জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তাফসীর আল-মুকারিন (At-Tafsirul Muqaran) – 201801, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২৩

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
১০৬ মিনিট পড়ার সময়
১৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২৩
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাফসীর আল-মুকারিন (التفسير المقارن)
বিষয় কোড: 201801 | প্রশ্নপত্র কোড: 111
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০২৩ সালের ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সর্বোচ্চ তাত্ত্বিক ও তুলনামূলক গবেষণাধর্মী কোর্স হলো “আত-তাফসীর আল-মুকারিন” (বিষয় কোড: 201801)। তুলনামূলক তাফসীরশাস্ত্র মূলত বিভিন্ন যুগ, চিন্তাধারা, মাযহাব ও ধারার শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরগণের দৃষ্টিভঙ্গি, দলিল-প্রমাণের শক্তি, ভাষা ও বালাগাতগত সূক্ষ্মতা এবং ইজতিহাদী পদ্ধতির তুলনামূলক পর্যালোচনার এক অনন্য শাস্ত্র। ২০২৩ সালের এই প্রশ্নপত্রটিতে সূরা আল-বুরুজ, সূরা আল-বালাদ, সূরা আল-কদর, সূরা আল-আসর ও সূরা আল-হুমাযাহ-এর আয়াতের গভীর তুলনামূলক তাফসীর বিশ্লেষণের পাশাপাশি সুন্নি ও মু’তাযিলী তাফসীরের বৈশিষ্ট্য, তুলনামূলক তাফসীরের মূলনীতি ও তারজীহের নিয়মাবলি, আল্লামা যামাখশারী এবং প্রাচীন ও আধুনিক তাফসীর সাহিত্যের ওপর গভীর প্রশ্ন সন্নিবেশিত হয়েছে। নিচে প্রশ্নপত্রের গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক) ও গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত)-এর অন্তর্ভুক্ত সকল ১৬টি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও অ্যাকাডেমিক সমাধান পরিবেশন করা হলো।

একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন

বিভাগ মোট প্রশ্ন উত্তর দিতে হবে প্রতি প্রশ্নের মান মোট নম্বর
مجموعة (أ) – গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক প্রশ্ন) ৮টি ৪টি ১৫ ৬০
مجموعة (ب) – গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন) ৮টি ৪টি ৫ ২০
সর্বমোট ১৬টি ৮টি — ৮০

مجموعة (أ) : গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)

[যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫ নম্বর।]

١- قوله تعالى: ﴿وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الْبُرُوجِ – وَالْيَوْمِ الْمَوْعُودِ – وَشَاهِدٍ وَمَشْهُودٍ – قُتِلَ أَصْحَابُ الْأُخْدُودِ – النَّارِ ذَاتِ الْوَقُودِ – إِذْ هُمْ عَلَيْهَا قُعُودٌ﴾ [البروج: ١-٦]

(أ) فسر الآيات المذكورة مقارنة بين تفسير الطبري وتفسير المراغي-
(ب) بين قصة أصحاب الأخدود-

(ক) ইমাম তাবারী ও শায়খ মারায়ীর তাফসীরের তুলনামূলক পর্যালোচনা

উক্ত আয়াতগুলো পবিত্র কুরআনের ৮৫তম সূরা আল-বুরূজের ১ থেকে ৬ নম্বর আয়াত। এখানে আল্লাহ তাআলা সুদৃঢ় গ্রহ-নক্ষত্রখচিত আসমান, কিয়ামত দিবস এবং সাক্ষ্যদানকারী ও যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া হবে—এসব মহা নিদর্শনের শপথ করে ঐতিহাসিক ‘আসহাবুল উখদূদ’-এর নির্মম অত্যাচার ও ঈমানদারদের আত্মত্যাগের বিবরণ পেশ করেছেন। নিম্নে ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.)-এর জামি’উল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন (তাফসীরে তাবারী) এবং আধুনিক যুগের প্রখ্যাত মুফাসসির শায়খ আহমাদ মুস্তফা আল-মারায়ীর তাফসীরুল মারায়ী-এর আলোকে আয়াতের তুলনামূলক তাফসীর পরিবেশন করা হলো:

পর্যালোচনার দিক জামি’উল বায়ান (ইমাম আত-তাবারী) তাফসীরুল মারায়ী (আহমাদ আল-মারায়ী)
১. তাফসীরের প্রকৃতি ও উৎস বিশুদ্ধ তাফসীর বিল মা’ছূর (التفسير بالمأثور)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম (হযরত ইবনে আব্বাস, আলী রা.) এবং তাবেয়ীগণের সনদযুক্ত রেওয়ায়াতকে মূল ভিত্তি বানিয়েছেন। আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক ও যুক্তিনির্ভর তাফসীর (التفسير الأدبي والاجتماعي)। তিনি ভাষাগত অলঙ্কার, মহাজাগতিক বিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
২. ‘যাতিল বুরূজ’ (ذَاتِ الْبُرُوجِ)-এর ব্যাখ্যা তাবারী বিভিন্ন রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করে প্রাধান্য দিয়েছেন যে, ‘বুরূজ’ দ্বারা আকাশে অবস্থিত বারোটি মহাজাগতিক রাশিচক্র (منازل الشمس والقمر والنجوم) বা আসমানের সুরক্ষিত প্রাসাদসমূহকে বোঝানো হয়েছে। মারায়ী জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করে বলেন, মহাশূন্যে ভাসমান সুবিন্যস্ত কক্ষপথ ও বিশাল মণ্ডলী আল্লাহর অপার সৃষ্টিশীল নিয়ন্ত্রণ ও মহাকর্ষীয় ভারসাম্যের জীবন্ত প্রমাণ।
৩. ‘শাহিদ ওয়া মাশহূদ’ (وَشَاهِدٍ وَمَشْهُودٍ) তাবারী বহু সংখ্যক আসার উল্লেখ করেছেন: শাহিদ হলো জুমার দিন আর মাশহূদ হলো আরাফার দিন; অথবা শাহিদ মুহাম্মদ (সা.) এবং মাশহূদ তাঁর উম্মত। তিনি সব মত উল্লেখ করে জুমার দিন ও আরাফার দিন সংক্রান্ত হাদিসকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। মারায়ী বলেন, এটি ব্যাপক অর্থবোধক। যেকোনো সাক্ষ্যদানকারী (যেমন স্বয়ং আল্লাহ, রাসূলগণ, ফেরেশতাগণ এবং মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ) এবং যা কিছুর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য প্রদান করা হবে (আমলনামা ও হাশরের ময়দান)।
৪. ‘কুতিলা আসহাবুল উখদূদ’ (قُتِلَ أَصْحَابُ الْأُخْدُودِ) তাবারী ব্যাকরণগতভাবে দেখিয়েছেন যে, ‘কুতিলা’ (قُتِلَ) হলো বদদোয়া ও অভিশাপ অর্থে ব্যবহৃত, অর্থাৎ ‘লু’ইনা’ (لُعِنَ – অভিশপ্ত হয়েছিল গর্তের অধিপতিরা)। তিনি ইয়ামেনের নাজরানের খন্দকের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সনদযুক্ত বর্ণনা পেশ করেছেন। মারায়ী ব্যাখ্যা করেছেন যে, জালিমদের বিরুদ্ধে এটি ঐশী শাস্তির ঘোষণা। তিনি সমকালীন বিশ্বের স্বৈরাচার ও ক্ষমতার দম্ভের সাথে এর তুলনা করে ঈমানের পথে অবিচলতার দীক্ষা তুলে ধরেছেন।
৫. ‘ইয হুম আলাইহা কু’ঊদ’ তাবারী বলেন, জালিম বাদশাহ ও তার পারিষদরা গর্তের কিনারায় আসনে বসে নিরীহ মুমিনদের জীবন্ত পুড়ে অঙ্গার হওয়ার দৃশ্য উপভোগ করছিল, যা তাদের সীমাহীন পাষণ্ডতার পরিচায়ক। মারায়ী মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এটি স্বৈরাচারী শাসকদের হৃদয়হীন স্যাডিজম বা পৈশাচিক উল্লাসের চিত্র, যা তাদের চূড়ান্ত অধঃপতনের প্রমাণ বহন করে।

(খ) আসহাবুল উখদূদের হৃদয়বিদারক ঐতিহাসিক ঘটনা

১. ভৌগোলিক অবস্থান ও পটভূমি: সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদের দীর্ঘ সহীহ হাদিস এবং তাফসীরে তাবারীর বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়্যাতের পূর্বে ইয়ামেনের নাজরান অঞ্চলে। সেখানকার অত্যাচারী ইহুদি শাসক যু-নাওয়াস (ذو نواس) প্রজাদের নিজের পূজা করতে বাধ্য করত।

২. বালক ও পথপ্রদর্শক দরবেশ: বাদশাহর এক বৃদ্ধ জাদুকর ছিল। জাদুকর বৃদ্ধ হয়ে পড়লে সে রাজাকে বলল যাতে তাকে একটি মেধাবী বালক দেওয়া হয় যাকে সে জাদুবিদ্যা শিক্ষা দেবে। বাদশাহ এক বালককে নিযুক্ত করল। বালকটি জাদু শেখার পথে এক দরবেশ বা ঈমানদার রাহিবের সাক্ষাৎ পেল। বালকটি রাহিবের নিকট থেকে বিশুদ্ধ তাওহীদের শিক্ষা গ্রহণ করল এবং একত্ববাদের প্রতি ঈমান আনল। বালকের দোয়ায় অন্ধ ও কুষ্ঠরোগী সুস্থ হতে লাগল।

৩. তাওহীদের প্রকাশ ও বাদশাহর ক্রোধ: একপর্যায়ে বাদশাহর অন্ধ দরবারী বালকের দোয়ায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে। বাদশাহ বিষয়টি জেনে ক্ষিপ্ত হয়ে দরবারী ও রাহিবকে করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ড করে হত্যা করে। এরপর বালকটিকে বিভিন্ন পাহাড়ে ও গভীর সাগরে ফেলে হত্যার চেষ্টা করা হলেও অলৌকিকভাবে আল্লাহ বালককে রক্ষা করেন এবং প্রহরীরা ধ্বংস হয়।

৪. বালকের আত্মত্যাগ ও গণ-ঈমান: অবশেষে বালকটি বাদশাহকে বলল, “তুমি আমাকে কিছুতেই হত্যা করতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি সমগ্র প্রজাদের এক বিশাল ময়দানে সমবেত করবে, আমাকে একটি গাছের গুঁড়িতে শূলে চড়াবে এবং আমার তূণীর থেকে একটি তীর নিয়ে ‘বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম’ (বালকের প্রতিপালক আল্লাহর নামে) বলে নিক্ষেপ করবে।” বাদশাহ তাই করল। তীরটি বালকের কপালে বিদ্ধ হয়ে বালক শাহাদাত বরণ করল। এই আত্মত্যাগ ও আল্লাহর কুদরত প্রত্যক্ষ করে উপস্থিত হাজার হাজার জনতা চিৎকার করে বলে উঠল: “আমান্না বিরাব্বিল গুলাম” (আমরা বালকের প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম!)।

৫. আগুনের খন্দক ও চরম শাহাদাত: বাদশাহ চরম আতঙ্কিত ও উন্মাদ হয়ে শহরের প্রধান প্রধান রাস্তায় বিশাল দীর্ঘ নালা বা পরিখা (الأخدود) খনন করাল এবং তাতে প্রচুর জ্বালানি কাঠ ফেলে দাউ দাউ করে আগুন প্রজ্বলিত করল। এরপর ঘোষণা দিল—যে ব্যক্তি ঈমান ত্যাগ করবে সে মুক্তি পাবে, আর যে তাওহীদে অবিচল থাকবে তাকে জ্যান্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। ঈমানদাররা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে হাসিমুখে আগুনে ঝাঁপ দিতে লাগলেন। এক কোলে শিশুসহ নারী ইতস্তত করছিলেন, তখন দুগ্ধপোষ্য শিশুটি আল্লাহর কুদরতে অলৌকিকভাবে কথা বলে উঠল: “ইয়া উম্মাহ! ইস্বিরী ফা-ইন্নাকি আলাল হাক্ক” (হে আম্মা! আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, নিশ্চয় আপনি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছেন!)। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জান্নাতের মহা পুরস্কারে ভূষিত করেন এবং জালিমদের দুনিয়া ও আখিরাতে চিরস্থায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করেন।


٢- قوله تعالى: ﴿لَا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ – وَأَنْتَ حِلٌّ بِهَذَا الْبَلَدِ – وَوَالِدٍ وَمَا وَلَدَ – لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي كَبَدٍ﴾ [البلد: ١-٤]

(أ) فسر الآيات المذكورة مقارنة بين تفسير البيضاوي وتفسير الميزان للطباطبائي-
(ب) أوضح قوله تعالى: “لقد خلقنا الإنسان في كبد”-

(ক) কাযী বায়যাবী ও আল্লামা তাবাতাবায়ীর তাফসীরের তুলনামূলক পর্যালোচনা

পবিত্র কুরআনের ৯০তম সূরা আল-বালাদের ১ থেকে ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা পবিত্র মক্কা নগরী, মানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং বংশপরম্পরার শপথ করে মানুষের অস্তিত্বগত সংগ্রাম ও পরীক্ষার বাস্তবতা ঘোষণা করেছেন। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের প্রখ্যাত মুফাসসির কাযী নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী (রহ.)-এর আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল এবং শিয়া ধারার দার্শনিক মুফাসসির আল্লামা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ হুসাইন তাবাতাবায়ী (রহ.)-এর আল-মিযান ফী তাফসীরিল কুরআন-এর আলোকে তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

পর্যালোচনার দিক আনওয়ারুত তানযীল (কাযী বায়যাবী) আল-মিযান (আল্লামা তাবাতাবায়ী)
১. তাফসীর পদ্ধতি ও দর্শন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের কালামশাস্ত্রীয় ও ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি। ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ, আলঙ্কারিক সূক্ষ্মতা ও ফিকহী ইঙ্গিতের সংমিশ্রণ। দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ধারা। ‘কুরআন দিয়ে কুরআনের তাফসীর’ (تفسير القرآن بالقرآن) পদ্ধতির মাধ্যমে আয়াতসমূহের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী ব্যাখ্যা।
২. ‘লা উকসিমু’ (لَا أُقْسِمُ)-এর ব্যাখ্যা বায়যাবী বলেন, ‘লা’ (لَا) শব্দটি শপথকে অধিকতর তাকীদ ও জোরালো করার জন্য অতিরিক্ত (زائدة لتأكيد القسم) হিসেবে ব্যবহৃত; অথবা এটি বিরোধীদের ধারণাকে নাকচ করে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত। তাবাতাবায়ী বলেন, ‘লা উকসিমু’ আরবি ভাষার এমন এক অলঙ্কারপূর্ণ শপথশৈলী, যেখানে সত্য এতই দেদীপ্যমান যে আনুষ্ঠানিক শপথের প্রয়োজন পড়ে না, অথচ এর মাধ্যমেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব বোঝানো হয়।
৩. ‘ওয়া আনতা হিল্লুন বিহাযাল বালাদ’ বায়যাবী দুটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন: (১) মক্কার কাফেররা আপনাকে যেখানে অবৈধ মনে করে সেখানে আপনাকে বৈধ (হালাল) মনে করছে অর্থাৎ হত্যার হুমকি দিচ্ছে। (২) ভবিষ্যতে মক্কা বিজয়ের দিন আপনার জন্য এই পবিত্র নগরী সাময়িকভাবে হালাল বা যুদ্ধ-অনুমোদিত করা হবে। তাবাতাবায়ী ব্যাখ্যা করেন, মক্কা নগরীর মর্যাদা স্বয়ং নবীজী (সা.)-এর উপস্থিতির কারণেই মহিমান্বিত হয়েছে। তবে কুরাইশরা শহরের ধর্মীয় সম্মান বজায় রাখলেও নবীর রক্ত হালাল মনে করে চরম আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত ছিল।
৪. ‘ওয়া ওয়ালিদিঁও ওয়ামা ওয়ালাদ’ বায়যাবী উল্লেখ করেন, ‘ওয়ালিদ’ হলেন হযরত আদম (আ.) অথবা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এবং ‘মা ওয়ালাদ’ হলো তাঁর পুণ্যবান সন্তান ও নবীগণ; অথবা সামগ্রিকভাবে পিতা ও তার সন্তান সন্ততি। তাবাতাবায়ী কুরআনের আন্তঃসম্পর্কের ভিত্তিতে মত দেন যে, এখানে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এবং তাঁর আত্মোৎসর্গকারী পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে বোঝানো হয়েছে, যাঁদের মাধ্যমে কা’বার প্রতিষ্ঠা ও মক্কার আবাদ হয়েছিল।
৫. ‘লাকাদ খালাকনাল ইনসানা ফী কাবাদ’ বায়যাবী ‘কাবাদ’ (كَبَد)-এর অর্থ করেছেন ‘মুশাক্কাত ও শিদ্দাত’ (কষ্ট, শ্রম ও কাঠিন্য)। মাতৃগর্ভ থেকে শুরু করে শৈশব, যৌবন, জীবিকার অন্বেষণ এবং মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ অবিরত কষ্টের সম্মুখীন। তাবাতাবায়ী দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বলেন, মানুষের এই দুঃখ-কষ্ট উদ্দেশ্যহীন নয়; বরং এই ক্লেশই মানুষের রুহকে খাঁটি করে এবং তাকে তার রবের সান্নিধ্যে পৌঁছার চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি গ্রহণ করায়।

(খ) ﴿لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي كَبَدٍ﴾ আয়াতাংশের বিস্তৃত ব্যাখ্যা

১. শাব্দিক বিশ্লেষণ: আরবি ভাষায় ‘আল-কাবাদ’ (الْكَبَدُ) শব্দের মূল অর্থ অত্যন্ত ভারী বা কঠিন কষ্ট, ক্লান্তি, পরিশ্রম, দুঃখ-যন্ত্রণা এবং প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়া। এছাড়াও এর অর্থ সোজা হয়ে দাঁড়ানো বা ভারসাম্য বজায় রাখা।

২. জীবনের প্রতিটি স্তরে কষ্টের বাস্তবতা: মুফাসসিরীনে কেরাম দেখিয়েছেন যে, মানুষের জীবন একটি অবিরাম সংগ্রামের নামান্তর:

  • গর্ভকালীন ও জন্মগত কষ্ট: মায়ের গর্ভে সংকীর্ণ স্থানে অবস্থান, ভূমিষ্ঠ হওয়ার তীব্র প্রসববেদনা এবং কান্নার মধ্য দিয়ে দুনিয়ায় আগমন।
  • শৈশব ও শিক্ষাজীবন: শৈশবের দুর্বলতা, কথা বলা ও হাঁটার প্রচেষ্টা, জ্ঞান অর্জন ও প্রশিক্ষণের কষ্ট।
  • জীবিকা ও পারিবারিক সংগ্রাম: যৌবনে বৈধ রিজিক অন্বেষণে ঘাম ঝরানো, পারিবারিক দায়িত্ব পালন, রোগ-ব্যাধি, জরা এবং সামাজিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি হওয়া।
  • বার্ধক্য ও মৃত্যুর প্রহর: শারীরিক শক্তির ক্ষয়, বার্ধক্যের অসহায়ত্ব এবং সাকরাতুল মাওত বা মৃত্যুর তীব্র যন্ত্রণা।
  • বরযখ ও আখিরাত: কবরের সওয়াল-জওয়াব, হাশরের কঠিন রোদ ও ময়দানের হিসাব-নিকাশের ভয়।

৩. এই ঘোষণার অন্তর্নিহিত হেকমত: কাফেররা দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও সাময়িক বিলাসবহুল জীবন পেয়ে অহংকার করত এবং ভাবত তাদের কেউ পরাস্ত করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মাধ্যমে মানুষের চোখ খুলে দিয়েছেন যে, দুনিয়া কোনো আরামের স্থায়ী আবাস নয় (دار الراحة নয়), বরং এটি কর্ম ও পরীক্ষার ময়দান (دار الابتلاء والامتحان)। যে ব্যক্তি এই কষ্টকে আল্লাহর আনুগত্য ও ধৈর্যের মাধ্যমে অতিক্রম করবে, সে চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করবে; আর যে অহংকারে মত্ত হবে, সে দুনিয়াতেও কষ্টে থাকবে এবং জাহান্নামেও কঠিনতম শাস্তির মুখোমুখি হবে।


٣- قوله تعالى: ﴿إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ – وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ – لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ﴾ [القدر: ١-٣]

(أ) فسر الآيات المذكورة مقارنة بين تفسير القدير للشوكاني وهميان الزاد للإباضية-
(ب) بين فضائل ليلة القدر-

(ক) ইমাম শাওকানী ও ইবায়ী মুফাসসির মুহাম্মাদ বিন ইউসুফের তাফসীরের তুলনামূলক পর্যালোচনা

পবিত্র কুরআনের ৯৭তম সূরা আল-কদরের প্রথম তিনটি আয়াতে কুরআন নাযিলের মহিমান্বিত রজনী ‘লাইলাতুল কদর’-এর মর্যাদা ও সহস্র মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আহলুস সুন্নাহর মুজতাহিদ ইমাম মুহাম্মদ বিন আলী আশ-শাওকানী (রহ.)-এর ফাতহুল কাদীর আল-জামি’ বাইনা ফান্নাইর রিওয়ায়াহ ওয়াদ দিরায়াহ এবং ইবাদী ধারার প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আতফাইশ (রহ.)-এর হামিয়ানুয যাদ ইলা দারিল মা’আদ-এর আলোকে তুলনামূলক পর্যালোচনা নিম্নরূপ:

পর্যালোচনার দিক ফাতহুল কাদীর (ইমাম আশ-শাওকানী) হামিয়ানুয যাদ (মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আতফাইশ – ইবাদী)
১. তাফসীরিক ধারা ও কর্মপদ্ধতি রিওয়ায়াত ও দিরায়াতের অনন্য সমন্বয়। তিনি সরাসরি মারফু হাদিস, সাহাবা ও তাবেয়ীগণের আসার যাচাই-বাছাইপূর্বক উল্লেখ করেন এবং মাযহাবী সংকীর্ণতামুক্ত স্বাধীন ইজতিহাদী মতামত দেন। ইবাদী মাযহাবের মূলনীতিভিত্তিক তাফসীর। তিনি ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও ফিকহী ইস্তিম্বাতের পাশাপাশি ইবাদী ধর্মতাত্ত্বিক মূলনীতিকে তুলে ধরেন।
২. ‘ইন্না আনযালনাহু’ (إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ) শাওকানী ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে উল্লেখ করেন যে, কুরআন লওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানের বায়তুল ইযযাহে কদরের রাতে সম্পূর্ণ একসাথে অবতীর্ণ হয়, অতঃপর সেখান থেকে ২৩ বছর ধরে ধাপে ধাপে নাযিল হয়। আতফাইশ বলেন, সর্বনাম ‘হু’ দ্বারা কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট বিধায় নাম উল্লেখ না করেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কুরআন অবতীর্ণের সূচনা এই রাতে হয়েছিল অথবা সম্পূর্ণ কুরআন একবারে অবতীর্ণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল।
৩. ‘লাইলাতুল কদর’ নামকরণের রহস্য শাওকানী তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন: (১) কদর অর্থ মর্যাদা ও সম্মান (শারাফ ও আযমাত), (২) তাকদীর বা আগামী এক বছরের তাকদীর ও ফায়সালা নির্ধারণের রাত, (৩) কদর অর্থ সংকীর্ণতা, কারণ এ রাতে এত ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় যে পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। আতফাইশ আধ্যাত্মিক ও আমলী দিককে প্রাধান্য দিয়ে বলেন, এটি এমন রজনী যাতে নেক আমলকারীর মর্যাদা আল্লাহর কাছে বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং এটি বান্দার জীবন পুনর্গঠনের এক অনন্য সুযোগ।
৪. ‘লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর’ শাওকানী রেওয়ায়াত উল্লেখ করে বলেন, বনি ইসরাঈলের এক মুজাহিদ দীর্ঘ এক হাজার মাস আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছিলেন। তা শুনে সাহাবীদের আফসোস দূর করতে আল্লাহ এই উম্মতকে এক রাতের ইবাদতে ১০০০ মাসের (৮৩ বছর ৪ মাস) চেয়েও বেশি সওয়াব দান করেন। আতফাইশ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘আলফ’ বা হাজার দ্বারা কেবল গাণিতিক সংখ্যাই নয়, বরং অসীম বরকত ও গুণগত শ্রেষ্ঠত্ব বোঝানো হয়েছে, যেখানে বান্দার সকল পাপ মোচনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

(খ) লাইলাতুল কদরের অনন্য মর্যাদা ও ফজিলতসমূহ

লাইলাতুল কদর বা শবে কদর সমগ্র বছরের শ্রেষ্ঠতম রজনী। কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে এর প্রধান ফজিলতগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  1. কুরআন মাজীদ অবতীর্ণের রাত: এই মহিমান্বিত রাতেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানবজাতির হেদায়াতের আলোকবর্তিকা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন লওহে মাহফূয থেকে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ করেন।
  2. এক হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ: এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাস (তথা ৮৩ বছর ৪ মাস) বিরতিহীন ইবাদত করার চেয়েও বহুগুণ বেশি বরকত ও সওয়াব বয়ে আনে।
  3. ফেরেশতা ও জিব্রাঈল (আ.)-এর অবতরণ: এ রাতে হযরত জিব্রাঈল (আ.)-এর নেতৃত্বে অগণিত ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন মুমিনদের জন্য শান্তি ও রহমতের দোয়া করেন।
  4. পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

    «مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»

    অর্থ: “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়ামুল লাইল (ইবাদত) করবে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহীহ বুখারী: ১৯০১)।
  5. সার্বক্ষণিক শান্তি ও নিরাপত্তা: সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত এই রাতটি সম্পূর্ণ শান্তি, রহমত ও নিরাপত্তায় পরিপূর্ণ থাকে।
  6. ভাগ্য ও বাজেট নির্ধারণ: সূরা আদ-দুখানে একে ‘লাইলাতিন মুবারাকাহ’ বলা হয়েছে, যেখানে আগামী এক বছরের মানুষের রিজিক, হায়াত, মউত এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলির ফায়সালা কার্যকর করা হয়।

٤- قوله تعالى: ﴿وَالْعَصْرِ – إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ – إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ﴾ [العصر: ١-٣]

(أ) فسر الآيات المذكورة مقارنة بين تفسير ‘أيسر التفاسير’ و’التفسير المنير’-
(ب) اكتب أهمية الوقت في حياة الإنسان-

(ক) শায়খ আবু বকর আল-জাযায়েরী ও ড. ওয়াহবাহ আয-যুহায়লীর তাফসীরের তুলনামূলক পর্যালোচনা

সূরা আল-আসর পবিত্র কুরআনের সংক্ষিপ্ততম কিন্তু অর্থ ও তাৎপর্যের দিক দিয়ে সর্বব্যাপী একটি সূরা। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন, যদি সমগ্র কুরআনের পরিবর্তে কেবল এই একটি সূরাই নাযিল হতো, তবে তা মানবজাতির পথপ্রদর্শনের জন্য যথেষ্ট ছিল। মদিনার প্রখ্যাত মুফাসসির শায়খ আবু বকর জাবের আল-জাযায়েরী (রহ.)-এর আইসারুত তাফাসীর লি কালামিল আলিয়্যিল কাবীর এবং আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকীহ ও মুফাসসির ড. ওয়াহবাহ আয-যুহায়লী (রহ.)-এর আত-তাফসীরুল মুনীর ফিল আকীদাতি ওয়াশ শারীআতি ওয়াল মানহাজ-এর তুলনামূলক পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:

পর্যালোচনার দিক আইসারুত তাফাসীর (আবু বকর আল-জাযায়েরী) আত-তাফসীরুল মুনীর (ড. ওয়াহবাহ আয-যুহায়লী)
১. তাফসীরিক মানহাজ ও পরিধি সাধারণ মুসলিম ও শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত সহজ, প্রাঞ্জল ও দরসী শৈলী। শব্দার্থ, সার্বিক ভাবার্থ এবং সরাসরি জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা (هدى الآيات) আলাদা করে উপস্থাপন করেন। অ্যাকাডেমিক, ফিকহী ও সুবিন্যস্ত আধুনিক বিশ্লেষণধর্মী শৈলী। ভাষাতত্ত্ব, বালাগাত, শানে নুযূল, ফিকহী বিধিবিধান এবং যুগোপযোগী সামাজিক দর্শন বিশ্লেষণ করেন।
২. ‘ওয়াল আসর’ (وَالْعَصْرِ)-এর শপথের ব্যাখ্যা জাযায়েরী বলেন, ‘আসর’ দ্বারা যামানা বা সময়কে বোঝানো হয়েছে, যার মধ্যে মানবজাতি তাদের সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে। আল্লাহ সময়ের শপথ করে সময়ের অপরিসীম মূল্যের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। যুহায়লী ব্যাখ্যা করেন, ‘আসর’ দ্বারা যুগ বা সময়, আসরের সালাতের সময় এবং বিশ্বনবী (সা.)-এর নবুওয়্যাতের স্বর্ণযুগ—সবই অন্তর্ভুক্ত। সময়ের দ্রুত বয়ে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনপূঁজি।
৩. ‘ইন্নাল ইনসানা লাফী খুসর’ জাযায়েরী উল্লেখ করেন, ‘ইনসান’ দ্বারা সমগ্র মানবজাতি এবং ‘খুসর’ হলো ধ্বংস, ব্যর্থতা ও জাহান্নাম। সময়ের সদ্ব্যবহার না করলে মানুষের প্রতি মুহূর্তের আয়ু কমে গিয়ে সে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। যুহায়লী অর্থনীতি ও বাণিজ্যের রূপকে ব্যাখ্যা করে বলেন, মানুষের জীবন হলো এক বরফের টুকরোর মতো যা প্রতিনিয়ত গলছে। যদি সে তা দিয়ে পুণ্য অর্জন না করে তবে সে চূড়ান্ত আত্মিক ও পারলৌকিক ক্ষতির শিকার হবে।
৪. মুক্তির চারটি অপরিহার্য শর্ত জাযায়েরী সুস্পষ্ট চারটি স্তম্ভ উল্লেখ করেন: ১. বিশুদ্ধ ঈমান, ২. নেক আমল, ৩. সত্যের দাওয়াত বা উপদেশ এবং ৪. দ্বীনের পথে অটল থাকার ধৈর্য। যুহায়লী সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করেন যে, কেবল ব্যক্তিগতভাবে ভালো হওয়াই যথেষ্ট নয় (আমলে সালেহ), বরং সমাজ বিনির্মাণে সত্য ও ন্যায়ের আদেশ এবং প্রতিকূলতায় সামগ্রিক ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা অপরিহার্য।

(খ) মানবজীবনে সময়ের অপরিসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলামে সময় নিছক কোনো জাগতিক ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়, বরং সময় হলো মানবজীবনের মূল মূলধন (رأس المال)। সময় চলে গেলে তা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না। মানবজীবনে সময়ের গুরুত্ব নিম্নরূপ:

  1. কুরআনে সময়ের শপথ: মহান আল্লাহ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সময়ের শপথ করেছেন—যেমন: ‘ওয়াল আসর’ (যুগের শপথ), ‘ওয়াল লাইল’ (রাত্রির শপথ), ‘ওয়াদ দুহা’ (পূর্বাহ্নের শপথ), ‘ওয়াল ফাজর’ (প্রভাতের শপথ)। আল্লাহ কোনো সৃষ্টির শপথ করলে তা তার পরম গুরুত্ব প্রমাণ করে।
  2. কিয়ামতের দিনে সময়ের হিসাব: তিরমিযী শরীফের প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: কিয়ামতের দিন কোনো বান্দা তার কদম একচুলও নাড়াতে পারবে না যতক্ষণ না তাকে চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, যার দুটিই সময়ের সাথে জড়িত—(১) তার সমগ্র জীবন সে কোন কাজে ব্যয় করেছে এবং (২) তার যৌবনকাল সে কোন কাজে নিঃশেষ করেছে।
  3. হারিয়ে যাওয়া সময়ের অপূরণীয়তা: প্রখ্যাত বুযর্গ হাসান বসরী (রহ.) বলতেন: “হে আদম সন্তান! তুমি তো দিনগুলোরই সমষ্টি মাত্র; যখন একটি দিন চলে যায়, তখন তোমার অস্তিত্বের একটি অংশই চিরতরে বিলীন হয়ে যায়।”
  4. অবসরকে সম্পদে রূপান্তর: রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: «نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ» অর্থাৎ “দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে: স্বাস্থ্য এবং অবসর।” (সহীহ বুখারী)।
  5. ব্যক্তি ও জাতির অগ্রগতি: যে ব্যক্তি ও জাতি সময়ের প্রতিটি মুহূর্তকে জ্ঞানার্জন, উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড ও আল্লাহর সন্তুষ্টিতে ব্যয় করে, তারাই দুনিয়া ও আখিরাতে বিজয় লাভ করে। সময়ের অপচয়ই ব্যক্তি ও জাতির ধ্বংস ডেকে আনে।

٥- قوله تعالى: ﴿وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ – الَّذِي جَمَعَ مَالًا وَعَدَّدَهُ – يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَدَهُ﴾ [الهمزة: ١-٣]

(أ) فسر الآيات المذكورة مقارنة بين تفسير ‘أحكام القرآن’ للجصاص وتفسير ‘القرآن العظيم’ لابن كثير-
(ب) ما المراد بقوله تعالى: “همزة لمزة”؟

(ক) ইমাম জাস্সাস ও হাফিজ ইবনে কাসীরের তাফসীরের তুলনামূলক পর্যালোচনা

পবিত্র কুরআনের ১০৪তম সূরা আল-হুমাযাহ-এর প্রথম তিনটি আয়াতে মানুষের চরিত্র হননকারী, পরনিন্দুক এবং ধন-সম্পদের মোহে অন্ধ কৃপণ পুঁজিপতিদের ভয়াবহ পরিণতির কথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তুলে ধরা হয়েছে। হানাফী মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় ফিকহী মুফাসসির ইমাম আবু বকর আল-জাস্সাস (রহ.)-এর আহকামুল কুরআন এবং ইলমে হাদিস ও তাফসীর শাস্ত্রের মহান ইমাম হাফিজ ইবনে কাসীর (রহ.)-এর তাফসীরুল কুরআনিল আযীম-এর আলোকে তুলনামূলক পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:

পর্যালোচনার দিক আহকামুল কুরআন (ইমাম আবু বকর আল-জাস্সাস) তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (হাফিজ ইবনে কাসীর)
১. তাফসীরিক বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য ফিকহুল কুরআন বা বিধানভিত্তিক তাফসীর। তিনি আয়াত থেকে শরীয়তের অনুশাসন, সামাজিক অপরাধের মাত্রা এবং ফিকহী মাসআলা উদ্ঘাটনে মনোনিবেশ করেন। তাফসীর বিল মা’ছূরের সর্বশ্রেষ্ঠ স্তম্ভ। তিনি কুরআনের আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াত, সহীহ হাদিস এবং সাহাবা ও তাবেয়ীদের বর্ণনার সমন্বয় ঘটান।
২. ‘ওয়াইলুন’ (وَيْلٌ)-এর তাৎপর্য জাস্সাস বলেন, ‘ওয়াইল’ শব্দটি ধ্বংস ও শাস্তির ঘোষণা। শরীয়তের দৃষ্টিতে মানুষের ইজ্জত-সম্মান নষ্ট করা এবং সম্পদ পুঞ্জীভূত করে কৃপণতা করা যে কবিরা গুনাহ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ, এটি তারই অকাট্য প্রমাণ। ইবনে কাসীর হাদিসের বরাতে উল্লেখ করেন, ‘ওয়াইল’ হলো জাহান্নামের এমন এক গভীর উপত্যকা, যার উত্তাপ ও গভীরতা এত ভয়াবহ যে স্বয়ং জাহান্নামও তা থেকে দিনে বহুবার আশ্রয় প্রার্থনা করে।
৩. ‘হুমাহাযাহ লুমাহাযাহ’-এর ব্যাখ্যা জাস্সাস ভাষাতাত্ত্বিক ও ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে পার্থক্য করে বলেন, একদল মানুষ ইঙ্গিতে-ইশারায় মানুষের সম্মান নষ্ট করে আর একদল প্রকাশ্যে কটূক্তি করে। শরীয়তে গীবত ও চোগলখোরী উভয়ই হারাম। ইবনে কাসীর ইবনে আব্বাস ও কাতাদাহর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন: হুমাযাহ হলো যে মানুষের সামনে গীবত করে ও খোঁটা দেয়, আর লুমাযাহ হলো যে মানুষের পেছনে দুর্নাম রটায় ও বিদ্রূপ করে।
৪. ‘আল্লাযী জামা’আ মালান ওয়া ‘আদ্দাদাহ’ জাস্সাস ফিকহী বিশ্লেষণ করে বলেন, সম্পদ উপার্জন করা হারাম নয়; কিন্তু সম্পদ পুঞ্জীভূত করে তার ওপর ফরজ জাকাত ও ওয়াজিব হক আদায় না করা এবং সম্পদে অন্ধ হয়ে যাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইবনে কাসীর বলেন, সে বারবার টাকা গুনে আনন্দ পায় এবং দুনিয়ার প্রেমে পাগল হয়ে থাকে। সে এই সম্পদে আল্লাহর কোনো হক বা আত্মীয়ের হক আদায় করে না।
৫. ‘ইয়াহসাবু আন্না মালাহূ আখলাদাহ’ জাস্সাস বলেন, অজ্ঞ মানব ভাবে এই সম্পদ তাকে দুনিয়ায় অমর করে রাখবে, যা চরম বাতুলতা ও ভ্রষ্টতা। ইবনে কাসীর বলেন, সে মনে করে তার ধন-সম্পদ তাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে এবং চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। অথচ মৃত্যু তার সমস্ত সঞ্চয়কে মুহূর্তে ধূলিসাৎ করে দেয়।

(খ) ﴿هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ﴾ (হুমাযাহ-লুমাযাহ)-এর সুনির্দিষ্ট তাৎপর্য

আরবি ব্যাকরণে ‘হুমাযাহ’ (هُمَزَة) এবং ‘লুমাযাহ’ (لُمَزَة) উভয় শব্দই ‘ফু’আলাহ’ (فُعَلَة) ওজনে গঠিত মুবালাগা বা আধিক্যবাচক বিশেষ্য, যার অর্থ কোনো কাজে চরমভাবে অভ্যস্ত ব্যক্তি। মুফাসসিরীন ও ভাষাতাত্ত্বিকগণের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এর সূক্ষ্ম অর্থগুলো নিম্নরূপ:

  1. সম্মুখ ও পশ্চাতের চরিত্রহনন: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এবং ইমাম মুজাহিদ (রহ.)-এর মতে:
    • হুমাযাহ (الْهُمَزَة): যে ব্যক্তি মানুষের সামনাসামনি কটু কথা বলে, খোঁটা দেয়, ব্যঙ্গ করে বা মুখের ভঙ্গিমা ও চোখ-হাত নেড়ে কাউকে অপমানিত করে (طعّان في الوجه)।
    • লুমাযাহ (اللُّمَزَة): যে ব্যক্তি মানুষের পেছনে তার গীবত করে, পরনিন্দা রটায় এবং অনুপস্থিতিতে দোষত্রুটি খুঁজে অপপ্রচার চালায় (مغتاب في الغيبة)।
  2. কথায় ও ইঙ্গিতে আঘাত: কোনো কোনো আলেমের মতে, হুমাযাহ হলো হাত ও চোখের ইঙ্গিতে মানুষের সম্মানহানি করা এবং লুমাযাহ হলো জিহ্বা ও কথার চাবুক দিয়ে মানুষের মনে আঘাত দেওয়া।
  3. শানে নুযূলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই আয়াতগুলো মক্কার চরম অহংকারী ও ধনী কাফেরদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল—যেমন আখনাশ ইবনে শুরাইক, ওলীদ ইবনে মুগীরা বা উমাইয়া ইবনে খালাফ। তারা দরিদ্র ও দুর্বল মুসলমানদের দেখলে আড়চোখে তাকাত, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত এবং নিজেদের ধনবল ও বংশমর্যাদার দেমাগ দেখাত। আল্লাহ তাদের এই নীচ মানসিকতার বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

٦- عرف التفسير السني والتفسير الاعتزالي، ثم بين أهم المميزات لكل من هذين النوعين من التفاسير-

[সুন্নি তাফসীর ও মু’তাযিলী তাফসীরের পরিচয় দাও, অতঃপর এ দুই ধারার তাফসীরের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]

১. আত-তাফসীরুস সুন্নি (التفسير السني) বা সুন্নি তাফসীরের পরিচয়

সংজ্ঞা: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা, উসূল ও মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও সালাফে সালেহীনের বিশুদ্ধ বর্ণনাসমূহকে প্রাধান্য দিয়ে এবং বিশুদ্ধ আরবি ভাষা ও শরীয়তের আলোকে যে তাফসীর রচিত হয়, তাকে ‘আত-তাফসীরুস সুন্নি’ বলা হয়।

মূল দর্শন: এখানে ওহী (নকল) হলো মূল এবং বিবেক-বুদ্ধি (আকল) হলো ওহীর অনুগামী ও সহায়ক। এই ধারার প্রধান প্রতিনিধি হলেন ইমাম তাবারী, ইমাম ইবনে কাসীর, ইমাম বাগাভী, ইমাম কুরতুবী ও ইমাম রাযী।

২. আত-তাফসীরুল ই’তিযালী (التفسير الاعتزالي) বা মু’তাযিলী তাফসীরের পরিচয়

সংজ্ঞা: মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের আকিদাগত পঞ্চমূলনীতি (আল-উসূলুল খামসাহ: তাওহীদ, আদল, আল-ওয়াদ ওয়াল ওয়াইদ, আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন, আল-আমর বিল মা’রূফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার)-কে কুরআনের ওপর প্রাধান্য দিয়ে যুক্তি ও দর্শনের আলোকে যে তাফসীর রচিত হয়, তাকে ‘আত-তাফসীরুল ই’তিযালী’ বলা হয়।

মূল দর্শন: তারা বিবেক ও মানবীয় বুদ্ধিকে (العقل) ওহীর চেয়ে অগ্রবর্তী মনে করে। যে আয়াত বা হাদিস তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণার বিরুদ্ধে যায়, তারা তার যথেচ্ছ অপব্যাখ্যা (তা’বীল) করে। এই ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হলেন আল্লামা আবু মুসলিম আল-ইসফাহানী, কাযী আব্দুল জাব্বার এবং আল্লামা মাহমূদ বিন উমর আয-যামাখশারী (তাফসীরে কাশশাফ)।

৩. উভয় ধারার তাফসীরের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যসমূহের তুলনামূলক বিবরণ

তুলনার ক্ষেত্র সুন্নি তাফসীরের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ মু’তাযিলী তাফসীরের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. আকল ও নকলের মর্যাদা ওহী ও সহীহ হাদিসকে সর্বোচ্চ প্রামাণ্য ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। আকল হলো ওহীর তাৎপর্য অনুধাবনের অনুগত মাধ্যম। আকল বা মানবীয় যুক্তিকে সর্বোচ্চ বিচারক মানা হয়। যা আকলের সাথে মিলে না, তাকে রূপক বলে অপব্যাখ্যা করা হয়।
২. আল্লাহর সিফাত (গুণাবলি) আল্লাহর সমস্ত নাম ও গুণাবলিকে সাদৃশ্যহীনভাবে (بلا تشبيه ولا تعطيل) সত্য বলে বিশ্বাস করা হয়। যেমন: আল্লাহর চেহারা, হাত, আরশে সমাসীন হওয়া। আল্লাহর জাত ছাড়া সমস্ত সিফাতকে অস্বীকার করা হয় (تعطيل الصفات)। তারা মনে করে সিফাত স্বীকার করলে বহুত্বের সৃষ্টি হয়। ‘ইয়াদ’ অর্থ শক্তি এবং ‘ইসতিওয়া’ অর্থ ক্ষমতা দখল।
৩. রুইয়াতুল্লাহ (আল্লাহর দর্শন) আখিরাতে মুমিনরা স্বচক্ষে পরম প্রভুর দীদার লাভ করবেন—এটি অকাট্য আকিদা হিসেবে সাব্যস্ত। দলিল: ﴿وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ * إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ﴾। আখিরাতেও আল্লাহকে চর্মচক্ষে দেখা অসম্ভব বলে তারা বিশ্বাস করে। তারা উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করে ‘আল্লাহর সওয়াবের প্রতিক্ষাকারী’।
৪. তাকদীর ও মানুষের কর্ম মানুষের সকল কাজের স্রষ্টা স্বয়ং আল্লাহ (খালিক), আর মানুষ তার কর্মের উপার্জনকারী (কাসিব)। ভালো-মন্দ সবই আল্লাহর ইলম ও কুদরতে ঘটে। তারা দাবি করে মানুষ নিজেই তার ভালো-মন্দ কর্মের চূড়ান্ত স্রষ্টা (خالق أفعال نفسه)। ফলে তারা তাকদীরকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে এবং এজন্য তাদের ‘কাদারিয়্যা’ বলা হয়।
৫. কবিরা গুনাহগার ব্যক্তির হুকুম কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি ফাসেক মুমিন। সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়; আল্লাহর রহমতে বা সুপারিশের মাধ্যমে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে। তারা ‘আল-মানযিলাতু বাইনাল মানযিলাতাইন’ বলে—সে ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি স্তরে আছে। তওবা ছাড়া মারা গেলে সে চিরকাল জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করবে।
৬. বালাগাত ও আরবি ভাষা ভাষাতত্ত্বকে কোরআনের মূল হেদায়েত অনুধাবনের জন্য নিয়োজিত রাখা হয়। আরবি অলঙ্কারশাস্ত্র, ই’জায ও বালাগাত উপস্থাপনে তারা অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন (যেমন তাফসীরে কাশশাফে)।

٧- ما التفسير المقارن؟ ثم بين وجوه المقارنة وضوابط الترجيح بين أقوال المفسرين-

[তুলনামূলক তাফসীর কাকে বলে? অতঃপর মুফাসসিরগণের মতামতের তুলনামূলক পর্যালোচনার দিকসমূহ এবং তারজীহ (প্রাধান্য)-এর নিয়মাবলি বর্ণনা কর।]

১. আত-তাফসীরুল মুকারিন (তুলনামূলক তাফসীর)-এর পরিচয়

শাব্দিক অর্থ: ‘মুকারিন’ (المُقَارَن) শব্দটি বাবে মুফা’আলাহ থেকে গৃহীত, যার অর্থ তুলনা করা, পাশাপাশি রেখে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য যাচাই করা।

পারিভাষিক সংজ্ঞা: তাফসীরুল মুকারিন হলো এমন এক উচ্চতর গবেষণা পদ্ধতি, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট আয়াত বা সূরার ওপর বিভিন্ন মুফাসসিরের ব্যাখ্যা, মাযহাবগত অভিমত ও ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি একত্রিত করে সেগুলোর দলিল-প্রমাণের শক্তি যাচাই-বাছাই করা হয় এবং বিশুদ্ধ উসূলের আলোকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী মতটিকে প্রাধান্য (ترجيح) দেওয়া হয়।

২. তুলনামূলক তাফসীরের বিভিন্ন দিক বা পর্যায় (وجوه المقارنة)

একটি আয়াতের তুলনামূলক ব্যাখ্যা করার সময় গবেষক মুফাসসির মূলত নিম্নলিখিত দিকগুলোর ওপর নজর দেন:

  1. রিওয়ায়াতগত তুলনা (المقارنة الرواية): আয়াতের শানে নুযূল, সাহাবা ও তাবেয়ীগণের আসার এবং হাদিসসমূহের সনদ ও মতনগত শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাই করা।
  2. ভাষাতাত্ত্বিক ও বালাগাতগত তুলনা (المقارنة اللغوية والبلاغية): শব্দার্থ, ব্যাকরণিক এরাব (اعراب), রূপক ও অলঙ্কারের বিভিন্নতার কারণে অর্থের কী রূপ পরিবর্তন ঘটে তা পর্যালোচনা করা।
  3. আকিদাগত তুলনা (المقارنة العقدية): সুন্নি, মু’তাযিলী, আশ’আরী, মাতুরিদী বা শিয়া মুফাসসিরগণ নিজ নিজ আকিদার সমর্থনে আয়াতের কী রূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং কোনটি কুরআন-সুন্নাহর মূল স্পিরিটের অনুসারী তা নিরূপণ করা।
  4. ফিকহী ও বিধানগত তুলনা (المقارنة الفقهية): হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ আয়াতের শব্দমালা থেকে কীভাবে পৃথক পৃথক হুকুম ইস্তিম্বাত করেছেন তা যাচাই করা।
  5. প্রাচীন ও আধুনিক ধারার তুলনা (المقارنة بين القديم والحديث): ক্লাসিক্যাল তাফসীরগুলোর সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনার সমন্বয় ও বৈসাদৃশ্য নিরূপণ।

৩. মুফাসসিরগণের মতামতের মধ্যে তারজীহ প্রদানের অপরিহার্য মূলনীতি (ضوابط الترجيح)

ইমাম তাবারী, ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইমাম যারকাশী এবং আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) প্রমুখ গবেষক মুফাসসিরগণের অনুসৃত তারজীহের প্রধান নিয়মাবলি নিম্নরূপ:

  1. কুরআন দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়া: যেখানে এক আয়াতের সংক্ষিপ্ততা অন্য আয়াতের বিশদ ব্যাখ্যা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়, সেখানে অন্য সকল ব্যক্তিগত মতকে বর্জন করে কুরআনী ব্যাখ্যাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  2. সহীহ মারফু হাদিসের প্রাধান্য: কোনো আয়াতের তাফসীরে যদি নির্ভরযোগ্য সনদে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট হাদিস পাওয়া যায়, তবে কোনো সাহাবী বা মুজতাহিদের কিয়াসকে তার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না।
  3. সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যকে প্রাধান্য দেওয়া: যে বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন, পরবর্তীতে উদ্ভুত কোনো মতকে তার ওপর প্রধান্য দেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
  4. আরবি ভাষার সুপ্রসিদ্ধ ও সাধারণ ব্যবহারের অগ্রাধিকার: কোনো শব্দের যদি একাধিক অর্থ থাকে, তবে বিরল বা অপ্রচলিত অর্থের চেয়ে জাহেলী যুগের বিশুদ্ধ কবিতা ও সাধারণ আরবিতে বহুল প্রচলিত অর্থটিকে প্রাধান্য দিতে হবে।
  5. কুরআনের পূর্বাপর প্রসঙ্গের (সিয়াক ও সিবাক) সাথে সামঞ্জস্য: যে মতটি আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বক্তব্য, সূরার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য এবং সামগ্রিক প্রসঙ্গের সাথে সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  6. মূল বক্তব্যকে বহাল রাখা (অনাবশ্যক রূপক পরিহার): কোনো রূপক বা তা’বীল করার সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা বা শরয়ী দলিল না থাকলে শব্দের হাকীকী বা আক্ষরিক অর্থকেই বলবৎ রাখতে হবে।
  7. ইসরাঈলী বর্ণনামুক্ত হওয়া: যে মতটি স্পষ্টত তাওরাত-ইঞ্জিল বা অনির্ভরযোগ্য ইসরাঈলী কাহিনীর ওপর নির্ভরশীল, তাকে পরিহার করে খাঁটি ইসলামি বর্ণনাভিত্তিক মতকে প্রাধান্য দিতে হবে।

٨- اكتب ترجمة علامة جار الله الزمخشري مع بيان مزايا تفسيره-

[আল্লামা জারুল্লাহ যামাখশারীর জীবনী লেখ এবং তাঁর তাফসীরের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বসমূহ বর্ণনা কর।]

১. আল্লামা জারুল্লাহ আয-যামাখশারী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও উপাধি: নাম মাহমূদ বিন উমর বিন মুহাম্মদ বিন আহমদ। উপনাম আবুল কাসিম। তাঁর বিশ্বখ্যাত উপাধি হলো ‘জারুল্লাহ’ (جار الله – আল্লাহর প্রতিবেশী), কারণ তিনি দীর্ঘদিন পবিত্র মক্কাতুল মুকাররমায় কা’বা শরীফের সান্নিধ্যে বসবাস ও জ্ঞানচর্চা করেছিলেন।
  • জন্ম: তিনি হিজরী ৪৬৭ সনের রজব মাসে মধ্য এশিয়ার খাওয়ারিজমের ‘যামাখশার’ নামক জনপদে জন্মগ্রহণ করেন।
  • জ্ঞানার্জন ও পাণ্ডিত্য: তিনি শৈশবেই পবিত্র কুরআন হিফজ করেন। এরপর বুখারা, সমরকন্দ, বাগদাদ ও মক্কা শরীফে যুগশ্রেষ্ঠ ওলামায়ে কেরামের নিকট উলূমুল কুরআন, হাদিস, আরবি ব্যাকরণ (নাহব-ছরফ), অভিধানশাস্ত্র ও বালাগাতশাস্ত্রে অগাধ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। বিশেষত আরবি সাহিত্যের অলঙ্কারশাস্ত্রে তিনি একচ্ছত্র ইমামের মর্যাদা লাভ করেন।
  • মাযহাব ও চিন্তাধারা: ফিকহের দিক থেকে তিনি হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন; কিন্তু আকিদার ক্ষেত্রে তিনি কট্টর মু’তাযিলী চিন্তাধারার সমর্থক ও প্রচারক ছিলেন।
  • রচনাবলি: তিনি বহু কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেছেন। তন্মধ্যে: আল-কাশশাফ ‘আন হাকায়িকিত তানযীল (তাফসীর), আসাসুল বালাগাহ (অভিধান), আল-মুফাস্সাল (নাহব), রাবি’উল আবরার, মাকামাতু যামাখশারী অন্যতম।
  • ইন্তেকাল: হিজরী ৫৩৮ সনে খাওয়ারিজমের রাজধানী জুরজানিয়ায় এই মহান ভাষাতাত্ত্বিক ইন্তেকাল করেন।

২. তাফসীরে কাশশাফের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বসমূহ (مزايا تفسير الكشاف)

আল্লামা যামাখশারীর তাফসীরে কাশশাফ কুরআনের বালাগাত ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় তাফসীর সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত চূড়া। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  1. ই’জাযুল কুরআন ও বালাগাতের নিখুঁত প্রকাশ: তিনি ইলমুল মা’আনী ও ইলমুল বায়ান-এর আলোকে কুরআনের প্রতিটি বাক্য, শব্দ, এমনকি হরফের অবস্থানগত সৌন্দর্য এত নিখুঁতভাবে প্রমাণ করেছেন যে, পরবর্তী সকল মুফাসসির তাঁর দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছেন। আল্লামা বালকীনি বলতেন: “আমি জমিন থেকে সোনা তোলার মতো যামাখশারীর কাশশাফ থেকে বালাগাতের মনি-মুক্তা উত্তোলন করেছি।”
  2. প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক প্রাঞ্জল উপস্থাপন: তিনি তাফসীরে «فَإِنْ قُلْتَ… قُلْتُ…» (যদি তুমি প্রশ্ন করো যে… তবে আমি উত্তরে বলব…)—এই আকর্ষণীয় যুক্তি ও বিতর্কশৈলী ব্যবহার করে আয়াতের জটিল বিষয়গুলোকে সহজবোধ্য করে তুলেছেন।
  3. কুরআনের অন্তর্নিহিত অলঙ্কার উন্মোচন: বাক্যস্থিত ইজায (সংক্ষেপণ), ইত্নাব (প্রসারণ), হাযফ (উহ্য রাখা), তাকদীম-তাখীর (আগে-পাছে আনা) ইত্যাদি অলঙ্কার যে কীভাবে আয়াতের অর্থকে মহিমান্বিত করেছে, তা তিনি সুনিপুণভাবে দেখিয়েছেন।
  4. জাহেলী কবিতা ও বিশুদ্ধ আরবির দৃষ্টান্ত: ব্যাকরণগত ও ভাষাতাত্ত্বিক জটিলতা নিরসনে তিনি প্রাচীন আরবের খাঁটি কবিতা ও প্রবাদ-প্রবচনকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
  5. ইসরাঈলিয়্যাতের আবিলতামুক্ততা: অন্যান্য প্রাচীন তাফসীরের তুলনায় তাফসীরে কাশশাফ ভিত্তিহীন ইসরাঈলী কল্পকাহিনী ও দুর্বল রেওয়ায়াত থেকে অনেকাংশেই মুক্ত।

সতর্কতা নোট: কাশশাফের এই আকাশচুম্বী সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব সত্ত্বেও পাঠকদের সতর্ক থাকতে হয়, কারণ যামাখশারী তাঁর মু’তাযিলী মতবাদকে (যেমন সিফাত অস্বীকার, রুইয়াতুল্লাহ অস্বীকার ইত্যাদি) অত্যন্ত সূক্ষ্ম বালাগাতী আবরণে কুরআনের আয়াতের মধ্যে জুড়ে দিয়েছেন। এজন্য আল্লামা ইবনুল মুনীর আল-ইস্কান্দারানী আল-ইনসাফ নামক গ্রন্থ লিখে কাশশাফের মু’তাযিলী বিভ্রান্তিগুলোর পর্দা উন্মোচন করেছেন।


مجموعة (ب) : গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)

[যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫ নম্বর।]

৯- (أ) اكتب نشأة التفسير المقارن وتطوره-

[তুলনামূলক তাফসীরের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ লেখ।]

উত্তর

১. প্রাথমিক পর্যায় (নবুওয়াত ও সাহাবা যুগ): তুলনামূলক তাফসীরের বীজ মূলত স্বয়ং নবুওয়্যাতের যুগেই প্রোথিত ছিল। সাহাবায়ে কেরাম যখন কোনো আয়াতের একাধিক ব্যাখ্যার মুখোমুখি হতেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তুলনামূলক সমাধান নিতেন। সাহাবা ও তাবেয়ীন যুগে মুফাসসিরদের ভিন্ন ভিন্ন মতের ওপর পর্যালোচনা শুরু হয়।

২. সংকলন যুগ (ইমাম তাবারীর অবদান): হিজরী তৃতীয় ও চতুর্থ শতকে তুলনামূলক তাফসীর এক সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। শায়খুল মুফাসসিরীন ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারীর আত-তাবারী (রহ.) (মৃ. ৩১০ হি.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ জামি’উল বায়ান-এ একটি আয়াতের ওপর পূর্ববর্তী সকল সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের মতামত পেশ করে তাদের দলিল যাচাই করেন এবং «وأولى الأقوال في ذلك بالصواب عندي…» (আমার নিকট এই মতটিই সর্বাধিক সঠিক…) বলে তারজীহ প্রদানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক তুলনামূলক তাফসীরের সূচনা করেন।

৩. বিকাশ ও মাযহাবী ধারার সমন্বয়: মধ্যযুগে ইমাম কুরতুবী (আহকামুল কুরআন), ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী (মাফাতিহুল গায়ব), কাযী বায়যাবী এবং ইমাম ইবনে কাসীর এই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) তাঁর মুক্বাদ্দিমাহ ফী উসূলিত তাফসীর গ্রন্থে তুলনামূলক তাফসীরের মূলনীতি ও তারজীহের নিয়মাবলি বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করেন।

৪. আধুনিক যুগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম: বিংশ শতাব্দীতে এসে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের খ্যাতনামা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলনামূলক তাফসীরকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান ও কোর্স হিসেবে রূপ দেওয়া হয়। ড. মুহাম্মদ আস-সায়্যিদ জিবরীল, ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম আশ-শারীফ প্রমুখ আধুনিক পণ্ডিতগণ তুলনামূলক তাফসীরের ওপর স্বতন্ত্র গবেষণা গ্রন্থ প্রণয়ন করে একে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন।


১০- (ب) ما الفرق بين التفسير الصوفي والفلسفي؟ بين-

[সুফি তাফসীর ও দার্শনিক তাফসীরের মধ্যে পার্থক্য কী? পরিষ্কার কর।]

উত্তর

সুফি তাফসীর এবং দার্শনিক তাফসীর—উভয়ই সাধারণ শাব্দিক ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে গিয়ে গভীরে প্রবেশের দাবিদার হলেও এদের উৎস, পদ্ধতি ও লক্ষ্যে মৌলিক বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান। নিচে এদের মূল পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

পার্থক্যসূচক বিষয় আত-তাফসীরুস সূফী (সুফি তাফসীর) আত-তাফসীরুল ফালসাফী (দার্শনিক তাফসীর)
১. মূল উৎস ও মাধ্যম আত্মশুদ্ধি, রিয়াযত, মোরাকাবা, কাশফ এবং অন্তর্দৃষ্টি (الذوق والكشف الوجداني)। গ্রিক দর্শন, মানবীয় যুক্তি, যুক্তিবিদ্যা এবং মনস্তাত্ত্বিক বিতর্ক (العقل والبرهان المنطقي)।
২. প্রধান লক্ষ্য আয়াতের বাহ্যিক রূপ বজায় রেখে তার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক রহস্য (ইশারা বা বাতিন) উন্মোচন করা এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন। কুরআনের আয়াতসমূহকে দার্শনিক তত্ত্ব ও মহাজাগতিক যুক্তির সাথে সমন্বয় করা বা দার্শনিক চিন্তা প্রমাণ করা।
৩. প্রকৃতির প্রকারভেদ দুই প্রকার: (১) মাকবুল বা প্রশংসনীয় ইশারী তাফসীর এবং (২) চরমপন্থী বা ভ্রান্ত বাতেনী তাফসীর (যা শরিয়তকে বাতিল করে)। দুই প্রকার: (১) ইসলামি দর্শনভিত্তিক (যেমন ইমাম রাযী) এবং (২) বিশুদ্ধ গ্রিকপন্থী দর্শনে নিমজ্জিত ব্যাখ্যা (যেমন ফারাবী, ইবনে সিনা)।
৪. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ইমাম তুসতারীর তাফসীরুত তুসতারী, ইসমাঈল হাক্কীর রূহুল বায়ান এবং আলূসীর রূহুল মা’আনী (ইশারী অংশ)। ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযীর মাফাতিহুল গায়ব এবং ইবনে সিনার রিসালাসমূহ।

১১- (ج) بين قصة قوم ثمود مختصرا-

[সংক্ষেপে সামূদ জাতির কাহিনী বর্ণনা কর।]

উত্তর

১. ভৌগোলিক পরিচয়: সামূদ ছিল প্রাচীন আরবের এক শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত পরাক্রমশালী জাতি। তারা হিজায ও শামের মধ্যবর্তী ‘আল-হিজর’ (বর্তমান মাদায়ে সাহেল) নামক পাথুরে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করত।

২. তাদের শিল্প ও প্রাচুর্য: আল্লাহ তাআলা তাদের অসাধারণ শারীরিক শক্তি এবং স্থাপত্যশিল্পের দক্ষতা দিয়েছিলেন। তারা সমতল ভূমিতে সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করত এবং পাহাড় খোদাই করে মজবুত ও বিলাসবহুল ঘরবাড়ি তৈরি করত। কিন্তু নিয়ামতের শুকরিয়া না করে তারা মূর্তিপূজা, শিরক ও জুলুমে লিপ্ত হয়।

৩. হযরত সালেহ (আ.)-এর আগমন ও অলৌকিক উটনী: আল্লাহ তাদের হেদায়াতের জন্য তাদের মধ্য থেকেই হযরত সালেহ (আ.)-কে নবী বানিয়ে পাঠান। তিনি তাদের একত্ববাদের দাওয়াত দেন। সামূদের প্রধানরা অহংকারবশত বলল, “যদি তুমি সত্য নবী হও, তবে এই কঠিন পাথর থেকে একটি গর্ভবতী ও দশ মাসের গর্ভধারিণী তাজা উটনী বের করে দেখাও।” হযরত সালেহ (আ.) আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন এবং চোখের পলকে বিশাল পাথর ফেটে এক অপূর্ব দশ মাসের গর্ভবতী উটনী বের হয়ে এল।

৪. পরীক্ষা ও উটনী হত্যা: সালেহ (আ.) তাদের সতর্ক করে বললেন: ﴿هَذِهِ نَاقَةُ اللّٰهِ لَكُمْ آيَةً﴾ (এটি আল্লাহর নিদর্শন উটনী)। শর্ত ছিল একদিন এই উটনী কূপের সমস্ত পানি পান করবে এবং অপরদিন তারা পানি পান করবে এবং উটনী তাদের প্রচুর দুধ দেবে। কিন্তু কুদার ইবনে সালিফ নামক এক পাপিষ্ঠের নেতৃত্বে নয়জন দুষ্কৃতকারী ষড়যন্ত্র করে উটনীর পা কেটে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করে।

৫. ভয়াবহ ঐশী গজব: হযরত সালেহ (আ.) তাদের জানিয়ে দিলেন, “তোমরা নিজেদের ঘরে আর মাত্র তিন দিন জীবন উপভোগ করে নাও, অতঃপর আল্লাহর আজাব অবধারিত।” চতুর্থ দিন ভোরে এক বিকট ও কানফাটানো বজ্রনিনাদ (الصيحة) এবং তীব্র ভূমিকম্পে সমগ্র সামূদ জাতি তাদের নিজ নিজ গৃহে মুখ থুবড়ে পড়ে ধ্বংস হয়ে গেল। কেবল হযরত সালেহ (আ.) এবং তাঁর ঈমানদার অনুসারীরা আল্লাহর রহমতে রক্ষা পান।


১২- (د) اكتب فقرة على التوحيد على ضوء سورة الإخلاص-

[সূরা আল-ইখলাসের আলোকে তাওহীদের ওপর একটি অনুচ্ছেদ লেখ।]

উত্তর

ভূমিকা: পবিত্র কুরআনের ১১২তম সূরা আল-ইখলাস হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের চূড়ান্ত ও নিখুঁত সনদ। মাত্র চারটি ছোট্ট আয়াতের সমন্বয়ে গঠিত এই সূরাটি সমগ্র ইসলামি আকিদার মূল নির্যাসকে ধারণ করে আছে, যার কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.) একে ‘কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

সূরা ইখলাসের আলোকে তাওহীদের চার স্তম্ভ:

  1. তাওহীদুল যাত বা সত্তাগত একত্ব ﴿قُلْ هُوَ اللّٰهُ أَحَدٌ﴾: আল্লাহ এক ও একক। তাঁর সত্তায় কোনো অংশীদার নেই, তিনি অবিভাজ্য এবং উপাসনা পাওয়ার একমাত্র যোগ্য তিনি। এটি শিরক ও বহুঈশ্বরবাদের মূলোৎপাটন করে।
  2. তাওহীদুস সিফাত বা মুখাপেক্ষীহীনতা ﴿اللّٰهُ الصَّمَدُ﴾: ‘আস-সামাদ’ শব্দের অর্থ পরম স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা, যাঁর দিকে গোটা মহাবিশ্ব তার সমস্ত প্রয়োজনের জন্য মুখাপেক্ষী, অথচ তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি জন্ম-মৃত্যু, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও দুর্বলতার বহু ঊর্ধ্বে।
  3. বংশীয় পবিত্রতা ও সন্তানহীনতা ﴿لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ﴾: তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তিনিও কারো থেকে জন্ম নেননি। এটি খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (ঈসা আল্লাহর পুত্র), ইহুদিদের ভ্রষ্টতা (উযায়ের আল্লাহর পুত্র) এবং আরব মুশরিকদের ধারণা (ফেরেশতারা আল্লাহর কন্যা)—এই সমস্ত কুফরী আকিদাকে এক আঘাতে চূর্ণ করে দিয়েছে।
  4. তুলনাহীন শ্রেষ্ঠত্ব ﴿وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ﴾: গুণাবলিতে, ক্ষমতায় ও অধিকারে কোনো সৃষ্টিই আল্লাহর সমকক্ষ বা সমতুল্য হতে পারে না। তিনি অতুলনীয় ও অনুপম।

উপসংহার: সূরা ইখলাস মানুষকে শিরকের যাবতীয় অন্ধকার থেকে মুক্ত করে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর দাসত্বে আত্মনিবেদনের সার্বিক দর্শন শিক্ষা দেয়।


১৩- (هـ) قارن بين تفسير روح البيان لإسماعيل حقي وتفسير مفاتيح الغيب للرازي-

[ইসমাইল হাক্কীর ‘রূহুল বায়ান’ এবং ইমাম রাযীর ‘মাফাতিহুল গায়ব’-এর মধ্যে তুলনা কর।]

উত্তর

আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী আল-বুরুসভী (রহ.)-এর রূহুল বায়ান এবং ইমাম ফাখরুদ্দীন আর-রাযী (রহ.)-এর মাফাতিহুল গায়ব (তাফসীরে কাবীর)—উভয়ই ইসলামি সাহিত্যের দুটি কালজয়ী মহাকাব্যিক তাফসীর। তবে উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিম্নে এদের তুলনামূলক রূপরেখা তুলে ধরা হলো:

তুলনার মাপকাঠি তাফসীরু রূহিল বায়ান (ইসমাঈল হাক্কী) মাফাতিহুল গায়ব (ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী)
১. মূলধারা ও চরিত্র সুফি-ইশারী ও ওয়াজ-নসীহতপ্রধান তাফসীর। তিনি আত্মশুদ্ধি, তাসাউফ ও আত্মিক হেদায়াতকে কেন্দ্র করে তাফসীর করেছেন। কালামশাস্ত্রীয়, দার্শনিক ও যুক্তিবাদী তাফসীর। তিনি আকলী ও নাকলী প্রমাণের মাধ্যমে বিরোধীদের যুক্তি খণ্ডন করেছেন।
২. ফারসি ও সুফি কবিতার ব্যবহার তিনি প্রায়শই মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী, শেখ সাদী, হাফিজ শিরাজী প্রমুখের ফারসি মরমি কবিতা ও সুফি বাণী উদ্ধৃত করেছেন। তিনি কবিতা এড়িয়ে দার্শনিক তর্ক, হেকমত, যুক্তিবিদ্যার কায়দা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করেছেন।
৩. মহাজাগতিক ও বৈজ্ঞানিক দর্শন মহাজাগতিক বিষয়কে তিনি আল্লাহর মারিফাত ও প্রেম অর্জনের উপলক্ষ হিসেবে দেখেছেন। তিনি তৎকালীন জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, মানব শরীরতত্ত্ব এবং প্রকৃতির নিদর্শনের বিশদ বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছেন।
৪. সুরতহাল ও গঠন ওয়াজ মাহফিলের মতো হৃদয়গ্রাহী বয়ান, চমৎকার নীতিবাক্য এবং কাসাসুল আম্বিয়ার আধ্যাত্মিক মর্ম সংবলিত। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল জ্যামিতিক বিন্যাস—مسألة (সমস্যা), بحث (গবেষণা), প্রশ্ন ও উত্তরের একাডেমিক ক্লাসিফিকেশন।

১৪- (و) اكتب خصائص تفسير ‘فتح القدير’ للشوكاني-

[ইমাম আশ-শাওকানীর ‘ফাতহুল কাদীর’ তাফসীরের বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ।]

উত্তর

ইয়েমেনের মহান মুজতাহিদ ইমাম মুহাম্মদ বিন আলী আশ-শাওকানী (রহ.) (মৃ. ১২৫০ হি.) রচিত ফাতহুল কাদীর আল-জামি’ বাইনা ফান্নাইর রিওয়ায়াহ ওয়াদ দিরায়াহ তাফসীর জগতের এক অনন্য মাইলফলক। এই গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

  1. রিওয়ায়াত ও দিরায়াতের সুষম মেলবন্ধন: এটিই এই তাফসীরের সর্বপ্রধান স্বাতন্ত্র্য। তিনি প্রতিটি আয়াতের অধীনে প্রথমে ভাষাতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ (দিরায়াত) করেন এবং পরে সংশ্লিষ্ট সকল মারফু হাদিস ও আসার (রিওয়ায়াত) সনদসহ পেশ করেন।
  2. মাযহাবী অন্ধত্ব ও তাকলীদের ঊর্ধ্বে অবস্থান: ইমাম শাওকানী ছিলেন মুতলাক মুজতাহিদ। তিনি কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের (হানাফী, শাফেয়ী, যায়েদী ইত্যাদি) অন্ধ অনুকরণ না করে যে মতের পক্ষে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর অকাট্য দলিল পেয়েছেন, নির্দ্বিধায় তাকেই গ্রহণ করেছেন।
  3. ভাষাতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণিক গভীরতা: তিনি আরবি ভাষার প্রাচীন অভিধান, নাহব ও সরফের সূক্ষ্ম নিয়মাবলি এবং বিখ্যাত জাহেলী কবিদের শের উদ্ধৃত করে আয়াতের ব্যাকরণিক সমাধান দিয়েছেন।
  4. সনদ ও হাদিসের তাহকীক: তাফসীর বিল মা’ছূরের অনেক গ্রন্থে জাল ও দুর্বল রেওয়ায়াত থাকলেও শাওকানী অনেক ক্ষেত্রে হাদিসের মান (সহীহ, হাসান, যায়ীফ) যাচাই করে সতর্ক করেছেন।
  5. ইসরাঈলিয়্যাতের তীব্র সমালোচনা: তিনি ভিত্তিহীন কিচ্ছা-কাহিনী ও ইসরাঈলী বর্ণনার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন এবং তা বর্জনের তাগিদ দিয়েছেন।

১৫- (ز) اكتب حياة الإمام ابن جرير الطبري-

[ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারীর সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখ।]

উত্তর

  • নাম ও বংশপরিচয়: নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবু জাফর। পিতার নাম জারীর, দাদার নাম ইয়াযীদ। পূর্ণ নাম: আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারীর আত-তাবারী। তিনি ‘শায়খুল মুফাসসিরীন’ (মুফাসসিরদের মধ্যমণি) এবং ‘ইমামুল মুয়াররিখীন’ (ঐতিহাসিকদের সম্রাট) উপাধিতে ভূষিত।
  • জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন: তিনি হিজরী ২২৪ সনে (৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ) উত্তর ইরানের কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী তাবারিস্তান অঞ্চলের ‘আমুল’ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং ৮ বছর বয়সে নামাজে ইমামতি শুরু করেন।
  • জ্ঞানার্জনের পরিভ্রমণ: জ্ঞানের সন্ধানে তিনি তাবারিস্তান থেকে বের হয়ে তৎকালীন পৃথিবীর প্রধান প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র—বাগদাদ, বসরা, কুফা, মিসর, শাম ও বৈরুত সফর করেন। তিনি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর নিকট পড়ার জন্য বাগদাদ গিয়েছিলেন, কিন্তু বাগদাদে পৌঁছার পূর্বেই ইমাম আহমদ ইন্তেকাল করেন।
  • পাণ্ডিত্য ও মাযহাব: তিনি তাফসীর, হাদিস, ফিকহ, ইতিহাস, ভাষা ও কিরাতশাস্ত্রে চরম উৎকর্ষ অর্জন করেন। তিনি নিজেই একজন মুজতাহিদ ইমাম ছিলেন এবং তাঁর নিজস্ব ফিকহী মাযহাব ছিল, যা ‘মাযহাবে জারীরী’ নামে পরিচিত ছিল।
  • অমর গ্রন্থাবলি:
    1. জামি’উল বায়ান ‘আন তা’বীলি আয়িল কুরআন (যা সংক্ষেপে ‘তাফসীরে তাবারী’ নামে পরিচিত—তাফসীর সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষ)।
    2. তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলূক (যা ‘তারীখে তাবারী’ নামে পরিচিত—ইসলামি ইতিহাসের মূল উৎসগ্রন্থ)।
    3. তাহযীবুল আছার, কিতাবুল কিরাআত ও ইখতিলাফুল ফুকাহা।
  • ইন্তেকাল: হিজরী ৩১০ সনের ২৬ শাওয়াল রবিউল আউয়াল মাসে বাগদাদে এই জ্ঞানতপস্বী মহান ইমাম ৮৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

১৬- (ح) اذكر اسماء أربعة كتب للتفسير بالمأثور مع اسماء مؤلفيها-

[তাফসীর বিল মা’ছূরের চারটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম তাঁদের রচয়িতাসহ উল্লেখ কর।]

উত্তর

তাফসীর বিল মা’ছূর (التفسير بالمأثور) হলো কুরআনের আয়াতের তাফসীর কুরআন দ্বারা, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ হাদিস দ্বারা, সাহাবায়ে কেরামের মতামত এবং তাবেয়ীনদের নির্ভরযোগ্য বক্তব্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার প্রাচীনতম ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। এই ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ চারটি কিতাব ও তাদের রচয়িতাগণের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

  1. জামি’উল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন (جامع البيان في تأويل آي القرآن):
    রচয়িতা: ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ বিন জারীর আত-তাবারী (রহ.) (মৃ. ৩১০ হিজরী)। এটি তাফসীর বিল মা’ছূরের প্রাচীনতম, সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য এবং সর্বপ্রধান মৌলিক ভিত্তিগ্রন্থ।
  2. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (تفسير القرآن العظيم):
    রচয়িতা: হাফিজ আবুল ফিদা ইমাদুদ্দীন ইসমাইল ইবনে কাসীর আশ-শাফেয়ী (রহ.) (মৃ. ৭৭৪ হিজরী)। যা সংক্ষেপে বিশ্বজুড়ে ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’ নামে পরিচিত।
  3. মা’আলিমুত তানযীল (معالم التنزيل):
    রচয়িতা: ইমাম আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন বিন মাসউদ আল-ফাররা আল-বাগাভী (রহ.) (মৃ. ৫১৬ হিজরী)। যা সংক্ষেপে ‘তাফসীরে বাগাভী’ নামে প্রসিদ্ধ।
  4. আদ-দুররুল মানছূর ফীত তাফসীরি বিল মা’ছূর (الدر المنثور في التفسير بالمأثور):
    রচয়িতা: ইমাম জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান বিন আবি বকর আস-সুয়ূতী (রহ.) (মৃ. ৯১১ হিজরী)। সম্পূর্ণ সনদযুক্ত বিশুদ্ধ আসার ও হাদিসের এক সুবিশাল সংকলন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: তুলনামূলক তাফসীর (আত-তাফসীরুল মুকারিন) পাঠের মূল উদ্দেশ্য কী?

উত্তর: বিভিন্ন মুফাসসিরের ব্যাখ্যার তুলনামূলক পর্যালোচনা করে শক্তিশালী দলিল ও বিশুদ্ধ উসূলের আলোকে সত্য ও অগ্রগণ্য মতটিকে গ্রহণ করা এবং গবেষণামূলক অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করা।

প্রশ্ন ২: তাফসীরশাস্ত্রে ইমাম তাবারীর ‘জামি’উল বায়ান’-কে কেন উম্মুল কুতুব বলা হয়?

উত্তর: কারণ এটি তাফসীর বিল মা’ছূরের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সনদভিত্তিক বিশ্বকোষ, যেখানে সাহাবা ও তাবেয়ীদের প্রায় সকল নির্ভরযোগ্য মতামত সংকলন করে নিখুঁত তারজীহ প্রদান করা হয়েছে।

প্রশ্ন ৩: সুন্নি ও মু’তাযিলী তাফসীরের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকিদাগত দ্বন্দ্ব কোথায়?

উত্তর: আল্লাহর গুণাবলি (সিফাত) সাব্যস্তকরণ, আখিরাতে মুমিনদের জন্য আল্লাহর দর্শন (রুইয়াতুল্লাহ) এবং বান্দার কর্ম ও তাকদীরের স্বাধীনতায় আকল বনাম নকলের প্রাধান্যের ক্ষেত্রে।

প্রশ্ন ৪: আল্লামা যামাখশারীর তাফসীরে কাশশাফের সর্বশ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য কী?

উত্তর: পবিত্র কুরআনের অলঙ্কারশাস্ত্রীয় অনন্যতা (ইলমুল মা’আনী ও ইলমুল বায়ান) এবং আররি ভাষার অতুলনীয় সাহিত্যিক সৌন্দর্যের নিখুঁত বিশ্লেষণ।

প্রশ্ন ৫: সূরা আল-আসরে সফলতার যে চারটি শর্ত বলা হয়েছে সেগুলো কী কী?

উত্তর: ১. আল্লাহর প্রতি খাঁটি ঈমান, ২. নেক আমল বা সৎকর্ম সম্পাদন, ৩. পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দান এবং ৪. দ্বীনের পথে অটল থাকার জন্য ধৈর্যের উপদেশ দান।

প্রশ্ন ৬: তাফসীরে ফাতহুল কাদীরের মূল স্বাতন্ত্র্য কোন দিকটিতে?

উত্তর: কোনো একক মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ না করে বিশুদ্ধ হাদিস ও আসার (রিওয়ায়াত) এবং উচ্চাঙ্গের ব্যাকরণ ও যুক্তি (দিরায়াত)-এর এক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় সাধন করা।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜