পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২৫
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث-١
[দিরাসাতুল হাদীস-১]
বিষয় কোড: ২০২৮০৬
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (الف) وعن إثنين من مجموعة (ب) وعن إثنين من مجموعة (ج) وعن إثنين من مجموعة (د)- الاعداد بالهامش تدل على الدرجات كاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিটি বিভাগ থেকে ২টি করে মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হলেও পরীক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ ও সমৃদ্ধ একাডেমিক প্রস্তুতির লক্ষ্যে নিম্নে প্রশ্নপত্রের চারটি বিভাগের মোট ১৬টি প্রশ্নেরই গভীর তাত্ত্বিক ও রেফারেন্সভিত্তিক নির্ভুল সমাধান উপস্থাপন করা হলো।]
مجموعة (الف) — الموطأ للإمام مالك (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)
(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة) — হাদীসের অনুবাদ করো অতঃপর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।
١- عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِ النَّاسِ مَنْزِلًا؟ رَجُلٌ آخِذٌ بِعِنَانِ فَرَسِهِ يُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللهِ…»
[১. আতা ইবনে ইয়াসার (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: আমি কি তোমাদেরকে মর্যাদার দিক থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তির সংবাদ দেব না? সে হলো ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশ্যে ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রস্তুত থাকে…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِ النَّاسِ مَنْزِلًا؟ رَجُلٌ آخِذٌ بِعِنَانِ فَرَسِهِ يُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللهِ، أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِ النَّاسِ مَنْزِلًا بَعْدَهُ؟ رَجُلٌ مُعْتَزِلٌ فِي غُنَيْمَةٍ يُقِيمُ الصَّلَاةَ وَيُؤْتِي الزَّكَاةَ وَيَعْبُدُ اللهَ وَلَا يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا»-
অনুবাদ:
হযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাহিমাহুল্লাহ/রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমি কি তোমাদেরকে মর্যাদার দিক থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তির সংবাদ দেব না? সে হলো এমন এক ব্যক্তি, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্যে স্বীয় ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রস্তুত থাকে। আমি কি তোমাদেরকে তার পরবর্তী স্তরের সর্বোত্তম ব্যক্তির সংবাদ দেব না? সে হলো এমন এক ব্যক্তি, যে নির্জন পাহাড়ের উপত্যকায় বা প্রান্তরে সামান্য কিছু বকরি নিয়ে লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করে; সে যথাযথভাবে সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করে না।”
হাদীসের শাব্দিক তাহকীক ও ব্যাখ্যা:
- عِنَانِ (ইনান): ঘোড়ার লাগাম। ঘোড়ার লাগাম হাতে রাখার অর্থ হলো সার্বক্ষণিক সতর্কাবস্থায় জিহাদের ডাক আসার প্রতীক্ষায় থাকা।
- مَنْزِلًا (মানযিলান): মর্যাদা, স্থান বা আল্লাহর নিকট সম্মান ও সাওয়াবের স্তর।
- مُعْتَزِلٌ فِي غُنَيْمَةٍ (মু’তাযিলুন ফী গুনাইমাহ): ফিতনা-ফ্যাসাদের যুগে দ্বীন রক্ষার স্বার্থে লোকালয় পরিহার করে স্বল্পসংখ্যক ছাগল-ভেড়া লালন-পালন করে নির্জনবাস গ্রহণকারী।
(الف) ما معنى الجهاد؟ بين فضيلة الجهاد في ضوء القرآن والسنة-
জিহাদের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জিহাদের ফযিলত:
১. জিহাদের আভিধানিক অর্থ (معنى الجهاد لغة):
‘জিহাদ’ (الجهاد) শব্দটি আরবী الجهد (জুহদ বা জাহদ) মূলধাতু থেকে নির্গত, যার অর্থ হলো—পরিশ্রম করা, আপ্রাণ চেষ্টা করা, কষ্ট স্বীকার করা, সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত শক্তি নিয়োগ করা। আল-মুফরাদাত ফী গারিবিল কুরআনে ইমাম রাগিব আসফাহানী (রহ.) বলেন: «الجهاد والمجاهدة: استِفراغ الوُسعِ في مُدافَعةِ العَدُوّ» অর্থাৎ শত্রুকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সাধ্যানুযায়ী সর্বশক্তি নিয়োগ করাকে জিহাদ বলা হয়।
২. জিহাদের পারিভাষিক অর্থ (معنى الجهاد شرعًا):
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় জিহাদ হলো আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার উদ্দেশ্যে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও জুলুম-ফিতনা দূরীকরণে কাফির, জালিম বা ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জান, মাল ও জবান দিয়ে সাধ্যমতো প্রচেষ্টা চালানো। ফুকাহায়ে কিরামের পরিভাষায়:
«بَذْلُ الْوُسْعِ وَالطَّاقَةِ فِي الْقِتَالِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ تَعَالَى نَفْسًا وَمَالًا وَلِسَانًا وَإِعْلَاءً لِكَلِمَةِ اللَّهِ تَعَالَى»
অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে জান, মাল ও বাক্য দ্বারা শক্তি প্রয়োগ করা। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) যাদুল মা’আদ গ্রন্থে জিহাদকে চার স্তরে বিভক্ত করেছেন: নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ, শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ, কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং মুনাফিক-ফাসিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ।
৩. পবিত্র কুরআনের আলোকে জিহাদের ফযিলত:
- জান্নাতের বাণিজ্য: আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে: «إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ» (সূরা আত-তাওবাহ: ১১১)।
- সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা: ঘরে বসে থাকা ব্যক্তির চেয়ে জান-মাল দিয়ে জিহাদকারীদের আল্লাহ সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন: «فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً» (সূরা আন-নিসা: ৯৫)।
- জীবন্ত অমরত্ব: আল্লাহর রাস্তায় শহীদগণ মৃত নন, বরং তারা আল্লাহর নিকট জীবিত ও রিযিকপ্রাপ্ত: «وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ» (সূরা আলে ইমরান: ১৬৯)।
৪. হাদীস শরীফের আলোকে জিহাদের ফযিলত:
- দ্বীনের সর্বোচ্চ চূড়া: মু’আয ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণিত হাদীসে নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «رَأْسُ الْأَمْرِ الْإِسْلَامُ، وَعَمُودُهُ الصَّلَاةُ، وَذِرْوَةُ سَنَامِهِ الْجِهَادُ» অর্থাৎ দ্বীনের মূল হলো ইসলাম, তার স্তম্ভ হলো সালাত এবং তার সর্বোচ্চ চূড়া হলো জিহাদ (জামে তিরমিযী: ২৬১৬)।
- অবিরাম রোযা ও সালাতের সমতুল্য: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সর্বোত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, কোন আমল এর সমকক্ষ হতে পারে? তিনি বললেন: তোমরা তার সামর্থ্য রাখবে না। মুজাহিদ ফিরে না আসা পর্যন্ত বিরতিহীন রোযা রাখা এবং ক্লান্তিহীন তাহাজ্জুদ পড়ার সমতুল্য হলো জিহাদ (সহীহ বুখারী: ২৭৮৫)।
- জাহান্নামের আগুন হারাম: যে পদযুগলে আল্লাহর রাস্তায় ধুলোবালি লাগে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেন (সহীহ বুখারী: ৯০৭)।
٢- عَنْ نَافِعٍ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْخَيْلُ مَعْقُودٌ فِي نَوَاصِيهَا الْخَيْرُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ: الأَجْرُ وَالْغَنِيمَةُ»-
[২. নাফে’ (রহ.) সূত্রে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: ঘোড়ার কপালে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ—সাওয়াব ও গনীমত—বেঁধে রাখা হয়েছে…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
حَدَّثَنِي يَحْيَى عَنْ مَالِكٍ عَنْ نَافِعٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ سَرِيَّةً فِيهَا عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ (رض) قِبَلَ نَجْدٍ، فَغَنِمُوا إِبِلًا كَثِيرَةً فَكَانَ سُهْمَانُهُمُ اثْنَيْ عَشَرَ أَوْ أَحَدَ عَشَرَ بَعِيرًا وَنَفَّلُوا بَعِيرًا بَعِيرًا-
অনুবাদ:
ইয়াহইয়া ইমাম মালিক থেকে, তিনি নাফে থেকে এবং তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদ অঞ্চলের দিকে একটি সামরিক সেনাদল (সারিয়্যাহ) প্রেরণ করেন, যাতে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-ও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক উট গনীমত হিসেবে লাভ করেন। ফলে যোদ্ধাদের প্রত্যেকের ভাগে এগারোটি বা বারোটি করে উট পড়েছিল এবং সেনাপতি তাদেরকে অতিরিক্ত পুরস্কার (নাফল) হিসেবে আরও একটি করে উট প্রদান করেছিলেন।
হাদীসের ব্যাখ্যা ও তাহকীক:
সারিয়্যাহ (سَرِيَّة) হলো এমন সেনাদল যাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না, বরং কোনো সাহাবীকে আমির নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন। এই অভিযানে সাহাবীগণ মূল গনীমতের নির্ধারিত হিস্যার পাশাপাশি বীরত্ব ও বিশেষ অবদানের জন্য অতিরিক্ত পুরস্কার (تنفيل – তানফীল) হিসেবে একটি করে উট পেয়েছিলেন।
(الف) ما معنى النفل لغة وشرعًا؟ وما حكمه؟ بين-
নফল-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ এবং এর হুকুম:
১. নফল-এর আভিধানিক অর্থ (معنى النفل لغة):
‘নাফল’ (النَّفَل) এর বহুবচন হলো ‘আনফাল’ (الأنفال)। এর আভিধানিক অর্থ হলো الزيادة (অতিরিক্ত, বর্ধিত অংশ, দান বা অনুগ্রহ)। যেমন ফরয ইবাদতের অতিরিক্ত ইবাদতকে নফল বলা হয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: «وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً» অর্থাৎ আমি ইবরাহিমকে দান করেছিলাম ইসহাক এবং অতিরিক্ত হিসেবে ইয়াকূব (সূরা আল-আম্বিয়া: ৭২)।
২. নফল-এর পারিভাষিক অর্থ (معنى النفل شرعًا):
জিহাদ ও গনীমতের অধ্যায়ে ‘নফল’ বা ‘তানফীল’ (التنفيل) বলতে বোঝায়—যুদ্ধে মুজাহিদদের জন্য সাধারণ গনীমতের অংশের অতিরিক্ত হিসেবে ইমাম বা সেনাপতি কর্তৃক প্রদত্ত বিশেষ উপহার বা উদ্দীপনামূলক অংশ। আল-মাওসূ’আহ আল-ফিকহিয়্যাহ কুয়েতিয়্যাহ অনুসারে:
«النَّفَلُ فِي اصْطِلَاحِ الْفُقَهَاءِ: مَا يُعْطِيهِ الإِمَامُ أَوِ الْقَائِدُ لِبَعْضِ الْغُزَاةِ زِيَادَةً عَلَى سَهْمِهِمْ مِنَ الْغَنِيمَةِ لِتَرْغِيبٍ أَوْ نِكَايَةٍ فِي الْعَدُوِّ»
অর্থাৎ যুদ্ধের ময়দানে কোনো সৈনিক বা ক্ষুদ্র দলের বিশেষ সাহসিকতা, গুপ্তচরবৃত্তি বা শত্রুকে পরাস্ত করার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সাধারণ বণ্টনের অতিরিক্ত যা কিছু প্রদান করা হয়, তা-ই নফল।
৩. নফল বা তানফীলের শরয়ী হুকুম (حكم النفل):
যুদ্ধলব্ধ সম্পদে নফল বা বিশেষ অনুদান প্রদান করা শরীয়তসম্মত ও জায়েয। তবে এর উৎস ও বণ্টন পদ্ধতি নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে:
- ইমাম মালিক (রহ.)-এর অভিমত: ইমাম মালিকের মতে, ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের মূল গনীমত এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) বের করার পূর্বে তানফীল দেওয়া মাকরূহ বা অনুচিত। বরং তানফীল দিতে হবে বায়তুলমালের অন্তর্ভুক্ত এক-পঞ্চমাংশের অংশ (خمس الخمس) থেকে, যাতে সাধারণ সৈনিকদের হকে কোনো ঘাটতি না ঘটে।
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর অভিমত: ইমাম আবু হানীফার মতেও মূল গনীমত বণ্টনের আগে অতিরিক্ত নফল দেওয়া সমীচীন নয়। তবে কোনো যোদ্ধা যদি দারুল হারবে প্রবেশের পূর্বে শর্তসাপেক্ষে নির্দেশ পায় (যেমন: যে ব্যক্তি কোনো শত্রুকে হত্যা করবে তার ব্যবহৃত আসবাবপত্র বা ‘সালাব’ তারই হবে), তবে তা কার্যকর করা জায়েয।
- ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর অভিমত: তাদের মতে, ইমাম বা সেনাপতি যুদ্ধের স্বার্থে ও যোদ্ধাদের উৎসাহ দিতে খুমুস বের করার পূর্বে কিংবা পরে মূল গনীমত থেকেও নফল ঘোষণা করতে পারেন, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সা.) নাজদ অভিমুখে প্রেরিত সারিয়্যাহর যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে অনুমোদন করেছিলেন।
٣- عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ أَنَّ أَبَا بَكْرٍ الصِّدِّيقَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ بَعَثَ جُيُوشًا إِلَى الشَّامِ، فَخَرَجَ يَمْشِي مَعَ يَزِيدَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ…
[৩. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত, আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সিরিয়ার দিকে সৈন্যবাহিনী পাঠালেন এবং ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ানের সাথে হেঁটে চললেন…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حَبَّانَ أَنَّ زَيْدَ بْنَ خَالِدٍ الْجُهَنِيَّ قَالَ: تُوُفِّيَ رَجُلٌ يَوْمَ حُنَيْنٍ وَإِنَّهُمْ ذَكَرُوهُ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَزَعَمَ زَيْدٌ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ»، فَتَغَيَّرَتْ وُجُوهُ النَّاسِ لِذَلِكَ، فَزَعَمَ زَيْدٌ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ صَاحِبَكُمْ قَدْ غَلَّ فِي سَبِيلِ اللهِ»، قَالَ: فَفَتَحْنَا مَتَاعَهُ فَوَجَدْنَا خَرَزَاتٍ مِنْ خَرَزِ يَهُودَ مَا تُسَاوِينَ دِرْهَمَيْنِ-
অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান থেকে বর্ণিত, যায়েদ ইবনে খালিদ আল-জুহানী (রা.) বলেন: হুনাইনের যুদ্ধের দিন এক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তার মৃত্যুর কথা উল্লেখ করলেন। যায়েদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন: “তোমাদের এই সঙ্গীর জানাযার সালাত তোমরাই আদায় করে নাও।” নবীজীর একথায় উপস্থিত সাহাবীদের মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে গেল (কারণ নবীজী নিজে জানাযায় ইমামতি করলেন না)। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “তোমাদের এই সঙ্গী আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধলব্ধ গনীমতের মালে খিয়ানত (গুলূল) করেছে।” বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমরা তার জিনিসপত্র খুলে তল্লাশি করলাম এবং সেখানে ইয়াহূদীদের ব্যবহৃত পুতির দানাসদৃশ কিছু পুতি পেলাম, যার মূল্য দুই দিরহামের সমানও ছিল না।
হাদীসের শিক্ষা:
গনীমতের সম্পদ বণ্টনের পূর্বে গোপন করা কবিরা গুনাহ। অতি সামান্য মূল্যের বস্তু হলেও তা খিয়ানত হিসেবে গণ্য হয় এবং এর ফলে খোদ রাসূলুল্লাহ (সা.) সেই ব্যক্তির জানাযার ইমামতি থেকে বিরত থেকে উম্মতকে কঠোর সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন।
(الف) ما معنى الغلول؟ وما حكم المتصدق من الغلول؟ بين-
গুলূল-এর অর্থ এবং গুলূলের সম্পদ থেকে সদকাকারীর বিধান:
১. গুলূল-এর আভিধানিক অর্থ (معنى الغلول لغة):
‘গুলূল’ (الْغُلُولُ) শব্দটি আরবী غلّ يغلّ (গাল্লা-য়াগুল্লু) থেকে এসেছে, যার অর্থ الخيانة في المغنم (গনীমতের সম্পদে আত্মসাৎ বা খিয়ানত করা), কোনো জিনিস গোপনে নিজের দখলে লুকিয়ে ফেলা। গোপন প্রতারণাকেও গুলূল বলা হয়।
২. গুলূল-এর পারিভাষিক অর্থ (معنى الغلول شرعًا):
শরীয়তের পরিভাষায় গনীমতের মাল রাষ্ট্রপ্রধান বা সেনাপতি কর্তৃক বিধিমোতাবেক বণ্টনের পূর্বে গোপনে তা থেকে কোনো কিছু আত্মসাৎ করা বা ছিনিয়ে নেওয়াকে গুলূল বলে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে: «وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَن يَغُلَّ ۚ وَمَن يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» অর্থাৎ কোনো নবীর জন্য শোভনীয় নয় যে তিনি খিয়ানত করবেন। আর যে ব্যক্তি খিয়ানত করবে, সে কিয়ামতের দিন খিয়ানতকৃত বস্তু সাথে নিয়ে উপস্থিত হবে (সূরা আলে ইমরান: ১৬১)।
৩. গুলূলের মাল থেকে সদকাকারীর বিধান (حكم المتصدق من الغلول):
গুলূল হলো বিশুদ্ধভাবে আত্মসাৎকৃত হারাম সম্পদ ও বান্দার হকের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে ইসলামী শরীয়তের সর্বসম্মত ফয়সালা হলো:
- সদকা কবুল না হওয়া: গুলূলের হারাম মাল থেকে সদকা করলে তা কিছুতেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না এবং তাতে কোনো সাওয়াব অর্জিত হয় না। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «لَا تُقْبَلُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُورٍ وَلَا صَدَقَةٌ مِنْ غُلُولٍ» অর্থাৎ পবিত্রতা ব্যতীত সালাত কবুল হয় না এবং খিয়ানত বা গুলূলের মাল থেকে সদকা কবুল হয় না (সহীহ মুসলিম: ২২৪)।
- আসল মালের হুকুম: খিয়ানতকারীর দায়িত্ব হলো তৎক্ষণাৎ তাওবা করা এবং আত্মসাৎকৃত মাল গনীমতের বায়তুলমাল বা হকদারদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়া। যদি সেনাবাহিনী এখনো সমবেত থাকে, তবে তাদের মাঝে বণ্টন করতে হবে।
- সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর করণীয়: যদি সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং প্রত্যেক হকদারকে খুঁজে বের করা অসম্ভব হয়, তবে ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ ও জুমহুর ফুকাহায়ে কিরামের মতে, খিয়ানতকারী ব্যক্তি সেই সম্পদ বা তার সমমূল্য বায়তুলমালে জমা দেবে কিংবা মুসলিম উম্মাহ ও দরিদ্রদের কল্যাণে সাওয়াবের নিয়ত ছাড়া দায়মুক্তির উদ্দেশ্যে সদকা করে দেবে। তবে এতে খিয়ানতকারী কোনো সদকার সাওয়াব পাবে না, বরং সে খিয়ানতের কঠিন পাপ থেকে নিষ্কৃতির একটি পথ খুঁজবে।
٤- عَنْ مَالِكٍ أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ كَتَبَ إِلَى عُمَّالِهِ: «أَنْ لَا تَحْمِلُوا فِي السَّبِيلِ إِلَّا مَنْ كَانَ قَوِيًّا عَلَى الْغَزْوِ…»
[৪. ইমাম মালিকের নিকট পৌঁছেছে যে, উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) তাঁর কর্মচারীদের নিকট লিখে পাঠালেন: আল্লাহর রাস্তায় কেবল তাকেই পাঠাবে যে যুদ্ধের সামর্থ্য রাখে…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ أَبِي الزِّنَادِ عَنِ الْأَعْرَجِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَضْحَكُ اللهُ إِلَى رَجُلَيْنِ يَقْتُلُ أَحَدُهُمَا الْآخَرَ كِلَاهُمَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ، يُقَاتِلُ هَذَا فِي سَبِيلِ اللهِ فَيُقْتَلُ، ثُمَّ يَتُوبُ اللهُ عَلَى الْقَاتِلِ فَيُقَاتِلُ فَيُسْتَشْهَدُ»-
অনুবাদ:
আবুয যিনাদ থেকে, তিনি আল-আ’রাজ থেকে এবং তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আল্লাহ তা’আলা এমন দু’জন ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে হাসেন, যাদের একজন অপরজনকে হত্যা করে অথচ তারা উভয়ই জান্নাতে প্রবেশ করবে! একজন আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে কাফিরের হাতে নিহত হয় (এবং শাহাদাত লাভ করে জান্নাতে যায়)। পরবর্তীতে আল্লাহ তা’আলা সেই হত্যাকারীকে তাওবা করার তাওফীক দান করেন এবং সে ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর সেও আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে শহীদ হয় (এবং জান্নাতে প্রবেশ করে)।”
হাদীসের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য:
আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততা এবং তওবার অপরিসীম শক্তি এই হাদীসে ফুটে উঠেছে। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কাফির অবস্থায় কৃত সব অপরাধ ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে মোচন হয়ে যায় («الإِسْلاَمُ يَجُبُّ مَا قَبْلَهُ»)। ফলে শহীদ ও তার পূর্বের কাফির হত্যাকারী উভয়ই জান্নাতী হয়। আল্লাহর ‘হাসা’ দ্বারা তাঁর বিশেষ সন্তুষ্টি ও অপার করুণা বোঝানো হয়েছে।
(ألف) ما معنى الشهيد؟ وما حكمه؟ بين-
শহীদের অর্থ এবং শরীয়তে শহীদের হুকুম:
১. শহীদের আভিধানিক অর্থ (معنى الشهيد لغة):
‘শহীদ’ (الشَّهِيدُ) আরবী শব্দ, যা فعيل এর ওযনে সিফাতে মুশাব্বাহা বা ইসমে ফায়েল/মাফ’উল। এর মূল ধাতু হলো الشهود (উপস্থিত থাকা) বা الشهادة (সাক্ষ্য প্রদান করা)। আভিধানিক অর্থ হলো الحاضر (উপস্থিত), الشاهد (সাক্ষী)।
২. শহীদের পারিভাষিক অর্থ (معنى الشهيد شرعًا):
ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও দ্বীন সমুন্নত করার লক্ষ্যে কাফির, বিদ্রোহী বা ডাকাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে যে মুসলিম অন্যায়ভাবে নিহত হয়, তাকে ‘শহীদ’ বলা হয়। তাকে শহীদ বলার কারণ হিসেবে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী ও অন্যান্য আলেমগণ উল্লেখ করেছেন:
১. মৃত্যুর সময় রহমতের ফেরেশতাগণ তার রূহ কবজ করার জন্য উপস্থিত হন।
২. কিয়ামতের ময়দানে সে পূর্ববর্তী উম্মতের ব্যাপারে নবীদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।
৩. তার জান্নাতী মর্যাদা ও ঈমানের সত্যতার ওপর আল্লাহর সাক্ষ্য বিদ্যমান।
৩. শহীদের প্রকারভেদ (أقسام الشهيد):
ফুকাহায়ে কিরাম শহীদকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন:
- দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের শহীদ (শহীদে হাকীকী): যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে কাফিরদের হাতে নিহত হয়। সে দুনিয়াতে শহীদের হুকুম পাবে এবং আখিরাতেও পূর্ণ সাওয়াব পাবে।
- শুধুমাত্র আখিরাতের শহীদ (শহীদে হুকমী): যারা যুদ্ধের ময়দান ছাড়া অন্যান্য বিশেষ পরিস্থিতিতে নিহত বা মৃত্যুবরণ করে; যেমন মহামারীতে মৃত, পেটের পীড়ায় মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত, প্রসববেদনায় মৃত নারী ইত্যাদি। এরা আখিরাতে শহীদের সাওয়াব পাবে, কিন্তু দুনিয়াতে সাধারণ মৃতের মতো তাদের গোসল ও কাফন দেওয়া হবে।
- শুধুমাত্র দুনিয়ার শহীদ: যে ব্যক্তি রিয়া (লোকদেখানো), গনীমতের লোভ বা গোত্রপ্রীতির উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে নিহত হয়। দুনিয়াতে তার বাহ্যিক আচরণ দেখে শহীদের মতো দাফন করা হলেও আখিরাতে সে কোনো সাওয়াব পাবে না, বরং শাস্তির মুখোমুখি হবে।
৪. শহীদে হাকীকীর শরয়ী হুকুম (أحكام الشهيد في الشريعة):
যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাতবরণকারী শহীদে হাকীকীর ক্ষেত্রে শরীয়তের বিশেষ বিধানাবলী নিম্নরূপ:
- গোসল না দেওয়া: জুমহুর ফুকাহায়ে কিরাম (ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমাদ ও আবু হানীফা)-এর মতে শহীদকে গোসল দেওয়া যাবে না। ওহুদের যুদ্ধে শহীদদের রক্তমাখা অবস্থায় দাফন করতে নির্দেশ দিয়ে নবীজী (সা.) বলেছিলেন: «زَمِّلُوهُمْ بِدِمَائِهِمْ» অর্থাৎ তাদের রক্তের সাথে তাদের বস্ত্রাবৃত করো (সহীহ বুখারী: ১৩৪৩)। কারণ কিয়ামতের দিন তাদের জখম থেকে কস্তুরীর সুবাস নির্গত হবে।
- রক্তাক্ত পোশাকে কাফন দেওয়া: শহীদ যে পোশাকে শাহাদাত বরণ করেছে, সেই পোশাকেই তাকে দাফন করা সুন্নত। প্রয়োজনে তার ওপর অতিরিক্ত কাপড় জড়িয়ে কাফন পূর্ণ করা যাবে, তবে তার শরীর থেকে রক্ত ধৌত করা যাবে না।
- জানাযার সালাত: এ বিষয়ে ফকীহগণের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
– ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ (রহ.): তাদের মতে শহীদের জানাযার সালাত আদায় করতে হবে না, কারণ ওহুদের শহীদদের ওপর নবীজী তৎক্ষণাৎ জানাযা পড়েননি এবং তারা সরাসরি জীবিত ও জান্নাতী।
– ইমাম আবু হানীফা (রহ.): হানাফী মাযহাব মতে শহীদের মাগফিরাত ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য তাঁর জানাযার সালাত আদায় করা ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, নবীজী পরবর্তীতে ওহুদের শহীদদের কবরস্থানে গিয়ে জানাযার ন্যায় সালাত আদায় করেছিলেন। ইমাম মালিকের মতে জানাযা না পড়াই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
مجموعة (ب) — الموطأ للإمام محمد بن الحسن (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ)
(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة) — হাদীসের অনুবাদ করো অতঃপর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।
٥- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا ثُوِّبَ بِالصَّلَاةِ فَلَا تَأْتُوهَا وَأَنْتُمْ تَسْعَوْنَ، وَأْتُوهَا وَعَلَيْكُمُ السَّكِينَةُ…»
[৫. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: যখন সালাতের ইকামত দেওয়া হয়, তখন দৌড়ে যেয়ো না; বরং স্থিরতার সাথে হেঁটে আসো…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا ثُوِّبَ بِالصَّلَاةِ فَلَا تَأْتُوهَا وَأَنْتُمْ تَسْعَوْنَ، وَأْتُوهَا وَعَلَيْكُمُ السَّكِينَةُ، فَمَا أَدْرَكْتُمْ فَصَلُّوا، وَمَا فَاتَكُمْ فَأَتِمُّوا، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ فِي صَلَاةٍ مَا كَانَ يَعْمِدُ إِلَى الصَّلَاةِ»-
অনুবাদ:
হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যখন সালাতের জন্য ইকামত দেওয়া হয়, তখন তোমরা দৌড়ে যেয়ো না; বরং ধীর-স্থিরতা ও গাম্ভীর্য বজায় রেখে হেঁটে আসো। অতঃপর জামা’আতের সাথে সালাতের যতটুকু অংশ পাও তা আদায় করো, আর যতটুকু অংশ তোমাদের ছুটে যায় তা (ইমামের সালামের পর দাঁড়িয়ে) পূর্ণ করে নাও। কেননা তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সালাতের উদ্দেশ্যে পথ চলে, সে মূলত সালাতরত অবস্থায়ই থাকে।”
হাদীসের শব্দার্থ ও তাহকীক:
- ثُوِّبَ بِالصَّلَاةِ (ছুইবা বিস-সালাহ): সালাতের ইকামত প্রদান করা। মূল ধাতু ‘ছাওয়াব’ (ثواب) অর্থ প্রত্যাবর্তন করা; আযানের মাধ্যমে একবার ডাকার পর ইকামতের মাধ্যমে পুনরায় সালাতের জন্য আহ্বান করা হয় বলে একে ‘তাছওয়ীব’ বলা হয়।
- تَسْعَوْنَ (তাস’আউনা): দৌড়াদৌড়ি করা বা তাড়াহুড়ো করে হাঁটা। নামাযের জামা’আত ধরার জন্য দৌড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- السَّكِينَةُ وَالْوَقَارُ (আস-সাকীনাহ ওয়াল-ওয়াকার): সাকীনাহ অর্থ বাহ্যিক শারীরিক স্থিরতা ও ধীরতা; আর ওয়াকার অর্থ অন্তরের গাম্ভীর্য, চক্ষু অবনত রাখা ও অপ্রয়োজনীয় কথা বা কাজ পরিহার করা।
(الف) بين فضيلة المشى إلى المسجد لأداء الصلوة-
সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে হেঁটে যাওয়ার ফযিলত:
ইসলামে জামা’আতে সালাত আদায় করার জন্য মসজিদে হেঁটে যাওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও অফুরন্ত সাওয়াবের মাধ্যম। কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এর প্রধান ফযিলতসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. প্রতিটি পদক্ষেপে পাপমোচন ও মর্যাদা বৃদ্ধি:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি স্বীয় ঘরে উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে (অযু করে), অতঃপর আল্লাহর ফরযসমূহের মধ্য থেকে কোনো ফরয আদায়ের জন্য আল্লাহর কোনো ঘরের (মসজিদের) দিকে হেঁটে যায়, তার প্রতিটি পদক্ষেপে একটি করে পাপ মোচন করা হয় এবং অপর পদক্ষেপে তার একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়” (সহীহ মুসলিম: ৬৬৬)।
২. কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে পূর্ণাঙ্গ নূরের সুসংবাদ:
রাতের অন্ধকারে (ফজর ও ইশার সালাতে) মসজিদে গমনকারীদের জন্য কিয়ামতের দিনে আলোর মহাসুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «بَشِّرِ الْمَشَّائِينَ فِي الظُّلَمِ إِلَى الْمَسَاجِدِ بِالنُّورِ التَّامِّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» অর্থাৎ অন্ধকারে পায়ে হেঁটে মসজিদের দিকে গমনকারীদের কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও (সুনানে আবু দাউদ: ৫৬১, জামে তিরমিযী: ২২৩)।
৩. জান্নাতে আল্লাহর মেহমানদারি লাভ:
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় (যেকোনো ওয়াক্তে) মসজিদে যাতায়াত করে, আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিটি গমনাগমনের বিনিময়ে জান্নাতে তার জন্য মেহমানদারির সামগ্রী প্রস্তুত রাখেন” (সহীহ বুখারী: ৬৬২, সহীহ মুসলিম: ৬৯৯)।
৪. গৃহ থেকে বের হওয়া মাত্রই সালাতের সাওয়াব শুরু:
আলোচ্য হাদীসে সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে: «فَإِنَّ أَحَدَكُمْ فِي صَلَاةٍ مَا كَانَ يَعْمِدُ إِلَى الصَّلَاةِ» অর্থাৎ নামাযের নিয়তে মসজিদে যাত্রাকারী ব্যক্তি পথিমধ্যে থাকা অবস্থাতেই সার্বক্ষণিকভাবে নামাযের সাওয়াব পেতে থাকে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সে একজন ইহরামধারী হাজীর ন্যায় সাওয়াব লাভ করে (সুনানে আবু দাউদ: ৫৫৮)।
৫. দূরবর্তী পথ অতিক্রমকারীর সর্বাধিক সাওয়াব:
যে ব্যক্তির বাড়ি মসজিদ থেকে যত দূরে, হেঁটে যাওয়ার কারণে তার সাওয়াবও তত বেশি। আবু মূসা আশ’আরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «إِنَّ أَعْظَمَ النَّاسِ أَجْرًا فِي الصَّلَاةِ أَبْعَدُهُمْ إِلَيْهَا مَمْشًى» অর্থাৎ সালাতে সর্বাধিক সাওয়াবের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যার বাড়ি মসজিদ থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে এবং যে সবচেয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসে (সহীহ বুখারী: ৬৫১, সহীহ মুসলিম: ৬৬২)।
٦- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ انْصَرَفَ مِنْ صَلَاةٍ جَهَرَ فِيهَا بِالْقِرَاءَةِ، فَقَالَ: «هَلْ قَرَأَ مَعِي مِنْكُمْ أَحَدٌ؟»…
[৬. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) উচ্চৈঃস্বরে কিরাতের নামায শেষে বললেন: তোমাদের কেউ কি আমার সাথে কিরাত পড়েছ?…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ انْصَرَفَ مِنْ صَلَاةٍ جَهَرَ فِيهَا بِالْقِرَاءَةِ، فَقَالَ: «هَلْ قَرَأَ مَعِي مِنْكُمْ أَحَدٌ؟» فَقَالَ رَجُلٌ: أَنَا يَا رَسُولَ اللهِ! قَالَ: فَقَالَ: «إِنِّي أَقُولُ مَالِي أُنَازَعُ الْقُرْآنَ؟» فَانْتَهَى النَّاسُ عَنِ الْقِرَاءَةِ مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيمَا جَهَرَ فِيهِ مِنَ الصَّلَوَاتِ حِينَ سَمِعُوا ذَلِكَ-
অনুবাদ:
হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক সালাত (যেমন ফজর, মাগরিব বা ইশা) শেষ করলেন যাতে তিনি উচ্চৈঃস্বরে কিরাত পাঠ করেছিলেন। সালাম ফিরিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন: “তোমাদের মধ্য থেকে কেউ কি এইমাত্র আমার সাথে কিরাত পড়েছ?” এক ব্যক্তি নিবেদন করল: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমি পড়েছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “আমি মনে মনে ভাবছিলাম, কিরাত পাঠে আমার সাথে কেন টানাহেঁচড়া (বিঘ্ন সৃষ্টি) করা হচ্ছে?” বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই উক্তি শোনার পর থেকে সাহাবীগণ সশব্দে কিরাত পাঠের সালাতসমূহে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে কিরাত পাঠ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত রইলেন।
হাদীসের তাৎপর্য:
ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে এই হাদীসটি বর্ণনা করে প্রমাণ করেছেন যে, ইমাম যখন কিরাত পড়েন তখন মুক্তাদীর কোনো কিরাত পড়া চলবে না; বরং ইমামের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা ওয়াজিব।
(الف) ما الإختلاف بين الأئمة في حكم القرأة خلف الإمام؟ بين موجزا-
ইমামের পেছনে কিরাত পাঠের হুকুম সম্পর্কে ইমামগণের মতপার্থক্য:
ইমামের পেছনে মুক্তাদীর কিরাত (বিশেষ করে সূরা ফাতিহা) পাঠের হুকুম নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে দীর্ঘ গবেষণা ও মতপার্থক্য বিদ্যমান। এ ব্যাপারে প্রধান তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:
১. হানাফী মাযহাব (ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ):
হানাফী মাযহাব মতে, মুক্তাদীর জন্য কোনো অবস্থাতেই—জাহরী (সশব্দ) কিংবা সিররী (নিঃশব্দ)—ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো কিরাত পাঠ করা জায়েয নেই; বরং তা মাকরূহে তাহরীমী। মুক্তাদী সর্বাবস্থায় নীরব থাকবে। তাঁদের শক্তিশালী দলীলসমূহ:
- কুরআনের দ্ব্যর্থহীন নির্দেশ: আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: «وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ» অর্থাৎ “যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমাদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়” (সূরা আল-আ’রাফ: ২০৪)। মুফাসসিরগণের ঐকমত্যে এই আয়াত সালাতের কিরাতের ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছে।
- সুপ্রসিদ্ধ হাদীসে নববী: জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الْإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তির কোনো ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাত পাঠই তার কিরাত হিসেবে গণ্য হবে” (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ: ৯৬, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৮৫০, মুসনাদে আহমাদ)।
- আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস: সহীহ মুসলিমে নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا» অর্থাৎ “ইমাম যখন কিরাত পড়ে, তখন তোমরা নীরবতা অবলম্বন করো” (সহীহ মুসলিম: ৪০৪)।
২. শাফেয়ী মাযহাব (ইমাম শাফেয়ী):
ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে, মুক্তাদীর জন্য জাহরী ও সিররী উভয় প্রকার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ফরয (রুকন)। সূরা ফাতিহা ব্যতীত কারও সালাত শুদ্ধ হবে না। তাঁদের প্রধান দলীল:
- উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) বর্ণিত বিশ্ববিখ্যাত হাদীস: «لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, তার সালাতই হলো না” (সহীহ বুখারী: ৭৫৬, সহীহ মুসলিম: ৩৯৪)।
৩. মালিকী ও হাম্বলী মাযহাব (ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল):
ইমাম মালিক এবং ইমাম আহমাদ (রহ.) এ ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তাঁদের মতে:
- জাহরী সালাতে (সশব্দ কিরাত): মুক্তাদী কোনো কিরাত পাঠ করবে না; বরং ইমামের কিরাত মনোযোগ দিয়ে শুনবে ও চুপ থাকবে।
- সিররী সালাতে (নিঃশব্দ কিরাত): মুক্তাদী মনে মনে সূরা ফাতিহা ও কিরাত পাঠ করবে; কারণ এ সময় ইমামের তিলাওয়াত শোনার সুযোগ থাকে না।
٧- عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ: «كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ ثَلَاثَ عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُوتِرُ مِنْ ذَلِكَ بِخَمْسٍ…»
[৭. আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রাতে তেরো রাকাত সালাত আদায় করতেন, এর মধ্যে পাঁচ রাকাত বিতর পড়তেন…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ وَأَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا أَمَّنَ الْإِمَامُ فَأَمِّنُوا، فَإِنَّهُ مَنْ وَافَقَ تَأْمِينُهُ تَأْمِينَ الْمَلَائِكَةِ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»، قَالَ: وَقَالَ ابْنُ شِهَابٍ: كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «آمِينَ»-
অনুবাদ:
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব এবং আবু সালামাহ ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তাঁরা হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “ইমাম যখন আমীন বলেন (বা আমীন বলার স্থানে পৌঁছেন), তখন তোমরাও আমীন বলো। কেননা যার আমীন বলা আসমানের ফেরেশতাগণের আমীন বলার সাথে মিলে যায়, তার পূর্ববর্তী সমস্ত (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” বর্ণনাকারী ইবনে শিহাব যুহরী বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও (সূরা ফাতিহা শেষে) ‘আমীন’ বলতেন।
হাদীসের শিক্ষা ও শব্দার্থ:
‘আমীন’ (آمِينَ) শব্দের অর্থ: «اللَّهُمَّ اسْتَجِبْ» অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমাদের দু’আ কবুল করুন।” সূরা ফাতিহা একটি পূর্ণাঙ্গ দু’আ হওয়ায় এর শেষে আমীন বলা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। ফেরেশতাদের আমীনের সাথে একাত্ম হওয়া গুনাহ মাফের কারণ।
(الف) هل يجهر التأمين أم يخفى في الصلوة؟ بين مع إختلاف الأئمة فيه-
নামাযে আমীন কি সশব্দে (উচ্চৈঃস্বরে) বলা হবে নাকি নিঃশব্দে? ইমামগণের মতপার্থক্যসহ আলোচনা:
সালাতে আমীন সশব্দে (جهر – জাহর) বলা হবে নাকি অনুচ্চ স্বরে নিঃশব্দে (إخفاء – ইখফা) বলা হবে—এ নিয়ে মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে দুটি সুস্পষ্ট মাযহাব বা অভিমত রয়েছে:
১. হানাফী ও মালিকী মাযহাব (আমীন নিঃশব্দে বলা সুন্নত):
ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ এবং অধিকাংশ মালিকী ফকীহগণের মতে, ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের জন্যই জাহরী ও সিররী সর্বপ্রকার সালাতে আমীন অনুচ্চ স্বরে নিঃশব্দে (বিল-ইখফা) বলা সুন্নাত। তাঁদের দলীলসমূহ:
- আমীন একটি দু’আ: আমীন সর্বসম্মতভাবে একটি দু’আ। আর পবিত্র কুরআনে দু’আ নিঃশব্দে ও গোপনে করার সাধারণ নির্দেশ রয়েছে: «ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ» অর্থাৎ “তোমরা বিনীতভাবে এবং গোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো; নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না” (সূরা আল-আ’রাফ: ৫৫)।
- ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.)-এর হাদীস: সুফিয়ান সাওরী ও শু’বা সূত্রে বর্ণিত হাদীসে এসেছে: «أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَرَأَ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ فَقَالَ: آمِينَ وَخَفَضَ بِهَا صَوْتَهُ» অর্থাৎ নবীজী (সা.) যখন ‘ওয়ালাদ্দাল্লীন’ পাঠ শেষ করতেন, তখন আমীন বলতেন এবং স্বীয় কণ্ঠস্বর নীচু করতেন (মুসনাদে আহমাদ: ১৮৮৪৭, সুনানে তিরমিযী: ২৪৮)।
- সাহাবীগণের অবিচ্ছিন্ন আমল: হযরত উমর ফারুক (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং কুফার ফকীহ সাহাবীগণ সালাতে আমীন নিঃশব্দে বলতেন। ইব্রাহীম নাখয়ী (রহ.) বলেন: চারটি বিষয় ইমাম নিঃশব্দে পড়বেন: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা (ছানা), তা’আউউয, তাসমিয়াহ (বিসমিল্লাহ) এবং আমীন।
২. শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব (জাহরী সালাতে সশব্দে আমীন বলা সুন্নত):
ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, জাহরী সালাতে ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের জন্যই সশব্দে (জোরে) আমীন বলা সুন্নত। তাঁদের দলীলসমূহ:
- ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বর্ণিত অপর একটি রিওয়ায়াতে এসেছে: «فَقَالَ آمِينَ وَمَدَّ بِهَا صَوْتَهُ» অর্থাৎ তিনি আমীন বললেন এবং তাঁর কণ্ঠস্বর দীর্ঘ/উচ্চ করলেন (সুনানে আবু দাউদ: ৯৩২)।
- আতা (রহ.) বলেন: আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) ও তাঁর পেছনের মুক্তাদীগণ এমনভাবে আমীন বলতেন যে মসজিদে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হতো।
সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত:
উভয় অভিমতের পক্ষেই নির্ভরযোগ্য সাহাবী ও হাদীসের বর্ণনা রয়েছে। হানাফী আলেমগণের মতে, নবীজী (সা.) সাহাবীদেরকে আমীন বলার নিয়ম শিক্ষা দেওয়ার জন্য কখনো কখনো সশব্দে আমীন বলেছিলেন (তালীমের উদ্দেশ্যে), কিন্তু তাঁর স্থায়ী ও সাধারণ সুন্নাত ছিল নিঃশব্দে আমীন বলা। তাই উভয় আমলই সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত এবং এটিকে কেন্দ্র করে উম্মাহর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করা অনুচিত।
٨- عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلَمْ يَدْرِ كَمْ صَلَّى ثَلَاثًا أَمْ أَرْبَعًا؟…»
[৮. আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: যখন তোমাদের কেউ সালাতে সন্দেহে পড়ে যে কয় রাকাত পড়েছে, তিন না চার?…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كَيْفَ الصَّلَاةُ بِاللَّيْلِ؟» قَالَ: «مَثْنَى مَثْنَى، فَإِذَا خَشِيَ أَحَدُكُمُ الصُّبْحَ فَلْيُصَلِّ رَكْعَةً وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا قَدْ صَلَّى»- وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يُوتِرُ مِنْهُنَّ بِوَاحِدَةٍ، فَإِذَا فَرَغَ مِنْهَا اضْطَجَعَ عَلَى شِقِّهِ الْأَيْمَنِ-
অনুবাদ:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করল: “রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ) কীভাবে আদায় করতে হয়?” নবীজী (সা.) উত্তরে বললেন: “দুই রাকাত দুই রাকাত করে। অতঃপর তোমাদের কেউ যখন সুবহে সাদিক ঘনিয়ে আসার আশঙ্কা করবে, তখন সে যেন এক রাকাত পড়ে নেয়, যা তার পূর্বে পঠিত সালাতকে বিজোড় (বিতর) করে দেবে।”
এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে মোট এগারো রাকাত সালাত আদায় করতেন, যার মধ্যে এক রাকাত দ্বারা তিনি সালাতকে বিতর (বিজোড়) বানাতেন। অতঃপর যখন সালাত শেষ করতেন, তখন তিনি স্বীয় ডান কাতে কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম নিতেন।
(ألف) صلوة الوتر واجبة أم سنة؟ وما الإختلاف فيها؟ بين مع الأدلة-
বিতর নামায কি ওয়াজিব নাকি সুন্নত? এ ব্যাপারে আলেমগণের মতপার্থক্য ও দলীলসমূহ:
বিতর সালাতের শরয়ী মর্যাদা নিয়ে ইমামগণের মাঝে দুটি প্রধান অভিমত পরিলক্ষিত হয়:
১. হানাফী মাযহাব (বিতর সালাত ওয়াজিব):
ইমামুল আযম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে বিতর নামায ‘ওয়াজিব’ (واجب)। ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর ত্যাগকারী ফাসিক এবং কঠিন গুনাহগার হবে। হানাফী মাযহাবের শক্তিশালী দলীলসমূহ:
- নবীজীর হুঁশিয়ারি: বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনবার ইরশাদ করেছেন: «الْوِتْرُ حَقٌّ فَمَنْ لَمْ يُوتِرْ فَلَيْسَ مِنَّا، الْوِتْرُ حَقٌّ فَمَنْ لَمْ يُوتِرْ فَلَيْسَ مِنَّا» অর্থাৎ “বিতর অপরিহার্য হক; সুতরাং যে ব্যক্তি বিতর পড়ে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (সুনানে আবু দাউদ: ১৪১৯, মুসতাদরাকে হাকিম)। কোনো সুন্নাত ত্যাগের কারণে উম্মতের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়ার এমন কঠোর ধমকি দেওয়া হয় না; যা প্রমাণ করে বিতর ওয়াজিব।
- অতিরিক্ত ফরযতুল্য সালাত: খারিযাহ ইবনে হুযাফা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَمَدَّكُمْ بِصَلَاةٍ هِيَ خَيْرٌ لَكُمْ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ: الْوِتْرُ، جَعَلَهُ اللَّهُ لَكُمْ فِيمَا بَيْنَ صَلَاةِ الْعِشَاءِ إِلَى أَنْ يَطْلُعَ الْفَجْرُ» অর্থাৎ “নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ওপর এমন একটি সালাত বৃদ্ধি করেছেন যা তোমাদের জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম; আর তা হলো বিতর সালাত” (তিরমিযী: ৪৫২, আবু দাউদ: ১৪১৮)। এখানে ‘বৃদ্ধিকরণ’ দ্বারা সালাতের আবশ্যকতা প্রমাণিত হয়।
- কাযা আদায়ের নির্দেশ: আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন: যে ব্যক্তি বিতর না পড়ে ঘুমিয়ে পড়ে বা ভুলে যায়, সে যেন স্মরণ হওয়া মাত্র বা সকালে তা কাযা আদায় করে নেয় (তিরমিযী: ৪৬৫)। নফল বা সাধারণ সুন্নাতের কাযা অপরিহার্য হয় না।
২. জুমহুর ফুকাহায়ে কিরাম (বিতর সুন্নাতে মুয়াক্কাদা):
ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং হানাফী মাযহাবের দুই প্রধান ফকীহ ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে বিতর সালাত ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বিল-মুয়াক্কাদাহ’ (অত্যন্ত তাকীদপূর্ণ সুন্নাত), তবে তা ওয়াজিব নয়। তাঁদের দলীলসমূহ:
- পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের হাদীস: ত্বালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা.) বর্ণিত হাদীসে এক গ্রাম্য ব্যক্তি নবীজীকে ইসলামের ফরয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: “দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত।” লোকটি জিজ্ঞেস করল: “আমার ওপর কি এ ছাড়া আর কোনো সালাত ফরয আছে?” নবীজী বললেন: «لَا، إِلَّا أَنْ تَطَّوَّعَ» অর্থাৎ “না, তবে তুমি যদি নফল বা অতিরিক্ত পড়তে চাও” (সহীহ বুখারী: ৪৬, সহীহ মুসলিম: ১১)। জুমহুরের মতে, বিতর যদি ওয়াজিব হতো তবে নবীজী এখানে বিতরের কথা উল্লেখ করতেন।
- হযরত আলী (রা.)-এর বক্তব্য: হযরত আলী (রা.) বলেন: «الْوِتْرُ لَيْسَ بِحَتْمٍ كَهَيْئَةِ الْمَكْتُوبَةِ، وَلَكِنَّهُ سُنَّةٌ سَنَّهَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» অর্থাৎ “বিতর ফরয সালাতের মতো অপরিহার্য কোনো ফরয নয়; বরং তা একটি সুন্নাত যা রাসূলুল্লাহ (সা.) চালু করেছেন” (জামে তিরমিযী: ৪৫৩)।
বিতরের রাকাত সংখ্যা ও গঠনপদ্ধতি:
- হানাফী মাযহাব: বিতর নামায এক সালামে মোট তিন রাকাত (মাগরিবের ন্যায়)। তবে মাগরিবের সাথে পার্থক্য হলো: বিতরের তৃতীয় রাকাতেও সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলাতে হয় এবং রুকুর পূর্বে তাকবীর বলে কুনূতের দু’আ পড়তে হয়। বিচ্ছিন্ন এক রাকাত পড়া হানাফী মাযহাবে মাকরূহে তাহরীমী (নবীজী এক রাকাতকে ‘বাত্তিরা’ বা লেজকাটা সালাত বলে নিষেধ করেছেন)।
- জুমহুর মাযহাব: শাফেয়ী ও হাম্বলীগণের মতে বিতর ১ রাকাত থেকে শুরু করে ১১ রাকাত পর্যন্ত হতে পারে। তবে উত্তম হলো দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে শেষ এক রাকাত পৃথক সালামে আদায় করা (ফাছল পদ্ধতি)।
مجموعة (ج) — شعب الإيمان للبيهقي (শুয়াবুল ঈমান লিল-বায়হাকী)
(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة) — হাদীসের অনুবাদ করো অতঃপর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।
٩- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ…»
[৯. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: আমি মানুষের সাথে লড়াই করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، فَإِذَا قَالُوهَا مَنَعُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ»- وَعَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ صَادِقًا مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ»-
অনুবাদ:
হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমি মানুষের সাথে লড়াই করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে— ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’। যখন তারা এ বাক্যটি বলবে, তখন তারা আমার থেকে তাদের রক্ত (জীবন) ও ধন-সম্পদকে নিরাপদ করে নেবে, তবে ইসলামের হকের কারণে (শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ করলে) ব্যতীত; আর তাদের অন্তরের প্রকৃত হিসাব-নিকাশ আল্লাহ তা’আলার জিম্মায়।”
এবং হযরত মু’আয ইবনে জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে সে অন্তর থেকে সত্যনিষ্ঠভাবে সাক্ষ্য দেয়— ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
হাদীসের শব্দার্থ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:
- أُمِرْتُ (উমিরতু): আমি আদিষ্ট হয়েছি; অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা আমাকে নির্দেশ প্রদান করেছেন।
- أُقَاتِلَ (উকাতিল): কিতাল বা লড়াই করা; এটি ‘বাব মুফা’আলা’ (مفاعلة) থেকে গঠিত, যার অর্থ প্রতিরোধকারী আক্রমণকারী কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, ঢালাওভাবে হত্যা (ক্বাতল) করা নয়।
- عَصَمُوا বা مَنَعُوا: নিরাপদ ও সংরক্ষিত করে নেওয়া (ইসমাত বা নিরাপত্তা লাভ)।
- إِلَّا بِحَقِّهَا: ইসলামের হক বা অধিকার ব্যতীত; যেমন মুরতাদ হওয়া, বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার করা বা কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার কারণে কিসাস জারি হওয়া।
- صَادِقًا مِنْ قَلْبِهِ: অন্তরের গভীর বিশ্বাস ও একনিষ্ঠতা সহকারে; যা মুনাফিক্বী ও কপটতার বিপরীত।
(الف) ما معنى الإيمان لغة وشرعًا؟ وما المراد بقوله عليه السلام “وحسابهم على الله عز وجل”؟ بين-
ঈমানের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
১. ঈমানের আভিধানিক অর্থ (معنى الإيمان لغة):
আরবি ‘ঈমান’ (الإيمان) শব্দটি ‘আল-আম্নু’ (الأَمْنُ) ধাতু থেকে ‘বাব ইফ’আল’ (إِفْعَالٌ)-এর মাসদার। অভিধানে এর মৌলিক অর্থ হলো— التَّصْدِيقُ (আত-তাসদীক্ব) অর্থাৎ কোনো সংবাদদাতাকে সত্যবাদী বলে বিশ্বাস ও সত্যায়ন করা, স্বীকৃতি দেওয়া এবং সংশয়হীনভাবে মেনে নেওয়া।
পবিত্র কুরআনে ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের বক্তব্যে তাসদীক্ব অর্থে এ শব্দের প্রয়োগ এসেছে: «وَمَا أَنْتَ بِمُؤْمِنٍ لَنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ» অর্থাৎ “আপনি তো আমাদের কথা বিশ্বাসকারী (মুসাদ্দিক্ব) নন, যদিও আমরা সত্যবাদী” (সূরা ইউসুফ: ১৭)।
২. ঈমানের পারিভাষিক ও শরয়ী অর্থ (معنى الإيمان شرعًا):
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ঈমানের সংজ্ঞায় উলামায়ে কিরামের প্রধান বক্তব্যসমূহ নিম্নরূপ:
- জমহুর মুতাকাল্লিমীন ও ফুকাহায়ে হানাফীয়া: ঈমান হলো— «التَّصْدِيقُ بِمَا جَاءَ بِهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ضَرُورَةً» অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীনের যে সমস্ত অকাট্য বিধিবিধান ও অপরিহার্য মৌলিক বিষয়াদি (জরুরিয়াতে দ্বীন) নিয়ে এসেছেন, তা অন্তরের গভীরে অকপটে সত্য বলে দৃঢ় বিশ্বাস করা। আর মুখে তার স্বীকৃতি বা ইকরার (الإقرار باللسان) করা হলো দুনিয়াবী আহকাম (যেমন জানাযা, বিয়ে, ওয়ারিশ ইত্যাদি) প্রয়োগের জন্য শর্ত। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: «الإِيمَانُ هُوَ التَّصْدِيقُ وَالإِقْرَارُ» অর্থাৎ ঈমান হলো অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে স্বীকৃতি।
- জমহুর মুহাদ্দিসীন, সালাফে সালিহীন ও ইমাম শাফে’ঈ, মালিক, আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): তাঁদের মতে ঈমান তিনটি উপাদানের সমষ্টি—
«الإِيمَانُ: عَقْدٌ بِالْقَلْبِ، وَإِقْرَارٌ بِاللِّسَانِ، وَعَمَلٌ بِالأَرْكَانِ»
অর্থাৎ ঈমান হলো— অন্তরে অটল বিশ্বাস, মুখে অকপট স্বীকৃতি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল ও বাস্তবায়ন। আনুগত্য ও নেক আমলের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহ ও অবাধ্যতার কারণে ঈমান হ্রাস পায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী “وحسابهم على الله عز وجل”-এর তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: «وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ» (আর তাদের প্রকৃত হিসাব-নিকাশ আল্লাহ পরাক্রমশালী ও মহান সত্তার জিম্মায়)-এর মর্মার্থ অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী:
- ১. জাহির বা বাহ্যিকতার ওপর ফয়সালা প্রদান: ইসলামী বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রনীতির মৌলিক উসূল হলো— ইসলাম মানুষের বাহ্যিক আমল, মুখের স্বীকারোক্তি ও প্রকাশ্য আচরণের ভিত্তিতে বিচার করে (نَحْنُ نَحْكُمُ بِالظَّوَاهِرِ)। কেউ যখন কালিমায়ে তাইয়্যিবা মুখে উচ্চারণ করে এবং ইসলামের বাহ্যিক বিধানাবলী পালন করে, তখন সে মুসলিম হিসেবে গণ্য হয় এবং তার জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ নিশ্চিত হয়ে যায়।
- ২. বাতেন বা অন্তরের গোপন রহস্য আল্লাহর নিকট সমর্পিত: কোনো ব্যক্তি অন্তর থেকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে কালেমা পাঠ করল, নাকি তরবারির ভয়ে বা জাগতিক স্বার্থে বাহ্যিকভাবে কালেমা উচ্চারণ করল (মুনাফেক্বী করল)— তা উন্মোচন করার দায়িত্ব কোনো মানুষের নয়। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাদের অন্তরের গোপন নিয়তের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব গ্রহণ করবেন (وَاللهُ يَتَوَلَّى السَّرَائِرَ)। যদি তারা মুনাফিক হয়, তবে আল্লাহ তাদের জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে শাস্তি দেবেন; আর যদি তারা সত্যবাদী মুমিন হয়, তবে তাদের জান্নাত নসীব করবেন।
- ৩. উসামা ইবনে যায়দ (রা.)-এর ঘটনার প্রতিধ্বনি: হযরত উসামা ইবনে যায়দ (রা.) এক যুদ্ধে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণকারী শত্রুকে ভয়ে কালেমা পড়েছে মনে করে হত্যা করেছিলেন। এ সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন: «أَفَلَا شَقَقْتَ عَنْ قَلْبِهِ حَتَّى تَعْلَمَ أَقَالَهَا أَمْ لَا؟» অর্থাৎ “তুমি কি তার হৃদয় চিরে দেখেছিলে যে সে অন্তর থেকে বলেছিল কি না?” (সহীহ মুসলিম: ৯৬)। আলোচ্য হাদীসের অংশটি প্রমাণ করে যে, অন্তরের গভীরে প্রবেশ করা মানুষের সাধ্যের অতীত, তার ফয়সালা একমাত্র সর্বজ্ঞ আল্লাহর দরবারেই সংরক্ষিত।
١٠- عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ…»
[১০. ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত…]
মূল হাদীস (النص الحديثই):
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ (أَظُنُّهُ قَالَ: وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ)، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ»-
অনুবাদ:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর স্থাপিত হয়েছে: এই কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই (বর্ণনাকারী বলেন: আমার ধারণা নবীজী এ-ও বলেছেন: এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল), সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, বাইতুল্লাহর হজ্জ সম্পাদন করা এবং রমযানের সিয়াম পালন করা।”
হাদীসের প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট:
এই হাদীসটি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ সম্বলিত সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও প্রামাণিক হাদীসগুলোর একটি। ইসলামকে এখানে একটি সুদৃঢ় ও সুউচ্চ ভবনের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যা পাঁচটি মজবুত খুঁটি বা স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ঈমানের কালেমা হলো এর কেন্দ্রীয় ভিত্তি এবং সালাত, যাকাত, হজ্জ ও সিয়াম হলো এর চারপাশের শক্তিশালী স্তম্ভসমূহ।
(الف) ما معنى الإسلام؟ وما الفرق بين الإيمان والإسلام؟ بين-
ইসলামের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:
১. ইসলামের আভিধানিক অর্থ (معنى الإسلام لغة):
‘ইসলাম’ (الإسلام) শব্দটি ‘আস-সিল্ম’ (السِّلْمُ) ও ‘আস-সালামাত’ (السَّلَامَةُ) ধাতু থেকে ‘বাব ইফ’আল’ (إِفْعَالٌ)-এর মাসদার। অভিধানে এর মৌলিক অর্থসমূহ হলো—
الِانْقِيَادُ (আল-ইনক্বিয়াদ): আনুগত্য স্বীকার করা ও বশ্যতা গ্রহণ করা।
الْخُضُوعُ وَالاسْتِسْلَامُ (আল-খুযূ’ ওয়াল-ইসতিসলাম): মাথানত করা, আত্মসমর্পণ করা এবং অহংকার বর্জন করে বিনীত হওয়া।
السَّلَامَةُ (আস-সালামাহ): শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে প্রবেশ করা।
২. ইসলামের পারিভাষিক ও শরয়ী অর্থ (معنى الإسلام شرعًا):
শরীয়তের পরিভাষায় ইসলাম হলো: «الِاسْتِسْلَامُ لِلَّهِ بِالتَّوْحِيدِ، وَالانْقِيَادُ لَهُ بِالطَّاعَةِ، وَالْبَرَاءَةُ مِنَ الشِّرْكِ وَأَهْلِهِ» অর্থাৎ তাওহীদের মাধ্যমে একক পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা, তাঁর যাবতীয় আদেশ-নিষেধের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা এবং শিরক ও শিরককারীদের সাথে সকল প্রকার সংস্রব ও সম্পর্কচ্ছেদ করা। অন্য কথায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) আনীত শরীয়তের প্রকাশ্য বিধিবিধানাবলী দৈনন্দিন জীবনে আন্তরিকভাবে পালন করার নামই হলো ইসলাম।
ঈমান ও ইসলামের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও পার্থক্য (الفرق بين الإيمان والإسلام):
ইসলামী আকীদা ও হাদীস শাস্ত্রে ঈমান ও ইসলামের পার্থক্য একটি সুপ্রসিদ্ধ তাত্ত্বিক বিতর্ক। উলামায়ে কিরামের তাহকীক অনুযায়ী এ পার্থক্যের মূল রূপরেখা নিম্নরূপ:
১. ব্যাকরণিক ও শাব্দিক প্রয়োগগত দৃষ্টিভঙ্গি (قاعدة: إذا اجتمعا افترقا، وإذا افترقا اجتمعا):
মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণের প্রতিষ্ঠিত কানুন হলো— যখন ‘ঈমান’ ও ‘ইসলাম’ শব্দদ্বয় কোনো একক বাক্যে বা প্রসঙ্গে একসাথে উল্লেখিত হয়, তখন তাদের অর্থ ভিন্ন হয় (যদি একত্রিত হয় তবে অর্থের ভিন্নতা প্রকাশ পায়; আর যখন পৃথক পৃথকভাবে এককভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন একটির অর্থ অপরটিকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়)।
- একত্রে উল্লেখিত হলে: ‘ঈমান’ দ্বারা উদ্দেশ্য হয় মানুষের বাতেন বা অন্তরের বিশ্বাস (আমালুল কুলূব— যেমন আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ ও আখিরাতে বিশ্বাস); আর ‘ইসলাম’ দ্বারা উদ্দেশ্য হয় মানুষের জাহির বা বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল (আমালুল জাওয়ারেহ— যেমন কালেমা পাঠ, সালাত, যাকাত, সিয়াম ও হজ্জ)। সুপ্রসিদ্ধ ‘হাদীসে জিবরীল’-এ হযরত জিবরীল (আ.) যখন পৃথক পৃথকভাবে প্রশ্ন করেছিলেন, তখন নবীজী (সা.) ঈমানকে অন্তরের ছয়টি বিশ্বাসের সাথে এবং ইসলামকে পাঁচটি বাহ্যিক স্তম্ভের সাথে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
- পৃথকভাবে একক উল্লেখিত হলে: কেবল ‘ঈমান’ উল্লেখ করলে তার মধ্যে ইসলাম ও সৎকর্মসমূহ শামিল থাকে; অনুরূপভাবে কেবল ‘ইসলাম’ উল্লেখ করলে তার অভ্যন্তরে আন্তরিক ঈমানও অবধারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে।
২. সাধারণ ও বিশেষত্বের পার্থক্য (عموم وخصوص وجهي):
- স্থানভেদে পার্থক্য: ঈমানের স্থান হলো ক্বলব বা অন্তর (محل الإيمان هو القلب); পক্ষান্তরে ইসলামের স্থান হলো সমগ্র দেহ ও বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (محل الإسلام هو الجوارح)।
- কুরআনী প্রমাণ: পবিত্র কুরআনে বেদুঈনদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: «قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا ۖ قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَٰكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ» অর্থাৎ “মরুবাসীরা বলে— আমরা ঈমান এনেছি। বলুন: তোমরা ঈমান আনোনি, বরং তোমরা বলো— আমরা আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করেছি; কেননা ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৪)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক আনুগত্য বা ইসলাম প্রকাশ পেলেই অন্তরের ঈমান পরিপূর্ণ হয় না।
- সারসংক্ষেপ: প্রত্যেক প্রকৃত মুমিনই মুসলিম; কিন্তু বাহ্যিকভাবে আত্মসমর্পণকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই আন্তরিকভাবে কামিল মুমিন নাও হতে পারে (যেমন মুনাফিকগণ বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করলেও তাদের অন্তরে ঈমানের লেশমাত্র থাকে না)। সুতরাং ঈমান হলো মূল ভিত্তি ও প্রাণ, আর ইসলাম হলো তার বাহ্যিক রূপ ও প্রতিফলন।
١١- عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا أَسْلَمَ الْعَبْدُ فَحَسُنَ إِسْلَامُهُ كَفَّرَ اللهُ عَنْهُ كُلَّ سَيِّئَةٍ زَلَفَهَا…»
[১১. আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: বান্দা যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলাম সুন্দর হয়…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا أَسْلَمَ الْعَبْدُ فَحَسُنَ إِسْلَامُهُ كَفَّرَ اللهُ عَنْهُ كُلَّ سَيِّئَةٍ زَلَفَهَا، وَكَتَبَ اللهُ لَهُ كُلَّ حَسَنَةٍ كَانَ زَلَفَهَا، ثُمَّ كَانَ الْقِصَاصُ: الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ، وَالسَّيِّئَةُ بِمِثْلِهَا إِلَّا أَنْ يَتَجَاوَزَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ»-
অনুবাদ:
হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যখন কোনো বান্দা ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলামকে সুন্দর ও নিখুঁত করে তোলে, তখন আল্লাহ তা’আলা তার অতীতের কৃত সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন এবং ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সে যে সমস্ত নেক আমল করেছিল তাও তার জন্য সাওয়াব হিসেবে লিখে দেন। অতঃপর শুরু হয় আমলের প্রতিদান বা হিসাব-নিকাশ: প্রতিটি সৎকাজের প্রতিদান দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়; আর প্রতিটি পাপকাজের শাস্তি কেবল সমপরিমাণই লেখা হয়, যদি না আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অনুগ্রহে ক্ষমা করে দেন।”
হাদীসের শব্দার্থ ও তাত্ত্বিক শিক্ষা:
- فَحَسُنَ إِسْلَامُهُ: তার ইসলাম সুন্দর ও পরিশুদ্ধ হলো; অর্থাৎ সে ইখলাস, নিষ্ঠা ও সুন্নাতের অনুসরণের মাধ্যমে খাঁটি মুমিন হলো এবং কপটতা ও লৌকিকতা পরিহার করল।
- زَلَفَهَا (যালাফাহা) বা أَزْلَفَهَا: পূর্বে অগ্রে প্রেরণ করেছিল বা জাহিলিয়াতের যুগে সম্পাদন করেছিল।
- الْقِصَاصُ: কর্মের সমমূল্য বিনিময় বা ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিদান ও প্রতিফল।
- শিক্ষা: ইসলামের করুণা ও রহমত অপার। বান্দা কুফর অবস্থায় পিতা-মাতার খেদমত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা বা দান-সদকার যে ভালো কাজগুলো করেছিল, ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহ স্বীয় দয়ায় সেইগুলোরও সাওয়াব প্রদান করেন। পক্ষান্তরে অতীতের সমস্ত পাপরাশি ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মুছে যায়।
(الف) أكتب نبذة من حياة أبي سعيد الخدري رضي الله عنه-
হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.)-এর বিশদ জীবনচরিত:
১. নাম, উপনাম ও বংশ পরিচয়:
তাঁহার মূল নাম সা’দ (سَعْدٌ)। উপনাম ‘আবু সাঈদ’ (أَبُو سَعِيدٍ), এবং তিনি এই উপনামেই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। পিতার নাম মালিক ইবনে সিনান (مالك بن سنان), যিনি উহুদের যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন। মাতার নাম উনাইসা বিনতে রাফি’ (أنيسة بنت رافع)। তিনি মদীনার আনসারদের বনু খুদরাহ (بنو خدرة) গোত্রের সন্তান ছিলেন, যা খাযরাজ গোত্রের একটি শাখা; এজন্য তাঁকে ‘আল-খুদরী’ (الخُدْرِيّ) এবং ‘আল-আনসারী’ বলা হয়।
২. শৈশব ও ইসলাম গ্রহণ:
তিনি হিজরতের প্রায় দশ বছর পূর্বে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় হিজরত করার পর তাঁর পিতা মালিক ইবনে সিনান (রা.) এবং পরিবারের সাথে তিনি শৈশবেই ইসলাম গ্রহণ করেন। উহুদের যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর। তাঁর পিতা তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে উপস্থিত করে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন; কিন্তু বয়সে ছোট হওয়ার কারণে নবীজী (সা.) তাঁকে অনুমতি দেননি।
৩. জিহাদে অংশগ্রহণ ও বীরত্ব:
খন্দকের যুদ্ধ (গাযওয়ায়ে আহযাব)-এর মাধ্যমে তাঁর প্রত্যক্ষ জিহাদী জীবন শুরু হয়। অতঃপর তিনি বায়’আতে রিদওয়ান, খায়বার বিজয়, মক্কা বিজয় এবং হুনাইনের যুদ্ধসহ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে মোট বারোটি (১২) রক্তক্ষয়ী غزوة বা অভিযানে সশরীরে অংশগ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত নির্ভীক ও ন্যায়নিষ্ঠ যোদ্ধা ছিলেন।
৪. ইলমী মর্যাদা ও হাদীস বর্ণনায় অবদান:
হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) ছিলেন সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ফকীহ, আলিম এবং ‘আস-সাহাবাহ আল-মুকাচ্ছিরীন’ (যাঁরা এক হাজারের অধিক হাদীস বর্ণনা করেছেন)-এর অন্যতম।
- হাদীস সংখ্যা: তাঁর বর্ণিত মোট হাদীসের সংখ্যা ১,১৭০টি। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়ে যৌথভাবে (মুত্তাফাকুন আলাইহি) তাঁর থেকে ৪৩টি হাদীস সংকলন করেছেন; এছাড়া এককভাবে ইমাম বুখারী ১৬টি এবং ইমাম মুসলিম ৫২টি হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন।
- আসহাবে সুফফার সাহচর্য: তিনি দীর্ঘ সময় আসহাবে সুফফায় অবস্থান করে চরম দারিদ্র্য ও অনাহারের মাঝেও ইলমে নববীর গভীর পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সর্বদা সাহাবায়ে কিরাম ও পরবর্তী তাবি’ঈদের নিকট হাদীস শিক্ষা দিতেন এবং বলতেন: “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসিয়ত হিসেবে তোমাদেরকে সাদর সম্ভাষণ জানাই।”
- প্রখ্যাত ছাত্রবৃন্দ: বিশিষ্ট সাহাবী ও তাবে’ঈদের এক বিশাল কাফেলা তাঁর থেকে হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন। তাঁদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ, আতা ইবনে ইয়াসার, মুজাহিদ, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব এবং আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান (রহ.) অন্যতম।
৫. চরিত্র, যুহদ ও সততা:
তিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও আত্মমর্যাদাবোধ ও তাওয়াক্কুলের প্রতীক ছিলেন। একবার তীব্র অভাবের সময় তাঁর পরিবার তাঁকে নবীজী (সা.)-এর নিকট কিছু সাহায্য চাওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি গেলেন। কিন্তু নবীজীর মুখে «مَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللهُ» (যে ব্যক্তি পবিত্রতা ও স্বাবলম্বিতা কামনা করে, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করে দেন) শুনে তিনি কিছু না চেয়ে ফিরে আসেন এবং পরবর্তীতে আল্লাহ তাঁকে প্রভূত বরকত দান করেন। তিনি সর্বদা সত্য কথা স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, এমনকী উমাইয়্যা খলীফা ও গভর্নরদের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধেও সাহসের সাথে প্রতিবাদ জানাতেন।
৬. ওফাত ও সমাধি:
হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) হিজরী ৭৪ সনে (মতান্তরে ৬৩ বা ৬৪ হিজরীতে) মদীনা মুনাওয়ারায় প্রায় ৮৪ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। ঐতিহাসিক সুপ্রসিদ্ধ জান্নাতুল বাক্বী গোরস্থানে তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় সমাহিত করা হয়।
١٢- عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ…»
[১২. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ব্যভিচারী যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন মুমিন অবস্থায় তা করে না…]
মূল হাদীস (النص الحديثي):
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَسْرِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَنْتَهِبُ نُهْبَةً يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ فِيهَا أَبْصَارَهُمْ حِينَ يَنْتَهِبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ»-
অনুবাদ:
হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “ব্যভিচারী যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন সে মুমিন অবস্থায় তা করে না; চোর যখন চুরি করে, তখন সে মুমিন অবস্থায় তা করে না; মদ্যপায়ী যখন মদ পান করে, তখন সে মুমিন অবস্থায় তা করে না; এবং কোনো লুটেরা যখন এমন কোনো প্রকাশ্য লুটতরাজ চালায় যাতে সাধারণ মানুষ তার দিকে (ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে) চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে, তখন সে মুমিন অবস্থায় তা করে না।”
হাদীসের বিশ্লেষণ ও ভাবার্থ:
এই হাদীসটি অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী সম্বলিত। একজন ব্যক্তি যখন জঘন্য কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, তখন তার অন্তরের ঈমানের নূর, লজ্জা ও আল্লাহভীতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। সে সময় তার অন্তরে পূর্ণাঙ্গ ঈমান বহাল থাকে না।
(ألف) ما هو أقوال العلماء في مرتكب الكبائر؟ بين-
কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির বিধান সম্পর্কে বিভিন্ন দল ও উলামায়ে কিরামের দৃষ্টিভঙ্গি:
যে ব্যক্তি তাওহীদ ও রিসালাতে বিশ্বাসী থাকা সত্ত্বেও তওবা ব্যতীত কবিরা গুনাহে (যেমন যিনা, চুরি, মদ্যপান ইত্যাদি) লিপ্ত হয় বা মৃত্যুবরণ করে, তার ঈমান ও আখিরাতের পরিণতি নিয়ে উম্মাহর মধ্যে ঐতিহাসিক মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধান চারটি দলের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নে পর্যালোচনা করা হলো:
১. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আত (জমহুর উম্মাহ, ইমাম আবু হানীফা, মালিক, শাফে’ঈ ও আহমাদ):
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আকীদা অনুযায়ী, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি কাফির হয়ে যায় না; বরং সে ‘ফাসিক মুমিন’ বা ত্রুটিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী মুমিন (مؤمن ناقص الإيمان أو مؤمن بإيمانه فاسق بكبيرته)।
- দুনিয়ার বিধান: সে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে, তার জানাযার নামায পড়া হবে, তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক ও ওয়ারিশ স্বত্ব কায়েম থাকবে এবং তার ওপর শরীয়তের দণ্ডবিধি (হদ) প্রয়োগ করা হলেও তাকে মুরতাদ ঘোষণা করা যাবে না।
- আখিরাতের বিধান: সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন (تحت مشيئة الله)। আল্লাহ তা’আলা চাইলে স্বীয় অনুগ্রহে অথবা নবীজী (সা.)-এর সুপারিশে (শাফা’আত) তাকে বিনা শাস্তিতে ক্ষমা করতে পারেন, অথবা তার পাপের সমপরিমাণ শাস্তি প্রদানের পর শেষ পর্যন্ত ঈমানের বদৌলতে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
- দলীল: কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন: «إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ» অর্থাৎ “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্য যেকোনো পাপ তিনি যার জন্য চান ক্ষমা করে দেন” (সূরা আন-নিসা: ৪৮)। এছাড়া হাদীসে এসেছে: «شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي» অর্থাৎ “আমার শাফা’আত আমার উম্মতের কবিরা গুনাহকারীদের জন্য সংরক্ষিত” (সুনানে আবু দাউদ, তিরমিযী)।
- আলোচ্য হাদীসের ব্যাখ্যা: হাদীসে «لَا يَزْنِي الزَّانِي… وَهُوَ مُؤْمِنٌ» দ্বারা ঈমানের মূল অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়নি; বরং ‘কামালিয়াত’ বা ঈমানের পূর্ণাঙ্গতা ও নূর অস্বীকার করা হয়েছে (نفي الكمال لا نفي الأصل)। অর্থাৎ কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকাকালে সে একজন পূর্ণাঙ্গ ও আল্লাহভীরু মুমিন হিসেবে অবশিষ্ট থাকে না। যেমন আরবীতে বলা হয়: ‘অমুকে কোনো মানুষই নয়’— যার অর্থ তার মনুষ্যত্ব বিনষ্ট হয়েছে, সে সৃষ্টির মূল অস্তিত্ব থেকে বের হয়ে যায়নি।
২. খারিজি সম্প্রদায় (الخوارج):
খারিজিদের চরমপন্থী মত হলো— যেকোনো কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি সাথে সাথে মিল্লাতে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যায়। দুনিয়াতে তার রক্ত ও ধন-সম্পদ হালাল এবং আখিরাতে সে কাফিরদের মতো চিরকাল জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। তাদের এই মত কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর সুস্পষ্ট পরিপন্থী।
৩. মু’তাজিলা সম্প্রদায় (المعتزلة):
মু’তাজিলাদের মতে, কবিরা গুনাহকারী ব্যক্তি মুমিনও নয়, আবার কাফিরও নয়; বরং সে ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি একটি অন্তর্বর্তীকালীন স্তরে অবস্থান করে। একে তাদের পারিভাষায় «المنزلة بين المنزلتين» (আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইনি) বলা হয়। তবে আখিরাতের ক্ষেত্রে তাদের মত খারিজিদের মতোই— অর্থাৎ তওবা ছাড়া মারা গেলে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, তবে কাফিরের চেয়ে তার শাস্তির মাত্রা সামান্য হালকা হবে।
৪. মুরজিয়া সম্প্রদায় (المرجئة):
মুরজিয়াদের ভ্রান্ত মত হলো— ঈমান থাকলে কোনো গুনাহই ক্ষতি করে না, যেমন কুফর থাকলে কোনো নেক আমল উপকারে আসে না (لا تضر مع الإيمان معصية كما لا تنفع مع الكفر طاعة)। তাদের মতে, অন্তরে বিশ্বাস থাকলেই একজন ব্যক্তি জঘন্যতম পাপ করেও হযরত আবু বকর (রা.) ও জিবরীল (আ.)-এর মতো পরিপূর্ণ মুমিন থাকে। ফলে তারা আমলের গুরুত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করে।
উপসংহার ও আহলে সুন্নাতের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের মতটিই কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুকূল মধ্যমপন্থী অবস্থান (وسطية)। তাঁরা খারিজি ও মু’তাজিলাদের মতো মুমিনকে কাফির বলেন না, আবার মুরজিয়াদের মতো পাপের ভয়াবহতাকেও লঘু করে দেখেন না; বরং কবিরা গুনাহগারকে ফাসিক বলে আখ্যায়িত করে তার তওবা এবং আল্লাহর রহমত ও শাফা’আতের ওপর আস্থা রাখেন।
مجموعة (د) — المقالات النظرية والتاريخية (তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রবন্ধসমূহ)
(أجب عن الأسئلة الآتية بالتفصيل) — নিম্নে প্রদত্ত প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও বিশ্লেষণাত্মক উত্তর দাও।
١٣- أكتب ترجمة الإمام مالك بن أنس رحمه الله تعالى-
[১৩. ইমামুল আইম্মাহ হযরত মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর বিশদ জীবনচরিত লিখ।]
ইমামুল আইম্মাহ, ইমাম দারিল হিজরাহ হযরত মালিক ইবনে আনাস (রহিমাহুল্লাহ)-এর বিশদ জীবনী:
১. ভূমিকা ও পরিচিতি:
ইসলামী শরীয়তের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের অন্যতম, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের দ্বিতীয় প্রধান মাযহাবের ইমাম এবং ‘ইমামু দারিল হিজরাহ’ (মদীনা মুনাওয়ারার ইমাম) উপাধিতে ভূষিত ব্যক্তিত্ব হলেন হযরত ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)। তিনি যুগপৎভাবে হাদীস ও ফিকহ উভয় শাস্ত্রে একচ্ছত্র ইমামতের অধিকারী ছিলেন।
২. নাম, উপনাম, বংশ ও উপাধি:
- নাম ও উপনাম: তাঁর নাম ‘মালিক’ (مَالِكٌ), এবং উপনাম ‘আবু আব্দুল্লাহ’ (أَبُو عَبْدِ اللهِ)।
- বংশপরম্পরা: মালিক ইবনে আনাস ইবনে মালিক ইবনে আবি আমির ইবনে আমর ইবনুল হারিস আল-আসবাহী আল-হিময়ারী (مالك بن أنس بن مالك بن أبي عامر الأصبحي)। তিনি ইয়েমেনের বিখ্যাত আসবাহ গোত্রের রাজকীয় বংশের সন্তান ছিলেন, যা পরবর্তীতে মদীনায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে কুরাইশদের বনু তাইম গোত্রের সাথে মিত্রতাবদ্ধ হয়।
- উপাধিসমূহ: তাঁর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ উপাধি «إِمَامُ دَارِ الْهِجْرَةِ» (ইমামু দারিল হিজরাহ), ‘শায়খুল ইসলাম’, ‘হুজ্জাতুল উম্মাহ’ এবং ‘মুফতিউল হারামাঈন’।
৩. জন্ম ও শৈশব:
ইমাম মালিক (রহ.) হিজরী ৯৩ সনে (মতান্তরে ৯০ বা ৯৫ হিজরীতে) খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল ইলম ও হাদীস চর্চায় সমৃদ্ধ। তাঁর দাদা আবু আমির (রা.) ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহাবী এবং তাঁর পিতা আনাস ও চাচা আবু সুহাইল নাফে’ ছিলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস। বাল্যকালে তাঁর আম্মা তাঁকে সুন্দর পোশাক ও পাগড়ি পরিয়ে বলতেন: “রাবিয়া আর-রায়ীর দরবারে যাও এবং তাঁর ইলম শেখার পূর্বে তাঁর আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা করো।”
৪. শিক্ষা ও উস্তাদবৃন্দ:
ইমাম মালিক মদীনার সাড়ে তিনশত (৩৫০) তাবে’ঈ ও তাবে-তাবে’ঈ উস্তাদের কাছ থেকে হাদীস ও ফিকহের পাঠ গ্রহণ করেন। তাঁর প্রধান উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন:
- ইমাম নাফে’ মাওলা ইবনে উমর (রহ.): হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর বিশিষ্ট খাদেম ও ছাত্র।
- ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.): হাদীস সংকলনের প্রধান অগ্রদূত।
- রাবিয়া ইবনে আবি আব্দুর রহমান (রাবিয়া আর-রায়ী): মদীনার শীর্ষস্থানীয় ফকীহ।
- ইমাম জা’ফর আস-সাদিক (রহ.): আহলে বাইতের প্রখ্যাত ইমাম।
- আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার ও ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী (রহ.)।
৫. দরস প্রদান ও ফতোয়াদানের অনুমতি:
ইমাম মালিক (রহ.) অত্যন্ত বিনয়ী ও সতর্ক ছিলেন। তিনি স্বীয় উদ্যোগে কখনো ফতোয়াদানের আসনে বসেননি। তিনি নিজেই বলেছেন: “মদীনার সত্তর (৭০) জন শীর্ষস্থানীয় ফকীহ ও মুহাদ্দিস যখন সাক্ষ্য দিলেন যে আমি ফতোয়া প্রদানের উপযুক্ত, কেবল তখনই আমি মসজিদে নববীতে দরস ও ফতোয়াদানের জন্য উপবেশন করেছি।” তিনি মসজিদে নববীতে ঠিক সেই স্থানে বসে দরস দিতেন, যেখানে খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর (রা.) বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
৬. হাদীসের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও আদব:
হাদীসে নববীর প্রতি ইমাম মালিকের সম্মান ও ভক্তি ছিল ইতিহাসে নজিরবিহীন:
- তিনি যখনই হাদীসের দরস দিতে বসতেন, প্রথমে গোসল করতেন, সুগন্ধি আতর ব্যবহার করতেন, সর্বোত্তম নতুন পোশাক ও পাগড়ি পরিধান করতেন এবং অত্যন্ত ভক্তি ও একাগ্রতার সাথে উপবেশন করতেন।
- দরসে কখনো উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেন না। কেউ প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন: “এটা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস, এখানে গলার স্বর নিচু রাখো।”
- মদীনা মুনাওয়ারার মাটিতে তিনি কখনো জুতো বা স্যান্ডেল পরে চলতেন না; কারণ যে মাটিতে বিশ্বনবী (সা.) হেঁটেছেন এবং শুয়ে আছেন, সে মাটিকে জুতোর নিচে রাখা তিনি বেয়াদবি মনে করতেন।
- একবার দরস চলাকালে একটি বিচ্ছু তাঁর কাপড়ের ভেতর ঢুকে তাঁকে ষোলোবার দংশন করে; তাঁর মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের অসম্মান হবে ভেবে দরস বন্ধ করেননি।
৭. চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও সতর্কতা:
ইমাম মালিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ‘লা আদরী’ (لَا أَدْرِي — আমি জানি না) বলার বিরল সাহস। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ জটিল প্রশ্ন নিয়ে আসত; তিনি বহু প্রশ্নের উত্তরে অকপটে বলতেন: “আমি এর উত্তর জানি না।” তিনি বলতেন: “মুফতির ঢাল হলো ‘আমি জানি না’ বলা; সে যদি তা ত্যাগ করে, তবে সে ধ্বংসের মুখে নিপতিত হয়।”
৮. সত্যের ওপর অবিচলতা ও ঐতিহাসিক পরীক্ষা (মিহনাত):
১৪৭ হিজরীতে আব্বাসী খলীফা আবু জা’ফর আল-মনসুরের গভর্নর জাফর ইবনে সুলায়মানের আমলে ইমাম মালিক একটি হাদীস বর্ণনা করেন: «لَيْسَ عَلَى مُسْتَكْرَهٍ طَلَاقٌ» অর্থাৎ বলপ্রয়োগে বাধ্যকৃত ব্যক্তির তালাক কার্যকর হয় না। রাজনৈতিকভাবে এই ফতোয়া আব্বাসী খলীফার প্রতি জোরপূর্বক আদায়কৃত আনুগত্যের বায়’আতের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এজন্য শাসকগোষ্ঠী তাঁকে হাদীসটি বর্ণনা করতে নিষেধ করে। ইমাম মালিক দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তা প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে প্রকাশ্যে চাবুক মারা হয় এবং তাঁর হাত মচকে শরীর বিকল করে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সত্য প্রকাশ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি।
৯. প্রধান ছাত্রবৃন্দ:
সমগ্র মুসলিম জাহান থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাঁর দরবারে সমবেত হতেন। তাঁর প্রধান ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন:
- ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফে’ঈ (রহ.): শাফে’ঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা।
- ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.): হানাফী মাযহাবের প্রধান ফকীহ ও মুয়াত্তার অন্যতম বর্ণনাকারী।
- ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব, আব্দুর রহমান ইবনুল কাসিম ও আসহাবু মালিক।
- ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া আল-লাইসী (রহ.): মুয়াত্তার সর্বাধিক প্রসিদ্ধ বর্ণনাকারী।
- সুফিয়ান আস-সাওরী ও সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না (রহ.)।
১০. অমর কীর্তি ও গ্রন্থাবলী:
তাঁর অমর অক্ষয় কীর্তি হলো হাদীস ও ফিকহের বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ «المُوَطَّأُ» (আল-মুয়াত্তা), যা লিখিত সুসংকলিত হাদীসগ্রন্থসমূহের আদি ভিত্তি। এছাড়া তাঁর ফতোয়া ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়েছে সুবিশাল ফিকহগ্রন্থ ‘আল-মুদাওওয়ানাতুল কুবরা’।
১১. ওফাত:
ইলমে নববীর এই উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা ১৪ রবিউল আউয়াল ১৭৯ হিজরীতে (৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) ৮৬ বছর বয়সে মদীনা মুনাওয়ারায় ইনতিকাল করেন। মদীনার গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ তাঁর জানাযার নামাযে ইমামতি করেন এবং তাঁকে ঐতিহাসিক জান্নাতুল বাক্বী গোরস্থানে আম্মাজান আয়েশা (রা.)-এর কবরের সন্নিকটে দাফন করা হয়।
١٤- ما المراد بالموطأ؟ ولم سمّى ‘الموطأ’ بالموطأ؟ بين مكانة ‘الموطأ’ بين كتب الحديث مع ذكر خصائصه-
[১৪. মুয়াত্তা দ্বারা কী উদ্দেশ্য? মুয়াত্তা-কে কেন ‘মুয়াত্তা’ নামকরণ করা হয়েছে? হাদীসের কিতাবসমূহের মধ্যে মুয়াত্তার স্থান ও এর বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]
‘আল-মুয়াত্তা’ (الموطأ)-এর পরিচয়, নামকরণের কারণ, হাদীসগ্রন্থে এর সুউচ্চ স্থান ও প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. মুয়াত্তার পরিচয় (المراد بالموطأ):
- আভিধানিক অর্থ: ‘মুয়াত্তা’ (مُوَطَّأ) শব্দটি ‘ওয়াত্বা’ (وَطْءٌ) ধাতু থেকে ‘বাব তাফ’ঈল’ (تَفْعِيلٌ)-এর ইসমে মাফ’ঊল (اسم مفعول)। আরবি ভাষায় এর আভিধানিক অর্থ হলো— الْمُمَهَّدُ (আল-মুমাহহাদ) অর্থাৎ সহজ ও সুগমকৃত পথ, পরিপাটি, সুবিন্যস্ত ও সহজবোধ্য বস্তু। এছাড়া এর অপর অর্থ الْمُوافَقُ عَلَيْهِ (আল-মুওয়াফাক্বু আলাইহি) অর্থাৎ যার ওপর সর্বসম্মতভাবে মানুষ একমত পোষণ করেছে।
- পারিভাষিক অর্থ: হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘আল-মুয়াত্তা’ হলো— ইমামুল আইম্মাহ মালিক ইবনে আনাস (রহ.) কর্তৃক মদীনা মুনাওয়ারার প্রামাণ্য হাদীসে মারফূ, সাহাবায়ে কিরামের মাওকূফ আসার, তাবি’ঈগণের ফতোয়া এবং মদীনার নির্ভরযোগ্য আমলকে ফিকহী তারতীবে সুবিন্যস্ত করে সংকলিত সর্বপ্রথম প্রামাণ্য ও বিশুদ্ধতম হাদীসগ্রন্থ।
২. ‘মুয়াত্তা’ নামকরণের ঐতিহাসিক কারণ (سبب تسميته بالموطأ):
ইমাম মালিকের এই সংকলনকে ‘মুয়াত্তা’ নামকরণের পেছনে দুটি প্রধান ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে:
- ১. মদীনার ফকীহগণের ঐকমত্য লাভ (মৌলিক ঐতিহাসিক কারণ): ইমাম মালিক (রহ.) গ্রন্থটি রচনার পর মদীনা মুনাওয়ারার সত্তর (৭০) জন শীর্ষস্থানীয় আলিম ও ফকীহের সামনে তা পেশ করেছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই গ্রন্থটির বিশুদ্ধতা, ধারাবাহিকতা ও বিন্যাসের সাথে পূর্ণ একমত পোষণ করেছিলেন এবং প্রশংসা করেছিলেন। ইমাম মালিক নিজেই এ প্রসঙ্গে বলেন: «عَرَضْتُ كِتَابِي هَذَا عَلَى سَبْعِينَ فَقِيهًا مِنْ فُقَهَاءِ الْمَدِينَةِ، فَكُلُّهُمْ وَاطَأَنِي عَلَيْهِ، فَسَمَّيْتُهُ الْمُوَطَّأَ» অর্থাৎ “আমি আমার এই কিতাবটি মদীনার সত্তর জন ফকীহের সামনে পেশ করেছি, তাঁরা প্রত্যেকেই এর সাথে সহমত ও ঐকমত্য পোষণ করেছেন (ওয়াত্বা’আনী); এজন্যই আমি এর নাম রেখেছি ‘আল-মুয়াত্তা’ (ঐকমত্যভিত্তিক গ্রন্থ)।”
- ২. মানুষের জন্য দ্বীনের পথ সুগম ও সহজসাধ্য করা: খলীফা আবু জা’ফর মনসুর ইমাম মালিককে অনুরোধ করেছিলেন এমন একটি কিতাব রচনা করতে যাতে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর অতিরিক্ত ছাড় (রুহসাত) এবং ইবনে উমর (রা.)-এর অতিরিক্ত কঠোরতা পরিহার করে মধ্যমপন্থী বিশুদ্ধ রূপ সংকলিত হয়। ইমাম মালিক সাধারণ মানুষের আমলের সুবিধার জন্য হাদীস ও ফিকহের বিধানাবলীকে অত্যন্ত সুগম ও সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করেছেন বলে একে ‘মুয়াত্তা’ (সুগমকৃত) বলা হয়।
৩. হাদীস শাস্ত্রে মুয়াত্তার সুউচ্চ স্থান ও মর্যাদা (مكانة الموطأ بين كتب الحديث):
হাদীস সংকলনের ইতিহাসে ‘আল-মুয়াত্তা’ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম সংকলিত হওয়ার পূর্বে এটিই ছিল মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক বিশুদ্ধতম কিতাব। মুয়াত্তার মর্যাদা সম্পর্কে শীর্ষস্থানীয় ইমামগণের অভিমত:
- ইমাম শাফে’ঈ (রহ.)-এর ঐতিহাসিক সাক্ষ্য: ইমাম শাফে’ঈ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন: «مَا بَعْدَ كِتَابِ اللهِ كِتَابٌ أَصَحُّ مِنْ كِتَابِ مَالِكٍ» অর্থাৎ “আল্লাহর কিতাবের (কুরআনুল কারীম) পর ভূপৃষ্ঠে ইমাম মালিকের মুয়াত্তা অপেক্ষা বিশুদ্ধতর কোনো কিতাব নেই।”
- মুহাদ্দিসগণের মূল্যায়ন: ইমাম ইবনু আব্দিল বার্র (রহ.) বলেন, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের লেখকদ্বয় মূলত মুয়াত্তার বিশুদ্ধতার ভিত্তির ওপরই তাঁদের কিতাব নির্মাণ করেছেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থে হাদীসের কিতাবসমূহের স্তরবিন্যাসে মুয়াত্তা ও বুখারী-মুসলিমকে যৌথভাবে ‘প্রথম স্তর’ (الطبقة الأولى)-এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
৪. মুয়াত্তা ইমাম মালিকের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص الموطأ):
মুয়াত্তা গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- ১. স্বর্ণালী সনদ (سِلْسِلَةُ الذَّهَبِ): হাদীস শাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিশুদ্ধতম সনদ হলো— «مَالِكٌ عَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» (ইমাম মালিক সূত্রে নাফে’ থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে, তিনি নবীজী সা. থেকে)। মুহাদ্দিসীনগণ একে ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণালী সূত্রের সনদ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যার অসংখ্য বর্ণনা মুয়াত্তায় বিদ্যমান।
- ২. মারফূ, মাওকূফ ও মাক্বতূ হাদীসের অপূর্ব সমাবেশ: এতে কেবল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মারফূ হাদীসই নেই; বরং সাহাবায়ে কিরামের ফতোয়া (আসার) এবং তাবে’ঈগণের সিদ্ধান্তও সুবিন্যস্তভাবে সংকলিত হয়েছে।
- ৩. ‘আমলে আহলে মদীনা’র প্রাধান্য: ইমাম মালিক মদীনার আলেম ও সাধারণ মানুষের নিরবচ্ছিন্ন যৌথ আমলকে (عمل أهل المدينة) খবরে ওয়াহিদ অপেক্ষা শক্তিশালী দলীল মনে করতেন; মুয়াত্তায় তিনি সেই আমলকে ব্যাপকভাবে বিধৃত করেছেন।
- ৪. ফিকহী ধারায় সুসংবদ্ধ বিন্যাস: কিতাবটি ঈমান, ত্বহারাত, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, জিহাদ, ক্রয়-বিক্রয়, বিবাহ ইত্যাদি ফিকহী অধ্যায়ের ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ে প্রথমে মূল হাদীস, তারপর সাহাবীদের আমল এবং পরিশেষে ইমাম মালিকের স্বীয় ইজতিহাদী মতামত পেশ করা হয়েছে।
- ৫. চরম সতর্কতা ও সংক্ষেপায়ন: ইমাম মালিক প্রায় এক লক্ষ হাদীস মুখস্থ থাকার পরও কঠোর বাছাইয়ের মাধ্যমে মাত্র কয়েকশত বিশুদ্ধতম বর্ণনা মুয়াত্তায় স্থান দিয়েছেন। তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে এই গ্রন্থটির পরিমার্জন ও সংশোধন করেছেন।
١٥- اكتب نبذة من حياة الإمام محمد بن الحسن رحمه الله مع بيان ميزات كتابه ‘الموطأ’-
[১৫. ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান (রহ.)-এর জীবনবৃত্তান্ত এবং তাঁর ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।]
মুজতাহিদে মুত্বলাক ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.)-এর জীবনচরিত এবং তাঁর সংকলিত ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১. ভূমিকা:
ইসলামী ফিকহ সংকলন ও হাদীসের সাথে ফিকহের সমন্বয় সাধনে যে কয়জন ক্ষণজন্মা মনীষী চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের শীর্ষস্থানীয় হলেন ইমামুল মুতাকাল্লিমীন ওয়াল ফুকাহা হযরত ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.)। তিনি ইমামে আযম আবু হানীফা (রহ.)-এর অন্যতম প্রধান খলীফা ও ফিকহে হানাফীর প্রাতিষ্ঠানিক রূপকার।
২. নাম, বংশ ও জন্ম:
- নাম ও উপনাম: মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ইবনে ফারকাদ আশ-শায়বানী। উপনাম ‘আবু আব্দুল্লাহ’। শায়বান গোত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ায় তাঁকে ‘আশ-শায়বানী’ বলা হয়।
- জন্ম: তিনি ১৩২ হিজরীতে (৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠার সন্ধিক্ষণে ইরাকের ওয়াসিত নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র কুফায় স্থানান্তরিত হয়।
৩. জ্ঞানার্জন ও উস্তাদবৃন্দ:
তিনি বাল্যকালেই কুরআন হিফয করেন এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.): মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি ইমামে আযমের দারসে যুক্ত হন এবং তাঁর ওফাত পর্যন্ত চার বছর গভীর পাঠ গ্রহণ করেন।
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.): ইমাম আবু হানীফার ওফাতের পর তিনি প্রধান বিচারপতি ইমাম আবু ইউসুফের কাছে ফিকহ শাস্ত্রের পূর্ণতা অর্জন করেন।
- ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.): কুফার পাঠ চুকিয়ে তিনি পবিত্র মদীনায় গমন করেন এবং ইমাম মালিকের খেদমতে একটানা তিন বছর অবস্থান করে তাঁর মুখে সরাসরি ৭০০-এর অধিক হাদীস শ্রবণ করে ‘মুয়াত্তা’ সংকলন করেন।
- অন্যান্য উস্তাদ: সুফিয়ান আস-সাওরী, আওযাঈ, মিস’আর ইবনে কিদাম প্রমুখ।
৪. ফিকহ ও হাদীসে অবদান (জাহিরুর রিওয়ায়াহ):
ইমাম মুহাম্মদ ছিলেন ফিকহে হানাফীর প্রধান সংকলক ও গ্রন্থকার। হানাফী মাযহাবের মূল ভিত্তি যে ছয়টি প্রামাণ্য কিতাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত—যাকে «كُتُبُ ظَاهِرِ الرِّوَايَةِ» (কুতুবে জাহিরুর রিওয়ায়াহ) বলা হয়—তা সবই ইমাম মুহাম্মদের সংকলিত। গ্রন্থগুলো হলো: ১. আল-মাবসূত (আসল), ২. আল-জামে’উস সাগীর, ৩. আল-জামে’উল কাবীর, ৪. আস-সিয়ারুস সাগীর, ৫. আস-সিয়ারুল কাবীর, এবং ৬. আয-যিয়াদাত।
৫. প্রধান বিচারপতি (কাযিউল কুযাত):
খলীফা হারুনুর রশীদ তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও সুবিচারের প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে রাই প্রদেশের প্রধান কাজী এবং পরবর্তীতে সমগ্র মুসলিম সাম্রাজ্যের ‘কাযিউল কুযাত’ (Chief Justice) পদে নিযুক্ত করেন।
৬. ছাত্রবৃন্দ:
তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সর্বপ্রধান হলেন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফে’ঈ (রহ.)। ইমাম শাফে’ঈ স্বীকার করেছেন: “আমি ইমাম মুহাম্মদের কাছ থেকে এক উট বোঝাই কিতাবের সমপরিমাণ ইলম অর্জন করেছি; জ্ঞানের ক্ষেত্রে আমি তাঁর কাছে ঋণী।” এছাড়া ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, আসাদ ইবনুল ফুরাত প্রমুখ তাঁর ছাত্র ছিলেন।
৭. ওফাত:
ইমাম মুহাম্মদ ১৮৯ হিজরীতে (৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে) ৫৮ বছর বয়সে খলীফা হারুনুর রশীদের সাথে সফরকালে ইরানের রাই (বর্তমান তেহরানের নিকটবর্তী) নগরীতে ইনতিকাল করেন। একই দিনে প্রখ্যাত ব্যাকরণবিদ ইমাম কিসাঈও ইন্তিকাল করায় খলীফা হারুনুর রশীদ গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন: “আজ আমি রাই নগরীতে ফিকহ ও আরবী ভাষাকে দাফন করলাম।”
মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (ميزات موطأ الإمام محمد):
ইমাম মুহাম্মদ সংকলিত ‘আল-মুয়াত্তা’ হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রে এক অতুলনীয় গ্রন্থ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- ১. হাদীস ও ফিকহের অনবদ্য সমন্বয়: মুয়াত্তা ইমাম মালিক মূলত হাদীসের কিতাব হলেও মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ হলো বিশুদ্ধ হাদীসের সাথে তুলনামূলক ফিকহের (الفقه المقارن) এক অপূর্ব সংকলন। এতে প্রতিটি হাদীস বর্ণনার পর ফিকহী ইস্তিম্বাত ও সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে।
- ২. হানাফী মাযহাবের সুস্পষ্ট দলীলভিত্তিক মূল্যায়ন: প্রতিটি হাদীস উল্লেখের পর ইমাম মুহাম্মদ স্বীয় সিদ্ধান্ত যুক্ত করে বলেন: «قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهَذَا نَأْخُذُ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللهُ» (মুহাম্মদ বলেন: আমরা এই হাদীস অনুসারেই আমল করি এবং এটাই ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর অভিমত)। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, হানাফী মাযহাব বিশুদ্ধ হাদীসের ভিত্তিতেই গঠিত।
- ৩. আহলে হিজায ও আহলে ইরাকের জ্ঞানের মেলবন্ধন: ইমাম মুহাম্মদ মদীনার ইলম (আহলে হাদীসধারা) এবং কুফার ইলম (আহলে রায় ও কিয়াসধারা)-কে এক মোহনায় একত্রিত করেছেন। ইমাম মালিকের বর্ণনা পেশ করার পর যেখানে হানাফী ফতোয়ার ভিন্নতা রয়েছে, সেখানে কুফার অন্যান্য সাহাবী (যেমন ইবনে মাসউদ ও আলী রা.)-এর হাদীস পেশ করে যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
- ৪. আমালে আহলে মদীনার গঠনমূলক পর্যালোচনা: মদীনার কোনো আমল বা হাদীসের বিপরীতে যদি অন্য কোনো সহীহ মারফূ হাদীস শক্তিশালী হতো, তবে ইমাম মুহাম্মদ গভীর আদবের সাথে তার পর্যালোচনা পেশ করেছেন।
- ৫. সহজবোধ্যতা ও নির্ভরযোগ্য সনদ: ইমাম মালিক ও ইমাম মুহাম্মদের মধ্যকার সনদ ছিল সরাসরি ও মধ্যবর্তী মাধ্যমবিহীন (عالي الإسناد)। ইমাম মুহাম্মদ স্বয়ং একজন শীর্ষস্থানীয় মুজতাহিদ ফকীহ হওয়ায় তাঁর তাহকীক ও বর্ণনা ইসলামী আইনশাস্ত্রে অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।
١٦- أذكر نبذة من حياة الإمام البيهقى مع بيان مزايا كتابه ‘شعب الايمان’-
[১৬. ইমাম বায়হাকী (রহ.)-এর জীবনচরিত আলোচনা কর এবং তাঁর ‘শু’আবুল ঈমান’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্য বর্ণনা কর।]
মুহাদ্দিসুল উম্মাহ ইমাম আহমদ ইবনুল হুসাইন আল-বায়হাকী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত এবং তাঁর অমর সংকলন ‘শু’আবুল ঈমান’ (شعب الإيمان)-এর বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্য:
১. নাম, উপনাম, বংশ ও জন্ম:
- নাম ও উপনাম: আহমদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আলী ইবনে মূসা আল-খসরুজিরদী আল-বায়হাকী। উপনাম ‘আবু বকর’ (أَبُو بَكْرٍ)।
- জন্ম: তিনি শাবান মাস ৩৮৪ হিজরীতে (৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইরানের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত বায়হাকের ‘খসরুজিরদ’ নামক জনপদে জন্মগ্রহণ করেন। এ কারণে তাঁকে ‘আল-বায়হাকী’ বলা হয়।
২. ইলমী সফর ও উস্তাদবৃন্দ:
ইমাম বায়হাকী মাত্র পনেরো বছর বয়স থেকে ইলমে হাদীসের অন্বেষণে খোরাসান, নিশাপুর, বাগদাদ, কূফা, মক্কা ও মদীনা সফর করেন। তাঁর প্রধান উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন:
- ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রহ.): ‘আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন’-এর প্রণেতা; তিনি ছিলেন ইমাম হাকিমের শ্রেষ্ঠ ছাত্র।
- আবু আলী আর-রূযবারী ও আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামী (রহ.)।
- আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আল-ইস্পাহানী ও হিলাল ইবনে মুহাম্মদ আল-হাফ্ফার (রহ.)।
৩. ফিকহ ও আকীদাগত অবস্থান:
ইমাম বায়হাকী ছিলেন শাফে’ঈ মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় ফকীহ এবং আহলে সুন্নাতের আশ’আরী ধারার প্রখ্যাত ইমাম। ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনী (রহ.) তাঁর সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক উক্তি করেছেন: “পৃথিবীর এমন কোনো শাফে’ঈ নেই যার ওপর ইমাম শাফে’ঈর অনুগ্রহ নেই; কেবল ইমাম বায়হাকী ছাড়া, কেননা ইমাম শাফে’ঈর মাযহাবকে সুদৃঢ় দলীল ও কিতাবের মাধ্যমে সমর্থন করে ইমাম বায়হাকী উল্টো ইমাম শাফে’ঈর ওপর বিরাট অনুগ্রহ করেছেন!”
৪. প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলী:
তিনি প্রায় এক সহস্রাধিক কিতাব ও পুস্তিকা রচনা করেছেন। তাঁর প্রধান অমর গ্রন্থসমূহ:
- আস-সুনানুল কুবরা (السُّنَنُ الْكُبْرَى): দশ খণ্ডে সমাপ্ত হাদীসের সর্ববৃহৎ ফিকহী সংকলন।
- শু’আবুল ঈমান (شُعَبُ الإِيمَانِ): ঈমানের শাখাসমূহের সুবিশাল বিশ্বকোষ।
- মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার: শাফে’ঈ মাযহাবের প্রমাণপঞ্জী।
- দালাইলুন নবুওয়াত (دَلَائِلُ النُّبُوَّةِ): সীরাত ও মুজিযার প্রামাণ্য কিতাব।
- আল-আসমা ওয়াস সিফাত (الأَسْمَاءُ وَالصِّفَاتُ): আল্লাহর নাম ও গুণের প্রামাণিক আকীদা।
৫. চরিত্র ও ওফাত:
তিনি ছিলেন চরম পরহেযগার, নির্লোভ ও যুহদের প্রতীক। দীর্ঘ ত্রিশ বছর তিনি রোযা পালন করেছেন। অবশেষে ১০ জুমাদাল উলা ৪৫৮ হিজরীতে (১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দে) নিশাপুরে ৭৪ বছর বয়সে এই মহান ইমাম ইন্তিকাল করেন এবং বায়হাকে এনে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
‘শু’আবুল ঈমান’ (شعب الإيمان) গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্য (مزايا كتاب شعب الإيمان):
ইমাম বায়হাকীর ‘শু’আবুল ঈমান’ ইসলামী সাহিত্যের এক অতুলনীয় কালজয়ী রচনা। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:
- ১. সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে বিন্যাস: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপ্রসিদ্ধ হাদীস: «الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ شُعْبَةً» (ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে)—এই হাদীসকে মূল কাঠামো ধরে ইমাম বায়হাকী কুরআন ও সুন্নাহর গভীর গবেষণার মাধ্যমে ঈমানের ৭৭টি মৌলিক শাখা (شعبة) নির্ধারণ করেছেন এবং প্রত্যেকটি শাখার অধীনে প্রাসঙ্গিক হাদীস ও আসার সংকলন করেছেন।
- ২. জীবনের সর্বাঙ্গীন দিকের পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ: গ্রন্থটিতে কেবল তাত্ত্বিক আকীদা নয়; বরং একজন মানুষের ব্যক্তিগত পবিত্রতা, নামায-রোযা, লেনদেন, সততা, পিতা-মাতার খেদমত, প্রতিবেশীর অধিকার, জিহাদ, দানশীলতা, রোগীর সেবা, শোকর, তাওয়াক্কুল এবং অন্তরের আত্মশুদ্ধি পর্যন্ত সামগ্রিক দ্বীনিয়াতকে ঈমানের বিভিন্ন শাখা হিসেবে প্রমাণ করা হয়েছে।
- ৩. সনদ ও মতনসহ বর্ণনার বিশাল সমাবেশ: এতে সংকলিত হাদীসের সংখ্যা প্রায় দশ হাজারেরও অধিক। প্রতিটি হাদীসের পূর্ণ সনদ উল্লেখ করার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে হাদীসের রাবী ও বিশুদ্ধতার মান (সহীহ, হাসান বা জয়ীফ) বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
- ৪. তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ আধার: গ্রন্থটিতে সালাফে সালিহীন, তাবে’ঈন এবং বিশিষ্ট সুফী-সাধকগণের হিকমতপূর্ণ নসীহত ও চরিত্র গঠনমূলক ঘটনা সন্নিবেশিত হয়েছে, যা মানুষের অন্তরে তাকওয়া ও খোদাভীতি সৃষ্টিতে অসাধারণ ভূমিকা রাখে।
- ৫. সহজ সংস্করণ ও প্রভাব: পরবর্তীকালে ইমাম আল-ক্বাযবীনী (রহ.) ‘মুখতাসারু শু’আবুল ঈমান’ নামে এর একটি চমৎকার সারসংক্ষেপ রচনা করেন, যা বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। গ্রন্থটি মুসলিম উম্মাহকে এ শিক্ষা দেয় যে, ধর্মীয় অনুশাসন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; বরং প্রতিটি নৈতিক সদ্গুণই ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. মুয়াত্তা ইমাম মালিক ও মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
মুয়াত্তা ইমাম মালিক হলো মদীনার সনদে সংকলিত হাদীস, আসার ও মদীনার আলেমদের ঐকমত্যভিত্তিক আমলের মৌলিক গ্রন্থ। পক্ষান্তরে মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ হলো ইমাম মালিকের নিকট থেকে সরাসরি পঠিত ও শ্রুত সেই মুয়াত্তারই একটি বিশেষ রিওয়ায়াত, যাতে ইমাম মুহাম্মদ প্রতিটি হাদীস বর্ণনার পর হানাফী ফিকহী মূলনীতি, ইমাম আবু হানীফার রায় এবং আহলে ইরাকের দলীলাদি দ্বারা হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গির গভীর বিশ্লেষণ ও সমন্বয় যুক্ত করেছেন।
২. ইমাম শাফে’ঈ (রহ.) কেন বলেছিলেন: “কিতাবুল্লাহর পর পৃথিবীতে মুয়াত্তা অপেক্ষা বিশুদ্ধতর কোনো কিতাব নেই”?
ইমাম শাফে’ঈ (রহ.) এই উক্তিটি করেছিলেন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম রচিত হওয়ার পূর্বে। কারণ তৎকালীন সময়ে লিখিত হাদীসগ্রন্থসমূহের মধ্যে ইমাম মালিকের মুয়াত্তা ছিল সর্বাধিক যাচাই-বাছাইকৃত, প্রামাণিক এবং ত্রুটিমুক্ত। এর সনদসমূহের বিশ্বস্ততা ও শর্তাবলীর কঠোরতা তৎকালীন সমগ্র মুসলিম জাহানের যে কোনো গ্রন্থের চেয়ে উন্নত ছিল।
৩. ইমাম বায়হাকীর ‘শু’আবুল ঈমান’ গ্রন্থে ঈমানের কতটি শাখা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর ভিত্তি কী?
ইমাম বায়হাকীর ‘শু’আবুল ঈমান’ গ্রন্থে ঈমানের মোট ৭৭টি শাখা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ভিত্তি হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী: «الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ شُعْبَةً» অর্থাৎ ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে; যার সর্বোচ্চ শাখা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বনিম্ন শাখা পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। ইমাম বায়হাকী কুরআন ও হাদীসের সামগ্রিক বিধানাবলী বিশ্লেষণ করে এই ৭৭টি শাখা বিন্যস্ত করেছেন।
৪. মুয়াত্তা ইমাম মালিক কি সিহাহ সিত্তাহ বা কুতুবে সিত্তার অন্তর্ভুক্ত?
মুয়াত্তা ইমাম মালিকের অসাধারণ বিশুদ্ধতার কারণে ইমাম ইবনুল আছীর ও ইমাম রযীনসহ মাগরিবের বহু শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস সুনানে ইবনে মাজাহর পরিবর্তে মুয়াত্তা ইমাম মালিককে কুতুবে সিত্তাহর ষষ্ঠ কিতাব হিসেবে গণ্য করেছেন। যদিও মাশরিক্বের জমহুর মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে ইবনে মাজাহ ষষ্ঠ কিতাব, তবুও সনদের নির্ভরযোগ্যতার বিচারে মুয়াত্তা ইমাম মালিক সুনানের কিতাবসমূহের চেয়েও অগ্রগণ্য।
৫. ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষে দিরাসাতুল হাদীস-১ অধ্যয়নের মূল তাৎপর্য কী?
দিরাসাতুল হাদীস-১ অধ্যয়নের মূল তাৎপর্য হলো শিক্ষার্থীদের হাদীসের প্রাচীনতম ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ দুটি ধারা— ইমাম মালিকের মাধ্যমে হিজাযী মুহাদ্দিসীনদের ধারা এবং ইমাম মুহাম্মদের মাধ্যমে ফুকাহায়ে ইরাকের ধারার সাথে সরাসরি পরিচিত করানো। একই সাথে ইমাম বায়হাকীর ‘শু’আবুল ঈমান’-এর মাধ্যমে হাদীসের শিক্ষাকে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের নৈতিক, আত্মশুদ্ধিমূলক ও ব্যবহারিক অঙ্গনে প্রয়োগ করার পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডিত্য অর্জন করা।
উপসংহার
ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষের ‘দিরাসাতুল হাদীস-১’ (বিষয় কোড: ২০২৮০৬) পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ভারসাম্যপূর্ণ। এই প্রশ্নপত্রে মুয়াত্তা ইমাম মালিক, মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ এবং শু’আবুল ঈমান লিল-বায়হাকী—হাদীস সাহিত্যের এই তিনটি শীর্ষস্থানীয় প্রামাণ্য উৎসের ওপর ভিত্তি করে ইলমে হাদীস ও ফিকহের মৌলিক গবেষণাধর্মী প্রশ্ন সন্নিবেশিত হয়েছে। এখানে সংকলিত উত্তরমালা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের পাশাপাশি হাদীসের বিশ্লেষণাত্মক পাঠ ও ফিকহী ইস্তিম্বাতের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশনা প্রদান করবে।