জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম (Dirasatu Tafsiril Quranil Karim) – 202401, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
১৩২ মিনিট পড়ার সময়
১৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 156
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف ، لعام ۲۰۲۱
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة تفسير القرآن الكريم
[দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম]
বিষয় কোড : 202401
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (الف) وعن واحد من مجموعة (ب) والأعداد بالهامش تدل على الدرجات الكاملة-
[দ্রষ্টব্য : (ক) অংশ হতে পাঁচটি এবং (খ) অংশ হতে যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]


مجموعة (الف) / (ক) বিভাগ : নির্বাচিত আয়াতের অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন

الدرجات — ١٤ × ٥ = ٧٠
(ترجم الآيات الكريمة مع الإجابة عن الأسئلة الملحقة بها)
[আয়াতগুলোর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও]


١- قوله تعالى : الحمد لله رب العالمين- الرحمن الرحيم- مالك يوم الدين- إياك نعبد وإياك نستعين- إهدنا الصراط المستقيم-

[১. মহান আল্লাহর বাণী: সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। বিচার দিবসের মালিক। আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন কর। (সুরা আল-ফাতিহা: ২-৬)]

আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ও প্রেক্ষাপট:

উক্ত সম্মানিত আয়াতসমূহ পবিত্র কুরআনের প্রারম্ভিক সুরা ‘সুরা আল-ফাতিহা’-এর অন্তর্গত। এতে মহান রব্বুল আলামীনের সর্বজনীন রুবূবিয়াত, অসীম রহমত, পরম মালিকানা, তাওহীদুল ইবাদাত ও ইস্তিয়ানাত এবং বান্দার পক্ষ থেকে একমাত্র সিরাতে মুস্তাকীমের হিদায়াত প্রার্থনার এক অনুপম সম্মিলন ঘটেছে। প্রতিটি মুমিন বান্দা দিনে-রাতে প্রতি ওয়াক্ত সালাতে এই বাক্যগুলোর পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে আল্লাহর সাথে এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপন করে।


(أ) اذكر أسماء سورة الفاتحة مع خصائصها وفضائلها-

[(ক) সুরা আল-ফাতিহার নামসমূহ তার বৈশিষ্ট্য ও ফজিলতসহ উল্লেখ কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
সুরা আল-ফাতিহা পবিত্র মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রথম এবং সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ সুরা। কোনো সুরার নামের প্রাচুর্য তার অর্থবহ গভীরতা ও অন্তর্নিহিত মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব নির্দেশ করে (كثرة الأسماء تدل على شرف المسمى)। আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন’ গ্রন্থে সুরা আল-ফাতিহার ২৫টিরও বেশি নামের উল্লেখ করেছেন।

১. সুরা আল-ফাতিহার প্রসিদ্ধ নামসমূহ ও নামকরণের তাৎপর্য:

  • فاتحة الكتاب (ফাতিহাতুল কিতাব – কিতাবের সূচনা বা ভূমিকা): কুরআনুল কারীমের তিলাওয়াত ও মাসহাফের লিপির সূচনা এই সুরা দ্বারা হওয়ার কারণে একে ফাতিহাতুল কিতাব বলা হয়।
  • أم القرآن / أم الكتاب (উম্মুল কুরআন / উম্মুল কিতাব – কুরআনের মূল বা সারসংক্ষেপ): গোটা কুরআনের মূল ভাববস্তু—তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, ইবাদত এবং পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ইতিহাস এই সুরার মধ্যে সংক্ষিপ্ত আকারে সন্নিবেশিত থাকায় একে উম্মুল কুরআন বলা হয়।
  • السبع المثاني (আস-সাবউল মাছানী – বারবার পঠিত সাতটি আয়াত): এ সুরায় সর্বসম্মতভাবে সাতটি আয়াত রয়েছে এবং প্রতিটি সালাতের প্রতিটি রাকাতে এটি বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ইরশাদ করেন: ﴿وَلَقَدْ آتَيْنَاكَ سَبْعًا مِّنَ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنَ الْعَظِيمَ﴾ (সুরা আল-হিজর: ৮৭)।
  • القرآن العظيم (আল-কুরআনুল আযীম – মহান কুরআন): সমগ্র কুরআনের মহিমান্বিত মর্মবাণী এতে পুঞ্জীভূত থাকার কারণে একে কুরআনুল আযীম বলা হয়।
  • الصلاة (আস-সালাত – নামায): সহীহ হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা একে সালাত হিসেবে অভিহিত করেছেন: «قَسَمْتُ الصَّلَاةَ بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي نِصْفَيْنِ» (আমি সালাতকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি)।
  • الشفاء / الشافية (আশ-শিফা / আশ-শাফিয়াহ – আরোগ্যকারী): আত্মিক ও শারীরিক সকল ব্যাধির মহা আরোগ্য হিসেবে এ সুরা কাজ করে।
  • الرقية (আর-রুকইয়াহ – ঝাড়ফুঁক বা দোয়ার সুরা): হাদিসে বর্ণিত সাহাবীগণ বিষাক্ত দংশনপ্রাপ্ত রোগীকে এ সুরার মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করে সুস্থ করেছিলেন।
  • الأساس (আল-আসাস – ভিত্তি): হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, প্রতিটি জিনিসের একটি ভিত্তি রয়েছে, আর কুরআনের ভিত্তি হলো সুরা আল-ফাতিহা।
  • الكافية ও الوافية (আল-কাফিয়াহ ও আল-ওয়াফিয়াহ): এ সুরা অন্যান্য সুরার পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু অন্য কোনো সুরা এর বিকল্প বা যথেষ্ট হতে পারে না।

২. সুরা আল-ফাতিহার অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص سورة الفاتحة):

  • তাওহীদের তিন প্রকারের সমাবেশ: এ সুরায় তাওহীদে রুবূবিয়াত (رب العالمين), তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত (الرحمن الرحيم – مالك يوم الدين) এবং তাওহীদুল উলূহিয়াত বা ইবাদত (إياك نعبد) একত্রিত হয়েছে।
  • রব্ব ও বান্দার সরাসরি কথোপকথন: এটি একমাত্র সুরা যেখানে বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমত ও বান্দার দোয়ার সরাসরি উত্তর দান সম্পর্কিত হাদিসে কুদসী বর্ণিত হয়েছে।
  • নামাযের অপরিহার্য রুকন: সুরা ফাতিহা ছাড়া কোনো সালাত শুদ্ধ হয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: «لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ» (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।

৩. সুরা আল-ফাতিহার ফযীলত (فضائل سورة الفاتحة):

  • কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সুরা: সহীহ বুখারীতে হযরত আবু সাঈদ ইবনুল মুআল্লা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: “আমি কি তোমাকে কুরআনুল কারীমের সর্বশ্রেষ্ঠ সুরাটি শিক্ষা দেব না? তা হলো ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’—যা বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহান কুরআন।”
  • আকাশের বিশেষ দরজা উন্মুক্ত করে দান: সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, একদা জিবরাঈল (আ.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে বসা ছিলেন। এমন সময় আকাশ থেকে এক বিশেষ শব্দ শুনে তিনি বললেন, “আজ আকাশের এমন একটি দরজা খোলা হয়েছে যা ইতোপূর্বে কখনো খোলা হয়নি এবং এমন এক ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়েছেন যিনি কখনো পূর্বে নামেননি।” সেই ফেরেশতা এসে সালাম দিয়ে বললেন, “আপনি এমন দুটি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন যা আপনার পূর্বে কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি—সুরা আল-ফাতিহা এবং সুরা আল-বাকারার শেষাংশ।”

উপসংহার:
সুরা আল-ফাতিহা ঈমানী জীবন গঠনের মূলমন্ত্র। এটি বান্দাকে রব্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং যাবতীয় বিভ্রান্তি এড়িয়ে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল থাকার চিরন্তন দিকনির্দেশনা প্রদান করে।


(ب) ما معنى الحمد والشكر؟ وما الفرق بينهما؟

[(খ) ‘আল-হামদ’ (حمد) ও ‘আশ-শুকর’ (شكر)-এর অর্থ কী? এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?]

উত্তর:

ভূমিকা:
ইসলামি পরিভাষায় ও আরবি অলঙ্কারশাস্ত্রে ‘আল-হামদ’ এবং ‘আশ-শুকর’ দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ শব্দ। আপাতদৃষ্টিতে দুটি শব্দকে সমার্থক মনে হলেও গভীর ভাষাতাত্ত্বিক ও শরিয়তী দৃষ্টিকোণ থেকে উভয়ের মধ্যে গভীর তাৎপর্যগত পার্থক্য বিদ্যমান।

১. ‘আল-হামদ’ (الحمد)-এর অর্থ ও সংজ্ঞা:

  • আভিধানিক অর্থ: আল-হামদ শব্দের অর্থ প্রশংসা করা, স্তুতি গাওয়া, গুণকীর্তন করা বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এটি নিন্দার (الذم) বিপরীত।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: কোনো সত্তার ঐচ্ছিক সুন্দর গুণাবলি, শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রেম ও শ্রদ্ধার সাথে যবান দ্বারা তার প্রশংসা করাকে ‘হামদ’ বলা হয়। ইমাম রাগিব আল-ইসফাহানী বলেন: «الْحَمْدُ لِلَّهِ تَعَالَى: الثَّنَاءُ عَلَيْهِ بِالْفَضِيلَةِ» (আল্লাহর জন্য হামদ হলো তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও গুণের কারণে তাঁর স্তুতি গাওয়া)।

২. ‘আশ-শুকর’ (الشكر)-এর অর্থ ও সংজ্ঞা:

  • আভিধানিক অর্থ: কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেওয়া। এর মূল অর্থ প্রকাশ করা বা উথলে ওঠা। এটি অকৃতজ্ঞতা বা কুফরি (الكفران)-এর বিপরীত।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুফাসসিরীন ও উসূলবিদগণের মতে, কোনো দাতার প্রদত্ত অনুগ্রহ ও নিআমতের স্বীকৃতিস্বরূপ অন্তর, যবান ও শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আনুগত্য প্রদর্শন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাকে ‘শুকর’ বলা হয়।

৩. হামদ ও শুকরের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য (الفرق بين الحمد والشكر):
আহলে ইলম ও আরবি ভাষাবিদগণের মতে হামদ ও শুকরের মধ্যে সম্পর্ক হলো ‘আম ও খাস ওয়াজহী’ (العموم والخصوص الوجهي)। অর্থাৎ একটি দিক থেকে হামদ ব্যাপক, আবার অন্য দিক থেকে শুকর ব্যাপক। পার্থক্যসমূহ নিম্নরূপ:

পার্থক্যের ক্ষেত্র আল-হামদ (الحمد) আশ-শুকর (الشكر)
উৎস বা মাধ্যম (الأداة) হামদ কেবল যবানের মাধ্যমে উচ্চারিত হয় (অন্তর দ্বারা ভালোবাসা বিদ্যমান থাকে)। শুকর তিনটি মাধ্যমে সাধিত হয়: অন্তর (স্বীকৃতি), যবান (প্রশংসা) এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (আনুগত্য ও ইবাদত)।
কারণ বা উপলক্ষ (السبب) হামদ নিআমত প্রাপ্তির বিনিময়েও হতে পারে, আবার কোনো প্রত্যক্ষ নিআমত ছাড়াও সত্তার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে হতে পারে। শুকর সর্বদাই কোনো প্রত্যক্ষ নিআমত বা অনুগ্রহের প্রতিদানস্বরূপ আদায় করা হয়।
ব্যাপকতা (العموم والخصوص) উপলক্ষের দিক থেকে হামদ বেশি ব্যাপক (সাধারণ)। কারণ আল্লাহর সকল সিফাত ও কাজের ওপরই আল-হামদুলিল্লাহ বলা যায়। প্রকাশের মাধ্যমের দিক থেকে শুকর বেশি ব্যাপক। কারণ দান-সদকা, সাজদাহ ও আনুগত্যের আমল সবই শুকরিয়ার অন্তর্ভুক্ত।

কবির ভাষায় শুকরের ত্রিমাত্রিক রূপ প্রকাশ পেয়েছে:
أَفَادَتْكُمُ النَّعْمَاءُ مِنِّي ثَلَاثَةً: * يَدِي، وَلِسَانِي، وَالضَّمِيرَ الْمُحَجَّبَا
(অর্থ: তোমাদের অনুগ্রহ আমার কাছ থেকে তিনটি জিনিস আদায় করে নিয়েছে—আমার হাত, আমার যবান এবং আমার অন্তরের লুকায়িত বিশ্বাস।)

উপসংহার:
অতএব, বান্দা হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো যবানে সর্বাবস্থায় আল্লাহর ‘হামদ’ বা গুণকীর্তন করা এবং প্রাপ্ত প্রতিটি নিআমতের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ অন্তরে ও আমলে তাঁর ‘শুকর’ আদায় করা।


٢- قوله تعالى : الم- ذلك الكتب لا ريب فيه، هدى للمتقين- الذين يؤمنون بالغيب ويقيمون الصلوة ومما رزقنهم ينفقون-

[২. মহান আল্লাহর বাণী: আলিফ-লাম-মীম। এটি সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য পথপ্রদর্শক। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। (সুরা আল-বাকারা: ১-৩)]

আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ও তাৎপর্য:

সুরা আল-বাকারার প্রারম্ভিক এই আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ কুরআনুল কারীমের সত্যতা ও নির্ভুলতা ঘোষণা করেছেন। এটি কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়, এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। এই কিতাব সর্বস্তরের মানুষের জন্য হলেও প্রকৃতপক্ষে এর আলো ও পথপ্রদর্শন কেবল তারাই গ্রহণ করতে পারে যারা ‘মুত্তাকী’। অতঃপর মুত্তাকীদের তিনটি মৌলিক গুণাবলি উল্লেখ করা হয়েছে—ঈমান বিল গাইব (অদৃশ্যে বিশ্বাস), সালাত কায়েম করা এবং আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করা।


(أ) ما المراد بالحروف المقطعات؟

[(ক) হুরুফে মুকাত্তাআত (حروف مقطعات) দ্বারা কী উদ্দেশ্য বা অর্থ কী?]

উত্তর:

ভূমিকা:
পবিত্র কুরআনুল কারীমের মোট ২৯টি সুরার প্রারম্ভে কিছু বিচ্ছিন্ন আরবি হরফ বা বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন—الم، الر، المر، كهيعص، طه، يس، ص، حم، ق، ن। এ বর্ণগুলোকে উলূমুল কুরআনের পরিভাষায় ‘আল-হুরুফুল মুকাত্তাআত’ (الحروف المقطعة – বিচ্ছিন্ন হরফসমূহ) বলা হয়।

১. হুরুফে মুকাত্তাআতের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য:

  • এ হরফগুলো পড়ার সময় মিলিয়ে পড়া হয় না, বরং পৃথক পৃথক হরফ হিসেবে উচ্চারণ করতে হয় (যেমন: আলিফ-লাম-মীম)।
  • আরবি বর্ণমালার মোট ২৮টি অক্ষরের মধ্যে ঠিক অর্ধেক অর্থাৎ ১৪টি হরফ মুকাত্তাআত হিসেবে কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ১৪টি হরফকে একত্রিত করলে তৈরি হয় চমৎকার বাক্য: «نَصٌّ حَكِيمٌ قَاطِعٌ لَهُ سِرٌّ» (এক প্রজ্ঞাময় সুনির্দিষ্ট বাণী, যার অন্তর্নিহিত গোপন রহস্য রয়েছে)।

২. হুরুফে মুকাত্তাআতের অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কিত মুফাসসিরীনদের দৃষ্টিভঙ্গি:
মুফাসসিরীনে কেরাম হুরুফে মুকাত্তাআতের তাফসীর নিয়ে দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়েছেন:

  1. সালাফে সালেহীন ও অধিকাংশ সাহাবা-তাবেঈনের মত (তাফবীয বা রহস্য সংরক্ষণ):
    হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.), আলী (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.), ইমাম শা’বী ও সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-এর মতে, এগুলো কুরআনের ‘মুতাশাবিহাত’ (রূপক বা রহস্যাবৃত) আয়াত। এর প্রকৃত জ্ঞান ও রহস্য কেবল আল্লাহ তাআলাই জানেন। হযরত আবু বকর (রা.) বলেন: «فِي كُلِّ كِتَابٍ سِرٌّ، وَسِرُّ اللَّهِ فِي الْقُرْآنِ أَوَائِلُ السُّوَرِ» (প্রতিটি কিতাবের একটি গোপন রহস্য থাকে, আর কুরআনে আল্লাহর গোপন রহস্য হলো সুরার প্রারম্ভিক হরফসমূহ)। সুতরাং এর ওপর বিনা দ্বিধায় ঈমান আনাই ঈমানের দাবি।
  2. মুহাক্কিক মুফাসসিরীনদের অভিমত (উদ্দেশ্য ও দর্শন অনুধাবন):
    ইমাম যামাখশারী, কুরতুবী, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাসীর (রহ.)-সহ গবেষক আলেমগণ এর নানাবিধ প্রজ্ঞাপূর্ণ উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন:

    • কুরআনের মু’জিযা ও সাহিত্যিক চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন (الإعجاز والتحدي): আরবরা ছিল অসাধারণ বাগ্মী ও সাহিত্যের অহংকারে অন্ধ। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, এই কুরআন তোমাদেরই পরিচিত হরফ—আলিফ, লাম, মীম ইত্যাদি দ্বারা গঠিত। যদি তোমরা একে মানুষের বাণী মনে কর, তবে তোমরাও এই বর্ণগুলো দিয়ে একটি সুরার অনুরূপ রচনা করে নিয়ে আস! কিন্তু তারা তা করতে ব্যর্থ হয়ে কুরআনের ঐশী রূপ মেনে নিতে বাধ্য হয়। লক্ষণীয় যে, প্রায় প্রতিটি মুকাত্তাআত হরফের পরেই কুরআনের মহত্ত্বের আলোচনা এসেছে।
    • মনোযোগ আকর্ষণ (لفت الانتباه): মুশরিকরা যখন বলত, “তোমরা এই কুরআন শোনো না এবং এতে হট্টগোল সৃষ্টি কর,” তখন তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে নবীজী ﷺ এই অভিনব ধ্বনি উচ্চারণ করতেন, যা শুনে তারা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যেত।
    • সুরার নাম বা প্রতীক: কোনো কোনো আলেমের মতে, এগুলো সংশ্লিষ্ট সুরাসমূহের স্বতন্ত্র নাম বা পরিচিতি।

উপসংহার:
হুরুফে মুকাত্তাআত কুরআনের অলৌকিক সাহিত্যিক উৎকর্ষের এক অনন্য নিদর্শন, যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সামনে বিনম্রভাবে সমর্পিত হতে শেখায়।


(ب) ما معنى التقوى؟ بين مراتبه وفوائده-

[(খ) তাকওয়া (تقوى)-এর অর্থ কী? এর স্তরসমূহ ও উপকারিতা বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
ইসলামি জীবনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘তাকওয়া’। এটি মানুষের আত্মার সুরক্ষা বর্ম এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান সোপান। কুরআনে অসংখ্য স্থানে মুমিনদের তাকওয়া অর্জনের জোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

১. তাকওয়ার আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • আভিধানিক অর্থ: ‘তাকওয়া’ শব্দটি আরবি ‘আল-বিকায়াহ’ (الوقاية) মূল থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ কোনো ক্ষতিকর বা ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে আত্মরক্ষা করা, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা, ঢাল ব্যবহার করা বা সংযত হওয়া।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর নির্দেশসমূহ পালন এবং তাঁর যাবতীয় নিষেধসমূহ বর্জনের মাধ্যমে নিজেকে তাঁর ক্রোধ ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখাকে তাকওয়া বলা হয়।
  • উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ উপমা: একবার হযরত ওমর (রা.) হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-কে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি কখনো কণ্টকাকীর্ণ সরু পথ দিয়ে হেঁটেছেন?” ওমর (রা.) বললেন, “হ্যাঁ।” উবাই (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “তখন আপনি কীভাবে চলেছিলেন?” ওমর (রা.) বললেন, “আমি আমার কাপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলে চলেছিলাম যেন গায়ে কাঁটা না বিঁধে।” উবাই (রা.) বললেন, “এটাই হলো তাকওয়া!” অর্থাৎ পাপের কাঁটাময় পৃথিবীতে সতর্কতার সাথে নিজেকে বাঁচিয়ে চলাই তাকওয়া।
  • হযরত আলী (রা.)-এর সংজ্ঞা: «التَّقْوَى هِيَ الْخَوْفُ مِنَ الْجَلِيلِ، وَالْعَمَلُ بِالتَّنْزِيلِ، وَالْقَنَاعَةُ بِالْقَلِيلِ، وَالاسْتِعْدَادُ لِيَوْمِ الرَّحِيلِ» (মহামহিম আল্লাহকে ভয় করা, কুরআন অনুযায়ী আমল করা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকা এবং পরকালের যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করাই তাকওয়া)।

২. তাকওয়ার স্তরসমূহ (مراتب التقوى):
মুফাসসিরীন ও উলামায়ে কেরাম তাকওয়ার তিনটি স্তর উল্লেখ করেছেন:

  1. প্রথম স্তর (শিরক ও কুফর থেকে আত্মরক্ষা): বিশুদ্ধ তাওহীদ ও ঈমান গ্রহণের মাধ্যমে অনন্তকালের জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। এটি তাকওয়ার প্রাথমিক ও মৌলিক স্তর।
  2. দ্বিতীয় স্তর (কবিরা গুনাহ ও অনাচার বর্জন): শরীয়তের নিষিদ্ধ যাবতীয় কবিরা গুনাহ পরিত্যাগ করা, সগিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং সকল ফরজ-ওয়াজিব পুঙ্খানুপুঙ্খ আদায় করা। সাধারণ অর্থে এটিই মুত্তাকীর স্তর।
  3. তৃতীয় স্তর (সন্দেহজনক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিহার): কোনো বৈধ কাজে গুনাহের সম্ভাবনা থাকলে তা থেকেও বিরত থাকা এবং আল্লাহর ধ্যান ছাড়া অন্তরকে অন্য সব কিছু থেকে পবিত্র রাখা। এটি সিদ্দিকীন ও আউলিয়ায়ে কেরামের সর্বোচ্চ স্তর।

৩. তাকওয়ার ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উপকারিতা (فوائد التقوى):

  • সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড (ফুরকান) লাভ: আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا﴾ (যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তিনি তোমাদের অন্তর্দৃষ্টি ও সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের শক্তি দান করবেন — সুরা আল-আনফাল: ২৯)।
  • বিপদ থেকে মুক্তি ও অপ্রত্যাশিত রিজিক লাভ: ইরশাদ হয়েছে: ﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا • وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ (আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না — সুরা আত-তালাক: ২-৩)।
  • আল্লাহর মহব্বত ও সাহচর্য লাভ: ﴿إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوا وَّالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ﴾ (নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে — সুরা আন-নাহল: ১২৮)।
  • আল্লাহর নিকট মর্যাদার শ্রেষ্ঠ মাপকাঠি: ﴿إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ﴾ (নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকী — সুরা আল-হুজুরাত: ১৩)।
  • জান্নাত প্রাপ্তি: পরকালে মুত্তাকীদের জন্যই জান্নাতের সুউচ্চ প্রাসাদ ও অফুরন্ত নিয়ামত সংরক্ষিত থাকবে।

উপসংহার:
তাকওয়াহীন জ্ঞান ও আমল আত্মাহীন দেহের মতো। মুমিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকওয়ার অনুশীলনই দুনিয়া ও আখিরাতে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের একমাত্র চাবিকাঠি।


٣- قوله تعالى : إن الذين كفروا سواء عليهم أأنذرتهم أم لم تنذرهم لا يؤمنون- ختم الله على قلوبهم وعلى سمعهم وعلى أبصارهم غشاوة ولهم عذاب عظيم-

[৩. মহান আল্লাহর বাণী: নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, তাদের জন্য উভয়ই সমান, তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর পর্দা রয়েছে, আর তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি। (সুরা আল-বাকারা: ৬-৭)]

আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ও তাৎপর্য:

সুরা আল-বাকারার শুরুতে মুমিন মুত্তাকীদের প্রশংসার পর এই দুই আয়াতে চরমপন্থী কাফেরদের শোচনীয় মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এটি এমন এক শ্রেণির কাফের যাদের কাছে সত্য দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তারা অন্ধ অহংকার, বিদ্বেষ ও হঠকারিতার কারণে সত্যকে অস্বীকার করেছে। ফলস্বরূপ তাদের অন্তরে মোহর অঙ্কিত হয়ে গেছে এবং তারা হেদায়াতের যোগ্যতা হারিয়ে চিরস্থায়ী শাস্তির উপযুক্ত হয়েছে।


(أ) عرف الكفر- ثم بين أقسامه-

[(ক) কুফর (كفر)-এর সংজ্ঞা দাও, অতঃপর এর প্রকারভেদসমূহ বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো ঈমান, আর ঈমানের ঠিক বিপরীত অবস্থা হলো ‘কুফর’। এটি এমন এক মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি যা মানুষকে স্রষ্টার পরিচয় ও অসীম নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে।

১. কুফর (الكفر)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:

  • আভিধানিক অর্থ: কুফর শব্দের মূল অর্থ হলো ঢেকে ফেলা, গোপন করা, আবৃত করা (الستر والتغطية)। রাতে অন্ধকার পৃথিবীকে ঢেকে ফেলে বিধায় রাতকে আরবিতে ‘কাফের’ বলা হয়। কৃষক মাটিতে বীজ পুঁতে তা মাটি দিয়ে ঢেকে দেয় বিধায় কুরআনুল কারীমে কৃষককেও ‘কুফফার’ (কুরআন ৫৭:২০) বলা হয়েছে। আবার নিয়ামত অস্বীকার করা বা অকৃতজ্ঞ হওয়াকেও কুফরান বলা হয়।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরীয়তের পরিভাষায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীনের যে সমস্ত অকাট্য বিষয়াদি (الضروريات الدينية) নিয়ে এসেছেন, তার কোনো একটি বিষয়কে অস্বীকার করা, অবিশ্বাস করা বা অমান্য করাকে কুফর বলা হয়। ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন: «الْكُفْرُ تَكْذِيبُ الرَّسُولِ ﷺ فِي شَيْءٍ مِمَّا جَاءَ بِهِ» (রাসূলুল্লাহ ﷺ যা নিয়ে এসেছেন তার কোনো অংশকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করাই কুফর)।

২. কুফরের প্রকারভেদসমূহ (أقسام الكفر):
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমামগণ প্রধানত কুফরকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেছেন:

  1. কুফরে ইনকার (كفر الإنكار): যে ব্যক্তি অন্তরেও সত্যকে স্বীকার করে না এবং মুখেও তা প্রকাশ করে না; অর্থাৎ স্রষ্টা, পরকাল বা রিসালাতকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। যেমন নাস্তিক ও প্রকৃতিপূজারীদের কুফর।
  2. কুফরে জুহূদ (كفر الجحود): যে ব্যক্তি অন্তরে সত্যকে চেনে ও জানে, কিন্তু অহংকার, হিংসা ও পার্থিব স্বার্থের কারণে প্রকাশ্যে অস্বীকার করে। যেমন ইবলিসের কুফর, ফেরাউন এবং মদিনার কিছু ইহুদি পণ্ডিতের কুফর। আল্লাহ বলেন: ﴿وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوًّا﴾ (তারা অন্যায় ও অহংকারবশত তা প্রত্যাখ্যান করেছিল, অথচ তাদের অন্তর তা সত্য বলে নিশ্চিত জেনেছিল — সুরা আন-নামল: ১৪)।
  3. কুফরে আনাদ বা মু’আনাদাহ (كفر العناد): সত্যকে অন্তর দিয়ে জানার পর এবং মুখেও তার সত্যতা স্বীকার করার পরও অন্ধ গোঁড়ামি ও সামাজিক খ্যাতির ভয়ে ইসলাম গ্রহণ না করা। যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাচা আবু তালিবের অবস্থা।
  4. কুফরে নিফাক (كفر النفاق): মুখে ঈমানের মৌখিক দাবি করা কিন্তু অন্তরে কুফরি ও শত্রুতা লালন করা। এটি মুনাফিকদের কুফর, যার শাস্তি জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে।
  5. কুফরে ই’রায (كفر الإعراض): সত্য দ্বীন থেকে উদাসীন হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। সত্য অনুসন্ধানের প্রতি কোনো আগ্রহ না দেখিয়ে গাফেল থাকা।
  6. কুফরে শাক্ক (كفر الشك): সত্যের ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে সন্দেহ ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগা (যেমন: কিয়ামত আদৌ হবে কি না সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করা)।

উপসংহার:
কুফরের যেকোনো রূপই মানবাত্মার জন্য চরম ধ্বংসাত্মক। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো কুফরির সকল প্রকার প্রকাশ ও সূক্ষ্ম ফাঁদ থেকে নিজের ঈমানকে পরিপূর্ণরূপে হিফাজত করা।


(ب) فسر قوله تعالى: “ختم الله على قلوبهم وعلى سمعهم وعلى أبصارهم غشاوة”-

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী: “আল্লাহ তাদের অন্তরে ও তাদের কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর পর্দা রয়েছে”—এর তাফসীর ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
উক্ত আয়াতে কারীমাটি ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গভীর দার্শনিক আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। কাফেরদের ওপর মোহর মেরে দেওয়ার স্বরূপ এবং এর সাথে মানুষের ইচ্ছা-স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে মুফাসসিরীনদের মাঝে বিস্তারিত একাডেমিক আলোচনা রয়েছে।

১. ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (التحليل اللغوي):

  • الختم (আল-খাতম): কোনো পাত্র বা বস্তুর মুখ এমনভাবে বন্ধ করে মোহর মেরে দেওয়া যাতে ভেতরের জিনিস বাইরে বের হতে না পারে এবং বাইরের কোনো জিনিস ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে (যেমন চিঠির খামে সিল মারা)। একে ‘ত্বাব’ (الطبع)-ও বলা হয়।
  • الغشاوة (আল-গিশাওয়াহ): চোখের ওপর ঢেকে থাকা পর্দা বা আবরণ, যা দৃষ্টিশক্তিকে সত্য দর্শনে বাধা প্রদান করে।

২. আয়াতের শানে নুযূল ও উদ্দেশ্য কারা?
ইবনে আব্বাস (রা.) ও মুফাসসিরীনদের মতে, এই আয়াতটি দুনিয়ার সকল সাধারণ কাফেরের জন্য প্রযোজ্য নয়; কারণ বহু কাফের পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে শ্রেষ্ঠ সাহাবী হয়েছিলেন। বরং এটি নির্দিষ্ট একদল চরম উদ্ধত কাফের (যেমন: আবু জাহেল, উতবা, শায়বা এবং মদিনার হঠকারী ইহুদি কা’ব ইবনুল আশরাফ ইত্যাদি) সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যাদের চিরস্থায়ী দুর্ভাগ্য ও অবাধ্যতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পূর্ব থেকেই অবগত ছিলেন (علمه الأزلي)।

৩. অন্তরে সিলমোহর পড়ার হাকীকত ও মেকানিজম:
প্রশ্ন ওঠে—আল্লাহ যদি নিজেই মোহর মেরে দেন, তবে তাদের দোষ কোথায় এবং তাদের শাস্তি কেন হবে?
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মুফাসসিরগণ এর চমৎকার ও যুক্তিগ্রাহ্য জবাব দিয়েছেন:

  • শাস্তিস্বরূপ মোহর অঙ্কন (عقوبة على تمردهم): আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর শুরুতে কোনো জোরপূর্বক মোহর মারেননি। বরং তারা যখন বারবার সত্যকে জেনে-শুনে প্রত্যাখ্যান করেছে, অহংকার প্রদর্শন করেছে এবং কুফরিকে আঁকড়ে ধরেছে, তখন তাদের এই ক্রমাগত অবাধ্যতার স্বাভাবিক পরিণতি ও যৌক্তিক শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাদের অন্তরকে মোহরাঙ্কিত করে দিয়েছেন।
  • হাদিসের ভাষ্য: তিরমিযী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: “বান্দা যখন একটি গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর সে তাওবা করলে তা মুছে যায়; কিন্তু সে যদি তাওবা না করে বারবার গুনাহ করতে থাকে, তবে সেই দাগ বাড়তে বাড়তে গোটা অন্তরকে ঢেকে ফেলে। এটাই হলো সেই ‘রান’ (الرَّانُ) বা মরিচা যার কথা আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন।”
  • মু’তাযিলা দৃষ্টিভঙ্গির খণ্ডন: আল্লামা যামাখশারী (রহ.) তাঁর তাফসীরে কাশশাফে মু’তাযিলা আকিদা অনুসারে একে রূপক ও কাফেরদের নিজস্ব অবাধ্যতার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু জমহুর মুফাসসিরীন (ইমাম কুরতুবী, ফখরুদ্দীন রাযী ও ইবনে কাসীর) প্রমাণ করেছেন যে, সৃষ্টিজগতের প্রতিটি পরিণতির চূড়ান্ত স্রষ্টা আল্লাহ হলেও কর্মের দায়ভার ও দায়িত্ব পুরোপুরি মানুষের নিজস্ব ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

উপসংহার:
আয়াতটি বান্দাকে সতর্ক করে দেয় যেন সে কখনোই সত্যের ব্যাপারে অহংকার ও হঠকারিতা না করে। সত্য জানার সাথে সাথে তা গ্রহণ না করলে অন্তর অন্ধ হয়ে যাওয়ার এক ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করে।


٤- قوله تعالى : ومن الناس من يقول آمنا بالله وباليوم الآخر وماهم بمؤمنين- يُخدعون الله والذين أمنوا وما يخدعون إلا أنفسهم وما يشعرون-

[৪. মহান আল্লাহর বাণী: আর মানুষের মধ্যে এমন কতক রয়েছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহ এবং মুমিনগণকে ধোঁকা দিতে চায়, অথচ তারা নিজেদের ছাড়া কাউকেই ধোঁকা দিচ্ছে না, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করতে পারছে না। (সুরা আল-বাকারা: ৮-৯)]

আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ও তাৎপর্য:

পবিত্র কুরআনে মানবজাতির তিনটি মানসিক শ্রেণির বর্ণনা এসেছে—প্রথমে মুমিন (৪ আয়াত), অতঃপর কাফের (২ আয়াত), এবং সর্বশেষে মুনাফিক। সুরা আল-বাকারার এই আয়াতে তৃতীয় সেই বিপজ্জনক দল অর্থাৎ ‘মুনাফিক’দের চরিত্র উন্মোচন করা হয়েছে। তারা মুখে ঈমানের মিষ্টি স্লোগান দেয় কিন্তু অন্তরে চরম কুফরি লুকিয়ে রাখে। তারা মনে করে চাতুর্য দিয়ে আল্লাহ ও মুমিনদের ধোঁকা দিচ্ছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদেরই আত্মপ্রতারণা ও সর্বনাশের পথ সুগম করছে।


(أ) عرف النفاق- بين علامات المنافقين فى ضوء الكتاب والسنة-

[(ক) নিফাক (نفاق)-এর পরিচয় দাও। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুনাফিকদের আলামত বা লক্ষণসমূহ বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
ইসলামের ইতিহাসে প্রত্যক্ষ কাফের ও শত্রুদের চেয়েও সমাজের ভেতরের গোপন শত্রু ‘মুনাফিক’রা সবসময় দ্বীন ও মুসলিম উম্মাহর সর্বাধিক ক্ষতিসাধন করেছে। নিফাক হলো মানব চরিত্রের জঘন্যতম কপটতা ও প্রতারণা।

১. নিফাক (النفاق)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • আভিধানিক অর্থ: নিফাক শব্দটি ‘নাফাক্বা’ (النَّفَقُ) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ মাটির নিচে নির্মিত সুরঙ্গ বা গোপন সুড়ঙ্গপথ। মরুভূমির গিরগিটি বা ইঁদুর যেমন আত্মরক্ষার জন্য গর্তের দুটি মুখ রাখে—একদিক দিয়ে বিপদ দেখলে অন্যদিক দিয়ে পালিয়ে যায়—তেমনি মুনাফিকও আত্মরক্ষার্থে কুফর ও ইসলামের মাঝে দ্বিচারিতা করে।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: অন্তরে কুফরি, হিংসা ও শত্রুতা লুকিয়ে রেখে মুখে বা প্রকাশ্যে ইসলাম ও ঈমান প্রকাশ করাকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘নিফাক’ বলা হয়।
  • নিফাকের প্রকারভেদ:
    1. নিফাকে আকবার বা ই’তিকাদী (চরম বিশ্বাসগত নিফাক): অন্তরে ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা মনে করা এবং বাহ্যিকভাবে মুসলমান সেজে থাকা। এর অধিকারী ব্যক্তি কাফেরদের চেয়েও নিকৃষ্ট এবং জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে (الدرك الأسفل من النار) নিক্ষিপ্ত হবে।
    2. নিফাকে আসগার বা আমলী (আচরণগত নিফাক): ঈমান থাকা সত্ত্বেও চরিত্রে মুনাফিকসুলভ স্বভাব (যেমন: মিথ্যা বলা, আমানতের খেয়ানত) প্রবেশ করা। এটি কবিরা গুনাহ হলেও ব্যক্তি ঈমান থেকে সরাসরি খারিজ হয় না।

২. কুরআনুল কারীমের আলোকে মুনাফিকদের আলামত বা বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • মিথ্যা শপথের আশ্রয় গ্রহণ: ﴿اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ﴾ (তারা নিজেদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে, অতঃপর মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত্ত করে — সুরা আল-মুনাফিকুন: ২)।
  • নামাযে চরম অলসতা ও লোকদেখানো ভাব: ﴿وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَىٰ يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا﴾ (যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে — সুরা আন-নিসা: ১৪২)।
  • দ্বিধাদ্বন্দ্বে দোলায়মান থাকা: ﴿مُّذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَٰلِكَ لَا إِلَىٰ هَٰؤُلَاءِ وَلَا إِلَىٰ هَٰؤُلَاءِ﴾ (তারা এর মাঝামাঝি দোলায়মান—না এদের দিকে, না ওদের দিকে — সুরা আন-নিসা: ১৪৩)।
  • ফিতনা সৃষ্টি ও সৎকাজে বাধা দেওয়া: তারা প্রকাশ্যে বলে আমরা সমাজে সংস্কার করছি (إنما نحن مصلحون), অথচ তারাই প্রকৃতপক্ষে মূল ফাসাদ সৃষ্টিকারী।

৩. সহীহ সুন্নাহর আলোকে মুনাফিকদের আলামত:
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
«أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ»
(চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকবে সে খাঁটি মুনাফিক, আর যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে তার মধ্যে নিফাকের একটি বৈশিষ্ট্য থাকবে যতক্ষণ না সে তা বর্জন করে:
১. যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয়, সে তার খিয়ানত করে;
২. যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে;
৩. যখন ওয়াদা বা অঙ্গীকার করে, তা ভঙ্গ করে;
৪. এবং যখন কোনো বিবাদে জড়ায়, তখন অশ্লীল গালিগালাজ করে।)

উপসংহার:
নিফাক আত্মিক ধ্বংসের নামান্তর। সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের ব্যাপারে নিফাকের আশঙ্কায় সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতেন। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত নিজের ভেতর এই ধ্বংসাত্মক আলামতগুলো রয়েছে কি না তা সর্বদা পর্যালোচনা করা।


(ب) ما المراد بقوله تعالى : ‘يُخدعون الله’؟ بين-

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী ‘يُخَادِعُونَ اللَّهَ’ (তারা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়) দ্বারা উদ্দেশ্য কী? ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ মুনাফিকদের অপকৌশল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন—তারা আল্লাহ ও মুমিনদের ‘ধোঁকা’ দিতে চায়। অথচ মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী, তাঁর কাছে কোনো কিছুই গোপন নেই। তবে কীভাবে তারা আল্লাহকে ধোঁকা দেয় এবং এর তাৎপর্য কী—তা নিয়ে মুফাসসিরীনগণ বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।

১. ‘খুদ’আহ’ (المخادعة)-এর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:
আরবি ভাষায় ‘আল-খাদ’উ’ (الخَدْعُ) শব্দের অর্থ হলো ক্ষতিসাধন করার উদ্দেশ্যে কোনো সত্যকে গোপন রেখে বাইরে ভিন্ন রূপ প্রদর্শন করা। বাবে মুফাআলা (مفاعلة) থেকে আসায় এটি পারস্পরিক প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে।

২. আল্লাহকে ধোঁকা দেওয়ার প্রকৃত অর্থ ও মুফাসসিরীনদের ব্যাখ্যা:
আল্লাহ তাআলাকে কি কোনো মানুষ কখনো ধোঁকা দিতে পারে? কস্মিনকালেও না। কারণ তিনি «عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ» (অন্তরের গোপন রহস্য সম্পর্কে পূর্ণ অবগত)। মুফাসসিরীনদের প্রদত্ত প্রামাণ্য ব্যাখ্যাসমূহ নিম্নরূপ:

  • রাসূল ও মুমিনদের সাথে ধোঁকাকেই আল্লাহর সাথে ধোঁকা বলা হয়েছে (مجاز بالحذف):
    আরবি ভাষার অলঙ্কারশাস্ত্রীয় রীতি অনুসারে আল্লাহর রাসূল ﷺ ও মুমিনদের ধোঁকা দেওয়ার অপচেষ্টাকে স্বয়ং আল্লাহর শানের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যেমন কুরআনে এসেছে: ﴿إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ﴾ (যারা আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করে, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছেই বাইয়াত গ্রহণ করে — সুরা আল-ফাতহ: ১০)। সুতরাং মুমিনদের ধোঁকা দেওয়া মানে স্বয়ং আল্লাহর দ্বীনকে ধোঁকা দেওয়ার নামান্তর।
  • আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের অপকৌশলের পাল্টা প্রতিদান (المشاكلة الجزائية):
    মুনাফিকরা নিজেদের চাতুর্য দিয়ে মুমিনদের ফাঁকি দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে তাদের জান-মালের আপাত নিরাপত্তা দিয়ে এবং পরকালে তাদের জন্য চরম অন্ধকার ও লাঞ্ছনা প্রস্তুত রেখে তাদের অপকৌশলকে তাদের বিরুদ্ধেই ফিরিয়ে দেন। একে বালাগাতের পরিভাষায় ‘মুশাকালাহ’ বলা হয়। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে: ﴿يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ﴾ (তারা আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চায়, অথচ তিনিই তাদেরকে ধোঁকায় নিপতিত করেন — সুরা আন-নিসা: ১৪২)।
  • তাদের ভ্রান্ত ধারণা ও অজ্ঞতা:
    মুনাফিকরা তাদের সংকীর্ণ বুদ্ধিতে মনে করত যে, তারা যেভাবে দুনিয়ার মানুষকে মিষ্টি কথায় প্রতারিত করতে পারছে, তেমনি হয়তো আল্লাহর দরবারেও বেঁচে যাবে। কিন্তু তাদের এই মনোভাব ছিল চরম অজ্ঞতাপ্রসূত।

৩. “وما يخدعون إلا أنفسهم وما يشعرون”-এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য:
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—তারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের আত্মাকেই ধোঁকা দিচ্ছে। কারণ তাদের এই কপটতার কোনো ক্ষতি আল্লাহ বা মুমিনদের স্পর্শ করে না; বরং তাদের এই আচরণ দুনিয়াতে তাদের আত্মিক প্রশান্তি ধ্বংস করে, হৃদরোগ বৃদ্ধি করে এবং আখিরাতে তাদের জন্য অবধারিত করে তোলে জাহান্নামের অতল গহ্বর। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো—তারা নিজেদের এই করুণ আত্মপ্রবঞ্চনা অনুভবও করতে পারে না।

উপসংহার:
মুনাফিকি চাতুর্য কখনোই আল্লাহর অনন্ত জ্ঞানের সামনে টিকে থাকতে পারে না। সরলতা ও একনিষ্ঠ সত্যবাদিতাই হলো আল্লাহর দরবারে সফলতার একমাত্র রাজপথ।


٥- قوله تعالى : سبحان الذى أسرى بعبده ليلا من المسجد الحرام إلى المسجد الأقصى الذى باركنا حوله لنريه من آيتنا إنه هو السميع البصير-

[৫. মহান আল্লাহর বাণী: পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ প্রদর্শন করতে পারি; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সুরা বনি ইসরাঈল: ১)]

আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ও তাৎপর্য:

উক্ত মহিমান্বিত আয়াতটি সুরা বনি ইসরাঈল (সুরা আল-ইসরা)-এর প্রথম আয়াত। এতে ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অলৌকিক মোজেজা—’ইসরা ও মিরাজ’-এর প্রথমাংশের অকাট্য বর্ণনা এসেছে। মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত রাতের এক ক্ষুদ্রাংশে প্রিয় নবী ﷺ-এর এই সফর ছিল মানব ইতিহাসের সকল বৈজ্ঞানিক ও জাগতিক চিন্তার ঊর্ধ্বে এক অনুপম ঐশী নিদর্শন।


(أ) اذكر قصة المعراج مختصرًا-

[(ক) মিরাজের ঘটনা সংক্ষেপে উল্লেখ কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
নবুওয়াতের দশম বর্ষে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয়তমা স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.) এবং পরম হিতৈষী চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন (যাকে عام الحزن বা শোকের বছর বলা হয়) এবং তায়েফের ময়দানে তিনি নির্মম নির্যাতনের শিকার হন, তখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় হাবীবকে সান্ত্বনা ও অসীম সম্মান প্রদর্শনের জন্য ঐতিহাসিক ‘ইসরা ও মিরাজ’-এর আয়োজন করেন।

মিরাজের সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিক ঘটনাক্রম:

  1. সিনা চাক ও বোরাকে আরোহণ:
    নবী করীম ﷺ যখন উম্মে হানী (রা.)-এর ঘরে বা হাতিমে কা’বায় শায়িত ছিলেন, তখন জিবরাঈল (আ.) আগমন করে তাঁর বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করেন (সিনা চাক) এবং যমযমের পানিতে ধৌত করে হিকমত ও ঈমান দ্বারা পূর্ণ করে দেন। অতঃপর বিদ্যুৎগতির ঐশী বাহন ‘বোরাক’-এ আরোহণ করিয়ে তাঁকে মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ভূগর্ভস্থ ভ্রমণকে ‘ইসরা’ বলা হয়।
  2. আম্বিয়ায়ে কেরামের ইমামতি:
    মসজিদুল আকসায় পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলগণের রূহকে সমবেত করা হয় এবং নবী করীম ﷺ সকলের ইমাম হয়ে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। এর মাধ্যমে তিনি সকল নবীর নেতা বা ‘সাইয়্যিদুল আম্বিয়া’ হিসেবে অভিষিক্ত হন।
  3. ঊর্ধ্বাকাশ গমন ও নবীদের সাথে সাক্ষাৎ (মিরাজ):
    বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বিশেষ সিঁড়ি বা ঊর্ধ্বগমনের বাহনের মাধ্যমে প্রথম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন আসমানে মহামহিম নবীদের সাথে সাক্ষাৎ হয়:

    • প্রথম আসমানে: হযরত আদম (আ.)
    • দ্বিতীয় আসমানে: হযরত ঈসা (আ.) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ.)
    • তৃতীয় আসমানে: হযরত ইউসুফ (আ.)
    • চতুর্থ আসমানে: হযরত ইদরীস (আ.)
    • পঞ্চম আসমানে: হযরত হারুন (আ.)
    • ষষ্ঠ আসমানে: হযরত মুসা (আ.)
    • সপ্তম আসমানে: হযরত ইব্রাহীম (আ.), যিনি বায়তুল মা’মুরে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন।
  4. সিদরাতুল মুনতাহা ও মহান সান্নিধ্য:
    সপ্তম আসমান অতিক্রম করে রাসূলুল্লাহ ﷺ ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ (সীমান্তের কুলগাছ)-এ উপনীত হন। সেখানে জিবরাঈল (আ.) থেমে গিয়ে বলেন, “এর এক চুল পরিমাণ সামনে অগ্রসর হলে আল্লাহর নূরের তাজাল্লিতে আমার পাখা ভস্মীভূত হয়ে যাবে।” সেখান থেকে নবীজী ﷺ একা রফরফ নামক বিশেষ বাহনে চড়ে আল্লাহর পরম সান্নিধ্যে আরশ মোবারকের কাছে উপনীত হন এবং সরাসরি আল্লাহ তাআলার সাথে বাক্যালাপে ধন্য হন।
  5. সালাতের উপহার ও প্রত্যাবর্তন:
    আল্লাহ তাআলা স্বীয় হাবীবকে উম্মতের জন্য ৫০ ওয়াক্ত সালাত উপহার দেন। পরবর্তীতে হযরত মুসা (আ.)-এর পরামর্শে কয়েকবার আবেদনের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত নির্ধারণ করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, ৫ ওয়াক্ত আদায় করলে ৫০ ওয়াক্তেরই সওয়াব দান করা হবে। একই সাথে সুরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত এবং কবিরা গুনাহ ছাড়া উম্মতের ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অতঃপর রাতের অন্ধকার শেষ হওয়ার পূর্বেই নবীজী ﷺ মক্কায় নিজ বিছানায় প্রত্যাবর্তন করেন।

উপসংহার:
মিরাজ ছিল মুমিন উম্মতের জন্য আধ্যাত্মিক উন্নতির শ্রেষ্ঠ দিশারী। সালাতকে তাই মুমিনের মিরাজ (الصلاة معراج المؤمن) বলা হয়।


(ب) هل كان الإسراء في اليقظة أم فى المنام؟ بين-

[(খ) ইসরা কি জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল নাকি স্বপ্নে? বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
ইসরা ও মিরাজ কি শারীরিক ও জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল, নাকি আত্মিক ও স্বপ্নযোগে হয়েছিল—এ নিয়ে সালাফ ও খালাফের মাঝে গভীর ইলমী আলোচনা রয়েছে। তবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত হলো—ইসরা ও মিরাজ সশরীরে জাগ্রত অবস্থাতেই সংঘটিত হয়েছিল।

১. জমহুর আহলুস সুন্নাহর চূড়ান্ত অভিমত:
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং চার মাযহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো—নবী করীম ﷺ জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে (روحًا وجسدًا في اليقظة) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে সপ্তাকাশ হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন করেছিলেন।

২. সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় ইসরা হওয়ার অকাট্য দলীলসমূহ:

  • ১. ‘বি-আবদিহী’ (بعبده) শব্দের ব্যবহার:
    আরবি ভাষায় ‘আবদ’ (বান্দা) শব্দটি কেবল রূহ বা আত্মাকে বোঝায় না; বরং দেহ ও আত্মার সমন্বিত জীবন্ত রূপকেই ‘আবদ’ বলা হয়। যদি কেবল রূহের ভ্রমণ হতো তবে ‘বি-রূহিহী’ (স্বীয় আত্মা দিয়ে) বলা হতো।
  • ২. ‘সুবহানা’ (سبحان) শব্দের বিস্ময়কর সূচনা:
    পবিত্র কুরআনে ‘সুবহান’ শব্দটি কেবল এমন অতিপ্রাকৃতিক, অভাবনীয় ও মহা অলৌকিক কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় যা মানববুদ্ধির বাইরে। স্বপ্নে যে কেউ এক রাতে বহু দূর ভ্রমণ করতে পারে, তাতে কোনো বিস্ময় নেই এবং তার জন্য ‘সুবহান’ বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
  • ৩. কুরাইশ মুশরিকদের তীব্র বিরোধিতা ও অস্বীকার:
    নবীজী ﷺ যখন মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করলেন, তখন মক্কার কাফেররা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল এবং একে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিল। ঘটনাটি যদি নিছক একটি স্বপ্ন হতো, তবে কাফেররা কখনো এর বিরোধিতা করত না; কারণ স্বপ্নে যেকোনো মানুষ যেকোনো স্থানে যেতে পারে, তা নিয়ে বিতর্ক করার কোনো অবকাশ থাকে না। কাফেরদের এই জোরালো বিরোধিতাই প্রমাণ করে যে নবীজী সশরীরে ভ্রমণের কথাই দাবি করেছিলেন।
  • ৪. ‘বোরাক’ বাহনের উপস্থিতি:
    সহীহ হাদিসে স্পষ্ট এসেছে যে নবীজীর জন্য বোরাক আনা হয়েছিল এবং তিনি তাতে সওয়ার হয়েছিলেন। আত্মিক বা স্বপ্নিল ভ্রমণের জন্য কোনো বাহন বা পশুর পিঠে আরোহণের কোনো প্রয়োজন হয় না।
  • ৫. বায়তুল মুকাদ্দাসের নিখুঁত বিবরণ প্রদান:
    কাফেররা যখন বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজা, জানালা ও খুঁটির বিবরণ জানতে চাইল, তখন আল্লাহ তাআলা তা নবীজীর চোখের সামনে তুলে ধরেন এবং তিনি দেখে দেখে নিখুঁত বর্ণনা দেন, যা তাঁর বাস্তব উপস্থিতিকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করে।

৩. হযরত আয়েশা ও মুআবিয়া (রা.)-এর কিছু বর্ণনার তাহকীক:
কোনো কোনো বর্ণনায় হযরত আয়েশা (রা.)-এর উক্তি পাওয়া যায় যে “নবীজীর শরীর হারিয়ে যায়নি, বরং আত্মিক ভ্রমণ হয়েছিল।” মুহাদ্দিসীনগণ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন—মিরাজের সময় হযরত আয়েশা (রা.) অতি অল্প বয়স্কা ছিলেন এবং নবীজীর সাথে তাঁর বিয়েও সম্পন্ন হয়নি। তিনি এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না। তাছাড়া তাঁদের বক্তব্যটি ছিল মিরাজের কোনো এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বিষয়ে, যা মূল সশরীরে ইসরাকে অস্বীকার করে না।

উপসংহার:
সুতরাং কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই প্রমাণিত যে, ইসরা ও মিরাজ ছিল জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে মহান আল্লাহর কুদরতের এক জীবন্ত মু’জিযা।


٦- قوله تعالى : يا أيها الذين آمنوا لا تقدموا بين يدى الله ورسوله واتقوا الله، إن الله سميع عليم- يا أيها الذين آمنوا لا ترفعوا أصواتكم فوق صوت النبى ولا تجهروا له بالقول كجهر بعضكم لبعض أن تحبط أعمالكم وأنتم لا تشعرون-

[৬. মহান আল্লাহর বাণী: হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের সাথে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল, নবীর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বলো না; পাছে তোমাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের সকল নেক আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। (সুরা আল-হুজুরাত: ১-২)]

আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ও প্রেক্ষাপট:

সুরা আল-হুজুরাতকে ‘সুরতুল আদাব’ বা শিষ্টাচারের সুরা বলা হয়। এই সুরার প্রারম্ভে মুমিন সমাজকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর সাথে কথাবার্তা ও আচরণের সর্বোচ্চ শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর হুকুম এবং রাসূলের সিদ্ধান্তের সামনে নিজের রায় বা মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং নবীজীর পবিত্র সান্নিধ্যে কণ্ঠস্বর নিচু রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


(أ) بين سبب نزول الآيات الكريمة-

[(ক) উক্ত সম্মানিত আয়াতসমূহের শানে নুযূল বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ কোনো না কোনো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তব শিক্ষণীয় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে। সুরা আল-হুজুরাতের প্রথম দুই আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে সহীহ বুখারী শরীফে অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

শানে নুযূলের ঐতিহাসিক বিবরণ (সহীহ বুখারী):
হযরত ইবনে আবি মুলাইকা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—নিকটবর্তী ছিল যে দুই শ্রেষ্ঠ মানুষ আবু বকর ও ওমর (রা.) ধ্বংস হয়ে যেতেন! ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

  • বনু তামীম প্রতিনিধি দলের আগমন:
    নবম হিজরীতে যখন বনু তামীম গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দরবারে আগমন করল, তখন তাঁদের গোত্রের নেতা বা আমীর হিসেবে কাকে নিযুক্ত করা হবে সে বিষয়ে আলোচনা শুরু হলো।
  • আবু বকর ও ওমর (রা.)-এর পরামর্শ:
    হযরত আবু বকর (রা.) প্রস্তাব করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! কা’কা ইবনে মা’বাদ (রা.)-কে তাদের আমীর নিযুক্ত করুন।”
    পক্ষান্তরে হযরত ওমর (রা.) বললেন, “বরং আকরা ইবনে হাবিস (রা.)-কে আমীর নিযুক্ত করা সমীচীন হবে।”
  • কথোপকথন ও কণ্ঠস্বর উচ্চ হওয়া:
    হযরত আবু বকর (রা.) তখন ওমর (রা.)-কে বললেন, “আপনি তো কেবল আমার বিরোধিতা করতেই চেয়েছিলেন!”
    ওমর (রা.) জবাব দিলেন, “আমি আপনার বিরোধিতা করতে চাইনি।”
    এই আলোচনার একপর্যায়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপস্থিতিতেই তাঁদের দুজনের কণ্ঠস্বর কিছুটা উঁচু হয়ে যায়।
  • আয়াত নাযিল ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতিক্রিয়া:
    রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে সাহাবীগণের সাধারণ কোনো বিষয়ে উচ্চস্বরে কথা বলাও যেন তাঁর শানের অমর্যাদা না হয়, সেজন্য আল্লাহ তাআলা তাৎক্ষণিকভাবে এই আয়াত অবতীর্ণ করেন: ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ﴾
  • হযরত সাবেত ইবনে কায়েস (রা.)-এর দৃষ্টান্ত:
    আয়াত নাযিল হওয়ার পর হযরত সাবেত ইবনে কায়েস (রা.)—যাঁর কণ্ঠ প্রাকৃতিকভাবেই খুব উঁচু ছিল—ঘরে দরজা বন্ধ করে কাঁদতে লাগলেন। তিনি ভাবলেন, “আমার উচ্চ কণ্ঠস্বরের কারণে আমার আমল বরবাদ হয়ে গেছে এবং আমি জাহান্নামী হয়ে গেছি।” রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর খোঁজ নিয়ে তাঁকে ডেকে পাঠালেন এবং অভয় দিয়ে বললেন, “না, তুমি এমন নও; বরং তুমি কল্যাণের সাথে বেঁচে থাকবে এবং শহীদ হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে!”
  • সাহাবীদের পরম সতর্কতা:
    এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর হযরত ওমর (রা.) নবীজী ﷺ-এর সামনে এত নিচু স্বরে কথা বলতেন যে, নবীজীকে বারবার কথাটি পুনরায় জিজ্ঞেস করে বুঝে নিতে হতো।

উপসংহার:
এই শানে নুযূল উম্মতকে শিক্ষা দেয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অন্যতম প্রধান দাবি।


(ب) بين مكانة النبى صلى الله عليه وسلم وفضله في ضوء سورة الحجرات-

[(খ) সুরা আল-হুজুরাতের আলোকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুউচ্চ মর্যাদা ও ফযীলত বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
সুরা আল-হুজুরাত প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর সম্মান, শ্রদ্ধা ও শিষ্টাচারের এক অনন্য স্বর্গীয় সনদ। এই সুরায় আল্লাহ তাআলা উম্মতের ওপর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মর্যাদা রক্ষার আবশ্যকতাকে অত্যন্ত অলঙ্কারপূর্ণ ও কঠোর ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

সুরা আল-হুজুরাতের আলোকে নবী করীম ﷺ-এর সুউচ্চ মর্যাদা:

  1. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত অগ্রাধিকার (لا تقدموا):
    কোনো বিষয়ে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কোনো ফায়সালা দিলে নিজের রায়, কিয়াস বা মনগড়া যুক্তি দিয়ে তার চেয়ে অগ্রগামী হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলের সিদ্ধান্তই মুমিনের জন্য চূড়ান্ত।
  2. কণ্ঠস্বর নিচু রাখার স্বর্গীয় নির্দেশ:
    নবীজীর সামনে নিজের গলার আওয়াজ উঁচু করা যাবে না। সাধারণ মানুষের সাথে যে উচ্চতায় কথা বলা হয়, নবীজীর সাথে কথা বলার সময় তার চেয়ে অনেক বেশি বিনীত ও মোলায়েম হতে হবে। কারণ তাঁর সামনে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক।
  3. বেয়াদবিতে সকল আমল বরবাদ হওয়ার হুশিয়ারি:
    কুরআন ঘোষণা করে যে, নবীজীর শানে সামান্যতম অসাবধানতা ও বেয়াদবি মানুষের জীবনের সকল নেক আমল—নামায, রোজা, হজ, যাকাত—অজ্ঞাতসারেই সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে (أن تحبط أعمالكم وأنتم لا تشعرون)। এমন সতর্কতা কুরআনে আর কারো ক্ষেত্রে উচ্চারণ করা হয়নি।
  4. নবীজীর প্রতি শ্রদ্ধাশীলদের তাকওয়ার সার্টিফিকেট:
    আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: ﴿إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَىٰ﴾ (যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের আওয়াজ নিচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য বাছাই ও পরীক্ষা করেছেন; তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার — আয়াত: ৩)। অর্থাৎ নবীজীর প্রতি সম্মান দেখানোই অন্তরের তাকওয়ার প্রমাণ।
  5. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও হুজরার সম্মান:
    বেদুইনরা যেভাবে ঘরের পেছন থেকে নাম ধরে চিৎকার করত, নবীজীকে সেভাবে ডাকা চরম নির্বুদ্ধিতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে (أكثرهم لا يعقلون)। নবীজীর অবসর সময় ও হুজরাসমূহের পবিত্রতা রক্ষা করা উম্মতের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে।

উপসংহার:
সুরা আল-হুজুরাত প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র পথ হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জীবনের সকল কিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রদর্শন করা।


٧- قوله تعالى : يا أيها الذين آمنوا اجتنبوا كثيرا من الظن ، إن بعض الظن إثم ولا تجسسوا ولا يغتب بعضكم بعضا ، أيحب أحدكم أن يأكل لحم أخيه ميتا فكرهتموه ، واتقوا الله ، إن الله تواب رحيم-

[৭. মহান আল্লাহর বাণী: হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাক; কারণ কোনো কোনো অনুমান তো পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে অপছন্দই কর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সুরা আল-হুজুরাত: ১২)]

আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ও তাৎপর্য:

সুরা আল-হুজুরাতের ১২ নং এই আয়াতটি একটি আদর্শ, শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণের মহাসনদ। সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ধ্বংসকারী তিনটি মারাত্মক ব্যাধি—অহেতুক কুধারণা (সূউল জান্ন), অন্যের গোপন দোষ অনুসন্ধান (তাজাসসুস) এবং পরনিন্দা বা গীবত করাকে এই আয়াতে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে গীবতের ঘৃণ্যতাকে মানুষের আপন মৃত ভাইয়ের পচা গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করে এক অকল্পনীয় মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে।


(أ) ما المراد بالظن والتجسس؟ بين-

[(ক) ‘জান্ন’ (ধারণা/অনুমান) ও ‘তাজাসসুস’ (গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান)-এর দ্বারা উদ্দেশ্য কী? বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
ইসলামি সমাজব্যবস্থা পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া অপরের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের দুর্বলতা খুঁজে বেড়ানো সামাজিক শান্তির মূল ভিত্তি বিনষ্ট করে।

১. ‘জান্ন’ (الظن)-এর অর্থ ও তাৎপর্য:

  • অর্থ: কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ বা বাস্তব দলিল ছাড়া নিছক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকে ‘জান্ন’ বলা হয়।
  • জান্ন-এর প্রকারভেদ:
    1. মুমিনের প্রতি ভালো ধারণা (হুসনুল জান্ন – حسن الظن): এটি প্রশংসনীয় ও মুস্তাহাব। আল্লাহ ও তাঁর নেককার বান্দাদের ব্যাপারে সর্বদা ভালো ধারণা পোষণ করা উচিত।
    2. কু-ধারণা বা অসৎ অনুমান (সূউল জান্ন – سوء الظن): কোনো দ্বীনদার বা নির্দোষ ব্যক্তির স্পষ্ট কোনো অপরাধ না দেখে কেবল সন্দেহের বশে তাকে চোর, মিথ্যাবাদী বা মুনাফিক মনে করা। আয়াতে এই ধরনের অনুমানকেই ‘পাপ’ (إثم) ঘোষণা করে তা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  • হাদিসের হুশিয়ারি: সহীহ বুখারীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: «إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ» (তোমরা ধারণা ও অনুমান থেকে বেঁচে থাক; কেননা অনুমান হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা)।

২. ‘তাজাসসুস’ (التجسس)-এর অর্থ ও তাহকীক:

  • অর্থ: কোনো মানুষের ব্যক্তিগত দোষ-ত্রুটি, গোপন বিষয়াদি বা দুর্বলতা যা সে ঢেকে রাখতে চায়, তা গোয়েন্দাগিরি করে বা লুকিয়ে অনুসন্ধান করাকে ‘তাজাসসুস’ বলা হয়।
  • তাজাসসুস ও তাহাসসুসের পার্থক্য: হাদিস শরীফে এসেছে—«وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا تَحَسَّسُوا»। মুহাদ্দিসীনদের মতে, অপরের গোপন অনিষ্ট ও দোষ খোঁজা হলো ‘তাজাসসুস’ (জীম দিয়ে), আর অপরের ভালো বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হলো ‘তাহাসসুস’ (হা দিয়ে)।
  • ইসলামি দৃষ্টিকোণ: ইসলাম প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তার (Privacy) পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করেছে। কারো ব্যক্তিগত চিঠিপত্র পড়া, অনুমতি ছাড়া ঘরে উঁকি দেওয়া বা গোপন রেকর্ডিং করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।

উপসংহার:
অনর্থক ধারণা মানুষের অন্তরে সন্দেহের জন্ম দেয় এবং সেই সন্দেহ মানুষকে তাজাসসুস বা গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত করে। তাই উভয় ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকাই সুস্থ সমাজের মূল শর্ত।


(ب) عرف الغيبة ثم اذكر حديثًا في ذم الغيبة-

[(খ) গীবতের সংজ্ঞা দাও। অতঃপর গীবতের নিন্দায় একটি হাদিস উল্লেখ কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
সামাজিক জীবনে জিহ্বার সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ হলো ‘গীবত’ বা পরনিন্দা। ইসলাম গীবতকে কবিরা গুনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে এবং একে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমতুল্য জঘন্য পাপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

১. গীবত (الغيبة)-এর প্রামাণ্য সংজ্ঞা:
স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ সহীহ মুসলিমের এক হাদিসে গীবতের নিখুঁত সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন:
«أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ»
(তোমরা কি জান গীবত কী? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। তিনি বললেন: “তোমার কোনো ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে শুনলে কষ্ট পাবে বা অপছন্দ করবে।”)
জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যা বলছি তা যদি বাস্তবিকই আমার ভাইয়ের মধ্যে উপস্থিত থাকে?”
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করলেন:
«إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ»
(তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে সত্যিই থাকে তবেই তুমি তার গীবত করলে; আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তার ওপর অপবাদ (বুহতান) আরোপ করলে। — সহীহ মুসলিম)।

২. কুরআনে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার উপমা:
আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ﴾। কোনো মানুষ যেমন তার আপন মৃত ভাইয়ের কাঁচা গোশত কখনো কামড়ে খেতে পারে না এবং তা দেখলেই চরম ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়, অনুপস্থিত ভাইয়ের দোষ বর্ণনা করাও আল্লাহর দরবারে তেমনি চরম ঘৃণ্য ও পৈশাচিক কাজ।

৩. গীবতের নিন্দায় হাদিস শরীফ (حديث في ذم الغيبة):

  • আবু দাউদ শরীফের প্রামাণ্য হাদিস: হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
    «لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمُشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ، فَقُلْتُ: مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ، وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ»
    (অর্থ: মিরাজের রজনীতে যখন আমাকে ঊর্ধ্বাকাশে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমি এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম যাদের তামার নখ রয়েছে এবং তারা সেই নখ দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক অবিরাম আঁচড়াচ্ছে ও ক্ষতবিক্ষত করছে! আমি বললাম, “হে জিবরাঈল! এরা কারা?” জিবরাঈল (আ.) বললেন, “এরা সেই সমস্ত লোক যারা দুনিয়াতে মানুষের গোশত খেত (অর্থাৎ গীবত করত) এবং মানুষের মান-সম্মানহানি করত।” — সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৪৮৭৮)।

উপসংহার:
গীবত কেবল আল্লাহর হক নয়, বরং বান্দার হকের (হাক্কুল ইবাদ) সাথে জড়িত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত আল্লাহও গীবতকারীকে ক্ষমা করেন না। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত নিজের যবানকে গীবতের আগুন থেকে সদা মুক্ত রাখা।


٨- قوله تعالى : والنجم إذا هوى- ما ضَلَّ صاحبكم وما غوى- وما ينطق عن الهوى- إن هو إلا وحىٌ يُوحَى- علّمه شديد القوى- ذو مرة فاستوى- وهو بالأفق الأعلى-

[৮. মহান আল্লাহর বাণী: শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্তমিত হয়। তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত হননি এবং বিপথগামীও হননি। আর তিনি প্রবৃত্তি থেকে কোনো কথা বলেন না। এতো এক ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। তাঁকে শিক্ষা দান করেছে এক শক্তিশালী সত্তা (জিবরাঈল), যিনি বলশালী; অতঃপর তিনি স্থির হয়েছিলেন, আর তিনি ছিলেন ঊর্ধ্ব দিগন্তে। (সুরা আন-নাজম: ১-৭)]

আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অর্থ ও তাৎপর্য:

সুরা আন-নাজমের প্রারম্ভিক এই আয়াতগুলো নবুওয়াত ও ওহীর প্রামাণিকতা ও অভ্রান্ততার এক অনন্য ঐশী দলিল। এতে মহান আল্লাহ নক্ষত্রের শপথ করে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ কখনো সত্যচ্যুত হননি এবং তিনি নিজের খেয়াল-খুশি বা মনগড়া কোনো কথা বলেন না। তিনি যা কিছু উচ্চারণ করেন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত খাঁটি ওহী। এই ওহী তাঁর কাছে নিয়ে এসেছেন মহাশক্তিশালী ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)।


(أ) ما معنى الوحى؟ بين كيفية نزول الوحى إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم-

[(ক) ওহী (وحي)-এর অর্থ কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর ওহী নাযিলের পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
ইসলামি আকিদা ও শরিয়তের মূল উৎস হলো ‘ওহী’। ওহী হলো সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যবর্তী ঐশী যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম, যার সাহায্যে আল্লাহর হিদায়াত মানবজাতির কাছে পৌঁছায়।

১. ওহী (الوحي)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • আভিধানিক অর্থ: ওহী শব্দের মূল অর্থ হলো অত্যন্ত দ্রুত এবং অত্যন্ত গোপনে কোনো তথ্য অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া বা সংকেত করা (الإشارة السريعة الخفية)।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী ও রাসূলগণের ওপর মানবজাতির পথপ্রদর্শনের নিমিত্তে যে ঐশী বাণী ও হেদায়াত অতিপ্রাকৃতিক উপায়ে অবতীর্ণ করেন, তাকে ওহী বলা হয়।
  • ওহীর প্রকারভেদ: ওহী দুই প্রকার—
    1. ওহীয়ে মাতলূ (وحي متلو): যে ওহীর শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর এবং তা সালাতে তিলাওয়াত করা হয় (যেমন: আল-কুরআন)।
    2. ওহীয়ে গাইরে মাতলূ (وحي غير متلو): যে ওহীর ভাব ও মর্ম আল্লাহর কিন্তু শব্দ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিজস্ব এবং তা তিলাওয়াত করা হয় না (যেমন: সুন্নাহ বা হাদিস)।

২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর ওহী নাযিলের পদ্ধতিসমূহ (كيفية نزول الوحي):
সহীহ বুখারীর কিতাবু বাদইল ওহী-তে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হারিস ইবনে হিশাম (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর ওহী কীভাবে আসে?” নবীজী ﷺ পদ্ধতিসমূহ বর্ণনা করেন:

  1. ঘণ্টার ধ্বনির মতো আসা (مثل صلصلة الجرس):
    রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “কখনো কখনো ওহী আমার কাছে ঘণ্টার টুংটাং শব্দের মতো আসে, আর এটিই আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টদায়ক হয়। অতঃপর ওহীর বাণী আমার অন্তরে সংরক্ষিত হয়ে গেলে সেই কষ্ট দূরীভূত হয়।” এই পদ্ধতিতে ওহী নাযিলের সময় তীব্র শীতের দিনেও নবীজীর কপাল মোবারক দিয়ে ঘাম ঝরে পড়ত এবং তিনি উটের পিঠে থাকলে উট ওহীর ভারে মাটিতে বসে পড়ত।
  2. ফেরেশতার মানব রূপ ধারণ (تمثل الملك رجلًا):
    জিবরাঈল (আ.) মানুষের আকৃতি ধারণ করে আসতেন এবং সাধারণ মানুষের মতো কথা বলতেন। অধিকাংশ সময় তিনি বিশিষ্ট ও রূপবান সাহাবী হযরত দাহিয়াতুল কালবী (রা.)-এর সুরতে আগমন করতেন। এটি ছিল নবীজীর জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ পদ্ধতি।
  3. জিবরাঈল (আ.)-এর আসল রূপ দর্শন:
    নবীজী ﷺ তাঁর নবুওয়াতী জীবনে জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর নিজস্ব ছয়শত ডানাযুক্ত দিগন্ত বিস্তৃত আসল রূপাবলীতে দুবার প্রত্যক্ষ করেছিলেন—একবার নবুওয়াতের সূচনায় হেরা গুহার নিকটে এবং দ্বিতীয়বার মিরাজের রাতে সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে।
  4. স্বপ্নযোগে সত্য দর্শন (الرؤيا الصالحة في المنام):
    নবুওয়াতের সূচনা হয়েছিল সত্য ও স্বচ্ছ স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি স্বপ্নে যা দেখতেন তা ভোরের সূর্যের মতো হুবহু বাস্তবায়িত হতো।
  5. অন্তরে ভাব সঞ্চার করা (النفث في الروع):
    জিবরাঈল (আ.) সরাসরি না এসে নবীজী ﷺ-এর পবিত্র অন্তরে অদৃশ্যভাবে কোনো কথা জাগ্রত করে দিতেন। নবীজী বলেন, “রূহুল কুদুস আমার অন্তরে এ কথা ফুঁকে দিয়েছেন যে, কোনো প্রাণী তার নির্ধারিত রিজিক পূর্ণ না করে মৃত্যুবরণ করবে না।”
  6. পর্দার আড়াল থেকে সরাসরি বাক্যালাপ:
    কোনো ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়া স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নবীর সাথে সরাসরি কথা বলেন। যেমন মিরাজের রাতে নবীজীর সাথে কথা হয়েছিল এবং তুর পাহাড়ে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে কথা হয়েছিল।

উপসংহার:
ওহী হলো নিখাদ সত্য ও যাবতীয় সংশয়মুক্ত ঐশী জ্ঞান, যার প্রতিটি হরফ সংরক্ষিত ও অবিকৃত।


(ب) إلام أشير بقوله تعالى: “علّمه شديد القوى”-

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী “عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى” (তাঁকে শিক্ষা দান করেছেন এক মহাশক্তিশালী সত্তা) দ্বারা কার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে? ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
সুরা আন-নাজমের ৫ নং আয়াতে ওহী বহনকারী এবং নবীজীর শিক্ষক হিসেবে এক মহাশক্তিশালী সত্তার প্রশংসা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওহীর নির্ভুলতা ও ঐশী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।

১. ‘শাদীদুল কুওয়া’ দ্বারা কার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে?
মুফাসসিরীনে কেরামের সর্বসম্মত অভিমত হলো—উক্ত আয়াতে ‘শাদীদুল কুওয়া’ (شَدِيدُ الْقُوَى – মহাশক্তিশালী সত্তা) দ্বারা ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে নির্দেশ করা হয়েছে।

২. জিবরাঈল (আ.)-এর শক্তি ও বৈশিষ্ট্যের বিবরণ:

  • অসীম শারীরিক শক্তি: তাফসীরে কুরতুবী ও ইবনে কাসীরে বর্ণিত হয়েছে, জিবরাঈল (আ.)-এর শক্তির মাত্রা এতই প্রচণ্ড যে, তিনি কওমে লুতের (সদুম জাতির) সাতটি বিশাল শহরকে নিজের একটি ডানার অগ্রভাগ দিয়ে মাটিসহ উপড়ে ঊর্ধ্বাকাশে তুলে নিয়ে উল্টে দিয়েছিলেন।
  • অবিশ্বাস্য দ্রুতগতি: তিনি চোখের পলকে সাত আসমান পেরিয়ে আরশ থেকে যমীনে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম।
  • ছয়শত ডানা: সহীহ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, জিবরাঈল (আ.)-এর ছয়শত নূরের ডানা রয়েছে, যার একটি মেললেই পূর্ব ও পশ্চিমের সমগ্র দিগন্ত ঢেকে যায়।
  • ‘যূ মিররাহ’ (ذو مرة)-এর তাৎপর্য: পরের আয়াতে তাঁকে ‘যূ মিররাহ’ অর্থাৎ অসাধারণ সৌন্দর্য, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য, বলবীর্য ও নিখুঁত গঠনের অধিকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

৩. এই বর্ণনার অন্তর্নিহিত হিকমত ও উদ্দেশ্য:
মক্কার কাফেররা কুৎসা রটাত যে, কোনো শয়তান বা জিন মুহাম্মদ ﷺ-কে এসব কাব্য বা জাদু শিখিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা তাদের এই অপবাদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে বললেন—না, কোনো দুর্বল জিন বা অপশক্তি নয়, বরং এই কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন আরশের পরম সম্মানিত, নির্ভরযোগ্য ও মহাশক্তিশালী ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.), যার কাছে শয়তান কখনো ঘেঁষতেই পারে না।

উপসংহার:
জিবরাঈল (আ.)-এর শক্তি ও আমানতদারির আলোচনা মূলত মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সুরক্ষা ও বিশুদ্ধতারই ঐশী গ্যারান্টি।


مجموعة (ب) / (খ) বিভাগ : তাফসীর সাহিত্য ও মুফাসসির পরিচিতি

الدرجات — ١٠ × ١ = ١٠
(أجب عن سؤال واحد من الأسئلة التالية)
[নিচের প্রশ্নগুলো থেকে যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও]


٩- اكتب نبذة من حياة صاحب الكشاف ثم بين مزايا تفسيره ‘الكشاف’-

[৯. তাফসীরে কাশশাফ প্রণেতা আল্লামা যামাখশারী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখ। অতঃপর তাঁর তাফসীর গ্রন্থ ‘আল-কাশশাফ’-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
আরবি ভাষা, অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত) এবং কুরআন তাফসীরের ইতিহাসে আল্লামা যামাখশারী (রহ.) এক অবিসংবাদিত প্রতিভা। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘আল-কাশশাফ’ কুরআনুল কারীমের সাহিত্যিক অলৌকিকতা (ই’জায) উন্মোচনে সমগ্র বিশ্বে অদ্যাবধি অদ্বিতীয় মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত।

১. আল্লামা যামাখশারী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:

  • নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে ওমর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-খাওয়ারিজমী আয-যামাখশারী (أبو القاسم محمود بن عمر الزمخشري)।
  • জন্ম: তিনি হিজরী ৪৬৭ সনের ২৭ রজব (১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) মধ্য এশিয়ার খাওয়ারিজমের ‘যামাখশার’ নামক এক জনপদে জন্মগ্রহণ করেন।
  • শিক্ষা-দীক্ষা ও পাণ্ডিত্য: তিনি বুখারা ও বাগদাদে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের কাছে ইলমে দ্বীন, আরবি ব্যাকরণ, বালাগাত ও সাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে মুফাসসির, ভাষাবিদ, মুহাদ্দিস ও কবি।
  • ‘জারুল্লাহ’ উপাধি লাভ: তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় মক্কা মুকাররমায় কা’বা শরীফের সান্নিধ্যে অবস্থান করে গবেষণা ও লেখালেখি করেন। কা’বার প্রতিবেশী হয়ে দীর্ঘকাল কাটানোর কারণে তিনি ইতিহাসে **’জারুল্লাহ’ (جار الله – আল্লাহর প্রতিবেশী)** উপাধিতে ভূষিত হন।
  • রচনাবলী: তিনি অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেন। যেমন: ‘আল-কাশশাফ’ (তাফসীর), ‘আল-মুফাসসাল’ (নাহু), ‘আসাসুল বালাগাহ’ (অভিধান), ‘রাবিউল আবরার’ ইত্যাদি।
  • ইন্তেকাল: হিজরী ৫৩৮ সনে (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) জুরজানিয়ায় এই মহান জ্ঞানতাপস ইন্তেকাল করেন।

২. তাফসীর গ্রন্থ ‘আল-কাশশাফ’-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
তাঁর তাফসীরের পূর্ণ নাম—**’আল-কাশশাফ আন হাকায়িকি গাওয়ামিদিত তানযীল ওয়া উইউনিল আকাবীল ফী উজূহিত তা’বীল’ (الكشاف عن حقائق غوامض التنزيل وعيون الأقاويل في وجوه التأويل)**। মক্কায় অবস্থানকালে মাত্র তিন বছরে তিনি এই অমর গ্রন্থটি সম্পন্ন করেন।

৩. তাফসীরে কাশশাফ-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ও সুবিধাসমূহ (مزايا تفسير الكشاف):

  1. বালাগাত ও অলঙ্কারশাস্ত্রের শ্রেষ্ঠতম প্রয়োগ:
    কুরআনের প্রতিটি আয়াতের বাক্যগঠন, শব্দের নির্বাচন, ইজায (সংক্ষেপণ), ইত্নাব (প্রসারণ), ইস্তিয়ারা ও মাজাযের এমন গভীর অলঙ্কারপূর্ণ বিশ্লেষণ কাশশাফের পূর্বে কেউ করতে পারেনি। ইমাম কুরতুবী, নাসাফী, বায়যাবী ও আলূসী সকলেই কাশশাফের এই বালাগাত থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন।
  2. কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকতা (ই’জায) প্রমাণ:
    আরবের বাঘা বাঘা কবি-সাহিত্যিকরা কেন কুরআনের একটি ছোট সুরার সমকক্ষ আনতে অক্ষম হয়েছিল, তা তিনি ব্যাকরণ ও বালাগাতের নিখুঁত চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
  3. প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক মননশীল পদ্ধতি (أسلوب السؤال والجواب):
    তিনি আয়াতে সম্ভাব্য নানা সংশয় ও সূক্ষ্ম প্রশ্ন তুলে ধরে নিজেই তার প্রজ্ঞাপূর্ণ জবাব দিয়েছেন। তিনি প্রায়শই লিখেছেন—«فَإِنْ قُلْتَ … قُلْتُ» (যদি তুমি প্রশ্ন কর তবে আমি বলব…)। এই পদ্ধতি পাঠকের চিন্তা ও বোধশক্তিকে শাণিত করে।
  4. ইসরাঈলী রেওয়ায়েত পরিহার:
    তৎকালীন যুগের অন্যান্য তাফসীরে যেখানে ভিত্তিহীন ইহুদি ও ঐতিহাসিক রূপকথা (ইসরাঈলিয়াত)-এর ছড়াছড়ি ছিল, যামাখশারী সেদিক থেকে নিজের তাফসীরকে শতভাগ মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রেখেছেন।
  5. আরবি সাহিত্যের প্রাচীন কবিতার উদ্ধৃতি (শাওয়াহিদ):
    কুরআনের বিরল শব্দাবলীর সঠিক অর্থ নির্ধারণে তিনি প্রাচীন প্রামাণ্য জাহেলি কবিতার অসংখ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।

সতর্কতা (Weakness/Note):
এতসব গুণ থাকা সত্ত্বেও আল্লামা যামাখশারী আকিদাগতভাবে ‘মু’তাযিলা’ মতবাদের অনুসারী ছিলেন। ফলে তিনি কিছু আয়াতে জোরপূর্বক মু’তাযিলা মতবাদ (যেমন: পরকালে আল্লাহর দিদার অস্বীকার, বান্দার কর্মের স্বাধীন স্রষ্টা হওয়া ইত্যাদি) প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। পরবর্তীতে আল্লামা ইবনুল মুনীর আল-ইস্কান্দারানী ‘আল-ইনসাফ’ নামক গ্রন্থের মাধ্যমে কাশশাফের সেই মু’তাযিলা অভিমতগুলোকে সুন্নী আকিদার আলোকে নিখুঁতভাবে খণ্ডন করেছেন।

উপসংহার:
আকিদাগত সতর্কতা বাদ দিলে, আরবি ভাষা ও কুরআনের সাহিত্যিক সৌন্দর্য অনুধাবনের জন্য তাফসীরে কাশশাফের সমকক্ষ গ্রন্থ তাফসীর সাহিত্যে বিরল।


١٠- اكتب ترجمة الإمام القرطبي مع خصائص تفسيره-

[১০. ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর জীবনচরিত লিখ এবং তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ‘আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন’-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
কুরআনুল কারীমের বিধানভিত্তিক (আহকামুল কুরআন) তাফসীর গ্রন্থসমূহের মধ্যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ হলো তাফসীরে কুরতুবী। এর রচয়িতা আল্লামা ইমাম কুরতুবী (রহ.) ছিলেন হিজরী সপ্তম শতকের এক অনন্য মুজতাহিদ ফকীহ ও মুহাদ্দিস।

১. ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর জীবনচরিত (ترجمة الإمام القرطبي):

  • নাম ও উপাধি: তাঁর পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আবু বকর ফারাহ আল-আনসারী আল-খাযরাজী আল-আন্দালুসী আল-কুরতুবী (أبو عبد الله محمد بن أحمد القرطبي)।
  • জন্ম ও স্বদেশ: তিনি তৎকালীন মুসলিম স্পেনের (আন্দালুস) বিখ্যাত কর্ডোভা (কুরতুবা) নগরীতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
  • শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন: তিনি স্পেনের শ্রেষ্ঠ আলেমদের নিকট কিরাত, তাফসীর, উলূমুল হাদিস ও মালিকী ফিকহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। আন্দালুসে খ্রিস্টান আগ্রাসনের পর তিনি প্রাচ্যে হিজরত করেন এবং মিসরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
  • চারিত্রিক গুণাবলি: তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরহেযগার, নির্লোভ, বিনম্র এবং দুনিয়াবিমুখ (যাহিদ) এক মহান ব্যক্তিত্ব। পার্থিব জৌলুস পরিহার করে তিনি এক সাধারণ কাপড়ে জীবন অতিবাহিত করতেন।
  • অন্যান্য রচনাবলী: তাফসীর ছাড়াও তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে: ‘আত-তাযকিরাহ ফী আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমূরিল আখিরাহ’ (পরকাল বিষয়ক বিশ্বখ্যাত কিতাব), ‘আল-আসনা ফী শারহি আসমায়িল্লাহিল হুসনা’, ‘কিতাবুত তামকার’ ইত্যাদি।
  • ওফাত: হিজরী ৬৭১ সনের ৯ শাওয়াল (১২৭৩ খ্রিষ্টাব্দ) মিসরের মুনইয়াতু বনী খাসীবে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন।

২. তাফসীরে কুরতুবীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
তাঁর তাফসীর গ্রন্থের পূর্ণ নাম—**’আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন ওয়াল মুবাইয়িনু লিমা তাদাম্মানাহু মিনাস সুন্নাতি ওয়া আয়িল ফুরকান’ (الجامع لأحكام القرآن والمبين لما تضمنه من السنة وآي الفرقان)**। এটি মূলত একটি বিশালাকার পূর্ণাঙ্গ তাফসীর, যা ২০টিরও বেশি খণ্ডে সমাপ্ত।

৩. তাফসীরে কুরতুবীর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص تفسير القرطبي):

  1. ফিকহ ও আহকামকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ (আহকামুল কুরআন):
    আয়াত থেকে শরিয়তের মাসআলা-মাসায়েল ও বিধিবিধান অনুসন্ধানে এটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। কোনো বিধানসম্পর্কিত আয়াত এলে তিনি সেখানে বহু সূক্ষ্ম মাসআলা পয়েন্ট আকারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
  2. মাযহাবসমূহের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ও ইনসাফ:
    ইমাম কুরতুবী স্বয়ং মালিকী মাযহাবের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও কোনো গোঁড়ামি করেননি। তিনি হানাফী, শাফিয়ী, হাম্বলী ও অন্যান্য মাযহাবের দলিলসমূহ ইনসাফের সাথে উপস্থাপন করতেন এবং যার দলিল শক্তিশালী মনে করতেন তাকেই সমর্থন করতেন।
  3. হাদিস ও আসার দ্বারা তাফসীর (তাফসীর বিল মা’ছূর):
    তিনি আয়াতের তাফসীরে প্রচুর বিশুদ্ধ হাদিস উল্লেখ করেছেন এবং হাদিসগুলোর সনদ ও মানের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দুর্বল ও জাল হাদিসকে চিহ্নিত করেছেন।
  4. ভাষা, ব্যাকরণ (ই’রাব) ও বালাগাত আলোচনা:
    তিনি আয়াতের শব্দার্থ, ব্যাকরণগত কাঠামো (ই’রাব) এবং অলঙ্কারশাস্ত্রের এমন নিখুঁত প্রয়োগ দেখিয়েছেন যা সাহিত্যের ছাত্রদের জন্যও অপরিহার্য পাঠ্য।
  5. ইসরাঈলী রেওয়ায়েত ও ভিত্তিহীন কাহিনীর খণ্ডন:
    অন্যান্য তাফসীরে বর্ণিত নবীদের সম্পর্কে আপত্তিকর গল্প-কাহিনী ও ইসরাঈলী বর্ণনাগুলোকে তিনি যুক্তি ও সহীহ হাদিস দ্বারা কঠোরভাবে খণ্ডন করেছেন।
  6. প্রসিদ্ধ কিরাতসমূহের আলোচনা:
    কুরআনের বিভিন্ন স্বীকৃত কিরাতের বৈচিত্র্য এবং তার কারণে অর্থের যে সমৃদ্ধি ঘটে, তা তিনি সবিস্তারে তুলে ধরেছেন।

উপসংহার:
তাফসীরে কুরতুবী কেবল একটি সাধারণ তাফসীর নয়; বরং তা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইসলামি বিশ্বকোষ। উম্মতের প্রতিটি আলিম ও তালেবে ইলমের জন্য এটি এক অমূল্য জ্ঞানের আধার।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের ‘দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম’ (বিষয় কোড: 202401) পরীক্ষার মানবণ্টন কেমন?

উত্তর: মোট পূর্ণমান ৮০। পরীক্ষাটি দুটি বিভাগে বিভক্ত। (ক) বিভাগ বা مجموعة (الف)-এ মোট ৮টি প্রশ্ন থাকে যার প্রতিটিতে নির্বাচিত আয়াতের অনুবাদ (৬ নম্বর) এবং দুটি তত্ত্বীয় উপ-প্রশ্ন (৪+৪=৮ নম্বর) মোট ১৪ নম্বর থাকে; এখান থেকে ৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় (৫ × ১৪ = ৭০ নম্বর)। (খ) বিভাগ বা مجموعة (ب)-এ তাফসীর শাস্ত্র ও মুফাসসিরীনদের ওপর ২টি প্রশ্ন থাকে, যেখান থেকে যেকোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় (১ × ১০ = ১০ নম্বর)। সর্বমোট ৮০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

২. সুরা আল-বাকারা ও সুরা আল-হুজুরাতের আয়াতগুলোর তাফসীরের জন্য কোন কোন কিতাবের সাহায্য নেওয়া সর্বোত্তম?

উত্তর: ফাজিল অনার্স সিলেবাসের আলোকে সুরা আল-বাকারা ও সুরা আল-হুজুরাতের গভীর তাফসীর অধ্যয়নের জন্য ইমাম ইবনে কাসীরের ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’, ইমাম কুরতুবীর ‘আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন’, আল্লামা যামাখশারীর ‘আল-কাশশাফ’ এবং আধুনিক যুগের শায়খ আলী আস-সাবুনীর ‘রওয়ায়েউল বায়ান ফী তাফসীরি আয়াতিল আহকাম’ ও ‘সাফওয়াতুত তাফাসীর’ সবচেয়ে প্রামাণ্য ও সহায়ক কিতাব।

৩. তাফসীরে কাশশাফ ও তাফসীরে কুরতুবীর মধ্যে মূল মৌলিক পার্থক্য কী?

উত্তর: তাফসীরে কাশশাফ মূলত কুরআনের অলঙ্কারশাস্ত্র, আরবি বালাগাত, ব্যাকরণিক সৌন্দর্য এবং শব্দচয়নের গভীর সাহিত্যিক মু’জিযা প্রমাণের ওপর সর্বাধিক জোর দেয়। পক্ষান্তরে তাফসীরে কুরতুবী হলো একটি বিধানভিত্তিক (আহকামুল কুরআন) তাফসীর, যেখানে ফিকহী মাসআলা, চার মাযহাবের দলিলের তুলনামূলক পর্যালোচনা, সহীহ হাদিসের প্রয়োগ এবং ইসরাঈলিয়াত খণ্ডনকে মূল উপজীব্য করা হয়েছে।

৪. কুরআন তাফসীর অংশে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার বিশেষ কৌশল কী?

উত্তর: সর্বোচ্চ নম্বর পেতে হলে প্রতিটি উত্তরের শুরুতে নির্ভুল হরকতসহ আরবি আয়াত বা হাদিসের উদ্ধৃতি প্রদান করা আবশ্যক। আয়াতের অনুবাদে শব্দের গভীর অর্থ ফুটিয়ে তুলতে হবে। উত্তরের কাঠামোতে সুস্পষ্টভাবে ভূমিকা, আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা, মুফাসসিরীনদের মতামত, শানে নুযূল এবং আধুনিক প্রাসঙ্গিক শিক্ষণীয় দিকগুলো পয়েন্ট আকারে উপস্থাপন করলে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যায়।

৫. ফাজিল অনার্স পরীক্ষায় আয়াতের শানে নুযূল লেখার সময় কী কী বিষয় খেয়াল রাখা উচিত?

উত্তর: শানে নুযূল লেখার সময় ভিত্তিহীন কোনো দুর্বল রেওয়ায়েত পরিহার করে সহীহ বুখারী, মুসলিম বা তিরমিযী প্রভৃতি বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থের প্রামাণ্য বর্ণনা উল্লেখ করতে হবে। কোন সাহাবীর কারণে বা কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তা স্পষ্ট করে এর থেকে প্রাপ্ত শরিয়তের মূল শিক্ষাটি তুলে ধরতে হবে।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন