জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তাফসীর বিগাইরিস-সানাদ-২ (At-Tafsir bi Ghayris-Sanad-2) – 201302, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৩য় বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১১৯ মিনিট পড়ার সময়
৬ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

اختبار السنة الثالثة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۳ م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
القرآن والدراسات الإسلامية
[আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
التفسير بدون السند – ۲
[আত-তাফসীর বিগাইরিস-সানাদ-২]
বিষয় কোড: ২০১৩০২ | পরীক্ষা কোড: ২০৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০

الملاحظة: أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ থেকে পাঁচটি এবং (খ) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]


مجموعة (أ) – ক-বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)

الدرجات: ١٤ × ٥ = ٧٠
(ترجم الآيات الكريمة ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)

١- أَتَىٰ أَمْرُ اللَّهِ فَلَا تَسْتَعْجِلُوهُ ۚ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَىٰ عَمَّا يُشْرِكُونَ – يُنَزِّلُ الْمَلَائِكَةَ بِالرُّوحِ مِنْ أَمْرِهِ عَلَىٰ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ أَنْ أَنذِرُوا أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاتَّقُونِ – خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ ۚ تَعَالَىٰ عَمَّا يُشْرِكُونَ –

[১. আল্লাহর আদেশ এসে গেছে, অতএব এর জন্য তাড়াহুড়ো করো না। তারা যাদের শরিক করে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র ও বহু ঊর্ধ্বে। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশে রুহ (ওহি) সহ ফেরেশতা প্রেরণ করেন এই মর্মে যে, তোমরা সতর্ক করো—নিশ্চয় আমি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; অতএব আমাকে ভয় করো। তিনি যথাযথ উদ্দেশ্যে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন; তারা যাকে শরিক করে তিনি তার বহু ঊর্ধ্বে।]

(أ) مَا الْمُرَادُ بِالرُّوحِ؟ بَيِّنْ –

[(ক) ‘রুহ’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? ব্যাখ্যা কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহলের সূচনালগ্নে মহান আল্লাহ তাঁর একত্ববাদ, ক্ষমতা এবং ওহি প্রেরণের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। আলোচ্য আয়াতে ব্যবহৃত ‘আর-রুহ’ (الرُّوحِ) শব্দটি কুরআনিক পরিভাষায় অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। মুফাসসিরীনে কিরাম এই শব্দের গভীর তাত্পর্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

الرُّوحِ (রুহ)-এর অর্থ ও উদ্দেশ্য

মুফাসসিরগণের মতে আলোচ্য আয়াতে ‘রুহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো:

  1. ওহি ও নবুওয়ত (الوحي والنبوة): জমহুর মুফাসসিরীন যেমন ইমাম তাবারী, ইবনে কাসীর ও আল্লামা কুরতুবী (রহ.)-এর মতে, এখানে ‘রুহ’ অর্থ হলো ওহি (Divine Revelation), নবুওয়ত ও আসমানী কিতাব। শারীরিক রুহ বা আত্মা যেমন মৃত বা নির্জীব দেহকে প্রাণবন্ত ও সচল করে, তেমনি আল্লাহর প্রেরিত ওহি এবং পবিত্র কুরআন আত্মিক ও নৈতিকভাবে মৃত মানবসমাজকে নবজীবন দান করে হেদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত করে। এ কারণেই ওহিকে রূপকভাবে ‘রুহ’ বলা হয়েছে। যেমন সূরা আশ-শূরায় বলা হয়েছে: وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا (আর এভাবেই আমি আপনার প্রতি আমার নির্দেশে রুহ অর্থাৎ ওহি নাজিল করেছি)।
  2. হযরত জিবরীল (আ.): কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে, এখানে রুহ দ্বারা ‘রুহুল কুদুস’ অর্থাৎ হযরত জিবরীল (আ.)-কে বোঝানো হয়েছে, যিনি আল্লাহর আদেশে ফেরেশতাদের দল নিয়ে নবীদের কাছে ওহি বহন করে আনেন।
  3. আল্লাহর রহমত ও প্রজ্ঞা: এটি দ্বারা আল্লাহর বিশেষ রহমত ও এমন প্রজ্ঞাময় শিক্ষা উদ্দেশ্য, যা অন্তরের ব্যাধি দূর করে মানবজাতিকে সত্যের পথে পরিচালিত করে।

উপসংহার

বিশুদ্ধতম ও সর্বসম্মত মত হলো, আলোচ্য আয়াতে ‘রুহ’ দ্বারা ওহি ও আসমানী বাণীকেই নির্দেশ করা হয়েছে, যা মানবজাতিকে জাহিলিয়াতের অন্ধকার ও আত্মিক মৃত্যু থেকে চিরন্তন জীবনের আলোকবর্তিকা প্রদর্শন করে।


(ب) بَيِّنْ سَبَبَ نُزُولِ هَٰذِهِ الْآيَاتِ الْكَرِيمَةِ –

[(খ) এই বরকতময় আয়াতসমূহের শানে নুযুল বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার পেছনে বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ বিদ্যমান, যাকে তাফসীরের পরিভাষায় ‘শানে নুযুল’ (سبب النزول) বলা হয়। সূরা আন-নাহলের প্রথম আয়াতটির অবতরণ প্রেক্ষাপট মক্কার মুশরিকদের উপহাস ও অস্বীকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শানে নুযুল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ইমাম বাগাভী, ইবনে জারীর তাবারী ও ইবনে কাসীর (রহ.) নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণনা করেছেন:

  • রাসূলুল্লাহ (স.) যখন মক্কায় কাফের ও মুশরিকদের কিয়ামতের ভয়াবহ শাস্তি, আল্লাহর গজব এবং বদরের ন্যায় ঐতিহাসিক পরাজয়ের ভীতি প্রদর্শন করতেন, তখন মক্কার উদ্ধত কাফেররা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে বলত: “হে মুহাম্মদ! তোমার সেই প্রতিশ্রুত আযাব ও কিয়ামত কেন আসছে না? সত্যবাদী হলে তা এখনই নিয়ে আসো!” যেমন তারা বলত: اللَّهُمَّ إِن كَانَ هَٰذَا هُوَ الْحَقَّ مِنْ عِندِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِّنَ السَّمَاءِ (হে আল্লাহ! এটা যদি তোমার পক্ষ থেকে সত্য হয়, তবে আমাদের ওপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করো)।
  • কাফেরদের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ তাড়া ও অবজ্ঞার জবাবে মহান আল্লাহ সূরা আন-নাহলের প্রারম্ভে এই আয়াত অবতীর্ণ করেন: أَتَىٰ أَمْرُ اللَّهِ فَلَا تَسْتَعْجِلُوهُ অর্থাৎ “আল্লাহর আদেশ এসে গেছে, অতএব তোমরা এর জন্য তাড়াহুড়ো করো না।”
  • আরবি ব্যাকরণে ভবিষ্যৎ ঘটনা অবশ্যম্ভাবী ও নিশ্চিত বোঝাতে অতীতকাল (فعل ماض) ব্যবহৃত হয়। এখানে ‘আতা’ (أتى – এসেছে) অতীতকালের শব্দ দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আল্লাহর আযাব ও কিয়ামত এমনভাবে সমাগত ও নির্ধারিত যে তা ঘটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

উপসংহার

সুতরাং আলোচ্য আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার মূল কারণ ছিল কাফেরদের খোদায়ী আযাব ও কিয়ামতকে উপহাসভরে তাড়াতাড়ি তলব করার সমুচিত ও কঠোর ঐশী জবাব প্রদান করা।


٢- وَهُوَ الَّذِي سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَأْكُلُوا مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا وَتَسْتَخْرِجُوا مِنْهُ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَا وَتَرَى الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِيهِ وَلِتَبْتَغُوا مِن فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ – وَأَلْقَىٰ فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ وَأَنْهَارًا وَسُبُلًا لَّعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ – وَعَلَامَاتٍ ۚ وَبِالنَّجْمِ هُمْ يَهْتَدُونَ –

[২. আর তিনিই সেই সত্তা যিনি সমুদ্রকে বশীভূত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা গোশত (মাছ) খেতে পারো এবং তা থেকে বের করতে পারো অলংকার যা তোমরা পরিধান করো। আর তোমরা দেখতে পাও তা চিরে নৌযান চলাচল করে, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পারো এবং যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। আর তিনি জমিনে সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন যেন তা তোমাদের নিয়ে হেলেদুলে না যায়, এবং নদ-নদী ও পথসমূহ তৈরি করেছেন যাতে তোমরা পথ পেতে পারো। এবং তিনি বহু দিকচিহ্ন স্থাপন করেছেন; আর নক্ষত্রপুঞ্জের সাহায্যেও তারা পথ পায়।]

(أ) فَسِّرْ قَوْلَهُ تَعَالَىٰ : “وَأَلْقَىٰ فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ” –

[(ক) মহান আল্লাহর বাণী: “আর তিনি জমিনে সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন যেন তা তোমাদের নিয়ে হেলেদুলে না যায়”—এর তাফসীর কর।]

ভূমিকা

মহান রাব্বুল আলামীন মানবজাতির বসবাসের অনুকূলে এই পৃথিবীকে সুষম ও স্থির রাখার জন্য এক অনন্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। আলোচ্য আয়াতে পৃথিবীর ভৌগোলিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সুদৃঢ় পর্বতমালার ভূমিকা চমৎকার বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক শৈলীতে তুলে ধরা হয়েছে।

আয়াতটির বিস্তৃত তাফসীর ও বিশ্লেষণ

  1. শব্দার্থ বিশ্লেষণ:
    • ‘রাওয়াসি’ (رَوَاسِيَ): ‘রাসিয়াহ’ (راسية)-এর বহুবচন, যার অর্থ সুউচ্চ, ভারী ও সুদৃঢ় পর্বতমালা।
    • ‘আন তামীদা বিকুম’ (أَن تَمِيدَ بِكُمْ): ‘মায়দ’ (الميد) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ আন্দোলিত হওয়া, হেলেদুলে যাওয়া বা ভারসাম্য হারিয়ে কেঁপে ওঠা। অর্থাৎ আল্লাহ জমিনের অভ্যন্তরে ও ওপরে পাহাড় স্থাপন করেছেন যাতে জমিন মানুষকে নিয়ে হেলেদুলে অনিরাপদ না হয়ে পড়ে।
  2. তাফসীরিক ব্যাখ্যা: আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, মহান আল্লাহ যখন জমিন সৃষ্টি করলেন, তখন তা পানির ওপর ভাসমান থাকায় দুলতে ও কাঁপতে শুরু করে। তখন আল্লাহ বিশাল ও সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করে একে পেরেক বা পেরেকের মতো গেঁথে দিয়ে স্থির ও অটল করে দেন। যেমন সূরা আন-নাবায় ইরশাদ হয়েছে: وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا (এবং আমি পাহাড়সমূহকে পেরেকস্বরূপ স্থাপন করেছি)।
  3. আধুনিক ভূতত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্য: আধুনিক ভূতত্ত্ববিজ্ঞান (Geology) প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীর ভূত্বকের টেকটোনিক প্লেটগুলোর ভারসাম্য রক্ষা এবং আইসোস্ট্যাসি (Isostasy) বজায় রাখার ক্ষেত্রে পর্বতমালার সুগভীর মূল (Roots) রয়েছে, যা মাটির গভীরে প্রোথিত থেকে ভূপৃষ্ঠকে অনাকাঙ্ক্ষিত দুলুনি ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। কুরআন চৌদ্দশত বছর পূর্বে এই বৈজ্ঞানিক সত্য দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছে।

উপসংহার

উক্ত আয়াতটি মহান আল্লাহর অসীম কুদরত এবং নিখিল সৃষ্টির নিখুঁত ভারসাম্য ও মহাপ্রজ্ঞার এক অনুপম নিদর্শন, যা মানবজাতিকে এক আল্লাহর প্রতি অবনত হতে উদ্বুদ্ধ করে।


(ب) مَنِ الَّذِي سَخَّرَ الْبَحْرَ؟ مَنْ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ؟ أَثْبِتْ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ –

[(খ) কে সমুদ্রকে বশীভূত করেছেন? সকল কিছুর স্রষ্টা কে? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রমাণ কর।]

ভূমিকা

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের মূলভিত্তি হলো তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও নিরঙ্কুশ সৃষ্টিকর্তৃত্ব)। মহাসমুদ্রের অপার বিস্তৃতি, এর উত্তাল তরঙ্গমালাকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করা এবং সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণকারী একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। নিম্নে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করা হলো।

সমুদ্র বশীভূতকারী এবং সর্বস্রষ্টার পরিচয়

মহাসমুদ্রকে মানুষের কল্যাণে বশীভূতকারী এবং সমগ্র মহাবিশ্ব ও এর প্রতিটি অণু-পরমাণুর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কোনো দেবী, প্রাকৃতিক শক্তি বা কল্পিত উপাস্যের এতে বিন্দুমাত্র কর্তৃত্ব বা অংশীদারিত্ব নেই।

পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিলসমূহ

  • সমুদ্রের বশ্যতা প্রসঙ্গে: আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ইরশাদ করেন: وَهُوَ الَّذِي سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَأْكُلُوا مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا — “আর তিনিই সেই সত্তা যিনি সমুদ্রকে বশীভূত করেছেন যাতে তোমরা তা থেকে তাজা গোশত খেতে পারো।” (সূরা আন-নাহল: ১৪)। সূরা আল-জাসিয়াতে ইরশাদ হয়েছে: اللَّهُ الَّذِي سَخَّرَ لَكُمُ الْبَحْرَ لِتَجْرِيَ الْفُلْكُ فِيهِ بِأَمْرِهِ — “আল্লাহই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন যাতে তাঁর আদেশে তাতে জাহাজ চলাচল করতে পারে।” (সূরা আল-জাসিয়াহ: ১২)।
  • সকল কিছুর নিরঙ্কুশ স্রষ্টা হওয়া প্রসঙ্গে: আল্লাহ ইরশাদ করেন: اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ ۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ — “আল্লাহই সকল কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত বস্তুর তত্ত্বাবধায়ক।” (সূরা আয-যুমার: ৬২)। সূরা আল-আনআমে বলা হয়েছে: ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ فَاعْبُدُوهُ — “তিনিই আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক; তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তিনি সবকিছুর স্রষ্টা, অতএব তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করো।” (সূরা আল-আনআম: ১০২)।

পবিত্র সুন্নাহর প্রামাণ্য দলিলসমূহ

  • রাসূলুল্লাহ (স.) সমুদ্র সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন: هُوَ الطَّهُورُ مَاؤُهُ الْحِلُّ مَيْتَتُهُ — “সমুদ্র এমন এক নিয়ামত যার পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী ভক্ষণ হালাল।” (সুনানে তিরমিযী, আবু দাউদ)।
  • হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন: كَانَ اللَّهُ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ غَيْرُهُ، وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ، وَكَتَبَ فِي الذِّكْرِ كُلَّ شَيْءٍ، وَخَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ — “সর্বপ্রথমে একমাত্র আল্লাহই বিদ্যমান ছিলেন, তিনি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর, অতঃপর তিনি লাওহে মাহফুজে সবকিছু লিপিবদ্ধ করেন এবং আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেন।” (সহীহ বুখারী: ৩১৯১)।

উপসংহার

কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলাদি দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাগর-মহাসাগরকে অনুগতকারী এবং দৃশ্য-অদৃশ্য সকল অস্তিত্বের একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক একমাত্র পরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা।


٣- سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ – وَآتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَجَعَلْنَاهُ هُدًى لِّبَنِي إِسْرَائِيلَ أَلَّا تَتَّخِذُوا مِن دُونِي وَكِيلًا – ذُرِّيَّةَ مَنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ ۚ إِنَّهُ كَانَ عَبْدًا شَكُورًا –

[৩. পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের নিদর্শন প্রদর্শন করি; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। আর আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম এবং তা বনী ইসরাঈলের জন্য পথপ্রদর্শক করেছিলাম এই মর্মে যে, তোমরা আমাকে ছাড়া কাউকে কর্মবিধায়ক গ্রহণ করো না। তোমরা তাদের বংশধর যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম; নিশ্চয় তিনি ছিলেন পরম কৃতজ্ঞ বান্দা।]

(أ) لِمَاذَا لُقِّبَ الرَّسُولُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْعَبْدِ؟ بَيِّنْ –

[(ক) রাসূলুল্লাহ (স.)-কে কেন ‘আব্দ’ (বান্দা) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে? ব্যাখ্যা কর।]

ভূমিকা

পবিত্র ইসরা ও মিরাজ ইসলামের ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ও মহামহিমান্বিত মোজেজা। এই অলৌকিক ঊর্ধ্বগমনের বর্ণনায় মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ মুস্তফা (স.)-কে কোনো বিশেষ রাজকীয় উপাধিতে না ডেকে পরম স্নেহে ‘আব্দিহী’ (بِعَبْدِهِ – তাঁর বান্দা) শব্দে আখ্যায়িত করেছেন। এর পেছনে গভীর আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক রহস্য নিহিত রয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (স.)-কে ‘আব্দ’ উপাধিতে ভূষিত করার কারণ ও প্রজ্ঞা

  1. দাসত্ব বা বন্দেগীই সর্বোচ্চ মাকাম (أشرف المقامات): মহান আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসার চূড়ান্ত শিখর হলো তাঁর পূর্ণাঙ্গ বন্দেগী ও আনুগত্য (উবুদিয়্যাত)। মিরাজের মতো সর্বোচ্চ রাজকীয় সম্মানের মুহূর্তে তাঁকে ‘বান্দা’ বলে সম্বোধন করে প্রমাণ করা হয়েছে যে, আল্লাহর খাঁটি গোলাম বা বান্দা হওয়াই সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা ও গৌরবের বিষয়।
  2. শিরক ও আতিশয্য থেকে উম্মতকে রক্ষা করা: বিগত উম্মতগুলো তাদের নবীদের অলৌকিক ঘটনা দেখে বাড়াবাড়ি করে বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়েছিল। যেমন খ্রিস্টানরা হযরত ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম ও মোজেজা দেখে তাঁকে ‘আল্লাহর পুত্র’ বানিয়ে শিরকে লিপ্ত হয়। মিরাজের মতো নজিরবিহীন অলৌকিক ভ্রমণের পরও যাতে কেউ রাসূলুল্লাহ (স.)-কে খোদায়ী আসনে না বসায়, সেজন্য সুস্পষ্টভাবে তাঁকে ‘আল্লাহর বান্দা’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হলেও খালিক বা স্রষ্টা নন, বরং আল্লাহর পরম সম্মানিত বান্দা ও রাসূল।
  3. পরম নৈকট্য ও খাস ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ: আরবি ভাষায় কোনো বিশেষ ব্যক্তির প্রতি একাত্মতা প্রকাশের জন্য ‘আমার বান্দা’ (عبد) সম্বোধন করা বিশেষ নৈকট্য, কৃপা ও গভীর প্রেমের স্মারক। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত মর্যাদার সাথে রাসূল (স.)-কে নিজের বান্দা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাঁকে আপন করে নিয়েছেন।

উপসংহার

অতএব, রাসূলুল্লাহ (স.)-কে ‘আব্দ’ বলা কোনো সাধারণ বিষয় নয়, বরং এটি তাঁর সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক মর্যাদা, নিখুঁত দাসত্ব এবং শিরকমুক্ত নিখাদ একত্ববাদের এক চূড়ান্ত ঘোষণা।


(ب) هَلْ كَانَ مِعْرَاجُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْيَقَظَةِ أَمْ فِي الْمَنَامِ؟ بَيِّنْ –

[(খ) নবী করীম (স.)-এর মিরাজ কি জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল নাকি স্বপ্নে? বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসরা ও মিরাজের বাস্তব রূপ কেমন ছিল—তা কি জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে সংঘটিত হয়েছিল, নাকি তা ছিল রূহানী বা স্বপ্নযোগে কোনো ভ্রমণ—এ নিয়ে উম্মতের আলিম ও ফকীহগণের মধ্যে তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের সুপ্রতিষ্ঠিত আকিদা অনুযায়ী এর প্রামাণ্য বিশ্লেষণ নিম্নে তুলে ধরা হলো।

জাগ্রত অবস্থা ও সশরীরে মিরাজ: আহলে সুন্নতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত

সাহাবায়ে কিরামের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তাবেঈন এবং আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের ইমামগণের চূড়ান্ত ও অকাট্য সিদ্ধান্ত হলো: রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ইসরা ও মিরাজ সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে (بالروح والجسد يقظة لا مناما) সংঘটিত হয়েছিল।

জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে হওয়ার দলিলসমূহ

  • ‘আব্দ’ শব্দের ব্যবহার: আয়াতে বলা হয়েছে: أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ। আরবি ভাষায় ‘আব্দ’ শব্দটি কেবল রুহ বা আত্মার ওপর প্রযোজ্য হয় না, বরং দেহ ও আত্মা উভয়ের সমন্বিত রূপকেই ‘আব্দ’ বা ব্যক্তি বলা হয়।
  • ‘সুবহানা’ শব্দের দ্বারা সূচনা: আয়াতটি سُبْحَانَ (পরম পবিত্র ও মহিমাময়) শব্দ দ্বারা শুরু হয়েছে। আরবি শৈলীতে এমন কোনো বিস্ময়কর ও মহা অলৌকিক কাজের বিবরণে ‘সুবহানা’ বলা হয় যা সাধারণ মানব বুদ্ধির অতীত। স্বপ্নযোগে যেকোনো মানুষ যেকোনো স্থানে যেতে পারে, তাতে কোনো বিস্ময় নেই; কিন্তু এক রাতে মক্কা থেকে বায়তুল মাকদিস হয়ে সপ্তাকাশ ভ্রমণ করে ফিরে আসা সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল বলেই তা আল্লাহর অপার কুদরত ও মহিমার নিদর্শন।
  • কুরাইশদের বিস্ময় ও অস্বীকৃতি: রাসূলুল্লাহ (স.) মিরাজ থেকে ফিরে যখন এই ঘটনার বিবরণ দেন, তখন মক্কার কাফেররা তা শুনে উপহাস ও অস্বীকার করেছিল। এটি যদি কেবল রাতের স্বপ্ন হতো, তবে কাফেররা কখনো একে অসম্ভব বলে অস্বীকার বা বিদ্রূপ করত না; কারণ মানুষ স্বপ্নে যেকোনো অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখতে পারে। কাফেরদের ঘোর বিরোধিতা প্রমাণ করে যে তিনি জাগ্রত অবস্থায় শারীরিক সফরের কথাই ঘোষণা করেছিলেন।
  • ‘বুরাক’ নামক বাহনে আরোহণ: সহীহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী নবী করীম (স.)-কে ‘বুরাক’ নামক দ্রুতগামী বাহনে আরোহণ করানো হয়েছিল। বাহন কেবল শারীরিক অস্তিত্বের জন্যই প্রয়োজন হয়, নিছক স্বপ্ন বা আত্মার জন্য বাহনের প্রয়োজন পড়ে না।

উপসংহার

অতএব আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের অকাট্য আকিদা হলো, রাসূলে কারীম (স.) জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা এবং সেখান থেকে সিদরাতুল মুনতাহা হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে মিরাজ সম্পন্ন করেছিলেন।


٤- اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا – مَّنِ اهْتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا – وَإِذَا أَرَدْنَا أَن نُّهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا –

[৪. পাঠ করো তোমার আমলনামা; আজ তোমার হিসাবের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট। যে ব্যক্তি সৎপথ অবলম্বন করে, সে তো নিজের মঙ্গলের জন্যই সৎপথ অবলম্বন করে; আর যে পথভ্রষ্ট হয়, সে নিজের ধ্বংসের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। এবং কোনো বহনকারী অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না; আর আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি প্রদান করি না। আর যখন আমি কোনো জনপদ ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তার সচ্ছল বিলাসী ব্যক্তিদের নির্দেশ দেই, অতঃপর তারা সেখানে পাপাচার লিপ্ত হয়; তখন তাদের ওপর শাস্তির কথা অবধারিত হয়ে যায়, ফলে আমি তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেই।]

(أ) فَسِّرْ قَوْلَهُ تَعَالَىٰ : “اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا” –

[(ক) মহান আল্লাহর বাণী: “পাঠ করো তোমার আমলনামা; আজ তোমার হিসাবের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট”—এর তাফসীর কর।]

ভূমিকা

হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহ প্রতিটি মানুষের পার্থিব জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ কর্মকাণ্ডের আমলনামা উন্মুক্ত করে দেবেন। সেখানে কোনো জোরজুলুম থাকবে না, বরং মানুষ নিজেই নিজের কৃতকর্মের সাক্ষী হয়ে নিজের বিচার অবলোকন করবে। আলোচ্য আয়াতটি আল্লাহর চরম ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের এক অনুপম দলিল।

আয়াতটির বিস্তৃত তাফসীর

  1. আমলনামা প্রদান ও পাঠের নির্দেশ: আল্লামা ইবনে কাসীর ও কুরতুবী (রহ.) বর্ণনা করেন, কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষের গলায় ঝুলানো তার কর্মকাণ্ডের নথি (আমলনামা) বের করে তার হাতে দেওয়া হবে। তখন তাকে নির্দেশ করা হবে: اقْرَأْ كِتَابَكَ অর্থাৎ “পাঠ করো তোমার কিতাব।” দুনিয়াতে যে ব্যক্তি নিরক্ষর ছিল, কিয়ামতের দিন সেও আল্লাহর কুদরতে অনায়াসে নিজের আমলনামা পাঠ করতে সক্ষম হবে।
  2. নিজের হিসাব নিজেই করা: كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا — “আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।” বিখ্যাত তাবেঈ হযরত কাতাদাহ (রহ.) বলেন, “আল্লাহর শপথ! সেই সত্তা কতই না ইনসাফপূর্ণ বিচারক, যিনি তোমাকেই তোমার নিজের ওপর হিসাবকারী নিযুক্ত করেছেন!” মানুষ তার চোখের সামনে জীবনের প্রতিটি ভালো ও মন্দ কাজ—চাই তা অণু পরিমাণও হোক না কেন—লিপিবদ্ধ দেখে কোনো ওজর পেশ করতে পারবে না।
  3. অস্বীকারের কোনো পথ না থাকা: আমলনামা দেখে অপরাধীরা বিস্মিত হয়ে চিৎকার করে বলবে: يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا — “হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এটা কেমন কিতাব, যা ছোট বা বড় কোনো আমলই বাদ দেয়নি, সবই গণনা করে রেখেছে!” (সূরা আল-কাহাফ: ৪৯)।

উপসংহার

আয়াতটি মুমিন বান্দাকে প্রতিনিয়ত আত্মশুদ্ধি ও আত্মহিসাব (মুহাজাবা) করার তাগিদ দেয়, যেন কিয়ামতের চূড়ান্ত আদালতে আমলনামা পাঠের পূর্বে দুনিয়াতেই নিজের পরকালীন প্রস্তুতি সুদৃঢ় করা যায়।


(ب) وَضِّحْ قَوْلَهُ تَعَالَىٰ : “وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا” –

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী: “আর আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি প্রদান করি না”—স্পষ্ট কর।]

ভূমিকা

মহান আল্লাহ পরম দয়ালু ও ইনসাফের প্রতীক। তিনি কাউকে কোনো পূর্বসতর্কতা ও হেদায়াতের দাওয়াত না পৌঁছিয়ে শাস্তি দেন না। ইসলামি শরিয়তের উসূল ও কালামশাস্ত্রের এক মৌলিক নীতি এই আয়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আয়াতটির বিশ্লেষণ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

  1. হুজ্জত কায়েম করার পর শাস্তি: ইমাম তাবারী ও ইবনে কাসীর (রহ.) ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহ তাআলা কোনো জাতি বা ব্যক্তিকে শাস্তি দেন না যতক্ষণ না তিনি তাদের কাছে স্বীয় রাসূল প্রেরণ করে সত্য-মিথ্যার পথ স্পষ্ট করেন এবং তাদের ওপর আল্লাহর হুজ্জত (প্রমাণ) কায়েম করেন। রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে বান্দার আর কোনো ওজর বা অজুহাত অবশিষ্ট থাকে না। যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেন: رُّسُلًا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ — “সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে।” (সূরা আন-নিসা: ১৬৫)।
  2. ফাতরাতের যুগ ও আহলুল ফাতরাতের বিধান (أهل الفترة): দুই নবীর মধ্যবর্তী এমন যুগ যেখানে কোনো নবীর দাওয়াত পৌঁছেনি, সেই যুগের মানুষদের কালামশাস্ত্রে ‘আহলুল ফাতরাত’ বলা হয়। আশআরিয়া মতানুযায়ী, যাদের কাছে আসমানী দাওয়াত পৌঁছেনি, তারা জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ করবে না; বরং কিয়ামতের ময়দানে তাদের জন্য বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
  3. ইসলামি আইনের মূলনীতি: এই আয়াত থেকে ফিকহী একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি গৃহীত হয়েছে: “কোনো বিধান বা নির্দেশ না পৌঁছা পর্যন্ত কোনো অপরাধের শাস্তি ধার্য করা যায় না” (لا تكليف إلا بعد البلاغ)।

উপসংহার

উক্ত আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, আল্লাহর ইনসাফ পরম নিখুঁত; তিনি কাউকে সৎপথ প্রদর্শনের সুযোগ না দিয়ে এবং রাসূলের মাধ্যমে সতর্ক না করে কখনো আজাব প্রদান করেন না।


٥- وَكَذَٰلِكَ بَعَثْنَاهُمْ لِيَتَسَاءَلُوا بَيْنَهُمْ ۚ قَالَ قَائِلٌ مِّنْهُمْ كَمْ لَبِثْتُمْ ۖ قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ ۚ قَالُوا رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثْتُمْ فَابْعَثُوا أَحَدَكُم بِوَرِقِكُمْ هَٰذِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلْيَنظُرْ أَيُّهَا أَزْكَىٰ طَعَامًا فَلْيَأْتِكُم بِرِزْقٍ مِّنْهُ وَلْيَتَلَطَّفْ وَلَا يُشْعِرَنَّ بِكُمْ أَحَدًا – إِنَّهُمْ إِن يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ يَرْجُمُوكُمْ أَوْ يُعِيدُوكُمْ فِي مِلَّتِهِمْ وَلَن تُفْلِحُوا إِذًا أَبَدًا –

[৫. আর এভাবেই আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম যাতে তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তাদের একজন বলল: তোমরা কতক্ষণ অবস্থান করেছ? তারা বলল: আমরা একদিন বা দিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি। তারা বলল: তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ তা তোমাদের রবই অধিক জানেন; অতএব তোমাদের একজনকে তোমাদের এই রৌপ্যমুদ্রাসহ নগরে পাঠাও, সে যেন দেখে কোনো খাদ্যটি সর্বাধিক পবিত্র ও উৎকৃষ্ট, অতঃপর যেন সেখান থেকে কিছু খাদ্য তোমাদের জন্য নিয়ে আসে। আর সে যেন সতর্কতা অবলম্বন করে এবং কাউকে তোমাদের বিষয়ে টের পেতে না দেয়। নিশ্চয় তারা যদি তোমাদের সন্ধান পেয়ে যায়, তবে তোমাদের পাথর মেরে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে, আর তখন তোমরা কখনোই সফলকাম হবে না।]

(أ) مَا الْمُرَادُ بِقَوْلِهِ تَعَالَىٰ : “وَكَذَٰلِكَ بَعَثْنَاهُمْ لِيَتَسَاءَلُوا”؟ بَيِّنْ –

[(ক) মহান আল্লাহর বাণী: “আর এভাবেই আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম যাতে তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে”—দ্বারা কী উদ্দেশ্য? বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

সূরা আল-কাহাফে বর্ণিত আসহাবে কাহাফের ঘটনা এক অনন্য মোজেজা। দ্বীন ও ঈমান রক্ষার তাগিদে গৃহত্যাগী একদল মুমিন যুবকদের আল্লাহ তাআলা তিনশত নয় বছর এক গুহায় গভীর ঘুমে নিমগ্ন রেখেছিলেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে পুনরায় জীবিত জাগ্রত করেন। আলোচ্য আয়াতে তাদের জাগ্রত করার হিকমত বর্ণিত হয়েছে।

জাগ্রত করার উদ্দেশ্য ও তাত্পর্য

  1. পুনরুত্থানের জীবন্ত প্রমাণ স্থাপন: মুফাসসিরগণের মতে, শত শত বছর মৃতবৎ নিদ্রায় রাখার পর অক্ষত শরীরে তাদেরকে জাগ্রত করে আল্লাহ বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছেন যে, কিয়ামতের দিন কবর থেকে মৃত মানুষকে জীবিত করা আল্লাহর জন্য কত সহজ।
  2. পারস্পরিক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে বিস্ময় প্রকাশ: যুবকরা দীর্ঘ তিন শতাব্দী ঘুমালেও তাদের কাছে মনে হয়েছিল তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা অর্ধদিবস ঘুমিয়েছেন। যখন তারা একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করল: “তোমরা কতক্ষণ অবস্থান করেছ?”, তখন তাদের একজন বলল একদিন বা দিনের কিছু অংশ। কিন্তু পরে যখন তারা নিজেদের মুদ্রা নিয়ে শহরের বাজারে গেল, তখন প্রকাশ পেল যে তাদের সেই যুগ বহু আগেই অতীত হয়ে গেছে। এই কথোপকথনের মাধ্যমেই দীর্ঘ সময়ের অলৌকিকত্ব তাদের ও সমগ্র নগরবাসীর কাছে প্রকাশ পায়।
  3. আল্লাহর ক্ষমতার মহিমা প্রকাশ: মানুষ যখন গভীর ঘুমে থাকে তখন তার সময়ের অনুভূতি থাকে না। এই পারস্পরিক জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে আল্লাহর কুদরতের যে মহিমান্বিত প্রকাশ ঘটেছে, তা কিয়ামতের পুনরুত্থানকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করে।

উপসংহার

অতএব, আসহাবে কাহাফকে জাগ্রত করার মূল উদ্দেশ্য ছিল পুনরুত্থানের বাস্তবতা প্রমাণ করা এবং আল্লাহর অপার কুদরতের নিদর্শন তাদের নিজেদের মুখ দিয়েই প্রকাশ করানো।


(ب) لِمَاذَا خَافَ أَصْحَابُ الْكَهْفِ الرَّجْمَ عَلَيْهِمْ؟ بَيِّنْ –

[(খ) আসহাবে কাহাফের সদস্যগণ কেন তাদের প্রস্তরাঘাতে নিহত হওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন? বুঝিয়ে লেখ।]

ভূমিকা

আসহাবে কাহাফ যে যুগে বাস করতেন, সেই যুগের শাসনকর্তা ছিল এক অত্যাচারী ও মূর্তিপূজক সম্রাট (দিকয়ানুস)। সে প্রজাদেরকে শিরক ও মূর্তিপূজায় বাধ্য করত এবং একত্ববাদে বিশ্বাসীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাত। যুবকরা যখন জাগ্রত হয়ে খাবার আনতে নগরে লোক পাঠাচ্ছিলেন, তখন তারা চরম সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন।

প্রস্তরাঘাত (রজম)-এর ভয়ের কারণসমূহ

  1. পূর্ববর্তী অত্যাচারী পরিবেশের ভয়: আসহাবে কাহাফ ঘুম থেকে ওঠার পর ধারণা করেছিলেন যে তাদের পালিয়ে আসার পর মাত্র একদিন অতিবাহিত হয়েছে এবং তৎকালীন অত্যাচারী রাজা ও তার সৈন্যরা এখনো তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে।
  2. দ্বীন ত্যাগের ওপর বাধ্যবাধকতা: তারা জানতেন যে যদি কাফেররা তাদের সন্ধান পেয়ে যায়, তবে তাদের সামনে দুটি বিকল্প ছাড়া পথ থাকবে না:
    • পাথর মেরে নির্মমভাবে হত্যা করা (الرَّجْم): একত্ববাদের ওপর অটল থাকলে তৎকালীন মূর্তিপূজকদের আইন অনুযায়ী জনসমক্ষে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো।
    • শিরকী ধর্মে জোরপূর্বক ফিরিয়ে নেওয়া: অন্যথায় বাধ্য করা হতো মূর্তিপূজা গ্রহণ করতে। আর ঈমান হারিয়ে কাফের হওয়া মুমিনের জন্য চিরন্তন ধ্বংসের নামান্তর।
  3. গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদ: এ কারণেই তারা বাজার থেকে খাবার কেনার সময় ছদ্মবেশ ও চরম সতর্কতা (وَلْيَتَلَطَّفْ) অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে কোনোভাবেই কেউ তাদের আস্তানা শনাক্ত করতে না পারে।

উপসংহার

ঈমানকে শিরকের পঙ্কিলতা থেকে বাঁচানো এবং আল্লাহর দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার গভীর সংকল্পের কারণেই তাঁরা প্রস্তরাঘাত ও বলপ্রয়োগের চরম আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন।


٦- كهيعص – ذِكْرُ رَحْمَتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيَّا – إِذْ نَادَىٰ رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا – قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُن بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا – وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِن وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا –

[৬. কাফ-হা-ইয়া-আইন-সদ। এটি আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন তিনি তাঁর রবকে আহ্বান করেছিলেন নিভৃতে সংগোপনে। তিনি বলেছিলেন: হে আমার রব! আমার অস্থিগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বার্ধক্যে মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হয়েছে; আর হে আমার রব! আপনাকে ডেকে আমি কখনো ব্যর্থ মনোরথ হইনি। আর আমি আমার পর উত্তরাধিকারী নিয়ে শঙ্কিত, এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; অতএব আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান করুন।]

(أ) مَا الْحُرُوفُ الْمُقَطَّعَاتُ؟ بَيِّنْ –

[(ক) হুরুফে মুকাত্তাআত কী? ব্যাখ্যা কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনের মোট ২৯টি সূরার প্রারম্ভে কিছু বিচ্ছিন্ন আরবি হরফ এসেছে, যা ইসলামি পরিভাষায় ‘হুরুফে মুকাত্তাআত’ (الحروف المقطعة) নামে পরিচিত। যেমন সূরা মারিয়ামের শুরুতে এসেছে ‘কাফ-হা-ইয়া-আইন-সদ’ (كهيعص)। উলূমুল কুরআনে এই হরফগুলো অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করে।

হুরুফে মুকাত্তাআতের পরিচয় ও প্রকারভেদ

শাব্দিক অর্থ: ‘মুকাত্তাআত’ শব্দটি ‘কাত’ (قطع) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ বিচ্ছিন্ন বা পৃথক পৃথক হরফ। এই হরফগুলো মিলিয়ে পড়া হয় না, বরং পৃথকভাবে প্রতিটি হরফের নাম উচ্চারণ করে পড়তে হয়।

উলূমুল কুরআনের দৃষ্টিকোণ:

  • মুতাশাবিহাত (মহা রহস্যময় বাণী): সালাফে সালেহীন এবং ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে, এই হরফগুলো কুরআনের ‘মুতাশাবিহ’ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। এর প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য একমাত্র মহান আল্লাহই ভালো জানেন। মুমিনগণ এর প্রতি বিনাবাক্যে ঈমান আনয়ন করেন।
  • কুরআনের অলৌকিকতার চ্যালেঞ্জ: অধিকাংশ মুফাসসির যেমন ইমাম যমখশরী, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাসীর (রহ.)-এর মতে, এই হরফগুলো দ্বারা তৎকালীন আরবের পণ্ডিত সাহিত্যিকদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। কুরআন তাদেরই পরিচিত আরবি হরফ (আলিফ, বা, তা…) দিয়ে রচিত; পারলে তারা যেন এর মতো একটি সূরা রচনা করে নিয়ে আসে। অথচ তারা চরম অক্ষম প্রমাণিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে কুরআন মানব রচিত নয় বরং আল্লাহর বাণী।
  • ঐশী নাম বা শপথ: কারো কারো মতে, এগুলো আল্লাহর বিশেষ নাম বা গুণবাচক নামের গোপন রহস্য নির্দেশ করে।

উপসংহার

হুরুফে মুকাত্তাআত পবিত্র কুরআনের এক অনন্য ঐশী অলৌকিকতা, যা একদিকে কুরআনের বিশুদ্ধতা ও আল্লাহর কালাম হওয়ার প্রমাণ দেয়, অন্যদিকে মুমিনের অন্তরে আল্লাহর বাণীর প্রতি গভীর সম্ভ্রম জাগ্রত করে।


(ب) اكْتُبْ قِصَّةَ وِلَادَةِ يَحْيَىٰ عَلَيْهِ السَّلَامُ –

[(খ) হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর জন্মবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ কর।]

ভূমিকা

হযরত যাকারিয়া (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর জন্মকাহিনী পবিত্র কুরআনের এক পরম আবেগময় ও অলৌকিক অধ্যায়। চরম বার্ধক্যে বন্ধ্যা স্ত্রীর গর্ভে এক মহিমান্বিত নবীর আগমন মহান আল্লাহর অসীম কুদরত ও দোয়ার অলৌকিক শক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইয়াহিয়া (আ.)-এর জন্মবৃত্তান্তের ধারাবাহিক বিবরণ

  1. যাকারিয়া (আ.)-এর নিভৃত প্রার্থনা: হযরত যাকারিয়া (আ.) বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছেছিলেন। তাঁর শরীরের হাড়গুলো জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। উপরন্তু তাঁর স্ত্রী ছিলেন আজীবন বন্ধ্যা। তিনি উপলব্ধি করলেন তাঁর মৃত্যুর পর বনী ইসরাঈলে তাওহীদের দাওয়াত ও দ্বীনের খিদমতকারী কোনো যোগ্য উত্তরসূরি নেই। তখন তিনি নির্জনে রবের দরবারে আর্জি জানালেন: “হে আমার রব! আমাকে একজন সৎকর্মশীল উত্তরাধিকারী দান করুন, যে আমার এবং ইয়াকুব বংশের উত্তরাধিকার বহন করবে।”
  2. সুসংবাদ প্রাপ্তি: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর আন্তরিক দোয়া কবুল করলেন। মেহরাবে যখন তিনি সালাতরত ছিলেন, তখন ফেরেশতা জিবরীল (আ.) এসে ডাক দিয়ে সুসংবাদ দিলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে ইয়াহিয়া নামক এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছেন, যে হবে আল্লাহর বাণীর সত্যায়নকারী, নেতা, আত্মসংযমী এবং পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত একজন নবী।”
  3. যাকারিয়া (আ.)-এর বিস্ময় ও নিদর্শন তলব: যাকারিয়া (আ.) পরম বিস্ময়ে বললেন, “হে আমার রব! কীভাবে আমার পুত্র হবে যখন আমি বার্ধক্যে উপনীত এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা?” আল্লাহ ইরশাদ করলেন: قَالَ كَذَٰلِكَ قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَيَّ هَيِّنٌ — “এভাবেই হবে, তোমার রব বলেছেন—এটা আমার জন্য অতি সহজ।” অতঃপর যাকারিয়া (আ.) একটি নিদর্শন চাইলেন। আল্লাহ নিদর্শন দিলেন যে, তিনি টানা তিন দিন মানুষের সাথে ইশারা ছাড়া স্বাভাবিক কথা বলতে পারবেন না।
  4. ইয়াহিয়া (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম: আল্লাহর কুদরতে বৃদ্ধা বন্ধ্যা স্ত্রীর গর্ভধারণ সম্পন্ন হলো এবং যথা সময়ে এক অনন্য গুণসম্পন্ন শিশুর জন্ম হলো। মহান আল্লাহ স্বয়ং এই নবজাতকের নাম রাখলেন ‘ইয়াহিয়া’ (যিনি চিরঞ্জীব থাকবেন)। এই নামের পূর্বে মানব ইতিহাসে কারো নামকরণ করা হয়নি।

উপসংহার

হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম প্রমাণ করে যে, পার্থিব কার্যকারণ আল্লাহর কুদরতের অধীন; আল্লাহ চাইলে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পরম অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারেন।


٧- يَا يَحْيَىٰ خُذِ الْكِتَابَ بِقُوَّةٍ ۖ وَآتَيْنَاهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا – وَحَنَانًا مِّن لَّدُنَّا وَزَكَاةً ۖ وَكَانَ تَقِيًّا – وَبَرًّا بِوَالِدَيْهِ وَلَمْ يَكُن جَبَّارًا عَصِيًّا – وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا –

[৭. হে ইয়াহিয়া! এই কিতাবকে দৃঢ়তার সাথে ধারণ করো; এবং আমি তাকে শৈশবেই প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা দান করেছিলাম। আর আমার পক্ষ থেকে স্নেহ-মমতা ও পবিত্রতা দান করেছিলাম; এবং সে ছিল পরহেজগার। এবং সে ছিল তার পিতা-মাতার প্রতি অনুগত এবং সে উদ্ধত ও অবাধ্য ছিল না। আর তার প্রতি শান্তি—যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, যেদিন সে মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন সে জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।]

(أ) مَا الْمُرَادُ بِالْكِتَابِ وَالْحُكْمِ؟ بَيِّنْ –

[(ক) ‘কিতাব’ ও ‘হুকম’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? ব্যাখ্যা কর।]

ভূমিকা

সূরা মারিয়ামের আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহ হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর অসাধারণ চারিত্রিক ও ধর্মীয় গুণাবলি তুলে ধরেছেন। শৈশবেই তাঁকে যে বিশেষ ঐশী অনুগ্রহ ও গুণাবলিতে ভূষিত করা হয়েছিল, তার মধ্যে ‘আল-কিতাব’ ও ‘আল-হুকম’ অন্যতম।

الْكِتَابِ (কিতাব)-এর ব্যাখ্যা

মুফাসসিরগণের সর্বসম্মত মতে, এখানে ‘আল-কিতাব’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তাওরাত (التوراة)। হযরত ইয়াহিয়া (আ.) বনী ইসরাঈলের নবী ছিলেন এবং তখন তাঁদের ওপর প্রধান আসমানী কিতাব ছিল তাওরাত। আল্লাহ তাঁকে শৈশব থেকেই তাওরাতের বিধিবিধানের ওপর পূর্ণ পাণ্ডিত্য দান করেছিলেন এবং নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তিনি যেন অত্যন্ত নিষ্ঠা, দৃঢ়তা ও গভীর সাধনার সাথে তাওরাতের শিক্ষা ধারণ ও বাস্তবায়ন করেন।

الْحُكْمِ (হুকম)-এর ব্যাখ্যা

মুফাসসিরীনে কিরাম ‘আল-হুকম’ সম্পর্কে কয়েকটি গভীর তাত্পর্য উল্লেখ করেছেন:

  • নবুওয়ত ও ঐশী প্রজ্ঞা (النبوة والحكمة): অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এর অর্থ হলো নবুওয়ত, ধর্মীয় গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং দ্বীনের সূক্ষ্ম রহস্য অনুধাবনের ঐশী ক্ষমতা।
  • শৈশবেই ফায়সালা ও বিচক্ষণতা: ইমাম কুরতুবী ও ইবনে কাসীর (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ মানুষ পরিণত বয়সে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভ করলেও আল্লাহ ইয়াহিয়া (আ.)-কে শৈশবেই (صَبِيًّا) তাওরাতের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান ও বিচারিক ফায়সালা করার অনন্য মেধা ও পরিপক্বতা দান করেছিলেন। একবার সমবয়সী শিশুরা যখন তাঁকে খেলার জন্য ডাকল, তখন তিনি শৈশবেই বলেছিলেন: “খেলার জন্য তো আমাকে সৃষ্টি করা হয়নি, বরং আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।”

উপসংহার

সুতরাং ‘কিতাব’ হলো তাওরাত শরিফ এবং ‘হুকম’ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত শৈশবের গভীর প্রজ্ঞা, ধর্মীয় জ্ঞান ও নবুওয়ত।


(ب) مَا مَعْنَى الْحَنَانِ فِي الْآيَةِ الْكَرِيمَةِ “وَحَنَانًا مِّن لَّدُنَّا”؟ بَيِّنْ –

[(খ) পবিত্র আয়াতে “وَحَنَانًا مِّن لَّدُنَّا” (আমার পক্ষ থেকে বিশেষ স্নেহ)-এর অর্থ কী? আলোচনা কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর আত্মিক ও মানবিক গুণাবলির এক অপূর্ব প্রশংসা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, তিনি তাঁকে তাঁর পক্ষ থেকে ‘হানান’ (حَنَانًا) দান করেছিলেন। আরবি ভাষা ও তাফসীরশাস্ত্রে এর অর্থ অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী।

حَنَانًا (হানান)-এর অর্থ ও তাত্পর্য

  1. গভীর স্নেহ, মমতা ও করুণা (الرحمة والشفقة): হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, ‘হানান’ অর্থ হলো গভীর দয়া, মায়ামমতা ও ভালোবাসা। আল্লাহ তাআলা ইয়াহিয়া (আ.)-এর হৃদয়ে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি বিশেষ স্নেহ ও কোমলতা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। তিনি জীবজন্তু, পশুপাখি ও মানুষের প্রতি অসীম দরদ ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতেন।
  2. পিতা-মাতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা: কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে, এটি ছিল তাঁর বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি তাঁর গভীর ভক্তি, সেবা ও ভালোবাসার আবেগ। তিনি পিতা-মাতার প্রতি কখনোই অবাধ্য বা কঠোর ছিলেন না।
  3. আল্লাহর বিশেষ রহমত: আল্লামা তাবারী (রহ.) উল্লেখ করেন, ‘হানানান মিন লাদুন্না’ অর্থ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি এক বিশেষ খাস রহমত ও অনুগ্রহ, যা তাঁকে সর্বদা পাপ ও পঙ্কিলতা থেকে পুতপবিত্র রেখেছিল।

উপসংহার

অতএব ‘হানান’ হলো অন্তরের এক পরম ঐশী কোমলতা ও মায়ামমতা, যার কারণে হযরত ইয়াহিয়া (আ.) ছিলেন সমস্ত সৃষ্টির প্রতি দয়ালু, পিতা-মাতার পরম অনুগত এবং আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যপ্রাপ্ত এক পবিত্র ব্যক্তিত্ব।


٨- وَمَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَا مُوسَىٰ – قَالَ هِيَ عَصَايَ أَتَوَكَّأُ عَلَيْهَا وَأَهُشُّ بِهَا عَلَىٰ غَنَمِي وَلِيَ فِيهَا مَآرِبُ أُخْرَىٰ – قَالَ أَلْقِهَا يَا مُوسَىٰ – فَأَلْقَاهَا فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ –

[৮. হে মূসা! তোমার ডান হাতে ওটা কী? তিনি বললেন: এটা আমার লাঠি; আমি এর ওপর ভর দেই এবং এর দ্বারা আমার মেষপালের জন্য পাতা ঝরিয়ে থাকি, এবং এতে আমার অন্যান্য প্রয়োজনও সাধিত হয়। তিনি বললেন: হে মূসা! তা নিক্ষেপ করো। অতঃপর তিনি তা নিক্ষেপ করলেন, আর অমনি তা ধাবমান এক অজগরে পরিণত হলো।]

(أ) اكْتُبْ مُعْجِزَاتِ مُوسَىٰ عَلَيْهِ السَّلَامُ –

[(ক) হযরত মূসা (আ.)-এর মুজিযাসমূহ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

হযরত মূসা (আ.) উলুল আযম রাসূলগণের অন্যতম। ফিরাউন ও তার উদ্ধত সম্প্রদায়ের অহংকার চূর্ণ করতে এবং বনী ইসরাঈলকে মুক্ত করতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বহু প্রামাণ্য ও বিস্ময়কর মোজেজা দান করেছিলেন। কুরআনে এগুলোকে সুস্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হযরত মূসা (আ.)-এর প্রধান মুজিযাসমূহ

  1. লাঠি অজগরে রূপান্তরিত হওয়া (মুজিযায়ে আসা): মূসা (আ.)-এর হাতের সাধারণ কাঠের লাঠিটি মাটিতে নিক্ষেপ করলেই তা এক বিশাল ও জীবন্ত অজগরে রূপ নিত এবং ফিরাউনের দরবারের জাদুকরদের তৈরি সমস্ত অলীক জাদু গ্রাস করে ফেলেছিল।
  2. উজ্জ্বল শুভ্র হাত (মুজিযায়ে ইয়াদে বায়দা): মূসা (আ.) যখন তাঁর হাত বগলের নিচে রেখে বের করতেন, তখন তা কোনো রোগ বা কুষ্ঠ ছাড়াই সূর্যের মতো জ্যোতির্ময় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠত।
  3. সমুদ্র দ্বিধাবিভক্ত হওয়া: ফিরাউনের বাহিনী যখন বনী ইসরাঈলকে তাড়া করেছিল, তখন আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আ.) সাগরে লাঠি দ্বারা আঘাত করলেন এবং লোহিত সাগরে বারোটি শুষ্ক সড়ক তৈরি হয়ে গেল। বনী ইসরাঈল নিরাপদে পার হয়ে গেল এবং ফিরাউন সদলবলে নিমজ্জিত হলো।
  4. পাথর থেকে বারোটি ঝরনাধারা প্রবাহিত হওয়া: তিহ প্রান্তরে তৃষ্ণার্ত বনী ইসরাঈলের জন্য তিনি পাথরে লাঠি মারলে সেখান থেকে বারোটি গোত্রের জন্য বারোটি প্রস্রবণ নির্গত হয়েছিল।
  5. মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ হওয়া: মরুভূমিতে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই আকাশ থেকে সুস্বাদু খাদ্য ‘মান্না’ ও পাখির ভুনা মাংস ‘সালওয়া’ নাজিল হতো।
  6. মেঘমালার ছায়া দান: তপ্ত মরুভূমিতে তাদের মাথার ওপর শীতল মেঘের ছাউনি দ্বারা ছায়া প্রদান করা হতো।
  7. নয়টি নিদর্শন (তূফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত): ফিরাউনের অবাধ্যতার শাস্তিস্বরূপ পর্যায়ক্রমে জলোচ্ছ্বাস, ফসল ধ্বংসকারী পঙ্গপাল, পোকা-মাকড়, ব্যাঙের উপদ্রব এবং সমস্ত নদীর পানি রক্তে রূপান্তরিত হওয়ার নিদর্শন দেখানো হয়েছিল।

উপসংহার

হযরত মূসা (আ.)-এর এই অলৌকিক মোজেজাসমূহ প্রমাণ করেছিল যে, পার্থিব সকল পরাশক্তি ও জাদুকরী বিদ্যা আল্লাহর কুদরতের সামনে সম্পূর্ণ তুচ্ছ ও অসহায়।


(ب) لِأَيِّ غَرَضٍ ذَكَرَ اللَّهُ قِصَّةَ مُوسَىٰ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي هَٰذِهِ الْآيَاتِ؟

[(খ) আল্লাহ তাআলা কোন উদ্দেশ্যে এই আয়াতসমূহে হযরত মূসা (আ.)-এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন?]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আ.) ও ফিরাউনের ঘটনা সর্বাধিক বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। সূরা ত্বাহার সূচনায় মূসা (আ.)-এর প্রতি নবুওয়ত প্রদানের ঘটনাটি কেবল একটি ঐতিহাসিক কাহিনী নয়, বরং এর পেছনে বহু সুদূরপ্রসারী ধর্মীয় ও মানসিক উদ্দেশ্য নিহিত ছিল।

ঘটনাটি উল্লেখ করার মূল উদ্দেশ্যসমূহ

  • রাসূলুল্লাহ (স.)-কে সান্ত্বনা ও সাহস প্রদান: মক্কার কাফেরদের অত্যাচার, উপহাস ও নিপীড়নে নবী করীম (স.) এবং সাহাবায়ে কিরাম চরম কঠিন সময় পার করছিলেন। আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ অত্যাচারী ফিরাউনের মুখে একা দাঁড়িয়ে মূসা (আ.) যেভাবে আল্লাহর সাহায্যে বিজয়ী হয়েছিলেন, মুহাম্মদ (স.)-ও তেমনি মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হবেন।
  • তাওহীদের মূল সত্য প্রতিষ্ঠা: পবিত্র তুওয়া প্রান্তরে আল্লাহ সরাসরি মূসা (আ.)-এর সাথে কথা বলে ঘোষণা করেন: إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي — “নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, অতএব আমারই ইবাদত করো।” এই সার্বজনীন সত্য উম্মতে মুহাম্মাদীকে শিক্ষা দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
  • অহংকারী জালিমদের পরিণতির শিক্ষা: ফিরাউনের মতো পরাক্রমশালী শাসকের পতন ঘটিয়ে আল্লাহ প্রমাণ করেছেন যে জুলুম ও কুফরির পরিণতি সর্বদাই ধ্বংস ও লাঞ্ছনা।
  • দাওয়াতের পদ্ধতি ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া: মূসা (আ.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ফিরাউনের মতো চরম জালিমের কাছে গিয়েও নরম ও মিষ্টি ভাষায় কথা বলতে (قَوْلًا لَّيِّنًا), যা বিশ্বজগতের সকল ইসলাম প্রচারকের জন্য শ্রেষ্ঠ নীতি।

উপসংহার

সুতরাং হযরত মূসা (আ.)-এর কাহিনী বর্ণনার মূল লক্ষ্য ছিল ঈমানদারদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করা, সত্যের চূড়ান্ত বিজয় ঘোষণা করা এবং খোদাদ্রোহীদের অবশ্যম্ভাবী পতনের সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা।


٩- نَّحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَأَهُم بِالْحَقِّ ۚ إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى – وَرَبَطْنَا عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ إِذْ قَامُوا فَقَالُوا رَبُّنَا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَن نَّدْعُوَ مِن دُونِهِ إِلَٰهًا ۖ لَّقَدْ قُلْنَا إِذًا شَطَطًا –

[৯. আমি আপনার কাছে তাদের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে বর্ণনা করছি; নিশ্চয় তারা ছিল কয়েকজন তরুণ যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম। আর আমি তাদের চিত্ত সুদৃঢ় করেছিলাম যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল: আমাদের রব তো আসমান ও জমিনের রব, আমরা কখনোই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোনো উপাস্যকে আহ্বান করব না; যদি করি তবে অবশ্যই আমরা গর্হিত ও সীমালঙ্ঘনমূলক কথা বলব।]

(أ) اكْتُبْ مِنْ فَضَائِلِ سُورَةِ الْكَهْفِ –

[(ক) সূরা আল-কাহাফের ফজিলতসমূহ লিপিবদ্ধ কর।]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনের ১৮তম সূরা ‘আল-কাহাফ’ অত্যন্ত মহিমান্বিত ও বরকতময় একটি সূরা। হাদীস শরিফে এই সূরার নিয়মিত তিলাওয়াতকারী এবং হিফজকারীর জন্য বিপুল সওয়াব, রহমত ও নিরাপত্তার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

সূরা আল-কাহাফের প্রধান ফজিলতসমূহ

  1. দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপত্তা: রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন: مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْف عُصِمَ مِنْ فِتْنَةِ الدَّجَّالِ — “যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষিত থাকবে।” অন্য বর্ণনায় শেষ দশ আয়াতের কথাও বর্ণিত হয়েছে। (সহীহ মুসলিম: ৮০৯)।
  2. জুমুআর দিনে পাঠের বিশেষ নূর লাভ: হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (স.) ইরশাদ করেন: مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ — “যে ব্যক্তি জুমুআর দিনে সূরা আল-কাহাফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমুআর মধ্যবর্তী সময় নূর দ্বারা আলোকিত করে দেওয়া হবে।” (মুস্তাদরাকে হাকেম, সুনানে বায়হাকী)।
  3. প্রশান্তি (সাকীনাহ) ও রহমত অবতীর্ণ হওয়া: সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, হযরত উসাইদ ইবনে হুজাইর (রা.) রাতে সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করছিলেন। তখন তাঁর ঘোড়াটি হঠাৎ লাফালাফি শুরু করল। তিনি তাকিয়ে দেখলেন একটি মেঘের মতো ছায়া তাঁকে ঢেকে রেখেছে, যার মধ্যে প্রদীপের মতো আলো জ্বলছিল। সকালে রাসূল (স.)-এর কাছে ঘটনা বর্ণনা করলে তিনি বললেন: “এটি ছিল সাকীনাহ (ঐশী প্রশান্তি), যা কুরআন তিলাওয়াতের কারণে নাজিল হয়েছিল।” (সহীহ বুখারী: ৫০১১)।
  4. পাপমোচনের কারণ: এই সূরা তিলাওয়াতের মাধ্যমে বান্দার পূর্ববর্তী জীবনের সগীরা গোনাহসমূহ ক্ষমা করা হয় এবং অন্তরে ঈমানের জ্যোতি বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার

সূরা আল-কাহাফ মুমিনের জন্য ফিতনাময় পৃথিবীর এক দুর্ভেদ্য ঢাল এবং পারলৌকিক মুক্তির এক জ্যোতির্ময় আলোকবর্তিকা।


(ب) مَتَى رَبَطَ اللَّهُ الْإِيمَانَ عَلَىٰ قُلُوبِ أَصْحَابِ الْكَهْفِ؟

[(খ) কখন আল্লাহ আসহাবে কাহাফের অন্তরে ঈমানের অবিচলতা দান করেছিলেন?]

ভূমিকা

পবিত্র কুরআনে আসহাবে কাহাফের ঈমানী দৃঢ়তা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: وَرَبَطْنَا عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ (এবং আমি তাদের চিত্ত সুদৃঢ় করেছিলাম)। সমাজে যখন শিরক ও পাপাচারের সয়লাব চলছিল, তখন একদল তরুণের পক্ষে রাজকীয় ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সত্যের ওপর অটল থাকা ছিল অলৌকিক।

অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় করার প্রেক্ষাপট ও মুহূর্ত

  1. অত্যাচারী সম্রাটের দরবারে দণ্ডায়মান হওয়ার সময়: মুফাসসিরীন বর্ণনা করেন, যখন মূর্তিপূজক বাদশাহ দিকয়ানুস তরুণদের ঈমান আনার সংবাদ পেয়ে তাদেরকে রাজদরবারে তলব করল এবং শিরক করতে বাধ্য করার হুমকি দিল, ঠিক সেই চরম সঙ্কটময় মুহূর্তে আল্লাহ তাঁদের অন্তরে অটল সাহস ও অবিচলতা দান করেছিলেন।
  2. প্রকাশ্য তাওহীদের ঘোষণা দেওয়ার প্রাক্কালে: আয়াতে বলা হয়েছে: إِذْ قَامُوا فَقَالُوا رَبُّنَا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ — “যখন তারা দাঁড়িয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করল: আমাদের প্রতিপালক তো আসমান ও জমিনের প্রতিপালক!” রাজদরবারের শত সহস্র সৈন্যের সামনে ফাঁসি বা নির্মম মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। এই অবিচলতা ছিল আল্লাহর দেওয়া ঐশী শক্তি।
  3. পার্থিব ভোগবিলাস ত্যাগের সংকল্পের সময়: এই যুবকরা ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁরা রাজপ্রাসাদের আরাম-আয়েশ ছেড়ে গুহায় আশ্রয় নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। তাদের অন্তরে এই দৃঢ়তা আল্লাহই স্থাপন করেছিলেন।

উপসংহার

অতএব, বাতিলের রক্তচক্ষুর সামনে যখন আসহাবে কাহাফের যুবকেরা প্রকাশ্যে তাওহীদের ঘোষণা দিতে দাঁড়িয়েছিলেন, তখনই আল্লাহ তাঁদের অন্তরে ঈমানের চূড়ান্ত দৃঢ়তা ও অবিচলতা ঢেলে দিয়েছিলেন।


١٠- اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ – وَهَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ مُوسَىٰ – إِذْ رَأَىٰ نَارًا فَقَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي آنَسْتُ نَارًا لَّعَلِّي آتِيكُم مِّنْهَا بِقَبَسٍ أَوْ أَجِدُ عَلَى النَّارِ هُدًى – فَلَمَّا أَتَاهَا نُودِيَ يَا مُوسَىٰ – إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ ۖ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوًى – وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَىٰ –

[১০. আল্লাহ—তিনি ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই, সমস্ত উত্তম নাম তাঁরই। আর আপনার কাছে কি মূসার বৃত্তান্ত পৌঁছেছে? যখন তিনি আগুন দেখতে পেয়েছিলেন, তখন স্বীয় পরিবারবর্গকে বলেছিলেন: তোমরা এখানে অবস্থান করো, নিশ্চয় আমি আগুন দেখেছি; হয়তো আমি সেখান থেকে তোমাদের জন্য কোনো জ্বলন্ত অঙ্গার আনতে পারব কিংবা আগুনের কাছে কোনো পথপ্রদর্শক পাব। অতঃপর যখন তিনি সেখানে পৌঁছালেন, তখন আহ্বান করা হলো: হে মূসা! নিশ্চয় আমিই তোমার প্রতিপালক, অতএব তোমার জুতা জোড়া খুলে ফেলো; নিশ্চয় তুমি পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় আছ। আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি, অতএব যা ওহি পাঠানো হচ্ছে তা মনোযোগসহ শ্রবণ করো।]

(أ) مَا هُوَ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ؟ وَكَمْ أَسْمَاءُ اللَّهِ تَعَالَىٰ؟ ثُمَّ بَيِّنْ بَعْضَ أَسْمَائِهِ –

[(ক) আসমাউল হুসনা কী? আল্লাহ তাআলার নাম কয়টি? অতঃপর তাঁর কয়েকটি নামের অর্থ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিচয় ও মারেফত লাভের প্রধানতম মাধ্যম হলো তাঁর পবিত্র নাম ও গুণাবলি। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাঁর নামসমূহকে ‘আসমাউল হুসনা’ (الأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ) অর্থাৎ ‘সর্বোত্তম ও সুন্দরতম নামসমূহ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আসমাউল হুসনা-এর পরিচয় ও সংখ্যা

পরিচয়: ‘আসমা’ হলো ‘ইসম’ (নাম)-এর বহুবচন এবং ‘হুসনা’ হলো ‘আহসান’ (সর্বাধিক সুন্দর)-এর স্ত্রীলিঙ্গ রূপ। সুতরাং আসমাউল হুসনা হলো মহান আল্লাহর সেই সমস্ত পবিত্র গুণবাচক নাম যা চূড়ান্ত সৌন্দর্য, পূর্ণতা ও মর্যাদায় ভূষিত এবং যাতে কোনো প্রকার ত্রুটি বা অপূর্ণতার স্পর্শ নেই।

আল্লাহর নামের সংখ্যা:

  • সহীহ হাদীসে ৯৯টি নামের বিশেষ ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন: إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا، مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ — “নিশ্চয় আল্লাহর নিরানব্বইটি—অর্থাৎ এক কম একশত নাম রয়েছে; যে ব্যক্তি এগুলো সংরক্ষণ (মুখস্থ, অনুধাবন ও আমল) করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
  • তবে ইমাম নববী, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর মতে, আল্লাহর নামের সংখ্যা কেবল ৯৯-এ সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর অসংখ্য অগণিত নাম রয়েছে যা তিনি কোনো কিতাবে নাজিল করেননি অথবা গায়েবের জগতে নিজের কাছে গোপন রেখেছেন।

কয়েকটি পবিত্র নামের অর্থ ও ব্যাখ্যা

  1. আর-রহমান (الرَّحْمَٰنُ): পরম করুণাময়, যাঁর অপার করুণা ও দয়া সমগ্র সৃষ্টিজগতকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে—চাই সে মুমিন হোক বা কাফের।
  2. আল-মালিক (الْمَلِكُ): সর্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী প্রকৃত বাদশাহ ও অধিপতি, যাঁর নির্দেশে গোটা মহাবিশ্ব পরিচালিত হয়।
  3. আল-কুদ্দুস (الْقُدُّوسُ): সকল ত্রুটি, বিচ্যুতি, সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা থেকে চিরপবিত্র সত্তা।
  4. আল-আলীম (الْعَلِيمُ): সর্বজ্ঞানী, যাঁর জ্ঞান থেকে প্রকাশ্য বা গোপনীয়, অতীত বা ভবিষ্যতের কোনো কিছুই গোপন থাকে না।
  5. আল-হাইয়্যু আল-ক্বাইয়্যুম (الْحَيُّ الْقَيُّومُ): চিরঞ্জীব ও সমস্ত অস্তিত্বকে ধারণকারী চিরস্থায়ী প্রতিপালক।

উপসংহার

আসমাউল হুসনা হলো মুমিনের জন্য আল্লাহকে চেনার শ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা এবং এই নামসমূহের মাধ্যমে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন।


(ب) عَرِّفِ الْوَحْيَ لُغَةً وَاصْطِلَاحًا – كَمْ قِسْمًا لَهُ؟ بَيِّنْ –

[(খ) শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থে ওহির পরিচয় দাও। ওহি কত প্রকার? বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ওহি হলো নবুওয়তের প্রাণভোমরা এবং আসমান ও জমিনের মধ্যকার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। মহান আল্লাহ ওহির মাধ্যমেই নবীদের ওপর শরিয়তের বিধিবিধান ও আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।

ওহির আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘ওহি’ (الْوَحْيُ) আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো অতি দ্রুত ও গোপনে সংকেত দেওয়া (الإشارة السريعة الخفية), গোপনে কথা বলা, ইলহাম করা বা অন্তরে কোনো বিষয়ের অনুভূতি ঢেলে দেওয়া।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, “মহান আল্লাহ কোনো মাধ্যম ছাড়া অথবা ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁর কোনো নির্বাচিত নবীর নিকট যে আসমানী হেদায়াত, বাণী ও বিধান অতি গোপনে ও নিশ্চিতভাবে প্রেরণ করেন, তাকে ওহি বলা হয়।” আল্লামা যারকানী (রহ.) বলেন: إعلام الله تعالى لنبي من أنبيائه بحكم شرعي ونحوه — “আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাঁর কোনো নবীকে শরিয়তের হুকুম বা বার্তা অবহিত করাকে ওহি বলে।”

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ওহির প্রকারভেদ

পবিত্র কুরআনের সূরা আশ-শূরার ৫১ নম্বর আয়াতে ওহির তিনটি মূল পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে: وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِيَ بِإِذْنِهِ مَا يَشَاءُ

  1. সরাসরি অন্তরে প্রক্ষেপণ বা স্বপ্ন (وَحْيًا): কোনো দৃশ্যমান মাধ্যম ছাড়াই নবীর অন্তরে সরাসরি ভাব ঢেলে দেওয়া অথবা সত্য স্বপ্নের (الرؤيا الصالحة) মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া। যেমন হযরত ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে পুত্র কুরবানির আদেশ পেয়েছিলেন।
  2. পর্দার অন্তরাল থেকে বাক্যালাপ (مِن وَرَاءِ حِجَابٍ): আল্লাহ তাআলা কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি কথা বলেন কিন্তু বান্দা ও তাঁর মাঝে নূরের পর্দা থাকে। যেমন হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে তূর পাহাড়ে আল্লাহ সরাসরি কথা বলেছিলেন (কালিমুল্লাহ)।
  3. ফেরেশতার মাধ্যমে ওহি প্রেরণ (يُرْسِلَ رَسُولًا): হযরত জিবরীল (আ.)-এর মাধ্যমে নবীদের কাছে ওহি পৌঁছানো। এটি আবার কয়েকভাবে হতো:
    • ঘণ্টাধ্বনির মতো অত্যন্ত ভারী আওয়াজের সাথে ওহি আসা (এটি ছিল রাসূলুল্লাহ স.-এর জন্য সবচেয়ে কষ্টকর)।
    • জিবরীল (আ.) মানুষের আকৃতি ধারণ করে এসে বাণী পৌঁছানো (যেমন দিহইয়া কালবী রা.-এর বেশে)।
    • জিবরীল (আ.) স্বীয় আসল ছয়শত ডানা বিশিষ্ট বিশাল আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করে ওহি প্রদান করা।

শরয়ী বিধানের দিক থেকে ওহি দুই প্রকার:

  • ওহি মাতলু (الوحي المتلو): যা তিলাওয়াত করা হয়, যার ভাষা ও ভাব উভয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং যা নামাজে পাঠ করা হয়; অর্থাৎ পবিত্র কুরআনুল কারীম।
  • ওহি গায়রে মাতলু (الوحي غير المتلو): যার ভাব আল্লাহর পক্ষ থেকে কিন্তু ভাষা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর নিজস্ব এবং যা নামাজে তিলাওয়াত করা হয় না; অর্থাৎ পবিত্র হাদিস শরিফ।

উপসংহার

ওহি হলো ঐশী জ্ঞানের অকাট্য উৎস, যা মানুষকে জাহিলিয়াত থেকে হেদায়াত এবং অন্ধকার থেকে আলোকের পথে পরিচালিত করার একমাত্র নির্ভুল পথনির্দেশ।


مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত ও তাত্ত্বিক প্রশ্নাবলি)

الدرجات: ١٠ × ١ = ١٠
(أجب عن سؤال واحد فقط)

١١- عَرِّفِ التَّفْسِيرَ وَالتَّأْوِيلَ مَعَ ذِكْرِ الْفَرْقِ بَيْنَهُمَا، ثُمَّ بَيِّنْ شَرَائِطَ الْمُفَسِّرِينَ –

[১১. তাফসীর ও তাবিলের সংজ্ঞা দাও এবং উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য উল্লেখ কর, অতঃপর মুফাসসিরগণের শর্তাবলি আলোচনা কর।]

ভূমিকা

কুরআনুল কারীম বোঝার জন্য ‘তাফসীর’ (التفسير) ও ‘তাবীল’ (التأويل) উলূমুল কুরআনের দুটি অতি মৌলিক ও গভীর পরিভাষা। এ দুটি শাস্ত্রীয় শব্দের পরিচিতি, এদের মধ্যকার তুলনামূলক পার্থক্য এবং পবিত্র কুরআনের তাফসীর করার ক্ষেত্রে একজন মুফাসসিরের যেসব আবশ্যিক যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হয়, তা নিম্নে সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

তাফসীরের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘তাফসীর’ শব্দটি বাবে তাফঈল-এর মাসদার। এটি ‘ফাসর’ (الْفَسْرُ) মূলধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ উন্মুক্ত করা, কোনো অস্পষ্ট বিষয়কে সুস্পষ্ট ও প্রকাশ করা (الكشف والإظهار)।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইমাম যারকাশী (রহ.)-এর মতে: “তাফসীর হলো এমন এক শাস্ত্র যার দ্বারা মহান আল্লাহর সেই কিতাবকে অনুধাবন করা যায় যা তিনি নবী মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর নাজিল করেছেন এবং এর অর্থ স্পষ্টকরণ ও এর মধ্যস্থিত বিধান ও হিকমতসমূহ আহরণ করা যায়।”

তাবীলের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

আভিধানিক অর্থ: ‘তাবীল’ শব্দটি ‘আওল’ (الأَوْلُ) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ প্রত্যাবর্তন করা, ফিরিয়ে আনা বা কোনো বিষয়ের মূল পরিণতির দিকে প্রত্যাবর্তন করানো (الرجوع إلى الأصل)।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: পরিভাষায় তাবীল হলো—”কোনো আয়াতের একাধিক সম্ভাব্য অর্থের মধ্য থেকে প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে তার প্রকাশ্য অর্থ পরিত্যাগ করে দূরবর্তী কিন্তু সঙ্গত কোনো অর্থ গ্রহণ করা।”

তাফসীর ও তাবীলের মধ্যকার পার্থক্য

বিষয় তাফসীর (التفسير) তাবীল (التأويل)
ব্যাপ্তির দিক তাফসীর অধিক ব্যাপক। এটি আসমানী কিতাব ছাড়াও যে কোনো গ্রন্থের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। তাবীল কেবল আসমানী কিতাবের গভীর ও রূপক অর্থের জন্য খাস।
অর্থের প্রত্যক্ষতা শব্দের প্রকাশ্য ও সাধারণ অর্থ প্রকাশ করার সাথে সংশ্লিষ্ট। শব্দের গভীর, অন্তর্নিহিত ও রূপক অর্থ উদ্ভাবনের সাথে সংশ্লিষ্ট।
নির্ভরশীলতা তাফসীর মূলত রেওয়ায়েত বা নির্ভর করে সাহাবা ও তাবেঈনদের বর্ণিত প্রামাণ্য বিবরণের ওপর। তাবীল মূলত দেরায়াত বা গবেষণালব্ধ প্রজ্ঞা ও গভীর চিন্তাশীলতার ওপর নির্ভর করে।
নিশ্চয়তা তাফসীরে অর্থ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও প্রায় সুনিশ্চিত হয়। তাবিলে গবেষকের সম্ভাবনা ও প্রাধান্য দেওয়ার ওপর ভিত্তি স্থাপিত হয়।

মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শর্তাবলি ও যোগ্যতা (شروط المفسر)

পবিত্র কুরআনের মতো ঐশী কালামের ব্যাখ্যা সাধারণ কারো পক্ষে সম্ভব নয়। একজন যোগ্য মুফাসসির হওয়ার জন্য সালাফে সালেহীন নিম্নোক্ত শর্তাবলি নির্ধারণ করেছেন:

  1. বিশুদ্ধ আকিদা ও তাকওয়া: মুফাসসিরকে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদায় বিশ্বাসী হতে হবে। কোনো বিদআতী, কুপ্রবৃত্তির অনুসারী বা পাপাচারী ব্যক্তি কুরআনের সঠিক মর্ম উদ্ধার করতে পারে না।
  2. আরবি ভাষার অগাধ পাণ্ডিত্য: যেহেতু কুরআন বিশুদ্ধ আরবিতে নাজিল হয়েছে, তাই মুফাসসিরকে নাহু (ব্যাকরণ), সরফ (শব্দরূপ), লুগাত (অভিধান), বালাগাত (অলঙ্কারশাস্ত্র—মাআনি, বায়ান ও বাদী) বিষয়ে পূর্ণ ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হবে।
  3. উলূমুল কুরআনের জ্ঞান: শানে নুযুল (অবতরণের প্রেক্ষাপট), মাক্কী ও মাদানী সূরার বৈশিষ্ট্য, নাসিখ ও মানসূখ (রহিতকারী ও রহিতকৃত বিধান) এবং মুহকাম ও মুতাশাবিহ আয়াত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।
  4. হাদিস ও উসূলে হাদিসের প্রজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সহীহ হাদিস ও আসার সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে, কারণ হাদিসই হলো কুরআনের সর্বোত্তম তাফসীর।
  5. উসূলে ফিকহ ও ইজতিহাদের যোগ্যতা: শরিয়তের হুকুম-আহকাম ও মাসায়েল উদঘাটনের জন্য উসূলে ফিকহ ও কিয়াসের নিয়মাবলিতে পারদর্শী হতে হবে।
  6. খোদাদত্ত বিশেষ প্রজ্ঞা (ইলমে মাওহিবাত): যে ব্যক্তি কুরআন অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাকে এক বিশেষ ইলমে লাদুন্নী বা প্রজ্ঞা দান করেন, যা দ্বারা কুরআনের গোপন তত্ত্ব উন্মোচিত হয়।

উপসংহার

কুরআনের তাফসীর ও তাবীল হলো ইসলামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ জ্ঞানশাখা। কোনো ব্যক্তি উপরোক্ত শর্তাবলি অর্জন না করে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদান করলে সে জাহান্নামের উপযুক্ত বলে হাদিস শরিফে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে।


١٢- اكْتُبْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ صَاحِبِ تَفْسِيرِ الْخَازِنِ رَحِمَهُ اللَّهُ مَعَ بَيَانِ خَصَائِصِ تَفْسِيرِهِ –

[১২. তাফসীরে খাজিনের প্রণেতা (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ এবং তাঁর তাফসীরের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

তাফসীর সাহিত্যে যে কয়টি গ্রন্থ যুগ যুগ ধরে আলিম ও সাধারণ পাঠকদের নিকট বিপুল সমাদর লাভ করেছে, তার মধ্যে ‘তাফসীরে খাজিন’ (تفسير الخازن) অন্যতম। এর মূল নাম হলো لُبَابُ التَّأْوِيلِ فِي مَعَانِي التَّنْزِيلِ (লুবাবুত তাবীল ফী মাআনিত তানযীল)। এর প্রণেতা আল্লামা আলাউদ্দীন আলী ইবনে মুহাম্মদ আল-খাজিন (রহ.) ছিলেন হাদিস ও তাফসীরশাস্ত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও উপাধি: তাঁর পূর্ণ নাম আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম ইবনে উমর আশ-শাইখী আশ-শাফেঈ। তাঁর লকব ছিল ‘আলাউদ্দীন’ এবং তিনি ‘আল-খাজিন’ (الخازن) নামেই সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করেন।
  • জন্ম: তিনি হিজরী ৬৭৮ সনে (১২৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) বাগদাদে এক সম্ভ্রান্ত ইলমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
  • ‘আল-খাজিন’ নামকরণের কারণ: তিনি দামেস্কের সুপ্রসিদ্ধ ‘খানকাহে সুমাইসাতিয়া’ (الخانقاه السميساطية)-এর বিশাল কিতাবখানা ও পান্ডুলিপি ভাণ্ডারের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক বা লাইব্রেরিয়ান (খাজিনুল কুতুব) হিসেবে দীর্ঘকাল নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে আলেম সমাজে তিনি ‘আল-খাজিন’ উপাধিতে ভূষিত হন।
  • জ্ঞানার্জন ও শিক্ষকবৃন্দ: তিনি হাদিস, ফিকহ ও তাফসীর শাস্ত্রে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ উলামায়ে কিরামের সান্নিধ্য লাভ করেন। তিনি শাফেঈ মাজহাবের শীর্ষস্থানীয় ফকীহ ও মুহাদ্দিস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
  • ইনতিকাল: এই মহান মনীষী হিজরী ৭৪১ সনে (১৩৪১ খ্রিষ্টাব্দ) সিরিয়ার ঐতিহাসিক আলেপ্পো (হালাব) নগরীতে ইনতিকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

তাফসীরে খাজিনের মূল উৎস ও প্রেক্ষাপট

তাফসীরে খাজিন মূলত ইমাম বাগাভী (রহ.) রচিত সুপ্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ مَعَالِمُ التَّنْزِيلِ (মাআলিমুত তানযীল)-এর এক অনন্য সংক্ষেপণ ও পরিমার্জিত রূপ। তিনি দীর্ঘ সনদ ও পুনরুক্তিসমূহ বাদ দিয়ে সহজবোধ্য ভাষায় এটি সংকলন করেন এবং এর সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও তথ্য সংযোজন করেন।

তাফসীরে খাজিনের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

  1. হাদিসভিত্তিক নির্ভরযোগ্য তাফসীর (التفسير بالمأثور): এটি মূলত তাফসীর বিল মা’ছূরের অন্তর্ভুক্ত। তিনি কুরআনের আয়াত ব্যাখ্যায় কুরআন, রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সহীহ হাদিস এবং সাহাবা ও তাবেঈনদের নির্ভরযোগ্য উক্তি দ্বারা সুসজ্জিত করেছেন।
  2. সনদ সংক্ষেপণ ও সহজবোধ্য উপস্থাপন: সাধারণ পাঠকের সুবিধার্থে তিনি দীর্ঘ জটিল বর্ণনাসূত্র (সনদ) পরিহার করে সরাসরি মূল হাদিস ও ব্যাখ্যা সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন, যাতে গ্রন্থের কলেবর ভারসাম্যপূর্ণ থাকে।
  3. ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও কিসাসুল আম্বিয়া: আম্বিয়ায়ে কিরামের পবিত্র জীবনকাহিনী ও কুরআনে বর্ণিত জাতিসমূহের ঐতিহাসিক ঘটনা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা এই তাফসীরের এক প্রধান আকর্ষণ।
  4. ইসরাঈলী বর্ণনার সংযোজন ও পর্যালোচনা: ইতিবৃত্তমূলক বর্ণনায় তিনি অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন আহলে কিতাবদের বর্ণনা (ইসরাঈলিয়াত) উল্লেখ করেছেন। তবে সচেতন আলিমগণ মনে করেন, পাঠককে এসব বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়।
  5. ফিকহী ও আকিদাগত ভারসাম্য: ফিকহী মাসআলা বর্ণনায় তিনি শাফেঈ মাজহাবের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য দিলেও অন্যান্য মাজহাবের দলিলের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন এবং আকিদার ক্ষেত্রে সালাফে সালেহীনের পথ অনুসরণ করেছেন।
  6. উপদেশ ও আখলাক শিক্ষা: আয়াতের ব্যাখ্যা শেষে তিনি বান্দার আত্মশুদ্ধি, নীতি-নৈতিকতা ও আখেরাতমুখী জীবনের গভীর উপদেশ সংযোজন করেছেন।

উপসংহার

আল্লামা খাজিন (রহ.) বিরচিত ‘লুবাবুত তাবীল’ বা ‘তাফসীরে খাজিন’ যুগ যুগ ধরে কুরআনিক জ্ঞানপিপাসুদের পিপাসা নিবারণ করে আসছে। এর সহজ ও সাবলীল প্রকাশভঙ্গি একে তাফসীর জগতের এক অমূল্য সম্পদে পরিণত করেছে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ৩য় বর্ষের আত-তাফসীর বিগাইরিস-সানাদ-২ বিষয়ের কোড কত?

আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আত-তাফসীর বিগাইরিস-সানাদ-২ বিষয়ের বিষয় কোড হলো ২০১৩০২ এবং পরীক্ষা কোড হলো ২০৩।

২. এ পরীক্ষায় মোট কত নম্বরের উত্তর দিতে হয় এবং সময় কত?

এ পরীক্ষায় পূর্ণমান ৮০ নম্বরের উত্তর দিতে হয়। সময় বরাদ্দ থাকে ৪ ঘণ্টা। ক-বিভাগ থেকে ৫টি রচনামূলক প্রশ্নের (১৪ × ৫ = ৭০) এবং খ-বিভাগ থেকে ১টি তাত্ত্বিক প্রশ্নের (১০ × ১ = ১০) উত্তর দিতে হয়।

৩. সূরা আন-নাহলে ‘রুহ’ দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

সূরা আন-নাহলের ২ নম্বর আয়াতে ‘রুহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর ওহি ও আসমানী কিতাব, যা মৃত অন্তরে হেদায়াতের জীবন সঞ্চার করে। কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে এর দ্বারা জিবরীল (আ.)-কেও বোঝানো হয়েছে।

৪. মিরাজ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে হয়েছিল নাকি স্বপ্নে?

আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নবী করীম (স.)-এর মিরাজ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে (দেহ ও রূহের সমন্বয়ে) সংঘটিত হয়েছিল, যা আল্লাহর এক অনন্য অলৌকিক কুদরতের নিদর্শন।

৫. তাফসীর ও তাবীলের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

তাফসীর মূলত আয়াতের বাহ্যিক ও প্রকাশ্য অর্থ এবং সাহাবা-তাবেঈনদের বর্ণনার সাথে সংশ্লিষ্ট; অপরদিকে তাবীল হলো গভীর গবেষণার মাধ্যমে দলিলের ভিত্তিতে দূরবর্তী সঙ্গত ও রূপক অর্থ উদঘাটনের সাথে সংশ্লিষ্ট।

৬. তাফসীরে খাজিনের মূল নাম কী এবং এর সংকলক কে?

তাফসীরে খাজিনের প্রকৃত নাম হলো ‘লুবাবুত তাবীল ফী মাআনিত তানযীল’ (لباب التأويل في معاني التنزيل)। এর রচয়িতা হলেন সপ্তম হিজরীর প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা আলাউদ্দীন আলী ইবনে মুহাম্মদ আল-খাজিন শাফেঈ (রহ.)।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *