জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আত-তাসাওউফ (At-Tasawwuf) – 201404, আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
20 September, 2026
৫৮ মিনিট পড়ার সময়
১৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা—২০২১
বিভাগ: আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বিষয়: আত-তাসাওউফ (التصوف – ইসলামী আধ্যাত্মিক দর্শন ও আত্মশুদ্ধিতত্ত্ব)
বিষয় কোড: 201404 | প্রশ্নপত্র কোড: 150
পূর্ণমান: ৮০ | সময়: ৪ ঘণ্টা


ভূমিকা ও পাঠ্যক্রম পরিচিতি

ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (IAU)-এর ফাযিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অন্যতম গভীর, রুহানী ও আত্মশুদ্ধিমূলক শাস্ত্রীয় বিষয় হলো ‘আত-তাসাওউফ’ (التصوف – Sufism / Islamic Spirituality), যার প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় কোড ২০১৪০৪। পবিত্র কুরআন ও নববী সুন্নাহর আলোকে মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নাফস), অন্তরের ব্যাধি নিরাময়, আল্লাহর মহব্বত ও মারেফাত অর্জন, ইহসানের স্তর হাসিল এবং সুফী ধারার ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ এই পাঠ্যসূচির প্রধান উপজীব্য। ২০২১ শিক্ষাবর্ষের এই প্রশ্নপত্রে তাসাওউফের সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য, ইতিহাস, আদল ও ইহসান, অন্তরের সুস্থতা ও চিকিৎসা, কারামতের শারঈ স্বরূপ, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর জীবন ও দর্শন এবং তাসাওউফের মৌলিক পরিভাষাসমূহ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নিম্নে প্রশ্নপত্রের প্রতিটি প্রশ্ন ও উপ-প্রশ্নের বিশদ ও তথ্যসমৃদ্ধ একাডেমিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো।


বিভাগ ‘ক’ : রচনামূলক প্রশ্নাবলি (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক)

١- عرف التصوف- ثم بين موضوعه وغرضه وأهميته في حياة الانسان-

[তাসাওউফের সংজ্ঞা দাও। তাসাওউফের আলোচ্য বিষয়, উদ্দেশ্য এবং মানব জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধর।]

১. তাসাওউফ (التصوف)-এর সংজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি:

ক. ব্যুৎপত্তিগত মতভেদ: ‘তাসাওউফ’ শব্দের মূল ধাতু নিয়ে ভাষাবিদ ও পণ্ডিতগণের মধ্যে কয়েকটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে:

  1. আস্-সূফ (الصُّوف – পশম): অধিকাংশ গবেষকের মতে এটি ‘সূফ’ শব্দ থেকে নির্গত। প্রাচীন যুগের দরবেশ ও নবীগণ দুনিয়াত্যাগ ও বিনয়ের প্রতীক হিসেবে মোটা পশমী পোশাক পরিধান করতেন।
  2. আস্-সাফা (الصَّفَاء – পরিচ্ছন্নতা ও নির্মলতা): যে ব্যক্তি তার অন্তরকে যাবতীয় পঙ্কিলতা, রিয়া, হিংসা ও অহংকার থেকে মুক্ত করে আল্লাহর জন্য পবিত্র করেছে, তাকে সূফী বলা হয়। বিশর হাফী (রহ.) বলেন: «الصُّوفِيُّ مَنْ صَفَا قَلْبُهُ لِلَّهِ» (সূফী হলেন তিনি, যাঁর অন্তর আল্লাহর জন্য নিষ্কলুষ)।
  3. আসহাবুস্ সুফফাহ (أصحاب الصُّفَّة): মসজিদে নববীর উত্তর প্রান্তে অবস্থানকারী নিঃস্ব, ত্যাগী ও সারাক্ষণ ইলম ও ইবাদতে মগ্ন সাহাবীগণের আত্মিক জীবনের সাথে সাদৃশ্যের কারণে এই নামকরণ হয়েছে।
  4. আস্-সফ্ফুল আওয়াল (الصَّفُّ الأَوَّل – প্রথম কাতার): অন্তরের আগ্রহ ও মর্যাদার দিক দিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রথম কাতারের অন্তর্ভুক্ত হওয়া।

খ. পারিভাষিক সংজ্ঞা:

  • ইমাম জুনাইদ বাগদাদী (রহ.): «التَّصَوُّفُ أَنْ يُمِيتَكَ الحَقُّ عَنْكَ وَيُحْيِيَكَ بِهِ» (তাসাওউফ হলো—আল্লাহ তোমাকে তোমার আমিত্ব ও কুপ্রবৃত্তি থেকে মৃত্যু দান করবেন এবং তাঁর অনন্ত ভালোবাসার ভেতর তোমাকে পুনরুজ্জীবিত করবেন)।
  • ইমাম মারূফ কারখী (রহ.): «التَّصَوُّفُ الأَخْذُ بِالحَقَائِقِ، وَاليَأْسُ مِمَّا فِي أَيْدِي الخَلَائِقِ» (তাসাওউফ হলো শাশ্বত সত্যকে আঁকড়ে ধরা এবং সৃষ্টির কাছে কোনো কিছুর প্রত্যাশা থেকে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে কেবল আল্লাহর ওপর নির্ভর করা)।
  • শায়খুল ইসলাম যাকারিয়া আল-আনসারী (রহ.): তাসাওউফ এমন এক বিজ্ঞান, যার দ্বারা অন্তরের পরিশুদ্ধি, নৈতিকতার উৎকর্ষ এবং পার্থিব ও পরকালীন স্থায়ী মুক্তি অর্জনের জন্য মানুষের আত্মিক ও বাহ্যিক অবস্থার পুনর্গঠন সাধিত হয়।

২. তাসাওউফের আলোচ্য বিষয় (موضوعه) ও মূল লক্ষ্য/উদ্দেশ্য (غرضه):

  • আলোচ্য বিষয় (الموضوع): তাসাওউফ শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হলো ‘মানুষের অন্তর’ (القلب) এবং ‘আল্লাহর যাত ও সিফাত’। কীভাবে অন্তরকে আত্মিক রোগমুক্ত করে আল্লাহর মারেফাত ও নৈকট্য লাভের উপযুক্ত পাত্রে পরিণত করা যায়, তা-ই এর মূল কেন্দ্রবিন্দু।
  • মূল উদ্দেশ্য (الغرض): তাসাওউফের পরম উদ্দেশ্য হলো ‘মাকামে ইহসান’ (مقام الإحسان) অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি (রিদ্বা) হাসিল। হাদীসে জিবরীলে বর্ণিত—«أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ»—বান্দা এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন সে আল্লাহকে প্রত্যক্ষ দেখছে; আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে সে সুদৃঢ় অনুভব করবে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন।

৩. মানবজীবনে তাসাওউফের গুরুত্ব ও অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা:

  1. আমলের প্রাণ সঞ্চার: ফিকহ শাস্ত্র মানুষের বাহ্যিক আমল (যেমন: নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, ওযুর শর্ত) শুদ্ধ করে; আর তাসাওউফ সেই আমলের ভেতরে ‘ইখলাস’ (আন্তরিকতা) ও ‘খুশু-খুজু’ (বিনম্র একাগ্রতা) দান করে। আত্মিক অনুভূতিহীন আমল প্রাণহীন মৃতদেহের মতো।
  2. অন্তরের মারাত্মক ব্যাধি নিরাময়: হিংসা (হাসাদ), অহংকার (কিবর), আত্মগর্ব (উজ্জ্ব), লোকদেখানো মনোভাব (রিয়া) এমন কিছু গোপন পাপ যা মানুষের সমস্ত নেক আমল জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। তাসাওউফ এই আত্মিক ক্যান্সারগুলোর নির্ভুল চিকিৎসাপদ্ধতি বাতলে দেয়।
  3. পার্থিব মোহ ও ভোগবাদ থেকে মুক্তি: আধুনিক মানুষ ভোগবাদ, অর্থলিপ্সা ও মানসিক হতাশায় জর্জরিত। তাসাওউফ মানুষকে যুহদ (অনাসক্তি), কানাআত (অল্পে তুষ্টি) ও তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা) শিক্ষা দিয়ে আত্মিক প্রশান্তি দান করে।
  4. উচ্চাঙ্গের নৈতিক চরিত্র গঠন: উত্তম চরিত্রই ইসলামের মূল নির্যাস। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الأَخْلَاقِ»। তাসাওউফ মানুষের রূঢ় স্বভাব দূর করে সহনশীলতা, ক্ষমা, বদান্যতা ও বিনয়ের দীক্ষা দেয়।

٢- اذكر تاريخ نشأة علم التصوف وتطوره بالتفصيل-

[সুফিবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ এর ইতিহাস বিস্তারিতভাবে উল্লেখ কর।]

ইসলামী চিন্তাধারায় তাসাওউফ বা সুফিবাদ কোনো বহিরাগত আমদানি নয়; বরং এর বীজ স্বয়ং কুরআন ও নববী সুন্নাহর আত্মিক সাধনার মাঝেই নিহিত ছিল। নিম্নে এর ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের ধারা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো:

  1. নবুওয়াত ও সাহাবা যুগ (বীজ বপন ও বাস্তব সাধনার পর্ব):
    • রাসুলুল্লাহ ﷺ নবুওয়াত লাভের পূর্বে হেরা গুহায় দিনের পর দিন যে নির্জন আত্মনিমগ্ন ধ্যান (তাহান্নুছ) করেছিলেন, তা-ই সুফিবাদের মূল উৎস। মদীনার জীবনে ‘আসহাবুস্ সুফফাহ’ ছিলেন এই আধ্যাত্মিক সাধনার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক জামাত।
    • হযরত আবু বকর, উমর, আলী, আবু যার গিফারী, সালমান ফারসী এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর জীবন ছিল চরম ত্যাগ, দুনিয়াবিমুখতা (যুহদ) ও কৃচ্ছ্রসাধনার অনুপম নমুনা। তখন ‘তাসাওউফ’ নামে কোনো পরিভাষা ছিল না, কারণ সকলের জীবনই ছিল তাসাওউফের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
  2. তাবেয়ী যুগ (যুহদ ও আউলিয়ায়ে কেরামের আত্মপ্রকাশ):
    • উমাইয়া যুগে যখন মুসলিম বিশ্বে সাম্রাজ্য বিস্তার ও অঢেল ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দেখা দেয়, তখন বহু মানুষ পার্থিব ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দেয়। এর বিপরীতে একদল নিষ্ঠাবান মুমিন নির্জনতা ও আল্লাহর ভালোবাসায় মগ্ন হন।
    • তাঁদের শীর্ষনেতা ছিলেন হযরত হাসান বসরী (রহ.) (মৃত ১১০ হি.), যাঁর হৃদয়গ্রাহী বয়ান মানুষকে পরকালের ভয়ে ক্রন্দন করাত। এছাড়া উওয়াইস আল-কারনী, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব এবং নারী সুফী রাবেয়া বসরী (রহ.) নিস্বার্থ ঐশী প্রেমের (হুব্বে ইলাহী) এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
  3. তৃতীয় ও চতুর্থ হিজরী শতাব্দী (তাত্ত্বিক রূপ ও শাস্ত্রীয় সংকলন):
    • এই যুগে সুফিবাদ একটি সুসংহত তাত্ত্বিক রূপ ধারণ করে। বাগদাদের ইমাম জুনাইদ বাগদাদী (রহ.) (মৃত ২৯৭ হি.) তাসাওউফকে কুরআন ও সুন্নাহর আইনি কাঠামোর (শরীয়ত) সাথে নিখুঁতভাবে সমন্বিত করে ‘সায়্যিদুত তায়িফাহ’ (সুফী সমাজের অবিসংবাদিত নেতা) উপাধি লাভ করেন।
    • এই যুগে তাসাওউফের ওপর সর্বপ্রথম অমর মৌলিক গ্রন্থাবলি রচিত হয়: ইমাম আবু নাসর সাররাজ প্রণীত ‘কিতাবুল লুমা’, আবু বকর আল-কালাবাযী প্রণীত ‘আত-তাআররুফ লি মাযহাবি আহলিত তাসাওউফ’, আবু তালিব মাক্কী প্রণীত ‘কূতূল কুলূব’ এবং ইমাম আবুল কাসেম আল-কুশায়রী প্রণীত ‘আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ’।
  4. পঞ্চম শতাব্দী : হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (রহ.)-এর বৈপ্লবিক সংস্কার:
    • হিজরী পঞ্চম শতাব্দীতে একদিকে ফকীহদের শুষ্ক আনুষ্ঠানিকতা এবং অন্যদিকে বাতেনী ও চরমপন্থী দার্শনিকদের বিভ্রান্তির কারণে সুফিবাদের ওপর সংশয় তৈরি হয়েছিল।
    • ইমাম আবু হামিদ আল-গাযালী (রহ.) (মৃত ৫০৫ হি.) তাঁর অমর কালজয়ী মহাকাব্য ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’ (إحياء علوم الدين) রচনার মাধ্যমে ফিকহ ও তাসাওউফের মাঝে এক ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন রচনা করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, শরীয়ত ছাড়া তাসাওউফ পথভ্রষ্টতা এবং তাসাওউফ ছাড়া শরীয়ত প্রাণহীন কঙ্কাল। ফলে তাসাওউফ সমগ্র মুসলিম জাহানে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।
  5. ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে পরবর্তী কাল (সিলসিলা ও তরিকাসমূহের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার):
    • এই যুগে খানকাহ ও সিলসিলার মাধ্যমে তাসাওউফ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। হযরত শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (কাদেরিয়া তরিকা), খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (চিশতিয়া তরিকা), শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা) এবং খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (নকশবন্দিয়া তরিকা)-এর মাধ্যমে সুফিবাদ বিশ্বজুড়ে লক্ষ কোটি মানুষের আত্মিক মুক্তির ঠিকানায় পরিণত হয়।

٣- عرف العدل والإحسان ثم بين أهميتهما وضروتهما موضحا-

[العدل ও الإحسان এর সংজ্ঞা দাও। এতদুভয়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিশদভাবে বর্ণনা কর।]

পবিত্র কুরআনের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই দুটি মহান নীতিকে পাশাপাশি নির্দেশ করেছেন: ﴿إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ﴾ [النحل: ৯০]—যে আয়াতটি জুমার প্রতিটি খুতবায় পঠিত হয়।

১. আল-আদল (العدل)-এর সংজ্ঞা ও তাৎপর্য:

ক. শাব্দিক অর্থ: ‘আদল’ অর্থ ইনসাফ, সুবিচার, সাম্য, ভারসাম্য রক্ষা করা এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে প্রদান করা।

খ. পারিভাষিক রূপ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়: «وَضْعُ الشَّيْءِ فِي مَوْضِعِهِ المُخْتَصِّ بِهِ، وَإِعْطَاءُ كُلِّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ دُونَ زِيَادَةٍ أَوْ نُقْصَانٍ»—অর্থাৎ কোনো বিষয়কে তার সঠিক স্থানে স্থাপন করা এবং কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা বৈষম্য না করে প্রত্যেকের পূর্ণ অধিকার সমর্পণ করাকে আদল বা ন্যায়বিচার বলে। ফিকহ ও রাজনীতিতে এটি সমাজের স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।

২. আল-ইহসান (الإحسان)-এর সংজ্ঞা ও তাৎপর্য:

ক. শাব্দিক অর্থ: ‘ইহসান’ শব্দটি ‘হুসন’ (حسن) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ সৌন্দর্যমণ্ডিত করা, উৎকৃষ্ট রূপ দেওয়া, বদান্যতা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করা।

খ. পারিভাষিক রূপ: তাসাওউফ ও উসূলের দৃষ্টিতে ইহসান হলো ইনসাফ ও ফরজের সীমা ছাড়িয়ে আরও এক ধাপ উঁচুতে উঠে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও পরম সৌন্দর্যের সাথে দায়িত্ব পালন করা। সুফী পণ্ডিতগণ বলেন: «العَدْلُ أَنْ تُعْطِيَ مَا عَلَيْكَ وَتَأْخُذَ مَا لَكَ، وَالإِحْسَانُ أَنْ تُعْطِيَ أَكْثَرَ مِمَّا عَلَيْكَ وَتَأْخُذَ أَقَلَّ مِمَّا لَكَ»—অর্থাৎ আদল হলো তুমি যা দিতে বাধ্য তা দেবে এবং যা তোমার প্রাপ্য তা নেবে; আর ইহসান হলো তুমি তোমার দায়ের চেয়ে বেশি দেবে এবং তোমার পাওনার চেয়ে কম গ্রহণ করবে (বা ক্ষমা করে দেবে)।

৩. মানবজীবনে আদল ও ইহসানের গুরুত্ব ও অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা:

বিবেচ্য ক্ষেত্র আল-আদল (ন্যায়বিচার)-এর ভূমিকা আল-ইহসান (অনুকম্পা ও সৌন্দর্যের) ভূমিকা
১. পারিবারিক জীবন স্ত্রীর দেনমোহর, ভরণপোষণ ও সন্তানদের মাঝে সম্পদের ইনসাফপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত করে। ভুলত্রুটি ক্ষমা করা, আন্তরিক সেবা, পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ত্যাগ দিয়ে সংসারকে জান্নাতসম করে তোলে।
২. সামাজিক স্থিতিশীলতা জুলুম, অত্যাচার ও অপরাধের বিচার করে সমাজে আইনের শাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। দরিদ্রদের গোপনে দান, ক্ষুধার্তকে অন্নদান এবং শত্রুর সাথেও সদাচরণের মাধ্যমে সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে।
৩. ব্যবসা ও অর্থনীতি ওজনে কম না দেওয়া, মাপে সঠিক রাখা, পণ্যের ভেজালমুক্ত মূল্য নির্ধারণ। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে সময় দেওয়া বা ঋণ মওকুফ করা, অতিরিক্ত মুনাফা ত্যাগ করে ক্রেতাকে ছাড় দেওয়া।
৪. ইবাদতের জগত ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ সময়মতো নিয়মমাফিক আদায় করা। আল্লাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হয়ে এমন ভালোবাসায় সালাত পড়া যেন স্বয়ং আল্লাহকে দেখছে।

٤- عرف القلب لغة واصطلاحا- ثم بين انواعه مع بيان طرق احلاحه من الامراض-

[قلب এর পরিচয় দাও। এর প্রকারভেদ বর্ণনা কর। অতঃপর আত্মার ব্যাধিসমূহ নিরাময়ের উপায়গুলো আলোচনা কর।]

১. আল-কালব (القلب)-এর পরিচয়:

  • শাব্দিক অর্থ: ‘কালব’ শব্দের মূল অর্থ উল্টে যাওয়া, পরিবর্তিত হওয়া, অস্থির থাকা বা আবর্তন করা। মানুষের মন প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত ও দোলায়মান হয় বলেই একে ‘কালব’ বলা হয়েছে। হাদীসে এসেছে: «إِنَّمَا سُمِّيَ القَلْبُ مِنْ تَقَلُّبِهِ» (বারবার পরিবর্তনশীল হওয়ার কারণেই কালবের এই নামকরণ)।
  • পারিভাষিক রূপ: ইসলামী তাসাওউফে কালব বলতে কেবল বুকের বাম পাশের মাংসপিণ্ডকে বোঝায় না; বরং তা হলো একটি অদৃশ্য ঐশী ও সূক্ষ্ম রুহানী উপাদান (لطيفة ربانية روحانية), যা মানবদেহের অনুভূতি, ঈমান, প্রজ্ঞা, সংকল্প ও আল্লাহর মারেফাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

২. অন্তরের প্রকারভেদ (أنواع القلوب):

কুরআনুল কারীমের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষের অন্তর প্রধানত চার ভাগে বিভক্ত:

  1. কালবে সালীম বা সুস্থ-নিষ্কলুষ অন্তর (القلب السليم): যা শিরক, কুফর, বিদআত এবং পার্থিব লোভ-লালসা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং আল্লাহর প্রেমে ভরপুর। কিয়ামতের দিন কেবল এই অন্তরই কাজে আসবে (সূরা আশ-শুআরা: ৮৯)।
  2. কালবে মুনীব বা অনুতপ্ত অন্তর (القلب المنيب): যা কোনো গোনাহ হয়ে গেলেই আল্লাহর ভয়ে কেঁদে ওঠে এবং তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে (সূরা ক্বাফ: ৩৩)।
  3. কালবে মাইয়্যিত বা মৃত অন্তর (القلب الميت): যা কুফর, অহংকার ও অবাধ্যতায় এমনভাবে সিলগালা হয়ে গেছে যে, তাতে কোনো সত্যের আলো বা উপদেশ প্রবেশ করে না (সূরা বাক্বারা: ৭)।
  4. কালবে মারীদ্ব বা ব্যাধিগ্রস্ত অন্তর (القلب المريض): যা বেঁচে আছে কিন্তু মারাত্মক আত্মিক রোগে আক্রান্ত। যেমন: মুনাফিকদের অন্তর, যার মধ্যে সন্দেহ, অহংকার ও প্রবৃত্তির তাড়না রয়েছে (সূরা বাক্বারা: ১০: ﴿فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا﴾)।

৩. অন্তরের আত্মিক ব্যাধিসমূহ নিরাময়ের প্রামাণ্য উপায়সমূহ:

  • ১. রব্বানী যিকিরে আত্মনিয়োগ (ذكر الله تعالى): অন্তরের মরচে দূর করার সর্বশ্রেষ্ঠ পালিশ হলো আল্লাহর যিকর। আল্লাহ বলেন: ﴿أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾ [الرعد: ২৮] (জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়)।
  • ২. তিলাওয়াতুল কুরআন ও তাদাব্বুর: অর্থ বুঝে কুরআন তিলাওয়াত অন্তরের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সন্দেহ দূর করে দেয়। কুরআন স্বয়ং অন্তরের শেফা (وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ)।
  • ৩. রিয়া ও অহংকারের মূলোৎপাটনে ইখলাস চর্চা: প্রতিটি আমল কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গোপনে করার অভ্যাস গড়ে তোলা। নফল দান ও তাহাজ্জুদ গোপনে আদায় করা অন্তরের রিয়া দূর করে।
  • ৪. সুহবাতে সালিহীন বা বুজুর্গদের সান্নিধ্য: একজন কামিল পীর বা আল্লাহপ্রেমিক মুত্তাকী আলেমের সান্নিধ্যে থাকা। কুরআন নির্দেশ দেয়: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ﴾ [التوبة: ১১৯]।
  • ৫. স্বল্পাহার ও কুপ্রবৃত্তি দমন (مخالفة النفس): অতিরিক্ত পানাহার ও অনর্থক কথাবার্তা অন্তরকে শক্ত করে দেয়। রোজা রাখা এবং হালাল রিযিক ভক্ষণ অন্তরকে নূরানী করে।

٥- عرف الكرامة- ثم بين حقيقتها وشروطها مفصلا-

[الكرامة এর পরিচয় দাও। অতঃপর এর হাকিকত ও শর্তাবলি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]

১. কারামাত (الكرامة)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:

ক. শাব্দিক অর্থ: ‘কারামাত’ অর্থ সম্মান, মর্যাদা, অনুগ্রহ বা অলৌকিক দান।

খ. পারিভাষিক রূপ: আকাইদ ও তাসাওউফের ইমামগণের মতে: «أَمْرٌ خَارِقٌ لِلْعَادَةِ يَظْهَرُ عَلَى يَدِ عَبْدٍ صَالِحٍ مُسْتَقِيمٍ عَلَى الشَّرِيعَةِ، غَيْرِ مُقَارَنٍ لِدَعْوَى النُّبُوَّةِ»—অর্থাৎ নবুওয়াতের দাবি ব্যতিরেকে শরীয়তের পূর্ণ অনুসারী কোনো মুত্তাকী ওলী বা সৎ বান্দার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম ভেঙে যে অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ করেন, তাকে ‘কারামাত’ বলা হয়।

অলৌকিক ঘটনার তুলনামূলক পার্থক্য:

  • মু’জিযা (معجزة): নবীদের মাধ্যমে নবুওয়াতের প্রমাণের জন্য প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনা।
  • কারামাত (كرامة): নবীর অনুসারী ওলীদের মাধ্যমে প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনা।
  • মাউনা’ত (معونة): সাধারণ বিপদগ্রস্ত মুমিনের জন্য আল্লাহর অপ্রত্যাশিত সাহায্য।
  • ইসতিদরাজ (استدراج): কোনো ফাসিক, কাফির বা জাদুকরের মাধ্যমে তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য প্রকাশিত ধোঁকা।

২. কারামাতের হাকীকত ও কুরআনিক প্রমাণসমূহ:

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো—ওলীদের কারামাত সত্য ও বাস্তব (كرامات الأولياء حق)। কুরআনে বহু কারামাতের ঐতিহাসিক বিবরণ এসেছে:

  1. হযরত মরিয়ম (আ.): তিনি নবী ছিলেন না, কিন্তু আল্লাহর ওলী ছিলেন। মেহরাবে ইবাদতরত অবস্থায় মৌসুম ছাড়াই তাঁর নিকট জান্নাত থেকে শীতকালে গ্রীষ্মের এবং গ্রীষ্মকালে শীতের ফল আসত (সূরা আলে ইমরান: ৩৭)।
  2. আসহাবুল কাহাফ: সেই ঈমানদার যুবকেরা কোনো নবী ছিলেন না; অথচ আল্লাহ তাঁদের গুহার ভেতর তিনশত নয় বছর সশরীরে জীবিত ও অক্ষত রেখেছিলেন (সূরা আল-কাহফ)।
  3. আসিফ ইবনে বারখিয়া: সুলাইমান (আ.)-এর দরবারে একজন ওলী চোখের পলক ফেলার পূর্বেই শত শত মাইল দূর থেকে রানি বিলকিসের সুবিশাল সিংহাসন হাজির করেছিলেন (সূরা আন-নামল: ৪০: ﴿قَالَ الَّذِي عِندَهُ عِلْمٌ مِّنَ الْكِتَابِ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ﴾)।

৩. কারামাত সহীহ হওয়ার অপরিহার্য শর্তাবলি (شروط الكرامة):

  • ১. শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দি (الاستقامة على الشريعة): সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী হতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি বাতাসে উড়ে বা পানির ওপর দিয়ে হাঁটে, কিন্তু শরিয়তের ফরজ-ওয়াজিব লঙ্ঘন করে বা কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকে, তবে তা কারামাত নয়—বরং শয়তানি ধোঁকা বা সিহর। ইমাম আবু ইয়াযীদ বোস্তামী (রহ.) বলেন: ‘কাউকে আকাশে উড়তে দেখলেও ধোঁকা খেও না, যতক্ষণ না দেখবে সে শরীয়তের হালাল-হারাম কতটা মেনে চলে।’ উলামায়ে কেরাম বলেন: «الِاسْتِقَامَةُ فَوْقَ الكَرَامَةِ» (শরীয়তের ওপর অবিচল থাকাই সর্বশ্রেষ্ঠ কারামাত)।
  • ২. নবুওয়াতের দাবি না থাকা: কারামাত প্রকাশকারী কখনোই নবুওয়াত দাবি করতে পারবে না; বরং সে সর্বদা নিজেকে একজন অনুগত উম্মত হিসেবে পেশ করবে।
  • ৩. ব্যক্তিগত অহংকার ও প্রচারবিমুখতা: ওলীগণ কখনো কারামাত দেখানোর জন্য ব্যাকুল থাকেন না; বরং তা প্রকাশ পেয়ে গেলে লজ্জাবোধ করেন যেমন নারীরা ঋতুস্রাব প্রকাশে লজ্জা পায়।
  • ৪. নবীর মু’জিযার শাখা হওয়া: ওলীর কারামাত মূলত তিনি যে নবীর অনুসারী, সেই নবীর মু’জিযারই এক প্রকার পরোক্ষ সত্যায়ন।

٦- اكتب ترجمة حياة الشاه ولى الله المحدث الدهلوى (رح) موجزا-

[শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ) এর জীবনী সংক্ষেপে লেখ।]

১. শুভ জন্ম ও বংশপরিচয়:

উপমহাদেশের ইলমে হাদীসের পুনরুজ্জীবক ও যুগশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ১১১৪ হিজরীর ৪ শাওয়াল (১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দ) দিল্লীর সন্নিকটে ফুলত নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম আহমদ, উপাধি ওয়ালিউল্লাহ এবং কুনিয়াত আবু আব্দুল আযীয। তাঁর পিতা শাহ আব্দুর রহীম (রহ.) ছিলেন দিল্লীর প্রখ্যাত আলিম ও ফতোয়ায়ে আলমগীরীর অন্যতম সংকলক।

২. শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন:

তিনি অত্যন্ত প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়সে কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন এবং পনের বছর বয়সে তৎকালীন প্রচলিত সকল পাঠ্যগ্রন্থ—তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, মানতিক ও চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন শেষ করে পিতার নিকট খেলাফত ও শিক্ষকতার অনুমতি লাভ করেন। পিতার ওফাতের পর তিনি বারো বছর মাদরাসায়ে রহীমিয়ায় পাঠদান করেন। এরপর ১১৪৩ হিজরীতে পবিত্র হজের উদ্দেশ্যে মক্কা ও মদীনায় গমন করেন। সেখানে হারামাইনের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শায়খ আবু তাহির আল-কুরদী এবং শায়খ ওমর আল-মাক্কী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে গভীর ইলমে হাদীস ও সনদ অর্জন করেন।

৩. যুগান্তকারী সংস্কার ও ঐতিহাসিক অবদানসমূহ:

  1. কুরআনের প্রথম ফারসি অনুবাদ (ফাতহুর রহমান): তৎকালীন ভারতবর্ষে ফারসি ভাষা প্রচলিত থাকা সত্ত্বেও মানুষ কুরআন না বুঝে পড়ত। উলামাদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের হেদায়েতের জন্য তিনি সর্বপ্রথম কুরআনের ফারসি অনুবাদ ‘ফাতহুর রহমান ফী তারজুমাতিল কুরআন’ সম্পন্ন করেন।
  2. ইলমে হাদীসের জাগরণ: তাঁর পূর্বে ভারতবর্ষে হাদীসের কুতুবে সিত্তাহর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ছিল না। তিনি মিশকাত ও সিহাহ সিত্তাহর পাঠদান শুরু করে উপমহাদেশের ইলমী বিপ্লব ঘটান। এজন্য তাঁকে ‘মুহাদ্দিসে দেহলভী’ বলা হয়।
  3. অমর কালজয়ী গ্রন্থ ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ (حجة الله البالغة): এটি ইসলামী দর্শন ও শরীয়তের বিধানসমূহের অন্তর্নিহিত রহস্য (আসরারুশ শরীয়াহ) বিষয়ক এক বিশ্বখ্যাত মাস্টারপিস। এতে তিনি আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক ভঙ্গিতে ইসলামের সত্যতা তুলে ধরেছেন।
  4. মাযহাবী মতভেদ ও তাসাওউফের সমন্বয়: তিনি চার মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ দূর করে দলিলভিত্তিক সহনশীলতার ডাক দেন (আল-ইনসাফ গ্রন্থ)। এছাড়া তাসাওউফে মুজাদ্দিদে আলফে সানীর ‘ওয়াহদাতুশ শুহূদ’ এবং ইবনুল আরাবীর ‘ওয়াহদাতুল উজূদ’-এর মধ্যকার দার্শনিক সংঘাত নিরসন করে এক অনুপম সমন্বয় সাধন করেন।
  5. রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ: মারাঠাদের হাত থেকে ভারতবর্ষের মুসলিমদের রক্ষায় তিনি আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালীকে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানান, যার ফলে ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠারা চিরতরে পরাস্ত হয়।

ওফাত: এই মহান মনীষী ১১৭৬ হিজরীর ২৯ মহররম (১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দ) দিল্লীতে ইন্তেকাল করেন এবং মেহেন্দিয়ান কবরস্থানে সমাহিত হন।


বিভাগ ‘খ’ : সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (যেকোনো ৪টি প্রশ্নের উত্তর আবশ্যক)

٧- بين طرق التصوف- (সুফিবাদের বিভিন্ন তরিকাসমূহ বর্ণনা কর)

মুসলিম বিশ্বের সুফী সাধকগণ আত্মশুদ্ধির সুবিধার্থে বিভিন্ন পদ্ধতি বা ‘তবিকা’ (طريقة) গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে প্রধান চারটি সিলসিলা সর্বজনবিদিত:

  • ১. কাদেরিয়া তরিকা (الطريقة القادرية): সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) (মৃত ৫৬১ হি.) কর্তৃক বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত। এর বৈশিষ্ট্য হলো শরীয়তের নিখুঁত পাবন্দি, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল এবং উচ্চৈঃস্বরে যিকির (যিকরে জলী)।
  • ২. চিশতিয়া তরিকা (الطريقة الششتية): খাজা আবু ইসহাক শামী কর্তৃক চিশত শহরে সূচিত এবং খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী আজমীরী (রহ.) কর্তৃক ভারতবর্ষে প্রচারিত। বৈশিষ্ট্য হলো তীব্র প্রেম (ইশক্বে ইলাহী), বিনয়, মানবসেবা ও আত্মবিলোপ।
  • ৩. নকশবন্দিয়া তরিকা (الطريقة النقشبندية): খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ বোখারী (রহ.) (মৃত ৭৯১ হি.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। বৈশিষ্ট্য হলো সম্পূর্ণ নিঃশব্দে অন্তরের যিকির (যিকরে খফী), সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ এবং রাজদরবার ও সমাজের সংস্কার। মুজাদ্দিদে আলফে সানী এই তরিকার অন্যতম ইমাম।
  • ৪. সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা (الطريقة السهروردية): শায়খ আবু নাজীব সোহরাওয়ার্দী ও শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। বৈশিষ্ট্য হলো কঠোর সংযম, নির্জন ইবাদত এবং জ্ঞানভিত্তিক আত্মশুদ্ধি।

٨- عرف الوجد والتواجد والوجود- (الوجد, التواجد ও الوجود এর সংজ্ঞা)

তাসাওউফে যিকির ও সামার মজলিসে অন্তরের ভাবাবেগের তিনটি ক্রমউন্নয়ন পর্যায় রয়েছে:

  1. আত-তাওয়াজুদ (التواجد – ভাবোচ্ছ্বাসের প্রয়াস): বান্দা যখন নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যিকির ও কান্নার মাধ্যমে অন্তরে কৃত্রিমভাবে আল্লাহর ভীতি বা ভালোবাসার অনুভূতি জাগ্রত করার চেষ্টা করে। এটি প্রথম স্তর।
  2. আল-ওয়াজদ (الوجد – অনাবিল ভাবোচ্ছ্বাস): যখন কোনো প্রকার চেষ্টা ছাড়াই অপ্রত্যাশিতভাবে আল্লাহর মহব্বত, ভয় বা কুরআন শ্রবণে অন্তরে এমন এক অলৌকিক ভাবতরঙ্গ সৃষ্টি হয়, যার ফলে শরীর কেঁপে ওঠে বা অশ্রু ঝরে পড়ে। এটি মধ্যম স্তর।
  3. আল-উজূদ (الوجود – আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ): ওয়াজদের উত্তাল তরঙ্গ শান্ত হয়ে যখন বান্দা আত্মবিস্মৃত হয়ে পরম প্রতিপালকের অবিরাম আধ্যাত্মিক উপস্থিতি ও সান্নিধ্যে স্থায়ী শান্তি লাভ করে। ইমাম জুনাইদ বলেন: ‘তাওয়াজুদ হলো সূচনা, ওয়াজদ হলো মধ্যবর্তী অবস্থা এবং উজূদ হলো পূর্ণতার চূড়া।’

٩- عرف البيعة ثم بين أقسامها- (বাইয়াতের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ)

সংজ্ঞা: ‘বাইয়াত’ (البيعة) শব্দের মূল অর্থ বিক্রি করা বা চুক্তি সম্পাদন করা। শরীয়তের পরিভাষায়, কোনো যোগ্য ইমাম বা শায়খের হাতে হাত রেখে কুরআন ও সুন্নাহর বিধান মেনে চলার এবং আত্মশুদ্ধি ও দ্বীনের রাস্তায় অটল থাকার যে পবিত্র অঙ্গীকার করা হয়, তাকে বাইয়াত বলে।

প্রকারভেদ: ইতিহাসে বাইয়াত চার প্রকার:

  • ১. বাইয়াতুল ইসলাম (بيعة الإسلام): কাফিরের ইসলাম গ্রহণের সময় কালেমা পাঠের মাধ্যমে অনুগত হওয়ার অঙ্গীকার।
  • ২. বাইয়াতুল জিহাদ (بيعة الجهاد): যুদ্ধের ময়দানে জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের শপথ (যেমন: হুদায়বিয়ায় বাইয়াতে রিদওয়ান)।
  • ৩. বাইয়াতুল খিলাফাহ বা ইমামাহ (بيعة الخلافة): মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্যের শপথ।
  • ৪. বাইয়াতুত ত্বরীক্বাহ বা ইরশাদ (بيعة الطريقة والإرشاد): একজন কামিল পীর বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের কাছে তওবা করে আত্মশুদ্ধি ও গুনাহমুক্ত জীবনযাপনের শপথ।

١٠- عرف الولى والولاية ثم بين اهميتها- (ওলী ও বেলায়েতের পরিচয় এবং এর গুরুত্ব)

১. পরিচয়:

  • আল-ওলী (الولي): ওলী অর্থ বন্ধু, নৈকট্যপ্রাপ্ত বা সাহায্যকারী। শরীয়তের পরিভাষায়, যে ব্যক্তি বিশুদ্ধ ঈমান, পরিপূর্ণ সুন্নাতের অনুসরণ এবং সার্বক্ষণিক তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর একান্ত প্রিয়পাত্র ও নৈকট্যধন্য হন, তাকে ‘ওলী’ বলা হয়। কুরআন বলে: ﴿أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ۝ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ﴾ [يونس: ৬২-৬৩]।
  • আল-বেলায়েত (الولاية): আল্লাহর সাথে বান্দার যে পরম নৈকট্য, আধ্যাত্মিক বন্ধুত্ব ও মুহাব্বতের সম্পর্ক তৈরি হয়, সেই আত্মিক মর্যাদাপূর্ণ স্তরকে ‘বেলায়েত’ বলে।

২. গুরুত্ব: বেলায়েত হলো মানবজীবনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক মর্যাদা। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন: «مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالحَرْبِ» (যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেই)। ওলীগণের উসিলায় আল্লাহ সমাজে রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেতনা দূর করেন।

١١- ما الفرق بين المجاهدة والمحاسبة والمراقبة- (মুজাহাদা, মুহাসাবা ও মুরাকাবার মধ্যকার পার্থক্য)

পরিভাষা মূল ভাবার্থ শারঈ ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
১. আল-মুজাহাদাহ (المجاهدة) কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম নফসের খারাপ কামনা-বাসনা দমন করতে নফল ইবাদত, ক্ষুধা ও ত্যাগের কঠোর অনুশীলন করা (কুরআন: ২৯:৬৯)।
২. আল-মুহাসাবাহ (المحاسبة) আত্ম-সমালোচনা বা হিসাব গ্রহণ প্রতি রাতে ঘুমানোর পূর্বে সারাদিনের প্রতিটি কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া। হযরত উমর (রা.) বলেন: «حَاسِبُوا أَنْفُسَكُمْ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبُوا»।
৩. আল-মুরাকাবাহ (المراقبة) সার্বক্ষণিক ঐশী নজরদারির ধ্যান বান্দা প্রতি মুহূর্তে অন্তরে এই ধ্যান বজায় রাখবে যে—‘আল্লাহ আমাকে দেখছেন, শুনছেন এবং তিনি আমার সাথে আছেন।’

١٢- ما معنى الحسد والنميمة والغيبة؟- (হাসাদ, নামীমা ও গীবত-এর অর্থ)

  1. আল-হাসাদ বা হিংসা (الحسد): অন্যের কোনো নিয়ামত, সুখ বা মর্যাদা দেখে অন্তরে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হওয়া এবং সেই নিয়ামত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: «إِيَّاكُمْ وَالحَسَدَ، فَإِنَّ الحَسَدَ يَأْكُلُ الحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النَّارُ الحَطَبَ» (তোমরা হিংসা থেকে বাঁচো; নিশ্চয় হিংসা নেক আমলসমূহকে এমনভাবে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় যেমন আগুন শুকনো কাঠকে পোড়ায়)।
  2. আন-নামীমাহ বা চোগলখোরী (النميمة): দুই ব্যক্তি বা দলের মধ্যে বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি করার অসৎ উদ্দেশ্যে একজনের গোপন কথা অন্যজনের কাছে লাগিয়ে দেওয়া। হাদীসে এসেছে: «لَا يَدْخُلُ الجَنَّةَ قَتَّاتٌ (نَمَّامٌ)» (চোগলখোর ব্যক্তি কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না)।
  3. আল-গীবত বা পরনিন্দা (الغيبة): কোনো ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো শারীরিক, চারিত্রিক বা সামাজিক দোষ আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে। কুরআন একে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো ঘৃণ্য পাপ বলেছে (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

  1. প্রশ্ন: তাসাওউফ শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য কী?
    উত্তর: মানবাত্মাকে যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত করে অন্তরে ইখলাস ও আল্লাহর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যের অনুভূতি (মাকামে ইহসান) অর্জন করা।
  2. প্রশ্ন: শরীয়ত ও তাসাওউফের সম্পর্ক কেমন?
    উত্তর: শরীয়ত হলো ইসলামের বাহ্যিক ভিত্তি ও শরীর, আর তাসাওউফ হলো তার অভ্যন্তরীণ প্রাণ ও রূহ; একটি ছাড়া অপরটি অর্থহীন ও অচল।
  3. প্রশ্ন: কারামাত ও মু’জিযার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
    উত্তর: মু’জিযা প্রকাশ পায় নবীদের মাধ্যমে নবুওয়াতের প্রমাণের উদ্দেশ্যে; আর কারামাত প্রকাশ পায় শরীয়ত অনুসারী ওলীদের মাধ্যমে কোনো নবুওয়াতের দাবি ছাড়া।
  4. প্রশ্ন: শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব কোনটি?
    উত্তর: তাঁর অমর মাস্টারপিস হলো ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’, যাতে তিনি ইসলামী শরীয়তের প্রতিটি বিধানের সূক্ষ্ম দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন।
  5. প্রশ্ন: তাসাওউফে প্রধান চারটি সিলসিলা কী কী?
    উত্তর: বিশ্বজুড়ে সমাদৃত চারটি প্রধান তরিকা হলো কাদেরিয়া, চিশতিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া এবং নকশবন্দিয়া তরিকা।
  6. প্রশ্ন: অন্তরের রোগ নিরাময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় কী?
    উত্তর: সার্বক্ষণিক আল্লাহর যিকির, অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত, তওবা-ইস্তিগফার এবং কামিল বুজুর্গদের সান্নিধ্য অবলম্বন করা।

উপসংহার ও পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা

ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাযিল সম্মান ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘আত-তাসাওউফ’ (বিষয় কোড: ২০১৪০৪) প্রশ্নপত্রটি অত্যন্ত উচ্চমার্গীয় ও রুহানী জ্ঞানতত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পরীক্ষায় ভালো নম্বর অর্জনের জন্য শুধুমাত্র সাধারণ আলোচনা না লিখে মূল আরবি পারিভাষিক সংজ্ঞা, কুরআন ও হাদীসের আয়াত ও নস, বিখ্যাত সুফী ইমামগণের উক্তি এবং তুলনামূলক ছক উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। এই সমাধানের প্রতিটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের সর্বশেষ মান অনুযায়ী সাজানো হয়েছে, যা পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সাফল্য নিশ্চিত করবে ইনশাআল্লাহ।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜