পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২৪
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المذاهب الفقهية
[আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ]
বিষয় কোড: ২০২৮০৫
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن أربعة من مجموعة (الف) وعن أربعة من مجموعة (ب)-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ থেকে চারটি এবং (খ) অংশ থেকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও। তবে পরীক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ ও সমৃদ্ধ একাডেমিক প্রস্তুতির লক্ষ্যে নিম্নে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্নের মানসম্মত ও প্রামাণ্য উত্তর বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো।]
مجموعة (الف) (ক বিভাগ)
الدرجات — ١٥ × ٤ = ٦٠
١- عرف الفقه لغة واصطلاحا ثم بين مساهمة عبد الله بن مسعود رضى الله عنه في تطور الفقه-
[১. الفقه এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। ফিকহের বিকাশে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এর অবদান বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের অনুশাসনমালাকে মানুষের ব্যবহারিক জীবনে নির্ভুলভাবে বাস্তবায়নের জন্য ‘ইলমুল ফিকহ’ (علم الفقه) এক অনন্য ও অপরিহার্য শাস্ত্র। কুরআন ও সুন্নাহর অতল সমুদ্র থেকে আহরিত বিধানাবলি মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল শাখা-প্রশাখাকে পরিচালিত করে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ফিকহী দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞায় যিনি শীর্ষস্থানীয় ছিলেন, তিনি হলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)। তিনি কুফায় যে ইলমী ধারার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত হানাফি মাযহাব সহ সামগ্রিক ইসলামী ফিকহের সুদৃঢ় ভিত্তিমূলে পরিণত হয়। নিম্নে ফিকহের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা এবং ফিকহের বিকাশে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ঐতিহাসিক অবদান বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো।
ইলমুল ফিকহের সংজ্ঞা (تعريف الفقه)
১. আভিধানিক অর্থ (المعنى اللغوي)
‘আল-ফিকহ’ (الفقه) শব্দটি আরবি ধাতু ‘ফাক্বিহা-ইয়াফক্বাহু’ (فَقِهَ – يَفْقَهُ – فِقْهًا) থেকে নিষ্পন্ন। এর মূল আভিধানিক অর্থ হলো: কোনো বিষয়ের গভীর জ্ঞান, সূক্ষ্ম উপলব্ধি ও গভীর অনুধাবন (الفهم الدقيق والفطنة)। সাধারণ বোধশক্তিকে ফিকহ বলা হয় না; বরং কথার অন্তরালের গূঢ় রহস্য ও তাৎপর্য অনুধাবন করাকে ফিকহ বলা হয়।
পবিত্র কুরআনে এই অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে:
﴿قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِّمَّا تَقُولُ﴾
“তারা বলল: হে শুয়াইব! তুমি যা বলছ তার অনেক কথাই আমরা বুঝি না (অনুধাবন করি না)।” (সূরা হূদ: ৯১)।
কুরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে:
﴿فَمَالِ هَٰؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا﴾
“এই কওমের কী হলো যে, তারা কোনো কথাই অনুধাবন করতে পারছে না!” (সূরা আন-নিসা: ৭৮)।
হাদিস শরীফে দ্বীনের গভীর জ্ঞান ও সূক্ষ্ম প্রজ্ঞার অর্থে শব্দটি এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
«مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ»
“আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা ও সঠিক অনুধাবন ক্ষমতা (তাফাক্কুহ ফিদ দ্বীন) দান করেন।” (সহীহ বুখারী: ৭১; সহীহ মুসলিম: ১০৩৭)।
২. পারিভাষিক অর্থ (المعنى الاصطلاحي)
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ‘ফিকহ’-এর সংজ্ঞা যুগে যুগে উসূলবিদ ও ফকীহগণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। এর প্রধান দুটি সংজ্ঞা প্রণিধানযোগ্য:
- ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.)-এর সর্বজনীন সংজ্ঞা:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ফিকহের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন:
«الفِقْهُ: مَعْرِفَةُ النَّفْسِ مَا لَهَا وَمَا عَلَيْهَا»
“নিজের জন্য কল্যাণকর ও ক্ষতিকর বিষয়সমূহ (অধিকার ও দায়িত্বসমূহ) সম্পর্কে আত্মার সম্যক জ্ঞান লাভ করার নামই ফিকহ।”
এই সংজ্ঞায় আকীদাহ, আমল ও আখলাক— দ্বীনের সকল ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে আকীদার অংশকে ‘আল-ফিকহুল আকবার’ এবং ব্যবহারিক বিধানকে সাধারণ ‘ফিকহ’ হিসেবে পরিগণিত করা হয়। - জমহুর উসূলবিদ ও ফকীহগণের সংজ্ঞা (ইমাম শাফিঈ ও পরবর্তী উসূলীয় পণ্ডিতগণ):
পরিভাষায় ইলমুল ফিকহের সুনির্দিষ্ট প্রায়োগিক সংজ্ঞা হলো:
«العِلْمُ بِالأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ العَمَلِيَّةِ المُكْتَسَبُ مِنْ أَدِلَّتِهَا التَّفْصِيلِيَّةِ»
“সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত দলীল-প্রমাণ (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস) থেকে ইস্তিম্বাত বা গবেষণার মাধ্যমে আহরিত শরীয়তের ব্যবহারিক বিধিবিধান সম্পর্কিত জ্ঞানকে ফিকহ বলে।”
ফিকহের বিকাশে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ঐতিহাসিক অবদান
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন ষষ্ঠ ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী এবং আস-সাবিকুনাল আওয়ালুনের অন্তর্ভুক্ত। তিনি নবী কারীম (সা.)-এর সার্বক্ষণিক খাদেম ও সহচর ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিগত গৃহকর্মে সহায়তা, মিসওয়াক, জুতো ও বালিশ বহন করার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার কারণে তিনি নবীজির প্রকাশ্য ও গোপনীয় যাবতীয় আমল, ইবাদত ও ফতোয়া প্রত্যক্ষভাবে প্রত্যক্ষ করার অনন্য সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ফিকহের বিকাশে তাঁর অবদান আলোচনা করার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত দিকসমূহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
১. কুরআন ও সুন্নাহর গভীরতম জ্ঞান ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ প্রশংসা
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কুরআন তিলাওয়াত ও তাফসীরের ক্ষেত্রে সাহাবাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন। তিনি স্বয়ং বলতেন: “আল্লাহর শপথ, যাঁর ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, আল্লাহর কিতাবের এমন কোনো সূরা নাজিল হয়নি যার সম্পর্কে আমি জানি না যে তা কোথায় নাজিল হয়েছে এবং কার ব্যাপারে নাজিল হয়েছে। যদি আমি জানতাম যে কোনো ব্যক্তি উটের পিঠে চড়ে পৌঁছা সম্ভব এমন দূরত্বের মধ্যে আমার চেয়ে কিতাবুল্লাহ সম্পর্কে বেশি জানে, তবে আমি অবশ্যই তার কাছে যেতাম।” (সহীহ বুখারী)।
নবী কারীম (সা.) তাঁর ফতোয়া ও দ্বীনি সমঝের প্রতি উম্মতকে আস্থাশীল করতে গিয়ে ইরশাদ করেছেন:
«رَضِيتُ لِأُمَّتِي مَا رَضِيَ لَهَا ابْنُ أُمِّ عَبْدٍ»
“আমার উম্মতের জন্য ইবনে উম্মে আবদ (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ) যা পছন্দ ও ফয়সালা করেন, আমিও তাতে সন্তুষ্ট ও সম্মত।” (মুস্তাদরাকে হাকেম)।
২. কুফায় আগমন ও ‘মাদরাসাতুল কুফা’র ভিত্তি স্থাপন
আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাঁর খিলাফতকালে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে নবনির্মিত কুফা নগরীতে বিচারক (কাজী), বাইতুল মালের তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেন। উমর (রা.) কুফাবাসীদের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক পত্রে লেখেন:
«إِنِّي قَدْ بَعَثْتُ عَمَّارًا أَمِيرًا، وَعَبْدَ اللَّهِ بْنَ مَسْعُودٍ مُعَلِّمًا وَوَزِيرًا، وَهُمَا مِنْ نُجَبَاءِ أَصْحَابِ مُحَمَّدٍ، فَاقْتَدُوا بِهِمَا، وَإِنِّي قَدْ آثَرْتُكُمْ بِعَبْدِ اللَّهِ عَلَى نَفْسِي»
“আমি আম্মারকে গভর্নর এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদকে শিক্ষক ও উজির হিসেবে পাঠালাম। তারা দুজনেই মুহাম্মাদ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী। তোমরা তাদের অনুসরণ কর। জেনে রেখো, আব্দুল্লাহকে তোমাদের মাঝে পাঠিয়ে আমি নিজেকে তোমাদের জন্য অগ্রাধিকার দিয়ে কুরবানি করলাম।” (তাবারানী, সুনানে দারিমী)।
কুফায় এসে ইবনে মাসউদ (রা.) একটি বিশাল ইলমী শিক্ষালয় বা ফিকহী একাডেমির প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইতিহাসে ‘মাদরাসাতুল কুফা’ বা ‘আসহাবুর রায়’-এর মূল সূতিকাগার নামে পরিচিত।
৩. ‘ইল্লত’ বা বিধানের কার্যকারণ অনুসন্ধান ও যুক্তিভিত্তিক ফিকহের বিকাশ
ইরাক ও পারস্য অঞ্চল ছিল বহু প্রাচীন সভ্যতা, জটিল সামাজিক সমস্যা ও বহুবিধ মিশ্র সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে নিত্যনতুন জটিল সমস্যার উদ্ভব হতো যা হিজাজে ছিল না। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নصوص-এর পাশাপাশি শরীয়তের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরীয়াহ) এবং বিধানের অন্তর্নিহিত কারণ (ইল্লত) অনুসন্ধান করে সমাধান বের করতেন। তিনি নসের অনুপস্থিতে ইজতিহাদ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ (রায় মাহমুদাহ) প্রয়োগ করে ফতোয়া দিতেন, যা পরবর্তীতে ‘ফিকহে হানাফি’র কিয়াস ও ইসতিহসানের ভিত্তি তৈরি করে।
৪. প্রখ্যাত তাবেয়ী ছাত্রবৃন্দের লালন ও ফিকহী সিলসিলার সূচনা
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কুফায় বহুসংখ্যক উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন তাবেয়ী ফকীহ তৈরি করেছিলেন, যাঁরা বিশ্বজুড়ে ফিকহের মশাল প্রজ্বলিত রাখেন। তাঁর বিশিষ্ট ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন:
- আলক্বামাহ ইবনে কায়েস আন-নাখয়ী (রহ.)
- আল-আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ আন-নাখয়ী (রহ.)
- মাসরূক ইবনুল আজদা আল-হামদানী (রহ.)
- উবাইদাহ আস-সালমানী (রহ.)
- শুরায়হ আল-কাজী (রহ.)
- মুররাহ আত-তায়্যিব (রহ.)
আলক্বামাহ ও আসওয়াদের ইলম এসে পৌঁছায় ইবরাহীম আন-নাখয়ীর কাছে; ইবরাহীম নাখয়ী থেকে লাভ করেন হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান; আর হাম্মাদের দীর্ঘ ১৮ বছরের সান্নিধ্যে ফিকহের পূর্ণতা লাভ করেন স্বীয় যুগের শ্রেষ্ঠ ইমাম, ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.)। ফলে ফিকহে হানাফির মূল ইলমী উৎস সরাসরি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সাথে যুক্ত।
৫. মাসআলা উদঘাটন ও ফতোয়া প্রদানের অনন্য দৃষ্টান্ত
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ফিকহী প্রজ্ঞার বহু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। একবার এমন এক মহিলার বিষয়ে প্রশ্ন এলো, যার মোহর ধার্য হওয়ার আগেই তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে এবং তাদের মধ্যে শারীরিক মিলনও হয়নি। ইবনে মাসউদ (রা.) গভীরভাবে চিন্তা করে ইজতিহাদের ভিত্তিতে ফতোয়া দিলেন যে, উক্ত মহিলা তার সমমানের নারীদের মতো পূর্ণ মোহর (মিহরুল মিছল) পাবে, তাকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে এবং সে স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে মিরাছের অংশ পাবে। পরবর্তীতে মা’কিল ইবনে সিনান আল-আশজাঈ (রা.) এসে সাক্ষ্য দিলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিরওয়া বিনতে ওয়াসিক নামক এক মহিলার ক্ষেত্রে হুবহু এই ফয়সালাই প্রদান করেছিলেন। এ কথা শুনে ইবনে মাসউদ (রা.) আনন্দে অশ্রুসিক্ত হন যে তাঁর ইজতিহাদ সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর সাথে মিলে গেছে। (জামে তিরমিযী: ১১৪৫)।
উপসংহার
সারসংক্ষেপে বলা যায়, ফিকহের সূচনাকালে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর যে কতিপয় সাহাবী ইসলামী আইনশাস্ত্রের সাংগঠনিক ও পদ্ধতিগত ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন শীর্ষস্থানীয় দিকপাল। তাঁর মাধ্যমে কুফা নগরী তৎকালীন মুসলিম জাহানের ফিকহ ও ফতোয়ার বিশ্বখ্যাত কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁরই প্রতিষ্ঠিত নীতি, রায় ও তাফাক্কুহের ওপর ভিত্তি করে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) হানাফি মাযহাবের বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেন। তাই ইসলামী ফিকহের ক্রমবিকাশ ও সমৃদ্ধিতে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
٢- عرف بالمذاهب الفقهية الأربعة ثم بين أصول الفقه الحنفي مفصلا-
[২. চার মাযহাবের পরিচয় দাও এবং ফিকহে হানাফির মূলনীতি বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের বিধানাবলি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আহরণ করে মানবসমাজের দৈনন্দিন জীবনের উপযোগী করে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের চার প্রধান ফিকহী মাযহাব মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত ঐকমত্যের স্মারক। হিজরী দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে আত্মপ্রকাশকারী এই চার মাযহাব— হানাফি, মালিকি, শাফেয়ী ও হাম্বলি— ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র কুরআন ও সুন্নাহর সুবিন্যস্ত ব্যাখ্যা ও বিচারব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। প্রতিটি মাযহাবের পেছনে রয়েছে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত মূলনীতি ও গবেষণা পদ্ধতি। নিম্নে চার মাযহাবের সংক্ষিপ্ত পরিচয় এবং ফিকহে হানাফির সুবিন্যস্ত মূলনীতিসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
চার মাযহাবের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (التعريف بالمذاهب الفقهية الأربعة)
১. মাযহাবে হানাফি (المذهب الحنفي)
প্রতিষ্ঠাতা: ইমামে আযম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.) (৮০ হি. – ১৫০ হি.)। তিনি তাবেয়ী ছিলেন এবং হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) সহ একাধিক সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন।
প্রধান কেন্দ্র ও বৈশিষ্ট্য: ইরাকের কুফা নগরীতে এর উৎপত্তি। এটি ‘আসহাবুর রায়’ বা যুক্তিভিত্তিক ও যৌক্তিক কারণভিত্তিক (তালীলে আহকাম) গবেষণা ধারার প্রতিনিধি। ইমাম আবু হানিফা তাঁর চল্লিশজন শীর্ষস্থানীয় ফকীহ ও মুজতাহিদ শিষ্যের সমন্বয়ে একটি যৌথ গবেষণা পরিষদের মাধ্যমে প্রায় অর্ধলক্ষ মাসআলা প্রণয়ন ও সংকলন করেন। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এই মাযহাবের প্রধান গ্রন্থকার ও প্রসারক। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া, মিশর ও বলকান অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এই মাযহাবের অনুসারী।
২. মাযহাবে মালিকি (المذهب المالكي)
প্রতিষ্ঠাতা: ইমামু দারিল হিজরাহ মালিক ইবনে আনাস আল-আসবাহী (রহ.) (৯৩ হি. – ১৭৯ হি.)।
প্রধান কেন্দ্র ও বৈশিষ্ট্য: মদিনা মুনাওয়ারা। এটি ‘আসহাবুল হাদিস’-এর অন্যতম প্রধান ধারা। এই মাযহাবের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে ‘আমালু আহলিল মাদীনাহ’ বা মদিনাবাসীদের অবিচ্ছিন্ন আমলকে একক হাদিসের চেয়েও অধিক শক্তিশালী দলীল মনে করা। তাঁর বিখ্যাত সংকলন ‘আল-মুয়াত্তা’ হাদিস ও ফিকহের প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য কিতাব। বর্তমানে উত্তর আফ্রিকা (মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া), সুদান ও উপসাগরীয় দেশসমূহে এই মাযহাব সুপ্রসিদ্ধ।
৩. মাযহাবে শাফেয়ী (المذهب الشافعي)
প্রতিষ্ঠাতা: ইমাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) (১৫০ হি. – ২০৪ হি.)।
প্রধান কেন্দ্র ও বৈশিষ্ট্য: মক্কা, বাগদাদ ও মিশর। ইমাম শাফেয়ী হিজাজের হাদিসভিত্তিক ফিকহ (ইমাম মালিকের নিকট শিক্ষা) এবং ইরাকের যুক্তিভিত্তিক ফিকহ (ইমাম মুহাম্মদের নিকট শিক্ষা)-এর এক অপূর্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় সাধন করেন। তিনি সর্বপ্রথম উসূলুল ফিকহের নিয়মনীতি লিখিত আকারে প্রণয়ন করেন তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ’-এর মাধ্যমে। তাঁর ফিকহী মতবাদ ‘কাউলে কাদীম’ (ইরাকের পূর্ববর্তী মত) এবং ‘কাউলে জাদীদ’ (মিশরের আধুনিক পরিমার্জিত মত)-এ বিভক্ত। বর্তমানে মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে এই মাযহাব বহুল প্রচলিত।
৪. মাযহাবে হাম্বলি (المذهب الحنبلي)
প্রতিষ্ঠাতা: ইমামুল মুহাদ্দিসীন আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাম্বল আশ-শায়বানী (রহ.) (১৬৪ হি. – ২৪১ হি.)।
প্রধান কেন্দ্র ও বৈশিষ্ট্য: বাগদাদ। ইমাম আহমদ ছিলেন সুন্নাহ ও হাদিসের এক সুবিশাল পর্বত। তিনি মুতাজিলাদের কুরআন সৃষ্টির ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে অটল ঈমানের পরিচয় দেন। তাঁর রচিত ‘মুসনাদে আহমদ’ হাদিসের অন্যতম বৃহত্তম বিশ্বকোষ। এই মাযহাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নুসূস (কুরআন ও সুন্নাহ)-এর অক্ষরে অক্ষরে আনুগত্য এবং দুর্বল হাদিসকেও কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকার প্রদান। বর্তমানে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলে এই মাযহাব রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আইনে ব্যাপকভাবে অনুসৃত।
ফিকহে হানাফির মূলনীতি (أصول الفقه الحنفي)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) স্বয়ং তাঁর ইজতিহাদ ও ফতোয়া প্রদানের পদ্ধতি ও উসূল বর্ণনা করে সুস্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন:
«إِنِّي آخُذُ بِكِتَابِ اللَّهِ إِذَا وَجَدْتُهُ، فَمَا لَمْ أَجِدْهُ فِيهِ أَخَذْتُ بِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ، فَإِذَا لَمْ أَجِدْ فِيهِمَا أَخَذْتُ بِقَوْلِ أَصْحَابِهِ… وَلَا أَخْرُجُ عَنْ قَوْلِهِمْ إِلَى قَوْلِ غَيْرِهِمْ، فَإِذَا انْتَهَى الْأَمْرُ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَالشَّعْبِيِّ وَابْنِ سِيرِينَ وَالْحَسَنِ… فَهُمْ رِجَالٌ اجْتَهَدُوا، فَأَجْتَهِدُ كَمَا اجْتَهَدُوا»
“আমি প্রথমে আল্লাহর কিতাব গ্রহণ করি। যদি তাতে বিধান না পাই, তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ গ্রহণ করি। যদি এ দুটির কোনোটিতে সমাধান না পাই, তবে সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য গ্রহণ করি… তাঁদের মতামত ছেড়ে অন্যদের কথায় যাই না। কিন্তু ফয়সালা যখন ইবরাহীম নাখয়ী, শাবী, ইবনে সীরীন ও হাসান বসরীর মতো তাবেয়ীদের নিকট পৌঁছায়, তবে তাঁরা যেমন ইজতিহাদ করেছেন, আমিও তাঁদের মতো ইজতিহাদ করি।” (তারিখে বাগদাদ: ১৩/৩৬৮)।
হানাফি উসূলবিদগণ (যেমন ইমাম শাশী, ইমাম বাযদাবী ও ইমাম সারাখসী) হানাফি ফিকহের মূলনীতিসমূহকে নিম্নোক্ত মৌলিক ভাগে বিন্যস্ত করেছেন:
১. কিতাবুল্লাহ (كتاب الله) — কুরআনুল কারীম
কুরআন শরীয়তের সর্বপ্রথম ও সর্বোচ্চ প্রামাণ্য উৎস। হানাফি উসূল অনুসারে:
– আম্মের অকাট্যতা: কুরআনের ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ (عام) হানাফিদের নিকট অকাট্য (قطعي الدلالة)। তাই একটি খাবারে ওয়াহিদ (একক হাদিস) দ্বারা কুরআনের ব্যাপক বিধানকে সরাসরি পরিবর্তন বা মানসূখ করা যায় না; বরং খাবারে ওয়াহিদ কেবল বিস্তারিত রূপ দেয়।
– ফরজ ও ওয়াজিবের বিভাজন: কুরআনের অকাট্য দলীল (নসসে ক্বাতি) দ্বারা প্রমাণিত বিধানকে ‘ফরজ’ এবং প্রবল ধারণাপ্রসূত দলীল দ্বারা প্রমাণিত বিধানকে ‘ওয়াজিব’ হিসেবে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়েছে।
২. সুন্নাতে রাসূলুল্লাহ (سنة رسول الله ﷺ)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ হলো কুরআনের ব্যাখ্যা ও দ্বিতীয় প্রধান উৎস। হানাফি ফিকহে সুন্নাহকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
– মুতাওয়াতির (المتواتر): যা অকাট্য নিশ্চিত জ্ঞান (العلم اليقيني) দান করে।
– মাশহুর (المشهور): যা মূলত সাহাবীদের যুগে একক ছিল কিন্তু তাবেয়ীদের যুগে তাওয়াতুরের স্তরে পৌঁছেছে। এটি হানাফিদের নিকট অত্যন্ত মর্যাদাবান এবং এর দ্বারা কুরআনের সাধারণ বিধানের تخصيص (বিশেষায়ন) করা যায়।
– খাবারে ওয়াহিদ (خبر الواحد): একক রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদিস। হানাফি মাযহাবে খাবারে ওয়াহিদ আমলযোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত হলো— রাবীর আমল যেন স্বীয় বর্ণনার বিপরীত না হয়, ঘটনাটি এমন সাধারণ ও উন্মুক্ত না হয় যা সবার জানা আবশ্যক (عموم البلوى) এবং তা কিতাবুল্লাহর নিশ্চিত মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।
৩. আল-ইজমা (الإجماع) — সর্বসম্মত ঐকমত্য
কোনো যুগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর মুজতাহিদগণের কোনো শরয়ী হুকুমের ওপর একমত হওয়াকে ইজমা বলে। হানাফি উসূল মতে ইজমার স্তরবিন্যাস রয়েছে:
– সাহাবায়ে কেরামের প্রকাশ্য ইজমা (অকাট্য ও ফরজের সমতুল্য)।
– সাহাবাদের সুকূতী ইজমা (নীরব সমর্থন)।
– পরবর্তী যুগের মুজতাহিদগণের ইজমা।
৪. আল-কিয়াস (القياس) — যৌক্তিক সাদৃশ্যমূলক অনুমান
যখন কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায় কোনো নতুন সমস্যার সরাসরি বিধান পাওয়া যায় না, তখন পূর্ববর্তী কোনো মূল বিধানের অন্তর্নিহিত কারণ (ইল্লত)-এর সাথে নতুন বিষয়ের সাদৃশ্য বিচার করে সমরূপ হুকুম নির্ধারণ করাকে কিয়াস বলে। হানাফি মাযহাবে কিয়াসের প্রয়োগ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সূক্ষ্ম। কিয়াসের চারটি রুকন: আসল (মূল বিষয়), ফার’ (নতুন বিষয়), হুকম (মূল বিধান) এবং ইল্লত (কার্যকারণ)।
৫. আল-ইসতিহসান (الاستحسان) — উত্তম পন্থা গ্রহণ ও অগ্রাধিকার
ইসতিহসান হানাফি মাযহাবের অন্যতম যুগান্তকারী মূলনীতি। এর পারিভাষিক অর্থ হলো: কোনো আপাতস্পষ্ট কিয়াস (কিয়াসে জলী)-এর কঠোরতার ফলে জনকল্যাণে ব্যাঘাত ঘটলে বা কঠিনতা দেখা দিলে, আরও কোনো সূক্ষ্মতর দলীল, শক্তিশালী কারণ বা বিশেষ উপযোগিতার ভিত্তিতে সেই কিয়াস পরিত্যাগ করে সহজতর ও অধিক কল্যাণকর বিকল্প পন্থা (কিয়াসে খফী বা নস) গ্রহণ করা। যেমন: সাধারণ কিয়াসের নিয়মে ওযু ছাড়া ভুলে কিছু খেয়ে ফেললে রোজা ভেঙে যাওয়ার কথা, কিন্তু নসের ভিত্তিতে ইসতিহসান করে বলা হয়েছে যে এতে রোজা ভাঙবে না।
৬. আক্বওয়ালুস সাহাবাহ (أقوال الصحابة)
সাহাবায়ে কেরামের ফতোয়া ও বক্তব্য হানাফি মাযহাবে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। বিশেষত যে সকল বিষয়ে যুক্তি বা কিয়াসের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয় (তাওক্বীফী বিষয়), সেখানে সাহাবীদের বক্তব্যকে সুন্নাহর সমতুল্য বিবেচনা করা হয় এবং কিয়াসের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়।
৭. আল-উরফ ওয়াল আদাহ (العرف والعادة) — প্রচলিত প্রথা ও রেওয়াজ
শরীয়তের কোনো স্পষ্ট নস বা নিষেধের পরিপন্থী না হওয়া সাপেক্ষে সমাজে প্রচলিত সুষ্ঠু ও মার্জিত প্রথা বা ব্যবসায়িক লেনদেনের রীতিনীতিকে হানাফি ফিকহে দলীল হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফিকহী কায়েদায় বলা হয়েছে: «الثَّابِتُ بِالعُرْفِ كَالثَّابِتِ بِالنَّصِّ» (প্রথা দ্বারা প্রমাণিত বিষয় নস দ্বারা প্রমাণিত বিষয়ের মতো)।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, চার মাযহাবের অস্তিত্ব ইসলামী শরীয়তের বৈচিত্র্য, সমৃদ্ধি ও গতিশীলতার নিদর্শন। এর মধ্যে ফিকহে হানাফি তাঁর কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য শ্রদ্ধাবোধ, সূক্ষ্ম যৌক্তিক বিচার এবং ইসতিহসানের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। এর ভারসাম্যপূর্ণ মূলনীতিমালার কারণেই এটি মুসলিম সাম্রাজ্যসমূহে (বিশেষত আব্বাসী ও উসমানীয় খিলাফতে) শত শত বছর ধরে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে সফলভাবে কার্যকর ছিল।
٣- ما التقليد؟ تحدث عن أهميته ونشأته وتطوره مفصلا-
[৩. التقليد কী? তাকলিদের গুরুত্ব, উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিত আলোচনা কর।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামী শরীয়তের চিরন্তন উৎস। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি কুরআন ও হাদিসের সুবিশাল ভাণ্ডার থেকে আইন ও সূক্ষ্ম বিধানাবলি ইস্তিম্বাত (উদঘাটন) করা অসম্ভব। সাধারণ মুসলিমদের জন্য দ্বীনের পথে পরিচালিত হওয়া এবং নির্ভুল আমল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞ মুজতাহিদ ফকীহগণের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করাই হলো ‘তাকলিদ’ (التقليد)। তাকলিদের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষ দ্বীনের বিশুদ্ধ রূপ ধারণ করে এবং সমাজে বিভ্রান্তি ও খামখেয়ালিপনা থেকে রক্ষা পায়। নিম্নে তাকলিদের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়, এর অপরিহার্য গুরুত্ব এবং এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
তাকলিদের সংজ্ঞা (تعريف التقليد)
১. আভিধানিক অর্থ (المعنى اللغوي)
‘তাকলিদ’ (التقليد) শব্দটি আরবি ‘ক্বালাদা’ (قَلَّدَ – يُقَلِّدُ – تَقْلِيدًا) ধাতু থেকে বাবে তাফঈল-এর মাসদার। এর আভিধানিক অর্থ হলো: কোনো ব্যক্তির গলায় হার বা রশি পরানো (وضع القلادة في العنق)। রূপক অর্থে, নিজের কর্ম ও আমলের জবাবদিহিতা ও দায়িত্বভার অন্য যোগ্য ব্যক্তির স্কন্ধে অর্পণ করে তাকে অনুসরণ করাকে তাকলিদ বলা হয়।
২. পারিভাষিক অর্থ (المعنى الاصطلاحي)
ইসলামী শরীয়তের উসূলীয় পরিভাষায় তাকলিদের সংজ্ঞায় ইমাম শাওকানী (রহ.) ‘ইরশাদুল ফুহুল’-এ বলেন:
«التَّقْلِيدُ: العَمَلُ بِقَوْلِ الغَيْرِ مِنْ غَيْرِ حُجَّةٍ»
“কোনো মুজতাহিদের বক্তব্য বা ফতোয়াকে দলীল-প্রমাণ দাবি বা অনুসন্ধান না করে মেনে নিয়ে আমল করার নামই তাকলিদ।”
আল্লামা কামাল ইবনুল হুমাম (রহ.) ‘আত-তাহরীর’ গ্রন্থে আরও স্পষ্ট করে বলেন:
«التَّقْلِيدُ: هُوَ العَمَلُ بِقَوْلِ مَنْ لَيْسَ قَوْلُهُ إِحْدَى الحُجَجِ الشَّرْعِيَّةِ بِلَا حُجَّةٍ»
“যার কথা স্বয়ং শরীয়তের মৌলিক দলীল নয় (যেমন রাসুলুল্লাহ সা. ব্যতীত অন্য কোনো মানুষ), তাঁর ফতোয়া দলীল অনুসন্ধান ব্যতিরেকে গ্রহণ করে আমল করার নাম তাকলিদ।”
৩. তাকলিদ ও ইত্তেবার মধ্যে পার্থক্য
আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধ অনুসরণ করাকে ‘ইত্তেবা’ বা সরাসরি আনুগত্য বলা হয়, যা সর্বাবস্থায় ফরজ। আর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য কোনো মুজতাহিদ ফকীহ (যেমন ইমাম আবু হানিফা বা ইমাম শাফেঈ)-এর গবেষণার মাধ্যমে দ্বীন পালন করাকে ‘তাকলিদ’ বলা হয়। এটি কোনো ব্যক্তিত্বের অন্ধ পূজা নয়; বরং এটি হলো কুরআন-সুন্নাহর সঠিক মর্ম বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভরতা।
তাকলিদের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা (أهمية التقليد)
ইসলামী শরীয়তে সাধারণ মুসলমানের জন্য তাকলিদের গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নলিখিত যুক্তিসমূহ এর অপরিহার্যতা প্রমাণ করে:
১. পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সাধারণ মানুষকে অজ্ঞতার অবস্থায় আলেমদের শরণাপন্ন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴾
“অতএব তোমরা জ্ঞানীদের (আহলুজ জিকর) জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জানো।” (সূরা আন-নাহল: ৪৩; সূরা আল-আম্বিয়া: ৭)।
এই আয়াতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, যারা শরীয়তের সূক্ষ্ম বিধান সম্পর্কে জানে না, তাদের কর্তব্য হলো অভিজ্ঞ পণ্ডিতদের জিজ্ঞেস করে তদনুযায়ী আমল করা— এটিই তাকলিদের সারমর্ম।
২. সার্বজনীন দায়িত্ববণ্টন ও বিশেষায়িত জ্ঞান
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
﴿وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا كَافَّةً ۚ فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ﴾
“সকল মুমিনের পক্ষে একসাথে জিহাদে বা অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়। অতএব তাদের প্রতিটি দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারে এবং স্বজাতিকে সতর্ক করতে পারে?” (সূরা আত-তাওবাহ: ১২২)।
সমাজে সবাই আইন প্রণেতা বা মুজতাহিদ হতে পারে না। কৃষক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক সবার পক্ষে আরবি ব্যাকরণ, বালাগাত, রিজাল শাস্ত্র ও নাসেখ-মানসূখ আয়ত্ত করা অসম্ভব। তাই সাধারণ মানুষের জন্য মুজতাহিদ ইমামদের তাকলিদ করা যুক্তিসঙ্গত ও শরয়ীভাবে অপরিহার্য।
৩. দ্বীন নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও প্রবৃত্তিপূজা রোধ
যদি তাকলিদের ব্যবস্থা না থাকত, তবে প্রতিটি ব্যক্তি কুরআন ও হাদিসের অনুবাদ পড়ে নিজের খেয়ালখুশি মতো ফতোয়া দিতে শুরু করত। ফলে দ্বীনের মধ্যে চরম নৈরাজ্য ও বিভেদ সৃষ্টি হতো। তাকলিদ মানুষকে নির্ভরযোগ্য শাস্ত্রীয় শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ রাখে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ (اتباع الهوى) থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।
তাকলিদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস (نشأة التقليد وتطوره)
তাকলিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি হুট করে গজিয়ে ওঠা কোনো প্রথা নয়; বরং এটি সাহাবী যুগ থেকে শুরু হয়ে যুগ পরম্পরায় একটি শৃঙ্খলিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। এর পর্যায়সমূহ নিম্নরূপ:
১ম পর্যায়: সাহাবায়ে কেরামের যুগ (عصر الصحابة)
নবী কারীম (সা.)-এর জীবদ্দশায় সাহাবীগণ দূরদূরান্তে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশিত প্রতিনিধিদের ফতোয়া মেনে চলতেন (যেমন ইয়ামেনে হযরত মুআজ ইবনে জাবাল রা.)।
নবীজির ওফাতের পর সাহাবাদের মধ্যে সবাই মুজতাহিদ বা ফতোয়া প্রদানকারী ছিলেন না। লক্ষাধিক সাহাবীর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ফতোয়াদানকারী সাহাবী ছিলেন মাত্র দশ-বারোজন (যেমন: উমর, আলী, ইবনে মাসউদ, আয়েশা, ইবনে আব্বাস, যায়েদ ইবনে সাবিত রা.)। সাধারণ সাহাবী ও নওমুসলিমগণ কোনো বিষয়ে সমস্যায় পড়লে সরাসরি এই বিশিষ্ট সাহাবীদের কাছে ফতোয়া চাইতেন এবং দলীল না চেয়েই তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন। এটিই ছিল তাকলিদের বাস্তব ও প্রাকৃতিক সূচনা।
২য় পর্যায়: তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের যুগ (عصر التابعين)
তাবেয়ীদের যুগে ইসলামী সাম্রাজ্য স্পেন থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তখন বিভিন্ন শহরে শীর্ষস্থানীয় ফকীহ তাবেয়ীগণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন। মদিনায় ফুকাহায়ে সাবআ (সাতজন শ্রেষ্ঠ ফকীহ), মক্কায় আতা ইবনে আবি রাবাহ, কুফায় আলক্বামাহ ও ইবরাহীম নাখয়ী, বসরায় হাসান বসরী, সিরিয়ায় ইমাম আওযায়ী ফতোয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। সাধারণ মানুষ নিজেদের স্থানীয় নির্ভরযোগ্য ফকীহের তাকলিদ করত।
৩য় পর্যায়: আইম্মায়ে আরবাআ ও মাযহাব সংকলনের স্বর্ণযুগ (عصر الأئمة الأربعة)
হিজরী দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে চার মহান ইমাম (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.) আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁরা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে প্রতিটি অধ্যায়ের মূলনীতি ও খুঁটিনাটি হাজার হাজার মাসআলা দলিলসহ সংকলিত করেন। তাঁদের শিষ্যগণ তা লিপিবদ্ধ করেন। অন্য অনেক ইমামের (যেমন সুফিয়ান সাওরী, লাইস ইবনে সাদ) মাযহাব সংরক্ষিত না হলেও এই চার ইমামের মাযহাব সুরক্ষিত থাকে এবং মুসলিম বিশ্ব স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের ফিকহী মাযহাবকে গ্রহণ করে নেয়।
৪র্থ পর্যায়: তাকলিদে শাখসির সংকলন ও প্রতিষ্ঠা (عصر استقرار المذاهব)
হিজরী চতুর্থ শতাব্দী থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত মুত্তাকী উলামায়ে কেরাম লক্ষ্য করলেন যে, মানুষের নৈতিক ও তাকওয়াপূর্ণ মান হ্রাস পাচ্ছে। মানুষ যদি বিভিন্ন মাযহাব থেকে শুধু সুবিধাজনক ফতোয়া খুঁজে নিয়ে আমল করে, তবে তা ‘তালফীক্ব’ ও ধর্মীয় খেয়ালখুশিতে রূপ নেবে। তাই উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে কোনো একটি নির্দিষ্ট মাযহাবকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা (তাকলিদে শাখসি – التقليد الشخصي)-কে ওয়াজিব বা অপরিহার্য নীতি হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.) তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, চার মাযহাবের যেকোনো একটির তাকলিদ করা উম্মাহর জন্য এক মহান নিয়ামত এবং ফিতনা থেকে মুক্তির ঢাল।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, তাকলিদ হলো কুরআন ও সুন্নাহর বিধানকে সঠিক পদ্ধতিতে মান্য করার এক নিরাপদ বৈজ্ঞানিক মাধ্যম। এর লক্ষ্য কুরআন-সুন্নাহর বিকল্প তৈরি করা নয়; বরং কুরআন-সুন্নাহর বিধানের বিশুদ্ধতম প্রয়োগ নিশ্চিত করা। চার মাযহাবের যেকোনো একটিকে সুদৃঢ়ভাবে অনুসরণ করার মাধ্যমেই উম্মতের ঐক্য, শরীয়তের শৃংখলা এবং আমলের শুদ্ধতা শত শত বছর ধরে সংরক্ষিত রয়েছে।
٤- اكتب نبذة عن ترجمة الإمام محمد بن الحسن الشيباني ثم بين مساهمته في الفقه الحنفي مفصلا-
[৪. ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাছান শাইবানীর জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ লেখ এবং ফিকহে হানাফিতে তাঁর অবদান বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
হানাফি ফিকহের যে মহান ইমামগণের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই মাযহাব বিশ্বের কোণে কোণে একটি সুসংবদ্ধ আইনব্যবস্থা হিসেবে সমাদৃত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারিত নাম ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী (রহ.)। তিনি ছিলেন হানাফি মাযহাবের ‘সাহিবাইন’ (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ)-এর অন্যতম স্তম্ভ এবং মাযহাবের প্রধান সংকলক (মুদাওউয়িনুল মাযহাব)। তাঁর কলমের অনন্য শক্তির মাধ্যমেই ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহী ঐতিহ্য গ্রন্থাকারে চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। নিম্নে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত এবং ফিকহে হানাফিতে তাঁর অসামান্য অবদান বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (ترجمة الإمام محمد)
১. জন্ম ও বংশপরিচয়
ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ১৩১ হিজরী বা ১৩২ হিজরীতে (৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) উমাইয়া খিলাফতের শেষলগ্নে দামেস্কের নিকটবর্তী ওয়াসিত নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন শাম অঞ্চলের অধিবাসী এবং শায়বান গোত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ইরাকের কুফা নগরীতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর মেধা ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী।
২. শিক্ষা অর্জন ও মহান ওস্তাদবৃন্দ
ইমাম মুহাম্মদ বাল্যকালেই কুরআনুল কারীম হিফজ করেন এবং আরবি ব্যাকরণ ও সাহিত্যে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.)-এর জ্ঞানগর্ভ ফিকহী মজলিসে যোগদান করেন। ইমাম আবু হানিফার ওফাত (১৫০ হি.) পর্যন্ত তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকেন।
ইমাম আবু হানিফার ওফাতের পর তিনি প্রধান শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর নিকট হানাফি ফিকহের উচ্চতর জ্ঞান সমাপ্ত করেন।
এরপর তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় গমন করেন এবং সেখানে অবস্থান করে ইমামু দারিল হিজরাহ মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর নিকট তিন বছর ধরে হাদিস ও ফিকহ অধ্যয়ন করেন এবং ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’ সরাসরি তাঁর মুখ থেকে শ্রবণ ও লিপিবদ্ধ করেন।
এছাড়াও তিনি সুফিয়ান সাওরী, মিসআর ইবনে কিদাম, আউযায়ী এবং অন্যান্য বরেণ্য মুহাদ্দিসগণের নিকট থেকে হাদিসের সনদ হাসিল করেন। ফলে তিনি একাধারে ফিকহের যুক্তি (আসহাবুর রায়) এবং হাদিসের ঐতিহ্য (আসহাবুল হাদিস)-এর বিরল সমন্বয়ে পরিণত হন।
৩. কর্মজীবন ও বিচারকের দায়িত্ব
খলিফা হারুনুর রশিদের খিলাফতকালে ইমাম আবু ইউসুফের সুপারিশে ইমাম মুহাম্মদকে প্রথমে আর-রিক্কাহ অঞ্চলের কাজী (বিচারক) নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তিনি প্রধান বিচারকের দায়িত্বও সুনামের সাথে পালন করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং সত্য উচ্চারণে নির্ভীক।
৪. ওফাত
১৮৯ হিজরীতে (৮০৫ খ্রিষ্টাব্দ) খলিফা হারুনুর রশিদের সফরসঙ্গী হিসেবে খুরাসান যাত্রাকালে ইরানের ‘রায়’ নগরীর নিকটবর্তী ‘রানবুয়াহ’ নামক স্থানে এই মহান ফকীহ মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। একই দিনে বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ইমাম কিসাঈ (রহ.)-ও ইন্তেকাল করেছিলেন। খলিফা হারুনুর রশিদ ব্যথিত হয়ে বলেছিলেন: “আজ আমরা একই দিনে ফিকহ ও আরবি ব্যাকরণ উভয় শাস্ত্রকে দাফন করলাম।”
ফিকহে হানাফিতে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর অবদান (مساهمته في الفقه الحنفي)
ফিকহে হানাফির ইতিহাসে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর অবদানকে ভিত্তিপ্রস্তর বলা যায়। যদি ইমাম মুহাম্মদ তাঁর অমূল্য গ্রন্থাবলি রচনা না করতেন, তবে হানাফি ফিকহের সুবিশাল সম্পদ হয়তো কালের গর্ভে হারিয়ে যেত। তাঁর প্রধান অবদানসমূহ নিম্নরূপ:
১. হানাফি ফিকহের আনুষ্ঠানিক গ্রন্থনা ও সংকলন (تدوين الفقه الحنفي)
ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.) স্বয়ং খুব কম গ্রন্থ লিখে গেছেন; তিনি মৌখিকভাবে ছাত্রদের নিয়ে মাসআলা আলোচনা ও গবেষণা করতেন। ইমাম মুহাম্মদ অসাধারণ সাহিত্যরীতি, প্রাঞ্জল আরবি ভাষা ও সুবিন্যস্ত অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যাসে হানাফি ফিকহকে সর্বপ্রথম কিতাব আকারে লিপিবদ্ধ করেন। এই কারণে তাঁকে হানাফি মাযহাবের প্রধান লিপিকার ও সংকলক (مدوّن المذهب) বলা হয়।
২. ‘জাহিরুর রিওয়ায়াত’ বা কুতুবুল উসূলের অমর সংকলন
হানাফি মাযহাবের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য ভিত্তি হলো ইমাম মুহাম্মদ রচিত ছয়টি বিশ্বখ্যাত কিতাব, যা ফিকহের পরিভাষায় ‘জাহিরুর রিওয়ায়াত’ (ظاهر الرواية) বা ‘মাসায়েলুল উসূল’ নামে পরিচিত। এই গ্রন্থগুলো নির্ভরযোগ্য ও অবিচ্ছিন্ন সনদে ইমাম মুহাম্মদ থেকে বর্ণিত হয়েছে। গ্রন্থগুলো হলো:
- ১. আল-মাবসূত (المبسوط) বা আল-আসল (الأصل): এটি হানাফি ফিকহের সবচেয়ে বিশদ ও সুবিশাল বিশ্বকোষ। এতে ফিকহের প্রতিটি অধ্যায়ের হাজার হাজার মূলনীতি ও শাখা-প্রশাখা দলিলসহ সংকলিত।
- ২. আল-জামেউস সাগীর (الجامع الصغير): ইমাম আবু ইউসুফের মাধ্যমে ইমাম আবু হানিফার যেসব মৌলিক ফতোয়া ও রায় বর্ণিত হয়েছিল, তা এই সংক্ষিপ্ত গ্রন্থে নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত। এটি হানাফিদের নিকট মুখস্থ করার মতো মর্যাদাপূর্ণ কিতাব।
- ৩. আল-জামেউল কাবীর (الجامع الكبير): এটি ফিকহ ও উসূলের অত্যন্ত গভীর, সূক্ষ্ম ও দার্শনিক বিশ্লেষণের এক অনন্য গ্রন্থ। এতে জটিল আইনি সমস্যার নিখুঁত সমাধান দেওয়া হয়েছে।
- ৪. আস-সিয়ারুস সাগীর (السير الصغير): যুদ্ধ ও সন্ধির আইন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক মৌলিক সংকলন।
- ৫. আস-সিয়ারুল কাবীর (السير الكبير): আন্তর্জাতিক আইনের ওপর রচিত মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম সুসংবদ্ধ বিশ্বকোষ। ইউরোপের গ্রোশিয়াস-এর বহু শতবর্ষ পূর্বেই ইমাম মুহাম্মদ যুদ্ধকালীন নীতি, অমুসলিমদের অধিকার ও আন্তর্জাতিক চুক্তির আইন প্রণয়ন করে গেছেন।
- ৬. আজ-জিয়াদাত (الزيادات): জামেউল কাবীরের পরিপূরক হিসেবে ফিকহী শাখা-প্রশাখার বিশেষ সংযোজনী।
৩. নাওয়াদির ও অন্যান্য অবিস্মরণীয় রচনা
জাহিরুর রিওয়ায়াত ছাড়াও তিনি রচনা করেন:
- কিতাবুল আসার (كتاب الآثار): ইমাম আবু হানিফা থেকে সনদের মাধ্যমে বর্ণিত হাদিস ও সাহাবীদের ফতোয়ার সংকলন।
- মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ (موطأ الإمام محمد): ইমাম মালিকের মুয়াত্তার ওপর তাঁর ঐতিহাসিক ভাষ্য ও হাদিসভিত্তিক ফিকহের অপূর্ব দলীল।
- কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনাহ (الحجة على أهل المدينة): মদিনাবাসীদের মতামতের বিপরীতে কুফার ফিকহের যৌক্তিক ও প্রামাণ্য শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ঐতিহাসিক গ্রন্থ।
- কিতাবুল কাসব (كتاب الكسب): ইসলামী অর্থনীতি ও হালাল উপার্জনের ওপর রচিত প্রাচীনতম দিকনির্দেশনা।
৪. আন্তর্জাতিক আইনের জনক হিসেবে মর্যাদা
পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত আইন বিশারদগণ স্বীকার করেছেন যে, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী রচিত ‘আস-সিয়ারুল কাবীর’ হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর রচিত বিশ্বের প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ। আধুনিক যুগে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শাইবানী ইন্টারন্যাশনাল ল সোসাইটি’ গঠিত হয়েছিল তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।
৫. পরবর্তী ইমামগণের ওপর গভীর প্রভাব (বিশেষত ইমাম শাফিঈ)
ইমাম শাফিঈ (রহ.) বাগদাদে এসে ইমাম মুহাম্মদের নিকট দীর্ঘ সময় ইলমুল ফিকহ অধ্যয়ন করেন। ইমাম শাফিঈ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্বীকার করেছেন:
«مَا رَأَيْتُ أَعْقَلَ مِنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْحَسَنِ، وَكَتَبْتُ عَنْهُ وِقْرَ بَعِيرٍ مِنْ عِلْمِهِ»
“মুহাম্মদ ইবনুল হাসানের চেয়ে অধিক প্রজ্ঞাবান ও বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ আমি আর কাউকে দেখিনি। আমি তাঁর থেকে এক উটের বোঝা পরিমাণ ইলম ও পাণ্ডিত্য লিখে নিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন: “মানুষ যদি ফিকহের গভীরে প্রবেশ করতে চায়, তবে সে যেন মুহাম্মদ ইবনুল হাসানের কিতাবসমূহ পাঠ করে।”
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী ছিলেন হানাফি মাযহাবের ইলমী ভিত্তির প্রধান স্থপতি। তাঁর অতুলনীয় প্রজ্ঞা, অসাধারণ লেখনীশক্তি এবং হাদিস ও যুক্তির অপূর্ব মেলবন্ধনের মাধ্যমেই ফিকহে হানাফি একটি আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার রূপ পরিগ্রহ করেছিল। উম্মতে মুসলিমাহ তাঁর এই অসামান্য একাডেমিক অবদানের কাছে চিরঋণী।
٥- قارن بين أصول الفقه المالكي والحنبلي-
[৫. ফিকহে মালিকি ও ফিকহে হাম্বলীর মূলনীতি তুলনামূলকভাবে আলোচনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী আইনশাস্ত্রে ইমামু দারিল হিজরাহ মালিক ইবনে আনাস (রহ.) প্রতিষ্ঠিত মাযহাবে মালিকি এবং ইমামুল মুহাদ্দিসীন আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাম্বল (রহ.) প্রতিষ্ঠিত মাযহাবে হাম্বলি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দুটি ফিকহী ধারা। উভয় মাযহাবই কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি সর্বোচ্চ নিষ্ঠাবান এবং মূলত ‘আসহাবুল হাদিস’-এর প্রতিনিধিত্ব করে। তা সত্ত্বেও বিধান আহরণ ও ইস্তিম্বাতের মূলনীতিতে (উসূলুল ফিকহ) উভয়ের মাঝে কিছু মৌলিক স্বাতন্ত্র্য ও পদ্ধতিগত ভিন্নতা রয়েছে। যেমন: ইমাম মালিক মদিনাবাসীদের আমল ও জনকল্যাণকে (মাসালিহে মুরসালাহ) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, পক্ষান্তরে ইমাম আহমদ একক হাদিস (খাবারে ওয়াহিদ) ও দুর্বল হাদিসকেও কিয়াসের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। নিম্নে উভয় মাযহাবের মূলনীতিসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে তাদের তুলনামূলক রূপরেখা তুলে ধরা হলো।
ফিকহে মালিকির মূলনীতি (أصول الفقه المالكي)
ইমাম মালিক (রহ.) মদিনা মুনাওয়ারার পবিত্র পরিবেশে আজীবন হাদিস ও ফিকহের চর্চা করেছেন। তিনি যে সকল মূলনীতির ওপর তাঁর মাযহাব গড়ে তুলেছেন, তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ:
১. কিতাবুল্লাহ (কুরআনুল কারীম)
কুরআন শরীয়তের আদি ও সর্বোচ্চ উৎস। ইমাম মালিকের নিকট কুরআনের ‘নস’ (সুস্পষ্ট বিধান) এবং ‘জাহির’ (বাহ্যিক অর্থ) উভয়টিই প্রামাণ্য। তিনি কুরআনের ‘আম’ (ব্যাপক বিধান)-কে একক হাদিস দ্বারা খাস (সীমিত) করা বৈধ মনে করেন।
২. সুন্নাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে তিনি দ্বিতীয় উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। তবে খাবারে ওয়াহিদ (একক হাদিস) আমলযোগ্য হওয়ার জন্য তাঁর একটি বিশেষ শর্ত রয়েছে— তা যেন ‘আমালু আহলিল মাদীনাহ’ (মদিনাবাসীদের সম্মিলিত আমল)-এর বিপরীত না হয়।
৩. আমালু আহলিল মাদীনাহ (عمل أهل المدينة) — মদিনাবাসীদের আমল
এটি মালিকি মাযহাবের সবচেয়ে অনন্য ও অবিসংবাদিত মূলনীতি। ইমাম মালিকের যুক্তি হলো: মদিনায় নবীজি (সা.) দশ বছর যাবত রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, ওহী নাজিল হয়েছে এবং হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যক্ষভাবে তাঁর নামাজ, রোজা ও যাবতীয় বিধান দেখে তা বংশপরম্পরায় কার্যকর রেখেছেন। তাই মদিনার হাজার হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ সম্মিলিত আমল যেকোনো একক রাবীর বর্ণনার চেয়ে লক্ষগুণে অধিক নির্ভরযোগ্য। যেমন: আযানের শব্দ সংখ্যা, সা’ ও মুদ-এর পরিমাণ ইত্যাদিতে তিনি মদিনাবাসীদের আমলকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
৪. আল-ইজমা (ঐকমত্য)
সাহাবায়ে কেরাম ও মুজতাহিদগণের ঐকমত্যকে তিনি অকাট্য দলীল হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশেষত মদিনার আলেমগণের ইজমাকে তিনি অতি উচ্চ মর্যাদা দেন।
৫. আল-কিয়াস (যৌক্তিক সাদৃশ্য)
নস বা আমলের অনুপস্থিতিতে তিনি কিয়াসের প্রয়োগ করতেন। তবে নসের উপস্থিতিতে কখনো কিয়াস প্রয়োগ করতেন না।
৬. আল-মাসালিহ আল-মুরসালাহ (المصالح المرسلة) — অনির্দিষ্ট জনকল্যাণ
মালিকি মাযহাবের অন্যতম যুগান্তকারী অবদান হলো মাসালিহে মুরসালাহ। এর অর্থ হলো: এমন কোনো কল্যাণ বা উপযোগিতা যার ব্যাপারে শরীয়তে সরাসরি কোনো আদেশ বা নিষেধ আসেনি, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করলে মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধিত হয় এবং ক্ষতি দূরীভূত হয়। যেমন: কুরআন হিফজের সুবিধার্থে তা এক খণ্ডে সংকলন, মুদ্রা তৈরি, কারাগার নির্মাণ ইত্যাদি।
৭. সাদ্দুজ জারায়ি (سد الذرائع) — পাপের পথ রুদ্ধ করা
যে মাধ্যম বা উপায় শেষ পর্যন্ত কোনো হারামে পৌঁছে দেয়, সেই মাধ্যমটিকেও হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। যেমন: সুদের পথ সুগম করতে পারে এমন ছলচাতুরিযুক্ত ক্রয়-বিক্রয় (বায়য়ে ঈনাহ) নিষিদ্ধ করা।
৮. আল-উরফ (প্রথা) ও আল-ইসতিসহাব
শরীয়তের বিরোধী নয় এমন মার্জিত সামাজিক প্রথা এবং কোনো বিধানের পরিবর্তন প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত পূর্বাবস্থা বহাল রাখা (ইসতিসহাব)।
ফিকহে হাম্বলীর মূলনীতি (أصول الفقه الحنبلي)
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মূলনীতিসমূহ তাঁর প্রখ্যাত শিষ্য ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ‘ইলামুল মুওয়াক্কিঈন’ গ্রন্থে পাঁচটি মূল স্তম্ভে বিন্যস্ত করেছেন:
১. আন-নুসূস (النصوص) — কুরআন ও সহীহ মারফু হাদিস
যখনই কোনো বিষয়ে কুরআন বা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ মারফু হাদিস পাওয়া যায়, তখন ইমাম আহমদ কারো কথা, ফতোয়া, কিয়াস বা রায় গ্রহণ করতেন না। নসের উপস্থিতিতে তিনি কোনো প্রকার যুক্তি বা ব্যক্তির মতামতের তোয়াক্কা করতেন না।
২. ফাতাওয়াস সাহাবাহ (সাহাবীদের ফতোয়া)
যদি কোনো বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কোনো মতভেদ না থাকত এবং তাঁদের ঐকমত্য পাওয়া যেত, তবে তিনি তা বিনাদ্বিধায় গ্রহণ করতেন এবং কারো ভিন্নমত গ্রহণ করতেন না।
৩. সাহাবাদের মতভেদের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর নিকটতম মত গ্রহণ
যদি সাহাবীগণের মধ্যে একাধিক মতভেদ দেখা যেত, তবে ইমাম আহমদ তাঁদের মতামতের বাইরে নতুন কোনো মত উদ্ভাবন করতেন না; বরং সাহাবীদের যে মতটি কুরআন ও সুন্নাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী, সেটিকে অগ্রাধিকার দিতেন।
৪. মুরসাল ও জয়ীফ হাদিসকে কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকার প্রদান
এটি হাম্বলি মাযহাবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যদি কোনো বিষয়ে সহীহ হাদিস না থাকে, তবে তিনি ‘হাদিসে জয়ীফ’ (যেটি তীব্রভাবে দুর্বল বা মওজু নয়, বরং উসূলীয় পরিভাষায় হাসান পর্যায়ের) অথবা ‘হাদিসে মুরসাল’-কে মানুষের ব্যক্তিগত কিয়াস বা মতামতের ওপর প্রাধান্য দিতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হলো:
«ضَعِيفُ الْحَدِيثِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ رَأْيِ الرِّجَالِ»
“মানুষের ব্যক্তিগত মত বা কিয়াসের চেয়ে দুর্বল হাদিসও আমার নিকট অধিক প্রিয়।”
৫. চূড়ান্ত নিরুপায় অবস্থায় কিয়াসের প্রয়োগ (القياس عند الضرورة)
ইমাম আহমদ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কিয়াস ব্যবহার করতেন। কুরআন, সহীহ হাদিস, সাহাবীদের ফতোয়া এবং জয়ীফ হাদিসের কোনোটিই যখন পাওয়া যেত না, কেবল তখনই তিনি চরম নিরুপায় অবস্থায় কিয়াসের আশ্রয় নিতেন।
উভয় মাযহাবের মূলনীতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও প্রধান পার্থক্য
ফিকহে মালিকি ও হাম্বলীর মধ্যকার প্রধান প্রধান তাত্ত্বিক ও প্রয়োগিক পার্থক্যসমূহ নিম্নরূপ:
- মদিনাবাসীদের আমল বনাম হাদিস: ইমাম মালিকের নিকট ‘আমালু আহলিল মাদীনাহ’ অত্যন্ত শক্তিশালী দলীল। যদি কোনো সহীহ একক হাদিস (খাবারে ওয়াহিদ) মদিনাবাসীদের নিরবচ্ছিন্ন আমলের বিপরীত হতো, তবে ইমাম মালিক মদিনাবাসীদের আমলকে প্রাধান্য দিতেন এবং উক্ত হাদিসটিকে বিশেষ পরিস্থিতির বলে ব্যাখ্যা করতেন। পক্ষান্তরে ইমাম আহমদ ‘আমালু আহলিল মাদীনাহ’-কে সাধারণ সহীহ হাদিসের সমকক্ষ মনে করতেন না; তাঁর নিকট সহীহ হাদিসই সর্বোচ্চ প্রামাণ্য, মদিনাবাসীর আমল তার বিপরীত হলেও তিনি সহীহ হাদিসকেই গ্রহণ করতেন।
- দুর্বল হাদিস ও কিয়াসের অবস্থান: ইমাম আহমদ দুর্বল হাদিসকেও কিয়াসের ওপর স্থান দিতেন। কিন্তু ইমাম মালিক কোনো দুর্বল হাদিস যদি শরীয়তের সার্বিক মূলনীতি (উসূলে কুল্লিয়াহ) ও প্রতিষ্ঠিত কিয়াসের বিপরীত হয়, তবে সেই দুর্বল হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করে সুদৃঢ় কিয়াস ও মূলনীতিকে অগ্রাধিকার দিতেন।
- মাসালিহে মুরসালাহর পরিধি: ইমাম মালিক শরীয়তের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ‘মাসালিহে মুরসালাহ’ (জনকল্যাণ)-কে এক সুবিশাল ভিত্তিরূপে গ্রহণ করেছেন এবং বহু উদ্ভাবনী বিধান প্রণয়ন করেছেন। ইমাম আহমদও জনকল্যাণ গ্রহণ করেছেন, তবে তা নসের সুনির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে রেখে অনেক বেশি রক্ষণশীলভাবে প্রয়োগ করেছেন।
- সাদ্দুজ জারায়ি (অসৎ পথ রোধ): উভয় ইমামই সাদ্দুজ জারায়ির নীতিতে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তবে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইমাম আহমদ শর্তাবলীর স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কিছুটা প্রশস্ততা দিয়েছেন, যেখানে ইমাম মালিক কঠোরভাবে হীলা-বাহানা রোধ করেছেন।
উপসংহার
সারসংক্ষেপে, ফিকহে মালিকি হলো হাদিস ও মদিনার সামাজিক বাস্তবতার এক সুদৃঢ় সমন্বয়, যা ব্যাপক জনকল্যাণ ও পারিপার্শ্বিক প্রজ্ঞাকে ধারণ করে। আর ফিকহে হাম্বলি হলো সুন্নাহর শব্দের অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণের এক আপসহীন দুর্গ, যা কিয়াসের বদলে দুর্বল হাদিসকেও বরণ করে নেয়। এই দুই মহান মাযহাবের সূক্ষ্ম ভারসাম্য ইসলামী আইনশাস্ত্রের সৌধকে অনন্তকাল ধরে সমৃদ্ধ ও সুরভিত করে রেখেছে।
٦- بين آراء المذاهب الأربعة حول القراءة خلف الإمام مفصلا ومدللا-
[৬. মুকতাদি ইমামের পিছনে কিরাত পড়ার বিষয়ে চার মাযহাবের মতামত দলিলসহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
জামাতে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে মুকতাদি (ইমামের পেছনে নামাজ আদায়কারী)-এর কিরাত পাঠের বিধান ইসলামী ফিকহের অন্যতম সর্বাধিক আলোচিত ও সূক্ষ্ম মতভেদপূর্ণ মাসআলা। বিশেষ করে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মুকতাদির ওপর ফরজ, ওয়াজিব, মুস্তাহাব নাকি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ— এ বিষয়ে যুগ যুগ ধরে আহলুস সুন্নাহর চার প্রধান মাযহাবের মাঝে গভীর গবেষণা ও মতপার্থক্য বিদ্যমান। মূলত কুরআনুল কারীমের সাধারণ আয়াত এবং বিভিন্ন সহীহ হাদিসের বাহ্যিক বৈচিত্র্যকে সমন্বয় করার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণেই এই মতভেদের উৎপত্তি। নিম্নে চার মাযহাবের বিস্তারিত অভিমত এবং তাদের স্বপক্ষে উপস্থাপিত অকাট্য দলীলসমূহ বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো।
চার মাযহাবের বিস্তারিত মতামত ও দলীলসমূহ (آراء المذاهب وأدلتهم)
১. মাযহাবে হানাফি: মুকতাদির জন্য কিরাত পাঠ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মাকরূহে তাহরীমী
মূল সিদ্ধান্ত: হানাফি মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো— মুকতাদি ইমামের পেছনে কোনো অবস্থাতেই কিরাত (সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো সূরা) পাঠ করবে না। নামাজ চাই সিররি (নীরব নামাজ— যেমন যোহর ও আসর) হোক কিংবা জাহরি (সশব্দ নামাজ— যেমন ফজর, মাগরিব ও এশা) হোক— সর্বাবস্থায় মুকতাদির দায়িত্ব হলো নীরব থাকা। ইমামের কিরাতই মুকতাদির জন্য যথেষ্ট। যদি কোনো মুকতাদি ইচ্ছাকৃতভাবে কিরাত পড়ে, তবে তা মাকরূহে তাহরীমী (হারামের নিকটবর্তী গুণাহ) হবে।
হানাফিগণের প্রামাণ্য দলীলসমূহ:
- পবিত্র কুরআন থেকে দলীল: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
﴿وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ﴾
“আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ কর এবং নীরবতা অবলম্বন কর, যাতে তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষিত হয়।” (সূরা আল-আ’রাফ: ২০৪)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও মুজাহিদ (রা.) সহ মুফাসসিরীনগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো, এই আয়াতটি জামাতে নামাজের কিরাত শ্রবণের বিষয়ে নাজিল হয়েছে। ইমাম যখন কিরাত পড়েন, তখন মুকতাদির কর্তব্য হলো দুটি: জাহরি নামাজে শ্রবণ করা এবং সিররি নামাজে নীরব থাকা। - হাদিস শরীফ থেকে দলীল (১): জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ، فَقِرَاءَةُ الإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ»
“যার কোনো ইমাম রয়েছে, তবে ইমামের কিরাতই তার কিরাত হিসেবে গণ্য হবে।” (মুসনাদে আহমদ: ১৪৬৪৩; মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ: ৯৭; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৮৫০— সনদ সহীহ)। - হাদিস শরীফ থেকে দলীল (২): হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
«إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ، فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا، وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا»
“নিশ্চয় ইমাম এজন্যই নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে তার অনুসরণ করা হয়। সুতরাং ইমাম যখন তাকবীর বলে তোমরা তাকবীর বলো, আর যখন সে কিরাত পড়ে তখন তোমরা পূর্ণ নীরব থাকো।” (সহীহ মুসলিম: ৪০৪; সুনানে নাসাঈ: ৯২১)। - সাহাবায়ে কেরামের আমল: হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “ইমামের পেছনে কি কোনো কিরাত আছে?” তিনি বললেন: «لا قِرَاءَةَ مَعَ الإِمَامِ فِي شَيْءٍ» (ইমামের সাথে কোনো নামাজেই কোনো কিরাত নেই)। (সহীহ মুসলিম: ৫৭৭)। একই ফতোয়া দিয়েছেন হযরত উমর, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।
২. মাযহাবে শাফেয়ী: মুকতাদির জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা ফরজ/ওয়াজিব
মূল সিদ্ধান্ত: ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর ‘কাউলে জাদীদ’ (মিশরীয় পরিমার্জিত মত) এবং শাফেয়ী মাযহাবের প্রধান ফতোয়া হলো— প্রত্যেক নামাজীর ওপর স্বীয় নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করা রুকন বা ফরজ। সে একাকী নামাজ আদায়কারী হোক কিংবা ইমামের পেছনে মুকতাদি হোক; নামাজ সিররি হোক কিংবা জাহরি হোক— মুকতাদিকে অবশ্যই সূরা ফাতিহা পড়তে হবে। তবে জাহরি নামাজে ইমামের সূরা ফাতিহা শেষ হলে এবং ইমামের ‘আমিন’ বলার পর ইমাম যখন পরবর্তী সূরা শুরু করবেন বা সামান্য বিরতি দেবেন, তখন মুকতাদি সংক্ষেপে সূরা ফাতিহা পড়ে নেবে।
শাফেয়ীগণের প্রামাণ্য দলীলসমূহ:
- হাদিস শরীফ থেকে দলীল (১): হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الكِتَابِ»
“যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, তার নামাজই হবে না।” (সহীহ বুখারী: ৭৫৬; সহীহ মুসলিম: ৩৯৪)।
শাফেয়ীগণের যুক্তি হলো, এই হাদিসে ‘লা সালাতা’ শব্দটি সাধারণ, যা একাকী নামাজী এবং মুকতাদি উভয়কে সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। - হাদিস শরীফ থেকে দলীল (২): হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজ শেষ করে সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন: “সম্ভবত তোমরা তোমাদের ইমামের পেছনে কিরাত পড়ছিলে?” আমরা বললাম: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন:
«لَا تَفْعَلُوا إِلَّا بِأُمِّ القُرْآنِ، فَإِنَّهُ لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِهَا»
“তোমরা এমনটি করো না; তবে কেবল উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) ব্যতীত। কেননা যে ব্যক্তি তা পাঠ করে না তার নামাজ হয় না।” (সুনানে আবু দাউদ: ৮২৩; তিরমিযী: ৩১১)।
৩. মাযহাবে মালিকি: সিররি নামাজে মুস্তাহাব, জাহরি নামাজে পড়া নিষিদ্ধ ও মাকরূহ
মূল সিদ্ধান্ত: ইমাম মালিক (রহ.) ও তাঁর অনুসারীদের মতে, বিধানটি নামাজের ধরনের ওপর নির্ভরশীল:
– সিররি নামাজে (যোহর ও আসর): মুকতাদির জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা মুস্তাহাব ও উত্তম।
– জাহরি নামাজে (ফজর, মাগরিব ও এশা): মুকতাদির জন্য কিরাত পাঠ করা মাকরূহ ও নিষিদ্ধ, চাই সে ইমামের কিরাত শুনতে পাক বা দূরে থাকার কারণে না শুনতে পাক। সর্বাবস্থায় নীরব থেকে ইমামের কিরাত শোনাই তার দায়িত্ব।
মালিকিগণের যুক্তি: তাঁরা কুরআনুল কারীমের আদেশের (فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا) ওপর আমল করে জাহরি নামাজে শ্রবণ ও নীরবতাকে ওয়াজিব সাব্যস্ত করেছেন। আর সিররি নামাজে যেহেতু শোনার কোনো সুযোগ নেই, তাই সেখানে নীরব থাকার চেয়ে আল্লাহর জিকির ও কুরআন পাঠ মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য হবে।
৪. মাযহাবে হাম্বলি: সিররি নামাজে মুস্তাহাব, জাহরি নামাজে না শুনলে পড়া জায়েয
মূল সিদ্ধান্ত: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মাযহাবের মূল ফতোয়া হলো:
– সিররি নামাজে মুকতাদির জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা মুস্তাহাব।
– জাহরি নামাজে যদি মুকতাদি ইমামের কিরাত স্পষ্টভাবে শুনতে পায়, তবে তার জন্য কিরাত পাঠ করা মাকরূহ; তখন নীরব থাকা ওয়াজিব।
– তবে ইমামের বিরতিকালে (সাকাতাতুল ইমাম) অথবা মুকতাদি যদি বধির হয় বা এত দূরে থাকে যে ইমামের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে না, তবে সে অবস্থায় মুকতাদির জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা বৈধ ও মুস্তাহাব। ইমাম আহমদ বলেন, সাহাবীদের ইজমা রয়েছে যে জাহরি নামাজে মুকতাদি মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
সারসংক্ষেপ ও ফকীহদের সমন্বয়মূলক মূল্যায়ন
চার মাযহাবের অভিমত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফকীহগণের মধ্যে এই মতভেদ মূলত উম্মতের জন্য রহমতস্বরূপ। হানাফিগণ কুরআনুল কারীমের সর্বজনীন নির্দেশ এবং জামাতের সংহতি রক্ষার্থে ইমামকে সমগ্র জামাতের প্রতিনিধি বানিয়েছেন। পক্ষান্তরে শাফেয়ীগণ ব্যক্তিগত ইবাদতের পূর্ণাঙ্গতার ওপর জোর দিয়েছেন। তবে সকল ইমামই একমত যে, কোনো মুকতাদি যদি ভুলবশত বা কোনো মাযহাবের অনুসরণে কিরাত পড়ে বা না পড়ে, তবুও তার নামাজ বাতিল হবে না এবং সে গুনাহগার হবে না।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মুকতাদির কিরাতের মাসআলাটি ফিকহী ইজতিহাদের এক চমৎকার নিদর্শন। হানাফি মাযহাবের অবস্থান যেখানে কুরআনের সরাসরি আদেশ ও বহুসংখ্যক সহীহ হাদিস দ্বারা সমর্থিত, তেমনি অন্যান্য মাযহাবের অবস্থানও সুনির্দিষ্ট হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নিজ নিজ মাযহাবের বিধান অনুযায়ী ইখলাসের সাথে নামাজ আদায় করাই মুসলিমদের জন্য সমীচীন।
٧- ما حكم الجمع بين الصلاتين الظهر والعصر أو المغرب والعشاء فى السفر؟ بين آراء الأئمة مدللا-
[৭. সফরকালীন যোহর-আছর এবং মাগরিব-এশা একত্রে আদায় করার হুকুম কী? ইমামগণের মতামত দলিলসহ বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলাম একটি সহজ, স্বাভাবিক ও মানবিক জীবনবিধান। মানুষের জীবনের কষ্ট-ক্লেশ ও দূরবর্তী যাত্রার বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে শরীয়তে ‘রুখসত’ বা বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সফরকালীন অবস্থায় মুসাফিরের জন্য দুই ওয়াক্তের নামাজ একত্রে মিলিয়ে আদায় করা (الجمع بين الصلاتين— যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক মাসআলা। তবে এই একত্রীকরণ কি কেবল নির্দিষ্ট স্থানে (যেমন হজে) সীমাবদ্ধ, নাকি যেকোনো শরয়ী সফরে তা প্রযোজ্য— এ নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে পদ্ধতিগত মতপার্থক্য রয়েছে। নিম্নে জমার প্রকারভেদ এবং চার মাযহাবের ইমামগণের মতামত দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
জমা বা একত্রীকরণের প্রকারভেদ (أقسام الجمع)
ফিকহের পরিভাষায় দুই ওয়াক্তের নামাজ একত্র করার তিনটি রূপ রয়েছে:
- ১. জাময়ে তাক্বদীম (جمع التقديم): পরবর্তী ওয়াক্তের নামাজকে পূর্ববর্তী ওয়াক্তে এগিয়ে এনে একসাথে আদায় করা। যেমন: যোহরের ওয়াক্তে যোহরের পর পরই আসরের নামাজ আদায় করা, কিংবা মাগরিবের ওয়াক্তে মাগরিবের সাথে সাথেই এশার নামাজ আদায় করা।
- ২. জাময়ে তাখীর (جمع التأخير): পূর্ববর্তী ওয়াক্তের নামাজকে বিলম্বিত করে পরবর্তী ওয়াক্তে নিয়ে গিয়ে একসাথে আদায় করা। যেমন: যোহরকে পিছিয়ে দিয়ে আসরের ওয়াক্তে আসরের সাথে আদায় করা, কিংবা মাগরিবকে পিছিয়ে দিয়ে এশার ওয়াক্তে এশার সাথে আদায় করা।
- ৩. জাময়ে সূরী (الجمع الصوري) বা বাহ্যিক একত্রীকরণ: প্রথম ওয়াক্তের নামাজকে একদম শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে আদায় করা, আর নামাজ শেষ হতে হতেই দ্বিতীয় ওয়াক্ত প্রবেশ করা এবং সাথে সাথেই দ্বিতীয় ওয়াক্তের নামাজ আদায় করা। এতে বাহ্যিকভাবে মনে হয় দুটি নামাজ একসাথে পড়া হলো, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি নামাজই তার নিজস্ব ওয়াক্তের ভেতরেই সম্পন্ন হয়।
ইমামগণের বিস্তারিত মতামত ও দলীলসমূহ (آراء الأئمة وأدلتهم)
১. জমহুর ফুক্বাহা (ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ রহ.): সফরে জাময়ে তাক্বদীম ও জাময়ে তাখীর জায়েয
মূল সিদ্ধান্ত: জমহুর আইম্মায়ে কেরামের মতে, শরয়ী সফরকালে (কসর করার দূরত্বে ভ্রমণকালে) মুসাফিরের জন্য যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা— এই দুই জোড়া নামাজ জাময়ে তাক্বদীম অথবা জাময়ে তাখীর যেকোনো পদ্ধতিতে একত্রে আদায় করা সরাসরি জায়েয ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। মুসাফির যদি ওয়াক্তের শুরুতে চলমান থাকে তবে তাখীর করবে, আর ওয়াক্তের শুরুতে কোথাও অবস্থানরত থাকলে তাক্বদীম করবে।
জমহুর উলামাগণের দলীলসমূহ:
- মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর হাদিস: হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত:
«أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ، إِذَا ارْتَحَلَ قَبْلَ أَنْ تَزِيغَ الشَّمْسُ أَخَّرَ الظُّهْرَ حَتَّى يَجْمَعَهَا إِلَى العَصْرِ فَيُصَلِّيَهُمَا جَمِيعًا، وَإِذَا ارْتَحَلَ بَعْدَ زَيْغِ الشَّمْسِ صَلَّى الظُّهْرَ وَالعَصْرَ جَمِيعًا ثُمَّ سَارَ، وَكَانَ إِذَا ارْتَحَلَ قَبْلَ المَغْرِبِ أَخَّرَ المَغْرِبَ حَتَّى يُصَلِّيَهَا مَعَ العِشَاءِ، وَإِذَا ارْتَحَلَ بَعْدَ المَغْرِبِ عَجَّلَ العِشَاءَ فَصَلَّاهَا مَعَ المَغْرِبِ»
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক যুদ্ধে সূর্য ঢলার পূর্বে রওয়ানা হলে যোহরকে পিছিয়ে দিয়ে আসরের সাথে একত্রে মিলিয়ে আদায় করতেন। আর যদি সূর্য ঢলার পর রওয়ানা হতেন, তবে যোহর ও আসর একত্রে পড়ে যাত্রা শুরু করতেন। অনুরূপভাবে মাগরিবের পূর্বে রওয়ানা হলে মাগরিবকে পিছিয়ে এশার সাথে পড়তেন, আর মাগরিবের পর রওয়ানা হলে এশাকে এগিয়ে এনে মাগরিবের সাথে একত্রে পড়তেন।” (সুনানে আবু দাউদ: ১২২০; জামে তিরমিযী: ৫৫৩— ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন)। - হযরত আনাস (রা.)-এর হাদিস: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরে বের হলে যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশা একত্রে মিলিয়ে জামা করতেন।
২. মাযহাবে হানাফি: হজের ময়দান ব্যতীত সফরে কেবল জাময়ে সূরী জায়েয, জাময়ে হাক্বিক্বী জায়েয নয়
মূল সিদ্ধান্ত: ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.) এবং হানাফি ফকীহগণের মতে, ফরজ নামাজের প্রতিটি ওয়াক্ত মহান আল্লাহ তাআলা সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় করেছেন। সুতরাং হজ উপলক্ষে ৯ই জিলহজ আরাফার ময়দানে (যোহর ও আসর একত্রে) এবং মুযদালিফার রাতে (মাগরিব ও এশা একত্রে) জামা করা ব্যতীত অন্য কোনো সাধারণ সফরে কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় সময়ের প্রকৃত একত্রীকরণ (জাময়ে হাক্বিক্বী— তাক্বদীম বা তাখীর) করা জায়েয নেই। সফরে হাদিসে যে জমার কথা এসেছে, তা মূলত ‘জাময়ে সূরী’ (বাহ্যিক জমা); অর্থাৎ যোহরকে তার ওয়াক্তের শেষ মুহূর্তে এবং আসরকে ওয়াক্তের শুরুতে আদায় করা।
হানাফিগণের সুদৃঢ় দলীলসমূহ:
- কুরআনুল কারীমের অকাট্য নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
﴿إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا﴾
“নিশ্চয় নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফরজ করা হয়েছে।” (সূরা আন-নিসা: ১০৩)।
হানাফিগণের যুক্তি হলো, কুরআনের এই আয়াত قطعي الثبوت ও قطعي الدلالة (অকাট্য)। কোনো ওয়াক্তকে তার মূল সময়ের পূর্বে আনা কিংবা পরের ওয়াক্তে নিয়ে যাওয়া কুরআনের এই স্থায়ী নসের পরিপন্থী। কোনো খাবারে ওয়াহিদ (একক হাদিস) দিয়ে কুরআনের এই সাধারণ বিধান বাতিল করা যায় না। - হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর অকাট্য সাক্ষ্য: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)— যিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সফর ও হজের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করেন:
«مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ صَلَّى صَلَاةً إِلَّا لِمِيقَاتِهَا، إِلَّا صَلَاتَيْنِ: جَمَعَ بَيْنَ الظُّهْرِ وَالعَصْرِ بِعَرَفَةَ، وَبَيْنَ المَغْرِبِ وَالعِشَاءِ بِجَمْعٍ (أَيْ بِمُزْدَلِفَةَ)»
“আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বদা নির্দিষ্ট ওয়াক্তেই নামাজ আদায় করতে দেখেছি; কেবল দুটি নামাজ ব্যতীত— আরাফাতে যোহর ও আসর একত্রে মিলিয়েছেন এবং মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা একত্রে মিলিয়েছেন।” (সহীহ বুখারী: ১৬৮২; সহীহ মুসলিম: ১২৮৯)। - হযরত আয়েশা (রা.)-এর আমল ও বর্ণনা: হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরে যোহরকে দেরি করিয়ে এবং আসরকে জলদি এনে জাময়ে সূরী হিসেবে আদায় করতেন। (সুনানে নাসাঈ ও তহাবী)।
- উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা: আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.) বিভিন্ন অঞ্চলে গভর্নরদের কাছে ফরমান জারি করেছিলেন:
«الْجَمْعُ بَيْنَ الصَّلَاتَيْنِ فِي وَقْتٍ وَاحِدٍ كَبِيرَةٌ مِنْ كَبَائِرِ الذُّنُوبِ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ لَهُ عُذْرٌ»
“শরয়ী ওজর (হজ) ছাড়া একই ওয়াক্তে দুই ওয়াক্তের নামাজ একত্র করা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।” (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ)।
উভয় মতের পর্যালোচনা ও আধুনিক ফতোয়া
হানাফি মাযহাবের ফকীহগণ বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরে চলাচলের সুবিধার জন্য যোহরের শেষ ওয়াক্তে নামাজে দাঁড়িয়েছেন, সালাম ফিরাতে ফিরাতেই আসরের সময় হয়েছে এবং তখনই আসর পড়েছেন। দর্শক দূর থেকে দেখে মনে করেছেন তিনি দুই ওয়াক্ত একসাথে পড়লেন। এটাই হলো জাময়ে সূরী। এতে কুরআনের নির্দিষ্ট ওয়াক্তের বিধানও অক্ষুণ্ণ থাকে এবং রাসুল (সা.)-এর আমলের ওপরও পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়। তবে চরম সংকটে বা ট্রেনের যাত্রায় যেখানে নামার সুযোগ নেই, সেখানে হানাফি ফকীহগণও জাময়ে সূরীর কঠোর পরামর্শ দেন, আর নিরুপায় অবস্থায় জমহুরের মতের ওপর আমল করারও অবকাশ দেন কোনো কোনো সমকালীন মুফতী।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সফরকালীন জামা বাইনাস সালাতাইনের বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মতপার্থক্য মূলত দলীলের অগ্রাধিকার ও ব্যাখ্যাভিত্তিক। জমহুরের মত মুসাফিরের জন্য বিশেষ স্বস্তি ও প্রশস্ততা দেয়, আর হানাফি মাযহাবের মত নামাজের ওয়াক্তের কুরআন নির্দেশিত অকাট্যতাকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রদান করে। উভয় ধারাই হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং নিজ নিজ মাযহাব অনুযায়ী আমল করাই বিধেয়।
٨- هل تجوز الجماعة الثانية والثالثة فى مسجد صلى فيه مع الجماعة؟ بين آراء العلماء-
[৮. কোনো মসজিদে জামায়াতে নামাজ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় জামায়াত করা কি বৈধ? আলেমগণের মতামত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
জামাতে নামাজ আদায় করা ইসলামের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা প্রকাশ্য প্রতীক। একটি মহল্লা বা সমাজের মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব এবং প্রথম কাতারের ফজিলত অর্জনের প্রধান মাধ্যম হলো নিয়মিত জামাত। তবে কোনো কারণে কোনো মুসল্লি যদি মসজিদের মূল নির্ধারিত জামাত ছুটে যাওয়ার পর মসজিদে উপস্থিত হয়, তবে সে কি সেখানে পুনরায় দ্বিতীয় বা তৃতীয় জামাত কায়েম করতে পারবে, নাকি তাকে একাকী নামাজ আদায় করতে হবে— এ বিষয়ে ইসলামী আইন বিশারদগণের মাঝে গভীর আলোচনা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে মসজিদের প্রকারভেদ এবং এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মতামত বিশদভাবে উপস্থাপন করা হলো।
মসজিদের প্রকারভেদ ও মাসআলার ক্ষেত্র নির্ধারণ
মাসআলাটি সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য ফুকাহায়ে কেরাম মসজিদকে প্রধানত দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন:
- ১. মসজিদুন লাহূ ইমামুন ওয়া মুআজ্জিনুন রাতিব (مسجد له إمام ومؤذن راتب): এমন সাধারণ বা মহল্লার মসজিদ, যার নির্দিষ্ট ইমাম ও মুয়াজ্জিন রয়েছেন এবং সেখানে নির্ধারিত ওয়াক্তে স্থায়ী মুসল্লিদের নিয়ে মূল জামাত অনুষ্ঠিত হয়। (মূল মতভেদটি এই ধরনের মসজিদকে ঘিরেই)।
- ২. মাসজিদু ত্বরীক্ব বা উন্মুক্ত মসজিদ (مسجد على قارعة الطريق): এমন মসজিদ যার কোনো নির্দিষ্ট ইমাম-মুয়াজ্জিন নেই, যেখানে পথচারী, মুসাফির ও সাধারণ মানুষ ক্রমাগত আসে এবং নামাজ পড়ে চলে যায় (যেমন: রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, বিমানবন্দর বা হাইওয়ের মসজিদ)। এই ধরনের মসজিদে সকল ফকীহের সর্বসম্মত ঐকমত্যে একাধিক জামাত (দ্বিতীয়, তৃতীয় বা ততোধিক) করা সম্পূর্ণ বৈধ ও প্রশংসনীয়।
মহল্লার নির্দিষ্ট মসজিদে দ্বিতীয় ও তৃতীয় জামাতের হুকুম: আলেমগণের মতামত
১. জমহুর ফুক্বাহা (হানাফি, মালিকি ও শাফেয়ী মাযহাবের অগ্রগণ্য মত): দ্বিতীয় জামাত মাকরূহ
মূল সিদ্ধান্ত: হানাফি মাযহাবের সুপ্রতিষ্ঠিত ফতোয়া এবং ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মূল মত অনুযায়ী— যে মসজিদে নির্ধারিত ইমাম ও মুয়াজ্জিনের সাথে মূল জামাত সম্পন্ন হয়ে গেছে, সেই মসজিদে পুনরায় আযান ও একামত দিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় জামাত কায়েম করা মাকরূহে তাহরীমী (হারামের নিকটবর্তী মাকরূহ)। এমনকি আযান-একামত ব্যতীতও নিয়মিত জামাতের ন্যায় সাধারণ প্রকাশ্য দ্বিতীয় জামাত করা মাকরূহে তানজিহী। এক্ষেত্রে মুসল্লিদের কর্তব্য হলো নিজ নিজ একাকী নামাজ আদায় করে নেওয়া।
জমহুর উলামাগণের যুক্তি ও দলীলসমূহ:
- নবী কারীম (সা.)-এর বাস্তব সুন্নাহ: হযরত আবু বাকরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত:
«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ أَقْبَلَ مِنْ نَوَاحِي المَدِينَةِ يُرِيدُ الصَّلَاةَ، فَوَجَدَ النَّاسَ قَدْ صَلَّوْا، فَمَالَ إِلَى مَنْزِلِهِ فَجَمَعَ أَهْلَهُ فَصَلَّى بِهِمْ»
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার উপকণ্ঠ থেকে কোনো এক বিবাদ মীমাংসা শেষে মসজিদে নববীতে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে ফিরে এলেন। এসে দেখলেন সাহাবায়ে কেরাম মূল জামাত শেষ করে ফেলেছেন। তখন তিনি মসজিদে পুনরায় দ্বিতীয় জামাত না করে স্বীয় গৃহে গমন করলেন এবং পরিবারের লোকজনকে নিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করলেন।” (আল-মুজামুল আওসাত তাবারানী: ৪৬০১; সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর— সনদ হাসান)।
ফকীহগণের যুক্তি হলো: যদি মসজিদে দ্বিতীয় জামাত প্রশংসনীয় হতো, তবে আল্লাহর রাসুল (সা.) স্বীয় মসজিদে সাহাবীদের ডেকে অবশ্যই দ্বিতীয় জামাত করতেন; কিন্তু তিনি মসজিদের ঐক্য বজায় রাখতে তা করেননি। - সাহাবী ও তাবেয়ীগণের আমল: ইমাম হাসান বসরী (রহ.) বলেন: “সাহাবায়ে কেরাম যখন মসজিদে এসে দেখতেন জামাত শেষ হয়ে গেছে, তখন তাঁরা একাকী নামাজ আদায় করতেন।” (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ)। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁর অমর কিতাব ‘আল-উম্ম’-এ লিখেছেন: “আমরা বহুসংখ্যক সাহাবীকে পেয়েছি, যাঁরা জামাত ছুটে গেলে একাকী নামাজ পড়েছেন এবং পুনরায় দ্বিতীয় জামাত করেননি।”
- সামাজিক কারণ ও মাকাসিদুশ শরীয়াহ:
- প্রথম জামাত হালকা হয়ে যাওয়া: দ্বিতীয় জামাতকে উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ নির্ধারিত প্রথম জামাতে উপস্থিত হওয়ার তাগিদ হারিয়ে ফেলবে এবং ভাববে পরে গিয়ে জামাত করে নিলেই হবে।
- মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও দলাদলি: অসৎ উদ্দেশ্যে মানুষ ইমামের পেছনে নামাজ না পড়ে নিজেরা আলাদা দ্বিতীয় জামাত তৈরি করার সুযোগ পাবে, যা মসজিদে ফিতনা ও বিভেদের দ্বার উন্মোচন করবে।
২. হাম্বলি মাযহাব ও ইমাম তিরমিযী (রহ.): দ্বিতীয় জামাত বৈধ ও মুস্তাহাব
মূল সিদ্ধান্ত: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.), ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ এবং শাফেয়ী মাযহাবের পরবর্তী কিছু ফকীহের মতে— মূল জামাত শেষ হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি জামাত বঞ্চিত হলে, তারা পুনরায় জামাত করে নামাজ আদায় করতে পারবে, এতে কোনো প্রকার কারাহাত নেই; বরং জামাতের সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে তা মুস্তাহাব ও প্রশংসনীয়।
হাম্বলিগণের প্রামাণ্য দলীল:
- হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর হাদিস: একবার এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে এমন সময় প্রবেশ করলেন যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ শেষ করেছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন:
«مَنْ يَتَصَدَّقُ عَلَى هَذَا فَيُصَلِّيَ مَعَهُ؟ فَقَامَ رَجُلٌ مِنَ القَوْمِ فَصَلَّى مَعَهُ»
“তোমাদের মধ্যে কে আছে যে এই ব্যক্তির প্রতি সদকা করবে এবং তার সাথে দাঁড়িয়ে (দ্বিতীয়বার) নামাজ আদায় করবে? তখন এক ব্যক্তি (হযরত আবু বকর বা আবু তালহা রা.) দাঁড়ালেন এবং তার সাথে নামাজ আদায় করলেন।” (সুনানে আবু দাউদ: ৫৭৪; জামে তিরমিযী: ২২০— ইমাম তিরমিযী বলেন হাদিসটি হাসান)। - যুক্তি: জামাতে নামাজের ফজিলত ২৭ গুণ বেশি। তাই দ্বিতীয় জামাত করা হলে জামাতবঞ্চিত ব্যক্তিরা জামাতের সেই বিপুল সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে না।
হানাফি মাযহাবের পক্ষ থেকে হাম্বলি দলীলের জবাব ও সমন্বয়
হানাফি ও জমহুর উলামায়ে কেরাম আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন: উক্ত হাদিসে যে ব্যক্তি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি ইতিমধ্যে রাসুল (সা.)-এর পেছনে ফরজ আদায় করে ফেলেছিলেন। তিনি দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়েছিলেন নফল নামাজ হিসেবে অপর ব্যক্তিকে জামাতের সওয়াব পৌঁছানোর জন্য (সদকা হিসেবে)। এটি সাধারণ অর্থে নতুন করে ফরজ জামাত কায়েমের ঘটনা ছিল না।
তবে হানাফি মাযহাবেও বলা হয়েছে: যদি কোনো মসজিদে দ্বিতীয় জামাত একান্ত করতেই হয়, তবে তা হতে হবে—
১. কোনো প্রকার দ্বিতীয় আযান বা একামত ছাড়া,
২. মূল মেহরাব পরিহার করে পেছনের কোনো এক কোণে বা পাশে সরে গিয়ে,
৩. জনসমাগম না করে সম্পূর্ণ অনাড়ম্বরভাবে।
তাহলে কারাহাত অনেকটাই লাঘব হয়ে যায়।
উপসংহার
সারসংক্ষেপে বলা যায়, মসজিদে দ্বিতীয় জামাতের ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মতভেদ মূলত মসজিদের মর্যাদা ও ঐক্য রক্ষা বনাম জামাতের সওয়াব অর্জনের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের ফল। মহল্লার নিয়মিত মসজিদে প্রথম জামাতের গুরুত্ব ও পবিত্রতা রক্ষা করা সর্বাগ্রে কাম্য। তবে কেউ জামাত মিস করলে হানাফি মতে একাকী আদায় করা উত্তম, অথবা পেছনের অংশে বিনা আযান-একামতে সংক্ষেপে জামাত করা যেতে পারে।
مجموعة (ب) (খ বিভাগ)
الدرجات — ٥ × ٤ = ٢٠
٩- ما المراد بالتلفيق وما حكمه؟
[৯. التلفيق দ্বারা কী বোঝায় এবং এর হুকুম কী?]
ভূমিকা
ইসলামী শরীয়তের ফিকহী গবেষণায় এবং ফতোয়া অনুশীলনে ‘আত-তালফীক্ব’ (التلفيق) একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পারিভাষিক বিষয়। সাধারণ মানুষ বা মুফতীগণ যখন একাধিক মাযহাবের মতামত পর্যালোচনা করেন, তখন তাদের পদ্ধতিগত প্রয়োগের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য তালফীক্বের সীমারেখা জানা অপরিহার্য। নিম্নে তালফীক্বের অর্থ, এর বাস্তব রূপ এবং শরয়ী হুকুম বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।
তালফীক্বের অর্থ ও রূপ (المراد بالتلفيق)
১. শাব্দিক অর্থ
‘তালফীক্ব’ (التلفيق) শব্দটি আরবি ‘লাফাক্বা’ (لَفَقَ – يُلَفِّقُ – تَلْفِيقًا) ধাতু থেকে বাবে তাফঈল-এর মাসদার। এর শাব্দিক অর্থ হলো: দুটি কাপড়ের কিনারা একত্রে মিলিয়ে সেলাই করা (ضم طرفي الثوب وخياطتهما), বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন অংশ জোড়াতালি দেওয়া বা সংমিশ্রণ ঘটানো।
২. পারিভাষিক অর্থ
উসূলুল ফিকহের পরিভাষায় ‘তালফীক্ব’ বলা হয়:
«التَّلْفِيقُ هُوَ: التَّرْكِيبُ بَيْنَ قَوْلَيْنِ أَوْ أَكْثَرَ فِي مَسْأَلَةٍ وَاحِدَةٍ ذَاتِ أَرْكَانٍ بِحَيْثُ يَتَوَلَّدُ مِنْهُمَا حَقِيقَةٌ لَا يَقُولُ بِهَا كُلٌّ مِنَ الإِمَامَيْنِ»
“কোনো একটি একক ইবাদত বা লেনদেনের মাসআলায় দুই বা ততোধিক ইমামের মতকে এমনভাবে জোড়াতালি বা সংমিশ্রণ করা, যার ফলে এমন এক নতুন মিশ্রিত পদ্ধতির সৃষ্টি হয় যা সংমিশ্রণকারী ইমামগণের কারোর মতেই সহীহ বা শুদ্ধ নয়।”
৩. বাস্তব উদাহরণ
যেমন: কোনো ব্যক্তি ওযু করতে গিয়ে শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করে মাথার সামান্য কয়েকটি চুল মাসেহ করল (যা শাফেয়ী মতে জায়েয কিন্তু হানাফি মতে চার ভাগের এক ভাগ মাসেহ না হওয়ায় বাতিল)। অতঃপর সে কোনো বেগানা নারীকে স্পর্শ করল বা তার শরীর থেকে রক্ত বের হলো, তখন সে হানাফি মাযহাবের ফতোয়া নিল যে রক্ত বের হলে বা স্পর্শ করলে ওযু ভাঙে না। এরপর সে নামাজ আদায় করল।
ফলাফল: এই ব্যক্তির ওযু শাফেয়ী মাযহাব মতে বাতিল (কারণ নারীর স্পর্শে শাফেয়ী মতে ওযু ভেঙে গেছে), আবার হানাফি মাযহাব মতেও বাতিল (কারণ মাথার চার ভাগের এক ভাগ মাসেহ করা হয়নি)। অর্থাৎ এমন এক ওযু তৈরি হলো যা কোনো ইমামের মতেই শুদ্ধ নয়। এটিই হলো তালফীক্ব।
তালফীক্বের শরয়ী হুকুম (حكم التلفيق)
উসূলবিদ ও ফকীহগণের সর্বসম্মত গবেষণা অনুযায়ী তালফীক্বের হুকুম নিম্নরূপ:
- ১. বাতিল ও হারাম তালফীক্ব (التلفيق الباطل): যদি এমন কোনো জোড়াতালি দেওয়া হয় যা কোনো একটি একক আমলের ক্ষেত্রে উভয় মাযহাবের শর্তকে লঙ্ঘন করে এক অভিনব রূপ তৈরি করে (যেমন ওপরের ওযুর উদাহরণ), তবে তা সর্বসম্মত ঐকমত্যে বাতিল, না-জায়েয ও ফাসিদ। এমন আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়।
- ২. প্রবৃত্তিপূজা ও সুবিধা খোঁজার উদ্দেশ্যে তালফীক্ব (تتبع الرخص): দ্বীনি বিধানের ক্ষেত্রে কোনো ওজর ছাড়া কেবল নিজের স্বার্থ, ভোগবিলাস ও সুবিধাবাদিতা হাসিল করতে বিভিন্ন মাযহাব থেকে সবচেয়ে হালকা ও শিথিল ফতোয়া বেছে নেওয়া সর্বসম্মতভাবে হারাম। আল্লামা ইবনে আব্দিল বার (রহ.) বলেন: «مَنْ تَتَبَّعَ رُخَصَ العُلَمَاءِ تَزَنْدَقَ» (যে ব্যক্তি আলেমদের শিথিল ফতোয়া খুঁজে খুঁজে আমল করে, সে পথভ্রষ্ট বা জিন্দিক হয়ে যায়)।
- ৩. বৈধ ও গ্রহণযোগ্য সমন্বয় (التلفيق الجائز عند الضرورة): যদি কোনো সার্বজনীন সামাজিক সংকট, তীব্র মানবিক ওজর বা আধুনিক কোনো জটিল লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি বা শীর্ষস্থানীয় মুজতাহিদ ফকীহগণের কোনো পরিষদ শরীয়তের মূল মাকাসিদ অক্ষুণ্ণ রেখে কোনো মাযহাবের বৈধ মতের সমন্বয় ঘটান (যেমন মুসলিম পারিবারিক আইনে নিখোঁজ স্বামীর ইদ্দতের ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের বদলে মালিকি মাযহাবের ৪ বছরের ফতোয়া গ্রহণ), তবে তা উম্মতের কল্যাণে জায়েয ও গৃহীত।
উপসংহার
সারসংক্ষেপে, ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি অনুযায়ী বিভিন্ন মাযহাবের বিধান মিশ্রিত করে কোনো ইবাদতকে উভয় মাযহাবের শর্তহীন করে ফেলা সম্পূর্ণ না-জায়েয। তবে নির্ভরযোগ্য মুফতী ও ফিকহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে গণস্বার্থে ও শরয়ী প্রয়োজনে পরিচালিত সমন্বয় ইসলামী আইনের অন্যতম গতিশীল শক্তি।
١٠- اكتب خمسة كتب فقهية للمذهب الشافعى-
[১০. শাফেয়ি মাযহাবের পাঁচটি ফিকহী কিতাবের নাম লেখ।]
ভূমিকা
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শাফেয়ী মাযহাব ইসলামী ফিকহের ইতিহাসে এক অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও প্রামাণ্য শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের অধিকারী। হিজরী দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু করে যুগে যুগে যুগশ্রেষ্ঠ পণ্ডিতগণ এই মাযহাবের শাখা-প্রশাখা ও উসূল সংকলনে অনন্যসাধারণ গ্রন্থাবলি রচনা করেছেন। নিম্নে শাফেয়ী মাযহাবের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও বিশ্ববিখ্যাত পাঁচটি ফিকহী কিতাবের বিশদ বিবরণ উপস্থাপন করা হলো।
শাফেয়ী মাযহাবের পাঁচটি মৌলিক ফিকহী কিতাবের পরিচয়
১. কিতাবুল উম্ম (كتاب الأم)
- লেখক: ইমামুল মাযহাব আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) (১৫০ হি. – ২০৪ হি.)।
- বিবরণ: এটি শাফেয়ী মাযহাবের মূল উৎস ও সংবিধানতুল্য প্রাচীনতম বিশ্বকোষ। ইমাম শাফেয়ী মিশরে অবস্থানকালে তাঁর পরিমার্জিত মতবাদের (আল-কাউলুল জাদীদ) ওপর ভিত্তি করে এটি ছাত্রদের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করান। এটি মূলত ফিকহী মাসআলা, কুরআনের তাফসীর, হাদিসের দলিল ও তুলনামূলক ফিকহের এক সুবিশাল সংকলন।
২. আল-মুহায্যাব ফী ফিকহিল ইমামিশ শাফেয়ী (المهذب في فقه الإمام الشافعي)
- লেখক: শাইখুল ইসলাম আবু ইসহাক ইবরাহীম ইবনে আলী আশ-শিরাজী (রহ.) (৩৯৩ হি. – ৪৭৬ হি.)।
- বিবরণ: এটি শাফেয়ী মাযহাবের সবচেয়ে সুবিন্যস্ত, প্রামাণ্য ও মধ্যম আকারের মৌলিক পাঠ্যগ্রন্থ। এতে প্রতিটি মাসআলার সাথে তার দলীল ও কারণসমূহ প্রাঞ্জল ভাষায় সন্নিবেশিত হয়েছে। পরবর্তীতে ইমাম নববী (রহ.) এই গ্রন্থের ওপরই তাঁর সুবিশাল বিশ্বকোষ ‘আল-মাজমূ’ শরহুল মুহায্যাব’ রচনা করেন।
৩. মিনহাজুত ত্বালিবীন ওয়া উমদাতুল মুফতীন (منهاج الطالبين وعمدة المفتين)
- লেখক: ইমাম মুহিউদ্দীন আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে শারাফ আন-নববী (রহ.) (৬৩১ হি. – ৬৭৬ হি.)।
- বিবরণ: শাফেয়ী মাযহাবের ফতোয়া নির্ধারণ ও পাঠদানের ক্ষেত্রে এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও চূড়ান্ত সনদতুল্য কিতাব। ইমাম নববী ইমাম রাফেয়ী রচিত ‘মুহাররার’-কে অত্যন্ত নিপুণভাবে সংক্ষেপ ও পরিমার্জন করে এই গ্রন্থ তৈরি করেন। পরবর্তী যুগে শাফেয়ী মাযহাবের যাবতীয় ফতোয়া ও গবেষণা এই মিনহাজের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়েছে।
৪. আল-ওয়াসীত্ব ফীল মাযহাব (الوسيط في المذهب) / আল-ওয়াজীয
- লেখক: হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-গাযালী (রহ.) (৪৫০ হি. – ৫০৫ হি.)।
- বিবরণ: ইমাম গাযালী তাঁর উস্তাদ ইমামুল হারামাইন জুওয়াইনী রচিত ‘নেহায়াতুল মাতলাব’-কে সারসংক্ষেপ করে ক্রমান্বয়ে তিনটি গ্রন্থ রচনা করেন— আল-বাসীত, আল-ওয়াসীত এবং আল-ওয়াজীজ। এর মধ্যে ‘আল-ওয়াসীত’ শাফেয়ী মাযহাবের দলীলভিত্তিক গবেষণার এক অনুপম মাস্টারপিস হিসেবে বিবেচিত।
৫. ফাতহুল কারীব আল-মুজীব ফী শারহি আলফাজিত তাক্বরীব (فتح القريب المجيب)
- লেখক: শামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে কাসিম আল-গাযযী (রহ.) (৮৫৯ হি. – ৯১৮ হি.)।
- বিবরণ: এটি আবু শুজা রচিত বিশ্বখ্যাত প্রাথমিক পাঠ্য ‘মাতনে আবু শুজা’ বা ‘গায়াতুত তাক্বরীব’-এর এক অনবদ্য ও জনপ্রিয় ব্যাখ্যাগ্রন্থ। বিশ্বের প্রায় সকল দ্বীনি মাদ্রাসা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শাফেয়ী ফিকহের প্রারম্ভিক ও মাধ্যমিক স্তরে এই গ্রন্থটি বাধ্যতামূলকভাবে পাঠদান করা হয়।
উপসংহার
উক্ত পাঁচটি গ্রন্থ ছাড়াও শাফেয়ী মাযহাবে ‘তুহফাতুল মুহতাজ’ (ইবনে হাজার হাইতামী), ‘নেহায়াতুল মুহতাজ’ (শামসুদ্দীন আর-রমলী) এবং ‘মুগনিল মুহতাজ’ (খতীব শিরবীনী) এর মতো কালজয়ী কিতাবসমূহ রয়েছে, যা শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে আলোকিত করে রেখেছে।
١١- اكتب كلمات الإقامة حسب الفقه الحنفى والشافعى-
[১১. হানাফি ও শাফেয়ি ফিকহের আলোকে ইকামতের শব্দগুলো লেখ।]
ভূমিকা
ফরজ নামাজের জামাত শুরু করার প্রাক্কালে জামাতের কাতারে দাঁড়ানো এবং নামাজে প্রবেশের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য ‘ইকামত’ (الإقامة) দেওয়া সুন্নাত বা ওয়াজিবতুল্য গুরুত্বপূর্ণ আমল। ইকামত শব্দের আভিধানিক অর্থ দাঁড় করানো বা প্রতিষ্ঠিত করা। তবে ইকামতের বাক্যগুলো কতবার উচ্চারিত হবে— অর্থাৎ প্রতিটি বাক্য দুইবার করে (দ্বৈত শব্দ) নাকি একবার করে (একক শব্দ) উচ্চারিত হবে— এ বিষয়ে ফিকহে হানাফি ও ফিকহে শাফেয়ীর মাঝে হাদিসের বর্ণনাসূত্রের ভিত্তিতে বৈচিত্র্যপূর্ণ পদ্ধতি রয়েছে। নিম্নে উভয় মাযহাবের ইকামতের শব্দাবলী ও তুলনামূলক বিবরণ উপস্থাপন করা হলো।
১. ফিকহে হানাফি অনুযায়ী ইকামতের শব্দাবলী (كلمات الإقامة عند الحنفية)
মূল নীতি: হানাফি মাযহাব মতে ইকামতের শব্দসমূহ আযানের ন্যায় দুইবার করে (مَثْنَى مَثْنَى) উচ্চারণ করতে হয়। কেবল ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’ বাক্যটি অতিরিক্ত হিসেবে দুইবার বলতে হয়। ফলে হানাফি মাযহাবে ইকামতের মোট বাক্য সংখ্যা হলো ১৭টি।
ইকামতের ক্রম ও শব্দসমূহ নিম্নরূপ:
- «اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ» (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার) — ২ বার
- «اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ» (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার) — ২ বার
- «أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ» (আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) — ২ বার
- «أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ» (আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ) — ২ বার
- «حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ» (হাইয়্যা আলাস সালাহ) — ২ বার
- «حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ» (হাইয়্যা আলাল ফালাহ) — ২ বার
- «قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ، قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ» (ক্বদ ক্বামাতিস সালাহ, ক্বদ ক্বামাতিস সালাহ) — ২ বার
- «اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ» (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার) — ২ বার
- «لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ» (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) — ১ বার
হানাফিগণের দলীল: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)— যাঁর স্বপ্নের মাধ্যমে আযান ও ইকামতের সূত্রপাত ঘটেছিল, তিনি বর্ণনা করেন: “স্বপ্নে যে ব্যক্তি আমাকে আযান শিখিয়েছিলেন, তিনি আযানের শব্দগুলো দুইবার করে এবং ইকামতের শব্দগুলোও দুইবার করে শিখিয়েছিলেন।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯; জামে তিরমিযী: ১৮৯— ইমাম তিরমিযী একে সহীহ বলেছেন)। এছাড়াও হযরত আবু মাহযূরাহ (রা.)-এর হাদিসেও ইকামতের শব্দ দ্বৈত এসেছে।
২. ফিকহে শাফেয়ী অনুযায়ী ইকামতের শব্দাবলী (كلمات الإقامة عند الشافعية)
মূল নীতি: শাফেয়ী মাযহাব মতে ইকামতের শব্দসমূহ এককভাবে (فُرَادَى فُرَادَى) একবার করে উচ্চারণ করতে হয়। তবে শুরুর তাকবীর (আল্লাহু আকবার) দুইবার, ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’ দুইবার এবং শেষের তাকবীর দুইবার বলতে হয়। ফলে শাফেয়ী মাযহাবে ইকামতের মোট বাক্য সংখ্যা হলো ১১টি।
ইকামতের ক্রম ও শব্দসমূহ নিম্নরূপ:
- «اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ» (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার) — ১ জোড়া (২ বার)
- «أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ» (আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) — ১ বার
- «أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ» (আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ) — ১ বার
- «حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ» (হাইয়্যা আলাস সালাহ) — ১ বার
- «حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ» (হাইয়্যা আলাল ফালাহ) — ১ বার
- «قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ، قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ» (ক্বদ ক্বামাতিস সালাহ, ক্বদ ক্বামাতিস সালাহ) — ২ বার
- «اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ» (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার) — ১ জোড়া (২ বার)
- «لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ» (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) — ১ বার
শাফেয়ীগণের দলীল: হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«أُمِرَ بِلَالٌ أَنْ يَشْفَعَ الأَذَانَ وَأَنْ يُوتِرَ الإِقَامَةَ إِلَّا الإِقَامَةَ»
“হযরত বিলাল (রা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তিনি আযানের শব্দগুলো জোড়ায় জোড়ায় (দুইবার করে) বলেন এবং ইকামতের শব্দগুলো বেজোড়ভাবে (একবার করে) বলেন, কেবল ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’ ব্যতীত।” (সহীহ বুখারী: ৬০৫; সহীহ মুসলিম: ৩৭৮)।
উপসংহার
উভয় পদ্ধতিই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ আমল দ্বারা প্রমাণিত। হানাফিগণ আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ ও আবু মাহযূরাহ (রা.)-এর হাদিসকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং শাফেয়ীগণ হযরত বিলাল (রা.)-এর হাদিসকে গ্রহণ করেছেন। ফলে উভয় তরিকায় ইকামত দেওয়াই শরীয়তসম্মত ও শুদ্ধ।
١٢- بين آراء فقهاء الأحناف فى تكبيرات العيدين-
[১২. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার অতিরিক্ত তাকবিরের বিষয়ে হানাফি ফকিহগণের মতামত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দুই রাকাত নামাজ ওয়াজিব। এই নামাজের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে সাধারণ নামাজের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু তাকবীর (তাকবীরাতে ঈদাইন) যুক্ত করা হয়। হানাফি মাযহাবে অতিরিক্ত তাকবীরের সংখ্যা ও তার বিন্যাসের ক্ষেত্রে এক চমৎকার পদ্ধতিগত ঐকমত্য ও ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। নিম্নে হানাফি ফকীহগণের সর্বসম্মত ও নির্ভরযোগ্য মতামত বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।
হানাফি মাযহাবের মূল সিদ্ধান্ত: অতিরিক্ত ৬ তাকবীর (ست تكبيرات زوائد)
হানাফি মাযহাবের ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) সহ জমহুর হানাফি ফুক্বাহাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: দুই ঈদের নামাজে অতিরিক্ত ৬টি তাকবীর ওয়াজিব। এর মধ্যে ১ম রাকাতে কিরাতের পূর্বে ৩টি এবং ২য় রাকাতে কিরাতের পর রুকুর পূর্বে ৩টি অতিরিক্ত তাকবীর প্রদান করতে হয়।
তাকবীর আদায়ের নিয়ম ও বিন্যাস
- ১ম রাকাত:
- ইমাম ও মুকতাদি প্রথমে তাকবীরে তাহরীমা (اللَّهُ أَكْبَرُ) বলে হাত বাঁধবে।
- নীরবে সানা (سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ…) পাঠ করবে।
- এরপর ইমাম উচ্চস্বরে এবং মুকতাদিগণ অনুচ্চস্বরে অতিরিক্ত ৩টি তাকবীর বলবে। ১ম ও ২য় তাকবীরে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে, আর ৩য় তাকবীরে হাত উঠিয়ে নাভির নিচে বাঁধতে হবে।
- এরপর আউযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মিলিয়ে স্বাভাবিকভাবে রুকু-সেজদা সম্পন্ন করবে।
- ২য় রাকাত:
- সেজদা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাঁধা অবস্থায় প্রথমে বিসমিল্লাহ সহ সূরা ফাতিহা ও কিরাত পাঠ করবে।
- কিরাত শেষ করার পর রুকুতে যাওয়ার ঠিক পূর্বে দাঁড়িয়ে হাত উঠিয়ে অতিরিক্ত ৩টি তাকবীর বলবে এবং প্রতিবার হাত ছেড়ে দেবে।
- এরপর ৪র্থ তাকবীর বলে রুকুতে গমন করবে (এই ৪র্থ তাকবীরটি মূলত রুকুর তাকবীর)।
হানাফি ফকীহগণের দলীল ও ভিত্তি
হানাফি ফকীহগণের এই ফতোয়া সরাসরি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং অন্যান্য বিশিষ্ট সাহাবীর আমলের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
- আলক্বামাহ ও আসওয়াদ (রহ.) থেকে বর্ণিত: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর উপস্থিতিতে হযরত হুযায়ফা (রা.) ও আবু মুসা আশআরী (রা.) ঈদের তাকবীর সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তখন ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন: “ঈদের নামাজে চার তাকবীর বলবে (তাকবীরে তাহরীমা সহ ৩ অতিরিক্ত তাকবীর), তারপর কিরাত পড়বে। এরপর দ্বিতীয় রাকাতে কিরাত পড়বে, তারপর রুকুর পূর্বে চার তাকবীর বলবে (৩ অতিরিক্ত তাকবীর এবং ৪র্থ তাকবীরে রুকুতে যাবে)।” (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৫৬৮৬; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ৫৮১১— সনদ সহীহ)।
- ইমাম ত্বহাবী (রহ.) ‘শারহু মাআনিল আসার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কুফার সাহাবী ও তাবেয়ীগণের অবিচ্ছিন্ন আমল এই ৬ তাকবীরের ওপরই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল।
হানাফি মাযহাবের অভ্যন্তরীণ ভিন্ন রেওয়ায়েত (১২ তাকবীরের বর্ণনা)
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) থেকে একটি বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি খলিফা হারুনুর রশিদের অনুরোধে মক্কা-মদিনাবাসীর আমলের সাথে সমন্বয় করে ১ম রাকাতে কিরাতের পূর্বে ৭ তাকবীর এবং ২য় রাকাতে কিরাতের পূর্বে ৫ তাকবীর (মোট ১২ অতিরিক্ত তাকবীর)-এর পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। তবে হানাফি মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া ও কার্যকর আমল হলো হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত ৬ অতিরিক্ত তাকবীরের ওপরই।
উপসংহার
হানাফি মাযহাবের ৬ তাকবীরের পদ্ধতিটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল। এতে ১ম রাকাতে কিরাতের পূর্বে এবং ২য় রাকাতে কিরাতের পরে তাকবীরগুলো থাকায় কিরাতটি দুই তাকবীরের মাঝখানে প্রস্ফুটিত হয়ে এক চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করে।
١٣- اكتب بعض أدلة جواز قراءة القرآن للميت-
[১৩. মৃতের সাওয়াবের জন্য কুরআন তেলওয়াতের বৈধতা সম্পর্কে কয়েকটি দলিল লেখ।]
ভূমিকা
মুমিনের মৃত্যুর পর তার মাগফিরাত, পারলৌকিক শান্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য জীবিতদের পক্ষ থেকে নেক আমল করে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির আত্মায় পৌঁছে দেওয়াকে ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ‘ঈসালে সওয়াব’ (إيصال الثواب) বলা হয়। দান-সদকা ও দোয়ার সওয়াব পৌঁছার ব্যাপারে যেমন কোনো মতভেদ নেই, তেমনি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে সেই তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির রূহে বখশিয়ে দেওয়া আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের জমহুর ফুক্বাহাদের নিকট সম্পূর্ণ বৈধ ও প্রশংসনীয়। নিম্নে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছার প্রামাণ্য দলীলসমূহ উপস্থাপন করা হলো।
কুরআন তিলাওয়াত করে ঈসালে সওয়াবের বৈধতার দলীলসমূহ
১. সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াতের সুস্পষ্ট হাদিস
হযরত মা’ক্বিল ইবনে ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«اقْرَءُوا عَلَى مَوْتَاكُمْ يس»
“তোমরা তোমাদের মৃতদের (মৃত্যুপথযাত্রী বা মৃত ব্যক্তিদের) উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াত কর।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩১২১; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৪৪৮; মুসনাদে আহমদ: ২০৩১৬— ইমাম হাকেম ও ইবনে হিব্বান একে সহীহ বলেছেন)।
ফকীহগণ বলেন, ‘মাওতাকুম’ শব্দের বাহ্যিক অর্থ হলো মৃত ব্যক্তিরা। সুতরাং মৃতের পাশে বা তার উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করা সুন্নাহসম্মত।
২. কবরে সূরা বাক্বারার শুরু ও শেষ তিলাওয়াত সংক্রান্ত সাহাবী আমল
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
«إِذَا مَاتَ أَحَدُكُمْ فَلَا تَحْبِسُوهُ وَأَسْرِعُوا بِهِ إِلَى قَبْرِهِ، وَلْيُقْرَأْ عِنْدَ رَأْسِهِ بِفَاتِحَةِ البَقَرَةِ، وَعِنْدَ رِجْلَيْهِ بِخَاتِمَةِ البَقَرَةِ»
“যখন তোমাদের কেউ মারা যায়, তখন তাকে আটকে রেখো না; বরং তাকে দ্রুত কবরে নিয়ে যাও। আর তার কবরে মাথার পাশে সূরা বাকারার প্রথমাংশ এবং পায়ের পাশে সূরা বাকারার শেষাংশ তিলাওয়াত কর।” (বায়হাকী: শুয়াবুল ঈমান— ৯২৯৪; তাবারানী: আল-মুজামুল কাবীর; ইমাম নববী ‘আল-আজকার’ গ্রন্থে সনদের প্রশংসা করেছেন)।
৩. কবরে খেজুরের ডাল রোপণের হাদিস দ্বারা কিয়াস
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যাদের আজাব হচ্ছিল। তখন নবীজি একটি তাজা খেজুরের ডাল দুই টুকরো করে দুটি কবরে গেঁড়ে দিলেন এবং বললেন:
«لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا»
“যতক্ষণ এই দুটি ডাল শুকিয়ে না যাবে, ততক্ষণ তাদের আজাব লাঘব করা হবে।” (সহীহ বুখারী: ২১৬)।
আল্লামা আইনী, ইমাম নববী ও ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন: একটি সামান্য তাজা ডালের তাসবীহ পাঠের কারণে যদি মৃত ব্যক্তির কবরের আজাব লাঘব হতে পারে, তবে একজন মুমিনের মুখ নিঃসৃত পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত— যা সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ কালাম— তার বরকত ও সওয়াব দ্বারা কেন মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে না? এটি স্পষ্ট কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত।
৪. জমহুর চার মাযহাবের ফকীহগণের ঐকমত্য
- ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.): ইমাম আহমদ বলেন, কবরে গেলে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী ও সূরা ইখলাস পড়ে তার সওয়াব মৃতের উদ্দেশ্যে পৌঁছালে তা অবশ্যই পৌঁছে যায়।
- আল্লামা ইবনে কুদামাহ আল-হাম্বলী (রহ.): তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘আল-মুগনী’-তে লিখেছেন: “যেকোনো নেক আমল করে তার সওয়াব মৃত মুসলমানকে দান করলে তা তার কাছে পৌঁছায় এবং সে তা দ্বারা উপকৃত হয়।”
- ইমাম নববী আশ-শাফেয়ী (রহ.): ‘আল-মাজমূ’ শরহুল মুহায্যাব’-এ উল্লেখ করেছেন: “শাফেয়ী আলেমগণ বলেছেন, মৃতের কবরে কুরআন তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব। আর পুরো কুরআন খতম করা হলে তো আরও উত্তম ও বরকতময়।”
- হানাফি ফিকহের অবস্থান: ‘হিদায়াহ’, ‘রদ্দুল মুহতার’ ও ‘ফাতাওয়া আলমগীরী’-তে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে, মানুষ তার যেকোনো আমলের (নামাজ, রোজা, তিলাওয়াত, সদকা) সওয়াব অন্য যেকোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তিকে বখশিয়ে দিতে পারে।
উপসংহার
সারসংক্ষেপে, কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতের মাগফিরাত কামনা ও সওয়াব বখশিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত ও সালাফে সালেহীনের আমল দ্বারা প্রমাণিত। তবে তিলাওয়াতটি হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং কোনো প্রকার ভাড়া বা চুক্তিভিত্তিক বাণিজ্যিক বিনিময় ব্যতিরেকে নিখাদ ইখলাসের সাথে।
١٤- اكتب آراء الأئمة فى عدد ركعات التراويح-
[১৪. তারাবিহ নামাজের রাকাত সম্পর্কে ইমামগণের মতামত লেখ।]
ভূমিকা
পবিত্র মাহে রমজানের বরকতময় রজনীসমূহে এশার ফরজ ও সুন্নাতের পর বিতরের পূর্বে জামাতের সাথে যে বিশেষ নামাজ আদায় করা হয়, তাকে ‘সালাতুত তারাবীহ’ (صلاة التراويح) বলা হয়। ‘তারাবীহ’ শব্দটি ‘তারবীহাহ’ (ترويحة)-এর বহুবচন, যার অর্থ বিশ্রাম নেওয়া। প্রতি চার রাকাত পর পর বিশ্রাম নেওয়া হয় বলে এর নাম তারাবীহ। তারাবীহ নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এর রাকাত সংখ্যা নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে পদ্ধতিগত মতামত বিদ্যমান। নিম্নে চার প্রধান মাযহাবের ইমামগণের মতামত ও দলীল বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।
চার মাযহাবের ইমামগণের বিস্তারিত মতামত
১. জমহুর আইম্মায়ে কেরাম (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ রহ.): ২০ রাকাত
মূল সিদ্ধান্ত: হানাফি, শাফেয়ী ও হাম্বলি মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এবং মুসলিম উম্মাহর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের ফতোয়া হলো— তারাবীহ নামাজ বিশ (২০) রাকাত। দুই দুই রাকাত করে মোট দশ সালামে বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। হারামাইন শরিফাইনে (মক্কার মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববী) শত শত বছর ধরে এই বিশ রাকাতই প্রচলিত রয়েছে।
জমহুরের অকাট্য দলীলসমূহ:
- হযরত উমর (রা.)-এর যুগে সাহাবাদের ইজমা: হযরত সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে:
«كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً»
“সাহাবায়ে কেরাম আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে রমজান মাসে বিশ (২০) রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন।” (সুনানে বায়হাকী কুবরা: ৪৩৯৩; মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার; ইমাম নববী, ইমাম ইবনে কুদামাহ ও আল্লামা যায়লায়ী সনদকে সহীহ বলেছেন)। - খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ» (তোমরা আমার সুন্নাত এবং আমার হিদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে মাড়ির দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধরো)। হযরত উমর (রা.)-এর এই সিদ্ধান্তের ওপর হযরত উসমান (রা.), আলী (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.) সহ কোনো সাহাবী কখনো আপত্তি করেননি, যা সর্বসম্মত ‘ইজমাউস সাহাবাহ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
- হযরত আলী (রা.)-এর আমল: হযরত আলী (রা.) রমজান মাসে এক ব্যক্তিকে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়ানোর জন্য ইমাম নিযুক্ত করতেন এবং বিতরের জন্য অন্য ইমাম দিতেন। (বায়হাকী)।
২. ইমাম মালিক (রহ.) ও মদিনাবাসীদের মত: ৩৬ রাকাত (অথবা ২০ রাকাত)
মূল সিদ্ধান্ত: ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর একটি বর্ণনা অনুযায়ী তারাবীহ বিশ রাকাত। তবে মাযহাবে মালিকির সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত অভিমত হলো— তারাবীহ নামাজ ছত্রিশ (৩৬) রাকাত এবং এর সাথে ৩ রাকাত বিতর মিলিয়ে মোট ৩৯ রাকাত।
ইমাম মালিকের দলীল ও প্রেক্ষাপট:
ইমাম মালিক বলেন: “আমি মদিনার অধিবাসীদের ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের যুগ থেকে ৩৬ রাকাত তারাবীহ আদায় করতে দেখেছি।”
এর কারণ হলো: মক্কাবাসী সাহাবী ও তাবেয়ীগণ তারাবীহর প্রতি চার রাকাত পর পর মক্কার কা’বা শরীফ এক চক্কর তাওয়াফ করতেন এবং দুই রাকাত তাওয়াফের নামাজ পড়তেন। এভাবে পাঁচ তারবীহায় তাঁরা মোট চারবার তাওয়াফ করে অতিরিক্ত ১৬ রাকাত নামাজের সওয়াব অর্জন করতেন। মদিনাবাসীগণ মক্কাবাসীদের এই অতিরিক্ত ফজিলতের সমকক্ষ হওয়ার জন্য প্রতি তারবীহায় তাওয়াফের চার রাকাতের বদলে অতিরিক্ত ৪ রাকাত করে মোট ১৬ রাকাত বৃদ্ধি করেন। ফলে বিশ রাকাতের সাথে ১৬ রাকাত যোগ হয়ে মোট ৩৬ রাকাত তারাবীহর প্রচলন হয়। সুতরাং ইমাম মালিকের ৩৬ রাকাতের মূল ভিত্তিও মূলত বিশ রাকাতই।
৮ রাকাত সংক্রান্ত বর্ণনার পর্যালোচনা
হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে রমজানে ও রমজানের বাইরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ১১ রাকাতের কথা এসেছে (সহীহ বুখারী: ১১৪৭)। মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণের সর্বসম্মত বিশ্লেষণ অনুযায়ী উক্ত হাদিসটি রমজানের বিশেষ ‘তারাবীহ’ সম্পর্কিত নয়; বরং তা ছিল সারা বছর রাতের বেলা রাসুল (সা.)-এর নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজ সম্পর্কিত। কারণ তারাবীহ নামাজ কেবল রমজানের রাতের সুন্নাত, যা কখনো রমজানের বাইরে আদায় করা হয় না।
উপসংহার
সারসংক্ষেপে, হযরত উমর (রা.)-এর যুগ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি উম্মাহর নিরবচ্ছিন্ন আমল ও সাহাবায়ে কেরামের ইজমার ভিত্তিতে ২০ রাকাত তারাবীহই সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ হিসেবে প্রমাণিত। উম্মতের ঐক্য ও ইবাদতের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করাই সার্বজনীন কর্তব্য।
١٥- هل تجب الزكاة فى مال الصبى؟ بين-
[১৫. শিশুর উপর কি যাকাত ওয়াজিব হয়? বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
যাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক পঞ্চস্তম্ভের একটি। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানের ওপর যাকাত ফরজ হয়। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু (الصبي) যদি উত্তরাধিকারসূত্রে, হেবা বা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তবে সেই শিশুর মালের ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে কি না এবং তার অভিভাবকের দায়িত্ব কী— এ বিষয়ে ইসলামী ফিকহের ইমামগণের মাঝে দুটি প্রধান ধারা পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে উভয় দৃষ্টিভঙ্গি দলীলসহ তুলে ধরা হলো।
১. জমহুর ফুক্বাহা (ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ রহ.): শিশুর মালের ওপর যাকাত ওয়াজিব
মূল সিদ্ধান্ত: জমহুর আইম্মায়ে কেরামের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর মাল যদি নিসাব পরিমাণ হয় এবং এক বছর অতিবাহিত হয়, তবে তার মালের ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে। শিশুর অভিভাবক (ওলী বা অভিভাবক) শিশুর পক্ষ থেকে সেই যাকাত আদায় করে দেবে।
জমহুরের দলীলসমূহ:
- কুরআনের সাধারণ নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
﴿خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا﴾
“তাদের সম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) গ্রহণ করুন, যা দ্বারা আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।” (সূরা আত-তাওবাহ: ১০৩)।
জমহুরের যুক্তি হলো, যাকাত মূলত ‘হাক্কুল মাল’ (সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট অধিকার), ব্যক্তির বয়সের সাথে এর সম্পর্ক নেই। যে মালের নিসাব পূর্ণ হয়েছে, তার হক্ব হিসেবেই যাকাত আদায় করতে হবে। - হাদিস শরীফ: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«اتَّجِرُوا فِي أَمْوَالِ اليَتَامَى، لَا تَأْكُلْهَا الصَّدَقَةُ»
“তোমরা এতিম-শিশুদের সম্পদ ব্যবসায় খাটাও, যাতে সদকা (যাকাত) তাদের সম্পদকে খেয়ে নিঃশেষ করে না দেয়।” (জামে তিরমিযী: ৬৪১; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক— মুরসাল সহীহ)।
এই হাদিস প্রমাণ করে যে এতিম ও শিশুর মালের ওপর যাকাত কার্যকর হয়, যার কারণেই সম্পদ ব্যবসায় খাটিয়ে বৃদ্ধির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। - হযরত উমর ও আয়েশা (রা.)-এর আমল: হযরত উমর (রা.) ও আয়েশা (রা.) এতিম ও শিশুদের সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করতেন।
২. মাযহাবে হানাফি (ইমাম আবু হানিফা রহ.): শিশুর মালের ওপর যাকাত ওয়াজিব নয়
মূল সিদ্ধান্ত: ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.) এবং হানাফি ফকীহগণের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয় না। শিশুর ওলী বা অভিভাবকের জন্যও শিশুর মাল থেকে যাকাত দেওয়া জায়েয নেই। তবে শিশুর ফসলি জমির ওপর উশর (ফসল কাটার যাকাত) এবং সদকাতুল ফিতর কার্যকর হবে।
হানাফিগণের যুক্তি ও দলীলসমূহ:
- তাকলীফ বা দায়িত্বারোপের অনুপস্থিতি: হযরত আলী (রা.) ও আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«رُفِعَ القَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ المَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ»
“তিন ব্যক্তি থেকে কলম তুলে নেওয়া হয়েছে (তাদের কোনো পাপ বা শরয়ী বাধ্যবাধকতা লেখা হয় না): ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু বালেগ হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল সুস্থ হওয়া পর্যন্ত।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৪০৩; জামে তিরমিযী: ১৪২৩)।
হানাফিগণের যুক্তি হলো, যাকাত একটি নিখাদ শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত (عبادة مالية)। আর ইবাদতের মূল শর্ত হলো সুস্থ বিবেক, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং নিয়তের সক্ষমতা। শিশু যেহেতু শরীয়তের আদেশের আওতাভুক্ত (মুকাল্লাফ) নয় এবং তার নিয়তের ক্ষমতা নেই, তাই তার ওপর নামাজ-রোজার ন্যায় যাকাতও ফরজ নয়। - শিশুর সম্পদে হস্তক্ষেপের নিষেধাজ্ঞা: আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন: ﴿وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ﴾ (আর এতিমের মালের কাছেও যেও না উত্তম পন্থা ব্যতীত)। শিশুর মালের কোনো ক্ষতি করা বা অভিভাবক কর্তৃক যাকাতের নামে মাল হ্রাস করা শরীয়ত পরিপন্থী।
- আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ফতোয়া: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: শিশুর মালের ওপর যাকাত নেই, যতক্ষণ না সে বালেগ হয়।
উপসংহার
উভয় মাযহাবের যুক্তি অত্যন্ত জোরালো। জমহুর উলামাগণ দরিদ্রের অধিকার ও মালের পবিত্রতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, পক্ষান্তরে হানাফি মাযহাব শিশুর অক্ষমতা এবং ইবাদতের জন্য অপরিহার্য শর্ত ‘তাকলীফ’-এর ওপর ভিত্তি করেছে। তবে শিশু বালেগ হওয়ার পর সে যদি নিসাবের মালিক থাকে, তবে পরবর্তী বছর থেকে তার ওপর যাকাত সর্বসম্মতভাবে ফরজ হবে।
١٦- ماذا تفعل المرأة إذا وجب عليها الحج وليس له زوج أو محرم؟
[১৬. হজ ওয়াজিব হয়েছে এমন কোনো মহিলার স্বামী বা মাহরাম না থাকলে তার করণীয় কী?]
ভূমিকা
পবিত্র হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি ফরজ বিধান। যার কা’বা শরীফ পর্যন্ত যাতায়াতের আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে, তার ওপর জীবনে একবার হজ আদায় করা ফরজ। তবে নারীদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক সামর্থ্যের (استطاعة) পাশাপাশি অতিরিক্ত একটি অপরিহার্য শর্ত হলো নিরাপদ সফর ও মাহরাম পুরুষের সঙ্গী থাকা। যদি কোনো মহিলার ওপর আর্থিক ও শারীরিকভাবে হজ ফরজ হয়, কিন্তু তার কোনো স্বামী বা বৈধ মাহরাম না থাকে, তবে সে ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান ও তার করণীয় কী— এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
১. হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের সিদ্ধান্ত: মাহরাম ছাড়া সফরে যাওয়া হারাম, অপেক্ষা বা বদলী হজ করবে
মূল সিদ্ধান্ত: হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের মতে, কোনো মহিলার কা’বা শরীফে যাতায়াতের পূর্ণ আর্থিক প্রাচুর্য থাকলেও যদি তার সাথে যাওয়ার মতো কোনো স্বামী বা প্রাপ্তবয়স্ক বিশ্বস্ত মাহরাম (যাদের সাথে চিরতরে বিবাহ হারাম) না থাকে, তবে তার ওপর সরাসরি হজের সফরে বের হওয়া না-জায়েয ও হারাম। মাহরাম সঙ্গী পাওয়া মহিলার জন্য হজ ওয়াজিবের একটি অন্যতম রুকন বা শর্ত।
দলীলসমূহ:
- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
«لَا تُسَافِرِ المَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ، وَلَا يَدْخُلُ عَلَيْهَا رَجُلٌ إِلَّا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ، فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أَخْرُجَ فِي جَيْشِ كَذَا وَكَذَا، وَامْرَأَتِي تُرِيدُ الحَجَّ؟ فَقَالَ: اخْرُجْ مَعَهَا»
“কোনো মহিলা যেন মাহরাম ব্যতীত সফর না করে… তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল: হে আল্লাহর রাসুল! আমি অমুক অমুক জিহাদের সেনাদলে নাম লিখিয়েছি, অথচ আমার স্ত্রী হজে যেতে চায়? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন: তুমি জিহাদে না গিয়ে ফিরে যাও এবং তোমার স্ত্রীর সাথে হজে যাও।” (সহীহ বুখারী: ১৮৬২; সহীহ মুসলিম: ১৩৪১)। - হযরত আবু হুরায়রা ও ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত: “আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো মহিলার জন্য মাহরাম ব্যতীত তিন দিন বা এক দিনের দূরত্বের পথ সফর করা হালাল নয়।” (সহীহ বুখারী: ১০৮৮)।
এমন মহিলার বাস্তব করণীয়:
- মহিলাটি অপেক্ষা করবে যে আল্লাহ তাআলা তাকে কোনো স্বামী দান করেন কি না অথবা কোনো মাহরামের (যেমন পিতা, ভাই, পুত্র, চাচা) ব্যবস্থা হয় কি না। এমনকি মাহরামের হজের খরচ মহিলা বহন করতে পারলে তা বহন করে তাকে সাথে নেবে।
- যদি বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত কোনো মাহরামের ব্যবস্থা না হয় এবং শারীরিকভাবে হজে যাওয়ার শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে, তবে সে তার জীবদ্দশায় নিজের পক্ষ থেকে কাউকে বদলী হজ (الحج بالبدل) করানোর ব্যবস্থা করবে অথবা মৃত্যুর পূর্বে স্বীয় ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে বদলী হজ করানোর জন্য অসিয়ত (الوصية) করে যাবে। এর ফলে সে ফরজ তরকের গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে।
২. শাফেয়ী ও মালিকি মাযহাবের সিদ্ধান্ত: নিরাপদ নারী দল থাকলে প্রথম ফরজ হজ আদায় করতে পারবে
মূল সিদ্ধান্ত: শাফেয়ী ও মালিকি মাযহাবের ফকীহগণের মতে, এটি যেহেতু জীবনের প্রথম ফরজ হজ, তাই যদি রাস্তা সম্পূর্ণ নিরাপদ হয় এবং মহিলার সাথে একাধিক নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত ও দ্বীনদার স্বাধীন মুসলিম নারীর জামাত বা সঙ্গিনী (رفقة مأمونة من النساء الثقات) থাকে, তবে স্বামী বা মাহরাম পুরুষ না থাকলেও সে ফরজ হজ আদায় করতে মক্কায় সফর করতে পারবে এবং তার হজ বিশুদ্ধভাবে আদায় হয়ে যাবে।
তাঁদের দলীল ও যুক্তি:
– রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আদী ইবনে হাতিম (রা.)-কে ইসলামের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সুসংবাদ দিয়ে বলেছিলেন: “অদূর ভবিষ্যতে তুমি দেখতে পাবে একজন একাকী নারী উটের পিঠে আরোহণ করে হীরা (ইরাক) থেকে মক্কায় এসে কা’বা তাওয়াফ করবে, অথচ সে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাবে না।” (সহীহ বুখারী: ৩৫৯৫)।
– হযরত উমর (রা.) তাঁর শেষ খিলাফতকালে নবীজি (সা.)-এর উম্মাহাতুল মুমিনীনগণের (আয়েশা ও উম্মে সালামা রা.) জন্য হযরত উসমান ও আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-কে অভিভাবক বানিয়ে মাহরাম ছাড়াই নিরাপদ কাফেলায় হজে পাঠিয়েছিলেন।
উপসংহার
সারসংক্ষেপে, স্বামী বা মাহরাম না থাকলে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী মহিলার নিজে সফর করা বৈধ নয়; সে মাহরামের অপেক্ষা করবে অথবা জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর আগে বদলী হজের অসিয়ত করবে। তবে আধুনিক যুগে হজ এজেন্সির সার্বিক নিরাপত্তা ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে যদি কোনো মহিলা চরম বাধ্য হয়ে শাফেয়ী বা মালিকি মাযহাবের সুযোগ গ্রহণ করে নিরাপদ নারী কাফেলার সাথে হজ সম্পন্ন করে, তবে সকল মাযহাব মতেই তার হজের ফরজিয়াত আদায় হয়ে যাবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফিকহে হানাফি ও ফিকহে শাফেয়ির মূলনীতির প্রধান পার্থক্য কী?
ফিকহে হানাফি ও ফিকহে শাফেয়ির মূলনীতির প্রধান পার্থক্য হলো— হানাফি মাযহাবে কুরআনের আম্ম (ব্যাপক) বিধান قطعي (অকাট্য) এবং একক হাদিস দ্বারা তা সহজে পরিবর্তন করা যায় না; পাশাপাশি যুক্তিসিদ্ধ কারণ ও ইসতিহসানের ব্যাপক প্রয়োগ রয়েছে। পক্ষান্তরে শাফেয়ি মাযহাবে কুরআনের আম্ম বিধানকে খাবারে ওয়াহিদ দ্বারা নির্দ্বিধায় খাস (সীমিত) করা হয় এবং কিয়াসের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ব্যতিক্রমী ইসতিহসান গ্রহণ না করে কেবল কঠোর নস ও ইল্লতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
২. তাকলিদ ও অন্ধ অনুকরণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
তাকলিদ কোনো অন্ধ পূজা বা ব্যক্তির খেয়ালখুশির অনুসরণ নয়। একজন সাধারণ মানুষ কুরআন ও হাদিসের জটিল ভাষা, নাসেখ-মানসূখ এবং সহীহ-জয়ীফ নির্ণয়ে অক্ষম হওয়ায় বিশেষজ্ঞ মুজতাহিদ ফকীহগণের গবেষণার মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক বিধান পালন করে— এটিই শরয়ী তাকলিদ। পক্ষান্তরে দলীল প্রকাশিত হওয়ার পরও সত্যকে অস্বীকার করে বাপ-দাদার ভুল রীতিনীতিকে আঁকড়ে ধরে থাকাকে অন্ধ অনুকরণ (تقليد أعمى) বলা হয়, যা শরীয়তে কঠোরভাবে নিন্দিত।
৩. তারাবীহ নামাজের ২০ রাকাতের পক্ষে প্রধান ঐতিহাসিক দলিল কী?
তারাবীহ নামাজের ২০ রাকাতের পক্ষে প্রধান ঐতিহাসিক দলিল হলো আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে সকল সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত আমল ও ইজমা। হযরত সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) সহীহ সনদে বর্ণনা করেন যে, সাহাবীগণ উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে ২০ রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন। হযরত উসমান ও আলী (রা.)-ও এই বিশ রাকাত অব্যাহত রেখেছিলেন, যার ওপর চার মাযহাবের জমহুর ফকীহগণ একমত হয়েছেন।
৪. সফরকালীন দুই নামাজ একত্রে আদায়ের ব্যাপারে হানাফি মাযহাবের জাময়ে সূরী কী?
হানাফি মাযহাব মতে হজের আরাফাহ ও মুযদালিফা ব্যতীত অন্য সাধারণ সফরে দুই ওয়াক্তের নামাজ সময়ের দিক থেকে একত্র করা যায় না। হানাফিগণ যে ‘জাময়ে সূরী’ (বাহ্যিক একত্রীকরণ)-এর কথা বলেন, তা হলো— প্রথম ওয়াক্তের নামাজকে (যেমন যোহর) তার ওয়াক্তের একদম শেষ প্রান্তে আদায় করা এবং তা শেষ হতে হতেই দ্বিতীয় ওয়াক্ত (যেমন আসর) প্রবেশ করা মাত্রই দ্বিতীয় নামাজ আদায় করা। এতে বাহ্যত দুটি নামাজ একসাথে আদায় হয়, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি নামাজ তার নির্ধারিত ওয়াক্তেই সম্পন্ন হয়।
৫. তালফীক্ব কোন ক্ষেত্রে সর্বসম্মতভাবে বাতিল ও অবৈধ?
তালফীক্ব তখনই সর্বসম্মতভাবে বাতিল ও অবৈধ হয়, যখন কোনো ব্যক্তি একটি মাত্র ইবাদতের মধ্যে একাধিক মাযহাবের শর্তকে এমনভাবে সংমিশ্রণ করে, যার ফলে এমন এক নতুন মিশ্রিত রূপ তৈরি হয় যা সংমিশ্রণকৃত মাযহাবগুলোর কারোর মতেই সহীহ নয়। উদাহরণস্বরূপ, ওযুতে শাফেয়ী মতে সামান্য চুল মাসেহ করে আবার হানাফি মতে রক্ত বের হওয়ার পরও ওযু বহাল মনে করে নামাজ পড়লে তা উভয় মাযহাব মতেই বাতিল বলে গণ্য হবে।