জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তাসাওউফ (At-Tasawwuf) – ২০২৮০৪, আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
১৫১ মিনিট পড়ার সময়
১৬ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২৩
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
التصوف
[আত-তাসাওউফ]
বিষয় কোড: ২০২৮০৪
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময়— ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান— ৮০]
[الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)-]
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ হতে ৪টি এবং (খ) বিভাগ হতে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (الف) (ক বিভাগ)

الدرجات — ١٥×٤ = ٦٠


١- عرف التصوف ثم بين مشروعيته ونشأته وتطوره-

[১. তাসাওউফ এর পরিচয় দাও। অতঃপর এর শরয়ি বিধান, উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তের বাহ্যিক বিধানাবলি যেমন দেহ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমলকে নিয়ন্ত্রিত করে, তেমনি তাসাওউফ মানুষের অভ্যন্তরীণ সত্তা, ক্বলব ও রুহের পরিশুদ্ধি বিধান করে। তাসাওউফ হলো মূলত ইসলামের ‘ইহসান’ (الإحسان) স্তরের বাস্তবায়ন এবং কুরআন মাজীদে নির্দেশিত আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়া (التزكية)-এর বিজ্ঞান। ইমাম জুনায়দ বাগদাদী (রহ.) বলেন, তাসাওউফ হলো আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে শরীয়তের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুবর্তী হওয়া। নিচে তাসাওউফের বিস্তারিত পরিচয়, শরয়ি বৈধতা, উৎপত্তি এবং ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ একাডেমিক আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হলো।

তাসাওউফের আভিধানিক পরিচয় ও ব্যুৎপত্তি

ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ‘তাসাওউফ’ (التصوف) শব্দটি কোন্ মূলধাতু থেকে উৎসারিত, এ বিষয়ে ভাষাবিদ ও মুফাসসিরীনদের মধ্যে কয়েকটি প্রসিদ্ধ অভিমত রয়েছে:

  1. সুফ (الصوف) শব্দ থেকে: এর অর্থ পশম বা উল। প্রাচীনকালের নবী-রাসূল ও সালেহীনগণ পার্থিব বিলাসিতা পরিহারের নিদর্শন হিসেবে অমসৃণ পশমি বস্ত্র পরিধান করতেন। আল্লামা ইবনে খালদুন ও ইমাম কুশায়রী (রহ.)-এর মতে এ মতটিই ভাষাগত দিক থেকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।
  2. সাফা (الصفاء) শব্দ থেকে: এর অর্থ পবিত্রতা, স্বচ্ছতা ও নির্মলতা। অর্থাৎ যারা স্বীয় অন্তরকে রিয়া, হাসাদ ও দুনিয়ার আসক্তি থেকে মুক্ত করে আল্লাহর ভালোবাসায় পবিত্র করেছেন। বাশার আল-হাফী (রহ.) বলেন, “সূফী হলেন তিনি, যাঁর অন্তর আল্লাহর জন্য সম্পূর্ণরূপে সাফ ও নিষ্কলুষ হয়ে গেছে।”
  3. আসহাবুস্ সুফফা (أصحاب الصفة) থেকে: মসজিদে নববীর উত্তর পাশে উন্মুক্ত ছাউনিতে বসবাসকারী নিঃস্ব ও জ্ঞানপিপাসু সাহাবায়ে কিরামের দলের সাথে তাঁদের জীবনচরিত্রের সামঞ্জস্য থাকায় সূফী বলা হয়।
  4. সুফফাহ বা কাতার (الصف الأول) থেকে: এর অর্থ প্রথম কাতার। সূফীগণ আত্মোৎসর্গ ও আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনে প্রথম কাতারের ন্যায় অগ্রগামী থাকেন বিধায় তাঁদের এ নাম দেওয়া হয়েছে।

তাসাওউফের পারিভাষিক সংজ্ঞা

ইসলামের প্রখ্যাত গবেষক ও সূফী-সাধকগণ তাসাওউফের বিভিন্ন তাৎপর্যবহ পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রদান করেছেন:

  • ইমাম জুনায়দ আল-বাগদাদী (রহ.):

    «التَّصَوُّفُ أَنْ يُمِيتَكَ الحَقُّ عَنْكَ، وَيُحْيِيَكَ بِهِ»

    অনুবাদ: “তাসাওউফ হলো— আল্লাহ তায়ালা তোমাকে তোমার নফস ও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মৃত্যু দান করবেন এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও স্মরণের মাধ্যমে তোমাকে পুনরুজ্জীবিত করবেন।” (তারীখে বাগদাদ)

  • ইমাম আবু মুহাম্মদ আল-জারীরী (রহ.):

    «التَّصَوُّفُ الدُّخُولُ فِي كُلِّ خُلُقٍ سَنِيٍّ، وَالخُرُوجُ مِنْ كُلِّ خُلُقٍ دَنِيٍّ»

    অনুবাদ: “তাসাওউফ হলো প্রতিটি মহৎ ও প্রশংসনীয় চরিত্রে প্রবেশ করা এবং প্রতিটি হীন ও নিন্দনীয় চরিত্র থেকে বের হয়ে আসা।” (আর-রিসালাহ আল-কুশায়রিয়্যাহ)

  • হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আল-গাযালী (রহ.):

    তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-মুনকিযু মিনাদ দালাল’-এ উল্লেখ করেন, তাসাওউফ হলো অন্তর থেকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর আসক্তি দূর করে কেবল আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হওয়া এবং ক্বলবকে আল্লাহর যিকিরে মগ্ন রাখা।

  • শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.):

    তাঁর মতে, তাসাওউফ কোনো বাক্যবাগীশিতা বা বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়; বরং তাসাওউফ হলো ক্ষুধা, বিনয়, নির্জনতা ও আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা।

তাসাওউফের শরয়ি বিধান ও প্রামাণিকতা (مشروعيته)

তাসাওউফ কোনো বিদয়াত বা মনগড়া মতবাদ নয়; বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নির্দেশনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। আল-কুরআন ও সহীহ হাদীস থেকে এর শরয়ি ভিত্তি অকাট্যভাবে প্রমাণিত:

উৎস আরবি পাঠ অনুবাদ ও শিক্ষণীয়
সূরা আশ-শামস: ৯-১০ ﴿قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا ۝ وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا﴾ “নিশ্চয় সে-ই সফলকাম হয়েছে, যে তার নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তা কলুষিত করেছে।” — আত্মশুদ্ধির অপরিহার্যতার দলিল।
সূরা আল-আ’লা: ১৪ ﴿قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ ۝ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ﴾ “নিশ্চয় সে সাফল্য লাভ করল, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল এবং স্বীয় রবের নাম স্মরণ করল ও সালাত কায়েম করল।”
হাদীসে জিবরীল (সহীহ মুসলিম: ৮) «قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِحْسَانِ، قَالَ: أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ» “তিনি বললেন: আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে তিনি নিশ্চয় তোমাকে দেখছেন।” — তাসাওউফের মূল স্তম্ভ হলো এই ইহসান।
সহীহ বুখারী (হাদীসে কুদসী: ৬৫০২) «وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ…» “আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে ক্রমাগত আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি…” — আল্লাহর নৈকট্য ও বেলায়েত লাভের মূল পথ।

তাসাওউফের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره)

তাসাওউফের সূচনা হঠাৎ করে ঘটেনি; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি সুসংগঠিত শাস্ত্রীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে। ঐতিহাসিক বিবর্তনের প্রধান পাঁচটি স্তর নিম্নরূপ:

  1. প্রথম যুগ: নবুওয়াত ও সাহাবায়ে কিরামের যুগ (হিযরত থেকে ১ম হিজরি শতাব্দী):

    রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনাদর্শই ছিল তাসাওউফের প্রত্যক্ষ উৎস। তিনি হেরা গুহায় তাহান্নুছ (একাকী ধ্যানমগ্নতা) করতেন এবং যাপিত জীবনে চরম যুহদ ও কৃচ্ছ্রসাধনা বজায় রাখতেন। আসহাবুস্ সুফফা (رضي الله عنهم) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনসহ শীর্ষ সাহাবীগণ ছিলেন আত্মশুদ্ধির সর্বোত্তম প্রতীক। তখন ‘তাসাওউফ’ নামের কোনো পরিভাষার প্রয়োজন ছিল না, কারণ ইসলামের পূর্ণ রূপই ছিল তাসাওউফ ও ইহসান।

  2. দ্বিতীয় যুগ: তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈনদের যুগ (১ম-২য় হিজরি শতাব্দী):

    উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে যখন ইসলামী খিলাফতের দিগন্ত বিস্তৃত হলো এবং ধনসম্পদ ও বিলাসিতার প্রাচুর্য দেখা দিল, তখন একদল মুখলিস মুত্তাকী উম্মাহকে আখিরাতের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য কৃচ্ছ্রসাধনা ও যুহদ (الزهد)-এর দিকে জোর দেন। এ যুগের প্রধান ব্যক্তিবর্গ হলেন হযরত হাসান বসরী (রহ.), উয়াইস আল-কারনী (রহ.), ইবরাহীম ইবনে আদহাম (রহ.), ফুযাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) এবং রাবেয়া বসরী (রহ.)। এ যুগে আধ্যাত্মিক চর্চাকে ‘যুহদ’ নামে অভিহিত করা হতো।

  3. তৃতীয় যুগ: পরিভাষা ও তাত্ত্বিক রূপায়নের যুগ (৩য়-৪র্থ হিজরি শতাব্দী):

    এ পর্যায়ে তাসাওউফ একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রীয় পরিভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সূফীগণ অন্তরের বিভিন্ন অবস্থা (আহওয়াল ও মাকামাত), তাওহীদে আফ’আল ও সিফাত সম্পর্কে গভীর আলোচনা শুরু করেন। এ যুগের শীর্ষ ইমামদের মধ্যে ছিলেন ইমাম জুনায়দ আল-বাগদাদী (যাঁকে সাইয়্যিদুত তায়েফা বলা হয়), মারূফ আল-কারখী, সিররী আস-সাকাতী, আল-হারিস আল-মুহাসিবী এবং আবু বকর আশ-শিবলী (রহিমাহুমুল্লাহ)।

  4. চতুর্থ যুগ: ইলম ও শরীয়তের সাথে পূর্ণ সমন্বয়ের যুগ (৫ম-৬ষ্ঠ হিজরি শতাব্দী):

    এ যুগে তাসাওউফের তাত্ত্বিক কাঠামো গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয় এবং কিছু বিভ্রান্ত চরমপন্থীর অপব্যাখ্যার বিপরীতে বিশুদ্ধ সুন্নাহসম্মত তাসাওউফ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইমাম আবু বাকর কাল্লাবাযীর ‘আত-তা’আররুফ’, ইমাম আবু নুয়াইমের ‘হিলয়াতুল আওলিয়া’, ইমাম আবুল কাসেম আল-কুশায়রীর ‘আর-রিসালাহ আল-কুশায়রিয়্যাহ’ এবং হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালীর ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থাবলি তাসাওউফকে শরীয়ত ও তাফসীর-হাদীসের সমান্তরালে অকাট্য শাস্ত্র হিসেবে সুদৃঢ় করে।

  5. পঞ্চম যুগ: তরীকাহ ও প্রাতিষ্ঠানিক সিলসিলার যুগ (৬ষ্ঠ হিজরি থেকে অদ্যাবধি):

    এ যুগে তাসাওউফ সুশৃঙ্খল তরীকাহ, খানকাহ ও শিক্ষা-ব্যবস্থার রূপ লাভ করে। বিশ্বব্যাপী ইসলামের দাওয়াত ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবে চার প্রধান তরীকাহ (কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া) আত্মপ্রকাশ করে। শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী, খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী, শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী এবং বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রহিমাহুমুল্লাহ) উম্মাহর লক্ষ-কোটি মানুষকে আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ দেন।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, তাসাওউফ হলো কুরআন ও সুন্নাহর অনুশাসনের গভীরতম আত্মিক উপলব্ধির নাম। শরীয়ত ব্যতীত মারিফত যেমন পঙ্গু ও অগ্রহণযোগ্য, তেমনি তাসাওউফ ব্যতীত কেবল বাহ্যিক আমল হলো আত্মাহীন দেহের ন্যায়। অতএব, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ সফলতার জন্য ফিকহ ও তাসাওউফের ভারসাম্যপূর্ণ অনুশীলন অপরিহার্য।


٢- ما مفهوم القلب؟ بين أنواعه مع أمراض القلب وطرق إصلاحه –

[২. ক্বলব এর তাৎপর্য কী? তার প্রকারভেদ উল্লেখপূর্বক ক্বলবের রোগসমূহ ও এর থেকে পরিত্রাণের পদ্ধতি বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী জীবনদর্শনে ‘ক্বলব’ (القلب) বা অন্তরের গুরুত্ব অপরিসীম। মানবদেহে দৃশ্যমান রক্তের সংবহনকারী মাংসপিণ্ডের পেছনে একটি রূহানী ও আধ্যাত্মিক সূক্ষ্ম সত্তা বিদ্যমান, যা মানুষের ঈমান, কুফর, হেদায়েত ও পথভ্রষ্টতার মূল কেন্দ্র। হাদীস শরীফে ক্বলবকে সমগ্র দেহের শাসক ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্তরের বিশুদ্ধতার ওপরই মানুষের পরকালীন মুক্তি নির্ভরশীল। নিম্নে ক্বলবের ধারণা, প্রকারভেদ, ক্বলবের মারাত্মক ব্যাধিসমূহ এবং তা নিরাময়ের কার্যকর পদ্ধতিসমূহ বিশ্লেষণ করা হলো।

ক্বলবের তাৎপর্য ও আভিধানিক-পারিভাষিক ধারণা

১. আভিধানিক অর্থ: ‘ক্বলব’ শব্দটি আরবি (ق-ل-ب) মূলধাতু থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন হওয়া, উল্টে যাওয়া, পরিবর্তিত রূপ ধারণ করা (التقلب والتحول)। মানুষের অন্তর প্রতিনিয়ত নানা চিন্তা, সংকল্প ও আবেগে আন্দোলিত হয় বলেই একে ‘ক্বলব’ বলা হয়। হাদীসে এসেছে:

«إِنَّمَا سُمِّيَ الْقَلْبُ مِنْ تَقَلُّبِهِ، إِنَّمَا مَثَلُ الْقَلْبِ كَمَثَلِ رِيشَةٍ مُعَلَّقَةٍ فِي أَصْلِ شَجَرَةٍ يُقَلِّبُهَا الرِّيحُ ظَهْرًا لِبَطْنٍ»

অনুবাদ: “অন্তরকে ‘ক্বলব’ নাম এজন্যই দেওয়া হয়েছে যে তা অনবরত পরিবর্তনশীল। অন্তরের দৃষ্টান্ত হলো বৃক্ষের মূলে ঝুলন্ত এমন এক পালকের ন্যায়, যাকে বাতাস উল্টে-পাল্টে দেয়।” (মুসনাদে আহমাদ: ১৯৭০৯)

২. পারিভাষিক অর্থ: ইমাম আল-গাযালী (রহ.) ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে স্পষ্ট করেন যে, ক্বলবের দুটি দিক রয়েছে:

  • বাহ্যিক বা বস্তুগত ক্বলব (القلب الجسماني): বাম স্তনের নিচে অবস্থিত মোচাকৃতির মাংসপিণ্ড, যা জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রক্ত সঞ্চালন করে। পশু ও মানুষ উভয়েরই তা থাকে।
  • রূহানী ও আধ্যাত্মিক ক্বলব (اللطيفة الربانية الروحانية): এটি এক দিব্য ঐশী সূক্ষ্ম জ্যোতি বা আধ্যাত্মিক সত্তা, যা বস্তুগত মাংসপিণ্ডের সাথে নিগূঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। এটিই মানুষের উপলব্ধি, জ্ঞানার্জন, ঈমান এবং আল্লাহকে চেনার মূল মাধ্যম। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ ও জবাবদিহিতার সম্বোধন মূলত এই রূহানী ক্বলবের প্রতিই হয়ে থাকে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ ক্বলবের কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বর্ণনা করে ইরশাদ করেন:

«أَلَا وَإِنَّ فِي الجَسَدِ مُضْغَةً، إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ القَلْبُ»

অনুবাদ: “জেনে রেখো! মানবদেহের ভেতরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে; যদি তা সুস্থ ও সংশোধিত থাকে, তবে সমগ্র দেহই সুস্থ থাকে। আর যদি তা বিনষ্ট ও কলুষিত হয়, তবে সমগ্র দেহই বিনষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখো! তা-ই হলো ক্বলব (অন্তর)।” (সহীহ বুখারী: ৫২, সহীহ মুসলিম: ১৫৯৯)

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ক্বলবের প্রকারভেদ (أنواع القلب)

পবিত্র কুরআনে মানব অন্তরের চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার নিরিখে বিভিন্ন প্রকার ক্বলবের বর্ণনা এসেছে, যা মূলত তিনটি মৌলিক ভাগে বিভক্ত:

ক্বলবের প্রকার কুরআনিক আয়াত ও প্রামাণিক ভাষ্য বৈশিষ্ট্য ও অবস্থা
১. সুস্থ অন্তর (القلب السليم) ﴿يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ ۝ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ﴾ (الشعراء: ٨٨-٨٩) শিরক, সন্দেহ, কুপ্রবৃত্তি ও কপটতামুক্ত একনিষ্ঠ ঈমানদার অন্তর। পরকালে কেবল এ অন্তরই মুক্তির উপায়।
২. আল্লাহমুখী অন্তর (القلب المنيب) ﴿مَّنْ خَشِيَ الرَّحْمَٰنَ بِالْغَيْبِ وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُّنِيبٍ﴾ (ق: ٣٣) যে অন্তর সর্বদা অনুশোচনা ও তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্যে প্রত্যাবর্তনশীল থাকে।
৩. প্রশান্ত অন্তর (القلب المطمئن) ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾ (الرعد: ٢٨) আল্লাহর যিকির ও স্মরণের মাধ্যমে পূর্ণ তৃপ্ত ও সংশয়হীন আস্থাভাজন অন্তর।
৪. রোগাক্রান্ত অন্তর (القلب المريض) ﴿فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا﴾ (البقرة: ١٠) মুনাফিক ও পাপীদের অন্তর, যাতে সংশয়, কুধারণা ও আত্মিক ব্যাধি বিরাজ করে।
৫. পাষাণ অন্তর (القلب القاسي) ﴿ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُم مِّن بَعْدِ ذَٰلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً﴾ (البقرة: ٧٤) যে অন্তর কোনো উপদেশ বা সতর্কবার্তায় বিগলিত হয় না, পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়।
৬. মোহরাঙ্কিত অন্তর (القلب المطبوع/المختوم) ﴿خَتَمَ اللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ﴾ (البقرة: ٧) চরম ঔদ্ধত্য ও ক্রমাগত পাপের কারণে সত্য গ্রহণের ক্ষমতা হারানো কাফেরদের অন্তর।

ক্বলবের মারাত্মক আত্মিক ব্যাধিসমূহ (أمراض القلب)

চিকিৎসাবিজ্ঞান যেমন দেহের শারীরিক রোগ নিরাময় করে, তাসাওউফ তেমনি ক্বলবের আধ্যাত্মিক ব্যাধি দূর করে। ক্বলবের প্রধান ধ্বংসাত্মক রোগগুলো নিম্নরূপ:

  1. রিয়া বা লোকদেখানো আমল (الرياء): আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা ও সম্মান লাভের আশায় নেক আমল করা। একে হাদীসে ‘শিরকে আসগার’ (ছোট শিরক) আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
  2. কিবর বা অহংকার (الكبر): নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবা এবং সত্যকে অস্বীকার ও মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা (غمط الناس وبطر الحق)। কিবরের অণুপরিমাণ থাকলে জান্নাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
  3. হাসাদ বা হিংসা (الحسد): অন্যের সুখ-সমৃদ্ধি বিনষ্ট হওয়ার কামনা করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে ধ্বংস করে যেমন আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়।” (আবু দাউদ: ৪৯০৩)
  4. হুব্বে দুনিয়া ও হুব্বে জাহ (حب الدنيا والجاه): পার্থিব ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও পদের প্রতি অন্ধ মোহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, “দুনিয়ার মোহ সকল পাপের মূল।” (বায়হাকী)
  5. উজব বা আত্মম্ভরিতা (العجب): নিজের আমল, জ্ঞান বা তাকওয়ার ওপর গর্ববোধ করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহকে ভুলে যাওয়া।
  6. গাফলাত বা ঔদাসীন্য (الغفلة): আখিরাত, মরণ ও আল্লাহর উপস্থিতি সম্পর্কে উদাসীন ও বেপরোয়া থাকা।

ক্বলব সংশোধনের উপায় ও পরিত্রাণের পদ্ধতি (طرق إصلاحه)

ক্বলবকে রোগমুক্ত করে ‘ক্বলবে সালীম’-এ রূপান্তরের জন্য সালাফে সালেহীন ও সূফী-সাধকগণ নিম্নোক্ত কার্যকর পদ্ধতিগুলোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন:

  1. খালেস তাওবাহ ও ইস্তিগফার (التوبة النصوح والاستغفار):

    গুনাহ করলে অন্তরে কালো দাগ পড়ে। খালেস তওবা ও অধিক ইস্তিগফারের মাধ্যমে ক্বলবের সেই মরিচা পরিষ্কার হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। অতঃপর সে যদি তাওবা ও ইস্তিগফার করে, তবে তার অন্তরটি আবার চকচকে পরিষ্কার হয়ে যায়।” (তিরমিযী: ৩৩৩৪, হাসান সহীহ)

  2. সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির অব্যাহত রাখা (مداومة ذكر الله):

    হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “প্রতিটি জিনিসের মরিচা দূর করার উপকরণ আছে, আর অন্তরের মরিচা দূর করার উপায় হলো আল্লাহর যিকির।” (বায়হাকী: শুআবুল ঈমান)। যিকর অন্তরে নূর ও স্থিরতা এনে দেয়।

  3. মুরাকাবা ও মুহাসাবা (المراقبة والمحاسبة):

    প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করা যে আল্লাহ আমাকে দেখছেন (মুরাকাবা), এবং প্রতিদিন নিজের ভুলত্রুটির হিসাব গ্রহণ করে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা (মুহাসাবা)। হযরত উমর (রা.) বলেন: “তোমাদের হিসাব নেওয়ার পূর্বেই তোমরা নিজেদের হিসাব সম্পন্ন করো।”

  4. কামিল শায়খের সাহচর্য ও সংস্রব (صحبة الصالحين):

    কুরআনের নির্দেশ: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ﴾ (আত-তাওবা: ১১৯)। খাঁটি আল্লাহপ্রেমী অলীদের সাহচর্যে থাকলে তাঁদের রূহানী প্রভাবে অন্তরের কুপ্রবৃত্তি দূরীভূত হয়।

  5. কুরআন তিলাওয়াত ও তাদাব্বুর (تلاوة القرآن وتدبره):

    কুরআন অন্তরের সকল রোগের নিশ্চিত আরোগ্য: ﴿وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ﴾ (বনী ইসরাঈল: ৮২)। অর্থ বুঝে তাদাব্বুর সহকারে তিলাওয়াত অন্তরকে নরম ও সজীব করে।

  6. হালাল খাদ্য গ্রহণ ও অনর্থক কাজ বর্জন (تحري الحلال):

    হারাম বা সন্দেহজনক খাদ্য অন্তরে অন্ধকার ও কঠোরতা সৃষ্টি করে। হালাল রিযিক অন্তরে তাকওয়ার নূর প্রজ্জ্বলিত করে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ক্বলব হলো আল্লাহর সমীপে বান্দার দৃষ্টিপাতস্থল (إن الله لا ينظر إلى صوركم وأموالكم ولكن ينظر إلى قلوبكم وأعمالكم)। তাই শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়ে আত্মিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা প্রতিটি মুমিনের জন্য ফরজে আইন। যথাযথ রিয়াযত, সাধনা ও যিকিরের মাধ্যমে ক্বলবকে সুস্থ রাখাই মানব জীবনের পরম সৌভাগ্যের চাবিকাঠি।


٣- اذكر إعتقاد أشهر الصوفية في مسائل أصول التصوف في ضوء الرسالة القشيرية باختصار-

[৩. আর-রিসালাহ আল-কুশায়রিয়াহ এর আলোকে উসূলে তাসাওউফ এর মাসআলায় প্রসিদ্ধ সূফীদের বিশ্বাসসমূহ সংক্ষেপে উল্লেখ কর।]

ভূমিকা

হিজরি পঞ্চম শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও তাসাওউফ-তাত্ত্বিক ইমাম আবুল কাসেম আব্দুল করীম ইবনে হাওয়াযিন আল-কুশায়রী (রহ.) (৩৭৬–৪৬৫ হি.) রচিত ‘আর-রিসালাহ আল-কুশায়রিয়্যাহ’ (الرسالة القشيرية) তাসাওউফ শাস্ত্রের একটি প্রামাণ্য ও কালজয়ী সংবিধানস্বরূপ। ইমাম কুশায়রী এ গ্রন্থের শুরুতে একটি সুদীর্ঘ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় সন্নিবেশ করেছেন, যার শিরোনাম: «فَصْلٌ فِي بَيَانِ اعْتِقَادِ هَذِهِ الطَّائِفَةِ فِي مَسَائِلِ الأُصُولِ» (উসূলে দ্বীন ও আকীদার মাসআলায় এ দল তথা সূফীগণের বিশ্বাসের সুস্পষ্ট বিবরণ)। এর মাধ্যমে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছেন যে, তাসাওউফের শীর্ষস্থানীয় ও মশহুর মাশায়েখগণ বিশুদ্ধ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদার ওপর অটল ছিলেন এবং ভ্রান্ত বেদাতী ফিরকাসমূহ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ছিলেন। নিচে তাঁদের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ আলোকপাত করা হলো।

১. তাওহীদ ও আল্লাহর জাত-সিফাতের ক্ষেত্রে বিশ্বাস (التوحيد والصفات)

ইমাম কুশায়রী (রহ.) স্পষ্ট করেন যে, সূফীগণের প্রধান বিশ্বাস হলো আল্লাহ তায়ালা ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু— তিনি এক, অদ্বিতীয়, অনাদি ও অনন্ত। তিনি কোনো সৃষ্টির সদৃশ নন:

  • সাদৃশ্যহীনতার আকীদা (التنزيه المطلق): আল্লাহ তায়ালা স্থান, কাল, দিক, দেহ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং সৃষ্টির যাবতীয় দুর্বলতা ও পরিবর্তনশীলতা থেকে চিরপবিত্র। কুরআনের ঘোষণা: ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾ (আশ-শূরা: ১১)।
  • ইমাম জুনায়দ আল-বাগদাদী (রহ.)-এর মূলনীতি:

    «التَّوْحِيدُ إِفْرَادُ القَدِيمِ عَنِ الحَدَثِ»

    অনুবাদ: “তাওহীদ হলো অনাদি-অনন্ত সত্তাকে (আল্লাহ) নশ্বর সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও অনন্য হিসেবে বিশ্বাস করা।” অর্থাৎ আল্লাহ চিরন্তন, আর মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও ধ্বংসশীল।

  • আবু বকর আশ-শিবলী (রহ.)-এর উক্তি: “যে ব্যক্তি আল্লাহর কোনো গুণকে সৃষ্টির গুণের সাথে তুলনা করে, সে পথভ্রষ্ট। আল্লাহ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ধারণার ঊর্ধ্বে।”

২. কালামুল্লাহ বা কুরআন মাজীদ সম্পর্কিত বিশ্বাস (القرآن كلام الله)

মু’তাযিলাদের ভ্রান্ত মতবাদ (কুরআন সৃষ্টি বা মাখলুক)-এর বিপরীতে সূফী মাশায়েখগণ বিশ্বাস করতেন:

  • আল-কুরআন আল্লাহ তায়ালার অনাদি ও চিরন্তন গুণ (ক্বালামুল্লাহ গাইরু মাখলূক / كلام الله غير مخلوق)।
  • ইমাম আবু বকর আল-কাল্লাবাযী ও ইমাম কুশায়রী উদ্ধৃত করেন, সূফী সমাজের কোনো একজন গ্রহণযোগ্য ইমামও কুরআনকে মাখলুক মনে করতেন না; বরং তাঁরা একে আল্লাহর চিরন্তন কালাম হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন।

৩. ক্বাযা ও ক্বদর এবং বান্দার কর্ম সম্পর্কিত বিশ্বাস (القضاء والقدر)

জাবরিয়া ও ক্বাদরিয়া ফিরকার চরমপন্থার বিপরীতে সালাফে সালেহীন ও সূফী ইমামগণের বিশ্বাস হলো মধ্যমপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ:

  • ভালো ও মন্দ, কল্যাণ ও অকল্যাণ— সবকিছুই আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা, জ্ঞান ও তাকদীর অনুযায়ী সৃষ্টি হয়।
  • বান্দা তার কাজের ‘কাসিব’ (অর্জনকারী) এবং আল্লাহ তায়ালা হলেন সকল কাজের ‘খালিক্ব’ (একচ্ছত্র স্রষ্টা): ﴿وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ﴾ (আস-সাফফাত: ৯৬)।
  • বান্দার ইচ্ছাশক্তি রয়েছে যার ভিত্তিতে সে পুরস্কৃত বা দণ্ডিত হবে, কিন্তু সে আল্লাহর ইচ্ছাকে অতিক্রম করতে পারে না।

৪. পরকালে রূইয়াতুল্লাহ বা আল্লাহর দর্শন লাভ (رؤية الله تعالى)

ইমাম কুশায়রী (রহ.) প্রমাণ করেন যে, সূফীগণ অকাট্যভাবে বিশ্বাস করেন:

  • কিয়ামতের দিন এবং জান্নাতে মুমিনগণ স্বচক্ষে আল্লাহ তায়ালার দর্শন লাভ করবেন। এটি জান্নাতীদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত।
  • তবে এই দর্শন হবে কোনো প্রকার আকার, সীমাবদ্ধতা, দিক বা সৃষ্টির ন্যায় দৃষ্টিগোচরতা ব্যতীত (بلا كيف ولا تشبيه ولا حصر)। দলিল: ﴿وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ ۝ إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٌ﴾ (আল-কিয়ামাহ: ২২–২৩)।

৫. অলীদের কারামত ও শাফাআতের সত্যতা (كرامات الأولياء والشفاعة)

মু’তাযিলাদের অস্বীকারের বিপরীতে সূফীগণের আকীদা হলো:

  • আল্লাহ তায়ালার নেককার মুত্তাকী বান্দাদের (আওলিয়ায়ে কিরাম) দ্বারা অলৌকিক ঘটনা বা ‘কারামত’ প্রকাশিত হওয়া বাস্তব ও সত্য (حق)। তবে কারামত নবুওয়াতের মু’জিযার অধীন এবং এটি শরীয়তের অনুবর্তিতার বাইরে কখনো হতে পারে না।
  • কিয়ামতের ময়দানে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ‘মাক্বামে মাহমুদ’ ও শাফাআতে কুবরাসহ সকল আম্বিয়া ও সালেহীনদের সুপারিশের অধিকার সত্য।

৬. সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা ও ভালোবাসার বাধ্যবাধকতা (محبة الصحابة)

রাফেযী ও খারেজীদের ভ্রান্তির বিপরীতে সূফী সমাজের ঐকমত্য হলো:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সকল সাহাবী ন্যায়পরায়ণ (عدول)। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ এবং তাঁদের সমালোচনা করা নিফাক্বীর আলামত।
  • মর্যাদার ক্রমানুসারে চার খলীফার স্থান: হযরত আবু বকর, অতঃপর উমর, অতঃপর উসমান, অতঃপর আলী (رضي الله عنهم أجمعين)।

সারসংক্ষেপ ছক: الرسالة القشيرية-এর আলোকে প্রধান সূফীগণের আকীদা

উসূলে তাসাওউফের বিষয় প্রসিদ্ধ সূফী ইমামগণের স্বীকৃত আকীদা বিচ্যুত ফিরকা ও তাদের বিভ্রান্তি
তাওহীদ ও সিফাত আল্লাহ এক, অনাদি, স্থান-কাল-দিক ও সৃষ্টির সাদৃশ্যমুক্ত। মুশাব্বিহা ও মুজাসসিমা (আল্লাহর দেহ প্রমাণকারী)।
কুরআন মাজীদ আল্লাহর অনাদি কালাম, সৃষ্টি বা মাখলুক নয়। মু’তাযিলা (কুরআনকে সৃষ্ট বস্তু দাবিদার)।
তাকদীর ও কর্ম আল্লাহ সকল কাজের স্রষ্টা, বান্দা ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন অর্জনকারী। ক্বাদরিয়া (তাকদীর অস্বীকারকারী) ও জাবরিয়া।
রূইয়াতুল্লাহ (দর্শন) জান্নাতে মুমিনদের চাক্ষুষ দর্শন লাভ অবধারিত ও সত্য। মু’তাযিলা ও জাহমিয়া (দর্শন অস্বীকারকারী)।
সাহাবায়ে কিরাম সকল সাহাবীর প্রতি গভীর ভক্তি, খোলাফায়ে রাশেদীনের মর্যাদা স্বীকার। শিয়া ও খারেজী সম্প্রদায়।

٤- ما معنى البيعة؟ وما حكمها؟ بين أقسام البيعة وشروط الشيخ الكامل ممثلا ومفصلا-

[৪. বাই’আত কাকে বলে? এর হুকুম কী? বাই’আত এর প্রকার ও কামিল শায়খ এর শর্তাবলি উদাহরণসহ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামে আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের একটি প্রধান মাধ্যম হলো ‘বাই’আত’ (البيعة)। রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কিরামকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের ওপর অটল থাকার জন্য বাই’আত গ্রহণ করাতেন। পরবর্তীতে সূফী মাশায়েখগণ নফসের তাযকিয়া ও অন্তরের সংশোধনের জন্য বাই’আতের সিলসিলা সুসংগঠিত করেন। নিম্নে বাই’আতের সংজ্ঞা, শরয়ি হুকুম, প্রকারভেদ এবং কামিল শায়খের আবশ্যকীয় শর্তাবলি সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

বাই’আতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

১. আভিধানিক অর্থ: ‘বাই’আত’ (البيعة) শব্দটি আরবি ‘বাই’উন’ (بيع) মূলধাতু থেকে উৎপন্ন। এর আভিধানিক অর্থ— ক্রয়-বিক্রয় করা, কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া, আনুগত্যের শপথ নেওয়া এবং আত্মসমর্পণ করা। যেহেতু আনুগত্যকারী ব্যক্তি তার সত্তা ও ইচ্ছাকে আমীর বা শায়খের নির্দেশনার অনুগত করে সঁপে দেয়, তাই একে ‘বাই’আত’ বলা হয়।

২. পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা ইবনে খালদুন (রহ.) তাঁর ‘মুকাদ্দিমাহ’ গ্রন্থে বলেন: “বাই’আত হলো নেতার প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করা, যেন আনুগত্যকারী ব্যক্তি তার নিজস্ব সিদ্ধান্তকে নেতার সিদ্ধান্তের অধীন করে নেয়।” আর তাসাওউফের পরিভাষায়: গুনাহ বর্জন করে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ পূর্ণাঙ্গরূপে পালন এবং আত্মশুদ্ধি ও মারেফাত অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো অভিজ্ঞ কামিল শায়খের হস্তে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করাকে বাই’আত বলে।

বাই’আতের শরয়ি হুকুম (حكم البيعة)

বাই’আতের লক্ষ্য ও ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে এর শরয়ি হুকুম নির্ধারিত হয়:

  1. রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় বাই’আত (بيعة الإمامة العظمى): ন্যায়পরায়ণ খলীফা বা ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে আনুগত্যের বাই’আত গ্রহণ করা উম্মাহর জন্য ফরজে কিফায়া। হাদীস শরীফে এসেছে: “যে ব্যক্তি আনুগত্যের বন্ধন ছাড়া মৃত্যুবরণ করল, সে জাহেলিয়্যাতের মৃত্যুবরণ করল।” (সহীহ মুসলিম: ১৮৫১)।
  2. তাযকিয়া ও আত্মশুদ্ধির বাই’আত (بيعة التزكية والإرشاد): কামিল শায়খের হাতে আত্মশুদ্ধির বাই’আত গ্রহণ করা সাধারণ অবস্থায় মুস্তাহাব ও সুন্নাত। তবে যদি কোনো ব্যক্তির আত্মিক ব্যাধি এত তীব্র হয় যে নিজে নিজে তা নিরাময় অসম্ভব এবং গুনাহ থেকে বাঁচা কঠিন হয়ে পড়ে, তবে কোনো কামিল পীরের শরণাপন্ন হওয়া তার জন্য ওয়াজিবের সমপর্যায়ে গণ্য হয় (শরয়ি মূলনীতি: ما لا يتم الواجب إلا به فهو واجب)।

কুরআন ও সুন্নাহর প্রামাণিক দলিল:

  • আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

    ﴿إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ﴾ (الفتح: ١٠)

    অনুবাদ: “নিশ্চয় যারা আপনার কাছে বাই’আত গ্রহণ করে, তারা মূলত আল্লাহর কাছেই বাই’আত গ্রহণ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর।”

  • বায়আতে রিদওয়ানের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন:

    ﴿لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ﴾ (الفتح: ١٨)

    অনুবাদ: “আল্লাহ মুমিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে বাই’আত গ্রহণ করছিল।”

বাই’আতের প্রকারভেদ (أقسام البيعة)

ইসলামের ইতিহাসে এবং তাসাওউফের ধারায় বাই’আত মূলত পাঁচ ভাগে বিভক্ত:

  1. বায়আতুল ইসলাম (بيعة الإسلام): অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণ ও তাওহীদ-রিসালাতের স্বীকৃতিসূচক বাই’আত।
  2. বায়আতুল জিহাদ ওয়াত তাসলীম (بيعة الجهاد والموت): দ্বীনের হিফাজতে ময়দানে দৃঢ় থাকা এবং পশ্চাদপসরণ না করার শপথ; যেমন হুদায়বিয়ায় বৃক্ষের নিচে সংঘটিত বায়আতে রিদওয়ান।
  3. বায়আতুস্ সাম’য়ি ওয়াত তাআহ (بيعة السمع والطاعة): শাসক ও আমীরের ন্যায়সঙ্গত আদেশ মান্য করার শপথ।
  4. বায়আতুত্তাওবাহ ওয়াল ইনাবাহ (بيعة التوبة): অতীতের সকল কবিরা ও সগিরা গুনাহ বর্জন করে আল্লাহর পথে একনিষ্ঠভাবে প্রত্যাবর্তনের বাই’আত।
  5. বায়আতুত্তারবিয়াহ ওয়াত তাযকিয়া বা সুলূক (بيعة التربية والسلوك): কামিল শায়খের তত্ত্বাবধানে ক্বলবের রোগ নিরাময় ও মারেফাত হাসিলের সুশৃঙ্খল বাই’আত।

কামিল শায়খের আবশ্যকীয় শর্তাবলি (شروط الشيخ الكامل)

তাসাওউফে ভুয়া ও ভণ্ড পীরদের প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সালাফে সালেহীন কামিল শায়খ বা পথপ্রদর্শক হওয়ার জন্য অত্যন্ত কঠোর শর্তারোপ করেছেন। ইমাম গাযালী, শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী ও মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহিমাহুমুল্লাহ) নিম্নোক্ত মৌলিক শর্তাবলি উল্লেখ করেছেন:

শর্তের শিরোনাম বিশ্লেষণ ও মানদণ্ড বাস্তব দৃষ্টান্ত / প্রমাণ
১. শরীয়তের পূর্ণ ইলম (العلم بالشريعة) সহীহ আকীদাসম্পন্ন আহলুস সুন্নাহর আলেম হতে হবে। ফরয, ওয়াজিব, হালাল-হারামের গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। জাহেল পীর পথভ্রষ্টকারী। ইমাম জুনায়দ (রহ.): “আমাদের এই ইলম কুরআন ও হাদীসের সাথে সুদৃঢ়ভাবে আবদ্ধ।”
২. সুন্নাহর পুঙ্খানুপুঙ্খ আমল ও ইস্তিক্বামাত যাবতীয় কবিরা গুনাহমুক্ত, সগিরা গুনাহ পরিহারকারী এবং সার্বক্ষণিক সুন্নাহর পাবন্দ হতে হবে। কোনো বিদয়াতে লিপ্ত থাকা যাবে না। বায়াযীদ বোস্তামী (রহ.) এক ব্যক্তির কিবলামুখী থুতু ফেলা দেখে তার শিষ্যত্ব ত্যাগ করেছিলেন।
৩. ইজাযত ও সহীহ সনদপ্রাপ্তি (السند المتصل) কোনো স্বীকৃত কামিল শায়খের দীর্ঘ সান্নিধ্যে থেকে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে খেলাফত ও বাই’আত করানোর লিখিত বা মৌখিক ইজাযতপ্রাপ্ত হতে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে আলী ও আবু বকর (রা.) হয়ে সিলসিলা পরম্পরায় শায়খ পর্যন্ত সনদ অবিচ্ছিন্ন থাকা।
৪. দুনিয়াবিমুখতা ও নির্লোভ চরিত্র (الزهد) মুরিদদের ধনসম্পদ বা নজর-নেয়াজের প্রতি কোনো লোভ থাকবে না; একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হেদায়েতের কাজ করবেন। কুরআন: ﴿اتَّبِعُوا مَن لَّا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُم مُّهْتَدُونَ﴾ (ইয়াসীন: ২১)।
৫. রুহানী চিকিৎসক হওয়া (طبيب القلوب) মুরিদের মানসিক অবস্থা ও ক্বলবের রোগ (রিয়া, হাসাদ, অহংকার) নির্ণয়পূর্বক উপযুক্ত যিকির ও আমল প্রেসক্রাইব করার প্রজ্ঞা থাকতে হবে। ইমাম গাযালী (রহ.): “শায়খ হলেন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ন্যায়, যিনি রোগীর অবস্থা ভেদে ঔষধ নির্ধারণ করেন।”
৬. সুহবতের ফয়েজ ও প্রভাব (تأثير الصحبة) যাঁর মজলিসে বসলে দুনিয়ার মোহ কমে, অন্তরে আল্লাহর ভয় ও মহব্বত জাগ্রত হয় এবং আখেরাতের ফিকির সৃষ্টি হয়। হাদীস: “সর্বোত্তম ব্যক্তি তারা, যাদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।” (ইবনে মাজাহ: ৪১১১)।

٥- من هو مؤسس الطريقة القادرية؟ أذكر نبذة من حياته-

[৫. কাদেরিয়া তরীকাহ এর প্রতিষ্ঠাতা কে? তাঁর জীবনী আলোচনা কর।]

ভূমিকা

মুসলিম জাহানের সুপ্রসিদ্ধ চার প্রধান আধ্যাত্মিক তরীকাহর মধ্যে ‘কাদেরিয়া তরীকাহ’ (الطريقة القادرية) সর্বাধিক প্রাচীন, বিস্তৃত ও প্রভাব বিস্তারকারী। এ মহান তরীকাহর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর যুগশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ, মুহাদ্দিস ও গাউসুল আযম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল কাদির জিলানী (রহিমাহুল্লাহু তায়ালা)। তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শ, সুন্নাহর নিখুঁত অনুসরণ এবং আধ্যাত্মিক বিপ্লব সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। নিম্নে তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিত সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা হলো।

নাম, উপাধি ও বংশ পরিচয়

  • শুভ নাম: আব্দুল কাদির।
  • উপাধি: মুহিউদ্দীন (দ্বীনের পুনরুজ্জীবনকারী), গাউসুল আযম (শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী বা আশ্রয়স্থল), সুলতানুল আওলিয়া (অলীদের সম্রাট) এবং শায়খে বাগদাদ।
  • জন্মকাল ও জন্মস্থান: তিনি ৪৭০ অথবা ৪৭১ হিজরি মোতাবেক ১০৭৭–৭৮ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের (বর্তমান ইরান) কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী তাবারিস্তান অঞ্চলের ‘জিলান’ (গিলান) নামক জনপদে জন্মগ্রহণ করেন। এ কারণে তাঁকে ‘আল-জিলানী’ বা ‘আল-ক্বাদেরী’ বলা হয়।
  • মর্যাদাপূর্ণ কুরাইশী নসবনামা: তিনি ছিলেন পিতার দিক থেকে ইমাম হাসান (রা.) এবং মাতার দিক থেকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পবিত্র বংশধর। ফলে তিনি বংশগতভাবে ‘হাসানী ও হুসাইনী সাইয়্যিদ’ এবং ‘নাজীবে তারাফাইন’ (উভয় দিক থেকে সম্ভ্রান্ত কুলীন)। তাঁর পিতার নাম সাইয়্যিদ আবু সালেহ মূসা জঙ্গীদোস্ত (রহ.) এবং মাতার নাম সাইয়্যিদা উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহ.)।

শৈশব, প্রাথমিক শিক্ষা ও বাগদাদ গমন

শৈশবেই তাঁর মধ্যে অসাধারণ সততা, সত্যবাদিতা ও ঐশী আভার প্রকাশ ঘটে। তিনি বাল্যকালে নিজ এলাকায় কুরআন মাজীদ হিফয ও প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে (৪৮৮ হিজরিতে) উচ্চতর ইলম অর্জনের জন্য তৎকালীন বিশ্বের ইলমের রাজধানী বাগদাদে যাত্রা করেন। যাত্রাপথে ডাকাতদলের মুখে পড়েও মায়ের নসীহত অনুযায়ী সত্য কথা বলে ডাকাত সর্দারসহ পুরো দলকে তওবা করিয়েছিলেন, যা তাঁর জীবনের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।

উচ্চশিক্ষা ও উস্তাদমণ্ডলী

বাগদাদে তিনি দীর্ঘকাল কুরআন, তাফসীর, হাদীস, উসূলে ফিকহ, বালাগাত ও আরবী সাহিত্যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি হাম্বলী মাযহাবের একজন প্রথম সারির ফকীহ ও মুহাদ্দিস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন:

  • হাদীস শাস্ত্রে: শায়খ আবু মুহাম্মদ জাফর আস-সাররাজ, আবু বকর আহমাদ ইবনে আল-মুযাফফর প্রমুখ।
  • ফিকহ শাস্ত্রে: শায়খ আবুল ওয়াফা আলী ইবনে আকীল হাম্বলী এবং আবুল হাসান মুহাম্মদ ইবনে ক্বাযী আবু ইয়া’লা।
  • আদব ও ভাষাশাস্ত্রে: আল্লামা আবু যাকারিয়া আত-তিবরিযী (রহ.)।
  • তাসাওউফ ও সুলূকে: আধ্যাত্মিক জগতে তিনি শায়খ আবু সাঈদ আল-মাখযূমী (রহ.)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করেন এবং তাঁর কাছ থেকে খিরকা ও খেলাফত লাভ করেন।

কঠোর মুজাহাদা ও নির্জন আত্মসাধনা

ইলম অর্জনের পর তিনি প্রায় ২৫ বছর বাগদাদ সংলগ্ন কারখ ও ইরাকের বিজন মরুপ্রান্তরে কঠোর রিয়াযত, অনশন ও নির্জন আত্মসাধনায় নিমগ্ন থাকেন। তিনি দুনিয়ার যাবতীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে গাছের পাতা ও বনজ উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করতেন এবং দিনরাত কুরআন তিলাওয়াত ও যিকিরে অতিবাহিত করতেন। এ কঠোর সাধনা তাঁকে আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ স্তরে আসীন করে।

দাওয়াতি বিপ্লব ও ওয়াজ-নসীহতের ময়দানে অবদান

৫২১ হিজরিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি বাগদাদে ফিরে আসেন এবং তাঁর পীর আবু সাঈদ মাখযূমীর মাদরাসায় পাঠদান ও জনসাধারণের মাঝে ওয়াজ শুরু করেন:

  1. শ্রোতাদের উপচে পড়া ভিড়: তাঁর ওয়াজের মজলিসে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট উলামা, ফুক্বাহা এবং সরকারের উচ্চপদস্থ আমীরগণ উপস্থিত হতেন। মজলিসে ৭০ হাজারের অধিক মানুষ সমবেত হতো এবং চারশত আলেম তাঁর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতেন।
  2. অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণ: তাঁর হাতে প্রত্যক্ষভাবে হাজার হাজার ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান ইসলাম গ্রহণ করে এবং লক্ষাধিক পথভ্রষ্ট পাপাচারী মুসলিম তওবা করে সালেহ মুমিন হয়।
  3. ক্রুসেডের প্রেক্ষাপটে সমাজ সংস্কার: তাঁর আধ্যাত্মিক জাগরণ মুসলিম সমাজের ঈমানি শক্তিকে উজ্জীবিত করে, যা পরবর্তীকালে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর ক্রুসেড বিজয়ীদের নৈতিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

রচিত অমূল্য গ্রন্থাবলি

শায়খ আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) অসংখ্য অনন্য কিতাব রচনা করেছেন, যার মধ্যে সর্বাধিক সুপ্রসিদ্ধ:

  • আল-গুনয়াতু লিতালিবি ত্বারীকিল হাক্ক (الغنية لطالبي طريق الحق): আকীদা, ফিকহ ও তাসাওউফের এক পূর্ণাঙ্গ এনসাইক্লোপিডিয়া।
  • ফুতূহুল গায়ব (فتوح الغيب): আধ্যাত্মিক দর্শন ও সুলূকের ৭৮টি অমূল্য বক্তব্যের সংকলন।
  • আল-ফাতহুর রব্বানী ওয়াল ফায়যুর রহমানী (الفتح الرباني والفيض الرحماني): তাঁর ৬২টি গভীর ওয়াজ ও নসীহতের সংকলন।
  • সিররুল আসরার (سر الأسرار): রুহের গভীর স্তর ও মারেফাত সম্পর্কিত তাত্বিক গ্রন্থ।

ওফাত ও সমাধি

এই মহান সংস্কারক ও সূফী সম্রাট ৯১ বছর বয়সে ৫৬১ হিজরির ১১ই রবিউস সানী (মোতাবেক ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দে) বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। বাগদাদ শরীফে তাঁর মাযার মুবারক অবস্থিত, যা বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এক পবিত্র যিয়ারতস্থল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া ত্বরিকাহ আজও সারা বিশ্বে বিশুদ্ধ শরীয়ত ও আত্মশুদ্ধির আলোকবর্তিকা হয়ে প্রজ্বলিত রয়েছে।


٦- عرف المصطلحات الصوفية الآتية : الشريعة والحقيقة وعلم اليقين وعين اليقين وحق اليقين مع الأدلة والأمثلة مفصلا-

[৬. দলিল ও উদাহরণসহ নিম্নলিখিত তাসাওউফের পরিভাষাগুলোর পরিচয় প্রদান কর: الشريعة، الحقيقة، علم اليقين، عين اليقين ও حق اليقين।]

ভূমিকা

তাসাওউফ ও আধ্যাত্মিক শাস্ত্রের গভীর মর্ম অনুধাবনের জন্য সালাফে সালেহীন ও সূফী মাশায়েখগণ কতিপয় বিশেষ পরিভাষা (اصطلاحات) ব্যবহার করেছেন। এ পরিভাষাগুলো কোনো মনগড়া বিষয় নয়; বরং এগুলো কুরআনুল কারীম ও সুন্নাহর গভীরতর তাত্ত্বিক রূপ। শরীয়ত ও হাকীকত এবং ইয়াকীনের তিনটি স্তর— ইলমুল ইয়াকীন, আইনুল ইয়াকীন ও হাক্বুল ইয়াকীনের মাধ্যমেই মানবাত্মা পূর্ণতার শিখরে আরোহণ করে। নিম্নে দলীল ও দৃষ্টান্তসহ এগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হলো।

১. আশ-শারীয়াহ (الشريعة)

  • আভিধানিক অর্থ: ‘শরীয়ত’ (الشريعة) শব্দের মূল অর্থ হলো— সুস্পষ্ট পথ, পানির ঝর্ণায় পৌঁছার সোজা ও উন্মুক্ত পথ (الطريق الواضح المستقيم الموصل إلى الماء)। যেহেতু শরীয়তের বিধানাবলি মানবজাতিকে আত্মিক জীবনের সুপেয় পানির সন্ধান দেয়, তাই একে শরীয়ত বলা হয়।
  • পারিভাষিক অর্থ: আল্লাহ তায়ালা স্বীয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর মাধ্যমে বান্দাদের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন নাজাতের জন্য আক্বাইদ, ইবাদত, মুআমালাত, মুআশারাত ও আখলাকের যে প্রকাশ্য ও অভ্যন্তরীণ বিধানাবলি অবতীর্ণ করেছেন, তাকে ‘শরীয়ত’ বলে।
  • দলীল: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

    ﴿ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَىٰ شَرِيعَةٍ مِّنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ﴾ (الجاثية: ١٨)

    অনুবাদ: “অতঃপর আমি আপনাকে দ্বীনের এক সুস্পষ্ট বিধান (শরীয়ত)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছি; সুতরাং আপনি এর অনুসরণ করুন এবং অজ্ঞদের খেয়ালখুশির অনুবর্তী হবেন না।”

  • উদাহরণ: দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ওযু করা, কিবলামুখী হওয়া, কিরাত পাঠ করা, রুকু ও সিজদা যথাযথভাবে আদায় করা হলো শরীয়তের বিধান।

২. আল-হাক্বীক্বাহ (الحقيقة)

  • আভিধানিক অর্থ: ‘হাকীকত’ (الحقيقة) শব্দের অর্থ প্রকৃত রূপ, মূল তত্ত্ব, সারবস্তু ও অকাট্য সত্য (الشيء الثابت قطعاً)।
  • পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের নির্দেশনাসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ পালনের মধ্য দিয়ে বান্দার ক্বলবের অন্তরালে যে রূহানী নূর, ঐশী প্রেমের গভীর উপলব্ধি এবং আল্লাহর কুদরত ও তাওহীদের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচিত হয়, তাকে হাকীকত বলে। অর্থাৎ শরীয়তের রূহ বা প্রাণই হলো হাকীকত।
  • শরীয়ত ও হাকীকতের পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক:

    প্রখ্যাত সূফী তাত্ত্বিকগণ বলেন: «الشَّرِيعَةُ سَفِينَةٌ، وَالطَّرِيقَةُ بَحْرٌ، وَالحَقِيقَةُ دُرَّةٌ» — “শরীয়ত হলো একটি নৌকাস্বরূপ, তরীকত হলো সমুদ্রস্বরূপ এবং হাকীকত হলো সমুদ্রের গর্ভের অমূল্য মুক্তাস্বরূপ।” নৌকা ছাড়া যেমন সমুদ্রে নামা আত্মহত্যা, তেমনি শরীয়তকে পরিত্যাগ করে হাকীকত দাবি করা ঘোরতর যিন্দীক্বী ও কুফরি। শায়খ আহমাদ রেযা খান ও ইমাম গাযালী (রহ.) দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন: শরীয়ত পরিপন্থী যেকোনো দাবিই বাতিল ও শয়তানের ধোঁকা।

  • উদাহরণ: সালাতের প্রকাশ্য নিয়মকানুন মেনে দাঁড়ানো হলো ‘শরীয়ত’, আর সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর সামনে বিনম্র অন্তরে নিজেকে নিঃস্ব ভেবে চাক্ষুষ দর্শনের ন্যায় পরম তৃপ্তি ও ভীতি লাভ করা হলো ‘হাকীকত’।

৩. ইলমুল ইয়াক্বীন (علم اليقين)

  • অর্থ ও সংজ্ঞা: অকাট্য যুক্তি, নিখুঁত সংবাদ ও অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে অন্তরে কোনো বিষয়ে যে দৃঢ়, নিঃসংশয় ও স্থির বিশ্বাস সৃষ্টি হয়, তাকে ‘ইলমুল ইয়াকীন’ বলা হয়। এটি হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও দলীলগত নিশ্চিত জ্ঞান।
  • দলীল: পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

    ﴿كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ﴾ (التكاثر: ٥)

    অনুবাদ: “কখনই নয়, যদি তোমরা নিশ্চিত জ্ঞানে (ইলমুল ইয়াকীনের সাথে) জানতে!”

  • বাস্তব দৃষ্টান্ত: দূর থেকে আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখে অকাট্যভাবে নিশ্চিত হওয়া যে সেখানে অবশ্যই আগুন প্রজ্বলিত হয়েছে।

৪. আইনুল ইয়াক্বীন (عين اليقين)

  • অর্থ ও সংজ্ঞা: কোনো বিষয়কে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে বা চাক্ষুষ সাক্ষ্যের মাধ্যমে অন্তরে যে অপরিবর্তনীয় প্রত্যক্ষ নিশ্চয়তা অর্জিত হয়, তাকে ‘আইনুল ইয়াকীন’ বলে। এটি দলীলগত জ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
  • দলীল: আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন:

    ﴿ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ﴾ (التكاثر: ٧)

    অনুবাদ: “অতঃপর তোমরা অবশ্যই জাহান্নামকে চাক্ষুষ প্রত্যয়ে (আইনুল ইয়াকীনের সাথে) প্রত্যক্ষ করবে।”

  • বাস্তব দৃষ্টান্ত: আগুনের নিকটে উপস্থিত হয়ে স্বচক্ষে প্রজ্বলিত আগুনের শিখা ও লেলিহান দৃশ্য অবলোকন করা।

৫. হাক্বুল ইয়াক্বীন (حق اليقين)

  • অর্থ ও সংজ্ঞা: চাক্ষুষ দর্শনের সীমা অতিক্রম করে যখন কোনো বস্তুর স্বাদ, স্পর্শ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বিলীন হয়ে চূড়ান্ততম আত্মিক উপলব্ধি হাসিল হয়, তাকে ‘হাক্বুল ইয়াকীন’ বলা হয়। এটি মানবীয় জ্ঞানের সর্বোচ্চ চূড়া।
  • দলীল: সূরা আল-ওয়াক্বিয়ায় ইরশাদ হয়েছে:

    ﴿إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ حَقُّ الْيَقِينِ ۝ فَسَبِّحْ بِاسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيمِ﴾ (الواقعة: ٩٥-٩٦)

    অনুবাদ: “নিশ্চয় এটিই চূড়ান্ত ও ধ্রুব সত্য (হাক্বুল ইয়াকীন); অতএব আপনি আপনার মহান রবের নামের পবিত্রতা ঘোষণা করুন।”

  • বাস্তব দৃষ্টান্ত: আগুনে হাত রেখে বা নিজে তাতে প্রবেশ করে আগুনের চরম দহন ও উত্তাপের অনুভূতি নিজের অস্তিত্বে প্রত্যক্ষভাবে আস্বাদন করা।

তুলনামূলক পর্যালোচনা ছক

পরিভাষা মূল তত্ত্ব ও স্তর দৃষ্টান্ত (আগুন) আধ্যাত্মিক দৃষ্টান্ত (জান্নাত/আল্লাহ)
الشريعة বাহ্যিক বিধিবিধান ও সুনির্দিষ্ট পথ সুরক্ষার নিয়মাবলি মেনে চলা ফরয-ওয়াজিব আমল সম্পাদন
الحقيقة অভ্যন্তরীণ রূহ ও গভীর সত্য আগুনের শক্তির সারমর্ম বুঝা আমলের মধ্যে ইখলাস ও নূর হাসিল
علم اليقين দলীলভিত্তিক সুনিশ্চিত জ্ঞান ধোঁয়া দেখে আগুনের অস্তিত্ব জানা কুরআন পড়ে জান্নাত-জাহান্নাম বিশ্বাস করা
عين اليقين চাক্ষুষ দর্শনের প্রত্যক্ষ বিশ্বাস চোখে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা কিয়ামতের দিন হাশর-মিযান চাক্ষুষ দেখা
حق اليقين অভিজ্ঞতালব্ধ চূড়ান্ত আত্মিক বিলীনতা আগুনে পুড়ে তার উত্তাপ স্পর্শ করা জান্নাতে প্রবেশ করে তার নিয়ামত ভোগ করা

٧- ما معنى التوبة والإستغفار؟ اذكر فضائلهما في ضوء الكتاب والسنة –

[৭. তাওবাহ ও ইস্তিগফার কাকে বলে? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে উভয়ের ফজিলত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

মানবজাতি সৃষ্টিগতভাবেই ভুলত্রুটি ও নফসের প্ররোচনার মুখোমুখি। তবে ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য হলো পাপের গহ্বরে নিমজ্জিত বান্দার জন্য আল্লাহর ক্ষমার দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত। আত্মশুদ্ধি ও তাসাওউফের প্রথম মনজিলই হলো ‘তাওবাহ’ (التوبة) ও ‘ইস্তিগফার’ (الاستغفار)। গুনাহের কারণে ক্বলবে যে কালিমা লেপন হয়, তাওবাহ ও ইস্তিগফার তা ধুয়ে-মুছে আত্মাকে নূরে উদ্ভাসিত করে। নিম্নে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ দুটির তাৎপর্য ও অনন্য ফযীলত সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

তাওবাহ (التوبة)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

১. আভিধানিক অর্থ: ‘তাওবাহ’ শব্দটি আরবি ‘তাবা-ইয়াতূবু’ (تاب – يتوب) মূলধাতু থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ— ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা (الرجوع)। অবাধ্যতা ছেড়ে আনুগত্যের দিকে ফিরে আসাকে তাওবাহ বলে।

২. পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায়: কৃত পাপের জন্য অন্তরে গভীর অনুশোচনা জাগ্রত করে অবিলম্বে সে পাপ চিরতরে বর্জন করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো তা না করার সুদৃঢ় সংকল্প নিয়ে আল্লাহর সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে ‘তাওবাহ’ বলে।

তাওবাহ কবুল হওয়ার অপরিহার্য শর্তাবলি (শর্তে নাসূহ)

ইমাম নববী (রহ.) তাঁর ‘রিয়াদুস সালেহীন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, তাওবা খাঁটি (তওবায়ে নাসূহ) হওয়ার জন্য চারটি শর্ত পূরণ আবশ্যক:

  1. পাপের জন্য লজ্জা ও অনুশোচনা (الندم): রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «النَّدَمُ تَوْبَةٌ» — “অনুশোচনাই হলো তাওবাহ।” (ইবনে মাজাহ: ৪২৫২)।
  2. তাৎক্ষণিকভাবে পাপ বর্জন করা (الإقلاع عن المعصية): পাপের কাজটিতে লিপ্ত থাকা অবস্থায় তওবা হয় না; অবিলম্বে তা পরিত্যাগ করতে হবে।
  3. ভবিষ্যতে পুনরায় না করার সুদৃঢ় সংকল্প (العزم على عدم العود): কস্মিনকালেও আর এ পাপে লিপ্ত হব না— অন্তরে এমন অটল প্রতিজ্ঞা থাকা।
  4. হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক আদায় (رد المظالم): পাপটি যদি কোনো মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার সাথে সংশ্লিষ্ট হয় (যেমন ধনসম্পদ আত্মসাৎ বা গীবত), তবে তার পাওনা পরিশোধ করতে হবে অথবা তার কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিতে হবে।

ইস্তিগফার (الاستغفار)-এর অর্থ ও তাৎপর্য

১. আভিধানিক অর্থ: ‘ইস্তিগফার’ শব্দটি ‘গাফারা’ (غفر) মূলধাতু থেকে ‘ইসতিফ’আল’ (استفعال) বাবে গিয়ে গঠিত। এর অর্থ— ঢেকে রাখা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, নিষ্কৃতি চাওয়া (طلب المغفرة والستر)। শিরস্ত্রাণকে ‘মিগফার’ বলা হয় কারণ তা আঘাত থেকে মাথাকে ঢেকে রাখে।

২. পারিভাষিক অর্থ: কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে বিনম্র চিত্তে স্বীয় গুনাহের মার্জনা এবং দুনিয়া ও আখিরাতে পাপের অপবাদ ও আযাব থেকে রক্ষার জন্য মুখে ও অন্তরে ক্ষমা প্রার্থনা করাকে ইস্তিগফার বলে। যেমন পাঠ করা: «أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ»।

পার্থক্য: ইস্তিগফার হলো ক্ষমা চাওয়ার দুআ, আর তাওবাহ হলো পাপের পথ থেকে বাস্তব জীবনে ফিরে আসার আমলি বিপ্লব।

পবিত্র কুরআনের আলোকে তাওবাহ ও ইস্তিগফারের ফযীলত

পবিত্র কুরআনে বহু আয়াতে তাওবাহ ও ইস্তিগফারের সীমাহীন কল্যাণ ও মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে:

  1. আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হওয়া:

    ﴿إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ﴾ (البقرة: ٢٢٢)

    অনুবাদ: “নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালোবাসেন।”

  2. সকল গুনাহ সম্পূর্ণ ক্ষমার প্রতিশ্রুতি:

    ﴿قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ﴾ (الزمر: ٥٣)

    অনুবাদ: “বলুন: হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

  3. গুনাহ পুণ্য ও সাওয়াবে পরিবর্তিত হওয়া:

    ﴿إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ﴾ (الفرقان: ٧٠)

    অনুবাদ: “তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে— আল্লাহ তাদের পাপরাশিকে পুণ্যে পরিবর্তিত করে দেবেন।”

  4. পার্থিব রিযিক, বৃষ্টি, ধনসম্পদ ও শক্তির প্রাচুর্য লাভ:

    ﴿فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ۝ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا ۝ وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَارًا﴾ (نوح: ١٠-١٢)

    অনুবাদ: “অতঃপর আমি বলেছি: তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদীনালা স্থাপন করবেন।”

হাদীস শরীফের আলোকে তাওবাহ ও ইস্তিগফারের ফযীলত

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহে তাওবা ও ইস্তিগফারের অতুলনীয় মর্যাদা বিধৃত হয়েছে:

  • পাপহীন নিষ্পাপ ব্যক্তিতে রূপান্তর:

    «التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ»

    অনুবাদ: “গুনাহ থেকে তওবাকারী ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মতো, যার কোনো গুনাহই নেই।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫০, সহীহ জামে’)

  • বান্দার তওবায় মহান আল্লাহর অপরিসীম আনন্দ:

    «لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ، مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضٍ فَلَاةٍ…»

    অনুবাদ: “তোমাদের কোনো ব্যক্তি খাদ্য-পানীয়সহ নিজ সওয়ারি নির্জন মরুপ্রান্তরে হারিয়ে ফেলে চরম নৈরাশ্যের পর তা হঠাৎ অক্ষত ফিরে পেলে যতটা না আনন্দিত হয়, বান্দা তওবা করলে আল্লাহ তায়ালা তার চেয়েও অধিক আনন্দিত হন।” (সহীহ মুসলিম: ২৭৪৭)

  • সংকট থেকে মুক্তি ও অভাবনীয় রিযিকের নিশ্চয়তা:

    «مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ»

    অনুবাদ: “যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফারকে আঁকড়ে ধরে থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সকল সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সকল দুশ্চিন্তা দূর করে স্বস্তি দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করবেন যা সে কল্পনাও করেনি।” (আবু দাউদ: ১৫১৮, আহমাদ: ২২২৩)

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আত্মঅনুশীলন:

    নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও স্বয়ং বিশ্বনবী ﷺ ইরশাদ করেছেন: “আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় আমি দিনে সত্তরেরও অধিক বার আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার ও তওবা করে থাকি।” (সহীহ বুখারী: ৬৩০৭)। অন্য রেওয়ায়েতে একশত বারের কথা এসেছে।


٨- تحدث عن خدمات الشيخ ابو بكر الصديق الفرفروى في نشر الإسلام في شبه القارة الهندية –

[৮. ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে হযরত আবু বকর সিদ্দিক ফুরফুরভী (রহ) এর অবদান আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ক্রান্তিলগ্নে অবিভক্ত বাংলা, আসাম তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে শিরক, বিদয়াত ও অনৈসলামিক কুসংস্কারের ঘনঘটা দূর করে কুরআন ও সুন্নাহর খাঁটি আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় যেসকল ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে ‘মুজাদ্দিদে জামান’ হযরত মাওলানা শায়খ আবু বকর সিদ্দিক ফুরফুরাভী (রহ.) (১৮৪৫–১৯৩৯ খ্রি.) অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা। তিনি ছিলেন একাধারে সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস, ফকীহ, বাতিলের বিরুদ্ধে আপসহীন মুজাহিদ এবং নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া ও কাদেরিয়া তরীকাহর শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। নিম্নে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে ও সমাজ বিনির্মাণে তাঁর ঐতিহাসিক বহুমুখী অবদানসমূহ পর্যালোচনা করা হলো।

সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও বংশমর্যাদা

তিনি ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে (১২৬১ হিজরি) পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ফুরফুরা শরীফে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন ইসলামের প্রথম খলীফা আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তিনি বাল্যকালেই কুরআন হিফয করেন এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সাথে হাদীস, ফিকহ ও তাফসীরের সনদ লাভ করেন। আধ্যাত্মিক অঙ্গনে তিনি কলকাতা মানিকতলার সুপ্রসিদ্ধ ওলী হযরত মাওলানা শাহ সূফী ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)-এর নিকট বায়আত গ্রহণ করে চিশতিয়া, কাদেরিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া এবং নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া চার ত্বরিকাতেই খেলাফত লাভ করেন।

ইসলাম প্রচার ও পুনরুজ্জীবনে ঐতিহাসিক সেবাসমূহ

  1. বিদয়াত, শিরক ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন:

    তৎকালীন বাংলা-আসামের মুসলিম সমাজে হিন্দুয়ানি আচার-আচরণ, কবরে সেজদা, ওরশের নামে অনৈসলামিক মেলা, বাদ্যযন্ত্রের আসর এবং বিভিন্ন বিদয়াত প্রবল আকার ধারণ করেছিল। হযরত ফুরফুরাভী (রহ.) অবিরাম সফর করে হাজার হাজার ইসলাহী মাহফিলের মাধ্যমে এসব অনৈসলামিক রসম-রেওয়াজ বন্ধ করেন এবং বিশুদ্ধ সুন্নাহর আমল পুনরুজ্জীবিত করেন।

  2. দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা আন্দোলন:

    তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে সঠিক ইসলামী ইলম ব্যতীত জাতিকে ঈমানি ধ্বংস থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে তিনি বাংলা ও আসামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজ অর্থ ও অনুপ্রেরণায় ১,১০০-এর অধিক মাদরাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ফুরফুরা ফাতেহিয়া সিনিয়র সিনিয়র মাদরাসা’ আজও উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও শীর্ষস্থানীয় ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র।

  3. আসাম ও সুন্দরবনে দাওয়াত এবং ধর্মান্তর রোধ:

    ব্রিটিশ আমলে খ্রিস্টান মিশনারিরা দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের প্রলোভন দেখিয়ে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করছিল। হযরত ফুরফুরাভী (রহ.) দুর্গম আসাম, ত্রিপুরা, সুন্দরবন ও চরাঞ্চলে নিজে সফর করে এবং তাঁর খলীফাদের পাঠিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ইসলামে ধরে রাখেন। তাঁর মোক্ষম দাওয়াত ও ত্যাগের ফলে বহু অমুসলিম স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

  4. ‘জমিয়তে ওলামায়ে বাংলা ও আসাম’ প্রতিষ্ঠা (১৯১৩ খ্রি.):

    মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক, শিক্ষা ও রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে এবং ওলামায়ে কিরামের সুসংগঠিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তিনি ১৯১৩ সালে ঐতিহাসিক ‘জমিয়তে ওলামায়ে বাংলা ও আসাম’ গঠন করেন। এ সংগঠনের মাধ্যমে ওলামাদের একত্রিত করে তিনি খেলাফত আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

  5. আধুনিক ইসলামী গণমাধ্যম ও প্রেসের বিকাশ:

    মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার জন্য তিনি আধুনিক সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতা ও নির্দেশনায় বাংলা ভাষায় মুসলমানদের প্রথম জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক ছোলতান’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’, এবং ‘সাপ্তাহিক মোসলেম হিতৈষী’ প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ সৃষ্টি হয়।

  6. অসহায় এতিম ও মানবতার সেবা:

    তিনি কেবল ওয়াজ-নসীহতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং সমাজে এতিমখানা, মুসাফিরখানা, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং বিধবাদের পুনর্বাসনে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সেবা কায়েম করেন। ১৯২০ ও ১৯৪৩ সালের মতো দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে তিনি ত্রাণ বিতরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

  7. নারী শিক্ষার বিস্তার ও সম্মানজনক অধিকার প্রতিষ্ঠা:

    তিনি উম্মাহর মা-বোনদের দ্বীনি শিক্ষাদানের জন্য অসংখ্য বালিকা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ঘরে ঘরে পর্দার সাথে ধর্মীয় তালিমের ব্যবস্থা চালু করেন।

  8. সুযোগ্য খলীফা ও দাঈ মণ্ডলীর কাফেলা তৈরি:

    তাঁর সান্নিধ্যে তৈরি হওয়া হাজার হাজার যোগ্য খলীফা বাংলা ও আসামের ঘরে ঘরে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেন। তাঁর সুযোগ্য পাঁচ সাহেবজাদা (পাঁচ হুজুর কেবলারূপে খ্যাত) এবং দেশবরেণ্য খলীফাগণ (যেমন আল্লামা নেছারউদ্দীন আহমদ পীর ছাহেব চরমোনাই রহ., মাওলানা রুহুল আমিন বশীরহাটী রহ. প্রমুখ) এ ধারাকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যান।

উপসংহার ও ওফাত

হযরত আবু বকর সিদ্দিক ফুরফুরাভী (রহ.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের এক অনন্য মুজাদ্দিদ। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মার্চ (১৩৫৮ হিজরির ২৫শে মহররম) প্রায় ৯৪ বছর বয়সে এই মহান সাধক ইন্তেকাল করেন। ফুরফুরা শরীফে তাঁর পবিত্র মাযার মুবারক অবস্থিত। তাঁর মাধ্যমে বাংলায় ইসলামী পুনর্জাগরণ যে নতুন গতি পেয়েছিল, তা আজ পর্যন্ত এ অঞ্চলের মুসলমানদের ঈমানি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করছে।


مجموعة (ب) (খ বিভাগ)

الدرجات — ٥×٤ = ٢٠


٩- ما معنى المحبة؟ اذكر أقسامها مع الأمثلة-

[৯. মহব্বত কাকে বলে? উদাহরণসহ এর প্রকার উল্লেখ কর।]

ভূমিকা

তাসাওউফ ও আধ্যাত্মিক সাধনার মূল প্রাণশক্তি হলো ‘মহব্বত’ (المحبة) বা ঐশী প্রেম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসাই মুমিনের ঈমানকে পূর্ণতা দান করে। নিচে মহব্বতের অর্থ, প্রকারভেদ এবং উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

মহব্বতের অর্থ ও তাৎপর্য

১. আভিধানিক অর্থ: ‘মহব্বত’ শব্দটি আরবি ‘হুব্বুন’ (حب) মূলধাতু থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ— গভীর টান, অনুরাগ, আকর্ষণ, প্রীতি ও ভালোবাসা।

২. পারিভাষিক অর্থ: ইমাম আবুল কাসেম আল-কুশায়রী (রহ.) বলেন: “মহব্বত হলো অন্তরের এমন এক স্থায়ী ও গভীর আকর্ষণ, যা প্রেমিককে সর্বদা প্রিয়তমের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের সকল ইচ্ছা, বাসনা ও অস্তিত্বকে বিলীন করে দিতে উদ্বুদ্ধ করে।” সূফী পরিভাষায়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর আনুগত্যে পরম আনন্দ লাভ এবং সকল ক্ষেত্রে তাঁদের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নামই মহব্বত।

মহব্বতের প্রকারভেদ ও বাস্তব উদাহরণ

ইসলামী চিন্তাবিদ ও তাসাওউফ শাস্ত্রবিদগণের মতে মহব্বত মূলত চার প্রকার:

  1. স্বভাবজাত মহব্বত (المحبة الفطرية/الطبيعية):

    মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাবের কারণে যে ভালোবাসা জন্ম নেয়। যেমন— সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার অপরিসীম ভালোবাসা, স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা, কিংবা ক্ষুধার্ত ব্যক্তির তৃপ্তিদায়ক খাদ্যের প্রতি আকর্ষণ।

  2. বুদ্ধিবৃত্তিক মহব্বত (المحبة العقلية):

    সুদূরপ্রসারী কল্যাণ ও পরিণামের কথা চিন্তা করে বিবেক দ্বারা তাড়িত ভালোবাসা। যেমন— রোগমুক্তির আশায় তিক্ত ঔষধ সেবন করাকে পছন্দ করা, অথবা আত্মশুদ্ধির স্বার্থে কোনো বিজ্ঞ শিক্ষকের কঠোর অনুশাসনকে সানন্দে মেনে নেওয়া।

  3. শরয়ি বা ঈমানি মহব্বত (المحبة الإيمانية/الشرعية):

    আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী কোনো সত্তা বা বস্তুকে ভালোবাসা। ঈমানের দাবি হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-কে পার্থিব সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা। আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে বলেন: ﴿قُلْ إِن كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ… أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ… فَتَرَبَّصُوا﴾ (আত-তাওবা: ২৪)। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান ও সমগ্র মানবজাতি অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই।” (সহীহ বুখারী: ১৫)।

  4. ঐশী বা আধ্যাত্মিক মহব্বত (المحبة الإلهية):

    কোনো পার্থিব স্বার্থ, এমনকি জান্নাতের লোভ বা জাহান্নামের ভয় ব্যতীত কেবল আল্লাহর জাত ও সিফাতের মহিমায় আত্মহারা হয়ে তাঁকে ভালোবাসা। আল্লাহ বলেন: ﴿وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ﴾ (আল-বাকারা: ১৬৫)। হযরত রাবেয়া বসরী (রহ.)-এর অমর কবিতা ও আমল এ মহব্বতের সর্বোত্তম ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।


١٠- ما الغيبة والحضور عند أهل التصوف؟

[১০. সূফীদের নিকট الغيبة ও الحضور বলতে কী বুঝায়?]

ভূমিকা

তাসাওউফ ও সুলূকের ময়দানে সালিকের ক্বলবে আপতিত আত্মিক অবস্থা বা হালের মধ্যে ‘আল-গাইবাহ’ (الغيبة) এবং ‘আল-হুযূর’ (الحضور) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দুটি পরিভাষা। এ দুটি অবস্থা মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

১. আল-গাইবাহ (الغيبة)

  • আভিধানিক অর্থ: অনুপস্থিত হওয়া, অদৃশ্য থাকা, চেতনা হারানো বা বেখবর হওয়া।
  • সূফীদের নিকট পারিভাষিক অর্থ: ক্বলবে আল্লাহ তায়ালার যিকির, মহত্ত্ব ও ভালোবাসার এমন তীব্র আবেশ ও আধ্যাত্মিক নূরের প্লাবন সৃষ্টি হওয়া, যার ফলে বান্দা বাহ্যিক সৃষ্টিজগত (খালক্ব), পরিপার্শ্ব, এমনকি নিজের দেহের সুখ-দুঃখের অনুভূতি থেকেও সম্পূর্ণ উদাসীন ও বিস্মৃত হয়ে পড়ে। একে পার্থিব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি থেকে অন্তরের ‘অনুপস্থিতি’ বলা হয়।
  • বাস্তব দৃষ্টান্ত: সিফফীনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)-এর পায়ে বিদ্ধ তীর যখন প্রচণ্ড ব্যথার কারণে বের করা যাচ্ছিল না, তখন তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। সালাতরত অবস্থায় পরম আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকাকালে তাঁর পা থেকে তীর টেনে বের করা হয়, কিন্তু তিনি টেরই পাননি। এটিই হলো চরম গাইবাহর দৃষ্টান্ত।

২. আল-হুযূর (الحضور)

  • আভিধানিক অর্থ: উপস্থিত হওয়া, বিদ্যমান থাকা, সজাগ ও সতর্ক হওয়া।
  • সূফীদের নিকট পারিভাষিক অর্থ: বান্দার ক্বলব সার্বক্ষণিকভাবে আল্লাহ তায়ালার সমীপে উপস্থিত থাকা এবং নিজেকে আল্লাহর সান্নিধ্যে দণ্ডায়মান অনুভব করা। অর্থাৎ সালিকের অন্তর কোনো মুহূর্তেই আল্লাহর স্মরণ ও মারেফাত থেকে গাফেল থাকে না। একেই বলা হয় ‘হুযূরে ক্বলব’ (حضور القلب مع الحق)।

উভয়ের পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

ইমাম আবুল কাসেম আল-কুশায়রী (রহ.) ‘আর-রিসালাহ’ গ্রন্থে অত্যন্ত চমৎকারভাবে উল্লেখ করেন:

«الغَيْبَةُ عَنِ الخَلْقِ هِيَ الحُضُورُ مَعَ الحَقِّ، وَكُلَّمَا قَوِيَتِ الغَيْبَةُ عَنِ الخَلْقِ زَادَ الحُضُورُ مَعَ الحَقِّ»

অনুবাদ: “সৃষ্টি থেকে অন্তরের অনুপস্থিতিই (গাইবাহ) হলো আল্লাহর সাথে সার্বক্ষণিক উপস্থিতির (হুযূর) নামান্তর। বান্দা সৃষ্টি ও নফস থেকে যত বেশি উদাসীন ও মুক্ত হতে পারে, আল্লাহর সমীপে তার অন্তরের উপস্থিতি তত বেশি গভীর ও শক্তিশালী হয়।”


١١- أذكر مفهوم الكرامة مع الأمثلة-

[১১. উদাহরণসহ কারামাত এর তাৎপর্য আলোচনা কর।]

ভূমিকা

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকীদা অনুযায়ী, আল্লাহ তায়ালার নৈকট্যপ্রাপ্ত ওলীগণের মাধ্যমে অলৌকিক ঘটনা প্রকাশিত হওয়া ধ্রুব সত্য (كرامات الأولياء حق)। এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয় বান্দার জন্য এক বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা। নিম্নে কারামতের তাৎপর্য ও উদাহরণ বিশ্লেষণ করা হলো।

কারামাত (الكرامة)-এর অর্থ ও সংজ্ঞা

১. আভিধানিক অর্থ: ‘কারামাত’ শব্দের অর্থ সম্মান, মর্যাদা, বদান্যতা, অলৌকিক অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠত্ব।

২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম তাহাবী, ইমাম নাসাফী ও আল্লামা তাফতাযানী (রহিমাহুমুল্লাহ) বলেন: নবুওয়াতের কোনো দাবি ছাড়াই আল্লাহ তায়ালার অনুগত, খাঁটি মুত্তাকী এবং শরীয়তের একনিষ্ঠ অনুসারী কোনো ওলীর মাধ্যমে প্রাকৃতিক কার্যকারণ নিয়মের বিপরীতে প্রকাশ পাওয়া কোনো অস্বাভাবিক বা অলৌকিক ঘটনাকে (أمر خارق للعادة) ‘কারামত’ বলে।

মু’জিযা ও কারামতের পার্থক্য: মু’জিযা প্রকাশ পায় আম্বিয়ায়ে কিরামের মাধ্যমে নবুওয়াতের প্রমাণের জন্য প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জসহ; আর কারামত প্রকাশিত হয় ওলীগণের মাধ্যমে গোপনে এবং তা মূলত তাঁদের অনুসৃত নবীর নবুওয়াতেরই পরোক্ষ প্রমাণ ও বরকত।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কারামতের বাস্তব দৃষ্টান্ত

  1. হযরত মরিয়ম (আলাইহাস সালাম)-এর কারামত:

    তিনি কোনো নবী ছিলেন না; অথচ তাঁর নির্জন ইবাদতকক্ষে কোনো ধরনের মানবীয় মাধ্যম ব্যতীত শীতকালে গ্রীষ্মের এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালীন তাজা ফল আল্লাহ তায়ালা দান করতেন: ﴿كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزْقًا ۖ قَالَ يَا مَرْيَمُ أَنَّىٰ لَكِ هَٰذَا ۖ قَالَتْ هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ﴾ (আলে ইমরান: ৩৭)।

  2. আসহাবে কাহাফের ঘটনা:

    কুরআন মাজীদে বর্ণিত কয়েকজন ঈমানদার যুবকের অত্যাচারী শাসকের ভয়ে গুহায় আশ্রয় নেওয়ার পর তিনশত নয় বছর পর্যন্ত অক্ষত শরীরে জাগ্রতের ন্যায় ঘুমিয়ে থাকা (সূরা আল-কাহাফ)।

  3. আসাফ ইবনে বারখিয়া (রহ.)-এর কারামত:

    হযরত সুলাইমান (আ.)-এর রাজদরবারে উপস্থিত কিতাবের ইলমধারী এক ওলী আসাফ ইবনে বারখিয়া চোখের পলক ফেলার পূর্বেই ইয়েমেন থেকে রাণী বিলকিসের সুবিশাল সিংহাসন বায়তুল মুকাদ্দাসে হাজির করে দিয়েছিলেন (সূরা আন-নামল: ৪০)।

  4. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ঐতিহাসিক কারামত:

    মদীনা শরীফে মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে জুমার খুতবা প্রদানকালে শত শত মাইল দূরে পারস্যের ‘নাহাওয়ান্দ’ ময়দানে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীকে শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ থেকে সতর্ক করে সমস্বরে উচ্চৈঃস্বরে ডাক দেন: «يَا سَارِيَةُ الْجَبَلَ الْجَبَلَ» (হে সারিয়া! পাহাড়ের দিকে যাও, পাহাড়কে পেছনে রাখো!)। সেনাপতি সারিয়া (রা.) সেই আওয়াজ স্পষ্টভাবে শুনে বাহিনীকে সুরক্ষিত করেন (মিশকাতুল মাসাবীহ, তারীখে তাবারী)।


١٢- أكتب ترجمة الشيخ أحمد رضا خان البريلوى مختصرا-

[১২. সংক্ষেপে শায়খ আহমদ রেযা খান বেরেলভী (রহ) এর জীবনী লেখ।]

ভূমিকা

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় উপমহাদেশে ফিকহ, উলূমে হাদীস, তাফসীর এবং সুন্নাহর পক্ষে শক্তিশালী লেখনী পরিচালনার ক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন ‘আলা হযরত’ ইমাম আহমদ রেযা খান ফাযেলে বেরেলভী (রহ.) (১২৭২–১৩৪০ হি./ ১৮৫৬–১৯২১ খ্রি.)। তিনি ছিলেন হানাফী মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় ফকীহ, বহুবিদ্যাবিশারদ এবং সুন্নাহর সুরক্ষায় এক আপসহীন সাধক।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

ইমাম আহমদ রেযা খান ১২৭২ হিজরির ১০ই শাওয়াল মোতাবেক ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জুন ভারতের উত্তর প্রদেশের বেরেলী শহরের জাসোলী মহল্লায় এক অভিজাত পাঠন বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ ছিলেন দ্বীনি ইলম ও বীরত্বের প্রতীক। তাঁর পিতা আল্লামা মুফতী নক্বী আলী খান (রহ.) ছিলেন তৎকালীন ভারতের একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম ও বহু গ্রন্থের প্রণেতা।

শিক্ষা ও অসাধারণ মেধার বিকাশ

তিনি ছিলেন অনন্য স্মরণশক্তি ও বিরল প্রতিভার অধিকারী। মাত্র ৪ বছর বয়সে কুরআন নাজেরা সম্পন্ন করেন। নিজ পিতার নিকট এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ উস্তাদদের কাছে মাত্র ১৩ বছর ১০ মাস ৪ দিন বয়সে প্রচলিত দরসে নেজামীর সমুদয় শাস্ত্র (তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, উসূল, মানতিক, বালাগাত, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রভৃতি) সমাপ্ত করেন এবং প্রথম ফতোয়া প্রদান করে পিতার নিকট থেকে ‘দস্তারে ফযীলত’ লাভ করেন। তিনি গণিত, বীজগণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ ৫০টিরও অধিক শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন।

আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও খিলাফত

১২৯৪ হিজরিতে তিনি মারাহরা শরীফের প্রখ্যাত ওলী সাইয়্যিদ শাহ আলে রাসূল মারাহরাভী (রহ.)-এর নিকট কাদেরিয়া বারাকাতিয়া তরীকায় বায়আত গ্রহণ করেন এবং একই মজলিসে খিলাফত ও ইজাযত প্রাপ্ত হন।

সাহিত্যকর্ম ও কালজয়ী গ্রন্থাবলি

তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় সহস্রাধিক অনন্য কিতাব ও গবেষণাপত্র রচনা করেন। তাঁর মধ্যে প্রধানতম:

  • আল-আত্বায়া আন-নাবাবিয়্যাহ ফিল ফাতাওয়া আর-রিযভিয়্যাহ (الفتاوى الرضوية): হানাফী ফিকহের ইতিহাসে প্রায় ৩০ খণ্ডের এক সুবিশাল ও অতুলনীয় ফতোয়া গ্রন্থ, যাতে হাজার হাজার জটিল আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী সমস্যার প্রামাণ্য সমাধান রয়েছে।
  • কানযুল ঈমান ফী তারজামাতিল কুরআন (كنز الإيمان): কুরআন মাজীদের এক অনুপম ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ উর্দু অনুবাদ।
  • হুসসামুল হারামাইন (حسام الحرمين): তৎকালীন বিভিন্ন বিভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডনে মক্কা ও মদীনার শীর্ষ উলামাদের সত্যায়িত ঐতিহাসিক গ্রন্থ।
  • হাদায়িকে বখশিশ (حدائق بخشش): বিশ্বনবী ﷺ-এর শানে রচিত তাঁর অমর নাত ও ভক্তিমূলক কবিতার অপূর্ব সংকলন, যার মধ্যে ‘মুস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম’ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

ইন্তেকাল

এই মহান বহুবিদ্যাবিশারদ আলেম ১৩৪০ হিজরির ২৫শে সফর মোতাবেক ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে অক্টোবর জুমার দিনে ৬৬ বছর বয়সে বেরেলী শরীফে ওফাত বরণ করেন। বেরেলী শরীফেই তাঁর মাজার অবস্থিত।


١٣- ما هى الولاية؟ بين مراتبها-

[১৩. বিলায়াত কাকে বলে? এর স্তরসমূহ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী আকীদা ও তাসাওউফে ‘বেলায়েত’ (الولاية) একটি অত্যন্ত সম্মানিত ও স্পর্শকাতর পরিভাষা। আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ যখন নফসের কুপ্রবৃত্তি দমন করে খালেস তাকওয়া ও সুন্নাহর অনুসরণে নিজেদের উৎসর্গ করেন, তখন তাঁরা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য বা বেলায়েত লাভ করেন। নিম্নে বেলায়েতের পরিচয় ও স্তরসমূহ বিশ্লেষণ করা হলো।

বেলায়েত (الولاية)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়

১. আভিধানিক অর্থ: ‘বেলায়েত’ শব্দটি আরবি ‘ওয়ালিয়ুন’ (ولي) থেকে এসেছে। এর অর্থ— নৈকট্য, সান্নিধ্য, অভিভাবকত্ব, সহায়তা, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা।

২. পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের নির্দেশনাসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন, সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসরণ এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে বান্দার যে বিশেষ রূহানী নৈকট্য, ঐশী বন্ধুত্ব ও সন্তুষ্টি অর্জিত হয়, তাকে ‘বেলায়েত’ বলে। আর যিনি এই মর্যাদা লাভ করেন তাকে ‘ওলী’ (আল্লাহর বন্ধু) বলা হয়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অলীদের পরিচয় ও মর্যাদা সম্পর্কে ঘোষণা করেন:

﴿أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ۝ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ﴾ (يونس: ٦٢-٦٣)

অনুবাদ: “জেনে রেখো! নিশ্চয় আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। তারা হলেন তারাই, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।”

বেলায়েতের প্রকারভেদ ও স্তরসমূহ (مراتب الولاية)

মুহাক্কিক উলামায়ে কিরাম ও সূফী তাত্ত্বিকগণের মতে বেলায়েত প্রধানত দুটি মৌলিক ভাগে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রশাসনিক আধ্যাত্মিক স্তরে বিভক্ত:

  1. সাধারণ বেলায়েত (الولاية العامة):

    ঈমান ও ইসলামের ভিত্তিতে প্রতিটি মুমিন মুসলমানের জন্য আল্লাহ তায়ালার যে সাধারণ বন্ধুত্ব ও অভিভাবকত্ব অর্জিত হয়। কুরআন মাজীদে এসেছে: ﴿اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ﴾ (আল-বাকারা: ২৫৭) — “যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক; তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান।”

  2. বিশেষ বেলায়েত (الولاية الخاصة):

    সকল ফরয-ওয়াজিব আদায়ের পর অবিরাম নফল ইবাদত, মুজাহাদা, যিকির ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে বান্দা যখন আল্লাহর খাস প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। কুরআন: ﴿وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ﴾ (আল-জাসিয়া: ১৯) — “আর আল্লাহ হলেন মুত্তাকীদের বন্ধু।” হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন: “বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার এত নৈকট্য লাভ করে যে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি; অতঃপর আমি তার শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও শক্তিরূপ ধারণ করি।” (সহীহ বুখারী: ৬৫০২)।

আওলিয়ায়ে কিরামের আধ্যাত্মিক পদমর্যাদার স্তরসমূহ

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর ‘আল-খাবারুদ দাল্লা আলা উজূদিল কুতবি ওয়াল আবদাল’ এবং আল্লামা আলী হুজবীরী (রহ.) ‘কাশফুল মাহজূব’ গ্রন্থে সহীহ হাদীসের ইঙ্গিত ও আছারের আলোকে আধ্যাত্মিক জগতের বিশেষ স্তরগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন:

  • কুতুব বা গাওস (القطب / الغوث): তিনি হলেন সমকালীন বিশ্বের সকল ওলীর আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু ও মধ্যমণি। প্রতি যুগে একজন মাত্র কুতুবুল আকতাব থাকেন।
  • ইমামান (الإمامان): কুতুবের সাহায্যকারী দুজন মহান ওলী, একজন তাঁর ডানে এবং অন্যজন বামে অবস্থান করেন।
  • আওতাদ (الأوتاد): চারজন মহান ওলী, যাঁদের পৃথিবীর চার প্রান্তের আধ্যাত্মিক স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়।
  • আবদাল (الأبدال): চল্লিশ জন বা সাতজন বিশেষ ওলী। হাদীসে এসেছে: হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আবদালগণ শাম দেশে থাকবেন, তাঁদের সংখ্যা চল্লিশ। যখন তাঁদের মধ্য থেকে কেউ ইন্তেকাল করেন, আল্লাহ অন্য একজনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। তাঁদের দোয়ায় বৃষ্টি বর্ষিত হয় এবং শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য আসে।” (মুসনাদে আহমাদ: ৮৯৬, সহীহ সনদ)।
  • নুজাবা ও নুক্বাবা (النجباء والنقباء): যথাক্রমে সত্তর জন এবং তিনশত জন পুণ্যবান ওলী, যাঁরা মানবজাতির আত্মিক কল্যাণে নিবেদিত থাকেন।

١٤- تحدث عن الطريقة المجددية ووظائفها-

[১৪. মুজাদ্দেদিয়া ত্বরিকাহ ও তার অজিফাসমূহ আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী আধ্যাত্মিক ইতিহাসে নকশবন্দিয়া তরীকাহর সর্বাধিক জনপ্রিয় ও ফলপ্রসূ শাখা হলো ‘মুজাদ্দেদিয়া তরীকাহ’ (الطريقة المجددية)। এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হিজরি দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মহান মুজাদ্দিদ শায়খ আহমাদ ফারুকী সিরহিন্দী (রহ.) (৯৭১–১০৩৪ হি./১৫৬৪–১৬২৪ খ্রি.), যিনি ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ নামে বিশ্বখ্যাত। তৎকালীন মোঘল সম্রাট আকবরের রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবর্তিত ভ্রান্ত ‘দ্বীনে ইলাহী’ এবং ওয়াহদাতুল ওজুদের নামে প্রচলিত শরীয়তবিরোধী ধারণার বিরুদ্ধে তিনি আপসহীন সংগ্রাম করে কুরআন ও সুন্নাহসম্মত নিখুঁত আধ্যাত্মিক বিপ্লব সাধন করেন।

মুজাদ্দেদিয়া তরীকাহর মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ

  1. সুন্নাহর পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ (اتباع السنة): এ তরীকায় শরীয়তের চুলচেরা আমল ছাড়া কোনো তাসাওউফ গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি মুস্তাহাব ও আদব রক্ষা করা আবশ্যক।
  2. নীরব যিকির বা যিকিরে খফী (الذكر الخفي): উচ্চৈঃস্বরে যিকির, গান-বাজনা (সমা) ও নাচানাচি (রাক্স) এ তরীকায় সম্পূর্ণরূপে বর্জিত। হৃদস্পন্দনের সাথে মিলিয়ে নিঃশব্দে আল্লাহর যিকির করা হয়।
  3. ওয়াহদাতুশ শুহূদ (وحدة الشهود): ইবনে আরাবীর ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ (স্রষ্টা ও সৃষ্টি একাকার)-এর অপব্যাখ্যার প্রতিবাদে মুজাদ্দিদে আলফে সানী প্রতিষ্ঠা করেন যে, সৃষ্টি ও স্রষ্টা কখনো এক হতে পারে না; বরং সৃষ্টি হলো স্রষ্টার কুদরতের নিদর্শন মাত্র।

মুজাদ্দেদিয়া তরীকাহর প্রধান অজিফাসমূহ (وظائف الطريقة)

মুজাদ্দেদিয়া তরীকায় সালিকের আত্মশুদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মতান্ত্রিক অজিফা ও সবক নির্ধারিত রয়েছে:

  • ১. দশ লতিফার যিকির (ذكر اللطائف العشر):

    মানবদেহে অবস্থিত দশটি সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র বা লতিফাকে জাগ্রত করা। এর মধ্যে ৫টি আলমে আমরের (ক্বলব, রুহ, সিরর, খফী, আখফা) এবং ৫টি আলমে খালক্বের (নফস ও চার উপাদান— মাটি, পানি, আগুন, বাতাস)। শায়খের দৃষ্টির ফয়েজের মাধ্যমে প্রথমে বাম স্তনের নিচে অবস্থিত ‘লতিফায়ে ক্বলব’-এ নিঃশব্দে ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ যিকির জারি করা হয়।

  • ২. নফী ও ইসবাতের যিকির (ذكر النفي والإثبات):

    শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় অন্তরে কালিমায়ে তাইয়্যিবা «لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ» পাঠ করা। ‘লা ইলাহা’ (নফী) বলে অন্তরের যাবতীয় গায়রুল্লাহর আসক্তি ধ্বংস করা এবং ‘ইল্লাল্লাহ’ (ইসবাত) বলে অন্তরে কেবল আল্লাহর জাত ও ভালোবাসাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা।

  • ৩. মুরাকাবা (المراقبة):

    বাহ্যিক চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে নিঃশব্দে গভীর ধ্যানে মগ্ন হওয়া। মুজাদ্দেদিয়া তরীকায় বিভিন্ন স্তরের মুরাকাবা রয়েছে; যেমন: মুরাকাবায়ে আহাদিয়্যাত (আল্লাহর এককত্বের ধ্যান), মুরাকাবায়ে মায়িয়্যাত (আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন), মুরাকাবায়ে আক্বরাবিয়্যাত (আল্লাহ গলার শিরার চেয়েও নিকটে) ইত্যাদি।

  • ৪. রাবেতায়ে শায়খ (رابطة الشيخ):

    যিকিরের পূর্বে কামিল শায়খের প্রতি অন্তরকে নিবিষ্ট করা, যেন শায়খের ক্বলবের মাধ্যমে বিশ্বনবী ﷺ-এর নূর সালিকের ক্বলবে বিচ্ছুরিত হয়।

  • ৫. খতমে খাজেগান (ختم خواجگان):

    সম্মিলিতভাবে নির্ধারিত দরূদ শরীফ, সূরা আল-ইনশিরাহ ও সূরা আল-ইখলাস পাঠ করে বিশ্ব মুসলিমের কল্যাণ ও রূহানী শক্তির জন্য দুআ করা।


١٥- ما معنى الشرك والكفر؟ وما الفرق بينهما؟

[১৫. শিরক ও কুফর কাকে বলে? উভয়ের মাঝে পার্থক্য কী?]

ভূমিকা

ইসলামী আকীদার মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ ও রিসালাত। ঈমানের বিপরীতমুখী সর্বনাশা দুটি ধারণা হলো ‘শিরক’ (الشرك) ও ‘কুফর’ (الكفر)। এ দুটি পাপ মানুষকে ইসলামের সীমানা থেকে চিরতরে বের করে দেয় এবং অনন্ত জাহান্নামের অধিকারী করে। নিম্নে এদের অর্থ, সংজ্ঞা ও পারস্পরিক সূক্ষ্ম পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হলো।

১. শিরক (الشرك)-এর অর্থ ও সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: অংশীদার করা, সমকক্ষ নির্ধারণ করা বা ভাগীদার বানানো (المشاركة والتشريك)।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: আল্লাহ তায়ালার উলুহিয়্যাত (উপাসনা), রুবূবিয়্যাত (পালনকর্তৃত্ব), যাত (সত্তা), সিফাত (গুণাবলি) কিংবা হুকুমতের ক্ষেত্রে অন্য কোনো সৃষ্টিকে সামান্যতমও অংশীদার বা সমকক্ষ সাব্যস্ত করাকে ‘শিরক’ বলে।
  • শরয়ি বিধান: শিরক হলো সবচেয়ে জঘন্যতম জুলুম (ظلم عظيم) এবং অমার্জনীয় অপরাধ। তওবা ছাড়া আল্লাহ তায়ালা শিরক কখনো ক্ষমা করবেন না: ﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ﴾ (আন-নিসা: ৪৮)।

২. কুফর (الكفر)-এর অর্থ ও সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ঢেকে রাখা, গোপন করা, সত্য অস্বীকার করা এবং অকৃতজ্ঞ হওয়া (الستر والإنكار والجحود)। রাতের অন্ধকার ও কৃষককেও আরবীতে ‘কাফের’ বলা হয়, কারণ তারা বীজ বা বস্তুকে মাটি ও আঁধার দিয়ে ঢেকে রাখে।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: দ্বীনের এমন কোনো সুনিশ্চিত ও সর্বজনবিদিত বিষয় (জরুরিয়াতে দ্বীন)-কে অন্তরে অস্বীকার করা বা মুখে অবিশ্বাস প্রকাশ করা, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে অকাট্যভাবে নিয়ে এসেছেন। যেমন— তাওহীদ, আখেরাত, কিয়ামত, মালায়েকা অস্বীকার করা কিংবা সালাত-যাকাতকে অপ্রয়োজনীয় বা অস্বীকার করা।

শিরক ও কুফরের মাঝে মৌলিক পার্থক্যসমূহ (الفرق بينهما)

ইসলামী আকীদা শাস্ত্রবিদদের মতে শিরক ও কুফরের সম্পর্ক হলো ‘উমুম ও খুসূস মুত্বলাক্ব’ (عموم وخصوص مطلق)। অর্থাৎ প্রতিটি শিরকই কুফর, কিন্তু প্রতিটি কুফর শিরক নয়:

তুলনার বিষয় শিরক (الشرك) কুফর (الكفر)
ধারণাগত ভিত্তি আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করে তাঁর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার বা সমকক্ষ স্থির করা (اثبات شريك مع الله)। সরাসরি সত্যকে অস্বীকার, অবিশ্বাস বা ধর্মের বিধান প্রত্যাখ্যান করা (انكار الحق وجحوده)।
ব্যাপ্তি ও পরিসর কুফরের একটি বিশেষ ও চরম রূপ। সকল শিরকই কুফরের অন্তর্ভুক্ত। শিরকের চেয়ে ব্যাপকতর। সকল কুফর শিরক নাও হতে পারে।
দৃষ্টান্ত মূর্তি, সূর্য বা কোনো বুজুর্গকে ইবাদত করা বা আল্লাহর সমকক্ষ ক্ষমতার অধিকারী ভাবা। নাস্তিক্যবাদ (আল্লাহর অস্তিত্বই অস্বীকার করা), কিয়ামতকে অস্বীকার করা বা নামাযের ফরযিয়াত অস্বীকার করা।
মনস্তাত্ত্বিক দিক এখানে বহুত্ববাদ (Polytheism) বিদ্যমান থাকে। এখানে সরাসরি অস্বীকার (Denial), ঔদ্ধত্য বা অকৃতজ্ঞতা থাকে।

١٦- تحدث عن مساهمة خواجه معين الدين الجستى في نشر الإسلام-

[১৬. ইসলাম প্রচারে খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ) এর অবদান আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের সুমহান দাওয়াত, সাম্য ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবের ইতিহাসে যার নাম চিরভাস্বর হয়ে আছে, তিনি হলেন ‘সুলতানুল হিন্দ’, ‘আতা-এ রাসূল’, গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা সাইয়্যিদ মঈনুদ্দীন চিশতী সানজারী আজমেরী (রহ.) (৫৩৭–৬৩৩ হি./ ১১৪১–১২৩৬ খ্রি.)। তলোয়ারের শক্তি ব্যতীত কেবল আধ্যাত্মিক নূর, অহিংসা, ভালোবাসা ও অনুপম চারিত্রিক মাধুর্যের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন অমুসলিমপ্রধান ভারতবর্ষে ইসলামের চিরস্থায়ী ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। নিম্নে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানসমূহ পর্যালোচনা করা হলো।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও আগমন

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.) ১১৪১ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের সিজিস্তানের সানজার নামক জনপদে এক সম্ভ্রান্ত হাসানী-হুসাইনী সাইয়্যিদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বোখারা ও সমরকন্দে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি চিশতিয়া তরীকাহর মহান ইমাম হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দীর্ঘ বিশ বছর কঠোর আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন এবং খেলাফতপ্রাপ্ত হন। অতঃপর হারামাইনে যিয়ারতের সময় মদীনা শরীফ থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রুহানী নির্দেশে তিনি ভারতবর্ষে হিজরত করেন এবং ১১৪২ হিজরি/১১৯১ খ্রিস্টাব্দে রাজপুতানার চরম বৈরী কেন্দ্রভূমি ‘আজমীর’-এ স্থায়ীভাবে আস্তানা কায়েম করেন।

উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে খাজা সাহেবের যুগান্তকারী অবদানসমূহ

  1. উদার নৈতিকতা ও সাম্যের মাধ্যমে অন্তরের জয়:

    তৎকালীন হিন্দু সমাজে কঠোর জাতিভেদ প্রথা (বর্ণপ্রথা) বিদ্যমান ছিল, যেখানে নিম্নবর্ণের শূদ্ররা মানুষের মর্যাদাও পেত না। খাজা সাহেব এসে সকল মানুষের জন্য তাঁর দরবার উন্মুক্ত করে দেন। উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদহীন এই সাম্য দেখে লক্ষ লক্ষ মানুষ দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে।

  2. বিপুলসংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণ (প্রায় ৯০ লক্ষ):

    ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত বর্ণনামতে, খাজা সাহেবের পুণ্যময় জীবদ্দশায় তাঁর প্রত্যক্ষ দাওয়াত, অসামান্য চরিত্র ও আধ্যাত্মিক প্রভাবে প্রায় নব্বই লক্ষ মানুষ মূর্তিপূজা ও পৌত্তলিকতা ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

  3. লঙ্গরখানা ও নিঃস্বার্থ মানবসেবা (গরীবে নেওয়াজ):

    তিনি ছিলেন দরিদ্র, নিঃস্ব ও অনাথদের পরম আশ্রয়স্থল। তাঁর খানকায় প্রতিদিন বিশাল ‘লঙ্গরখানা’ (অন্নসত্র) চালু থাকত, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষ বিনামূল্যে তৃপ্তি সহকারে আহার করত। এ কারণেই সাধারণ মানুষ তাঁকে পরম ভালোবেসে ‘গরীবে নেওয়াজ’ (দরিদ্রদের বন্ধু ও দাতা) উপাধিতে ভূষিত করে।

  4. চিশতিয়া ত্বরিকাহর ভিত্তি ও আধ্যাত্মিক সিলসিলা বিস্তার:

    তিনি উপমহাদেশে ‘চিশতিয়া তরীকাহ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা প্রেম, ক্ষমা ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বহু বিশ্ববিখ্যাত খলীফা তৈরি করেন, যাঁদের মাধ্যমে সমগ্র ভারতে ইসলামের বিস্তার ঘটে। তাঁর শীর্ষ খলীফাদের মধ্যে ছিলেন:

    • হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী (দিল্লি)
    • হযরত বাবা ফরীদুদ্দীন গঞ্জে শাকার (পাঞ্জাব)
    • হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আওলিয়া (দিল্লি)
    • হযরত আলাউল হক পাণ্ডবী ও হযরত নূর কুতুবে আলম (বাংলা)
  5. রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আনয়ন:

    তৎকালীন শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহানের অত্যাচারী শাসন সত্ত্বেও খাজা সাহেব কোনো রাজনৈতিক সংঘাতের পথে না গিয়ে অহিংস দাওয়াতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আধ্যাত্মিক বিজয় অর্জন করেন।

উপসংহার ও ওফাত

খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.) ৬৩৩ হিজরির ৬ই রজব মোতাবেক ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ৯৭ বছর বয়সে আজমীর শরীফে ওফাত বরণ করেন। আজমীর শরীফে তাঁর পবিত্র মাযার অবস্থিত, যা আজও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কোটি কোটি মানুষের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রস্থল। উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাস রচনা করতে গেলে খাজা আজমেরীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।


উপসংহার

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২-এর ‘আত-তাসাওউফ’ (বিষয় কোড: ২০২৮০৪) প্রশ্নপত্রটির সার্বিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, তাসাওউফ কোনো প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন শাস্ত্র নয়; বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহর গভীরতম আত্মিক উপলব্ধির নাম। ক্বলবের পরিশুদ্ধি, তাওবাহ-ইস্তিগফারের অবিরাম চর্চা, শরীয়ত ও হাকীকতের সমন্বয়, কামিল শায়খের সঠিক নির্বাচন এবং উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারক মহান আওলিয়ায়ে কিরামের অবদান সম্পর্কে প্রতিটি প্রশ্নের প্রামাণ্য আলোচনা শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনেই সহায়তা করবে না, বরং তাদের বাস্তব জীবনেও তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. তাসাওউফ ও শরীয়তের মধ্যে প্রকৃত সম্পর্ক কী?

শরীয়ত হলো বাহ্যিক বিধানাবলির নাম, আর তাসাওউফ হলো সেই বিধানাবলি পালনের আন্তরিক রূহ ও গভীর সত্য (ইহসান)। শরীয়ত ছাড়া তাসাওউফ বাতিল ও বিভ্রান্তি, আর তাসাওউফ ছাড়া শুধু বাহ্যিক আমল আত্মাহীন দেহের ন্যায়। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন: “যে ফিকহ শিখল কিন্তু তাসাওউফ অর্জন করল না সে ফাসেক হলো, আর যে তাসাওউফ শিখল কিন্তু ফিকহ অর্জন করল না সে যিন্দীক হলো; আর যে উভয়টি সমন্বয় করল সে সত্যে উপনীত হলো।”

২. একজন কামিল শায়খ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড কোনটি?

কামিল শায়খের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো— তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আলেম হবেন, সুন্নাহর পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসারী ও বিদয়াতমুক্ত হবেন এবং কোনো প্রতিষ্ঠিত সিলসিলার কামিল শায়খের নিকট থেকে খেলাফত ও ইজাযতপ্রাপ্ত হবেন। যাঁর সান্নিধ্যে বসলে আল্লাহর স্মরণ বৃদ্ধি পায় এবং দুনিয়ার আসক্তি হ্রাস পায়, তিনিই প্রকৃত কামিল শায়খ।

৩. ক্বলবের রোগ নিরাময়ে তাসাওউফের প্রধান ভূমিকা কী?

চিকিৎসাবিজ্ঞান যেমন দেহের বাহ্যিক রোগ সারায়, তাসাওউফ তেমনি ক্বলবের মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি যেমন অহংকার (কিবর), রিয়া (লোকদেখানো ভাব), হিংসা (হাসাদ) ও দুনিয়ার মোহ নিরাময় করে। নিয়মিত যিকির, মুরাকাবা, মুহাসাবা ও নেককারদের সোহবতের মাধ্যমে অন্তরকে ‘ক্বলবে সালীম’-এ রূপান্তর করাই তাসাওউফের মূল কাজ।

৪. মু’জিযা ও কারামতের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

মু’জিযা নবুওয়াতের প্রমাণের জন্য আম্বিয়ায়ে কিরামের মাধ্যমে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জসহকারে প্রকাশ পায়। পক্ষান্তরে, কারামত কোনো প্রকাশ্য দাবি ছাড়া আল্লাহর প্রিয় মুত্তাকী ওলীগণের মাধ্যমে তাঁদের নিষ্ঠা ও ইত্তেবা-এ সুন্নাতের ফলস্বরূপ অলৌকিকভাবে প্রকাশিত হয়। কারামত মূলত নবীর মু’জিযারই অনুগামী শাখা।

৫. ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফিয়া-ই কেরামের ভূমিকা কেমন ছিল?

উপমহাদেশে ইসলাম বিস্তার কোনো সামরিক বিজয় বা শক্তির মাধ্যমে ঘটেনি; বরং হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী, শায়খ আব্দুল কাদির জিলানীর অনুসারীগণ, হযরত শাহ জালাল, মুজাদ্দিদে আলফে সানী এবং হযরত আবু বকর সিদ্দিক ফুরফুরাভী (রহিমাহুমুল্লাহ)-এর মতো মহান অলীদের মানবপ্রেম, লঙ্গরখানা, বর্ণবাদের অবসান ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের মাধ্যমেই কোটি কোটি মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜