জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন (At-Tafsir Wal Mufassirun) – 403, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২০

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৭৫ মিনিট পড়ার সময়
১৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২০
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন (التفسير والمفسرون – ইতিহাস ও মূলনীতি)
বিষয় কোড: ৪০৩ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৫৯ | পরীক্ষা কোড: ২০৪
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

[দ্রষ্টব্য: নিচের যে কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দাও। সকল প্রশ্নের মান সমান: ১৬ × ৫ = ৮০]


ভূমিকা ও পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন’ (التفسير والمفسرون) একটি সর্বাধিক তাত্ত্বিক ও ইতিহাসভিত্তিক মৌলিক বিষয় (বিষয় কোড: ৪০৩)। তাফসীর শাস্ত্রের ক্রমবিকাশ, উৎপত্তি, যুগবিভাজন, তাফসীর ও তা’বিলের পার্থক্য, নবুওয়াত ও সাহাবা যুগের তাফসীররীতি, তাবেয়ী যুগের তাফসীর প্রতিষ্ঠানসমূহ (মাদরাসাতুত তাফসীর), একজন আদর্শ মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শর্তাবলি ও শিষ্টাচার, তাফসীর বির-রায়ের গ্রহণযোগ্যতা এবং ইমাম তাবারী, ইবনে মাসউদ (রা.), যামাখশারী, বায়যাবী ও আলুসী (রহ.)-এর মতো যুগান্তকারী মুফাসসিরগণের জীবন ও কর্ম পর্যালোচনা এই বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ২০২০ সালের এই প্রশ্নপত্রে মোট ৯টি প্রশ্ন এসেছে। শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির লক্ষ্যে নিম্নে ৯টি প্রশ্নেরই সর্বোচ্চ প্রামাণিক, উচ্চাঙ্গের ও বিস্তারিত সমাধান প্রদান করা হলো।


١- عرف التفسير والتأويل- ثم تحدث عن معانى التأويل التى وردت فى القرآن الكريم موضحًا-

[التفسير ও التأويل এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর কুরআনুল কারীমে বর্ণিত তা’বীল এর অর্থসমূহ বিশদভাবে আলোচনা কর।]

১. ‘আত-তাফসীর’ (التفسير)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘আত-তাফসীর’ শব্দটি আরবী ’فَسَّرَ – يُفَسِّرُ – تَفْسِيرًا‘ বাব থেকে গৃহীত। এর মূল ধাতু হলো ‘ف – س – ر’ (ফা-সীন-রা) অথবা কারো মতে উল্টো রূপ (قلب مكاني) ‘س – ف – ر’ (সীন-ফা-রা)।

    অভিধানে এর অর্থ হলো: البيان والإيضاح والكشف والإظهار অর্থাৎ কোনো অস্পষ্ট বিষয়কে সুস্পষ্ট করা, ব্যাখ্যা করা, অর্থ উদ্ঘাটন করা এবং আবরণ উন্মোচন করা। যেমন আরবী প্রবাদে বলা হয়: سَفَرَتِ الْمَرْأَةُ عَنْ وَجْهِهَا (মহিলা তার মুখমণ্ডলের পর্দা উন্মোচন করল)।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা:

    ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) তাঁর ‘আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন’ গ্রন্থে বলেন:

    «التَّفْسِيرُ: عِلْمٌ يُفْهَمُ بِهِ كِتَابُ اللَّهِ الْمُنَزَّلُ عَلَى نَبِيِّهِ مُحَمَّدٍ ﷺ، وَبَيَانُ مَعَانِيهِ، وَاسْتِخْرَاجُ أَحْكَامِهِ وَحِكَمِهِ»

    “তাফসীর হলো এমন এক শাস্ত্র, যার মাধ্যমে নবী করীম মুহাম্মদ (ﷺ)-এর ওপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাবকে সম্যকভাবে বুঝা যায়, এর মর্মার্থসমূহ সুস্পষ্ট করা যায় এবং এর অন্তর্নিহিত হুকুম-আহকাম ও হিকমতসমূহ উদ্ভাবন করা যায়।”

    ইমাম সুয়ূতী (রহ.)-এর মতে: তাফসীর হলো এমন এক বিজ্ঞান যা মানবীয় সামর্থ্যের আলোকে মহান আল্লাহর বাণীর উদ্দেশ্য উদঘাটন নিয়ে আলোচনা করে।

২. ‘আত-তা’বীল’ (التأويل)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘আত-তা’বীল’ শব্দটি আরবী ’أَوَّلَ – يُؤَوِّلُ – تَأْوِيلًا‘ ধাতু থেকে গৃহীত। এর মূল অক্ষর হলো ‘أ – و – ل’ (হামযা-ওয়াও-লাম), যার অর্থ: الرجوع إلى الأصل والعاقبة অর্থাৎ মূল উৎসের দিকে ফিরে যাওয়া, পরিণাম, ফলাফল বা শেষ পরিণতি।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা:

    মুতাআখখিরীন (পরবর্তী যুগের আলেম ও ফকীহগণ)-এর পরিভাষায়:

    «صَرْفُ اللَّفْظِ عَنْ مَعْنَاهُ الظَّاهِرِ الرَّاجِحِ إِلَى مَعْنًى مَرْجُوحٍ لِدَلِيلٍ يَقْتَضِيهِ»

    “কোনো দলীল বা যুক্তির ভিত্তিতে কোনো শব্দের প্রকাশ্য ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত (যাহির ও রাজেহ) অর্থ পরিহার করে অপ্রকাশ্য বা সম্ভাব্য (মারজূহ) অর্থে প্রয়োগ করা।”

৩. কুরআনুল কারীমে বর্ণিত ‘তা’বীল’ (التأويل) শব্দের অর্থসমূহ

পবিত্র কুরআনে ‘তা’বীল’ শব্দটি মোট ১৭টি আয়াতে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনুল কারীমের সামগ্রিক ব্যবহারে তা’বীলের মূলত তিনটি প্রধান অর্থ পরিলক্ষিত হয়:

  1. ১. বিষয়ের চূড়ান্ত পরিণতি, বাস্তব রূপ ও ভবিষ্যৎ ফলাফল (مَا يَئُولُ إِلَيْهِ الشَّيْءُ وَعَاقِبَتُهُ فِي الْخَارِجِ):

    কুরআনে তা’বীলের সর্বাধিক ব্যবহার হয়েছে কোনো ঘটনা বা বাণীর বাস্তব বহিঃপ্রকাশ ও চূড়ান্ত পরিণতি অর্থে। যেমন:

    • সূরা আল-আ’রাফে কিয়ামত ও আখেরাতের শাস্তির আগমন প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে:

      ﴿هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا تَأْوِيلَهُ يَوْمَ يَأْتِي تَأْوِيلُهُ يَقُولُ الَّذِينَ نَسُوهُ مِن قَبْلُ قَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِالْحَقِّ﴾ [الأعراف: ৫৩]

      অর্থাৎ “তারা কি কেবল এর চরম পরিণতিরই প্রতীক্ষা করছে? যেদিন এর চূড়ান্ত পরিণতি (কিয়ামত ও প্রতিদান) বাস্তবে উপস্থিত হবে, সেদিন পূর্বে যারা একে ভুলে গিয়েছিল তারা বলবে: আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ সত্য নিয়েই এসেছিলেন।” এখানে তা’বীল অর্থ বাস্তব রূপ পাওয়া।
    • সূরা বনী ইসরাঈলে পরিমাপে সুবিচার প্রসঙ্গে এসেছে:

      ﴿وَأَوْفُوا الْكَيْلَ إِذَا كِلْتُمْ وَزِنُوا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا﴾ [الإسراء: ৩৫]

      অর্থাৎ “পরিমাপে পূর্ণ মাপ দাও এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন কর; এটি উত্তম এবং পরিণামের দিক দিয়ে উৎকৃষ্টতর।” এখানে তা’বীল অর্থ শেষ ফলাফল বা পরিণতি (عاقبة)।
  2. ২. স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও রহস্য উন্মোচন (تَعْبِيرُ الرُّؤْيَا وَتَفْسِيرُهَا):

    সূরা ইউসুফে তা’বীল শব্দটি বারংবার স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও প্রতীকের রহস্য উদঘাটন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন:

    • হযরত ইউসুফ (আ.)-এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশে: ﴿رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ﴾ [يوسف: ১০১] অর্থাৎ “হে আমার রব! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছেন এবং স্বপ্নের তাৎপর্য ও ব্যাখ্যার জ্ঞান শিখিয়েছেন।”
    • হযরত ইউসুফ (আ.)-এর পিতামাতার সেজদার পর উক্তি: ﴿يَا أَبَتِ هَذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا﴾ [يوسف: ১০০] অর্থাৎ “হে আমার পিতা! এটিই হলো আমার পূর্ববর্তী স্বপ্নের বাস্তব ব্যাখ্যা, যা আমার প্রতিপালক সত্যে পরিণত করেছেন।”
  3. ৩. আয়াতের মর্মার্থ, তাফসীর ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য (التَّفْسِيرُ وَبَيَانُ الْمَعْنَى):

    কোনো কোনো স্থানে তাফসীর ও তা’বীল সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন সূরা আলে ইমরানের মুতাশাবিহাত সংক্রান্ত আয়াতে:

    ﴿وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ﴾ [آل عمران: ৭]

    এখানে সালাফদের একদলের মতে তা’বীল অর্থ স্বয়ং আয়াতের গূঢ় মর্মার্থ ও চূড়ান্ত তাৎপর্য, যা একমাত্র আল্লাহই অবগত আছেন। এছাড়া হযরত খিযির (আ.)-এর ঘটনায় এসেছে: ﴿ذَلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِع عَّلَيْهِ صَبْرًا﴾ [الكهف: ৮২] অর্থাৎ “এটিই হলো সেই সব বিষয়ের অন্তর্নিহিত রহস্যময় তাৎপর্য, যার ওপর আপনি ধৈর্য ধরতে পারেননি।”

٢- بين خصائص التفسير فى زمن رسول الله صلى الله عليه وسلم وأصحابه-

[রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের যুগের তাফসিরের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা কর।]

১. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগের তাফসীরের বৈশিষ্ট্যসমূহ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগ হলো তাফসীর শাস্ত্রের সূচনা ও স্বর্ণযুগ। কারণ পবিত্র কুরআন তাঁর ওপরই অবতীর্ণ হয়েছিল এবং কুরআন ব্যাখ্যার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা তাঁকেই অর্পণ করেছিলেন: ﴿وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ﴾ [النحل: ৪৪]। এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

  1. কুরআন দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা (تفسير القرآن بالقرآن):

    রাসূল (ﷺ) এক আয়াতের অস্পষ্টতা অন্য আয়াতের সাহায্যে দূর করতেন। যেমন: ﴿الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ﴾ আয়াতের ‘জুলম’ শব্দের অর্থ সাহাবায়ে কেরাম সাধারণ পাপ মনে করে চিন্তিত হলে নবীজী (ﷺ) সূরা লোকমানের ১৩ নম্বর আয়াত পাঠ করে বুঝিয়ে দেন যে, এখানে জুলম অর্থ ‘শিরক’ (إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ)।
  2. মৌখিক সুন্নাহ ও প্রায়োগিক বাস্তবায়ন (البيان النبوي قولاً وعملاً):

    কুরআনের সংক্ষিপ্ত (মুজমাল) বিধানগুলোর বিশদ বিবরণ রাসূল (ﷺ) তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে প্রদান করেছেন। যেমন: নামায কায়েমের নির্দেশ কুরআনে এলেও রাকাআত সংখ্যা, রুকু-সেজদার নিয়ম নবীজী প্র্যাক্টিক্যালি শিখিয়ে বলেছেন: «صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي» (তোমরা সেভাবে নামায পড় যেভাবে আমাকে পড়তে দেখছ)।
  3. সমগ্র কুরআনের তাফসীর না করে কেবল প্রয়োজনের ব্যাখ্যা:

    সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন আরবী ভাষার বিশুদ্ধ ভাষাবিদ (আহলে লিসান)। ফলে কুরআনের অধিকাংশ আয়াতের ভাষা ও ব্যাকরণ তারা সহজেই বুঝতেন। যে সকল বিষয়ে শানে নুযূল, গায়েবের সংবাদ বা অস্পষ্টতা তৈরি হতো, কেবল সেগুলোই তারা রাসূল (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করতেন এবং রাসূল (ﷺ) তার ব্যাখ্যা দিতেন।
  4. লিখনির অভাব ও স্মৃতির ওপর নির্ভরতা:

    এ যুগে তাফসীর কোনো পৃথক গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ ছিল না। কুরআন ও হাদীসের পাঠ স্মৃতিতে সংরক্ষণ এবং আমলের মাধ্যমে ধারণ করাই ছিল মূল রীতি।

২. সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর যুগের তাফসীরের বৈশিষ্ট্যসমূহ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরামের যুগ শুরু হয়। এই যুগের বিশিষ্ট মুফাসসিরদের মধ্যে ছিলেন চার খলীফা, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, উবাই ইবনে কা’ব, যায়েদ ইবনে সাবিত ও আবু মূসা আশ’আরী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। এই যুগের বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

  1. উৎসসমূহের ধারাবাহিক বিন্যাস:

    সাহাবায়ে কেরাম তাফসীরের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করতেন: (১) প্রথমে পবিত্র কুরআন, (২) অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ, (৩) নিজেরা আরবী ভাষা ও শানে নুযূলের সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতার আলোকে ইজতিহাদ ও ফাহম প্রয়োগ করতেন।
  2. শানে নুযূলের প্রত্যক্ষ জ্ঞান:

    সাহাবায়ে কেরাম অহী নাযিল হওয়ার স্থান, কাল, প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন: “আল্লাহর শপথ! কুরআনের প্রতিটি আয়াত কোথায় নাযিল হয়েছে এবং কার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, তা আমি জানি।”
  3. আরবী ভাষার শুদ্ধতা ও জাহেলী কবিতার প্রামাণ্যতা:

    কুরআনের কোনো বিরল শব্দ (গারীবুল কুরআন) বোঝার জন্য সাহাবাগণ বিশুদ্ধ আরবী ভাষার নিয়ম ও প্রাক-ইসলামী আরবী কবিতার উদ্ধৃতি গ্রহণ করতেন। বিশেষ করে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিলেন।
  4. ইসরাঈলিয়্যাতের অনুপ্রবেশের সূচনা ও সতর্কতা:

    পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের কিছু বিবরণ জানার জন্য আহলে কিতাব থেকে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম ও কাব আল-আহবার (রা.)-এর নিকট থেকে ঐতিহাসিক তথ্য শোনা হতো। তবে তা ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং আকীদার কোনো ক্ষেত্রে তা কখনো গ্রহণ করা হতো না।
  5. মতপার্থক্যের স্বল্পতা:

    সাহাবাদের যুগে তাফসীরে কোনো মৌলিক বা আকীদাগত বিরোধ ছিল না। যা ছিল তা মূলত পরিভাষাগত বা শব্দগত ভিন্নতা (اختلاف تنوع، لا اختلاف تضاد)।

٣- اكتب عدد مدارس التفسير فى عهد التابعين وذويها وخصائصها-

[তাবেঈ যুগের মাদরাসাতুত তাফসির এর সংখ্যা, এর কর্ণধার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশিষ্ট্য লেখ।]

তাবেঈ যুগের তাফসীর প্রতিষ্ঠানসমূহ (মাদরাসাতুত তাফসীর)

ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে সাহাবায়ে কেরাম যখন বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে হিজরত ও বসতি স্থাপন করেন, তখন প্রধান প্রধান ইসলামী কেন্দ্রে বিশিষ্ট সাহাবীগণকে কেন্দ্র করে স্বতন্ত্র তাফসীর ধারা বা ‘মাদরাসাতুত তাফসীর’ গড়ে ওঠে। তাবেঈ যুগে এই ধারা পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। তাবেঈ যুগে প্রধানত তিনটি প্রধান মাদরাসাতুত তাফসীর বিদ্যমান ছিল:

মাদরাসার নাম ও কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাতা সাহাবী ও প্রধান তাবেঈ মনীষীবৃন্দ পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ (الخصائص) ইসলামী ইতিহাসে মূল্যায়ন
১. মক্কার তাফসীর মাদরাসা (مدرسة مكة) মূল কর্ণধার: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)।

শীর্ষ তাবেঈ শিক্ষার্থীবৃন্দ: সাঈদ ইবনে জুবায়ের, মুজাহিদ ইবনে জাবর, ইকরামা মাওলা ইবনে আব্বাস, আতা ইবনে আবী রাবাহ ও তাউস ইবনে কায়সান (রহ.)।
  • আরবী ভাষাতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও বালাগাতকে তাফসীরের মূল ভিত্তি বানানো।
  • মুজাহিদ (রহ.) ইবনে আব্বাসের নিকট ত্রিশবার কুরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পেশ করে প্রতিটি আয়াতের শানে নুযূল জেনেছেন।
  • সাহাবাদের আছার ও বিশুদ্ধ ভাষাশৈলীর গভীর সমন্বয়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার মতে: তাফসীরের ক্ষেত্রে মক্কাবাসীদের বর্ণনা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য (أعلم الناس بالتفسير أهل مكة)।
২. মদীনার তাফসীর মাদরাসা (مدرسة المدينة) মূল কর্ণধার: হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)।

শীর্ষ তাবেঈ শিক্ষার্থীবৃন্দ: যায়েদ ইবনে আসলাম, আবুল আলিয়া আর-রিয়াহী এবং মুহাম্মদ ইবনে কাব আল-কুরাযী (রহ.)।
  • রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ ও মদীনার ফিকহী ঐতিহ্যের ওপর সর্বাধিক নির্ভরতা।
  • ইসরাঈলী বর্ণনা ও অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পবিত্রতা রক্ষা।
  • ইবাদত, হালাল-হারাম ও তাকওয়ার আয়াতের ওপর গভীর আত্মিক অনুশীলন।
বিশুদ্ধ আছারী ধারা এবং রসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহর সাথে সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিগণিত।
৩. ইরাক ও কুফার তাফসীর মাদরাসা (مدرسة العراق / الكوفة) মূল কর্ণধার: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।

শীর্ষ তাবেঈ শিক্ষার্থীবৃন্দ: আলক্বামাহ, আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ, মাসরূক, মুররাহ আল-হামদানী, আমের আশ-শা’বী, ইবরাহীম আন-নাখঈ ও হাসান বসরী (রহ.)।
  • যুক্তি, রায় ও ইজতিহাদের ব্যাপক প্রয়োগ (মাদরাসাতুর রায়)।
  • আয়াতের অন্তর্নিহিত ইল্লত (কারণ) ও ফিকহী ইস্তিম্বাতের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ।
  • নবাগত অনারব মুসলিমদের জটিল সমস্যার সমাধানে কুরআনের ব্যাপক প্রায়োগিক ব্যাখ্যা।
পরবর্তীকালে হানাফী মাযহাবের ফিকহী তাফসীর এবং যুক্তিভিত্তিক ইলমে কালামের মূল ভিত্তি এখান থেকেই রচিত হয়।

তাবেঈ যুগের তাফসীর ধারার সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. গ্রন্থাবদ্ধকরণের প্রাথমিক সূচনা: একক পূর্ণাঙ্গ কিতাব না হলেও তাবেঈগণ বিচ্ছিন্নভাবে খাতায় নোট ও সহীফা লিপিবদ্ধ শুরু করেন (যেমন: মুজাহিদের তাফসীর)।
  2. ইসরাঈলিয়্যাতের বিস্তার: এ যুগে কিছু অনারব ও বনী ইসরাঈলী লোক ইসলাম গ্রহণের কারণে ঐতিহাসিক বিবরণে অপ্রমাণিত কিচ্ছা-কাহিনীর কিছু অনুপ্রবেশ ঘটে।
  3. মাযহাবী ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের অঙ্কুরোদগম: খারেজী ও শিয়াদের উত্থানের ফলে কোনো কোনো দল নিজস্ব মতের সপক্ষে আয়াতের অপব্যাখ্যা শুরু করলে তাবেঈ ইমামগণ কড়া নজরদারি ও সনদের যাচাই শুরু করেন।

٤- تحدث عن شروط المفسر وآدابه مفصلًا-

[মুফাসসির এর শর্ত ও নিয়মাবলি সবিস্তারে আলোচনা কর।]

ভূমিকা

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বাণী ‘আল-কুরআন’ হলো সমস্ত মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ দিকদর্শন। তাই এর তাফসীর ও ব্যাখ্যা কোনো সাধারণ মানুষের অনুমানের বিষয় নয়। ইমাম সুয়ূতী (রহ.) তাঁর ‘আল-ইতকান’ গ্রন্থে এবং আল্লামা যারকাশী ‘আল-বুরহান’ গ্রন্থে একজন যোগ্য মুফাসসির হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার শর্ত (শুরুত) এবং চারিত্রিক শিষ্টাচার (আদাব) নির্ধারণ করেছেন। নিম্নে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. মুফাসসিরের আবশ্যকীয় শর্তাবলী (شروط المفسر)

পবিত্র কুরআনের তাফসীরে হাত দেওয়ার পূর্বে একজন গবেষককে নিম্নোক্ত মৌলিক জ্ঞানসমূহে পূর্ণ পারদর্শী হতে হবে:

  1. বিশুদ্ধ আকীদা ও ঈমান (صحة العقيدة): মুফাসসিরকে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বিশুদ্ধ আকীদা পোষণকারী হতে হবে। বিদআতী, মু’তাযিলী বা ভ্রান্ত ফিরকার অনুসারী হলে সে নিজের মতের সপক্ষে কুরআনের অপব্যাখ্যা করবে।
  2. প্রবৃত্তি ও পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত হওয়া (التجرد عن الهوى): কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, গোত্র বা অন্ধ মাযহাবী পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল সত্য প্রকাশে নিবেদিত হতে হবে।
  3. আরবী ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যুৎপত্তি:
    • ইলমুল লুগাত (علم اللغة): আরবী মূল শব্দার্থ ও শব্দের আভিধানিক ব্যবহার সম্পর্কে গভীর জ্ঞান।
    • ইলমুন নাহু ও ছরফ (النحو والتصريف): আরবী বাক্যতত্ত্ব ও শব্দরূপান্তর। সামান্য যের-যবরের পরিবর্তনে অর্থের বিপর্যয় ঘটে, যা নাহু ছাড়া বোঝা অসম্ভব।
    • ইলমুল ইশতিক্বাক্ব (علم الاشتقاق): শব্দমূল থেকে নতুন শব্দের উৎপত্তি সংক্রান্ত জ্ঞান।
    • ইলমুল বালাগাত (তিনটি শাখা: মা’আনী, বায়ান ও বাদী): কুরআনের ই’জায ও অলঙ্কারশাস্ত্র বোঝার জন্য বালাগাতের জ্ঞান ছাড়া কোনো ব্যক্তি কুরআনের মর্মে পৌঁছাতে পারে না।
  4. উলূমুল কুরআনের মৌলিক শাখাসমূহ:
    • ইলমুল কিরাআত (علم القراءات): বিভিন্ন মুতাওয়াতির কিরাআত ও তার অর্থের তারতম্য জানা।
    • ইলমু আসবাবিন নুযূল (أسباب النزول): আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সঠিক প্রেক্ষাপট জানা; অন্যথায় চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
    • ইলমুন নাসিখ ওয়াল মানসূখ (الناسخ والمنسوخ): কোন বিধানটি বহাল আছে আর কোনটি রহিত হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে জানা।
  5. ইলমুল হাদীস ও রিয়ালাতের জ্ঞান: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহীহ সুন্নাহ এবং হাদীসের সনদ, রাবীদের অবস্থা (জারহ ও তা’দীল) সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা।
  6. ইলমু উসূলিল ফিকহ (أصول الفقه): আম, খাস, মুজমাল, মুবাশশার, আমর, নাহী এবং শারয়ী হুকুম উদ্ভাবনের নিয়মাবলি জানা।
  7. ইলমুল মাওহিবাহ (علم الموهبة): এটি এমন এক বিশেষ ইলম বা দূরদর্শিতা যা মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নেককার ও মুত্তাকী বান্দাদের অন্তরে দান করেন। যেমন হাদীসে এসেছে: «مَنْ عَمِلَ بِمَا عَلِمَ، وَرَّثَهُ اللَّهُ عِلْمَ مَا لَمْ يَعْلَمْ» (যে ব্যক্তি স্বীয় ইলম অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাকে অজানা বিষয়ের ইলম দান করেন)।

২. একজন মুফাসসিরের শিষ্টাচার ও নিয়মাবলি (آداب المفسر)

  1. একনিষ্ঠ নিয়ত (إخلاص النية): পার্থিব খ্যাতি, অর্থলাভ বা মানুষের বাহবা পাওয়ার উদ্দেশ্য না রেখে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে তাফসীর করা।
  2. উচ্চ নৈতিক চরিত্র ও তাকওয়া (حسن الخلق والتقوى): মুফাসসিরের ব্যক্তিগত জীবনকে কুরআনের বাস্তব নমুনা হতে হবে, যাতে তাঁর কথা মানুষের হৃদয়ে প্রভাব ফেলে।
  3. বিনম্রতা ও সত্যের সামনে সমর্পণ (التواضع والرجوع إلى الحق): নিজের ভুল ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক তা সংশোধন করার সততা থাকতে হবে। অহংকার বর্জন করতে হবে।
  4. ধীরস্থিরতা ও সতর্ক যাচাই (التثبت والتأني): কোনো বর্ণনা পাওয়ার সাথে সাথে যাচাই না করে তাফসীরে ঢুকিয়ে না দেওয়া; বিশেষ করে ইসরাঈলিয়্যাত ও জাল হাদীস থেকে সতর্ক থাকা।
  5. সাহাবা ও সালাফদের ব্যাখ্যার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ: সালাফে সালেহীনের সর্বসম্মত তাফসীরের বাইরে গিয়ে নিজের মনগড়া অদ্ভুত ব্যাখ্যা না দেওয়া।

٥- عرف التفسير بالرأى ثم بين نشأته وآراء العلماء فى قبوله-

[التفسير بالرأي এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এর উৎপত্তি ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে ওলামাদের মতামত বর্ণনা কর।]

১. ‘আত-তাফসীর বির-রায়’ (التفسير بالرأي)-এর পরিচয় ও সংজ্ঞা

  • আভিধানিক অর্থ: ‘রায়’ (الرأي) শব্দের অর্থ বুদ্ধি, বিবেক, যুক্তি, অভিমত বা চিন্তা-ভাবনা। বহুবচন হলো ‘আরা’ (آراء)।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা:

    «هُوَ تَفْسِيرُ الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ بِالاجْتِهَادِ الْمُسْتَنِدِ إِلَى أُصُولِ اللُّغَةِ وَقَوَاعِدِ الشَّرِيعَةِ، دُونَ الِاقْتِصَارِ عَلَى مُجَرَّدِ النَّقْلِ وَالْمَأْثُورِ»

    “কেবলমাত্র রেওয়ায়াত ও বর্ণনার ওপর সীমাবদ্ধ না থেকে আরবী ভাষার ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র এবং শরীয়তের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বুদ্ধিবৃত্তিক ইজতিহাদ ও গবেষণার মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের তাফসীর করাকে ‘তাফসীর বির-রায়’ বলা হয়।”

২. তাফসীর বির-রায়ের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ (نشأته)

  1. বীজ বপনের যুগ (সাহাবা ও তাবেঈ যুগ): সাহাবায়ে কেরাম কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে ভাষার জ্ঞান ও ইজতিহাদ প্রয়োগ করতেন। বিশেষ করে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বহু ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রজ্ঞা ও রায় ব্যবহার করেছেন।
  2. দ্বিতীয় হিজরী শতকে বিস্তার: উমাইয়া যুগের শেষ ও আব্বাসীয় যুগের শুরুতে যখন মুসলিম সাম্রাজ্য পারস্য ও রোমান অঞ্চলে বিস্তৃত হলো এবং নতুন নতুন দার্শনিক বিতর্ক ও ফিকহী সমস্যার উদ্ভব হলো, তখন শুধু হাদীস দিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর মিলছিল না। তখন মুফাসসিরগণ কুরআনের প্রায়োগিক ব্যাখ্যার জন্য ইজতিহাদ ও আকলের আশ্রয় নেন। ইরাক ও কুফাকেন্দ্রীক হানাফী আলেমগণ এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
  3. গ্রন্থাবদ্ধ যুগ: মু’তাযিলাদের কাশশাফ, আহলুস সুন্নাহর ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর ‘মাফাতিহুল গায়েব’, কাযী বায়যাবীর ‘আনওয়ারুত তানযীল’ প্রভৃতি গ্রন্থের মাধ্যমে তাফসীর বির-রায় প্রাতিষ্ঠানিক পরাকাষ্ঠা লাভ করে।

৩. তাফসীর বির-রায়ের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের মতামত

উলামায়ে কেরামের গবেষণায় সুস্পষ্ট হয়েছে যে, ‘রায়’ বা যুক্তি দুই প্রকার: প্রশংসনীয় যুক্তি (الرأي المحمود) এবং নিন্দনীয় যুক্তি (الرأي المذموم)। এর ভিত্তিতে ওলামাদের মতামত নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

শ্রেণিবিভাগ সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য শারয়ী বিধান ও ওলামাদের দৃষ্টিভঙ্গি
১. প্রশংসনীয় তাফসীর বির-রায় (التفسير بالرأي المحمود / المشروع) যে তাফসীর শরীয়তের দলীল, সহীহ হাদীস ও আরবী ভাষার সর্বজনীন ব্যাকরণের সাথে সংগতিপূর্ণ। কুরআন নিয়ে গভীর গবেষণা (তাদাব্বুর) এবং উসূলে ফিকহের আলোকে সম্পন্ন। সর্বসম্মতভাবে জায়েয ও প্রশংসনীয়: জমহুর উলামায়ে কেরাম একে মুস্তাহাব ও দ্বীনের অপরিহার্য প্রয়োজন বলেছেন। দলীল: ﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ﴾। নবীজী (ﷺ) ইবনে আব্বাসের জন্য দোয়া করেছিলেন: «اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ»
২. নিন্দনীয় তাফসীর বির-রায় (التفسير بالرأي المذموم / الباطل) যে তাফসীর অজ্ঞতা, মনগড়া অনুমান, কুপ্রবৃত্তি (হাওয়া), বিভ্রান্তিকর বিদআত অথবা শরীয়ত ও আরবী ভাষার নিয়মের বিপরীত কোনো মতামত প্রতিষ্ঠার জন্য করা হয়। সর্বসম্মতভাবে হারাম ও কবীরা গুনাহ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন:

«مَنْ قَالَ فِي الْقُرْآنِ بِرَأْيِهِ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ»

“যে ব্যক্তি কুরআনের ব্যাপারে নিজের মনগড়া কথা বলল, সে যেন জাহান্নামে নিজের বাসস্থান বানিয়ে নিল।” (তিরমিযী)।

٦- اكتب ترجمة عبد الله بن مسعود (رض) ثم بين مساهمته فى علم التفسير-

[আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) এর জীবনী লেখ এবং ইলমুত তাফসিরে তাঁর অবদান বর্ণনা কর।]

১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও বংশপরিচয়: নাম আব্দুল্লাহ, উপনাম আবু আব্দুর রহমান (أبو عبد الرحمن)। পিতার নাম মাসউদ এবং মাতার নাম উম্মে আবদ। মাতার সূত্রে তাঁকে ‘ইবনে উম্মে আবদ’ বলা হতো। তিনি বনু হুযাইল গোত্রের সন্তান ছিলেন।
  • ইসলাম গ্রহণ: তিনি ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের ষষ্ঠতম মুসলমান (السادس في الإسلام)। তিনি মক্কার দারুল আরকামে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে বয়আত গ্রহণ করেন।
  • সাহসিকতা ও প্রথম প্রকাশ্য কুরআন তিলাওয়াত: তিনিই প্রথম সাহাবী যিনি কাফের কুরাইশদের শত নির্যাতনের মুখে কাবা চত্বরে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে সূরা আর-রহমান তিলাওয়াত করে মক্কার বুকে কুরআন প্রচারের ইতিহাস রচনা করেছিলেন।
  • রাসূল (ﷺ)-এর সান্নিধ্য ও খিদমত: তিনি ছায়ার মতো রাসূল (ﷺ)-এর সাথে থাকতেন। তিনি নবীজীর মেসওয়াক, জুতো ও ওযুর পানির খেদমত করতেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গভীর ইলম ও আখলাক তিনি সরাসরি অর্জন করেছিলেন।
  • খেলাফতকালে ভূমিকা ও ওফাত: খলীফা উমর (রা.) তাঁকে কুফার প্রধান বিচারক ও শিক্ষাগুরু হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি ৩২ হিজরীতে হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে মদীনায় ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাক্বীতে সমাহিত হন।

২. ইলমুত তাফসীরে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ঐতিহাসিক অবদান

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ইলমুত তাফসীরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর পরেই যাঁর নাম সর্বাধিক ভাস্বর, তিনি হলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)। তাফসীর শাস্ত্রে তাঁর অবদান অতুলনীয়:

  1. কুরআন সম্পর্কে তাঁর গভীর ও প্রত্যক্ষ জ্ঞান:

    তিনি স্বয়ং বলতেন:

    «وَاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ غَيْرُهُ، مَا نَزَلَتْ آيَةٌ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ إِلَّا وَأَنَا أَعْلَمُ فِيمَ نَزَلَتْ، وَأَيْنَ نَزَلَتْ، وَلَوْ أَعْلَمُ أَحَدًا أَعْلَمَ مِنِّي بِكِتَابِ اللَّهِ تَبْلُغُهُ الْإِبِلُ لَرَكِبْتُ إِلَيْهِ»

    “সেই আল্লাহর শপথ যাঁর ছাড়া কোনো ইলাহ নেই! আল্লাহর কিতাবের এমন কোনো আয়াত নাযিল হয়নি যার সম্পর্কে আমি জানি না যে তা কার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে এবং কোথায় নাযিল হয়েছে। আর উটের পিঠে চড়ে পৌঁছানো যায় এমন কোনো ব্যক্তি যদি কুরআন সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী হতো, তবে আমি অবশ্যই তার কাছে যেতাম।” (সহীহ বুখারী)।
  2. রাসূল (ﷺ) কর্তৃক তাঁর কিরাআত ও তাফসীরের প্রশংসা:

    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: «مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَقْرَأَ الْقُرْآنَ غَضًّا كَمَا أُنْزِلَ، فَلْيَقْرَأْهُ عَلَى قِرَاءَةِ ابْنِ أُمِّ عَبْدٍ» (“যে ব্যক্তি কুরআনকে অবতীর্ণ হওয়ার সময়ের মতো তাজা ও বিশুদ্ধভাবে পড়তে ভালোবাসে, সে যেন ইবনে উম্মে আবদ বা ইবনে মাসউদের কিরাআত অনুযায়ী পড়ে”)।
  3. কুফা ও ইরাকের তাফসীর মাদরাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন:

    উমর (রা.) যখন তাঁকে কুফায় পাঠালেন, তখন কুফাবাসীকে উদ্দেশ্য করে চিঠিতে লিখেছিলেন: “আমি নিজের প্রয়োজনে ইবনে মাসউদকে আটকে না রেখে তোমাদের শিক্ষার জন্য তাঁকে পাঠিয়ে নিজের ওপর তোমাদের অগ্রাধিকার দিলাম।” সেখানে তিনি সুবিশাল ‘মাদরাসাতুত তাফসীর’ প্রতিষ্ঠা করেন। আলক্বামাহ, আসওয়াদ ও মাসরূকের মতো শত শত তাবেঈ মুফাসসির তাঁর হাতে তৈরি হন।
  4. ফিকহী ও প্রায়োগিক তাফসীরের সূচনা:

    তিনি কেবল শব্দের আক্ষরিক অর্থ করতেন না; বরং সমাজ ও জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কুরআনের গভীর প্রায়োগিক দিক উন্মোচন করতেন। পরবর্তীকালে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) যে ফিকহুল কুরআন সংকলন করেছিলেন, তার প্রধান সূত্র ছিল ইবনে মাসউদ (রা.)-এর তাফসীর।

٧- اكتب نبذة عن حياة محمد بن جرير الطبرى- ثم تحدث عن خصائص تفسيره-

[মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারীর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ। অতঃপর তাঁর তাফসিরের বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।]

১. ইমাম মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও পরিচয়: পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর ইবনে ইয়াযীদ আত-তাবারী (أبو جعفر محمد بن جرير بن يزيد الطبري)। তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মুফাসসির ও ‘ইমামুল মুফাসসিরীন’ (মুফাসসিরদের শীর্ষ ইমাম)।
  • জন্ম ও শিক্ষাজীবন: তিনি ২২৪ হিজরীতে ইরানের কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী তাবারিস্তান প্রদেশের আমুল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালেই পবিত্র কুরআন হিফয করেন এবং হাদীস অন্বেষণে বাগদাদ, বসরা, কুফা, মিশর ও শাম ভ্রমণ করেন। তিনি একাধারে মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকীহ (মুজতাহিদ মুতলক্ব) এবং ইতিহাসবিদ ছিলেন।
  • স্বাধীন মাযহাব প্রতিষ্ঠা: তিনি প্রথম জীবনে শাফেঈ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, পরবর্তীতে তিনি পূর্ণ মুজতাহিদ হয়ে নিজস্ব ‘মাযহাবে জারীরী’ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • ওফাত: ৩১০ হিজরীতে বাগদাদে এই মহান ইমাম ৮৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
  • অমর গ্রন্থাবলী:
    1. ‘জামেউল বায়ান আন তা’বীলি আয়িল কুরআন’ (جامع البيان عن تأويل آي القرآن): তাফসীর শাস্ত্রের প্রধান বিশ্বকোষ।
    2. ‘তারীখুল উমাম ওয়াল মুলূক’ (تاريخ الأمم والملوك): যা ‘তারীখে তাবারী’ নামে খ্যাত।
    3. তাহযীবুল আছার (تهذيب الآثار)।

২. তাফসীরে তাবারীর (‘জামেউল বায়ান’) অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص تفسيره)

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন: “মানুষের হাতে বিদ্যমান তাফসীরগ্রন্থসমূহের মধ্যে তাবারীর তাফসীরই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক বিশুদ্ধ।” এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

  1. তাফসীর বিল-মা’ছুরের ভিত্তিপ্রস্তর: এটি রেওয়ায়াত ও আছারের ভিত্তিতে রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। প্রতিটি আয়াতের তাফসীরে তিনি রাসূল (ﷺ), সাহাবা ও তাবেঈদের বর্ণনা পূর্ণ সনদসহ উল্লেখ করেছেন।
  2. আদালত ও রাবীদের যাচাই (تحقيق الأسانيد): তিনি শুধু রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেননি; বরং সনদের মান ও রাবীদের অবস্থা চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন।
  3. অভিমতসমূহের তুলনামূলক বিচার ও তারজীহ (الترجيح بين الأقوال): কোনো আয়াতে একাধিক তাফসীর থাকলে তিনি সবগুলো উল্লেখ করে বলেন: «وَأَوْلَى الْأَقْوَالِ فِي ذَلِكَ بِالصَّوَابِ عِنْدَنَا قَوْلُ فُلَانٍ…» (আমাদের নিকট সর্বাধিক সঠিক অভিমত হলো অমুকের উক্তি…) এবং তার সপক্ষে আরবী ভাষা ও যুক্তির অকাট্য দলীল পেশ করেন।
  4. আরবী ভাষা ও প্রাচীন কবিতার প্রামাণ্য ব্যবহার: তিনি আরবী ব্যাকরণ (নাহু ও ছরফ) এবং আরবের প্রাচীন জাহেলী কবিতার (শাওয়াহিদ) সাহায্যে শব্দের সঠিক তাৎপর্য প্রমাণ করেন।
  5. মুতাওয়াতির কিরাআতের প্রামাণ্য বিশ্লেষণ: তিনি বিশুদ্ধ কিরাআতসমূহ উল্লেখ করে অর্থের বৈচিত্র্য সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেন।
  6. ইসরাঈলিয়্যাত পর্যালোচনা: যদিও কিছু প্রাচীন ঐতিহাসিক কাহিনী এতে এসেছে, তবে তিনি সনদ উল্লেখ করে তার দায় মুক্ত করেছেন এবং স্বজ্ঞানে স্পষ্ট সমালোচনা করেছেন।

٨- قارن بين تفسير الكشاف وتفسير البيضاوى-

[তাফসিরে কাশশাফ ও তাফসিরে বায়যাবীর মাঝে তুলনামূলক আলোচনা কর।]

তাফসীরে কাশশাফ ও তাফসীরে বায়যাবীর তুলনামূলক রূপরেখা

আরবী সাহিত্যের আলঙ্কারিক তাফসীর (التفسير البلاغي الأدبي) জগতে আল্লামা যামাখশারীর ‘আল-কাশশাফ’ (الكشاف) এবং কাযী নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবীর ‘আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল’ (أنوار التنزيل وأسرار التأويل) দুটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। একটি বালাগাত শাস্ত্রের মূল উৎস, অন্যটি তার বিশুদ্ধিকৃত ও সংহত রূপ। নিম্নে এ দুটির বিশদ তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো:

তুলনার মাপকাঠি তাফসীরে কাশশাফ (আল্লামা যামাখশারী – ওফাত: ৫৩৮ হি.) তাফসীরে বায়যাবী (কাযী বায়যাবী – ওফাত: ৬৮৫ হি.)
১. গ্রন্থকারের মাযহাব ও আকীদা তিনি কট্টর মু’তাযিলী আকীদা এবং হানাফী ফিকহের অনুসারী ছিলেন। গ্রন্থের ভূমিকাতেই গর্বভরে নিজেকে মু’তাযিলী ঘোষণা করেছেন। তিনি বিশুদ্ধ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত (আশ‘আরী আকীদা) এবং শাফেঈ ফিকহের অনুসারী ছিলেন।
২. রচনার সম্পর্ক ও ভিত্তি এটি একটি মৌলিক রচনা, যা বালাগাত ও ভাষাশৈলীর গভীর গবেষণার ওপর স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে রচিত। এটি কাশশাফের ওপর নির্ভরশীল সংক্ষেপণ। কাযী বায়যাবী কাশশাফের বালাগাত ও ভাষাশৈলী অক্ষুণ্ণ রেখে এর মু’তাযিলী মতবাদগুলোকে ছেঁটে সুন্নী রূপ দিয়েছেন।
৩. বালাগাত ও ই’জাযুল কুরআন ইলমুল মা’আনী ও বায়ান প্রয়োগে ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থানকারী। রূপক, উপমা ও শব্দালঙ্কারের এমন নিপুণ বিশ্লেষণ করেছেন যা আর কেউ করতে পারেনি। কাশশাফের বালাগাতকে সংক্ষিপ্তাকারে হুবহু ধারণ করেছেন এবং জটিল বাক্যগুলোকে আরও পরিশীলিত ও সংহত রূপ দিয়েছেন।
৪. আকিদাগত দ্বন্দ্ব ও অবস্থান কুরআনের আয়াতসমূহকে জোরপূর্বক মু’তাযিলাদের পাঁচটি মূলনীতি (তাওহীদ তথা সিফাত অস্বীকার, আদল তথা তাকদীর অস্বীকার, রূইয়াতুল্লাহ অস্বীকার)-এর সপক্ষে তা’বীল করেছেন। যামাখশারীর মু’তাযিলী তা’বীলগুলোকে তীব্রভাবে খণ্ডন করে আল্লাহর দিদার, সিফাতে ইলাহিয়্যা ও তাকদীরের সুন্নী আকীদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।
৫. সংক্ষেপণ ও বিন্যাসশৈলী ব্যাখ্যা বিস্তারিত, দীর্ঘ এবং প্রশ্নোত্তরমূলক (فإن قلتَ… قلتُ…)। ভাষা প্রবহমান ও সাহিত্যের রসে সমৃদ্ধ। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, ঘনকালো ও গভীর (موجز ومكثف)। অল্প শব্দে সমুদ্রসম ভাব ব্যক্ত করায় এটি মাদরাসার পাঠ্যবই হিসেবে অধিক সমাদৃত হয়েছে।
৬. ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি আহকামের আয়াতে হানাফী মাযহাবের প্রাধান্য ও পর্যালোচনা করেছেন। শাফেঈ মাযহাবের ফিকহী ইস্তিম্বাত তুলে ধরেছেন, তবে অন্যান্য মাযহাবের প্রতি সম্মান বজায় রেখেছেন।

সারসংক্ষেপ: আল্লামা বালক্বীনী বলেন: “কাযী বায়যাবী কাশশাফের শরীর থেকে মু’তাযিলী বিষাক্ত কাঁটাগুলো বেছে ফেলে দিয়ে কেবল তার সুগন্ধি পুষ্পসমূহ গ্রহণ করেছেন।” ফলে বায়যাবী হয়ে উঠেছে ইসলামী শিক্ষাঙ্গনে সুন্নী শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বাধিক সমাদৃত পাঠ্যগ্রন্থ।

٩- اكتب نبذة من حياة محمود الآلوسى (رح) ثم بين خصائص تفسيره-

[মাহমুদ আল-আলুসী (রহ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ এবং তাঁর তাফসিরের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]

১. আল্লামা শিহাবুদ্দীন আল-আলূসী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও পরিচয়: পুরো নাম শিহাবুদ্দীন আবুল ছানা সাইয়্যিদ মাহমুদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-হুসাইনী আল-আলূসী আল-বাগদাদী (شهاب الدين أبو الثناء محمود بن عبد الله الآلوسي)। তিনি ছিলেন ত্রয়োদশ হিজরী শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ ও মুফাসসির।
  • জন্ম ও পরিবার: তিনি ১২১৭ হিজরীতে (১৮০২ খ্রি.) ইরাকের বাগদাদ শহরে এক সম্ভ্রান্ত সাইয়্যিদ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ফোরাত নদীর ‘আলূস’ দ্বীপের অধিবাসী হওয়ায় তাঁদের ‘আলূসী’ বলা হয়।
  • শিক্ষা ও মেধা: তিনি অতি অল্প বয়সেই কুরআন হিফয করেন এবং বাগদাদের শ্রেষ্ঠ উলামাদের নিকট তাফসীর, হাদীস, উসূল, নাহু, বালাগাত ও ফালসাফায় অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি অধ্যাপনা শুরু করেন।
  • দায়িত্ব পালন: তিনি বাগদাদের প্রধান মুফতী (مفتي بغداد) হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ফতোয়ার দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা গোটা উসমানীয় সাম্রাজ্যে সমাদৃত ছিল।
  • ওফাত: এই মহান জ্ঞানসাধক ১২৭০ হিজরীতে (১৮৫৪ খ্রি.) বাগদাদেই ইন্তেকাল করেন।
  • শ্রেষ্ঠ কীর্তি: তাঁর কালজয়ী তাফসীরগ্রন্থ ‘রূহুল মা’আনী ফী তাফসীরিল কুরআনিল আযীম ওয়াস সাবয়িল মাছানী’ (روح المعاني في تفسير القرآن العظيم والسبع المثاني)—যা ৩০ খণ্ডে সমাপ্ত।

২. তাফসীরে রূহুল মা’আনীর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص تفسيره)

আল্লামা আলূসীর ‘রূহুল মা’আনী’ তাফসীর সাহিত্যের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ সমন্বিত বিশ্বকোষ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

  1. পূর্ববর্তী সমস্ত তাফসীর ধারার মহাসমন্বয়:

    আলূসী তাঁর তাফসীরে ইমাম তাবারীর আছারী বর্ণনা, রাযীর কালামতাত্ত্বিক দর্শন, যামাখশারী ও বায়যাবীর বালাগাত এবং কুরতুবীর ফিকহী আহকামকে একত্রিত করে এক বিশাল জ্ঞানসমুদ্র তৈরি করেছেন।
  2. আহলুস সুন্নাহর আকীদার আপসহীন প্রতিরক্ষা:

    তিনি মু’তাযিলা, শিয়া এবং দার্শনিকদের বাতিল বিভ্রান্তিগুলো অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে খণ্ডন করেছেন এবং সালাফী ও আশ‘আরী-মাতুরীদী ধারার চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
  3. উচ্চাঙ্গের আরবী ব্যাকরণ ও বালাগাত:

    আয়াতের জটিল নাহ্মী সমস্যা, শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অলঙ্কারশাস্ত্রের এমন নিখুঁত ও সূক্ষ্ম চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন যা উন্নত স্তরের গবেষকদের মুগ্ধ করে।
  4. ইসরাঈলিয়্যাত ও দুর্বল বর্ণনার তীব্র প্রতিরোধ:

    তিনি পূর্ববর্তী অনেক তাফসীরে ঢুকে পড়া অলীক ইসরাঈলী কাহিনী ও দুর্বল হাদীসগুলোকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে বাতিল করেছেন।
  5. ভারসাম্যপূর্ণ আত্মিক ও ইশারী তাফসীর (التفسير الإشاري المعتدل):

    বাহ্যিক তাফসীর শেষ করার পর তিনি ‘ومن باب الإشارة’ শিরোনামে আয়াতের আত্মিক ও তাসাউফভিত্তিক ইশারা বর্ণনা করতেন। তবে তিনি স্পষ্ট শর্ত আরোপ করেছেন যে, কোনো ইশারী তাফসীর যদি শরীয়তের জাহেরী বিধানের পরিপন্থী হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
  6. মুতাওয়াতির ও বিরল কিরাআতের সমাবেশ:

    তিনি প্রতিটি আয়াতের বিভিন্ন কিরাআত উল্লেখ করে অর্থের যে বিশাল বৈচিত্র্য তৈরি হয় তা পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. তাফসীর ও তা’বিলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

তাফসীর হলো কোনো আয়াতের প্রকাশ্য শাব্দিক অর্থ ও ব্যাখ্যা যা মূলত বর্ণনা (নকল) ও সাহাবাদের আছারের ওপর নির্ভরশীল; অপরদিকে তা’বীল হলো দলীল ও ইজতিহাদের ভিত্তিতে আয়াতের অন্তর্নিহিত গূঢ় মর্মার্থ ও চূড়ান্ত পরিণতির দিকে পৌঁছানো যা বিবেকের গভীর অনুসন্ধান দ্বারা অর্জিত হয়।

২. তাবেঈ যুগে তাফসীরের প্রধান তিনটি কেন্দ্র (মাদরাসা) কী কী ছিল?

তাবেঈ যুগে তাফসীরের প্রধান তিনটি কেন্দ্র ছিল: (১) মক্কার মাদরাসা—যার প্রধান ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), (২) মদীনার মাদরাসা—যার প্রধান ছিলেন হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.), এবং (৩) ইরাক ও কুফার মাদরাসা—যার প্রধান ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।

৩. একজন মুফাসসিরের জন্য কোন কোন বিষয়ের জ্ঞান থাকা শর্ত?

একজন মুফাসসিরের জন্য বিশুদ্ধ আকীদা, আরবী ভাষা (লুগাত, নাহু, ছরফ, বালাগাত), উলূমুল কুরআন (শানে নুযূল, নাসিখ-মানসূখ, কিরাআত), ইলমে হাদীস, উসূলে ফিকহ এবং খোদাভীতি ও তাকওয়ার অধিকারী হওয়া অপরিহার্য শর্ত।

৪. তাফসীর বির-রায় (التفسير بالرأي) কি ইসলামী শরীয়তে জায়েয?

যদি তাফসীর বির-রায় শরীয়তের উসূল, সহীহ সুন্নাহ ও আরবী ভাষার বিশুদ্ধ ব্যাকরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা সর্বসম্মতভাবে জায়েয ও প্রশংসনীয় (রায় মাহমুদ); কিন্তু যদি তা অজ্ঞতা, কুপ্রবৃত্তি ও মনগড়া মতের ভিত্তিতে হয়, তবে তা কঠোরভাবে হারাম (রায় মাযমুম)।

৫. তাফসীরে তাবারীকে কেন সকল তাফসীরের উৎস বলা হয়?

কারণ ইমাম তাবারী সর্বপ্রথম রাসূল (ﷺ), সাহাবা ও তাবেঈদের সমস্ত বিশুদ্ধ রেওয়ায়াতকে পূর্ণ সনদসহ সংকলন করেছেন, আরবী ব্যাকরণ ও কবিতার দ্বারা তা যাচাই করেছেন এবং বিভিন্ন মতের তুলনামূলক তারজীহ প্রদান করে তাফসীর শাস্ত্রের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপন করেছেন।

৬. তাফসীরে কাশশাফ ও তাফসীরে বায়যাবীর মূল সম্পর্ক কী?

আল্লামা যামাখশারীর ‘আল-কাশশাফ’ হলো বালাগাত ও ভাষাশৈলীর দিক দিয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু এতে মু’তাযিলী আকীদার মিশ্রণ ছিল। কাযী বায়যাবী সেই মু’তাযিলী মতবাদগুলোকে বর্জন করে সুন্নী আকীদায় অত্যন্ত সংক্ষেপে কাশশাফের বালাগাতকে ধারণ করে ‘আনওয়ারুত তানযীল’ রচনা করেন।


উপসংহার ও পরীক্ষার্থীদের জন্য চূড়ান্ত নির্দেশনা

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল সম্মান ৪র্থ বর্ষের ‘আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরূন’ (৪০৩) প্রশ্নপত্রটি তাফসীর শাস্ত্রের ইতিহাস ও মূলনীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের পারিভাষিক আরবী উদ্ধৃতি, বিখ্যাত তাফসীরকারকদের ওফাত সন, তাফসীরগ্রন্থসমূহের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য এবং তুলনামূলক ছক উপস্থাপন করতে হবে। ২০২০ সালের এই প্রশ্নপত্রের ৯টি প্রশ্নের বিশদ সমাধান নিয়মিত অধ্যয়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্ন নং মূল আলোচ্য বিষয় শাস্ত্রীয় মূলনীতি / ব্যক্তিত্ব সারসংক্ষেপ
তাফসীর ও তা’বীলের পরিচয় এবং কুরআনে তা’বীল যারকাশী, সুয়ূতী, সূরা আল-আ’রাফ ও ইউসুফ সংজ্ঞা, পার্থক্য এবং পরিণতি, স্বপ্ন ও ব্যাখ্যা অর্থে প্রয়োগ।
নবীজী (ﷺ) ও সাহাবাদের যুগের তাফসীরের বৈশিষ্ট্য কুরআন দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা, সুন্নাহ ও শানে নুযূল প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভাষার বিশুদ্ধতা ও মতপার্থক্যের অনুপস্থিতি।
তাবেঈ যুগের মাদরাসাতুত তাফসীর মক্কা (ইবনে আব্বাস), মদীনা (উবাই), কুফা (ইবনে মাসউদ) তিনটি প্রধান কেন্দ্র, শীর্ষ তাবেঈ শিক্ষার্থীবৃন্দ ও রীতিনীতি।
মুফাসসিরের শর্ত ও শিষ্টাচার আকীদা, আরবী ব্যাকরণ, বালাগাত, উলূমুল কুরআন ও তাকওয়া যোগ্যতার আবশ্যকীয় ১৫টি শর্ত ও নৈতিক শিষ্টাচার।
তাফসীর বির-রায় ও আলেমদের মতামত রায় মাহমুদ বনাম রায় মাযমুম, বুখারী ও তিরমিযীর হাদীস উৎপত্তি, গ্রহণযোগ্যতার শর্ত ও হারাম হওয়ার সীমারেখা।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর জীবনী ও অবদান বনু হুযাইল, কুফার মাদরাসা, ফিকহুল কুরআন কুরআনের প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও তাফসীর শাস্ত্রে ঐতিহাসিক অবদান।
ইমাম তাবারীর জীবনী ও ‘জামেউল বায়ান’ তাবারিস্তান, সনদ যাচাই, তারজীহ ও ভাষাতত্ত্ব মুফাসসিরদের ইমাম এবং আছারী তাফসীরের স্বর্ণশিখর।
তাফসীরে কাশশাফ বনাম তাফসীরে বায়যাবী যামাখশারী (মু’তাযিলী) বনাম বায়যাবী (সুন্নী আশ’আরী) বালাগাতের তুলনা, আকীদাগত পার্থক্য ও সংক্ষেপণ।
আল্লামা শিহাবুদ্দীন আলূসী ও ‘রূহুল মা’আনী’ বাগদাদ, ৩০ খণ্ডের তাফসীর, সমন্বিত ধারা আছার, দর্শন, বালাগাত ও মিতাচারী ইশারী তাফসীরের মিলনমেলা।
টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন