ফাযিল (স্নাতক) সম্মান প্রথম বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪
আল হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ
বাংলা
বিষয় কোড : 202104 | সময় : ৪ ঘণ্টা | মান : ৮০
২০২৪ সালের ফাজিল ১ম বর্ষ আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের পরীক্ষার্থীদের জন্য বাংলা বিষয়ের ক, খ, গ এবং ঘ বিভাগের মূল প্রশ্নপত্রের শতভাগ অবিকল প্রতিটি প্রশ্ন, বিকল্প ও ব্যাকরণ অংশের প্রামাণ্য অ্যাকাডেমিক সমাধান নিচে প্রস্তুত করে দেওয়া হলো।
ক বিভাগ (মান— ১০ x ২ = ২০)
১। (ক) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর।
ভূমিকা: মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বরু চণ্ডীদাস রচিত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য এক অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী সৃষ্টি। বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ ১৯০৯ সালে বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের গোয়ালঘরের মাচা থেকে এ কাব্যের প্রাচীন পুঁথি আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে তা প্রকাশ করেন।
১. মধ্যযুগের আদি নিদর্শন: চর্যাপদের পর মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের খাঁটি আদি নিদর্শন হিসেবে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একক মর্যাদার অধিকারী। এটি বাংলা ভাষার আদি-মধ্য স্তরের ব্যাকরণগত ও ভাষাতাত্ত্বিক রূপ স্পষ্টভাবে ধারণ করে আছে।
২. নাট্যগীতি বা ঝুমুর গানের প্রভাব: কাব্যটি মূলত রাধা, কৃষ্ণ ও বড়ায়ির পারস্পরিক সংলাপমূলক উক্তি-প্রত্যুক্তির মাধ্যমে রচিত। এতে ১৩টি খণ্ড রয়েছে এবং এটি প্রাচীন বাংলা নাট্যসাহিত্যের প্রাথমিক পূর্বাভাস বহন করে।
৩. মানবীয় প্রেমের বিকাশ: বৈষ্ণবীয় অলৌকিক আধ্যাত্মিকতার আবরণে আবৃত হলেও এতে সাধারণ বাঙালি মানব-মানবীর প্রেম, বিরহ, মান-অভিমান এবং সমাজের বাস্তব চিত্র সজীব হয়ে উঠেছে। কৃষ্ণ এখানে ঈশ্বরত্ব হারিয়ে বাস্তবের পল্লী রাখাল যুবকে এবং রাধা সাধারণ পল্লীবালিকায় রূপায়িত হয়েছে।
৪. ছন্দ ও অলংকার: পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের সাবলীল গতি এবং দেশীয় অলংকারের সার্থক প্রয়োগ বাংলা কাব্যভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে।
উপসংহার: ভাষাতাত্ত্বিক দলিল এবং কাব্যরস উভয় বিচারেই বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশের ধারায় ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ এক অনন্য অমূল্য সম্পদ।
অথবা,
(খ) টীকা লেখ :
(i) চর্যাপদ
চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম প্রামাণ্য নিদর্শন। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের রয়েল লাইব্রেরি থেকে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামে এর পুঁথি আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশ করেন। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘ODBL’ গ্রন্থে এর ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। চর্যাপদের পদগুলো মূলত সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের (লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা প্রমুখ) গুহ্য সাধনপ্রণালী ও ধর্মীয় তত্ত্ববিষয়ক গীতিসংকলন। সন্ধ্যা ভাষার প্রতীকী আড়ালে এতে তৎকালীন প্রাচীন বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ডোম্বী, শবরী, নদ-নদী, নৌকা এবং সামাজিক রীতিনীতির বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।
(ii) লাইলী-মজনু
মধ্যযুগের মুসলিম প্রণয়োপাখ্যানের ধারায় দৌলত উজির বাহরাম খান রচিত ‘লাইলী-মজনু’ এক অতুলনীয় রোমান্টিক আখ্যানকাব্য। পারস্যের মহাকবি নিজামী গঞ্জনভীর ফারসি কাব্য ‘লাইলী ও মজনুন’ অবলম্বনে বাহরাম খান চট্টগ্রামের অধিপতি নেজাম শাহ সুরের পৃষ্ঠপোষকতায় ষোড়শ শতাব্দীতে এটি রচনা করেন। কায়েস (মজনু) ও লাইলীর আত্মিক ও নিঃস্বার্থ প্রেমের করুণ আখ্যান এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মধ্যযুগের প্রচলিত অলৌকিক দেব-দেবীর প্রভাবমুক্ত হয়ে খাঁটি মানবিক প্রেম ও মনস্তত্ত্বের রূপায়ণে কাব্যটি মধ্যযুগীয় ধারায় এক বিশিষ্ট মাইলফলক।
২। (ক) বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা বর্ণনা কর।
ভূমিকা: বাংলা গদ্য সাহিত্যের উন্মেষ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপনে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (প্রতিষ্ঠিত: ৪ মে ১৮০০) অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে। ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতি শিক্ষার উদ্দেশ্যে কলেজটি স্থাপিত হয়।
১. বাংলা বিভাগের সূচনা ও কেরীর নেতৃত্ব: ১৮০১ সালে উইলিয়াম কেরীর নেতৃত্বে বাংলা বিভাগ খোলা হয়। তিনি দেশীয় পণ্ডিত ও মুনশিদের একত্রিত করে পাঠ্যপুস্তক রচনার উদ্যোগ নেন। কেরী রচিত ‘কথোপকথন’ (১৮০১) ও ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২) কথ্য ও সাধু গদ্যের অন্যতম নিদর্শন।
২. বিশিষ্ট পণ্ডিতবর্গের সাহিত্যকর্ম:
- মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার: তাঁর রচিত ‘বত্রিশ সিংহাসন’ (১৮০২), ‘হিতোপদেশ’ (১৮০৮), ‘রাজাবলী’ (১৮০৮) এবং ‘প্রবোধচন্দ্রিকা’ (১৮১৩) বাংলা সাধু গদ্যে ও তৎসম শব্দভাণ্ডারে নতুন মাত্রা যোগ করে।
- রামরাম বসু: রচিত ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ (১৮০১) কোনো বাঙালি লেখকের প্রথম মৌলিক গদ্যগ্রন্থ এবং ‘লিপিমালা’ (১৮০২)।
- অন্যান্য পণ্ডিত: গোলকনাথ শর্মার ‘হিতোপদেশ’, তারিণীচরণ মিত্রের ‘ওরিয়েন্টাল ফেবুলিস্ট’ প্রভৃতি গ্রন্থ গদ্যকে পাঠোপযোগী রূপ দেয়।
৩. বাক্যরীতি ও কাঠামোর বিকাশ: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকদের হাত ধরেই বাংলা বাক্যের অন্বয়, যতিচিহ্নের প্রাথমিক প্রয়োগ ও ব্যাকরণগত কাঠামো একটি সুশৃঙ্খল রূপ লাভ করে।
উপসংহার: যদিও তাদের গদ্য ছিল মূলত অনুবাদভিত্তিক ও কিছুটা আড়ষ্ট, তবুও বাংলা সাহিত্যের আধুনিক গদ্যের শৈশবভূমি ছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।
অথবা,
(খ) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম গদ্যশিল্পী হিসেবে মীর মশাররফ হোসেনের কৃতিত্বের পরিচয় দাও।
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগে মুসলিম সমাজের জাগরণ ও আধুনিক কথাসাহিত্য বিনির্মাণে মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) ছিলেন অগ্রণী পুরুষ। তিনিই প্রথম সফল আধুনিক মুসলিম ঔপন্যাসিক ও গদ্যশিল্পী।
১. বিষাদ-সিন্ধু ও মহাকাব্যিক গদ্য: তাঁর অমর কীর্তি ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (১৮৮৫-১৮৯১)। কারবালার ঐতিহাসিক করুণ ঘটনা অবলম্বনে রচিত এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক রোমান্স ও ট্র্যাজেডি। এর সুললিত ও ভাবগম্ভীর গদ্য ভাষা বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন সম্পদ।
২. সামাজিক নাটক ও প্রহসন: ‘জমিদার দর্পণ’ (১৮৭৩) নাটকে নীলকর ও শোষক জমিদারদের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। এ ছাড়া ‘বসন্তকুমারী’ নাটক এবং ‘এ কী কোলি’ প্রহসনে সমাজের কুসংস্কার তুলে ধরা হয়।
৩. আত্মজীবনীমূলক সাহিত্য: ‘আমার জীবনী’ এবং ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ গ্রন্থে তৎকালীন সামাজিক অবক্ষয়, ভণ্ডামি ও ব্যক্তিগত জীবনের অকপট সত্য ফুটিয়ে তুলেছেন।
উপসংহার: বিশুদ্ধ সাধু গদ্যরীতি নির্মাণে এবং মুসলিম সমাজকে সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে মীর মশাররফ হোসেনের কৃতিত্ব অসামান্য।
খ বিভাগ (মান— ১০ x ২ = ২০)
৩। (ক) ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধ অবলম্বনে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষা চিন্তার পরিচয় দাও।
ভূমিকা: বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত ‘আমাদের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধটি তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক বলিষ্ঠ তাত্ত্বিক দলিল।
১. মাতৃভাষার মর্যাদা ও আবশ্যকতা: ড. শহীদুল্লাহ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা এবং সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত ও অপরিহার্য। তিনি বলেন, মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে কোনো জাতির সামগ্রিক উন্নতি সম্ভব নয়।
২. জাতীয় সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মূল্যায়ন: প্রবন্ধে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন—আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়েও বড় সত্য আমরা বাঙালি। ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও ভাষাগত ঐক্যই আমাদের প্রধান পরিচয়।
৩. কৃত্রিম লিপির চক্রান্তের খণ্ডন: ইসলামি ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে বাংলা বর্ণমালার বদলে আরবি বা রোমান হরফে বাংলা লেখা বা জোরপূর্বক উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার হীন চক্রান্তকে তিনি ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক যুক্তি দিয়ে নস্যাৎ করেন।
উপসংহার: ভাষা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর প্রগতিশীল, বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মূল বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
অথবা,
(খ) ‘তৈল’ প্রবন্ধে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাঙালি চরিত্রের যে নির্মল সত্যচিত্র প্রকাশ করেছেন তার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা: মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ একটি অনবদ্য ব্যঙ্গাত্মক ও সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক প্রবন্ধ। রূপক অর্থে ‘তৈল’ অর্থাৎ তোষামোদ বা চাটুকারিতার সর্বজনীন প্রভাবকে তিনি সরস ভঙ্গিতে উন্মোচিত করেছেন।
১. তোষামোদের সর্বব্যাপী শক্তি: প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন তৈল অত্যন্ত স্নেহপদার্থ এবং তা জগৎকে মসৃণ রাখে। সমাজে যোগ্যতা ও প্রতিভার চেয়ে তৈলমর্দন বা তেল মারার ক্ষমতা মানুষকে সহজে পদোন্নতি, প্রতিষ্ঠা ও পার্থিব সাফল্য এনে দেয়।
২. বাঙালি চরিত্রের দুর্বলতা: বাঙালি চরিত্রের মেরুদণ্ডহীনতা ও কৃত্রিম স্তাবকতাকে তিনি তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। ব্রিটিশ আমলে কীভাবে তৈল দানের গুণে মানুষ ‘রায়বাহাদুর’ বা পদ-পদবি লাভ করত, তার বাস্তব রূপ তিনি তুলে ধরেছেন।
৩. ব্যঙ্গ ও রসবোধের মেলবন্ধন: গভীর সামাজিক ব্যাধিকে নিপুণ কৌতুক ও উপমার আবরণে পরিবেশন করে প্রাবন্ধিক পাঠককে আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছেন।
উপসংহার: হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর তৈল বিষয়ক পর্যবেক্ষণ কেবল তৎকালীন সমাজের জন্যই নয়, বরং বর্তমান স্বার্থান্বেষী সমাজব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সমান সত্য।
৪। (ক) ‘সমাপ্তি’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা কর।
ভূমিকা: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্প ‘সমাপ্তি’-তে চঞ্চল, দুরন্ত পল্লীবালিকা মৃন্ময়ীর পরিণয়-পরবর্তী কিশোরী মানসের প্রৌঢ় নারীতে রূপান্তরের চিত্র চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
১. কাহিনি সংক্ষেপ: অপূর্ব শিক্ষিত ও আধুনিক যুবক। সে প্রচলিত সামাজিক ধারার বাইরে গিয়ে গ্রামের দুরন্ত ও স্বাধীনচেতা বালিকা মৃন্ময়ীকে ভালোবেসে বিয়ে করে। কিন্তু বিয়ের পরেও মৃন্ময়ীর চঞ্চলতা ও বাঁধনহীন আচরণ সংসারের বন্ধনকে অস্বীকার করে।
২. মানসিক রূপান্তর ও নামকরণের ব্যঞ্জনা: অপূর্বর প্রতি উপেক্ষা এবং পরবর্তীতে তার অনুপস্থিতিতে মৃন্ময়ীর অন্তরে ভালোবাসার সুপ্ত অঙ্কুরোদ্গম ঘটে। বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় সে নিজের ভেতরের কিশোরী চপলতার ইতি টেনে পরিণত গৃহিণী ও প্রেমময়ী নারীতে রূপান্তরিত হয়। গল্পের শেষে অপূর্বর প্রত্যাবর্তনে তাদের মিলন ঘটে এবং মৃন্ময়ীর অহং ও দূরত্বের ‘সমাপ্তি’ সূচিত হয়।
উপসংহার: দাম্পত্য জীবনের দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি ও কিশোরীসুলভ চঞ্চলতার অবসান ঘটিয়ে পরিপূর্ণ প্রেমের সূচনা হওয়ায় ‘সমাপ্তি’ নামকরণটি শিল্পসম্মত ও সার্থক হয়েছে।
অথবা,
(খ) কাজী নজরুল ইসলামের ‘শিউলিমালা’ গল্প অবলম্বনে শিউলি চরিত্র বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রোমান্টিক ছোটগল্প ‘শিউলিমালা’-র কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র শিউলি। নিঃশব্দ প্রেম, আত্মত্যাগ ও সামাজিক সংস্কারের টানাপোড়েনে চরিত্রটি এক ট্র্যাজিক মহিমায় উজ্জ্বল।
১. গভীর অন্তর্মুখী প্রেম: শিউলি সংগীতে পারদর্শী যুবক শেফালির কণ্ঠে মোহিত হয়ে তার প্রেমে পড়ে। তার ভালোবাসা ছিল প্রকাশহীন, নিঃশব্দ ও আত্মনিবেদিত—ঠিক যেমন রাতের আঁধারে ফোটা সুবাসিত শিউলি ফুল ভোরের আলোয় ঝরে পড়ে।
২. সামাজিক দ্বিধা ও বেদনা: পারিপার্শ্বিক সংস্কার ও পারিবারিক বাস্তবতার কারণে শিউলি তার ভালোবাসাকে প্রকাশ্যে রূপ দিতে পারেনি। নীরবে হৃদয়ের রক্তক্ষরণ সহ্য করে সে প্রেমের স্মৃতিকে লালন করেছে।
উপসংহার: নজরুল শিউলি চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রেমিকার গভীর ভাবাবেগ, করুণ পরিণতি ও আত্মত্যাগের চিরন্তন মানবিক রূপ তুলে ধরেছেন।
গ বিভাগ (মান— ১০ x ২ = ২০)
৫। (ক) ‘কোমলতা ও কঠোরতার অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত এক অনন্য চরিত্র হযরত উমর ফারুক (রা)।’ – উক্তিটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর ফারুক’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর ব্যক্তিস্বভাবের এক বিরল ও অপূর্ব বৈপরীত্য—কোমলতা ও কঠোরতার সুষম মেলবন্ধন জীবন্ত রূপ লাভ করেছে।
১. চরিত্রের কোমল রূপ (মানবপ্রেম ও সহানুভূতি): প্রজাবৎসল খলিফা হিসেবে উমর (রা.)-এর হৃদয় ছিল কুসুমকোমল। গভীর রাতে মদিনার অলিগলিতে ছদ্মবেশে ঘুরে অনাহারক্লিষ্ট ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না শুনে তিনি ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। রাজভাণ্ডার থেকে নিজ কাঁধে আটার বস্তা বহন করে নিয়ে অসহায় মায়ের ঘরে পৌঁছে দেওয়া এবং নিজ হাতে রুটি তৈরি করে ক্ষুধার্ত শিশুদের মুখে তুলে দেওয়া তাঁর অতুলনীয় কোমল হৃদয়ের সাক্ষ্য দেয়। জেরুজালেম যাত্রাকালে মরুভূমির তপ্ত বালুতে ভৃত্যকে উটের পিঠে বসিয়ে নিজে উটের রশি টেনে হেঁটে চলার মধ্যে ফুটে ওঠে তাঁর অপার ভ্রাতৃত্ব ও মহানুভবতা।
২. চরিত্রের কঠোর রূপ (ন্যায়ের শাসন ও আপসহীনতা): সত্য, ন্যায় ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন বজ্রের মতো কঠোর। অপরাধী যত আপনজনই হোক না কেন, আল্লাহর বিধান কার্যকরে তিনি কখনো দ্বিধা করেননি। অন্যায়, মিথ্যা ও অহংকারের বিরুদ্ধে তাঁর তরবারি ছিল সর্বদা উদ্যত। তিনি মদ্যপানের অপরাধে নিজ পুত্র আবু শাহমাকে শাস্তি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।
উপসংহার: একদিকে অসহায় প্রজার জন্য ক্রন্দনরত কোমল হৃদয়, অন্যদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন কঠোরতা—এ দুই বিপরীত গুণের অপূর্ব সমন্বয়ই উমর ফারুক (রা.)-কে বিশ্ব ইতিহাসের এক কালজয়ী রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে।
অথবা,
(খ) “‘বনলতা সেন’ একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা।” – উক্তিটির যথার্থতা বিশ্লেষণ কর।
ভূমিকা: জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে রোমান্টিক চেতনা ও ক্লাসিক্যাল সৌন্দর্যের এক অনুপম সৃষ্টি। ক্লান্ত নাগরিক জীবনের হতাশা থেকে চিরন্তন শান্তির আশ্রয়ে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা এতে মূর্ত হয়েছে।
১. সময় ও দূরত্বের ব্যাপ্তি: “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে”—সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর পর্যন্ত কবির অনন্ত ঐতিহাসিক অভিযাত্রা আধুনিক মানুষের অস্তিত্ববাদী অন্বেষার প্রতীক।
২. শান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক: ঐতিহাসিক ক্লান্তির অবসান ঘটে বনলতা সেনের রূপ ও সান্নিধ্যে। “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য”—অতুলনীয় উপমায় কবি বনলতা সেনকে একাধারে মানবী এবং চিরন্তন শান্তির নীড় হিসেবে নির্মাণ করেছেন।
৩. অনন্য ছন্দ ও আবহ: কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে ধ্বনিমাধুর্য, বিষাদ এবং ধীরলয়ের চিত্রকল্প যা পাঠককে এক স্বপ্নময় জগতে নিয়ে যায়।
উপসংহার: আধুনিক মানুষের একাকীত্ব, ক্লান্তি এবং সৌন্দর্যের মাধ্যমে তার উত্তরণের চিরন্তন প্রকাশ হিসেবে ‘বনলতা সেন’ নিঃসন্দেহেই একটি অসামান্য আধুনিক কবিতা।
৬। (ক) ‘বলাকা’ কবিতার মূলভাব ও কাব্য সৌন্দর্যের পরিচয় দাও।
ভূমিকা: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের দার্শনিক কাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ‘বলাকা’। কাশ্মীরের ঝিলম নদীর তীরে বসে উড়ন্ত বুনো হাঁসের ঝাঁক দেখে কবির চিত্তে যে চিরন্তন গতির অনুভূতি জেগে উঠেছিল, তারই সার্থক প্রকাশ এ কবিতা।
১. মূলভাব—গতিবাদ ও রূপান্তর: বিশ্বজগৎ স্থির নয়, তা চিরন্তন চলমান ও রূপান্তরশীল। বুনো হাঁসের ডানার শব্দে কবি উপলব্ধি করেছেন যে নিখিল সৃষ্টি অবিরাম উড়ে চলেছে অচেনা দূরত্বের পানে। পর্বত, অরণ্য ও নদী কেউই স্থবির নয়—গতির আবেগে সবাই চঞ্চল। উপনিষদের ‘চরৈবেতি’ মন্ত্রের অনুরণন ঘটেছে এই কবিতায়।
২. ছন্দের মুক্তি ও কাব্যসৌন্দর্য: প্রচলিত মাত্রাবৃত্ত বা পয়ারের শৃঙ্খলা ভেঙে কবি মুক্তক ছন্দের ব্যবহার করেছেন। চরণের অসমান দৈর্ঘ্য উড়ন্ত পাখির ডানার ওঠানামা ও বাতাসের তরঙ্গকে মূর্ত করে তুলেছে। চিত্রকল্প ও সুরের মেলবন্ধন কবিতাটিকে অনন্য নান্দনিক উচ্চতা দিয়েছে।
উপসংহার: গতি ও সৃষ্টির চিরন্তন রূপান্তরকে মহাকাব্যিক উপলব্ধিতে ধারণ করায় ‘বলাকা’ বাংলা কাব্যসাহিত্যের এক অপূর্ব রূপবৈভব।
অথবা,
(খ) কবি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতা অবলম্বনে স্বাধীনতার স্বরূপ বর্ণনা কর।
ভূমিকা: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ একটি অমর দেশপ্রেমমূলক কবিতা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত এ কবিতায় স্বাধীনতার স্বরূপকে বাঙালির দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সাথে একাত্ম করা হয়েছে।
১. ঐতিহ্যের সাথে আত্মিক সংযোগ: স্বাধীনতা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; তা রবীন্দ্র-সংগীত, নজরুলের ঝাঁকড়া চুল, শহীদ মিনারের অমর একুশে এবং পিতা-মাতার প্রার্থনার পবিত্রতায় উদ্ভাসিত।
২. গ্রামীণ ও নাগরিক চিত্রকল্প: ফসলের মাঠ, কৃষকের হাসি, মেঠোপথ, মেঘনা নদীর মাঝি এবং গৃহবধূর সিঁথির সিঁদুরে কবি স্বাধীনতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। স্বাধীনতা মানে নতুন প্রজন্মের নির্ভীক পথচলা।
উপসংহার: বাঙালির শাশ্বত জীবনযাত্রা ও মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের সাথে স্বাধীনতাকে অভিন্ন রূপে কল্পনা করায় কবিতাটি খাঁটি দেশপ্রেমের চিরন্তন প্রতীক।
ঘ বিভাগ (মান— ৫ x ৪ = ২০)
৭। যে কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও :
(ক) ভাষা কাকে বলে? বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা কর।
সংজ্ঞা: মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাকযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে ভাষা বলে। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনির দ্বারা নিষ্পন্ন, কোনো বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত এবং বাক্যে প্রযুক্ত শব্দসমষ্টিকে ভাষা বলে।”
বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ:
বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্যতম প্রধান শাখা শত্ম (Satem) দলের অন্তর্ভুক্ত। ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা থেকে কালক্রমে বিভিন্ন বিবর্তনীয় স্তরের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে:
- ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা: আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে এর প্রচলন ছিল।
- ভারতীয় আর্যভাষা: প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা (বেদ-সংহিতার ভাষা) থেকে মধ্য ভারতীয় আর্যভাষা (প্রাকৃত ও অপভ্রংশ) রূপ লাভ করে।
- মাগধী প্রাকৃত ও অপভ্রংশ: ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পূর্ব ভারতীয় ‘মাগধী অপভ্রংশ’ থেকে আনুমানিক দশম শতাব্দীতে (৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বঙ্গ-কামরূপী শাখার মাধ্যমে বাংলা ভাষার জন্ম হয়। (অন্যদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, ‘গৌড়ীয় অপভ্রংশ’ থেকে সপ্তম শতাব্দীতে ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বাংলা ভাষার উদ্ভব ঘটে)।
- যুগের ক্রমবিকাশ:
- প্রাচীন যুগ (৬৫০/৯৫০-১২০০ খ্রি.): চর্যাপদের যুগ।
- মধ্যযুগ (১২০১-১৮০০ খ্রি.): শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য ও অনুবাদ সাহিত্যের যুগ।
- আধুনিক যুগ (১৮০১ খ্রি.-বর্তমান): ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, গদ্য সাহিত্যের বিকাশ, সাময়িকপত্র এবং আধুনিক মুক্তচিন্তার যুগ।
(খ) আধুনিক বাংলা বানানে ‘ই’-কার ব্যবহারের পাঁচটি নিয়ম উদাহরণসহ লেখ।
বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী ‘ই’-কার (ি) ব্যবহারের ৫টি নিয়ম নিচে উল্লেখ করা হলো:
- অতৎসম শব্দে: সকল তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র শব্দে কেবল ‘ই’ বা ‘ই’-কার (ি) ব্যবহৃত হবে। যেমন: গাড়ি, বাড়ি, শাড়ি, চাবি, টুপি, কেরানি।
- আলি-প্রত্যয়যুক্ত শব্দে: শব্দের শেষে ‘আলি’ প্রত্যয় যুক্ত হলে সর্বদা ই-কার হয়। যেমন: সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, মিতালি।
- স্ত্রীবাচক অতৎসম শব্দে: অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে ই-কার হয়। যেমন: নানি, দাদি, চাচি, মাসি, পিসি।
- পদাশ্রিত নির্দেশকে: পদাশ্রিত নির্দেশক ‘টি’-তে সর্বদা ই-কার হয়। যেমন: বইটি, কলমটি, ছেলেটি।
- ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দের সাথে ‘তা’ বা ‘ত্ব’ যুক্ত হলে: মূল শব্দের দীর্ঘ-ঈ-কার পরিবর্তিত হয়ে ই-কার হয়। যেমন: কৃতী > কৃতিত্ব, প্রতিযোগী > প্রতিযোগিতা, স্থায়ী > স্থায়িত্ব।
(গ) ণ-ত্ব বিধান বলতে কী বুঝ?
সংজ্ঞা: তৎসম (সংস্কৃত) শব্দে মূর্ধন্য-ণ এর সঠিক ব্যবহারের নিয়মকে ণ-ত্ব বিধান বলে। খাঁটি বাংলা বা বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য-ণ ব্যবহৃত হয় না।
ণ-ত্ব বিধানের প্রধান নিয়মসমূহ:
- তৎসম শব্দে ঋ, র, ষ এর পর মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: ঋণ, বর্ণ, কারণ, ভীষণ, কৃষ্ণ।
- ঋ, র, ষ এর পরে স্বরবর্ণ, ক-বর্গ, প-বর্গ কিংবা য, ব, হ, ং থাকলে তার পরবর্তী দন্ত্য-ন পরিবর্তিত হয়ে মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: কৃপণ, লক্ষণ, হরিণ, অর্পণ।
- ট-বর্গীয় ধ্বনির (ট, ঠ, ড, ঢ) পূর্বে তৎসম শব্দে যুক্তবর্ণ হিসেবে সর্বদা মূর্ধন্য-ণ যুক্ত হয়। যেমন: ঘণ্টা, লণ্ঠন, কাণ্ড, প্রচণ্ড।
- প্র, পরা, পরি, নির্—এই চারটি উপসর্গের পর কতগুলো ধাতুর দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: প্রণাম, পরায়ণ, পরিণাম, নির্ণয়।
(ঘ) নিচের শব্দগুলোর বানান শুদ্ধ করে লেখ (যে কোনো পাঁচটি) :
| প্রদত্ত অশুদ্ধ বানান | শুদ্ধ বানান | শুদ্ধিকরণের ব্যাকরণিক নিয়ম |
|---|---|---|
| মুহুর্ত | মুহূর্ত | ‘হ’-এ দীর্ঘ-ঊ-কার এবং রেফের পূর্বে মূর্ধন্য-ণ/ত |
| শিরোচ্ছেদ | শিরশ্ছেদ | সন্ধিজাত নিয়মে বিসর্গ ও চ/ছ মিলে ‘শ্ছ’ হয় |
| ঐক্যমত | ঐকমত্য (বা: ঐক্য) | ‘ঐক্য’ শব্দের সাথে ‘মত’ প্রত্যয়ে দ্বিত্ব বর্জনীয় |
| পিপিলিকা | পিপীলিকা | প্রথম প-এ হ্রস্ব-ই, দ্বিতীয় প-এ দীর্ঘ-ঈ-কার |
| নূন্যতম | ন্যূনতম | ‘য’-ফলার সাথে দীর্ঘ-ঊ-কার হবে |
| শশ্রুষা | শুশ্রূষা | প্রথম তালব্য-শ-এ হ্রস্ব-উ, দ্বিতীয় তালব্য-শ-এ দীর্ঘ-ঊ-কার |
| আকাংখা | আকাঙ্ক্ষা | যুক্তবর্ণে ‘ঙ+ক্ষ’ (ঙ্ক্ষ) ব্যবহৃত হয় |
(ঙ) ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি) :
| প্রদত্ত শব্দ | ব্যাসবাক্য | সমাসের নাম |
|---|---|---|
| আয়কর | আয়ের ওপর কর | মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস |
| গৃহস্থ | গৃহে অবস্থান করে যে | উপপদ তৎপুরুষ সমাস |
| তেপান্তর | তিন প্রান্তরের সমাহার | দ্বিগু সমাস |
| নদীমাতৃক | নদী মাতা যার | বহুব্রীহি সমাস |
| প্রগতি | প্র (উৎকৃষ্ট) যে গতি | প্রাদি সমাস |
| বিষাদসিন্ধু | বিষাদ রূপ সিন্ধু | রূপক কর্মধারয় সমাস |
| রাজপথ | পথের রাজা | ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস |
(চ) প্রত্যয়ের নামসহ প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় কর (যে কোনো পাঁচটি) :
| প্রদত্ত শব্দ | প্রকৃতি ও প্রত্যয় | প্রত্যয়ের প্রকার |
|---|---|---|
| উক্তি | √বচ্ + তি (ক্তি) | কৃৎ প্রত্যয় |
| করণীয় | √কৃ + অনীয় | কৃৎ প্রত্যয় |
| তারুণ্য | তরুণ + য (ষ্ণ্য) | তদ্ধিত প্রত্যয় |
| দৈনিক | দিন + ইক (ষ্ণিক) | তদ্ধিত প্রত্যয় |
| বক্তব্য | √বচ্ + তব্য | কৃৎ প্রত্যয় |
| লাজুক | লাজ + উক্ | তদ্ধিত প্রত্যয় |
| সাহিত্য | সহিত + য (ষ্যঞ্) | তদ্ধিত প্রত্যয় |
(ছ) ভাব-সম্প্রসারণ কর :
“অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।”
মূলভাব: অন্যায় করা এবং নীরবে অন্যায়কে মেনে নেওয়া উভয়ই সমান মাত্রার জঘন্য অপরাধ। পাপী যেমন ঘৃণার যোগ্য, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে তা সহ্য করা কাপুরুষতাও স্রষ্টা ও সৃষ্টির দরবারে সমভাবে ধিক্কৃত।
সম্প্রসারিত ভাব: মানবসমাজে ন্যায় ও নীতিবোধই শান্তিময় সমাজজীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু স্বার্থপরতা ও পাশবিক প্রবৃত্তির কারণে মানুষ যখন অন্যের ওপর জুলুম, নির্যাতন ও অন্যায় আচরণ করে, তখন সে মানবতার চরম অবমাননা ঘটায়। অন্যায়কারী নিজ বিবেক ও মানবিক মর্যাদাকে বিসর্জন দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। কিন্তু তার চেয়েও মারাত্মক অপরাধ হলো, সমাজে বসবাসকারী অন্য ব্যক্তিরা যখন চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখেও ভয়ে বা নিরাসক্ত হয়ে নিশ্চুপ থাকে। অন্যায় সহ্য করার অর্থ প্রকারান্তরে অন্যায়কারীকে উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করা। যে ব্যক্তি নীরবে অন্যায় মেনে নেয়, সে প্রতিবাদহীনতার কারণে পাপের সম-অংশীদার হয়ে ওঠে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই তীব্র ক্ষোভে উচ্চারণ করেছেন যে, অন্যায়কারী এবং অন্যায়ের নীরব সহনশীল—উভয়ের ওপরেই যেন ঈশ্বরের চরম ঘৃণা ও অভিশাপ পতিত হয়।
উপসংহার: সমাজ থেকে অনাচার ও অত্যাচার নির্মূল করতে হলে কেবল নিজে অন্যায় থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাই মনুষ্যত্বের প্রকৃত পরিচয়।
(জ) তোমার মাদরাসায় নবীনবরণ অনুষ্ঠানে নবীন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়ে একটি মানপত্র রচনা কর।
অভিনন্দন মানপত্র
হে নবীন জ্ঞানপিপাসু অনুজবৃন্দ,
ঐতিহ্যবাহী কামিল মাদরাসার সবুজ ও স্নিগ্ধ প্রাঙ্গণে আজকের এই আনন্দঘন নবীনবরণ অনুষ্ঠানে তোমাদের জানাই আমাদের হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে উষ্ণ অভিনন্দন ও রক্তিম শুভেচ্ছা। তোমরা আজ জীবনের এক নতুন সোপানে পদার্পণ করেছ। তোমাদের দীপ্ত পদচারণায় আমাদের প্রিয় শিক্ষাঙ্গন আজ প্রাণবন্ত ও মুখরিত হয়ে উঠেছে।
হে সোনালী আগামীর দিশারি,
ইসলামের শাশ্বত জ্ঞান ও আধুনিক বিদ্যার সমন্বয়ে নিজেদের চরিত্র গঠন করাই এই বিদ্যাপীঠের মূল লক্ষ্য। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের সুমহান শিক্ষায় নিজেদের আলোকিত করে তোমরা দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণে নেতৃত্ব দেবে—এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা। আলিম ও ফাযিল স্তরের এই উচ্চশিক্ষা তোমাদের মেধা ও প্রজ্ঞাকে শাণিত করবে।
হে প্রিয় নবীন সাথী,
জ্ঞানার্জনের পথ মসৃণ নয়, বরং অধ্যবসায় ও কঠোর সাধনার মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হয়। এই মাদরাসার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ পাঠাগার এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকবৃন্দের স্নেহময় দিকনির্দেশনা তোমাদের অগ্রযাত্রায় সার্বক্ষণিক বাতিঘর হয়ে থাকবে। সততা, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলাবোধকে পাথেয় করে তোমরা এক একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে—আজকের এই শুভলগ্নে আমরা পরম করুণাময়ের দরবারে সেই প্রার্থনাই করি।
তোমাদের শিক্ষাজীবন সাফল্যমণ্ডিত ও জ্যোতির্ময় হোক।
বিনীত ও ভালোবাসাসহ,
প্রবীণ শিক্ষার্থীবৃন্দ
কামিল মাদরাসা, ঢাকা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ফাযিল ১ম বর্ষ বাংলা পরীক্ষায় পূর্ণমান কত?
ফাযিল ১ম বর্ষ বাংলা পরীক্ষায় পূর্ণমান ৮০ নম্বর এবং নির্ধারিত সময় ৪ ঘণ্টা। প্রশ্নপত্রটি ক, খ, গ এবং ঘ এই চারটি বিভাগে বিভক্ত থাকে।
বাংলা ব্যাকরণ অংশে ভালো নম্বর তোলার উপায় কী?
বানান শুদ্ধিকরণ, সমাস নির্ণয়, প্রকৃতি-প্রত্যয় এবং ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী উদাহরণসহ নির্ভুলভাবে লিখলে ব্যাকরণ অংশে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়।
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের আবিষ্কারক ও রচয়িতা কে?
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা বরু চণ্ডীদাস এবং ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়ার কাঁকিল্যা গ্রাম থেকে এটি আবিষ্কার করেন।
‘উমর ফারুক’ কবিতায় খলিফার চরিত্রের কোন দিকটি সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে?
হযরত উমর (রা.)-এর অনন্য চরিত্র একদিকে প্রজাবৎসল কোমলতা ও মানবপ্রেম, অন্যদিকে ন্যায়ের শাসন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন কঠোরতার অপূর্ব সমন্বয় ফুটে উঠেছে।
ভাব-সম্প্রসারণ লেখার ক্ষেত্রে কোন নিয়মগুলো অনুসরণীয়?
ভাব-সম্প্রসারণকে মূলভাব, সম্প্রসারিত ভাব এবং উপসংহার—এই তিন স্তরে বিভক্ত করে যুক্তি ও প্রাঞ্জল ভাষায় কোনো উদ্ধৃতি ছাড়া পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা উচিত।
নবীনবরণ মানপত্র লেখার সময় কী ধরনের বিষয় গুরুত্ব দিতে হয়?
মানপত্রে নবীন শিক্ষার্থীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা, প্রতিষ্ঠানের গৌরবময় ইতিহাস, অধ্যবসায়ের গুরুত্ব এবং দেশ ও জাতির সেবায় নৈতিক চরিত্র গঠনের দিকনির্দেশনা মার্জিত ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে হয়।