জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতুল হাদীস-২ (Dirasatul Hadith-2) – ২০২৮০৭, আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১৯৪ মিনিট পড়ার সময়
১৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২৬
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۲
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث-٢
[দিরাসাতুল হাদীস-২]
বিষয় কোড: ২০২৮০৭
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (الف) وعن إثنين من مجموعة (ب) وعن إثنين من مجموعة (ج) وعن إثنين من مجموعة (د)- الأعداد بالهامش تدل على الدرجات كاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিটি বিভাগ থেকে ২টি করে মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হলেও পরীক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ ও সমৃদ্ধ একাডেমিক প্রস্তুতির লক্ষ্যে নিম্নে প্রশ্নপত্রের চারটি বিভাগের মোট ১৬টি প্রশ্নেরই গভীর তাত্ত্বিক ও রেফারেন্সভিত্তিক নির্ভুল সমাধান উপস্থাপন করা হলো।]


مجموعة (الف) — صحيح ابن حبان (সহীহ ইবনে হিব্বান)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


١- أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْحَسَنِ بْنِ قُتَيْبَةَ اللَّخْمِيُّ بِعَسْقَلَانَ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي السَّرِيِّ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) قَالَ: سَأَلَ رَجُلٌ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ! أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «الْإِيمَانُ بِاللهِ»، قَالَ: ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ: «ثُمَّ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ»، قَالَ: ثُمَّ مَاذَا؟ قَالَ: «ثُمَّ حَجٌّ مَبْرُورٌ»-

[১. মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবনে কুতায়বা আল-লাখমী আসক্বালানে আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন ইবনু আবিস সারী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আব্দুর রাযযাক আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন মা’মার আমাদের যুহরী থেকে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে, তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল: হে আল্লাহর রাসূল! কোন আমলটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন: আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা। সে বলল: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: অতঃপর আল্লাহর পথে জিহাদ করা। সে নিবেদন করল: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: অতঃপর কবুল হজ্জ (হজ্জে মাবরূর)।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ পরিচিতি

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করল: হে আল্লাহর রাসূল! সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি ইরশাদ করলেন: “আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান আনা।” সে আরজ করল: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: “অতঃপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।” সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল: তারপর কোনটি? নবীজী (সা.) ইরশাদ করলেন: “অতঃপর হজ্জে মাবরূর (নিষ্পাপ ও মকবুল হজ্জ)।”

হাদীসের রাবী ও সনদ বিশ্লেষণ:

  • ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.): গ্রন্থের সংকলক, প্রখ্যাত হাফিযে হাদীস আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আত-তামীমী আল-বুসতী (মৃত্যু ৩৫৪ হিজরী)।
  • মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ইবনে কুতায়বা আল-লাখমী: আসক্বালানের বিশ্বস্ত মুহাদ্দিস ও ইবনে হিব্বানের অন্যতম শীর্ষ উস্তাদ।
  • ইবনু আবিস সারী: মুহাম্মদ ইবনু আবিস সারী আল-আসকালানী, নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী।
  • আব্দুর রাযযাক আস-সান’আনী: সুবিখ্যাত ‘মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক’-এর প্রণেতা (১২৬-২১১ হিজরী)।
  • মা’মার ইবনে রাশিদ: বসরার শীর্ষস্থানীয় হাফিযে হাদীস ও ইমাম যুহরীর বিশিষ্ট ছাত্র।
  • ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরী: মদীনার শীর্ষস্থানীয় তাবে’ঈ ও হাদীস সংকলনের অগ্রদূত।
  • সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব: ফুকাহায়ে সাব’আ বা মদীনার সাত ফকীহের অন্যতম প্রধান সাইয়্যিদুত তাবে’ঈন।
  • হযরত আবু হুরায়রা (রা.): সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী প্রখ্যাত জলীলুল কদর সাহাবী।

হাদীসের শব্দার্থ ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

  • أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ: কোন আমলটি সর্বাধিক সাওয়াব ও মর্যাদাপূর্ণ? ‘আফদ্বাল’ হলো ইসমে তাফযীল, যা আতিশয্য ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে।
  • الْإِيمَانُ بِاللهِ: আল্লাহর অস্তিত্ব, তাওহীদ ও সিফাতে আন্তরিক বিশ্বাস এবং মুখে স্বীকৃতি। সমস্ত সৎকাজের ভিত্তি হলো ঈমান; ঈমান ব্যতীত কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়।
  • حَجٌّ مَبْرُورٌ: পুণ্যময়, কবুলকৃত ও পাপমুক্ত হজ্জ।

(الف) ما الحج المبرور؟ بين أراء العلماء مفصلا-

হজ্জে মাবরূরের পরিচয় ও উলামায়ে কিরামের বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

১. হজ্জে মাবরূরের আভিধানিক অর্থ:

‘মাবরূর’ (مَبْرُورٌ) শব্দটি আরবি ‘আল-বির্র’ (الْبِرُّ) ধাতু থেকে ইসমে মাফ’ঊল (اسم مفعول)। ‘বির্র’ শব্দের অর্থ হলো— পুণ্য, আনুগত্য, সততা, আন্তরিকতা, কল্যাণ ও একনিষ্ঠতা। অতএব আভিধানিক অর্থে ‘হজ্জে মাবরূর’ হলো এমন হজ্জ যাতে পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য ও পুণ্য সাধিত হয়েছে এবং যা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়েছে।

২. হজ্জে মাবরূরের পারিভাষিক রূপ ও উলামায়ে কিরামের অভিমতসমূহ:

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় হজ্জে মাবরূরের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসীন ও ফকীহগণের সুনির্দিষ্ট বক্তব্যসমূহ নিম্নরূপ:

  • ইমাম কুরতুবী ও নববী (রহ.)-এর অভিমত: হজ্জে মাবরূর হলো— «الَّذِي لَا يُخَالِطُهُ إِثْمٌ» অর্থাৎ যে হজ্জের মধ্যে কোনো প্রকার গুনাহ, পাপাচার ও শরীয়তবিরোধী ত্রুটির সংমিশ্রণ ঘটেনি। পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: «فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে হজ্জের সংকল্প করে, তার জন্য হজ্জ চলাকালীন স্ত্রী-সম্ভোগ (বা অশ্লীলতা), পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৯৭)। হজ্জের পুরো সফরে এই শর্তসমূহ পূর্ণাঙ্গভাবে অক্ষুণ্ণ রাখাই হলো হজ্জে মাবরূর।
  • সম্পদের হালাল হওয়া (ইমাম আহমাদ ও ইবনে হাজার): যে হজ্জ সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র উপার্জনের অর্থ দিয়ে সম্পাদন করা হয়। হারাম বা সন্দেহযুক্ত সম্পদ দিয়ে হজ্জ করলে তা হজ্জে মাবরূর হয় না। হাদীসে এসেছে, হারাম মালের হজ্জকারী যখন বলে ‘লাব্বায়িক’, তখন আসমান থেকে ঘোষণা আসে: ‘লা লাব্বায়িকা ওয়া লা সা’দায়িক’ (তোমার হজ্জ কবুল নয়)।
  • ইখলাস ও রিয়ামুক্ত হওয়া (ইবনুল কাইয়্যিম রহ.): যে হজ্জে লোকদেখানো মনোভাব (রিয়া), খ্যাতি অর্জনের লিপ্সা (সুম’আ) বা জাগতিক কোনো উদ্দেশ্য থাকে না; বরং কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মাগফিরাত কামনায় নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন হয়।
  • হাদীসে নববীর প্রত্যক্ষ তাফসীর: সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন: «مَا بِرُّ الْحَجِّ يَا رَسُولَ اللهِ؟» (হে আল্লাহর রাসূল! হজ্জের পুণ্য বা মাবরূর হওয়ার লক্ষণ কী?)। রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তরে ইরশাদ করেছিলেন: «إِطْعَامُ الطَّعَامِ، وَإِفْشَاءُ السَّلَامِ (وفي رواية: وَطِيبُ الْكَلَامِ)» অর্থাৎ “ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করা, শান্তির বিস্তার (সালাম) ঘটানো এবং মানুষের সাথে উত্তম ও বিনম্র ভাষায় কথা বলা” (মুসনাদে আহমাদ, মুস্তাদরাকে হাকিম)।
  • হাসান বসরী (রহ.)-এর বিশ্লেষণ (হজ্জ কবুল হওয়ার জীবন্ত আলামত): প্রখ্যাত তাবে’ঈ হাসান বসরী (রহ.) বলেন: «الْحَجُّ الْمَبْرُورُ أَنْ يَرْجِعَ زَاهِدًا فِي الدُّنْيَا، رَاغِبًا فِي الْآخِرَةِ» অর্থাৎ “হজ্জে মাবরূর হলো— হজ্জ সমাপ্ত করে বান্দা এমন অবস্থায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবে যে, সে পার্থিব মোহ বর্জনকারী এবং আখিরাতের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হবে।” অর্থাৎ হজ্জের পর ব্যক্তির পূর্ববর্তী অন্যায় স্বভাব পরিবর্তিত হয়ে জীবন পরিশুদ্ধ ও তাকওয়াপূর্ণ হওয়াই হলো হজ্জ মাবরূর হওয়ার বাস্তব প্রমাণ।

৩. হজ্জে মাবরূরের সুমহান ফযিলত:

সহীহ হাদীসে হজ্জে মাবরূরের দুটি অতুলনীয় প্রতিদানের কথা ঘোষিত হয়েছে:

  • সরাসরি জান্নাত লাভ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «وَالْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّةُ» অর্থাৎ “আর হজ্জে মাবরূরের একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।
  • নিষ্পাপ জীবনের শুভ সূচনা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمَ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ করল এবং কোনো অশ্লীলতা ও গুনাহে লিপ্ত হলো না, সে তার মাতৃগর্ভ থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ নিষ্পাপ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে প্রত্যাবর্তন করে” (সহীহ বুখারী: ১৫২১)।

٢- أَخْبَرَنَا الْحَسَنُ بْنُ سُفْيَانَ حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللهِ بْنُ مُعَاذٍ الْعَنْبَرِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا أَبِي قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ عَنْ قَتَادَةَ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ بِاللهِ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ»-

[২. আল-হাসান ইবনে সুফিয়ান আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন উবাইদুল্লাহ ইবনে মু’আয আল-আনবারী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আমার পিতা আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন শু’বাহ ক্বাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “তোমাদের কেউ আল্লাহর প্রতি প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার (মুসলিম) ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত (পরিপূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই ভালোবাসবে ও পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য ভালোবাসে ও পছন্দ করে।”

হাদীসের তাৎপর্য ও ব্যাকরণিক তাহকীক:

  • لَا يُؤْمِنُ: এর বাহ্যিক অর্থ ‘ঈমান আনেনি’। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের উসূল অনুযায়ী এখানে নফিয়ে কামালিয়াত (نفي الكمال لا نفي الأصل) উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সে পূর্ণাঙ্গ, খাঁটি ও মর্যাদাবান মুমিন হতে পারবে না; এর দ্বারা তাকে কাফির বা ইসলামত্যাগী বোঝানো হয়নি।
  • لِأَخِيهِ: তার ভাইয়ের জন্য। এর দ্বারা সর্বাগ্রে দ্বীনী মুসলিম ভাই উদ্দেশ্য, এবং ব্যাপক অর্থে সমগ্র মানবজাতিও শামিল (যাতে অমুসলিমদের জন্যও হিদায়েত ও কল্যাণ কামনা করা অন্তর্ভুক্ত)।
  • مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ: যা সে নিজের জন্য ভালোবাসে; অর্থাৎ সুখ, শান্তি, সম্মান, নিরাপত্তা, সুস্থতা, জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।

(الف) اشرح قوله صلى الله عليه وسلم “حتى يحب لأخيه ما يحب لنفسه”-

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণী “حتى يحب لأخيه ما يحب لنفسه”-এর বিশদ ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য:

১. ইসলামী সমাজব্যবস্থা ও নৈতিকতার সুবর্ণ মূলনীতি:

এই হাদীসটি ইসলামের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনের এক অনন্য ভিত্তিপ্রস্তর। ইমাম নববী (রহ.) তাঁর ‘শারহু সহীহ মুসলিম’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এই হাদীসটি ইসলামের মৌলিক চার বা পাঁচটি হাদীসের একটি, যার ওপর ইসলামের সামগ্রিক আখলাক ও মু’আমালাত প্রতিষ্ঠিত। মানব মনের সহজাত প্রবৃত্তি হলো আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা। ইসলাম বান্দার আত্মাকে এমনভাবে পরিশুদ্ধ করে যাতে সে নিজেকে অপরের অবস্থানে কল্পনা করতে পারে এবং নিজের জন্য যে কল্যাণ প্রত্যাশা করে, অপরের জন্যও ঠিক সেই পরিমাণ আন্তরিক কল্যাণ কামনা করতে পারে।

২. এই ভালোবাসার পরিধি ও বাস্তব রূপরেখা:

হাফিয ইবনে রজব হাম্বলী (রহ.) তাঁর ‘জামে’উল উলূমি ওয়াল হিকাম’ গ্রন্থে এই হাদীসের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র নির্দেশ করেছেন:

  • ১. দ্বীনী ও আত্মিক কল্যাণ কামনা: একজন মুমিন নিজের জন্য যেভাবে কুফর ও শিরকমুক্ত খাঁটি ঈমান, তাকওয়া, গুনাহের ক্ষমা, কবরের শান্তি ও জান্নাত প্রত্যাশা করে; ঠিক তেমনিভাবে তার অপর ভাইয়ের জন্যও ঈমানের অবিচলতা, সৎপথের দিশা ও আখিরাতের মুক্তি ঐকান্তিকভাবে কামনা করবে। এমনকী পথভ্রষ্ট ব্যক্তির জন্য অন্তরে হেদায়েতের প্রার্থনা করবে।
  • ২. পার্থিব সুখ ও শান্তি কামনা: নিজের জান-মাল, পরিবার, সম্মান ও রিযিকের ক্ষেত্রে যে নিরাপত্তা ও বরকত একজন মানুষ নিজে চায়, সমাজে বসবাসকারী সকল মুসলমানের জন্যও সেই নিরাপত্তা ও উন্নতি কামনা করবে। কারো কোনো ক্ষতি হলে নিজের ক্ষতি মনে করে ব্যথিত হবে।
  • ৩. অপছন্দনীয় ও ক্ষতিকর বিষয় প্রতিরোধ: হাদীসের বিপরীত অর্থ (মফহূমে মুখালাফাত) হলো— একজন মুমিন নিজের জন্য যে অপমান, দুঃখ, ক্ষতি, অসুস্থতা ও অন্যায়কে ঘৃণা করে, তার অপর কোনো মুসলিম ভাইয়ের ওপর সেই বিপদ পতিত হোক তা সে কখনোই সহ্য করবে না।

৩. অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ (হাসাদ) ও অহমিকা বিনাশ:

নিজের মতো অপরকে ভালোবাসা কেবল তখনই সম্ভব, যখন মানুষের অন্তর ‘হাসাদ’ (পরশ্রীকাতরতা), লোভ, ঘৃণা ও অহংকার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। হাসাদ হলো এমন এক মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি যা অন্যের কল্যাণ দেখে অন্তরে জ্বালা সৃষ্টি করে এবং অন্যের নিয়ামত ধ্বংস কামনা করে। আলোচ্য হাদীসে আমল করার মাধ্যমে বান্দা যখন অপরের সৌভাগ্যে আনন্দিত হতে শেখে, তখন অন্তরের হিংসা সমূলে নির্মূল হয়ে যায় এবং দিল আল্লাহর নূরে আলোকিত হয়।

৪. সমাজ জীবনে এই হাদীসের প্রায়োগিক প্রভাব:

  • ব্যবসায়-বাণিজ্যে সততা: বিক্রেতা নিজের জন্য ভেজালমুক্ত ভালো পণ্য পেতে ভালোবাসে; অতএব সে ক্রেতাকে কখনো ঠকাবে না, পরিমাপে কম দেবে না বা মিথ্যা বলবে না।
  • পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব: সাহাবায়ে কিরামের উজ্জ্বল উদাহরণ হলো আনসার সাহাবীগণ, যাঁরা হিজরতকারী মুহাজির ভাইদের জন্য নিজেদের ধন-সম্পদ ও আবাসস্থল দ্বিধাহীন চিত্তে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে তাঁদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে: «وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ» অর্থাৎ “তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত ছিল” (সূরা আল-হাশর: ৯)।

٣- أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ مُحَمَّدٍ الْأَزْدِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ قَالَ حَدَّثَنَا جَعْفَرُ بْنُ عَوْنٍ قَالَ حَدَّثَنِي ابْنُ إِسْحَاقَ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ التَّيْمِيِّ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخِيَارِكُمْ؟» قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ! قَالَ: «أَطْوَلُكُمْ أَعْمَارًا وَأَحْسَنُكُمْ أَخْلَاقًا»-

[৩. আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-আযদী আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন ইসহাক ইবনে ইব্রাহীম আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন জাফর ইবনে আউন আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইবনে ইসহাক আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহীম আত-তায়মী থেকে, তিনি আবু সালামা থেকে, তিনি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মধ্যকার সর্বোত্তম ব্যক্তিদের সংবাদ দেব না?” সাহাবীগণ নিবেদন করলেন: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি ইরশাদ করলেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে বয়সে দীর্ঘজীবী এবং চরিত্রে সর্বাধিক উত্তম।”]

হাদীসের ভাবার্থ ও রাবী পরিচয়:

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত করব না?” সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন: অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি ইরশাদ করলেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সেই ব্যক্তি, যার আয়ু দীর্ঘ এবং যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।”

হাদীসের গভীর প্রজ্ঞা: দীর্ঘায়ু লাভ করা তখনই মানুষের জন্য সৌভাগ্যের কারণ হয়, যখন তা নেক আমল, আল্লাহর আনুগত্য ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে অতিবাহিত হয়। দীর্ঘ জীবন যদি পাপ ও জুলুমে কাটে, তবে তা শাস্তির কারণ হয়। পক্ষান্তরে দীর্ঘায়ুর সাথে যদি সুন্দর আখলাক ও তাকওয়া যুক্ত হয়, তবে সে ব্যক্তি আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদায় ভূষিত হয়।

(الف) تحدث عن اهمية حسن الخلق في ضوء الحديث-

আলোচ্য হাদীসের আলোকে ‘হুসনুল খুলুক্ব’ বা উত্তম চরিত্রের অপরিসীম গুরুত্ব:

১. উত্তম চরিত্র (حسن الخلق)-এর স্বরূপ ও অর্থ:

ইসলামের পরিভাষায় ‘হুসনুল খুলুক্ব’ হলো মানুষের অন্তরের সেই অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও সুষম স্বভাব, যার প্রভাবে বাহ্যিকভাবে স্বতঃস্ফূর্ত ও মার্জিত আচরণ প্রকাশ পায়। ইমাম হাসান বসরী (রহ.) উত্তম চরিত্রের তিনটি বাস্তব লক্ষণ উল্লেখ করেছেন: «كَفُّ الأَذَى، وَبَذْلُ النَّدَى، وَطَلَاقَةُ الْوَجْهِ» অর্থাৎ কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা, অকাতরে দান ও পরোপকার করা এবং সর্বদা হাসিমুখে প্রফুল্লতার সাথে মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করা।

২. কুরআন ও হাদীসের আলোকে উত্তম চরিত্রের মর্যাদা:

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে উত্তম চরিত্র নিছক কোনো লৌকিক ভদ্রতা নয়; বরং তা ঈমানের সর্বাধিক প্রামাণ্য বহিঃপ্রকাশ। নিম্নে এর প্রধান তাৎপর্যসমূহ আলোচনা করা হলো:

  • ১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য: বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় রিসালাতের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঘোষণা করে ইরশাদ করেন: «إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ» অর্থাৎ “আমি তো কেবল মহৎ ও সুন্দর চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের উদ্দেশ্যেই প্রেরিত হয়েছি” (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, মুসনাদে আহমাদ)। স্বয়ং মহান আল্লাহ কুরআনে তাঁর চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন: «وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ» অর্থাৎ “নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত” (সূরা আল-ক্বলম: ৪)।
  • ২. মীযানের পাল্লায় সর্বাধিক ভারী আমল: কিয়ামতের ময়দানে যে আমলটি বান্দার সাওয়াবের পাল্লাকে সবচেয়ে বেশি ভারী করবে, তা হলো উত্তম চরিত্র। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «مَا مِنْ شَيْءٍ أَثْقَلُ فِي مِيزَانِ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ» অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় উত্তম চরিত্র অপেক্ষা ভারী আর কোনো বস্তু রাখা হবে না” (জামে তিরমিযী: ২০০২)।
  • ৩. আখিরাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকটতম নৈকট্য লাভ: হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا» অর্থাৎ “কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার সর্বাধিক প্রিয় এবং মজলিসের দিক থেকে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী ব্যক্তি হবে সে, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর” (জামে তিরমিযী: ২০১৮)।
  • ৪. দিবাভাগে রোযাদার ও রাত্রিকালীন তাহাজ্জুদগুজারের সমতুল্য সাওয়াব: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُدْرِكُ بِحُسْنِ خُلُقِهِ دَرَجَةَ الصَّائِمِ الْقَائِمِ» অর্থাৎ “নিশ্চয় একজন মুমিন তার সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে দিনে অনবরত রোযাদার এবং রাতে অবিরাম নামাযে দণ্ডায়মান ব্যক্তির সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করতে পারে” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৯৮)।
  • ৫. জান্নাতের সর্বোচ্চ প্রাসাদের নিশ্চয়তা: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «وَأَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي أَعْلَى الْجَنَّةِ لِمَنْ حَسُنَ خُلُقُهُ» অর্থাৎ “আর যে ব্যক্তি স্বীয় চরিত্রকে সুন্দর করবে, আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ চূড়ায় একটি সুরম্য প্রাসাদের দায়িত্ব গ্রহণ করছি” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০০)।

৩. দীর্ঘায়ু ও সুন্দর চরিত্রের সমন্বয়:

আলোচ্য হাদীসে নবীজী (সা.) দীর্ঘায়ু এবং সুন্দর চরিত্রের সমন্বয়কে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বানিয়েছেন। দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি দিন যখন সুন্দর আচার-ব্যবহার, পিতা-মাতার সেবা, প্রতিবেশীর হক আদায়, দুর্বলকে সাহায্য এবং ক্ষমার মাধ্যমে অতিবাহিত হয়, তখন বান্দা কোটি কোটি সাওয়াবের অধিকারী হয়ে আল্লাহর ওলীগণের কাতারে শামিল হয়।


٤- أَخْبَرَنَا عُمَرُ بْنُ مُحَمَّدٍ الْهَمَدَانِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو الرَّبِيعِ سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ عَنْ حَمَّادِ بْنِ زَيْدٍ قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ وَهْبٍ قَالَ أَخْبَرَنِي اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ عَنْ خَالِدِ بْنِ يَزِيدَ عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي هِلَالٍ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الْحَيَاءُ مِنَ الْإِيمَانِ وَالْإِيمَانُ فِي الْجَنَّةِ، وَالْبَذَاءُ مِنَ الْجَفَاءِ وَالْجَفَاءُ فِي النَّارِ»-

[৪. উমর ইবনে মুহাম্মদ আল-হামাদানী আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন আবু রবী’ সুলায়মান ইবনে দাউদ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনে যায়দ থেকে, তিনি বলেন ইবনে ওয়াহাব আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন লায়স ইবনে সা’দ আমাকে খালেদ ইবনে ইয়াযীদ থেকে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি সাঈদ ইবনু আবি হিলাল থেকে, তিনি আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে, তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমানের স্থান জান্নাতে; আর অশ্লীলতা নির্দয়তা ও কঠোরতার অংশ এবং নির্দয়তার স্থান জাহান্নামে।”]

হাদীসের অনুবাদ ও শব্দার্থ:

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “লজ্জাশীলতা (হায়া) ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর ঈমানের পরিণতি হলো জান্নাত। পক্ষান্তরে অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা হলো কঠোরতা ও অবাধ্যতার অংশ, আর কঠোরতা ও অবাধ্যতার পরিণতি হলো জাহান্নাম।”

হাদীসের শব্দার্থ ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

  • الْحَيَاءُ (আল-হায়া): লজ্জা, সংকোচবোধ ও আত্মমর্যাদা। এটি অন্তরের এমন এক মহৎ বৃত্তি যা মানুষকে সকল প্রকার অন্যায়, অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর হক ও বান্দার হক আদায়ে সচেষ্ট করে।
  • الْبَذَاءُ (আল-বাযা): অশ্লীলতা, নির্লজ্জ কথাবার্তা, গালিগালাজ এবং কুরুচিপূর্ণ আচরণ।
  • الْجَفَاءُ (আল-জাফা): অন্তরের রুক্ষতা, কঠোরতা, অবাধ্যতা ও সত্যের প্রতি অনীহা।

(ألف) بين أهمية الحياء فى حياة المسلم-

মুসলিম জীবনে হায়া বা লজ্জাশীলতার অপরিহার্য গুরুত্ব ও প্রভাব:

১. হায়া (الحياء)-এর পরিচয় ও প্রকৃতি:

ইসলামী নীতিশাস্ত্রে ‘হায়া’ হলো ঈমানের আত্মা। আল্লামা জুরজানী (রহ.) ‘আত-তা’রীফাত’ গ্রন্থে বলেন: «الحياء: انقباض النفس عن القبيح مخافة اللوم» অর্থাৎ নিন্দনীয় ও পাপের ভয়ে নফসের সংকুচিত হওয়া ও মন্দ কাজ বর্জন করার নামই হলো হায়া। হায়া দুর্বলতা বা ভীরুতা নয়; বরং এটি নৈতিক শক্তির সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ, যা মানুষকে পাপের পথে অগ্রসর হতে বাধা দেয়।

২. হায়ার স্তরভেদ ও প্রকারসমূহ:

একজন নিষ্ঠাবান মুসলিমের জীবনে হায়া তিনটি স্তরে কার্যকর থাকে:

  • ১. আল্লাহর প্রতি হায়া (الحياء من الله): এটি হায়ার সর্বোচ্চ ও প্রধান স্তর। বান্দা যখন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা’আলা প্রকাশ্য ও গোপন সব কিছুই দেখেন (إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا), তখন সে নির্জনে একাকী অবস্থানকালেও কোনো পাপ করতে ভয় ও লজ্জা পায়। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «اسْتَحْيُوا مِنَ اللهِ حَقَّ الْحَيَاءِ» (তোমরা আল্লাহর নিকট যথাযথ লজ্জা পোষণ করো)। সাহাবীগণ আরজ করলেন: আমরা তো লজ্জা করি। নবীজী বললেন: কেবল মুখমণ্ডলের লজ্জা নয়; বরং আল্লাহর প্রতি প্রকৃত লজ্জা হলো— মস্তক ও মস্তকের মধ্যকার চিন্তাকে হেফাজত করা, উদর ও তার খাদ্যকে হারাম থেকে রক্ষা করা এবং মৃত্যু ও দেহের ক্ষয়িষ্ণুতাকে সর্বদা স্মরণ রাখা (জামে তিরমিযী: ২৪৫৮)।
  • ২. মানুষের প্রতি হায়া (الحياء من الناس): সমাজের মানুষের সামনে এমন কোনো অশ্লীল কথা, অঙ্গভঙ্গি বা নির্লজ্জ পোশাক পরিহার করা যা মানুষের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় ও নিন্দনীয়। মানুষের প্রতি হায়া সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তি রক্ষা করে।
  • ৩. নিজের নফসের প্রতি হায়া (الحياء من النفس): নিজের বিবেক ও আত্মার প্রতি লজ্জা পোষণ করা। অর্থাৎ এমন কোনো নীচ কাজ না করা যা মানুষের নিজের আত্মসম্মান ও মনুষ্যত্বকে নিজ চোখের সামনেই ছোট করে ফেলে।

৩. ঈমান ও হায়ার অবিচ্ছেদ্য যুগলবন্দী:

হাদীসে নববীতে হায়া ও ঈমানকে একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «إِنَّ الْحَيَاءَ وَالْإِيمَانَ قُرِنَا جَمِيعًا، فَإِذَا رُفِعَ أَحَدُهُمَا رُفِعَ الْآخَرُ» অর্থাৎ “নিশ্চয় হায়া এবং ঈমান একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত; যখন এ দুটির একটি তুলে নেওয়া হয়, তখন অপরটিও আপনা-আপনি উঠে যায়” (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৫৮, বায়হাকী ফী শু’আবিল ঈমান)। অর্থাৎ যার হায়া নেই, তার ঈমানের অস্তিত্বও বিলুপ্তির মুখে পড়ে।

৪. সমাজ জীবনে হায়ার বরকত ও গুরুত্ব:

  • সর্ববিধ কল্যাণের আধার: ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «الْحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ» অর্থাৎ “লজ্জাশীলতা কেবল কল্যাণই বয়ে আনে” (সহীহ বুখারী: ৬১১৭, সহীহ মুসলিম: ৩৭)। সহীহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় এসেছে: «الْحَيَاءُ خَيْرٌ كُلُّهُ» অর্থাৎ হায়া সর্বাংশেই কল্যাণময়।
  • সকল নবীদের সর্বসম্মত ঐতিহাসিক অসিয়ত: আবু মাসউদ আল-বাদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلَامِ النُّبُوَّةِ الْأُولَى: إِذَا لَمْ تَسْتَحِ فَاصْنَعْ مَا شِئْتَ» অর্থাৎ “পূর্ববর্তী নবীগণের বাণী থেকে পরবর্তী মানুষ যা অক্ষুণ্ণভাবে লাভ করেছে তার একটি হলো: যখন তোমার মধ্যে লজ্জাশীলতাই অবশিষ্ট না থাকবে, তখন তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো” (সহীহ বুখারী: ৩৪৮৪)। অর্থাৎ হায়া না থাকলে মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায় অন্যায় ও পাপাচারের অতল গহ্বরে পতিত হয়।
  • সামাজিক শান্তি ও শালীনতা রক্ষা: মুসলিম সমাজে নারী-পুরুষের দৃষ্টি সংযত রাখা, শালীন পোশাক পরিধান, নোংরা কথা পরিহার এবং পারস্পরিক ইজ্জত-আব্রু রক্ষার একমাত্র নিশ্চয়তা দেয় হায়া ও পর্দা। যে সমাজে হায়া লোপ পায়, সেখানে যিনা, ব্যভিচার ও পারিবারিক ভাঙন মহামারী রূপ ধারণ করে।

مجموعة (ب) — صحيح ابن خزيمة (সহীহ ইবনে খুযায়মাহ)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


٥- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مَعْمَرِ بْنِ رِبْعِيٍّ الْقَيْسِيُّ حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ الْحَنَفِيُّ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ عِمْرَانَ هُوَ الْبَارِقِيُّ عَنْ عَطِيَّةَ مَعَ بَرَاءَتِي مِنْ عُهْدَتِهِ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِيٍّ إِلَّا لِخَمْسَةٍ: الْعَامِلِ عَلَيْهَا، أَوْ غَارِمٍ، أَوْ مُشْتَرِيهَا، أَوْ عَامِلٍ فِي سَبِيلِ اللهِ، أَوْ جَارٍ فَقِيرٍ يُتَصَدَّقُ عَلَيْهِ أَوْ أُهْدِيَ إِلَيْهِ»-

[৫. মুহাম্মদ ইবনে মা’মার ইবনে রিব’ঈ আল-ক্বায়সী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আবু বকর আল-হানাফী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন সুফিয়ান ইমরান আল-বারিক্বী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি আতিয়্যাহ আল-আউফী থেকে (তার দায়িত্ব ও ত্রুটি থেকে আমার দায়মুক্তির ঘোষণা সহকারে) বর্ণনা করেন, তিনি আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “কোনো ধনীর জন্য সদকা (যাকাত) গ্রহণ করা হালাল নয়, কেবল পাঁচ ব্যক্তি ব্যতীত: ১. সদকা আদায় ও বণ্টনে নিয়োজিত কর্মচারী, ২. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, ৩. যে ব্যক্তি স্বীয় অর্থ দিয়ে তা ক্রয় করে নিয়েছে, ৪. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী যোদ্ধা, এবং ৫. কোনো দরিদ্র প্রতিবেশী যাকে সদকা দেওয়া হয়েছে, অতঃপর সে ধনী প্রতিবেশীকে তা হাদিয়া হিসেবে উপহার দিয়েছে।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও সনদ তাহকীক

অনুবাদ: হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “কোনো সম্পদশালী বা ধনী ব্যক্তির জন্য সদকার (যাকাত) মাল গ্রহণ করা হালাল নয়, তবে পাঁচ প্রকার ধনী ব্যক্তি এর ব্যতিক্রম: ১. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী (আমিল), ২. যে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে (যদিও তার অন্য সম্পদ থাকে), ৩. যে ব্যক্তি স্বীয় অর্থ দিয়ে সদকার মাল ক্রয় করে নিয়েছে, ৪. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী মুজাহিদ (গাযী), এবং ৫. কোনো দরিদ্র ব্যক্তি যাকে সদকা হিসেবে কিছু দেওয়া হয়েছে, অতঃপর সে তা থেকে কোনো ধনী প্রতিবেশীকে উপহার বা উপঢৌকন দিয়েছে।”

ইমাম ইবনে খুযায়মার সতর্কতামূলক উক্তি:

হাদীসের সনদে ইমাম ইবনে খুযায়মাহ (রহ.) বলেছেন: «عَنْ عَطِيَّةَ مَعَ بَرَاءَتِي مِنْ عُهْدَتِهِ» অর্থাৎ ‘আতিয়্যাহ আল-আউফী থেকে বর্ণিত, তবে তার বর্ণনা ও নির্ভরযোগ্যতার দায়ভার থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত।’ ইমাম ইবনে খুযায়মাহ স্বীয় কিতাবে কেবলমাত্র সহীহ হাদীস সংকলনের কঠোর শর্তারোপ করেছিলেন; আতিয়্যাহ আল-আউফী হাদীস বিশারদদের নিকট দুর্বল (জয়ীফ) রাবী হওয়ায় তিনি নিজেকে তার দায় থেকে মুক্ত ঘোষণা করে মুহাদ্দিসসুলভ সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তবে এই হাদীসের মূল বক্তব্য অন্যান্য সহীহ সনদে সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযীতেও বর্ণিত হয়েছে।

হাদীসের শব্দার্থ ও ফিকহী তাৎপর্য:

  • لَا تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِيٍّ: ফরয সদকা বা যাকাত এমন ব্যক্তির জন্য গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম যে স্বাবলম্বী এবং যার নিকট নেসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে।
  • الْعَامِلِ عَلَيْهَا: ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত যাকাত সংগ্রহকারী ও হিসাবরক্ষক; সে ধনী হলেও স্বীয় মেহনতের পারিশ্রমিক হিসেবে যাকাত তহবিল থেকে গ্রহণ করতে পারে।
  • غَارِمٍ: যে ব্যক্তি কোনো সৎকাজ, মানুষের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা বা অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
  • أُهْدِيَ إِلَيْهِ: দরিদ্র ব্যক্তি যাকাত হিসেবে প্রাপ্ত বস্তুর পূর্ণ মালিক হয়ে যায়। পরবর্তীতে সে যদি তা ধনী কাউকে হাদিয়া দেয়, তবে ধনীর জন্য তা সাদাক্বাহ নয় বরং হাদিয়া হিসেবে খাওয়া জায়েয। যেমন উম্মুল মুমিনীন মায়মূনা (রা.)-এর মুক্তদাসী বারীরা (রা.)-কে দেওয়া সদকার গোশত রাসূলুল্লাহ (সা.) تناول করেছিলেন এবং বলেছিলেন: «هُوَ لَهَا صَدَقَةٌ وَهُوَ لَنَا هَدِيَّةٌ» (তা বারীরার জন্য সদকা এবং আমাদের জন্য হাদিয়া)।

(الف) عرف الصدقة- ثم بين فضائلها فى ضوء الكتاب والسنة-

সাদাক্বাহর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এর ফযিলত:

১. সাদাক্বাহর আভিধানিক অর্থ:

‘সাদাক্বাহ’ (الصدقة) শব্দটি আরবি ‘আস-সিদক্ব’ (الصِّدْقُ) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ হলো— সত্যবাদিতা, সততা ও অকপটতা। ইমাম রাগিব আসফাহানী (রহ.) বলেন, যে দান বান্দার অন্তরের ঈমানের সত্যতা ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার জ্বলন্ত প্রমাণ বহন করে, তাকে ‘সাদাক্বাহ’ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «وَالصَّدَقَةُ بُرْهَانٌ» অর্থাৎ “সাদাক্বাহ হলো (ঈমানের) সুস্পষ্ট প্রমাণ” (সহীহ মুসলিম: ২২৩)।

২. সাদাক্বাহর পারিভাষিক অর্থ:

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় সাদাক্বাহ হলো— একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন সাওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে স্বীয় হালাল উপার্জিত সম্পদ অভাবী, দুস্থ ও দ্বীনী কল্যাণকাজে স্বেচ্ছায় কিংবা শরয়ী নির্দেশে দান করা।
সাদাক্বাহ মূলত দুই প্রকার:

  • ফরয ও ওয়াজিব সাদাক্বাহ: যেমন শরীয়ত নির্ধারিত বার্ষিক যাকাত, সদকাতুল ফিতর, কাফ্ফারা ও মানতের দান।
  • নফল বা ঐচ্ছিক সাদাক্বাহ: অভাবী মানুষকে সাহায্য, মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ, কূপ খনন বা যেকোনো সাধারণ দান-খয়রাত। ব্যাপক অর্থে যেকোনো ভালো কাজ, মানুষের সাথে হাসিমুখে কথা বলা, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানোকেও হাদীসে সাদাক্বাহ বলা হয়েছে।

৩. পবিত্র কুরআনের আলোকে সাদাক্বাহর ফযিলত:

  • সাতশত গুণ পর্যন্ত সাওয়াব বৃদ্ধি: আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: «مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ» অর্থাৎ “যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি শস্যবীজের ন্যায়, যা থেকে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয় এবং প্রতিটি শীষে থাকে একশত দানা। আর আল্লাহ যার জন্য চান তা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৬১)।
  • সম্পদে প্রভূত বরকত ও বৃদ্ধি: বাহ্যত সাদাক্বাহ করলে সম্পদ কমে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন। ইরশাদ হয়েছে: «يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ» অর্থাৎ “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদকাকে বর্ধিত করেন” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৭৬)।
  • আত্মার পরম পরিশুদ্ধি: মহান আল্লাহ বলেন: «خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا» অর্থাৎ “আপনি তাদের ধন-সম্পদ থেকে সাদাক্বাহ গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশোধিত করবেন” (সূরা আত-তাওবাহ: ১০৩)।

৪. সুন্নাহে নববীর আলোকে সাদাক্বাহর ফযিলত:

  • জাহান্নামের ভয়াবহ অগ্নি থেকে মুক্তি: আদী ইবনে হাতিম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ» অর্থাৎ “তোমরা একটি খেজুরের অর্ধাংশ দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা করো” (সহীহ বুখারী: ১৪১৭)।
  • কিয়ামতের দিন আরশের সুশীতল ছায়া লাভ: যে সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের কঠিন দিনে স্বীয় আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন, তাদের অন্যতম হলো: «وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ» অর্থাৎ “সেই ব্যক্তি যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কী দান করল তার বাম হাতও তা জানতে পারে না” (সহীহ বুখারী: ৬৬০)।
  • বালা-মুসিবত ও অপমৃত্যু রোধ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «إِنَّ الصَّدَقَةَ لَتُطْفِئُ غَضَبَ الرَّبِّ وَتَدْفَعُ مِيتَةَ السُّوءِ» অর্থাৎ “নিশ্চয় দান-সদকা রবের ক্রোধকে নির্বাপিত করে এবং অপমৃত্যু ও মন্দ পরিণতি প্রতিহত করে” (জামে তিরমিযী: ৬৬৪)।
  • কখনো ধন-সম্পদ হ্রাস পায় না: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ» অর্থাৎ “সাদাক্বাহ কখনো কোনো সম্পদ কমায় না” (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮)।
  • অবিরাম সদকায়ে জারিয়া: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: “মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দু’আ করে” (সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)।

٦- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ وَزَيْدُ بْنُ أَخْزَمَ الطَّائِيُّ قَالَا: حَدَّثَنَا أَبُو أَحْمَدَ حَدَّثَنَا إِسْرَائِيلُ عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ حَدَّثَنَا حُبْشِيُّ بْنُ جُنَادَةَ السَّلُولِيُّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ سَأَلَ وَلَهُ مَا يُغْنِيهِ فَإِنَّمَا يَأْكُلُ الْجَمْرَ»، وَقَالَ زَيْدُ بْنُ أَخْزَمَ: «مَنْ سَأَلَ مِنْ غَيْرِ فَقْرٍ فَإِنَّمَا يَأْكُلُ الْجَمْرَ»-

[৬. মুহাম্মদ ইবনে বাশশার এবং যায়দ ইবনে আখযাম আত-ত্বাঈ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাঁরা বলেন আবু আহমাদ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইসরাঈল আবু ইসহাক থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন হুবশী ইবনে জুনাদাহ আস-সালূলী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি অভাবমুক্ত থাকা সত্ত্বেও মানুষের কাছে হাত পাতে (ভিক্ষা চায়), সে মূলত জাহান্নামের জ্বলন্ত অঙ্গার ভক্ষণ করে।” এবং যায়দ ইবনে আখযাম বর্ণনা করেন: “যে ব্যক্তি দারিদ্র্য ব্যতীতই মানুষের কাছে যাঞ্চা করে, সে মূলত জ্বলন্ত অঙ্গারই ভক্ষণ করে।”]

হাদীসের অনুবাদ ও শব্দার্থ:

অনুবাদ: হযরত হুবশী ইবনে জুনাদাহ আস-সালূলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি নিজের অভাবমুক্ত থাকার সংস্থান থাকা সত্ত্বেও মানুষের কাছে ভিক্ষা চায়, সে প্রকৃতপক্ষে জাহান্নামের জ্বলন্ত কয়লাই ভক্ষণ করে।” অন্য বর্ণনায় এসেছে: “যে ব্যক্তি কোনো প্রকৃত দারিদ্র্য বা চরম অভাব ছাড়াই যাঞ্চা করে, সে যেন জাহান্নামের জ্বলন্ত কয়লাই গলাধঃকরণ করে।”

হাদীসের শব্দার্থ ও তাহকীক:

  • مَنْ سَأَلَ: যে ব্যক্তি যাঞ্চা করল বা মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইল।
  • مَا يُغْنِيهِ: যা তাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখে; অর্থাৎ যার কাছে সকাল ও সন্ধ্যার আহারের সংস্থান রয়েছে অথবা যে সুস্থ দেহে কাজ করে উপার্জন করার সামর্থ্য রাখে।
  • الْجَمْرَ: জ্বলন্ত কয়লা বা অগ্নিকাণ্ড। অর্থাৎ যে সম্পদ সে যাঞ্চা করে জমায়, কিয়ামতের দিন তা আগুনে রূপান্তর করে তার পেটে ও চেহারায় দাগ দেওয়া হবে।

(الف) متى يجوز السؤال ومتى لا؟ وما حكم سؤال الغنى؟ بين-

মানুষের কাছে যাঞ্চা (ভিক্ষা) করার শরয়ী বিধান ও ধনীর জন্য যাঞ্চা করার হুকুম:

১. ভিক্ষা বা যাঞ্চা করার সাধারণ বিধান:

ইসলামে মানুষের কাছে হাত পাতা ও ভিক্ষাবৃত্তিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও হীন কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলাম আত্মমর্যাদাবোধ, মেহনত ও হালাল উপার্জনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى» অর্থাৎ “উপরিভাগের হাত (দাতার হাত) নিচের হাত (গ্রহীতার হাত) অপেক্ষা বহুগুণে উত্তম” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।

২. কখন যাঞ্চা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা হারাম?

নিম্নোক্ত অবস্থায় কোনো ব্যক্তির জন্য মানুষের কাছে যাঞ্চা করা সর্বসম্মতভাবে হারাম ও কবিরা গুনাহ:

  • যার নিকট নিজের ও পরিবারের জন্য এক দিন এক রাতের খাবার বিদ্যমান রয়েছে।
  • যে ব্যক্তি শারীরিকভাবে সুস্থ, সবল এবং হালাল কাজের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জনে সক্ষম। নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «لَا تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِيٍّ وَلَا لِذِي مِرَّةٍ سَوِيٍّ» অর্থাৎ “কোনো ধনী ব্যক্তির জন্য এবং কোনো সুস্থ ও সবল কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্য সদকা গ্রহণ হালাল নয়” (সুনানে আবু দাউদ: ১৬৩৪)।
  • সম্পদ বৃদ্ধি ও সঞ্চয় করার উদ্দেশ্যে হাত পাতা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: «مَنْ سَأَلَ النَّاسَ أَمْوَالَهُمْ تَكَثُّرًا فَإِنَّمَا يَسْأَلُ جَمْرًا فَلْيَسْتَقِلَّ أَوْ لِيَسْتَكْثِرْ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বৃদ্ধির লালসায় মানুষের কাছে হাত পাতে, সে মূলত জাহান্নামের আগুন যাঞ্চা করে; অতএব সে চাইলে কম চাইতে পারে অথবা বেশি চাইতে পারে” (সহীহ মুসলিম: ১০৪১)।

৩. কখন যাঞ্চা করা বৈধ ও জায়েয?

সুপ্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত ক্বাবীসা ইবনে মুখারিক্ব আল-হিলালী (রা.) থেকে বর্ণিত সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করেছেন যে, কেবল তিন শ্রেণীর ব্যক্তির জন্য অন্যের নিকট যাঞ্চা করা হালাল:

  • ১. রক্তপণ বা জরিমানা বহনকারী ব্যক্তি (حَمَالَةً): যে ব্যক্তি দুই গোত্র বা মানুষের বিরোধ মেটানোর জন্য কোনো বিরাট আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা রক্তপণ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে; সে সেই সমপরিমাণ অর্থ সাহায্য নিতে পারে এবং তা পরিশোধ হলে হাত গুটিয়ে নেবে।
  • ২. প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্বান্ত ব্যক্তি (جَائِحَةً اجْتَاحَتْ مَالَهُ): যার সহায়-সম্পদ কোনো আকস্মিক প্লাবন, অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয়ে গেছে; সে তার জীবন ধারণের ন্যূনতম সংস্থান হওয়া পর্যন্ত সাহায্য প্রার্থনা করতে পারে।
  • ৩. অনাহারক্লিষ্ট নিঃস্ব ব্যক্তি (فَاقَةٌ): যে চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হয়েছে এবং তার নিজ মহল্লার অন্তত তিনজন বিবেকবান ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে অমুক ব্যক্তি সত্যিই ক্ষুধার্ত ও নিঃস্ব; সে ব্যক্তি জীবিকা নির্বাহের মতো পরিমাণ যাঞ্চা করতে পারবে।

৪. ধনীর জন্য যাঞ্চা করার হুকুম (حكم سؤال الغني):

যার নিকট নেসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে অথবা দৈনন্দিন খোরাকীর সংস্থান রয়েছে, এমন ধনী ব্যক্তির জন্য মানুষের কাছে যাঞ্চা করা قطعيًا حرام (অকাট্যভাবে হারাম)। এটি কাবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

  • আখিরাতের ভয়াবহ শাস্তি: আলোচ্য হাদীসে বলা হয়েছে— সে জাহান্নামের অঙ্গার ভক্ষণ করে।
  • মুখমণ্ডলে কোনো গোশত থাকবে না: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন: «مَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَسْأَلُ النَّاسَ حَتَّى يَأْتِيَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَيْسَ فِي وَجْهِهِ مُزْعَةُ لَحْمٍ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি অনবরত মানুষের কাছে ভিক্ষা চায়, কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে তার চেহারায় এক টুকরো গোশতও থাকবে না (কেবল কঙ্কাল থাকবে)” (সহীহ বুখারী: ১৪৭৪, সহীহ মুসলিম: ১০৪০)।
  • চেহারায় ক্ষতচিহ্ন: সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: মানুষের কাছে হাত পাতা হলো এমন এক ক্ষতচিহ্ন, যার দ্বারা ব্যক্তি কিয়ামতের দিন স্বীয় মুখমণ্ডলকে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে (তিরমিযী, আবু দাউদ)।

٧- حَدَّثَنَا أَبُو سَلَمَةَ يَحْيَى بْنُ الْمُغِيرَةِ الْمَخْزُومِيُّ، ثَنَا ابْنُ أَبِي فُدَيْكٍ عَنِ الضَّحَّاكِ بْنِ عُثْمَانَ عَنْ نَافِعٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِإِخْرَاجِ زَكَاةِ الْفِطْرِ قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ، وَأَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ يُؤَدِّي قَبْلَ ذَلِكَ بِيَوْمٍ وَيَوْمَيْنِ-

[৭. আবু সালামা ইয়াহইয়া ইবনুল মুগীরাহ আল-মাখযূমী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইবনু আবি ফুদাইক আমাদের যুহ্হাক ইবনে উসমান থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি নাফে’ থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের (ঈদের) নামাযে বের হওয়ার পূর্বেই যাকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেছেন; এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ঈদের এক দিন বা দুই দিন পূর্বে তা আদায় করতেন।]

হাদীসের প্রেক্ষাপট ও পূর্ণাঙ্গ তরজমা

অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের ঈদের সালাতে বের হওয়ার পূর্বেই সদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন; এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ঈদের এক দিন বা দুই দিন পূর্বেই তা পরিশোধ করে দিতেন।

হাদীসের শব্দার্থ ও শিক্ষা:

  • زَكَاةِ الْفِطْرِ: রমযানের সমাপ্তিতে ঈদুল ফিতরের দিন রোযা ভঙ্গের কারণে যে আর্থিক ওয়াজিব বা সাদাক্বাহ আদায় করা হয়।
  • قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلَاةِ: ঈদের নামাযের পূর্বে আদায় করা ওয়াজিব বা মুস্তাহাব। এর উদ্দেশ্য হলো যাতে দরিদ্র ও মিসকীনগণ ঈদের নামাযের পূর্বেই প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পেয়ে আনন্দে অংশ নিতে পারে।
  • قبل ذلك بيوم ويومين: ইবনে উমর (রা.)-এর এই আমল দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঈদের এক বা দুই দিন পূর্বে অগ্রিম ফিতরা প্রদান করা সম্পূর্ণ বৈধ ও সুন্নাহসম্মত।

(الف) ما هى زكاة الفطر؟ بين أحكام زكاة الفطر مفصلا-

যাকাতুল ফিতরের পরিচয় এবং এর আহকাম ও মাসায়েল:

১. যাকাতুল ফিতরের পরিচয় ও নামকরণের কারণ:

‘যাকাতুল ফিতর’ (زكاة الفطر) বা সাদাকাতুল ফিতর হলো শরীয়তের এমন এক আর্থিক ওয়াজিব সদকা, যা রমযান মাসের সিয়াম সমাপ্তির পর ঈদুল ফিতরের শুভলগ্নে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী বা তার মূল্য অভাবীদের মাঝে বণ্টন করতে হয়। ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ রোযা ভঙ্গ বা সমাপ্তি; সিয়াম সাধনা সফলভাবে সম্পন্ন করার তাওফীক লাভে আল্লাহর শুকরিয়া হিসেবে এই দান করা হয় বলে একে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বলা হয়।

২. যাকাতুল ফিতরের হুকুম:

  • হানাফী মাযহাব মতে: যাকাতুল ফিতর আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব (واجب)
  • জমহুর আইম্মাহ (মালিকী, শাফে’ঈ ও হাম্বলী মাযহাব) মতে: এটি ফরয (فرض)। দলীল হিসেবে ইবনে উমর (রা.)-এর হাদীস পেশ করা হয়: «فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ» অর্থাৎ “রাসূলুল্লাহ (সা.) যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন” (সহীহ বুখারী: ১৫০৩)।

৩. কার ওপর ওয়াজিব এবং আবশ্যকীয় শর্তাবলী:

  • হানাফী মাযহাবের শর্ত: ঈদুল ফিতরের সুবহে সাদিকের সময় যে স্বাধীন মুসলিম ব্যক্তির নিকট স্বীয় মৌলিক প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও ঋণ বাদে অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা সমমূল্যের মাল বিদ্যমান থাকে, তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব। এতে মাল এক বছর অতিবাহিত (হাওলানুল হাওল) হওয়ার শর্ত নেই এবং ব্যবসায়িক মাল হওয়াও আবশ্যক নয়।
  • অন্যান্য মাযহাবের শর্ত: ঈদের দিন ও রাতের মৌলিক খাদ্য ও পোশাকের অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত থাকলেই তার ওপর ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব।
  • অধীনস্থদের পক্ষ থেকে আদায়: একজন সামর্থ্যবান পুরুষ নিজের পক্ষ থেকে এবং তার নাবালেগ সন্তান ও আশ্রিত দাস-দাসীর পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করবে। বালেগ সন্তান ও স্ত্রীর পক্ষ থেকে আদায় করা মুস্তাহাব।

৪. সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ ও খাদ্যদ্রব্য:

হাদীস শরীফে পাঁচ প্রকার খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে:

  • গম বা আটা: অর্ধ সা’ (نصف صاع), যা আধুনিক হিসেবে প্রায় ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম (সতর্কতামূলক প্রায় ১ কেজি ৬৬০ গ্রাম বা পৌনে দুই কেজি)। এটি হানাফী মাযহাবের সুপ্রসিদ্ধ সিদ্ধান্ত।
  • যব, খেজুর, কিসমিস ও পনির: এক সা’ (صاع كامل), যা আধুনিক ওজনে প্রায় ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম (মতান্তরে ৩ কেজি ২৫০ গ্রাম)।
  • নগদ অর্থ দ্বারা আদায়: ইমাম আবু হানীফা (রহ.), সুফিয়ান সাওরী এবং উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)-এর মতে ফিতরার খাদ্যদ্রব্যের পরিবর্তে সমমূল্যের নগদ টাকা (القيمة) প্রদান করা সম্পূর্ণ জায়েয এবং দরিদ্রদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণে তা অধিক ফলপ্রসূ ও উত্তম।

৫. ফিতরা আদায়ের সময়সীমা:

  • ওয়াজিব হওয়ার সময়: হানাফী মতে ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার সাথে সাথে ওয়াজিব হয়। শাফে’ঈ মতে রমযানের শেষ সূর্যাস্তের সাথে সাথে ওয়াজিব হয়।
  • মুস্তাহাব সময়: ঈদের দিন সকালে ঈদগাহে নামাযের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে আদায় করা সর্বোত্তম।
  • অগ্রিম আদায়: ঈদের এক বা দুই দিন পূর্বে আদায় করা সাহাবায়ে কিরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত। হানাফী ও শাফে’ঈ মতে রমযানের শুরু থেকেই অগ্রিম ফিতরা দেওয়া জায়েয।
  • নামাযের পর বিলম্ব করা: ঈদের নামাযের পর আদায় করলে ফিতরা আদায় হয়ে যাবে বটে, তবে তা মাকরূহ হবে এবং সাধারণ নফল সাদাক্বার মতো গণ্য হবে। নবীজী (সা.) বলেছেন: «مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ، وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ» (আবু দাউদ: ১৬০৯)।

৬. সাদাকাতুল ফিতরের মৌলিক হিকমত ও উদ্দেশ্য:

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফিতরার দুটি সুমহান উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন:

«فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ»
(সুনানে আবু দাউদ: ১৬০৯, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮২৭)

  • ১. রোযাদারের আত্মশুদ্ধি (طُهْرَةً لِلصَّائِمِ): সিয়াম পালনকালে মানুষের অনিচ্ছাকৃত অনর্থক কথাবার্তা, দৃষ্টির ত্রুটি ও গীবতের যে সমস্ত গুনাহ হয়, সাদাকাতুল ফিতর সেই অপূর্ণতা মুছে দিয়ে রোযাকে নিষ্কলুষ ও কবুল করে।
  • ২. দরিদ্রদের মুখে হাসি ফোটানো (طُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ): ঈদের আনন্দের দিনে সমাজের কোনো নিঃস্ব ব্যক্তি যেন অভুক্ত না থাকে এবং কারো কাছে হাত না পেতে স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপন করতে পারে।

٨- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي عَدِيٍّ قَالَ: أَنْبَأَنَا ثَابِتُ بْنُ عُمَارَةَ حَدَّثَنَا رَبِيعَةُ بْنُ شَيْبَانَ قَالَا: قُلْتُ لِلْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ: مَا تَذْكُرُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ قَالَ: أَذْكُرُ أَنَّهُ أَدْخَلَنِي مَعَهُ غُرْفَةَ الصَّدَقَةِ، فَأَخَذْتُ تَمْرَةً، فَأَلْقَيْتُهَا فِي فِيَّ، فَقَالَ: «أَلْقِهَا! فَإِنَّهَا لَا تَحِلُّ لِرَسُولِ اللهِ وَلَا أَحَدٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ»-

[৮. মুহাম্মদ ইবনে বাশশার আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইবনু আবি আদী আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন সাবিত ইবনে উমারাহ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন রবী’আহ ইবনে শায়বান আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আপনার কী কথা মনে আছে? তিনি বললেন: আমার মনে পড়ে যে, তিনি আমাকে সাথে নিয়ে সদকার মাল রাখার কামরায় প্রবেশ করলেন; তখন আমি সেখান থেকে একটি শুকনো খেজুর নিয়ে মুখে পুরে নিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “তা ফেলে দাও! কেননা সদকার মাল না আল্লাহর রাসূলের জন্য হালাল, আর না তাঁর পরিবারবর্গের কারো জন্য হালাল।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ তরজমা ও প্রেক্ষাপট

অনুবাদ: হযরত রবী’আহ ইবনে শায়বান (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নবীদৌহিত্র হযরত হাসান ইবনে আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে জিজ্ঞেস করলাম: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য থেকে আপনার কী স্মৃতি মনে আছে? তিনি বললেন: আমার স্পষ্ট মনে পড়ে যে, একবার নবীজী (সা.) আমাকে সাথে নিয়ে সদকার খেজুর রাখার সংরক্ষিত কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। তখন (শিশু অবস্থায়) আমি একটি খেজুর তুলে স্বীয় মুখে দিয়ে ফেললাম। তা দেখে রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্রুত বললেন: “ছুড়ে ফেলে দাও! তা মুখ থেকে ফেলে দাও! কেননা সদকা না আল্লাহর রাসূলের জন্য হালাল, আর না তাঁর আহলে বাইতের কোনো সদস্যের জন্য হালাল।”

হাদীসের শিক্ষণীয় দিক ও সতর্কতা:

অন্য বর্ণনায় এসেছে, নবীজী (সা.) হাসান (রা.)-এর মুখের ভেতর হাত দিয়ে সেই খেজুরটি বের করে ফেলেন এবং বলেন: «كِخْ كِخْ، أَمَا عَلِمْتَ أَنَّا لَا نَأْكُلُ الصَّدَقَةَ؟» অর্থাৎ “ছিঃ ছিঃ ফেলে দাও! তুমি কি জানো না যে আমরা সদকার মাল খাই না?” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)। শিশুদের লালন-পালনেও হারাম ও নিষিদ্ধ বস্তু থেকে কতটা সতর্ক থাকতে হয়, এই হাদীস তার এক অনুপম দৃষ্টান্ত।

(ألف) هل تحل الصدقة لأهل البيت؟ بين مع بيان مصارف الزكاة مفصلا-

আহলে বাইতের জন্য সদকার বিধান এবং যাকাতের আটটি খাতের বিশদ বিবরণ:

১. আহলে বাইতের জন্য সদকা গ্রহণের বিধান (حكم الصدقة لآل البيت):

ইসলামী শরীয়তের সর্বসম্মত ফয়সালা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সম্মানিত পরিবারবর্গ (আহলে বাইত)-এর জন্য ফরয যাকাত ও ওয়াজিব সদকা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম (حرام قطعيًا)

  • হারাম হওয়ার কারণ: আব্দুল মুত্তালিব ইবনে রাবী’আহ (রা.) থেকে বর্ণিত সহীহ মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন: «إِنَّ هَذِهِ الصَّدَقَاتِ إِنَّمَا هِيَ أَوْسَاخُ النَّاسِ، وَإِنَّهَا لَا تَحِلُّ لِمُحَمَّدٍ وَلَا لِآلِ مُحَمَّدٍ» অর্থাৎ “নিশ্চয় এই সমস্ত যাকাত ও সদকা হলো মানুষের মালের গোনাহ ও ময়লা-আবর্জনা; আর তা মুহাম্মদ এবং তাঁর বংশধরদের জন্য কোনোক্রমেই হালাল নয়” (সহীহ মুসলিম: ১০৭২)। আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবীব ও তাঁর পবিত্র বংশকে মানুষের সম্পদের ময়লা থেকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ রেখেছেন।
  • আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিবর্গ: ফুকাহায়ে কিরামের ঐকমত্যে ‘আলে মুহাম্মদ’ বলতে বুঝায়— হযরত আলী (রা.), হযরত আক্বীল (রা.), হযরত জা’ফর (রা.) এবং হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশধরগণ (অর্থাৎ বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব)। তাঁদের কারো জন্যই যাকাত গ্রহণ বৈধ নয়।
  • নফল হাদিয়া বা উপহার গ্রহণের হুকুম: আহলে বাইতের জন্য নফল হাদিয়া, মেহমানদারি ও সাধারণ উপহার গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হালাল ও বরকতময়। স্বয়ং নবীজী (সা.) হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং তার উত্তম বিনিময় প্রদান করতেন।
  • বিকল্প আর্থিক সংস্থান: যেহেতু তাঁদের জন্য যাকাত নিষিদ্ধ, তাই ইসলামী রাষ্ট্রে গনীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) থেকে আহলে বাইতের সম্মানজনক ভাতার বিধান পবিত্র কুরআনে নির্ধারণ করা হয়েছে (সূরা আল-আনফাল: ৪১)।

২. যাকাতের খাতসমূহের বিস্তারিত বিবরণ (مصارف الزكاة):

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে যাকাতের আটটি খাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে:

«إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ»

“নিশ্চয় সদকা (যাকাত) কেবল ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরয; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত-তাওবাহ: ৬০)

এই আটটি খাতের ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:

  • ১. আল-ফুক্বারা (الْفُقَرَاءُ — ফকীরগণ): হানাফী মাযহাব মতে ফকীর হলো সেই ব্যক্তি, যার কিছু সম্পদ রয়েছে কিন্তু তা নেসাব পরিমাণ নয়, অথবা নেসাব পরিমাণ থাকলেও তা ঋণ বা মৌলিক প্রয়োজনে ব্যয় হয়ে যায়। অন্যান্য মাযহাব মতে যার কোনো সম্পদ বা উপার্জন নেই।
  • ২. আল-মাসাকীন (الْمَسَاكِينُ — মিসকীনগণ): হানাফী মতে যার কোনো সম্পদই নেই এবং যে অন্যের সাহায্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। অন্য মাযহাব মতে যার সামান্য সম্পদ আছে কিন্তু তা দিয়ে জীবনযাত্রার অর্ধেক ব্যয়ও মেটানো যায় না। মোটকথা অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিরাই ফকীর ও মিসকীন।
  • ৩. আল-‘আমিলীনা ‘আলাইহা (الْعَامِلِينَ عَلَيْهَا — যাকাত কর্মচারী): ইসলামী সরকার কর্তৃক যাকাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বণ্টনের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ। তাঁরা তাদের মেহনতের পারিশ্রমিক হিসেবে যাকাত থেকে বেতন পাবেন।
  • ৪. আল-মুআল্লাফাতু কুলূবুহুম (الْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ — চিত্তাকর্ষণ): ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য নওমুসলিম বা দুর্বল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তি। হানাফী মাযহাব মতে ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই খাত কার্যকর থাকলেও হযরত আবু বকর ও উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে সাহাবীদের সর্বসম্মত ইজমার ভিত্তিতে ইসলামের প্রতাপ সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এই খাত রহিত হয়েছে; তবে অন্যান্য ইমামদের মতে বিশেষ প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে তা প্রয়োগ করা যেতে পারে।
  • ৫. ফীর-রিক্বাব (فِي الرِّقَابِ — দাসমুক্তি): ক্রীতদাসদের মুক্তির জন্য বা মুক্তিপণের চুক্তি করা গোলামদের সাহায্যার্থে যাকাত ব্যয় করা। বর্তমান যুগে অন্যায়ভাবে বন্দী মুসলিমদের মুক্ত করতেও তা প্রয়োগযোগ্য।
  • ৬. আল-গারিমীন (الْغَارِمِينَ — ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি): যে ব্যক্তি কোনো বৈধ প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং নিজের সম্পদ দিয়ে ঋণ পরিশোধে সম্পূর্ণ অক্ষম।
  • ৭. ফী সাবীলিল্লাহ (فِي سَبِيلِ اللَّهِ — আল্লাহর রাস্তায়): জমহুর ফকীহগণের মতে আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য জিহাদরত মুজাহিদীন যাদের যুদ্ধাস্ত্র বা পাথেয় নেই। আধুনিক আলেমগণের মতে দ্বীন ইসলামের প্রচার-প্রসার, ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দ্বীনী দাওয়াতী কর্মকাণ্ডের অভাবী কর্মীরাও এতে অন্তর্ভুক্ত।
  • ৮. ইবনুস সাবীল (ابْنِ السَّبِيلِ — মুসাফির): যে ব্যক্তি সফররত অবস্থায় অর্থাভাবে বা সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে, যদিও নিজ দেশে সে ধনী হয়; তাকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিমাণ যাকাত প্রদান করা যাবে।

مجموعة (ج) — المستدرك للحاكم (আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিম)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)


٩- حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْحَسَنِ الْكَارَزِيُّ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ ثَنَا حَجَّاجُ بْنُ مِنْهَالٍ ثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ عَنْ حُمَيْدٍ عَنْ يُوسُفَ بْنِ مِهْرَانَ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا) قَالَ: قَالَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ: «أَطْيَبُ رِيحٍ فِي الْأَرْضِ الْهِنْدُ، أُهْبِطَ بِهَا آدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَعَلِقَ شَجَرُهَا مِنْ رِيحِ الْجَنَّةِ»-

[৯. মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আল-কারাযী আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আলী ইবনে আব্দুল আযীয আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন হাজ্জাজ ইবনে মিনহাল আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন হাম্মাদ ইবনে সালামাহ হুমাইদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি ইউসুফ ইবনে মিহরান থেকে, তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) ইরশাদ করেছেন: “পৃথিবীর মধ্যে সর্বোত্তম সুবাস ও সুরভি হলো হিন্দুস্তান (ভারত উপমহাদেশ); কেননা সেখানে হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)-কে অবতরণ করানো হয়েছিল, ফলে এর বৃক্ষরাজিতে জান্নাতের সুগন্ধি সংলগ্ন ও সুরভিত হয়ে গেছে।”]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ তরজমা ও বিশ্লেষণ

অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইরশাদ করেছেন: “পৃথিবীর বুকে সর্বাধিক পবিত্র ও সুবাসিত ভূখণ্ড হলো হিন্দুস্তান (ভারত উপমহাদেশ); কেননা এখানেই সর্বপ্রথম মানব হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)-কে (জান্নাত থেকে) অবতরণ করানো হয়েছিল, যার ফলে সেখানকার বৃক্ষরাজি ও উদ্ভিদে জান্নাতের সুবাস লেপ্টে সুগন্ধময় হয়ে উঠেছিল।”

হাদীসের তাহকীক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

  • ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রহ.): ইমাম হাকিম স্বীয় সংকলন ‘আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন’-এ এই রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করেছেন।
  • আদম (আ.)-এর অবতরণস্থল: ঐতিহাসিক মুফাসসিরীন ও সাহাবায়ে কিরামের বর্ণনানুযায়ী, আদম (আ.) যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন, তখন তিনি ভারত উপমহাদেশের অন্তর্গত বর্তমান শ্রীলঙ্কার ‘সারান্দীপ’ (নুওয়ারা এলিয়া পর্বতের আদম চূড়া)-এ অবতরণ করেন। তিনি জান্নাত থেকে সুগন্ধি পাতা ও চারা নিয়ে এসেছিলেন, যার বদৌলতে এই অঞ্চলের বনভূমি ও মশলাসমূহ জান্নাতী সুবাসে সুরভিত হয়েছিল।
  • শব্দার্থ: أَطْيَبُ رِيحٍ — সর্বাধিক পবিত্র ও সুমিষ্ট সুবাস। فَعَلِقَ — লেগে গেল বা সংলগ্ন হলো।

(الف) تحدث عن خلق آدم عليه السلام وهبوطه فى الأرض موجزا-

হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)-এর সৃষ্টি ও পৃথিবীতে অবতরণের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত:

১. হযরত আদম (আ.)-এর মুজিযাপূর্ণ সৃষ্টি:

আল্লাহ তা’আলা পৃথিবীতে স্বীয় প্রতিনিধি (খলীফা) প্রেরণের ইচ্ছা প্রকাশ করে ফেরেশতাদের বললেন: «إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً» (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৩০)। অতঃপর আদম সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়:

  • মাটির সংমিশ্রণ: হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তা’আলা সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাল, সাদা, কালো, নরম ও শক্ত মাটি একত্রিত করার নির্দেশ দেন। এজন্যই আদম সন্তানদের গায়ের রঙ ও মেজাজে এই বৈচিত্র্য দেখা যায় (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযী)।
  • অবয়ব নির্মাণ ও রূহ সঞ্চার: মাটি ও পানির সংমিশ্রণে ‘ত্বীনিল লাযিব’ (আঠালো কাদা) এবং পরবর্তীতে ‘সালসালিন কাল ফাখ্খার’ (পোড়ামাটির মতো শুষ্ক ঠনঠনে রূপ) ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা স্বীয় পক্ষ থেকে তাঁর মধ্যে রূহ ফুঁকে দিলেন। রূহ প্রবেশ করা মাত্রই আদম (আ.) হাঁচি দিয়ে বললেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’, আর আল্লাহ রহমতের ঘোষণা দিয়ে বললেন ‘য়ারহামুকাল্লাহ’।
  • ফেরেশতাদের সিজদা ও ইবলিসের অবাধ্যতা: আল্লাহ তা’আলা সমস্ত ফেরেশতাকে সম্মানের সিজদা (সিজদায়ে তা’যীমী) করার নির্দেশ দিলেন। সকলেই সিজদাবনত হলো, কেবল ইবলিস স্বীয় অহংকার ও হিংসার বশবর্তী হয়ে বলল: “আমি আগুনের তৈরি আর সে মাটির তৈরি; আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।” ফলে ইবলিস চিরতরে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হলো।
  • ইলম ও খেলাফতের শ্রেষ্ঠত্ব: মহান আল্লাহ আদম (আ.)-কে সমস্ত বস্তুর নাম ও অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য শিক্ষা দিলেন (وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا), যার উত্তর ফেরেশতারা দিতে পারেনি। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, জ্ঞানের কারণেই মানুষ সমগ্র সৃষ্টির সেরা।

২. জান্নাতে বসবাস ও পরীক্ষা:

অতঃপর আদম (আ.)-এর বাম পাঁজরের হাড় থেকে তাঁর জীবনসঙ্গিনী মা হাওয়া (আলাইহাস সালাম)-কে সৃষ্টি করা হলো। আল্লাহ তাঁদেরকে জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামত ভোগের অনুমতি দিয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট গাছের ফল খাওয়া নিষিদ্ধ করলেন: «وَلَا تَقْرَبَا هَٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ»। কিন্তু চিরশত্রু ইবলিস মিথ্যা শপথ করে তাঁদের প্রলুব্ধ করল যে, এই ফল খেলে তাঁরা চিরঞ্জীব ও ফেরেশতা হয়ে যাবেন। ফলে তাঁরা অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই গাছের ফল ভক্ষণ করলেন। ফল খাওয়ার সাথে সাথেই জান্নাতী পোশাক খসে পড়ল এবং তাঁরা বৃক্ষের পাতা দিয়ে নিজেদের আবৃত করতে লাগলেন।

৩. পৃথিবীতে অবতরণ ও তাওবার মহিমা:

  • অবতরণের নির্দেশ: আল্লাহ তা’আলা তাঁদেরকে পৃথিবীতে অবতরণের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করলেন: «اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ» অর্থাৎ “তোমরা নেমে যাও, তোমরা একে অপরের শত্রু; এবং পৃথিবীতে তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাসস্থান ও জীবিকা নির্ধারিত রইল” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৩৬)।
  • অবতরণস্থল: ঐতিহাসিক রেওয়ায়েত অনুযায়ী আদম (আ.) ভারত উপমহাদেশের সারান্দীপে এবং হাওয়া (আ.) আরবের জেদ্দায় অবতীর্ণ হন।
  • অনুতাপ ও রোনাজারি: বিচ্ছেদের তীব্র বেদনায় আদম (আ.) আল্লাহর ভয়ে দীর্ঘকাল অশ্রুপাত করেন। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা তাঁকে ক্ষমার বাক্যসমূহ শিক্ষা দিলেন (فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ):
    «رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ»
    (সূরা আল-আ’রাফ: ২৩)।
  • তাওবা কবুল ও পুনর্মিলন: আল্লাহ তাঁদের তাওবা কবুল করে নিষ্পাপ ঘোষণা করলেন। অতঃপর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মক্কার আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতে তাঁদের পুনর্মিলন ঘটে এবং সেখান থেকেই পৃথিবীতে মানব সভ্যতার বিস্তার শুরু হয়।

١٠- أَخْبَرَنِي أَبُو جَعْفَرٍ مُحَمَّدُ بْنُ حَاتِمٍ الْكَشِّيُّ ثَنَا عَبْدُ بْنُ حُمَيْدٍ أَنْبَأَ أَبُو عَاصِمٍ عَنْ عَزْرَةَ بْنِ ثَابِتٍ حَدَّثَنِي عِلْبَاءُ بْنُ أَحْمَرَ الْيَشْكُرِيُّ عَنْ أَبِي زَيْدٍ قَالَ: قَالَ لِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا أَبَا زَيْدٍ ادْنُ فَامْسَحْ ظَهْرِي»، قَالَ: فَدَنَوْتُ مِنْهُ وَمَسَحْتُ ظَهْرَهُ وَوَضَعْتُ أَصَابِعِي عَلَى الْخَاتَمِ فَغَمَزْتُهَا، فَقِيلَ لَهُ: وَمَا الْخَاتَمُ؟ قَالَ: شَعْرٌ مُجْتَمِعٌ عِنْدَ كَتِفَيْهِ- هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ وَلَمْ يُخَرِّجَاهُ-

[১০. আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে হাতিম আল-কাশ্শী আমাকে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন আবদ ইবনে হুমাইদ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন আবু আসিম আমাদের সংবাদ দিয়েছেন আযরাহ ইবনে সাবিত থেকে, তিনি বলেন ইলবা ইবনে আহমার আল-য়াশকরী আমার কাছে আবু যায়দ (রা.) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন: “হে আবু যায়দ! কাছে এসো এবং আমার পিঠে হাত বুলাও।” তিনি বলেন: আমি তাঁর নিকটবর্তী হলাম এবং তাঁর পিঠে হাত বুলালাম এবং আমার আঙুলগুলো মোহরে নবুওয়াতের ওপর রেখে তাতে মৃদু স্পর্শ (চাপ) করলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো: সেই মোহরটি কী ছিল? তিনি বললেন: তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে একগুচ্ছ পুঞ্জীভূত পশম (মাংসের ওপর গজানো চুল)। — ইমাম হাকিম বলেন: এই হাদীসটির সনদ সহীহ, কিন্তু বুখারী ও মুসলিম তা সংকলন করেননি।]

হাদীসের ভাবার্থ ও রাবী পরিচয়:

অনুবাদ: হযরত আবু যায়দ আমর ইবনে আখত্বাব আল-আনসারী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করলেন: “হে আবু যায়দ! আমার সন্নিকটে এসো এবং আমার পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করো (ম্যাসেজ করো)।” তিনি বলেন: আমি তাঁর সান্নিধ্যে গেলাম এবং তাঁর পৃষ্ঠদেশ মাসেহ করলাম। এ সময় আমার আঙুলগুলো (নবীজীর পিঠে অবস্থিত) ‘খাতামুন নবুওয়াত’ (মোহরে নবুওয়াত)-এর ওপর পড়ল এবং আমি তা আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে টিপলাম। বর্ণনাকারী বলেন, আবু যায়দ (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: সেই খাতাম বা মোহরটি কেমন ছিল? তিনি উত্তরে বললেন: “তাঁর উভয় কাঁধের সংযোগস্থলে কেশের এক সুবিন্যস্ত সমাবেশ।”

হাদীসের শব্দার্থ ও সনদ মান:

  • ادْنُ (উদনু): সন্নিকটে আসো (دنا يدنو ধাতু থেকে أمر)।
  • فَغَمَزْتُهَا (ফাগামাযতুহা): আঙুল দিয়ে মৃদু চাপ দিলাম বা স্পর্শ করলাম।
  • شَعْرٌ مُجْتَمِعٌ: একত্রিত পশম বা চুল যা সিলমোহরের মতো শোভা পাচ্ছিল।
  • ইমাম হাকিমের সিদ্ধান্ত: ইমাম হাকিম নিশাপুরী বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ সকলে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য; তবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম এই সুনির্দিষ্ট শব্দে হাদীসটি সংকলন করেননি।

(الف) ماذا تعرف عن الخاتم؟ بين آراء المحدثين والمؤرخين عن مكانه وصورته-

‘খাতামুন নবুওয়াত’ (মোহরে নবুওয়াত)-এর বিশদ তাত্ত্বিক পরিচয়, স্থান ও রূপরেখা:

১. খাতামুন নবুওয়াতের পরিচয় ও তাৎপর্য:

‘খাতামুন নবুওয়াত’ (خاتم النبوة) হলো বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র পৃষ্ঠদেশে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এক সুমহান ও মুজিযাপূর্ণ শারীরিক নিদর্শন। এটি ছিল পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে (তাওরাত ও ইঞ্জিল) বর্ণিত শেষ নবীর অকাট্য আলামত। এই মোহর দেখেই সিরিয়ার নাসত্বূরা ও বাহীরা পাদ্রী শৈশবে নবীজীকে চিনেছিলেন এবং পরবর্তীতে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত সালমান ফারসী (রা.) দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে সত্য নবীকে নিশ্চিতভাবে চেনার জন্য এই মোহর প্রত্যক্ষ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

২. মোহরে নবুওয়াতের অবস্থান (مكانه في الجسد الشريف):

মুহাদ্দিসীন ও সীরাত বিশারদগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী:

  • মোহরে নবুওয়াত ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র পিঠে উভয় কাঁধের মধ্যবর্তী অংশে (بين كتفيه)।
  • বিশেষ করে এটি বাম কাঁধের হাড়ের কিছুটা সন্নিকটে (عند ناغض كتفه اليسرى) অবস্থিত ছিল, যা ঠিক অন্তরের সমান্তরাল স্থানে পৃষ্ঠদেশে শোভা পাচ্ছিল। হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.) ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেন, মোহরটি অন্তরের সন্নিকটে পৃষ্ঠদেশে স্থাপন করার এক অনুপম হিকমত ছিল—যাতে অন্তরে শয়তানের প্রবেশপথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ ও সিলগালা করা থাকে এবং ওহী ও নূরের ধারক হিসেবে সংরক্ষিত থাকে।

৩. মোহরে নবুওয়াতের রূপ ও আকৃতি (صورته وصفته):

সহীহ হাদীসের বিভিন্ন রেওয়ায়েতে সাহাবায়ে কিরাম মোহরে নবুওয়াতের যে চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন, তা নিম্নরূপ:

  • ১. কবুতরের ডিমের মতো উঁচু মাংসপিণ্ড: হযরত সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) ও জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বর্ণনা করেন: «فَنَظَرْتُ إِلَى خَاتَمِ النُّبُوَّةِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ مِثْلَ زِرِّ الْحَجَلَةِ، أَوْ بَيْضَةِ الْحَمَامَةِ» অর্থাৎ “আমি তাঁর উভয় কাঁধের মাঝে অবস্থিত মোহরে নবুওয়াত প্রত্যক্ষ করেছি, যা ছিল কবুতরের ডিমের ন্যায় বা মশারি বা বোতামের মতো একটি চমৎকার উঁচু লালচে মাংসপিণ্ড” (সহীহ বুখারী: ৩৫৪১, সহীহ মুসলিম: ২৩৪৬)।
  • ২. পুঞ্জীভূত তিল ও পশমের সমাবেশ: আলোচ্য হাদীসে আবু যায়দ (রা.) বলেছেন: «شَعْرٌ مُجْتَمِعٌ» অর্থাৎ তার চারপাশে কতকগুলো ঘন পশম সুবিন্যস্ত ছিল। সালমান ফারসী (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, এতে কিছু তিল ও আঁচিলের মতো সৌন্দর্য ছিল।
  • ৩. বন্ধ মুষ্টির ন্যায়: কোনো কোনো সাহাবী একে এক মুষ্টি আঙুলের অগ্রভাগের মতো উঁচু বলে বর্ণনা করেছেন।
  • ৪. লিখিত রূপ সংক্রান্ত পর্যালোচনা: সাধারণ কিছু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে মোহরের ভেতর «محمد رسول الله» বা «سر فإنك منصور» লিখিত ছিল; তবে হাফিয ইবনে হাজার ও ইমাম ইবনু আব্দিল বার্র (রহ.) স্পষ্ট করেছেন যে, লেখার সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহ মুহাদ্দিসীনদের নিকট সনদের দিক থেকে সাব্যস্ত নয়। বরং বিশুদ্ধ মত হলো—এটি ছিল আল্লাহর কুদরতে গঠিত একটি সুন্দর ও আকর্ষণীয় উঁচু মাংসপিণ্ড, যা থেকে মৃগনাভী ও মেশকের ন্যায় সুবাস নির্গত হতো।

৪. মোহরে নবুওয়াত কখন স্থাপিত হয়েছিল?

অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে, নবী করীম (সা.) এই মোহর নিয়েই ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তবে বক্ষ বিদারণের (শাক্বক্বে সাদর) ঘটনার সময় জিবরীল (আ.) জমজম পানি দিয়ে তাঁর ক্বলব ধৌত করার পর এই মোহরটিকে চূড়ান্তভাবে অঙ্কিত ও সিলমোহরযুক্ত করে দেন। নবীজী (সা.)-এর ওফাতের পর এই মোহরটি অদৃশ্য হয়ে যায়, যা দেখে সাহাবায়ে কিরাম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ওহীর আগমন চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে।


١١- أَخْبَرَنِي أَبُو الطَّيِّبِ مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ الْحِيرِيُّ ثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الْوَهَّابِ ثَنَا يَعْلَى بْنُ عُبَيْدٍ ثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ عَنْ عَطَاءٍ مَوْلَى أُمِّ حَبِيبَةَ قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيَهْبِطَنَّ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلًا وَإِمَامًا مُقْسِطًا، وَلَيَسْلُكَنَّ فَجًّا حَاجًّا أَوْ مُعْتَمِرًا أَوْ بِنِيَّتِهِمَا، وَلَيَأْتِيَنَّ قَبْرِي حَتَّى يُسَلِّمَ وَلَأَرُدَّنَّ عَلَيْهِ»- يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ: «أَيْ بَنِي أَخِي! إِنْ رَأَيْتُمُوهُ فَقُولُوا: أَبُو هُرَيْرَةَ يُقْرِئُكَ السَّلَامَ»-

[১১. আবু তিব্ব মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল-হীরী আমাকে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইয়া’লা ইবনে উবাইদ আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক সাঈদ ইবনু আবি সাঈদ আল-মাক্ববুরী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি উম্মে হাবীবা (রা.)-এর মুক্তদাসী আত্বা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “মরিয়ম-পুত্র ঈসা অবশ্যই পৃথিবীতে ন্যায়পরায়ণ বিচারক ও সুবিচারক নেতা হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি হজ্জ বা ওমরাহ অথবা উভয়ের যৌথ নিয়তে পাহাড়ের গিরিপথ অতিক্রম করবেন। এবং তিনি অবশ্যই আমার কবরের সন্নিকটে এসে আমাকে সালাম জানাবেন, আর আমি অবশ্যই তাঁর সালামের উত্তর দেব।” অতঃপর আবু হুরায়রা (রা.) বলতেন: “হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্রগণ! তোমরা যদি তাঁকে জীবিত দেখতে পাও, তবে তাঁকে বলবে— আবু হুরায়রা আপনাকে সালাম জানিয়েছে!”]

হাদীসের ভাবার্থ ও শব্দার্থ:

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “মরিয়ম-তনয় ঈসা (আলাইহিস সালাম) অবশ্যই একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক ও সুবিচারক ইমাম হিসেবে (আকাশ থেকে) পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। তিনি গিরিপথ ধরে হজ্জ অথবা ওমরাহ কিংবা উভয়ের নিয়তে যাত্রা করবেন। এবং তিনি অবশ্যই আমার রওজা মোবারকের পাশে উপস্থিত হয়ে আমাকে সালাম পেশ করবেন, আর আমি তাঁর সালামের প্রতিউত্তর দান করব।” আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর ছাত্রদের সম্বোধন করে বলতেন: “হে আমার ভাতিজারা! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাঁর সাক্ষাৎ পাবে, সে যেন তাঁকে বলে— আবু হুরায়রা আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে!”

শব্দার্থ:

  • لَيَهْبِطَنَّ: অবশ্যই অবতরণ করবেন (লামে তাকিদ ও নূনে তাকিদে সাকীলা সম্বলিত)।
  • حَكَمًا عَدْلًا: কুরআন ও শরীয়তে মুহাম্মাদীর ভিত্তিতে বিচার ফয়সালাকারী ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক। তিনি নতুন কোনো শরীয়ত বা কিতাব নিয়ে আসবেন না, বরং বিশ্বনবীর উম্মত হিসেবে তাঁর শরীয়তের বিধান কার্যকর করবেন।
  • فَجًّا: দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী প্রশস্ত পথ বা উপত্যকা।
  • بِنِيَّتِهِمَا: হজ্জ ও ওমরাহ উভয়টির একসাথে ইহরাম (হজ্জে ক্বিরান)।

(الف) تحدث عن ولادة عيسى عليه السلام ورفعه إلى السماء؟ نزوله الى الارض قبل يوم القيامة موجزا-

হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম, আকাশে উত্তোলন ও কিয়ামতের পূর্বে অবতরণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

১. পিতা ব্যতীত অলৌকিক জন্ম (ولادته عليه السلام):

হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজিযা। মহান আল্লাহ হযরত মরিয়ম (আলাইহাস সালাম)-এর নিকট জিবরীল (আ.)-কে একজন সুদর্শন মানুষের বেশে প্রেরণ করেন। জিবরীল (আ.) ফুঁৎকার দিলে আল্লাহর নির্দেশে পিতা ব্যতীতই মরিয়ম (আ.) গর্ভধারণ করেন (সূরা মারইয়াম: ১৯-২১)। সমাজের অপবাদ থেকে রক্ষা করতে আল্লাহ সদ্যজাত শিশু ঈসা (আ.)-কে বাকশক্তি দান করেন। দোলনায় শুয়ে তিনি ঘোষণা করলেন: «إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا» অর্থাৎ “আমি তো আল্লাহর বান্দা; তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন” (সূরা মারইয়াম: ৩০)।

২. সশরীরে আকাশে উত্তোলন (رفعه إلى السماء):

বনী ইসরাঈলের পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় যখন ঈসা (আ.)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে রোমান শাসকের যোগসাজশে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করল, তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে জীবিতাবস্থায় আসমানে তুলে নিলেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইয়াহুদীদের দাবি নাকচ করে দেন:

«وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ ۚ … بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا»

“অথচ তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং তাদের জন্য একজনকে তাঁর সদৃশ করে দেওয়া হয়েছিল… প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাঁকে স্বীয় সান্নিধ্যে (আসমানে) তুলে নিয়েছেন; আর আল্লাহ হলেন মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আন-নিসা: ১৫৭-১৫৮)

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের সর্বসম্মত আকীদা হলো— ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেননি, বরং তিনি রূহ ও শরীর সহ জীবিতাবস্থায় দ্বিতীয় আসমানে অবস্থান করছেন।

৩. কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে পুনঃঅবতরণ (نزوله إلى الأرض):

কিয়ামতের অন্যতম প্রধান ও অকাট্য আলামত হলো ঈসা (আ.)-এর পৃথিবীতে আগমন। হাদীসে নববীতে তাঁর পুনরাগমনের বিশদ বিবরণ এসেছে:

  • অবতরণস্থল: তিনি ফজর নামাযের সময় সিরিয়ার দামেশক নগরীর পূর্ব প্রান্তের শ্বেত মিনারে (المنارة البيضاء) দুই ফেরেশতার পাখার ওপর হাত রেখে হালকা জাফরানী রঙের পোশাকে অবতীর্ণ হবেন। তাঁর মাথা থেকে মুক্তার মতো পানির ফোঁটা ঝরতে থাকবে।
  • ইমাম মাহদীর সাথে নামায: তিনি অবতরণ করে দেখতে পাবেন মুসলিম সেনাদল নামাযের জন্য প্রস্তুত। হযরত ইমাম মাহদী (আ.) তাঁকে নামাযের ইমামতি করার অনুরোধ করবেন; কিন্তু ঈসা (আ.) বলবেন: “তোমাদের একজন অপরজনের ইমাম, যা এই উম্মতের প্রতি আল্লাহর এক বিশেষ সম্মান।” তিনি মুক্তাদী হিসেবে মাহদীর পেছনে নামায আদায় করবেন।
  • দাজ্জাল নিধন: ভণ্ড কানা দাজ্জাল ঈসা (আ.)-এর সুবাস পেয়ে পানিতে লবণের ন্যায় গলতে শুরু করবে। অবশেষে ফিলিস্তিনের লুদ (লুদ্দ)-এর ফটকে ঈসা (আ.) স্বীয় বর্শা দিয়ে দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং মানবজাতিকে তার ফিতনা থেকে মুক্ত করবেন।
  • ইয়াজূজ-মাজূজের বিনাশ: ঈসা (আ.) মুমিনদের নিয়ে তূর পর্বতে আশ্রয় নেবেন এবং তাঁর দু’আর বরকতে মহামারীর মাধ্যমে ইয়াজূজ-মাজূজ ধ্বংস হবে।
  • সুশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা: তিনি ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন (খ্রিষ্টবাদের ভ্রান্ত ত্রিত্ববাদ বিলুপ্ত করবেন), শুকর নিধন করবেন এবং জিযিয়া রহিত করে সমগ্র পৃথিবীতে একমাত্র ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। পৃথিবী এমন শান্তি ও সম্প্রীতিতে ভরে উঠবে যে বাঘ ও মেষ একসাথে চরে বেড়াবে, বিষধর সাপের বিষ দূর হয়ে যাবে এবং সর্বত্র বরকত উপচে পড়বে।
  • ওফাত: তিনি পৃথিবীতে চল্লিশ বছর ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে জীবনযাপন করবেন, বিবাহ করবেন, সন্তান হবে এবং হজ্জ সম্পাদন করবেন। অতঃপর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবেন এবং মুসলমানরা তাঁর জানাযা পড়ে মদীনা মুনাওয়ারায় নবী করীম (সা.) ও শায়খাইন (আবু বকর ও উমর রা.)-এর রওজার পাশে তাঁকে দাফন করবে।

١٢- حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ إِسْحَاقَ أَنْبَأَ هِشَامُ بْنُ عَلِيٍّ ثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ ثَنَا هَاوَدُ بْنُ أَبِي الْفُرَاتِ ثَنَا عِلْبَاءُ بْنُ أَحْمَرَ عَنْ عِكْرِمَةَ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَفْضَلُ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ: خَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ، وَفَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ، وَمَرْيَمُ ابْنَتُ عِمْرَانَ، وَآسِيَةُ بِنْتُ مُزَاحِمٍ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ»- هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ وَلَمْ يُخَرِّجَاهُ بِهَذَا اللَّفْظِ-

[১২. আবু বকর ইবনে ইসহাক আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন হিশাম ইবনে আলী আমাদের সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন মূসা ইবনে ইসমাঈল আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন হাউদ ইবনু আবিল ফুরাত আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন ইলবা ইবনে আহমার ইকরামা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “সমগ্র জাহানের নারীকুলের মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন চারজন: খুওয়াইলিদ-কন্যা খাদীজাহ, মুহাম্মদ-কন্যা ফাতিমাহ, ইমরান-কন্যা মারইয়াম এবং ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম।” — ইমাম হাকিম বলেন: এই হাদীসটির সনদ সহীহ, তবে বুখারী ও মুসলিম এই নির্দিষ্ট শব্দবিন্যাসে তা সংকলন করেননি।]

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ তরজমা ও ফযিলত

অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “বিশ্বজগতের নারীদের মধ্যে সর্বোত্তম মর্যাদাবান হলেন চারজন মহীয়সী নারী: ১. খাদীজাহ বিনতে খুওয়াইলিদ, ২. ফাতিমাহ বিনতে মুহাম্মদ, ৩. মারইয়াম বিনতে ইমরান, এবং ৪. ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম (রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না)।”

(ألف) اكتب نبذة من حياة خديجة بنت خويلد (رض) مختصرا-

উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজাহ বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত:

১. নাম, বংশ ও জাহিলী যুগের উপাধি:

তাঁর নাম খাদীজাহ (خَدِيجَةُ)। পিতার নাম খুওয়াইলিদ ইবনে আসাদ এবং মাতার নাম ফাতিমা বিনতে যায়িদাহ। তিনি কুরাইশ বংশের বনু আসাদ শাখার এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জাহিলিয়াতের যুগে চরম নৈতিক অবক্ষয়ের মাঝেও তাঁর নিষ্কলুষ চরিত্র, সততা ও আত্মমর্যাদার কারণে মক্কাবাসী তাঁকে «الطَّاهِرَةُ» (আত-ত্বাহিরা — পরম পূত-পবিত্রা) এবং ‘সাইয়্যিদাতু কুরাইশ’ (কুরাইশদের নেত্রী) উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

২. ব্যবসা ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বিবাহ:

হযরত খাদীজাহ (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও সফল ব্যবসায়ী। তিনি চুক্তিভিত্তিক ব্যবসার জন্য বিশ্বস্ত মানুষের সন্ধান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সত্যবাদিতা, আমানতদারী ও মহান চরিত্রের কথা শুনে তিনি স্বীয় বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে নবীজীকে সিরিয়ায় পাঠান। কাফেলায় তাঁর বিশ্বস্ত গোলাম মায়সারা নবীজীর অলৌকিক মর্যাদা ও নিখুঁত সততা প্রত্যক্ষ করে খাদীজাহ (রা.)-কে অবগত করে। এতে মুগ্ধ হয়ে চল্লিশ বছর বয়সে তিনি পঁচিশ বছর বয়সী যুবক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠান এবং মহা আনন্দের সাথে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়।

৩. পৃথিবীর সর্বপ্রথম মুসলমান ও ইসলামের আশ্রয়দাত্রী:

নবুওয়াতের দশম বর্ষে জিবরীল (আ.) যখন হেরা গুহায় ওহী নিয়ে অবতরণ করলেন, তখন নবীজী (সা.) ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে খাদীজাহ (রা.)-কে বললেন: «زَمِّلُونِي زَمِّلُونِي» (আমাকে চাদর দিয়ে আবৃত করো)। সেই চরম সংকটের মুহূর্তে হযরত খাদীজাহ (রা.) পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বনবীর নবুওয়াতকে সত্য বলে গ্রহণ করেন এবং ইসলাম কবুল করেন। তিনি নবীজীকে যে ঐতিহাসিক সান্ত্বনা দিয়েছিলেন তা ইতিহাসে চিরস্মরণীয়:

«كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللَّهُ أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الْكَلَّ، وَتَكْسِبُ الْمَعْدُومَ، وَتَقْرِي الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ»
(সহীহ বুখারী: ৩)

“কখনোই নয়! আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। কেননা আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায়ের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বকে উপার্জনক্ষম করেন, মেহমানের আতিথেয়তা করেন এবং ন্যায়ের পক্ষে বিপদে সাহায্য করেন।”

৪. ইসলামের জন্য অতুলনীয় ত্যাগ ও কুরবানী:

তিনি তাঁর অগাধ ধন-সম্পদের পুরোটাই ইসলামের দাওয়াত ও অসহায় মুসলমানদের সাহায্যে অকাতরে বিলিয়ে দেন। নবুওয়াতের সপ্তম থেকে দশম বর্ষ পর্যন্ত কুরাইশরা যখন নবীজী ও বনু হাশিমকে ‘শি’আবে আবু তালিবে’ দীর্ঘ তিন বছর সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করে বন্দি রাখে, তখন বৃদ্ধ বয়সেও খাদীজাহ (রা.) গাছের পাতা খেয়ে নবীজীর সাথে হাসিমুখে সেই অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছিলেন।

৫. মহান আল্লাহর সালাম ও জান্নাতের সুসংবাদ:

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার জিবরীল (আ.) নবীজী (সা.)-এর খেদমতে এসে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! এই যে খাদীজাহ একটি পাত্রে খাদ্য নিয়ে আপনার দিকে আসছেন। তিনি যখন পৌঁছাবেন, তখন আপনি তাঁকে তাঁর রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন! এবং তাঁকে জান্নাতে এমন এক মোতি বা মুক্তার তৈরি সুরম্য প্রাসাদের সুসংবাদ দেবেন, যেখানে কোনো প্রকার কোলাহল বা কষ্ট-ক্লান্তি থাকবে না” (সহীহ বুখারী: ৩৮২০, সহীহ মুসলিম: ২৪৩২)।

৬. ওফাত ও নবীজীর চিরন্তন ভালোবাসা:

শি’আবে আবু তালিবের অবরোধ সমাপ্তির পর নবুওয়াতের দশম বর্ষে রমযান মাসে প্রায় ৬৫ বছর বয়সে এই মহান নারী মক্কায় ইন্তিকাল করেন। একই বছর নবীজীর পরম অভিভাবক চাচা আবু তালিবও ইন্তিকাল করায় নবীজী এই বছরকে «عَامُ الْحُزْنِ» (আমুল হুযন বা দুঃখের বছর) হিসেবে ঘোষণা করেন। খাদীজাহ (রা.)-এর জীবদ্দশায় নবীজী আর কোনো বিবাহ করেননি এবং তাঁর ওফাতের পরও সারাজীবন তাঁকে গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করতেন এবং তাঁর বান্ধবীদের ঘরে গোশত হাদিয়া পাঠাতেন। মক্কার জান্নাতুল মু’আল্লা গোরস্থানে তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় দাফন করা হয়।


مجموعة (د) — المقالات النظرية والتاريخية (তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রবন্ধসমূহ)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (أجب عن الأسئلة الآتية بالتفصيل)


١٣- أُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ أَحْوَالِ أَبِي عَبْدِ اللهِ الْحَاكِمِ النَّيْسَابُورِيِّ مَعَ بَيَانِ مَكَانَةِ كِتَابِهِ ‘الْمُسْتَدْرَكِ’ بَيْنَ كُتُبِ الْحَدِيثِ-

[১৩. ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকিম নিশাপুরী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা কর এবং হাদীসগ্রন্থসমূহের মধ্যে তাঁর ‘আল-মুস্তাদরাক’ গ্রন্থের স্থান ও মর্যাদা বর্ণনা কর।]

ভূমিকা:

ইলমে হাদীস সংরক্ষণ, হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাই এবং মুহাদ্দিসগণের শর্তাবলী নির্ণয়ে চতুর্থ ও পঞ্চম হিজরী শতকের অন্যতম প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্ব হলেন হাফিযুল উম্মাহ ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকিম নিশাপুরী (রহ.)। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের অনুকরণে এবং তাঁদের নির্ধারিত কঠোর শর্তানুযায়ী সহীহ হাদীস সংকলনের যে মহান উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা হাদীস সাহিত্যের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

১. ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রহ.)-এর জীবনচরিত:

  • নাম, উপনাম ও বংশ পরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হামদাওয়াইহ ইবনে নু’আইম আত-তাহমী আল-ফারাবী আন-নায়সাবুরী। উপনাম ‘আবু আব্দুল্লাহ’ এবং উপাধি «الْحَاكِمُ» (আল-হাকিম) ও ‘ইমামুল মুহাদ্দিসীন’। বিচারক (কাজী) হিসেবে অনন্য দায়িত্ব পালন করায় তিনি ‘আল-হাকিম’ নামে সমধিক পরিচিত লাভ করেন।
  • জন্ম ও শৈশব: তিনি ৩২১ হিজরীতে (৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে) তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম তীর্থভূমি ইরানের খোরাসান প্রদেশের নিশাপুর নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল ইলম চর্চায় প্রসিদ্ধ; পিতা ও মামার তত্ত্বাবধানে শৈশবেই তিনি ইলমে হাদীস চর্চা শুরু করেন।
  • ইলমী সফর ও উস্তাদবৃন্দ: তিনি হাদীসের সন্ধানে খোরাসান, ইরাক, হিজায, জিবাল এবং মার্ভ সফর করেন। প্রায় দুই সহস্রাধিক উস্তাদের কাছ থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেছেন। তাঁর প্রধান উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন:
    • ইমাম দারাকুতনী (রহ.): বিখ্যাত ‘সুনানে দারাকুতনী’-এর প্রণেতা ও ইলমুল ইলালের ইমাম।
    • আবু আলী আন-নায়সাবুরী, ইবনুস সিম্মাক, আবুল আব্বাস আল-আসাম্ম।
    • আবু আহমাদ আল-আস্সাল ও আবু বকর আহমাদ ইবনে ইসহাক আস-সিবগ্বী।
  • প্রধান ছাত্রবৃন্দ: তাঁর দরবারে বিশ্বখ্যাত আলেমদের সমাবেশ ঘটেছিল। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রধান হলেন ইমাম আবু বকর আহমাদ ইবনুল হুসাইন আল-বায়হাকী (রহ.), যিনি ইমাম হাকিমের গভীর সান্নিধ্য লাভ করেন। এছাড়া হাফিয আবু নু’আইম আল-ইস্পাহানী ও আবু মুহাম্মদ আল-জুওয়াইনী তাঁর ছাত্র ছিলেন।
  • বিচারপতি (কাজী) হিসেবে দায়িত্ব: ৩৫৯ হিজরীতে সামানী শাসকগোষ্ঠী তাঁকে নিশাপুরের কাজী পদে নিযুক্ত করেন। পরবর্তীতে তিনি জর্জানের কাজীর দায়িত্বও অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সাথে পালন করেন।
  • গ্রন্থাবলী: তিনি অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে প্রধান হলো:
    • আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন (الْمُسْتَدْرَكُ عَلَى الصَّحِيحَيْنِ)
    • মা’রিফাতু উলূমিল হাদীস (مَعْرِفَةُ عُلُومِ الْحَدِيثِ) — উসূলে হাদীসের আদি প্রামাণ্য গ্রন্থ।
    • তারীখু নায়সাবুর (تَارِيخُ نَيْسَابُورَ)
    • আল-মাদখাল ইলা মা’রিফাতি কিতাবিল ইকলীল
  • ওফাত: ইলমে হাদীসের এই দিকপাল ৩ সফর ৪০৫ হিজরীতে (১০১৪ খ্রিষ্টাব্দে) ৮৪ বছর বয়সে নিশাপুরে ইন্তিকাল করেন।

২. হাদীস শাস্ত্রে ‘আল-মুস্তাদরাক’ গ্রন্থের স্থান ও মর্যাদা:

‘মুস্তাদরাক’ (مستدرك) এমন এক বিশেষ সংকলন পদ্ধতিকে বলা হয়, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট লেখক বা গ্রন্থের শর্তানুযায়ী বিশুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মূল গ্রন্থে যে সমস্ত হাদীস স্থান পায়নি, সেগুলোকে পরবর্তীতে যুক্ত ও সংকলিত করা হয়। ইমাম হাকিমের লক্ষ্য ছিল—ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম যে সমস্ত রাবী ও সনদের শর্তের ওপর ভিত্তি করে সহীহ হাদীস সংকলন করেছেন, সেই শর্তানুযায়ী উত্তীর্ণ কিন্তু সহীহাইনে না আসা অবশিষ্ট সহীহ হাদীসগুলোকে এক কিতাবে একত্র করা।

৩. মুস্তাদরাকের হাদীসের স্তরবিন্যাস:

ইমাম হাকিম তাঁর সংকলিত হাদীসগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করেছেন:

  • ১. শায়খাইন উভয়ের শর্তে উত্তীর্ণ (صحيح على شرط الشيخين): যে হাদীসের রাবীগণ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম উভয় কিতাবের কেন্দ্রীয় বর্ণনাকারী।
  • ২. কেবল ইমাম বুখারীর শর্তে উত্তীর্ণ (صحيح على شرط البخاري)।
  • ৩. কেবল ইমাম মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ (صحيح على شرط مسلم)।
  • ৪. সনদের দিক থেকে সহীহ, তবে শায়খাইনের শর্তে নয় (صحيح الإسناد ولم يخرجاه): অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত রাবীদের সূত্রে বর্ণিত সহীহ হাদীস।

৪. মুস্তাদরাক গ্রন্থের মূল্যায়ন ও ইমাম যাহাবীর ‘তালখীস’:

মুহাদ্দিসীনদের ঐকমত্য অনুযায়ী, ইমাম হাকিম তাঁর জীবনের শেষ ভাগে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মুস্তাদরাক সংকলন করেছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্বে তিনি গ্রন্থটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে পরিমার্জন ও পর্যালোচনার (তাহযীব ও তানকীহ) সুযোগ পাননি। এর ফলে গ্রন্থটিতে সহীহ হাদীসের পাশাপাশি কিছু হাসান, কিছু জয়ীফ এবং অসাবধানতাবশত অতি সামান্য কিছু জাল (মাওযূ’) বর্ণনাও ঢুকে পড়েছিল। এজন্য উলামায়ে কিরাম তাঁকে হাদীস সহীহ বলার ক্ষেত্রে ‘মুতাসাহিল’ (শিথিলতাকারী) বলে উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তীতে অষ্টম হিজরী শতকের শ্রেষ্ঠ রিজাল শাস্ত্রবিদ ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.) মুস্তাদরাকের প্রতিটি হাদীসকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে রচনা করেন «تَلْخِيصُ الْمُسْتَدْرَكِ» (তালখীসুল মুস্তাদরাক)। ইমাম যাহাবী যে সমস্ত হাদীসকে সহীহ বলে সমর্থন করেছেন, সেগুলো মুহাদ্দিসীনদের নিকট নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে সমাদৃত। সহীহ বুখারী, মুসলিম, ইবনে খুযায়মাহ ও ইবনে হিব্বানের পরই মুস্তাদরাকে হাকিমের স্থান।


١٤- اُكْتُبْ مَقَالَةً حَوْلَ “صَحِيحِ ابْنِ حِبَّانَ” مُشْتَمِلَةً عَلَى النِّقَاطِ التَّالِيَةِ: (أَلِف) اِسْمُ الْمُؤَلِّفِ مَعَ بَيَانِ رِحْلَاتِهِ الْعِلْمِيَّةِ وَصِفَاتِهِ- (ب) اِبْنُ حِبَّانَ مُتَشَدِّدٌ أَمْ مُتَسَاهِلٌ فِي نَقْلِ الْحَدِيثِ وَالرِّجَالِ- (ج) مَنْزِلَتُهُ بَيْنَ كُتُبِ الْحَدِيثِ-

[১৪. “সহীহ ইবনে হিব্বান” সম্পর্কে একটি বিশদ প্রবন্ধ রচনা কর, যাতে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে: (ক) গ্রন্থকারের নাম, তাঁর ইলমী সফর ও গুণাবলী, (খ) হাদীস বর্ণনা ও রিজাল শাস্ত্রে ইবনে হিব্বান মুতাশাদ্দিদ (কঠোর) নাকি মুতাসাহিল (শিথিল)? (গ) হাদীসের কিতাবসমূহের মধ্যে এই গ্রন্থের মর্যাদা ও অবস্থান।]

(ক) গ্রন্থকারের নাম, ইলমী সফর ও চারিত্রিক গুণাবলী:

  • নাম ও বংশ পরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান ইবনে আহমাদ ইবনে হিব্বান ইবনে মু’আজ আত-তামীমী আদ-দারেমী আল-বুসতী (أَبُو حَاتِمٍ مُحَمَّدُ بْنُ حِبَّانَ البُسْتِيّ)। তিনি বর্তমান আফগানিস্তানের অন্তর্গত ঐতিহাসিক ‘বুস্ত’ (Bust) নগরীর অধিবাসী ছিলেন বলে তাঁকে ‘আল-বুসতী’ এবং বনু তামীম গোত্রের হওয়ায় ‘আত-তামীমী’ বলা হয়।
  • ইলমী সফর (رحلاته العلمية): ইলমে হাদীস অন্বেষণে ইমাম ইবনে হিব্বান তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সুবিশাল ভৌগোলিক সফর করেন। তিনি খোরাসান, নিশাপুর, মার্ভ, সমরকন্দ, হেরাত, বুখারা, বাগদাদ, বসরা, কূফা, ওয়াসিত, মক্কা, মদীনা, দামেশক, হিমস, বৈরুত, আসক্বালান, গাযযা এবং গোটা মিশর ও আলেকজান্দ্রিয়া পরিভ্রমণ করেন। শত শত উস্তাদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি লক্ষাধিক হাদীস সংরক্ষণ করেন। তাঁর শীর্ষস্থানীয় উস্তাদদের মধ্যে রয়েছেন—ইমাম আবু আব্দুর রহমান আন-নাসায়ী (সুনানে নাসায়ীর প্রণেতা), ইমাম আবু বকর ইবনে খুযায়মাহ (সহীহ ইবনে খুযায়মার প্রণেতা), আবুল কাসিম আল-বাগাবী এবং আবু ইয়া’লা আল-মাওসিলী।
  • গুণাবলী ও পাণ্ডিত্য: ইমাম ইবনে হিব্বান কেবল একজন মুহাদ্দিসই ছিলেন না; বরং তিনি একাধারে ফকীহ, উসূলবিদ, মুফাসসির, ইতিহাসবিদ, ভাষাবিদ, যুক্তিবিদ ও চিকিৎসাবিদ্যায় অসাধারণ বুৎপত্তির অধিকারী এক বহুশাস্ত্রদর্শী (Polymath) ইমাম ছিলেন। তিনি কিছুকাল সমরকন্দ, নাসা এবং সিসতানের প্রধান বিচারক (কাজী) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও সংকলন শৈলী তৎকালীন মুহাদ্দিসদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। ৩৫৪ হিজরীতে (৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) প্রায় আশি বছর বয়সে স্বীয় জন্মভূমি বুস্তে তিনি ইন্তিকাল করেন।

(খ) হাদীস ও রিজাল শাস্ত্রে ইবনে হিব্বানের অবস্থান: মুতাশাদ্দিদ না মুতাসাহিল?

ইলমুল জারহ ওয়াত তা’দীল ও রিজাল শাস্ত্রে ইমাম ইবনে হিব্বানের ভূমিকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গবেষণামূলক। মুহাদ্দিসীনদের গভীর পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ইমাম ইবনে হিব্বানের মাঝে একই সাথে তাশাদ্দুদ (চরম কঠোরতা) এবং তাসাহুল (শিথিলতা)-এর বিরল সমন্বয় ঘটেছে:

  • ১. জারহ বা সমালোচনার ক্ষেত্রে তিনি ‘মুতাশাদ্দিদ’ (চরম কঠোর): কোনো রাবীর দোষ-ত্রুটি বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত কঠোর মনোভাব পোষণ করতেন। সুপ্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য বহু রাবীকে তিনি সামান্য ত্রুটির কারণেও কঠোর সমালোচনা করে স্বীয় ‘কিতাবুল মাজরূহীন’ (كتاب المجروحين)-এ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। হাফিয যাহাবী ও ইবনে হাজার (রহ.) মন্তব্য করেছেন যে, ইবনে হিব্বানের জারাহর ক্ষেত্রে চরম কঠোরতা থাকায় কোনো রাবীর ব্যাপারে তাঁর একক সমালোচনা অন্যান্য মুহাদ্দিসদের দ্বারা সমর্থিত না হলে তা হুবহু গ্রহণ করা হয় না।
  • ২. তা’দীল বা নির্ভরযোগ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে তিনি ‘মুতাসাহিল’ (শিথিলতাকারী): অপরিচিত রাবীদের (المجاهيل) নির্ভরযোগ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে তাঁর একটি ব্যতিক্রমী উসূল ছিল। তাঁর মতে, কোনো রাবীর পরিচয় যদি জ্ঞাত হয়, তার থেকে নির্ভরযোগ্য কোনো উস্তাদ হাদীস বর্ণনা করেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো প্রকাশ্য কুফরী, ফিসক্ব বা বিদ’আতের প্রমাণ না থাকে—তবে তাকে ‘আদল’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে ধরে নিতে হবে (الأصل في المسلم العدالة حتى يثبت جرحه)। এই নীতির কারণে তিনি বহু ‘মাজহূলুল হাল’ (যার সততা প্রমাণিত নয় এমন) রাবীকে স্বীয় ‘কিতাবুছ ছিক্বাত’ (كتاب الثقات)-এ স্থান দিয়েছেন এবং তাঁদের হাদীসকে সহীহ বলেছেন।
  • উপসংহার: হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী ‘নুকাত’ গ্রন্থে চমৎকারভাবে সমাধান দিয়েছেন: “ইবনে হিব্বান পরিচিত রাবীদের দোষ ধরার ক্ষেত্রে মুতাশাদ্দিদ, কিন্তু অপরিচিত রাবীদের ছিক্বাহ বানানোর ক্ষেত্রে মুতাসাহিল।”

(গ) হাদীস সাহিত্যে সহীহ ইবনে হিব্বানের স্থান ও মর্যাদা:

  • গ্রন্থের মূল কাঠামো ও বিন্যাস: ইমাম ইবনে হিব্বান এই কিতাবটির মূল নাম রেখেছিলেন «التَّقَاسِيمُ وَالأَنْوَاعُ» (আত-তাক্বাসীম ওয়াল আনওয়া’)। এটি প্রচলিত ফিকহী তারতীবে (ঈমান, নামায, যাকাত) রচিত ছিল না; বরং তিনি এক সম্পূর্ণ অভিনব পদ্ধতিতে সমগ্র দ্বীনকে ৫টি প্রধান ভাগ (আহকাম, মানাহী, আখবার, নাওয়াহী, রাসূলুল্লাহর বৈশিষ্ট্য) এবং ৪০০টি উপ-প্রকারে বিভক্ত করেছিলেন। তাঁর এই জটিল বিন্যাসের কারণে পরবর্তীতে আমীর আলাউদ্দীন আল-ফারিসী (রহ.) একে অত্যন্ত সহজ ফিকহী অধ্যায়ে পুনর্সজ্জিত করেন, যা «الْإِحْسَانُ فِي تَقْرِيبِ صَحِيحِ ابْنِ حِبَّانَ» (আল-ইহসান ফী তাক্বরীবি সহীহি ইবনে হিব্বান) নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
  • মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এবং সহীহ ইবনে খুযায়মার পরই সহীহ হাদীসের চতুর্থ সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সংকলন হিসেবে সহীহ ইবনে হিব্বানকে স্থান দেওয়া হয়। জালালুদ্দীন সুয়ূতী ও হাফিয ইরাকী (রহ.) বলেন, সহীহ ইবনে হিব্বানের বিশুদ্ধতার স্তর মুস্তাদরাকে হাকিমের চেয়ে বহুগুণে উন্নত ও নির্ভরযোগ্য।

١٥- اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ الْإِمَامِ ابْنِ حَجَرٍ مَعَ بَيَانِ مَنْزِلَتِهِ فِي عِلْمِ الْحَدِيثِ-

[১৫. হাফিয ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোচনা কর এবং হাদীস শাস্ত্রে তাঁর সুউচ্চ আসন ও মর্যাদা বর্ণনা কর।]

১. হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহ.)-এর জীবনচরিত:

  • নাম, বংশ ও লকব: তাঁর পূর্ণ নাম আহমাদ ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আহমাদ আল-কিনানী আল-আসক্বালানী আল-মিসরী আশ-শাফে’ঈ। উপনাম ‘আবুল ফাদ্বল’ (أَبُو الْفَضْلِ) এবং লকব «شَيْخُ الْإِسْلَامِ» (শায়খুল ইসলাম) এবং «أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ فِي الْحَدِيثِ» (আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস)। তাঁর পূর্বপুরুষ ফিলিস্তিনের আসক্বালানের অধিবাসী ছিলেন বিধায় তাঁকে ‘আল-আসক্বালানী’ এবং বংশের এক প্রখ্যাত মনীষীর নাম ‘হাজার’ হওয়ায় তিনি ‘ইবনে হাজার’ নামে জগদ্বিখ্যাত।
  • জন্ম ও এতিম শৈশব: তিনি ৭৩ হিজরীর (১৩৭২ খ্রিষ্টাব্দ) شعبان মাসে মিসরের পুরাতন কায়রোতে নীল নদের তীরে জন্মগ্রহণ করেন। চার বছর বয়সেই তাঁর পিতা ও মাতা উভয়ই ইন্তিকাল করেন। এতিম অবস্থায় স্বীয় অভিভাবক যাকীউদ্দীন আল-খাররূবীর স্নেহচ্ছায়ায় তিনি নয় বছর বয়সে সম্পূর্ণ কুরআন হিফয সমাপ্ত করেন। এরপর মাত্র বারো বছর বয়সে মক্কা মুকাররামায় তারাবীহর নামাযে ইমামতি করেন।
  • ইলমী সফর ও উস্তাদবৃন্দ: ইলম অর্জনে তিনি তৎকালীন মুসলিম জাহানের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রসমূহ পরিভ্রমণ করেন। মিশর, আলেকজান্দ্রিয়া, মক্কা, মদীনা, ইয়েমেনের যাবীদ ও তাইয এবং সিরিয়ার দামেশক ও আলেপ্পো সফর করেন। তাঁর প্রধান উস্তাদগণের অন্যতম:
    • হাফিযুল আসর যায়নুদ্দীন আব্দুর রাহীম আল-ইরাকী (রহ.) — যাঁর সান্নিধ্যে তিনি দীর্ঘ দশ বছর হাদীসের উচ্চতর পাঠ গ্রহণ করেন।
    • সিরাজুদ্দীন আল-বালক্বীনী ও ইবনুল মুলাক্কিন (ফিকহ শাস্ত্রে)।
    • ভাষাবিদ আল্লামা মাজদুদ্দীন আল-ফীরোযাবাদী (রহ.) — ‘আল-ক্বামূসুল মুহীত’-এর প্রণেতা।
  • কাযিউল কুযাত (প্রধান বিচারপতি): ৮২৭ হিজরীতে খলীফার নির্দেশে তিনি মিসরের প্রধান বিচারপতির পদ অলঙ্কৃত করেন এবং অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠার সাথে দীর্ঘ ২১ বছর এই পদে বহাল থাকেন। তিনি কোনো প্রকার উপঢৌকন বা রাজনৈতিক প্রভাব বরদাশত করতেন না।
  • ওফাত: ২৮ যিলহজ্জ ৮৫২ হিজরীতে (১৪৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) ৭৯ বছর বয়সে ইলমে নববীর এই মহান অভিভাবক কায়রোতে ইন্তিকাল করেন। তৎকালীন সুলতান, আমীর, উলামা এবং প্রায় পঞ্চাশ সহস্রাধিক মানুষ তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। ইমাম শাফে’ঈ (রহ.)-এর মাযারের সন্নিকটে কারাফাহ গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

২. ইলমে হাদীসে হাফিয ইবনে হাজারের সুউচ্চ মর্যাদা ও অবদান:

হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানীকে হাদীস শাস্ত্রের ইতিহাসে «خَاتِمَةُ الْحُفَّاظِ» (সর্বশেষ মহান হাফিযে হাদীস) হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর পর আর কোনো ব্যক্তি হাদীসের সনদ ও মতন আয়ত্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। মুহাদ্দিসগণের ভাষায়: “ইবনে হাজারের ওপর ইলমে হাদীসের সমাপ্তি ঘটেছে।” তাঁর অমর অবদানসমূহ নিম্নরূপ:

  • ১. ফাতহুল বারী (فَتْحُ الْبَارِي بِشَرْحِ صَحِيحِ الْبُخَارِي): এটি সহীহ বুখারীর সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক প্রামাণ্য ও বিশ্বকোষীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থ। দীর্ঘ ২৫ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি এই অমর গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি সমাপ্তির পর মুসলিম জাহানে এমন এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল যে পণ্ডিতগণ ঘোষণা করেছিলেন: «لَا هِجْرَةَ بَعْدَ الْفَتْحِ» অর্থাৎ ‘ফাতহুল বারী রচিত হওয়ার পর হাদীসের ব্যাখ্যার জন্য আর কোথাও হিজরত বা খোঁজাখুঁজির প্রয়োজন নেই।’
  • ২. উসূলে হাদীসের পাঠ্যবই: উসূলে হাদীসের মূল দর্শন তিনি রচনা করেন «نُخْبَةُ الْفِكَرِ فِي مُصْطَلَحِ أَهْلِ الأَثَرِ» এবং তার বিশ্ববিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ «نُزْهَةُ النَّظَرِ», যা আজও বিশ্বের প্রতিটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দরসে নিযামীর কেন্দ্রীয় পাঠ্য।
  • ৩. রিজাল ও রাবী পর্যালোচনা: বর্ণনাকারীদের যাচাইয়ে তিনি রচনা করেন—
    • তাহযীবুত তাহযীব (تَهْذِيبُ التَّهْذِيبِ) ও তার সারসংক্ষেপ তাক্বরীবুত তাহযীব
    • লিসানুল মীযান (لِسَانُ الْمِيزَانِ)
    • তা’জীলুল মানফা’আহ
  • ৪. সাহাবায়ে কিরামের জীবনীকোষ: সাহাবীগণের সঠিক পরিচয় ও সংখ্যা নির্ণয়ে তাঁর রচিত «الإِصَابَةُ فِي تَمْيِيزِ الصَّحَابَةِ» এক অতুলনীয় ঐতিহাসিক দলিল, যাতে প্রায় ১২ সহস্রাধিক সাহাবীর পুঙ্খানুপুঙ্খ জীবনী সংকলিত হয়েছে।
  • ৫. ফিকহী হাদীসের তাখরীজ: হিদায়া ও রাফে’ঈর শারহুল ওয়াজীজের হাদীস যাচাইয়ে তিনি রচনা করেন তালখীসুল হাবীর (تَلْخِيصُ الْحَبِيرِ) এবং আদ-দিরায়াহ

١٦- اُكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ الْإِمَامِ الذَّهَبِيِّ مَعَ بَيَانِ مَنْزِلَتِهِ فِي عِلْمِ الرِّجَالِ-

[১৬. ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত আলোচনা কর এবং রিজাল শাস্ত্রে (রাবীদের সমালোচনামূলক বিদ্যায়) তাঁর সুউচ্চ আসন ও মর্যাদা বর্ণনা কর।]

১. ইমাম আয-যাহাবী (রহ.)-এর জীবনচরিত:

  • নাম ও বংশ পরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান ইবনে ক্বায়মায ইবনে আব্দুল্লাহ আত-তুর্কমানী আল-ফারিক্বী আদ-দিমাশক্বী আশ-শাফে’ঈ। উপনাম ‘আবু আব্দুল্লাহ’ এবং লকব «شَمْسُ الدِّينِ» (শামসুদ্দীন)। পিতা আহমাদ ইবনে উসমান একজন সুপ্রসিদ্ধ দক্ষ স্বর্ণকার (صائغ الذهب) ছিলেন বিধায় তিনি ‘ইবনুল যাহাবী’ বা «الذَّهَبِيُّ» (আয-যাহাবী) নামে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেন।
  • জন্ম ও লালন-পালন: তিনি রবিউল আখের ৬৭৩ হিজরীতে (১২৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) সিরিয়ার দামেশক নগরীতে এক সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালেই তিনি পবিত্র কুরআন হিফয সমাপ্ত করেন এবং বিভিন্ন ক্বিরাআতের ওপর দক্ষতা অর্জন করেন।
  • ইলমী সফর ও উস্তাদবৃন্দ: আঠারো বছর বয়স থেকে তিনি ইলমে হাদীস অন্বেষণে দামেশক, বা’লাবাক, আলেপ্পো, নাবলুস, বায়তুল মাকদিস, মক্কা, মদীনা, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া ও ত্রিপোলি সফর করেন। তাঁর উস্তাদের সংখ্যা সহস্রাধিক। তাঁর প্রধান উস্তাদগণের মধ্যে অন্যতম:
    • হাফিয জামালুদ্দীন আবুল হাজ্জাজ আল-মিযযী (রহ.) — ‘তাহযীবুল কামাল’-এর প্রণেতা।
    • শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) — যাঁর পাণ্ডিত্য ও গভীর চিন্তাধারায় যাহাবী ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন।
    • ইমাম ইবনে দাক্বীক্বিল ঈদ ও হাফিয আল-বিরযালী (রহ.)।
  • চরিত্র ও জীবনের শেষ ভাগ: তিনি ছিলেন চরম ন্যায়নিষ্ঠ, সত্যবাদী, পরহেযগার ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী মুহাদ্দিস। জীবনের শেষ ভাগে ৭১৪ হিজরীর পর তিনি উভয় চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। দৃষ্টিহীন অবস্থাতেও তিনি শিক্ষার্থীদের হাদীস পাঠ করাতেন। অবশেষে ৩ যিলক্বদ ৭৪৮ হিজরীতে (১৩৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) ৭৫ বছর বয়সে দামেশকে ইন্তিকাল করেন এবং ঐতিহাসিক বাব আল-সাগীর গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

২. রিজাল শাস্ত্রে (علم الرجال) ইমাম যাহাবীর অবিসংবাদিত মর্যাদা:

ইলমুর রিজাল বা রাবী সমালোচনাবিদ্যা (আসমাউর রিজাল ও আল-জারহু ওয়াত তা’দীল)-এর ক্ষেত্রে ইমাম যাহাবীকে সর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ও প্রামাণ্য দিকপাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আল্লামা তাজউদ্দীন আস-সুবকী (রহ.) ‘তাবাক্বাতুশ শাফে’ইয়্যা’ গ্রন্থে বলেন: «كَانَ شَيْخُنَا الذَّهَبِيُّ رَحِمَهُ اللهُ بَصِيرًا بِالرِّجَالِ، نَاقِدًا لِلْآثَارِ، إِمَامَ الْوُجُودِ فِي هَذَا الشَّأْنِ» অর্থাৎ “আমাদের উস্তাদ ইমাম যাহাবী ছিলেন রাবীদের ত্রুটি-বিচ্যুতি নির্ণয়ে প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, হাদীসের কঠোর পর্যালোচক এবং এই শাস্ত্রে তৎকালীন সমগ্র জগতের একচ্ছত্র ইমাম।”

রিজাল শাস্ত্রে তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য ও পদ্ধতি:

  • ১. অনন্য সুবিচার ও ইনসাফ (الإنصاف والعدالة): ইমাম যাহাবীর মূল্যায়নে কোনো প্রকার অন্ধ পক্ষমগ্নতা, মাযহাবী সংকীর্ণতা বা ব্যক্তিগত অনুরাগ স্থান পেত না। তিনি যে কোনো রাবীর প্রশংসা করার সময় যেমন কৃপণতা করেননি, তেমনি সমালোচনা করার সময়ও সীমার অতিক্রম করেননি। তাঁর ইনসাফপূর্ণ বিচার মুহাদ্দিসদের নিকট সর্বজনগ্রাহ্য মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
  • ২. সংক্ষিপ্ত ভাষায় চূড়ান্ত ফয়সালা: তিনি একটি মাত্র বাক্যে বা দু-একটি শব্দে রাবীর সামগ্রিক জীবনের গ্রহণযোগ্যতা ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। যেমন: ‘ছিক্বাহ ছাবত’, ‘লাইয়্যিনুল হাদীস’, ‘মাতরূক’, বা ‘সালেহ’।
  • ৩. রিজাল শাস্ত্রে তাঁর অমর সংকলনসমূহ:
    • সিয়ারু আ’লামিন নুবালা (سِيَرُ أَعْلَامِ النُّبَلَاءِ): ইসলামী ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনীকোষ (২৫ খণ্ডে সমাপ্ত)। এতে সাহাবী, তাবে’ঈ, মুহাদ্দিস, ফকীহ, খলীফা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের পুঙ্খানুপুঙ্খ জীবনী ও তাঁদের হাদীসের মান মূল্যায়ন করা হয়েছে।
    • মীযানুল ইতিদাল ফী নাক্বদির রিজাল (مِيزَانُ الِاعْتِدَالِ فِي نَقْدِ الرِّجَالِ): রিজাল শাস্ত্রে তাঁর কালজয়ী মাস্টারপিস। এতে তিনি দুর্বল, জয়ীফ, প্রত্যাখ্যাত ও বিতর্কিত রাবীদের বিস্তারিত তাহকীক পেশ করেছেন। পরবর্তীকালে ইবনে হাজারের ‘লিসানুল মীযান’ এই গ্রন্থের ওপরই রচিত হয়।
    • তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ (تَذْكِرَةُ الْحُفَّاظِ): চার খণ্ডে সমাপ্ত হাদীসের বিশ্বস্ত হাফিযগণের সুবিন্যস্ত ঐতিহাসিক অভিধান।
    • আল-কাশেফ (الْكَاشِفُ فِي مَعْرِفَةِ مَنْ لَهُ رِوَايَةٌ فِي الْكُتُبِ السِّتَّةِ): কুতুবে সিত্তাহর সমস্ত রাবীদের অতি মূল্যবান এক খণ্ডের সংক্ষিপ্ত সংকলন।
    • আল-মুগনী ফিয যু’আফা (الْمُغْنِي فِي الضُّعَفَاءِ): দুর্বল রাবীদের নির্ভরযোগ্য কোষগ্রন্থ।
    • তারীখুল ইসলাম (تَارِيخُ الإِسْلَامِ): ৫০ খণ্ডের সুবিশাল ঐতিহাসিক বিশ্বকোষ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. সহীহ ইবনে হিব্বান ও সহীহ ইবনে খুযায়মার সংকলন পদ্ধতির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

সহীহ ইবনে খুযায়মাহ প্রচলিত ফিকহী অধ্যায় অনুসারে সুবিন্যস্ত হয়েছে এবং ইমাম ইবনে খুযায়মাহ সনদের সামান্যতম দুর্বলতা বা ত্রুটি থাকলে তা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে সহীহ ইবনে হিব্বান কোনো ফিকহী অধ্যায়ে নয়, বরং ইমাম ইবনে হিব্বানের নিজস্ব আবিষ্কৃত ৫টি মূল বিভাগ ও ৪০০টি অভিনব প্রকারে সাজানো হয়েছিল; পরবর্তীতে আল-ফারিসী একে ফিকহী তারতীবে সাজান। এছাড়া ইবনে খুযায়মার শর্ত ইবনে হিব্বানের শর্ত অপেক্ষা কিছুটা কঠোর ও সতর্কতাপূর্ণ ছিল।

২. ইমাম হাকিমের ‘আল-মুস্তাদরাক’ কি সহীহাইনের শর্তে সম্পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ?

ইমাম হাকিম নিশাপুরী স্বীয় মুস্তাদরাকে সংকলিত বহু হাদীসকে ‘সহীহ আলা শারতিশ শায়খাইন’ (বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ) বলে দাবি করলেও মুহাদ্দিসীনদের পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সব হাদীস সেই কঠোর শর্তে উত্তীর্ণ নয়। ইমাম যাহাবীর তাহকীক অনুযায়ী, মুস্তাদরাকের অর্ধেকের বেশি হাদীস সহীহাইনের শর্তে উত্তীর্ণ, এক-চতুর্থাংশ বিশুদ্ধ বা হাসান পর্যায়ের এবং অবশিষ্ট অংশে কিছু দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ রেওয়ায়েত রয়েছে। তাই ইমাম যাহাবীর সমর্থন ব্যতীত হাকিমের একক রায় পূর্ণরূপে গৃহীত হয় না।

৩. ইলমে হাদীসে ‘হাফিয’ (حافظ) উপাধির অধিকারী হতে কী পরিমাণ হাদীস জানা আবশ্যক?

মুহাদ্দিসীনদের পরিভাষায় ‘হাফিয’ হলেন সেই মহান ব্যক্তি, যিনি সনদ, মতন, রাবীদের জারহ-তা’দীল, জীবনী এবং দুর্বলতা (ইলাল) সহ কমপক্ষে এক লক্ষ (১,০০,০০০) হাদীস পূর্ণাঙ্গভাবে মুখস্থ ও আয়ত্ত করেছেন। ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী, ইমাম আয-যাহাবী ও ইমাম হাকিম নিশাপুরী ছিলেন এই সুউচ্চ স্তরের অমর হাফিযে হাদীস।

৪. রিজাল শাস্ত্রে ‘মুতাশাদ্দিদ’ ও ‘مুতাসাহিল’ পরিভাষার সঠিক মর্মার্থ কী?

রিজাল শাস্ত্রে ‘মুতাশাদ্দিদ’ (متشدد) বলা হয় সেই সমালোচক মুহাদ্দিসকে, যিনি কোনো রাবীকে নির্ভরযোগ্য ঘোষণা করতে অত্যন্ত কঠোর শর্তারোপ করেন এবং সামান্য ত্রুটির কারণেও রাবীকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেন (যেমন ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, নাসায়ী ও আবু হাতিম আর-রাযী)। পক্ষান্তরে ‘মুতাসাহিল’ (متساهل) বলা হয় তাঁকে, যিনি রাবী যাচাইয়ে কিছুটা শিথিল মনোভাব প্রদর্শন করেন এবং সামান্য অনুকূল আলামত পেলেই তাকে নির্ভরযোগ্য ঘোষণা করেন বা হাদীসকে সহীহ বলেন (যেমন ইমাম তিরমিযী, হাকিম ও ইবনে হিব্বান)।

৫. ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘দিরাসাতুল হাদীস-২’ পাঠের ফায়দা কী?

দিরাসাতুল হাদীস-২ পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সিহাহ সিত্তাহর পরবর্তী স্তরের তিনটি প্রধান স্তম্ভ—সহীহ ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে খুযায়মাহ এবং আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিমের বর্ণনারীতি, সনদ বিশ্লেষণ ও সংকলন পদ্ধতির সাথে গভীর তাত্ত্বিক পরিচিতি লাভ করে। একই সাথে ইমাম ইবনে হাজার ও ইমাম যাহাবীর মতো শ্রেষ্ঠ মনীষীদের জীবন ও রিজাল শাস্ত্রের মূলনীতি আয়ত্ত করে উচ্চতর হাদীস গবেষণার পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।


উপসংহার

ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২-এর ‘দিরাসাতুল হাদীস-২’ (বিষয় কোড: ২০২৮০৭) প্রশ্নপত্রটি অত্যন্ত তথ্যবহুল, ভারসাম্যপূর্ণ এবং হাদীস গবেষণার উচ্চতর মানদণ্ডে রচিত। সহীহ ইবনে হিব্বান, সহীহ ইবনে খুযায়মাহ এবং আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিম—এই তিনটি প্রামাণ্য হাদীসগ্রন্থের নির্বাচিত পাঠ এবং হাদীস সাহিত্যের প্রধান দুই দিকপাল হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী ও ইমাম আয-যাহাবীর ওপর রচিত এই পূর্ণাঙ্গ ও রেফারেন্সভিত্তিক উত্তরমালা পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের নিশ্চয়তা প্রদানের পাশাপাশি তাদের হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয় ও রিজাল শাস্ত্রের জ্ঞানকে সুদৃঢ় করবে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন