اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٠
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২০]
القسم: الحديث والدراسات الإسلامية [বিভাগ: আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
المادة: أصول التخريج ودراسة الأسانيد [বিষয়: উসূলুত তাখরীজ ওয়া দিরাসাতুল আসানীদ]
كود المادة [বিষয় কোড]: 404 | كود الامتحان [পরীক্ষা কোড]: 204 | كود ورقة الأسئلة [প্রশ্নপত্র কোড]: 171
الزمن [সময়]: ৪ ঘণ্টা | الدرجات الكاملة [পূর্ণমান]: ৮০
الملاحظة [দ্রষ্টব্য]: أجب عن خمسة من الأسئلة التالية، والدرجات متساوية- [নিচের যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও। সকল প্রশ্নের মান সমান (১৬ × ৫ = ৮০ নম্বর)।]
١- ماذا تعرف عن تخريج الحديث؟ تحدث عن فائدته والحاجة إليه-
[১. তাখরীজুল হাদিস (تخريج الحديث) সম্পর্কে তুমি কী জান? এর উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: হাদিস শাস্ত্রের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ, সূক্ষ্ম ও প্রায়োগিক শাখার নাম হলো ‘ইলমুত তাখরীজ’ বা তাখরীজুল হাদিস। হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা নিরূপণ, মূল গ্রন্থের সন্ধান এবং সনদের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তাখরীজের কোনো বিকল্প নেই। নিম্নে তাখরীজের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয়, এর উপকারিতা ও সমকালীন প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
তাখরীজ (التخريج)-এর আভিধানিক অর্থ:
‘তাখরীজ’ (تخريج) শব্দটি আরবি ‘আল-খুরুজ’ (الخروج) মূলধাতু থেকে বাবে তাফঈল (تفعيل)-এর মাসদার বা ক্রিয়ামূল। এর আভিধানিক অর্থ হলো:
- الإبراز والإظهار: কোনো বিষয়কে প্রকাশ করা বা বের করে স্পষ্ট করা।
- الاستنباط: কোনো গূঢ় তত্ত্ব নিংড়ে বের করা।
- التدريب والتوجيه: কাউকে কোনো কাজে দক্ষ বা প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা।
সুতরাং শাব্দিক অর্থে গোপন বা লুকায়িত কোনো হাদিসের মূল উৎস প্রকাশ ও স্পষ্ট করাকে তাখরীজ বলা হয়।
তাখরীজ-এর পারিভাষিক সংজ্ঞা:
মুহাদ্দিসীন ও উসূলবিদদের পরিভাষায় তাখরীজের সংজ্ঞায় আল্লামা সাখাভী (রহ.) এবং আধুনিক গবেষক ড. মাহমুদ আত-তাহহান সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
هو الدلالة على موضع الحديث في مصادره الأصلية التي أخرجته بسنده، ثم بيان مرتبته عند الحاجة-
“হাদিসকে তার মূল প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে নিজস্ব সনদসহ চিহ্নিত করে তার অবস্থান নির্দেশ করা এবং প্রয়োজনে হাদিসের গ্রহণযোগ্যতার মান (সহিহ, হাসান বা যয়িফ) সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করাকে তাখরীজ বলে।”
তাখরীজের মূল উপাদানসমূহ:
- উৎস নির্দেশ (العزو إلى المصادر الأصلية): হাদিসটি মূল কোন কিতাবে (যেমন: কুতুবে সিত্তাহ, মুসনাদে আহমদ, মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক) সংকলিত হয়েছে তা উল্লেখ করা।
- সনদ স্পষ্টকরণ (بيان السند): হাদিসটির প্রাথমিক বর্ণনাকারী (সাহাবী) এবং পরবর্তী সনদের স্তর উন্মোচন করা।
- হাদিসের মান নির্ধারণ (الحكم على الحديث): হাদিসটি সহিহ, হাসান নাকি দুর্বল তা রিজাল শাস্ত্র ও উসূলের আলোকে ব্যাখ্যা করা।
তাখরীজুল হাদিসের উপকারিতা (فوائد التخريج):
তাখরীজের মাধ্যমে একজন হাদিস গবেষক অগণিত ইলমি ফায়দা অর্জন করতে পারেন:
- মূল উৎসের প্রামাণিকতা লাভ: লোকমুখে প্রচলিত কথা বা পরোক্ষ বইতে উদ্ধৃত বিবরণ আসলেই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস কি না এবং তা মূল কোন কিতাবে আছে তা সরাসরি জানা যায়।
- বহুবিধ সনদের সন্ধান (تعدد الطرق): তাখরীজের মাধ্যমে একটি হাদিসের বিভিন্ন সূত্র বা সনদ পাওয়া যায়, যা একক দুর্বল হাদিসকে ‘হাসান লিগাইরিহী’ বা শক্তিশালী স্তরে উন্নীত করতে সাহায্য করে।
- সনদের বিচ্ছিন্নতা ও ত্রুটি দূরীকরণ: কোনো গ্রন্থে হাদিস মুরাসাল (তাবেয়ী সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণনা করেছেন) বর্ণিত হলে তাখরীজের মাধ্যমে অন্য সনদে বাদ পড়া সাহাবীর নাম স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
- তাদলীসের সন্দেহ দূরীকরণ: মুদাল্লিস রাবী যদি ‘আন’ (عن) শব্দ দ্বারা হাদিস বর্ণনা করে থাকেন, অন্য সনদে তাখরীজের ফলে তার সরাসরি শ্রবণ বা ‘সামা’ (حدثنا / سمعت) প্রমাণিত হয়ে যায়।
- মুবহাম রাবীর পরিচয় উন্মোচন: সনদে যদি কেবল ‘জনৈক ব্যক্তি’ (عن رجل) উল্লেখ থাকে, অন্য তুরুক তাখরীজ করলে তার মূল নাম-পরিচয় বের হয়ে আসে।
- ইদরাজ (মিশ্রণ) চিহ্নিতকরণ: মূল হাদিসের বক্তব্যের সাথে রাবীর নিজস্ব বক্তব্য মিশ্রিত হয়ে গেলে তাখরীজের মাধ্যমে মূল মতন আলাদা করা সম্ভব হয়।
তাখরীজের প্রয়োজনীয়তা (الحاجة إليه):
বর্তমান সময়ে তাখরীজের আবশ্যকতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি:
- জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা প্রতিরোধ: সমাজ ও ওয়াজ মাহফিলে ছড়িয়ে পড়া বানোয়াট হাদিস প্রতিহত করতে তাখরীজের জ্ঞান অপরিহার্য।
- ফিকহি সিদ্ধান্তের সঠিকতা যাচাই: ফিকহের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে বহু হাদিস সনদবিহীনভাবে এসেছে; সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে সঠিক ফতোয়া প্রদানে তাখরীজ অত্যন্ত জরুরি।
- ইসলামি গবেষণার মানদণ্ড রক্ষা: আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক থিসিস বা ইসলামি গবেষণায় কোনো হাদিস উদ্ধৃত করলে তার তাখরীজ পেশ করা বাধ্যতামূলক শর্ত।
٢- اذكر تاريخ التخريج- ثم بين مقاصد التخريج ومجالاته موضحا-
[২. তাখরীজের ইতিহাস আলোচনা কর। অতঃপর তাখরীজের উদ্দেশ্যসমূহ এবং ক্ষেত্রসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: তাখরীজ শাস্ত্র রাতারাতি তৈরি হয়নি; বরং হাদিস সংরক্ষণের স্বাভাবিক ক্রমবিকাশের ধারায় বিভিন্ন যুগে এর পরিধি ও প্রায়োগিক পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য এসেছে। নিম্নে তাখরীজের ঐতিহাসিক বিকাশ, এর উদ্দেশ্য ও কর্মক্ষেত্র আলোচনা করা হলো:
তাখরীজের ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ (تاريخ التخريج):
তাখরীজের ইতিহাসকে প্রধানত চারটি ঐতিহাসিক যুগে বিভক্ত করা যায়:
- প্রথম যুগ (প্রাথমিক সংকলকদের যুগ – হিজরি ১ম থেকে ৫ম শতক): এ যুগে মুহাদ্দিসগণ স্বয়ং হাদিস বর্ণনাকারী ও সংকলক ছিলেন। তাঁদের নিকট ‘তাখরীজ’ অর্থ ছিল নিজস্ব সনদের ভিত্তিতে শায়খদের কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করে কিতাবে সন্নিবেশিত করা। যেমন- ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহ.) স্ব স্ব কিতাবে হাদিস তাখরীজ করেছেন।
- দ্বিতীয় যুগ (পরোক্ষ উদ্ধৃতি ও সনদ বর্জনের যুগ – ৫ম ও ৬ষ্ঠ শতক): এ সময়ে ফিকহ, তাফসির ও তাসাউফের ব্যাপক গ্রন্থ রচিত হয় (যেমন: আল-হিদায়াহ, আল-কাশশাফ, এহয়াউ উলুমিদ্দীন)। লেখকগণ গ্রন্থ কলেবর সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে সনদের ধারাবাহিকতা বাদ দিয়ে কেবল মতন উল্লেখ করেন। ফলে সাধারণ পাঠক ও গবেষকদের জন্য হাদিসের প্রামাণিকতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
- তৃতীয় যুগ (তাখরীজের স্বর্ণযুগ – হিজরি ৭ম থেকে ১০ম শতক): সনদবিহীন প্রচলিত কিতাবসমূহের হাদিসগুলোর উৎস ও সনদ উদ্ধারের জন্য মুহাদ্দিসগণ বিশেষ তাখরীজ গ্রন্থ প্রণয়ন শুরু করেন। এ যুগের শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিসগণ হলেন:
- আল্লামা যায়লায়ী (রহ.) [মৃ. ৭৬২ হি.]: হিদায়া গ্রন্থের হাদিস তাখরীজ করে বিশ্বখ্যাত ‘নাসবুর রায়া লিআহাদিসিল হিদায়াহ’ (نصب الراية) রচনা করেন।
- হাফেয আল্লামা ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) [মৃ. ৮৫২ হি.]: রাফেয়ীর শারহুল ওয়াজিজের হাদিস তাখরীজে ‘তালখীসুল হাবীর’ (التلخيص الحبير) এবং কাশশাফের হাদিস তাখরীজে ‘আল-কাফিশ শাফ’ রচনা করেন।
- হাফেয আল-ইরাকী (রহ.) [মৃ. ৮০৬ হি.]: ইমাম গাযযালীর এহয়াউ উলুমিদ্দীনের হাদিস তাখরীজে ‘আল-মুগনী আন হামলিল আসফার’ প্রণয়ন করেন।
- চতুর্থ যুগ (আধুনিক ও কম্পিউটার যুগ): আধুনিক যুগে শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী, শায়খ আহমদ শাকির, ড. মাহমুদ আত-তাহহান প্রমুখ উসূলুত তাখরীজকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্য বিষয়ে রূপ দেন। বর্তমানে কম্পিউটার ডাটাবেজ ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে এ শাস্ত্র নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
তাখরীজের মূল উদ্দেশ্যসমূহ (مقاصد التخريج):
- العزو إلى الأصل (মূল গ্রন্থের সন্ধান): কোনো হাদিস কোন মূল হাদিসগ্রন্থে রয়েছে তা খুঁজে বের করা।
- تمييز الصحيح من السقيم (বিশুদ্ধ ও অশুদ্ধের পৃথকীকরণ): হাদিসের সনদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সহিহ, হাসান, যয়িফ ও মাওদূ হাদিস আলাদা করা।
- جمع الطرق والشواهد (সনদ ও সাক্ষ্য সংগ্রহ): একাধিক সনদের সমন্বয়ে একক দুর্বল হাদিসের শক্তি বৃদ্ধি করা।
- إزالة الإشكال والشبهات (অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি নিরসন): আপাতবিরোধী হাদিসের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতম সনদটিকে প্রাধান্য দেওয়া এবং সন্দেহ দূর করা।
তাখরীজের ক্ষেত্রসমূহ (مجالات التخريج):
যেসব শাস্ত্রের কিতাবে হাদিস সনদহীনভাবে এসেছে, সেগুলোর সবই তাখরীজের উর্বর ক্ষেত্র:
- ইলমুল ফিকহ ও উসূলে ফিকহ: হিদায়া, কুদূরী, কানযুদ দাকায়িক, আল-মাজমূ ইত্যাদি গ্রন্থে উল্লিখিত দলিলের তাখরীজ।
- ইলমুত তাফসির: তাফসিরে কাশশাফ, বায়যাবী, ইবনে কাসীর প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত হাদিস ও আসারের তাখরীজ।
- আখলাক ও তাসাউফ: এহয়াউ উলুমিদ্দীন, মাদারিজুস সালিকীন, কূতুল কুলূব ইত্যাদি কিতাবের হাদিসের তাখরীজ।
- সিরাত ও ইতিহাস: ইবনে হিশাম, তাবাকাতুল কুবরা, তারিখুত তাবারী প্রভৃতি গ্রন্থের হাদিস ও ঐতিহাসিক বর্ণনার তাখরীজ।
٣- اكتب أهمية الإسناد ودراسة الأسانيد- ثم اذكر أشهر أنواع المصنفات في تراجم الصحابة-
[৩. সনদ ও দিরাসাতুল আসানীদ এর গুরুত্ব বর্ণনা কর। অতঃপর সাহাবিদের জীবনী সম্পর্কিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলির প্রকরণ বর্ণনা কর।]
উত্তর:
সনদ (الإسناد) এর পরিচয়:
‘সনদ’ অর্থ নির্ভর করা বা প্রমাণপত্র। হাদিসের পরিভাষায় হাদিসের মূল বক্তব্য (মতন) পর্যন্ত পৌঁছানোর বর্ণনাকারী পরম্পরাকে ‘সনদ’ বা ‘ইসনাদ’ বলা হয়।
সনদ ও দিরাসাতুল আসানীদ-এর গুরুত্ব (أهمية الإسناد ودراسة الأسانيد):
- দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: সনদের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রখ্যাত তাবেয়ী আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন:
الإسناد من الدين، ولولا الإسناد لقال من شاء ما شاء-
“সনদ হলো দ্বীনেরই অংশ; যদি সনদ না থাকত, তবে যার যা ইচ্ছা সে তা-ই বলত।” (সহিহ মুসলিমের ভূমিকা)
- মুহাম্মদীয় উম্মতের অনন্য বৈশিষ্ট্য: সনদ প্রথা আল্লাহ তাআলা কেবল উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্যই নির্ধারিত করেছেন। পূর্ববর্তী ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মে কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ না থাকায় তাদের ধর্মগ্রন্থ বিকৃত হয়ে গেছে।
- জাল হাদিস চিহ্নিতকরণের হাতিয়ার: ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহ.) বলেন, “সনদ হলো মুমিনের অস্ত্র; যদি তার কাছে অস্ত্রই না থাকে, তবে সে লড়াই করবে কীভাবে?”
- দিরাসাতুল আসানীদ (সনদ পর্যালোচনার অনিবার্যতা): সনদ পর্যালোচনা ছাড়া কোনো হাদিসকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী হিসেবে চূড়ান্ত ঘোষণা করা যায় না। রাবীদের সততা (আদালত), স্মৃতিশক্তি (দ্বব্ত) এবং নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতেই দিরাসাতুল আসানীদ প্রয়োজন।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনী (تراجم الصحابة) সম্পর্কিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলির প্রকরণ:
হাদিস শাস্ত্রের মৌলিক নীতি হলো—“الصحابة كلهم عدول” (সমস্ত সাহাবী ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত)। তাই হাদিসের সনদে সাহাবীর নাম নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলে তাঁর ব্যক্তিগত আদালত পরীক্ষা করতে হয় না। সাহাবীদের নাম, জীবদ্দশা, মর্যাদা ও ইসলাম গ্রহণের সময় নির্ধারণে মুহাদ্দিসগণ অনন্য গ্রন্থাবলি সংকলন করেছেন। এর প্রধান গ্রন্থাবলি নিম্নরূপ:
- ১. আল-ইস্তিআব ফী মারিফাতি আল-আসহাব (الاستيعاب في معرفة الأصحاب):
রচয়িতা: আল্লামা হাফেয আবু উমর ইউসুফ ইবনে আব্দিল বার আল-কুরতুবী (মৃ. ৪৬৩ হি.)। এটি সাহাবীদের পরিচয় বিষয়ক প্রাচীনতম ও সর্বাধিক প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের অন্যতম, যা বর্ণানুক্রমিক পদ্ধতিতে রচিত। এতে প্রায় ৩,৫০০ সাহাবীর জীবনী স্থান পেয়েছে। - ২. উসদুল গাবাহ ফী মারিফাতিস সাহাবাহ (أسد الغابة في معرفة الصحابة):
রচয়িতা: আল-ইমাম ইযযুদ্দীন ইবনুল আসীর আল-জাযারী (মৃ. ৬৩০ হি.)। তিনি পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাব একত্রিত করে প্রায় ৭,৫৫৪ জন সাহাবীর বিস্তৃত জীবনী সংকলন করেছেন। - ৩. আল-ইসাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ (الإصابة في تمييز الصحابة):
রচয়িতা: আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস হাফেয ইবনে হাজার আল-আসকালানী (মৃ. ৮৫২ হি.)। সাহাবা বিষয়ক সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ও চূড়ান্ত প্রামাণ্য গ্রন্থ। এতে ১২,০০০-এর অধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে এবং গ্রন্থটি চার ভাগে বিন্যস্ত। - ৪. আত-তাবাকাতুল কুবরা (الطبقات الكبرى):
রচয়িতা: মুহাম্মদ ইবনে সা’দ আল-বাগদাদী (কাতিবুল ওয়াকিদী) [মৃ. ২৩০ হি.]। সাহাবীদের বদর, উহুদ ও হিজরতের মর্যাদা অনুযায়ী স্তরভিত্তিক (তাবাকাত) বর্ণনায় এটি অতুলনীয়। - ৫. তাজরীদু আসমাইস সাহাবাহ (تجريد أسماء الصحابة):
রচয়িতা: আল-হাফেয শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (মৃ. ৭৪৮ হি.)। উসদুল গাবাহর ওপর ভিত্তি করে রচিত একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অতি মূল্যবান নামতালিকা।
٤- اذكر أنواع المصنفات في التخريج عن طريق النظر في حال الحديث سندًا ومتنا-
[৪. মতন ও সনদের দিক থেকে হাদিসের অবস্থা লক্ষ্য করার মাধ্যমে তাখরীজ বিষয়ক গ্রন্থসমূহ আলোচনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: তাখরীজের অন্যতম জনপ্রিয় ও সহজ পদ্ধতি হলো হাদিসের বাহ্যিক অবস্থা, গুণাবলি বা কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রেখে তাখরীজ করা। হাদিসের মতন বা সনদের এই বিশেষ অবস্থার ওপর ভিত্তি করে মুহাদ্দিসগণ পৃথক পৃথক কিতাব সংকলন করেছেন। নিম্নে এর প্রধান প্রকার ও গ্রন্থাবলি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হলো:
- মুতাওয়াতির হাদিস বিষয়ক গ্রন্থাবলি (الكتب المصنفة في الأحاديث المتواترة):
যেসব হাদিস এত বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে তাদের মিথ্যার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব, সেগুলোকে মুতাওয়াতির বলে। হাদিসটি মুতাওয়াতির কি না তা জানতে এ জাতীয় কিতাবে খুঁজতে হয়:- আল-আযহারুল মুতানাসিরাহ ফিল আখবারিল মুতাওয়াতিরাহ — ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (রহ.)।
- নাযমুল মুতানাছির মিনাল হাদিসিল মুতাওয়াতির — আল্লামা মুহাম্মদ জাফর আল-কাত্তানী (রহ.)।
- প্রসিদ্ধ ও লোকমুখে প্রচলিত হাদিস বিষয়ক গ্রন্থ (كتب الأحاديث المشتهرة على الألسنة):
যেসব হাদিস সাধারণ মানুষ ও আলেমদের মুখে মুখে বহুল প্রচলিত, সেগুলোর মূল উৎস ও সহিহ-যয়িফ অবস্থা যাচাইয়ের জন্য এ গ্রন্থসমূহ রচিত:- আল-মাকাসিদুল হাসানাহ ফী বায়ানি কাসীরিম মিনাল আহাদিসিল মুশতাহারাহ আলাল আলসিনাহ — আল্লামা শামসুদ্দীন আস-সাখাভী (রহ.)।
- কাশফুল খাফা ওয়া মুযীলুল ইলবাস আম্মা ইশতাহারা মিনাল আহাদিসি আলা আলসিনাতিন নাস — শায়খ ইসমাঈল ইবনে মুহাম্মদ আল-আজলূনী (রহ.)।
- আত-তাযকিরাহ ফিল আহাদিসিল মুশতাহারাহ — ইমাম বদরুদ্দীন আয-যারকাশী (রহ.)।
- হাদিসে কুদসি বিষয়ক গ্রন্থাবলি (كتب الأحاديث القدسية):
যে হাদিসের অর্থ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে এবং ভাষা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিজস্ব, তাকে হাদিসে কুদসি বলে। এর জন্য স্বতন্ত্র কিতাব রয়েছে:- আল-ইতহাফাতুস সুন্নিয়্যাহ বিল আহাদিসিল কুদসিয়্যাহ — আল্লামা মুহাম্মদ মাদানী (রহ.)।
- আল-আহাদিসুল কুদসিয়্যাহ — মিশরের আওকাফ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য সংকলন।
- জাল ও মনগড়া হাদিস বিষয়ক গ্রন্থ (كتب الأحاديث الموضوعة):
যেসব কথা হাদিস নয় অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নামে সমাজে চালানো হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করার কিতাব:- কিতাবুল মাওদূআত — ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.)।
- আল-লাআলিল মাসনূআহ ফিল আহাদিসিল মাওদূআহ — ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (রহ.)।
- আল-মাসনূ’ ফী মা’রিফাতিল হাদিসিল মাওদূ’ — মোল্লা আলী আল-কারী (রহ.)।
- তানযীহুশ শারীয়াহ আল-মারফূআহ আনিল আখবারিশ শানীআহ আল-মাওদূআহ — ইবনে আররাক আদ-দিমাশকী (রহ.)।
- গোপন ত্রুটিযুক্ত হাদিস বিষয়ক গ্রন্থ (كتب علل الحديث):
হাদিসের বাহ্যিক সনদ সহিহ মনে হলেও ভেতরে কোনো সূক্ষ্ম দোষ (ইল্লাত) থাকলে তা উদঘাটনকারী কিতাব:- আল-ইলাল — ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী (রহ.)।
- ইলালুল হাদিস — ইমাম ইবনে আবি হাতিম আর-রাযী (রহ.)।
- আল-ইলালুল কাবীর ও আল-ইলালুস সাগীর — ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.)।
- আল-ইলালুল ওয়ারিদাহ ফিল আহাদিসিন নাবাবিয়্যাহ — ইমাম আবুল হাসান আদ-দারাকুতনী (রহ.)।
- মুরসাল ও মুনকাতি হাদিস বিষয়ক গ্রন্থ (كتب المراسيل):
যে সনদের ধারাবাহিকতায় কোনো তাবেয়ী বা রাবী বাদ পড়েছেন:- কিতাবুল মারাসীল — ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী (রহ.)।
- আল-মারাসীল — ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রহ.)।
- জামেউত তাহসীল ফী আহকামিল মারাসীল — আল-হাফেয সালাহুদ্দীন আল-আলাঈ (রহ.)।
٥- بين أقسام كتب الحديث المرتبة على الأبواب والموضوعات- ثم اذكر الفرق بين السنن والمصنفات-
[৫. অধ্যায় ও বিষয়ভিত্তিক বিন্যস্ত হাদিস গ্রন্থসমূহের আলোচনা কর এবং সুনান ও মুসান্নাফাতের পার্থক্য বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: হাদিসের সংকলন ও তাখরীজের সুবিধার জন্য মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন বিন্যাস পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। এর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও কার্যকর পদ্ধতি হলো ‘আত-তারতীব আলাল আবওয়াব’ বা অধ্যায় ও বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস। নিম্নে এর শ্রেণিবিভাগ এবং সুনান ও মুসান্নাফের পার্থক্য বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
বিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক বিন্যস্ত হাদিস গ্রন্থের প্রকারভেদ:
- আল-জাওয়ামে (الجوامع – বহুমাত্রিক পূর্ণাঙ্গ সংকলন):
যে কিতাবে দ্বীনের মূল ৮টি ক্ষেত্র (আকাইদ, আহকাম, সিরাত, আদব, তাফসির, যুহদ, ফিতান ও কিয়ামতের আলামত, মানাকিব) পূর্ণাঙ্গরূপে অধ্যায়ভিত্তিক সাজানো থাকে। যেমন: সহিহুল বুখারী ও জামে আত-তিরমিযী। - আস-সুনান (السنن – ফিকহি সংকলন):
যে কিতাবে কেবল ফিকহ বা শরয়ী হুকুম-আহকাম সম্পর্কিত মারফু হাদিসসমূহ ফিকহের তারতীব অনুযায়ী (তাহরাত, সালাত, সাওম, যাকাত, হজ্জ ইত্যাদি) সংকলিত হয়। যেমন: সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ। - আল-মুসান্নাফাত (المصنفات – ব্যাপক ফিকহি ও আসার সংকলন):
সুনানের মতো ফিকহি অধ্যায়ে বিন্যস্ত হলেও এতে মারফু হাদিসের পাশাপাশি সাহাবায়ে কেরামের আমল/বাণী (মাওকুফ) এবং তাবেয়ীদের ফতোয়া (মাকতু) ব্যাপকভাবে সংকলিত হয়। যেমন: মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ। - আল-মুওয়াত্তাআহ (الموطآت – সুবিন্যস্ত সংকলন):
মুসান্নাফের অনুরূপ যা ফিকহ ও আসারের মেলবন্ধনে সহজবোধ্য করা হয়েছে। যেমন: মুয়াত্তা ইমাম মালিক। - আল-মুস্তাদরাকাত (المستدركات – সম্পূরক সংকলন):
পূর্ববর্তী কোনো মুহাদ্দিসের শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও তাঁর গ্রন্থে স্থান না পাওয়া হাদিসসমূহ অধ্যায়ভিত্তিক সংকলন। যেমন: হাকিম নিশাপুরী রচিত আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহীহাইন। - আল-মুস্তাখরাজাত (المستخرجات – বিকল্প সনদের সংকলন):
অন্য কোনো গ্রন্থের মূল হাদিসগুলোকে লেখক স্বীয় সনদে (মূল লেখকের মাধ্যম ছাড়া) সংকলন করেন। যেমন: মুস্তাখরাজে আবু নুয়াইম আলা সহিহিল বুখারী।
সুনান ও মুসান্নাফাত-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য (الفرق بين السنن والمصنفات):
| তুলনার বিষয় | আস-সুনান (السنن) | আল-মুসান্নাফাত (المصنفات) |
|---|---|---|
| হাদিসের প্রকার | মূলত ও প্রধানত মারফু হাদিস (রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন) সংকলিত হয়। | মারফু হাদিসের সাথে প্রচুর পরিমাণে মাওকুফ (সাহাবীদের কথা) ও মাকতু (তাবেয়ীদের ফতোয়া) সংকলিত হয়। |
| মূল উদ্দেশ্য | শরীয়তের মৌলিক আহকামে নববী সুন্নাহর প্রামাণিক দলিল উপস্থাপন করা। | সুন্নাহর পাশাপাশি প্রথম যুগের সালাফদের ফিকহি আমল, ইজমা ও ফতোয়ার সামগ্রিক চিত্র সংরক্ষণ করা। |
| ফিকহি পর্যালোচনা | সুনানের রচয়িতাগণ অনেক সময় হাদিসের মান (সহিহ/যয়িফ) ও ফিকহি মতভেদ যুক্ত করেন। | মুসান্নাফে সাধারণত মান নির্ধারণ না করে সালাফদের বর্ণনা অবিকল সনদসহ উপস্থাপন করা হয়। |
| প্রসিদ্ধ উদাহরণ | সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহ। | মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক আস-সানআনী, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ। |
٦- عرف الجامع والسنن والمعاجم والأطراف- ثم اذكر أشهر المصنفات فيها-
[৬. আল-জামে, আস-সুনান, আল মাআজিম এবং আল-আতরাফ এর পরিচয় দাও। এসব বিষয়ে রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলির নাম উল্লেখ কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: হাদিস সংকলনের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণের বৈচিত্র্যময় পদ্ধতির ফলে নানা পরিভাষা ও গ্রন্থ কাঠামোর উদ্ভব হয়েছে। নিচে ‘আল-জামে’, ‘আস-সুনান’, ‘আল-মাআজিম’ এবং ‘আল-আতরাফ’-এর বিশদ পরিচয় ও প্রামাণ্য গ্রন্থাবলি উল্লেখ করা হলো:
- আল-জামে (الجامع):
- পরিচয়: হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘আল-জামে’ এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুবিশাল সংকলন, যাতে দ্বীনের যাবতীয় মৌলিক আটটি বিষয়ের হাদিস বাব বা অধ্যায়ভিত্তিক সাজানো থাকে। এই ৮টি বিষয় হলো:
- العقائد (ঈমান ও আকিদা)
- الأحكام (হালাল-হারাম ও ফিকহি বিধান)
- السير والتاريخ (নবীর সিরাত ও ইতিহাস)
- الآداب (আখলাক ও শিষ্টাচার)
- التفسير (কুরআনের তাফসির)
- الزهد والرقائق (আত্মশুদ্ধি ও পরকাল)
- الفتن وأشراط الساعة (ফিতনা ও কিয়ামতের আলামত)
- المناقب والفضائل (সাহাবা ও স্থানসমূহের মর্যাদা)
- প্রসিদ্ধ কিতাব:
- আল-জামেউস সহিহুল মুসনাদ… — ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারী (রহ.)।
- আল-জামেউল কাবীর (জামে আত-তিরমিযী) — ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.)।
- পরিচয়: হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘আল-জামে’ এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুবিশাল সংকলন, যাতে দ্বীনের যাবতীয় মৌলিক আটটি বিষয়ের হাদিস বাব বা অধ্যায়ভিত্তিক সাজানো থাকে। এই ৮টি বিষয় হলো:
- আস-সুনান (السنن):
- পরিচয়: যে হাদিস গ্রন্থে কেবল ফিকহি আহকাম সম্পর্কিত হাদিসসমূহ ফিকহের তারতীব অনুযায়ী সংকলিত হয় এবং যাতে আকিদা, সিরাত বা তাফসিরের মতো অন্যান্য বিষয় সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে না।
- প্রসিদ্ধ কিতাব:
- সুনানে আবু দাউদ — ইমাম আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আশআস আস-সিজিস্তানী (রহ.)।
- সুনানে নাসাঈ (আল-মুজতাবা) — ইমাম আহমদ ইবনে শুআইব আন-নাসাঈ (রহ.)।
- সুনানে ইবনে মাজাহ — ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ আল-কাযভীনী (রহ.)।
- সুনানে আদ-দারেমী — ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আদ-দারেমী (রহ.)।
- আল-মাআজিম (المعاجم):
- পরিচয়: ‘মু’জাম’ (معجم) শব্দটি ‘আজামাহ’ থেকে নির্গত। মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় যে কিতাবে হাদিসসমূহ ফিকহি অধ্যায় অনুযায়ী নয়; বরং লেখকের উস্তায বা শায়খদের নামের আরবি বর্ণমালার (أ، ب، ت…) ক্রম অনুযায়ী সংকলিত হয়, তাকে মু’জাম বলা হয়। কখনো কখনো সাহাবীদের নামের বর্ণানুক্রমিক গ্রন্থকেও মু’জাম বলা হয়।
- প্রসিদ্ধ কিতাব: ইমাম আবুল কাসিম সুলাইমান ইবনে আহমদ আত-তাবারানী (রহ.)-এর তিনটি বিখ্যাত মু’জাম:
- আল-মু’জামুল কাবীর (المعجم الكبير): সাহাবায়ে কেরামের নামের বর্ণানুক্রমিক সুবিশাল সংকলন।
- আল-মু’জামুল আওসাত (المعجم الأوسط): তাবারানীর প্রায় এক হাজার উস্তাযের নামের ক্রমানুসারে সংকলিত।
- আল-মু’জামুস সাগীর (المعجم الصغير): প্রতিটি উস্তাযের কাছ থেকে মাত্র ১/২টি করে বিরল হাদিস নিয়ে সংকলিত।
- আল-আতরাফ (الأطراف):
- পরিচয়: ‘তারফ’ (طرف) অর্থ প্রান্ত বা শেষাংশ। যে কিতাবে কোনো হাদিসের মূল মতন বিস্তারিত উল্লেখ না করে কেবল তার সূচনামূলক অংশ বা ইঙ্গিত উল্লেখ করা হয় এবং এরপর ওই হাদিসটির সমস্ত সনদ ও বিভিন্ন মূল কিতাবের রেফারেন্স একত্র করা হয়, তাকে কিতাবুল আতরাফ বলে। এটি সনদ সন্ধানের একটি মাস্টার-কী (Master Key)।
- প্রসিদ্ধ কিতাব:
- তুহফাতুল আশরাফ বিমারিফাতিল আতরাফ — আল্লামা জামালুদ্দীন আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ আল-মিযযী (রহ.) [কুতুবে সিত্তাহর আতরাফ]।
- ইতহাফুল মাহরাহ বিআতরাফিল আশারাহ — হাফেয ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.)।
- আতরাফুস সাহীহাইন — ইমাম খালফ আল-ওয়াসিতী (রহ.)।
٧- بين مراحل دراسة الأسانيد موضحا- ثم اذكر طريقة دراسة الأسانيد مفصلا-
[৭. দিরাসাতুল আসানীদ এর স্তরসমূহ বর্ণনা কর। অতঃপর দিরাসাতুল আসানীদ এর পদ্ধতি বর্ণনা কর।]
উত্তর:
ভূমিকা: হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ বা ‘দিরাসাতুল আসানীদ’ (دراسة الأسانيد) হলো উলূমুল হাদিসের সর্বোচ্চ প্রায়োগিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর। এর মাধ্যমেই কোনো হাদিস রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে নির্ভুলভাবে সাব্যস্ত কি না তা নিশ্চিত করা হয়। নিচে এর বিভিন্ন স্তর ও বাস্তব অনুসন্ধান পদ্ধতি বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
দিরাসাতুল আসানীদ-এর প্রধান স্তরসমূহ (مراحل دراسة الأسانيد):
একটি সনদকে সঠিকভাবে পরীক্ষা করতে হলে গবেষককে নিম্নলিখিত ৭টি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়:
- প্রথম স্তর: সনদ পৃথকীকরণ (عزل الإسناد عن المتن): হাদিসের বক্তব্য (মতন) থেকে বর্ণনাকারী পরম্পরাকে আলাদা করা এবং শুরু থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত প্রতিটি নাম চিহ্নিত করা।
- দ্বিতীয় স্তর: রাবীদের পূর্ণ নাম ও পরিচয় নিশ্চিতকরণ (تحديد أسماء الرواة بدقة): সনদে কোনো রাবীর ডাকনাম, বংশীয় নাম বা অস্পষ্ট নাম থাকলে তা পরিষ্কারভাবে শনাক্ত করা।
- তৃতীয় স্তর: প্রতিটি রাবীর জীবনী ও তথ্য অনুসন্ধান (ترجمة رواة الإسناد): ইলমুর রিজাল ও তারাজিমের নির্ভরযোগ্য কিতাব থেকে রাবীর জন্ম, মৃত্যু, বাসস্থান, শিক্ষক ও ছাত্রদের তালিকা প্রস্তুত করা।
- চতুর্থ স্তর: জারহ ও তা’দীল পর্যালোচনা (دراسة أقوال أئمة الجرح والتعديل): ইমাম বুখারী, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন প্রমুখ ইমামগণ ওই রাবী সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছেন তা একত্র করা।
- পঞ্চম স্তর: সনদের ধারাবাহিক সংযোগ পরীক্ষা (دراسة اتصال السند): প্রতিটি রাবী তাঁর পূর্ববর্তী উস্তাযের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন কি না, তাঁদের সমসাময়িকতা কেমন ছিল এবং বর্ণনায় ‘সামা’ (শ্রবণ) আছে কি না তা যাচাই করা।
- ষষ্ঠ স্তর: গোপন ত্রুটি ও বৈপরীত্য অনুসন্ধান (البحث عن العلة والشذوذ): সনদটি আপাতদৃষ্টিতে সহিহ হলেও অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সনদের বিপরীত কি না অথবা এতে কোনো গোপন দোষ (ইল্লাত) আছে কি না তা অনুসন্ধান করা।
- সপ্তম স্তর: মুতাবাআত ও শাওয়াহিদ সংকলন (الاعتبار وجمع المتابعات): সনদে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা দূর করার মতো সমর্থক অন্য কোনো সনদ (মুতাবাআহ) বা অন্য সাহাবীর হাদিস (শাহিদ) আছে কি না তা যাচাই করা।
দিরাসাতুল আসানীদ-এর বাস্তব পদ্ধতি (طريقة دراسة الأسانيد بالتفصيل):
গবেষক যখন বাস্তবে একটি সনদ নিয়ে কাজ করবেন, তখন নিম্নোক্ত সুনির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী অনুসরণ করবেন:
১. রাবীদের আদালত ও স্মৃতিশক্তি যাচাই:
- আদালত (العدالة): রাবী মুসলিম, বালেগ, বিবেকবান, তাকওয়াবান এবং সামাজিক শালীনতাসম্পন্ন কি না। তিনি মিথ্যা বা পাপাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত কি না তা যাচাই করা।
- দ্বব্ত বা স্মৃতিশক্তি (الضبط): রাবীর স্মৃতিশক্তি বা লিখিত পাণ্ডুলিপির নির্ভুলতা কেমন। এর জন্য ‘তাকরীবুত তাহযীব’, ‘তাহযীবুল কামাল’ এবং ‘মীযানুল ইতিদাল’ প্রভৃতি কিতাব দেখা হয়।
২. সনদের সংযোগ (الاتصال) নিশ্চিতকরণ:
- উস্তায ও ছাত্রের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জন্ম-মৃত্যু সাল পরীক্ষা করে প্রমাণ করা যে তাঁরা একই যুগে জীবিত ছিলেন (মুআসারাত)।
- মুদাল্লিস রাবীদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট শ্রবণের শব্দ (سمعت / حدثنا) বিদ্যমান থাকা আবশ্যক; কারণ মুদাল্লিসের ‘আন’ (عن) গ্রহণযোগ্য নয় যতক্ষণ না শ্রবণ প্রমাণিত হয়।
৩. শাওয়াহিদ ও মুতাবাআত অনুসন্ধান (الإعتبار):
সনদের কোনো স্তরে একক রাবী থাকলে তাখরীজের মাধ্যমে অনুসন্ধান করতে হবে যে অন্য কোনো সনদে অন্য কোনো রাবী তাঁর সমর্থনে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন কি না। যদি একই সাহাবী থেকে অন্য সনদে বর্ণিত হয় তবে তাকে ‘মুতাবাআহ’ (متابعة) বলে, আর অন্য সাহাবী থেকে বর্ণিত হলে তাকে ‘শাহিদ’ (شاهد) বলে। এর মাধ্যমে দুর্বল হাদিস হাসান লিগাইরিহীতে উন্নীত হয়।
৪. চূড়ান্ত হুকুম বা রায় নির্ধারণ (الحكم النهائي):
উপরোক্ত পর্যালোচনার ভিত্তিতে হাদিসটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়া:
- শর্ত পূরণ হলে: صحيح لذاته (সহিহ লিযাতিহী)
- দ্বব্তে সামান্য দুর্বলতা থাকলে: حسن لذاته (হাসান লিযাতিহী)
- মুতাবাআতের মাধ্যমে শক্তি পেলে: صحيح لغيره বা حسن لغيره
- শর্ত অপূর্ণ থাকলে: ضعيف (যয়িফ বা দুর্বল) বা موضوع (বানোয়াট)।
٨- علق على اربعة فقط:
[৮. নিচের যে কোনো চারটির ওপর সংক্ষেপ টীকা লেখ: (পরীক্ষায় ৪টি লিখতে বলা হলেও শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতির জন্য নিচে ৭টি বিষয়েরই সমৃদ্ধ উত্তর দেওয়া হলো)]
(أ) التخريج عن طريق الحاسب الآلي (কম্পিউটারের সাহায্যে হাদিস তাখরীজ):
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কম্পিউটারের সাহায্যে হাদিস তাখরীজ একটি যুগান্তকারী সংযোজন।
- ব্যবহৃত সফটওয়্যার ও ডাটাবেজ: ‘আল-মাকতাবাতুশ শামিলাহ’ (المكتبة الشاملة), ‘জাওয়ামি’উল কালিম’ (جوامع الكلم), ‘আল-বাহিসুল হাদিসী’ ইত্যাদি।
- সুবিধাসমূহ: মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার কিতাব থেকে হাদিসের শব্দ, রাবীর নাম বা বিষয় দিয়ে অনুসন্ধান করে সমস্ত সনদ ও কিতাবের পৃষ্ঠা নম্বর পাওয়া যায়। এতে গবেষকদের শত শত ঘণ্টার শ্রম বেঁচে যায়।
- সতর্কতা: কম্পিউটার সফটওয়্যার কেবল একটি সহায়ক মাধ্যম (وسيلة مساعدة); সফটওয়্যারে টাইপিং ভুল বা ভুল পাঠ থাকতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গবেষককে অবশ্যই মূল মুদ্রিত বা পাণ্ডুলিপি কিতাবের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে।
(ب) وجوه الطعن المتعلقة بالعدالة (রাবীর সততা সম্পর্কিত আপত্তিসমূহ):
হাদিস শাস্ত্রে কোনো রাবীর গ্রহণযোগ্যতা বিনষ্টকারী ত্রুটিকে ‘তা’ন’ (طعن) বলে। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ‘নুখবাতুল ফিকার’ গ্রন্থে রাবীর আদালত বা সততা বিনষ্টকারী ৫টি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন:
- الكذب في الحديث (হাদিসে মিথ্যা বলা): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নামে জেনেশুনে বানোয়াট কথা বলা। এর কারণে হাদিস ‘মাওদূ’ বা জাল হয়ে যায়।
- الاتهام بالكذب (মিথ্যার অপবাদ): সাধারণ জীবনে মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস থাকা। এর দ্বারা হাদিস ‘মাতরূক’ (পরিত্যাজ্য) হয়।
- الفسق (ফাসেকী বা পাপাচার): কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকা বা সগিরা গুনাহ বারবার করা।
- البدعة (বিদআত): আকাইদ বা আমলের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহর পরিপন্থী মনগড়া মতবাদ পোষণ করা ও তার দিকে আহ্বান জানানো।
- الجهالة (অজ্ঞাত পরিচয়): রাবীর বংশ, নাম বা নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে কোনো মুহাদ্দিসের অবগত না থাকা।
(ج) الإصابة في تمييز الصحابة (আল-ইসাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ):
হাফেয ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) রচিত সাহাবায়ে কেরামের জীবনী বিষয়ক এক অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বকোষ।
- রচনার বৈশিষ্ট্য: লেখক পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে এতে ১২,০০০-এর বেশি ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
- গ্রন্থটির অনন্য চার ভাগ (الأقسام الأربعة):
- প্রথম ভাগ: যাদের সাহাবী হওয়া নিশ্চিত দলীল ও সাক্ষ্যের দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
- দ্বিতীয় ভাগ: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় যে সকল শিশুর জন্ম হয়েছিল কিন্তু বয়সের কারণে সরাসরি হাদিস শোনার সুযোগ সীমিত ছিল।
- তৃতীয় ভাগ: ‘মুখাদরামীন’ (المخضرمون) — যাঁরা নববী যুগে জাহিলিয়াত ও ইসলাম উভয় যুগ পেয়েছেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেছেন, কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাননি।
- চতুর্থ ভাগ: যাঁদেরকে পূর্ববর্তী গ্রন্থকারগণ ভুলবশত সাহাবী বলে উল্লেখ করেছিলেন, কিন্তু লেখক যুক্তি ও দলীল দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা সাহাবী নন।
(د) كتب الثقات (সিকাত বা নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের গ্রন্থাবলি):
রিজাল শাস্ত্রের যেসব কিতাবে কেবল নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ (ছিকাহ) রাবীদের নাম ও গুণাবলি সংকলন করা হয়েছে, সেগুলোকে ‘কুতুবুস সিকাত’ বলে।
- প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি:
- কিতাবুছ ছিকাত — ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল-বুস্তী (মৃ. ৩৫৪ হি.)।
- কিতাবুছ ছিকাত — ইমাম আবুল হাসান আহমদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-ইজলী (মৃ. ২৬১ হি.)।
- তারীখু আসমাইস সিকাত — ইমাম ইবনে শাহীন (মৃ. ৩৮৫ হি.)।
- ব্যবহার: সনদের কোনো অপরিচিত রাবীর নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করতে এবং তাঁকে দুর্বল রাবীদের তালিকা থেকে মুক্ত দেখতে এ কিতাবসমূহ ব্যবহার করা হয়।
(ه) الفرق بين المستخرج والمستدرك من كتب الحديث (মুস্তাখরাজ ও মুস্তাদরাক গ্রন্থের মধ্যে পার্থক্য):
হাদিসের পরিভাষায় এই দুটি সংকলন পদ্ধতির মধ্যে সূক্ষ্ম ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:
- আল-মুস্তাখরাজ (المستخرج): কোনো মুহাদ্দিস পূর্ববর্তী কোনো প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থের (যেমন: সহিহ বুখারী বা সহিহ মুসলিম) হাদিসগুলোকে নির্বাচন করে মূল গ্রন্থকারের সূত্র ছাড়া নিজের ভিন্ন সনদে সেই একই হাদিসগুলো বর্ণনা করেন। এতে মূল হাদিসের মতন প্রায় এক থাকে কিন্তু নতুন সনদ যোগ হয়। যেমন: মুস্তাখরাজে আবু নুয়াইম আলা সহিহিল বুখারী।
- আল-মুস্তাদরাক (المستدرك): কোনো মুহাদ্দিস পূর্ববর্তী কোনো ইমামের অনুসৃত শর্তানুযায়ী উত্তীর্ণ কিন্তু তাঁর গ্রন্থে বাদ পড়ে যাওয়া হাদিসগুলোকে নতুন করে সংকলন করেন। যেমন: ইমাম হাকিম নিশাপুরী রচিত আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহীহাইন (এতে বুখারী ও মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ হাদিস সংকলন করা হয়েছে যা তাঁদের কিতাবে নেই)।
(و) الكتب المخصوصة في الضعفاء من رواة الحديث (দুর্বল রাবীদের জন্য নির্ধারিত গ্রন্থাবলি):
হাদিস বিশারদগণ উম্মতকে সতর্ক করার জন্য যেসব বর্ণনাকারী মিথ্যাবাদী, স্মৃতিভ্রষ্ট, ফাসেক বা দুর্বল, তাঁদের তালিকা করে স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেছেন।
- প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহ:
- কিতাবুদ দুআফাইস সাগীর — ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারী (রহ.)।
- কিতাবুদ দুআফা ওয়াল মাতরূকীন — ইমাম আহমদ ইবনে শুআইব আন-নাসাঈ (রহ.)।
- আল-কামিল ফী দুআফাইর রিজাল — ইমাম ইবনে আদী আল-জুরজানী (রহ.) (সবচেয়ে বিস্তৃত গ্রন্থ)।
- মীযানুল ইতিদাল ফী নাকদির রিজাল — ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.)।
- লিসানুল মীযান — হাফেয ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.)।
- উপকারিতা: কোনো সনদের রাবী দুর্বল কি না তা নিশ্চিত হওয়া এবং জাল হাদিস সনাক্ত করা।
(ز) الحكم على الحديث (হাদিসের হুকুম বা মান নির্ধারণ):
সনদ ও মতনের সূক্ষ্ম পর্যালোচনার পর হাদিসটির চূড়ান্ত প্রামাণিক মর্যাদা (حكم الحديث) ঘোষণা করাকে আল-হুকমু আলাল হাদিস বলে।
- মানদণ্ড: সহিহ হাদিসের ৫টি মৌলিক শর্ত (সনদের অবিচ্ছিন্নতা, রাবীর আদালত, পূর্ণ স্মৃতিশক্তি, শায না হওয়া এবং গোপন ত্রুটিমুক্ত হওয়া) বিদ্যমান থাকলে হাদিসটি সহিহ হবে। স্মৃতিশক্তিতে কিছুটা ঘাটতি থাকলে হাসান হবে এবং কোনো শর্ত ভঙ্গ হলে যয়িফ বলে গণ্য হবে।
- গুরুত্ব: সাধারণ মানুষ বা ফিকহবিদদের জন্য হাদিসটি আমলযোগ্য কি না তা নির্ধারণ করে দেয় এই হুকুম। আধুনিক যুগে মুহাদ্দিসগণের ঐক্যমত্যের আলোকেই কেবল কোনো হাদিসের ওপর চূড়ান্ত হুকুম আরোপ করা সমীচীন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (Frequently Asked Questions – FAQ)
প্রশ্ন ১: তাখরীজুল হাদিস (تخريج الحديث) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: হাদিসের মূল প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহে (যেমন: বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ) সনদসহ হাদিসটির সঠিক অবস্থান ও উৎস নির্দেশ করা এবং এর গ্রহণযোগ্যতার মান (সহিহ, হাসান বা যয়িফ) সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করাকে তাখরীজুল হাদিস বলা হয়।
প্রশ্ন ২: সুনান (السنن) ও মুসান্নাফ (المصنفات) গ্রন্থের মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: সুনান গ্রন্থে মূলত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মারফু হাদিসসমূহ ফিকহি অধ্যায়ভিত্তিক সাজানো থাকে (যেমন: সুনানে আবু দাউদ)। অপরদিকে মুসান্নাফাত গ্রন্থে ফিকহি অধ্যায়ের অধীনে মারফু হাদিসের সাথে প্রচুর পরিমাণে সাহাবায়ে কেরামের বাণী (মাওকুফ) এবং তাবেয়ীদের ফতোয়া (মাকতু) সংকলিত থাকে (যেমন: মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ)।
প্রশ্ন ৩: কিতাবুল আতরাফ (كتب الأطراف) দ্বারা কীভাবে হাদিস তাখরীজ করা হয়?
উত্তর: কিতাবুল আতরাফে হাদিসের পূর্ণ মতন না দিয়ে শুধু তার সূচনাংশ উল্লেখ করা হয় এবং এর অধীনে ওই হাদিসের যতগুলো সনদ বিভিন্ন কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে তার সব একত্র করা হয়। এর ফলে একটি হাদিসের সমস্ত সনদ ও মূল কিতাব খুব সহজেই খুঁজে বের করা যায়।
প্রশ্ন ৪: ‘আল-ইসাবাহ ফী তাময়ীযিস সাহাবাহ’ গ্রন্থের লেখক কে এবং এর বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: এর লেখক হলেন বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেয ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.)। গ্রন্থটিতে প্রায় ১২,০০০ ব্যক্তির জীবনী আলোচিত হয়েছে এবং সাহাবীদের চারটি স্বতন্ত্র ভাগে (প্রমাণিত সাহাবী, নাবালক সাহাবী, মুখাদরামীন এবং সাহাবী নন কিন্তু ভুলবশত সাহাবী বলা হয়েছিল) বিন্যস্ত করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: কম্পিউটারের সাহায্যে হাদিস তাখরীজের সুবিধা ও সতর্কতা কী?
উত্তর: কম্পিউটার ও মাকতাবাতুশ শামিলার মতো সফটওয়্যারের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার কিতাব থেকে হাদিস অনুসন্ধান করে বিপুল সময় বাঁচানো যায়। তবে সফটওয়্যারে টাইপিং ভুল বা ভুল পাঠ থাকতে পারে বিধায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অবশ্যই মূল মুদ্রিত গ্রন্থের সাথে মিলিয়ে যাচাই করা অপরিহার্য।