ফাজিল স্নাতক (সম্মান) ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: التصوف (আত-তাসাওউফ / সুফিবাদ ও আত্মশুদ্ধি)
বিষয় কোড: ২০১৮০৪ | পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১১৪
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
مجموعة (الف) : الأسئلة التحريرية والتأصيلية (গ্রুপ ‘ক’ – বিশদ তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নাবলি)
[الملاحظة: أجب عن أربعة أسئلة من هذه المجموعة. الدرجات: ৪ × ১৫ = ৬০]
(পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও সামগ্রিক জ্ঞানার্জনের সুবিধার্থে গ্রুপ ‘ক’-এর ৮টি মূল প্রশ্নের সবগুলোই বিস্তারিত বিশ্লেষণসহ সমাধান করা হলো।)
١- عرف التصوف ثم بين نشأته وتطوره مفصلا-
[তাসাওউফ এর সংজ্ঞা দাও। তাসাওউফ এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
১. তাসাওউফের সংজ্ঞা (مفهوم التصوف):
আভিধানিক ব্যুৎপত্তি: ‘তাসাওউফ’ (التَّصَوُّفُ) শব্দের মূল ধাতু নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে:
(ক) আহলে সুফফা (أهل الصُّفَّة): মসজিদে নববীর বারান্দায় অবস্থানকারী নিবেদিতপ্রাণ দুনিয়াবিমুখ সাহাবীগণের সাথে সম্পর্কিত।
(খ) সাফ (الصف الأول): আল্লাহর সমীপে প্রথম কাতারে অবস্থানকারীদের স্বভাববিশিষ্ট হওয়া।
(গ) সাফা (الصفاء): কলুষমুক্ত আত্মিক শুভ্রতা ও হৃদয়ের পবিত্রতা।
(ঘ) সূফ (الصُّوف): অনাসক্তির প্রতীক হিসেবে পশমি বা মোটা বস্ত্র পরিধান করা।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: প্রখ্যাত সুফি ইমাম জুনায়েদ আল-বাগদাদী (রহ.) বলেন—
«التَّصَوُّفُ أَنْ يُمِيتَكَ الْحَقُّ عَنْ نَفْسِكَ وَيُحْيِيَكَ بِهِ»
অর্থাৎ: “তাসাওউফ হলো মহান আল্লাহ তোমার নফস ও পাশবিক প্রবৃত্তিকে বিলুপ্ত করবেন এবং তাঁর সান্নিধ্যে তোমাকে এক নব আত্মিক জীবন দান করবেন।”
সংক্ষেপে: কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নফস) অর্জন করে অন্তরে সদা আল্লাহর সান্নিধ্য ও প্রত্যক্ষ উপস্থিতির অনুভূতি (ইহসান) জাগ্রত রাখার শাস্ত্রই হলো তাসাওউফ।
২. তাসাওউফের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (نشأته وتطوره):
- নবুয়তের যুগ ও সাহাবায়ে কিরামের আমল (প্রথম পর্যায়): রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সমগ্র জীবনই ছিল তাসাওউফের জীবন্ত প্রতীক। তিনি হেরাগুহায় গভীর মোরাকাবা করতেন, রোজা রাখতেন এবং রাতে দীর্ঘ নফল সালাতে ক্রন্দন করতেন। সাহাবায়ে কিরাম (বিশেষ করে হযরত আবু বকর, আলী, আবু যর গিফারী ও আহলে সুফফা) ছিলেন সর্বোচ্চ যুহদ ও তাকওয়ার অধিকারী। তখন পারিভাষিক নাম না থাকলেও এর পূর্ণ বাস্তব অনুশীলন বিদ্যমান ছিল।
- তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের যুগ (দ্বিতীয় পর্যায় – যুহদের যুগ): উমাইয়া যুগে যখন মুসলিম জাহানে বিপুল পার্থিব সম্পদ ও বিলাসী জীবনপ্রবাহ প্রবেশ করে, তখন হাসান আল-বসরী (রহ.), ইব্রাহিম ইবনে আদহাম, রাবেয়া বসরী ও ফুযাইল ইবনে আইয়াদের মতো বুজুর্গগণ পার্থিব ভোগবিলাসের বিরুদ্ধে কলব পরিষ্কারের আন্দোলন শুরু করেন। তখন একে ‘যুহদ’ (الزهد) বলা হতো।
- সংকলন ও তাত্ত্বিক পরিভাষার যুগ (তৃতীয় পর্যায় – ৩য় ও ৪র্থ হিজরী শতক): এ যুগে জুনায়েদ বাগদাদী, মারুফ কারখী, সিররি সাকাতী প্রমুখ মুহাদ্দিস ও আলেম তাসাওউফকে সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞান ও পরিভাষায় বিন্যস্ত করেন। একে ফিকহের পাশাপাশি অন্তরের আমল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- সমন্বয় ও সুফি তরিকা সমূহের যুগ (পঞ্চম হিজরী শতক থেকে পরবর্তীকাল): ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) তাঁর ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থের মাধ্যমে শরিয়ত ও তাসাওউফের বিরোধ নিরসন করে এক অনন্য সমন্বয় সাধন করেন। এরপর মুসলিম বিশ্বে চারটি প্রধান আধ্যাত্মিক সিলসিলা বা তরীকা (কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া ও সোহরাওয়ার্দিয়া) সুশৃঙ্খল নিয়মে বিকাশ লাভ করে।
٢- عرف بالوقت والمقام والحال والقبض والبسط والهيبة والأنس في ضوء الرسالة القشيرية-
[আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ এর আলোকে الوقت، والمقام، والحال، والقبض، والبسط، والهيبة، والأنس এর পরিচয় দাও।]
ইমাম আবুল কাসিম আল-কুশাইরী (রহ.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ-তে আধ্যাত্মিক সাধনার পরিভাষাগুলোকে চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন:
- الوقت (আল-ওয়াকত / বর্তমান মুহূর্ত): সুফি সাধকদের পরিভাষায় ‘ওয়াকত’ হলো সাধকের বর্তমান অবস্থা। অতীত যা পার হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যৎ যা এখনো আসেনি—উভয়ের চিন্তা ত্যাগ করে বান্দা বর্তমান মুহূর্তে আল্লাহর যে হুকুমের সম্মুখীন, ঠিক সেই হুকুম নিষ্ঠার সাথে পালন করাই হলো ‘ইবনুল ওয়াকত’ (মুহূর্তের সন্তান) হওয়া। সুফিরা বলেন: «الصُّوفِيُّ ابْنُ وَقْتِهِ» (সুফি হলেন নিজ সময়ের সর্বোত্তম রূপকার)।
- المقام (আল-মাকাম / স্থায়ী আত্মিক স্তর): সাধকের নিজস্ব চেষ্টা, সাধনা ও মুজাহাদার মাধ্যমে অর্জিত এমন স্থায়ী আধ্যাত্মিক স্তর, যা বান্দার মধ্যে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় (যেমন তওবা, যুহদ, তাওয়াক্কুল ও সবর)। এক মাকামের পূর্ণ হক আদায় না করে পরবর্তী মাকামে পৌঁছানো যায় না।
- الحال (আল-হাল / ক্ষণিক ঐশী অবস্থা): কোনো বাহ্যিক প্রচেষ্টা বা ইচ্ছা ছাড়াই আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি বান্দার অন্তরে ক্ষণিকের জন্য যে ভাবাবেগ, অনুরাগ বা অবস্থা উদিত হয় এবং কিছুক্ষণ পর মিলিয়ে যায়, তাকে ‘হাল’ বলে। সুফিরা বলেন: «الْمَقَامَاتُ مَكَاسِبُ وَالْأَحْوَالُ مَوَاهِبُ» (মাকাম হলো সাধনার ফল আর হাল হলো আল্লাহর একক দান)।
- القبض والبسط (আল-ক্ববয ও আল-বাস্ত / আত্মিক সংকোচন ও সম্প্রসারণ):
- ক্ববয (القبض): কোনো প্রকাশ্য কারণ ছাড়াই অন্তরে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সংকোচন, বিষাদ ও ভীতির অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া, যা সাধারণ মানুষের ভয়ের চেয়ে উচ্চতর পর্যায়ের।
- বাস্ত (البسط): অন্তরে এক অনাবিল প্রসন্নতা, আধ্যাত্মিক উল্লাস ও আল্লাহর রহমতের মহাসাগরে অবগাহনের আনন্দ অনুভূত হওয়া।
- الهيبة والأنس (আল-হাইবাহ ও আল-উন্স / মহিমাভীতি ও পরম ঘনিষ্ঠতা):
- হাইবাহ (الهيبة): আল্লাহর মহত্ব, পরাক্রম ও অসীম জালাল দর্শনে অন্তরে যে পরম ভীতি ও সম্ভ্রমের উদ্রেক ঘটে।
- উন্স (الأنس): আল্লাহর দয়া, করুণা ও পরম সৌন্দর্যের (জামাল) ভাবনায় হৃদয়ে যে সুমধুর আত্মিক প্রশান্তি ও পরম ঘনিষ্ঠতার তৃপ্তি জাগ্রত হয়।
٣- أوضح مرام الفضائل الآتية: التواضع والإطاعة وحفظ اللسان وكظم الغيظ والمجاهدة والمحاسبة والإحسان-
[নিম্নোক্ত সৎ গুণাবলির মর্মার্থ স্পষ্ট কর:
التواضع والإطاعة وحفظ اللسان وكظم الغيظ والمجاهدة والمحاسبة والإحسان-]
ইসলামি নীতিশাস্ত্র ও তাসাওউফের আলোকে এই সাতটি মহৎ গুণের (ফাযায়েল) মর্মার্থ নিম্নরূপ:
- التواضع (বিনয় ও নম্রতা): সত্যকে অবনত মস্তকে গ্রহণ করা এবং নিজেকে অপরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে না করা। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—«وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ» (যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদাকে সমুন্নত করেন)।
- الإطاعة (আনুগত্য): আল্লাহর নির্দেশাবলি ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহকে নিজের আবেগ ও মতামতের ওপরে স্থান দিয়ে নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করা।
- حفظ اللسان (জিহ্বা সংরক্ষণ): মিথ্যা, গিবত, পরনিন্দা, অশ্লীল বাক্য ও অনর্থক বাক্যালাপ থেকে জিহ্বাকে পূর্ণ সংযত রাখা। রাসুল ﷺ বলেছেন—«مَنْ صَمَتَ نَجَا» (যে নীরব থাকল, সে মুক্তি পেল)।
- كظم الغيظ (ক্রোধ সংবরণ): চরম ক্ষোভ ও প্রতিশোধ গ্রহণের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে রাগ হজম করা এবং ক্ষমা প্রদর্শন করা। কুরআনে মুত্তাকীদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে: «وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ»।
- المجاهدة (আত্মিক সাধনা ও কৃচ্ছ্রসাধন): নফসের কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের কুমন্ত্রণাকে পরাভূত করে আল্লাহর আনুগত্যে শরীর ও মনকে পরিচালিত করার সার্বক্ষণিক সংগ্রাম (জিহাদে আকবর)।
- المحاسبة (আত্মসমালোচনা): কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে চূড়ান্ত হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার আগেই প্রতিদিন রাতে নিজের ভালো ও মন্দ কাজের হিসাব নিজে গ্রহণ করা। হযরত উমর (রা.) বলেন: «حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا»।
- الإحسان (ইহসান): ইবাদতে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ভাষায়: «أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ» (তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; আর যদি দেখতে না পাও, তবে বিশ্বাস রাখবে তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে দেখছেন)।
٤- أوضح مرام الرذائل الآتية: الشرك والرياء والحرص والعجب والاسراف والدياثة وسوء الظن-
[নিম্নোক্ত অসৎ গুণাবলির মর্মার্থ স্পষ্ট কর:
الشرك والرياء والحرص والعجب والاسراف والدياثة وسوء الظن-]
আত্মার ব্যাধিসমূহ (রাযায়েল) যা মুমিনের ঈমান ও আমলকে ধ্বংস করে দেয়:
- الشرك (আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব): আল্লাহর জাত, সিফাত বা ইবাদতের কোনো ক্ষেত্রে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা। এটি ক্ষমার অযোগ্য বৃহত্তম অপরাধ (إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ)।
- الرياء (লোকদেখানো আমল): মানুষের প্রশংসা বা দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ইবাদত প্রদর্শন করা। হাদিসে একে ‘শিরকে আসগর’ বা ছোট শিরক বলে অভিহিত করা হয়েছে।
- الحرص (তীব্র লোভ ও লালসা): দুনিয়ার ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও খ্যাতির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, যা মানুষকে হালাল-হারামের সীমা ভুলিয়ে দেয়। রাসুল ﷺ বলেন: “দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে ছাগলের পালে ছেড়ে দিলে যে ক্ষতি করে, সম্পদের লোভ মুমিনের দ্বীনের তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে।”
- العجب (আত্মমুগ্ধতা ও অহমিকা): নিজের জ্ঞান, সৌন্দর্য বা ইবাদতের জন্য নিজেকে অত্যন্ত বড় ও ত্রুটিমুক্ত ভাবা এবং এই নেয়ামতের জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা ভুলে যাওয়া।
- الإسراف (অপচয় ও অপব্যয়): সম্পদ বা সময়কে শরিয়তের সীমার বাইরে বা অপ্রয়োজনে অনর্থক ব্যয় করা। আল্লাহ ইরশাদ করেন: «إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ» (অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই)।
- الدياثة (দয়ূসগিরি বা আত্মমর্যাদাহীনতা): নিজের স্ত্রী, কন্যা বা অধীনস্থ নারীদের নগ্নতা, অশ্লীলতা ও ব্যভিচার দেখেও কোনো আত্মমর্যাদা বা ঈমানি আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত না হওয়া। হাদিসে এসেছে, দয়ূস জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
- سوء الظن (মন্দ ধারণা বা কুধারণা): কোনো প্রকাশ্য অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই অন্য কোনো মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অহেতুক সন্দেহ ও খারাপ ধারণা পোষণ করা। কুরআন ইরশাদ করে: «اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ»।
٥- عرف الولاية ثم بين أهميتها ومراتبها مفصلا-
[الولاية এর সংজ্ঞা দাও। বেলায়েতের গুরুত্ব ও স্তর বিস্তারিত বর্ণনা দাও।]
১. বেলায়েতের সংজ্ঞা (مفهوم الولاية):
শব্দার্থ: ‘বেলায়েত’ (الْوَلَايَةُ) শব্দের অর্থ নৈকট্য, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও অভিভাবকত্ব।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরিয়ত নির্দেশিত শর্তানুযায়ী আল্লাহ তাআলার খাঁটি আনুগত্য, মারিফাত ও ভালোবাসার মাধ্যমে বান্দার আল্লাহর বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত বন্ধু (ওলী) হওয়াকে ‘বেলায়েত’ বলে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—
«أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ – الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ» [সূরা ইউনুস: ৬২-৬৩]
অর্থাৎ: “জেনে রেখো! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলীদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না; যারা ঈমান এনেছে এবং সদা তাকওয়া অবলম্বন করে।”
২. বেলায়েতের গুরুত্ব (أهمية الولاية):
- ওলীগণ হলেন আল্লাহর বিশেষ রহমতের পাত্র এবং জমিনে হেদায়েতের আলোকবর্তিকা।
- হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—«مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ» (যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিই)। [সহিহ বুখারী]।
- তাঁদের দোয়ার বরকতে সমাজে বালা-মুসিবত দূর হয় এবং মানুষ হিদায়াত লাভ করে।
৩. বেলায়েতের স্তরসমূহ (مراتب الولاية):
- الولاية العامة (সাধারণ বেলায়েত): এটি সমস্ত সাধারণ মুমিনদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যারা বিশুদ্ধ ঈমান এনেছেন এবং কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন (اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا)।
- الولاية الخاصة (বিশেষ বেলায়েত): এটি সেই মুত্তাকী ও সালেহীন বান্দাদের জন্য, যারা শুধু ফরজ-ওয়াজিবই নয়, বরং নফল ইবাদত, সার্বক্ষণিক জিকির ও কঠোর আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর পরম নৈকট্য অর্জন করেছেন।
- আধ্যাত্মিক ব্যবস্থাপনাগত স্তর (مراتب رجال الغيب): সুফি পরিভাষায় এই উচ্চপর্যায়ের ওলীদের আধ্যাত্মিক মর্যাদাভিত্তিক বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত করা হয়, যথা:
- কুতুব (القطب) বা গাউস (الغوث): যিনি স্বীয় যুগের শীর্ষ ওলী এবং আধ্যাত্মিক জগতের মধ্যমণি।
- আবদাল (الأبدال): চল্লিশজন নির্বাচিত বিশেষ ওলী, যাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ জমিনের ভারসাম্য রক্ষা করেন।
- আওতাদ (الأوتاد): চারজন প্রধান ওলী, যাঁরা চার দিকের স্তম্ভস্বরূপ।
- নুক্বাবা ও নুজাবা (النقباء والنجباء): জনগণের আত্মিক সংশোধনে নিয়োজিত বিশিষ্ট সাধকবৃন্দ।
٦- عرف بالشيخ ثم بين شروط الشيخ الكامل وآداب المريدين-
[শায়খের পরিচয় দাও। শায়খে কামিলের শর্ত ও মুরিদানের আদাব বর্ণনা কর।]
১. শায়খের পরিচয় (مفهوم الشيخ):
তাসাওউফের পরিভাষায় ‘শায়খ’ (বা পীর/মুর্শিদ) হলেন এমন একজন আধ্যাত্মিক গুরু ও পথপ্রদর্শক, যিনি নিজে শরিয়ত ও মারিফতের পরিপূর্ণ শিক্ষা অর্জন করে কোনো কামিল পীরের সাহচর্যে থেকে আত্মশুদ্ধি লাভ করেছেন এবং সাধারণ মানুষকে আল্লাহর পথের সন্ধান ও তারবিয়াত দেওয়ার ক্ষমতা ও ইজাযতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
২. শায়খে কামিলের অপরিহার্য শর্তাবলি (شروط الشيخ الكامل):
ইমাম গাজ্জালী ও শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) শায়খে কামিল হওয়ার জন্য চারটি মূল শর্ত উল্লেখ করেছেন:
- বিশুদ্ধ শরয়ি জ্ঞান (العلم الشرعي): শায়খকে অবশ্যই কুরআন, সুন্নাহ ও জরুরি ফিকহি আহকামের গভীর জ্ঞানী আলেম হতে হবে; অজ্ঞ বা জাহেল ব্যক্তি কখনো মুর্শিদ হতে পারে না।
- সুদৃঢ় তাকওয়া ও আমল (التقوى والعمل): তিনি কেবল কথার প্রচারক হবেন না, বরং তাঁর আমল হবে সুন্নাহর হুবহু বাস্তব নমুনা। তিনি সমস্ত বিদআত ও কবিরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকবেন।
- কামিল শায়খের সাহচর্য ও খেলাফত (الصحبة والإجازة): তিনি কোনো যোগ্য হক্কানী পীরের সান্নিধ্যে দীর্ঘকাল আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং শিষ্যদের হেদায়েতের খেলাফত বা সনদপ্রাপ্ত হয়েছেন।
- দুনিয়াবিমুখতা ও নিরাসক্তি (الزهد في الدنيا): তিনি মুরিদদের কাছ থেকে ধনসম্পদ বা দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিলের প্রত্যাশী হবেন না; তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
৩. মুরিদানের আদাব ও কর্তব্য (آداب المريدين):
- শায়খের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও সম্মান: মনে বিশ্বাস রাখা যে, আমার আত্মিক চিকিৎসার জন্য বর্তমান শায়খই সবচেয়ে উপযুক্ত।
- নির্দেশ পালন ও তাসলিম: শায়খের শরিয়তসম্মত নসিহত ও অজিফা নিষ্ঠার সাথে পালন করা।
- আপত্তি পরিহার করা: শায়খের কোনো অভ্যন্তরীণ কর্ম তাৎক্ষণিক বোধগম্য না হলেও হযরত খিজির (আ.) ও মূসা (আ.)-এর ঘটনার মতো অযথা তর্ক বা আপত্তি উত্থাপন না করা।
- গোপন ত্রুটি প্রকাশ করা: চিকিৎসকের কাছে যেমন রোগ লুকাতে নেই, তেমনি নিজের মনের কুচিন্তা ও ওয়াসওয়াসা শায়খের কাছে অকপটে তুলে ধরে আত্মিক ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করা।
٧- اكتب نبذة عن ترجمة الشيخ أحمد السرهندى ثم تحدث عن أعماله الدعوية-
[শায়খ আহমাদ সারহিন্দি (রহ) এর জীবনী সংক্ষেপে লেখ এবং তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রম সম্পর্কে আলোচনা কর।]
১. শায়খ আহমাদ সারহিন্দির সংক্ষিপ্ত জীবনী:
- নাম ও উপাধি: তাঁর নাম আহমাদ ইবনে আব্দুল আহাদ ফারুকী সারহিন্দি (৯৭১–১০৩৪ হি. / ১৫৬৪–১৬২৪ খ্রি.)। তিনি হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর বংশধর ছিলেন। হিজরি দ্বিতীয় সহস্রাব্দে ইসলামি রেনেসাঁ সৃষ্টির জন্য তাঁকে “মুজাদ্দিদে আলফে সানী” (مجدد الألف الثاني) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
- জন্ম ও শিক্ষা: তিনি ভারতের পাঞ্জাবের সারহিন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় পিতা এবং কাশ্মীরের প্রখ্যাত আলেমদের নিকট হাদিস, তাফসির ও যুক্তিবিদ্যা অধ্যয়ন করেন।
- আধ্যাত্মিক বায়আত: তিনি দিল্লিতে আগমন করে প্রখ্যাত নকশবন্দী সাধক হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এর হাতে বায়আত হন এবং অল্প সময়ের মধ্যে নকশবন্দিয়া সিলসিলার প্রধান খলিফা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
২. তাঁর ঐতিহাসিক দাওয়াতি ও সংস্কারমূলক কার্যক্রম (أعماله الدعوية):
- ‘দ্বীনে ইলাহী’র বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিরোধ: মুঘল সম্রাট আকবর ইসলাম, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের সংমিশ্রণে যে ভ্রান্ত ও কুফরি মতবাদ ‘দ্বীনে ইলাহী’ চালু করেছিল এবং রাজদরবারে সিজদায়ে তাহিয়্যাহ বাধ্যতামূলক করেছিল—মুজাদ্দিদে আলফে সানী তাঁর বিরুদ্ধে একাকী রুখে দাঁড়ান।
- কারাবরণ ও আত্মমর্যাদা: সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি সম্রাটকে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তাঁকে গোয়ালিয়র দুর্গে দীর্ঘ দুই বছর কারাবন্দী থাকতে হয়। তাঁর অবিচল ঈমানি দৃঢ়তা দেখে পরবর্তীতে জাহাঙ্গীর খাঁটি তওবা করে তাঁর মুরিদ হন এবং ইসলামি শরিয়তের হুকুম পুনরুজ্জীবিত করেন।
- ‘মাকতূবাতে ইমামে রব্বানী’ ও বৈপ্লবিক চিঠি: তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের শীর্ষ সেনাপতি, উজির ও আমলাদের নিকট শত শত বিশ্লেষণমূলক পত্র (মাকতূবাত) প্রেরণ করেন। এই চিঠিগুলো দরবারের নীতি পরিবর্তন করে পুরো সাম্রাজ্যে শরিয়তের পুনর্জাগরণ ঘটায়।
- ওয়াহদাতুশ শুহুদের দর্শন প্রতিষ্ঠা: তৎকালীন সুফি সমাজে প্রচলিত ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ (সর্বেশ্বরবাদ)-এর চরম অপব্যাখ্যা দূর করে তিনি কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ‘ওয়াহদাতুশ শুহুদ’ (একমাত্র স্রষ্টার প্রত্যক্ষ অবলোকন)-এর অকাট্য তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
- সুফিবাদকে শরিয়তের অধীনে ফিরিয়ে আনা: তিনি কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেন—যে আধ্যাত্মিকতা শরিয়তের সামান্যতম নির্দেশের পরিপন্থী, তা যিন্দিকি ও শয়তানি গোমরাহী ছাড়া কিছু নয়।
٨- اكتب ترجمة خواجه معين الدين الجشتى (رح)-
[খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী (রহ) এর জীবনী লেখ।]
১. জন্ম ও প্রাথমিক জীবন:
সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনউদ্দীন হাসান চিশতী সাঞ্জারী আজমিরী (রহ.) (৫৩৭–৬৩৩ হি. / ১১৪১–১২৩৬ খ্রি.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রধানতম প্রচারক। তিনি সিজিস্তানের (বর্তমান সিস্তান, ইরান) সাঞ্জার নামক স্থানে এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি পিতা-মাতাকে হারান।
২. বৈরাগ্য ও আধ্যাত্মিক দীক্ষা:
একদা এক মহান বুজুর্গ ইব্রাহিম কান্দুজীর সান্নিধ্যে তাঁর অন্তরে বৈরাগ্য জাগ্রত হয়। তিনি পৈতৃক বাগান ও পানির কল বিক্রি করে সমস্ত সম্পদ গরিবদের মাঝে দান করে ইলমের অন্বেষণে বোখারা ও সমরকন্দ গমন করেন। পরবর্তীতে তিনি নিশাপুরের হারুন নামক স্থানে গিয়ে মহান চিশতীয়া সাধক হযরত খাজা উসমান হারুনী (রহ.)-এর হাতে বায়আত হন এবং একটানা বিশ বছর গুরুর খেদমতে নিয়োজিত থাকেন।
৩. ভারতে আগমন ও আজমিরে ইসলাম প্রচার:
- মদিনা মুনাওয়ারায় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রওজা মোবারকে আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা লাভ করে তিনি ভারতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
- তিনি লাহোরে এসে হযরত দাতা গঞ্জেবখশ আলী হাজভেরীর মাজারে চিল্লাকশি করেন এবং তাঁর প্রশংসায় অমর শের আবৃত্তি করেন:
«گنج بخش فیض عالم مظهر نور خدا / ناقصاں را پیر کامل کاملاں را رہنما» - ১১৯২ সালে তিনি তৎকালীন হিন্দু সংস্কৃতির শক্ত ঘাঁটি রাজস্থানের আজমিরে এসে আস্তানা স্থাপন করেন। রাজা পৃথ্বীরাজের বাধা সত্ত্বেও তিনি পরম ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে ইসলাম প্রচার শুরু করেন।
৪. কৃতিত্ব ও ওফাত:
তাঁর অনুপম চরিত্র, মানবপ্রেম ও অলৌকিক ব্যক্তিত্বের কারণে লাখ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের দলিত মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি ভারতে চিশতিয়া তরীকার ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। ৬৩৩ হিজরীর ৬ রজব তিনি ৯৭ বছর বয়সে আজমিরে ইন্তেকাল করেন। প্রতি বছর তাঁর পবিত্র মাজারে ওরস মোবারক উদযাপিত হয়।
مجموعة (ب) : الأسئلة الموجزة والتحليلية (গ্রুপ ‘খ’ – সংক্ষিপ্ত ও পরিভাষাগত প্রশ্নাবলি)
[الملاحظة: أجب عن أربعة أسئلة من هذه المجموعة. الدرجات: ৪ × ৫ = ২০]
(পরীক্ষার্থীদের সেরা নম্বর প্রাপ্তির সুবিধার্থে গ্রুপ ‘খ’-এর ৮টি প্রশ্নের সবগুলোরই গভীর প্রামাণ্য উত্তর প্রস্তুত করা হলো।)
٩- ما المكاشفة والمشاهدة؟
[مكاشفة ও مشاهدة কী?]
সুফি পরিভাষায় ‘মুকাশাফা’ ও ‘মুশাহাদা’ হলো অন্তরের অদৃশ্য জগতে প্রবেশ ও পরম সত্য প্রত্যক্ষ করার দুটি উচ্চতম স্তর:
- المكاشفة (আল-মুকাশাফা): আভিধানিক অর্থ উন্মোচন বা আবরণমুক্ত করা। পারিভাষিক অর্থে—প্রমাণ ও যুক্তির মুখাপেক্ষী না হয়ে অন্তর্দৃষ্টির (কাশফ) মাধ্যমে বান্দার সামনে অদৃশ্য আধ্যাত্মিক সত্য, হাকিকত ও রহস্যাবলি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যাওয়া। এটি অন্তরের এক পরম ঐশী উপলব্ধি।
- المشاهدة (আল-মুশাহাদা): আভিধানিক অর্থ প্রত্যক্ষ দর্শন করা। এটি মুকাশাফার চেয়েও উচ্চতর স্তর। সাধকের হৃদয়ে যখন মহান আল্লাহর অনন্ত মহিমা, কুদরত ও সৌন্দর্যের এমন প্রত্যক্ষ উপস্থিতি অনুভব হয় যেন তিনি অন্তরের চোখ দিয়ে আল্লাহকে প্রত্যক্ষ করছেন (যেমনটি হাদিসে জিবরীলে ইহসানের ব্যাখ্যায় এসেছে: «أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ»)। এতে সৃষ্টিজগতের সমস্ত অস্তিত্ব সাধকের দৃষ্টি থেকে মিলিয়ে যায়।
١٠- ما حقيقة الخشوع والرضاء؟
[خشوع ও رضاء এর মর্মার্থ কী?]
- الخشوع (খুশু বা বিনম্র সমর্পণ): অন্তরে আল্লাহর অপরিসীম ভয় ও মহত্ব জাগ্রত রেখে দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে স্থির, শান্ত ও অনুগত রাখা। সালাতে দৃষ্টি নত রাখা, অন্তরের একাগ্রতা এবং বিনয়ের সাথে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান থাকাই হলো খুশুর হাকিকত। কুরআন মুমিনদের সফলতার মূল ভিত্তি হিসেবে খুশুকে চিহ্নিত করেছে: «الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ»।
- الرضاء (রেযা বা সন্তুষ্টি): আল্লাহর যেকোনো ফয়সালা, তাকদীর ও ভাগ্যের ভালো-মন্দের ওপর মনে বিন্দুমাত্র ক্ষোভ বা আক্ষেপ না রেখে পরম আনন্দে সন্তুষ্ট থাকা। সুফিরা বলেন: রেযা হলো আল্লাহর ভালোবাসার সর্বোচ্চ চূড়া, যেখানে বান্দা বলে—”আমি আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে পেয়ে পরম সন্তুষ্ট” (رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا)।
١١- ما الغيبة والنميمة؟
[غيبة ও نميمة কী?]
ইসলামী শরিয়তে গিবত ও নামীমা হলো কবিরা গুনাহ এবং সামাজিক বিপর্যয়ের মূল কারণ:
- الغيبة (গিবত বা পরনিন্দা): কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কোনো সত্য দোষ বা ত্রুটির কথা আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের স্পষ্ট জানিয়েছেন—«ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ» (তোমার ভাইয়ের এমন বিষয়ে আলোচনা করা যা সে অপছন্দ করে)। আর যা তার মাঝে নেই তা বললে তা হবে তোহমত বা মিথ্যা অপবাদ। কুরআন একে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সাথে তুলনা করেছে।
- النميمة (নামীমা বা চোগলখোরী): সমাজে বিশৃঙ্খলা, শত্রুতা ও ফিতনা সৃষ্টি করার অসৎ উদ্দেশ্যে একজনের গোপন কথা বা কটূক্তি অপরের কানে পৌঁছে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ ﷺ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ» (চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না)। [সহিহ বুখারী]।
١٢- اكتب حديثا حول أهمية إصلاح القلب-
[ইসলাহুল ক্বালব এর গুরুত্ব বিষয়ে একটি হাদিস লেখ।]
হৃদয় বা অন্তর সংশোধনের অপরিসীম গুরুত্ব সম্পর্কে সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে হযরত নোমান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত সুবিখ্যাত হাদিসটি উদ্ধৃত হলো:
«أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ»
[সহিহ বুখারী: ৫২, সহিহ মুসলিম: ১৫৯৯]
হাদিসের তাৎপর্য ও শিক্ষা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
“জেনে রেখো! মানবদেহের অভ্যন্তরে এমন একটি গোশতের টুকরো রয়েছে, যা যদি সুস্থ ও সংশোধিত থাকে তবে সমগ্র দেহই সুস্থ ও সৎ থাকে; আর তা যদি নষ্ট ও কলুষিত হয়ে যায় তবে সমগ্র দেহই নষ্ট হয়ে যায়। সাবধান! সেই অঙ্গটিই হলো ক্বালব (অন্তর)।”
এই হাদিস প্রমাণ করে যে, সমস্ত বাহ্যিক আমলের শুদ্ধতা ও মানবচরিত্রের উৎকর্ষ সম্পূর্ণভাবে অন্তরের পবিত্রতা ও ইসলাহুল কালবের ওপর নির্ভরশীল।
١٣- عرف بالطريقة النقشبندية موجزا-
[নকশবন্দিয়া তরীকার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।]
১. প্রতিষ্ঠাতা ও নামকরণ:
নকশবন্দিয়া তরীকা হলো সুফিবাদের চার প্রধান সিলসিলার অন্যতম। এর মূল প্রতিষ্ঠাতা হলেন বোখারার মহান সাধক হযরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ বোখারী (রহ.) (৭১৭–৭৯১ হি.)। ‘নকশবন্দ’ শব্দের অর্থ অন্তরে আল্লাহর নামের চিরস্থায়ী নকশা বা ছাপ অঙ্কনকারী।
২. তরীকার অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর সাথে সংযোগ: একমাত্র নকশবন্দিয়া সিলসিলাই রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়েছে (অন্যান্য সিলসিলা হযরত আলীর মাধ্যমে এসেছে)।
- জিকরে খফী (নীরব জিকির): এ তরীকার প্রধান আমল হলো উচ্চৈঃস্বরে জিকিরের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে অন্তরের গভীরে ধ্যানমগ্ন হয়ে ‘জিকরে খফী’ ও মোরাকাবা করা।
- শরিয়ত ও সুন্নাহর পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ: এ তরীকা গান-বাজনা (সামা), নাচ বা শরিয়তবিরোধী আচারকে সম্পূর্ণ পরিহার করে সুন্নাতের কঠোর অনুসরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
- পবিত্র মূলনীতি: এ তরীকার ১১টি সুপ্রসিদ্ধ আধ্যাত্মিক মূলনীতি রয়েছে, যার মধ্যে হুঁশ দর দম (প্রতিটি নিঃশ্বাসে সচেতনতা), নজর বর কদম (দৃষ্টি পায়ের ওপর রাখা) এবং খিলওয়াত দর আঞ্জুমান (জনসমুদ্রে থেকেও অন্তরে আল্লাহর সাথে নির্জনতা) অন্যতম।
١٤- بين نبذة عن وظائف الطريقة المجددية-
[মুজাদ্দেদি তরিকার অজিফা সংক্ষেপে বর্ণনা কর।]
মুজাদ্দেদে আলফে সানী হযরত শায়খ আহমাদ সারহিন্দী (রহ.) প্রবর্তিত নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া সিলসিলার প্রধান আধ্যাত্মিক অজিফা ও সাধনাপদ্ধতি নিম্নরূপ:
- লাতায়িফে সিত্তা (ছয়টি সূক্ষ্ম আত্মিক কেন্দ্র) জাগ্রতকরণ: মানবদেহের নির্দিষ্ট ছয়টি আধ্যাত্মিক লতিফা—ক্বালব (হৃদয়), রুহ (আত্মা), সিরর (রহস্য), খফী (গুপ্ত), আখফা (নিগূঢ়) এবং নফস (প্রবৃত্তি)-এর মোরাকাবার মাধ্যমে সেগুলোকে আল্লাহর নূরে আলোকিত ও জিকিরময় করা।
- নফী ও ইছবাত (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)-এর মোরাকাবা: নিঃশ্বাস বন্ধ করে অন্তরে ‘লা ইলাহা’ বলে সমস্ত গায়রুল্লাহর আসক্তি ধ্বংস করা এবং ‘ইল্লাল্লাহ’ দ্বারা অন্তরের জমিনে আল্লাহর ভালোবাসাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
- দৈনিক ইস্তিগফার ও দরূদ শরীফ: প্রত্যহ নিয়মিতভাবে কমপক্ষে ১০০ বা ততোধিক বার ইস্তিগফার এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করা।
- খতমে খাজেগান ও রাবেতায়ে শায়খ: সুশৃঙ্খলভাবে সম্মিলিত মোরাকাবা সম্পাদন এবং অন্তরে কামিল শায়খের ফয়েয ও আধ্যাত্মিক সংযোগ (রাবেতা) স্থাপন করা।
١٥- عرف بالكتاب “الرسالة القشيرية” موجزا-
[আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ এর পরিচয় সংক্ষেপে তুলে ধর।]
১. গ্রন্থ ও গ্রন্থকারের পরিচয়:
আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ (الرسالة القشيرية في علم التصوف) তাসাওউফ শাস্ত্রের সর্বাপেক্ষা প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য মৌলিক আকর গ্রন্থ। এর রচয়িতা হলেন নিশাপুরের যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও সুফি ইমাম আবুল কাসিম আব্দুল কারীম ইবনে হাওয়াযিন আল-কুশাইরী (রহ.) (৩৭৬–৪৬৫ হি.)।
২. রচনার প্রেক্ষাপট ও মূল বিষয়বস্তু:
- ভ্রান্ত সুফিবাদ ও বিদআত প্রতিরোধ: তৎকালীন যুগে কিছু ভণ্ড ও ছদ্মবেশী সুফি শরিয়তের বিধানকে অবহেলা করে লামাযহাবী ও ইবাহাতিয়্যাহ (স্বৈরাচারী প্রবৃত্তি) প্রচার করছিল। ইমাম কুশাইরী সুফিবাদকে রক্ষা করার জন্য ৪৩৭ হিজরীতে এই ঐতিহাসিক পত্রটি রচনা করেন।
- গ্রন্থের কাঠামো: গ্রন্থটির প্রধান দুটি অংশ রয়েছে—
- প্রথম অংশে জগতবিখ্যাত ৮৩ জন মহান সুফি মনীষীর জীবনী ও তাঁদের শরিয়তসম্মত বাণী সংকলিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে প্রকৃত সুফিগণ ছিলেন সুন্নাহর চরম অনুসারী।
- দ্বিতীয় অংশে তাসাওউফের ২৭টি মৌলিক পরিভাষা (ওয়াকত, হাল, মাকাম, কবয, বাস্ত ইত্যাদি) এবং আত্মশুদ্ধির বিভিন্ন স্তর কুরআন ও হাদিসের আলোকে সুবিন্যস্তভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
- এটি পরবর্তীকালে ইমাম গাজ্জালীর ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন সহ সমস্ত সুফি সাহিত্যের প্রধান দিকনির্দেশক হিসেবে সমাদৃত হয়।
١٦- اكتب أسماء خمس مؤلفات في التصوف-
[তাসাওউফ বিষয়ে পাঁচটি গ্রন্থের নাম লেখ।]
ইসলামের ইতিহাসে তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধি শাস্ত্রের সুবিখ্যাত পাঁচটি মৌলিক ও বিশ্বনন্দিত গ্রন্থের নাম ও রচয়িতা:
| ক্রম | গ্রন্থের নাম (اسم الكتاب) | গ্রন্থকারের নাম (اسم المؤلف) | গ্রন্থের মৌলিক গুরুত্ব |
|---|---|---|---|
| ১ | إحياء علوم الدين (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন) | ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) [মৃত্যু: ৫০৫ হি.] | শরিয়ত ও তাসাওউফের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষীয় সমন্বয় গ্রন্থ। |
| ২ | الرسالة القشيرية (আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ) | ইমাম আবুল কাসিম আব্দুল কারীম আল-কুশাইরী (রহ.) [মৃত্যু: ৪৬৫ হি.] | সুফি পরিভাষা ও সুফিয়া-ই-কেরামের আকীদার প্রামাণ্য সংবিধান। |
| ৩ | قوت القلوب في معاملة المحبوب (ক্বূতুল ক্বুলূব) | ইমাম আবু তালিব আল-মাক্কী (রহ.) [মৃত্যু: ৩৮৬ হি.] | আত্মার খোরাক ও ইবাদতের আন্তরিকতা বিষয়ক প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। |
| ৪ | كشف المحجوب (কাশফুল মাহজুব) | হযরত দাতা গঞ্জেবখশ আলী আল-হাজভেরী (রহ.) [মৃত্যু: ৪৬৫ হি.] | ফারসি ভাষায় রচিত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম ও বিখ্যাত সুফি ক্লাসিক। |
| ৫ | التعرف لمذهب أهل التصوف (আত-তাআররুফ লি মাযহাবি আহলিত তাসাওউফ) | ইমাম আবু বকর মুহাম্মদ আল-কালাবাযী (রহ.) [মৃত্যু: ৩৮০ হি.] | আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সাথে সুফিবাদের পূর্ণ ঐকমত্য প্রমাণের প্রাচীন দলিল। |
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের التصوف (তাসাওউফ) বিষয়ের কোড ও মান বণ্টন কী?
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ফাজিল ৪র্থ বর্ষের التصوف বিষয়ের কোড হলো ২০১৮০৪ (পরীক্ষা কোড ২০৮, প্রশ্নপত্র কোড ১১৪)। পূর্ণমান ৮০; যার মধ্যে গ্রুপ ‘ক’-তে ১৫ নম্বরের ৪টি বিশদ প্রশ্ন (৬০ নম্বর) এবং গ্রুপ ‘খ’-তে ৫ নম্বরের ৪টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (২০ নম্বর) উত্তর দিতে হয়।
২. তাসাওউফের পারিভাষিক অর্থ ও মূল উদ্দেশ্য কী?
কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে অন্তর থেকে সমস্ত অসৎ স্বভাব (রিয়া, অহংকার, লোভ) দূর করে আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং অন্তরে সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মোরাকাবার অনুভূতি (ইহসান) জাগ্রত করাই তাসাওউফের মূল উদ্দেশ্য।
৩. সুফি পরিভাষায় ‘মাকাম’ ও ‘হাল’-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
‘মাকাম’ হলো সাধকের নিজস্ব চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে অর্জিত স্থায়ী আত্মিক স্তর (যেমন তওবা ও সবর); পক্ষান্তরে ‘হাল’ হলো কোনো চেষ্টা ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্তরে অবতীর্ণ হওয়া ক্ষণস্থায়ী ঐশী অনুভূতি বা আবেগ।
৪. শায়খ আহমাদ সারহিন্দি (রহ.)-কে কেন ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ বলা হয়?
সম্রাট আকবরের বাতিল ধর্ম ‘দ্বীনে ইলাহী’ এবং সর্বেশ্বরবাদের ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে হিজরি দ্বিতীয় সহস্রাব্দে তিনি ভারতবর্ষে খাঁটি কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ইসলামি শরিয়তের ঐতিহাসিক নবজাগরণ ঘটান বলে তাঁকে ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানী’ বলা হয়।
৫. নকশবন্দিয়া তরীকার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ কী কী?
নকশবন্দিয়া তরীকা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর সাথে সম্পর্কিত, এতে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে অন্তরের গভীরে ‘জিকরে খফী’ করা হয় এবং এটি গান-বাজনা পরিহার করে সুন্নাহর কঠোর অনুসরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
৬. ইমাম কুশাইরীর ‘আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ’ গ্রন্থটির মূল গুরুত্ব কী?
ইমাম কুশাইরী তৎকালীন ভণ্ড ও ছদ্মবেশী সুফিদের বিভ্রান্তি দূর করতে ৮৩ জন প্রখ্যাত সুফির জীবনী ও সুফি পরিভাষাসমূহ সংকলন করে প্রমাণ করেন যে, খাঁটি সুফিবাদ ও ইসলামি শরিয়ত একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।