জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তাসাওউফ (At-Tasawwuf) – 201804, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৮৬ মিনিট পড়ার সময়
১৮ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২৩
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাসাওউফ (التصوف – সুফিবাদ ও আত্মশুদ্ধি)
বিষয় কোড: 201804 | প্রশ্নপত্র কোড: 114
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০২৩ সালের ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম মৌলিক আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক শাস্ত্রীয় কোর্স হলো “আত-তাসাওউফ” (التصوف – বিষয় কোড: 201804)। ইসলামের বাহ্যিক বিধিবিধানের ন্যায় অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা, আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নফস), আল্লাহর মারিফাত এবং ‘ইহসান’-এর স্তরে উন্নীত হওয়ার নিয়মতান্ত্রিক বিজ্ঞানই হলো ইলমুত তাসাওউফ। ২০২৩ সালের এই প্রশ্নপত্রটিতে ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরী (রহ.)-এর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ’-এর আলোকে সুফিদের আকিদা, আধ্যাত্মিক পরিভাষা (ওয়াজদ, তাওয়াজুদ, ওজুদ, গায়বাহ, হুজুর, ফানা, বাকা), সৎগুণাবলি (ইখলাস, তাওয়াদু, খুশু, ক্বানাআত, ওয়ারা, ইহসান), কাদেরিয়া ও নকশবন্দী তরিকা, বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর অবদান এবং তাসাওউফের ওপর আরোপিত সন্দেহের প্রামাণিক নিরসনসহ মোট ১৬টি গভীর প্রশ্ন সন্নিবেশিত হয়েছে। নিচে গ্রুপ ‘ক’ ও গ্রুপ ‘খ’-এর অন্তর্ভুক্ত সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও অ্যাকাডেমিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো।

একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন

গ্রুপ / বিভাগ মোট প্রশ্ন উত্তর দেওয়ার নিয়ম প্রতি প্রশ্নের মান মোট নম্বর
مجموعة (أ) – গ্রুপ ‘ক’ (বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি) ৮টি যেকোনো ৪টি ১৫ ৬০
مجموعة (ب) – গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি) ৮টি যেকোনো ৪টি ২০
সর্বমোট ১৬টি ৮টি ৮০

مجموعة (أ) : গ্রুপ ‘ক’ (বিশদ রচনামূলক প্রশ্নাবলি)

[নির্দেশনা: এই বিভাগ থেকে যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণমান ১৫। নিচে পরীক্ষার্থীদের সামগ্রিক প্রস্তুতি ও গভীর জ্ঞানার্জনের সুবিধার্থে ৮টি প্রশ্নের সবগুলোরই প্রামাণিক উত্তর প্রদান করা হলো।]

١- ما التصوف؟ وما موضوعه وغرضه ومشروعيته؟ بين مفصلا-

[التصوف কাকে বলে? তাসাওউফের আলোচ্য বিষয়, উদ্দেশ্য ও বৈধতা কতটুকু? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

১. তাসাওউফের সংজ্ঞা (مفهوم التصوف):

আভিধানিক ব্যুৎপত্তি: ‘তাসাওউফ’ (التَّصَوُّفُ) শব্দটির মূল ধাতু নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক ও পণ্ডিতদের মাঝে চারটি প্রধান মত রয়েছে:

  1. সূফ (الصُّوف): এর অর্থ পশম। প্রাচীনকালে যুহদ ও দুনিয়াবিমুখতার প্রতীক হিসেবে সুফিগণ মোটা পশমি পোশাক পরিধান করতেন বিধায় তাঁদের সূফী এবং এই পথকে তাসাওউফ বলা হয়। এটিই অধিকাংশ ভাষাবিদের নিকট সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত।
  2. সাফা (الصَّفَاء): এর অর্থ হৃদয়ের শুভ্রতা ও কলুষমুক্ত পবিত্রতা। যে ব্যক্তি নিজ আত্মাকে পার্থিব পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর ভালোবাসায় খাঁটি করেছে, সে-ই সূফী।
  3. আহলে সুফফা (أهل الصُّفَّة): মসজিদে নববীর বারান্দায় অবস্থানকারী নিবেদিতপ্রাণ জ্ঞানপিপাসু ও দুনিয়াবিমুখ সাহাবীগণের পবিত্র জীবনপদ্ধতির অনুসারী হওয়ার কারণে এ নাম হয়েছে।
  4. সাফ (الصَّفّ): আল্লাহর দরবারে ও সন্তুষ্টি অর্জনে যারা প্রথম সারিতে (الصف الأول) অবস্থান করে।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: প্রখ্যাত আউলিয়া ও ফকীহগণ তাসাওউফকে চমৎকারভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:

  • সায়্যিদুত তায়েফা ইমাম জুনায়েদ আল-বাগদাদী (রহ.) বলেন:

    «التَّصَوُّفُ أَنْ يُمِيتَكَ الْحَقُّ عَنْ نَفْسِكَ وَيُحْيِيَكَ بِهِ»
    অর্থ: “তাসাওউফ হলো এই যে, মহান আল্লাহ তোমার নফস ও পাশবিক প্রবৃত্তিকে মৃত্যু দান করবেন এবং তাঁর সান্নিধ্যে তোমাকে এক নব আত্মিক জীবন দান করবেন।”

  • ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরী (রহ.) বলেন: তাসাওউফ হলো শরীয়তের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিধানের পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে আত্মাকে অসৎ গুণাবলী (রিয়া, অহংকার, হিংসা) থেকে মুক্ত করে সৎ গুণাবলীতে (ইখলাস, তাওয়াক্কুল, সবর) সুশোভিত করা।
  • সংক্ষেপে: কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে নফসের পরিশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নফস) অর্জন করে সর্বদা অন্তরে আল্লাহর সান্নিধ্য ও প্রত্যক্ষ উপস্থিতির অনুভূতি (ইহসান) জাগ্রত রাখার শাস্ত্রই হলো ইলমুত তাসাওউফ।

২. তাসাওউফের আলোচ্য বিষয় (موضوع علم التصوف):

ইলমুত তাসাওউফের মূল আলোচ্য বিষয় হলো “মানুষের অন্তর ও আত্মা” (النفس والقلب) এবং “আল্লাহর পবিত্র সত্তা ও তাঁর সন্তুষ্টি” (ذات الله تعالى ورضوانه)। অর্থাৎ মানবাত্মাকে কীভাবে কুপ্রবৃত্তি থেকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের যোগ্য করা যায়, তা-ই এর প্রধান প্রতিপাদ্য।

৩. তাসাওউফের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য (غرض التصوف وغايته):

  • মারিফাতুল্লাহ ও রেযামন্দি লাভ: আল্লাহ তাআলার খাঁটি পরিচিতি ও তাঁর একনিষ্ঠ সন্তুষ্টি অর্জন করা।
  • তাযকিয়াতুন নফস: অন্তরের মারাত্মক আত্মিক রোগসমূহ—যেমন অহংকার (কিবর), পরশ্রীকাতরতা (হাসাদ), লোকদেখানো মনোভাব (রিয়া), কৃপণতা ও লোভ দূর করা।
  • ইহসানের স্তরে উপনীত হওয়া: হাদিসে জিবরীলে বর্ণিত «أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ» (তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ)-এর চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছানো।
  • উভয় জাহানের মুক্তি: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: ﴿يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ – إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ﴾ অর্থাৎ “যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না, কেবল সে ব্যক্তি ব্যতীত যে আল্লাহর কাছে একটি সুস্থ ও পবিত্র অন্তর নিয়ে উপস্থিত হবে।” (সূরা আশ-শুআরা: ৮৮-৮৯)।

৪. তাসাওউফের শরয়ী বৈধতা ও ভিত্তি (مشروعيته من الكتاب والسنة):

তাসাওউফ ইসলামবহির্ভূত কোনো বিদআত নয়; বরং এর মূল ভিত্তি স্বয়ং কুরআন ও সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত:

  1. কুরআনুল কারীমের দলীল:

    আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ﴿قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا – وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا﴾ অর্থাৎ “নিশ্চয় সে-ই সফলকাম হয়েছে যে নিজ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে, আর সে ব্যর্থ হয়েছে যে নিজেকে কলুষিত করেছে।” (সূরা আশ-শামস: ৯-১০)। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব ছিল উম্মাহর আত্মশুদ্ধি: ﴿وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ﴾ (সূরা আল-জুমুআ: ২)।

  2. পবিত্র হাদিসের দলীল:

    সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: «مَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ، وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ» অর্থাৎ “বান্দা আমার ফরয বিধান পালনের চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো বস্তু দিয়ে আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না। আর বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে ক্রমাগত আমার নিকটবর্তী হতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।” (সহীহ বুখারী: ৬৫০২)।

  3. চার ইমাম ও সালাফের ঐকমত্য:

    ইমাম মালেক (রহ.) এক ঐতিহাসিক মূলনীতি ঘোষণা করেছেন:
    «مَنْ تَفَقَّهَ وَلَمْ يَتَصَوَّفْ فَقَدْ تَفَسَّقَ، وَمَنْ تَصَوَّفَ وَلَمْ يَتَفَقَّهْ فَقَدْ تَزَنْدَقَ، وَمَنْ جَمَعَ بَيْنَهُمَا فَقَدْ تَحَقَّقَ»
    অর্থ: “যে ব্যক্তি ফিকহ শিক্ষা করল অথচ তাসাওউফ অর্জন করল না সে ফাসিক হয়ে গেল; আর যে ব্যক্তি তাসাওউফ গ্রহণ করল কিন্তু ফিকহ অর্জন করল না সে জিন্দিক (ধর্মহীন) হলো; আর যে ব্যক্তি উভয়টির সমন্বয় করল সে-ই প্রকৃত সত্যে উপনীত হলো।”


٢- بين تاريخ نشأة علم التصوف وتطوره مفصلا-

[ইলমুত তাসাওউফ এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা:

ইলমুত তাসাওউফ কোনো আকস্মিক আবির্ভূত মতবাদ নয়; বরং নবুওয়াতের নূর থেকে উৎসারিত একটি ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান। ফিকহ, উসুল ও হাদিস শাস্ত্র যেমন প্রাথমিক যুগে বিদ্যমান বাস্তবতা সত্ত্বেও পরবর্তীতে পরিভাষা ও নিয়মতান্ত্রিক সংকলনের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করেছিল, তাসাওউফও তেমনি উম্মাহর আত্মিক প্রয়োজনের তাগিদে ধাপে ধাপে বিকশিত হয়েছে।

ইলমুত তাসাওউফের ঐতিহাসিক পর্যায়ক্রম ও বিকাশ (تاريخ نشأته وتطوره):

  1. প্রথম পর্যায়: নবুওয়াত ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ (বাস্তব অনুশীলন ও যুহদের যুগ):

    রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সমগ্র জীবনই ছিল তাসাওউফের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। হেরাগুহায় দীর্ঘ নির্জন ধ্যান, রোজা রাখা, রাতের পর রাত দাঁড়িয়ে ক্রন্দনরত সালাত এবং দুনিয়ার ভোগবিলাস বর্জন ছিল তাঁর আদর্শ। সাহাবায়ে কেরাম (বিশেষ করে খোলাফায়ে রাশেদীন, আবু যর গিফারী, সালমান ফারসী এবং আহলে সুফফার ৭০ জন নিবেদিতপ্রাণ সাহাবী) ছিলেন তাসাওউফের মূর্ত প্রতীক। এ যুগে কোনো আলাদা শাস্ত্রীয় নামের প্রয়োজন ছিল না; কারণ সকলের আমল ও অন্তরে সরাসরি নবুওয়াতের পবিত্র নূর বিরাজমান ছিল।

  2. দ্বিতীয় পর্যায়: তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের যুগ (যুহদ ও নির্জনতার যুগ):

    উমাইয়া যুগে যখন ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি পায় এবং মুসলিম সমাজে রোমান ও পারসিক ধনসম্পদ ও বিলাসী জীবনপ্রবাহ প্রবেশ করে, তখন সালাফে সালেহীন পার্থিব মোহ থেকে মানুষের হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফেরাতে এক আধ্যাত্মিক জাগরণ সৃষ্টি করেন। তখন একে ‘যুহদ’ (الزهد) বলা হতো। এ যুগের প্রবাদপ্রতিম সাধক ছিলেন হযরত হাসান আল-বসরী (রহ.), ইব্রাহিম ইবনে আদহাম, রাবেয়া বসরী, উয়াইস আল-কারনী এবং ফুযাইল ইবনে আইয়াদ (রহ.)।

  3. তৃতীয় পর্যায়: পারিভাষিক রূপ ও স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে সংকলন (৩য় ও ৪র্থ হিজরি শতক):

    এ যুগে বাগদাদ ও নিশাপুরে তাসাওউফ একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র ও পরিভাষাগত রূপ ধারণ করে। মুহাদ্দিস ও ফকীহ সূফীগণ একে একটি সুশৃঙ্খল বিজ্ঞান হিসেবে বিন্যস্ত করেন। এ যুগের প্রধান রূপকার ছিলেন ইমাম জুনায়েদ আল-বাগদাদী, মারুফ কারখী, সিররি সাকাতী, হারিস আল-মুহাসিবী প্রমুখ। ইমাম আবু নসর সাররাজ প্রণয়ন করেন ‘কিতাবুল লুমা’ (كتاب اللمع), আবু বকর আল-কালাবাযী লেখেন ‘আত-তাআররুফ’ (التعرف لمذهب أهل التصوف) এবং আবু তালিব মক্কী লেখেন ‘কূত আল-কুলূব’ (قوت القلوب)

  4. চতুর্থ পর্যায়: দর্শন ও শাস্ত্রীয় সমন্বয় (৫ম হিজরি শতক):

    এ যুগে ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরী (রহ.) (৩৭৬-৪৬৫ হি.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ’ (الرسالة القشيرية) রচনা করে প্রমাণ করেন যে খাঁটি সুফিদের আকিদা ও আমল শতভাগ কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী। অতঃপর হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) (৪৫০-৫০৫ হি.) তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ (إحياء علوم الدين)-এর মাধ্যমে ফিকহ ও তাসাওউফের এমন এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন রচনা করেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত তাসাওউফকে ইসলামী শাস্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করে।

  5. পঞ্চম পর্যায়: প্রাতিষ্ঠানিক তরিকা ও বিশ্বব্যাপী বিস্তার (৬ষ্ঠ শতক থেকে বর্তমান):

    এ যুগে সুফিবাদ খানকাহ ও নির্দিষ্ট তরীকাভিত্তিক সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (কাদেরিয়া), খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতী (চিশতিয়া), শায়খ শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দী (সোহরাওয়ার্দিয়া) এবং খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (নকশবন্দী তরিকা)-এর মাধ্যমে সুফিবাদ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।


٣- اكتب معتقدات الصوفية فى الله سبحانه وتعالى فى ضوء الرسالة القشيرية-

[আর-রিসালাহ আল-কুশাইরিয়্যার আলোকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্পর্কে সুফিদের আকিদা লেখ।]

ভূমিকা:

ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরী (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আর-রিসালাহ আল-কুশাইরিয়্যাহ’-এর শুরুতেই ‘আকাইদুস সুফিয়্যাহ’ (عقائد الصوفية) বা সুফিদের আকিদা বিষয়ক স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন যে, প্রকৃত সুফি সাধকগণ হলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সবচেয়ে খাঁটি তাওহীদপন্থী দল। আল্লাহ তাআলার জাত ও সিফাত সম্পর্কে তাঁদের আকিদা কোনো প্রকার অপব্যাখ্যা, সাদৃশ্যকরণ কিংবা বিভ্রান্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

আর-রিসালাহ আল-কুশাইরিয়্যার আলোকে আল্লাহ সম্পর্কে সুফিদের মৌলিক আকিদাসমূহ:

  1. একত্ববাদ ও অমুখাপেক্ষিতা (التوحيد المطلق والتنزيه):

    সুফিগণের অবিচল বিশ্বাস হলো—আল্লাহ তাআলা অনাদি (قديم), অনন্ত (أبدي), এক ও একক (واحد أحد)। তাঁর কোনো অংশীদার, সমকক্ষ, বিপরীত বা সদৃশ নেই। তিনি সন্তান গ্রহণ করেননি এবং কারও সন্তান নন। কুরআনুল কারীমের অমোঘ ঘোষণা: ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾ অর্থাৎ “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শূরা: ১১)।

  2. শারীরিক কাঠামো, স্থান ও কালের সীমাবদ্ধতা থেকে পবিত্রতা:

    ইমাম কুশাইরী উল্লেখ করেন, সুফিদের সর্বসম্মত আকিদা হলো আল্লাহ তাআলা কোনো দেহ (جسم), জড়বস্তু (جوهر) কিংবা কোনো গুণ (عرض) নন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নন; বরং তিনি স্থান ও কাল সৃষ্টি করার পূর্বে যেমন ছিলেন, এখনও ঠিক তেমনই আছেন। দিক (جهة), দূরত্ব বা স্থানিক আবদ্ধতা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য, যা মহান স্রষ্টার জন্য অসম্ভব ও বাতিল।

  3. আল্লাহর অনাদি সিফাত বা গুণাবলীতে বিশ্বাস:

    আল্লাহ তাআলা এমন সকল গুণে গুণান্বিত যা স্বয়ং তিনি ও তাঁর রাসুল বর্ণনা করেছেন। তাঁর কুদরত (শক্তি), ইলম (জ্ঞান), হায়াত (জীবন), ইরাদাহ (ইচ্ছা), সামা (শ্রবণ), বাসার (দর্শন) এবং কালাম (কথা) অনাদি ও অনন্ত। তাঁর কোনো গুণ সৃষ্টির মতো নয়; তিনি কোনো রূপান্তর, হ্রাস-বৃদ্ধি বা অপূর্ণতা থেকে চিরপবিত্র।

  4. হুলূল (حلول) ও ইত্তিহাদ (اتحاد) থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও মুক্ত:

    কুশাইরী জোর দিয়ে বলেন, খাঁটি সুফিগণ কস্মিনকালেও সৃষ্টিতে স্রষ্টার প্রবেশ (হুলূল) কিংবা স্রষ্টা ও সৃষ্টির একাকার হয়ে যাওয়া (ইত্তিহাদ)-এ বিশ্বাস করেন না। যারা এসব ভ্রান্ত আকিদা সুফিদের ওপর চাপায় তারা স্পষ্ট মিথ্যাবাদী। সুফিদের নিকট স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সত্তাগত প্রভেদ চিরন্তন ও অলঙ্ঘনীয়।

  5. তাকদীর ও কর্মের সৃষ্টিতে বিশ্বাস:

    সুফিদের আকিদা হলো মানুষের ভালো-মন্দ সকল কর্মের একক স্রষ্টা হলেন মহান আল্লাহ। বান্দা কেবল কর্মের উপার্জনকারী (কাসিব)। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়ে না।

সুফি ইমামগণের ঐতিহাসিক প্রামাণিক উক্তিসমূহ:

  • সায়্যিদুত তায়েফা ইমাম জুনায়েদ আল-বাগদাদী (রহ.)-কে তাওহীদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:

    «التَّوْحِيدُ إِفْرَادُ الْقَدِيمِ عَنِ الْحَدَثِ»
    অর্থ: “তাওহীদ হলো অনাদি-চিরন্তন স্রষ্টাকে নশ্বর সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও একক হিসেবে বিশ্বাস করা।”

  • ইমাম যুন্নুন আল-মিসরী ও ইমাম শিবলী (রহ.) বলেন:

    «كُلُّ مَا تَخَيَّلْتَهُ بِبَالِكَ، فَاللهُ بِخِلَافِ ذَلِكَ»
    অর্থ: “তুমি তোমার অন্তরে ও কল্পনায় যা কিছু কল্পনা করবে, আল্লাহ তাআলা তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও পবিত্র।”


٤- عرف الوجد والتواجد والوجود والغيبة والحضور والفناء والبقاء فى ضوء الرسالة القشيرية :

[আল-রিসালাহ আল-কুশাইরিয়্যার আলোকে নিম্নোক্ত পরিভাষাগুলোর সংজ্ঞা দাও: الوجد ، التواجد ، الوجود ، الغيبة ، الحضور ، الفناء ، البقاء-]

ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরী (রহ.) ‘আর-রিসালাহ আল-কুশাইরিয়্যাহ’ গ্রন্থে সুফি সাধনার গভীর স্তর ও অনুভূতিসমূহকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। উক্ত সাতটি পরিভাষার বিশদ পরিচয় নিম্নরূপ:

  1. التواجد (আত-তাওয়াজুদ):

    সাধকের নিজ ইচ্ছা ও কৃত্রিম চেষ্টার মাধ্যমে অন্তরে আধ্যাত্মিক ভাবাবেগ, অনুরাগ ও কান্না সৃষ্টির প্রাথমিক প্রয়াসকে ‘তাওয়াজুদ’ বলা হয়। এটি রিয়া বা লোকদেখানোর জন্য নয়; বরং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আন্তরিক বাসনা থেকে উদ্ভূত। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «ابْكُوا، فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكَوْا» অর্থাৎ “তোমরা আল্লাহর ভয়ে কাঁদো; যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান কর।” (ইবনে মাজাহ)।

  2. الوجد (আল-ওয়াজদ):

    কোনো কৃত্রিম চেষ্টা বা নিজের ইচ্ছাশক্তি ছাড়াই আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার অন্তরে হঠাৎ যে আধ্যাত্মিক আলোর চমক, প্রেম ও অনুরাগের তীব্র আলোড়ন নেমে আসে, তাকে ‘ওয়াজদ’ বলে। এটি সাধককে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণহীন ভাবাবেগে আপ্লুত করে তোলে। সুফিদের মূলনীতি: «التَّوَاجُدُ بِدَايَةٌ، وَالْوَجْدُ وَاسِطَةٌ» (তাওয়াজুদ হলো সূচনা আর ওয়াজদ হলো মধ্যবর্তী পর্যায়)।

  3. الوجود (আল-ওজুদ):

    এটি ওয়াজদের চেয়েও উচ্চতর স্তর। যখন অন্তরে আল্লাহর মারিফাত ও প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে ভাবাবেগের চাঞ্চল্য ও অস্থিরতা দূর হয়ে এক গভীর প্রশান্তি নেমে আসে, তখন তাকে ‘ওজুদ’ বলা হয়। ইমাম জুনায়েদ (রহ.) বলেন: “ওয়াজদের সমাপ্তিতে ওজুদের সূচনা।”

  4. الغيبة (আল-গায়বাহ):

    আল্লাহর স্মরণ, মহব্বত বা কোনো আধ্যাত্মিক চিন্তায় এমনভাবে মগ্ন হওয়া যাতে বান্দা নিজের পারিপার্শ্বিক জগৎ, সৃষ্টি এবং এমনকি নিজের অস্তিত্বের খবর সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন ও অনুপস্থিত হয়ে পড়ে। যেমন হযরত আলী (রা.)-এর শরীর থেকে তীর বের করার সময় তিনি সালাতে এতই নিমগ্ন ছিলেন যে ব্যথার কোনো অনুভূতিই পাননি।

  5. الحضور (আল-হুজুর):

    গায়বাহর বিপরীত ও উচ্চতর স্তর। অন্তরে সর্বদা মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত থাকার জীবন্ত অনুভূতি জাগ্রত থাকা। বান্দা যখন স্রষ্টার উপস্থিতিতে হৃদয়কে সজাগ রাখে এবং সৃষ্টির কোনো কিছুই তাকে আল্লাহর ধ্যান থেকে গাফেল করতে পারে না, তাকে ‘হুজুর’ বলে।

  6. الفناء (আল-ফানা):

    সুফি পরিভাষায় ফানা মানে অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজের নফস, পাশবিক প্রবৃত্তি, অহংকার এবং সৃষ্টির প্রতি মোহকে আল্লাহর প্রেমে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেওয়া। কুশাইরীর মতে: “যে ব্যক্তি নিজের মন্দ স্বভাব ও দোষত্রুটি বিলুপ্ত করেছে, সে ফানা অর্জন করেছে।”

  7. البقاء (আল-বাকা):

    ফানার চূড়ান্ত পরিণতি হলো বাকা। নফসের দাসত্ব বিলুপ্ত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নির্দেশনার অধীনে নিজের অস্তিত্বকে পুনরুজ্জীবিত করা। এমন সাধক সৃষ্টিজগতে অবস্থান করেন কিন্তু সর্বদা স্রষ্টার আদেশে মানুষের হিদায়াত ও শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণে জীবন পরিচালনা করেন।


٥- أوضح مرام الفضائل الآتية : الإخلاص والتواضع والخشوع والقناعة والورع والإحسان :

[নিম্নোক্ত সৎগুণাবলির মর্মার্থ স্পষ্ট কর: الإخلاص ، التواضع ، الخشوع ، القناعة ، الورع والإحسان-]

ইসলামী নৈতিকতা ও তাসাওউফের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আত্মিক সৎগুণাবলীতে ভূষিত করা। উক্ত ছয়টি মহৎ সদ্গুণের তাৎপর্য নিম্নরূপ:

  1. الإخلاص (আল-ইখলাস / একনিষ্ঠতা):

    সকল ইবাদত ও আমলে কেবল এবং কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা। লোকদেখানো মনোভাব (রিয়া), সুনাম বা প্রশংসার সামান্যতম প্রত্যাশামুক্ত থাকাই হলো ইখলাস। আল-কুশাইরী উল্লেখ করেন: “ইখলাস হলো এমন এক গোপন আমানত যা কোনো ফেরেশতা জানতে পারে না যাতে লিখবে, কোনো শয়তান জানতে পারে না যাতে নষ্ট করবে।” আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ﴾ (সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৫)।

  2. التواضع (আত-তাওয়াদু / বিনয় ও নম্রতা):

    নিজেকে সৃষ্টির কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে না করা এবং সত্য যার মুখ থেকেই প্রকাশ পাক না কেন, তা বিনম্রচিত্তে গ্রহণ করা। অহংকারের বিপরীত হলো তাওয়াদু। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ অবশ্যই তার মর্যাদা সমুন্নত করেন।” (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮)।

  3. الخشوع (আল-খুশু / হৃদয়ের ভয়মিশ্রিত একাগ্রতা):

    অন্তরে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও ভয়ের প্রভাবে এমন এক বিনম্র ভাব সৃষ্টি হওয়া যা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে স্থিরতা, প্রশান্তি ও একনিষ্ঠতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিশেষ করে সালাতে দৃষ্টি নত রাখা এবং এদিক-ওদিক না তাকানো খুশুর লক্ষণ। আল্লাহ বলেন: ﴿قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ – الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ﴾ (সূরা আল-মুমিনূন: ১-২)।

  4. القناعة (আল-ক্বানাআত / অল্পে তুষ্টি):

    আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য যে পরিমাণ রিযিক নির্ধারণ করেছেন, লোভ-লালসা পরিহার করে তাতে সন্তুষ্ট থাকা এবং অন্যের সম্পদের প্রতি পরশ্রীকাতর দৃষ্টি না দেওয়া। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ، وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ» অর্থাৎ “প্রচুর ধনসম্পদ থাকলেই ধনী হওয়া যায় না; বরং প্রকৃত ধনী হলো যার অন্তরের প্রাচুর্য (ক্বানাআত) আছে।” (সহীহ বুখারী: ৬৪৪৬)।

  5. الورع (আল-ওয়ারা / পরহেজগারি):

    প্রকাশ্য হারাম থেকে বেঁচে থাকার পাশাপাশি যেসকল মুবাহ বা বৈধ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ থাকে, আখেরাতের ভয়ে তা-ও বর্জন করা। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ» অর্থাৎ “যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা ছেড়ে দিয়ে যা সন্দেহের ঊর্ধ্বে তা গ্রহণ কর।” (তিরমিযী: ২৫১৮)। এটি মোত্তাকীদের সর্বোচ্চ স্তর।

  6. الإحسان (আল-ইহসান / আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব):

    দ্বীন ইসলামের সর্বোচ্চ শিখর হলো ইহসান। হাদিসে জিবরীলে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সংজ্ঞা দিয়ে ইরশাদ করেছেন: «أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ» অর্থাৎ “তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে স্বচক্ষে দেখছ; আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে নিশ্চয় তিনি তোমাকে দেখছেন।” (সহীহ বুখারী: ৫০)।


٦- عرف الطريقة القادرية مع ذكر وظائفها وسلاسلها موضحا-

[কাদেরিয়া তরিকার পরিচয়, অজিফা ও শাজারাহ বিশদভাবে বর্ণনা কর।]

১. কাদেরিয়া তরিকার পরিচয় (مفهوم الطريقة القادرية):

মুসলিম জাহানের সর্বজনমান্য শীর্ষস্থানীয় অলি গাউসুল আযম বড়পীর হযরত শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) (৪৭০-৫৬১ হিজরি / ১০৭৭-১১৬৬ খ্রি.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আধ্যাত্মিক তরীকাকে “তরীকায়ে কাদেরিয়া” (الطريقة القادرية) বলা হয়। এটি বিশ্বের প্রথম এবং সর্বাধিক বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক সুফি তরীকা। এ তরিকার মূল ভিত্তি হলো কুরআন ও সুন্নাহর কঠোরতম অনুসরণ, নির্ভেজাল তাওহীদ, নফসের মুজাহাদা এবং সৃষ্টির প্রতি অকৃত্রিম দয়া ও ভালোবাসা।

২. কাদেরিয়া তরিকার প্রধান অজিফা ও আমলসমূহ (وظائف الطريقة القادرية):

কাদেরিয়া তরিকায় মুরিদ ও সাধকদের আত্মশুদ্ধির জন্য কিছু নিয়মিত আমল ও অজিফা নির্ধারণ করা হয়েছে:

  1. কালিমায়ে তাইয়্যিবার জিকির: প্রতিদিন নির্জনে বসে নির্দিষ্ট সংখ্যায় (যেমন ১০০, ৫০০ বা ১০০০ বার) «لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ» জিকির করা, যা অন্তরের মরিচা দূর করে তাওহীদের নূর প্রজ্জ্বলিত করে।
  2. আসমাউল হুসনা ও ইসমুয জাতের জিকির: প্রতিদিন নির্দিষ্ট নিয়মে «يَا أَللَّهُ», «يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ», «يَا عَزِيزُ» এবং «يَا وَدُودُ» জিকির করা।
  3. দরূদ শরীফের অজিফা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি প্রতিদিন প্রচুর দরূদ পাঠ করা, বিশেষ করে ‘সালাতুত তানজিইয়াহ’ এবং ‘দরূদে কাদেরিয়া’ বা ‘দরূদে গাউসিয়া’ তিলাওয়াত করা।
  4. ইস্তিগফারের পাবন্দি: প্রত্যহ ন্যূনতম ১০০ বার খাঁটি অন্তরে ইস্তিগফার («أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ») পাঠ করা।
  5. তাহাজ্জুদ ও নফল সালাত: রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় এবং সালাতুল ইশরাক ও সালাতুল আওয়াবীন নিয়মিত পালন করা।
  6. মুজাহাদাতুন নফস: কম খাওয়া, কম ঘুমানো এবং কম কথা বলা (قلة الطعام، وقلة المنام، وقلة الكلام)-এর মাধ্যমে প্রবৃত্তি দমন করা।

৩. কাদেরিয়া তরিকার সিলসিলা ও শাজারাহ (سلاسل الطريقة القادرية):

কাদেরিয়া তরিকার আধ্যাত্মিক সিলসিলা রাসুলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত স্বর্ণালী পরম্পরায় অবিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত। নিচে এর বিশুদ্ধ শাজারাহ ক্রমানুসারে প্রদত্ত হলো:

  1. সায়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ ﷺ
  2. আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)
  3. ইমাম হাসান আল-বসরী (রহ.)
  4. শায়খ হাবীব আল-আজমী (রহ.)
  5. শায়খ দাউদ আত-তাঈ (রহ.)
  6. শায়খ মারূফ আল-কারখী (রহ.)
  7. শায়খ সিররি আস-সাকাতী (রহ.)
  8. সায়্যিদুত তায়েফা শায়খ জুনায়েদ আল-বাগদাদী (রহ.)
  9. শায়খ আবু বকর আশ-শিবলী (রহ.)
  10. শায়খ আবদুল ওয়াহিদ আত-তামীমী (রহ.)
  11. শায়খ আবুল ফারাহ আত-তারতূসী (রহ.)
  12. শায়খ আবুল হাসান আলী আল-কুরায়শী আল-হাদ্কারী (রহ.)
  13. শায়খ আবু সাঈদ আল-মাখযূমী (মুখরিমী) (রহ.)
  14. সুলতানুল আউলিয়া গাউসুল আযম শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)

٧- اكتب نبذة من حياة شاه جلال اليمنى (رح)-

[শাহ জালাল আল-ইয়ামানী (রহ) এর জীবনী লেখ।]

ভূমিকা:

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক প্রাণপুরুষ হলেন সুলতানুল বাংলা হযরত শাহ জালাল মুজাররাদ আল-ইয়ামানী (রহ.)। তাঁর পবিত্র পদধূলি, অটল ঈমানী সাধনা এবং ৩৬০ জন সঙ্গী আউলিয়ার রক্তের ঘামে সিলেটসহ সমগ্র পূর্ববঙ্গ ইসলামের চিরস্থায়ী দূর্গে পরিণত হয়েছিল।

১. জন্ম ও বংশ পরিচয়:

হযরত শাহ জালাল (রহ.) ৬৭১ হিজরিতে (১২৭১ খ্রি.) ইয়েমেনের কুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মাহমুদ বিন মুহাম্মদ এবং মাতার নাম সাইয়্যেদা হাসিনা ফাতিমা। তিনি পিতৃকুল ও মাতৃকুল উভয় দিক থেকেই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বংশধর (সাইয়্যেদ) ছিলেন।

২. বাল্যকাল, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক দীক্ষা:

শৈশবেই তাঁর পিতা-মাতা ইন্তেকাল করেন। ফলে তিনি তাঁর মামা তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক সাধক হযরত সৈয়দ আহমদ কবীর সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর স্নেহচ্ছায়ায় মক্কা ও মদিনায় বড় হন। মামার কাছেই তিনি কুরআন, হাদিস ও ফিকহে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং দীর্ঘ ৩০ বছর কঠোর সাধনা ও রিয়াযতের মাধ্যমে বেলায়েতের সর্বোচ্চ মাকাম লাভ করেন।

৩. বাংলার উদ্দেশ্যে হিজরত ও মাটির পরীক্ষা:

সাধনাকালের সমাপ্তিতে তাঁর মুর্শিদ আহমদ কবীর তাঁকে একমুঠো মাটি দিয়ে নির্দেশ দেন—”যে জনপদের মাটির গন্ধ, বর্ণ ও স্বাদের সাথে এই মাটির হুবহু মিল পাবে, সেখানেই আস্তানা গড়ে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করবে।” এই নির্দেশ নিয়ে তিনি ১২ জন সঙ্গীসহ ভারত অভিমুখে যাত্রা করেন। দিল্লিতে হযরত নিযামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং নিযামুদ্দিন আউলিয়া তাঁকে একজোড়া সুরমা রঙের কবুতর (যা আজও ‘জালালী কবুতর’ নামে খ্যাত) উপহার দেন।

৪. সিলেট আগমন ও অত্যাচারী রাজা গৌর গোবিন্দের পতন:

সিলেটের তৎকালীন অত্যাচারী হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দের রাজ্যে শেখ বুরহান উদ্দিন নামক এক মুসলিম প্রজা সন্তানের জন্ম উপলক্ষে গরু জবাই করায় রাজা বুরহানের নবজাতক শিশুকে হত্যা এবং তাঁর হাত কেটে ফেলে। এই চরম অবিচারের প্রতিকার চেয়ে বুরহান উদ্দিন বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের শরণাপন্ন হন। সুলতানের ভাগ্নে সেনাপতি সিকান্দার খান গাজীর নেতৃত্বে প্রেরিত বাহিনী বারবার পরাজিত হলে হযরত শাহ জালাল (রহ.) তাঁর ৩৬০ জন আউলিয়া নিয়ে এ অভিযানে শরিক হন। পথিমধ্যে সিলেটের মাটির সাথে নিজের মাটির মিল খুঁজে পান। ৭০৩ হিজরিতে (১৩০৩ খ্রি.) অলৌকিক শক্তিতে সুরমা নদী জায়নামাজে পার হয়ে তিনি সিলেট বিজয় করেন এবং ইনসাফ কায়েম করেন।

৫. দাওয়াতী মিশন ও মানবকল্যাণ:

বিজয় লাভের পর তিনি ৩৬০ জন আউলিয়াকে সমগ্র সিলেট, আসাম, ময়মনসিংহ ও চট্রগ্রাম অঞ্চলে পাঠিয়ে সুসংগঠিতভাবে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেন। তিনি নিজে আজীবন কুমার (মুজাররাদ) থেকে দিনরাত মানবসেবা ও তাওহীদের তালিমে মগ্ন ছিলেন। তাঁর ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে হিন্দু ও বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।

৬. ঐতিহাসিক ইবনে বতুতার সাথে সাক্ষাৎ ও ওফাত:

বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট এসে হযরত শাহ জালাল (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর অতিথিশালায় তিন দিন অবস্থান করেন। অবশেষে ৭৪৭ হিজরিতে (১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে) এই মহান ওলী ইন্তেকাল করেন। সিলেটের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তাঁর পবিত্র মাজার আজও লাখ লাখ মানুষের আধ্যাত্মিক প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু।


٨- اكتب الشبهات الموجهة للتصوف مع دراستها فى ضوء النصوص-

[নুসূসের আলোকে পর্যালোচনাসহ সুফিবাদের ওপর আরোপিত সন্দেহগুলো লেখ।]

ভূমিকা:

ইলমুত তাসাওউফ যখনই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আত্মশুদ্ধির পথ দেখিয়েছে, তখনই অজ্ঞতা, চরমপন্থা কিংবা কিছু ভণ্ড নামধারী সূফীদের অপকর্মের কারণে তাসাওউফের ওপর নানাবিধ সন্দেহ ও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। নিচে প্রধান প্রধান সন্দেহসমূহ উল্লেখ করে কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য নসের (দলিলের) আলোকে তার প্রামাণিক জবাব পর্যালোচনা করা হলো:

১. সন্দেহ এক: “তাসাওউফ শব্দটি কুরআন-হাদিসে নেই, অতএব এটি বিদআত।”

পর্যালোচনা ও জবাব:
এটি একটি স্থূল যুক্তি। কারণ পরিভাষা নতুন হলেই কোনো বিষয় বিদআত হয় না; বরং দেখতে হবে তার অর্থ ও বাস্তবতা ইসলামসম্মত কি না। ইসলামী শাস্ত্রীয় নীতি হলো: «لَا مُشَاحَّةَ فِي الِاصْطِلَاحِ» (পরিভাষা ব্যবহারে কোনো বিধিনিষেধ নেই)। ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, উলূমুল হাদিস, নাহু, সরফ—এসব শাস্ত্রীয় নামও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে ছিল না। কিন্তু যেমন ফিকহের বাস্তবতা কুরআন-হাদিসে আছে, তেমনি তাসাওউফের মূল বাস্তবতা—যেমন: তাযকিয়াহ (تزكية), যুহদ (زهد), ইহসান (إحسان), খুশু (خشوع) এবং ইখলাস (إخلاص)—কুরআন ও হাদিসের প্রতিটি পাতায় নির্দেশিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন: ﴿قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى﴾ (সূরা আল-আলা: ১৪)। অতএব, একে বিদআত বলা চরম অজ্ঞতা।

২. সন্দেহ দুই: “সুফিবাদ মানেই সংসারত্যাগ, বৈরাগ্য ও নিষ্ক্রিয়তা (কর্মবিমুখতা)।”

পর্যালোচনা ও জবাব:
প্রকৃত তাসাওউফ কখনো বৈরাগ্য (রহবানিয়্যাত) সমর্থন করে না। সুফিদের মূলনীতি হলো: «خَلْوَةٌ فِي جَلْوَةٍ» এবং «دَسْت بَه كَار، دِل بَه يار» (হাত থাকবে কাজে আর অন্তর থাকবে আল্লাহর স্মরণে)। সুফি সাধকগণ ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন। সালাহুদ্দিন আইয়ুবী, শায়খ আবদুল কাদির জিলানী, নূরুদ্দিন জাঙ্গী, তারিক বিন যিয়াদ, মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী সকলেই ছিলেন সুফিদের সংস্পর্শধন্য মুজাহিদ। ইসলামে বৈরাগ্য নিষিদ্ধ; তাসাওউফের শিক্ষা হলো—দুনিয়াকে পকেটে রাখো কিন্তু অন্তরে ঢুকতে দিও না। যেমন জাহাজের নিচে পানি থাকা আবশ্যক, কিন্তু জাহাজের ভেতরে পানি ঢুকলে তা ডুবে যায়।

৩. সন্দেহ তিন: “সুফিরা নাকি শরীয়ত ও তরীকতকে ভিন্ন মনে করে এবং মারেফাত অর্জন হলে সালাত লাগে না।”

পর্যালোচনা ও জবাব:
এটি কিছু পথভ্রষ্ট ভণ্ড (বে-শরা) ফকিরদের কুফরি দাবি, যা খাঁটি সুফিগণ শতভাগ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইমাম জুনায়েদ আল-বাগদাদী (রহ.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন:
«طَرِيقُنَا هَذَا مُقَيَّدٌ بِأُصُولِ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، فَمَنْ لَمْ يَحْفَظِ الْقُرْآنَ، وَلَمْ يَكْتُبِ الْحَدِيثَ، لَا يُقْتَدَى بِهِ فِي عِلْمِنَا»
অর্থ: “আমাদের এই তাসাওউফের পথ কুরআন ও সুন্নাহর রজ্জু দ্বারা শক্তভাবে বাঁধা। যে ব্যক্তি কুরআন হিফয করেনি এবং হাদিস লিপিবদ্ধ করেনি, আমাদের এই তাসাওউফে তার অনুসরণ করা জায়েজ নেই।”
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ সালাত আদায় করেছেন, অতএব কোনো ব্যক্তির জন্য সালাত মাফ হওয়া পরিষ্কার কুফরি।

৪. সন্দেহ চার: “সুফিবাদে হুলূল, ইত্তিহাদ ও মাজার পূজার মতো শিরক বিদ্যমান।”

পর্যালোচনা ও জবাব:
মূলধারার আহলুস সুন্নাহর সুফিগণ সর্বসম্মতভাবে হুলূল (স্রষ্টা সৃষ্টির ভেতর প্রবেশ করা) এবং ইত্তিহাদ (স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক হয়ে যাওয়া)-কে কুফরি বলে আখ্যায়িত করেছেন। কবরে সিজদা করা বা কোনো ওলীর কাছে সন্তান চাওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও শিরক। সুফিগণ ওলীদের কেবল আল্লাহর প্রিয় বান্দা এবং নেককার মাধ্যম মনে করেন, কোনো রব মনে করেন না।


مجموعة (ب) : গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি)

[নির্দেশনা: এই বিভাগ থেকে যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণমান ৫। নিচে পরীক্ষার্থীদের সামগ্রিক সহায়তার জন্য ৮টি প্রশ্নের সবগুলোরই প্রামাণিক উত্তর পরিবেশন করা হলো।]

٩- ما المكاشفة والمشاهدة؟

[মুকাশাফাহ ও মুশাহাদাহ কী?]

উত্তর:

ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরী (রহ.)-এর মতে মুকাশাফাহ ও মুশাহাদাহ হলো আধ্যাত্মিক সাধনার দুটি অতীব উচ্চতর স্তর:

  • المكاشفة (আল-মুকাশাফাহ): আভিধানিক অর্থ পর্দা উন্মোচন করা। সুফি পরিভাষায়, সাধকের অন্তর থেকে সংশয় ও সন্দেহের পর্দা অপসারিত হয়ে এমন দৃঢ় ঈমানী আলোক ও দিব্যদৃষ্টি লাভ করা, যার ফলে অদেখা গায়েবী বিষয়সমূহ (আখেরাত, হাশর, জান্নাত, জাহান্নাম) মনের আয়নায় এমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যেন তা প্রত্যক্ষ বস্তুর মতো প্রতিভাত হয়।
  • المشاهدة (আল-মুশাহাদাহ): এটি মুকাশাফার চেয়েও উচ্চতর স্তর। কোনো দলিল-প্রমাণের প্রয়োজন ছাড়াই বান্দা সর্বত্র মহান আল্লাহর অপার কুদরত, পবিত্র সিফাত ও মহিমার এমন সার্বক্ষণিক প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য অনুভব করে, যেন সে আল্লাহকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ»—এই হাদিসটিই মুশাহাদার সর্বোচ্চ মূলভিত্তি।

١٠- اكتب أهمية ذكر الموت-

[মৃত্যুকে স্মরণ করার গুরুত্ব লেখ।]

উত্তর:

ইসলাম ও তাসাওউফে মৃত্যুকে স্মরণ করা হলো আত্মশুদ্ধি এবং নফসের লাগাম টেনে ধরার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এর ধর্মীয় ও আত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম:

  1. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্পষ্ট নির্দেশ: রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ: الْمَوْتِ» অর্থাৎ “তোমরা দুনিয়াবী ভোগ-বিলাসের স্বাদ বিনাশকারী মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।” (জামে তিরমিযী: ২৩০৭)।
  2. অন্তরের কঠিনতা দূরীকরণ: মৃত্যুর স্মরণ পাথরের মতো শক্ত হৃদয়কে নরম করে এবং আল্লাহর ভয়ে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরায়।
  3. তওবায় ত্বরা ও পাপবর্জন: যে ব্যক্তি সর্বদা মৃত্যুকে সামনে দেখে, সে গুনাহের কাজে লিপ্ত হতে পারে না এবং অবিলম্বে আল্লাহর দরবারে খাঁটি তওবা করে নেয়।
  4. দুনিয়ার মোহমুক্তি ও অল্পে তুষ্টি: মৃত্যু মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে এই রাজপ্রাসাদ, অর্থ-সম্পদ সবই পড়ে থাকবে, সাথে যাবে কেবল তিন টুকরো সাদা কাফন ও নেক আমল। ফলে অন্তরে ক্বানাআত ও যুহদ সৃষ্টি হয়।

١١- ما هى أمراض القلوب؟

[অন্তরের রোগ কী কী?]

উত্তর:

শারীরিক রোগের চেয়ে অন্তরের রোগ বা আত্মিক ব্যাধি অনেক বেশি মারাত্মক; কারণ শারীরিক রোগে কেবল দুনিয়ার জীবন শেষ হয়, কিন্তু অন্তরের রোগে চিরস্থায়ী আখেরাত ধ্বংস হয়ে যায়। প্রধান প্রধান অন্তরের রোগগুলো হলো:

  1. الرياء (আর-রিয়া / লোকদেখানো মনোভাব): আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা বা সুনামের জন্য নেক আমল করা। একে হাদিসে ‘শিরকে আসগার’ (ছোট শিরক) বলা হয়েছে।
  2. الكبر (আল-কিবর / অহংকার): সত্যকে অস্বীকার করা এবং অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করা। রাসুল ﷺ বলেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
  3. الحسد (আল-হাসাদ / পরশ্রীকাতরতা): অন্যের ভালো সহ্য করতে না পেরে তার নিয়ামত ধ্বংসের কামনা করা। এটি সমস্ত নেক আমলকে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয়।
  4. العجب (আল-উজব / আত্মমুগ্ধতা): নিজের আমল বা জ্ঞান নিয়ে অহংকারবোধ করা এবং নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা।
  5. حب الدنيا وحب الجاه (দুনিয়ার মোহ ও ক্ষমতার লোভ): সকল পাপাচারের মূল উৎস হলো দুনিয়ার ভালোবাসা (رَأْسُ كُلِّ خَطِيئَةٍ حُبُّ الدُّنْيَا)।
  6. الحقد والغضب (হিংসা-বিদ্বেষ ও ক্রোধ): অন্যের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার আগুন অন্তরে পুষে রাখা।
  7. النفاق (কপটতা ও দ্বিচারিতা): মুখে এক আর অন্তরে অন্য ভাব পোষণ করা।

١٢- عرف الولى والولاية ثم بين أهميتهما-

[الولى ও الولاية এর পরিচয় দাও এবং উভয়ের গুরুত্ব বর্ণনা কর।]

১. ওলী ও বিলায়েতের পরিচয়:

ওলী (الولي): আভিধানিক অর্থ বন্ধু, সাহায্যকারী বা নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি। শরীয়তের পরিভাষায়, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর পূর্ণ অনুসারী, ফরয-নফল আমলের পাবন্দ এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভ করেছেন, তাঁকে ‘ওলীউল্লাহ’ (আল্লাহর ওলী) বলা হয়। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ওলীর পরিচয় দিয়ে বলেন: ﴿أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ – الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ﴾ অর্থাৎ “জেনে রাখো! আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা চিন্তিতও হবেন না। তাঁরা হলেন সেই সকল লোক যারা ঈমান এনেছেন এবং সর্বদা তাকওয়া অবলম্বন করেন।” (সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩)।

বিলায়েত (الولاية): ওলী হওয়ার পদমর্যাদা, আধ্যাত্মিক নৈকট্য ও বিশেষ সম্পর্ককে ‘বিলায়েত’ বলে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাকে দেওয়া এক বিশেষ আত্মিক আলো ও সম্মান।

২. ওলী ও বিলায়েতের গুরুত্ব:

  • আল্লাহর প্রত্যক্ষ সাহায্য ও নিরাপত্তা লাভ: সহীহ বুখারীর হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: «مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ» অর্থাৎ “যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছি।”
  • সমাজে হিদায়াত ও নৈতিক সংস্কারের বিস্তার: ওলীগণের জীবনাদর্শ, কথা ও সোহবত মানুষকে পাপ থেকে তওবা করিয়ে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনে।
  • দোয়া কবুলের উসিলা: ওলীগণের খাঁটি দোয়ার বরকতে উম্মাহ বহু বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা পায়।

١٣- بين الفروق بين المجاهدة والمحاسبة والمراقبة-

[مراقبة , محاسبة ও مجاهدة এর মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা কর।]

উত্তর:

তাসাওউফে আত্মশুদ্ধির তিনটি অতীব মৌলিক সোপান হলো মুজাহাদা, মুহাসাবা এবং মোরাকাবা। এদের সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক পার্থক্য নিচে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয় المجاهدة (আল-মুজাহাদাহ) المحاسبة (আল-মুহাসাবাহ) المراقبة (আল-মোরাকাবা)
মৌলিক অর্থ নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও কঠোর শ্রম আমলের হিসাব-নিকাশ ও আত্মপর্যালোচনা সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি হৃদয়ে ধ্যান রাখা
কাজের ধরন কুপ্রবৃত্তি দমন করা, অলসতা দূর করে ইবাদতে বাধ্য করা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে নফসকে জোরপূর্বক বিরত রাখা। প্রতিদিনের কাজ শেষ করে নিজের নিয়ত, কথা ও কাজের লাভ-ক্ষতি যাচাই করে ভুল হলে তওবা করা ও ভালো হলে শোকর করা। অন্তরের দৃষ্টিকে সবসময় আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ রাখা; এই বিশ্বাস রাখা যে “আল্লাহ আমাকে প্রতি মুহূর্তে দেখছেন।”
শরয়ী ভিত্তি ﴿وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا﴾ (সূরা আল-আনকাবুত: ৬৯) হযরত উমর (রা.)-এর উক্তি: «حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا» (হিসাব নেওয়ার পূর্বে আত্মহিসাব নাও) ﴿إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا﴾ (সূরা আন-নিসা: ১)
আধ্যাত্মিক ফল নফস নিয়ন্ত্রণাধীন ও অনুগত হয়। ভুলত্রুটি সংশোধন ও ঈমান মজবুত হয়। ইহসানের স্তরে আরোহণ ও গোনাহমুক্ত জীবন লাভ হয়।

١٤- ما حقيقة الكرامة؟ بين بعض الكرامات-

[কারামাতের তাৎপর্য কী? কয়েকটি কারামাতের বর্ণনা দাও।]

১. কারামাতের তাৎপর্য (حقيقة الكرامة):

আভিধানিক অর্থ সম্মান ও মর্যাদা। শরীয়তের পরিভাষায়, নবুওয়াতের দাবিদার ব্যতীত কোনো আল্লাহভীরু মুমিন ওলীর হাতে স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে অলৌকিকভাবে আল্লাহর কুদরতে যে অসাধারণ ঘটনা প্রকাশিত হয়, তাকে ‘কারামত’ (الكرامة) বলা হয়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা হলো ওলীদের কারামত সত্য। কারামত মূলত ওলীর নিজস্ব ক্ষমতা নয়; বরং তিনি যে নবীর অনুসারী, সেই নবীর নবুওয়াতেরই জীবন্ত মুজিজার এক পরোক্ষ প্রতিফলন ও সম্মান।

২. কুরআন ও হাদিস সমর্থিত কয়েকটি ঐতিহাসিক কারামাত:

  1. আসহাবে কাহাফের ঘটনা (কুরআনুল কারীম): অত্যাচারী রাজার হাত থেকে ঈমান বাঁচাতে সাতজন যুবক গুহায় আশ্রয় নেন এবং আল্লাহ তাআলা কোনো খাদ্য-পানীয় ছাড়াই তাঁদের ৩০৯ বছর জীবিত অবস্থায় ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন (সূরা আল-কাহাফ)।
  2. হযরত মরিয়ম (আ.)-এর কারামত (কুরআনুল কারীম): মেহরাবে কোনো মানুষের প্রবেশ ছাড়াই শীতকালে গ্রীষ্মের ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতের তাজা ফল তাঁর কাছে অলৌকিকভাবে আসত (সূরা আলে ইমরান: ৩৭)।
  3. আসাফ ইবনে বরখিয়ার কারামত (কুরআনুল কারীম): হযরত সুলাইমান (আ.)-এর উম্মতের এক নেককার ব্যক্তি চোখের পলক ফেলার পূর্বেই ইয়েমেন থেকে রানী বিলকিসের সুবিশাল সিংহাসন ফিলিস্তিনের দরবারে হাজির করে দিয়েছিলেন (সূরা আন-নামল: ৪০)।
  4. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কারামত (হাদিস ও আসারের আলোকে): মদিনার মসজিদে নববীতে জুমার খুতবা প্রদানকালে শত শত মাইল দূরে পারস্যের নাহাওয়ান্দে যুদ্ধরত সেনাপতি সারিয়াহকে দেখতে পেয়ে মিম্বর থেকে চিৎকার করে নির্দেশ দিয়েছিলেন: «يَا سَارِيَةُ الْجَبَلَ الْجَبَلَ» (হে সারিয়াহ! পাহাড়ের সাহায্য নাও)। সেনাপতি সেই আওয়াজ শুনে পাহাড়ের আড়ালে সৈন্য সাজিয়ে নিশ্চিত পরাজয় থেকে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন।

١٥- اكتب شروط الشيخ الكامل-

[শায়খে কামিলের শর্তগুলো লেখ।]

উত্তর:

তাসাওউফে আত্মশুদ্ধির পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালনকারী পীর বা মুর্শিদকে ‘শায়খে কামিল’ (الشيخ الكامل) বা আদর্শ পথপ্রদর্শক বলা হয়। যে কারও হাতে হাত দিয়ে মুরিদ হওয়া জায়েজ নেই। একজন কামিল শায়খের মধ্যে নিম্নোক্ত অপরিহার্য শর্ত ও গুণাবলী থাকা বাধ্যতামূলক:

  1. শরীয়তের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অধিকারী হওয়া: শায়খকে অবশ্যই কুরআন, হাদিস, আকিদা এবং হালাল-হারাম সংক্রান্ত ফিকহী মাসআলা বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে, যাতে তিনি শরীয়ত মোতাবেক মুরিদকে পথ চালাতে পারেন। জাহেল কোনো ব্যক্তি পীর হতে পারে না।
  2. সুন্নাহর অনুসারী ও খোদাভীরু হওয়া: শায়খকে নিজে সমস্ত কবিরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকতে হবে, সগিরা গুনাহে অবিচল না থাকা এবং প্রতিটি সুন্নাহর কঠোর অনুসারী ও তাকওয়াবান হতে হবে।
  3. হক্কানী শায়খের সোহবত ও খেলাফত (ইজাযত) প্রাপ্ত হওয়া: তিনি নিজে কোনো কামিল শায়খের সান্নিধ্যে থেকে আত্মশুদ্ধি অর্জন করেছেন এবং খেলাফত বা অনুমতি লাভ করেছেন। তাঁর তরিকার সনদ রাসুলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছাতে হবে।
  4. দুনিয়াবিমুখ ও অর্থলোভমুক্ত হওয়া: শায়খ যেন মুরিদের ধনসম্পদ বা নজর-নেওয়াজের লোভী না হন; বরং তিনি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে হেদায়াত দান করেন।
  5. আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা ও ব্যাধি নির্ণয়ের ক্ষমতা: মুরিদের অন্তরের কোন ব্যাধি আছে এবং কোন জিকির ও আমলের মাধ্যমে তা দূর হবে, তা নির্ণয় করে প্রেসক্রিপশন দেওয়ার মতো হিকমত থাকতে হবে।
  6. যার সান্নিধ্যে বসলে আল্লাহর স্মরণ তাজা হয়: রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল শ্রেষ্ঠ আউলিয়া কারা? তিনি বলেছিলেন: «الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللَّهُ» অর্থাৎ “যাঁদের দেখলে আল্লাহর কথা মনে পড়ে যায়।” (ইবনে মাজাহ: ৪১১৯)।

١٦- اكتب أشغال الطريقة النقشبندية-

[নকশবন্দী তরিকার অজিফাগুলো লেখ।]

উত্তর:

হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ বুখারী (রহ.) (৭১৮-৭৯১ হিজরি) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সুপ্রসিদ্ধ তরীকায়ে নকশবন্দিয়ার প্রধান প্রধান অজিফা ও আশগাল (আধ্যাত্মিক সাধনার পদ্ধতি) নিম্নরূপ:

  1. যিকরে খফী (الذكر الخفي / নিঃশব্দ জিকির): নকশবন্দী তরিকার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো শব্দহীন নীরব জিকির। জিহ্বা বা ঠোঁট না নাড়িয়ে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে অন্তরের গভীরে আল্লাহর জিকির করা।
  2. ছয় লতিফার সাধনা (أشغال اللطائف الستة): মানবদেহে আল্লাহ ছয়টি আত্মিক কেন্দ্র বা লতিফা স্থাপন করেছেন:
    • ক্বলব (قلب): বাম স্তনের দুই আঙুল নিচে।
    • রূহ (روح): ডান স্তনের দুই আঙুল নিচে।
    • সিরর (سر): বাম স্তনের দুই আঙুল উপরে।
    • খফী (خفي): ডান স্তনের দুই আঙুল উপরে।
    • আখফা (أخفى): সিনার ঠিক মাঝখানে।
    • নফসে নাতেকা (نفس ناطقة): কপালের মাঝখানে।

    মুরিদ চোখ বন্ধ করে কল্পনা করেন যে তাঁর প্রতিটি লতিফা থেকে সমস্ত পাপ বের হয়ে যাচ্ছে এবং আল্লাহর নূরের বরকত প্রবেশ করে «أَللَّهُ أَللَّهُ» জিকিরে স্পন্দিত হচ্ছে।

  3. নফী ও ইসবাতের জিকির (نفي وإثبات): নিঃশ্বাস বন্ধ করে নাভি থেকে «لَا إِلَٰهَ» (নফী বা সমস্ত মিথ্যা উপাস্যের অস্বীকৃতি) টেনে নিয়ে মস্তিষ্কে তোলে এবং «إِلَّا اللَّهُ» (ইসবাত বা একমাত্র আল্লাহর প্রতিষ্ঠা) দ্বারা ক্বলবের লতিফায় সজোরে আঘাত করে।
  4. রাবেতায়ে শায়খ (رابطة الشيخ): মোরাকাবার সময় কামিল শায়খের চেহারা ও নূর অন্তরে কল্পনা করে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র রওজা মোবারক থেকে নেমে আসা ফয়েজ গ্রহণ করা।
  5. খতম-ই-খাজেগান (ختم الخواجگان): বিশেষ কোনো বিপদ থেকে মুক্তি বা আত্মিক উন্নতির জন্য নির্দিষ্ট নিয়মে দরূদ শরীফ, সূরা ফাতিহা, সূরা ইনশিরাহ ও সূরা ইখলাস সম্মিলিতভাবে তিলাওয়াত করা।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ইলমুত তাসাওউফের মূল আলোচ্য বিষয় ও উদ্দেশ্য কী?

উত্তর: তাসাওউফের মূল আলোচ্য বিষয় হলো মানুষের অন্তর ও আত্মা এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো আত্মাকে রিয়া, অহংকার ও লোভ থেকে পরিশুদ্ধ করে হাদিসে জিবরীলে বর্ণিত ‘ইহসান’-এর স্তরে পৌঁছে আল্লাহর খাঁটি মারিফাত ও সন্তুষ্টি অর্জন করা।

প্রশ্ন ২: ইমাম কুশাইরীর মতে আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে সুফিদের আকিদা কেমন?

উত্তর: ইমাম কুশাইরীর মতে সুফিগণ হলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী। তাঁরা বিশ্বাস করেন আল্লাহ তাআলা অনাদি, অনন্ত, এক ও একক। তিনি স্থান, কাল, দিক ও সৃষ্টির শারীরিক সাদৃশ্য থেকে চিরপবিত্র। সুফিগণ হুলূল ও ইত্তিহাদকে স্পষ্ট কুফরি মনে করেন।

প্রশ্ন ৩: ফানা ও বাকা পরিভাষার সঠিক অর্থ কী?

উত্তর: ফানা মানে অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজের নফস ও কুপ্রবৃত্তিকে আল্লাহর ভালোবাসায় বিলীন করে দেওয়া। আর বাকা হলো নফসের কুপ্রবৃত্তি ধ্বংসের পর আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শরীয়তের বিধান মোতাবেক নিজের অস্তিত্বকে পরিচালিত করা।

প্রশ্ন ৪: কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা কে এবং এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?

উত্তর: কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হলেন গাউসুল আযম শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কুরআন-সুন্নাহর কঠোরতম পাবন্দি, কালিমায়ে তাইয়্যিবার জিকির, ইস্তিগফার, দরূদ শরীফ এবং নফসের মুজাহাদার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন।

প্রশ্ন ৫: হযরত শাহ জালাল (রহ.) কখন এবং কীভাবে সিলেটে ইসলাম প্রচার করেন?

উত্তর: হযরত শাহ জালাল (রহ.) ৭০৩ হিজরিতে (১৩০৩ খ্রি.) রাজা গৌর গোবিন্দের অত্যাচার থেকে নির্যাতিত মুসলমানদের রক্ষায় সেনাপতি সিকান্দার খানের সাথে সিলেট বিজয় করেন। অতঃপর ৩৬০ জন আউলিয়াকে নিয়ে মানবসেবা ও সাম্যের বাণীর মাধ্যমে সমগ্র বাংলায় ইসলামের স্থায়ী বিস্তার ঘটান।

প্রশ্ন ৬: ওলীগণের কারামাত সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহর আকিদা কী?

উত্তর: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো ওলীদের কারামাত সত্য। এটি ওলীর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নয়; বরং আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর নেককার বান্দার সম্মানার্থে এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর অনুসরণের বরকতে প্রকাশিত অসাধারণ অলৌকিক ঘটনা।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন