জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম (Dirasatu Tafsiril Quranil Karim) – ২০২৮০১, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২২

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
১৫১ মিনিট পড়ার সময়
১৩ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২০
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف)، لعام ٢٠٢٢
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২২]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة تفسير القرآن الكريم
[দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম]
বিষয় কোড: ২০২৮০১
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (الف) وعن واحد من مجموعة (ب) والأعداد بالهامش تدل على الدرجات الكاملة-
[নোট: ‘ক’ বিভাগ থেকে যে কোনো ৫টি এবং ‘খ’ বিভাগ থেকে যে কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণমান ডানপাশে উল্লেখ করা হয়েছে।]


مجموعة (الف) / (ক) বিভাগ : নির্বাচিত আয়াতের অনুবাদ ও সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন

الدرجات — ١٤ × ٥ = ٧٠
(ترجم الآيات الكريمة مع الإجابة عن الأسئلة الملحقة بها)
[আয়াতগুলোর অনুবাদ কর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও]


١- اهدنا الصراط المستقيم- صراط الذين انعمت عليهم- غير المغضوب عليهم ولا الضالين-

[১. আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করুন—তাদের পথ, যাদেরকে আপনি অনুগ্রহ দান করেছেন; যাদের উপর আপনার ক্রোধ আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়। (সুরা আল-ফাতিহা: ৬-৭)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
اهْدِنَا আমাদের পথ প্রদর্শন করুন / পরিচালিত করুন فعل أمر للدعاء، صيغة جمع المتكلم مع المخاطب، মূলধাতু ه-د-ي (হিদায়েত), বাবে إفعال বা ضرب। ‘না’ (نا) হলো مفعول به أول।
الصِّرَاطَ পথ, রাজপথ, সুগম রাস্তা مفعول به ثان، مفرد، বহুবচন صُرُط، মূলধাতু ص-ر-ط। এটি মূল আরবি ভাষায় سين (سراط) দিয়েও পঠিত হয়।
الْمُسْتَقِيمَ সরল, সুদৃঢ়, যাতে কোনো বক্রতা নেই نعت / صفة للصراط، اسم فاعل، বাবে استفعال (استقامة)، মূলধাতু ق-و-م।
أَنْعَمْتَ আপনি অনুগ্রহ করেছেন, নিয়ামত দিয়েছেন فعل ماض، واحد مذكر حاضر، বাবে إفعال، মূলধাতু ن-ع-م (নিয়ামত)।
الْمَغْضُوبِ যাদের উপর ক্রোধ পতিত হয়েছে اسم مفعول، বাবে ضرب (غضب)، মূলধাতু غ-ض-ب। এখানে ‘আলাইহিম’ (عليهم) হলো نائب الفاعل।
الضَّالِّينَ পথভ্রষ্টগণ, যারা সত্যবিচ্যুত হয়েছে اسم فاعل، جمع مذكر سالم، বাবে ضرب، মূলধাতু ض-ل-ل (পথভ্রষ্টতা)।

(الف) ما معنى الهداية؟ بين اقسامها-

[(ক) হিদায়াত (الهداية)-এর অর্থ কী? এর প্রকারভেদসমূহ বর্ণনা কর।]

উত্তর:

১. হিদায়াত (الهداية)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘আল-হিদায়াহ’ (الهداية) শব্দটি مصدر (ক্রিয়ামূল)। এর আভিধানিক অর্থ হলো: الدَّلَالَةُ بِلُطْفٍ (অত্যন্ত নম্রতা ও স্নেহের সাথে পথপ্রদর্শন করা), الإرشاد (সঠিক পথ নির্দেশ করা), البيان (স্পষ্ট করা) এবং التوجيه نحو المطلوب (কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা)। আল্লামা রাগিব আল-ইসফাহানী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন’ গ্রন্থে লিখেছেন: «الهداية: دلالة بلطف، ومنه الهدية لما فيه من اللطف» অর্থাৎ হিদায়াত হলো অত্যন্ত মমত্ববোধ ও কোমলতার সাথে পথপ্রদর্শন করা; এই কোমলতার কারণেই উপহারকে ‘হাদিয়া’ বলা হয়।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় হিদায়াত হলো: «إِرْشَادُ اللهِ تَعَالَى عِبَادَهُ إِلَى طَرِيقِ الْحَقِّ وَالْفَلَاحِ الْمُوصِلِ إِلَى رِضْوَانِهِ وَجَنَّتِهِ» অর্থাৎ মহান আল্লাহ কর্তৃক স্বীয় বান্দাদেরকে এমন সত্য ও কল্যাণের পথের দিশা দেওয়া, যা তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের মঞ্জিলে পৌঁছে দেয়।

২. হিদায়াতের স্তর ও প্রকারভেদ (أقسام الهداية):
মুফাসসিরিনে কিরাম ও ইসলামী গবেষকগণ (বিশেষ করে আল্লামা রাগিব আল-ইসফাহানী, ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী এবং আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ.) কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে হিদায়াতকে প্রধানত ৪টি মৌলিক স্তরে বিভক্ত করেছেন:

হিদায়াতের প্রকার সংজ্ঞা ও তাৎপর্য কুরআনুল কারীমের দলিল
১. الهداية العامة
(সার্বজনীন প্রাকৃতিক হিদায়াত)
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি অনু-পরমাণু, জড় ও জীবকে তার নিজ নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী জীবনধারণ, আত্মরক্ষা ও বংশবৃদ্ধির সহজাত জ্ঞান দান করা। এটি মুমিন-কাফির, মানুষ-পশু নির্বিশেষে সকল সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য। ﴿قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَىٰ﴾
(সুরা ত্বা-হা: ৫০)
২. هداية الدلالة والبيان
(দিকনির্দেশনা ও পথপ্রদর্শনের হিদায়াত)
নবী-রাসূল প্রেরণ ও আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করে মানবজাতিকে সত্য ও মিথ্যার পথ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেওয়া। এই হিদায়াত পৌঁছানো নবী ও দাঈদের কাজ। ﴿وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ﴾
(সুরা আশ-শূরা: ৫২)
﴿وَهَدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ﴾ (সুরা আল-বালাদ: ১০)
৩. هداية التوفيق والإلهام
(তাওফীক ও অন্তরে সত্য গ্রহণের হিদায়াত)
বান্দার অন্তরে ঈমানের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা, সত্য গ্রহণ করার মানসিক সামর্থ্য ও অবিচলতা (ثبات) দান করা। এটি একমাত্র মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ; কোনো নবী বা মানুষের এতে ক্ষমতা নেই। ﴿إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ﴾
(সুরা আল-কাসাস: ৫৬)
৪. هداية الآخرة إلى الجنة
(পরকালে জান্নাতের পথপ্রদর্শন)
কিয়ামতের দিন পুলসিরাত পার করিয়ে মুমিন বান্দাদেরকে নিরাপদে জান্নাতের চিরস্থায়ী ঠিকানায় পরিচালিত করা। ﴿وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَٰذَا﴾
(সুরা আল-আ’রাফ: ৪৩)

মু’মিনের ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম’ দোয়ার রহস্য:
প্রশ্ন জাগতে পারে, একজন মুমিন তো ইতিমধ্যেই হিদায়াতপ্রাপ্ত, তবে সে কেন প্রতি রাকাতে ‘ইহদিনা’ (আমাদের পথ প্রদর্শন করুন) বলে প্রার্থনা করে? আল্লামা বায়যাবী (রহ.) স্বীয় তাফসীরে উল্লেখ করেছেন, এখানে হিদায়াত চাওয়ার অর্থ হলো: «الثبات والاستمرار على الهداية، والزيادة في نور البصيرة» অর্থাৎ “প্রাপ্ত হিদায়াতের ওপর অটল-অবিচল থাকা, হিদায়াতের স্থায়িত্ব বজায় রাখা এবং প্রজ্ঞার নূরের উত্তরোত্তর প্রবৃদ্ধি অর্জন করা।”


(ب) ما المراد بالصراط المستقيم؟ بين-

[(খ) ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ (الصراط المستقيم) দ্বারা কী উদ্দেশ্য? ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

১. ‘সিরাতে মুস্তাকীম’-এর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:

  • الصراط (আস-সিরাত): আরবি ভাষায় সিরাত শব্দের অর্থ হলো الواسع والواضح من الطرق অর্থাৎ প্রশস্ত, উন্মুক্ত ও সুস্পষ্ট রাজপথ।
  • المستقيم (আল-মুস্তাকীম): এর অর্থ হলো القويم الذي لا عوج فيه অর্থাৎ সোজা-সরল পথ, যাতে কোনো প্রকার বক্রতা, বিভ্রান্তি বা জটিলতা নেই।

২. মুফাসসিরিনে কিরাম ও সালাফে সালেহীনের দৃষ্টিতে সিরাতে মুস্তাকীমের অর্থ:
সিরাতে মুস্তাকীমের ব্যাখ্যায় সাহাবা, তাবেয়ীন ও ইমামগণের বহু মূল্যবান বাণী রয়েছে। আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, এ ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই; বরং প্রতিটি মত একে অপরের পরিপূরক:

  • ইসলাম ধর্ম (دين الإسلام): সাইয়্যিদুনা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, সিরাতে মুস্তাকীম হলো দ্বীন ইসলাম। ইমাম আহমদ ও তিরমিযীতে বর্ণিত নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.)-এর হাদিসে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «وَالصِّرَاطُ: الْإِسْلَامُ، وَالسُّورَانِ: حُدُودُ اللَّهِ، وَالْأَبْوَابُ الْمُفَتَّحَةُ: مَحَارِمُ اللَّهِ» “আর সিরাত হলো ইসলাম, প্রাচীর দুটি হলো আল্লাহর সীমারেখা, এবং উন্মুক্ত দরজাসমূহ হলো আল্লাহর হারামকৃত বিষয়সমূহ।”
  • আল্লাহর কিতাব বা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন (كتاب الله القرآن): আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) ও ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «هُوَ حَبْلُ اللَّهِ الْمَتِينُ، وَهُوَ الذِّكْرُ الْحَكِيمُ، وَهُوَ الصِّرَاطُ الْمُسْتَقِيمُ» “কুরআন হলো আল্লাহর সুদৃঢ় রজ্জু, প্রজ্ঞাময় উপদেশ এবং এটিই হলো সিরাতে মুস্তাকীম।” (জামে তিরমিযী)।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত: প্রখ্যাত তাবেয়ী আবুল আলিয়াহ ও হাসান বসরী (রহ.) বলেন, সিরাতে মুস্তাকীম হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর পর তাঁর দুই খলীফা আবু বকর ও উমর (রা.)-এর অনুসৃত আদর্শ ও সুন্নাহর পথ।
  • হক ও সত্যের পথ (طريق الحق): এটি এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যমপন্থা যা চরমপন্থা (إفراط) এবং অবহেলা বা শৈথিল্যবাদ (تفريط)-এর মধ্যবর্তী মধ্যম পথ (উম্মাতে ওয়াসাত)।

৩. আয়াতের পরবর্তী অংশে সিরাতে মুস্তাকীমের বাস্তব প্রতিফলন:
আল্লাহ তাআলা কেবল তাত্ত্বিকভাবে সিরাতে মুস্তাকীমের সংজ্ঞা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং একে মানবীয় আদর্শের সাথে যুক্ত করে ইরশাদ করেছেন: ﴿صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ﴾ (তাদের পথ, যাদের আপনি পুরস্কৃত করেছেন)। সুরা আন-নিসার ৬৯ নম্বর আয়াতে এই চার শ্রেণির মহিমান্বিত ব্যক্তিদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে:

  1. نَبِيِّينَ (নবীগণ): আসমানী ওহীর প্রত্যক্ষ বাহক ও নিষ্পাপ পথপ্রদর্শক।
  2. صِدِّيقِينَ (সিদ্দীকগণ): যাঁরা কোনো সংশয় ছাড়া সত্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যায়নকারী (যেমন হযরত আবু বকর রা.)।
  3. شُهَدَاء (শহীদগণ): যাঁরা আল্লাহর দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারী অথবা সত্যের জীবন্ত সাক্ষ্যদানকারী।
  4. صَالِحِينَ (সৎকর্মশীলগণ): যাঁদের প্রকাশ্য ও গোপন চরিত্র আল্লাহর বিধান মোতাবেক সংশোধিত।

পাশাপাশি এই পথ দুটি চরম ভ্রষ্টতা থেকে মুক্ত: ﴿غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ﴾ (যাদের উপর গজব নাযিল হয়েছে—অর্থাৎ সত্য জেনেও তার উপর আমল করেনি, যেমন ইহুদি সম্প্রদায়) এবং ﴿وَلَا الضَّالِّينَ﴾ (যারা সঠিক জ্ঞান ছাড়াই অন্ধভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে, যেমন নাসারা বা খ্রিস্টান সম্প্রদায়)। অতএব, বিশুদ্ধ জ্ঞান ও সৎআমলের সমন্বিত জীবনব্যবস্থাই হলো সিরাতে মুস্তাকীম।


٢- وإذا قيل لهم لا تفسدوا فى الأرض قالوا إنما نحن مصلحون- ألا إنهم هم المفسدون ولكن لايشعرون-

[২. আর যখন তাদেরকে বলা হয়, “তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না”, তখন তারা বলে, “আমরাই তো কেবল শান্তি স্থাপনকারী ও সংশোধনকারী!” জেনে রেখো, নিশ্চয়ই তারাই মূলত বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না। (সুরা আল-বাকারাহ: ১১-১২)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
قِيلَ বলা হয় / বলা হলো فعل ماض مجهول، বাবে نصر (قول)، মূলধাতু ق-و-ل। এর نائب الفاعل হলো পরবর্তী বাক্য।
لَا تُفْسِدُوا তোমরা ফাসাদ করো না, বিপর্যয় সৃষ্টি করো না فعل نهي، جمع مذكر حاضر، বাবে إفعال، মূলধাতু ف-س-د (ফাসাদ/বিপর্যয়)।
مُصْلِحُونَ শান্তি স্থাপনকারী, সংশোধনকারী দল اسم فاعل، جمع مذكر سالم، বাবে إفعال، মূলধাতু ص-ل-ح (সংশোধন/শান্তি)।
أَلَا সাবধান! জেনে রেখো! সতর্ক হও! أداة استفتاح وتنبيه (সতর্কীকরণ ও সূচনামূলক অব্যয়)।
الْمُفْسِدُونَ প্রকৃত বিপর্যয় সৃষ্টিকারী দল اسم فاعل، معرف بأل للعهد أو الاستغراق، বাবে إفعال।
لَا يَشْعُرُونَ তারা উপলব্ধি করে না / অনুভূতিহীন فعل مضارع منفي، جمع مذكر غائب، বাবে نصر، মূলধাতু ش-ع-ر (সূক্ষ্ম অনুভূতি/উপলব্ধি)।

(الف) ما معنى الفساد؟ وما هي صورة الفساد؟

[(ক) ফাসাদ (الفساد)-এর অর্থ কী? ফাসাদের রূপ বা সুরতগুলো কী কী?]

উত্তর:

১. ফাসাদ (الفساد)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘আল-ফাসাদ’ (الفساد) শব্দটি الصلاح (শান্তি, কল্যাণ ও সংশোধন)-এর বিপরীতার্থক শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো: البطلان (নষ্ট হওয়া), التلف (ধ্বংস হওয়া), الخروج عن الاعتدال (ভারসাম্য বা মধ্যমপন্থা থেকে বিচ্যুত হওয়া) এবং الاضطراب والخلل (বিশৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করা)।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়: «الْفَسَادُ هُوَ الْخُرُوجُ عَنْ طَاعَةِ اللهِ تَعَالَى وَتَعْطِيلُ أَحْكَامِ شَرِيعَتِهِ، وَإِثَارَةُ الْفِتَنِ فِي الْأَرْضِ بِالْكُفْرِ وَالنِّفَاقِ وَالْمَعَاصِي» অর্থাৎ আল্লাহর আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাওয়া, তাঁর শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করা এবং কুফর, মুনাফেকী ও পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পৃথিবীতে ফিতনা-বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেওয়াকে ফাসাদ বলা হয়।

২. ফাসাদের বিভিন্ন রূপ ও সুরত (صور الفساد):
মুফাসসিরিনে কিরাম (ইমাম তাবারী, ইবনে কাসীর ও আল্লামা বায়যাবী রহ.) মুনাফিকদের চরিত্র ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের আলোকে জমিনে ফাসাদের নিম্নোক্ত রূপসমূহ চিহ্নিত করেছেন:

  1. কুফর ও নিফাক (الشرك والنفاق): আল্লাহদ্রোহিতা ও কপটতা হলো জমিনে ফাসাদের মূল শিকড়। যখন মানুষ আল্লাহর উলূহিয়াত ও রুবূবিয়াতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তখন জমিনের রূহানী ও নৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
  2. শত্রুদের সাথে গোপন মিত্রতা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত (موالاة الكفار وإفشاء أسرار المسلمين): মুনাফিকরা বাহ্যিকভাবে মুসলিম পরিচয় দিয়ে তলে তলে ইসলামের শত্রু কাফির-মুশরিকদের সাথে গোপন মৈত্রী গড়ে তুলত এবং মুসলিম সমাজের সংবেদনশীল তথ্য পাচার করত, যা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য চরম ধ্বংসাত্মক ছিল।
  3. পাপ ও নাফরমানী বিস্তার (ارتكاب المعاصي والمجاهرة بها): আল্লামা আবুল আলিয়া ও হাসান বসরী (রহ.) বলেন, জমিনে যে কোনো পাপাচারই এক প্রকার ফাসাদ। কারণ পাপাচারের কারণে আকাশ থেকে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, খরা দেখা দেয় এবং জমিনের বরকত তুলে নেওয়া হয়।
  4. সত্যকে বিকৃত করা ও সংস্কারের নামে নৈরাজ্য (قلب الحقائق وتسمية الباطل إصلاحاً): ধ্বংসাত্মক মতবাদ, ধর্মহীনতা ও বিশৃঙ্খলাকে “উন্নতি, আধুনিকায়ন ও সংস্কার” নামে প্রচার করা। মুনাফিকরা সমাজ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডকে ‘ইসলাহ’ (إصلاح) বলে দাবি করত।
  5. সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ এবং জুলুম (الظلم والعدوان وأكل أموال الناس بالباطل): সমাজে সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, অবিচার এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার হরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অশান্তির দাবানল জ্বালানো।

(ب) شرح قوله تعالى “ألا انهم هم المفسدون ولكن لا يشعرون”-

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী “সাবধান! নিশ্চয়ই তারাই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না”-এর ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

১. আয়াতাংশের অলঙ্কারশাস্ত্রীয় ও ব্যাকরণিক তাৎপর্য (البلاغة القرآنية):
পবিত্র কুরআনের এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি মুনাফিকদের মিথ্যা দাবির এমন এক চূড়ান্ত ও দ্ব্যর্থহীন খণ্ডন, যা অলঙ্কারশাস্ত্রের (বালাগাত) দৃষ্টিকোণ থেকে চরম বিস্ময়কর। এখানে মুনাফিকদের ফাসাদকে সুনিশ্চিত করতে একাধিক তাকীদ (تأكيد) ও সীমাবদ্ধকরণ (قصر وحصر) ব্যবহৃত হয়েছে:

  • أَلَا (আলা): এটি أداة استفتاح وتنبيه (সতর্কতামূলক সূচনা)। এর মাধ্যমে উদাসীন শ্রোতাকে সতর্ক করে চরম কোনো সত্যের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়।
  • إِنَّ (ইন্না): এটি حرف توكيد (দৃঢ়তাজ্ঞাপক অব্যয়), যা বাক্যের বক্তব্যকে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
  • هُمْ (হুম – যমীরে ফাসল): এখানে ضمير الفصل ব্যবহৃত হয়েছে যা حصر وقصر (নির্দিষ্টকরণ) বুঝায়। অর্থাৎ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী যদি কেউ থেকে থাকে, তবে তারা এই মুনাফিকরাই, অন্য কেউ নয়।
  • الْمُفْسِدُونَ (আল-মুফসিদূন): শব্দটিতে ال (আলিফ-লাম) ব্যবহৃত হয়েছে যা جنس বা عهد নির্দেশ করে। অর্থাৎ ফাসাদের পূর্ণাঙ্গ সত্তা তাদের মধ্যেই রূপায়িত হয়েছে।

২. “ولكن لا يشعرون” (কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না)-এর মর্মার্থ:
আরবি ‘শু’উর’ (الشعور) শব্দের অর্থ হলো إدراك الشيء بحاسة خفية অর্থাৎ পঞ্চেন্দ্রিয়ের অতি সূক্ষ্ম অনুভূতি দিয়ে কোনো বিষয়কে উপলব্ধি করা। আল্লাহ তাআলা এখানে মুনাফিকদের জন্য ‘লা ইয়ালামুন’ (তারা জানে না)-এর চেয়েও গভীরতর শব্দ ‘লা ইয়াশউবুন’ ব্যবহার করেছেন। এর কারণ হলো:

  • আত্মপ্রবঞ্চনা ও বিবেকহীনতা: মুনাফিকরা তাদের নিফাক ও কপটতার কারণে এমন এক স্তরে নেমে গেছে যে, তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য করার মানসিক অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা ধ্বংস হয়ে গেছে।
  • অন্তরের বক্রতা ও মোহর: তারা মনে করত মুসলিম ও কাফির উভয় দলের সাথে সুবিধাবাদী সম্পর্ক রেখে তারা বড় ধরনের বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক শান্তির কাজ করছে। অথচ মূলত তারা সত্য ও মিথ্যার মাঝখানে প্রতারণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে ফিতনা সৃষ্টি করছিল। এই ধোঁকাবাজিকে তারা কল্যাণকর কাজ বলে ধারণা করায় তাদের সংশোধন হওয়ার পথও রুদ্ধ হয়ে যায়।
  • বাস্তব শিক্ষা: একজন প্রকাশ্য অপরাধীর চেয়ে একজন সুবিধাবাদী কপট সংস্কারক সমাজের জন্য বহুগুণে বিপজ্জনক। কারণ প্রকাশ্য শত্রুকে চেনা যায়, কিন্তু কল্যাণকামী বন্ধুর মুখোশ পরা মুনাফিক সমাজকে ভেতর থেকে ঘুণপোকার মতো ধ্বংস করে দেয়।

٣- الله يستهزئ بهم ويمدهم فى طغيانهم يعمهون- أولئك الذين اشتروا الضلالة بالهدى فما ربحت تجارتهم وما كانوا مهتدين-

[৩. আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করেন এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় বিভ্রান্ত ও উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে মরার অবকাশ দেন। এরাই তারা, যারা হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা ক্রয় করেছে; সুতরাং তাদের এ ব্যবসা লাভজনক হয়নি এবং তারা সঠিক পথপ্রাপ্তও ছিল না। (সুরা আল-বাকারাহ: ১৫-১৬)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
يَسْتَهْزِئُ উপহাস করেন, উপহাসের শাস্তি দেন فعل مضارع، واحد مذكر غائب، বাবে استفعال، মূলধাতু ه-ز-أ (উপহাস/বিদ্রূপ)।
يَمُدُّهُمْ তাদের অবকাশ দেন, ঢিল দেন, বাড়িয়ে দেন فعل مضارع، واحد مذكر غائب، বাবে نصر، মূলধাতু م-د-د (প্রসারিত করা/অবকাশ দেওয়া)। ‘হুম’ (هم) হলো مفعول به।
طُغْيَانِهِمْ তাদের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্য ও সীমালঙ্ঘন مصدر مضاف، মূলধাতু ط-غ-ي (সীমালঙ্ঘন করা)।
يَعْمَهُونَ তারা উদভ্রান্তের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে فعل مضارع، جمع مذكر غائب، বাবে فتح (عمه)، মূলধাতু ع-م-ه।العمه হলো অন্তরের অন্ধত্ব ও দিশেহারা হওয়া।
اشْتَرَوُا তারা ক্রয় করেছে, বদল করেছে فعل ماض، جمع مذكر غائب، বাবে افتعال، মূলধাতু ش-ر-ي (ক্রয়/বিক্রয়)।
تِجَارَتُهُمْ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন اسم مفرد مضاف، মূলধাতু ت-ج-ر। এখানে রূপক অর্থে গৃহীত।

(الف) ما معنى الاستهزاء؟ أوضح قوله تعالى “الله يستهزئ بهم”-

[(ক) ইস্তিহযা (الاستهزاء)-এর অর্থ কী? মহান আল্লাহর বাণী “আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করেন”-এর মর্মার্থ ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

১. ইস্তিহযা (الاستهزاء)-এর আভিধানিক অর্থ:
আরবি ‘আল-ইস্তিহযা’ (الاستهزاء) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো: السخرية والاستخفاف والتنقيص অর্থাৎ কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, বিদ্রূপ করা, উপহাস করা এবং কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করে কৌতুক করা। মুনাফিকরা যখন মুমিনদের সাথে দেখা করত তখন বলত “আমরা ঈমান এনেছি”, আবার যখন তাদের শয়তান সর্দারদের সাথে নির্জনে মিলিত হতো তখন বলত “আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি, আমরা তো তাদের সাথে কেবল উপহাস (إنما نحن مستهزئون) করছিলাম।”

২. “الله يستهزئ بهم” (আল্লাহ তাদের সাথে উপহাস করেন)-এর আক্বীদা ও তাফসীরভিত্তিক ব্যাখ্যা:
মহান আল্লাহ সমস্ত ত্রুটি, অবমাননা ও অনর্থক কৌতুক থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র (منزه عن العبث والنقائص)। তাহলে আল্লাহর প্রতি ‘ইস্তিহযা’ বা উপহাসের সম্বন্ধ করার অর্থ কী? আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমাম ও মুফাসসিরগণ এর নিম্নোক্ত সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন:

  • ১. মুশাকাহালা ও মুকাবাহলা (المشاكلة والمقابلة اللفظية): আরবি অলঙ্কারশাস্ত্রে অপরাধের শাস্তি হিসেবে অপরাধের একই শব্দ প্রয়োগ করে জবাব দেওয়াকে ‘মুশাকাহালা’ বলা হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা অন্যত্র ইরশাদ করেছেন: ﴿وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِّثْلُهَا﴾ (মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ—সুরা আশ-শূরা: ৪০)। সুতরাং মুনাফিকরা মুমিনদের সাথে যে উপহাস করত, আল্লাহ তাদের সেই অপকর্মের উপযুক্ত শাস্তি ও লাঞ্ছনা দিচ্ছেন, যাকে শাস্তিস্বরূপ ‘আল্লাহর ইস্তিহযা’ বলা হয়েছে।
  • ২. কিয়ামতের ময়দানে মুনাফিকদের শাস্তি প্রদর্শন: তাফসীরে তাবারী ও ইবনে কাসীরে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, কিয়ামতের ঘোর অন্ধকারে মুনাফিকদের সাময়িক নূর দেওয়া হবে, কিন্তু তারা যখন মুমিনদের সাথে পুলসিরাতের দিকে এগোতে যাবে তখন তাদের সেই নূর নিভিয়ে দেওয়া হবে এবং তাদের ও মুমিনদের মাঝখানে প্রাচীর তুলে দেওয়া হবে। মুনাফিকরা তখন বলবে “আমাদের জন্য একটু অপেক্ষা করো, আমরা তোমাদের আলো থেকে একটু আলো নেব।” তখন তাদেরকে বলা হবে “পেছনে ফিরে যাও এবং আলোর সন্ধান করো!” এভাবেই তাদের কপটতার জন্য তাদেরকে চূড়ান্তভাবে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করা হবে।
  • ৩. অবকাশ দান বা ইস্তিদরাজ (الاستدراج والإملاء): দুনিয়াতে মুনাফিকদেরকে তাদের কুফর ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক ধ্বংস না করে অবকাশ দেওয়া হয়, যেন তারা নিজেদেরকে নিরাপদ ভেবে পাপে নিমজ্জিত থাকে এবং পরিশেষে কঠিন আজাবে পতিত হয়।

(ب) كيف اشتروا الضلالة بالهدى؟ بين-

[(খ) মুনাফিকরা কীভাবে হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা ক্রয় করেছিল? ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

১. ‘হিদায়াতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতা ক্রয়’-এর আলঙ্কারিক রূপক (الاستعارة التمثيلية):
কুরআনুল কারীমের এই বাক্যটি একটি অনুপম ও প্রাঞ্জল রূপক উপমা। স্বাভাবিকভাবে ‘ক্রয়-বিক্রয়’ (اشتراء وتجارة) পার্থিব পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। কিন্তু এখানে আত্মিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে বাণিজ্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এর মর্মার্থ হলো:

  • বিনিময় ও অগ্রাধিকার দেওয়া (الاستبدال والاختيار): মুনাফিকরা সত্য ও মিথ্যার সুযোগ পেয়েও ইচ্ছাকৃতভাবে হিদায়াত ও ঈমানের মতো অমূল্য সম্পদ পরিত্যাগ করে তার বিনিময়ে কুফর, নিফাক ও ভ্রষ্টতাকে বেছে নিয়েছিল। যেমন কোনো অজ্ঞ ব্যবসায়ী খাঁটি স্বর্ণ দিয়ে সস্তা কাচ বা পাথর কিনে আনন্দ প্রকাশ করে।
  • ফিতরাত ও আসমানী নিদর্শনের অপচয়: প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে তাওহীদের ফিতরাত নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং মদিনার মুনাফিকরা তাদের চোখের সামনে সর্বশেষ রাসূল ﷺ-এর জীবন্ত মুজিযা প্রত্যক্ষ করেছিল। কিন্তু তারা সেই সহজলভ্য হিদায়াতকে বিসর্জন দিয়ে ভ্রষ্টতার পথ আঁকড়ে ধরেছিল।

২. “فما ربحت تجارتهم وما كانوا مهتدين” (তাদের এ ব্যবসা লাভজনক হয়নি)-এর তাৎপর্য:
পার্থিব বাণিজ্যে মানুষ দুটি উদ্দেশ্য লাভ করতে চায়: মূলধন রক্ষা করা এবং অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করা। মুনাফিকদের এই আত্মিক বাণিজ্যে উভয়টিই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে:

  • মূলধন ও লাভের দ্বৈত বিনাশ: তারা ঈমান রূপ আসল মূলধন হারিয়েছে এবং বিনিময়ে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরের (الدرك الأسفل من النار) স্থায়ী আজাব লাভ করেছে। ফলে তাদের বাণিজ্য চূড়ান্ত লোকসানে পর্যবসিত হয়েছে।
  • হিদায়াতের পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ: শেষাংশে বলা হয়েছে “তারা সঠিক পথপ্রাপ্ত ছিল না”—অর্থাৎ তারা আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয়ে এমন এক অন্ধকার কানাগলিতে প্রবেশ করেছে যেখান থেকে সুপথ পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা অবশিষ্ট নেই।

٤- مثلهم كمثل الذى استوقد نارًا فلما أضاءت ما حوله ذهب الله بنورهم وتركهم فى ظلمات لا يبصرون- صم بكم عمي فهم لا يرجعون-

[৪. তাদের দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালালো; অতঃপর যখন আগুন তার চারপাশকে আলোকিত করল, তখন আল্লাহ তাদের জ্যোতি ছিনিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে এমন ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিলেন যে তারা কিছুই দেখতে পায় না। তারা বধির, মূক, অন্ধ; সুতরাং তারা আর ফিরে আসবে না। (সুরা আল-বাকারাহ: ১৭-১৮)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
مَثَلُهُمْ তাদের দৃষ্টান্ত, অবস্থা, উপমা اسم مفرد مضاف، বহুবচন أَمْثَال، মূলধাতু م-ث-ل (সাদৃশ্য/উপমা)।
اسْتَوْقَدَ সে আগুন জ্বালালো / প্রজ্জ্বলিত করতে চাইল فعل ماض، واحد مذكر غائب، বাবে استفعال، মূলধাতু و-ق-د (আগুন প্রজ্বলন)। এখানে ‘সীন’ (سين) অক্ষরটি طلب বা আধিক্য অর্থে ব্যবহৃত।
أَضَاءَتْ আলোকিত করল فعل ماض، واحد مؤنث غائب، বাবে إفعال، মূলধাতু ض-و-ء।
ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ আল্লাহ তাদের জ্যোতি কেড়ে নিলেন / দূর করলেন ذهب فعل ماض এর সাথে ‘বা’ (بـ) অব্যয় যুক্ত হয়ে تعدية (প্রভাবক) অর্থ দিয়েছে, অর্থাৎ أذهب الله نورهم (আল্লাহ তাদের জ্যোতি নিঃশেষ করে দিলেন)।
صُمٌّ বধির (বহুবচন) صفة مشبهة، جمع أَصَمّ، মূলধাতু ص-م-م (শ্রবণশক্তি হারানো)।
بُكْمٌ মূক বা বোবা (বহুবচন) صفة مشبهة، جمع أَبْكَم، মূলধাতু ب-ك-م (বাকশক্তিহীন হওয়া)।
عُمْيٌ অন্ধ (বহুবচন) صفة مشبهة، جمع أَعْمَى، মূলধাতু ع-م-ي (দৃষ্টিহীন হওয়া)।

(الف) ما معنى التشبيه؟ بين عناصر التشبيه وفائدته-

[(ক) তাশবীহ (التشبيه)-এর অর্থ কী? তাশবীহের উপাদানসমূহ ও এর উপকারিতা বর্ণনা কর।]

উত্তর:

১. তাশবীহ (التشبيه)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ:

  • আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘আত-তাশবীহ’ (التشبيه) শব্দের অর্থ হলো التمثيل والمقارنة অর্থাৎ সাদৃশ্য স্থাপন করা, উপমা দেওয়া, তুলনা করা বা এক বস্তুর মতো অপর বস্তুকে চিত্রিত করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইলমুল বায়ান (علم البيان) তথা আরবি অলঙ্কারশাস্ত্রের পরিভাষায়: «التَّشْبِيهُ هُوَ بَيَانُ أَنَّ شَيْئاً أَوْ أَشْيَاءَ شَارَكَتْ غَيْرَهَا فِي صِفَةٍ أَوْ أَكْثَرَ، بِأَدَاةٍ هِيَ الْكَافُ أَوْ نَحْوُهَا مَلْفُوظَةً أَوْ مَلْحُوظَةً» অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট গুণ বা বৈশিষ্ট্যে একটি বস্তু অপর কোনো বস্তুর সমকক্ষ বা অংশীদার—তা কোনো প্রকাশ্য বা উহ্য সাদৃশ্যসূচক অব্যয়ের (যেমন: كاف، مثل ইত্যাদি) মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলাকে তাশবীহ বলে।

২. তাশবীহের উপাদান বা রুকনসমূহ (عناصر التشبيه وأركانه):
একটি পূর্ণাঙ্গ তাশবীহের ৪টি মৌলিক উপাদান থাকে:

উপাদান (الركن) বিবরণ ও তাৎপর্য প্রদত্ত আয়াতের আলোকে দৃষ্টান্ত
১. الْمُشَبَّه
(মুশাব্বাহ / উপমেয়)
যাকে তুলনা করা হয় (যার অবস্থা বর্ণনা করাই মূল উদ্দেশ্য)। মুনাফিকদের দল (المنافقون—যা ‘হুম’ ضمیر দ্বারা ব্যক্ত)।
٢. الْمُشَبَّه بِهِ
(মুশাব্বাহ বিহী / উপমান)
যার সাথে তুলনা করা হয় (যার মধ্যে তুলনীয় বৈশিষ্ট্যটি অধিকতর প্রসিদ্ধ ও স্পষ্ট)। ঘোর অন্ধকারে যে ব্যক্তি আগুন জ্বালায় (الذي استوقد ناراً)।
৩. أَدَاة التَّشْبِيه
(আদাতুত তাশবীহ / সাদৃশ্যসূচক অব্যয়)
যে শব্দ বা হরফের মাধ্যমে তুলনা প্রকাশ পায় (যেমন: كـَ، كأن، مثل)। এখানে ব্যবহৃত হয়েছে كـَ এবং مَثَل
৪. وَجْهُ الشَّبَه
(ওয়াজহুশ শাব্বাহ / সাদৃশ্যের ভিত্তি)
যে অভিন্ন গুণ বা অবস্থার ভিত্তিতে উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য দেখানো হয়েছে। সাময়িক আলোর ঝলকানি পেয়ে বিপদ থেকে উদ্ধারের আশা করা, অতঃপর হঠাৎ আলো হারিয়ে চরম অন্ধকার ও দিশেহারা অবস্থায় পতিত হওয়া।

৩. তাশবীহের উপকারিতা ও বালাগাতী মাহাত্ম্য (فائدة التشبيه):

  1. বিমূর্ত ভাবকে দৃশ্যমান মূর্ততায় রূপদান (تصوير المعقول في صورة المحسوس): নিফাক বা কপটতার মতো অভ্যন্তরীণ বিমূর্ত মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে মরুভূমির রাতে আগুন নেভার মতো বাস্তব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চিত্রে রূপ দিয়ে জীবন্ত করে তোলা।
  2. শ্রোতার অন্তরে গভীর প্রভাব সৃষ্টি: যুক্তিতর্কের চেয়ে রূপক উপমা মানুষের অন্তরে দ্রুত দাগ কাটে এবং সত্যের ভয়াবহতা হৃদয়ঙ্গম করতে সাহায্য করে।
  3. মুনাফিকদের চূড়ান্ত ব্যর্থতার চমৎকার প্রতিচ্ছবি: তারা দুনিয়াতে মুসলমানদের সাথে বাহ্যিক সুর মিলিয়ে সাময়িক সুবিধা (জান-মালের নিরাপত্তা ও গনীমত) পায়, কিন্তু মৃত্যুর সাথে সাথেই সেই আলো নিভে অনন্ত জাহান্নামের ঘোর অন্ধকারে তারা নিপতিত হয়।

(ب) ما المراد بقوله تعالى “صم بكم عمي فهم لا يرجعون”؟

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী “তারা বধির, মূক, অন্ধ; সুতরাং তারা আর ফিরে আসবে না”-এর উদ্দেশ্য কী?]

উত্তর:

১. তিনটি মানবীয় ইন্দ্রিয় অকেজো হওয়ার তাৎপর্য:
বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুনাফিকরা শুনতে পেত, কথা বলতে পারত এবং চোখ দিয়ে তাকাতে পারত। তবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ‘বধির, বোবা ও অন্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন কেন? মুফাসসিরিনে কিরাম এর ব্যাখ্যায় বলেন, হেদায়েত গ্রহণের যে মূল তিনটি ইন্দ্রিয়গত মাধ্যম রয়েছে, মুনাফিকরা সেগুলোকে হক গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল:

  • صُمٌّ (বধির): তারা সত্য বাণী, কুরআনের উপদেশ ও নসীহত শোনে ঠিকই, কিন্তু তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও অনুসরণের নিয়তে শোনে না। ফলে তাদের শোনা না-শোনার সমান।
  • بُكْمٌ (মূক/বোবা): তারা সত্য কথা প্রকাশ করতে পারে না, তাওহীদের অকপট সাক্ষ্য দিতে পারে না এবং ন্যায়ের পক্ষে তাদের জিহ্বা সম্পূর্ণ অসাড়।
  • عُمْيٌ (অন্ধ): তারা আল্লাহর কুদরত, সৃষ্টিজগতের নিদর্শন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্পষ্ট মুজিযা স্বচক্ষে দেখেও অন্তরের অন্ধত্বের কারণে সত্য পথ দেখতে পায় না। যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেন: ﴿فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَٰكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ﴾ (সুরা আল-হাজ্জ: ৪৬)।

২. “فهم لا يرجعون” (সুতরাং তারা আর ফিরে আসবে না)-এর মর্মার্থ:
যে ব্যক্তির চোখ, কান ও জিহ্বা সুস্থ থাকে, সে যদি পথ হারিয়ে ফেলে তবে অন্যের ডাক শুনে, কাউকে জিজ্ঞেস করে বা পথ দেখে সঠিক রাস্তায় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি একই সাথে অন্ধ, বধির ও বোবা, সে যদি গভীর অন্ধকারে পথ হারায়, তবে তার সঠিক পথে ফিরে আসার কোনো উপায় থাকে না। তদ্রূপ মুনাফিকরা তাদের সত্য গ্রহণের সকল ইন্দ্রিয়কে অবরুদ্ধ করে ফেলায় তাদের ভ্রষ্টতা থেকে তাওবা করে হিদায়াতের পথে ফিরে আসার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। এটি বালাগাতের দৃষ্টিতে এক অনন্য ‘ইস্তিয়ারা তাসরীহিয়্যাহ’ (استعارة تصريحية)।


٥- وآتينا موسى الكتاب وجعلناه هدى لبنى إسرائيل ألا تتخذوا من دونى وكيلا- ذرية من حملنا مع نوح إنه كان عبدا شكورا-

[৫. আর আমি মুসাকে কিতাব (তাওরাত) দান করেছিলাম এবং তা বনী ইসরাঈলের জন্য হিদায়াতস্বরূপ নির্ধারণ করেছিলাম এ মর্মে যে, তোমরা আমাকে ছাড়া অপর কাউকে কর্মবিধায়ক (অভিভাবক) রূপে গ্রহণ করো না। হে তাদের বংশধর, যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম! নিশ্চয়ই সে ছিল পরম কৃতজ্ঞ এক বান্দা। (সুরা আল-ইসরা: ২-৩)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
آتَيْنَا আমি দান করেছিলাম / দিয়েছি فعل ماض، متكلم مع الغير، বাবে إفعال، মূলধাতু أ-ت-ي।
وَكِيلًا কর্মবিধায়ক, অভিভাবক, ভরসাস্থল مفعول به، فعيل بمعنى مفعول (موكول إليه الأمر)، মূলধাতু و-ك-ل।
ذُرِّيَّةَ বংশধর, সন্তান-সন্ততি منادى مضاف بحذف حرف النداء (হে বংশধর!) অথবা مفعول به على الاختصاص، মূলধাতু ذ-ر-أ।
حَمَلْنَا আমি আরোহণ করিয়েছিলাম / বহন করেছিলাম فعل ماض، متكلم مع الغير، বাবে ضرب، মূলধাতু ح-م-ل।
شَكُورًا পরম কৃতজ্ঞ, অতিশয় শুকরিয়াকারী صيغة مبالغة على وزن فَعُول، বাবে نصر (شكر)، মূলধাতু ش-ك-ر।

(الف) ما معنى قوله تعالى “ذرية من حملنا مع نوح”؟ بين-

[(ক) মহান আল্লাহর বাণী “হে তাদের বংশধর, যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় বহন করেছিলাম!”-এর অর্থ ও তাৎপর্য কী? ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

১. ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও সম্পর্কের রূপ:
মুফাসসিরিনে কিরামের মতে, আয়াতে ﴿ذُرِّيَّةَ مَنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ﴾ বাক্যাংশটি মূলত একটি আহবায়ক বাক্য (منادى)। এখানে النداء বা আহ্বানসূচক অব্যয় ‘ইয়া’ (يا) উহ্য রয়েছে; অর্থাৎ মূল বাক্য হলো: «يَا ذُرِّيَّةَ مَنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ» (হে তাদের বংশধর, যাদেরকে আমি নূহের সাথে মহাপ্লাবনে কিশতিতে সওয়ার করিয়েছিলাম!)। আবার কোনো কোনো ব্যাকরণবিদের মতে, এটি বনী ইসরাঈলের প্রতি লক্ষ্য করে الاختصاص বা বিশেষ সম্বোধন হিসেবে নসব (যবর) প্রাপ্ত হয়েছে।

২. আয়াতটির অন্তর্নিহিত অর্থ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

  • মহাপ্লাবনের মহা অনুগ্রহের স্মরণ: হযরত নূহ (আ.)-এর যুগে যখন পাপাচারী মানবজাতিকে মহাপ্লাবনের পানিতে নিমজ্জিত করে সমূলে ধ্বংস করা হয়েছিল, তখন আল্লাহ তাআলা পরম দয়া পরবশ হয়ে নূহ (আ.) এবং কিশতিতে তাঁর সাথে আরোহণকারী মুমিনদেরকে রক্ষা করেছিলেন। আজকের সমগ্র মানবজাতি এবং বনী ইসরাঈল হলো সেই রক্ষা পাওয়া পুণ্যবান ঈমানদারদেরই বংশধর।
  • কৃতজ্ঞতা প্রকাশের তাগিদ: বনী ইসরাঈলকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, তোমরা সাধারণ কোনো জাতির বংশধর নও; বরং তোমরা সেই নির্বাচিত মুমিনদের রক্ত ধারণ করছ, যাদেরকে আল্লাহ অলৌকিকভাবে মহাপ্লাবনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করেছিলেন। সুতরাং তোমাদের পিতৃপুরুষদের মতো তোমাদেরও একমাত্র আল্লাহর তাওহীদের অনুগত হওয়া এবং শিরক পরিহার করে আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়া উচিত।

(ب) ما معنى قوله تعالى “إنه كان عبدا شكورا”؟ بين-

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী “নিশ্চয়ই সে ছিল পরম কৃতজ্ঞ এক বান্দা”-এর অর্থ কী? ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

১. ‘আবদান শাকুরান’ (عَبْدًا شَكُورًا)-এর ভাষাগত বৈশিষ্ট্য:
আয়াতে বর্ণিত ‘শাকুর’ (شكور) শব্দটি আরবি ইলমুস সরফের নিয়মে صيغة مبالغة বা আতিশয্যবোধক বিশেষ্য (যার ওজন فَعُول)। সাধারণ কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে ‘শাকির’ (شاكر) বলা হয়, কিন্তু যিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে অবিরাম আল্লাহর অসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাকে ‘শাকুর’ (شكور) বলা হয়। এখানে সর্বনাম ‘ইন্নাহু’ (إنه) দ্বারা সাইয়্যিদুনা হযরত নূহ (আ.)-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

২. হযরত নূহ (আ.)-এর অনন্য শুকরিয়ার স্বরূপ (হাদিসের আলোকে):
তাফসীরে তাবারী, ইবনে কাসীর ও মুসতাদরাকে হাকীমে বর্ণিত সহীহ সনদের রেওয়ায়েতে হযরত নূহ (আ.)-এর শুকরিয়া আদায়ের বাস্তব রূপ তুলে ধরা হয়েছে:

  • আহার ও পানীয় গ্রহণের পর শুকরিয়া: মুআজ ইবনে জাবাল ও সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত, নূহ (আ.) যখনই কোনো খাবার খেতেন বা পানি পান করতেন, তখনই বলতেন: «الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي وَسَقَانِي وَكَفَانِي وَآوَانِي» (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে আহার করিয়েছেন, পান করিয়েছেন, যথেষ্ট করেছেন এবং আশ্রয় দিয়েছেন)।
  • পোশাক পরিধান ও পবিত্রতা অর্জনে শুকরিয়া: তিনি নতুন বা পুরাতন কাপড় পরিধান করার সময় এবং প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে পবিত্রতা অর্জনের পরেও আল্লাহর হামদ ও সানা গাইতেন। জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় দৈনন্দিন কাজে আল্লাহর প্রশংসায় মগ্ন থাকার কারণেই আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং কুরআনে তাঁকে ﴿عَبْدًا شَكُورًا﴾ উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

৩. শিক্ষণীয় দিক ও মোক্ষম উপদেশ:
আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে এবং বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে, নূহ (আ.) দীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর কাফিরদের জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেও এক মুহূর্তের জন্য আল্লাহর অকৃতজ্ঞ হননি। অতএব, তাঁর বংশধর হয়ে বনী ইসরাঈল কীভাবে আল্লাহর নিয়ামত তাওরাতকে ভুলে গিয়ে শিরকে লিপ্ত হয় এবং আল্লাহকে ছাড়া অন্যদের কর্মবিধায়ক (উকিল) হিসেবে গ্রহণ করে? মানুষের জীবনের আসল মর্যাদা বংশগৌরবে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও নিঃশর্ত আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত।


٦- وقضينا إلى بنى إسرائيل فى الكتاب لتفسدن فى الأرض مرتين ولتعلن علوا كبيرا- فإذا جاء وعد أولاهما بعثنا عليكم عبادا لنا أولى بأس شديد فجاسوا خلال الديار ، وكان وعدا مفعولا-

[৬. আর আমি বনী ইসরাঈলকে কিতাবে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, তোমরা পৃথিবীতে অবশ্যই দু’বার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং মহাদম্ভ ও সীমালঙ্ঘন প্রদর্শন করবে। অতঃপর এ দু’টির প্রথমটির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হলো, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম আমার এমন কতিপয় বান্দাকে, যারা ছিল প্রচণ্ড যুদ্ধবাজ ও পরাক্রমশালী; ফলে তারা তোমাদের বসতবাড়ির প্রতিটি কোণায় প্রবেশ করে তল্লাশি চালাল। আর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হওয়ারই ছিল। (সুরা আল-ইসরা: ৪-৫)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
قَضَيْنَا আমি চূড়ান্ত ফয়সালা জানিয়ে দিয়েছিলাম / অবধারিত করেছিলাম فعل ماض، متكلم مع الغير، বাবে ضرب (قضاء)، মূলধাতু ق-ض-ي। এখানে قضينا إلى অর্থ حكمنا وأوحينا وحياً مقطوعاً به।
لَتُفْسِدُنَّ তোমরা অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টি করবে فعل مضارع، جمع مذكر حاضر مؤكد باللام ونون التوكيد الثقيلة، বাবে إفعال، মূলধাতু ف-س-د।
مَرَّتَيْنِ দু’বার اسم مثنى، مفعول مطلق مؤكد، মূলধাতু م-ر-ر।
لَتَعْلُنَّ তোমরা অবশ্যই ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতা দেখাবে فعل مضارع مؤكد باللام والنون، جمع مذكر حاضر، বাবে نصر (علو)، মূলধাতু ع-ل-و।
أُولِي بَأْسٍ প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী যোদ্ধা أولى হলো ذوي (অধিকারী) অর্থে اسم جمع، এবং بأس হলো যুদ্ধশক্তি ও বীরত্ব (قوة وشدة في الحرب)।
فَجَاسُوا তারা তন্ন তন্ন করে চষে ফেলল / তল্লাশি চালাল فعل ماض، جمع مذكر غائب، বাবে نصر، মূলধাতু ج-و-س। الجوس হলো কোনো বস্তুর খোঁজে চারদিকে বিচরণ করা।

(الف) فسّر قوله تعالى “لتفسدن فى الأرض مرتين”-

[(ক) মহান আল্লাহর বাণী “তোমরা পৃথিবীতে অবশ্যই দু’বার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে”-এর তাফসীর কর।]

উত্তর:

১. আয়াতাংশের শাব্দিক ও মূলগত ব্যাখ্যা:
আল্লাহ তাআলা তাওরাত কিতাবের মাধ্যমে বনী ইসরাঈলকে আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, তারা তাদের জাতীয় জীবনে দুটি ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে মারাত্মক পাপাচার, অবাধ্যতা ও রক্তপাতে লিপ্ত হয়ে পৃথিবীতে ফাসাদ বা চরম অনাচার সৃষ্টি করবে। এখানে ‘আল-আরদ্ব’ (الأرض) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শাম তথা পবিত্র ফিলিস্তিন ও বাইতুল মুকাদ্দাস অঞ্চল, যেখানে তাদের রাজত্ব ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

২. বনী ইসরাঈলের ‘দুইবারের ফাসাদ’ (المرتان)-এর ঐতিহাসিক ও তাফসীরভিত্তিক বিবরণ:
ইমাম তাবারী, ইবনে কাসীর ও আল্লামা বায়যাবী (রহ.) পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব ও ইতিহাসের বর্ণনাসমূহ পর্যালোচনা করে এই দুই ফাসাদের নিম্নোক্ত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:

বিপর্যয় (الفساد) পাপ ও অনাচারের প্রকৃতি ঐতিহাসিক পরিণতি ও ঐশী শাস্তি
প্রথম ফাসাদ
(الإفساد الأول)
তাওরাতের বিধিবিধান পরিত্যাগ করা, আল্লাহর সাথে শিরকে লিপ্ত হওয়া এবং তাদের সৎ উপদেশদাতা নবীগণকে হত্যা করা (যেমন হযরত শি’য়া বা ইশাইয়া আ. এবং যাকারিয়া আ.-কে হত্যা করার মতো জঘন্য অপরাধ)। আল্লাহ তাদের ওপর ব্যবিলনের পরাক্রমশালী সম্রাট বখতেনাসার (বুখতানাসসার / Nebuchadnezzar)-কে বিজয়ী করেন। সে বায়তুল মুকাদ্দাস আক্রমণ করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে, তাওরাতের পাণ্ডুলিপি জ্বালিয়ে দেয় এবং হাজার হাজার বনী ইসরাঈলকে বন্দী করে ব্যবিলনে দাস বানিয়ে নিয়ে যায়।
দ্বিতীয় ফাসাদ
(الإفساد الثاني)
প্রথম শাস্তির পর তওবা করে মুক্ত হয়ে ফিরে আসার পর পুনরায় ঔদ্ধত্যে মেতে ওঠা; নিষ্পাপ নবী হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-কে নির্মমভাবে হত্যা করা এবং হযরত ঈসা (আ.)-কে শূলে চড়িয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র করা। পরিশেষে শেষনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর সাথে চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করা। রোমান সম্রাট তিতুস (Titus) ৭০ খ্রিস্টাব্দে জেরুজালেম আক্রমণ করে বাইতুল মুকাদ্দাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়, তাদের বিখ্যাত দ্বিতীয় উপাসনালয় মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং তাদের নির্বাসিত ও বিশ্বে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

(ب) من المراد بقوله تعالى “عبادا لنا أولى بأس شديد”؟ أوضح-

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী “আমার এমন কতিপয় বান্দা, যারা ছিল প্রচণ্ড যুদ্ধবাজ ও পরাক্রমশালী”-এর দ্বারা কাদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে? স্পষ্ট কর।]

উত্তর:

১. ‘ইবাদান লানা’ (عِبَادًا لَنَا)-এর তাত্পর্য:
এখানে প্রশ্ন ওঠে, এই আক্রমণকারীরা তো কাফির ও মূর্তিপূজক ছিল, তাহলে আল্লাহ তাদের কেন “আমার বান্দা” (عباداً لنا) বলে নিজের দিকে সম্বন্ধ করলেন? মুফাসসিরিনে কিরাম এর অতি চমৎকার তাত্ত্বিক উত্তর দিয়েছেন:

  • সৃষ্টিগত দাসত্ব (عبودية القهر والتسخير): সৃষ্টিজগতের প্রতিটি সত্তাই মহান আল্লাহর কুদরতের অধীন ও বাধ্যগত বান্দা। এটি মুমিনের প্রেমপূর্ণ ইবাদতের দাসত্ব (عبودية التشريف) নয়; বরং এটি হলো আল্লাহর মহাশক্তির কাছে পরাভূত হওয়ার সার্বজনীন সৃষ্টিগত দাসত্ব।
  • ঐশী গজবের হাতিয়ার: আল্লাহ তাআলা অবাধ্য জাতিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য অনেক সময় জালেম শাসক ও কাফির শক্তিকে তাঁর গজবের চাবুক বা শাস্তির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। যেমন প্রখ্যাত প্রবাদ রয়েছে: «الظَّالِمُ سَيْفُ اللَّهِ فِي الْأَرْضِ يَنْتَقِمُ بِهِ ثُمَّ يَنْتَقِمُ مِنْهُ» “জালেম হলো জমিনে আল্লাহর তরবারি; তিনি তাকে দিয়ে পাপীদের শাস্তি দেন, অতঃপর তাকেও ধ্বংস করেন।”

২. ঐতিহাসিকভাবে এই পরাক্রমশালী বাহিনী কারা ছিল:

  • ব্যবিলনের সম্রাট বখতেনাসার ও তার সৈন্যদল: জমহুর মুফাসসিরীন (হযরত ইবনে আব্বাস, সাঈদ ইবনে যুবায়ের, কাতাদাহ প্রমুখ) বলেন, এরা ছিল ব্যাবিলনের ক্যালডীয় বা কালদানী সাম্রাজ্যের রাজা বখতেনাসার (Nebuchadnezzar) ও তার রণোন্মাদ সৈন্যবাহিনী। তারা ছিল অত্যন্ত দুর্ধর্ষ, নিষ্ঠুর এবং শারীরিক ও সামরিক শক্তিতে অপরাজেয়।
  • “فجاسوا خلال الديار” (তারা ঘরের আনাচে-কানাচে চষে ফেলল): আয়াতে বলা হয়েছে, এই পরাক্রমশালী বাহিনী ফিলিস্তিনের শহর-নগর ও বসতবাড়ির প্রতিটি অলিগলি, কোণ ও গৃহকোণে প্রবেশ করে বনী ইসরাঈলকে খুঁজে বের করে হত্যা ও বন্দি করেছিল। তাদের হাত থেকে বনী ইসরাঈলের কেউ রক্ষা পায়নি।
  • ঐশী সতর্কবাণী: আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে স্পষ্ট করলেন যে, কোনো জাতি যদি আসমানী কিতাব ও সত্য নবীর অনুসারী হয়েও অহংকার ও পাপাচারে লিপ্ত হয়, তবে আল্লাহ জালিম পরাশক্তিদের মাধ্যমে তাদের মান-ইজ্জত ও স্বাধীনতা ধুলায় মিশিয়ে দেন।

٧- يا أيها الذين آمنوا إن جاءكم فاسق بنبإ فتبينوا أن تصيبوا قوما بجهالة فتصبحوا على ما فعلتم نادمين-

[৭. হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী (ফাসিক) তোমাদের নিকট কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হও; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের উপর চড়াও না হও, যার ফলে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়। (সুরা আল-হুজুরাত: ৬)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
فَاسِقٌ পাপাচারী, আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘনকারী اسم فاعل، বাবে ضرب (فسق)، মূলধাতু ف-س-ق। আরবিতে খোলস ছেড়ে খেজুর বের হওয়াকে ফিসক বলে, তেমনি আনুগত্যের গণ্ডি পেরোনো ব্যক্তিকে ফাসিক বলে।
بِنَبَإٍ গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ নিয়ে اسم مفرد مجرور بالباء، মূলধাতু ن-ب-أ। সাধারণ সংবাদকে خبر বলা হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ঘটনাকে ‘নাবা’ (نبأ) বলা হয়।
فَتَبَيَّنُوا তোমরা যাচাই-বাছাই ও নিশ্চিত হও فعل أمر، جمع مذكر حاضر، বাবে تفعّل، মূলধাতু ب-ي-ن (স্পষ্ট করা)। অন্য কিরাতে এটি فَتَثَبَّتُوا (ধৈর্যসহ নিশ্চিত হও) পঠিত হয়েছে।
أَن تُصِيبُوا পাছে তোমরা আক্রমণ করে বস / ক্ষতিগ্রস্ত কর أن مصدرية، تصيبوا فعل مضارع منصوب، মূলধাতু ص-و-ب (বাবে إفعال)। বাক্যটিতে كراهة أن تصيبوا উহ্য।
بِجَهَالَةٍ অজ্ঞতাবশত, প্রকৃত সত্য না জেনে مصدر مجرور، মূলধাতু ج-ه-ل।
نَادِمِينَ লজ্জিত, অনুতপ্ত (বহুবচন) اسم فاعل، جمع مذكر سالم، خبر تصبحوا، মূলধাতু ن-د-م (অনুতাপ)।

(الف) اكتب سبب نزول هذه الآية الكريمة-

[(ক) উক্ত সম্মানিত আয়াতের শানে নুযুল (নাযিলের প্রেক্ষাপট) লিখ।]

উত্তর:

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মূল ঘটনা (ওয়ালিদ ইবনে উকবাহ ও বনু মুসতালিক গোত্র):
ইমাম আহমদ, তাবারী, ইবনে কাসীর ও আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) সহীহ সনদে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা ও ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, এই আয়াতটি প্রখ্যাত সাহাবী ওয়ালিদ ইবনে উকবাহ (রা.) এবং বনু মুসতালিক গোত্রের ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়:

  • যাকাত সংগ্রহের নির্দেশ: অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর অথবা মুরাইসী যুদ্ধের পর বনু মুসতালিক গোত্র তাদের নেতা হারিস ইবনে আবি দ্বিরার (রা.)-এর নেতৃত্বে ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ওয়ালিদ ইবনে উকবাহকে তাদের কাছ থেকে যাকাতের অর্থ সংগ্রহ করার জন্য দূত হিসেবে প্রেরণ করেন।
  • ভুল বোঝাবুঝি ও পশ্চাদপসরণ: বনু মুসতালিক গোত্রের লোকেরা যখন জানতে পারল যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রেরিত দূত তাদের কাছে আসছেন, তখন তারা আনন্দচিত্তে তাঁকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানাতে এবং যাকাতের উট ও মালপত্র জমা দিতে দলবদ্ধ হয়ে অস্ত্রহীন অবস্থায় শহরের বাইরে এগিয়ে আসে। কিন্তু অন্ধকার যুগ বা জাহেলী যুগে ওয়ালিদ ইবনে উকবার গোত্রের সাথে বনু মুসতালিকের শত্রুতা ছিল। ওয়ালিদ দূর থেকে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে ধেয়ে আসতে দেখে মনে করলেন যে তারা বুঝি তাকে আক্রমণ বা হত্যা করতে আসছে এবং তারা ধর্মত্যাগী (মুরতাদ) হয়ে যাকাত দিতে অস্বীকার করছে। তিনি ভয়ে ভীত হয়ে তাদের সাথে কোনো প্রকার কথা না বলেই মদিনায় ফিরে আসেন।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট রিপোর্ট: মদিনায় পৌঁছে ওয়ালিদ আরজ করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! বনু মুসতালিক যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং তারা আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছিল।” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলেন এবং সত্যতা যাচাইয়ের জন্য খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একদল মুজাহিদ প্রেরণ করলেন এবং নির্দেশ দিলেন, আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে।
  • সত্য উদঘাটন: হযরত খালিদ (রা.) রাতের আঁধারে তাদের এলাকায় পৌঁছে দেখতে পান যে, বনু মুসতালিকের মসজিদে আজান হচ্ছে, সাহাবীগণ জামাতে সালাত আদায় করছেন এবং তারা ইসলামের ওপর অবিচল রয়েছে। সকালে তাদের নেতা হারিস বিন আবি দ্বিরার উপস্থিত হয়ে বলেন: “আল্লাহর কসম! আমরা দূতকে সংবর্ধনা দিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি না এসেই ফিরে গেছেন।” ঠিক এই মুহূর্তে ওহী নিয়ে জিবরাঈল (আ.) অবতীর্ণ হন এবং সুরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াত নাযিল করে কোনো সংবাদের সত্যতা যাচাই না করে কোনো গোত্র বা জাতির বিরুদ্ধে সামরিক বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন।

(ب) هل يقبل خبر الفاسق وشهادته؟ اكتب موضحا-

[(খ) ফাসিকের সংবাদ ও সাক্ষ্য কি গ্রহণযোগ্য? বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

১. ফাসিক (الفاسق)-এর সংজ্ঞা:
শরীয়তের পরিভাষায় ফাসিক হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি কবিরা গুনাহে (যেমন মিথ্যাচার, যেনা, মদ্যপান, সুদ ইত্যাদি) লিপ্ত হন কিংবা কোনো তওবা ছাড়া অবিরাম সগিরা গুনাহ পুনরাবৃত্তি করেন এবং যার দ্বীনদারী ও ন্যায়পরায়ণতা (عدالة) বিনষ্ট হয়েছে।

২. ফাসিকের সংবাদ (خبر الفاسق)-এর হুকুম:
ইসলামী ফিকহ ও উসুলুল ফিকহের সর্বসম্মত নীতিমালা অনুযায়ী ফাসিকের সংবাদ সরাসরি গ্রহণও করা যাবে না, আবার সরাসরি একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যাবে না; বরং তার সংবাদ আসলে تبين وتثبت (অনুসন্ধান ও যাচাই-বাছাই) করা ওয়াজিব:

  • দ্বীনী ও বর্ণনামূলক সংবাদ (الرواية ونقل الحديث): কুরআন-সুন্নাহ বা দ্বীনের শরয়ী বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে ফাসিকের রেওয়ায়েত সর্বসম্মতভাবে বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য (مردود)। কারণ দ্বীনের বর্ণনায় শতভাগ বিশ্বস্ততা ও তাকওয়া অপরিহার্য।
  • পার্থিব ও সাধারণ সংবাদ (الأمور الدنيوية والمعاملات): সাধারণ সামাজিক খবর বা লেনদেনের ক্ষেত্রে যদি ফাসিকের সংবাদের পক্ষে প্রবল আলামত বা নিরপেক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে যাচাই সাপেক্ষে তা আমলে নেওয়া যাবে। নতুবা তা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হারাম।

৩. ফাসিকের সাক্ষ্য (شهادة الفاسق)-এর হুকুম:
বিচারালয়ে ও শরয়ী আদালতে মানুষের অধিকার নির্ধারণে সাক্ষ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ফাসিকের সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে চার ইমাম ও ফুকাহাগণের মূলনীতি নিম্নরূপ:

মাযহাব / ইমামগণ ফাসিকের সাক্ষ্যের বিধান শরয়ী দলিল ও যুক্তি
জমহুর ফুকাহা
(মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব)
ফাসিকের কোনো সাক্ষ্যই আদালতে গ্রহণযোগ্য নয় (لا تقبل شهادته مطلقاً)। সুরা আত-তালাকের ২ নম্বর আয়াত: ﴿وَأَشْهِدُوا ذَوَيْ عَدْلٍ مِّنكُمْ﴾ (তোমাদের মধ্যকার দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী বানাও)। ফাসিক যেহেতু আদিল বা ন্যায়পরায়ণ নয়, তাই তার সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যাত।
হানাফী মাযহাব
(ইমাম আবু হানীফা রহ.)
সাধারণ অবস্থায় ফাসিকের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য। তবে বিচারক যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তাকে সত্যবাদী বলে মনে করেন তবে হুদূদ ও কিসাস ব্যতীত সাধারণ দেওয়ানি বিষয়ে তা গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে, যদিও তা অপছন্দনীয়। ফাসিক তওবা করে সৎ হয়ে গেলে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে। সুরা আন-নূরের ৪ নম্বর আয়াতে অপবাদকারীর সাক্ষ্য বাতিল ঘোষণা করে পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে: ﴿إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا﴾ (তবে যারা তওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে)। তওবার দ্বারা ফিসক দূরীভূত হলে সাক্ষ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

٨- يا أيها الذين آمنوا لا يسخر قوم من قوم عسى أن يكونوا خيرا منهم ولا نساء من نساء عسى أن يكن خيرًا منهن ولا تلمزوا أنفسكم ولا تنابزوا بالألقاب، بئس الاسم الفسوق بعد الإيمان، ومن لم يتب فأولئك هم الظالمون-

[৮. হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ সম্প্রদায় যেন অপর কোনো পুরুষ সম্প্রদায়কে উপহাস না করে, কেননা হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম; এবং কোনো নারীও যেন অপর কোনো নারীকে উপহাস না করে, কেননা হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং পরস্পরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। ঈমান আনার পর ফাসিকি নামযুক্ত হওয়া কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তওবা করে না, মূলত তারাই জালিম। (সুরা আল-হুজুরাত: ১১)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
لَا يَسْخَرْ যেন উপহাস বা বিদ্রূপ না করে فعل نهي، واحد مذكر غائب مجزوم، বাবে فتح (سخر)، মূলধাতু س-خ-ر।
قَوْمٌ সম্প্রদায়, পুরুষের দল اسم جمع، মূলত এমন পুরুষদের দলকে বলা হয় যারা কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পাদনে প্রস্তুত।
لَا تَلْمِزُوا তোমরা দোষারোপ করো না, খোটা দিও না فعل نهي، جمع مذكر حاضر، বাবে ضرب، মূলধাতু ل-م-ز। اللمز হলো মানুষের মুখের সামনে বা ইশারা-ইঙ্গিতে দোষ খোঁজা।
أَنفُسَكُمْ পরস্পরকে / নিজেদেরকে مفعول به مضاف। মুমিনরা এক দেহের মতো, তাই অপর মুমিনকে দোষারোপ করা নিজেকেই দোষারোপ করার শামিল।
لَا تَنَابَزُوا তোমরা পরস্পর মন্দ উপাধিতে ডেকো না فعل نهي، اصله لا تتنابزوا، বাবে تفاعل (যা উভয় পক্ষের মধ্যে আদান-প্রদান বুঝায়)، মূলধাতু ن-ب-ز।
بِالْأَلْقَابِ উপাধি বা মন্দ খেতাবসমূহ দ্বারা جمع لَقَب، যা কোনো ব্যক্তির এমন নাম বা পদবি নির্দেশ করে যা শুনলে সে কষ্ট পায়।

(الف) بين سبب نزول هذه الآية الكريمة-

[(ক) উক্ত সম্মানিত আয়াতের শানে নুযুল (নাযিলের প্রেক্ষাপট) বর্ণনা কর।]

উত্তর:

১. পুরুষদের একে অপরকে উপহাসের প্রেক্ষাপট:
মুফাসসিরিনে কিরাম উল্লেখ করেন যে, এই আয়াতের প্রথম অংশ বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে:

  • ছাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর ঘটনা: হযরত ছাবিত ইবনে কায়েস (রা.) কানে কিছুটা কম শুনতেন। তাই মজলিসে তিনি সর্বদা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকটবর্তী স্থানে বসতেন। একদিন মসজিদে নববীতে জামাত চলাকালে তিনি দেরিতে পৌঁছান। তিনি লোকজনকে ডিঙিয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন। এক ব্যক্তি তাকে জায়গা না দিয়ে বারণ করলে ছাবিত ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন: “তুমি অমুক নারীর সন্তান!” জাহেলী যুগের একটি অপবাদ দিয়ে তার মাকে খোটা দেওয়া হলো। লোকটি অত্যন্ত লজ্জিত হলো। তখন এই আয়াত নাযিল করে যেকোনো মুমিনকে বংশ বা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে কটাক্ষ করা নিষিদ্ধ করা হয়।
  • হযরত বেলাল ও সালমান ফারসী (রা.)-কে কটাক্ষ: অপর বর্ণনায় এসেছে, কুরাইশের কিছু অভিজাত লোক হযরত বেলাল, আম্মার ও সুহাইব (রা.)-এর মতো নিঃস্ব ও কৃষ্ণকায় সাহাবীদের দারিদ্র্য ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে উপহাস করত। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সাবধান করে ঘোষণা করেন যে, আল্লাহর দরবারে তাদের মর্যাদা এসব অহংকারীদের চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ।

২. নারীদের উপহাসের প্রেক্ষাপট:
আয়াতে নারীদের বিশেষভাবে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে (﴿وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ﴾), কারণ নারীদের মধ্যে রূপ-সৌন্দর্য ও বংশমর্যাদা নিয়ে পরস্পরকে খোটা দেওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। ইমাম কুরতুবী ও ইবনে কাসীর (রহ.) উল্লেখ করেন:

  • উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করে নবীজী ﷺ-এর পরিবারে যুক্ত হলেন, তখন কোনো কোনো স্ত্রী তাঁকে “ইহুদি বংশের মেয়ে” বলে কটাক্ষ করতেন। সাফিয়্যাহ (রা.) কেঁদে নবীজী ﷺ-কে তা জানালে নবীজী সান্ত্বনা দিয়ে বললেন: “তুমি কেন বলোনি যে, মূসা (আ.) আমার পূর্বপুরুষ, হারুন (আ.) আমার চাচা এবং মুহাম্মদ ﷺ আমার স্বামী!” অতঃপর এই আয়াত নাযিল হয়।
  • অনুরূপভাবে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামাহ (রা.)-এর খাটো গড়ন বা পোশাক নিয়ে উপহাস করার প্রেক্ষিতেও এটি নাযিল হওয়ার রেওয়ায়েত পাওয়া যায়।

৩. মন্দ উপাধিতে ডাকার প্রেক্ষাপট (تنابز بالألقاب):
ইমাম আহমদ ও তিরমিযীতে আবু জুবাইরাহ ইবনে দাহহাক (রা.) থেকে বর্ণিত, জাহেলী যুগে আনসারদের প্রায় প্রতিটি ব্যক্তির দুই বা তিনটি উপনাম থাকত। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ অনেক সময় কোনো সাহাবীকে স্নেহ করে তার আগের কোনো নামে ডাকতেন, কিন্তু পরে সাহাবীগণ জানাতেন যে এই নামে ডাকলে লোকটি কষ্ট পায়। তখন আল্লাহ তাআলা কোনো মুসলিমকে এমন কোনো নামে বা উপাধিতে ডাকা সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেন যা সে অপছন্দ করে।


(ب) ما معنى السخرية؟ وما حكمها فى الشريعة الاسلامية؟

[(খ) সুখরিয়াহ (السخرية)-এর অর্থ কী? ইসলামী শরীয়তে এর বিধান কী?]

উত্তর:

১. সুখরিয়াহ (السخرية)-এর শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা:

  • আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘আস-সুখরিয়াহ’ (السخرية) শব্দের অর্থ হলো: الاستهزاء والتنقيص অর্থাৎ কাউকে তাচ্ছিল্য করা, বিদ্রূপ করা, উপহাস করা, ব্যঙ্গচিত্র আঁকা বা কৌতুকচ্ছলে কারো সম্মানহানি করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইমাম নববী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘আল-আযকার’ গ্রন্থে সুখরিয়াহর অত্যন্ত সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছেন: «السُّخْرِيَةُ هِيَ الِاسْتِهَانَةُ وَالتَّحْقِيرُ، وَالتَّنْبِيهُ عَلَى الْعُيُوبِ وَالنَّقَائِصِ عَلَى وَجْهٍ يُضْحَكُ مِنْهُ، وَقَدْ يَكُونُ ذَلِكَ بِالْمُحَاكَاةِ فِي الْفِعْلِ وَالْقَوْلِ، وَبِالْإِشَارَةِ وَالْإِيمَاءِ» অর্থাৎ “সুখরিয়াহ বা উপহাস হলো কাউকে হেয় ও তুচ্ছ প্রতিপন্ন করা এবং মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে কারো শারীরিক, বাচনিক বা বংশীয় ত্রুটি-বিচ্যুতিকে প্রকাশ করা। এটি কারো অঙ্গভঙ্গি বা কথার অনুকরণ (মিমিক্রি) করে, চোখের ইশারায় কিংবা ইঙ্গিতের মাধ্যমেও হতে পারে।”

২. ইসলামী শরীয়তে সুখরিয়াহর হুকুম (حكم السخرية في الشريعة):
ইসলামী শরীয়তের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো মুসলিম বা নিরপরাধ মানুষকে উপহাস করা, তাচ্ছিল্য করা বা ব্যঙ্গ করা কাটখোট্টা হারাম এবং মারাত্মক কবিরা গুনাহ (حرام قطعي وكبيرة من كبائر الذنوب)। এর শরয়ী দলিলসমূহ নিম্নরূপ:

  • ১. কুরআনুল কারীমের নিষেধাজ্ঞা: সুরা হুজুরাতের এই আয়াতে সরাসরি النهي الصريح বা দ্ব্যর্থহীন নিষেধাজ্ঞা এসেছে: ﴿لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ﴾। উসুলুল ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী نهي সর্বদা তাহরীম বা হারাম হওয়াকে প্রমাণ করে। তাছাড়া আয়াতের শেষে যারা এ কাজ থেকে তওবা করে না তাদেরকে ‘জালিম’ (﴿فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴾) আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা কবিরা গুনাহের স্পষ্ট আলামত।
  • ২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসের সতর্কবাণী: সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ، وَمَالُهُ، وَعِرْضُهُ» “একজন মানুষের পাপী ও নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ বা হেয় মনে করে। প্রতিটি মুসলিমের জান, মাল ও ইজ্জত অপর মুসলিমের জন্য সম্পূর্ণ হারাম।”
  • ৩. অহংকারের বহিঃপ্রকাশ: মানুষ কেবল তখনই অন্যকে নিয়ে উপহাস করে যখন সে নিজেকে বড় এবং অন্যকে ছোট মনে করে। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: «الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ» “অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।” (সহীহ মুসলিম)। যে ব্যক্তির অন্তরে এক সরিষা দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
  • ৪. সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের কারণ: উপহাস ও বিদ্রূপ মানুষের অন্তরে ক্ষোভ, বিদ্বেষ, শত্রুতা ও প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা ভ্রাতৃত্বের চিরন্তন বন্ধনকে চুরমার করে দেয়। তাই ইসলাম একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে সুখরিয়াহকে চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

٩- يا أيها الناس إنا خلقناكم من ذكر وأنثى وجعلناكم شعوبا وقبائل لتعارفوا- إن أكرمكم عند الله أتقاكم ، إن الله عليم خبير-

[৯. হে মানবজাতি! নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান সে ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মুত্তাকী (আল্লাহভীরু)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। (সুরা আল-হুজুরাত: ১৩)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
شُعُوبًا বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীসমূহ, রাষ্ট্রসমূহ جمع شَعْب، মূলধাতু ش-ع-ب (শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হওয়া)। الشعوب হলো القبائل-এর চেয়ে বড় মানবগোষ্ঠী (যেমন: অনারব জাতিসমূহ)।
قَبَائِلَ গোত্রসমূহ, বংশসমূহ جمع قَبِيلَة، মূলধাতু ق-ب-ل। এক পিতামহ বা রক্তসম্পর্কিত একক পরিবারগুলোর সমষ্টিকে কাবিলা বলে।
لِتَعَارَفُوا যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার فعل مضارع منصوب بأن مضمرة بعد لام التعليل، أصله لتتعارفوا، বাবে تفاعل، মূলধাতু ع-ر-ف।
أَكْرَمَكُمْ তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি اسم تفضيل مضاف، মূলধাতু ك-ر-م (মর্যাদা/সম্মান)।
أَتْقَاكُمْ যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহভীরু / মুত্তাকী اسم تفضيل، اصله أَوْقَاكُمْ، বাবে افتعال (تقوى)، মূলধাতু و-ق-ي (রক্ষা করা/ভয় করা)।
خَبِيرٌ সম্যক অবহিত, অন্তরের সূক্ষ্ম খবর রাখেন যিনি فعيل بمعنى فاعل، صفة مشبهة، মূলধাতু خ-ب-ر।

(الف) ما هو سبب نزول هذه الآية الكريمة؟

[(ক) উক্ত সম্মানিত আয়াতের শানে নুযুল (নাযিলের প্রেক্ষাপট) কী?]

উত্তর:

১. মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক ঘটনা ও হযরত বেলালের আজান:
ইমাম বায়হাকী, বাগাভী ও ইবনে কাসীর (রহ.) হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ কা’বা শরীফকে মূর্তিমুক্ত করার পর প্রিয় সাহাবী হযরত বেলাল হাবশী (রা.)-কে কা’বার ছাদে উঠে বিজয়ের আজান দেওয়ার নির্দেশ দেন। একজন কৃষ্ণাঙ্গ সাবেক কৃতদাস কা’বা গৃহের ছাদে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে আজান দিচ্ছেন—এ দৃশ্য দেখে কুরাইশদের কিছু নব্য মুসলিম ও উদ্ধত ব্যক্তি জাহেলী বর্ণবাদের বশবর্তী হয়ে মন্তব্য করতে লাগল:

  • আত্তাব ইবনে আসীদ বলল: “আল্লাহর শোকর যে আমার পিতা আসীদ আগেই মারা গেছেন, তাকে এই দৃশ্য দেখতে হলো না!”
  • হারিস ইবনে হিশাম বলল: “মুহাম্মদ কি এই কালো কাক ছাড়া আজান দেওয়ার মতো আর কাউকেই খুঁজে পেল না?”
  • সুহাইল ইবনে আমর বলল: “আল্লাহ যদি চান, তবে অবশ্যই তিনি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাবেন।”

তাদের এই গোপন বর্ণবাদী ও বংশীয় অহংকারপূর্ণ কথোপকথনের পরপরই হযরত জিবরাঈল (আ.) ওহী নিয়ে আগমন করেন এবং এই আয়াতটি নাযিল করে ঘোষণা করেন যে, মানুষের সম্মান চামড়ার রঙে নয়, বংশে নয়, বরং একমাত্র তাকওয়ার মধ্যেই নিহিত।

২. অপর একটি ঘটনা (হযরত আবু হিন্দ-এর বিয়ে):
ইমাম আবু দাউদ তাঁর ‘মারাশীল’ গ্রন্থে যুহরী (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বনু বায়াযাহ গোত্রকে তাদের এক মেয়ের সাথে আবু হিন্দ (রা.)-এর বিবাহ দিতে বললেন। আবু হিন্দ ছিলেন একজন মুক্তদাস এবং পেশায় রক্তমোক্ষণকারী (সিঙ্গা লাগাতেন)। বনু বায়াযাহর লোকেরা অহংকার করে বলল: “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি আমাদের মেয়েদের আমাদের দাস ও রক্তমোক্ষণকারীর কাছে বিয়ে দেব?” তাদের এই কৌলীন্যপ্রথা ও আভিজাত্যের অন্ধ অহংকার চূর্ণ করার জন্য আল্লাহ তাআলা এই সর্বজনীন আয়াত অবতীর্ণ করেন।


(ب) فسّر قوله تعالى “إن أكرمكم عند الله أتقاكم”-

[(খ) মহান আল্লাহর বাণী “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান সে ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মুত্তাকী”-এর তাফসীর কর।]

উত্তর:

১. বর্ণবাদ ও বংশগৌরবের চিরতরে বিলোপসাধন:
আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, সমস্ত মানুষ একই পিতা (হযরত আদম আ.) এবং একই মাতা (হযরত হাওয়া আ.) থেকে উদ্ভূত। অতএব, জন্মগতভাবে কারও কোনো প্রাধান্য বা শ্রেষ্ঠত্ব নেই। বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক পরিচয় ও পারস্পরিক পরিচিতি (لِتَعَارَفُوا), পরস্পরের বিরুদ্ধে অহংকার বা শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করার জন্য নয় (لَا لِتَفَاخَرُوا)।

২. আল্লাহর দরবারে মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি: তাকওয়া (تقوى):

  • তাকওয়ার অর্থ: তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয়ে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে পালন করা। যে ব্যক্তি আল্লাহর যত বেশি অনুগত, সে-ই আল্লাহর দরবারে তত বেশি মর্যাদাবান ও সম্মানিত।
  • পার্থিব মাপকাঠি বনাম ঐশী মাপকাঠি: দুনিয়ার মানুষ মর্যাদা পরিমাপ করে অর্থসম্পদ, ক্ষমতা, রূপ-সৌন্দর্য এবং আভিজাত্য দিয়ে। কিন্তু মহান রব্বুল আলামীন মানুষের এই কৃত্রিম ভেদাভেদকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়ে কেবল অন্তরের শুদ্ধতা ও আমলের একনিষ্ঠতাকে মর্যাদার ভিত্তি বানিয়েছেন।

৩. বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে এই আয়াতের পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন:
হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ ও আবু নাদ্বরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ আইয়ামে তাশরীক্ব তথা বিদায় হজের ভাষণে এই আয়াতের জীবন্ত ব্যাখ্যা দিয়ে ইরশাদ করেন:

«يَا أَيُّهَا النَّاسُ، أَلَا إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ، وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ، وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ، وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى، إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ»

[অর্থ: “হে লোকসকল! জেনে রেখো, তোমাদের প্রতিপালক একজন এবং তোমাদের আদি পিতাও একজন। মনে রেখো, অনারবের উপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আরবের উপরও কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোনো প্রাধান্য নেই, আর শ্বেতাঙ্গের উপরও কৃষ্ণাঙ্গের কোনো প্রাধান্য নেই—একমাত্র তাকওয়া ছাড়া। নিশ্চয়ই আল্লাহর দরবারে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সে-ই, যে সর্বাধিক মুত্তাকী।”] (মুসনাদে আহমদ: ২২৯৭৮)।

উপসংহার: আয়াতের শেষে বলা হয়েছে ﴿إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ﴾—আল্লাহ কার অন্তরে কতটুকু খাঁটি তাকওয়া রয়েছে সে বিষয়ে পরিপূর্ণ অবগত। মানুষের লোকদেখানো আমল বা আভিজাত্যের মিথ্যা দাবি দিয়ে আল্লাহর জ্ঞানকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।


١٠- ولقد رآه نزلة أخرى- عند سدرة المنتهى- عندها جنة المأوى- إذ يغشى السدرة ما يغشى- ما زاغ البصر وما طغى- ولقد رأى من آيات ربه الكبرى-

[১০. আর অবশ্যই তিনি তাকে আরও একবার দেখেছিলেন—সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে। যার কাছে অবস্থিত জান্নাতুল মা’ওয়া (বসবাসের জান্নাত)। যখন বরই গাছটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যা আচ্ছন্ন করার ছিল। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রান্তও হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলীর মধ্যে বহু বড় বড় নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। (সুরা আন-নাজম: ১৩-১৮)]

শব্দার্থ ও তাহকীক (المفردات والتحقيق اللغوي):

শব্দ (الكلمة) আভিধানিক অর্থ ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও রূপতত্ত্ব (الصيغة والتحقيق)
نَزْلَةً أُخْرَى আরও একবার, দ্বিতীয় দফায় অবরোহণকালে نزلة হলো اسم مرة (একবার সংঘটিত হওয়া বুঝায়), منصوب على الظرفية المصدرية। دوسری بار।
سِدْرَةِ الْمُنتَهَى সিদরাতুল মুনতাহা, প্রান্তবর্তী কুলবৃক্ষ سدرة হলো কুল গাছ বা বরই গাছ, المنتهى হলো বাবে افتعال-এর اسم مكان (সর্বোচ্চ সীমানা)।
جَنَّةُ الْمَأْوَى জান্নাতুল মা’ওয়া, চিরস্থায়ী আশ্রয়ের উদ্যান اسم مكان، মূলধাতু أ-و-ي (আশ্রয় গ্রহণ করা)। মুত্তাকীদের আত্মাসমূহের স্থায়ী আবাসস্থল।
يَغْشَى আচ্ছন্ন করছিল, ঢেকে ফেলছিল فعل مضارع، বাবে سمع، মূলধাতু غ-ش-ي (ঢেকে ফেলা)।
مَا زَاغَ বক্র হয়নি, ডানে-বামে বিভ্রান্ত হয়নি فعل ماض منفي، বাবে ضرب، মূলধাতু ز-ي-غ (বক্র হওয়া)।
مَا طَغَى সীমালঙ্ঘন করেনি, দৃষ্টি অগ্রবর্তী হয়নি فعل ماض منفي، বাবে فتح، মূলধাতু ط-غ-ي (সীমা অতিক্রম করা)।

(الف) ما المراد بـ “سدرة المنتهى وجنة المأوى”؟ بين-

[(ক) ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ ও ‘জান্নাতুল মা’ওয়া’ দ্বারা কী উদ্দেশ্য? ব্যাখ্যা কর।]

উত্তর:

১. সিদরাতুল মুনতাহা (سدرة المنتهى)-এর পরিচয় ও নামকরণ:

  • স্বরূপ ও অবস্থান: সহীহ মুসলিমের রেওয়ায়েত অনুযায়ী সিদরাতুল মুনতাহা হলো ষষ্ঠ অথবা সপ্তম আসমানে অবস্থিত একটি বিশাল ও অভূতপূর্ব মহিমান্বিত কুলবৃক্ষ (বরই গাছ)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেন যে, এর ফলগুলো ছিল হাজার (ইয়েমেনের একটি স্থান)-এর বিশালাকার মটকার মতো এবং এর পাতাগুলো ছিল হাতির কানের মতো সুবিশাল।
  • ‘মুনতাহা’ (চরম সীমানা) নামকরণের তাৎপর্য: প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন: «إِلَيْهَا يَنْتَهِي مَا يُعْرَجُ بِهِ مِنَ الْأَرْضِ فَيُقْبَضُ مِنْهَا، وَإِلَيْهَا يَنْتَهِي مَا يُهْبَطُ بِهِ مِنْ فَوْقِهَا فَيُقْبَضُ مِنْهَا» অর্থাৎ পৃথিবী থেকে যা কিছু আসমানে উত্থিত হয় (আমল ও রূহসমূহ) তা এই সিদরাতুল মুনতাহায় এসে শেষ হয় এবং সেখান থেকেই তা গ্রহণ করা হয়। আবার ওপর থেকে আল্লাহর যে ফয়সালা ও নির্দেশাবলি অবতীর্ণ হয় তাও সিদরাতুল মুনতাহায় এসে শেষ হয় এবং সেখান থেকেই তা গ্রহণ করা হয়। কোনো ফিরিশতা বা সৃষ্টির এর চেয়ে ওপরে যাওয়ার অনুমতি নেই।
  • আচ্ছন্ন হওয়ার রূপ (إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى): রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, আল্লাহর নূরের তাজাল্লী এবং স্বর্ণের প্রজাপতির মতো অজস্র ফিরিশতা বৃক্ষটিকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে এর অভূতপূর্ব সৌন্দর্যের বর্ণনা সৃষ্টিজগতের কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

২. জান্নাতুল মা’ওয়া (جنة المأوى)-এর অর্থ ও মর্যাদা:

  • অর্থ ও রূপ: ‘মা’ওয়া’ (المأوى) শব্দের অর্থ আশ্রয়স্থল বা চিরস্থায়ী ঠিকানা। এটি সিদরাতুল মুনতাহার সন্নিকটে অবস্থিত জান্নাতের আটটি স্তরের অন্যতম একটি মহাসম্মানিত জান্নাত।
  • কার আবাসস্থল: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, এটি এমন জান্নাত যেখানে শহীদদের রূহসমূহ এবং মুত্তাকীদের আত্মাসমূহ অবস্থান করে। হাসান বসরী (রহ.) বলেন, কিয়ামতের পর মুমিনরা এই জান্নাতেই চিরস্থায়ী আশ্রয় গ্রহণ করবে।

(ب) اذكر الواقعة المتعلقة بهذه الآيات الكريمة باختصار-

[(খ) উক্ত পবিত্র আয়াতসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাটি সংক্ষেপে উল্লেখ কর।]

উত্তর:

১. মি’রাজের মহাসম্মিলন ও জিবরাঈল (আ.)-এর আসল রূপ দর্শন:
উক্ত সম্মানিত আয়াতসমূহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অলৌকিক মুজিযা ‘লাইলাতুল মি’রাজ’ (ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ)-এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট। মক্কার কুরাইশ কাফিররা নবীজী ﷺ-এর নবুওয়াত ও আসমানী ওহী প্রত্যক্ষ করার দাবিকে অস্বীকার করত। আল্লাহ তাআলা এই সুরায় কসম খেয়ে কাফিরদের অপবাদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন যে, মুহাম্মদ ﷺ নিজের মনগড়া কোনো কথা বলেন না, বরং তিনি যা বলেন তা ওহী এবং তিনি সত্য প্রত্যক্ষ করেছেন:

  • জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর নিজস্ব আকৃতিতে দ্বিতীয়বার দর্শন: মক্কার হেরা গুহায় ও বাত্বহায় নবুওয়াতের সূচনালগ্নে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমবার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে ছয়শত ডানাবিশিষ্ট আসমান-জমিনব্যাপী বিস্তৃত আসল ফিরিশতার আকৃতিতে দেখেছিলেন। আর মি’রাজের রাতে ঊর্ধ্বাকাশে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’র নিকটে তিনি জিবরাঈল (আ.)-কে দ্বিতীয়বারের মতো (نزلة أخرى) তাঁর আসল রূপ ও মহিমায় প্রত্যক্ষ করেন।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দৃষ্টির পরম শিষ্টাচার (مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى): ঊর্ধ্বজগতের কল্পনাতীত সৌন্দর্য ও ঐশী তাজাল্লীর মাঝেও মহানবী ﷺ-এর দৃষ্টি সামান্যতম ডানে-বামে বিভ্রান্ত হয়নি (ما زاغ) এবং যতটুকু দেখার অনুমতি ছিল তার চেয়ে এক বিন্দু পরিমাণও সীমা অতিক্রম করেনি (ما طغى)। এটি ছিল আল্লাহর দরবারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সর্বোচ্চ আদব ও নিখুঁত একনিষ্ঠতার এক অতুলনীয় প্রমাণ।
  • মহান নিদর্শনাবলি প্রত্যক্ষকরণ (رَأَىٰ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ): তিনি সেই রাতে জান্নাত, জাহান্নাম, কাওসার নদী, বায়তুল মা’মুর এবং মহান রব্বুল আলামীনের রুবূবিয়াতের মহিমান্বিত কুদরত স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

২. আল্লাহ তাআলাকে স্বচক্ষে দর্শন বিষয়ে সাহাবায়ে কিরামের পর্যালোচনা:
আয়াতে বর্ণিত দর্শনের ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে দুটি অভিমত রয়েছে: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা ও ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মতে, এখানে জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর আসল আকৃতিতে দেখার কথা বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে সাইয়্যিদুনা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ মি’রাজের রাতে স্বীয় অন্তর্দৃষ্টি বা চর্মচক্ষু দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ তাআলার বিশেষ তাজাল্লী ও দীদার প্রত্যক্ষ করেছিলেন। জমহুর উলামায়ে কিরাম উভয় মতের সমন্বয় করে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ জিবরাঈল (আ.)-কেও স্বরূপে দেখেছিলেন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার বিশেষ সান্নিধ্য ও প্রত্যক্ষ নূরানী তাজাল্লী লাভের অনন্য মর্যাদাও অর্জন করেছিলেন।


مجموعة (ب) / (খ) বিভাগ : উলূমুল কুরআন ও তাফসীর বিষয়ক রচনামূলক প্রশ্ন

الدرجات — ১০ × ১ = ১০
(أجب عن سؤال واحد فقط)
[যে কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও]


١١- اكتب نبذة من حياة العلامة القاضى ناصر الدين البيضاوى- ثم بين مزايا تفسيره البيضاوى-

[১১. আল্লামা কাযী নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখ। অতঃপর তাঁর বিখ্যাত তাফসীর ‘তাফসীরে বায়যাবী’-এর বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্বসমূহ বর্ণনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
সপ্তম হিজরী শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুতাকাল্লিম, উসূলবিদ ও শাফেয়ী ফকীহ হলেন আল্লামা কাযী নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী (রহ.)। কুরআনুল কারীমের সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরতম সাহিত্যিক ও তাত্ত্বিক তাফসীর রচনায় তাঁর রচিত অমর গ্রন্থ ‘আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল’ (যা সর্বসাধারণ্যে ‘তাফসীরে বায়যাবী’ নামে খ্যাত) মুসলিম বিশ্বে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে আসছে।

১. আল্লামা কাযী নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী (ترجمة حياة العلامة البيضاوي):

  • নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর পূর্ণ নাম হলো আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী আবুল খায়ের নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী আশ-শিরাযী আশ-শাফেয়ী (عبد الله بن عمر بن محمد بن علي، أبو الخير، ناصر الدين البيضاوي)।
  • জন্ম ও জন্মস্থান: তিনি বর্তমান ইরানের ফার্স প্রদেশের রাজধানী শিরাজের নিকটবর্তী ‘বায়দা’ (البيضاء) নামক মনোরম জনপদে জন্মগ্রহণ করেন। বায়দা শহরের দিকে সম্বন্ধ করে তাঁকে ‘আল-বায়যাবী’ বলা হয়। তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তিনি সপ্তম হিজরীর প্রথমভাগে জন্মগ্রহণ করেন।
  • পারিবারিক ও শিক্ষাজীবন: তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও বিদ্বান পরিবারে লালিত-পালিত হন। তাঁর পিতা উমর ইবনে মুহাম্মদ ছিলেন তৎকালীন ফার্স অঞ্চলের প্রধান বিচারপতি (কাযিউল কুযাত)। বায়যাবী (রহ.) স্বীয় পিতা ও সমকালীন শ্রেষ্ঠ আলিমগণের নিকট কুরআন, তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, বালাগাত ও ইলমুল কালামের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
  • বিচারপতি পদে দায়িত্ব পালন: পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি দীর্ঘকাল ফার্স ও শিরাজ অঞ্চলের প্রধান বিচারপতি (قاضي القضاة) হিসেবে সততা ও সুনামের সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। এ কারণে তাঁর নামের সাথে ‘আল-কাযী’ (القاضي) পদবিটি স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
  • ইন্তেকাল: জীবনের শেষভাগে তিনি বিচার বিভাগ থেকে অবসর নিয়ে ইরানের তাবরিজ নগরীতে জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন। তিনি হিজরী ৬৮৫ মতান্তরে ৬৯১ হিজরীতে (১২৯১ খ্রিষ্টাব্দে) তাবরিজেই ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই সমাহিত হন।

২. আল্লামা বায়যাবীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী:
তিনি ইসলামী জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় কালজয়ী কিতাব রচনা করেছেন:

  1. তাফসীর শাস্ত্রে: «أنوار التنزيل وأسرار التأويل» (তাফসীরে বায়যাবী)।
  2. উসুলুল ফিকহ শাস্ত্রে: «منهاج الوصول إلى علم الأصول» (বিশ্বের অধিকাংশ মাদ্রাসায় উসুলের পাঠ্যবই)।
  3. ইলমুল কালাম বা আক্বীদা শাস্ত্রে: «طوالع الأنوار من مطالع الأنظار»
  4. ফিকহ শাস্ত্রে: «غاية القصوى في دراية الفتوى» (শাফেয়ী ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ)।
  5. হাদীস শাস্ত্রে: «تحفة الأبرار شرح مصابيح السنة» (ইমাম বাগাভীর মাসাবীহুস সুন্নাহর সুপ্রসিদ্ধ শারহ)।

৩. তাফসীরে বায়যাবীর অনন্য বৈশিষ্ট্য ও বিশেষত্বসমূহ (مزايا تفسير البيضاوي):

বৈশিষ্ট্য (المزية) বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
১. অলৌকিক সংক্ষেপণ ও গভীরতা
(الإيجاز البديع)
তাফসীরে বায়যাবীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি ‘সহল ও মুমতায’—অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত শব্দে গভীর ও সুবিশাল অর্থ ব্যক্ত করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘ বাক্যালাপ বর্জন করে বিন্দুতে সিন্ধুর মতো কুরআনের আসল উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন।
২. কাশশাফের বিশুদ্ধিকরণ ও পরিশুদ্ধ রূপ আল্লামা যামাখশারীর ‘আল-কাশশাফ’ আরবি ভাষা ও বালাগাতের জন্য শ্রেষ্ঠ হলেও তাতে মু’তাযিলা মতবাদের ভ্রান্ত আক্বীদা ছিল। আল্লামা বায়যাবী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাশশাফের সেই অনন্য বালাগাত ও সাহিত্যের সৌন্দর্য গ্রহণ করেছেন, কিন্তু মু’তাযিলা মতবাদ বর্জন করে খাঁটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের (আশআরী) আক্বীদা দ্বারা তা পরিশুদ্ধ করেছেন।
৩. রাযীর তাফসীরের সারসংক্ষেপ ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযীর ৩২ খণ্ডের সুবিশাল ‘তাফসীরে কাবীর’ (মাফাতিহুল গায়েব)-এর দার্শনিক, যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্ম তত্ত্বগুলোকে আল্লামা বায়যাবী চমৎকারভাবে সংক্ষেপ করে স্বীয় তাফসীরে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
৪. আরবি ব্যাকরণ ও অলঙ্কারশাস্ত্রের চমৎকার প্রয়োগ কুরআনুল কারীমের প্রতিটি জটিল আয়াতের ইরাব (إعراب), বালাগাত, মায়ানী ও বায়ান তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিশ্লেষণ করেছেন, যা শিক্ষার্থী ও আলিমদের ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রাখে।
৫. কিরাআতের প্রামাণ্য বর্ণনা তিনি প্রতিটি আয়াতে সাব’আ ও আশারাহ মুতাওয়াতির কিরাআতের ভিন্নতা এবং তার ফলে অর্থের যে সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তা গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন।
৬. শাফেয়ী ফিকহের মাসায়েল প্রণয়ন আহকাম সংক্রান্ত আয়াতগুলোতে তিনি শাফেয়ী মাযহাবের প্রমাণাদি পেশ করার পাশাপাশি অন্যান্য মাযহাবের যুক্তিও ইনসাফের সাথে উপস্থাপন করেছেন।

৪. ইসলামী বিশ্বে তাফসীরে বায়যাবীর গ্রহণযোগ্যতা:
আল্লামা বায়যাবীর তাফসীর এত জনপ্রিয় ও তাত্ত্বিক ছিল যে, মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতগণ এর ওপর ২৫০টিরও বেশি ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও টীকা (حاشية) রচনা করেছেন। যার মধ্যে খাফাজী রচিত ‘ইনায়াতুল কাযী’ এবং শায়খযাদাহ রচিত ‘হাশিয়াতু শায়খযাদাহ’ বিশ্বখ্যাত। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও দরসে নেজামী পাঠ্যক্রমে এটি অন্যতম প্রধান প্রামাণ্য তাফসীর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।


١٢- اكتب ترجمة الإمام البغوى مع خصائص تفسيره-

[১২. ইমাম বাগাভী (রহ.)-এর জীবনচরিত লিখ এবং তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।]

উত্তর:

ভূমিকা:
পঞ্চম ও ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, ফকীহ এবং তাফসীর শাস্ত্রের অনন্য পুরোধা ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন ইবনে মাসউদ আল-বাগাভী (রহ.)। সুন্নাহর পুনরুজ্জীবনে তাঁর অসামান্য অবদানের কারণে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ তাঁকে একবাক্যে “মুহয়িউস সুন্নাহ” (محيي السنة – সুন্নাহর পুনরুজ্জীবনকারী) এবং “রুকনুদ্দীন” (ركن الدين – দ্বীনের স্তম্ভ) উপাধিতে ভূষিত করেছে।

১. ইমাম বাগাভীর জীবনচরিত (ترجمة الإمام البغوي):

  • নাম ও পরিচয়: তাঁর মূল নাম আল-হুসাইন, পিতার নাম মাসউদ। কুনিয়াত (উপনাম) আবু মুহাম্মদ এবং লকব ‘মুহয়িউস সুন্নাহ’। তাঁর পূর্ণ বংশপরিক্রমা: আল-হুসাইন ইবনে মাসউদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আল-ফাররা আল-বাগাভী আশ-শাফেয়ী (الحسين بن مسعود بن محمد بن الفراء البغوي الشافعي)। পশমের পোশাক প্রস্তুতের পারিবারিক কাজের কারণে তাঁকে ‘ইবনুল ফাররা’ও বলা হতো।
  • জন্ম ও জন্মস্থান: তিনি খোরাসানের হেরাত ও মার্ভের মধ্যবর্তী ‘বাগ’ বা ‘বাঘাশূর’ (بغشور) নামক শহরে আনুমানিক ৪৩৩ কিংবা ৪৩৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ শহরের নামানুসারে তিনি ‘আল-বাগাভী’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
  • শিক্ষার্জন ও উস্তাদবৃন্দ: বাল্যকালেই তিনি কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং খোরাসানের শ্রেষ্ঠ আলিমদের নিকট ইলমে হাদীস ও ফিকহের উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর প্রধান উস্তাদ ছিলেন তৎকালীন শাফেয়ী মাযহাবের প্রধান ফকীহ কাযী হুসাইন ইবনে মুহাম্মদ আল-মারওয়াযী (রহ.)। এছাড়া তিনি আবু ওমর আল-মালীহী এবং আব্দুর রহমান আদ-দাউদী (রহ.)-এর মতো হাদিসবিশারদদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন।
  • যাহেদ ও পরহেযগার জীবন: ইমাম বাগাভী (রহ.) কেবল তত্ত্বজ্ঞানী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন আল্লাহভীরু কামেল ওলী। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। তিনি প্রায় সবসময় জয়তুনের তেল দিয়ে শুকনো রুটি আহার করতেন। জীবনে কখনো নাম-যশ বা পার্থিব পদের লোভ করেননি।
  • ইন্তেকাল: তিনি সুদীর্ঘ বরকতময় জীবন অতিবাহিত করে ৫১৬ হিজরীতে (১১২২ খ্রিষ্টাব্দে) মার্ভরূয (مرو الروذ) শহরে ৮০ বছরের অধিক বয়সে ইন্তেকাল করেন এবং স্বীয় উস্তাদ কাযী হুসাইন (রহ.)-এর সমাধির পাশে সমাহিত হন।

২. ইমাম বাগাভীর বিখ্যাত গ্রন্থাবলী:

  1. তাফসীর শাস্ত্রে: «معالم التنزيل في تفسير القرآن» (তাফসীরে বাগাভী)।
  2. হাদীস শাস্ত্রে: «شرح السنة» (হাদীস ও ফিকহের এক কালজয়ী বিশ্বকোষ) এবং «مصابيح السنة» (যা পরবর্তীকালে ওয়ালীউদ্দীন তাবরীযী কর্তৃক ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ হিসেবে পরিমার্জিত হয়)।
  3. ফিকহ শাস্ত্রে: «التهذيب في فقه الإمام الشافعي» (শাফেয়ী ফিকহের অতি চমৎকার গ্রন্থ)।

৩. তাফসীরে বাগাভী (মা’আলিমুত তানযীল)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص التفسير):
ইমাম বাগাভীর তাফসীর গ্রন্থটি ‘তাফসীর বিল মা’ছুর’ (হাদীস ও আছারের ভিত্তিতে কুরআন ব্যাখ্যা)-এর অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য গ্রন্থ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নে বিবৃত হলো:

বৈশিষ্ট্য (الخصيصة) তাফসীর পদ্ধতির বিশ্লেষণ ও গুরুত্ব
১. তাফসীর বিল মা’ছুরের বিশুদ্ধতম নমুনা তিনি আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রথমে কুরআনের অন্য আয়াত, অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ হাদীস এবং সাহাবা ও তাবেয়ীনের নির্ভরযোগ্য আসার ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেছেন।
২. ভারসাম্যপূর্ণ মাঝারি কলেবর
(تفسير متوسط)
এটি তাফসীরে তাবারীর মতো অতি বিশদ বা দীর্ঘ নয়, আবার একেবারে অতি সংক্ষিপ্তও নয়; বরং শিক্ষার্থী ও গবেষক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত সুষম ও পাঠযোগ্য।
৩. বিদ’আত ও ভ্রান্ত দলগুলোর প্রভাবমুক্ত তাফসীরটিতে মু’তাযিলা, জাহমিয়্যা বা কোনো বিভ্রান্ত দলের দর্শনের লেশমাত্র নেই। এটি পুরোপুরি সালাফে সালেহীন ও সুন্নাহর অনুসারীদের বিশুদ্ধ আক্বীদার ওপর রচিত।
৪. জাল হাদীস ও ইসরাঈলিয়্যাত বর্জনের সতর্কতা পূর্ববর্তী বহু মুফাসসির যেখানে যাচাই ছাড়া দুর্বল কিসসা-কাহিনী উল্লেখ করেছেন, ইমাম বাগাভী সেখানে হাদীসের মান যাচাই করেছেন এবং অপ্রয়োজনীয় ও ভ্রান্ত ইসরাঈলী বর্ণনা বর্জন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। কোনো রেওয়ায়েত আনলে তার দুর্বলতা স্পষ্ট করেছেন।
৫. শব্দার্থ ও সহজবোধ্য ফিকহী আলোচনা আরবি ভাষার জটিল শব্দগুলোর প্রাঞ্জল অর্থ প্রদান করেছেন এবং আয়াত সংশ্লিষ্ট ফিকহী মাসআলাগুলো চার মাযহাবের দলিলসহ সরল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।
৬. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যার অনন্য প্রশংসাপত্র ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) তাঁর ‘মুকাদ্দিমা ফী উসূলিত তাফসীর’ গ্রন্থে লিখেছেন: “যখন আমাকে আল-যামাখশারী, আল-কুরতুবী এবং আল-বাগাভীর তাফসীর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি বললাম—বাগাভীর তাফসীরটিই সবচেয়ে নিরাপদ, বিদ’আত ও বানোয়াট হাদিস থেকে সর্বাধিক মুক্ত এবং সুন্নাহর সবচেয়ে কাছাকাছি।”

প্রশ্নপত্রের বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনা ও শিক্ষণীয় দিক

প্রশ্ন নং সুরা ও আয়াতাংশ মূল প্রতিপাদ্য বিষয় আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা
সুরা আল-ফাতিহা (৬-৭) হিদায়াতের স্তরভেদ ও সিরাতে মুস্তাকীমের সন্ধান প্রতিটি সালাতে আল্লাহর কাছে সত্যের অবিচলতা ও হিদায়াত প্রার্থনা।
সুরা আল-বাকারাহ (১১-১২) মুনাফিকদের মিথ্যা শান্তির দাবি ও ফাসাদের রূপ সংস্কারের নামে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা চরম আত্মপ্রবঞ্চনা।
সুরা আল-বাকারাহ (১৫-১৬) আল্লাহর ইস্তিহযা ও হিদায়াতের বিনিময়ে পথভ্রষ্টতা কেনা কপটতার পরিণাম চরম লাঞ্ছনা ও আখেরাতের চিরস্থায়ী দেউলিয়াত্ব।
সুরা আল-বাকারাহ (১৭-১৮) আগুন প্রজ্বলনকারীর চমৎকার বালাগাতী তাশবীহ সত্য উপলব্ধির চোখ, কান ও জিহ্বা বন্ধ রাখলে অন্ধত্ব অনিবার্য।
সুরা আল-ইসরা (২-৩) বনী ইসরাঈলের প্রতি তাওহীদের আদেশ ও নূহ (আ.)-এর শুকরিয়া সব অবস্থায় আল্লাহর শোকর আদায় করা এবং শিরক থেকে মুক্ত থাকা।
সুরা আল-ইসরা (৪-৫) বনী ইসরাঈলের দুইবারের ফাসাদ ও ঐশী শাস্তি অহংকার ও নবী হত্যার কারণে পরাশক্তির মাধ্যমে জাতীয় অবক্ষয় ঘটে।
সুরা আল-হুজুরাত (৬) ফাসিকের সংবাদের সত্যতা যাচাই ও সাক্ষ্যের বিধান গুজব প্রতিরোধ, তদন্ত ছাড়া পদক্ষেপ বর্জন ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা।
সুরা আল-হুজুরাত (১১) উপহাস, খুঁত ধরা ও মন্দ উপাধিতে ডাকার নিষেধাজ্ঞা মানবাধিকার সংরক্ষণ, পারস্পরিক সম্মান ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা।
সুরা আল-হুজুরাত (১৩) মানবজাতির সমতা ও তাকওয়ার মাপকাঠি বর্ণবাদ, বর্ণবৈষম্য ও বংশীয় অহংকার বিলোপ করে তাকওয়া অর্জন।
১০ সুরা আন-নাজম (১৩-১৮) সিদরাতুল মুনতাহা, মি’রাজ ও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দৃষ্টির আদব নবুওয়াতের সত্যতা ও আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ মারিফত প্রত্যক্ষকরণ।
১১-১২ উলূমুল কুরআন ও রিজাল আল্লামা বায়যাবী ও ইমাম বাগাভীর জীবন ও তাফসীর কর্ম তাফসীর শাস্ত্রের বালাগাতী ও আসারি ধারার গভীর জ্ঞান ও পদ্ধতি অনুধাবন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের ‘দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম’ বিষয়ের মানবণ্টন কেমন?

উক্ত বিষয়ে মোট পূর্ণমান ১০০। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার পূর্ণমান ৮০ এবং ইনকোর্স/মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ২০ নম্বর। লিখিত পরীক্ষায় ‘ক’ বিভাগে ১০টি ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন থেকে ৫টি (১৪ × ৫ = ৭০ নম্বর) এবং ‘খ’ বিভাগে ২টি তাফসীরশাস্ত্রীয় বড় প্রশ্ন থেকে ১টি (১০ × ১ = ১০ নম্বর) উত্তর করতে হয়।

২. কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যামূলক উত্তরে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার উপায় কী?

প্রতিটি আয়াতের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রদান করে শব্দগুলোর মূলধাতু (মাদ্দাহ), বাবের রূপতত্ত্ব ও আভিধানিক অর্থ সম্বলিত একটি ছক তৈরি করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তরে শানে নুযুল, মুফাসসিরিনের প্রামাণ্য উক্তি এবং বালাগাতী অলঙ্কার উপস্থাপন করলে সর্বোচ্চ নম্বর নিশ্চিত হয়।

৩. ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ সম্পর্কে মুফাসসিরগণের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত কী?

সাহাবা ও মুফাসসিরগণের বিভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; মূলত আল-কুরআন, ইসলাম ধর্ম, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত এবং আহলুস সুন্নাহর মধ্যমপন্থাই হলো সিরাতে মুস্তাকীম।

৪. আধুনিক সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতের প্রাসঙ্গিকতা কী?

সুরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াত হলো বৈশ্বিক তথ্য যাচাই নীতি (Fact-checking Policy)-এর ঐশী মূলভিত্তি। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভাইরাল খবর বা স্বার্থান্বেষী মহলের তথ্য বিশ্বাস করে কারো প্রতি অবিচার করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৫. তাফসীরে বায়যাবী ও তাফসীরে বাগাভীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

তাফসীরে বায়যাবী মূলত বালাগাত, ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ ও কালামী যুক্তিনির্ভর সংক্ষিপ্ত সংকলন (তাফসীর বির-রায় আল-মাহমুদ)। অপরপক্ষে তাফসীরে বাগাভী হলো হাদীস, সাহাবায়ে কিরামের আসার ও বিশুদ্ধ বর্ণনানির্ভর সুন্নাহভিত্তিক সংকলন (তাফসীর বিল-মা’ছুর)।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন