হাদিস প্রচারে তাঁর সোনালী অবদানসমূহ:
১. হাদিস শিক্ষাদানের আন্তর্জাতিক মজলিস: কূফার জামে মসজিদে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর দরসে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সেরা ছাত্ররা সমবেত হতো। তিনি সেখানে সহস্রাধিক হাদিসের পাঠ ও তাহকিক পেশ করতেন।
২. ফিকহি একাডেমি গঠন ও হাদিসের প্রয়োগ: তিনি তাঁর ৪০ জন বিজ্ঞ শিষ্যের সমন্বয়ে একটি ফিকহ বোর্ড গঠন করেছিলেন। কোনো মাসআলা সমাধানের পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সমস্ত হাদিস পেশ করা হতো এবং গভীর পর্যালোচনার পর হাদিসের আলোকে ফতোয়া লিপিবদ্ধ হতো।
৩. কূফায় বিশুদ্ধ সুন্নাহর অতন্দ্র পাহারা: কূফা শহর যখন শিয়া ও খারিজিদের নানাবিধ রাজনৈতিক মতবাদে জর্জরিত ছিল, তখন ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সুন্নাহর অবিচল প্রচারক হিসেবে উম্মাহকে আহলুস সুন্নাহর সহিহ পথে অবিচল রাখেন।
৪. বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস ছাত্র তৈরি: হাদিস শাস্ত্রের অমর রত্ন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ওয়াকী ইবনুল জাররাহ, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান, হাফস ইবনে গিয়াস প্রমুখ ইমাম আবু হানিফার প্রত্যক্ষ শাগরেদ ছিলেন এবং তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।

উপসংহার:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কেবল ফিকহের ইমাম ছিলেন না, বরং হাদিস বিজ্ঞানেরও এক অগ্রদূত ছিলেন। তাঁর মুসনাদ আজও বিশ্বজুড়ে ফিকহ ও হাদিসের সুষম মিলনের জীবন্ত দলিল হিসেবে সমাদৃত।


١٤- اكتب نبذة من حياة الامام الشافعى (رح) ثم اذكر مزايا مسنده ورتبته-

[১৪. ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লেখো, অতঃপর তাঁর মুসনাদের বৈশিষ্ট্য ও এর মর্যাদা উল্লেখ করো।]

ভূমিকা:
উম্মতে মুহাম্মদির দ্বিতীয় শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, চার প্রসিদ্ধ ফিকহি মাযহাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং উসুলুল ফিকহ শাস্ত্রের প্রথম প্রণেতা হলেন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস আশ-শাফিয়ী (রহ.)। তিনি হাদিস ও ফিকহের এক অপূর্ব সমন্বয়কারী ছিলেন। নিচে তাঁর পুণ্যময় জীবনচরিত এবং তাঁর অমর হাদিস সংকলন ‘মুসনাদুশ শাফিয়ী’-এর বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা আলোচনা করা হলো:

১. ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত:
– নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর নাম মুহাম্মদ, কুনিয়াত ‘আবু আব্দুল্লাহ’। তাঁর পূর্ণ বংশলতিকা: মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস ইবনুল আব্বাস ইবনে উসমান ইবনে শাফে’ আল-কুরাইশি আল-মুত্তালিবি। তাঁর বংশ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রপিতামহ আব্দে মান্নাফের বংশধর ‘আল-মুত্তালিব’-এ গিয়ে নবিজির বংশের সাথে মিলিত হয়েছে।
– জন্ম ও বাল্যকাল: ১৫০ হিজরিতে (যে বছর ইমাম আবু হানিফা রহ. ইন্তেকাল করেন) ফিলিস্তিনের গাজ্জায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তাঁর পিতা মারা যান। দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়ে তিনি মাত্র সাত বছর বয়সে সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেন এবং দশ বছর বয়সে ইমাম মালিকের ‘মুওয়াত্তা’ কণ্ঠস্থ করেন।
– ইলমি সফর ও উস্তাদবৃন্দ: মক্কায় তিনি মুফতি মুসলিম ইবনে খালিদ আজ-জানজি ও সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নার নিকট হাদিস ও ফিকহ শেখেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি ফতোয়া দেওয়ার অনুমতি লাভ করেন। এরপর মদিনায় গিয়ে ইমাম মালিক (রহ.)-এর দীর্ঘ সান্নিধ্য অর্জন করেন। পরবর্তীতে ইয়েমেন, বাগদাদ এবং মিশরে ইলমি দায়িত্ব পালন করেন।
– রচনাবলী ও অবদান: তিনি ছিলেন উসুলুল ফিকহ শাস্ত্রের জনক। তাঁর বিখ্যাত ‘আর-রিসালাহ’ উসুলুল ফিকহের সর্বপ্রথম লিখিত গ্রন্থ। এছাড়া তাঁর সুবিশাল ফিকহি গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্ম’ শাফিয়ী মাযহাবের প্রধান উৎস। তিনি সুন্নাহর পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরে ‘নাসিরুস সুন্নাহ’ (সুন্নাহর সাহায্যকারী) উপাধিতে ভূষিত হন।
– ওফাত: ২০৪ হিজরির রজব মাসের শেষ জুমার রাতে ৫৪ বছর বয়সে মিশরের কায়রোতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

২. ‘মুসনাদুশ শাফিয়ী’-এর সংকলন পদ্ধতি ও পরিচয়:
ইমাম শাফিয়ী (রহ.) স্বতন্ত্র কোনো হাদিসগ্রন্থ ‘মুসনাদ’ শিরোনামে রচনা করেননি। বরং তাঁর বিশ্বস্ত শাগরেদ ও রাবিদের একজন—প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আবু আমর মুহাম্মদ ইবনে জাফর আল-হাদলিবী আল-আস্সাম (الربيع بن سليمان والمرادي এর রেওয়ায়েত সূত্রে) ইমাম শাফিয়ীর ‘কিতাবুল উম্ম’, ‘আর-রিসালাহ’, ‘আল-আমালী’ ও ‘ইখতিলাফুল হাদিস’ গ্রন্থে উল্লেখিত হাদিসসমূহকে একত্র করে এই কিতাবের রূপ দেন।

৩. মুসনাদুশ শাফিয়ীর বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্যসমূহ (مزايا مسنده):
১. স্বর্ণালী সনদের সমাহার (سلسلة الذهب): এই গ্রন্থে ইমাম শাফিয়ীর সূত্রে ইমাম মালিক থেকে বর্ণিত বহু হাদিস রয়েছে, যার সনদ: (الشافعي عن مالك عن نافع عن ابن عمر)—মুহাদ্দিসিনের সর্বসম্মত মতে এটি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিশুদ্ধতম সনদ ‘সিলসিলাতুয যাহাব’।
২. উচ্চতম বিশুদ্ধতার মান: ইমাম শাফিয়ী হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তিনি কেবল ন্যায়পরায়ণ, স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন ও বিশ্বস্ত রাবি থেকেই হাদিস বর্ণনা করতেন।
৩. ফিকহি আহকামের দলিলভিত্তিক সমন্বয়: গ্রন্থের প্রতিটি হাদিস কোনো না কোনো মৌলিক ফিকহি মাসআলার প্রত্যক্ষ দলিল হিসেবে উপস্থাপিত।
৪. সাহাবা ও তাবেয়িনের আসার: মারফু হাদিসের পাশাপাশি সাহাবি ও তাবেয়িদের মূল্যবান ফতোয়া ও আসার এতে সংকলিত হয়েছে।

৪. হাদিস শাস্ত্রে মুসনাদুশ শাফিয়ীর মর্যাদা (رتبته في كتب الحديث):
হাদিস শাস্ত্রের গ্রন্থপরম্পরায় মুসনাদুশ শাফিয়ীর স্থান অত্যন্ত উচ্চে। সিহাহ সিত্তাহ সংকলনের পূর্ববর্তী যুগের সংকলনগুলোর মধ্যে এটি শীর্ষ সারির একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.) হাদিসগ্রন্থের স্তরবিন্যাসে ইমাম শাফিয়ীর হাদিসসমূহকে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের অত্যন্ত সহিহ ও বিশুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছেন।


١٥- اكتب نبذة من حياة الإمام احمد بن حنبل (رح) ثم تحدث عن خدماته فى علم الحديث-

[১৫. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লেখো, অতঃপর হাদিস শাস্ত্রে তাঁর বহুমুখী খেদমত ও অবদান আলোচনা করো।]

ভূমিকা:
আহলুস সুন্নাহর আপসহীন সিপাহসালার, ইমামু দারিস সালাম ও হাম্বলি মাযহাবের সম্মানিত ইমাম হলেন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আশ-শাইবানী (রহ.)। তিনি হাদিস মুখস্থ, সংরক্ষণ, যাচাই-বাছাই ও সংকলনে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। নিচে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও হাদিস শাস্ত্রে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান তুলে ধরা হলো:

১. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত:
– নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর নাম আহমদ, পিতা মুহাম্মদ, পিতামহ হাম্বল। কুনিয়াত ‘আবু আব্দুল্লাহ’। তিনি শাইবানী গোত্রের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন।
– জন্ম ও শৈশব: ১৬৪ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে তৎকালীন খিলাফতের রাজধানী বাগদাদে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন বীর সৈনিক, যিনি তাঁর শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। মাতার স্নেহছায়ায় তিনি কঠোর সাধনায় বড় হন।
– জ্ঞানার্জন ও ঐতিহাসিক সফর: প্রথমে বাগদাদে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি হাদিস অন্বেষণে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র সফর করেন। তিনি পায়ে হেঁটে কুফা, বসরা, মক্কা, মদিনা, ইয়েমেন, সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়া সফর করেন। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুর রাজ্জাক সানআনীর নিকট হাদিস শুনতে তিনি দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে ইয়েমেনে গমন করেন।
– ফিতনায়ে খালকিল কুরআন ও আপসহীনতা: খলিফা আল-মামুন, মুতাসিম ও ওয়াসিক বিল্লাহর আমলে মুতাজিলাদের চাপিয়ে দেওয়া ভ্রান্ত আকিদা ‘কুরআন সৃষ্টি’ মানতে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করেন। তাঁকে দীর্ঘকাল অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রাখা হয় এবং জল্লাদ দিয়ে নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করা হয়। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেন: ‘আল্লাহর কুরআন আল্লাহর কালাম, তা অবিনশ্বর ও অসৃষ্ট।’ তাঁর এই নির্ভীক দৃঢ়তার কারণেই আজ আহলুস সুন্নাহর সহিহ আকিদা টিকে রয়েছে। এজন্য তাঁকে ‘ইমামু আহলিস সুন্নাহ’ বলা হয়।
– ওফাত: ২৪১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল ৭৭ বছর বয়সে বাগদাদে এই মহান ইমাম ওফাত লাভ করেন। তাঁর জানাজায় প্রায় আট লক্ষাধিক মানুষ শরিক হয়েছিল।

২. হাদিস শাস্ত্রে ইমাম আহমদ (রহ.)-এর বহুমুখী খেদমত ও অবদান:
হাদিস শাস্ত্রের সুরক্ষায় ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর খেদমত অতুলনীয়:
১. বিশাল সংকলন ‘আল-মুসনাদ’ প্রণয়ন: তিনি তাঁর অমর গ্রন্থ ‘মুসনাদে আহমদ’ সংকলন করেন। তিনি প্রায় সাত লক্ষাধিক হাদিস থেকে অত্যন্ত যাচাই-বাছাই করে প্রায় ত্রিশ হাজার (পুনরাবৃত্তিসহ প্রায় চল্লিশ হাজার) হাদিস সংকলন করেন। এটি হাদিস ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম বিশ্বকোষ।
২. বিপুল হাদিস কণ্ঠস্থকরণ: ইমাম আবু জুরআ আর-রাজি বলেন: ‘ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল দশ লক্ষ হাদিস তাঁর স্মৃতিতে মুখস্থ রেখেছিলেন।’
৩. ইলমুল ইলাল ও রিজাল শাস্ত্রে পারদর্শিতা: হাদিসের সূক্ষ্ম ত্রুটি নির্ণয় এবং বর্ণনাকারীদের সততা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ে তিনি ছিলেন অনন্য পণ্ডিত। তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ইলাল ওয়া মা’রিফাতির রিজাল’ এবং ‘কিতাবুয যুহদ’ হাদিস শাস্ত্রের অমূল্য সম্পদ।
৪. সিহাহ সিত্তাহর ইমামগণের মহান উস্তাদ: হাদিস শাস্ত্রের অবিসংবাদিত ইমামগণ তাঁর ছাত্র ছিলেন। ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিজি, ইমাম নাসাঈ প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসিন তাঁর দরসে বসে হাদিস গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের গ্রন্থে তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৫. সুন্নাহর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি: তিনি এমন কোনো হাদিস শুনতেন না যার ওপর নিজে একবার হলেও আমল করতেন না। এমনকি রাসুল (সা.) এক দিনার দিয়ে শিঙ্গা লাগিয়েছিলেন শুনে তিনিও তা আমল করেছিলেন।

উপসংহার:
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ছিলেন হাদিস শাস্ত্রের এক সুউচ্চ পর্বত। তাঁর ত্যাগ, হাদিস সংরক্ষণ এবং সুন্নাহর ওপর অটলতা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহর পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।


١٦- علّق على المصطلحات التالية (اثنين فقط) :

(الف) الجامع ؛ (ب) السنن ؛ (ج) المسند ؛ (د) الصحيح-

[১৬. নিম্নলিখিত পরিভাষাগুলোর ওপর টীকা লেখো (যে কোনো দুটি): (ক) আল-জামে; (খ) আস-সুনান; (গ) আল-মুসনাদ; (ঘ) আস-সহিহ।]

(পরীক্ষায় যে কোনো দুটি চাওয়া হলেও পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির স্বার্থে চারটি পরিভাষারই চমৎকার ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:)

(ক) আল-জামে (الجامع):
– আভিধানিক অর্থ: ‘জামে’ শব্দটি جمع ধাতু থেকে اسم فاعل-এর রূপ। এর আভিধানিক অর্থ একত্রকারী, সমাহারকারী বা সর্বব্যাপী।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় যে গ্রন্থে দ্বীনের সমস্ত মৌলিক শাখা ও বিষয়ের হাদিসসমূহ পূর্ণাঙ্গভাবে অধ্যায়ভিত্তিক সংকলিত হয়, তাকে ‘আল-জামে’ বলা হয়।
– জামির ৮টি মৌলিক বিষয় (أبواب الجامع الثمانية): একটি কিতাব ‘জামে’ হতে হলে তাতে দ্বীনের মৌলিক ৮টি বিষয়ের হাদিস অবশ্যই থাকতে হবে:
১. العقائد (আকিদা ও বিশ্বাস): তাওহিদ, রিসালাত, মালাইকা ও আখিরাত।
২. الأحكام (শরিয়তের বিধান): তাহারাত, সালাত, সাওম, হজ, মুয়ামালাত ইত্যাদি।
৩. السير والمغازي (সিরাত ও ইতিহাস): নবিজির জীবন ও যুদ্ধসমূহ।
৪. الآداب (আদব ও শিষ্টাচার): পানাহার, পোশাক ও সামাজিক শিষ্টাচার।
৫. التفسير (কুরআনের তাফসির): বিভিন্ন আয়াতের শানে নুযুল ও ব্যাখ্যা।
৬. الزهد والرقائق (যুহদ ও আধ্যাত্মিকতা): দুনিয়াবিমুখতা ও অন্তরের পবিত্রতা।
৭. الفتن وأشراط الساعة (ফিতনা ও কিয়ামতের আলামত): শেষ যামানার বিপর্যয়।
৮. المناقب والمثالب (সাহাবা ও জাতির মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য)।
– প্রসিদ্ধ উদাহরণ: ১. সহিহুল বুখারি (যার মূল নাম: الجامع المسند الصحيح المختصر), ২. জামিউত তিরমিজি।

(খ) আস-সুনান (السنن):
– আভিধানিক অর্থ: ‘সুনান’ শব্দটি سنة (সুন্নাত)-এর বহুবচন। এর অর্থ চলার পথ, নিয়ম, আদর্শ বা শরিয়তের রীতি।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় যে কিতাবে কেবল শরিয়তের বাস্তব আমলি ও ফিকহি বিধান সম্পর্কিত হাদিসসমূহ ফিকহের তারতিব (যেমন তাহারাত, সালাত, জাকাত, সিয়াম, হজ, নিকাহ, তলাক, বুয়ূ’ ইত্যাদি) অনুযায়ী সংকলন করা হয়, তাকে ‘আস-সুনান’ বলা হয়। এতে সাধারণত আকিদা, ইতিহাস বা কিয়ামতের আলামতের মতো অধ্যায় থাকে না।
– প্রসিদ্ধ উদাহরণ: সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে তিরমিজি (সুনান হিসেবেও গণ্য), সুনানে ইবনে মাজাহ এবং সুনানে আদ-দারিমী।

(গ) আল-মুসনাদ (المسند):
– আভিধানিক অর্থ: ‘মুসনাদ’ শব্দটি سند ধাতু থেকে اسم مفعول-এর রূপ। এর অর্থ সম্পর্কিত, ঠেস দেওয়া বা সনদযুক্ত গ্রন্থ।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: হাদিস সংকলনের এমন একটি পদ্ধতি, যাতে বিষয়ভিত্তিক বা ফিকহি অধ্যায় অনুযায়ী হাদিস সাজানো হয় না; বরং প্রত্যেক সাহাবির নাম অনুযায়ী তাঁর বর্ণিত সমস্ত হাদিস (তা যে বিষয়েরই হোক না কেন) একত্রে এক স্থানে সংকলন করা হয়।
– বিন্যাস পদ্ধতি: প্রথমে আশারায়ে মুবাশশারাহ (১০ জন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি), এরপর বদরি সাহাবি, অতঃপর ক্রমান্বয়ে আনসার, মুহাজির, মক্কার সাহাবি, কূফার সাহাবি এবং সর্বশেষে মহিলা সাহাবিদের বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করা হয়।
– প্রসিদ্ধ উদাহরণ: মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল, মুসনাদে আবু দাউদ আত-তায়ালিসি, মুসনাদে বাযযার এবং মুসনাদু আবি হানিফা।

(ঘ) আস-সহিহ (الصحيح):
– আভিধানিক অর্থ: ‘সহিহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নিখুঁত, সুস্থ, রোগমুক্ত বা খাঁটি।
– পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে হাদিস গ্রন্থে লেখক কেবল মুহাদ্দিসিনের পরিভাষায় উত্তীর্ণ ‘সহিহ’ বা বিশুদ্ধ হাদিসসমূহ সংকলন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন এবং কোনো দুর্বল বা জাল হাদিস স্থান দেননি, তাকে ‘আস-সহিহ’ বলা হয়।
– হাদিস সহিহ হওয়ার ৫টি শর্ত:
১. اتصال السند (সনদের অবিচ্ছিন্নতা): প্রথম বর্ণনাকারী থেকে রাসুল (সা.) পর্যন্ত প্রত্যেক রাবি পূর্ববর্তী রাবি থেকে সরাসরি শ্রবণ করেছেন।
২. عدالة الرواة (রাবিগণের ন্যায়পরায়ণতা): রাবি মুত্তাকি ও পাপাচারমুক্ত হবেন।
৩. ضبط الرواة (রাবিগণের স্মৃতিশক্তি ও সংরক্ষণের পূর্ণতা): বর্ণনাকারী পূর্ণ স্মৃতিধর হবেন।
৪. عدم الشذوذ (শায বা নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বিপরীত না হওয়া): অধিক নির্ভরযোগ্য রাবির বর্ণনার বিপরীত হবে না।
৫. عدم العلة القادحة (সূক্ষ্ম ক্ষতিকর ত্রুটিমুক্ত হওয়া): সনদে বা মতনে কোনো গোপন ত্রুটি থাকবে না।
– প্রসিদ্ধ উদাহরণ: সহিহুল বুখারি, সহিহ মুসলিম, সহিহ ইবনে খুজায়মাহ এবং সহিহ ইবনে হিব্বান।


সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও বিভাগভিত্তিক মানবণ্টন সারসংক্ষেপ

বিভাগ বিষয়বস্তু ও কিতাব প্রশ্ন সংখ্যা উত্তরদানের শর্ত প্রতি প্রশ্নের মান মোট নম্বর
مجموعة (الف) [ক বিভাগ] মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা (রহ.) ৪টি (১ থেকে ৪) যে কোনো ২টি ১০ (অনুবাদ ৬ + ব্যাখ্যা ৪) ২০
مجموعة (ب) [খ বিভাগ] মুসনাদুল ইমাম আশ-শাফিয়ী (রহ.) ৪টি (৫ থেকে ৮) যে কোনো ২টি ১০ (অনুবাদ ৬ + ব্যাখ্যা ৪) ২০
مجموعة (ج) [গ বিভাগ] মুসনাদুল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ৪টি (৯ থেকে ১২) যে কোনো ২টি ১০ (অনুবাদ ৬ + ব্যাখ্যা ৪) ২০
مجموعة (د) [ঘ বিভাগ] ইমামগণের জীবনচরিত, সংকলন রীতি ও হাদিস পরিভাষা ৪টি (১৩ থেকে ১৬) যে কোনো ২টি ১০ ২০
সর্বমোট ১৬টি প্রশ্ন ৮টি প্রশ্ন ১০ × ৮ ৮০ নম্বর

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ফাজিল ৪র্থ বর্ষের ‘আল-মুসনাদ লি আবি হানিফা ওয়া আশ-শাফিয়ী ওয়া আহমাদ’ পরীক্ষার মানবণ্টন ও প্রশ্নের কাঠামো কেমন?
উত্তর: এ পরীক্ষার পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং সময় ৪ ঘণ্টা। প্রশ্নপত্রে মোট ৪টি বিভাগ থাকে: ‘ক’ বিভাগ (মুসনাদে আবি হানিফা), ‘খ’ বিভাগ (মুসনাদে শাফিয়ী), ‘গ’ বিভাগ (মুসনাদে আহমদ) এবং ‘ঘ’ বিভাগ (ইমামগণের জীবনী ও হাদিস পরিভাষা)। প্রথম তিনটি বিভাগে ৪টি করে হাদিস ও সংশ্লিষ্ট ফিকহি প্রশ্ন থাকে (অনুবাদ ৬ + ব্যাখ্যা ৪ = ১০)। ‘ঘ’ বিভাগে ৪টি তাত্ত্বিক প্রশ্ন থাকে। প্রতিটি বিভাগ থেকে আবশ্যিকভাবে ২টি করে মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় (৮ × ১০ = ৮০ নম্বর)।

প্রশ্ন ২: হাদিসের অনুবাদ ও তাহকিক অংশে পূর্ণ নম্বর পাওয়ার কার্যকর কৌশল কী?
উত্তর: হাদিসের ৬ নম্বরের অনুবাদে পূর্ণ নম্বর পেতে হলে প্রথমে সহিহ ও সাবলীল বাংলা অনুবাদ উপস্থাপন করতে হবে। এরপর হাদিসের নির্বাচিত কঠিন শব্দগুলোর ব্যাকরণিক তাহকিক (সীগাহ, বাহাস, বাব, মূলধাতু বা তারকিব) ছক বা টেবিল আকারে লিখে অর্থ প্রদান করলে পরীক্ষক অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং শতভাগ নম্বর প্রদান করেন।

প্রশ্ন ৩: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে কি ইমান হ্রাস-বৃদ্ধি পায়?
উত্তর: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে ইমানের মূল সত্তা ও তাসদিক (বিশ্বাস) হ্রাস বা বৃদ্ধি পায় না; কারণ বিশ্বাস কম-বেশি হলে তা সন্দেহে রূপ নেয়। তবে নেক আমল ও তাকওয়ার দ্বারা ইমানের নূর, জ্যোতি ও পূর্ণতা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে জমহুর মুহাদ্দিসিনের মতে আমল ইমানের অংশ হওয়ায় আমল বৃদ্ধির সাথে সাথে ইমান বৃদ্ধি পায় এবং পাপে হ্রাস পায়।

প্রশ্ন ৪: জুমার খুতবা চলাকালে সাধারণ মুসল্লিদের কথা বলার বিধান কী?
উত্তর: হানাফি মাযহাব মতে খুতবা চলাকালে যে কোনো কথা বলা, এমনকি সালামের উত্তর বা হাঁচির জবাব দেওয়াও মাকরূহে তাহরিমি। মালিকি ও হাম্বলি মতে খুতবা শোনা অবস্থায় কথা বলা হারাম। শাফিয়ী মতে মাকরূহে তানজিহি। হাদিস অনুযায়ী খুতবারত অবস্থায় কাউকে ‘চুপ করো’ বলাও অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য, যা জুমার সওয়াব বিনষ্ট করে।

প্রশ্ন ৫: আল-জামে এবং আস-সুনান কিতাবের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
উত্তর: ‘আল-জামে’ গ্রন্থে দ্বীনের সমস্ত মৌলিক ৮টি শাখার (আকিদা, আহকাম, সিরাত, আদব, তাফসির, যুহদ, ফিতান ও মানাক্বিব) হাদিস সংকলিত থাকে (যেমন সহিহ বুখারি)। পক্ষান্তরে, ‘আস-সুনান’ গ্রন্থে কেবল শরিয়তের ফিকহি আহকাম ও হালাল-হারাম সংক্রান্ত হাদিসগুলো ফিকহি অধ্যায় অনুযায়ী বিন্যস্ত থাকে (যেমন সুনানে আবু দাউদ বা সুনানে নাসাঈ)।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜