ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২১
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজু দাওয়াতিহিম ফিল কুরআন (سير الأنبياء ومناهج دعوتهم في القرآن)
বিষয় কোড: 201409 | প্রশ্নপত্র কোড: 155
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা
ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০২১ সালের ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঈমানোদ্দীপক কোর্স হলো “সিয়ারুল আম্বিয়া ওয়া মানাহিজু দাওয়াতিহিম ফিল কুরআন” (বিষয় কোড: 201409)। এ কোর্সের মূল প্রতিপাদ্য হলো পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আম্বিয়ায়ে কেরাম (আলাইহিমুস সালাম)-এর পুণ্যময় জীবনালেখ্য, তাঁদের নিষ্পাপ চরিত্র (ইসমাতুল আম্বিয়া), মু’জিযা ও কারামতের স্বরূপ, দাওয়াতের প্রজ্ঞাপূর্ণ বৈচিত্র্যময় পদ্ধতি এবং তাওহীদের বার্তা প্রচার করতে গিয়ে কাফের-মুশরিকদের তরফ থেকে আসা প্রতিকূলতা মোকাবিলার ঐশী কৌশল। নিচে উক্ত প্রশ্নপত্রের গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক) ও গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত)-এর অন্তর্ভুক্ত মোট ১২টি প্রশ্নেরই কুরআন-সুন্নাহ ও আকাইদের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে বিস্তারিত, প্রামাণ্য ও অ্যাকাডেমিক সমাধান পরিবেশন করা হলো।
একনজরে প্রশ্নপত্রের রূপরেখা ও মানবণ্টন
| বিভাগ | মোট প্রশ্ন | উত্তর দিতে হবে | প্রতি প্রশ্নের মান | মোট নম্বর |
|---|---|---|---|---|
| مجموعة (الف) – গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক প্রশ্ন) | ৬টি | ৪টি | ১৫ | ৬০ |
| مجموعة (ب) – গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন) | ৬টি | ৪টি | ৫ | ২০ |
| সর্বমোট | ১২টি | ৮টি | — | ৮০ |
مجموعة (الف) : গ্রুপ ‘ক’ (রচনামূলক প্রশ্নাবলি)
[যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের মান ১৫ নম্বর।]
١- عرف النبى والرسول لغة واصطلاحًا- ثم بين الفرق بينهما-
[নবি ও রসূল শব্দদ্বয়ের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। অতঃপর উভয়ের পার্থক্য বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
মানবজাতিকে হিদায়াত, তাওহীদ এবং আখিরাতের অনন্ত সফলতার পথ প্রদর্শনের জন্য মহান আল্লাহ যুগে যুগে যে মহান ও নিষ্পাপ ব্যক্তিবর্গকে মনোনীত করেছেন, তাঁদের ‘নবি’ (نبي) ও ‘রাসূল’ (رسول) বলা হয়। ইসলামী আকিদা ও নবুওয়্যাতের তাত্ত্বিক আলোচনায় নবি ও রাসূলের স্বরূপ উদ্ঘাটন এবং তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের সীমারেখা নিরূপণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়।
‘নবি’ (النبي) শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা
১. আভিধানিক অর্থ: আরবি ব্যাকরণ ও ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘নবি’ (النَّبِيُّ) শব্দটি দুটি মূলধাতু (مادة) থেকে গঠিত হতে পারে:
- ‘নাবা’ (النَّبَأُ) থেকে নিষ্পন্ন: এর অর্থ মহাবার্তা, সুসংবাদ বা অতীব গুরুত্বপূর্ণ খবর। যেমন আল্লাহ বলেন: ﴿عَمَّ يَتَسَاءَلُونَ * عَنِ النَّبَإِ الْعَظِيمِ﴾ (সূরা আন-নাবা: ১-২)। এই অর্থে নবি হলেন (مُنَبَّأٌ) বা ‘যাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে গায়েবের সংবাদ দেওয়া হয়েছে’ এবং (مُنَبِّئٌ) বা ‘যিনি আল্লাহর বাণী মানুষের নিকট পৌঁছে দেন’।
- ‘নাবওয়াহ’ (النَّبْوَةُ) থেকে নিষ্পন্ন: এর অর্থ উচ্চভূমি, মর্যাদা বা সমুন্নত অবস্থান। অর্থাৎ যিনি সৃষ্টিজগতের সকল মানুষের চেয়ে আত্মিক ও মর্যাদাগত দিক দিয়ে সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করেন।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ইমামগণ নবির সংজ্ঞা বিভিন্নভাবে দিয়েছেন। ইমাম নাসাফী (রহ.) বলেন:
«النَّبِيُّ: إِنْسَانٌ بَعَثَهُ اللّٰهُ تَعَالَى لِتَبْلِيغِ مَا أَوْحَى إِلَيْهِ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ مَعَهُ كِتَابٌ وَلَا شَرِيعَةٌ جَدِيدَةٌ»
অর্থ: “নবি হলেন এমন একজন মানবসন্তান, যাঁকে মহান আল্লাহ তাঁর নিকট অবতীর্ণ অহী মানুষের কাছে প্রচার করার জন্য প্রেরণ করেছেন; যদিও তাঁর সাথে স্বতন্ত্র আসমানি কিতাব কিংবা নতুন শরীয়ত না থাকে।”
‘রাসূল’ (الرسول) শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা
১. আভিধানিক অর্থ: ‘রাসূল’ (الرَّسُولُ) শব্দটি ‘রিসালাত’ (الرِّسَالَةُ) মূলধাতু থেকে নির্গত, যার আভিধানিক অর্থ বার্তা প্রেরক, দূত, বার্তাবাহক বা কোনো দায়িত্ব দিয়ে প্রেরিত প্রতিনিধি। বহুবচনে ‘রুসুল’ (رُسُلٌ)।
২. পারিভাষিক সংজ্ঞা: আকাইদের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ শারহুল আকাঈদ আন-নাসাফিয়্যাহ-তে বর্ণিত হয়েছে:
«الرَّسُولُ: إِنْسَانٌ بَعَثَهُ اللّٰهُ تَعَالَى إِلَى الْخَلْقِ لِتَبْلِيغِ الْأَحْكَامِ، مَعَهُ كِتَابٌ أَوْ شَرِيعَةٌ جَدِيدَةٌ أَوْ بُعِثَ إِلَى قَوْمٍ كُفَّارٍ مُخَالِفِينَ»
অর্থ: “রাসূল হলেন এমন এক সম্মানিত মানব, যাঁকে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের কাছে দ্বীনের হুকুম-আহকাম পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেছেন এবং তাঁর সাথে নতুন কোনো কিতাব অথবা নতুন স্বতন্ত্র শরীয়ত প্রদান করেছেন অথবা তিনি কোনো বিদ্রোহী কাফের কওমের নিকট প্রেরিত হয়েছেন।”
নবি ও রাসূলের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আলেমদের মতে নবি ও রাসূলের মধ্যে সাধারণ ও বিশেষ সম্পর্কের (العُمُومُ وَالْخُصُوصُ الْمُطْلَقُ) ভিত্তিতে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে:
| পার্থক্যের ভিত্তি | রাসূল (الرسول) | নবি (النبي) |
|---|---|---|
| ১. কিতাব ও শরীয়ত | রাসূলের নিকট সাধারণত নতুন কিতাব অথবা স্বতন্ত্র নতুন শরীয়ত নাযিল হয়। | নবির জন্য নতুন কিতাব থাকা জরুরি নয়; তিনি পূর্ববর্তী রাসূলের শরীয়তের প্রচার ও বাস্তবায়ন করেন। |
| ২. ব্যাপকতা ও সম্পর্ক | প্রত্যেক রাসূলই নবি, কিন্তু প্রত্যেক নবি রাসূল নন (كُلُّ رَسُولٍ نَبِيٌّ وَلَيْسَ كُلُّ نَبِيٍّ رَسُولًا)। রাসূলের পদবি বিশেষ। | নবির পদবি ব্যাপক। নবুওয়্যাতের বৃত্ত রিসালাতের বৃত্তের চেয়ে বড়। |
| ৩. উম্মত বা কওমের প্রকৃতি | রাসূল মূলত অবাধ্য, অবিশ্বাসী ও বিদ্রোহী কাফের কওমকে একত্ববাদের দাওয়াত দিতে প্রেরিত হন। | নবি এমন মুমিন বা পূর্ববর্তী শরীয়তপ্রাপ্ত কওমের মাঝে প্রেরিত হতে পারেন, যেখানে দ্বীনের পুনরুজ্জীবন প্রয়োজন। |
| ৪. সংখ্যার তারতম্য | রাসূলগণের সংখ্যা নবিগণের তুলনায় কম। হাদিস অনুযায়ী ৩১৩ বা ৩১৫ জন। | নবিগণের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রসিদ্ধ হাদিস অনুযায়ী প্রায় ১ লক্ষ ২৪ হাজার বা ২ লক্ষ ২৪ হাজার। |
| ৫. দাওয়াতের বাধ্যবাধকতা | রাসূলের ওপর তাঁর ওপর অর্পিত কিতাব ও শরীয়ত সর্বস্তরে তাবলীগ ও প্রতিষ্ঠা করা ফরজ। | কোনো কোনো মতানুযায়ী নবির ওপর বিশেষ কোনো বিধান কেবল নিজের ও অনুসারীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। |
কুরআন ও হাদিসের প্রমাণ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নবি ও রাসূলকে স্বতন্ত্র শব্দে পাশাপাশি উল্লেখ করে উভয়ের পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন:
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ وَلَا نَبِيٍّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أُمْنِيَّتِهِ﴾ (সূরা আল-হাজ্জ: ৫২)।
এই আয়াতে ‘রাসূল’ ও ‘নবি’-কে ‘ওয়াও’ (عطف) দ্বারা পৃথক করা হয়েছে, যা উভয়ের পরিচয়গত পার্থক্যের সুস্পষ্ট দলিল।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, নবুওয়্যাত হলো রিসালাতের ভিত্তি। একজন রাসূল যেমন সর্বোচ্চ স্তরের নবি, তেমনি আল্লাহর প্রেরিত সকল নবি ও রাসূলই ছিলেন নিষ্পাপ, মহাসম্মানিত এবং বিশ্বমানবতার সর্বোত্তম আদর্শ ও পথপ্রদর্শক।
٢- هل الإنبياء عليهم الصلوة والسلام كلهم معصومون عن الصغائر والكبائر قبل النبوة وبعدها؟ بين بالأدلة-
[নবিগণ (আ) সকলেই কি নবুওয়্যাতের আগে-পরে ছগীরা ও কবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত ছিলেন? দলিলসহ বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
ইসলামী আকাইদের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে ‘ইসমাতুল আম্বিয়া’ (عصمة الأنبياء) বা নবীদের নিষ্পাপ হওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অবিচ্ছেদ্য বিষয়। নবি ও রাসূলগণ যদি চারিত্রিক স্খলন বা পাপাচার থেকে সুরক্ষিত না হতেন, তবে তাঁদের আনীত ঐশী বাণীর গ্রহণযোগ্যতা বিনষ্ট হয়ে যেত। নবুওয়্যাত লাভ করার পূর্বে এবং পরে সগিরা ও কবিরা গুনাহ থেকে তাঁরা নিষ্পাপ ছিলেন কি না—এ বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর ইমামগণের গভীর বিশ্লেষণ রয়েছে।
‘ইসমাত’ (العصمة)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
আভিধানিক অর্থ: ‘ইসমাত’ শব্দের অর্থ সুরক্ষা, হিফাযত করা, নিবৃত্ত রাখা বা প্রতিরোধ করা।
পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাযানী (রহ.) বলেন, «العِصْمَةُ: مَلَكَةٌ تَمْنَعُ صَاحِبَهَا مِنَ الْمَعْصِيَةِ مَعَ قُدْرَتِهِ عَلَيْهَا لُطْفًا مِنَ اللّٰهِ تَعَالَى»—”ইসমাত হলো আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে বান্দার মধ্যে সৃষ্ট এমন এক আত্মিক শক্তি, যা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিকে পাপকর্মে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে।”
নবিগণের নিষ্পাপতা (عصمة الأنبياء)-এর স্তরভিত্তিক বিশ্লেষণ
১. কুফর ও শিরক থেকে পবিত্রতা
মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা (إجماع) হলো, সকল নবি ও রাসূল নবুওয়্যাত লাভের পূর্বে এবং পরে সারাজীবন কুফর, শিরক ও প্রতিমাপূজা থেকে সম্পূর্ণভাবে নিষ্পাপ ও মুক্ত ছিলেন। জাহিলী পরিবেশেও কোনো নবি কখনো শিরকে লিপ্ত হননি।
২. মিথ্যা ও অহী প্রচারে ভুল-ত্রুটি থেকে পবিত্রতা
সকল আলেম একমত যে, দ্বীনের তাবলীগে, অহী পৌঁছাতে এবং সাধারণ জীবনেও নবিগণ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সর্বপ্রকার মিথ্যা ও বিকৃতি থেকে পূর্ণরূপে নিষ্পাপ। এখানে কোনো ভুল হওয়া অসম্ভব, কারণ আল্লাহ বলেন: ﴿وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى * إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى﴾ (সূরা আন-নাজম: ৩-৪)।
৩. কবিরা গুনাহ (الكبائر) থেকে পবিত্রতা
- নবুওয়্যাত পরবর্তী সময়ে: জমহুর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নবুওয়্যাত লাভের পর নবিগণের দ্বারা কোনো কবিরা গুনাহ (যেমন: ব্যভিচার, চুরি, অন্যায় হত্যা, জুলুম ইত্যাদি) সংঘটিত হওয়া বিবেক ও শরীয়ত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অসম্ভব (مستحيل)।
- নবুওয়্যাত পূর্ববর্তী সময়ে: অধিকাংশ মুতাকাল্লিম ও ফকীহগণের মতে, নবুওয়্যাতের পূর্বেও নবিগণ সকল প্রকাশ্য ও গোপন কবিরা গুনাহ থেকে পবিত্র ছিলেন। কেননা নবুওয়্যাতের পূর্বে কেউ ব্যভিচারী বা চোর থাকলে নবুওয়্যাতের পর লোকসমাজে তাঁর নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকে না।
৪. সগিরা গুনাহ (الصغائر) থেকে পবিত্রতা
সগিরা গুনাহের ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
- মর্যাদাহানিকর সগিরা গুনাহ (الصغائر الخسيسة): যেসব সগিরা গুনাহ মানুষের ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক চরিত্রকে হেয় প্রতিপন্ন করে (যেমন: মাপে এক দানা কম দেওয়া, তুচ্ছ জিনিস চুরি করা)—এসব থেকে নবিগণ নবুওয়্যাতের আগে ও পরে সর্বাবস্থায় সম্পূর্ণ নিষ্পাপ।
- মর্যাদাহানিহীন সাধারণ ভুলত্রুটি (الزلات والسهو): অধিকাংশ গবেষক আলেমের মতে, নবিগণ ইচ্ছাকৃত কোনো সগিরা গুনাহে লিপ্ত হতেন না। তবে কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃত ভুল (নসিয়ান/ভুলে যাওয়া), ইজতিহাদী ভুল অথবা ‘উত্তম কাজের বিপরীতে অপেক্ষাকৃত কম উত্তম কাজ বেছে নেওয়া’ (ترك الأولى) ঘটে থাকত। যাকে ‘যাল্লাত’ (زلات) বলা হয়। কুরআন ও সুন্নাহে এ জাতীয় ঘটনাবলিকে সাধারণ মানুষের মানদণ্ডে পাপ নয়, বরং তাঁদের উচ্চ মর্যাদার কারণে সতর্কবাণী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (حَسَنَاتُ الْأَبْرَارِ سَيِّئَاتُ الْمُقَرَّبِينَ)।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসমাতের দলিলসমূহ
- আল্লাহর নির্দেশ মান্য করার সাধারণ আদেশ: মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: ﴿قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ﴾ (সূরা আলে ইমরান: ৩১)। নবিগণ যদি গোনাহ করতেন, তবে গোনাহের কাজেও তাঁদের অনুসরণ করা মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ত, যা ইসলামী শরীয়তের মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
- শয়তানের স্বীকারোক্তি: ইবলিস স্বয়ং বলেছিল যে সে মুখলিস বান্দাদের পথভ্রষ্ট করতে পারবে না: ﴿قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ * إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ﴾ (সূরা সোয়াদ: ৮২-৮৩)। আর নবিগণ হলেন মুখলিস বান্দাদের শীর্ষে।
- হৃদয় ও চরিত্রের পবিত্রতা: আল্লাহ তাআলা নবিদের প্রশংসায় বলেন: ﴿وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ﴾ (সূরা সোয়াদ: ৪৭)—”নিশ্চয় তারা আমার নিকট মনোনীত ও শ্রেষ্ঠ সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত।”
উপসংহার
সারসংক্ষেপে বলা যায়, নবিগণ নবুওয়্যাতের পূর্বে ও পরে সর্বপ্রকার কুফর, শিরক ও কবিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ। নবুওয়্যাতের পর হীন সগিরা গুনাহ থেকেও তাঁরা মুক্ত। কুরআনে বর্ণিত নবিদের বাহ্যিক কিছু ইজতিহাদী ভুলকে কোনোভাবেই প্রচলিত অর্থে ‘পাপ’ বলা যাবে না, বরং তা ছিল উম্মতকে শিক্ষা দেওয়া এবং আল্লাহর দরবারে বিনয় প্রকাশের মাধ্যম।
٣- اكتب عشرة أسماء من الانبياء المذكورين عليهم السلام في القرآن ثم بين حياتهم بالاختصار-
[কুরআনে বর্ণিত নবিগণের (আ) নামসমূহ থেকে দশজনের নাম ও জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনে সর্বমোট ২৫ জন সম্মানিত নবি ও রাসূলের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ﴿وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَرُسُلًا لَمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ﴾ (সূরা আন-নিসা: ১৬৪)। নিম্নে কুরআনে বর্ণিত নবিগণের মধ্য থেকে দশজন প্রধান নবির পুণ্যময় নাম ও সংক্ষিপ্ত জীবনী উপস্থাপন করা হলো।
দশজন নবির সংক্ষিপ্ত জীবনী
১. আদম (আলাইহিস সালাম) — أٰدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ
তিনি মানবজাতির আদি পিতা (আবুল বাশার) এবং পৃথিবীর প্রথম নবি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নিজ কুদরতি হাতে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন, সমস্ত বস্তুর নাম শিক্ষা দেন এবং ফেরেশতাদের দ্বারা সিজদা করিয়ে সম্মানিত করেন। জান্নাতে কিছুকাল অবস্থানের পর ইবলিসের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণের ফলে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। তিনি তাওবা করেন এবং আল্লাহ তাঁর তাওবা কবুল করে নবুওয়্যাত দান করেন।
২. নূহ (আলাইহিস সালাম) — نُوحٌ عَلَيْهِ السَّلَامُ
তিনি ‘উলুল আযম’ রাসূলদের প্রথম এবং মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা (আবুল বাশার আস-সানী)। তিনি তাঁর মূর্তিপূজক সম্প্রদায়কে দীর্ঘ ৯৫০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে তাওহীদের দাওয়াত দেন। অবাধ্য কাফেরদের ধ্বংসের জন্য মহাপ্লাবন অবতীর্ণ হয় এবং আল্লাহর নির্দেশে নির্মিত কিশতিতে মুমিনগণ ও জীবজন্তুর জোড়া রক্ষা পায়।
৩. ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) — إِبْرَاهِيمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ
তাঁকে ‘খলীলুল্লাহ’ (আল্লাহর বন্ধু) এবং ‘আবুল আম্বিয়া’ (নবীদের পিতা) বলা হয়। তিনি নমরূদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে অলৌকিকভাবে রক্ষা পান। বৃদ্ধ বয়সে পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানি করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পুত্রের সহযোগিতায় পবিত্র কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন। মুসলিম মিল্লাত তাঁরই আদর্শের অনুসারী।
৪. ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) — إِسْمَاعِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ
হযরত ইবরাহীম (আ.) ও মা হাজেরার জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিনি ছিলেন চরম ধৈর্যশীল ও অনুগত (‘যবীহুল্লাহ’)। শিশুকালে তাঁর পদপ্রান্ত থেকে বরকতময় যমযম কূপের উৎপত্তি হয়। তিনি আরব জাতির পূর্বপুরুষ এবং তাঁর বংশেই শেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) আগমন করেন।
৫. ইউসুফ (আলাইহিস সালাম) — يُوسُفُ عَلَيْهِ السَّلَامُ
হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র। পবিত্র কুরআনে তাঁর জীবনীকে ‘আহসানুল কাসাস’ (সর্বোত্তম কাহিনী) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ভাইদের হিংসা, কূপে নিক্ষেপ, দাস হিসেবে বিক্রি, মিথ্যা অপবাদে কারাবরণ এবং পরবর্তীতে মিসরের অর্থমন্ত্রী ও শাসক হওয়ার মাধ্যমে সততা ও ক্ষমার অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
৬. মূসা (আলাইহিস সালাম) — مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ
তিনি ‘কালীমূল্লাহ’ (আল্লাহর সাথে সরাসরি বাক্যালাপকারী)। আল্লাহ তাঁকে তাওরাত কিতাব ও নয়টি স্পষ্ট মু’জিযা প্রদান করেন। তিনি অত্যাচারী ফেরাউন ও তার বাহিনীকে লোহিত সাগরে নিমজ্জিত করে বনি ইসরাঈলকে দীর্ঘ দাসত্ব থেকে মুক্ত করেন।
৭. দাঊদ (আলাইহিস সালাম) — دَاوُدُ عَلَيْهِ السَّلَامُ
বনি ইসরাঈলের নবি ও প্রতাপশালী বাদশাহ। জালুতকে বধ করার মাধ্যমে তাঁর বীরত্ব প্রকাশ পায়। আল্লাহ তাঁকে আসমানি কিতাব ‘যাবুর’ দান করেন, যা তিনি অতি সুমধুর কণ্ঠে তিলাওয়াত করতেন। তাঁর জন্য লোহা নরম করে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি বর্ম নির্মাণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
৮. সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) — سُلَيْمَانُ عَلَيْهِ السَّلَامُ
হযরত দাঊদ (আ.)-এর পুত্র। আল্লাহ তাঁকে নবুওয়্যাতের পাশাপাশি এমন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজত্ব দান করেছিলেন, যেখানে জিন, বাতাস ও পশুপাখির ভাষা তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ করেন এবং রানি বিলকিসকে তাওহীদের ছায়াতলে আনেন।
৯. ঈসা (আলাইহিস সালাম) — عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ
হযরত মরিয়ম (আ.)-এর গর্ভে পিতা ছাড়া অলৌকিকভাবে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ‘রূহুল্লাহ’ ও ‘কালিমাতুল্লাহ’। আল্লাহ তাঁকে ইনজীল কিতাব এবং জন্মান্ধকে দৃষ্টিদান, কুষ্ঠরোগী নিরাময় ও মৃতকে জীবিত করার মু’জিযা দেন। ইহুদিরা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে আল্লাহ তাঁকে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেন।
১০. মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) — مُحَمَّدٌ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবি (খাতামুন্নাবিয়্যীন) এবং রহমাতুল্লিল আলামীন। তিনি মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৪০ বছর বয়সে নবুওয়্যাত লাভ করেন। তাঁর ওপর চিরন্তন মু’জিযা আল-কুরআন অবতীর্ণ হয়। তিনি আইয়ামে জাহিলিয়াতের অন্ধকার দূর করে এক মদিনা সনদের ভিত্তিতে ইনসাফপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন।
٤- اذكر منهج دعوة نوح عليه الصلوة والسلام بالتفصيل-
[নুহ (আ) এর দা’ওয়াতের পদ্ধতি বিস্তারিত বর্ণনা কর।]
ভূমিকা
হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম) ছিলেন মানবজাতির ইতিহাসের প্রথম রাসূল, যাঁর যুগে পৌত্তলিকতা ও শিরকের বিস্তার ঘটেছিল। তিনি সুদীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর ধরে তাঁর কওমকে তাওহীদের পথে ডাকার যে অবিচল ধৈর্য, বহুমুখী কৌশল ও ত্যাগ প্রদর্শন করেছিলেন, তা কুরআনের সূরা নূহ, সূরা হূদ, সূরা আল-আ’রাফ ও আশ-শুআরায় বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
হযরত নূহ (আ.)-এর দাওয়াত পদ্ধতির মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. অবিরাম ও নিরবচ্ছিন্ন দাওয়াত (الدعوة المستمرة ليلاً ونهاراً)
হযরত নূহ (আ.) কোনো সময় বা পরিস্থিতির পরোয়া না করে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা দাওয়াতি কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি আল্লাহর দরবারে আরজ করেন:
﴿قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا﴾ (সূরা নূহ: ৫)—”তিনি বললেন: হে আমার রব! আমি আমার সম্প্রদায়কে রাত-দিন দাওয়াত দিয়েছি।”
২. প্রকাশ্য ও গোপন বহুমুখী কৌশল (الجمع بين الإعلان والإسرار)
দাওয়াতি কাজে বৈচিত্র্য আনতে তিনি প্রকাশ্য জনসমক্ষে এবং গোপনে ব্যক্তিগতভাবে মানুষকে বুঝিয়েছেন:
﴿ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا * ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا﴾ (সূরা নূহ: ৮-৯)। অর্থাৎ তিনি যেখানে সম্মিলিত আলোচনা ফলপ্রসূ সেখানে প্রকাশ্য ভাষণ দিয়েছেন, আবার যেখানে ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং কার্যকর সেখানে নিভৃতে হৃদয়গ্রাহী উপদেশ দিয়েছেন।
৩. যুক্তিভিত্তিক মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ ও তাওহীদের প্রমাণ (الاستدلال بآيات الآفاق والأنفس)
তিনি তাঁর কওমকে অন্ধবিশ্বাস বর্জন করে মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানান। তিনি আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য এবং মানুষের সৃষ্টিতত্ত্বের যুক্তি তুলে ধরে বলেন:
﴿أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللّٰهُ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا * وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا﴾ (সূরা নূহ: ১৫-১৬)।
৪. পার্থিব ও পরকালীন নিয়ামতের প্রলোভন ও আশা সঞ্চার (الترغيب بالبركات الدنيوية والنعيم الأخروي)
তিনি মানুষকে হতাশ না করে ইস্তিগফারের মাধ্যমে পার্থিব সমৃদ্ধি লাভের সুসংবাদ দেন:
﴿فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا * يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا * وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا﴾ (সূরা নূহ: ১০-১২)। অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত দেবেন, ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে বরকত দেবেন এবং নদীমাতৃক সুজলা-সুফলা উদ্যান দান করবেন।
৫. আযাবের কঠোর ভীতি প্রদর্শন (الترهيب من عذاب الله)
কেবল আশাবাদ নয়, অবাধ্যতার চূড়ান্ত পরিণাম সম্পর্কেও তিনি সতর্ক করে বলেন:
﴿إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍ﴾ (সূরা হূদ: ২৬)—”নিশ্চয় আমি তোমাদের ওপর এক যন্ত্রণাদায়ক দিবসের আযাবের ভয় করছি।”
৬. নিঃস্বার্থপরতা ও বিনিময়হীন দাওয়াতি চরিত্র (التجرد وعدم طلب الأجر)
তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁর এই আহ্বানের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, ধনদৌলত বা নেতৃত্বের লোভ নেই:
﴿وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾ (সূরা আশ-শুআরা: ১০৯)।
৭. নিপীড়িত ও দরিদ্র অনুসারীদের মর্যাদা রক্ষা (رعاية المستضعفين)
কওমের অহংকারী সর্দাররা শর্ত দিয়েছিল যে সমাজের নিম্নশ্রেণির দরিদ্র মুমিনদের তাড়িয়ে দিলে তারা নূহের কথা শুনবে। কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন: ﴿وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الْمُؤْمِنِينَ﴾ (সূরা আশ-শুআরা: ১১৪)—”আমি কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাসীদের তাড়িয়ে দিতে পারি না।”
উপসংহার
হযরত নূহ (আ.)-এর ৯৫০ বছরের দাওয়াতি জীবন আধুনিক কালের দাঈদের জন্য চরম ধৈর্য, অবিচলতা, কৌশলগত বৈচিত্র্য এবং পার্থিব স্বার্থহীনতার অনন্য মডেল। শত অবমাননা সত্ত্বেও তিনি সত্যের পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন।
٥- اكتب كيفية دعوة موسى عليه الصلوة والسلام في إصلاح المجتمع-
[সমাজ সংস্কারে মূসা (আ) এর দা’ওয়াতের পদ্ধতি লেখ।]
ভূমিকা
হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) এমন এক অবক্ষয়গ্রস্ত যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন মিসরের সমাজ ছিল চরম রাজনৈতিক স্বৈরাচার, অর্থনৈতিক শোষণ, বর্ণবাদী দাসত্ব এবং আত্মপূজার আঁধারে নিমজ্জিত। স্বঘোষিত প্রভু ফেরাউনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বনি ইসরাঈলের সামাজিক মুক্তি এবং সমগ্র সমাজের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কার সাধনে মূসা (আ.) যে বিপ্লবী দাওয়াতি রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন, তা মানবজাতির সমাজ সংস্কারের চিরন্তন দিশারি।
সমাজ সংস্কারে হযরত মূসা (আ.)-এর দাওয়াতি কর্মপদ্ধতি
১. ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত ও রাজনৈতিক সংস্কার (إصلاح رأس الهرم السياسي)
হযরত মূসা (আ.) প্রান্তিক মানুষকে নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সরাসরি স্বৈরাচারী শাসক ফেরাউনের রাজদরবারে গিয়ে সত্য প্রকাশ করেন। আল্লাহ নির্দেশ দেন:
﴿اذْهَبْ إِلَى فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَى﴾ (সূরা ত্বাহা: ২৪)।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে সার্বভৌমত্ব কোনো মানুষের নয়, বরং সৃষ্টিজগতের প্রতিপালকের: ﴿قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ * قَالَ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا﴾ (সূরা আশ-শুআরা: ২৩-২৪)।
২. নম্র ও যুক্তিনির্ভর বাচনভঙ্গি (الخطاب اللين والجدال بالتي هي أحسن)
ফেরাউন চরম নিষ্ঠুর ও অহংকারী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ মূসা ও হারূন (আ.)-কে প্রথম পর্যায়ে কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেন:
﴿فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى﴾ (সূরা ত্বাহা: ৪৪)।
এটি প্রমাণ করে যে সামাজিক সংস্কারের সূচনা করতে হয় উগ্রতা পরিহার করে হিকমত ও কল্যাণকামী নমনীয়তার মাধ্যমে।
৩. মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও দাসপ্রথার অবসান (تحرير الإنسان من العبودية والظلم)
ফেরাউন বনি ইসরাঈলের পুরুষদের হত্যা করত, নারীদের দাসী বানাত এবং সমগ্র জাতিকে বাধ্যতামূলক বেগার খাটাত। মূসা (আ.) এই সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে মানবমুক্তির দাবি তুলে বলেন:
﴿أَنْ أَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ﴾ (সূরা আশ-শুআরা: ১৭)—”বনি ইসরাঈলকে আমাদের সাথে মুক্তি দিয়ে মুক্তভাবে যেতে দাও।”
৪. অলৌকিক প্রমাণ ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন (إبطال الخرافات بالسلطان المعجز)
তৎকালীন মিসরীয় সমাজ যাদুবিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো অন্ধবিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিল। মূসা (আ.) তাঁর লাঠি (عصا) ও শুভ্র হাত (يد بيضاء)-এর সুস্পষ্ট মু’জিযার মাধ্যমে রাজকীয় যাদুকরদের সকল ভেল্কিবাজি চূর্ণ করেন। ফলে প্রধান যাদুকররা সত্য বুঝতে পেরে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে সমাজকে কুসংস্কারমুক্তির বার্তা দেয়।
৫. বনি ইসরাঈলের চারিত্রিক ও মনস্তাত্ত্বিক গোলামি মোচন (البناء النفسي والتربوي للجماعة)
দীর্ঘ দাসত্বের কারণে বনি ইসরাঈলের মধ্যে কাপুরুষতা, অলসতা, গো-পূজা এবং আত্মমর্যাদাহীনতার জন্ম হয়েছিল। মূসা (আ.) তাদেরকে বারবার তাওহীদ, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের তালিম দেন:
﴿قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ اسْتَعِينُوا بِاللّٰهِ وَاصْبِرُوا إِنَّ الْأَرْضَ لِلّٰهِ يُورِثُهَا مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ﴾ (সূরা আল-আ’রাফ: ১২৮)।
৬. শরীয়তভিত্তিক আইনি ও বিচারিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা (إرساء مبادئ الشريعة والعدالة)
সামাজিক অপরাধ ও অরাজকতা দূরীকরণে মূসা (আ.) তূর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে কথোপকথন শেষে আসমানি সংহিতা ‘তাওরাত’ (التوراة) লাভ করেন। তাওরাতের দশটি আদেশ (Ten Commandments) সমাজ থেকে হত্যা, ব্যভিচার, মিথ্যা সাক্ষ্য, চুরি ও পিতামাতার অবাধ্যতা দূর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মূলভিত্তি রচনা করে।
উপসংহার
হযরত মূসা (আ.)-এর সমাজ সংস্কার ছিল সামগ্রিক—যাতে একাধারে আধ্যাত্মিক তাওহীদ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সুবিচার এবং নৈতিক চরিত্রের পুনর্গঠন সমন্বিত ছিল।
٦- تحدث عن المشاكل التى واجهها عيسى عليه السلام في دعوة بنى اسرائيل-
[বনি ইসরাঈলের মাঝে দাওয়াত প্রচার করতে গিয়ে ঈসা (আ) যে সকল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা আলোচনা কর।]
ভূমিকা
হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম) বনি ইসরাঈলের সর্বশেষ নবি হিসেবে এমন এক সংকটপূর্ণ সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন তাদের সমাজ ধর্মগুরুদের কপটতা, রসম-রেওয়াজ, বৈষয়িক লোভ-লালসা এবং তাওরাতের বিকৃতিতে নিমজ্জিত ছিল। তিনি তাদের অন্ধ আচারসর্বস্বতা ভেঙে আত্মিক পবিত্রতা ও ইনজীলের সুসংবাদ দিতে গিয়ে নানামুখী ভয়ংকর ষড়যন্ত্র ও বাধার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
হযরত ঈসা (আ.)-এর দাওয়াতি জীবনে বনি ইসরাঈল কর্তৃক সৃষ্ট প্রধান সমস্যাবলি
১. জন্মসংক্রান্ত মিথ্যা অপবাদ ও বংশীয় কুৎসা (الطعن في نسبه الشريف والافتراء على أمه)
ঈসা (আ.) পিতা ছাড়া আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে সাইয়িদা মারইয়াম (আ.)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। বনি ইসরাঈলের কট্টর ইহুদিরা এই অলৌকিকত্ব স্বীকার না করে পবিত্রা মারইয়ামের ওপর ব্যভিচারের চরম অপবাদ আরোপ করে এবং ঈসা (আ.)-কে জারজ সন্তান বলে গালিগালাজ করে। কুরআন বলে:
﴿وَبِكُفْرِهِمْ وَقَوْلِهِمْ عَلَى مَرْيَمَ بُهْتَانًا عَظِيمًا﴾ (সূরা আন-নিসা: ১৫৬)।
২. মু’জিযাসমূহকে যাদু বলে প্রত্যাখ্যান (اتهامه بالسحر والشعوذة)
আল্লাহ তাআলা ঈসা (আ.)-কে জন্মান্ধকে সুস্থ করা, কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করা, মৃতকে জীবিত করা এবং ঘরের জমানো খাবারের খবর বলে দেওয়ার মতো সুস্পষ্ট মু’জিযা দিয়েছিলেন। কিন্তু বনি ইসরাঈল হিংসা ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে এগুলোকে ‘জাদুকরী ভেল্কি’ আখ্যা দেয়:
﴿فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ﴾ (সূরা আল-মায়েদা: ১১০)।
৩. ধর্মীয় যাজক ও ফরীশীদের একগুঁয়ে বিরোধিতা (مقاومة الأحبار والفرّيسيين المتزمتين)
ইহুদি ধর্মযাজক (আহবার) ও ফরীশীরা নিজেদের বানানো কুসংস্কারাচ্ছন্ন ফতোয়া ও হালাল-হারামের কারবার চালিয়ে সাধারণ মানুষকে শোষণ করত। ঈসা (আ.) যখন তাদের অর্থনৈতিক শোষণ ও অন্তসারশূন্যতার প্রতিবাদ জানালেন এবং তাওরাতের কিছু অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা সহজ করতে চাইলেন (﴿وَلِأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ﴾), তখন কায়েমি স্বার্থবাদী ধর্মব্যবসায়ীরা তাঁর ঘোর শত্রুতে পরিণত হয়।
৪. রোমান শাসকদের কাছে মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ (التحريض السياسي والوشاية لدى الحاكم الروماني)
ইহুদি নেতারা যখন ধর্মীয় বিতর্কে ঈসা (আ.)-কে পরাস্ত করতে পারল না, তখন তারা তৎকালে ফিলিস্তিনের শাসক রোমান গভর্নর পিলাতের কাছে রাজনৈতিক চক্রান্ত শুরু করে। তারা রটিয়ে দেয় যে ঈসা নিজেকে ‘ইহুদিদের রাজা’ দাবি করে রোমান সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উসকানি দিচ্ছেন এবং রোমান কর প্রদান বন্ধের ষড়যন্ত্র করছেন।
৫. অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক অনুসারী লাভ (قلة المستجيبين وتخاذل الجمهور)
বনি ইসরাঈলের বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র অল্প কয়েকজন সাধারণ দরিদ্র জেলে ও শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁর ওপর ঈমান আনেন, যাঁদের ‘হাওয়ারী’ (الحواريون) বলা হয়। সমগ্র জাতি তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন:
﴿فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللّٰهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللّٰهِ﴾ (সূরা আলে ইমরান: ৫২)।
৬. হত্যার নীলনকশা ও ক্রুশবিদ্ধ করার অপচেষ্টা (المؤامرة على قتله وصلبه)
সর্বশেষে বনি ইসরাঈলের চক্রান্তকারীরা ঈসা (আ.)-কে বন্দি করে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যার ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করে। এমনকি তাঁর এক শিষ্য মুনাফেকি করে গুপ্তচরের কাজ করে। কিন্তু মহান আল্লাহ অলৌকিক কুদরতে ঈসা (আ.)-কে রক্ষা করেন, চক্রান্তকারী নেতার চেহারা ঈসা (আ.)-এর সদৃশ করে দেন এবং তাঁকে সশরীরে দ্বিতীয় আসমানে উঠিয়ে নেন:
﴿وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللّٰهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ﴾ (সূরা আন-নিসা: ১৫৭)।
উপসংহার
বনি ইসরাঈলের ন্যাক্কারজনক শত্রুতা ও বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও হযরত ঈসা (আ.) আত্মিক পবিত্রতা ও ক্ষমার পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর মিশনকে রক্ষা করেছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তাঁর পুনরায় পৃথিবীতে আগমন ঘটবে।
مجموعة (ب) : গ্রুপ ‘খ’ (সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি)
[যেকোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫ নম্বর।]
٧- تحدث عن حكمة إرسال الأنبياء والرسل-
[নবি ও রসুলগণ (আ) কে প্রেরণ এর হিকমত সম্পর্কে আলোচনা কর।]
উত্তর
মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ানুভূতি সীমিত। কেবল মানবীয় বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর সত্তা, সিফাত, পরকাল এবং সঠিক ইবাদত-বন্দেগির পদ্ধতি পূর্ণরূপে জানা অসম্ভব। তাই পরম করুণাময় আল্লাহ যুগে যুগে নবি ও রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। এর প্রধান হিকমতসমূহ হলো:
- হুজ্জত বা অকাট্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা (إقامة الحجة على العباد): কিয়ামতের দিন মানুষ যাতে এ কথা বলতে না পারে যে আমরা দ্বীনের পথ জানতাম না বা আমাদের সতর্ক করা হয়নি। আল্লাহ বলেন: ﴿رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللّٰهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ﴾ (সূরা আন-নিসা: ১৬৫)।
- তাওহীদের বিশুদ্ধ শিক্ষা দান (الدعوة إلى التوحيد الخالص): সকল শিরক ও মূর্তিপূজার বিনাশ ঘটিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতে মানুষকে আহ্বান করা। ﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللّٰهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ﴾ (সূরা আন-নাহল: ৩৬)।
- ব্যবহারিক আদর্শ ও রোল মডেল উপস্থাপন (القدوة العملية): মানুষ যেন নবিদের বাস্তব জীবনে দেখে অহীর বিধানাবলি অনুসরণ করতে পারে।
- আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধন (تزكية النفوس والأخلاق): মানুষের অন্তরের কলুষতা দূর করে উত্তম চরিত্র শিক্ষা দেওয়া।
- ইনসাফপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ (إقامة القسط والعدل): অত্যাচার ও বৈষম্য দূর করে পৃথিবীতে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।
٨- عرف المعجزة والكرامة لغة واصطلاحا ثم بين الفرق بينهما-
[المعجزة ও الكرامة এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। অতঃপর উভয়ের পার্থক্য বর্ণনা কর।]
১. মু’জিযা (المعجزة)-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: ‘ই’জায’ (الإعجاز) থেকে নিষ্পন্ন, যার অর্থ অক্ষমকারী, পরাভূতকারী বা যা অন্যদের অপারগ করে তোলে।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: «أَمْرٌ خَارِقٌ لِلْعَادَةِ، مَقْرُونٌ بِالتَّحَدِّي، سَالِمٌ عَنِ الْمُعَارَضَةِ، يَظْهَرُ عَلَى يَدِ مُدَّعِي النُّبُوَّةِ»—”নবুওয়্যাত দাবিদার নবির হাতে চ্যালেঞ্জসহকারে প্রকাশিত এমন অলৌকিক ও সাধারণ নিয়মবহির্ভূত ঘটনা, যার সমকক্ষ আনয়নে সমগ্র সৃষ্টি অপারগ হয়।”
২. কারামত (الكرامة)-এর সংজ্ঞা
- আভিধানিক অর্থ: সম্মান, দানশীলতা বা মর্যাদা প্রদর্শন।
- পারিভাষিক সংজ্ঞা: «أَمْرٌ خَارِقٌ لِلْعَادَةِ يَظْهَرُ عَلَى يَدِ عَبْدٍ صَالِحٍ ظَاهِرِ الصَّلَاحِ غَيْرِ مُدَّعٍ لِلنُّبُوَّةِ»—”নবুওয়্যাতের দাবি ছাড়াই আল্লাহর কোনো সৎ, মুত্তাকী ওলী বা নেককার বান্দার হাতে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশিত সাধারণ নিয়মবহির্ভূত অলৌকিক ঘটনা।”
৩. মু’জিযা ও কারামতের মধ্যে পার্থক্য
| পার্থক্যের দিক | মু’জিযা (المعجزة) | কারামত (الكرامة) |
|---|---|---|
| ১. পাত্র বা ব্যক্তিত্ব | কেবলমাত্র নবি বা রাসূলের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। | আল্লাহর ওলী বা নেককার মুমিনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। |
| ২. নবুওয়্যাতের দাবি | এর সাথে নবুওয়্যাতের প্রকাশ্য দাবি জড়িত থাকে। | এতে নবুওয়্যাতের দাবি থাকে না; দাবি করলে তা বাতিল হয়ে যায়। |
| ৩. চ্যালেঞ্জ (তাহাদ্দী) | প্রতিপক্ষকে অনুরূপ কিছু আনার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ থাকে। | কোনো ধরনের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ থাকে না; এটি ওলী লুকিয়ে রাখেন। |
| ৪. উদ্দেশ্য | নবুওয়্যাতের সত্যতা প্রমাণ ও উম্মতের ঈমান দৃঢ় করা। | ওলীকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মান প্রদর্শন বা বিপদ থেকে উদ্ধার। |
٩- اكتب صفات داؤد عليه السلام-
[দাউদ (আ) এর গুণাবলি লেখ।]
উত্তর
হযরত দাঊদ (আলাইহিস সালাম) ছিলেন একই সাথে বনি ইসরাঈলের বিশিষ্ট নবি এবং পরাক্রমশালী সুশাসক। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে তাঁর প্রধান গুণাবলি নিম্নরূপ:
- অবিচল ইবাদত ও তাওয়াব (أواب – বারবার আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী): আল্লাহ বলেন: ﴿وَاذْكُرْ عَبْدَنَا دَاوُدَ ذَا الْأَيْدِ إِنَّهُ أَوَّابٌ﴾ (সূরা সোয়াদ: ১৭)। তিনি সর্বদা তওবা ও যিকিরে মগ্ন থাকতেন।
- সর্বোত্তম সিয়াম ও তাহাজ্জুদ (صيام داود وقيامه): রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় রোজা হলো দাঊদ (আ.)-এর রোজা—তিনি একদিন রোজা রাখতেন আর একদিন ভঙ্গ করতেন; এবং তাঁর রাতের নামাজ ছিল রাতের অর্ধেক ঘুমাতেন, এক-তৃতীয়াংশ ইবাদত করতেন এবং এক-ষষ্ঠমাংশ ঘুমাতেন” (সহীহ বুখারী)।
- সুমধুর কণ্ঠস্বর ও যাবুর তিলাওয়াত: আল্লাহ তাঁকে ‘লাহনে দাঊদী’ (মধুরতম কণ্ঠ) দিয়েছিলেন। তিনি যখন যাবুর তিলাওয়াত করতেন, তখন পাহাড়-পর্বত ও শূন্যে উড়ন্ত পাখিরাও তাঁর সাথে তাসবীহ পাঠ করত।
- লোহা নরম করার মু’জিযা ও হস্তশিল্পে জীবিকা নির্বাহ: আল্লাহ তাঁর জন্য লোহাকে মোমের মতো নরম করে দিয়েছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ না নিয়ে নিজ হাতে যুদ্ধবর্ম (الدرع) তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা অর্জন করতেন।
- ইনসাফপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপরিচালনা: আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীর খলিফা নিযুক্ত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন: ﴿يَا دَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ﴾ (সূরা সোয়াদ: ২৬)।
- অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতা: তিনি জালুতের মতো বিশালদেহী প্রতাপশালী জালিমকে নির্ভীকভাবে পাথর নিক্ষেপ করে বধ করেছিলেন।
١٠- بين أهمية الدعوة الى الله تعالى في ضوء القرآن والحديث-
[কুরআন-হাদিসের আলোকে আল্লাহর প্রতি দা’ওয়াতের গুরুত্ব বর্ণনা কর।]
উত্তর
ইসলামে ‘আমরু বিল মা’রূফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ) তথা আল্লাহর দ্বীনের প্রতি দাওয়াত প্রদান একটি মৌলিক ও অপরিহার্য ইবাদত। মানবজাতির সার্বিক মুক্তি ও সামাজিক শান্তি এ দাওয়াতের ওপরই নির্ভরশীল।
১. পবিত্র কুরআনের আলোকে গুরুত্ব
- সর্বশ্রেষ্ঠ কথার স্বীকৃতি: মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
﴿وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللّٰهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ﴾ (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)—”ঐ ব্যক্তির চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকর্ম করে এবং বলে: নিশ্চয় আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন।” - শ্রেষ্ঠ উম্মতের খেতাব লাভের শর্ত: আল্লাহ বলেন:
﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللّٰهِ﴾ (সূরা আলে ইমরান: ১১০)। অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে বাধা দেওয়ার কারণেই এই উম্মতকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা হয়েছে। - দাওয়াতের সাধারণ নির্দেশ: আল্লাহ বলেন: ﴿ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ﴾ (সূরা আন-নাহল: ১২৫)।
২. পবিত্র হাদিসের আলোকে গুরুত্ব
- লাল উটের চেয়েও উত্তম প্রাপ্তি: হযরত আলী (রা.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.) খায়বার যুদ্ধের দিন বলেছিলেন:
«فَوَاللّٰهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللّٰهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ» (সহীহ বুখারী)—”আল্লাহর কসম! তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ একজন মানুষকেও হিদায়াত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য মূল্যবান লাল উট লাভ করার চেয়েও বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।” - একটি বাণী হলেও পৌঁছানোর হুকুম: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: «بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً»—”আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও মানুষের কাছে পৌঁছে দাও” (সহীহ বুখারী)।
- আজাব থেকে বাঁচার উপায়: নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ যদি অসৎকাজে বাধা না দেয়, তবে আল্লাহ এমন শাস্তি পাঠাবেন যে পরবর্তীতে তাদের দোয়াও কবুল হবে না (তিরমিযী)।
١١- قتل موسى عليه السلام قبطيا ، لم يكن واجب القتل فما قولكم في عصمة موسى (ع)-
[হত্যাযোগ্য অপরাধী ছিলনা—এমন একজন কিবতীকে মূছা (আ) হত্যা করেছিলেন, এমতাবস্থায় মূছা (আ) এর ‘মাছুম’ থাকার ব্যাপারে তোমার মতামত কী?]
উত্তর ও তাত্ত্বিক সমাধান
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাসাসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত মূসা (আ.) নবুওয়্যাত লাভের পূর্বে মিসরের রাজপ্রাসাদে অবস্থানকালে একদিন এক বনি ইসরাঈলী মুমিনকে এক অত্যাচারী কিবতীর জুলুম থেকে রক্ষা করতে গিয়ে কিবতীকে এক ঘুষি মারেন। এতে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিবতী মারা যায় (﴿فَوَكَزَهُ مُوسَى فَقَضَى عَلَيْهِ﴾)। আপাতদৃষ্টিতে এ ঘটনাকে অনেকে নবিদের নিষ্পাপতা বা ‘ইসমাত’-এর পরিপন্থী মনে করতে পারে। তবে মুফাসসিরীন ও উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটি মূসা (আ.)-এর ‘মা’সূম’ (নিষ্পাপ) হওয়ার মর্যাদায় কোনোভাবেই আঘাত করে না। এর শক্তিশালী যুক্তিসমূহ নিম্নরূপ:
- হত্যার কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা ইচ্ছা ছিল না (قتل الخطأ): হযরত মূসা (আ.)-এর উদ্দেশ্য কিবতীকে হত্যা করা ছিল না; বরং একজন মজলুমকে জালেমের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর শক্তিশালী হাতের একটিমাত্র ঘুসিতে (وکزة) লোকটি অপ্রত্যাশিতভাবে মারা যায়। শরীয়তের পরিভাষায় এটি ‘কতলে খাতা’ (ভুলবশত অনিচ্ছাকৃত হত্যা), যা কোনো অবস্থাতেই কবিরা গুনাহ বা ইচ্ছাকৃত হত্যা নয়।
- ঘটনাটি নবুওয়্যাত লাভের আগের: ঘটনাটি ঘটেছিল মূসা (আ.)-এর মাদয়ান গমন এবং তূর পাহাড়ে নবুওয়্যাত লাভ করার বহু পূর্বে যৌবনকালে। আর আহলুস সুন্নাহর আকিদা অনুযায়ী নবুওয়্যাতের পূর্বে অনিচ্ছাকৃত ভুল হওয়া ইসমাতের পরিপন্থী নয়।
- কিবতী ব্যক্তি ছিল শত্রু ও অত্যাচারী কাফের (كافر حربي): কিবতীরা বনি ইসরাঈলীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করছিল। জালেমকে নিবৃত্ত করতে গিয়ে বলপ্রয়োগ করা জায়েয ছিল।
- তাৎক্ষণিক তাওবা ও আত্মশুদ্ধি: মূসা (আ.) ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই শয়তানের প্ররোচনা বলে অনুতপ্ত হন এবং আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন: ﴿قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ﴾ (সূরা আল-কাসাস: ১৬)। আল্লাহ তাঁর তাৎক্ষণিক ক্ষমা কবুল করে নেন।
অতএব, এই অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা হযরত মূসা (আ.)-এর নিষ্পাপতার (عصمة) পরিপন্থী নয়; বরং এটি ছিল মজলুমকে উদ্ধারের একটি মানবিক ও অনিচ্ছাকৃত পদক্ষেপ।
١٢- قال الله تعالى لنبينا محمد صلى الله عليه وسلم: “واللّٰهُ يعصمك من الناس” وقد وقع ما وقع في طائف وأحد من الكفار ، فما جوابكم فيه؟
[“আল্লাহ আপনাকে লোকদের থেকে হেফাজত করবেন”-আমাদের নবি মুহাম্মদ (স) কে আল্লাহ এমন প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর তাঁর উপর তায়েফ এবং উহুদে কাফেরদের পক্ষ থেকে যে আক্রমণ হলো—সে ব্যাপারে তোমাদের জবাব কী?]
উত্তর ও প্রামাণ্য বিশ্লেষণ
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মায়েদায় আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন:
﴿يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللّٰهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ﴾ (সূরা আল-মায়েদা: ৬৭)।
অর্থাৎ “আল্লাহ আপনাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন।” আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্ন জাগে যে, তায়েফের ময়দানে নবীজির রক্তাক্ত হওয়া এবং ওহুদ যুদ্ধে তাঁর দানদান মুবারক শহীদ হওয়া ও মুখমণ্ডল জখম হওয়া কি এই ঐশী প্রতিশ্রুতির বিপরীত? এ বিষয়ে মুফাসসির ও মুতাকাল্লিমগণ অকাট্য জবাব পেশ করেছেন:
- ঐতিহাসিক ও নাযিল হওয়ার কালক্রম (التاريخ وسياق النزول): সবচেয়ে অকাট্য সমাধান হলো ঐতিহাসিক কালক্রম।
- তায়েফের ঘটনা ঘটেছিল নবুওয়্যাতের দশম বর্ষে মক্কী জীবনে (হিজরতের পূর্বে)।
- ওহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল হিজরী ৩য় সনে মদিনা মুনাওয়ারায়।
- পক্ষান্তরে, সূরা আল-মায়েদার এই আয়াতটি (৬৭ নং আয়াত) নাযিল হয়েছিল সম্পূর্ণ মাদানী জীবনের একেবারে শেষভাগে, হিজরী নবম বা দশম সনে (বিদায় হজের সময়কালের কাছাকাছি)।
সুতরাং যে আয়াতটি উহুদ ও তায়েফের বহু বছর পর নাযিল হয়েছে, তার ভিত্তিতে উহুদ বা তায়েফের ঘটনায় আপত্তি উত্থাপন করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন।
- ‘ইসমাত’ বা সুরক্ষার প্রকৃত তাৎপর্য: মুফাসসিরগণ স্পষ্ট করেছেন যে, এই আয়াতে সুরক্ষার অর্থ হলো: কাফের-মুশরিকরা নবীজি (সা.)-কে হত্যা করতে পারবে না, ইসলাম প্রচারের আগেই তাঁর দাওয়াতকে স্তব্ধ করতে পারবে না এবং দ্বীন বিজয়ী হওয়ার পূর্বে তাঁকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় করতে পারবে না। আল্লাহ তাঁর জীবনকে নবুওয়্যাতের দায়িত্ব পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সুরক্ষিত রেখেছেন। কাফেররা শত চেষ্টা করেও বিষপ্রয়োগ, গুপ্তহত্যা ও যুদ্ধের ময়দানে নবীজিকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
- নবিদের ওপর শারীরিক পরীক্ষা ও মর্যাদা বৃদ্ধি: সাময়িক আঘাত, ক্ষত বা কষ্ট নবুওয়্যাতের মর্যাদাহানি করে না; বরং তা নবিদের ধৈর্য ও উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: “মানুষের মধ্যে নবিগণের ওপরই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে, অতঃপর তাদের পর যারা শ্রেষ্ঠ তাদের ওপর” (তিরমিযী)। উহুদ ও তায়েফের আঘাত ছিল উম্মতের জন্য চরম ধৈর্যের অনুপম শিক্ষা।
সুতরাং, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি শতভাগ সত্য ও বাস্তবায়িত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলাম বিজয় করার পর স্বাভাবিকভাবে পূর্ণাঙ্গ সফলতার সাথে ইহধাম ত্যাগ করেছেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: নবি ও রাসূলের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: প্রত্যেক রাসূলই নবি, কিন্তু প্রত্যেক নবি রাসূল নন। রাসূলের সাথে সাধারণত নতুন কিতাব বা স্বতন্ত্র শরীয়ত থাকে এবং তিনি বিদ্রোহী কওমের নিকট প্রেরিত হন; পক্ষান্তরে নবি পূর্ববর্তী শরীয়ত পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন।
প্রশ্ন ২: নবিগণ কি নবুওয়্যাতের পূর্বে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হতে পারতেন?
উত্তর: না। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকিদা অনুযায়ী নবিগণ নবুওয়্যাতের পূর্বে ও পরে সর্বাবস্থায় কুফর, শিরক ও সর্বপ্রকার কবিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ছিলেন।
প্রশ্ন ৩: পবিত্র কুরআনে সর্বমোট কতজন নবির নাম উল্লেখ করা হয়েছে?
উত্তর: পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ২৫ জন নবি ও রাসূলের পবিত্র নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৪: মু’জিযা ও কারামতের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: মু’জিযা নবুওয়্যাতের দাবিসহ নবির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাভূত করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রকাশিত হয়; আর কারামত কোনো প্রকার দাবি বা প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছাড়াই আল্লাহর ওলী বা সৎ বান্দার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন ৫: হযরত মূসা (আ.) কর্তৃক কিবতী হত্যা কি তাঁর নিষ্পাপতার পরিপন্থী?
উত্তর: না। কারণ তা ছিল নবুওয়্যাতের পূর্বের ঘটনা, এবং তিনি ইচ্ছাকৃত হত্যা করতে চাননি; বরং মজলুমকে বাঁচাতে গিয়ে ভুলবশত অনিচ্ছাকৃত (কতলে খাতা) আঘাতের কারণে কিবতী মারা গিয়েছিল।
প্রশ্ন ৬: ‘ওয়াল্লাহু ইয়া’সিমুকা মিনান নাস’ আয়াত সত্ত্বেও নবীজি (সা.) তায়েফে রক্তক্ষরণের শিকার কেন হলেন?
উত্তর: কারণ সূরা মায়েদার এই আয়াতটি তায়েফের ঘটনার বহু বছর পর মাদানী জীবনের শেষভাগে নাযিল হয়েছিল। এছাড়া এই আয়াতে সুরক্ষা দ্বারা ইসলাম প্রচার পূর্ণ হওয়ার আগে প্রাণনাশের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।