اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٠
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০]
القسم: الحديث والدراسات الإسلامية [বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المادة: حاضر العالم الإسلامي [বিষয়: বর্তমান মুসলিম বিশ্ব]
كود المادة [বিষয় কোড]: 405 | كود الامتحان [পরীক্ষা কোড]: 204 | كود ورقة الأسئلة [প্রশ্নপত্র কোড]: 172
الزمن [সময়]: ৪ ঘণ্টা | الدرجات الكاملة [পূর্ণমান]: ৮০
الملاحظة [দ্রষ্টব্য]: أجب عن خمسة من الأسئلة التالية، والدرجات متساوية- [নিচের যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও। সকল প্রশ্নের মান সমান (১৬ × ৫ = ৮০ নম্বর)।]
١- تحدث عن أزمة اللاجئين الروهانجيا في بنغلاديش مفصلا-
[১. বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়গুলোর অন্যতম হলো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থী সংকট। মিয়ানমার সরকারের পরিকল্পিত সামরিক দমন-পীড়ন ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ভিটামাটি হারিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। নিম্নে রোহিঙ্গা সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ২০১৭ সালের চরম বিপর্যয়, বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকা এবং এর বহুমুখী প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিচিতি ও ঐতিহাসিক পটভূমি:
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের (প্রাচীন নাম আরাকান) শতাব্দীপ্রাচীন আদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী। ৮ম শতক থেকেই আরাকানে মুসলিম বণিক ও সুফি সাধকদের আগমনের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার শুরু হয় এবং ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ছিল একটি স্বাধীন মুসলিম শাসিত ভূখণ্ড। কিন্তু ১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজা বোধপায়া আরাকান দখল করার পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়।
- ১৯৭৮ সালের ‘অপারেশন কিং ড্রাগন’: বার্মিজ সেনাবাহিনীর প্রথম বড় ধরনের অভিযানে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে, যাদের পরবর্তীতে প্রত্যাবাসন করা হয়।
- ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন: বার্মার সামরিক জান্তা ১৯৮২ সালে একটি বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন জারি করে, যেখানে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের ১৩৫টি জাতীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকা থেকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রহীন (Stateless) ঘোষণা করা হয়।
- ১৯৯১-৯২ সালের ‘অপারেশন পাই থায়া’: দ্বিতীয় দফায় সামরিক নির্যাতনে আরও আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
২. ২০১৭ সালের মানবতাবিরোধী গণহত্যা ও বাংলাদেশে মহাপ্রবাহ:
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মগ চরমপন্থীরা আরাকানের রোহিঙ্গা পল্লীগুলোতে তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ (Clearance Operation)-এর নামে ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ চালায়। জাতিসংঘ একে “Textbook example of ethnic cleansing” (জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ) হিসেবে আখ্যায়িত করে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে পূর্বের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখেরও বেশি।
৩. বাংলাদেশের ভূমিকা ও মানবিক উদারতা:
সীমিত সম্পদ ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার ও সাধারণ জনগণ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়।
- কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবির স্থাপন করে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
- ক্যাম্পের জনঘনত্ব কমাতে নোয়াখালীর ‘ভাসানচরে’ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত আবাসন নির্মাণ করে রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে স্থানান্তর করা হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক মহলে মানবিক নেতৃত্বের জন্য তৎকালীন বিশ্বনেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের প্রশংসা করেন।
৪. বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গা সংকটের বহুমুখী প্রভাব:
- অর্থনৈতিক ও আর্থিক চাপ: বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার পেছনে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
- পরিবেশগত বিপর্যয়: ক্যাম্প তৈরির জন্য কক্সবাজার অঞ্চলে প্রায় ৮ হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় হয়েছে, পাহাড়ি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে।
- সামাজিক ও শ্রমবাজারের অস্থিরতা: স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর তুলনায় রোহিঙ্গা শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা কম মজুরিতে কাজ করছে, ফলে স্থানীয় যুবসমাজ কর্মহীন হয়ে পড়ছে এবং সামাজিক অসন্তোষ বাড়ছে।
- আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা হুমকি: শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে মাদক চোরাচালান (ইয়াবা), মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং সশস্ত্র গ্রুপগুলোর (যেমন আরসা বা আরএসও) আধিপত্য বিস্তারের কারণে অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
৫. আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও স্থায়ী সমাধানের পথ:
রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো নিজ দেশে তাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
- আন্তর্জাতিক আদালত (ICJ): ওআইসির সমর্থনে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গণহত্যার মামলা দায়ের করে, যেখানে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC): মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মিয়ানমারের সামরিক জেনারেলদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান।
- কূটনৈতিক তৎপরতা: চীন ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন আলোচনা চালালেও মিয়ানমারের আন্তরিকতার অভাবে তা সফল হচ্ছে না। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও ভিটেমাটি ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
٢- ما التغيرات الأخيرة التي حدثت في الساحة الدينية والاجتماعية في المملكة العربية السعودية؟ بين موضحا-
[২. সৌদি আরবের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে সম্প্রতি কী পরিবর্তন এসেছে? বিশদভাবে আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: ঐতিহাসিক কাল থেকেই সৌদি আরব কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন এবং ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামোর জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে ঘোষিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার কর্মসূচি ‘ভিশন ২০৩০’ (Saudi Vision 2030)-এর আওতায় দেশটিতে নজিরবিহীন ধর্মীয় ও সামাজিক রূপান্তর ঘটেছে। নিম্নে এসব সাম্প্রতিক পরিবর্তনের চুলচেরা বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. ধর্মীয় ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক পরিবর্তনসমূহ (التغيرات الدينية):
- ‘ধর্মীয় পুলিশ’ বা হাইয়াতুল আমরি বিল মারুফের ক্ষমতা বিলোপ: পূর্বে সৌদি আরবে ‘হাইয়াতুল আমরি বিল মারুফ ওয়ান-নাহি আনিল মুনকার’ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ সংক্রান্ত কমিটি)-এর সদস্যরা রাস্তায় সাধারণ মানুষকে নামাজে বাধ্য করা, পোশাক নিয়ন্ত্রণ ও গ্রেপ্তার করার পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ছিল। ২০১৬ সালে এক রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে তাদের গ্রেপ্তার ও নজরদারির ক্ষমতা সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া হয়।
- ‘মধ্যপন্থী ইসলাম’ (الاسلام الوسطي)-এর ঘোষণা: যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্য ঘোষণায় বলেন যে, সৌদি আরব ১৯৭৯ সালের কট্টরপন্থী ধারায় আর ফিরে যাবে না; বরং দেশটি সহনশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থী ইসলামে প্রত্যাবর্তন করবে, যা সকল ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে সহাবস্থান নিশ্চিত করে।
- বাদশাহ সালমান হাদিস কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা: বিতর্কিত বা বিভ্রান্তিকর হাদিসের অপব্যাখ্যা রোধ এবং নির্ভরযোগ্য হাদিস যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মদিনা মুনাওয়ারায় ‘মাজমাউল মালিক সালমান লি হাদিসিন নাবাবী’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
- মসজিদ ও ওয়াকফ সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা: মসজিদের লাউডস্পিকারের শব্দ কেবল আজান ও ইকামতের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা এবং সাধারণ নামাজের কেরাত লাউডস্পিকারে প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ফিকহি বিষয়ে সালাফি ধারার কট্টর অবস্থান থেকে সরে এসে উন্মুক্ততার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
২. সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনসমূহ (التغيرات الاجتماعية):
- নারীদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন:
- গাড়ি চালানোর অনুমতি: ২০১৮ সালের জুন মাসে সৌদি আরবের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও গাড়ি চালানোর ঐতিহাসিক অনুমতি দেওয়া হয়।
- পুরুষ অভিভাবকত্ব (Wilayah) আইনের শিথিলতা: ২০১৯ সালে আইন সংশোধন করে ২১ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নারীদের পুরুষ অভিভাবকের (বাবা বা স্বামী) অনুমতি ছাড়াই বিদেশ ভ্রমণ ও পাসপোর্ট প্রাপ্তির অধিকার দেওয়া হয়।
- কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক অংশগ্রহণ: সামরিক বাহিনী, পুলিশ, কূটনীতি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নারীদের ব্যাপক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
- বিনোদন ও সংস্কৃতির উন্মুক্তকরণ:
- ২০১৬ সালে ‘জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট অথরিটি’ (GEA) গঠিত হয়। ৩৫ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৮ সালে দেশটিতে বাণিজ্যিক সিনেমা হল পুনরায় চালু করা হয়।
- বার্ষিক ‘রিয়াদ সিজন’ (Riyadh Season)-এর মতো বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসব চালু করে আন্তর্জাতিক সঙ্গীতানুষ্ঠান, কনসার্ট, রেসলিং ও ফ্যাশন শোর আয়োজন করা হচ্ছে।
- পর্যটন ও মিশ্র সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন:
- অর্থনীতিকে তেলের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের করতে ২০১৯ সালে বিশ্বের ৪৯টি দেশের জন্য পর্যটন ভিসা (Tourist Visa) চালু করা হয়।
- বিদেশি নারী পর্যটকদের জন্য ঐতিহ্যবাহী ‘আবায়া’ বা বোরকা পরার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে।
- রেস্তোরাঁ ও জনসমক্ষে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক প্রবেশদ্বার ও বসার ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক নিয়ম বাতিল করা হয়েছে।
- মেগা সিটি ‘নিওম’ (NEOM) ও আধুনিক মেগা প্রকল্প: লোহিত সাগরের উপকূলে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ফিউচারিস্টিক আধুনিক শহর ‘নিওম’, যা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক উদার আইন ও প্রযুক্তি নির্ভর সংস্কৃতির ওপর পরিচালিত হবে।
উপসংহার: সৌদি আরবের এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রশংসা ও আধুনিকায়নের স্বীকৃতি পেলেও মুসলিম বিশ্বের উলামা ও রক্ষণশীল মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাঁদের মতে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে ইসলামি ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি যেন বিসর্জিত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা অপরিহার্য।
٣- أذكر الأوضاع السياسية الراهنة لأفغانستان مفصلا-
[৩. আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা বিস্তারিত আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত আফগানিস্তান ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। গত চার দশক ধরে যুদ্ধ-সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই দেশটি ‘সাম্রাজ্যের কবরস্থান’ (Graveyard of Empires) নামেও খ্যাত। নিম্নে ২০২০ পরবর্তী আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বর্তমান শাসনব্যবস্থা বিশদভাবে তুলে ধরা হলো:
১. দোহা চুক্তি ও ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন:
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পর ন্যাটো ও মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালিয়ে তালেবান সরকারের পতন ঘটায়। দীর্ঘ বিশ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সমস্ত বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করে।
২. ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট: তালেবানের কাবুল পুনরুদ্ধার:
মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে আফগান সেনাবাহিনী ও আশরাফ গনি সরকারের দ্রুত পতন ঘটে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কোনো বড় রক্তপাত ছাড়াই রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং দেশটিকে ‘ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান’ (Islamic Emirate of Afghanistan) হিসেবে পুনর্গঠনের ঘোষণা দেয়।
৩. বর্তমান রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার স্বরূপ:
- নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কাঠামো: আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা হলেন আমিরুল মুমিনীন মোল্লা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। সরকারের প্রধান নীতি ও কৌশল কান্দাহার থেকে পরিচালিত হয় এবং কাবুলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা দেশ পরিচালনা করছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোল্লা মুহাম্মদ হাসান আখুন্দ।
- সংবিধান ও আইন ব্যবস্থা: পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংবিধান বাতিল করে পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে ইসলামি শরীয়াহকে রাষ্ট্রের প্রধান ও একমাত্র আইন হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
- আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি: তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর গত চার দশকের গৃহযুদ্ধের তুলনায় দেশটির সামগ্রিক সাধারণ অপরাধ ও সংঘাত অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে আন্ডারগ্রাউন্ড জঙ্গি সংগঠন ‘দায়েশ/আইএস-খোরাসান’ (ISIS-K) এখনো নিয়মিত বিরতিতে শিয়া মসজিদ, সাধারণ নাগরিক ও সরকারি স্থাপনায় আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করছে।
৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও স্বীকৃতির চ্যালেঞ্জ:
- কূটনৈতিক স্বীকৃতির সংকট: ক্ষমতা গ্রহণের এতদিন পরেও জাতিসংঘ কিংবা বিশ্বের কোনো একক দেশ তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়নি।
- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শর্ত: জাতিসংঘ ও পশ্চিমা বিশ্ব তিনটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে বলছে: ১. অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) জাতীয় সরকার গঠন, ২. নারী শিক্ষা ও নারীদের কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, এবং ৩. আফগান ভূখণ্ডকে কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করতে না দেওয়া।
- প্রতিবেশী দেশসমূহের কৌশলগত অবস্থান: আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও চীন, রাশিয়া, ইরান, পাকিস্তান ও কাতার বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির কারণে কাবুলে তাদের দূতাবাস সচল রেখেছে এবং বাণিজ্য ও কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে চীন আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ (লিথিয়াম, তামা) আহরণে বিশাল বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
৫. অর্থনৈতিক সংকট ও মানবিক পরিস্থিতি:
ক্ষমতা পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ জব্দ করে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটিতে মারাত্মক ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
٤- اكتب ما تعرف عن الوضع الراهن لقضية كشمير موضحا-
[৪. কাশ্মীর সমস্যার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তুমি যা জান বিস্তারিত আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রধান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হলো কাশ্মীর উপত্যকা। কাশ্মীর সমস্যার কারণে ইতোমধ্যে দেশ দুটির মধ্যে তিনটি বড় যুদ্ধ (১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৯৯) সংঘটিত হয়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে কাশ্মীর ইস্যুটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক মাত্রায় প্রবেশ করেছে। নিচে কাশ্মীর সমস্যার বর্তমান পরিস্থিতি আলোচনা করা হলো:
১. কাশ্মীর সংকটের ঐতিহাসিক পটভূমি:
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের তৎকালীন হিন্দু রাজা মহারাজা হরি সিং বিতর্কিতভাবে ভারতের সাথে সংযুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন। এরপর শুরু হওয়া যুদ্ধে কাশ্মীর বিভক্ত হয়ে পড়ে:
- জম্মু ও কাশ্মীর: যা ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
- আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তান: যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
- ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কাশ্মীরে গণভোট (Plebiscite) আয়োজনের ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করে, যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
২. ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন:
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার তাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ (Article 370) এবং অনুচ্ছেদ ৩৫(এ) (Article 35A) বাতিল করে। এর মাধ্যমে:
- কাশ্মীরের দীর্ঘদিনের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত করা হয়।
- পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে বিভক্ত করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (Union Territories) রূপান্তর করা হয়: ১. জম্মু ও কাশ্মীর এবং ২. লাদাখ।
- কাশ্মীরের পৃথক পতাকা ও নিজস্ব সংবিধান বিলুপ্ত হয়ে কেন্দ্রীয় আইন সরাসরি কার্যকর হয়।
- বাইরের নাগরিকদের জমি কেনা ও স্থায়ী নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়।
৩. বর্তমান রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থা:
- কঠোর নিরাপত্তা ও সামরিক নজরদারি: ৩৭০ ধারা বাতিলের সময় থেকে উপত্যকায় অতিরিক্ত হাজার হাজার আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়, ইন্টারনেট ও যোগাযোগ দীর্ঘকাল বিচ্ছিন্ন ছিল এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দী করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতির আপাত শান্ত দৃশ্য দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে।
- জনমিতিক (Demographic) পরিবর্তনের আশঙ্কা: নতুন ডোমিসাইল (বাসস্থান) আইনের আওতায় বহিরাগত ভারতীয়দের কাশ্মীরে জমি কেনা ও চাকরি পাওয়ার পথ সুগম হওয়ায় স্থানীয় কাশ্মীরিরা আশঙ্কা করছেন যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই উপত্যকাকে সংখ্যালঘু বানানোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা চলছে।
- রাজনৈতিক শূন্যতা ও স্থানীয় নির্বাচন: দীর্ঘ বছর পর সম্প্রতি স্থানীয় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা পূর্বের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত এবং রাজ্যপালের হাতেই অধিকাংশ ক্ষমতা ন্যস্ত।
৪. পাকিস্তান ও চীনের অবস্থান:
- পাকিস্তান: পাকিস্তান ভারতের এই পদক্ষেপকে জাতিসংঘের প্রস্তাব ও দ্বিপাক্ষিক সিমলা চুক্তির প্রকাশ্য লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। পাকিস্তান ভারতের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত করে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে ও ওআইসিতে বিষয়টি নিয়মিত উত্থাপন করে আসছে।
- চীন: লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করায় চীন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়, কারণ লাদাখের আকসাই চীন অংশ নিয়ে চীনের সাথে ভারতের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। এর ফলে ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনা সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে।
উপসংহার: কাশ্মীর উপত্যকা দক্ষিণ এশিয়ার দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ফ্ল্যাশপয়েন্ট (Flashpoint)। কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং আলোচনার টেবিলে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান অসম্ভব।
٥- تحدث عن الأوضاع السياسية الراهنة في السودان-
[৫. সুদানের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: আফ্রিকা মহাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ সুদান আরব ও কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির মেলবন্ধন। প্রাকৃতিক সম্পদ ও নীল নদের সুবাদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশটি দশকের পর দশক ধরে সামরিক অভ্যুত্থান, গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত। নিচে ২০১৯ পরবর্তী সুদানের রাজনৈতিক বিবর্তন এবং বর্তমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা পেশ করা হলো:
১. ঐতিহাসিক পটভূমি ও ওমর আল-বশিরের পতন (২০১৯):
সুদানে ১৯৮৯ সাল থেকে টানা ৩০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট ওমর হাসান আল-বশির। তাঁর আমলে ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হয়ে যায়। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, রুটির মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে সুদানি সেনাবাহিনী ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
২. অন্তর্বর্তীকালীন শাসন ও ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান:
বশিরের পতনের পর সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় ‘সার্বভৌম কাউন্সিল’ (Sovereign Council) এবং প্রধানমন্ত্রী হন অর্থনীতিবিদ ড. আব্দাল্লাহ হামদুক। কিন্তু বেসামরিক সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর সুদানি সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে জরুরি অবস্থা জারি করেন।
৩. ২০২৩ সাল থেকে চলমান বর্তমান রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ:
সুদানের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ হলো ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত দুটি সামরিক শক্তির মুখোমুখি সংঘাত। ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে সুদানে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা বর্তমানেও চলমান। এই সংঘাতের দুই পক্ষ হলো:
- সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (SAF – Sudanese Armed Forces): যার নেতৃত্বে আছেন সেনাপ্রধান ও কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান।
- র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF – Rapid Support Forces): এটি একটি শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনী, যার নেতৃত্বে আছেন জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো (যিনি ‘হেমেদতি’ নামে পরিচিত)। পূর্বে এই বাহিনী দারফুরের ‘জানজাবিদ’ মিলিশিয়া হিসেবে পরিচিত ছিল।
৪. বর্তমান গৃহযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক প্রভাব:
- রাজধানী খার্তুম ও দারফুরে ধ্বংসযজ্ঞ: যুদ্ধ শুরুর পর রাজধানী খার্তুম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষ বিমান হামলা ও ভারী কামান ব্যবহার করায় নগরীর অবকাঠামো, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। দারফুরে আরএসএফ বাহিনীর বিরুদ্ধে পুনরায় জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ উঠেছে।
- বিশ্বের সর্ববৃহৎ বাস্তুচ্যুতি সংকট: জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই যুদ্ধের কারণে সুদানের ভেতর ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে (মিশর, চাদ, দক্ষিণ সুদান) প্রায় ১ কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ শরণার্থী সংকট।
- দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে জনগণ: কৃষি উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেশটির আড়াই কোটির বেশি মানুষ চরম খাদ্য সংকটে রয়েছে এবং বহু অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ঘোষিত হয়েছে।
৫. আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা:
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে জেদ্দায় দফায় দফায় শান্তি আলোচনা (Jeddah Talks) অনুষ্ঠিত হলেও কোনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়নি। তাছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), মিশর ও রাশিয়ার মতো বিদেশি শক্তির ছায়া প্রভাবের কারণে এই সংঘাত আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং বেসামরিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর ছাড়া সুদানের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন।
٦- متى أسست منظمة التعاون الإسلامي؟ وما خلفيتها وأهدافها؟ بين-
[৬. অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) কখন প্রতিষ্ঠিত হয়? এর প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে গঠিত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা হলো ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন’ (OIC – منظمة التعاون الإسلامي)। জাতিসংঘের পর এটিই বিশ্বের বৃহত্তম বহুপাক্ষিক জোট, যার বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৫৭টি রাষ্ট্র। নিম্নে এর প্রতিষ্ঠা, পটভূমি ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ওআইসি প্রতিষ্ঠার সন ও স্থান:
- প্রতিষ্ঠা তারিখ: ১৯৬৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর (১২ রজব ১৩৮৯ হিজরি)।
- প্রতিষ্ঠা স্থান: মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রথম ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলনে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- নামকরণ: প্রতিষ্ঠাকালে এর নাম ছিল ‘অর্গানাইজেশন অব দ্য ইসলামিক কনফারেন্স’ (Organization of the Islamic Conference)। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ২৮ জুন কাজাখস্তানের আস্তানায় অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৩৮তম সম্মেলনে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন’ (Organisation of Islamic Cooperation)।
- সদর দপ্তর: ওআইসির স্থায়ী সদর দপ্তর সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত। সনদ অনুযায়ী, পবিত্র জেরুজালেম (আল-কুদস) মুক্ত হলে এর সদর দপ্তর স্থায়ীভাবে জেরুজালেমে স্থানান্তরিত হবে।
২. ওআইসি প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (خلفية التأسيس):
ওআইসি প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রত্যক্ষ ও মূল কারণ ছিল মুসলিম বিশ্বের প্রথম কিবলা ও তৃতীয় পবিত্রতম স্থান ‘পবিত্র মসজিদুল আকসা’য় যায়নবাদী অগ্নিসংযোগের ঘটনা।
- ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত এক চরমপন্থী ইহুদি ডেনিস মাইকেল রোহান ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ছত্রছায়ায় মসজিদুল আকসায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
- এই নারকীয় অগ্নিকাণ্ডে ঐতিহাসিক সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর স্মৃতিবিজড়িত কাঠের তৈরি দুর্লভ মিম্বরটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয় এবং মসজিদের দক্ষিণ অংশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- এই ঘটনায় গোটা মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সৌদি আরবের দূরদর্শী বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ এবং মরক্কোর বাদশাহ দ্বিতীয় হাসানের যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৯ সালের ২২-২৫ সেপ্টেম্বর রাবাতে ২৪টি মুসলিম দেশের শীর্ষ নেতাদের জরুরি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করা হয়। এই ঐতিহাসিক রাবাত সম্মেলনেই সম্মিলিত মুসলিম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ওআইসি গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
৩. ওআইসির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ (أهداف المنظمة):
ওআইসির সনদে নির্ধারিত প্রধান উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ:
- মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি রক্ষা: সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে ইসলামি সংহতি, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সার্বিক সহযোগিতা সুদৃঢ় করা।
- আল-কুদস ও পবিত্র স্থানসমূহের সুরক্ষা: ফিলিস্তিনের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস ও মসজিদুল আকসার ইসলামি মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা।
- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যৌথ স্বার্থরক্ষা: জাতিসংঘসহ বিশ্বের সকল আন্তর্জাতিক ফোরামে মুসলিম দেশসমূহের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব যৌথভাবে তুলে ধরা।
- ইসলামোফোবিয়া ও ধর্মীয় বৈষম্য প্রতিরোধ: ইসলামের প্রকৃত শান্তির বার্তা বিশ্বদরবারে তুলে ধরা এবং পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের বিরুদ্ধে অবমাননা ও ঘৃণা প্রচারের বিরুদ্ধে সমন্বিত লড়াই করা।
- অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন: মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য, যৌথ বিনিয়োগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আদান-প্রদান বাড়ানো। এ লক্ষ্যে ‘ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (IsDB) কাজ করছে।
- মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা: অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে (যেমন: মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, ভারতের কাশ্মীরি মুসলিম) বসবাসকারী মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার আদায়ে কাজ করা।
উপসংহার: ওআইসি মুসলিম বিশ্বের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হলেও সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল, স্বার্থের সংঘাত এবং কার্যকর যৌথ সামরিক বা অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের অক্ষমতার কারণে এটি অনেক সময় প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে এর গুরুত্ব আজও অপরিসীম।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (Frequently Asked Questions – FAQ)
প্রশ্ন ১: অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (OIC) কখন এবং কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট ইসরায়েল অধিকৃত জেরুজালেমের পবিত্র মসজিদুল আকসায় যায়নবাদীদের অগ্নিসংযোগের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদে এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মরক্কোর রাবাতে ওআইসি প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন ২: সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কী এবং এর ফলে দেশটিতে কী সামাজিক পরিবর্তন এসেছে?
উত্তর: ‘ভিশন ২০৩০’ হলো যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি আরবের তেল-পরবর্তী অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও সামাজিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনা। এর ফলে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি, অভিভাবকত্ব আইনের শিথিলতা, সিনেমা ও বিনোদন উৎসব চালু এবং সহনশীল মধ্যপন্থী ইসলামের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট কখন মারাত্মক রূপ নেয়?
উত্তর: ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে ব্যাপক গণহত্যা ও জাতিগত নিধন শুরু করলে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে পূর্বের রোহিঙ্গাসহ প্রায় ১২ লক্ষাধিক শরণার্থী কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাস করছে।
প্রশ্ন ৪: ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কাশ্মীরের রাজনৈতিক মর্যাদায় কী পরিবর্তন ঘটে?
উত্তর: ভারত সরকার তাদের সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত করে এবং রাজ্যটিকে ‘জম্মু-কাশ্মীর’ ও ‘লাদাখ’ নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করে।
প্রশ্ন ৫: সুদানের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ কী?
উত্তর: সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বাধীন সরকারি সেনাবাহিনী (SAF) এবং জেনারেল হেমেদতির নেতৃত্বাধীন আধা-সামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (RSF)-এর মধ্যে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলছে।