পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৮৮
ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১
বিভাগ: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
বিষয়: আধুনিক এশীয় আরব রাষ্ট্রসমূহের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক গবেষণা পদ্ধতি (ষষ্ঠ পত্র)
[History of Modern Asian Arab States and Historical Research Methodology (Paper VI)]
বিষয় কোড: ২০৫৪০৬
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
গ্রুপ-ক: এশিয়ার আরব রাষ্ট্রসমূহ
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো তিনটি বর্ণনামূলক প্রশ্নের উত্তর দাও: ১০ × ৩ = ৩০ এবং ৬ নং প্রশ্নের যেকোনো দুটি টীকার উত্তর দাও: ৫ × ২ = ১০। মোট মান: ৪০]
১. স্বাধীন সিরিয়ার রাজনৈতিক দলসমূহের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে যা জান লেখ।
[English: Write what you know about the rise and development of the political parties in independent Syria.]
ভূমিকা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষিতে ফরাসি ম্যান্ডেট (French Mandate) প্রতিষ্ঠিত হয় সিরিয়ায়। ১৯৪৬ সালে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের পর সিরিয়ায় বহুমুখী রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দলের বিকাশ ঘটে। স্বাধীন সিরিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাত, অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার লড়াই দেশটির আধুনিক ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
স্বাধীন সিরিয়ার প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
- জাতীয়তাবাদী দল ও পিপলস পার্টি (National Party & People’s Party):
স্বাধীনতা-পূর্ব জাতীয় জোট (National Bloc) বিভক্ত হয়ে প্রধান দুটি ঐতিহ্যবাহী দল গড়ে ওঠে। দামেস্কের উচ্চবিত্ত ও ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘ন্যাশনাল পার্টি’ (জাতীয় দল) এবং আলেপ্পোর শিল্পপতি ও ভূম্যধিকারীদের নিয়ে গঠিত হয় ‘পিপলস পার্টি’ (হিজব আল-শাআব)। ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে এই দুটি ঐতিহ্যবাহী বুর্জোয়া দল সংসদীয় সরকার পরিচালনা করে, কিন্তু তাদের অদক্ষতা ও ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে তারা জনসমর্থন হারায়।
- আরব সমাজতান্ত্রিক বাথ পার্টি (Arab Socialist Ba’ath Party):
১৯৪৭ সালে মিশেল আফলাক (খ্রিস্টান বুদ্ধিজীবী) এবং সালাহ আল-দীন আল-বিতার কর্তৃক বাথ পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৩ সালে আকরাম আল-হাওরানীর সমাজতান্ত্রিক দলের সাথে যুক্ত হয়ে এটি ‘আরব বাথ সোশ্যালিস্ট পার্টি’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
- মূল স্লোগান: “ওয়াহদাহ, হুররিয়াহ, ইশতিরাকিয়াহ” (ঐক্য, স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র)। এটি প্যান-অ্যারাবিজম বা সমগ্র আরব জাতির অভিন্ন ঐক্যে বিশ্বাসী ছিল।
- ক্ষমতায় আরোহণ: ১৯৬৩ সালের ৮ মার্চ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাথ পার্টি সিরিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে হাফিজ আল-আসাদের ‘সংশোধনবাদী বিপ্লব’ (Corrective Movement)-এর মাধ্যমে দলটি আলাভি সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং বর্তমান বাশার আল-আসাদের আমল পর্যন্ত সিরিয়া শাসন করে আসছে।
- সিরিয়ান সোশ্যাল ন্যাশনালিস্ট পার্টি (SSNP):
১৯৩২ সালে আন্তুন সায়াদেহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এ দলটি প্যান-অ্যারাবিজমের বিরোধিতা করে ঐতিহাসিক ‘বৃহত্তর সিরিয়া’ (সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন, ইরাক ও কুয়েত)-র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিল। তারা একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী ভূখণ্ড গঠনের পক্ষপাতী ছিল।
- সিরিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি (Syrian Communist Party):
খালিদ বাকদাশের নেতৃত্বে ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি ছিল আরব বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও সুসংগঠিত কমিউনিস্ট দল। কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে তাদের ব্যাপক প্রভাব ছিল এবং তারা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সিরিয়ার কৌশলগত সামরিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে।
- মুসলিম ব্রাদারহুড (আল-ইখওয়ানুল মুসলিমুন):
মুস্তফা আল-সিবায়ীর নেতৃত্বে ১৯৪৫-৪৬ সালে মিশরের ইখওয়ানের ধারায় সিরিয়ায় এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তারা সিরিয়াকে একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তর এবং বাথ পার্টির সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতির তীব্র বিরোধিতা করে। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে তাদের সাথে হাফিজ আল-আসাদ সরকারের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৮২ সালের কুখ্যাত ‘হামা গণহত্যা’।
উপসংহার
সিরিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাস ছিল বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে একদলীয় বাথ পার্টির কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং সামরিক একনায়কতন্ত্রে রূপান্তরের এক সংঘাতময় পথপরিক্রমা।
২. কোন অবস্থায় ১৯৪৩ সালে লেবাননের জাতীয় চুক্তি গৃহীত হয়? এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।
[English: What led to the acceptance of the Lebanese National Pact in 1943? Mention its main features.]
ভূমিকা
মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত জটিল বহু-ধর্মীয় ও বহু-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র লেবাননে গৃহযুদ্ধ ও বিভেদ এড়িয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে ১৯৪৩ সালে একটি অলিখিত ঐতিহাসিক সাংবিধানিক সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়, যা ‘লেবাননের জাতীয় চুক্তি’ (National Pact / আল-মীসাক্ব আল-ওয়াতানী) নামে পরিচিত।
১৯৪৩ সালের জাতীয় চুক্তির পটভূমি ও পরিস্থিতি
- ফরাসিদের সাম্প্রদায়িক বিভাজন নীতি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স বৃহত্তর লেবানন সৃষ্টি করে খ্রিস্টান ম্যারোনাইটদের প্রাধান্য দিয়ে একটি সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করে। তবে দেশটির জনসংখ্যায় মুসলমান (সুন্নি ও শিয়া), দ্রুজ এবং অন্যান্য খ্রিস্টানদের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য।
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা: ১৯৪১ সালে মিত্রবাহিনী লেবানন দখল করে এবং স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯৪৩ সালের নির্বাচনে ম্যারোনাইট নেতা বিশারা আল-খুরী রাষ্ট্রপতি এবং সুন্নি মুসলিম নেতা রিয়াদ আল-সুলহ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
- দ্বন্দ্বের নিরসন ও অভিন্ন জাতীয় পরিচয়: তৎকালীন পরিস্থিতিতে খ্রিস্টানরা ফ্রান্স বা পশ্চিমা সুরক্ষার ওপর নির্ভর করত এবং মুসলিমরা সিরিয়া বা বৃহত্তর আরব ঐক্যের সাথে একীভূত হওয়ার স্বপ্ন দেখত। উভয় নেতা উপলব্ধি করেন যে একটি স্থিতিশীল স্বাধীন লেবানন গড়তে হলে উভয় পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে: খ্রিস্টানরা পশ্চিমা সুরক্ষা ত্যাগ করবে এবং মুসলিমরা সিরিয়ার সাথে একত্রীকরণ পরিহার করে লেবাননের স্বতন্ত্র স্বাধীনতা মেনে নেবে। এর ফলশ্রুতিতেই আল-খুরী ও রিয়াদ আল-সুলহর মধ্যে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়।
জাতীয় চুক্তির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
- ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পদ বণ্টন:
- রাষ্ট্রপতি (President): সর্বদা ম্যারোনাইট খ্রিস্টান (Maronite Christian) সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত হবেন।
- প্রধানমন্ত্রী (Prime Minister): সর্বদা সুন্নি মুসলিম (Sunni Muslim) সম্প্রদায় থেকে নিযুক্ত হবেন।
- জাতীয় সংসদের স্পিকার (Speaker of Parliament): সর্বদা শিয়া মুসলিম (Shia Muslim) সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত হবেন।
- ডেপুটি স্পিকার ও উপ-প্রধানমন্ত্রী: গ্রিক অর্থোডক্স খ্রিস্টান সম্প্রদায় থেকে এবং সেনাপ্রধান হবেন দ্রুজ বা ম্যারোনাইট।
- সংসদে ৬:৫ অনুপাত রক্ষা: ১৯৩২ সালের সর্বশেষ আদমশুমারির ভিত্তিতে (যেখানে খ্রিস্টানরা সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ দেখানো হয়েছিল) সংসদে প্রতি ৬ জন খ্রিস্টান এমপির বিপরীতে ৫ জন মুসলিম এমপি থাকার অনুপাত নির্দিষ্ট করা হয়।
- নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি: লেবানন পশ্চিমা প্রভাবের ক্রীড়নক হবে না এবং কোনো আরব রাষ্ট্রের অধীনস্থও হবে না। এটি একটি স্বাধীন আরব দেশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সাথে নিরপেক্ষ সম্পর্ক বজায় রাখবে।
উপসংহার
যদিও এই চুক্তি লেবাননকে প্রাথমিক স্বাধীনতা ও তিন দশক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দিয়েছিল, তবে জনসংখ্যার পরিবর্তন এবং ক্ষমতার অনমনীয়তার কারণে এটি পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ভয়াবহ লেবাননী গৃহযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে, যা ১৯৮৯ সালের ‘তায়েফ চুক্তি’র মাধ্যমে সংশোধিত হয়।
৩. ব্যালফোর ঘোষণা কী? এর বিষয়বস্তু উল্লেখপূর্বক ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী ইতিহাসে এর ফলাফল বিশ্লেষণ কর।
[English: What is the ‘Balfour Declaration’? Analysis its effects on the subsequent history of Palestine and the Middle East with reference to the content of it.]
ভূমিকা
আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিষাদময় ও রক্তাক্ত সংকট—ফিলিস্তিন সমস্যার মূল বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ সরকারের একটি চিঠির মাধ্যমে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস ব্যালফোর কর্তৃক ব্রিটিশ ইহুদি নেতা লর্ড ওয়াল্টার রথসচাইল্ডের কাছে প্রেরিত এই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রটি ইতিহাসে ‘ব্যালফোর ঘোষণা’ (Balfour Declaration) নামে কুখ্যাত।
ব্যালফোর ঘোষণার মূল বিষয়বস্তু
ঘোষণাপত্রটির মূল পাঠ্য ছিল নিম্নরূপ:
“মহামান্য ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি (National Home for the Jewish People) প্রতিষ্ঠাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে এবং এই লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করবে; তবে স্পষ্টভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর (স্থানীয় আরব মুসলিম ও খ্রিস্টান) নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোনো কাজ করা হবে না।”
মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী ইতিহাসে এর ভয়াবহ ফলাফল ও প্রভাব
- একটি জাতির সাথে শতাব্দীর চরম বিশ্বাসঘাতকতা: যখন এই ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিল আদিবাসী আরব এবং ইহুদিরা ছিল মাত্র ৮-৯ শতাংশ। এক বিদেশি পরাশক্তি অন্য একটি জাতির মাতৃভূমিকে তৃতীয় পক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার এই নজিরবিহীন অন্যায়কে ঐতিহাসিক আর্থার কোয়েস্টলার সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে: “একটি দেশ অন্য দেশকে প্রতিশ্রুতি দিল একটি তৃতীয় দেশের ভূমি হস্তান্তরের।”
- ইহুদিদের গণ-অভিবাসন ও জনমিতি পরিবর্তন: ব্যালফোর ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে ১৯২২ সালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (League of Nations) ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অনুমোদন করে। এরপর ব্রিটিশ ছত্রছায়ায় সমগ্র ইউরোপ থেকে লাখ লাখ জায়নবাদী ইহুদি ফিলিস্তিনে অভিবাসন করতে থাকে। ফলে কয়েক দশকে ইহুদি জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে এক-তৃতীয়াংশে দাঁড়ায়।
- ১৯৩৬-৩৯ সালের ফিলিস্তিনি মহাবিদ্রোহ: জমি দখল ও ব্রিটিশদের একতরফা ইহুদি তোষণের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতি আমিন আল-হুসাইনির নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি আরবরা সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে, যা ব্রিটিশ সেনাবাহিনী নিষ্ঠুরভাবে দমন করে।
- ১৯৪৮ সালের নাকবা ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশরা দায়িত্ব এড়িয়ে জাতিসংঘে বিষয়টি তোলে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভাগের অন্যায় প্রস্তাব (রেজোলিউশন ১৮১) দেয়। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইহুদিরা তথাকথিত ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র’ ঘোষণা করে। এর ফলে শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং জন্ম নেয় ‘নাকবা’ (মহাবিপর্যয়), যার ফলে সাড়ে সাত লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি আরব চিরতরে নিজ বাস্তুভিটা থেকে বিতাড়িত হয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়।
- চিরস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও যুদ্ধসমূহ: ব্যালফোর ঘোষণার প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতেই সংঘটিত হয় ১৯৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ (যার মাধ্যমে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে), ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপপুর যুদ্ধ এবং বর্তমান ফিলিস্তিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
উপসংহার
ব্যালফোর ঘোষণা ছিল মানব ইতিহাসের একটি চরম সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় দলিল, যা বিগত এক শতাব্দী ধরে ফিলিস্তিনি জনগণকে নিজ ভূখণ্ডে পরাধীন, বাস্তুহারা এবং মধ্যপ্রাচ্যকে চির অশান্তির রণক্ষেত্রে পরিণত করে রেখেছে।
৪. ১৯৩০ সালের ইঙ্গ-ইরাক চুক্তির প্রধান ধারাগুলো বর্ণনা কর। এ চুক্তির মাধ্যমে ইরাক কী পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেছিল?
[English: Describe the main provisions of the Anglo-Iraqi Treaty of 1930. Did Iraq attain full independence by this treaty?]
ভূমিকা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইরাকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসনের বিরুদ্ধে ১৯২০ সালে দেশব্যাপী তীব্র গণবিদ্রোহ (আসা-সাওরাতুল ইরাকিয়া) দেখা দেয়। ব্রিটিশরা বিদ্রোহ দমন করলেও বুঝতে পারে যে প্রত্যক্ষ উপনিবেশ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ফলে তারা হাশেমী নেতা প্রথম ফয়সালকে ইরাকের সিংহাসনে বসায় এবং কয়েক দফা চুক্তির পর অবশেষে ১৯৩০ সালের ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী নূরী আল-সাঈদ এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনারের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘ইঙ্গ-ইরাক চুক্তি ১৯৩০’ স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৩০ সালের চুক্তির প্রধান প্রধান ধারাসমূহ
- ম্যান্ডেটের অবসান ও নামমাত্র স্বাধীনতা: চুক্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, লিগ অব নেশনস-এ ইরাক সদস্যপদ লাভ করার সাথে সাথেই আনুষ্ঠানিক ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অবসান ঘটবে এবং ইরাক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত হবে। (১৯৩২ সালে ইরাক লিগ অব নেশনসের সদস্য হয়)।
- ২৫ বছরের কৌশলগত প্রতিরক্ষা মৈত্রী: উভয় দেশ ২৫ বছর মেয়াদী একটি বাধ্যতামূলক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। কোনো এক পক্ষ যুদ্ধে জড়ালে অপর পক্ষ তাকে ঘাঁটি, পরিবহন ও সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য থাকবে।
- ব্রিটিশ বিমানঘাঁটি বহাল রাখা: সবচেয়ে বিতর্কিত শর্ত ছিল যে, ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনী (RAF) বসরা অঞ্চলের ‘শাইবা’ (Shaibah) এবং বাগদাদের নিকটবর্তী ‘হাব্বানিয়া’ (Habbaniyah) বিমানঘাঁটির ওপর পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও সৈন্য মোতায়েনের অধিকার বজায় রাখবে।
- যোগাযোগ ও ট্রানজিট সুবিধা: যুদ্ধের সময় যেকোনো প্রয়োজনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ইরাকের নদী, বন্দর, রেলপথ ও আকাশসীমা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অবাধে ব্যবহার করতে পারবে।
- সামরিক উপদেষ্টা ও অস্ত্রের একচেটিয়া অধিকার: ইরাকি সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহের একচ্ছত্র অধিকার কেবল ব্রিটেনের হাতে সংরক্ষিত থাকবে এবং সকল সামরিক উপদেষ্টা হবেন ব্রিটিশ কর্মকর্তা।
- তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ: ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি (IPC)-এর মাধ্যমে ইরাকের বিপুল তেল সম্পদের ওপর ব্রিটিশদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখা হয়।
ইরাক কি এ চুক্তির মাধ্যমে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেছিল? মূল্যায়ন
ঐতিহাসিকদের সর্বসম্মত মতে, ১৯৩০ সালের চুক্তির মাধ্যমে ইরাক কখনোই প্রকৃত ও পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেনি, বরং এটি ছিল একটি সীমিত ও শর্তযুক্ত ছদ্মবেশী স্বাধীনতা (Conditional Sovereignty):
- সার্বভৌমত্বের সংকট: দেশের মাটিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি বহাল থাকা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের চরম পরিপন্থী।
- পররাষ্ট্রনীতির পরাধীনতা: ইরাক তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারত না; ব্রিটিশদের অনুমতি ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক জোট গঠন অসম্ভব ছিল।
- ১৯৪১ সালের অভ্যুত্থান ও ব্রিটিশ পুনর্দখল: এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ১৯৪১ সালে, যখন জাতীয়তাবাদী নেতা রশিদ আলী আল-কিলানী ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে চাইলে ব্রিটিশ বাহিনী হাব্বানিয়া ঘাঁটি থেকে আক্রমণ চালিয়ে ইরাককে পুনরায় সম্পূর্ণ সামরিক দখলে নেয়।
উপসংহার
১৯৩০ সালের চুক্তি ইরাককে স্বাধীনতার একটি আন্তর্জাতিক আনুষ্ঠানিক সনদ দিলেও মূল ক্ষমতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাতেই কুক্ষিগত রেখেছিল, যার অবসান ঘটেছিল ১৯৫৮ সালের ১৪ জুলাইয়ের রক্তাক্ত সামরিক বিপ্লবের মাধ্যমে।
৫. জর্দানের বাদশাহ হুসাইনের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি পর্যালোচনা কর।
[English: Review the internal and external polices of king Hossain of Jordan.]
ভূমিকা
আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও দক্ষ কূটনীতিবিদ শাসকদের অন্যতম ছিলেন হাশেমী রাজবংশের বাদশাহ হুসাইন বিন তালাল (শাসনকাল: ১৯৫২-১৯৯৯ খ্রি.)। প্রাকৃতিক সম্পদহীন এবং চারিদিকে শক্তিশালী ও প্রতিকূল প্রতিবেশীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছোট্ট একটি দেশ জর্ডানকে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান, গৃহযুদ্ধ ও আরব-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যেও টিকিয়ে রাখা ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বাদশাহ হুসাইনের অভ্যন্তরীণ নীতি
- সেনাবাহিনীকে জর্ডানীয়করণ (১৯৫৬): তিনি ক্ষমতায় এসে সাহসিকতার সাথে ব্রিটিশ জেনারেল জন বাগট গ্লাবকে (Glubb Pasha) আরব লিজিয়নের প্রধান পদ থেকে বরখাস্ত করেন এবং জর্ডানের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব সম্পূর্ণ স্থানীয় আরব অফিসারদের হাতে তুলে দেন। এটি তাঁর অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী করে।
- বেদুইন উপজাতিদের আনুগত্য লাভ: জর্ডানের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থায় তিনি বিশ্বস্ত বেদুইন উপজাতিদের নিয়োগ করেন। এই বেদুইন আনুগত্যই একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান থেকে তাঁর রাজতন্ত্রকে রক্ষা করেছিল।
- ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ (গৃহযুদ্ধ – ১৯৭০): ১৯৬৭ সালের পর জর্ডানের মাটিতে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে পিএলও (PLO) গেরিলা বাহিনী এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তারা একটি ‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র’ গড়ে তোলে এবং রাজতন্ত্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে বাদশাহ হুসাইন জর্ডানীয় সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে কঠোর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ফেদায়ীনদের পরাজিত করেন এবং পিএলওকে জর্ডান থেকে বহিষ্কার করে লেবাননে পাঠিয়ে দেন।
- ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক সংস্কার: ১৯৮৯ সালে অর্থনৈতিক সংকটের পর তিনি দেশে সংসদীয় সাধারণ নির্বাচন দেন এবং ১৯৯০-এর দশকে রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সীমিত রাজনৈতিক সংস্কার করেন।
বাদশাহ হুসাইনের বৈদেশিক নীতি
- পাশ্চাত্যের সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক: চারপাশের বৈরী সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলোর (নাসেরের মিশর, বাথিস্ট সিরিয়া ও ইরাক) চাপ থেকে বাঁচতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। জর্ডান বিপুল মার্কিন সাহায্য লাভ করে।
- ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ ও পশ্চিম তীর হারানো: আরব ঐক্যের চাপে তিনি নাসেরের সাথে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেন এবং ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে অংশ নেন। এর ফলে ইসরায়েল জর্ডানের অধীনস্থ ঐতিহাসিক পশ্চিম তীর (West Bank) ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সামরিক বিপর্যয়। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে তিনি পশ্চিম তীরের সমস্ত প্রশাসনিক দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে পিএলওর অনুকূলে ছেড়ে দেন।
- ১৯৯৪ সালের ওয়াদি আরাবা শান্তি চুক্তি: মিশরের পর দ্বিতীয় আরব দেশ হিসেবে জর্ডান ১৯৯৪ সালে ইসরায়েলের সাথে ঐতিহাসিক ‘ওয়াদি আরাবা শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত চিহ্নিত হয় এবং জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা ও মুসলিম তীর্থস্থানগুলোর একক তত্ত্বাবধায়ক (Custodian) হিসেবে জর্ডানের বাদশাহর অধিকার ইসরায়েল কর্তৃক স্বীকৃত হয়।
- উপসাগরীয় যুদ্ধের নিরপেক্ষতা (১৯৯০-৯১): সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক কুয়েত দখলের পর তিনি ইরাকের ওপর সরাসরি মার্কিন আক্রমণের বিরোধিতা করে আরব সমাধানের প্রস্তাব দেন, যার ফলে সাময়িকভাবে তিনি আমেরিকা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরাগভাজন হন।
উপসংহার
বাদশাহ হুসাইন ছিলেন একজন খাঁটি বাস্তববাদী (Pragmatic) শাসক। চরম প্রতিকূল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নিজের রাজতন্ত্র ও জর্ডানের স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই ছিল তাঁর সমগ্র নীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
৬. যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও (সংক্ষিপ্ত টীকা):
[দ্রষ্টব্য: মান ৫ × ২ = ১০]
(ক) প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (The World War-I)
উত্তর: ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত মিত্রশক্তি (ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র) এবং অক্ষশক্তি (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্য)-এর মধ্যে সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। এ যুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষে যোগ দিলে ব্রিটিশরা মক্কার শরিফ হুসাইনের সাথে ম্যাকমাহন চিঠিপত্রের মাধ্যমে তুর্কিদের বিরুদ্ধে ‘আরব বিদ্রোহ’ (১৯১৬) ঘটায়। যুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে এবং সাইকস-পিকট চুক্তির অধীনে মধ্যপ্রাচ্য ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক ম্যান্ডেটে বিভক্ত হয়।
(খ) ইউএআর (The United Arab Republic)
উত্তর: ১৯৫৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসের এবং সিরিয়ার নেতাদের উদ্যোগে মিশর ও সিরিয়াকে একীভূত করে গঠিত একটি সংক্ষিপ্তকালীন সমন্বিত আরব রাষ্ট্র হলো ‘ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক’ (UAR)। এর উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র আরব বিশ্বকে একটি অভিন্ন পতাকাতলে একত্রিত করা। তবে কায়রোর অতিরিক্ত খবরদারি, সিরিয়ার অর্থনীতিতে অসন্তোষ এবং সিরিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষোভের কারণে ১৯৬১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দামেস্কে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিরিয়া এ ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায় এবং ইউএআরের সমাপ্তি ঘটে।
(গ) পিএলও (The Palestine Liberation Organization)
উত্তর: ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক রূপ দিতে ১৯৬৪ সালে আরব লীগের কায়রো শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’ (পিএলও)। ১৯৬৯ সালে ইয়াসির আরাফাত এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এটি আল-ফাতাহ সহ বিভিন্ন গেরিলা গোষ্ঠীর সমন্বয়ে পরিচালিত হতো। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ পিএলওকে ফিলিস্তিনি জনগণের ‘একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৩ সালে এটি ঐতিহাসিক অসলো চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ (PA) গঠনে নেতৃত্ব দেয়।
(ঘ) ইউএই (The United Arab Emirates)
উত্তর: ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর পারস্য উপসাগরীয় সাতটি ক্ষুদ্র আমিরাত—আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, উম্মুল কুয়াইন ও ফুজাইরাহ (এবং ১৯৭২ সালে রাস আল-খাইমাহ যুক্ত হয়) একত্রিত হয়ে একটি আধুনিক ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত’ (UAE) গঠন করে। ব্রিটিশরা উপসাগর ত্যাগ করার পর আবুধাবির দূরদর্শী শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান এর প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। বিপুল তেল সম্পদ, উন্মুক্ত বাণিজ্য ও পর্যটন নীতির কারণে আজ এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গ্রুপ-খ: গবেষণা পদ্ধতি
[দ্রষ্টব্য: যেকোনো তিনটি বর্ণনামূলক প্রশ্নের উত্তর দাও: ১০ × ৩ = ৩০ এবং ১২ নং প্রশ্নের যেকোনো দুটি টীকার উত্তর দাও: ৫ × ২ = ১০। মোট মান: ৪০]
৭. গবেষণা পদ্ধতির সংজ্ঞা দাও। এর গুরুত্ব মূল্যায়ন কর।
[English: Define Research Methodology. Evaluate its importance.]
ভূমিকা
জ্ঞান সৃষ্টি, সত্যের অনুসন্ধান এবং বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যাগুলোর বিজ্ঞানসম্মত ও প্রামাণ্য সমাধানের নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই হলো গবেষণা। আর সেই গবেষণাকে সুশৃঙ্খল, নির্ভরযোগ্য ও অভ্রান্ত রূপ দেওয়ার পথনির্দেশিকা হলো ‘গবেষণা পদ্ধতি’ (Research Methodology)।
গবেষণা পদ্ধতির সংজ্ঞা
আভিধানিক অর্থ: ইংরেজি ‘Research’ শব্দটি ফরাসি ‘Rechercher’ থেকে এসেছে, যার অর্থ নতুন করে নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করা। আর ‘Methodology’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘Methodos’ (নির্দিষ্ট পথ বা পন্থা) এবং ‘Logos’ (জ্ঞান বা শাস্ত্র) থেকে।
পারিভাষিক সংজ্ঞা:
- গবেষণা পদ্ধতি হলো একটি পদ্ধতিগত ও দার্শনিক কাঠামো, যার মাধ্যমে একজন গবেষক তাঁর গবেষণার সমস্যা চিহ্নিতকরণ, নকশা প্রণয়ন, তথ্য সংগ্রহের হাতিয়ার নির্বাচন, তথ্য বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নির্ধারণ করেন।
- সমাজবিজ্ঞানী সি. আর. কোঠারির মতে, “গবেষণা পদ্ধতি কেবল গবেষণার কৌশল নয়, বরং কৌশলের পেছনে অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতা ও কার্যপদ্ধতির নিয়মতান্ত্রিক বিজ্ঞান।”
গবেষণা পদ্ধতির অপরিহার্য গুরুত্ব ও তাৎপর্য
- পদ্ধতিগত ত্রুটি ও অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণ: সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করলে গবেষণা ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সঠিক মেথডোলজি গবেষককে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
- গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা (Validity & Reliability): একটি গবেষণার ফলাফল বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক মহলে তখনই স্বীকৃতি পায়, যখন তার তথ্য সংগ্রহের উৎস ও বিশ্লেষণের পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে প্রশ্নাতীত হয়।
- সময় ও সম্পদের সাশ্রয়: সঠিক রূপরেখা জানা থাকলে গবেষকের শ্রম ও অর্থের অপচয় রোধ হয় এবং সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
- তথ্য বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড: সংগৃহীত বিপুল কাঁচা তথ্যকে (Raw Data) কীভাবে প্রক্রিয়াজাত, কোডিং এবং পরিসংখ্যানিক বা বর্ণনামূলক বিশ্লেষণ করতে হবে তা গবেষণা পদ্ধতি শিক্ষা দেয়।
- নীতি নির্ধারণ ও মানবকল্যাণ: রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সামাজিক সমস্যা নিরসনে সঠিক গবেষণালব্ধ তথ্যই নির্ভুল জাতীয় নীতি প্রণয়নের পথ উন্মুক্ত করে।
উপসংহার
গবেষণা পদ্ধতি হলো জ্ঞানচর্চার কম্পাস। কম্পাসহীন জাহাজ যেমন সমুদ্রে দিক হারায়, তেমনি সঠিক পদ্ধতি ছাড়া যেকোনো গবেষণাই উদ্দেশ্যহীন তথ্যের জঞ্জালে পরিণত হয়।
৮. গবেষণার বিভিন্ন পদ্ধতি উল্লেখ কর। তুমি কি মনে কর মিশ্র গবেষণা পদ্ধতি গুণগত ও পরিমাণগত গবেষণার চেয়ে বেশি যুক্তিসম্মত?
[English: Mention the different methods of research. Do you think mixed method research is more reasonable than qualitative and quantitative research?]
ভূমিকা
সামাজিক বিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক গবেষণায় সঠিক পদ্ধতি নির্বাচনই হলো গবেষণার সাফল্যের পূর্বশর্ত। বিষয়ের প্রকৃতি, উদ্দেশ্যের ভিন্নতা এবং তথ্যের ধরনের ওপর ভিত্তি করে গবেষণার নানা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।
গবেষণার প্রধান প্রধান পদ্ধতিসমূহ
- ঐতিহাসিক পদ্ধতি (Historical Method): অতীত ঘটনাবলির প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উৎস (দলিলপত্র, শিলালিপি, স্মৃতিচারণ) বিশ্লেষণ করে অতীতের পুনর্নির্মাণ করা।
- বর্ণনামূলক ও জরিপ পদ্ধতি (Descriptive & Survey Method): বর্তমান সমাজের কোনো ঘটনা বা অবস্থার বর্তমান চিত্র জরিপ বা প্রশ্নমালার মাধ্যমে তুলে ধরা।
- পরীক্ষামূলক পদ্ধতি (Experimental Method): নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক নির্ণয় করা।
- কেস স্টাডি পদ্ধতি (Case Study): কোনো একটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা একক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ গভীর বিশ্লেষণ।
- নৃতাত্ত্বিক পদ্ধতি (Ethnographic Method): গবেষক নিজে কোনো সমাজে অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সংস্কৃতি অধ্যয়ন করা।
পরিমাণগত ও গুণগত গবেষণা পদ্ধতির তুলনামূলক চিত্র
| বৈশিষ্ট্য | পরিমাণগত গবেষণা (Quantitative) | গুণগত গবেষণা (Qualitative) |
|---|---|---|
| তথ্যের ধরন | সংখ্যাভিত্তিক ও পরিসংখ্যানিক (Numbers & Statistics)। | বর্ণনামূলক, ভাষা ও অনুভূতিভিত্তিক (Words & Meanings)। |
| লক্ষ্য | হাইপোথিসিস পরীক্ষা ও সাধারণীকরণ করা। | কোনো বিষয়ের অন্তর্নিহিত অর্থ ও গভীর অভিজ্ঞতা অনুধাবন। |
| হাতিয়ার | কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নমালা, সেন্সাস, পরীক্ষা। | উন্মুক্ত সাক্ষাৎকার, ফোকাস গ্রুপ (FGD), পর্যবেক্ষণ। |
মিশ্র গবেষণা পদ্ধতি (Mixed Method) কি বেশি যুক্তিসম্মত? মূল্যায়ন
হ্যাঁ, সমকালীন আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও মানববিদ্যায় মিশ্র গবেষণা পদ্ধতি (Mixed Method Research) সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও যুক্তিযুক্ত। এর সপক্ষে যুক্তিসমূহ:
- পরস্পরের পরিপূরক (Complementarity): পরিমাণগত গবেষণা উত্তর দেয় “কতজন বা কী ঘটেছে” (What/How much), কিন্তু এটি “কেন বা কীভাবে ঘটল” (Why/How) তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। মিশ্র পদ্ধতিতে সংখ্যাভিত্তিক তথ্যের পাশাপাশি মানুষের আবেগ ও কারণ উন্মোচিত হয়।
- ট্রায়াঙ্গুলেশন (Triangulation): যখন একটি একক ফলাফলকে জরিপের পরিসংখ্যান এবং গভীর সাক্ষাৎকারের গুণগত তথ্য—উভয় দিয়ে যাচাই করা হয়, তখন গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
- জটিল সামাজিক বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র: মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজ কেবল সংখ্যা বা কেবল অনুভূতির ওপর চলে না; উভয়ের সমন্বয়ই পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন করতে পারে।
উপসংহার
অতএব, পরিমাণগত ও গুণগত পদ্ধতির একতরফা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য ফলাফলে পৌঁছাতে মিশ্র গবেষণা পদ্ধতিই সর্বাধিক কার্যকর ও যুক্তিগ্রাহ্য।
৯. গবেষক কে? একজন সফল গবেষকের গুণাবলি উল্লেখ কর।
[English: Who is researcher? Identify the qualifies of a successful researcher.]
ভূমিকা
যে ব্যক্তি প্রথাগত চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে গভীর কৌতূহল ও নিষ্ঠার সাথে সত্য উদঘাটন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং সমাজ ও সভ্যতার জটিল রহস্য উন্মোচনে নিয়মতান্ত্রিক অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করেন, তিনিই হলেন গবেষক।
গবেষকের পরিচয়
গবেষক হলেন একজন বিদগ্ধ সত্যান্বেষী ব্যক্তি, যিনি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নীতিমালা ও নিয়মকানুন মেনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উৎসের ওপর নির্ভর করে কোনো অজানা বিষয়ের ওপর নতুন আলো ফেলেন অথবা প্রচলিত ধারণার বিজ্ঞানসম্মত সংস্কার সাধন করেন।
একজন সফল গবেষকের অপরিহার্য গুণাবলি
- জ্ঞানপিপাসা ও অনুসন্ধিৎসু মন (Inquisitiveness): প্রতিটি বিষয়ের কার্যকারণ জানার গভীর আগ্রহ থাকতে হবে। কেন, কীভাবে, কী কারণে—এই প্রশ্নগুলো সর্বদা গবেষকের মনে জাগ্রত থাকতে হবে।
- বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা (Objectivity): সফল গবেষককে অবশ্যই ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও পূর্বসংস্কার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে। প্রাপ্ত তথ্যে যা সত্য প্রমাণিত হবে, তা-ই বিনাদ্বিধায় মেনে নিতে হবে।
- অধ্যবসায় ও অসীম ধৈর্য (Patience & Perseverance): গবেষণা কোনো চটজলদি কাজ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে লাইব্রেরিতে পড়াশোনা, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং বারবার ব্যর্থতার মুখেও ধৈর্য ধারণ করার মানসিকতা থাকা আবশ্যক।
- সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি (Critical Thinking): অন্যের মুখের কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে প্রতিটি তথ্যের সত্যতা, প্রামাণিকতা ও যৌক্তিক ভিত্তি যাচাই করার সক্ষমতা থাকতে হবে।
- নৈতিক সততা (Ethical Integrity): চৌর্যবৃত্তি বা প্লেজারিজম পরিহার করা, অন্যের তথ্যের যথাযথ কৃতজ্ঞতা স্বীকার (Citation) করা এবং তথ্য বিকৃত না করা একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় চারিত্রিক ভূষণ।
- পদ্ধতিগত জ্ঞান ও ভাষাগত দক্ষতা: আধুনিক গবেষণা সফটওয়্যার (SPSS, Zotero ইত্যাদি) এবং গবেষণাপত্র রচনার প্রাঞ্জল ও সুসংহত ভাষা এবং আন্তর্জাতিক রেফারেন্সিং স্টাইল (APA, Chicago) জানা থাকতে হবে।
উপসংহার
আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন, “আমি কোনো বিশেষ প্রতিভাবান নই, আমি শুধু প্রচণ্ড কৌতূহলী।” এই কৌতূহল ও চারিত্রিক সততার সমন্বয়েই একজন সাধারণ শিক্ষার্থী একজন মহান সফল গবেষকে পরিণত হন।
১০. থিসিস কী? বিভিন্ন প্রকার থিসিস সম্পর্কে আলোকপাত কর।
[English: What is thesis? Describe the different types of thesis.]
ভূমিকা
উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে (স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডি) কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর মৌলিক গবেষণা পরিচালনা করে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্যে উপস্থাপিত সুসংবদ্ধ একাডেমিক গবেষণাপত্রকে ‘থিসিস’ (Thesis) বা ‘গবেষণা অভিসন্দর্ভ’ বলা হয়।
থিসিসের সংজ্ঞা ও স্বরূপ
আভিধানিক অর্থ: গ্রিক শব্দ ‘Thesis’ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ কোনো প্রস্তাব উত্থাপন করা বা কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা।
পারিভাষিক অর্থ: থিসিস হলো একজন গবেষকের মৌলিক চিন্তাভাবনা, নতুন তথ্য এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য-বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনো একটি নতুন তত্ত্ব বা ধারণাকে একাডেমিক মানদণ্ডে প্রমাণ করার এক বিস্তারিত লিখিত প্রতিবেদন।
বিভিন্ন প্রকার থিসিস
একাডেমিক স্তর এবং গবেষণার প্রকৃতির ভিত্তিতে থিসিসকে নিম্নোক্ত প্রকারে ভাগ করা যায়:
- একাডেমিক স্তরভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ:
- মাস্টার্স থিসিস (Master’s Thesis): এটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অংশ হিসেবে লিখিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো গবেষণার পদ্ধতি প্রয়োগ এবং সাহিত্যের ওপর দখল প্রদর্শন করা। এটি সাধারণত তুলনামূলক কম দীর্ঘ এবং সীমিত পরিসরে মৌলিক তথ্যের সন্ধান করে।
- এমফিল থিসিস (M.Phil Thesis): পিএইচডির পূর্ববর্তী উন্নত গবেষণা, যাতে উচ্চতর বিশ্লেষণ এবং নতুন তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
- ডক্টরেট বা পিএইচডি ডিসার্টেশন (Ph.D. Dissertation): উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরের থিসিস। এটি শতভাগ মৌলিক জ্ঞান সৃষ্টি (Original Contribution to Knowledge) হতে হবে। এতে এমন কিছু তথ্য বা তত্ত্ব আবিষ্কার করতে হয় যা ইতিপূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি।
- গবেষণার পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ:
- তাত্ত্বিক বা ধারণাগত থিসিস (Theoretical Thesis): যা মূলত দর্শন, ইতিহাস বা সাহিত্যের বিদ্যমান তত্ত্বগুলোর গভীর বিশ্লেষণ, পুনর্মূল্যায়ন ও নতুন ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল।
- অভিজ্ঞতালব্ধ বা প্রায়োগিক থিসিস (Empirical Thesis): যা মাঠপর্যায়ের উপাত্ত, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, জরিপ বা কেস স্টাডির চাক্ষুষ প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়।
একটি আদর্শ থিসিসের কাঠামো
একটি মানসম্মত থিসিসে সাধারণত ভূমিকা, গবেষণার সমস্যা ও উদ্দেশ্য, সাহিত্য পর্যালোচনা (Literature Review), গবেষণা পদ্ধতি, তথ্য বিশ্লেষণ ও আলোচনা, সিদ্ধান্ত/সুপারিশ এবং গ্রন্থপঞ্জি ও পরিশিষ্ট অন্তর্ভুক্ত থাকে।
১১. স্যাম্পলিং কী? উদাহরণসহ এর কার্যপ্রণালী ও পদ্ধতি আলোচনা কর।
[English: What is sampling? Discuss its procedure and methods with examples.]
ভূমিকা
গবেষণার আওতাভুক্ত বিশাল জনগোষ্ঠী বা তথ্যবিশ্বের প্রতিটি উপাদান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সময়, অর্থ ও শক্তির বিবেচনায় প্রায়শই অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে সমগ্রকের প্রতিনিধিত্বকারী একটি ক্ষুদ্র অংশ নির্বাচন করার বৈজ্ঞানিক কৌশলই হলো ‘স্যাম্পলিং’ বা ‘নমুনায়ন’।
স্যাম্পলিংয়ের সংজ্ঞা
পারিভাষিক সংজ্ঞা: সমগ্র জনগোষ্ঠী বা তথ্যবিশ্ব (Population) থেকে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে প্রতিনিধিত্বমূলক একটি ক্ষুদ্র অংশ (Sample) বাছাই করার প্রক্রিয়াকে স্যাম্পলিং বলা হয়। সংগৃহীত এই ক্ষুদ্র নমুনার ফলাফল থেকেই সমগ্র জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সহজ উদাহরণ: একটি হাড়ির ভাত সেদ্ধ হয়েছে কি না তা জানার জন্য প্রতিটি ভাত টিপে দেখার প্রয়োজন হয় না; দু-একটি ভাত টিপেই যেমন পুরো হাড়ির অবস্থা বোঝা যায়, স্যাম্পলিংও ঠিক তেমনি একটি প্রক্রিয়া।
স্যাম্পলিংয়ের প্রধান পদ্ধতিসমূহ
স্যাম্পলিং মূলত দুই প্রকার:
- সম্ভাবনামূলক নমুনায়ন (Probability Sampling): যেখানে সমগ্রকের প্রতিটি উপাদানের নির্বাচিত হওয়ার সমান সুযোগ থাকে। এটি সবচেয়ে নিরপেক্ষ পদ্ধতি।
- সরল দৈবচয়ন (Simple Random Sampling): লটারি পদ্ধতি বা র্যান্ডম নম্বর টেবিল ব্যবহার করে নির্বাচন। যেমন: ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে লটারি করে ২০ জন নির্বাচন।
- স্তরবিন্যস্ত নমুনায়ন (Stratified Sampling): সমগ্রককে বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কয়েকটি স্তরে ভাগ করে (যেমন: ধনী, মধ্যবিত্ত, দরিদ্র অথবা পুরুষ ও নারী) প্রতিটি স্তর থেকে আনুপাতিক হারে স্যাম্পল নেওয়া।
- গুচ্ছ নমুনায়ন (Cluster Sampling): ভৌগোলিক বা প্রাতিষ্ঠানিক গুচ্ছ নির্বাচন করা। যেমন: সারা দেশের শিক্ষকদের গবেষণার জন্য দৈবচয়নে ৫টি জেলা নির্বাচন করে তার সকল শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করা।
- অ-সম্ভাবনামূলক নমুনায়ন (Non-Probability Sampling): যেখানে গবেষক নিজের সুবিধা বা বিচারবুদ্ধির ওপর নির্ভর করেন।
- সুবিধাজনক নমুনায়ন (Convenience Sampling): হাতের কাছে যাদের সহজে পাওয়া যায়।
- উদ্দেশ্যমূলক নমুনায়ন (Purposive/Judgmental Sampling): গবেষণার বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণে দক্ষ ব্যক্তিদের বাছাই করা। যেমন: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্য কেবল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া।
- স্নো-বল নমুনায়ন (Snowball Sampling): দুর্লভ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একজনের মাধ্যমে আরেকজনের সন্ধান নেওয়া (যেমন: মাদকাসক্তদের গবেষণা)।
উপসংহার
স্যাম্পলিংয়ের মূল শক্তি হলো এর ‘প্রতিনিধিত্বশীলতা’ (Representativeness)। নমুনা যত বেশি সুসংগত হবে, গবেষণার ফলাফল তত বেশি নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য হবে।
১২. যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও (সংক্ষিপ্ত টীকা):
[দ্রষ্টব্য: মান ৫ × ২ = ১০]
(ক) গবেষণা পদ্ধতি (Research method)
উত্তর: গবেষণার তথ্য সংগ্রহ, উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের জন্য সরাসরি যেসব বাস্তব কলাকৌশল ও হাতিয়ার প্রয়োগ করা হয়, তাকে ‘রিসার্চ মেথড’ বা গবেষণা কৌশল বলা হয়। যেমন: প্রশ্নমালা তৈরি, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, পর্যবেক্ষণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ। সংক্ষেপে বলা যায়, মেথডোলজি হলো গবেষণার তত্ত্ব ও দর্শন, আর মেথড হলো তার ব্যবহারিক হাতিয়ার।
(খ) কুম্ভীলক-বৃত্তি (Plagiarism)
উত্তর: একাডেমিক ও গবেষণা জগতে অন্যের চিন্তা, বক্তব্য, ভাষা, লেখা বা গবেষণালব্ধ তথ্য তাঁর নাম বা উৎসের যথাযথ কৃতজ্ঞতা স্বীকার (Citation/Reference) না করে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়াকে কুম্ভীলক-বৃত্তি বা প্লেজারিজম বলা হয়। এটি এক ধরনের মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি এবং চরম অসততা। আধুনিক যুগে বিভিন্ন সফটওয়্যার (যেমন: Turnitin) দিয়ে প্লেজারিজম শনাক্ত করা হয় এবং প্লেজারিজম প্রমাণিত হলে থিসিস বাতিল এমনকি ডিগ্রি প্রত্যাহার হতে পারে।
(গ) তথ্য-সংগ্রহ (Data-collection)
উত্তর: গবেষণার সমস্যা সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্ট উৎস থেকে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ ও উপাত্ত আহরণের সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়াকে তথ্য-সংগ্রহ বলা হয়। তথ্য দুই প্রকার:
১. প্রাথমিক তথ্য (Primary Data): গবেষক নিজে সরাসরি মাঠপর্যায় থেকে চাক্ষুষ সাক্ষাৎকার, প্রশ্নমালা বা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো যা সংগ্রহ করেন।
২. মাধ্যমিক তথ্য (Secondary Data): পূর্বে প্রকাশিত বইপত্র, গবেষণাপত্র, সরকারি নথিপত্র ও আদমশুমারি থেকে যা সংগৃহীত হয়।
(ঘ) সাহিত্য পর্যালোচনা (Literature review)
উত্তর: গবেষণাধীন নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ইতিপূর্বে দেশি-বিদেশি গবেষকগণ কী কী কাজ করেছেন, কোন কোন তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে এখনও জ্ঞানের ঘাটতি বা ফাঁক (Research Gap) রয়েছে—তা জানার জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ, জার্নাল ও গবেষণা নিবন্ধের বিস্তারিত সমালোচনামূলক পাঠ ও মূল্যায়নকে ‘লিটারেচার রিভিউ’ বলা হয়। এটি গবেষণার পুনরাবৃত্তি রোধ করে এবং নতুন গবেষণার যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. এশিয়ার আরব রাষ্ট্রসমূহ এবং গবেষণা পদ্ধতি (২০৫৪০৬) পত্রের সিলেবাসের গঠন কেমন?
উত্তর: এই পত্রটি দুটি স্বতন্ত্র অংশে বিভক্ত: গ্রুপ-ক এ রয়েছে আধুনিক যুগে এশিয়ার আরব দেশসমূহের (সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইরাক, জর্ডান ইত্যাদি) রাজনৈতিক ইতিহাস (৪০ নম্বর) এবং গ্রুপ-খ এ রয়েছে গবেষণার মৌলিক পদ্ধতি ও থিসিস রচনার বিজ্ঞান (৪০ নম্বর)।
২. ব্যালফোর ঘোষণা কেন আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিতর্কিত দলিল?
উত্তর: কারণ এই ঘোষণার মাধ্যমেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কোনো বৈধ অধিকার ছাড়া আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে বলপূর্বক ইহুদিদের জন্য একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রক্তক্ষয়ী সংকটের জন্ম দিয়েছে।
৩. লেবাননের ১৯৪৩ সালের জাতীয় চুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
উত্তর: প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা বণ্টন—রাষ্ট্রপতি হবেন ম্যারোনাইট খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী হবেন সুন্নি মুসলিম এবং সংসদের স্পিকার হবেন শিয়া মুসলিম।
৪. মিশ্র গবেষণা পদ্ধতি কেন একক পদ্ধতির চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য?
উত্তর: কারণ এটি পরিমাণগত গবেষণার সংখ্যাভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠতা এবং গুণগত গবেষণার গভীর মানবিক অনুভূতির অপূর্ব সমন্বয় ঘটায়, যা জটিল সামাজিক সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে সক্ষম।
৫. গবেষণায় ‘কুম্ভীলক-বৃত্তি’ (Plagiarism) করলে কী পরিণতি হতে পারে?
উত্তর: এটি একটি গুরুতর বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধ। প্লেজারিজম ধরা পড়লে গবেষণাপত্র বা থিসিস সরাসরি বাতিল হতে পারে, গবেষকের ডিগ্রি কেড়ে নেওয়া হতে পারে এবং একাডেমিক মহলে চিরতরে ব্ল্যাকলিস্টেড হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৬. পরীক্ষায় গবেষণা পদ্ধতির প্রশ্নের উত্তর লেখার কার্যকর নিয়ম কী?
উত্তর: গবেষণা পদ্ধতির প্রশ্নোত্তরে কেবল মুখস্থ সংজ্ঞা না লিখে বাস্তব উদাহরণ (যেমন: স্যাম্পলিংয়ে লটারি বা ভাতের উদাহরণ), সুনির্দিষ্ট ধাপসমূহ এবং পদ্ধতির তুলনামূলক ছক ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া যায়।