জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তাফসীর আল-মুকারিন (At-Tafsirul Muqaran) – 201801, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৭৪ মিনিট পড়ার সময়
১৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২২
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাফসীর আল-মুকারিন (التفسير المقارن)
বিষয় কোড: 201801 | প্রশ্নপত্র কোড: 111
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা

ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০২২ সালের ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সর্বোচ্চ তাত্ত্বিক ও গবেষণাধর্মী কোর্স হলো “আত-তাফসীর আল-মুকারিন” (বিষয় কোড: 201801)। তুলনামূলক তাফসীরশাস্ত্র মূলত বিভিন্ন যুগ, মাযহাব ও ধারার শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরগণের দৃষ্টিভঙ্গি, দলিল-প্রমাণের শক্তি, ভাষা ও বালাগাতগত সূক্ষ্মতা এবং ইজতিহাদী পদ্ধতির তুলনামূলক পর্যালোচনার এক অনন্য বিজ্ঞান। ২০২২ সালের এই প্রশ্নপত্রটিতে সূরা আল-বুরুজ, সূরা আত-তারিক্ব, সূরা আত-তীন, সূরা আল-কদর ও সূরা আল-ইখলাসের আয়াতের তুলনামূলক তাফসীর বিশ্লেষণের পাশাপাশি তাফসীরুল মুকারিনের মূলনীতি, প্রাচীন ও আধুনিক তাফসীরের প্রভেদ এবং প্রখ্যাত মুফাসসিরগণের রচনাবলির ওপর গভীর প্রশ্ন সন্নিবেশিত হয়েছে। নিচে প্রশ্নপত্রের গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক) ও গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত)-এর অন্তর্ভুক্ত সকল ১৬টি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও অ্যাকাডেমিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো।

একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন

বিভাগ মোট প্রশ্ন উত্তর দিতে হবে প্রতি প্রশ্নের মান মোট নম্বর
مجموعة (الف) – গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক প্রশ্ন) ৮টি ৪টি ১৫ ৬০
مجموعة (ب) – গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন) ৮টি ৪টি ২০
সর্বমোট ১৬টি ৮টি ৮০

مجموعة (الف) : গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)

[যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫ নম্বর।]

١- هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْجُنُودِ * فِرْعَوْنَ وَثَمُودَ * بَلِ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي تَكْذِيبٍ * وَاللّٰهُ مِنْ وَرَائِهِمْ مُحِيطٌ

(الف) فسر الآيات المذكورة مقارنة بين تفسير جامع البيان للطبرى وتفسير المراغى لأحمد بن مصطفى المراغى-
(ب) بين قصة فرعون وجنوده-

(ক) ইমাম তাবারী ও আল্লামা মারায়ীর তাফসীরের তুলনামূলক পর্যালোচনা

উক্ত আয়াতগুলো পবিত্র কুরআনের ৮৫তম সূরা আল-বুরূজের ১৭ থেকে ২০ নম্বর আয়াত। এখানে আল্লাহ তাআলা অতীত অবাধ্য জাতিসমূহের ঐতিহাসিক পরিণতি এবং মক্কার কাফেরদের সত্য প্রত্যাখ্যানের অসারতা তুলে ধরেছেন। নিম্নে ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.)-এর জামি’উল বায়ান এবং আধুনিক যুগের প্রখ্যাত মুফাসসির শায়খ আহমাদ মুস্তফা আল-মারায়ীর তাফসীরুল মারায়ী-এর আলোকে আয়াতের তুলনামূলক তাফসীর পরিবেশন করা হলো:

পর্যালোচনার দিক জামি’উল বায়ান (ইমাম আত-তাবারী) তাফসীরুল মারায়ী (আহমাদ আল-মারায়ী)
১. মূল তাফসীর ধারা বিশুদ্ধ তাফসীর বিল মা’ছূর (التفسير بالمأثور)। সনদযুক্ত রেওয়ায়াত, সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তিভিত্তিক। আধুনিক যুগের যুক্তিবাদী, সামাজিক ও সংস্কারমূলক তাফসীর (التفسير العقلي والاجتماعي)।
২. ‘হাল আতাকা’ (هَلْ أَتَاكَ)-এর ব্যাখ্যা তাবারীর মতে, প্রশ্নবোধক হলেও এটি ‘তাহকীক’ ও ‘তাশভীক’ (দৃঢ়করণ ও উৎসাহিতকরণ) অর্থে ব্যবহৃত। অর্থাৎ “নিশ্চয় আপনার নিকট সেই সৈন্যবাহিনীর সংবাদ পৌঁছেছে।” মারায়ীর মতে, এটি বিশ্বনবী (সা.) এবং সমগ্র মানবসমাজকে ইতিহাসের অনিবার্য বিধান ও শিক্ষা গ্রহণের জন্য মনোযোগী করার এক মহাজাগতিক অলঙ্কারপূর্ণ সম্বোধন।
৩. ফেরাউন ও সামূদের উল্লেখের তাৎপর্য তাবারী বর্ণনা করেন, ফেরাউন ছিল বিশাল সৈন্য ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতীক এবং সামূদ ছিল অতিকায় শারীরিক শক্তির প্রতীক। উভয়ের ধ্বংসের ইতিহাস দ্বারা কুরাইশদের অহংকার চূর্ণ করা উদ্দেশ্য। মারায়ী দেখিয়েছেন, ফেরাউন জলমগ্ন হয়ে ধ্বংস হয় এবং সামূদ বিকট শব্দে ধ্বংস হয়—প্রকৃতির উভয় শক্তিকে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে নিয়োজিত করেছিলেন। আধুনিক শক্তির অহংকারও আল্লাহর কাছে তুচ্ছ।
৪. ‘বালিল্লাযীনা কাফারূ ফী তাকযীব’ তাবারী বলেন, ‘বাল’ (بَلْ) এখানে ‘ইদরাব’ (পূর্বের কথা থেকে সরে এসে নতুন বিষয় স্থাপন)। অতীতের ধ্বংসের ইতিহাস জানা সত্ত্বেও মক্কার কুরাইশরা সত্য প্রত্যাখ্যানের চরম হঠকারিতায় নিমজ্জিত। মারায়ী মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে বলেন, কাফেরদের বিরোধিতার কারণ প্রমাণের অভাব নয়, বরং অহংকার, জাতিগত বিদ্বেষ এবং অন্ধ গোঁড়ামি।
৫. ‘ওয়াল্লাহু মিন ওয়ারায়িহিম মুহীত’ তাবারী বলেন, আল্লাহ সর্বদিক দিয়ে তাদের পরিবেষ্টন করে আছেন; তাদের কোনো অপচেষ্টাই আল্লাহর এলেম ও কুদরত থেকে বের হতে পারে না। তিনি যেকোনো মুহূর্তে পাকড়াও করবেন। মারায়ী ব্যাখ্যা করেন, কাফেররা যতই পরাক্রমশালী হোক না কেন, তারা আল্লাহর সার্বিক নিয়ন্ত্রণাধীন জালে বন্দি। তাদের কোনো সৈন্যবাহিনী বা প্রযুক্তি আল্লাহর গজব থেকে নিস্তার দিতে পারে না।

(খ) ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনীর সংক্ষিপ্ত কাহিনী

ফেরাউন ছিল প্রাচীন মিসরের চরম অত্যাচারী শাসক, যে নিজেকে ‘সর্বোচ্চ প্রভু’ (﴿أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى﴾) দাবি করেছিল। সে বনি ইসরাঈলীদের ওপর নির্মম দাসত্ব চাপিয়ে দিয়েছিল এবং নবুওয়্যাতের আশঙ্কায় নবজাতক পুত্রসন্তানদের হত্যা করত। হযরত মূসা (আ.) যখন আল্লাহর স্পষ্ট নয়টি মু’জিযা নিয়ে তার দরবারে উপস্থিত হন, তখন সে অহংকারের বশে মূসা (আ.)-কে জাদুকর আখ্যা দেয়। পরবর্তীতে মূসা (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে বনি ইসরাঈলকে নিয়ে রাতে মিসর ত্যাগ করেন, তখন ফেরাউন তার বিশাল সুসজ্জিত সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করে। লোহিত সাগরের তীরে পৌঁছে মুমিনরা অসহায় বোধ করলে আল্লাহর কুদরতে সমুদ্র বিভক্ত হয়ে বারোটি শুকনা রাস্তা তৈরি হয়। মূসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নিরাপদে পার হয়ে যান। কিন্তু ফেরাউন ও তার দাম্ভিক বাহিনী সমুদ্রে প্রবেশ করলে প্রকাণ্ড জলরাশি পুনরায় একত্রিত হয়ে তাদের চোখের পলকে নিমজ্জিত করে। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে ফেরাউন ঈমান আনার ভান করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং আল্লাহ তার মরদেহকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করেন।


٢- وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ * وَمَا أَدْرَاكَ مَا الطَّارِقُ * النَّجْمُ الثَّاقِبُ * إِنْ كُلُّ نَفْسٍ لَمَّا عَلَيْهَا حَافِظٌ

(الف) فسر الايات الكريمة المذكورة مقارنة بين تفسير الدر المنثور للسيوطى والنكت والعيون للماوردى-
(ب) أوضح قوله تعالى: “ان كل نفس لما عليها حافظ”-

(ক) ইমাম সুয়ূতী ও ইমাম মাওয়ার্দীর তাফসীরের তুলনামূলক পর্যালোচনা

সূরা আত-তারিক্বের প্রথম চারটি আয়াতে মহান আল্লাহ আসমান এবং নিশাচর উজ্জ্বল নক্ষত্রের শপথ করে মানুষের আমল সংরক্ষক ফেরেশতাদের উপস্থিতির ঘোষণা দিয়েছেন। নিম্নে ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)-এর আদ-দুররুল মানছূর ফীত তাফসীর বিল মা’ছূর এবং ইমাম আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দী (রহ.)-এর আন-নুকাত ওয়াল উয়ূন-এর তুলনামূলক আলোচনা তুলে ধরা হলো:

তুলনার ভিত্তি আদ-দুররুল মানছূর (ইমাম আস-সুয়ূতী) আন-নুকাত ওয়াল উয়ূন (ইমাম আল-মাওয়ার্দী)
১. তাফসীর পদ্ধতি বিশুদ্ধ রেওয়ায়াত ও হাদিসভিত্তিক। সনদের ধারাবাহিকতায় সাহাবা ও তাবেয়ীদের বর্ণনার সংকলন। ভাষাগত বিশ্লেষণ, ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিভিন্ন মুফাসসিরের মতামতের সুবিন্যস্ত সারসংক্ষেপ (আকওয়াল)।
২. ‘আত-তারিক্ব’ (الطَّارِقُ)-এর ব্যাখ্যা সুয়ূতী হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) ও আলী (রা.) থেকে হাদিস উদ্ধৃত করেন যে, যা রাতে আগমন করে তাকেই ‘তারিক্ব’ বলে। নক্ষত্র রাতে উদিত হয় বিধায় তাকে তারিক্ব বলা হয়েছে। মাওয়ার্দী ভাষার দিক থেকে চারটি অর্থ উল্লেখ করেন: (ক) নিশাচর নক্ষত্র, (খ) প্রভাতী নক্ষত্র (শুক্র গ্রহ), (গ) সুরাইয়া (Pleiades), (ঘ) সপ্ত আসমান ভেদ করে নেমে আসা জ্যোতি।
৩. ‘আন-নাজমুছ ছাক্বিব’ (النَّجْمُ الثَّاقِبُ) সুয়ূতী মুজাহিদ ও কাতাদা থেকে বর্ণনা করেন, ‘ছাক্বিব’ অর্থ যা নিজের প্রখর আলো দিয়ে অন্ধকার ও শয়তানকে ভেদ করে ভস্ম করে দেয়। মাওয়ার্দী দুটি সুস্পষ্ট অভিমত আনেন: (ক) প্রদীপ্ত ও উজ্জ্বল নক্ষত্র যা অন্ধকার ভেদ করে, (খ) উল্কাপিণ্ড যা অবাধ্য শয়তানদের নিক্ষেপ করা হয়।
৪. ‘ইন্না কুল্লা নাফসিন লাম্মা আলাইহা হাফিজ’ সুয়ূতী ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ প্রতিটি মানুষের সাথে রক্ষক ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন, যিনি তাকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন এবং তার আমল লিপিবদ্ধ করেন। মাওয়ার্দী চারটি শক্তিশালী অভিমত পেশ করেন: (ক) আমল সংরক্ষক ফেরেশতা (কিরামান কাতিবীন), (খ) বিপদাপদ থেকে রক্ষাকারী ফেরেশতা, (গ) স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বান্দার আমলের প্রত্যক্ষদর্শী ও রক্ষক, (ঘ) মানুষের বিবেক ও রুহ।

(খ) “إِنْ كُلُّ نَفْسٍ لَمَّا عَلَيْهَا حَافِظٌ”-এর তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা

আরবি ব্যাকরণে ‘ইন’ (إِنْ) হলো না-বোধক (نافي) এবং ‘লাম্মা’ (لَمَّا) তাশদীদের সাথে ‘ইল্লা’ (إِلَّا) অর্থাৎ ব্যাতিক্রমবাচক অর্থে ব্যবহৃত। ফলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়: “এমন কোনো প্রাণী বা মানুষ নেই, যার ওপর একজন পাহারাদার ও সংরক্ষক নিযুক্ত নেই।”

মুফাসসিরগণের মতে এই সুরক্ষার দুটি প্রধান দিক রয়েছে:

  1. শারীরিক সুরক্ষা (الحفظ من المكاره): বান্দার সামনে, পেছনে ও চারপাশে সার্বক্ষণিক ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন, যাঁরা তাকে অনিষ্টকর জিন, শয়তান ও অপ্রত্যাশিত বিপদ থেকে রক্ষা করেন, যতক্ষণ না তাকদীরের চূড়ান্ত ফায়সালা উপস্থিত হয়। যেমন আল্লাহ বলেন: ﴿لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللّٰهِ﴾ (সূরা আর-রা’দ: ১১)।
  2. আমল সংরক্ষণ (حفظ الأعمال والأقوال): মানুষের প্রতিটি কথা, কর্ম, নিয়ত ও পদক্ষেপ রেকর্ড করার জন্য সম্মানিত লেখক ফেরেশতাদ্বয় (কিরামান কাতিবীন) নিয়োজিত রয়েছেন। কিয়ামতের ময়দানে এই সংরক্ষিত আমলনামার ভিত্তিতেই পরম ইনসাফের সাথে হিসাব গ্রহণ করা হবে।

٣- وَالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ * وَطُورِ سِينِينَ * وَهَذَا الْبَلَدِ الْأَمِينِ * لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ

(الف) فسر الايات المذكورة مقارنة بين تفسير روح البيان لإسماعيل حقى وتفسير مفاتيح الغيب للرازى-
(ব) ما المراد بقوله تعالى: ‘احسن تقويم’؟ بين موضحا-

(ক) ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী ও ইসমাইল হাক্কীর তাফসীরের তুলনামূলক পর্যালোচনা

সূরা আত-তীনের এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা চারটি পবিত্র বিষয়ের শপথ করে মানুষের সর্বোত্তম সৃষ্টিগত গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন। নিম্নে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.)-এর দর্শন ও কালামশাস্ত্রীয় শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ মাফাতিহুল গাইব (আত-তাফসীরুল কাবীর) এবং শায়খ ইসমাইল হাক্কী আল-বুরূসাবী (রহ.)-এর তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধিমূলক গ্রন্থ রূহুল বায়ান-এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

তুলনামূলক প্রেক্ষিত মাফাতিহুল গাইব (ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী) রূহুল বায়ান (ইসমাইল হাক্কী)
১. তাফসীর ধারা ও শৈলী যুক্তি, দর্শন, কালামশাস্ত্র ও ফিকহী গভীরতাভিত্তিক তাফসীর বির রায় আল-মাহমূদ। আদবী ও সুফিয়ানা ধারাভিত্তিক ইশারী ও আত্মিক তাফসীর (التفسير الإشاري الصوفي)।
২. চার শপথের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তাৎপর্য রাযী ভৌগোলিক ও নবুওয়্যাতের মিলনস্থল দেখিয়েছেন: ত্বীন ও যায়তুন হলো শাম বা ফিলিস্তিন (ঈসা আ.-এর কর্মক্ষেত্র); তূর সীনীন হলো মিসরের সিনাই প্রান্তর (মূসা আ.-এর বাক্যালাপের স্থান); এবং বলদুল আমীন হলো মক্কা মুকাররমা (মুহাম্মদ সা.-এর জন্ম ও অহী নাযিলভূমি)। ইসমাইল হাক্কী আত্মিক অর্থ বের করেন: ত্বীন হলো মানবদেহের মাটির উপাদান, যায়তুন হলো রুহ বা আত্মিক নূর, তূর সীনীন হলো কলব বা অন্তরের জ্যোতি, এবং মক্কা হলো সিরাজুম মুনীর মুহাম্মাদী হাকীকত।
৩. তীন ও যায়তুনের ঔষধি ও খাদ্যগুণ রাযী চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে তীনের সুস্বাদু পুষ্টি, হজমশক্তি বৃদ্ধি এবং যায়তুনের পবিত্র তেল, বাতি জ্বালানো ও রোগমুক্তির বৈজ্ঞানিক ফায়দা বিস্তৃতভাবে প্রমাণ করেছেন। হাক্কী পার্থিব উপকারের সাথে সাথে যায়তুনকে সূরা নূরের ﴿زَيْتُونَةٍ لَا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ﴾-এর সাথে মিলিয়ে অন্তরের তাওহীদী আলোর উপমা দিয়েছেন।
৪. ‘আহসানি তাক্ববীম’-এর ব্যাখ্যা রাযী বলেন, মানুষের সোজা দাঁড়ানো, হাত দিয়ে খাওয়া, বিবেক-বুদ্ধির পূর্ণতা এবং সমগ্র সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্বই হলো আহসানি তাক্ববীম। হাক্কী বলেন, মানুষ হলো সমগ্র সৃষ্টিজগতের সারাংশ (যুলদে আলম)। আল্লাহ মানুষকে নিজ খলিফা হওয়ার মতো রূহানী ও আসমানি যোগ্যতা দিয়ে সর্বোত্তম সুরতে সৃষ্টি করেছেন।

(খ) “أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ” (আহসানি তাক্ববীম)-এর সুস্পষ্ট মর্মার্থ

‘তাক্ববীম’ (تقويم) শব্দের অর্থ কোনো বস্তুকে সঠিক অবয়ব দেওয়া, ত্রুটিহীন সোজা করা এবং ভারসাম্যপূর্ণরূপে গঠন করা। আর ‘আহসানি তাক্ববীম’ অর্থ সর্বোত্তম ও নিখুঁত গঠনাকৃতি। মুফাসসিরগণের মতে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিম্নরূপ:

  1. শারীরিক সৌন্দর্য ও অঙ্গসৌষ্ঠব: অন্যান্য জীবজন্তু নতশিরে চার পায়ে চলে এবং মুখ দিয়ে আহার করে। কিন্তু মানুষকে আল্লাহ সুউচ্চ, সোজা ও মার্জিত অবয়ব দান করেছেন এবং হাত দিয়ে আহার করার সম্মান দিয়েছেন।
  2. বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞানের ভূষণ: মানুষকে আল্লাহ চিন্তা করার ক্ষমতা, কল্যাণ-অকল্যাণ বাছাইয়ের বিবেচনা এবং উদ্ভাবনী বুদ্ধিমত্তা দিয়েছেন, যা কোনো প্রাণীকে দেননি।
  3. নৈতিক ও আধ্যাত্মিক যোগ্যতা: মানুষই একমাত্র সৃষ্টি, যে আল্লাহর মারিফত ও ভালোবাসা অর্জন করে ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত হতে পারে।

٤- إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ * وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ * لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ

(الف) فسر الايات المذكورة مقارنة بين تفسير فتح القدير للشوكانى وهميان الزاد للاباضية-
(ب) ما أقوال العلماء فى تعيين ليلة القدر؟

(ক) ইমাম শাওকানী ও ইবাদী তাফসীর ‘হাময়ানুয যাদ’-এর তুলনামূলক পর্যালোচনা

পবিত্র কুরআনের ৯৭তম সূরা আল-কদরের প্রথম তিনটি আয়াতে আল-কুরআন অবতীর্ণের মহিমান্বিত রজনী ‘লাইলাতুল কদর’-এর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা হয়েছে। নিম্নে আল্লামা মুহাম্মদ বিন আলী আশ-শাওকানী (রহ.)-এর ফাতহুল কাদীর এবং ইবাদী আলেম মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আতফায়িশ (রহ.)-এর হাময়ানুয যাদ ইলা দারিল মা’আদ-এর তুলনামূলক পর্যালোচনা উপস্থাপিত হলো:

আলোচনার দিক ফাতহুল কাদীর (ইমাম আশ-শাওকানী) হাময়ানুয যাদ (আতফায়িশ – ইবাদী মাযহাব)
১. তাফসীর পদ্ধতি তাফসীর বিল মা’ছূর ও তাফসীর বির রায়-এর অপূর্ব সমন্বয়। সহীহ সনদের হাদিস এবং শক্তিশালী ভাষাতত্ত্বের নির্ভরতা। ইবাদী আকিদা ও ফিকহের প্রতিফলন, ভাষাগত আলোচনা এবং যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা।
২. কুরআন নাযিলের স্বরূপ শাওকানী ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বিশুদ্ধ রেওয়ায়াত উল্লেখ করেন যে, লওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানের ‘বাইতুল ইযযাহ’-তে পূর্ণ কুরআন কদরের রাতে একবারে নাযিল হয়; অতঃপর ২৩ বছরে ধাপে ধাপে জিবরাঈল (আ.) তা নিয়ে আসেন। আতফায়িশও পূর্ণ কুরআন লাওহে মাহফুজ থেকে নাযিল হওয়ার কথা বলেন, তবে তিনি জোর দেন যে কদরের রাতে মূলত নবীজি (সা.)-এর ওপর প্রথম অহী অবতীর্ণের সূচনা হয়েছিল।
৩. ‘কদর’ শব্দের অর্থ শাওকানী দুটি অর্থ উল্লেখ করেন: (ক) মর্যাদা ও সম্মান (الشرف والعظمة), (খ) ভাগ্য ও তাকদীর নির্ধারণ (التقدير والقضاء)। আতফায়িশ মর্যাদার অর্থের পাশাপাশি তাকদীর ও বিশ্বব্যবস্থার বার্ষিক দায়িত্ব ফেরেশতাদের হস্তান্তরের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন।
৪. ‘লাইলাতুল কদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর’ শাওকানী বিভিন্ন হাদিস এনে প্রমাণ করেন যে, এই রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরবিহীন এক হাজার মাস (৮৩ বছর ৪ মাস)-এর নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। আতফায়িশও হাজার মাসের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেন, তবে তিনি নৈতিক আত্মশুদ্ধি এবং ইবাদতের আন্তরিকতার শর্তে এই পুণ্য লাভের কথা বলেন।

(খ) শবে কদর নির্ধারণে উলামায়ে কেরামের মতভেদ

লাইলাতুল কদর বছরের কোন রাতে সংঘটিত হয়—এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে চল্লিশটিরও অধিক মতভেদ রয়েছে। তবে প্রধান বিশুদ্ধ মতগুলো নিম্নরূপ:

  1. রমযান মাসের শেষ দশকে: জমহুর উলামায়ে কেরাম ও সহীহ হাদিস অনুযায়ী লাইলাতুল কদর রমযানের শেষ দশকে নিহিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: «تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ» (সহীহ বুখারী)।
  2. শেষ দশকের বিজোড় রাতসমূহে: বিশেষ করে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন: “তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত অনুসন্ধান করো” (বুখারী)।
  3. রমযানের ২৭তম রজনী: হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.), হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এবং ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর অন্যতম বর্ণনা অনুযায়ী রমযানের ২৭তম রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক। উবাই ইবনে কা’ব শপথ করে বলতেন যে এটি ২৭তম রাত।
  4. পুরো রমযানে আবর্তিত হওয়া: কোনো কোনো আলেমের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট তারিখে স্থির নয়; বরং প্রতি বছর শেষ দশকের যেকোনো এক রাতে স্থানান্তরিত হয়। আল্লাহ তাআলা এই রাতকে গোপন রেখেছেন যাতে বান্দা শেষ দশকের প্রতিটি রাতে আন্তরিকভাবে ইবাদতে নিমগ্ন থাকে।

٥- قُلْ هُوَ اللّٰهُ أَحَدٌ * اللّٰهُ الصَّمَدُ * لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ * وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ

(الف) فسر الايات المذكورة مقارنة بين تفسير التاويلات النجمية فى التفسير الإشارى لنجم الدين احمد بن عمر الكبرى وتيسير الكريم الرحمن لعبد الرحمن السعدى-
(ب) بين أهمية سورة الإخلاص وفضلها مفصلا-

(ক) ‘আত-তাভীলাতুন নাজমিয়্যাহ’ ও ‘তাফসীরুস সাদী’-এর তুলনামূলক পর্যালোচনা

সূরা আল-ইখলাস হলো ইসলামের তাওহীদের মূল স্তম্ভ ও নির্যাস। নিম্নে সুফি সাধক শায়খ নাজমুদ্দীন কুবরা (রহ.)-এর ইশারী তাফসীর আত-তাভীলাতুন নাজমিয়্যাহ এবং সালাফী আলেম শায়খ আব্দুর রহমান আস-সাদী (রহ.)-এর তৈসীরুল কারীমির রহমান-এর তুলনামূলক পাঠ উপস্থাপন করা হলো:

পর্যালোচনার ভিত্তি আত-তাভীলাতুন নাজমিয়্যাহ (নাজমুদ্দীন কুবরা) তৈসীরুল কারীমির রহমান (শায়খ আস-সাদী)
১. তাফসীর ধারা গভীর তাসাউফ ও আত্মিক ইশারী তাফসীর (التفسير الإشاري)। সহজ-সরল, স্পষ্ট আহলুস সুন্নাহর সালাফী আকিদানির্ভর মানহাজ।
২. ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’-এর ব্যাখ্যা তিনি ‘হুয়া’ (هُوَ)-কে সত্তাগত গায়িবী পরিচয় এবং ‘আহাদ’ (أَحَد)-কে কাসরত (বহুত্ব)-এর বিনাশকারী পরম একত্ব বা ফানা ফিল্লাহর সর্বোচ্চ মাকাম হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। সাদী বলেন, আল্লাহ তাঁর নাম, সিফাত ও কর্মে এক ও একক। তাঁর কোনো অংশীদার, সমকক্ষ বা সদৃশ নেই।
৩. ‘আল্লাহুস সামাদ’ (اللّٰهُ الصَّمَدُ) নাজমুদ্দীন কুবরা সামাদিয়্যাতকে এমন এক মহাসমুদ্র বলেন যার কোনো গভীরতা বা কূল নেই; সমস্ত সৃষ্টি যেখানে নিঃস্ব ও বিলীন হয়ে মুখাপেক্ষী থাকে। সাদী বলেন, সামাদ হলেন সেই মহান প্রভু, যাঁর দিকে সমস্ত সৃষ্টি নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য মুখাপেক্ষী হয় এবং যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।
৪. ‘লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ’ তিনি আত্মিক নূরের চিরন্তনতা দেখান যে আল্লাহ কোনো কারণ থেকে উদ্ভূত নন এবং কোনো কার্যও তাঁর থেকে জন্ম নেয় না। সাদী স্পষ্ট কালামী ও আকিদাগত যুক্তি দেন যে খ্রিষ্টানদের ত্রিত্ববাদ ও মুশরিকদের ফেরেশতাদের আল্লাহর কন্যা বলার কুফরী মতবাদ এর মাধ্যমে চিরতরে অপসারিত হয়েছে।

(খ) সূরা আল-ইখলাসের গুরুত্ব ও সুমহান মর্যাদা

সূরা আল-ইখলাসকে পবিত্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ (ثلث القرآن) ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফজিলতসমূহ নিম্নরূপ:

  1. কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য: সহীহ বুখারীতে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهَا لَتَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ»—”সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয় এই সূরা কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য।” কারণ কুরআনের বিষয়বস্তু মূলত তিনটি: তাওহীদ, আহকাম ও কাসাস (ইতিহাস)। আর সূরা ইখলাস সম্পূর্ণ তাওহীদের বর্ণনায় নিবেদিত।
  2. আল্লাহর ভালোবাসার মাধ্যম: এক সাহাবী প্রতি রাকাতে এই সূরা তিলাওয়াত করতেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, “এতে পরম দয়াময় আল্লাহর সিফাত রয়েছে, তাই আমি এ সূরা ভালোবাসতে পছন্দ করি।” নবীজি (সা.) বললেন: “তাঁকে জানিয়ে দাও যে আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন” (সহীহ বুখারী)।
  3. জান্নাত প্রাপ্তির সুসংবাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতিদিন দশবার সূরা ইখলাস পাঠ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন” (মুসনাদে আহমাদ)।

٦- ما التفسير المقارن؟ اكتب أهميته وغايته وفوائده بالتفصيل-

[তুলনামূলক তাফসীর কাকে বলে? এর গুরুত্ব, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও উপকারিতা বিস্তারিতভাবে লেখ।]

ভূমিকা

উলূমুল কুরআনের শাখাগুলোর মধ্যে ‘আত-তাফসীরুল মুকারিন’ (التفسير المقارن) বা তুলনামূলক তাফসীরশাস্ত্র আধুনিক উচ্চতর ইসলামিক গবেষণার অন্যতম শীর্ষ মাধ্যম। বিভিন্ন তাফসীরগ্রন্থের মাঝে মিল-অমিল, দলিলের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মতভেদের কারণ উদঘাটনে এ শাস্ত্রের কোনো বিকল্প নেই।

তুলনামূলক তাফসীর (التفسير المقارن)-এর সংজ্ঞা

১. আভিধানিক অর্থ: ‘মুকারিন’ শব্দটি ‘মুকারানাহ’ (المقارنة) মূল থেকে নির্গত, যার অর্থ পাশাপাশি রাখা, তুলনা করা, সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নিরূপণ করা।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: উলূমুল কুরআনের গবেষকদের মতে—
«هُوَ عِلْمٌ يَبْحَثُ فِي جَمْعِ أَقْوَالِ الْمُفَسِّرِينَ فِي تَفْسِيرِ الْآيَاتِ الْقُرْآنِيَّةِ، وَالْمُقَارَنَةِ بَيْنَهَا، وَمُوَازَنَةِ أَدِلَّتِهِمْ، لِلتَّرْجِيحِ بَيْنَهَا بِقَوَاعِدِ التَّرْجِيحِ الْمُعْتَمَدَةِ»
অর্থ: “তুলনামূলক তাফসীর হলো এমন এক শাস্ত্র, যাতে কুরআনের কোনো নির্দিষ্ট আয়াতের ওপর বিভিন্ন মুফাসসিরের ব্যাখ্যা-মতামত একত্রিত করে তাদের মধ্যে তুলনা করা হয় এবং নির্ভরযোগ্য তারজীহ (অগ্রাধিকার)-এর মূলনীতির ভিত্তিতে সবচেয়ে শক্তিশালী মতটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।”

তুলনামূলক তাফসীরের গুরুত্ব

  1. মতভেদের কারণ উদ্ঘাটন: একই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ কেন ভিন্ন ভিন্ন মতে পৌঁছালেন (যেমন: ব্যাকরণগত ভিন্নতা, শানে নুযুল, বালাগাত বা ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি)—তা উদঘাটন করা যায়।
  2. গোঁড়ামি ও অন্ধ তাকলীদ দূরীকরণ: কোনো বিশেষ মাযহাব বা ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণের মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে দলিলের বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা তৈরি হয়।
  3. কুরআনী বাণীর বহুমাত্রিক অর্থ উপলব্ধি: আল-কুরআনের অলৌকিক অর্থপ্রাচুর্য ও গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব হয়।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (الغايات والأهداف)

  • আল-কুরআনের আয়াতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রামাণ্য ও বিশুদ্ধ ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার (ترجيح الراجح) দেওয়া।
  • দুর্বল, বাতিল ও ইসরাঈলী বর্ণনার প্রভাব চিহ্নিত করে কুরআন তাফসীরকে নিষ্কলুষ রাখা।
  • মুফাসসিরগণের অনুসৃত নীতি ও মেধার মূল্যায়ন করা।

উপকারিতা ও সুফল (الفوائد)

  • গবেষক ও শিক্ষার্থীদের ইজতিহাদী যোগ্যতা এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
  • বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়।
  • আধুনিক যুগের নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে সমকালীন সমস্যার সমাধানে কুরআনের গভীরতম পথনির্দেশ বের করা সহজ হয়।

٧- عرف التفسير القديم والتفسير المعاصر- ثم بين أهم المميزات لكل من هذين النوعين من التفاسير-

[প্রাচীন তাফসীর ও সমকালীন তাফসীরের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর এ দুই প্রকার তাফসীরের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।]

১. প্রাচীন তাফসীর (التفسير القديم)-এর পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

সংজ্ঞা: হিজরী প্রথম শতাব্দী থেকে শুরু করে অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায় (চতুর্দশ হিজরী শতাব্দীর সূচনা) পর্যন্ত সময়ে রচিত তাফসীরগ্রন্থগুলোকে প্রাচীন তাফসীর বলা হয়। যেমন: তাবারী, কুরতুবী, ইবনে কাছীর, যামাখশারী, রাযী প্রমুখের তাফসীর।

প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. রেওয়ায়াত ও সনদের প্রাধান্য: সাহাবী ও তাবেয়ীগণের উক্তি এবং হাদিসের সনদ যাচাইয়ের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ।
  2. আরবি ব্যাকরণ ও ভাষাভিত্তিক গভীর আলোচনা: নাহু, সারফ, ইর্যাব ও প্রাচীন আরবি জাহিলী কবিতার শ্লোক দিয়ে শব্দার্থ বিশ্লেষণ।
  3. ফিকহী ও কালামী বিতর্ক: মাযহাবী ইখতিলাফ এবং মু’তাযিলা, জাবারিয়া, কাদারিয়াদের মতো ভ্রান্ত ফেরকার মতবাদ খণ্ডনে বিশাল অধ্যায় নিবেদন।
  4. ইসরাঈলিয়্যাতের অনুপ্রবেশ: ঐতিহাসিক তথ্যের প্রয়োজনে কোথাও কোথাও অনালোচিতভাবে কিছু অনির্ভরযোগ্য ইসরাঈলী বর্ণনা স্থান পাওয়া।

২. সমকালীন তাফসীর (التفسير المعاصر)-এর পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

সংজ্ঞা: চতুর্দশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে বর্তমান একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে রচিত তাফসীরকে সমকালীন তাফসীর বলে। যেমন: তাফসীরুল মারায়ী, ফী যিলালিল কুরআন, তাফহীমুল কুরআন, তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন, আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর ইত্যাদি।

প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  1. আদবী, সামাজিক ও হিদায়াতি ধারা (الاتجاه الأدبي الاجتماعي): ব্যাকরণগত জটিলতা এড়িয়ে কুরআনকে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জীবন্ত সংবিধান হিসেবে তুলে ধরা।
  2. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমন্বয় (التفسير العلمي): চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব ও প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কারের আলোকে কুরআনের অলৌকিকত্ব প্রমাণ।
  3. ইসরাঈলিয়্যাত বর্জন: প্রাচীন কালের অনির্ভরযোগ্য কল্পকাহিনী ও রূপকথা কঠোরভাবে বর্জন।
  4. পাশ্চাত্য মতবাদ ও সংশয়বাদের খণ্ডন: বস্তুবাদ, নাস্তিক্যবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, পুঁজিবাদ ও প্রাচ্যবিদদের অভিযোগের শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব দান।
  5. সহজ ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা: জটিল পারিভাষিক শব্দের বদলে সমকালীন পাঠকের উপযোগী আকর্ষণীয় ভাষা ব্যবহার।

٨- اكتب ترجمة الامام القاضى ناصر الدين البيضاوى مع ذكر خصائص تفسيره-

[ইমাম কাজী নাসিরুদ্দীন আল-বাইযাবী (রহ.)-এর জীবনী এবং তাঁর তাফসীরের বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।]

ভূমিকা

হিজরী সপ্তম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, প্রখ্যাত ফকীহ ও দার্শনিক ইমাম কাজী নাসিরুদ্দীন আল-বাইযাবী (রহ.) সংকলিত তাফসীরগ্রন্থ আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল (যা ‘তাফসীরে বাইযাবী’ নামে বিশ্বখ্যাত) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের প্রায় সকল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকাভুক্ত হয়ে আসছে।

ইমাম বাইযাবী (রহ.)-এর পুণ্যময় জীবনী

  • নাম ও উপাধি: তাঁর নাম আব্দুল্লাহ বিন উমর বিন মুহাম্মদ বিন আলী। উপাধি ‘নাসিরুদ্দীন’ এবং বংশীয় পরিচিতি ‘আল-বাইযাবী’।
  • জন্ম ও জন্মস্থান: তিনি ইরানের ফারস প্রদেশের শিরাজের নিকটবর্তী ‘বাইযা’ নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
  • শিক্ষা ও মর্যাদা: তিনি তাঁর পিতা কাজী উমর এবং সমকালের শ্রেষ্ঠ ওলামাদের নিকট তাফসীর, হাদিস, উসূলে ফিকহ, মানতিক ও কালামশাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি শিরাজের প্রধান কাজী (বিচারক) হিসেবে দীর্ঘদিন সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
  • ওফাত: তিনি হিজরী ৬৮৫ মতান্তরে ৬৯১ হিজরীতে তাবরীযে ইন্তেকাল করেন।
  • বিখ্যাত গ্রন্থাবলি: আনওয়ারুত তানযীল (তাফসীর), মিনহাজুল উসূল (উসূলে ফিকহ), তাওয়ালিউল আনওয়ার (কালামশাস্ত্র), আল-গায়াতুল কাসওয়া (শাফিয়ী ফিকহ)।

‘তাফসীরে বাইযাবী’-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

  1. চরম সংক্ষেপণ ও প্রাঞ্জলতা (الإيجاز البليغ): তিনি অল্প কথায় সাগরের মতো গভীর অর্থ প্রকাশ করার দুর্লভ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।
  2. যামাখশারীর কাশশাফের সারসংক্ষেপ ও সংশোধন: তিনি আল্লামা যামাখশারীর তাফসীরে কাশশাফের বালাগাত ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় সূক্ষ্মতা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাঁর মু’তাযিলী ভ্রান্ত আকিদা সম্পূর্ণ বর্জন করে বিশুদ্ধ আহলুস সুন্নাতের আকিদায় তা রূপান্তর করেছেন।
  3. ইমাম রাযীর তাফসীরের সারনির্যাস: ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর মাফাতিহুল গাইবের সূক্ষ্ম দার্শনিক ও বিবেকগ্রাহ্য যুক্তিগুলোকে সংক্ষিপ্ত আকারে সন্নিবেশিত করেছেন।
  4. ক্বিরাআত ও নাহুর আলোচনা: সাব’আ ও আশারাহ ক্বিরাআতের পার্থক্য এবং সূক্ষ্ম আরবি ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ সংযোজন করেছেন।
  5. সুরক্ষিত ও ভারসাম্যপূর্ণ আহলুস সুন্নাহর মানহাজ: কালামশাস্ত্রের জটিল মাসআলায় তিনি সর্বদাই আশ’আরী মতবাদকে অগ্রাধিকার দিয়ে দলিলের সাথে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।

مجموعة (ب) : গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)

[যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫ নম্বর।]

৯- (الف) اكتب وجوه المقارنة بين أقوال المفسرين-

[মুফাসসিরগণের মতামতের মধ্যকার তুলনামূলক পর্যালোচনার ক্ষেত্রসমূহ লেখ।]

উত্তর

তুলনামূলক তাফসীরে মুফাসসিরগণের মতামতের পর্যালোচনা মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়:

  1. সনদ ও বর্ণনার বিশুদ্ধতা (الرواية والأثر): মতামতটি সহীহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য সাহাবী-তাবেয়ীগণের সনদের অনুকূলে কি না তা যাচাই করা।
  2. আরবি ভাষা ও অলঙ্কারশাস্ত্র (اللغة والبلاغة): আয়াতের শব্দের আভিধানিক অর্থ, ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (إعراب) এবং বালাগাত বা অলঙ্কারশাস্ত্রীয় সৌন্দর্যের নিরিখে তুলনা।
  3. কুরআনের সাধারণ নিয়ম ও سیاق (প্রেক্ষাপট): আয়াতের পূর্বাপর যোগসূত্র (Context) এবং কুরআনের অন্যান্য আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যতা নিরূপণ।
  4. শানে নুযূল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (سبب النزول): যে ঘটনার প্রেক্ষাপটে আয়াত নাযিল হয়েছিল, তার সাথে মতামতের যৌক্তিক মিল যাচাই করা।
  5. শরীয়তের সামগ্রিক মাকাসিদ ও ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলামী শরীয়তের মৌলিক লক্ষ্য (مقاصد الشريعة)-এর সাথে মতামতের যথার্থতা বিশ্লেষণ।

১০- (ب) ما الفرق بين التفسير بالمأثور والتفسير بالرأي؟

[তাফসীর বিল মা’ছূর ও তাফসীর বির রায়-এর মধ্যকার পার্থক্য কী?]

উত্তর

পার্থক্যের ক্ষেত্র তাফসীর বিল মা’ছূর (التفسير بالمأثور) তাফসীর বির রায় (التفسير بالرأي)
১. সংজ্ঞাগত ভিত্তি কুরআন, সহীহ হাদিস, সাহাবা ও তাবেয়ীগণের নির্ভরযোগ্য বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত তাফসীর। ভাষাতত্ত্ব, বিবেক, যুক্তি এবং শরীয়তের মূলনীতির নিরিখে কৃত ইজতিহাদী তাফসীর।
২. মূল নির্ভরতা সনদ, রেওয়ায়াত ও নকল (نقل)-এর ওপর নির্ভরশীল। যুক্তি, প্রজ্ঞা ও আকল (عقل)-এর ওপর নির্ভরশীল।
৩. গ্রহণযোগ্যতার শর্ত সনদ সহীহ ও বিশুদ্ধ হওয়া অপরিহার্য; জাল বর্ণনা বর্জনীয়। কুরআন-সুন্নাহ ও আরবি ভাষার ব্যাকরণবিরোধী না হওয়া এবং মনগড়া না হওয়া শর্ত।
৪. প্রধান উদাহরণ তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে ইবনে কাছীর, আদ-দুররুল মানছূর। তাফসীরে রাযী, তাফসীরে বাইযাবী, রুহুল মা’আনী।

১১- (ج) اكتب قصة قوم ثمود مختصرا-

[সামূদ জাতির কাহিনী সংক্ষেপে লেখ।]

উত্তর

সামূদ জাতি ছিল প্রাচীন আরবের এক প্রতাপশালী ও সমৃদ্ধ জাতি, যারা হিজর নামক উপত্যকায় বসবাস করত। আল্লাহ তাদের পাহাড় কেটে সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণের অসাধারণ কারিগরি দক্ষতা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা নিআমতের শুকরিয়া না করে মূর্তিপূজা ও অহংকারে লিপ্ত হয়। আল্লাহ তাদের হেদায়েতের জন্য হযরত সালেহ (আলাইহিস সালাম)-কে নবি হিসেবে প্রেরণ করেন। তারা সালেহ (আ.)-এর কাছে দাবি করে যে পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী বিশেষ উটনী বের করে দেখালে তারা ঈমান আনবে। আল্লাহর কুদরতে অলৌকিক উটনী প্রকাশিত হয় এবং সালেহ (আ.) সতর্ক করেন যেন এর কোনো ক্ষতি না করা হয়। কিন্তু কওমের পাপিষ্ঠ নেতা কুদার বিন সালিফের নেতৃত্বে তারা উটনীটিকে হত্যা (নহর) করে ফেলে। ফলে নির্ধারিত তিন দিন পর এক বিকট প্রকম্পিত আসমানি গর্জন ও ভূমিকম্পে সমগ্র সামূদ জাতি নিজেদের গৃহের অভ্যন্তরে মুখ থুবড়ে চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।


১২- (د) ما اللوح المحفوظ؟ بين-

[লওহে মাহফুজ কী? ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর

‘লওহে মাহফুজ’ (اللوح المحفوظ)-এর আভিধানিক অর্থ ‘সংরক্ষিত ফলক’। ইসলামী পরিভাষায় এটি সৃষ্টিজগতের আদি ও অন্তের সমস্ত তথ্যাবলি সংবলিত আসমানি সংরক্ষিত ফলক, যা সপ্তম আকাশের ওপরে আরশের নিকটে অবস্থিত।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন: ﴿بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ * فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ﴾ (সূরা আল-বুরূজ: ২১-২২)।
এর মূল তাৎপর্যসমূহ:

  • তাকদীরের অভ্রান্ত সংরক্ষণ: মহাবিশ্ব সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে আল্লাহ তাআলা কলমকে নির্দেশ দিলে কলম সৃষ্টির শুরু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ করে (সহীহ মুসলিম)।
  • কুরআনের মূল উৎস: পবিত্র আল-কুরআন সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ ও অবিকৃতভাবে এই লওহে মাহফুজেই লিপিবদ্ধ ছিল, যা শয়তানের স্পর্শ ও সর্বপ্রকার পরিবর্তন থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।

১৩- (هـ) اكتب مزايا تفسير الكشاف لجار الله الزمخشرى-

[আল্লামা জারুল্লাহ যামাখশারী (রহ.)-এর তাফসীরে কাশশাফ-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ লেখ।]

উত্তর

মু’তাযিলা মতাবলম্বী ভাষাতাত্ত্বিক আল্লামা আবুল কাসেম জারুল্লাহ যামাখশারী (রহ.)-এর আল-কাশশাফ আন হাকায়িকিত তানযীল তাফসীর সাহিত্যের এক অনন্য বিস্ময়। এর প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

  1. বালাগাত ও অলঙ্কারশাস্ত্রের শীর্ষ রূপায়ণ (إعجاز البلاغة): ইলমে মা’আনী ও বায়ান শাস্ত্রের সূক্ষ্মতম প্রয়োগে কুরআনের অলৌকিক বাকরীতি উন্মোচনে কাশশাফের তুলনা বিশ্বসাহিত্যে বিরল।
  2. প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি (أسلوب السؤال والجواب): তিনি ‘ফা ইন কুলতা… কুলতু’ (فإن قلتَ… قلتُ – যদি তুমি প্রশ্ন করো… তবে আমি বলব) রীতিতে সম্ভাব্য সকল আপত্তির প্রাঞ্জল সমাধান দিয়েছেন।
  3. সংক্ষিপ্ততা ও সূক্ষ্মতা: দীর্ঘ অপ্রয়োজনীয় বর্ণনা পরিহার করে শব্দের গূঢ় রহস্য প্রকাশ করেছেন।
  4. মু’তাযিলী মতাদর্শের অন্তর্ভুক্তি: তিনি নিজের মু’তাযিলী আকিদা সুকৌশলে উপস্থাপন করেছেন, যার কারণে পরবর্তী সুন্নী ইমামগণ (যেমন বাইযাবী ও ইবনুল মুনীর) তাঁর বালাগাত গ্রহণ করে আকিদাগত অংশ সংশোধন করেছেন।

১৪- (و) قارن بين تفسير أحكام القران للجصاص وتفسير القران العظيم لابن كثير مختصرا-

[ইমাম জাসসাস (রহ.)-এর আহকামুল কুরআন এবং ইবনে কাছীর (রহ.)-এর তাফসীরুল কুরআনিল আযীমের মধ্যে সংক্ষেপে তুলনা কর।]

উত্তর

তুলনার ভিত্তি আহকামুল কুরআন (ইমাম আল-জাসসাস) তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (ইবনে কাছীর)
১. তাফসীর ধারা ফিকহী তাফসীর (التفسير الفقهي)। বিশুদ্ধ তাফসীর বিল মা’ছূর (التفسير بالمأثور)।
২. মূল উপজীব্য কুরআনের আইন ও বিধানসংক্রান্ত আয়াতগুলোর বিস্তারিত ফিকহী পর্যালোচনা। কুরআনের ঐতিহাসিক পটভূমি, সাধারণ হেদায়েত ও সামগ্রিক ব্যাখ্যা।
৩. মাযহাবী অবস্থান হানাফী মাযহাবের উসূল ও দলিলের ওপর ভিত্তি করে রচিত এবং হানাফী মাযহাবের প্রাধান্য প্রদান। শাফিয়ী মাযহাবের অনুসারী হলেও নিরপেক্ষ হাদিসভিত্তিক সালাফী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
৪. তাফসীর পদ্ধতি উসূলে ফিকহ ও ফিকহী ইজতিহাদের বিশ্লেষণ। কুরআন দিয়ে কুরআন, অতঃপর হাদিস, অতঃপর সাহাবা-তাবেয়ীগণের উক্তি দিয়ে তাফসীর।

১৫- (ز) اكتب حياة الإمام جلال الدين السيوطى بالاختصار-

[ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)-এর পুণ্যময় জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]

উত্তর

  • নাম ও পরিচয়: আব্দুর রহমান বিন কামালুদ্দীন আবু বকর। লকব ‘জালালুদ্দীন’ এবং মিসরের আসয়ূত অঞ্চলের দিকে সম্বন্ধ করে ‘আস-সুয়ূতী’ নামে খ্যাত।
  • জন্ম ও শৈশব: তিনি হিজরী ৮৪৯ সনে কায়রোতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র আট বছর বয়সে পবিত্র কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন।
  • জ্ঞানচর্চা ও মুজাদ্দিদীয়ত: তিনি হিজরী নবম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ ও বহুশাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাফসীর, হাদিস, আরবি ব্যাকরণ, ইতিহাস ও উলূমুল কুরআনে তাঁর দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তিনি আড়াই লক্ষ হাদিসের হাফিয ছিলেন।
  • গ্রন্থাবলি: তিনি ছোট-বড় প্রায় ছয় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তন্মধ্যে আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন, তাফসীরুল জালালাইন (দ্বিতীয় অংশ), আদ-দুররুল মানছূর, তারীখুল খুলাফা এবং আল-জামি’উস সাগীর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।
  • ইন্তেকাল: হিজরী ৯১১ সনে কায়রোতে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন।

১৬- (ح) اكتب أسماء خمسة كتب للتفسير المعاصر-

[সমকালীন তাফসীর সাহিত্যের পাঁচটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম লেখ।]

উত্তর

আধুনিক ও সমকালীন সময়ে রচিত বিশ্বনন্দিত পাঁচটি তাফসীরগ্রন্থের নাম ও লেখকের পরিচিতি নিম্নরূপ:

  1. তাফসীরুল মারায়ী (تفسير المراغي): রচয়িতা শায়খ আহমাদ বিন মুস্তফা আল-মারায়ী (রহ.) (মিসর)। এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় আধুনিক সামাজিক ও সাহিত্যিক ধারার তাফসীর।
  2. ফী যিলালিল কুরআন (في ظلال القرآن): রচয়িতা সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ (রহ.) (মিসর)। কুরআনের বিপ্লবী আহ্বান ও জীবনমুখী দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য তাফসীর।
  3. তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন (معارف القرآن): রচয়িতা মুফতী মুহাম্মদ শফী উসমানী (রহ.) (পাকিস্তান/ভারত উপমহাদেশ)। ফিকহী ভারসাম্য ও সমকালীন জীবনঘনিষ্ঠ ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ।
  4. আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর (التحرير والتنوير): রচয়িতা আল্লামা মুহাম্মদ আত-তাহির ইবনে আশুর (রহ.) (তিউনিসিয়া)। আধুনিক বালাগাত ও ভাষাতাত্ত্বিক দর্শনের এক মহাকাব্যিক সংকলন।
  5. তাফহীমুল কুরআন (تفهيم القرآن): রচয়িতা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)। সমকালীন প্রাঞ্জল ভাষায় কুরআনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিকনির্দেশনা সংবলিত আধুনিক তাফসীর।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: আত-তাফসীরুল মুকারিন বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: কোনো নির্দিষ্ট আয়াতের ওপর বিভিন্ন মুফাসসিরের তাফসীর ও মতামত একত্রিত করে তাদের যুক্তি, দলিল ও পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং অধিকতর শক্তিশালী মতটিকে প্রাধান্য দেওয়ার বিদ্যাকে তুলনামূলক তাফসীর বলা হয়।

প্রশ্ন ২: প্রাচীন ও সমকালীন তাফসীরের প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: প্রাচীন তাফসীরে সনদ, ব্যাকরণগত রূপ ও ফিকহী-কালামী বিতর্কের প্রাধান্য থাকে; অন্যদিকে সমকালীন তাফসীরে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সমন্বয়, সামাজিক বাস্তবতা ও জীবনমুখী সহজবোধ্য ব্যাখ্যার প্রাধান্য দেওয়া হয়।

প্রশ্ন ৩: সূরা আত-তীনের চার শপথে কোন কোন নবীর স্মৃতিবিজড়িত স্থানের ইঙ্গিত রয়েছে?

উত্তর: তীন ও যায়তুন দ্বারা হযরত ঈসা (আ.)-এর শাম অঞ্চল, তূর সীনীন দ্বারা হযরত মূসা (আ.)-এর সিনাই প্রান্তর এবং বলদুল আমীন দ্বারা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্মভূমি মক্কার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

প্রশ্ন ৪: তাফসীরে কাশশাফের শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও কেন তা সতর্কতার সাথে পড়তে হয়?

উত্তর: কারণ এটি আরবি বালাগাত ও অলঙ্কারশাস্ত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও লেখক আল্লামা যামাখশারী এতে মু’তাযিলাদের কিছু ভ্রান্ত আকিদা সুকৌশলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

প্রশ্ন ৫: সূরা আল-ইখলাসকে কেন কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ বলা হয়েছে?

উত্তর: পবিত্র কুরআনের বিষয়বস্তু মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত—তাওহীদ, শরীয়তের বিধিবিধান এবং নবীদের ইতিহাস। আর সূরা ইখলাস সম্পূর্ণভাবে খাঁটি তাওহীদের বর্ণনায় নিবেদিত বিধায় একে এক-তৃতীয়াংশ বলা হয়েছে।

প্রশ্ন ৬: লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের সর্বোত্তম সময় কোনটি?

উত্তর: সহীহ হাদিস অনুযায়ী পবিত্র মাহে রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে) কদরের রাত অনুসন্ধানের নির্দেশ রয়েছে, যার মধ্যে ২৭তম রাতের সম্ভাবনা সর্বাধিক।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন