اختبار السنة الثالثة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۳ م
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৩]
القرآن والدراسات الإسلامية
[আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
التفسير بالسند
[আত-তাফসীর বিস-সানাদ]
বিষয় কোড: ২০১৩০১ | পরীক্ষা কোড: ২০৩
সময়: ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৮০
الملاحظة: أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب)-
[দ্রষ্টব্য: (ক) অংশ থেকে পাঁচটি এবং (খ) অংশ থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।]
مجموعة (أ) – ক-বিভাগ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
الدرجات: ١٤ × ٥ = ٧٠
(ترجم الآيات الكريمة ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)
١- وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا ۚ كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ – وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۗ وَلَئِن قُلْتَ إِنَّكُم مَّبْعُوثُونَ مِن بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَٰذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ –
[১. আর জমিনে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। তিনি তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসস্থান সম্পর্কে অবগত আছেন; সবই এক সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ। আর তিনিই সেই সত্তা যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তখন তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর; যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন যে, কর্মে তোমাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? আর আপনি যদি বলেন, মৃত্যুর পর নিশ্চয়ই তোমাদের পুনরুত্থিত করা হবে, তবে কাফেররা অবশ্যই বলবে, এ তো এক সুস্পষ্ট জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়।]
(أ) ما معنى الرزق؟ هل يسمى الحرام رزقا؟ اوضح الاختلاف فى هذه المسئلة بين اهل السنة والجماعة وبين المعتزلة –
[(ক) রিজিকের অর্থ কী? হারাম বস্তুকে কি রিজিক বলা যায়? এ বিষয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত এবং মু’তাযিলাদের মধ্যকার মতভেদ স্পষ্ট কর।]
ভূমিকা
ইসলামি আকাইদ ও তাফসীরশাস্ত্রে ‘রিজিক’ (الرزق) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পরিভাষা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই নিখিল সৃষ্টির একমাত্র রাজ্জাক ও আহারদাতা। তিনি প্রতিটি সৃষ্টির পরিমিত রিজিক নির্ধারণ করে রেখেছেন। তবে হারাম উপার্জন বা ভোগকৃত হারাম বস্তুকে ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক ‘রিজিক’ বলা যাবে কি না, তা নিয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত এবং মু’তাযিলাদের মধ্যে তাত্ত্বিক বিতর্ক বিদ্যমান। নিম্নে এর বিস্তৃত পর্যালোচনা পেশ করা হলো।
রিজিকের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
শাব্দিক অর্থ: ‘রিজিক’ (الرزق) আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো অংশ (الحظ / النصيب), অনুগ্রহ, দান, আহার্য বা এমন সামগ্রী যা দ্বারা মানুষ বা কোনো প্রাণী উপকৃত হয়। আল্লামা জুরজানী (রহ.) বলেন, “রিজিক হলো সেই বস্তু যা আল্লাহ তাআলা কোনো প্রাণীর আহার ও বেঁচে থাকার উপকরণ হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।”
পারিভাষিক অর্থ: আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের ইমামদের মতে, “আল্লাহ তাআলা জীবকূলকে যা কিছু ভক্ষণ বা ব্যবহারের সুযোগ দান করেন এবং জীব যা থেকে প্রকৃত উপকার লাভ করে, চাই তা হালাল হোক বা হারাম—তা-ই রিজিক।” অপরদিকে মু’তাযিলাদের মতে, “রিজিক হলো এমন বস্তু যার মালিকানা শরীয়তসিদ্ধ এবং যা ভোগ করার অধিকার বান্দা শরীয়তের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত হয়।”
হারাম বস্তু রিজিক কি না: মতভেদ ও পর্যালোচনা
হারাম বস্তু রিজিক কি না—এ বিষয়ে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:
- আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের অভিমত: আহলে সুন্নতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হারাম বস্তুও আল্লাহর সৃষ্টি করা রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। কোনো ব্যক্তি যদি সারা জীবন কেবল হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে, তবে সেও আল্লাহর নির্ধারিত রিজিকই ভক্ষণ করেছে; কারণ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই আহারের দ্বারাই তার জীবন ধারণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে হারাম পন্থায় তা অর্জন করার কারণে বান্দা তার ইচ্ছাধীন কর্মের (কাসব) দরুন গোনাহগার ও শাস্তির যোগ্য বিবেচিত হবে।
- মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের অভিমত: মু’তাযিলাদের মতে, হারাম বস্তুকে কোনোভাবেই ‘রিজিক’ বলা যাবে না। তাদের যুক্তি হলো, আল্লাহ তাআলা মানুষকে রিজিক ভক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং হারাম বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। যদি হারামও রিজিক হতো, তবে আল্লাহ বান্দাকে হারাম খেতে নিষেধ করে আবার সেই হারাম ভক্ষণ করাতেন—যা আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতা ও প্রজ্ঞার পরিপন্থী।
উভয় পক্ষের দলিল ও পর্যালোচনা
আহলে সুন্নতের দলিল:
- কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা: وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا (জমিনের প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহর)। যদি হারাম বস্তু রিজিক না হতো, তবে যে ব্যক্তি কেবল চুরি বা হারাম খেয়ে বেঁচে থাকে, তার ক্ষেত্রে কুরআনের এই সার্বজনীন আয়াতটি মিথ্যা প্রতিপন্ন হতো—নাউযুবিল্লাহ। অতএব যা কিছু খেয়ে জীবন রক্ষা পায় সবই রিজিক।
- হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন: “কোনো প্রাণী তার নির্ধারিত রিজিক পূর্ণরূপে গ্রহণ না করা পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না।”
মু’তাযিলাদের খণ্ডন: আহলে সুন্নতের আলিমগণ বলেন, মু’তাযিলাদের বিভ্রান্তির মূল কারণ হলো তারা ‘রিজিক’ (যা দ্বারা জীবন বাঁচে) এবং ‘হালাল রিজিক’ (যা শরীয়তে বৈধ) এর মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। আল্লাহ জীবন ধারণের সামগ্রী হিসেবে যা দিয়েছেন তা আমভাবে রিজিক, কিন্তু বান্দা নিজ ইচ্ছায় তা হালাল পথে উপার্জন না করে হারাম পথে গ্রহণ করলে বান্দার অপরাধের কারণেই সে দণ্ডিত হবে।
উপসংহার
সুতরাং বিশুদ্ধতম সিদ্ধান্ত হলো, পরম করুণাময় আল্লাহই সকল সৃষ্টির রিজিকদাতা। তাঁর সৃষ্টি করা আহার্য সার্বিকভাবে রিজিক হলেও মুমিন বান্দার দায়িত্ব হলো হালাল পন্থায় সেই রিজিক অন্বেষণ করা এবং হারাম পন্থার পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ পুতপবিত্র রাখা।
(ب) ما المقصود بستة ايام فى هذه الآية؟
[(খ) এ আয়াতে ‘ছয় দিন’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য?]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনের আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহ আসমান ও জমিনকে ‘ছয় দিনে’ (فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ) সৃষ্টি করার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি ‘কুন’ (হও) শব্দের এক ইশারায় পলকের মধ্যে সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কেন এই ধাপে ধাপে ছয় দিনে সৃষ্টি করলেন, এবং এখানে ‘দিন’ বলতে পার্থিব দিন নাকি অন্য কোনো মহাজাগতিক কালখণ্ড উদ্দেশ্য—তা গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
ستة ايام (ছয় দিন)-এর ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য
মুফাসসিরীন ও গবেষকগণ ‘ছয় দিন’ সম্পর্কে নিম্নোক্ত দুটি প্রধান ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:
- মহাজাগতিক দীর্ঘ কালপর্ব (أطوار / فترات زمنية): বহু বিশিষ্ট মুফাসসির ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক আলিমের মতে, আসমান ও জমিন সৃষ্টির পূর্বে সূর্য, চন্দ্র এবং পৃথিবীর আবর্তন ছিল না। সুতরাং বর্তমানের ২৪ ঘণ্টার দিন-রাত্রি তখন বিদ্যমান ছিল না। অতএব এখানে ‘দিন’ (يوم) বলতে দীর্ঘ সময়কাল বা সৃষ্টিতাত্ত্বিক স্তর (Geological/Cosmic Stages) উদ্দেশ্য। যেমন কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে: وَإِنَّ يَوْمًا عِندَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ — “নিশ্চয়ই তোমার রবের কাছে একটি দিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৪৭)। এমনকি সূরা আল-মাআরিজে একে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমতুল্য বলা হয়েছে।
- পার্থিব দিনের পরিমাপ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং জমহুর সালাফের মতে, এটি পার্থিব হিসাবের পরিমাপে ছয়টি কালখণ্ড, যা রবিবার থেকে শুরু হয়ে শুক্রবারে সমাপ্ত হয় এবং প্রতি স্তরে আসমান ও জমিনের বিভিন্ন স্তর ও উপাদান সৃষ্টি করা হয়।
আল্লাহর ধাপে ধাপে সৃষ্টির পেছনের প্রজ্ঞা (حكمة الخلق في ستة أيام)
- বান্দাকে ধৈর্য ও পরিকল্পনার শিক্ষা দেওয়া: মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের শিখিয়েছেন যে, যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাড়াহুড়ো না করে নিয়মতান্ত্রিকতা, ধৈর্য ও সুপরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে সম্পাদন করা উচিত।
- সৃষ্টির সুশৃঙ্খল বিন্যাস প্রদর্শন: মহাবিশ্বের অণু-পরমাণু, গ্যালাক্সি এবং পৃথিবীর জৈব পরিবেশ অত্যন্ত সুক্ষ্ম ভারসাম্যে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে, যা পরম স্রষ্টার অপরিসীম প্রজ্ঞাকে প্রমাণ করে।
- ফেরেশতা ও সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর কুদরত স্পষ্ট করা: ধাপে ধাপে সৃষ্টির প্রতিটি স্তর প্রত্যক্ষ করে যাতে ফেরেশতাকুল আল্লাহর মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন।
উপসংহার
অতএব ‘ছয় দিন’ হলো মহাবিশ্ব সৃষ্টির ছয়টি পূর্ণাঙ্গ কালপর্ব বা যুগ, যার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর অনন্ত কুদরত, প্রজ্ঞা এবং সৃষ্টির অপূর্ব ভারসাম্যকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
٢- أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۖ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ – فَإِلَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا أُنزِلَ بِعِلْمِ اللَّهِ وَأَن لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ – مَن كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ –
[২. তবে কি তারা বলে, সে এটা নিজে রচনা করেছে? আপনি বলুন: তবে তোমরাও এর অনুরূপ দশটি মনগড়া সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক। অতঃপর যদি তারা তোমাদের ডাকে সাড়া না দেয়, তবে জেনে রেখো—এ কিতাব আল্লাহর ইলম দ্বারাই অবতীর্ণ হয়েছে এবং তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; অতএব তোমরা কি আত্মসমর্পণকারী হবে? যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার শোভা-সৌন্দর্য কামনা করে, আমি সেখানে তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দিয়ে দেই এবং তাদের কোনো হক নষ্ট করা হয় না।]
(أ) ما الفرق بين المؤمن والمسلم؟
[(ক) মুমিন ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য কী?]
ভূমিকা
ইসলাম ও ঈমান ইসলামি জীবনাদর্শের দুটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ। কখনো এ দুটি শব্দ সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার কখনো উভয়ের মাঝে সূক্ষ্ম অর্থগত ও স্তরভেদগত পার্থক্য সূচিত হয়। মুমিন ও মুসলিমের মধ্যকার এই সম্পর্ক ও পার্থক্য অনুধাবন করা দ্বীনের মৌলিক জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।
শাব্দিক ও পারিভাষিক বিশ্লেষণ
মুসলিম (المسلم): ‘ইসলাম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্য স্বীকার করা এবং শান্তি স্থাপন করা। পরিভাষায়, যে ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে আল্লাহর নির্দেশাবলির সামনে আত্মসমর্পণ করে এবং ইসলামের মৌলিক বিধিবিধান পালন করে, তাকে মুসলিম বলা হয়।
মুমিন (المؤمن): ‘ঈমান’ শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ সত্যায়ন করা, আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করা এবং নির্ভর করা। পরিভাষায়, যে ব্যক্তি মনে-প্রাণে আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল ও তাকদীরের প্রতি অবিচল আস্থা স্থাপন করে, তাকে মুমিন বলে।
মুমিন ও মুসলিমের মৌলিক পার্থক্যসমূহ
- অভ্যন্তরীণ বনাম বাহ্যিক রূপ: ঈমানের মূল কেন্দ্র হলো মানুষের অন্তর (التصديق بالقلب), আর ইসলামের মূল কেন্দ্র হলো বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (العمل بالجوارح)। সুতরাং অন্তরের অবিচল বিশ্বাসী ব্যক্তি মুমিন, আর বাহ্যিক অনুগত ব্যক্তি মুসলিম।
- কুরআনি সুস্পষ্ট স্তরভেদ: পবিত্র কুরআনে সূরা আল-হুজুরাতের ১৪ নম্বর আয়াতে বেদুঈনদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে:
قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا ۖ قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَٰكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ
“বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন: তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো, আমরা আত্মসমর্পণ করেছি (ইসলাম গ্রহণ করেছি); কেননা ঈমান এখনও তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি।” এই আয়াত প্রমাণ করে ঈমানের স্তর ইসলামের চেয়ে উচ্চতর ও গভীর।
- ব্যাপকতা ও বিশেষত্ব (العموم والخصوص): ওলামায়ে কেরামের মতে, প্রতিটি মুমিনই মুসলিম, কিন্তু প্রতিটি মুসলিম প্রকৃত মুমিন নাও হতে পারে (যেমন দুর্বল ঈমানদার বা বাহ্যিক আত্মসমর্পণকারী)।
- হাদিসে জিবরীলের মানদণ্ড: সহীহ হাদিসে হযরত জিবরীল (আ.)-এর প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ (স.) ইসলামকে সংজ্ঞায়িত করেছেন বাহ্যিক আমল (কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত) দ্বারা; আর ঈমানকে সংজ্ঞায়িত করেছেন অদৃশ্য ও মৌলিক আকাইদের গভীর বিশ্বাসের মাধ্যমে।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলা যায়, ইসলাম হলো দ্বীনের বাহ্যিক ভিত্তি ও রূপরেখা, আর ঈমান হলো তার প্রাণ ও অভ্যন্তরীণ জ্যোতি। পূর্ণাঙ্গ মুত্তাকী হতে হলে বাহ্যিক আনুগত্যের (ইসলাম) সাথে আন্তরিক নিখাদ বিশ্বাসের (ঈমান) নিখুঁত সমন্বয় অপরিহার্য।
(ب) كيف تحدى القران كفار عصره بمثل هذه الآية؟ بين –
[(খ) পবিত্র কুরআন আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে তৎকালীন কাফেরদের কীভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিল? স্পষ্ট কর।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআন বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চিরন্তন ও জীবন্ত মুজিযা। তৎকালীন আরবরা ছিল ভাষা, অলঙ্কারশাস্ত্র, কাব্য ও বাগ্মিতার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবুও তারা কুরআনের অলৌকিক বাণী শুনে হতভম্ব হয়ে অপপ্রচার চালাত যে এটি মানুষের রচিত। তখনই কুরআন তাদের প্রকাশ্যে সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ (তাহাদ্দী – التحدي) নিক্ষেপ করে।
কুরআনের চ্যালেঞ্জের ক্রমধারা ও আলোচ্য আয়াতের অবস্থান
পবিত্র কুরআন কাফেরদের একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল:
- প্রথম স্তর (সমগ্র কুরআনের চ্যালেঞ্জ): কাফেরদের বলা হলো পুরো কুরআনের মতো একটি কিতাব রচনা করে আনতে:
قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا
“বলুন, যদি মানব ও জিন জাতি এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ রচনা করতে পারবে না—যদিও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৮৮)। আরবরা এতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
- দ্বিতীয় স্তর (আলোচ্য আয়াত – দশটি সূরার চ্যালেঞ্জ): যখন তারা পুরো কুরআন আনতে ব্যর্থ হলো, তখন সূরা হূদের ১৩ আয়াতে চ্যালেঞ্জ শিথিল করে বলা হলো:
فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ
“তবে তোমরা এর অনুরূপ মাত্র দশটি মনগড়া সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে ডেকে নাও।” এই চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে তাদের ঔদ্ধত্যকে ধূলিসাৎ করা হলো। কিন্তু তারা দশটি সূরাও রচনা করতে পারল না।
- তৃতীয় স্তর (মাত্র একটি সূরার চ্যালেঞ্জ): পরিশেষে সূরা আল-বাকারা এবং সূরা ইউনুসে তাদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে বলা হলো: فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ — “তবে এর মতো মাত্র একটি সূরাই রচনা করে দেখাও।” আরবের শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরা এই সামান্য একটি সূরার সমকক্ষ সাহিত্য রচনা করতেও চিরতরে অপারগ প্রমাণিত হয়।
কুরআনের চ্যালেঞ্জের বিজয়ের তাৎপর্য
- আরবের আরবীবিদরা কুরআনের বাচনভঙ্গি, শব্দের গাঁথুনি, সুরের মূর্ছনা ও অর্থের গভীরতা দেখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল যে, এটি কোনো মানুষের বাণী হতেই পারে না।
- সাহিত্যিক প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয়ে তারা তরবারি ধারণ করেছিল; যা প্রমাণ করে বাকযুদ্ধে তারা সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়েছিল।
উপসংহার
কুরআনের এই চ্যালেঞ্জ ছিল কিয়ামত পর্যন্ত সকল অবিশ্বাসীদের জন্য এক অপূরণীয় চ্যালেঞ্জ, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে পবিত্র কুরআন একক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নির্ভুল আসমানী ওহী।
٣- الر ۚ تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ – إِنَّا أَنزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَّعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ – نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَٰذَا الْقُرْآنَ وَإِن كُنتَ مِن قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ – إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ –
[৩. আলিফ-লাম-রা; এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত। নিশ্চয়ই আমি একে আরবি ভাষায় কুরআনরূপে অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো। আমি আপনার নিকট এই কুরআন ওহীর মাধ্যমে প্রেরণ করে সর্বোত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি, যদিও এর পূর্বে আপনি এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যখন ইউসুফ তার পিতাকে বলল: হে আমার পিতা! আমি স্বপ্নে দেখেছি এগারটি নক্ষত্র, এবং সূর্য ও চন্দ্রকে; আমি দেখলাম তারা আমাকে সেজদা করছে।]
(أ) بَيِّنْ حِكْمَةَ ذِكْرِ الْحُرُوفِ الْمُقَطَّعَةِ فِي أَوَائِلِ السُّوَرِ –
[(ক) বিভিন্ন সূরার শুরুতে হুরুফে মুকাত্তাআত উল্লেখ করার হিকমত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনের ২৯টি সূরার প্রারম্ভে কিছু বিচ্ছিন্ন আরবি বর্ণমালার সমাহার দেখতে পাওয়া যায়, যেমন: ‘আলিফ-লাম-মীম’, ‘আলিফ-লাম-রা’, ‘ত্বা-হা’, ‘ইয়া-সীন’ ইত্যাদি। এগুলোকে তাফসীরের পরিভাষায় ‘হুরুফে মুকাত্তাআত’ (الحروف المقطعة) বা বিচ্ছিন্ন বর্ণমালা বলা হয়। এই রহস্যময় বর্ণমালার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও হিকমত অপরিসীম।
হুরুফে মুকাত্তাআতের মূল হিকমত ও তাৎপর্য
- কুরআনের অলৌকিকত্ব ও চ্যালেঞ্জ প্রদর্শন (الإعجاز والتحدي): মুফাসসিরীনদের এক বিরাট দলের মতে, হুরুফে মুকাত্তাআতের প্রধান হিকমত হলো আরবদের জানিয়ে দেওয়া যে, কুরআন যে ভাষায় রচিত তা এই পরিচিত আরবি হরফ দিয়েই তৈরি। তোমরাও এই হরফ দিয়েই কথা বলো ও কবিতা লেখো; তবে পারলে এই হরফগুলো সাজিয়ে কুরআনের মতো একটি বাণী তৈরি করে দেখাও! যখন তারা ব্যর্থ হলো, তখন প্রমাণিত হলো যে এই বিন্যাস মানুষের নয়, স্বয়ং আল্লাহর। প্রায় প্রতিটি সূরায় যেখানে হুরুফে মুকাত্তাআত এসেছে, তার ঠিক পরেই কুরআনের মাহাত্ম্যের কথা বলা হয়েছে (যেমন: الم – ذَٰلِكَ الْكِتَابُ, الر – تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ)।
- শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করা (لفت الأنظار): কাফেররা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে কুরআনের তিলাওয়াত শুনবে না এবং হট্টগোল করবে। কিন্তু যখন মহানবী (স.) এই অদ্ভুত ও অভিনব ভঙ্গিতে বিচ্ছিন্ন হরফগুলো উচ্চারণ করতেন, তখন কাফেররা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে তা শুনত।
- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মধ্যকার গোপন রহস্য (السر بين الله ورسوله): হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), আলী (রা.) এবং ইমাম শাবী (রহ.)-এর মতে, প্রতিটি কিতাবের একটি গোপন রহস্য থাকে, আর কুরআনের গোপন রহস্য হলো হুরুফে মুকাত্তাআত; যার প্রকৃত জ্ঞান কেবল আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীব (স.)-ই ভালো জানেন।
- আরবি ভাষার শব্দসম্ভার স্মরণ করানো: সাধারণ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, জ্ঞানার্জনের মৌলিক মাধ্যম হলো অক্ষর ও বর্ণমালা, যা আল্লাহর এক অনুপম অনুগ্রহ।
উপসংহার
হুরুফে মুকাত্তাআত পবিত্র কুরআনের সুউচ্চ অলঙ্কার, বাগ্মিতা ও অলৌকিক সৌন্দর্যের এক চিরন্তন নিদর্শন, যা মানুষের অন্তরকে মুগ্ধ করে এবং স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্বের সামনে বিনম্র করে তোলে।
(ب) لِمَاذَا سُمِّيَتْ سُوْرَةُ يُوسُفَ بِأَحْسَنِ الْقَصَصِ؟
[(খ) সূরা ইউসুফকে কেন ‘আহসানুল কাসাস’ (সর্বোত্তম কাহিনী) নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে?]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনের দ্বাদশ সূরা হলো সূরা ইউসুফ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই সূরার প্রারম্ভেই ঘোষণা করেছেন: نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ অর্থাৎ “আমি আপনার কাছে সর্বোত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি।” একক ঘটনাপ্রবাহে পুরো একটি সূরা নিবেদিত হওয়ার এই অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং মানবচরিত্রের নানামুখী শিক্ষণীয় দিক সূরা ইউসুফকে বিশ্বসাহিত্যের সেরা কাহিনীতে রূপ দিয়েছে।
সূরা ইউসুফকে ‘আহসানুল কাসাস’ বলার যৌক্তিক কারণসমূহ
- বিচিত্র মানবীয় সম্পর্কের নিখুঁত রূপায়ন: এ সূরায় শাসক ও প্রজা, পিতা ও পুত্র, ভাই ও ভাই, স্বামী ও স্ত্রী, ধনী ও দরিদ্র, মুক্ত মানুষ ও দাস—জীবনের প্রতিটি সামাজিক সম্পর্কের বাস্তব চিত্র ও শিক্ষা সন্নিবেশিত হয়েছে।
- সবর ও শুকরের অনুপম মহাকাব্য: হযরত ইউসুফ (আ.)-এর বাল্যকালে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়া, দাস হিসেবে বিক্রি হওয়া, মিথ্যা অপবাদে দীর্ঘ বছর কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি থাকা এবং পরিশেষে মিশরের অর্থ ও খাদ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হওয়া—চরম বিপদেও সবর এবং চরম সফলতায় শুকরের যে জীবন্ত পাঠ এ সূরায় রয়েছে, তা তুলনাহীন।
- পাপের প্ররোচনায় আত্মসংযমের পরাকাষ্ঠা: আজিজে মিশরের রূপসী স্ত্রীর প্রচণ্ড প্রলোভন ও ফাঁদ থেকে একজন সুদর্শন যুবকের আল্লাহর ভয়ে নিজের চরিত্রকে নিষ্কলুষ রাখার যে দৃষ্টান্ত এ সূরায় ফুটে উঠেছে, তা মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নৈতিক পাঠ।
- হিংসার করুণ পরিণতি ও ক্ষমার ঔদার্য: ভাইদের হিংসা কীভাবে তাদের লাঞ্ছিত করল এবং পরিশেষে ক্ষমতাবান ইউসুফ (আ.) কীভাবে প্রতিশোধ না নিয়ে لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ (আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই) বলে তাদের ক্ষমা করে দিলেন, তা উদারতার শীর্ষ শিখর।
- কাহিনীর নিখুঁত ক্লাইম্যাক্স ও পরিণতি: একটি স্বপ্নের মাধ্যমে কাহিনীর শুরু এবং দীর্ঘ বহু বছর পর বাস্তব জীবনে সেই স্বপ্নের হুবহু সফল রূপায়নের মাধ্যমে সমাপ্তি—সাহিত্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে এটি এক নিখুঁত ও অনুপম শিল্পকর্ম।
উপসংহার
সূরা ইউসুফ নিছক কোনো ঐতিহাসিক গল্প নয়; বরং এটি ঈমান, চরিত্র, ধৈর্য, ন্যায়পরায়ণতা ও সফলতার এক প্রামাণ্য জীবনদর্শন। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা একে পরম যথার্থতায় ‘আহসানুল কাসাস’ বলে ভূষিত করেছেন।
٤- قَالُوا يَا أَبَانَا إِنَّا ذَهَبْنَا نَسْتَبِقُ وَتَرَكْنَا يُوسُفَ عِندَ مَتَاعِنَا فَأَكَلَهُ الذِّئْبُ ۖ وَمَا أَنتَ بِمُؤْمِنٍ لَّنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ – وَجَاءُوا عَلَىٰ قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ ۚ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ – وَجَاءَتْ سَيَّارَةٌ فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَأَدْلَىٰ دَلْوَهُ ۖ قَالَ يَا بُشْرَىٰ هَٰذَا غُلَامٌ ۚ وَأَسَرُّوهُ بِضَاعَةً ۚ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَعْمَلُونَ –
[৪. তারা বলল: হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করতে চলে গিয়েছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালামালের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, অতঃপর বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু আপনি তো আমাদের বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী। আর তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত মেখে নিয়ে এল। তিনি বললেন: বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি গল্প সাজিয়ে দিয়েছে; সুতরাং সুন্দর ধৈর্যই আমার অবলম্বন, আর তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই সাহায্যস্থল। আর এক কাফেলা এল, তারা তাদের পানি সংগ্রহকারীকে পাঠাল এবং সে তার বালতি নামিয়ে দিল; সে বলে উঠল: কী সুখবর! এ তো এক কিশোর! এবং তারা তাকে বাণিজ্যের পণ্য হিসেবে গোপন করে রাখল; আর তারা যা করছিল সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবগত।]
(أ) كيف اتصف الدم بالكذب؟ وما هو الدم الذى كان على قميص يوسف؟
[(ক) রক্ত কীভাবে ‘মিথ্যা’ বিশেষণে বিশেষিত হলো? এবং ইউসুফের জামায় কোন রক্ত ছিল?]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনের ভাষা ও ব্যাকরণিক অলঙ্কার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আলোচ্য আয়াতে ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের ষড়যন্ত্রের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে রক্তকে ‘কাদিব’ বা মিথ্যা বলা হয়েছে (بِدَمٍ كَذِبٍ)। কোনো রক্ত স্বয়ং মিথ্যা হতে পারে না, তবে এখানে কেন এই রূপক বিশেষণ ব্যবহৃত হলো এবং সেই রক্তের উৎস কী ছিল, তা তাফসীরশাস্ত্রে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।
রক্ত ‘মিথ্যা’ বিশেষণে বিশেষিত হওয়ার রহস্য (بلاغة الوصف بالكذب)
- মুবালাগা বা অতিশয়োক্তি প্রকাশ: আল্লামা যামাখশারী এবং বায়যাবী (রহ.) উল্লেখ করেছেন, এখানে ‘কাদিব’ (মিথ্যা) শব্দটি মাসদার (ভাববাচ্য), যা ইসমে ফায়েল বা মাফউল অর্থাৎ ‘মাকযূব’ (মিথ্যা বানানো হয়েছে এমন) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। চরম মিথ্যা বোঝানোর জন্য গুণবাচক শব্দের বদলে সরাসরি মূল শব্দটি ব্যবহার করা আরবি ভাষার একটি সুপরিচিত অলঙ্কার।
- দাবির অসারতা প্রমাণ: ভাইয়েরা দাবি করেছিল এটি ইউসুফের রক্ত, অথচ বাস্তবে তা ইউসুফের রক্ত ছিল না। সুতরাং তাদের এই দাবি যেমন মিথ্যা ছিল, তেমনি সেই রক্তও ছিল একটি বানোয়াট সাক্ষ্য।
- জামার অক্ষত থাকা: হযরত ইয়াকুব (আ.) যখন রক্তমাখা জামাটি হাতে নিলেন, তখন দেখলেন জামাটিতে রক্ত লেগে আছে ঠিকই কিন্তু জামার কোথাও নেকড়ে বাঘের নখ বা দাঁতের কোনো ছিঁড়ে যাওয়ার চিহ্ন নেই! তখন ইয়াকুব (আ.) বলে উঠলেন: “আজব নেকড়ে তো! সে ইউসুফকে খেয়ে ফেলল অথচ তার জামাটি ছিঁড়লও না!” এই চতুর অসাবধানতাই তাদের মিথ্যা ষড়যন্ত্রকে হাতেনাতে ফাঁস করে দেয়।
ইউসুফ (আ.)-এর জামায় কোন রক্ত লাগানো হয়েছিল?
তাফসীরে তাবারী, ইবনে কাসীর ও কুরতুবীতে বর্ণিত হয়েছে, ইউসুফ (আ.)-কে অন্ধকূপে নিক্ষেপ করার পর ভাইয়েরা তাদের চক্রান্ত ঢাকার জন্য একটি মেষশাবক বা ছাগলের বাচ্চা (جَدْيٌ / شاة) জবাই করে তার রক্ত ইউসুফ (আ.)-এর জামায় মেখে নিয়ে পিতার নিকট হাজির হয়েছিল।
উপসংহার
মিথ্যা কখনো সত্যের আলো ঢেকে রাখতে পারে না। ষড়যন্ত্রকারীরা যতই নিখুঁত মিথ্যা তৈরি করুক না কেন, সত্যের স্পষ্ট প্রমাণের সামনে তা অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়—ইউসুফের জামার রক্তই তার চিরন্তন দৃষ্টান্ত।
(ب) اذكر التركيب النحوى “ما انت بمؤمن لنا” –
[(খ) “ما أنت بمؤمن لنا”-এর নাহভী তারকীব উল্লেখ কর।]
নাহভী তারকীব (التركيب النحوي)
আলোচ্য বাক্যটি আরবি ব্যাকরণের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ উদাহরণ। এর তারকীব নিম্নরূপ:
- مَا (মা): نافية تعمل عمل ليس، تسمى ‘ما الحجازية’ — এটি হিজাযী ‘মা’ যা না-বোধক এবং ‘লাইসা’ (ليس)-এর মতো আমল করে (ইসমে রফা দেয় এবং খবরে নসব দেয়)।
- أَنْتَ (আন্তা): ضمير منفصل مبني على الفتح في محل رفع، وهو اسم ‘ما’ — এটি পৃথক সর্বনাম, ফাতহার ওপর মাবনী এবং হিজাযী ‘মা’-এর ইসমে হওয়ার কারণে মাহাল্লান মারফু।
- بِمُؤْمِنٍ (বিমু’মিনিন):
- الباء (বা): حرف جر زائد للتوكيد — বাক্যকে অধিক জোরদার করার জন্য অতিরিক্ত হরফে জার।
- مُؤْمِنٍ (মু’মিনিন): خبر ‘ما’ مجرور لفظا منصوب محلا — এটি হিজাযী ‘মা’-এর খবর, যা বা হরফে জারের কারণে বাহ্যিকভাবে মাজরুর হলেও মূল অবস্থানে মাহাল্লান মানসুব। (এখানে مؤمن শব্দটি اسم فاعل যার অর্থ مصدق বা বিশ্বাসকারী)।
- لَنَا (লানা): اللام حرف جر، و(نا) ضمير متصل مبني على السكون في محل جر، والجار والمجرور متعلق بـ (مؤمن) — যার ও মাজরুর মিলে ‘মু’মিন’ ইসমে ফায়েলের সাথে মুতাআল্লিক।
সারকথা: ‘মা’ তার ইসম ও খবর নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জুমলায়ে ইসমিয়্যা নাফিয়্যাহ (جملة اسمية نافية) গঠন করেছে।
٥- لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ ۗ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ ۚ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِ مِن وَالٍ – هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنشِئُ السَّحَابَ الثِّقَالَ –
[৫. তাঁর জন্য রয়েছে একের পর এক আগমনকারী পাহারাদার বাহিনী, যারা তাঁর সম্মুখে ও পশ্চাতে আল্লাহর নির্দেশে তাকে হেফাজত করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো কওমের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। আর আল্লাহ যখন কোনো সম্প্রদায়ের জন্য কোনো অমঙ্গলের ইচ্ছা করেন, তখন তা প্রতিহত করার কেউ নেই; আর তাদের জন্য তিনি ছাড়া কোনো সাহায্যকারী নেই। তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের ভয় ও আশার সঞ্চার করে বিদ্যুৎ দেখান এবং ভারী মেঘমালা সৃষ্টি করেন।]
(أ) من هم المعقبات؟ ولما سميت الملائكة معقبات؟
[(ক) মুয়াক্কিবাত কারা? এবং ফেরেশতাদের কেন মুয়াক্কিবাত নাম রাখা হয়েছে?]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য বিশেষ ফেরেশতাদের নিয়োগের কথা উল্লেখ করেছেন। আলোচ্য আয়াতে তাদের ‘মুয়াক্কিবাত’ (المعقبات) বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে।
المعقبات (মুয়াক্কিবাত) কারা?
তাফসীরে তাবারি ও ইবনে কাসীরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘মুয়াক্কিবাত’ হলেন মানবজাতির সুরক্ষায় নিয়োজিত আল্লাহর বিশেষ ফেরেশতাবৃন্দ (حفظة من الملائكة)। তারা মানুষের সামনে, পেছনে ও ডানে-বামে সার্বক্ষণিক পাহারা দেন এবং আল্লাহর অমোঘ হুকুম ছাড়া যে কোনো বিপদাপদ, জিন-শয়তানের আক্রমণ ও অনিষ্ট থেকে মানুষকে হেফাজত করেন। আর যখন আল্লাহর কোনো নির্ধারিত তাকদীর এসে যায়, তখন তারা সরে যান।
ফেরেশতাদের ‘মুয়াক্কিবাত’ নামকরণের কারণ
- পালাক্রমে আগমন (التعاقب): আরবি ভাষায় ‘আকাবা’ (عقب) অর্থ পেছনে আসা বা একের পর এক আসা। এই ফেরেশতাগণ দিনে ও রাতে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। আসরের নামাজ ও ফজরের নামাজের সময় রাতের ফেরেশতা এবং দিনের ফেরেশতারা একত্রিত হন এবং পালাবদল করে মানুষের সুরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই পালাক্রমে ডিউটি করার কারণেই তাদের ‘মুয়াক্কিবাত’ বলা হয়।
- স্ত্রীবাচক তা (تاء التأنيث)-এর রহস্য: মুয়াক্কিবাত শব্দটি বহুবচন। এর শেষে ‘তা’ যুক্ত হয়েছে মুবালাগা বা আধিক্য বোঝাতে (যেমন: আল্লামাহ – علامة)। অর্থাৎ এই ফেরেশতাগণ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও শক্তির সাথে তাদের দায়িত্বে অবিচল থাকেন।
(ب) اشرح قول الله تعالى “ان الله لا يغير ما بقوم حتى يغيروا ما بانفسهم” –
[(খ) আল্লাহর বাণী: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে”—ব্যাখ্যা কর।]
ভূমিকা
আলোচ্য আয়াতাংশটি সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক বিপ্লবের এক শাশ্বত ঐশী নীতি (سنة إلهية)। ব্যক্তি, জাতি ও সমাজের সার্বিক উন্নতি বা অবনতি সম্পূর্ণভাবে তাদের নৈতিক চরিত্র ও কর্মপদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল—কুরআন এখানে সেই ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরেছে।
আয়াতটির বিশদ তাফসীর ও তাৎপর্য
- ঐশী নেয়ামত ও স্থিতিশীলতার শর্ত: আল্লাহ তাআলা কোনো জাতিকে যে স্বাধীনতা, সম্মান, শান্তি ও ধন-সম্পদ দান করেন, তা তিনি বিনা কারণে ছিনিয়ে নেন না। কিন্তু যখন সেই জাতি আল্লাহর আনুগত্য ত্যাগ করে পাপাচার, অন্যায়, জুলুম ও অকৃতজ্ঞতায় লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহও তাদের ওপর থেকে নিরাপত্তা ও শান্তির চাদর তুলে নেন এবং লাঞ্ছনা ও বিপর্যয় চাপিয়ে দেন।
- জাতির জাগরণের মূল চাবিকাঠি: একইভাবে কোনো জাতি যদি পরাধীনতা, অজ্ঞতা, অনৈক্য ও পতনের গভীর খাদে নিমজ্জিত থাকে, তবে অলৌকিকভাবে আকাশ থেকে এসে কেউ তাদের উদ্ধার করবে না; যতক্ষণ না সেই জাতির মানুষ নিজেদের চিন্তাভাবনা, চরিত্র, কর্মস্পৃহা ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধে বিপ্লব সাধন করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ফিরে আসে।
- ব্যক্তিগত সংশোধন থেকে জাতীয় মুক্তি: জাতীয় পরিবর্তন কখনোই কেবল রাজনৈতিক শ্লোগানে আসে না; বরং ব্যক্তিপর্যায়ে আত্মশুদ্ধি (তাজকিয়ায়ে নফস) এবং নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণের মাধ্যমেই একটি আদর্শ সমাজের ভিত্তি রচিত হয়।
উপসংহার
অতএব বর্তমান মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হলে কেবল অপরের দোষারোপ না করে নিজেদের কর্ম, চরিত্র ও দ্বীনদারীর সংশোধন ঘটাতে হবে। কারণ আত্মসংশোধনই হলো ঐশী সাহায্য ও বিজয়ের একমাত্র পূর্বশর্ত।
٦- قُلْ مَن رَّبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلِ اللَّهُ ۚ قُلْ أَفَاتَّخَذْتُم مِّن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ لَا يَمْلِكُونَ لِأَنفُسِهِمْ نَفْعًا وَلَا ضَرًّا ۚ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَىٰ وَالْبَصِيرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِي الظُّلُمَاتُ وَالنُّورُ ۗ أَمْ جَعَلُوا لِلَّهِ شُرَكَاءَ خَلَقُوا كَخَلْقِهِ فَتَشَابَهَ الْخَلْقُ عَلَيْهِمْ ۚ قُلِ اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ –
[৬. বলুন: আসমান ও জমিনের প্রতিপালক কে? বলে দিন: আল্লাহ! বলুন: তবে কি তোমরা তাঁকে বাদ দিয়ে এমন সব অভিভাবক গ্রহণ করেছ যারা নিজেদের লাভ বা ক্ষতিরও কোনো ক্ষমতা রাখে না? বলুন: অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে, অথবা অন্ধকার ও আলো কি সমান হতে পারে? নাকি তারা আল্লাহর এমন সব অংশীদার স্থির করেছে যারা তাঁর সৃষ্টির মতো কিছু সৃষ্টি করেছে, যার কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়েছে? বলুন: আল্লাহই সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি এক, পরাক্রমশালী।]
(أ) ما معنى الشرك؟ وكم نوعا له؟
[(ক) শিরক-এর অর্থ কী? এবং এর প্রকারভেদ কতটি?]
ভূমিকা
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ। আর তাওহিদের বিপরীত সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ হলো শিরক। শিরকের অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই যদি না বান্দা খাঁটি তওবা করে। আলোচ্য আয়াতে শিরকের অসারতাকে যৌক্তিক প্রমাণ দ্বারা খণ্ডন করা হয়েছে।
শিরকের পরিচয়
শাব্দিক অর্থ: ‘শিরক’ (الشرك) অর্থ অংশীদার করা, শরিক করা, সমকক্ষ নির্ধারণ করা বা সমকক্ষ বানানো।
পারিভাষিক অর্থ: আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, ক্ষমতা, অধিকার বা ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে তাঁর সমকক্ষ বা অংশীদার মনে করাই হলো শিরক। ইমাম রাগিব আল-ইসফাহানী বলেন: “আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে উপাসনায় বা বৈশিষ্ট্যে সমতুল্য জ্ঞান করা শিরক।”
শিরকের প্রকারভেদ
ওলামায়ে কেরাম শিরককে প্রধানত দুটি মৌলিক ভাগে বিভক্ত করেছেন:
- শিরকে আকবর (الشرك الأكبر – বড় শিরক): যা মানুষকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় এবং তার পূর্বের সকল সৎকর্ম বাতিল করে চিরস্থায়ী জাহান্নামের যোগ্য করে। এটি কয়েক প্রকার হতে পারে:
- শিরক ফিয-যাত (সত্তায় শিরক): আল্লাহর সন্তান বা পিতা সাব্যস্ত করা (যেমন খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ বা মুশরিকদের ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা ভাবা)।
- শিরক ফিস-সিফাত (গুণাবলিতে শিরক): কাউকে আল্লাহর মতো সর্বজ্ঞ (আলেমূল গায়েব) বা সর্বশক্তিমান মনে করা।
- শিরক ফিল ইবাদাত (ইবাদতে শিরক): মূর্তি, মাজার, সূর্য বা কোনো সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সেজদা, মানত বা দোয়া করা।
- শিরকে আসগর (الشرك الأصغر – ছোট শিরক): যা সরাসরি মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে না দিলেও অত্যন্ত জঘন্য পাপ এবং সংশ্লিষ্ট আমলকে বরবাদ করে দেয়। এর মধ্যে প্রধান হলো ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো আমল। যেমন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন: “আমি তোমাদের ওপর যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো ছোট শিরক, অর্থাৎ রিয়া (লোকদেখানো ইবাদত)।” এছাড়া আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম খাওয়াও ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
(ب) قوله تعالى ‘خلقوا’ ماذا وقع فى التركيب النحوى؟
[(খ) আল্লাহর বাণী ‘خلقوا’ নাহভী তারকীবে কী হয়েছে?]
নাহভী বিশ্লেষণ (التركيب النحوي لكلمة ‘خلقوا’)
আয়াতাংশ: أَمْ جَعَلُوا لِلَّهِ شُرَكَاءَ خَلَقُوا كَخَلْقِهِ
- خَلَقُوا (খালাকূ): فعل ماضٍ مبني على الضم لاتصاله بواو الجماعة، و(الواو) ضمير متصل مبني على السكون في محل رفع فاعل — এটি মাযী মা’রূফ ফেল, ওয়াও জামায়াতের সাথে যুক্ত হওয়ায় পেশের ওপর মাবনী; আর ‘ওয়াও’ হলো মাহাল্লান মারফু ফায়েল।
- তারকীবীয় অবস্থান (المحل الإعرابي):
জুমলায়ে ফেলিয়্যাহ (خلقوا كخلقه) হলো পূর্ববর্তী ইসমে নাকেরা ‘شُرَكَاءَ’ (শুরাকাআ)-এর সিফাত (نعت / صفة)। যেহেতু ‘শুরাকাআ’ শব্দটি ‘জাআলূ’ ফেলের মাফউলে বিহী হওয়ার কারণে মানসুব ছিল, তাই এই জুমলাটিও ফি মাহাল্লি নাসব (في محل نصب نعت لـ شركاء) হয়েছে।
অর্থগত সম্পর্ক: তারা কি আল্লাহর এমন অংশীদার বানিয়েছে—যাদের গুণ হলো তারা আল্লাহর মতো সৃষ্টি করেছে? এটি কাফেরদের প্রতি একটি তীব্র বিদ্রূপাত্মক প্রশ্ন।
٧- الر ۚ كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَىٰ صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ – اللَّهِ الَّذِي لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ وَوَيْلٌ لِّلْكَافِرِينَ مِنْ عَذَابٍ شَدِيدٍ – الَّذِينَ يَسْتَحِبُّونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجًا ۚ أُولَٰئِكَ فِي ضَلَالٍ بَعِيدٍ –
[৭. আলিফ-লাম-রা; এটি একটি কিতাব যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনি মানবজাতিকে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অন্ধকারসমূহ থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন—পরাক্রমশালী ও প্রশংসিত আল্লাহর সরল পথের দিকে। সেই আল্লাহ, আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে সবই যাঁর; আর কাফেরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির দুর্ভোগ। যারা আখিরাতের তুলনায় পার্থিব জীবনকে বেশি ভালোবাসে, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেয় এবং তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করে; তারাই চরম বিভ্রান্তিতে রয়েছে।]
(أ) فسر قوله تعالى: “الذين يستحبون الحياة الدنيا على الاخرة” –
[(ক) আল্লাহর বাণী: “যারা পরকালের চেয়ে পার্থিব জীবনকে বেশি ভালোবাসে”—এর তাফসীর কর।]
আয়াতটির বিশদ তাফসীর
মুফাসসিরীনদের মতে, ‘ইসতিহবাব’ (الاستحباب) অর্থ কোনো বস্তুকে অন্য বস্তুর ওপর প্রাধান্য দেওয়া ও অধিক ভালোবাসা। আয়াতটিতে কাফের ও পথভ্রষ্টদের একটি মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক রোগ তুলে ধরা হয়েছে:
- ক্ষণস্থায়ী সুখের অন্ধ মোহ: কাফেররা চোখের সামনের ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাস, ক্ষমতা ও পার্থিব লোভকে আখিরাতের চিরন্তন নেয়ামতের চেয়ে শ্রেয় মনে করে। তারা ভালো করেই জানে যে পরকাল সত্য, কিন্তু দুনিয়ার স্বার্থপরতা তাদের সত্য গ্রহণের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
- দ্বীন বিক্রির মানসিকতা: তারা সামান্য বৈষয়িক লাভের আশায় নিজের ঈমান ও বিবেক বিসর্জন দেয়। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে: فَمَا رَبِحَت تِّجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ — “তাদের এই বাণিজ্য লাভজনক হয়নি এবং তারা সঠিক পথও পায়নি।”
- দ্বীনের বিরুদ্ধে অবস্থান: এই দুনিয়াপ্রীতি কেবল তাদের নিজেদের পথভ্রষ্টতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তারা অন্য মানুষদেরও আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিতে শুরু করে (يصدون عن سبيل الله)।
(ب) حقق الكلمات التالية: الظلمات، يصدون –
[(খ) নিম্নোক্ত শব্দগুলোর তাহকীক কর: الظلمات، يصدون।]
শব্দ তাহকীক (التحقيق اللغوي والصرفي)
- الظُّلُمَاتِ (আয-যুলুমাত):
- صیغه ও বহুবচন: جمع مؤنث سالم (বহুবচন), এর একবচন হলো ‘যুলমাহ’ (ظُلْمَةٌ)।
- মূল ধাতু (ماده): ظ – ل – م (যাল-লাম-মীম)।
- বাব (باب): ضرب يضرب (বা যলামা ইয়াযলিমু) অথবা কারুমা ইয়াকরুমু।
- অর্থ: অন্ধকারসমূহ, অজ্ঞতা, কুফর ও শিরকের ঘনঘটা। কুরআনে অন্ধকারকে বহুবচনে আনা হয়েছে কারণ কুফর ও বিভ্রান্তির পথ বহু; আর নূরকে একবচনে আনা হয়েছে কারণ সত্যের পথ মাত্র একটি।
- يَصُدُّونَ (য়াসুদ্দূনা):
- صیغه: جمع مذكر غائب (পুংলিঙ্গ বহুবচন নামপুরুষ)।
- بحث: فعل مضارع معروف (বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালীন ক্রিয়া)।
- মূল ধাতু (ماده): ص – د – د (সোয়াদ-দাল-দাল), জিনসে মুদাআফে সুলাসী (مضاعف ثلاثي)।
- বাব (باب): نصر ينصر (বা বাবে নাসারা ইয়ানসুরু)।
- অর্থ: তারা বাধা প্রদান করে, ফিরিয়ে রাখে বা বিমুখ হয়।
٨- وَقَالَ مُوسَىٰ إِن تَكْفُرُوا أَنتُمْ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا فَإِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ حَمِيدٌ – أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَبَأُ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ ۛ وَالَّذِينَ مِن بَعْدِهِمْ ۛ لَا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا اللَّهُ ۚ جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَرَدُّوا أَيْدِيَهُمْ فِي أَفْوَاهِهِمْ وَقَالُوا إِنَّا كَفَرْنَا بِمَا أُرْسِلْتُم بِهِ وَإِنَّا لَفِي شَكٍّ مِّمَّا تَدْعُونَنَا إِلَيْهِ مُرِيبٍ –
[৮. আর মূসা বললেন: যদি তোমরা এবং জমিনে যারা আছে সবাই কুফরি করো, তবুও নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। তোমাদের কাছে কি তোমাদের পূর্ববর্তীদের সংবাদ পৌঁছেনি—নূহ, আদ ও সামূদ কওম এবং তাদের পরবর্তীদের? যাদের আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিলেন, কিন্তু তারা নিজেদের হাত নিজেদের মুখে চেপে ধরল এবং বলল: তোমরা যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছ নিশ্চয়ই আমরা তা প্রত্যাখ্যান করলাম এবং তোমরা যে বিষয়ের দিকে আমাদের ডাকছ সে সম্পর্কে আমরা বিভ্রান্তিকর সন্দেহের মধ্যে রয়েছি।]
(أ) ما المراد من قول الله “إن تكفروا انتم ومن فى الارض جميعا”؟
[(ক) আল্লাহর বাণী: “যদি তোমরা এবং পৃথিবীর সকলে কুফরি করো”—দ্বারা কী উদ্দেশ্য?]
বিশদ ব্যাখ্যা
হযরত মূসা (আ.) বনী ইসরাঈলকে লক্ষ্য করে এই গভীর সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। এর মূল শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
- আল্লাহর পরম অমুখাপেক্ষিতা (الغنى المطلق): নিখিল বিশ্বের সকল জিন ও মানব যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাফের ও পাপাচারী হয়ে যায়, তবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, প্রতাপ বা রাজত্বের চুল পরিমাণ ক্ষতিও হবে না। ঠিক তেমনিভাবে সকলেই যদি পরম মুত্তাকী হয়ে যায়, তবে আল্লাহর রাজত্ব এতটুকুও বৃদ্ধি পাবে না।
- হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন: “হে আমার বান্দারা! তোমাদের পূর্বাপর সকল মানুষ ও জিন যদি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে পাপাচারী ব্যক্তির অন্তরের মতো হয়ে যায়, তবে তা আমার রাজত্বের কোনো ক্ষতি সাধন করবে না।” (সহীহ মুসলিম)।
- অতএব বান্দা ঈমান ও নেক আমল করে নিজেরই কল্যাণ সাধন করে, আর কুফরি করে কেবল নিজেরই ধ্বংস ডেকে আনে। আল্লাহ বান্দার ইবাদতের মুখাপেক্ষী নন।
(ب) ما معنى الكفر؟ وكم نوعا له؟
[(খ) কুফর শব্দের অর্থ কী? এবং এর প্রকারভেদ কতটি?]
কুফরের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
শাব্দিক অর্থ: ‘কুফর’ (الكفر) শব্দের মূল অর্থ ঢেকে রাখা, গোপন করা বা অকৃতজ্ঞ হওয়া। বীজকে মাটির নিচে ঢেকে রাখে বলে আরবিতে কৃষককে ‘কাফির’ (كَافِرٌ) বলা হয়।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায়, রাসূলুল্লাহ (স.) দ্বীনের যে সকল সুনিশ্চিত বিধান ও ওহী আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন, তার কোনো একটিকে অস্বীকার করা বা অবিশ্বাস করাই হলো কুফর।
কুফরের প্রকারভেদ: ওলামায়ে কেরাম কুফরকে প্রধানত চার ভাগে বিভক্ত করেছেন:
- কুফরে ইনকার (كفر الإنكار): অন্তরেও বিশ্বাস না করা এবং মুখেও স্বীকার না করা (যেমন নাস্তিকদের কুফর)।
- কুফরে জুহূদ (كفر الجحود): অন্তরে সত্য জেনেও কেবল অহংকার ও জেদের বশে মুখে অস্বীকার করা (যেমন ইবলিসের কুফর এবং তৎকালীন বহু ইহুদি পন্ডিতের কুফর)।
- কুফরে এ’নাদ (كفر العناد): সত্যকে অন্তর ও মুখ দিয়ে স্বীকার করা সত্ত্বেও আনুগত্য না করে বিরোধিতা করা (যেমন আবু তালিবের অবস্থা)।
- কুফরে নিফাক (كفر النفاق): মুখে ঈমানের মিথ্যা দাবি করা অথচ অন্তরে কুফর লালন করা (মুনাফিকদের কুফর)।
٩- الر ۚ تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ وَقُرْآنٍ مُّبِينٍ – رُّبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ – ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ ۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ – وَمَا أَهْلَكْنَا مِن قَرْيَةٍ إِلَّا وَلَهَا كِتَابٌ مَّعْلُومٌ – مَّا تَسْبِقُ مِنْ أُمَّةٍ أَجَلَهَا وَمَا يَسْتَأْخِرُونَ –
[৯. আলিফ-লাম-রা; এগুলো কিতাবের এবং সুস্পষ্ট কুরআনের আয়াত। কখনো কখনো কাফেররা আক্ষেপ করে কামনা করবে—হায়! তারা যদি মুসলিম হতো! তাদের ছেড়ে দিন, তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের ভুলিয়ে রাখুক; অচিরেই তারা জানতে পারবে। আর আমি কোনো জনপদকেই ধ্বংস করিনি যার জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ লিপিবদ্ধ ছিল না। কোনো জাতিই তার নির্দিষ্ট সময়সীমাকে এগিয়ে আনতে পারে না এবং বিলম্বিতও করতে পারে না।]
(أ) اوضح قول الله تعالى “ربما يود الذين كفروا لوكانوا مسلمين” –
[(ক) আল্লাহর বাণী: “কখনো কখনো কাফেররা কামনা করবে—হায়! তারা যদি মুসলিম হতো”—স্পষ্ট কর।]
আয়াতের মর্মার্থ ও পটভূমি
মুফাসসিরীনদের মতে, কাফেররা কখন ও কেন ইসলাম গ্রহণের এই তীব্র আক্ষেপ করবে, সে সম্পর্কে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে:
- মৃত্যুর সময়: যখন মৃত্যুর ফেরেশতা আযাবের রূপ নিয়ে সামনে হাজির হবেন এবং পরকালের বিভীষিকা চাক্ষুষ দেখতে পাবে, তখন তারা চরম অনুতপ্ত হয়ে বলবে—হায়! আমরা যদি মুসলিম হতাম!
- কিয়ামতের ময়দানে: যখন তারা মুমিনদের সম্মান, নুর এবং জান্নাতের সুসংবাদ প্রত্যক্ষ করবে, তখন তাদের আফসোসের সীমা থাকবে না।
- জাহান্নাম থেকে গুনাহগার মুমিনদের মুক্তির সময়: সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কিয়ামতের দিন গুনাহগার মুসলিমরা যখন নিজ পাপের কারণে কিছুকাল জাহান্নামে কাফেরদের সাথে থাকবে, তখন কাফেররা উপহাস করে বলবে: “তোমাদের ইসলাম তোমাদের কী কাজে আসল?” অতঃপর যখন আল্লাহর আদেশে সকল ঈমানদারকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তখন কাফেররা চরম বিলাপ করে বলবে: رُبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْ كَانُوا مُسْلِمِينَ — “হায়! আমরা যদি পার্থিব জীবনে মুসলিম হতাম, তবে আজ আমরাও এভাবে মুক্তি পেতাম!”
(ب) قول الله تعالى “يأكلوا ويتمتعوا” ماذا وقع فى التركيب النحوى؟
[(খ) আল্লাহর বাণী “يأكلوا ويتمتعوا” নাহভী তারকীবে কী হয়েছে?]
নাহভী বিশ্লেষণ
- ذَرْهُمْ (যারহুম): ‘যার’ (ذر) হলো ফে’লে আমর (امر), ফায়েল হলো ‘আনতা’ (أنت) সর্বনাম; আর ‘হুম’ (هم) হলো মাফউলে বিহী।
- يَأْكُلُوا (ইয়াকুলূ): فعل مضارع مجزوم لأنه وقع جوابا للأمر (ذرهم)، وعلامة جزمه حذف النون لأنه من الأفعال الخمسة، والواو فاعل — এটি ফে’লে মুযারে যা জাযমপ্রাপ্ত হয়েছে, কারণ এটি ফে’লে আমরের জওয়াবে (জওয়াবুল আমর) واقع হয়েছে। এর জাযমের আলামত হলো ‘নূন’ পড়ে যাওয়া (হযফে নূন)।
- وَيَتَمَتَّعُوا (ওয়া ইয়াতামাত্তা’ঊ): الواو حرف عطف، و(يتمتعوا) معطوف على (يأكلوا) مجزوم مثله بحذف النون — হরফে আতফের মাধ্যমে পূর্ববর্তী জাযমপ্রাপ্ত ফে’লের ওপর মাতূফ হয়ে এটিও নূন পড়ে গিয়ে মাজযূম হয়েছে।
١٠- وَقَالُوا يَا أَيُّهَا الَّذِي نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ إِنَّكَ لَمَجْنُونٌ – لَّوْ مَا تَأْتِينَا بِالْمَلَائِكَةِ إِن كُنتَ مِنَ الصَّادِقِينَ – مَا نُنَزِّلُ الْمَلَائِكَةَ إِلَّا بِالْحَقِّ وَمَا كَانُوا إِذًا مُّنظَرِينَ – إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ – وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ فِي شِيَعِ الْأَوَّلِينَ – وَمَا يَأْتِيهِم مِّن رَّسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ –
[১০. আর তারা বলল: ওহে যার ওপর উপদেশ অবতীর্ণ হয়েছে! নিশ্চয়ই তুমি একজন উন্মাদ। তুমি যদি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও তবে আমাদের কাছে ফেরেশতাদের নিয়ে আসছ না কেন? আমি ফেরেশতাদের কেবল সত্য ও বাস্তব ফায়সালাসহকারে অবতীর্ণ করি, আর তখন তাদের কোনো অবকাশ দেওয়া হবে না। নিশ্চয়ই আমিই এই উপদেশ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি নিজেই এর সংরক্ষক। আর আপনার পূর্বেও আমি পূর্ববর্তীদের বিভিন্ন দলের মাঝে রাসূল প্রেরণ করেছিলাম। আর তাদের কাছে এমন কোনো রাসূল আসেননি যাঁর সাথে তারা উপহাস করেনি।]
(أ) لم قالوا للنبى صلى الله عليه وسلم إنك لمجنون؟ وهل كان فيه جنون؟
[(ক) কাফেররা কেন নবীজী (স.)-কে উন্মাদ বলেছিল? এবং তাঁর মাঝে কি কোনো উন্মাদনা ছিল?]
উত্তর ও বিশ্লেষণ
কাফেরদের অপবাদের কারণ: মক্কার কুরাইশরা ভালো করেই জানত যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ সত্যবাদী (আল-আমীন) ও অনন্য চরিত্রের অধিকারী। কিন্তু যখন তিনি তাদের বহু বছরের বাপ-দাদার মূর্তিপূজা বর্জন করে এক অদৃশ্য আল্লাহর তাওহিদের দাওয়াত দিলেন এবং পরকালের ন্যায়বিচারের ভয় দেখালেন, তখন স্বার্থান্ধ কাফেররা সাধারণ মানুষকে তাঁর থেকে দূরে রাখার চক্রান্ত হিসেবে এই হীন অপবাদ দেয়। তারা বিদ্রূপ করে তাঁকে উন্মাদ বলত।
অপবাদের অসারতা: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সৃষ্টির সেরা মানব, পরম প্রজ্ঞাবান ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তার প্রতীক। আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্বয়ং কাফেরদের এই অপবাদ খণ্ডন করে ইরশাদ করেছেন: مَا أَنتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُونٍ ۚ وَإِنَّ لَكَ لَأَجْرًا غَيْرَ مَمْنُونٍ ۚ وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ — “আপনার রবের অনুগ্রহে আপনি উন্মাদ নন। নিশ্চয়ই আপনার জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার এবং নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।” (সূরা আল-কলম: ২-৪)।
(ب) ما معنى الذكر؟ وإلم يعود الضمير فى (له) فى هذه الآية الكريمة؟
[(খ) ‘যিকির’ শব্দের অর্থ কী? এবং এ আয়াতে (له) সর্বনামটি কার দিকে প্রত্যাবর্তন করেছে?]
ব্যাখ্যা ও তাহকীক
- ‘যিকির’ (الذِّكْرُ)-এর অর্থ: যিকির শব্দের সাধারণ অর্থ স্মরণ, সম্মান ও উপদেশ। তবে আলোচ্য আয়াতে ‘আয-যিকির’ দ্বারা সুনির্দিষ্টভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীম উদ্দেশ্য। কারণ এটি মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং এতে রয়েছে বিশ্ববাসীর জন্য অনুপম নসিহত।
- (لَهُ) সর্বনামের প্রত্যাবর্তন: وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ আয়াতে ‘লাহূ’-এর ‘হু’ (ـهُ) জমিরটি ‘আয-যিকির’ অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের দিকে প্রত্যাবর্তন করেছে। অর্থাৎ “আমি নিজেই এই পবিত্র কুরআনের সংরক্ষক।” (কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে এটি নবী করীম (স.)-এর দিকেও প্রত্যাবর্তন করতে পারে, অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর নবীকে হেফাজত করবেন; তবে জমহুর মুফাসসিরদের মতে এটি কুরআনের দিকেই প্রত্যাবর্তিত)। এর মাধ্যমে আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনের প্রতিটি হরফ, শব্দ ও ভাবকে বিকৃতি থেকে রক্ষার চিরন্তন গ্যারান্টি দিয়েছেন।
مجموعة (ب) – খ-বিভাগ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
الدرجات: ١٠ × ١ = ١٠
١١- عَرِّفِ التَّفْسِيرَ بِالْمَأْثُورِ مَعَ أَنْوَاعِهِ وَقَوَاعِدِهِ مُفَصَّلًا –
[১১. তাফসীর বিল মা’ছুরের পরিচয় দাও এবং এর প্রকারভেদ ও মূলনীতিসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ তাফসীর ও মর্ম উপলব্ধির সবচেয়ে প্রামাণ্য ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হলো ‘তাফসীর বিল মা’ছুর’ (التفسير بالمأثور)। নিজস্ব মনগড়া রায় বা যুক্তির ঊর্ধ্বে ওহী ও নির্ভরযোগ্য সনদের ওপর প্রতিষ্ঠিত এ পদ্ধতিকেই তাফসীরের মূল ভিত্তি গণ্য করা হয়।
তাফসীর বিল মা’ছুরের সংজ্ঞা
শাব্দিক অর্থ: ‘মা’ছুর’ (مأثور) অর্থ বর্ণিত, ঐতিহ্যগত বা পরম্পরাগতভাবে প্রাপ্ত।
পারিভাষিক সংজ্ঞা: যে তাফসীর কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের আসার এবং তাবেয়ীগণের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে সম্পন্ন করা হয়, তাকে ‘তাফসীর বিল মা’ছুর’ বা রেওয়ায়েতভিত্তিক তাফসীর বলা হয়।
তাফসীর বিল মা’ছুরের স্তর ও প্রকারভেদ
- কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর: এটি তাফসীরের সর্বোচ্চ স্তর। কুরআনের এক স্থানের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যকে অন্য স্থানের বিস্তারিত আয়াত দ্বারা ব্যাখ্যা করা (যেমন সূরা ফাতিহার ‘সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহিম’-এর ব্যাখ্যা সূরা নিসার ৬৯ আয়াতে দেওয়া হয়েছে)।
- হাদিস বা সুন্নাহ দ্বারা তাফসীর: রাসূলুল্লাহ (স.) হলেন কুরআনের প্রধান ব্যাখ্যাকারী। তিনি তাঁর কথা ও কর্ম দ্বারা আয়াতের মর্ম স্পষ্ট করেছেন (যেমন সালাত কায়েমের পদ্ধতি হাদিস দ্বারা নির্ধারিত)।
- সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য দ্বারা তাফসীর: সাহাবিগণ ওহী নাযিলের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। বিশেষত ইবনে আব্বাস (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.) প্রমুখের তাফসীর অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।
- তাবেয়ীগণের মতামত দ্বারা তাফসীর: মুজাহিদ, কাতাদাহ, হাসান বসরী প্রমুখ বিশিষ্ট তাবেয়ীগণের রেওয়ায়েত।
তাফসীর বিল মা’ছুরের মূলনীতি ও গ্রহণযোগ্যতার শর্ত
- সনদের বিশুদ্ধতা যাচাই এবং দুর্বল বা জাল হাদিস পরিহার করা।
- ইসরাঈলি কাল্পনিক ও বানোয়াট বর্ণনা থেকে মুক্ত থাকা।
- আরবি ভাষার ব্যাকরণ ও বিশুদ্ধ প্রয়োগরীতির সাথে সংগতিপূর্ণ হওয়া।
উপসংহার
তাফসীর বিল মা’ছুর হলো কুরআনী তাফসীরের ভিত্তিপ্রস্তর। ইমাম তাবারী, ইবনে কাসীর ও সুয়ূতী (রহ.)-এর তাফসীর গ্রন্থসমূহ এই পদ্ধতির শ্রেষ্ঠ স্মারক।
١٢- اذْكُرْ نُبْذَةً مِنْ حَيَاةِ الْمُفَسِّرِ الْعَلَّامِ أَبِي الْفِدَاءِ إِسْمَاعِيلَ بْنِ كَثِيرٍ صَاحِبِ “تَفْسِيرِ الْقُرْآنِ الْعَظِيمِ” ثُمَّ بَيِّنْ مَنَاهِجَهُ وَخَصَائِصَ تَفْسِيرِهِ الْمَذْكُورِ –
[১২. তাফসীরে কুরআনিল আযীমের রচয়িতা হাফিজ ইবনে কাসীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখ কর এবং উক্ত তাফসীরের পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামি জ্ঞানজগতে হাফিজ ইমাদুদ্দীন আবুল ফিদা ইসমাইল ইবনে কাসীর (রহ.) এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। হাদিস, ইতিহাস ও তাফসীর শাস্ত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর রচিত ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’ বিশ্বব্যাপী ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’ নামে সমধিক খ্যাত এবং তাফসীর বিল মা’ছুরের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণ্য গ্রন্থ।
হাফিজ ইবনে কাসীর (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
- জন্ম ও বংশপরিচয়: তিনি ৭০১ হিজরীতে সিরিয়ার বুসরা অঞ্চলের অন্তর্গত মাজদাল নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম ইসমাইল ইবনে উমর ইবনে কাসীর আল-কুরাশী আদ-দিমাশকী।
- শিক্ষা ও শিক্ষকবৃন্দ: শৈশবেই তিনি দামেস্কে আগমন করেন এবং পবিত্র কুরআন হিফজ করেন। তিনি শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, আল্লামা মিযযী, আল্লামা যাহাবী এবং কামালুদ্দীন ইবনে কাযী শুহবাহ (রহ.)-এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের সান্নিধ্যে জ্ঞানার্জন করেন।
- রচনাবলি: তাঁর অমর গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, বিশ্বখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, জামেউল মাসানীদ ওয়াস সুনান এবং আল-বাহিসুল হাহীস (উলূমুল হাদিস)।
- ইন্তেকাল: তিনি ৭৭৪ হিজরীতে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে তাঁর প্রিয় উস্তাদ আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর পাশে দাফন করা হয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীরের মানহাজ ও অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
- কুরআন দ্বারা কুরআনের নিখুঁত তাফসীর: তিনি প্রথমে আয়াত উল্লেখ করে তার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কুরআনী আয়াতের চমৎকার সমন্বয় সাধন করেন।
- সনদসহ প্রামাণ্য হাদিসের সমাবেশ: তিনি সিহাহ সিত্তাহ ও মুসনাদে আহমাদ থেকে সহীহ সনদযুক্ত হাদিস উদ্ধৃত করে আয়াতের তাফসীর উপস্থাপন করেন এবং সনদের মান বিচার করেন।
- ইসরাঈলি রেওয়ায়েতের কঠোর খণ্ডন: তাঁর তাফসীরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তিনি ইহুদিদের বানোয়াট ও অবাস্তব কেচ্ছা-কাহিনী (ইসরাঈলিয়াত) দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান ও খণ্ডন করেছেন।
- ফিকহী মাসআলায় নিরপেক্ষ আলোচনা: বিভিন্ন ফিকহী মাযহাবের যুক্তি ও মতামত উল্লেখপূর্বক দলিলভিত্তিক তুলনামূলক পর্যালোচনা পেশ করেছেন।
উপসংহার
হাফিজ ইবনে কাসীর (রহ.)-এর এই তাফসীর কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি কুরআন গবেষক ও শিক্ষার্থীর জন্য এক অপরিহার্য ও নির্ভরযোগ্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ৩য় বর্ষের আত-তাফসীর বিস-সানাদ (২০১৩০১) পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার উপায় কী?
কুরআনের মূল আয়াতসমূহের সঠিক তরজমা, ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ (তারকীব ও তাহকীক) এবং প্রখ্যাত মুফাসসিরদের মতামত উদ্ধৃতিসহ উপস্থাপন করলে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া যায়।
২. আত-তাফসীর বিস-সানাদ পত্রটিতে কোন কোন সূরার তাফসীর অন্তর্ভুক্ত?
এ পত্রে মূলত সূরা হূদ, সূরা ইউসুফ, সূরা আর-রাদ এবং সূরা ইবরাহীমের নির্বাচিত অংশের সনদভিত্তিক প্রামাণ্য তাফসীর পাঠ্য থাকে।
৩. তাফসীর বিল মা’ছুর (التفسير بالمأثور) বলতে কী বোঝায়?
কুরআনের আয়াতকে অপর আয়াত দ্বারা, রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের আসার এবং তাবেয়ীগণের ব্যাখ্যার মাধ্যমে যে তাফসীর করা হয় তাকে তাফসীর বিল মা’ছুর বলে।
৪. তাফসীরে ইবনে কাসীরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী?
হাফিজ ইবনে কাসীর (রহ.)-এর ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’ হলো তাফসীর বিল মা’ছুরের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, যাতে সনদসহ হাদিস ও ইসরাঈলি রেওয়ায়েতের কঠোর যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।
৫. ক-বিভাগের আয়াতভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর কীভাবে লিখলে ভালো হয়?
প্রথমে আয়াতটির সাবলীল অনুবাদ, এরপর সংশ্লিষ্ট শানে নুযূল, ব্যাকরণগত দিক এবং উপ-প্রশ্নগুলোর বিশ্লেষণ ধারাবাহিক সাব-হেডিং দিয়ে লেখা উত্তম।
৬. পরীক্ষার সময় বণ্টন কেমন হওয়া উচিত?
৪ ঘণ্টার পরীক্ষায় ক-বিভাগের ৫টি প্রশ্নের জন্য প্রতিটিতে গড়ে ৩৫-৪০ মিনিট এবং খ-বিভাগের ১টি প্রশ্নের জন্য ২৫-৩০ মিনিট বরাদ্দ রাখা উচিত।