জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-মুসনাদু লিল ইমাম আবি হানিফা, আশ-শাফিয়ী, আহমদ (Al-Musnad lil Imam Abi Hanifa, ash-Shafii, Ahmad) – 406, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২০

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
৭৬ মিনিট পড়ার সময়
১৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٠
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০]
القسم: الحديث والدراسات الإسلامية [বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المادة: المسند للإمام أبي حنيفة والمسند للإمام الشافعي والمسند للإمام أحمد
[বিষয়: আল-মুসনাদু লিল ইমাম আবি হানিফা, আশ-শাফিয়ী, আহমদ]
كود المادة [বিষয় কোড]: 406 | كود الامتحان [পরীক্ষা কোড]: 204 | كود ورقة الأسئلة [প্রশ্নপত্র কোড]: 173
الزمن [সময়]: ৪ ঘণ্টা | الدرجات الكاملة [পূর্ণমান]: ৮০

الملاحظة [দ্রষ্টব্য]: أجب عن أربعة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب) والدرجات متساوية- [ক বিভাগ (مجموعة أ) থেকে যে কোনো চারটি এবং খ বিভাগ (مجموعة ب) থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান সমান (১৬ নম্বর)।]


مجموعة (أ) – [ক বিভাগ]

নিচের হাদিসগুলোর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও। মান: ১৬ × ৪ = ৬৪


১. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলী

١- عن حماد بن إبراهيم عمن سمع أم عطية تقول: رخص للنساء في الخروج إلى العيدين حتى لقد كانت البكران تخرجان في الثوب الواحد حتى لقد كانت الحائض تخرج إلى المصلى فتجلس في عرض الناس ولا تصلي-

[১. হাম্মাদ ইবনে ইবরাহিম সূত্রে বর্ণিত, তিনি এমন এক ব্যক্তি থেকে শুনেছেন যিনি উম্মে আতিয়্যাহ (রা.)-কে বলতে শুনেছেন: “রমণীদের জন্য উভয় ঈদে (ঈদগাহে) বের হওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়েছিল। অবস্থা এমন ছিল যে, দুজন কুমারী মেয়ে একটিমাত্র চাদর পরিধান করে (পালাক্রমে বা একত্রে জড়িয়ে) বের হতো এবং ঋতুবতী মহিলারাও ঈদগাহে উপস্থিত হতো; অতঃপর তারা সাধারণ মানুষের পেছনে বসে থাকত এবং নামাজ আদায় করত না (কেবল দোয়া ও তাকবিরে শরিক হতো)।”]

(أ) أكتب أقوال الفقهاء الكرام في مسئلة خروج النساء إلى المصلى والمساجد-

[(ক) মহিলাদের ঈদগাহ ও মসজিদে গমন প্রসঙ্গে ফকিহগণের অভিমত আলোচনা কর।]

উত্তর:

ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে নারীদের মসজিদে জামাতে ও ঈদগাহে যাওয়ার সাধারণ অনুমতি ছিল। কিন্তু পরবর্তী যুগে সামাজিক অবক্ষয়, পাপাচার ও ফিতনার বিস্তারের কারণে এই বিধানের প্রয়োগে ফকিহগণের মধ্যে বিশদ বিশ্লেষণ ও মতামত রচিত হয়েছে:

  1. হানাফি মাযহাবের অভিমত (مذهب الحنفية):
    • প্রারম্ভিক অবস্থা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র যুগে নারীদের মসজিদে গিয়ে জামাতে ও ঈদগাহে নামাজ আদায়ের অনুমতি ছিল।
    • পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও বর্তমান ফতোয়া: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই সমাজ পরিবর্তনের ফলে ফিতনার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেন:

      لَوْ أَدْرَكَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ الْمَسَاجِدَ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ

      (যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতেন নারীরা পরবর্তীতে কী নতুন চালচলন উদ্ভাবন করেছে, তবে তিনি তাদের মসজিদে আসা নিষিদ্ধ করতেন, যেমন বনি ইসরাইলের নারীদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল – সহিহ বুখারি)।

    • এই প্রেক্ষিতে আমিরুল মুমিনিন হযরত ওমর (রা.) নারীদের জামাতে আসায় কড়াকড়ি আরোপ করেন। হানাফি ফকিহগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্তমানে যুবতী নারীদের জন্য মসজিদে জামাতে কিংবা ঈদগাহে যাওয়া মাকরূহে তাহরিমি। বৃদ্ধাদের ক্ষেত্রে ফজর, মাগরিব ও এশায় যাওয়ার অনুমতি প্রাথমিক কিতাবাদিতে থাকলেও ফতোয়ায়ে শামী ও পরবর্তী ফতোয়া গ্রন্থসমূহে সর্বযুগের ফিতনা রোধে সাধারণ সকল নারীর জন্যই মসজিদে না গিয়ে নিজ ঘরে নামাজ পড়াকে সর্বোত্তম ও ওয়াজিব সমতুল্য হুকুম সাব্যস্ত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

      صَلَاةُ الْمَرْأَةِ فِي بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي حُجْرَتِهَا، وَصَلَاتُهَا فِي مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي بَيْتِهَا

      (নারীদের অন্দরমহলের নামাজ বাইরের ঘরের নামাজের চেয়ে উত্তম এবং তাদের গোপন প্রকোষ্ঠের নামাজ অন্দরমহলের চেয়েও উত্তম – সুনানে আবি দাউদ)।

  2. শাফিয়ী মাযহাবের অভিমত (مذهب الشافعية):
    • ইমাম শাফিয়ী (রহ.) ও তাঁর অনুসারী ফকিহগণের মতে, অতি বৃদ্ধা ও অনাকর্ষণীয় নারীদের জন্য ঈদগাহ ও মসজিদে উপস্থিত হওয়া জায়েয ও মুস্তাহাব।
    • তবে রূপবতী, যুবতী ও আকর্ষণীয় নারীদের জন্য ঈদগাহ কিংবা মসজিদে যাওয়া মাকরূহ, যেন কোনো প্রকার ফিতনা ও নৈতিক স্খলনের সুযোগ সৃষ্টি না হয়।
  3. মালিকি মাযহাবের অভিমত (مذهب المالكية):
    • ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, যে বৃদ্ধাদের প্রতি পুরুষদের কোনো কামভাব বা আকর্ষণ থাকে না (المتجالة), তারা মসজিদে ও ঈদগাহে যেতে পারেন।
    • কিন্তু যে সকল নারী যুবতী কিংবা যাদের উপস্থিতিতে পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণের সামান্যতম সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের জন্য ঘরের বাইরে জামাতে যাওয়া নিষিদ্ধ বা মাকরূহ।
  4. হাম্বলি মাযহাবের অভিমত (مذهب الحنابلة):
    • হাম্বলি ফকিহগণের মতে, নারীদের জন্য মসজিদে ও ঈদগাহে যাওয়া মূলত জায়েয ও মুবাহ, যদি তারা পূর্ণাঙ্গ পর্দা রক্ষা করে, সুগন্ধি পরিহার করে এবং পুরুষদের সাথে সংমিশ্রণ ব্যতিরেকে নির্লিপ্তভাবে যাতায়াত করতে পারে। তবে ঘরে নামাজ আদায় করাই তাদের জন্য অধিক ফজিলতপূর্ণ।

(ب) حقق الكلمات الآتية: رخص، المصلى، تخرج، تجلس-

[(খ) শব্দসমূহের আভিধানিক ও ব্যাকরণগত তাহকিক কর: رخص، المصلى، تخرج، تجلس।]

উত্তর:

শব্দ (الكلمة) সিগাহ ও বাহাস (الصيغة والبحث) বাব ও মাছদার (الباب والمصدر) মাদাহ ও জিনস (المادة والجنس) অর্থ (المعنى)
رُخِّصَ واحد مذكر غائب، فعل ماض مجهول تفعيل، التَّرْخِيصُ ر – خ – ص، صحيح অনুমতি দেওয়া হয়েছিল / শিথিল করা হয়েছিল।
الْمُصَلَّى اسم ظرف مكان (أو اسم مفعول) تفعيل، التَّصْلِيَةُ ص – ل – و، ناقص واوي (معتل اللام) নামাজ আদায়ের স্থান, ঈদগাহ ময়দান।
تَخْرُجُ واحد مؤنث غائب، فعل مضارع معروف نَصَرَ – يَنْصُرُ، الْخُرُوجُ خ – ر – ج، صحيح সে (স্ত্রীবাচক) বের হয় / বের হতো।
تَجْلِسُ واحد مؤنث غائب، فعل مضارع معروف ضَرَبَ – يَضْرِبُ، الْجُلُوسُ ج – ل – س، صحيح সে (স্ত্রীবাচক) বসে / অবস্থান করে।

২. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলী

٢- حدثنا أبو سفيان عن عبد الله بن يزيد عن أبيه أنه صلى خلف الإمام فجهر ببسم الله الرحمن الرحيم فقال له حين انصرف اغن عنى كلمتك هذه فإني صليت خلف رسول الله صلى الله عليه وسلم وخلف أبي بكر وخلف عمر وعثمان رضى الله عنهم فلم أسمعها منهم-

[২. আবু সুফিয়ান আমাদের নিকট হাদিস বর্ণনা করেন আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযিদ সূত্রে, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি কোনো এক ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করলেন এবং সেই ইমাম সশব্দে (উচ্চস্বরে) ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ পাঠ করলেন। নামাজান্তে তিনি ইমামকে বললেন: “তোমার এই বাক্যটি (উচ্চস্বরে পড়া) আমার থেকে নিবৃত্ত রাখো। কেননা নিশ্চয়ই আমি রাসুলুল্লাহ (সা.), আবু বকর, ওমর এবং ওসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর পেছনে নামাজ আদায় করেছি, কিন্তু তাঁদের কাউকে তা উচ্চস্বরে পড়তে শুনিনি।”]

(أ) ركّب: بسم الله الرحمن الرحيم-

[(ক) ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’-এর নাহবি তারকিব কর।]

উত্তর:

আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্র (النحو) অনুযায়ী ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’-এর বিশদ তারকিব নিম্নরূপ:

  • البَاءُ (বা): حرف جر مبني على الكسر (যার-যুক্ত অব্যয়)।
  • اسْمِ (ইসম): اسم مجرور بالباء وعلامة جره الكسرة الظاهرة في آخره، وهو مضاف (বা যার-এর কারণে মাজরুর এবং এটি মুদাফ)।
  • شبه الجملة (بِسْمِ): الجار والمجرور متعلقان بمحذوف فعل مؤخر مناسب للمقام تقديره: “أَقْرَأُ” أو “أَبْدَأُ” (অথবা اسم فاعل محذوف تقديره: “ابْتِدَائِي”)। এখানে কর্মকে পূর্বে এবং ফেল-কে উহ্য রাখার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নামের মাধ্যমে বরকত হাসিল ও তাওহিদের পূর্ণ নিষ্ঠা (حصر ও اختصاص) বজায় রাখা।
  • اللهِ (আল্লাহ): لفظ الجلالة، مضاف إليه مجرور وعلامة جره الكسرة الظاهرة في آخره (মুদাফ ইলাইহ হিসেবে মাজরুর)।
  • الرَّحْمَنِ (আর-রাহমান): نعت أول (সিফাতে আওয়াল) للفظ الجلالة، مجرور وعلامة جره الكسرة الظاهرة।
  • الرَّحِيمِ (আর-রাহিম): نعت ثانٍ (সিফাতে সানি) للفظ الجلالة، مجرور وعلامة جره الكسرة الظاهرة।

(খ) هل البسملة جزء من الفاتحة أو من السورة أم هي جزء من القرآن؟ بين مع بيان أقوال العلماء-

[(খ) বিসমিল্লাহ কি সুরা ফাতেহা বা অন্য সুরার অংশ, নাকি কুরআনের স্বতন্ত্র আয়াত? ওলামায়ে কেরামের মতামতসহ আলোচনা কর।]

উত্তর:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পবিত্র কুরআনের অন্তর্ভুক্ত কিনা এবং তা সুরা ফাতেহা ও অন্যান্য সুরার অংশ কিনা—এ বিষয়ে মুফাসসির ও ফকিহগণের মাঝে সুনির্দিষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে:

  1. ঐকমত্যের ক্ষেত্র (محل الإجماع):

    সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও সকল ইমাম এ বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত যে, সুরা আন-নামলের ৩০ নম্বর আয়াতে বিদ্যমান বিসমিল্লাহ—﴿إِنَّهُ مِن سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ﴾—নিঃসন্দেহে পবিত্র কুরআনের একটি অবিচ্ছেদ্য আয়াতাংশ। এতে কারো কোনো দ্বিধা নেই।

  2. সুরার প্রারম্ভে বিসমিল্লাহ সম্পর্কে ইমামগণের মতভেদ:
    • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফি মাযহাবের অভিমত:

      হানাফি ফকিহগণের মতে, বিসমিল্লাহ সুরা ফাতেহার কোনো অংশ নয় এবং সুরা তাওবাহ ছাড়া অন্যান্য সুরারও অংশ নয়। বরং এটি পবিত্র কুরআনের একটি স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ আয়াত (آية مستقلة من القرآن)، যা দুটি সুরার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করার জন্য এবং বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে নাজিল করা হয়েছে। দলীল: রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদিনের আমল ছিল যে তাঁরা নামাজে বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে পাঠ করতেন না, বরং নিঃশব্দে পাঠ করতেন (سراً)। যদি তা ফাতেহার অংশ হতো, তবে জাহরি নামাজে উচ্চস্বরে পাঠ ওয়াজিব হতো।

    • ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর অভিমত:

      ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সুরা ফাতেহার প্রথম ও অবিচ্ছেদ্য আয়াত। তদ্রূপ সুরা তাওবাহ ছাড়া কুরআনের প্রতিটি সুরারই প্রথম আয়াত হলো বিসমিল্লাহ। এ কারণে শাফিয়ী মাযহাবে জাহরি নামাজে সুরা ফাতেহার সাথে বিসমিল্লাহও উচ্চস্বরে (جهراً) পাঠ করা সুন্নাত। তাঁদের অন্যতম দলীল হলো হযরত নাঈম আল-মুজমির বর্ণিত হাদিস, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে পড়ে বলেছিলেন, “আমার নামাজ তোমাদের মধ্যে রাসুলুল্লাহর নামাজের সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ।”

    • ইমাম মালিক (রহ.)-এর অভিমত:

      ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, বিসমিল্লাহ সুরা ফাতেহা বা অন্য কোনো সুরার অংশ নয়। এমনকি ফরজ নামাজে সুরা ফাতেহার পূর্বে বিসমিল্লাহ পড়া মাকরূহ—চাই তা সশব্দে হোক বা নিঃশব্দে। তবে নফল নামাজে তা পড়া জায়েয।

    • ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর অভিমত:

      ইমাম আহমদ (রহ.) থেকে দুটি রেওয়ায়েত পাওয়া যায়। অধিক প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, বিসমিল্লাহ সুরা ফাতেহারই একটি আয়াত, তবে নামাজে তা উচ্চস্বরে না পড়ে চুপিচুপি বা নিঃশব্দে পাঠ করাই সুন্নাত।


৩. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলী

٣- عن الحكم عن أبي ليلى عن حذيفة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم: لا تلبسوا الحرير ولا الديباج ولا تشربوا في آنية الذهب والفضة ولا تأكلوا في صحافهما فإنها لهم في الدنيا ولكم في الآخرة-

[৩. হযরত হুজায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “তোমরা রেশম ও রেশমি বস্ত্র পরিধান করো না এবং সোনা ও রূপার পাত্রে পানাহার করো না। কেননা এগুলো দুনিয়াতে কাফেরদের জন্য এবং আখেরাতে তোমাদের জন্য।”]

(أ) بين حكم لبس الحرير للرجال والنساء-

[(ক) পুরুষ ও নারীদের জন্য রেশম পরিধানের বিধান আলোচনা কর।]

উত্তর:

ইসলামের শরীয়তে রেশমি বস্ত্র পরিধানের বিধান নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র:

  1. পুরুষদের জন্য রেশম পরিধানের বিধান:
    • সাধারণ হুকুম: প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের জন্য খাঁটি রেশমি কাপড় (الحرير الخالص) পরিধান করা সম্পূর্ণ হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) একহাতে সোনা ও অন্যহাতে রেশম নিয়ে উম্মতকে দেখিয়ে ইরশাদ করেছিলেন:

      إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي، حِلٌّ لِإِنَاثِهِمْ

      (নিশ্চয় এ দুটি বস্তু আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং তাদের নারীদের জন্য হালাল – সুনানে আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)।

    • ব্যতিক্রম ও ছাড়ের ক্ষেত্রসমূহ:
      • চিকিৎসা ও চর্মরোগের ক্ষেত্রে: চুলকানি বা চর্মরোগের বিশেষ চিকিৎসায় পুরুষদের রেশম পরিধানের অনুমতি রয়েছে, যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ও যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.)-কে যুদ্ধের সফরে অনুমতি দিয়েছিলেন।
      • বর্ডার বা কারুকাজ হিসেবে: কাপড়ে অনধিক চার আঙুল পরিমাণ রেশমের পাড়, বোতাম বা বর্ডার থাকলে তা পুরুষদের জন্য পরিধান করা জায়েয।
      • মিশ্রিত কাপড়: কাপড়ের টানা যদি সুতি এবং বানা রেশম হয় (বা রেশমের চেয়ে অন্য সুতা বেশি বা সমান থাকে), তবে তা হানাফি মাযহাবে পুরুষদের জন্য পরিধানযোগ্য।
  2. নারীদের জন্য রেশম পরিধানের বিধান:
    • নারীদের জন্য খাঁটি রেশমি বস্ত্র কিংবা রেশম মিশ্রিত যে কোনো কাপড় পরিধান করা সর্বসম্মতভাবে হালাল ও বৈধ।
    • তবে নারীদের ক্ষেত্রেও অহংকার, আত্মম্ভরিতা প্রদর্শন কিংবা অপচয় (ইসরাফ) বর্জন করা আবশ্যক।

(ب) أكتب حكم إستعمال آنية الذهب والفضة مع بيان أسباب حرمتها-

[(খ) সোনা ও রূপার পাত্র ব্যবহারের বিধান ও তা হারাম হওয়ার কারণ আলোচনা কর।]

উত্তর:

  1. সোনা ও রূপার পাত্র ব্যবহারের বিধান:

    নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলমানের জন্য সোনা ও রূপার পাত্রে পানাহার করা, অযু বা গোসল করা কিংবা দৈনন্দিন খাদ্যসামগ্রী পরিবেশনে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে ইরশাদ করেছেন:

    الَّذِي يَشْرَبُ فِي إِنَاءِ الْفِضَّةِ إِنَّمَا يُجَرْجِرُ فِي بَطْنِهِ نَارَ جَهَنَّمَ

    (যে ব্যক্তি রূপার পাত্রে পান করে, সে মূলত নিজের পেটের ভেতর জাহান্নামের আগুন ঢালছে – সহিহ মুসলিম)।

  2. সোনা ও রূপার পাত্র হারাম হওয়ার হিকমত ও কারণসমূহ:
    • অহংকার ও আত্মগরিমা (التكبر والخيلاء) দমন: সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার মানুষের অন্তরে বিত্ত-বৈভবের অহংকার ও দাম্ভিকতা সৃষ্টি করে, যা আধ্যাত্মিক বিনয়কে ধ্বংস করে।
    • দরিদ্র ও অভাবীদের চিত্তদাহ রোধ (كسر قلوب الفقراء): ধনীদের দ্বারা সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহারের ফলে সমাজের গরিব ও অসহায় মানুষদের অন্তরে তীব্র ক্ষোভ ও বঞ্চনাবোধের জন্ম হয়।
    • অপব্যয় ও বিলাসিতা রোধ (محاربة الإسراف والتبذير): খাবার বা পানির মতো মৌলিক প্রয়োজনে মূল্যবান ধাতুর পাত্র ব্যবহার চরম পর্যায়ের অপচয় ও ভোগবিলাস।
    • অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও তারল্য রক্ষা (المحافظة على النقدين): সোনা ও রূপা হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থার মূল ভিত্তি ও বিনিময়ের মাধ্যম। এগুলো পাত্রে রূপান্তরিত হয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়লে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং সাধারণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
    • কাফের ও ভোগবাদীদের সাথে সাদৃশ্য বর্জন: দুনিয়াকেন্দ্রিক বিলাসিতা হলো পরকালবিমুখ অমুসলিমদের নীতি, যা মুমিনের আত্মশুদ্ধির পরিপন্থী।

৪. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলী

٤- عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: دخل أعرابي في المسجد فقال: اللهم ارحمني ومحمدا ولا ترحم معنا أحدا، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: لقد حجرت واسعا، ثم بال في المسجد، فقام إليه الناس، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: علموا ويسروا ولا تعسروا وصبوا عليه سجلا من ماء-

[৪. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: এক বেদুইন মসজিদে প্রবেশ করে দোয়া করল: ‘হে আল্লাহ! আমাকে এবং মুহাম্মদকে ক্ষমা কর, আর আমাদের সাথে কাউকে ক্ষমা করো না।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন: ‘তুমি এক সুবিশাল জিনিসকে সংকীর্ণ করে ফেললে।’ অতঃপর সে মসজিদের ভেতরে প্রস্রাব করে দিল। এতে উপস্থিত সাহাবিগণ তাকে প্রহার করতে উদ্যত হলেন। তখন নবী করীম (সা.) বললেন: “তোমরা মানুষকে দ্বীন শিক্ষা দাও, তাদের জন্য সহজ করো এবং কঠিন করো না। আর প্রস্রাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।”]

(أ) اكتب ترجمة أبي هريرة رضي الله عنه مع ذكر خدمته في الحديث-

[(ক) হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অবদান আলোচনা কর।]

উত্তর:

  1. নাম, বংশ ও উপনাম:

    হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর ইসলামপূর্ব নাম ছিল আবদুশ শামস (বা অন্য বর্ণনায় আবদে আমর)। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাম রাখেন আব্দুর রহমান (মতান্তরে আবদুল্লাহ)। তিনি ইয়েমেনের বিখ্যাত ‘দাওস’ গোত্রের সন্তান ছিলেন। একদা তাঁর চাদরের আস্তিনে একটি বিড়ালছানা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্নেহভরে তাঁকে ‘আবু হুরায়রা’ (বিড়ালছানার পিতা) উপনামে ডাকেন, যা পরবর্তীতে তাঁর আসল নামের চেয়ে অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে।

  2. ইসলাম গ্রহণ ও সুফফায় অবস্থান:

    তিনি সপ্তম হিজরিতে খায়বার বিজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তে মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে তিনি পার্থিব কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিত্যাগ করে মসজিদে নববীর ‘আসহাবে সুফফাহ’-তে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সার্বক্ষণিক নবীজির পবিত্র সান্নিধ্যে অবস্থান করতেন।

  3. অলৌকিক স্মৃতিশক্তি ও বরকতপূর্ণ দোয়া:

    হযরত আবু হুরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট নিজের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কথা নিবেদন করলে নবীজী (সা.) তাঁকে নিজের চাদর বিছাতে বলেন। অতঃপর নবীজী তাতে দোয়ার প্রতীক হিসেবে হাত দিয়ে কিছু সঞ্চালন করে চাদরটি বুকের সাথে জড়িয়ে নিতে বলেন। এর পর থেকে তিনি জীবনে কখনো রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে শোনা একটি কথাও বিস্মৃত হননি।

  4. হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান (خدمته في علم الحديث):
    • সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী (مُكْثِرُ الصَّحَابَةِ): সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনিই হলেন সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি। তাঁর বর্ণিত হাদিসের মোট সংখ্যা ৫,৩৭৪টি।
    • শাগরিদ ও অনুসারী: তাঁর নিকট থেকে আট শতাধিক তাবেয়ী, ফকিহ ও মুহাদ্দিস হাদিস শিক্ষা গ্রহণ ও বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারি (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর শাগরিদের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
    • বিশুদ্ধ আমানতদারী: তিনি হাদিস সংরক্ষণে কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং রাতের এক-তৃতীয়াংশ হাদিস পুনরাবৃত্তি ও মোযাকারায় ব্যয় করতেন।
  5. ইন্তেকাল:

    হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ৫৭ হিজরিতে (মতান্তরে ৫৯ হি.) ৭৮ বছর বয়সে মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকিতে সমাধিস্থ হন।

(ب) اشرح قوله عليه السلام: علموا ويسروا ولا تعسروا-

[(খ) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী ‘শিক্ষা দাও, সহজ করো এবং কঠিন করো না’-এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই সংক্ষিপ্ত অথচ কালজয়ী বাণীটি ইসলামি দাওয়াত, শিক্ষা ও সংশোধনের এক চিরন্তন মূলনীতি ঘোষণা করে:

  • অজ্ঞতার চিকিৎসা হলো জ্ঞানদান (عَلِّمُوا): বেদুইন লোকটি মসজিদের পবিত্রতা ও আদব সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। নবীজী (সা.) বুঝিয়েছেন যে, অপরাধী যদি অজ্ঞতাবশত ভুল করে, তবে তাকে তিরস্কার বা মারধর না করে মমতা ও প্রজ্ঞার সাথে সঠিক বিধান শিক্ষা দিতে হবে।
  • সহজসাধ্য আচরণ ও সুযোগ প্রদান (يَسِّرُوا): নবীজী (সা.) বেদুইন লোকটিকে প্রস্রাবের মাঝখানে থামিয়ে দিতে দেননি, কারণ এতে তার শারীরিক ক্ষতি হতো এবং প্রস্রাব ছিটিয়ে মসজিদের বৃহত্তর অংশ অপবিত্র হতো। প্রস্রাব শেষ হওয়া পর্যন্ত সুযোগ দেওয়া এবং পরে মাত্র এক বালতি পানি দিয়ে স্থানটি পবিত্র করা ছিল চরম প্রজ্ঞাপূর্ণ সহজীকরণ। দ্বীনের সকল ক্ষেত্রে মানুষের সাধ্য ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে সহজ পন্থা অবলম্বন করাই সুন্নাত।
  • কঠোরতা ও ভীতি প্রদর্শন বর্জন (وَلَا تُعَسِّرُوا): দ্বীন প্রচারে অনমনীয়তা, উগ্রতা ও কঠোরতা মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে ঠেলে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلَّا غَلَبَهُ» (নিশ্চয় দ্বীন সহজ; দ্বীন নিয়ে যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করবে সে পরাজিত হবে – সহিহ বুখারি)। তাই কঠোরতা পরিহার করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করাই শরীয়তের মূল লক্ষ্য।

৫. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলী

٥- عن أنس أن أبا بكر حدثه قال: قلت للنبي صلى الله عليه وسلم وهو في الغار: لو أن أحدهم نظر إلى قدميه لأبصرنا تحت قدميه، فقال: يا أبا بكر! ما ظنك بإثنين الله ثالثهما-

[৫. হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত আবু বকর (রা.) তাঁকে বর্ণনা করেছেন: “সাওর পর্বতের গুহায় অবস্থানকালে আমি নবী করীম (সা.)-কে বললাম: কাফেরদের কেউ যদি নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকায়, তবে সে তার পায়ের নিচেই আমাদের দেখে ফেলবে! তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘হে আবু বকর! যাদের তৃতীয়জন স্বয়ং আল্লাহ, সে দুজনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা?’ “]

(أ) اذكر قصة هجرة الرسول صلى الله عليه وسلم بالاختصار-

[(ক) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।]

উত্তর:

ইসলামের ইতিহাসে নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত ছিল দ্বীন প্রতিষ্ঠার এক যুগান্তকারী বাঁক। এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:

  1. প্রেক্ষাপট ও কুরাইশদের ষড়যন্ত্র:

    মক্কার কাফেররা আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াতের পর মদিনায় ইসলামের বিস্তার দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা ‘দারুন নদওয়া’-তে একত্রিত হয়ে আবু জাহেলের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাড়ি ঘেরাও করে তাঁকে একযোগে হত্যা করা হবে।

  2. হযরত আলী (রা.)-কে বিছানায় শয়ন ও নিরাপদে বহির্গমন:

    আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে নবীজী (সা.)-কে কাফেরদের ষড়যন্ত্র জানিয়ে দেন এবং হিজরতের নির্দেশ প্রদান করেন। নবীজী (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে নিজের বিছানায় সবুজ চাদর দিয়ে শুইয়ে রাখেন, যাতে তিনি কাফেরদের গচ্ছিত আমানতগুলো ফিরিয়ে দিতে পারেন। এরপর নবীজী সুরা ইয়াসিনের প্রাথমিক আয়াত পাঠ করে ধূলি নিক্ষেপ করে ঘেরাওকারীদের চোখের সামনে দিয়ে নিরাপদে গৃহত্যাগ করেন।

  3. সওর গুহায় তিন দিন আত্মগোপন:

    রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর আজীবনের বিশ্বস্ত সঙ্গী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সাথে নিয়ে মদিনার স্বাভাবিক রাস্তার বিপরীত দিকে অবস্থিত ‘সওর’ পর্বতের একটি দুর্গম গুহায় আশ্রয় নেন। সেখানে তাঁরা তিন দিন অবস্থান করেন। কাফেররা পদচিহ্ন অনুসন্ধানকারী বিশেষজ্ঞ নিয়ে গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে গুহামুখে মাকড়সা জাল বুনে দেয় এবং কবুতর ডিম পেড়ে বসে থাকে, ফলে কাফেররা গুহায় কেউ নেই মনে করে ফিরে যায়।

  4. মদিনার পথে যাত্রা ও কুবাতে অবস্থান:

    তিন দিন পর বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতের সাহায্যে তাঁরা লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী অপ্রচলিত পথ ধরে মদিনাভিমুখে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে সুরাকা ইবনে মালিক তাঁদের পাকড়াও করার চেষ্টা করে অলৌকিকভাবে পরাস্ত হয়। অবশেষে নবীজী মদিনার উপকণ্ঠ ‘কুবা’ নামক স্থানে পৌঁছান এবং সেখানে ইসলামের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে কুবা’ প্রতিষ্ঠা করেন।

  5. মদিনায় আগমন ও ঐতিহাসিক সংবর্ধনা:

    অতঃপর ১২ই রবিউল আউয়াল রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় প্রবেশ করেন। মদিনার আনসার সাহাবিগণ, নারী-পুরুষ ও শিশুরা «طَلَعَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا» সংগীত গেয়ে নবী করিম (সা.)-কে মহাসমারোহে বরণ করে নেন।

(ب) اشرح قوله عليه السلام ‘ما ظنك بإثنين الله ثالثهما’-

[(খ) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী ‘যাদের তৃতীয়জন আল্লাহ, সে দুজনের ব্যাপারে তোমার কী ধারণা?’-এর তাৎপর্য আলোচনা কর।]

উত্তর:

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই অমর উক্তিটি তাওহিদ ও তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ শিখরকে নির্দেশ করে:

  • আল্লাহর প্রতি অবিচল তাওয়াক্কুল (عظمة التوكل على الله): যখন মানুষের পার্থিব সমস্ত অবলম্বন নিঃশেষ হয়ে যায় এবং শত্রু একদম মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন পার্থিব শক্তির বাইরে একক আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার নামই তাওয়াক্কুল। নবীজী (সা.) এক মুহূর্তের জন্যও আতঙ্কিত বা বিচলিত হননি।
  • মাঈয়্যাতে ইলাহিয়্যা বা আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য (معية الله الخاصة): এখানে ‘আল্লাহ তৃতীয়জন’ হওয়ার অর্থ শারীরিক কোনো উপস্থিতি নয়; বরং এটি হলো আল্লাহর বিশেষ মদদ, সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও নুসরাতের সান্নিধ্য (معية النصرة والتأييد والحفظ)। আল্লাহ যার সহায় হন, সমগ্র সৃষ্টির শক্তি মিলেও তার সামান্য ক্ষতি করতে পারে না।
  • পবিত্র কুরআনের সাক্ষ্য: আল্লাহ তাআলা এই ঘটনার চিত্রায়ণ করে সুরা আত-তাওবার ৪০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন:

    ﴿إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا﴾

    (যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফেররা তাকে বহিষ্কার করেছিল, যখন সে ছিল দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা দুজন গুহার মধ্যে ছিল; তখন সে তার সঙ্গীকে বলছিল: বিষণ্ণ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন)।

  • উম্মতের জন্য চিরন্তন প্রেরণা: যেকোনো কঠিন সংকট, বিপদ কিংবা দ্বীনের দাওয়াতি কার্যক্রমে শত্রুর ভয় উপেক্ষা করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা রাখার শিক্ষাই এখানে নিহিত।

৬. হাদিস ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্নাবলী

٦- عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: لولا أن أشق على أمتي لأمرتهم بالسواك عند كل صلاة ولأخرت صلاة العشاء إلى ثلث الليل-

[৬. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “যদি না আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর হওয়ার আশঙ্কা হতো, তবে আমি তাদের প্রতিটি নামাজের পূর্বে মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম এবং এশার নামাজ রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বিলম্বিত করে আদায় করার আদেশ দিতাম।”]

(أ) أكتب وقت صلاة العشاء مفصلا-

[(ক) এশার নামাজের ওয়াক্তের বিস্তারিত বিবরণ দাও।]

উত্তর:

ফিকহশাস্ত্রে এশার নামাজের সময়সীমা ও বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা রয়েছে:

  1. ওয়াক্তের প্রারম্ভ (بداية الوقت):
    • মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হওয়া মাত্রই এশার নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয়। আর তা হলো পশ্চিম আকাশের শাফাক (شفق) অন্তর্হিত হওয়া।
    • শাফাক নির্ধারণে মতভেদ:
      • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মূল অভিমত: শাফাক হলো পশ্চিমাকাশের রক্তিম আভা বিলীন হওয়ার পর অবশিষ্ট শ্বেত আভা (البياض الذي يعقب الحمرة)। এই শুভ্র আভা মিলিয়ে যাওয়ার পর এশার ওয়াক্ত শুরু হয় (এটি অধিক সতর্কতামূলক)।
      • সাহেবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ রহ.) এবং তিন ইমামের অভিমত: শাফাক হলো পশ্চিমাকাশের লাল আভা (الحمرة)। লাল আভা অদৃশ্য হলেই এশার ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায়। বর্তমানে হানাফি ফতোয়ায় উভয় মতের সুযোগ রয়েছে।
  2. ওয়াক্তের সমাপ্তি (نهاية الوقت):

    পূর্বাকাশে সুবহে সাদিক (الفجر الصادق) উদিত হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এশার বৈধ ওয়াক্ত বহাল থাকে। সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার সাথে সাথে এশার সময় সমাপ্ত হয়ে যায় এবং ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়।

  3. এশার ওয়াক্তের বিভিন্ন পর্যায় ও মুস্তাহাব সময়:
    • মুস্তাহাব ওয়াক্ত (الوقت المستحب): রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ (ثلث الليل الأول) পর্যন্ত এশার নামাজ বিলম্বিত করে পড়া মুস্তাহাব। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সময়টিকে সর্বোত্তম পছন্দ করতেন।
    • মুবাহ বা জায়েয ওয়াক্ত (الوقت المباح): রাতের এক-তৃতীয়াংশ থেকে শুরু করে মধ্যরাত (نصف الليل) পর্যন্ত বিলম্ব করে পড়া কোনো প্রকার অপছন্দনীয়তা ছাড়াই জায়েয।
    • মাকরূহ ওয়াক্ত (الوقت المكروه): শরয়ী ওজর (যেমন অসুস্থতা, সফর ইত্যাদি) ব্যতিরেকে মধ্যরাতের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত নামাজ বিলম্ব করা মাকরূহে তানজিহি। এতে জামাত ছুটে যাওয়া ও ফজরের নামাজ কাজা হওয়ার বড় আশঙ্কা তৈরি হয়।

(ব) أذكر حكم السواك وحكمته في الإسلام-

[(খ) ইসলামে মেসওয়াকের বিধান ও অন্তর্নিহিত হিকমত আলোচনা কর।]

উত্তর:

  1. মেসওয়াকের শরয়ী বিধান (حكم السواك):
    • মেসওয়াক করা সর্বসম্মতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। অযু করার সময় কুলি করার পূর্বে মেসওয়াক করা সুন্নাত।
    • নামাজের পূর্বে, কুরআন তিলাওয়াতের পূর্বে, ঘুম থেকে ওঠার পর, ঘরে প্রবেশের সময় এবং মুখের গন্ধ পরিবর্তনের সময় মেসওয়াক করা অত্যন্ত প্রশংসনীয় মুস্তাহাব আমল।
    • রোযাদারের জন্য দিনের শুরুতে বা শেষে (শাফিয়ী মাযহাব ব্যতীত হানাফিদের মতে) মেসওয়াক করা সম্পূর্ণ জায়েয ও সুন্নাত।
  2. মেসওয়াকের অন্তর্নিহিত হিকমত ও তাৎপর্য (حكمة السواك):
    • আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন: রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে মেসওয়াক হলো ‘মারদাতুল লির-রব’ অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তোষ লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
    • মুখের দুর্গন্ধ ও জীবাণু দূরীকরণ: মেসওয়াক মুখের লালা, খাবারের অবশিষ্টাংশ ও দুর্গন্ধ দূর করে মুখকে সর্বদা সুবাসিত ও পবিত্র রাখে।
    • ফেরেশতাদের সম্মান প্রদর্শন: যখন বান্দা নামাজে দাঁড়ায়, তখন ফেরেশতা তার মুখের কাছে নিজের মুখ রেখে তিলাওয়াত শ্রবণ করে। মুখের দুর্গন্ধ ফেরেশতাদের কষ্ট দেয়, তাই মেসওয়াক ফেরেশতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যম।
    • শারীরিক ও দাঁতের সুরক্ষা: আধুনিক বিজ্ঞানে প্রমাণিত যে যয়তুন ও পিলু গাছের মেসওয়াকে প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপ্টিক, ফ্লুরাইড ও আঁশ রয়েছে যা মাড়িকে শক্ত করে, দাঁতের ক্ষয়রোধ করে এবং মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
    • নামাজের মর্যাদা ও সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মেসওয়াক করে অযু করার পর আদায়কৃত দুই রাকাত নামাজ মেসওয়াকবিহীন সত্তুর রাকাত নামাজের চেয়েও উত্তম।
    • মৃত্যুর সময় কালিমা নসিব: ইসলামিক স্কলার ও ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন যে নিয়মিত মেসওয়াকের বরকতে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে মৃত্যুর মুহূর্তে কালিমায়ে শাহাদাত নসিব করেন।

مجموعة (ب) – [খ বিভাগ]

নিচের যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। মান: ১৬ × ১ = ১৬


٧- اكتب نبذة من ترجمة الإمام الأعظم أبي حنيفة رحمه الله مع ذكر منهجه في مسنده وخدمته في علم الحديث-

[৭. ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও জীবনী, তাঁর মুসনাদ সংকলন পদ্ধতি এবং হাদিস শাস্ত্রে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান আলোচনা কর।]

উত্তর:

১. ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও জীবনী (ترجمة الإمام أبي حنيفة رحمه الله)

  • নাম, উপনাম ও বংশপরিচয়:

    তাঁর নাম নোমান, কুনিয়াত বা উপনাম ‘আবু হানিফা’ এবং লকব হলো ‘ইমামে আজম’ (সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম)। পিতার নাম সাবিত ইবনে যুতা। তাঁর পূর্বপুরুষ পারস্যের স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত ছিলেন।

  • জন্ম ও শৈশব:

    তিনি উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের শাসনামলে ৮০ হিজরিতে (৬৯৯ খ্রিস্টাব্দ) ইরাকের ঐতিহ্যবাহী ইলমি নগরী কুফায় জন্মগ্রহণ করেন।

  • তাবেয়ী হওয়ার গৌরব:

    ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিসগণের বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইমাম আবু হানিফা (রহ.) একজন মর্যাদাবান তাবেয়ী ছিলেন। তিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রা.), সাহল ইবনে সা’দ (রা.) এবং আবুল তুফাইল আমির ইবনে ওয়াসিলা (রা.)-কে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাঁদের থেকে হাদিস রেওয়ায়েত করেছেন।

  • ইলম অন্বেষণ ও উস্তাদবৃন্দ:

    তিনি ইলমে কালাম ও ফিকহে আত্মনিয়োগের পূর্বে তৎকালীন প্রখ্যাত আলেমগণের সান্নিধ্যে হাদিসের গভীর পাঠ গ্রহণ করেন। তিনি কুফার প্রধান ফকিহ ইমাম হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমানের নিকট দীর্ঘ আঠারো বছর সার্বক্ষণিক শিক্ষা লাভ করেন। এ ছাড়া মক্কা ও মদিনায় আতা ইবনে আবি রাবাহ, নাফে’ মাওলা ইবনে উমর, ইমাম যুহরি, ইকরামা এবং আহলে বাইতের ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির ও ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহিমাহুমুল্লাহ)-এর দরবারে হাদিসের সনদ ও রেওয়ায়েত অর্জন করেন।

  • চরিত্র, তাকওয়া ও শাহাদাত:

    তিনি অত্যন্ত পরহেজগার, খোদাভীরু ও আমানতদার রেশম ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি সারারাত তাহাজ্জুদে ক্রন্দনরত অবস্থায় কাটাতেন। আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর তাঁকে প্রধান বিচারপতির (কাযিউল কুযাত) পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি অন্যায়ের সহযোগী না হওয়ার প্রত্যয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং কারাগারে চরম নির্যাতনের পর বিষপ্রয়োগে ১৫০ হিজরিতে (৭৬৭ খ্রি.) তিনি শাহাদাতবরণ করেন। বাগদাদের খাইজুরান কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।


২. মুসনাদে ইমাম আবু হানিফা-এর সংকলন পদ্ধতি (منهجه في مسنده)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর হাদিস সংকলন ‘মুসনাদুল ইমাম আবি হানিফা’ ইসলামি হাদিস সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এর বিন্যাস ও সংকলন পদ্ধতি নিম্নরূপ:

  • সংকলন প্রেক্ষাপট: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) স্বহস্তে মুসনাদ নামে কোনো একক গ্রন্থ মলাটবদ্ধ করে যাননি। বরং তিনি তাঁর ফিকহি গবেষণায় যেসব সহিহ হাদিস দলীল হিসেবে পেশ করতেন এবং দরসে ছাত্রদের শোনাতেন, তাঁর শাগরিদগণ তা লিপিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবুল মুয়াইয়াদ আল-খোওয়ারিজমি (রহ.) ইমামের বিভিন্ন ছাত্রের বর্ণিত ১৭টি মাসানিদ একত্রিত করে ‘জামেউল মাসানিদ’ (جامع المسانيد) সংকলন করেন।
  • উচ্চমানের সনদ (علو الإسناد): ইমাম আবু হানিফা (রহ.) হলেন চার ইমামের মধ্যে সর্বপ্রাচীন। ফলে তাঁর হাদিসগুলোর সনদ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও উচ্চস্তরের। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর মাঝে মাত্র দুজন বা তিনজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে হাদিস লাভ করতেন (ثلاثيات ورباعيات)।
  • ফিকহুল হাদিস ও দরয়ায়াত পদ্ধতি: তিনি কেবল সনদের বাহ্যিক বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা দেখতেন না; বরং হাদিসের অর্থ কুরআনের সামগ্রিক মূলনীতি, উসুলে শরীয়াহ এবং সাহাবায়ে কেরামের আমলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা কঠোরভাবে যাচাই করতেন।
  • আবওয়াবুল ফিকহ অনুযায়ী বিন্যাস: যদিও এটি ‘মুসনাদ’ নামে খ্যাত, কিন্তু সংকলকগণ সাধারণ মুসনাদের মতো সাহাবিদের নামের ক্রমানুসারে না সাজিয়ে ফিকহি অধ্যায় (কিতাবুত তাহারাত, কিতাবুছ সালাত ইত্যাদি) অনুসারে সুবিন্যস্ত করেছেন।

৩. হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অবদান (خدمته في علم الحديث)

  • কুফা হাদিস স্কুলের নেতৃত্ব: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও আলী (রা.)-এর প্রবর্তিত কুফার ঐতিহ্যবাহী ইলমি ধারার ধারক ছিলেন এবং হাজার হাজার হাদিস যাচাই-বাছাই করে উম্মতের জন্য ফিকহের বুনিয়াদ রচনা করেন।
  • মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে তাঁর মর্যাদা:
    • আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস ইমাম শু’বা (রহ.) বলেন: “আবু হানিফা আমাদের ধারণার চেয়েও বিজ্ঞ ছিলেন এবং হাদিসের গভীর সমঝদার ছিলেন।”
    • ইমাম মাক্কী ইবনে ইবরাহিম—যাঁর সূত্রে ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর অধিকাংশ ‘সুলাসিয়াত’ (তিন স্তরের) হাদিস বর্ণনা করেছেন—তিনি ছিলেন ইমাম আবু হানিফার একনিষ্ঠ ছাত্র।
    • ইমাম যাহাবী (রহ.) তাঁকে ‘তাযকিরাতুল হুফফাজ’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করে প্রমাণ করেছেন যে তিনি হাদিসের হাফেজ ও অনন্য ইমাম ছিলেন।
  • ফিকহি হাদিসের সংকলন ও যাচাই: তিনি ফিকহি মাসআলা উদ্ভাবনের মাধ্যমে হাদিসের প্রায়োগিক দিক জীবন্ত করে তোলেন, যা ইসলামি আইনশাস্ত্রের ভিত্তি হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

٨- تحدث ترجمة الإمام الشافعي رحمه الله تعالى مع ذكر منهجه في مسنده وخدمته في علم الحديث-

[৮. ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও জীবনী, তাঁর মুসনাদ সংকলন পদ্ধতি এবং হাদিস শাস্ত্রে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান আলোচনা কর।]

উত্তর:

১. ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর পরিচিতি ও জীবনী (ترجمة الإمام الشافعي رحمه الله)

  • নাম ও বংশমর্যাদা:

    তাঁর নাম মুহাম্মদ, কুনিয়াত ‘আবু আবদুল্লাহ’ এবং লকব ‘নাসিরুস সুন্নাহ’ (সুন্নাহর সাহায্যকারী)। পিতার নাম ইদ্রিস। বংশধারা: মুহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস ইবনুল আব্বাস ইবনে উসমান ইবনে শাফে’ আল-কুরাশী আল-মুত্তালিবি। তিনি কুরাইশ বংশের বনু মুত্তালিব শাখার সন্তান ছিলেন, যার কারণে তাঁর বংশধারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পূর্বপুরুষ হাশেমের ভাই মুত্তালিবের সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে।

  • জন্ম ও শৈশব:

    ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ওফাতের বছর অর্থাৎ ১৫০ হিজরিতে ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক গাজা শহরে ইমাম শাফিয়ী (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই পিতৃহারা হলে তাঁর বিদুষী মা তাঁকে স্বগোত্র কুরাইশের কাছে মক্কায় নিয়ে আসেন। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি অভাবনীয় প্রতিভার পরিচয় দেন; মাত্র সাত বছর বয়সে সম্পূর্ণ কুরআনুল কারিম হিফজ করেন এবং দশ বছর বয়সে ইমাম মালিকের ‘আল-মুয়াত্তা’ মুখস্থ করে ফেলেন।

  • ইলমি সফর ও শ্রেষ্ঠ উস্তাদবৃন্দ:

    তিনি মক্কার মুফতি মুসলিম ইবনে খালিদ আজ-জাঞ্জী এবং সুফিয়ান ইবনে উয়াইনার নিকট ফিকহ ও হাদিস শিক্ষা করেন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তাঁর উস্তাদ তাঁকে ফতোয়া প্রদানের অনুমতি দেন। অতঃপর মদিনায় গমন করে ইমাম মালিক (রহ.)-এর নিকট দীর্ঘ সময় হাদিস পাঠ করেন। পরবর্তীতে বাগদাদে গিয়ে ইমাম আবু হানিফার প্রধান শাগরিদ ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানীর সাথে ফিকহি বিতর্ক ও গবেষণা করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি মিশরে হিজরত করেন।

  • ইন্তেকাল:

    তিনি ২০৪ হিজরির রজব মাসের শেষ জুমায় ৫৪ বছর বয়সে মিশরের কায়রোতে ইন্তেকাল করেন এবং মুকাত্তাম পর্বতের পাদদেশে তাঁকে দাফন করা হয়।


২. মুসনাদে ইমাম শাফিয়ী-এর সংকলন পদ্ধতি (منهجه في مسنده)

ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর হাদিস সংকলন ‘মুসনাদুশ শাফিয়ী’ হাদিস জগতে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে আছে:

  • সংকলক ও সূত্র: ইমাম শাফিয়ী (রহ.) নিজে এটি পৃথক কিতাব হিসেবে বিন্যস্ত করেননি। বরং তাঁর রচিত কালজয়ী গ্রন্থ ‘কিতাবুল উম্ম’ (كتاب الأم) এবং ‘আল-মাবসুত’-এ ফিকহি মাসআলার সমর্থনে যেসব হাদিস তিনি সনদসহ বর্ণনা করেছিলেন, তাঁর বিশিষ্ট শাগরিদ রবী’ ইবনে সুলাইমান আল-মুরাদী থেকে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবুল আব্বাস আল-আসাম্ম (রহ.) তা সংগ্রহ করে ‘মুসনাদুশ শাফিয়ী’ নামে একত্র করেন।
  • অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যাস (الترتيب على الأبواب الفقهية): এটি সাহাবিদের নামের ক্রমিক অনুসারে নয়, বরং ফিকহের বিষয়ভিত্তিক অধ্যায় (তাহারাত, সালাত, যাকাত, হজ, বাই ইত্যাদি) অনুসারে সংকলিত হয়েছে।
  • সনদের বিশুদ্ধতা ও স্বর্ণশৃঙ্খল (سلسلة الذهب): এতে ইমাম শাফিয়ী কর্তৃক বর্ণিত বহু হাদিস এমন সনদে রয়েছে যাকে মুহাদ্দিসগণ ‘সিলসিলাতুজ যাহাব’ বা স্বর্ণশৃঙ্খল আখ্যা দিয়েছেন (যেমন: শাফিয়ী ← মালিক ← নাফে’ ← ইবনে উমর ← রাসুলুল্লাহ ﷺ)।
  • মুরসাল ও মাওকুফ হাদিসের পর্যালোচনা: এতে মারফু হাদিসের পাশাপাশি সাহাবিদের ফতোয়া (আসার) এবং কিছু ক্ষেত্রে উচ্চমানের মুরসাল হাদিসও বর্ণিত হয়েছে, যা ইমাম শাফিয়ীর সূক্ষ্ম উসুল দ্বারা সমর্থিত।

৩. হাদিস শাস্ত্রে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান (خدمته في علم الحديث)

  • উসুলুল হাদিস ও উসুলুল ফিকহের প্রতিষ্ঠা: ইমাম শাফিয়ী (রহ.) সর্বপ্রথম ‘আর-রিসালাহ’ (الرسالة) গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে হাদিস ও ফিকহের বিজ্ঞানসম্মত নিয়মনীতি লিপিবদ্ধ করেন। খবরে ওয়াহেদ (একক বর্ণনা)-এর প্রামাণিকতা, সনদের ধারাবাহিকতা (ইত্তিসাল), রাবির নির্ভরযোগ্যতার শর্তাবলী এবং সহিহ ও জয়িফ হাদিসের সূক্ষ্ম মানদণ্ড তিনিই সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
  • নাসিখ ও মানসুখ নির্ধারণ: হাদিসের মধ্যে আপাত বিরোধ নিরসনে তিনি ‘ইখতিলাফুল হাদিস’ (اختلاف الحديث) গ্রন্থ রচনা করেন এবং হাদিসের সমাধানমূলক ব্যাখ্যা দেন।
  • ‘নাসিরুস সুন্নাহ’ উপাধি লাভ: তৎকালীন বাগদাদে একদল লোক বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির অজুহাতে সুন্নাহর প্রামাণিকতা অস্বীকার করতে চাইলে ইমাম শাফিয়ী জোরালো দলীলের মাধ্যমে তাদের যুক্তি খণ্ডন করেন এবং সুন্নাহকে কুরআনের পরেই দ্বীনের অকাট্য উৎস হিসেবে পুনপ্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণে মুহাদ্দিসগণ তাঁকে ‘নাসিরুস সুন্নাহ’ (সুন্নাহর ত্রাতা ও সাহায্যকারী) উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মূল্যায়ন: ইমাম আহমদ (রহ.) বলতেন: “যদি ইমাম শাফিয়ী না হতেন, তবে আমরা হাদিসের অর্থ ও মর্ম বুঝতেই পারতাম না। তিনি ছিলেন দুনিয়ার জন্য সূর্যের ন্যায় এবং মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্যের ন্যায়।”

সাধারণ জিজ্ঞাসা (Frequently Asked Questions – FAQ)

প্রশ্ন 1: ফাজিল ৪র্থ বর্ষের হাদিস ৪০৬ কোডের বিষয়টির মূল আলোচ্য কী?

উত্তর: ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ৪০৬ কোডের বিষয়টি হলো ‘আল-মুসনাদু লিল ইমাম আবি হানিফা, আশ-শাফিয়ী, আহমদ’। এতে মূলত ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফিয়ী (রহ.) ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মুসনাদ থেকে নির্বাচিত হাদিসসমূহ, হাদিসের অনুবাদ, ব্যাকরণগত তাহকিক, ফিকহি আহকাম এবং ইমামগণের জীবন ও হাদিস সংকলন পদ্ধতির বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

প্রশ্ন 2: মহিলাদের জন্য মসজিদে ও ঈদগাহে নামাজ পড়ার ব্যাপারে হানাফি মাযহাবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী?

উত্তর: হানাফি মাযহাবের ফতোয়া অনুযায়ী, প্রাথমিক যুগে নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও পরবর্তীকালে ফিতনার আশঙ্কা ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকেই নারীদের জামাতে যাওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়। বর্তমানে সাধারণ ও যুবতী নারীদের জন্য মসজিদে বা ঈদগাহে যাওয়া মাকরূহে তাহরিমি এবং তাঁদের নিজ ঘরের অন্দরমহলে নামাজ আদায় করাই অধিক সওয়াব ও ফজিলতপূর্ণ।

প্রশ্ন 3: বিসমিল্লাহ কি সুরা ফাতেহার অংশ নাকি স্বতন্ত্র আয়াত?

উত্তর: ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর মতে বিসমিল্লাহ সুরা ফাতেহা ও অন্যান্য সুরার প্রথম ও অবিচ্ছেদ্য আয়াত। পক্ষান্তরে, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফি ফকিহগণের মতে বিসমিল্লাহ সুরা ফাতেহা কিংবা অন্য সুরার অংশ নয়; বরং এটি দুই সুরার মাঝে পার্থক্যকারী ও বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে নাজিলকৃত পবিত্র কুরআনের একটি স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ আয়াত।

প্রশ্ন 4: পুরুষদের জন্য কোন ধরনের রেশম পরিধান করা বৈধ?

উত্তর: পুরুষদের জন্য খাঁটি রেশমি কাপড় পরিধান করা সম্পূর্ণ হারাম। তবে বিশেষ চর্মরোগ বা চুলকানির চিকিৎসায় এবং পোশাকে অনধিক চার আঙুল পরিমাণ রেশমের পাড়, বর্ডার বা বোতাম থাকলে তা পুরুষদের জন্য পরিধান করা জায়েয। এ ছাড়া কাপড়ের বুননে রেশমের চেয়ে তুলার বা অন্য সুতার পরিমাণ বেশি থাকলে তাও পরিধানযোগ্য।

প্রশ্ন 5: মুসনাদুশ শাফিয়ী ও মুসনাদে আবি হানিফার মূল সংকলক কারা?

উত্তর: ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফিয়ী (রহ.) স্বহস্তে মুসনাদ গ্রন্থাকারে সাজিয়ে যাননি। মুসনাদে আবি হানিফা মূলত তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ও অন্যান্যদের থেকে সংগৃহীত রেওয়ায়েত নিয়ে আবুল মুয়াইয়াদ আল-খোওয়ারিজমি সংকলন করেন। অপরদিকে মুসনাদুশ শাফিয়ী ইমাম শাফিয়ীর ‘কিতাবুল উম্ম’ থেকে তাঁর ছাত্র রবী’ ইবনে সুলাইমানের সূত্রে আবুল আব্বাস আল-আসাম্ম সংকলন করেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜