ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: المذاهب الفقهية (আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ / তুলনামূলক ফিকহ শাস্ত্র)
বিষয় কোড: ২০১৮০৫ | পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১১৫
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (الف) : الأسئلة التحريرية والتأصيلية (গ্রুপ ‘ক’ – বিশদ মৌলিক প্রশ্নাবলি)
[الملاحظة: أجب عن أربعة أسئلة من هذه المجموعة. الدرجات: ৪ × ১৫ = ৬০]
(পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও গবেষণাধর্মী পর্যালোচনার স্বার্থে গ্রুপ ‘ক’-এর ৮টি প্রশ্নের সবগুলোরই পূর্ণাঙ্গ ফিকহি সমাধান উপস্থাপন করা হলো।)
١- عرف الفقه لغة وشرعًا- ثم بين نشأته و تطوره عبر العصور-
[ফিকহ এর শাব্দিক ও পারিভাষিক পরিচয় দাও। অতঃপর এর উৎপত্তি ও যুগে যুগে এর ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১. ফিকহের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা (تعريف الفقه):
আভিধানিক অর্থ: ‘ফিকহ’ (الْفِقْهُ) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো বিষয়ের গভীর উপলব্ধি, সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা ও যথার্থ জ্ঞানলাভ (الْفَهْمُ الدَّقِيقُ)। যেমন কুরআনে এসেছে: «لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ» (যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে)।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: ফিকহ শাস্ত্রবিদদের সর্বসম্মত সংজ্ঞায়—
«الْعِلْمُ بِالْأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ الْعَمَلِيَّةِ الْمُكْتَسَبَةِ مِنْ أَدِلَّتِهَا التَّفْصِيلِيَّةِ»
অর্থাৎ: “কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের মতো বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট শরয়ি দলিলসমূহ থেকে গবেষণা ও ইজতিহাদের মাধ্যমে অর্জিত ব্যবহারিক ইসলামি আইনি বিধানাবলির সুশৃঙ্খল জ্ঞানকেই ফিকহ বলা হয়।”
২. ফিকহের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره عبر العصور):
- নবুয়তের যুগ (عصر النبوة): এটি ছিল ফিকহের মূল ভিত্তিপ্রস্তর। আইন প্রণয়নের একমাত্র উৎস ছিলেন ওহিয়ে মাতলু (কুরআন) এবং ওহিয়ে গায়রে মাতলু (সুন্নাহ)। সাহাবায়ে কিরাম যেকোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক ফয়সালা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছ থেকে সরাসরি গ্রহণ করতেন।
- খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ (عصر الخلفاء الراشدين): রাসুলের ওফাতের পর নতুন নতুন পরিস্থিতি ও ভূখণ্ড বিজয়ের প্রেক্ষিতে খলিফাগণ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরামর্শ (শুরা) এবং ইজমার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতেন। হযরত উমর, আলী, ইবনে মাসউদ ও আয়িশা (রা.) এ যুগের শীর্ষ মুজতাহিদ ফকিহ ছিলেন।
- উমাইয়া যুগ ও ফিকহি কেন্দ্রের বিকাশ: এ যুগে সাহাবায়ে কিরাম বিভিন্ন বিজিত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। ফলে দুটি প্রধান চিন্তাধারার জন্ম হয়: মদিনার হাদিসপ্রধান ফিকহ (মাদরাসাতুল হাদিস) এবং ইরাক/কুফার যুক্তি ও কিয়াসপ্রধান ফিকহ (মাদরাসাতুর রায়)।
- আব্বাসী যুগ ও মাযহাব সংকলনের স্বর্ণযুগ: দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতকে চার প্রধান মাযহাব (হানাফী, মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী)-এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচিত হয়। ইমামগণ কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিধিবিধান নিষ্কাশনের সুনির্দিষ্ট উসূল (আইনদর্শন) প্রণয়ন করেন।
- পরবর্তী যুগ ও ফিকহের বিশ্বকোষীয় বিন্যাস: পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইজতিহাদের দরজা সংকুচিত হয়ে তাকলীদ ও ফতোয়া সংকলনের ধারা শুরু হয় (যেমন ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া, ফতোয়ায়ে আলমগীরী এবং উসমানী খিলাফতের মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ)।
٢- ما المراد بالمذاهب الفقهية؟ لم مست الحاجة اليها؟ وما الفوائد فى تعدد المذاهب؟ بين-
[আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ বলতে কী বুঝ? এটার প্রয়োজনীয়তা কী? একাধিক মাযহাব এর উপকারিতা কী? বর্ণনা কর।]
১. ‘আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ’-এর পরিচয়:
‘মাযহাব’ (مَذْهَبٌ) শব্দের অর্থ মতাদর্শ, চলার পথ বা দৃষ্টিভঙ্গি। ফিকহি পরিভাষায়: কুরআন ও সুন্নাহর নসসমূহ অনুধাবন এবং সেখান থেকে শরয়ি বিধানাবলি ইস্তিম্বাত (নিষ্কাশন) করার জন্য যুগশ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ ইমামগণ যে সুশৃঙ্খল বৈজ্ঞানিক নিয়ম ও উসূল অবলম্বন করেছেন এবং তাঁর অনুসারীগণ যে ফিকহি পথ অনুসরণ করেন, তাকে ‘মাযহাব’ বলা হয়। যেমন হানাফী, মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব।
২. মাযহাবের প্রয়োজনীয়তা (الحاجة إلى المذاهب):
- কুরআন ও হাদিসের প্রতিটি আয়াত ও হাদিস সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি বুঝে আইন বের করার মতো সহজ নয়; অনেক নির্দেশ মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট), নাসিখ-মানসুখ (রহিত) এবং মুতলাক-মুকাইয়্যাদ (শর্তহীন ও শর্তযুক্ত) অবস্থায় রয়েছে।
- একজন সাধারণ মুসলমানের পক্ষে আরবি ভাষার গভীর ব্যাকরণ, নাসিখ-মানসুখ, হাদিসের রিজাল শাস্ত্র ও তাআরুজের নিয়মাবলী নিজে জেনে সরাসরি ইজতিহাদ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। তাই বিশেষজ্ঞ ফকিহদের সুবিন্যস্ত গবেষণার অনুসরণ করা অপরিহার্য।
৩. একাধিক মাযহাবের উপকারিতা ও দর্শন (فوائد تعدد المذاهب):
- উম্মাহর জন্য ঐশী প্রশস্ততা ও রহমত: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীদের মধ্যেও মতভেদ ছিল। উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) বলতেন: “সাহাবায়ে কিরামের মতভেদ না থাকলে আমি আনন্দিত হতাম না; কারণ তাঁদের মতভেদের ফলেই আমাদের জন্য শরিয়তে উদারতা ও প্রশস্ততা তৈরি হয়েছে।”
- দেশ ও কালের বৈচিত্র্যময় সমাধান: পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশ, সংস্কৃতি ও মানবিক প্রয়োজনের সাথে চার মাযহাবের কোনো না কোনো মতের চমৎকার সামঞ্জস্য থাকে, যা শরিয়তকে চিরন্তন গতিশীল রাখে।
- বিকল্প মতের সুযোগ ও সংকট নিরসন: কোনো একটি মাযহাবের অধীনে কোনো বিশেষ সমসাময়িক জটিলতায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলে অন্য সুপ্রতিষ্ঠিত মাযহাবের দলিলের ভিত্তিতে সমন্বয় (তাকলীদে যারূরী) করে উম্মাহকে সংকটমুক্ত করা সম্ভব হয়।
٣- ما هى المذاهب الأربعة؟ ومن هم مؤسسوها؟ ثم بين نشأتها بالتفصيل-
[মাযহাব চতুষ্টয় কী? এর প্রতিষ্ঠাতা কারা? অতঃপর এর উৎপত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চার মাযহাব ও তাঁদের প্রতিষ্ঠাতা:
| মাযহাবের নাম | প্রতিষ্ঠাতা ইমাম | জন্ম ও ওফাত সন | প্রধান কেন্দ্র | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|---|
| হানাফী মাযহাব | ইমামে আযম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.) | ৮০ – ১৫০ হিজরী | কুফা (ইরাক) | শুরাভিত্তিক ফিকহ ও কিয়াস-ইস্তিহসানের গভীর প্রয়োগ। |
| মালিকী মাযহাব | ইমাম দারুল হিজরাহ মালিক ইবনে আনাস (রহ.) | ৯৩ – ১৭৯ হিজরী | মদিনা মুনাওয়ারা | আমলে আহলে মদিনা ও মাসালিহে মুরসালাহর অগ্রাধিকার। |
| শাফেয়ী মাযহাব | ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইদরীস আশ-শাফেয়ী (রহ.) | ১৫০ – ২০৪ হিজরী | মক্কা, বাগদাদ ও কায়রো | উসূলে ফিকহের প্রথম প্রণেতা, হাদিস ও কিয়াসের নিপুণ সমন্বয়। |
| হাম্বলী মাযহাব | ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আশ-শায়বানী (রহ.) | ১৬৪ – ২৪১ হিজরী | বাগদাদ | সহিহ ও মুরসাল হাদিসের ওপর সর্বাধিক নির্ভরতা। |
২. চার মাযহাবের বিস্তারিত ঐতিহাসিক উৎপত্তি:
- হানাফী মাযহাবের বিকাশ: ইমাম আবু হানিফা ৪০ জন বিশিষ্ট মুজতাহিদ শিষ্যের সমন্বয়ে একটি ‘ফিকহ একাডেমি’ গঠন করে হাজার হাজার বাস্তবিক ও আনুমানিক মাসআলা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর প্রধান দুই ছাত্র কাজী আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ এ মাযহাবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
- মালিকী মাযহাবের বিকাশ: ইমাম মালিক মদিনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবীদের সরাসরি বংশধর ও আমলকে দেখে তাঁর কালজয়ী হাদিস-ফিকহ গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা সংকলন করেন। ইবনুল কাসিম তাঁর ফতোয়া সংকলন আল-মুদাওওয়ানাতুল কুবরায় সংরক্ষণ করেন।
- শাফেয়ী মাযহাবের বিকাশ: ইমাম শাফেয়ী হানাফী ও মালিকী উভয় ধারার নির্যাস গ্রহণ করে আর-রিসালাহ এবং কিতাবুল উম্ম রচনা করে মধ্যমপন্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ইরাকে তাঁর পূর্ববর্তী মত (আল-মাযহাবুল কাদীম) এবং মিশরে তাঁর সংশোধিত পরিপক্ব মত (আল-মাযহাবুল জাদীদ) বিকাশ লাভ করে।
- হাম্বলী মাযহাবের বিকাশ: মুতাযিলাদের ফিতনায়ে খালকে কুরআনের বিরুদ্ধে একাকী দাঁড়িয়ে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল হাদিসের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করেন এবং ৪০ হাজার হাদিসের সমাহারে মুসনাদে আহমাদ সংকলনের ভিত্তিতে কঠোর হাদিসনিষ্ঠ ফিকহ উপহার দেন।
٤- ما المذهب الحنفى؟ أوضح الأسباب التى اشتهر بها الفقه الحنفى ثم اذكر بعض الكتب المشهورة للمذهب الحنفى-
[হানাফী মাযহাব বলতে কী বুঝ? যে সকল কারণে ফিকহে হানাফী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে তা ব্যাখ্যা কর। অতঃপর হানাফী মাযহাব এর কয়েকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থের নাম উল্লেখ কর।]
১. হানাফী মাযহাবের পরিচয়:
ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.) এবং তাঁর যোগ্যতম শিষ্যবর্গের (বিশেষ করে ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ও ইমাম যুফার) ইজতিহাদি মূলনীতি ও মাসআলাসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত সুশৃঙ্খল ফিকহি ধারাকে ‘হানাফী মাযহাব’ বলা হয়। বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যা এই মাযহাবের অনুসারী।
২. ফিকহে হানাফী সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভের মূল কারণসমূহ:
- শুরা বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সংকলন: ইমাম আবু হানিফা কোনো মাসআলা একাকী চাপিয়ে দিতেন না। তিনি তাঁর মজলিশে ফিকহের শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিতর্ক ও পর্যালোচনা করতেন; সর্বসম্মত হলে তা লিপিবদ্ধ করতেন।
- তাকদীরি বা কাল্পনিক ফিকহের বিকাশ: ভবিষ্যতে কী কী মানবিক ও বৈজ্ঞানিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে, তা আগেই কল্পনা করে শত সহস্র সমস্যার সমাধান তাঁরা প্রস্তুত রেখেছিলেন, যা সভ্যতা পরিচালনায় অভাবনীয় অবদান রাখে।
- ইস্তিহসান ও মানবকল্যাণের গভীর বিবেচনা: অনমনীয় নিয়মের পরিবর্তে যেখানে সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব ও সুবিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন, সেখানে হানাফী ফিকহ ইস্তিহসানের মাধ্যমে উদার সমাধান প্রদান করে।
- রাষ্ট্রীয় খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতা: উমাইয়া যুগের পর আব্বাসী খিলাফতকালে ইমাম আবু ইউসুফ ‘কাযিউল কুযাত’ (প্রধান বিচারপতি) নিযুক্ত হন। এর ফলে সমগ্র খেলাফতের আদালতসমূহে হানাফী আইন চালু হয়। পরবর্তীতে অটোমান উসমানী সাম্রাজ্য এবং ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের সরকারি আইন ছিল ফিকহে হানাফী।
৩. হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ও প্রামাণ্য গ্রন্থাবলি:
- আল-মাবসূত (المبسوط): ইমাম শামসুল আইম্মাহ আস-সারাখসী (রহ.)।
- বাদায়েউস সানায়ে’ ফী তারতীবিশ শারায়ে’ (بدائع الصنائع): ইমাম আলাউদ্দীন আল-কাসানী (রহ.)।
- আল-হিদায়াহ (الهداية): ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.)।
- ফাতহুল কাদীর (فتح القدير): আল্লামা কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম (রহ.)।
- রাদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার (رد المحتار / ফতোয়ায়ে শামী): আল্লামা ইবনে আবেদীন আশ-শামী (রহ.)।
- ফতোয়ায়ে আলমগীরী (الفتاوى الهندية): সম্রাট আওরঙ্গজেবের তত্ত্বাবধানে ৫০০ শীর্ষ আলেম কর্তৃক সংকলিত।
٥- أكتب آراء الفقهاء حول مسئلة القراءة خلف الامام ثم رجح ما هو ارجح عندك بالدلائل-
[ইমামের পিছনে মুক্তাদির কিরাআত পাঠের বিষয়ে ফকিহগণের মতামত উল্লেখ কর। অতঃপর তোমার মতে যে মতটি প্রাধান্য পাবারযোগ্য সেটি দলিলসহ প্রতিষ্ঠিত কর।]
১. ফকিহগণের মতামত ও মাযহাবি ইখতিলাফ:
জামাতে সালাত আদায়কালে ইমামের পেছনে মুক্তাদি সূরা ফাতিহা বা অন্য কিরাত পড়বে কিনা—এ নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে তিনটি প্রধান মত রয়েছে:
- ১ম মত (হানাফী মাযহাব): ইমামের পেছনে মুক্তাদির জন্য কিরাত পাঠ করা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ (মাকরূহে তাহরীমী); তা প্রকাশ্য কিরাতের সালাত (মাগরিব, এশা, ফজর) হোক বা নিঃশব্দ কিরাতের সালাত (যোহর, আসর) হোক। মুক্তাদি সর্বাবস্থায় নীরব থাকবে।
- ২য় মত (শাফেয়ী মাযহাব): প্রত্যেক সালাতেই (জেহরি হোক বা সিররি) মুক্তাদির জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব বা ফরজ। ফাতিহা না পড়লে মুক্তাদির সালাত বাতিল হয়ে যাবে।
- ৩য় মত (মালিকী ও হাম্বলী মাযহাব): নিঃশব্দ কিরাতের সালাতে (যোহর ও আসরে) মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পড়বে; কিন্তু প্রকাশ্য কিরাতের সালাতে (মাগরিব, এশা, ফজর) যখন ইমাম কিরাত জোরে পাঠ করবেন, তখন মুক্তাদি মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং কোনো কিরাত পড়বে না।
২. হানাফী মাযহাবের মতের প্রাধান্য ও অকাট্য দলীলসমূহ (الترجيح بالدلائل):
দলিলের গভীরতা ও সমন্বয়ের দিক থেকে হানাফী মাযহাবের মতই সর্বাধিক শক্তিশালী ও প্রাধান্যযোগ্য:
- পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—
«وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ» [সূরা আল-আরাফ: ২০৪]
মুফাসসিরীনে সাহাবা (ইবনে মাসউদ, আবু হুরায়রা ও মুজাহিদ) একবাক্যে বলেছেন, এই আয়াতটি সালাতে ইমামের কিরাত শোনার নির্দেশেই নাজিল হয়েছে। ইমাম যখন কিরাত পড়েন তখন মুক্তাদির ওপর ‘শোনা ও চুপ থাকা’ ফরজ। - রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্পষ্ট হাদিস: জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
«مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ، فَقِرَاءَةُ الإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ»
“যার কোনো ইমাম রয়েছে, তবে ইমামের কিরাত পাঠই মুক্তাদির কিরাত হিসেবে যথেষ্ট।” [মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, দারা কুতনী] - সহিহ মুসলিমের হাদিস: রাসুল ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন—«وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا» (আর ইমাম যখন কিরাত পাঠ করে, তখন তোমরা পূর্ণ নীরব থাকো)। [সহিহ মুসলিম: ৪০৪]।
- যুক্তির নিরিখে: ইমামকে নেতা বানানো হয়েছে অনুসরণ করার জন্য। ইমাম যদি মুক্তাদির পক্ষ থেকে নামাজে কেরাত, রুকু, সিজদা পরিচালনা করেন, তবে তাঁর পাঠই মুক্তাদির জন্য প্রতিনিধি হিসেবে কার্যকর হবে।
٦- وازن بين المذهب الحنفى والمذهب الشافعى مع ذكر أصول هذين المذهبين الرئيسين-
[হানাফী ও শাফিয়ী মাযহাবের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা কর। অতঃপর এ দু মাযহাবের প্রধান প্রধান মূলনীতিগুলো উল্লেখ কর।]
১. হানাফী ও শাফিয়ী মাযহাবের মৌলিক উসূল বা মূলনীতিসমূহ:
| উসূলের ক্ষেত্র | হানাফী মাযহাবের মূলনীতি (أصول الفقه الحنفي) | শাফিয়ী মাযহাবের মূলনীতি (أصول الفقه الشافعي) |
|---|---|---|
| আম ও খাস-এর হুকুম | কুরআনের ‘আম’ (সাধারণ) শব্দ নির্দিষ্টতার মতো সুনিশ্চিত (ক্বাতয়ী); খবরুল ওয়াহিদ দ্বারা কুরআনের আমকে নির্দিষ্ট করা যায় না। | ‘আম’ শব্দ ধারণামূলক (যন্নী); নির্ভরযোগ্য একক হাদিস (খবরুল ওয়াহিদ) দ্বারা কুরআনের আমকে খাস করা বৈধ। |
| খবরুল ওয়াহিদের শর্ত | বর্ণনাকারীর ফকিহ হওয়া এবং সাধারণ সংকটপূর্ণ বিষয়ে হাদিসটি যেন মানুষের প্রকাশ্য অভ্যাসের বিপরীত না হয়। | সনদ সহিহ হলেই হাদিস গ্রহণযোগ্য; রাবীর অতিরিক্ত ফিকহি পান্ডিত্য শর্ত নয়। |
| কিয়াস ও ইস্তিহসান | কিয়াসের পাশাপাশি জনকল্যাণে ও প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ইস্তিহসান’ (উদার বিকল্প) ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। | ইস্তিহসান কঠোরভাবে বর্জনীয়; ইমাম শাফেয়ী বলেন: «مَنِ اسْتَحْسَنَ فَقَدْ شَرَّعَ» (যে ইস্তিহসান করল সে যেন নতুন আইন রচনা করল)। |
| ফরজ ও ওয়াজিবের বিভাজন | অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত হলে ‘ফরজ’, আর প্রবল ধারণামূলক দলিল দ্বারা প্রমাণিত হলে ‘ওয়াজিব’। | হজ ব্যতীত অন্য সমস্ত বিষয়ে ফরজ ও ওয়াজিব একই অর্থের পরিপূরক। |
২. দুটি প্রধান ধারার পদ্ধতিগত তুলনা:
- হানাফী পদ্ধতিকে বলা হয় ‘তারিকাতুল ফুকাহা’—যেখানে ফিকহি মাসআলা থেকে উসূলের মূলনীতি বের করা হয়।
- শাফিয়ী পদ্ধতিকে বলা হয় ‘তারিকাতুল মুতাকাল্লিমীন’—যেখানে আগে বিশুদ্ধ ব্যাকরণ ও যুক্তির অকাট্য মূলনীতি দাঁড় করানো হয়, তারপর তার অধীনে মাসআলা স্থাপন করা হয়।
٧- أذكر كلمات الآذان والاقامة مع ذكر اختلاف الفقهاء فيها- ثم رجح المذهب الحنفى بالدلائل-
[ফকিহগণের ইখতিলাফ উল্লেখপূর্বক আযান ও ইক্বামত এর শব্দ বিষয়ে আলোচনা কর। অতঃপর দলিলসহ হানাফী মাযহাবের প্রাধান্যের বিষয়টি উল্লেখ কর।]
১. আযান ও ইকামতের শব্দ সংখ্যা নিয়ে ফকিহগণের ইখতিলাফ:
- হানাফী মাযহাব: আযানের বাক্য ১৫টি এবং ইকামতের বাক্য ১৭টি। আযানের মতো ইকামতেও প্রতিটি বাক্য দুইবার করে বলতে হবে (জোড় শব্দ), কেবল “ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ” দুইবার অতিরিক্ত যুক্ত হয়ে মোট ১৭ বাক্য হবে।
- শাফেয়ী মাযহাব: আযানের বাক্য ১৯টি (তারজী’ সহ; অর্থাৎ শাহাদাতাইন প্রথমে আস্তে বলে পুনরায় উচ্চস্বরে বলা) এবং ইকামতের বাক্য ১১টি (ইকামতের সমস্ত বাক্য এক এক বার বলা হবে, শুধু তাকবীর শুরুতে ও শেষে দুইবার এবং ক্বাদ কামাতিস সালাহ দুইবার)।
- মালিকী মাযহাব: আযান ১৭ বাক্য এবং ইকামত ১০ বাক্য (এমনকি ক্বাদ কামাতিস সালাহ-ও একবার বলা হবে)।
২. হানাফী মাযহাবের দলীল ও প্রাধান্য (الترجيح بالحجة):
হানাফী মাযহাবের মতটি অত্যন্ত শক্তিশালী সহিহ হাদিস দ্বারা সমর্থিত:
- আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-এর ঐতিহাসিক হাদিস: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) স্বপ্নে যেভাবে ফেরেশতাকে আযান ও ইকামত দিতে দেখেছিলেন এবং যা রাসুলুল্লাহ ﷺ অনুমোদন করেছিলেন—সেখানে আযান ও ইকামত উভয়টিই জোড় শব্দে (দুই দুই বার করে) উচ্চারিত হয়েছিল [আবু দাউদ, তিরমিযী]।
- আবু মাহযূরা (রা.)-এর হাদিস: সহিহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ হযরত আবু মাহযূরাকে ইকামতের ১৭টি শব্দ শিক্ষা দিয়েছিলেন, যাতে সমস্ত বাক্য দুইবার করে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- সুতরাং হানাফী মাযহাবের অবস্থানই সুন্নাহর সর্বাধিক সুসংগত ও ধারাবাহিক রূপ।
٨- ما المراد باختلاف المطالع؟ هل يعتبر ذالك ام لا؟ وما حكم خبر الراديو والتلفيزيون في ثبوت الهلال؟ رؤية الهلال؟ بين بالتفصيل-
[ইখতিলাফুল মাতালি’ দ্বারা উদ্দেশ্য কী? এটার গ্রহণযোগ্যতা আছে কিনা? চাঁদ দেখার বিষয়ে রেডিও ও টেলিভিশনের সংবাদ এর হুকুম কী? বিস্তারিত আলোচনা কর।]
১. ইখতিলাফুল মাতালি’-এর পরিচয় (مفهوم اختلاف المطالع):
‘মাতলা’ (مَطْلَعٌ) হলো উদয়স্থল। পৃথিবীর গোলকীয় গঠন ও আহ্নিক গতির কারণে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে সূর্য ও চন্দ্রোদয়ের সময়ের যে ব্যবধান ঘটে, তাকে ‘ইখতিলাফুল মাতালি’ বা উদয়স্থলের ভিন্নতা বলা হয়।
২. শরিয়তে ইখতিলাফুল মাতালি’-এর গ্রহণযোগ্যতা (حكم اعتبار اختلاف المطالع):
- জমহুর হানাফী, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের প্রাচীন মত: দূরবর্তী অঞ্চল হলেও ইখতিলাফুল মাতালি’ গ্রহণযোগ্য নয় (لا عبرة باختلاف المطالع)। অর্থাৎ পৃথিবীর যেকোনো এক প্রান্তে নির্ভরযোগ্যভাবে নতুন চাঁদ দেখা গেলে এবং তা শরয়ি সনদে প্রমাণিত হলে সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের জন্য রোজা রাখা ও ঈদ করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
- ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ও আধুনিক ফুকাহায়ে কিরামের মত: অত্যন্ত দূরবর্তী অঞ্চলসমূহের জন্য মাতলা বা উদয়স্থলের ভিন্নতা শরিয়তে গ্রহণযোগ্য (معتبر)। হযরত কুরাইব (রা.) সিরিয়ায় শুক্রবার চাঁদ দেখে রোজা রেখেছিলেন, কিন্তু মদিনায় ইবনে আব্বাস (রা.) শনিবার চাঁদ দেখেছিলেন। ইবনে আব্বাস সিরিয়ার চাঁদ দেখাকে মদিনার জন্য যথেষ্ট গণ্য করেননি এবং বলেছিলেন: «هَكَذَا أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ» (রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন)। সমকালীন আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি এই মতের ওপর ভিত্তি করে নিজ নিজ অঞ্চলের চাঁদ দেখাকে প্রাধান্য দেয়।
৩. চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে রেডিও ও টেলিভিশনের সংবাদের শরয়ি হুকুম:
- রেডিও বা টেলিভিশন কেবল একটি প্রচার মাধ্যম, এটি নিজে কোনো প্রত্যক্ষ শরয়ি সাক্ষী নয়।
- তবে যদি কোনো দেশের সরকারি বা সর্বসম্মত নির্ভরযোগ্য ‘জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি’ (হিলাল কমিটি) শরয়ি সাক্ষ্যের ভিত্তিতে চাঁদ ওঠার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে এবং সেই বিশ্বস্ত সরকারি সিদ্ধান্ত রেডিও-টিভিতে সংবাদ আকারে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, তবে তা ‘খবরে মুস্তাফিজ’ বা নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞপ্তি হিসেবে গণ্য হবে এবং তার ভিত্তিতে রোজা ও ঈদ পালন করা সর্বসম্মতভাবে জায়েজ ও ওয়াজিব।
مجموعة (ب) : الأسئلة الموجزة والتحليلية (গ্রুপ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত ও জরুরি ফিকহি সমাধান)
[الملاحظة: أجب عن أربعة أسئلة من هذه المجموعة. الدرجات: ৪ × ৫ = ২০]
(পরীক্ষার্থীদের সেরা নম্বর প্রাপ্তির লক্ষ্যে গ্রুপ ‘খ’-এর ৮টি প্রশ্নের সবগুলোরই প্রামাণ্য উত্তর প্রস্তুত করা হলো।)
٩- كم ركعة لصلوة التراويح؟ وما الاختلاف فيها؟ بين-
[তারাবি নামাজ কত রাকাআত? এ বিষয়ে ইমামগণের মতামত কী? বর্ণনা কর।]
১. ফকিহগণের মতামত:
- জমহুর আহলে সুন্নাত (হানাফী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব): তারাবি সালাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং তা সর্বমোট ২০ (বিশ) রাকাআত।
- ইমাম মালিক (রহ.)-এর মশহুর মত: মদিনাবাসীদের আমলের ভিত্তিতে তিনি ৩৬ রাকাআত তারাবিকে উত্তম মনে করতেন (মক্কাবাসীরা প্রতি চার রাকাত পরপর কাবা তাওয়াফ করত বলে মদিনার লোকেরা সমতা রক্ষায় অতিরিক্ত চার রাকাত করে ১৬ রাকাত মিলিয়ে ২০+১৬=৩৬ রাকাত পড়ত)। তবে মূল তারাবি তাঁর নিকটও ২০ রাকাতই ছিল।
- আহলে হাদিস বা সালাফী মত: তাঁরা বিতর সহ ১১ রাকাত (৮ রাকাত তারাবি) বলে থাকেন।
২. বিশ রাকাআতের অকাট্য প্রমাণ:
দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.) ১৪ হিজরীতে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর ইমামতিতে সমস্ত সাহাবীকে একত্রিত করে জামাতে ২০ রাকাআত তারাবির সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা চালু করেন। হযরত উসমান ও আলী (রা.)-এর যুগেও ২০ রাকাআত অব্যাহত ছিল। কোনো একজন সাহাবীও এর বিরোধিতা করেননি; ফলে ২০ রাকাআত তারাবির ওপর সাহাবায়ে কিরামের ঐতিহাসিক ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
١٠- ما معنى التقليد؟ وما حكم التقليد الشخصى؟
[তাকলিদ কী? ‘তাকলিদে শাখছী’ এর হুকুম কী?]
- তাকলীদের সংজ্ঞা: শরিয়তের দলিল অনুসন্ধানে অক্ষম কোনো ব্যক্তির জন্য দ্বীনের বিস্তারিত আহকাম পালনে কোনো নির্ভরযোগ্য মুজতাহিদের সিদ্ধান্তের অনুসরণ করাকে ‘তাকলীদ’ বলে।
- তাকলীদে শাখছী (নির্দিষ্ট একজন ইমামের অনুসরণ)-এর হুকুম: যে ব্যক্তি নিজে ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখে না, ফিতনা ও প্রবৃত্তির লালসা থেকে আত্মরক্ষার জন্য তার ওপর চার মাযহাবের যেকোনো একটি নির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ (তাকলীদে শাখছী) করা ওয়াজিব। যদি নির্দিষ্ট মাযহাব না মেনে যেখান থেকে যা সুবিধাজনক তা গ্রহণ করা হয় (তালফীক্ব), তবে মানুষ প্রবৃত্তিপূজায় লিপ্ত হবে এবং দ্বীনের মূল চেতনা ধ্বংস হয়ে যাবে। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) আল-ইনসাফ গ্রন্থে লিখেছেন—উম্মাহর সামগ্রিক কল্যাণে নির্দিষ্ট মাযহাবের তাকলীদ এক মহান নিরাপত্তা।
١١- ما الفرق بين التقليد والاتباع؟ بين-
[তাকলিদ ও ইত্তিবা এর মধ্যে পার্থক্য কী? বর্ণনা কর।]
ইসলামী পরিভাষায় ‘তাকলীদ’ এবং ‘ইত্তিবা’-এর মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য নিম্নরূপ:
| পার্থক্যের ক্ষেত্র | তাকলীদ (التقليد) | ইত্তিবা (الاتباع) |
|---|---|---|
| কার জন্য প্রযোজ্য | মুজতাহিদ আলেমদের ফতোয়া অনুসরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। | স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং অকাট্য দলিলের অনুসরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। |
| দলিলের জ্ঞান | দলিল না জেনে বিজ্ঞ আলেমের ওপর ভরসা করে তাঁর রায় গ্রহণ করা। | স্পষ্ট দলিল ও প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যের সরাসরি অনুসরণ করা। |
| শরয়ি মর্যাদা | অজ্ঞ সাধারণ মানুষের জন্য বাধ্যবাধকতামূলক মাধ্যম। | প্রত্যেক মুমিনের ওপর মূল ঈমানি দাবি ও সার্বজনীন দায়িত্ব। |
١٢- من أسس المذهب الفقهى اولاً؟ عرف به-
[সর্বপ্রথম কে মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেন? তাঁর পরিচয় দাও।]
১. প্রথম মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা:
ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক ফিকহি মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেন ইমামে আযম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত আল-কুফী (রহ.) (৮০–১৫০ হি. / ৬৯৯–৭৬৭ খ্রি.)।
২. তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
- তিনি কুফায় এক সম্ভ্রান্ত পারসিক বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কয়েকজন সাহাবীকে (যেমন হযরত আনাস ইবনে মালিক রা.) প্রত্যক্ষ করেছেন, ফলে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘তাবেয়ী’ ছিলেন।
- তিনি রেশম কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন এবং চরম সততা ও আমানতদারীর জন্য খ্যাত ছিলেন।
- তিনি তাঁর উস্তাদ হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমানের নিকট ১৮ বছর ফিকহ শাস্ত্রের নিবিড় পাঠ গ্রহণ করেন।
- তিনি খলিফা মানসুরের অন্যায় বিচারিক পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে কারাগারে বিষপ্রয়োগে শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম শাফেয়ী তাঁর সম্পর্কে ঘোষণা করেন: «النَّاسُ فِي الْفِقْهِ عِيَالٌ عَلَى أَبِي حَنِيفَةَ» (ফিকহের ক্ষেত্রে সমস্ত মানুষ আবু হানিফার মুখাপেক্ষী সন্তানতুল্য)।
١٣- ما رأيك في خروج النساء إلى المساجد؟ بين مدللاً-
[সালাতের উদ্দেশ্যে নারীদের মসজিদে গমন সম্পর্কে তোমার মত কী? দলিলসহ বর্ণনা কর।]
১. শরিয়তের মূল বিধান ও মাযহাবসমূহের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামের প্রারম্ভে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে কিছু শর্তসাপেক্ষে নারীদের মসজিদে গমনের অনুমতি ছিল। তবে পরবর্তীতে সামাজিক অবক্ষয় ও ফিতনার আশঙ্কায় ফুকাহায়ে কিরামের রায় নিম্নরূপ:
- উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.)-এর ঐতিহাসিক ঘোষণা: সহিহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল ﷺ-এর ওফাতের পর নারীদের অবস্থার পরিবর্তন দেখে আয়িশা (রা.) বলেন—
«لَوْ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ رَأَى مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ الْمَسْجِدَ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ»
“আজকাল নারীরা সাজসজ্জায় যা শুরু করেছে তা যদি রাসুল ﷺ দেখতেন, তবে অবশ্যই বনী ইসরাইলের নারীদের মতো এদের মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ করতেন।” - হানাফী মাযহাবের ফতোয়া: বর্তমান যুগে ফিতনা ও নৈতিক স্খলনের ভয় প্রবল হওয়ায় যুবতী নারীদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও জুমার উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়া মাকরূহে তাহরীমী।
- ঘরে সালাত আদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব: রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বয়ং নারীদের ঘরের সালাতকে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ ঘোষণা করেছেন: «صَلَاةُ الْمَرْأَةِ فِي بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي حُجْرَتِهَا، وَصَلَاتُهَا فِي مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي بَيْتِهَا» (নারীদের ভেতরের নির্জন প্রকোষ্ঠের সালাত বাইরের সালাতের চেয়ে অধিক সওয়াবের)। [আবু দাউদ]।
١٤- كيف تصلى صلوة الوتر؟ أوضح على وفق المذهب الحنفى-
[বিতর নামাজ কীভাবে আদায় করতে হয়? হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এর ব্যাখ্যা দাও।]
১. হানাফী মাযহাব মতে বিতরের মর্যাদা ও রাকাআত সংখ্যা:
হানাফী মাযহাব মতে বিতরের সালাত ‘ওয়াজিব’ এবং তা মাগরিবের সালাতের ন্যায় এক সালামে তিন রাকাআত আদায় করতে হয়।
২. আদায়ের পূর্ণ নিয়ম:
- প্রথম দুই রাকাআত সাধারণ সালাতের মতো সুরা ফাতিহার সাথে কেরাত মিলিয়ে রুকু-সিজদা করে প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠের পর না দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সরাসরি তৃতীয় রাকাআতে দাঁড়াবে।
- তৃতীয় রাকাআতে সুরা ফাতিহা ও অন্য কোনো সুরা পাঠ সম্পন্ন করার পর রুকুতে না গিয়ে তাকবীরে তাহরীমার ন্যায় দুই হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে পুনরায় হাত বাঁধবে।
- অতঃপর নিঃশব্দে ‘দোয়ায়ে কুনূত’ (اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ…) পাঠ করবে।
- দোয়া শেষে তাকবীর বলে রুকু ও সিজদা সম্পন্ন করে শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ, দরূদ ও দোয়ায়ে মাসূরা পড়ে উভয় দিকে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করবে।
١٥- هل تجب الزكوة فى الزروع والثمار فى بلادنا هذه؟ وما نصابها؟
[আমাদের দেশে ফসল ও শস্যে যাকাত (উশর) ওয়াজিব হবে কিনা এবং তার নিসাব কী?]
১. বাংলাদেশের কৃষিজমিতে উশর বা ফসলের যাকাত ওয়াজিব হওয়া:
হ্যাঁ, সর্বসম্মতভাবে ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—«وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ» (ফসল কাটার দিনে তার হক আদায় করো)। হাদিসে বলা হয়েছে: «فِيمَا سَقَتِ السَّمَاءُ الْعُشْرُ» (যে জমিন বৃষ্টির পানিতে সিক্ত হয় তাতে দশভাগের একভাগ অর্থাৎ ১০% উশর)।
২. সেচপদ্ধতি ও পরিমাণের বিধান:
- বৃষ্টির পানি বা প্রাকৃতিক নদী-নালার পানিতে উৎপন্ন ফসলে ১০% (দশভাগের একভাগ) উশর দিতে হবে।
- ব্যয়বহুল সেচযন্ত্র বা কেনা পানিতে চাষাবাদ করা ফসলে ৫% (বিশভাগের একভাগ) নিসফে উশর দিতে হবে।
৩. উশরের নিসাব:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে: মাটি থেকে উৎপন্ন যেকোনো খাদ্যশস্যে অল্প হোক বা বেশি হোক কোনো নেসাব নেই; যেকোনো পরিমাণের ওপরই উশর ওয়াজিব।
- সাহেবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ) এবং জমহুর ফুকাহায়ের মতে: ৫ ওয়াসাক্ব (প্রায় ২০ মণ বা ৯১০ কেজি) পরিমাণ উদ্বৃত্ত ফসল উৎপাদিত হলেই কেবল উশর ওয়াজিব হবে। বর্তমান বাংলাদেশে অধিকাংশ ফতোয়ায় এই মত অনুসরণ করা হয়।
١٦- أذكر شروط الحج عن الغير-
[অন্যের পক্ষ থেকে হজ (হজ্জে বদল) করার শর্ত উল্লেখ কর।]
ইসলামী শরিয়তে কোনো অক্ষম ব্যক্তির পক্ষ থেকে অন্য কাউকে দিয়ে হজ্জে বদল করানোর জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলি বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য:
- মূল ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ হওয়া: যার পক্ষ থেকে হজ্জে বদল করানো হচ্ছে, তার ওপর জীবদ্দশায় হজ ফরজ হয়েছিল।
- স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা বা মৃত্যু: মূল ব্যক্তি মারা গিয়েছেন অথবা এমন মারাত্মক বার্ধক্য বা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত যে নিজে মক্কায় যাওয়ার সামর্থ্য চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন। ক্ষণস্থায়ী বা সাময়িক অসুস্থতায় বদলি হজ জায়েজ নয়।
- আদেশ বা ওসিয়ত থাকা: মূল ব্যক্তি নিজে হজ্জে বদলের নির্দেশ বা ওসিয়ত করেছেন (অথবা ওয়ারিসগণ তাঁর পক্ষ থেকে দায়িত্ব নিচ্ছেন)।
- প্রতিনিধি মুসলমান ও বিবেকবান হওয়া: যিনি হজ্জে বদল পালন করবেন তাকে সুস্থ মস্তিষ্কের ধার্মিক মুসলমান হতে হবে। ইতিপূর্বে নিজের ফরজ হজ আদায় করেছেন এমন ব্যক্তিকে দিয়ে করানো উত্তম।
- সম্পূর্ণ ব্যয়ভার মূল ব্যক্তির সম্পদ থেকে হওয়া: হজ্জে বদলের খরচ মূল ব্যক্তির রেখে যাওয়া মাল বা প্রেরকের তহবিল থেকে মেটাতে হবে; প্রতিনিধি কোনো পারিশ্রমিক বা লাভ গ্রহণের চুক্তি করতে পারবেন না।
- উদ্দেশ্য ও ইহরাম নির্দিষ্ট করা: মিকাত থেকে ইহরাম বাধার সময় যার পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে স্পষ্ট ভাষায় তাঁর পক্ষ থেকে হজের নিয়ত করতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের المذاهب الفقهية (আল-মাযাহিব আল-ফিকহিয়্যাহ) বিষয়ের কোড ও প্রশ্নের বিন্যাস কী?
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কারিকুলামে ফাজিল ৪র্থ বর্ষের المذاهب الفقهية বিষয়ের কোড হলো ২০১৮০৫ (পরীক্ষা কোড ২০৮, প্রশ্নপত্র কোড ১১৫)। পূর্ণমান ৮০; গ্রুপ ‘ক’-তে ১৫ নম্বরের ৪টি বিশদ প্রশ্ন (৬০ নম্বর) এবং গ্রুপ ‘খ’-তে ৫ নম্বরের ৪টি সংক্ষিপ্ত ফিকহি প্রশ্ন (২০ নম্বর) উত্তর দিতে হয়।
২. ইমামের পেছনে মুক্তাদির সূরা ফাতিহা পাঠের ব্যাপারে হানাফী মাযহাবের দলিল কী?
হানাফী মাযহাব মতে সূরা আরাফের ২০৪ নম্বর আয়াত (“কুরআন পাঠের সময় মনোযোগ দিয়ে শোনো ও চুপ থাকো”) এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস (“যার ইমাম রয়েছে, ইমামের কিরাত পাঠই তার কিরাত হিসেবে যথেষ্ট”) অনুযায়ী মুক্তাদি জেহরি বা সিররি কোনো সালাতেই কিরাত পাঠ করবে না।
৩. ‘তাকলীদে শাখছী’ বলতে কী বোঝায় এবং এর হুকুম কী?
সাধারণ মুসলিমদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট একজন মুজতাহিদ ইমামের (যেমন আবু হানিফা, শাফেয়ী ইত্যাদি) সমস্ত ফিকহি সিদ্ধান্তের অবিচল অনুসরণ করাকে তাকলীদে শাখছী বলে। দ্বীনের বিধিবিধানে স্বৈরাচারিতা ও প্রবৃত্তিপূজা থেকে বাঁচতে সাধারণের জন্য এটি ওয়াজিব।
৪. তারাবির সালাত ২০ রাকাত হওয়ার ঐতিহাসিক প্রমাণ কী?
দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে সাহাবায়ে কিরাম জামাতে ২০ রাকাত তারাবি আদায় করেছিলেন এবং পরবর্তী খলিফাদের যুগেও তা বহাল ছিল। এর ওপর সাহাবায়ে কিরামের ঐতিহাসিক ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৫. হানাফী মাযহাব মতে বিতর নামাজের পদ্ধতি কী?
হানাফী মাযহাব মতে বিতর ওয়াজিব এবং তা মাগরিবের মতো এক সালামে তিন রাকাত পড়তে হয়। তৃতীয় রাকাআতে কেরাত শেষে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে তাকবীর দিয়ে পুনরায় হাত বেঁধে নিঃশব্দে দোয়ায়ে কুনূত পাঠ করতে হয়।
৬. অন্যের পক্ষ থেকে হজ্জে বদল করানোর প্রধান শর্তাবলি কী কী?
মূল ব্যক্তির ওপর হজ ইতিপূর্বে ফরজ হতে হবে, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন অথবা চিরতরে বার্ধক্য বা দূরারোগ্য ব্যাধিতে শারীরিক সফরক্ষমতা হারিয়েছেন এবং হজের সমস্ত খরচ মূল ব্যক্তির সম্পদ থেকে বহন করতে হবে।