জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতুল হাদীস – ৩ (Dirasatul Hadith – 3) – 202409, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
১৪৬ মিনিট পড়ার সময়
১২ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: ২০৪ | প্রশ্নপত্র কোড: ১৬৪
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث-۳
[দিরাসাতুল হাদিস-৩]
বিষয় কোড: ২০২৪০৯ (202409)
الوقت — ٤ ساعات [সময় — ৪ ঘণ্টা] | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
[الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (الف) وعن اثنين من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج) وعن اثنين من مجموعة (د) — والاعداد بالهامش تدل على الدرجات الكاملة—]
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রত্যেক বিভাগ থেকে ২টি করে মোট ৮টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তবে পরীক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও সর্বোচ্চ একাডেমিক ফলাফলের সুবিধার্থে এখানে সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য ও বিস্তৃত সমাধান সংযোজন করা হলো।]


مجموعة (الف) — مصنف عبد الرزاق

(ترجم الأحاديث الآتية ثم أجب عن الاسئلة الملحقة بها)

١- عن عمر بن الخطاب (رض) بينما هو قائم يخطب يوم الجمعة فدخل رجل من أصحاب النبى صلى الله عليه وسلم فناداه عمر اية ساعة هذه؟ فقال : إنى شغلت اليوم فلم انقلب الى اهلى حتى سمعت النداء فلم ازد على ان توضأت، فقال عمر : الوضوء ايضا، وقد علمت ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يأمر بالغسل- [الدرجات: ٦]

[১. উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি জুমার দিন দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি (হযরত উসমান ইবনে আফফান রা.) মসজিদে প্রবেশ করলেন। উমর (রা.) তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডেকে বললেন, “এটা কোন্ সময়?” তিনি উত্তরে বললেন, “আজ আমি সাংসারিক ও ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত ছিলাম, ফলে আযানের ধ্বনি শোনার পূর্ব পর্যন্ত আমি পরিবারের কাছে ফিরতেই পারিনি। অতঃপর আমি কেবল ওজু করার অতিরিক্ত আর কিছুই করতে পারিনি (গোসল করতে পারিনি)।” তখন উমর (রা.) বললেন, “(গোসল ত্যাগ করে) কেবল ওজুও করলেন? অথচ আপনি নিশ্চিতভাবেই জানেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন গোসল করার কঠোর নির্দেশ দিতেন!”]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

হাদিসটির সঠিক অনুধাবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর ধাতুগত রূপান্তর, ব্যাকরণিক বিন্যাস ও অর্থ নিম্নের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:

আরবি শব্দ (مفردات) মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ অর্থ ও তাহকিক
بَيْنَمَا ظرف زمان (সময়জ্ঞাপক অব্যয়) এমতাবস্থায়, এমন সময়, যখন। মূলত ‘বাইনা’ (بين)-এর সাথে ‘মা’ যায়েদা যুক্ত হয়েছে।
قَائِمٌ اسم فاعل، باب نصر (ق-و-م) দণ্ডায়মান অবস্থায়, দাঁড়িয়ে। জুমার খুতবা দাঁড়িয়ে দেওয়া সুন্নাত।
يَخْطُبُ فعل مضارع معروف، باب نصر (خ-ط-ب) তিনি খুতবা দিচ্ছিলেন বা ভাষণ দান করছিলেন।
رَجُلٌ مِّنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ مركب توصيفي নবী ﷺ-এর সাহাবিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি; বুখারী ও মুসলিমের স্পষ্ট রেওয়ায়েত অনুযায়ী তিনি ছিলেন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)।
فَنَادَاهُ فعل ماض، باب مفاعلة (ن-د-و) উমর (রা.) তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকলেন বা সম্বোধন করলেন।
أَيَّةُ سَاعَةٍ هٰذِهِ؟ جملة استفهامية للتوبيخ والتنبيه এটা কোন্ সময়? অর্থাৎ জুমার এত দেরিতে উপস্থিত হওয়ার সময় কি এটা? এটি সতর্কীকরণমূলক প্রশ্ন।
شُغِلْتُ فعل ماض مجهول، باب فعل (ش-غ-ل) আমি ব্যস্ত ছিলাম বা কাজে ব্যাপৃত ছিলাম।
فَلَمْ أَنْقَلِبْ فعل مضارع مجزوم بـ لم، باب انفعال (ق-ل-ب) আমি প্রত্যাবর্তন করতে পারিনি, ফিরে যেতে পারিনি।
النِّدَاءُ مصدر، باب مفاعلة (ن-د-و) আযান, আহ্বান; এখানে জুমার দ্বিতীয় আযান উদ্দেশ্য যার মাধ্যমে খুতবা শুরু হয়।
فَلَمْ أَزِدْ فعل مضارع مجزوم بـ لم، باب نصر (ز-ي-د) আমি অতিরিক্ত কিছুই করতে পারিনি।
تَوَضَّأْتُ فعل ماض، باب تفعل (و-ض-أ) আমি ওজু সম্পন্ন করেছি।
الْوُضُوءَ أَيْضًا؟ منصوب على المفعول به لفعل محذوف (গোসল ছেড়ে দিয়ে) শুধু ওজুই করলেন? অর্থাৎ «أتقتصر على الوضوء أيضا ولا تغتسل؟»
يَأْمُرُ بِالْغُسْلِ جملة فعلية গোসল করার আদেশ দিতেন বা তাকিদ করতেন।

খ. হাদিসের প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা (সববে উরূদ)

আলোচ্য হাদিসটি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বাস্তব ঘটনাকে তুলে ধরে। জুমার দিন হযরত উমর (রা.) মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তৃতীয় খলিফা ও নবীজি ﷺ-এর অন্যতম প্রধান সাহাবি হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) মসজিদে প্রবেশ করেন। উমর (রা.) মিম্বর থেকেই তাকে দেরিতে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করেন এবং ওজু করার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে গোসলের সুন্নাতটি স্মরণ করিয়ে দেন।

এ ঘটনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট হয় যে, সাহাবায়ে কেরামের সমাজ ছিল জবাবদিহিতা ও সুন্নাতের নিখুঁত অনুশীলনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। খলিফাতুল মুসলিমীন খুতবার মতো সংবেদনশীল ও গম্ভীর মুহূর্তেও একজন শীর্ষস্থানীয় সাহাবিকে সতর্ক করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি এবং হযরত উসমান (রা.) অত্যন্ত বিনম্রতার সাথে নিজের ওজর পেশ করেছেন।

গ. হাদিস থেকে উদ্ভূত ফিকহি ও দাওয়াতি শিক্ষণীয় বিষয়

  1. খুতবার সময় প্রয়োজনে খতিবের কথা বলা: খুতবা চলাকালে সাধারণ মুসল্লিদের জন্য নিরব থাকা ওয়াজিব হলেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি বা সতর্কতামূলক প্রয়োজনে খতিব কোনো মুসল্লিকে সম্বোধন করে কথা বলতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট মুসল্লি তার সংক্ষিপ্ত জবাব দিতে পারেন।
  2. জুমার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ: জুমার আযানের পূর্বেই পার্থিব কাজকর্ম গুটিয়ে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া প্রতিটি মুমিনের আবশ্যিক দায়িত্ব।
  3. সুন্নাতের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের গুরুত্বারোপ: জুমার দিনের গোসল কেবল সাধারণ পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং এটি নবীজি ﷺ-এর একটি মুয়াক্কাদাহ সুন্নাত, যা ছুটে গেলে সাহাবায়ে কেরাম অনুতপ্ত হতেন।

(الف) بين حكم الغسل يوم الجمعة- [الدرجات: ٤]

[(ক) জুমার দিন গোসল করার বিধান বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর।]

ভূমিকা: জুমার দিন গোসল করা ইসলামের একটি অত্যন্ত মহিমান্বিত ও তাকীদপূর্ণ আমল। জুমার দিনে বিপুল সংখ্যক মুসল্লির একত্র সমাবেশ ঘটে বিধায় শরীর পরিচ্ছন্ন রাখা ও দুর্গন্ধমুক্ত থাকার বিশেষ বিধান ইসলামে দেওয়া হয়েছে। তবে এই গোসল ফরজ/ওয়াজিব নাকি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ—এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে বিস্তারিত মতবিনিময় রয়েছে।

১. ফুকাহায়ে কেরামের মাযহাবভিত্তিক মতামত

জুমার দিনের গোসলের শারঈ হুকুম নিয়ে মুজতাহিদ ইমামগণের মাঝে মূলত দুটি প্রধান অভিমত পরিলক্ষিত হয়:

মাযহাব / দল গোসলের বিধান (حكم الغسل) মূল দৃষ্টিভঙ্গি
জুমহুর ফুকাহায়ে কেরাম
(হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি মাযহাবের অধিকাংশ)
সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ / মুস্তাহাব জুমার গোসল ওয়াজিব বা ফরজ নয়; বরং এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সুন্নাত। গোসল না করে শুধু ওজু করলেও জুমার নামাজ পূর্ণ সহীহ হবে।
যাহেরী মাযহাব ও আহলে হাদিস
(ইমাম দাউদ যাহেরী, ইবনে হাযম ও সালাফদের কতিপয়)
ওয়াজিব (واجب) প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের জন্য জুমার গোসল করা ওয়াজিব; সক্ষম ব্যক্তি বিনা ওজরে গোসল না করলে গুনাহগার হবে।
ইমাম হাসান বসরী ও ইবনুল মুবারক অবস্থাগত শর্তসাপেক্ষ ওয়াজিব শরীরে ঘাম বা দুর্গন্ধ থাকলে গোসল ওয়াজিব, অন্যথায় সুন্নাত বা মুস্তাহাব।

২. উভয় পক্ষের দলীলসমূহের তুলনামূলক পর্যালোচনা

ক. জাহেরীগণের দলীল (ওয়াজিবের পক্ষে):

  1. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    «غُسْلُ يَوْمِ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ»

    “প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য জুমার দিনে গোসল করা ওয়াজিব।” (সহীহ বুখারী: ৮৭৯, সহীহ মুসলিম: ৮৪৬)

  2. হযরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত অপর রেওয়ায়েতে এসেছে:

    «غُسْلُ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ، وَالسِّوَاكُ، وَأَنْ يَمَسَّ مِنْ طِيبٍ مَا قَدَرَ عَلَيْهِ»

    “জুমার গোসল, মিসওয়াক করা এবং সুগন্ধি থাকলে তা স্পর্শ করা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্কের ওপর ওয়াজিব।” (সুনানে নাসাঈ: ১৩৭৪)

খ. জুমহুর ফুকাহায়ে কেরামের দলীল (সুন্নাত হওয়ার পক্ষে):

  1. হযরত সামুরা বিন জুনদুব (রা.)-এর দ্ব্যর্থহীন হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    «مَنْ تَوَضَّأَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَبِهَا وَنِعْمَتْ، وَمَنِ اغْتَسَلَ فَالْغُسْلُ أَفْضَلُ»

    “যে ব্যক্তি জুমার দিন ওজু করল, তা উত্তম কাজ করল। আর যে ব্যক্তি গোসল করল, গোসলই সর্বোত্তম।” (জামে তিরমিযী: ৪৯৭, সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৪; হাদিসটি হাসান ও গ্রহণযোগ্য)। এই হাদিসে ওজুকে জায়েয ও সুন্দর বলা হয়েছে এবং গোসলকে ‘সর্বোত্তম’ বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করে গোসল ওয়াজিব নয় বরং সুন্নাত।

  2. হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা: সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন: মদিনার উপকণ্ঠ থেকে সাহাবায়ে কেরাম পায়ে হেঁটে ভারী পশমি কাপড় পরে জুমার নামাজে আসতেন। তীব্র গরমে তাদের শরীর থেকে ঘাম ঝরত এবং গন্ধ বের হতো। তখন নবীজি ﷺ বললেন: “যদি তোমরা আজকের এই দিনে গোসল করে আসতে তবে কতই না ভালো হতো!” (সহীহ বুখারী: ৯০২)। এটি নির্দেশ করে যে তৎকালীন প্রেক্ষাপটে পরিচ্ছন্নতার তাগিদে এ আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
  3. সাহাবায়ে কেরামের আমল ও ইজমায়ে সুকূতি: আলোচ্য হাদিসে হযরত উমর (রা.) হযরত উসমান (রা.)-কে গোসল না করে শুধু ওজু করে আসার কারণে সতর্ক করেছেন ঠিকই, কিন্তু খুতবা বন্ধ করে তাকে বাড়ি ফিরে গিয়ে গোসল করে আসতে বাধ্য করেননি এবং তাঁর নামাজও বাতিল গণ্য করেননি। উপস্থিত সমগ্র সাহাবায়ে কেরামের কেউই তাকে গোসল করতে ফিরে যেতে বলেননি। এটি সর্বসম্মতভাবে প্রমাণ করে যে জুমার গোসল ফরজ বা ওয়াজিব নয়, বরং সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।

৩. মতভেদের সমন্বয় ও বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত

মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কেরাম ব্যাখ্যা করেছেন যে, সহীহ বুখারীর হাদিসে উল্লেখিত «واجب» শব্দটি শরীয়তের পরিভাষাগত ‘ওয়াজিব’ (যা পরিত্যাগ করলে শাস্তি অবধারিত) অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং আরবি ভাষার প্রয়োগরীতি অনুযায়ী এর অর্থ «متأكد جدا» বা “অত্যন্ত তাকীদপূর্ণ সুন্নাত ও নৈতিক দায়িত্ব”। যেমন মানুষ বলে থাকে ‘তোমার ঋণ শোধ করা আমার ওপর ওয়াজিব’ বা ‘মেহমানের খাতির করা ওয়াজিব’। অতএব, জুমহুরের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ও সর্বসম্মত: জুমার দিনের গোসল সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ, যা আদায় করলে অশেষ সাওয়াব মিলবে, তবে ওজরের কারণে গোসল করতে না পারলে ওজু দ্বারা জুমার নামাজ কোনো প্রকার ত্রুটি ছাড়াই সম্পূর্ণ আদায় হয়ে যাবে।


٢- عن معمر ، عن قتادة ، أن ابن مسعود كان يصلى قبل الجمعة اربع ركعات، وبعدها اربع ركعات— قال: ابو إسحاق: وكان على يصلى بعد الجمعة ست ركعات، وبه يأخذ عبد الرزاق— [الدرجات: ٦]

[২. মা’মার থেকে বর্ণিত, তিনি কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) জুমার পূর্বে চার রাকাত এবং জুমার পরে চার রাকাত নামাজ আদায় করতেন। আবু ইসহাক বলেন: আর আলী (রা.) জুমার পরে ছয় রাকাত নামাজ আদায় করতেন; এবং ইমাম আব্দুর রাজ্জাক এটিই গ্রহণ করেছেন (অর্থাৎ এই আমলকেই প্রাধান্য দিয়েছেন)।]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

আরবি শব্দ মূলধাতু ও ব্যাকরণ অর্থ ও তাহকিক
مَعْمَرٌ اسم علم (معمر بن راشد الأزدي) মা’মার বিন রশিদ; বসরা ও ইয়েমেনের বিখ্যাত ইমাম ও মুহাদ্দিস (মৃত্যু: ১৫৩ হিজরি)।
قَتَادَةُ قتادة بن دعامة السدوسي বিখ্যাত তাবেয়ী ও মুফাসসির, জ্ঞান ও মুখস্থশক্তিতে অনন্য (মৃত্যু: ১১৮ হিজরি)।
ابْنُ مَسْعُودٍ عبد الله بن مسعود الهذلي (رض) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রখ্যাত ফকীহ সাহাবি, কুফা মাদ্রাসার মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী।
قَبْلَ الْجُمُعَةِ ظرف زمان مضاف জুমার জমার নামাজের পূর্বে; অর্থাৎ জুমার মূল দুই রাকাতের পূর্বে চার রাকাত সুন্নাত।
بَعْدَهَا ظرف زمان مضاف إلى ضمير الجمعة জুমার মূল নামাজের পরে; অর্থাৎ সুন্নাতে বা’দাল জুমা।
أَبُو إِسْحَاقَ عمرو بن عبد الله السبيعي الكوفي আবু ইসহাক আস-সাবীঈ; কুফার বিখ্যাত তাবেয়ী ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস।
عَلِيٌّ (رض) علي بن أبي طالب أمير المؤمنين ইসলামের চতুর্থ খলিফা, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা।
سِتَّ رَكَعَاتٍ عدد ومعدود (ست ركعات) ছয় রাকাত নামাজ; জুমার পরে প্রথমে চার রাকাত এবং পরে দুই রাকাত আদায় করার পদ্ধতি।
بِهِ يَأْخُذُ فعل مضارع مع حرف الجر তিনি এটি গ্রহণ করেছেন, অর্থাৎ ইমাম আব্দুর রাজ্জাক ফতোয়া ও আমলে হযরত আলী (রা.)-এর এই অভিমতকে গ্রহণ করেছেন।

খ. আছারের সনদ ও ফিকহি তাৎপর্য

ইমাম আব্দুর রাজ্জাক তাঁর বিখ্যাত হাদিস সংকলন আল-মুসান্নাফ-এ এই প্রামাণ্য আছারটি সংকলন করেছেন। এখানে সাহাবায়ে কেরামের জুমার নামাজের পূর্বের ও পরের নফল ও সুন্নাত নামাজের বিশদ বিবরণ বিধৃত হয়েছে:

  1. জুমার পূর্বের চার রাকাত (সুন্নাতে কাবলাল জুমা): হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) জুমার পূর্বে চার রাকাত নামাজ আদায় করতেন। হানাফি মাযহাবে জুমার পূর্বে চার রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ নামাজ আদায়ের পক্ষে এটি একটি অকাট্য দলীল। তাছাড়া তিরমিযী শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) জনগণকে জুমার পূর্বে চার রাকাত পড়ার নির্দেশ দিতেন।
  2. জুমার পরের নামাজ (সুন্নাতে বা’দাল জুমা): জুমার ফরজ নামাজের পর কত রাকাত সুন্নাত আদায় করতে হবে, এ বিষয়ে হাদিস ও আছারে কয়েকটি রূপ এসেছে:
    • রাসূলুল্লাহ ﷺ জুমার পর ঘরে গিয়ে দুই রাকাত পড়তেন (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
    • রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের কেউ জুমার পর নামাজ পড়তে চাইলে সে যেন চার রাকাত পড়ে” (সহীহ মুসলিম: ৮৮১)।
    • হযরত আলী (রা.) জুমার পরে ছয় রাকাত পড়তেন—প্রথমে চার রাকাত, অতঃপর দুই রাকাত (৪ + ২ = ৬ রাকাত)। ইমাম আব্দুর রাজ্জাক সান’আনী (রহ.) এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এই ছয় রাকাতের আমলকেই সবচেয়ে পছন্দ করেছেন, যেন কোনো রেওয়ায়েতই বাদ না পড়ে।

(الف) بين فضائل يوم الجمعة فى ضوء القرآن والسنة— [الدرجات: ٤]

[(ক) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জুমার দিনের ফযীলতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা কর।]

ভূমিকা: সপ্তাহের সাতটি দিনের মাঝে জুমার দিন হলো মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য এক বিশেষ নিয়ামত ও শ্রেষ্ঠ উপহার। হাদিস শরীফে এ দিনকে «سيد الأيام» (দিনসমূহের সর্দার) এবং মুমিনদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

১. পবিত্র কুরআনের আলোকে জুমার দিনের ফযীলত

  1. স্বতন্ত্র সূরার নামকরণ: মহান আল্লাহ কুরআনুল কারীমে জুমার দিনের গুরুত্ব তুলে ধরতে «سورة الجمعة» (সূরা আল-জুমুআহ) নামে পূর্ণাঙ্গ একটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন।
  2. নামাজের জন্য দ্রুত গমনের ঐশী নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

    ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾

    “হে ঈমানদারগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয় (আযান দেওয়া হয়), তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে!” (সূরা আল-জুমুআহ: ৯)। এই আয়াতে জুমার আযানের সাথে সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পার্থিব যাবতীয় কার্যক্রম ত্যাগ করে আল্লাহর জিকিরের দিকে যাওয়াকে অপরিহার্য দায়িত্ব করা হয়েছে।

  3. পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব: ইহুদিদের জন্য শনিবার এবং খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার নির্ধারিত থাকলেও তারা বিভ্রান্ত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদীকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে জুমার দিনের হেদায়েত দান করেছেন।

২. সহীহ সুন্নাহর আলোকে জুমার দিনের অনন্য ফযীলত ও বৈশিষ্ট্য

সহীহ হাদিসের আলোকে জুমার দিনের প্রধান প্রধান ফযীলত নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

  1. সপ্তাহের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    «خَيْرُ يَوْمٍ طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ يَوْمُ الْجُمُعَةِ، فِيهِ خُلِقَ آدَمُ، وَفِيهِ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ، وَفِيهِ أُخْرِجَ مِنْهَا، وَلَا تَقُومُ السَّاعَةُ إِلَّا فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ»

    “সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে (পৃথিবীতে) নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর জুমার দিন ব্যতিরেকে কিয়ামত সংঘটিত হবে না।” (সহীহ মুসলিম: ৮৫৪)।

  2. দোআ কবুলের নিশ্চিত মুহূর্ত (ساعة الإجابة): জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যাতে কোনো মুসলিম বান্দা নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে কোনো কল্যাণ প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন (সহীহ বুখারী: ৯৩৫)। জুমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, এই মুহূর্তটি হলো আসরের পর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময় অথবা ইমাম মিম্বরে বসা থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়।
  3. এক বছরের নফল নামাজ ও রোজার সাওয়াব: হযরত আওস ইবনে আওস আস-সাকাফী (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করাবে ও করবে, সকাল সকাল মসজিদে যাবে, পায়ে হেঁটে যাবে, ইমামের কাছাকাছি বসবে এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনবে কোনো অনর্থক কাজ করবে না—তার মসজিদে যাওয়ার প্রতিটি কদমে এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের নফল তাহাজ্জুদের সাওয়াব লেখা হবে! (সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৫, জামে তিরমিযী: ৪৯৬; হাদিসটি সহীহ)।
  4. গুনাহ মাফের মাধ্যম: এক জুমা থেকে অপর জুমার মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত সগীরা গুনাহসমূহের কাফফারা হয়ে যায় যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয় (সহীহ মুসলিম: ২৩৩)।
  5. দরূদ পাঠের বিশেষ দিন: নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন: “তোমরা জুমার দিনে আমার ওপর অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ কর, কেননা তোমাদের দরূদ আমার দরবারে পেশ করা হয়।” (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)।
  6. সূরা কাহাফ পাঠের নূর: যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা আল-কাহাফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূর দ্বারা আলোকিত থাকবে (মুস্তাদরাকে হাকেম; সহীহ)।

٣- عن الثورى عن سماك بن حرب قال: سمعت جابر بن سمرة يقول كان النبى صلى الله عليه وسلم يجلس بين الخطبتين من يوم الجمعة ويخطب، وكانت صلاته قصدًا— وخطبته قصدًا ويقرأ آيات من القران على المنبر— [الدرجات: ٦]

[৩. সুফিয়ান আস-সাওরী থেকে বর্ণিত, তিনি সিমাক ইবনে হারব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন দুই খুতবার মাঝে বসতেন এবং দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। তাঁর নামাজ ছিল মধ্যপন্থী (পরিমিত দৈর্ঘ্যের) এবং তাঁর খুতবাও ছিল মধ্যপন্থী; আর তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে কুরআনের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করতেন।]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

আরবি শব্দ মূলধাতু ও ব্যাকরণ অর্থ ও তাহকিক
الثَّوْرِيُّ سفيان بن سعيد الثوري الكوفي ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী; আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস (মৃত্যু: ১৬১ হিজরি)।
سِمَاكُ بْنُ حَرْبٍ سماك بن حرب الذهلي البكري কুফার বিখ্যাত তাবেয়ী ও মুহাদ্দিস (মৃত্যু: ১২৩ হিজরি)।
جَابِرُ بْنُ سَمُرَةَ صحابي جليل من حلفاء بني زهرة হযরত জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.); নবীজি ﷺ-এর বিশিষ্ট সাহাবি (মৃত্যু: ৬৬ হিজরি)।
يَجْلِسُ بَيْنَ الْخُطْبَتَيْنِ فعل مضارع مع ظرف مكان مضاف তিনি দুই খুতবার মধ্যস্থলে বসতেন (جلسة الاستراحة); এটি জুমার খুতবার একটি সুন্নাত আমল।
قَصْدًا مصدر، باب نصر (ق-ص-د)، منصوب على الحال মধ্যমপন্থী, ভারসাম্যপূর্ণ, পরিমিত; অর্থাৎ না অতি দীর্ঘ যা মানুষের বিরক্তির কারণ হয়, আর না অতি সংক্ষিপ্ত যাতে উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
عَلَى الْمِنْبَرِ جار ومجرور (ن-ب-ر) মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে। মিম্বরে খুতবা দেওয়া সুন্নাতে নববী।
يَقْرَأُ آيَاتٍ جملة فعلية তিনি কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতেন; খুতবার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে নসীহতপূর্ণ আয়াত পাঠ করা।

খ. হাদিসের বিশদ ব্যাখ্যা ও শিক্ষণীয় দিক

  1. দাঁড়িয়ে দুটি খুতবা প্রদান ও মাঝখানে বসা: রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বদা দাঁড়িয়ে দুটি খুতবা দিতেন এবং উভয়ের মাঝে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বসতেন। সাহাবায়ে কেরামের মতে কেউ বসে খুতবা দিলে তা সুন্নাত পরিপন্থী কাজ হতো।
  2. খুতবা ও নামাজের দৈর্ঘ্যে ভারসাম্য: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নামাজ ও খুতবা উভয়টিই ছিল মধ্যমপন্থী («قَصْدًا»)। সহীহ মুসলিমে আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি ﷺ বলেছেন: “নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তির নামাজের দীর্ঘতা এবং খুতবার সংক্ষিপ্ততা তার ফিকহি প্রজ্ঞার নিদর্শন। অতএব তোমরা নামাজ দীর্ঘ কর এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত কর।” (সহীহ মুসলিম: ৮৬৯)। অতি দীর্ঘ খুতবা দিয়ে উপস্থিত মুসল্লিদের ক্লান্ত বা বিরক্ত করা সুন্নাহর পরিপন্থী।
  3. খুতবায় কুরআন তিলাওয়াত: খুতবা কোনো রাজনৈতিক বা সাধারণ বক্তৃতা নয়, বরং এটি জিকির ও উপদেশ। তাই খুতবার মাঝে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা এবং এর মাধ্যমে আখেরাতের ভয় ও আমলের তাগিদ সঞ্চার করা সুন্নাতে নববী। হযরত উম্মে হিশাম বিনতে হারিসা (রা.) বলেন: “আমি সূরা ক্বাফ মুখস্থ করেছি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র মুখ থেকে, যা তিনি প্রতি জুমার খুতবায় মিম্বরে দাঁড়িয়ে পাঠ করতেন।” (সহীহ মুসলিম: ৮৭৩)।

(الف) ما معنى الخطبة؟ وما حكم الخطبة فى الجمعة بغير العربية— [الدرجات: ٤]

[(ক) খুতবার অর্থ কী? জুমার নামাজে আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা প্রদানের বিধান কী?]

১. খুতবার শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ (معنى الخطبة لغة واصطلاحاً)

  • শাব্দিক অর্থ: আরবি «الخُطْبَةُ» (খ-এ পেশযোগে) শব্দটি ‘খাতাবা’ (خَطَبَ) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হলো ভাষণ, বক্তৃতা, নসীহতপূর্ণ বাণী, উপদেশমালা বা কোনো সমবেত জনতার সম্মুখে বক্তব্য প্রদান করা। (উল্লেখ্য, খ-এ যেরযোগে «الخِطْبَةُ» অর্থ বিবাহের প্রস্তাব পেশ করা)।
  • পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় খুতবা হলো:

    «الْخُطْبَةُ هِيَ كَلَامٌ مَنْظُومٌ مُشْتَمِلٌ عَلَى حَمْدِ اللَّهِ وَالثَّنَاءِ عَلَيْهِ، وَالصَّلَاةِ عَلَى رَسُولِهِ، وَتِلَاوَةِ شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ، وَالْوَعْظِ وَالتَّذْكِيرِ، يُلْقَى قَبْلَ صَلَاةِ الْجُمُعَةِ أَوْ بَعْدَ صَلَاةِ الْعِيدَيْنِ»

    “এমন সুবিন্যস্ত বক্তব্য যা মহান আল্লাহর হামদ ও সানা, তাঁর রাসূলের ওপর সালাত ও দরূদ, কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত এবং উপদেশ ও নসীহত সংবলিত হয়, যা জুমার নামাজের পূর্বে বা ঈদের নামাজের পরে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রদান করা হয়।”

২. জুমার খুতবার মৌলিক রুকনসমূহ

ফুকাহায়ে কেরামের মতে একটি বৈধ ও পরিপূর্ণ খুতবায় নিম্নের রুকনগুলো বিদ্যমান থাকা আবশ্যক:

  1. আল্লাহ তাআলার হামদ ও শুকরিয়া জ্ঞাপন (যেমন: الحمد لله বলা)।
  2. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ পাঠ।
  3. তাকওয়ার উপদেশ ও নসীহত (যেমন: أوصيكم بتقوى الله)।
  4. কুরআনুল কারীম থেকে অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ আয়াত তিলাওয়াত।
  5. মুমিন নর-নারীর জন্য কল্যাণ ও মাগফিরাতের দোআ করা।

৩. জুমার খুতবা অনারবি (মাতৃভাষায়) প্রদানের ফিকহি বিধান

অন-আরব দেশসমূহে (যেমন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান বা পাশ্চাত্যে) স্থানীয় মাতৃভাষায় জুমার খুতবা প্রদান করা যাবে কি না—এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে তিনটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:

অভিমত বিধান ও প্রবক্তা দালিলিক ব্যাখ্যা
১ম মত (জুমহুর) আরবিতেই হওয়া ওয়াজিব/শর্ত
(মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহ)
খুতবা হলো নামাজের মতোই একটি তাআববুদী (ইবাদতমূলক) শারঈ শে’আর। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম অনারব ভূমিতে গিয়েও কেবল আরবিতেই খুতবা দিয়েছেন। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনারবিতে খুতবা দিলে খুতবা শুদ্ধ হবে না।
২য় মত (ইমাম আবু হানিফা রহ.) জায়েয কিন্তু সুন্নাত পরিপন্থী (মাকরূহে তানযীহী) ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে খুতবার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর জিকির ও নসীহত; তাই আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় দিলেও মূল দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে, তবে দীর্ঘদিনের মুতাওয়ারাছ সুন্নাত ছেড়ে দেওয়ার কারণে তা অনুত্তম বা মাকরূহ হবে। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে সক্ষমতা থাকলে আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় খুতবা দেওয়া জায়েয নয়।
৩য় মত (সমকালীন সমন্বয়ক ফতোয়া) দ্বিমুখী পদ্ধতি (আরবি সুন্নাত অক্ষুণ্ণ রেখে মাতৃভাষায় বয়ান)
(দারুল উলূম দেওবন্দ, আল-আজহার ও বিশ্ব ফিকহ একাডেমি)
মূল খুতবা (মিম্বরে দাঁড়িয়ে পঠিত দুটি খুতবা) সম্পূর্ণ আরবি ভাষায় প্রদান করা অপরিহার্য সুন্নাত। তবে খুতবার পূর্বে মাতৃভাষায় পূর্ণাঙ্গ নসীহত ও বয়ান করা হবে, অথবা আরবির পাশাপাশি খুতবার মূল কথাগুলো সংক্ষেপে স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে দেওয়া হবে।

৪. চূড়ান্ত ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত

উপমহাদেশের নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরাম ও বিশ্ব ফিকহ একাডেমির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: মিম্বরে দাঁড়িয়ে মূল জুমার দুটি খুতবা আরবিতেই প্রদান করা ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। কারণ এটি শরীয়তের একটি নির্ধারিত শে’আর বা প্রতীকী ইবাদত। আর উপস্থিত সাধারণ মুসল্লিদেরকে ইসলামের বিধিবিধান ও নসীহত বোঝানোর লক্ষ্যে খুতবার পূর্বে স্থানীয় ভাষায় (যেমন বাংলায়) বিশদ বয়ান পেশ করাই শরীয়তের উদ্দেশ্য ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ সংরক্ষণের সর্বোত্তম সমন্বিত রূপ।

مجموعة (ب) — مصنف ابن أبى شيبة

(ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الاسئلة الملحقة بها)

٤- حدثنا شريك عن عاصم عن أبى صالح يرفعه الى عيسى بن مريم (عليه السلام) قال: قال لاصحابه: اتخذوا المساجد مساكن، واتخذوا البيوت منازل، وانجوا من الدنيا بسلام، وكلوا من يقل البرية، قال: وزاده فيه الأعمش: واشربوا من الماء القراح— [الدرجات: ٦]

[৪. শুরাইক বর্ণনা করেন আসিম থেকে, তিনি আবু সালিহ থেকে, তিনি এটিকে মারফূ সূত্রে হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন; তিনি (ঈসা আ.) তাঁর সাহাবিদের (হাওয়ারীগণকে) বললেন: “তোমরা মসজিদসমূহকে তোমাদের বাসস্থান বানাও, এবং নিজেদের ঘরগুলোকে কেবল ক্ষণস্থায়ী সরাইখানা (যাত্রাবিরতির স্থান) মনে কর; আর দুনিয়া থেকে নিরাপদে ও শান্তিতে মুক্তিলাভ কর। বন্য শাকসবজি ভক্ষণ কর।” রাবী বলেন: এবং আ’মাশ এতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন: “আর সুপেয় বিশুদ্ধ পানি পান কর।”]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

আরবি শব্দ (مفردات) মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ অর্থ ও তাহকিক
شَرِيكٌ شريك بن عبد الله النخعي الكوفي শুরাইক বিন আব্দুল্লাহ আন-নাখঈ; কুফার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও কাজী (মৃত্যু: ১৭৭ হিজরি)।
عَاصِمٌ عاصم بن بهدلة الكوفي আসিম ইবনে আবি নাজূদ; ক্বিরাআতের ইমাম ও মুহাদ্দিস (মৃত্যু: ১২৭ হিজরি)।
أَبُو صَالِحٍ ذكوان السمان الزيات الكوفي আবু সালিহ আস-সাম্মান; বিশিষ্ট তাবেয়ী ও নির্ভরযোগ্য রাবী (মৃত্যু: ১০১ হিজরি)।
يَرْفَعُهُ فعل مضارع، باب نصر (ر-ف-ع) তিনি মারফূ সূত্রে এটি বর্ণনা করেন, অর্থাৎ সনদকে ঈসা (আ.) পর্যন্ত উন্নীত করেন।
اتَّخِذُوا فعل أمر للجمع، باب افتعال (أ-خ-ذ) তোমরা গ্রহণ কর, বানাও বা নির্ধারণ কর।
مَسَاكِنَ جمع مَسْكَن، اسم مكان (س-ك-ن) স্থায়ী বাসস্থানসমূহ, যেখানে মানুষ শান্তি ও স্থিতি খুঁজে পায়।
مَنَازِلَ جمع مَنْزِل، اسم مكان (ن-ز-ل) অস্থায়ী যাত্রাবিরতির স্থান, মুসাফিরখানা বা সরাইখানা।
انْجُوا فعل أمر للجمع، باب نصر (ن-ج-و) তোমরা মুক্তিলাভ কর, নাজাত পাও বা নিরাপদে উত্তীর্ণ হও।
يَقْلِ الْبَرِّيَّةِ / بَقْلِ اسم مفرد مضاف (ب-ق-ل) প্রান্তরের বুনো শাকসবজি ও লতাপাতা; মূল পান্ডুলিপিতে এটি ‘بقل البرية’ (বাক্বলে বারিয়্যাহ), ছাপার ভুলে ‘يقل’ এসেছে।
الْأَعْمَشُ سليمان بن مهران الأسدي الكوفي সুলাইমান ইবনে মিহরান আল-আ’মাশ; কুফার শীর্ষ মুহাদ্দিস ও শাইখুল ইসলাম।
الْمَاءِ الْقَرَاحِ مركب توصيفي (ق-ر-ح) সুপেয়, স্বচ্ছ, নির্ভেজাল ও বিশুদ্ধ পানি, যাতে কোনো কৃত্রিম মিশ্রণ নেই।

খ. হাদিসের মর্মার্থ ও তাহকিক

ইমাম ইবনে আবি শায়বাহ তাঁর অমর গ্রন্থ আল-মুসান্নাফ-এর ‘কিতাবুয যুহদ’ (যুহদ অধ্যায়)-এ এই অনন্য বাণীটি সংকলন করেছেন। এখানে হযরত ঈসা (আ.) তাঁর অনুসারী হাওয়ারীগণকে আত্মিক পরিশুদ্ধি ও যুহদের শীর্ষ স্তরের এক বাস্তব নির্দেশনা দিয়েছেন:

  1. মসজিদকে বাসস্থান ও ঘরকে সরাইখানা বানানো: এর রূপক অর্থ হলো—একজন মুমিনের মনের প্রশান্তি ও আত্মিক আশ্রয়স্থল হবে মসজিদ। সে মসজিদে নামাজ ও জিকিরে এত বেশি সময় কাটাবে যেন মসজিদই তার আসল ঠিকানা; আর নিজের ঘরকে মুসাফিরের ক্ষণস্থায়ী তাঁবু জ্ঞান করবে।
  2. অল্পে তুষ্টির জীবন: প্রান্তরের সাধারণ শাকসবজি ও প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ পানি পানের কথা বলে বিলাসিতা, অপচয় ও ভোগবাদী মানসিকতা পরিহার করে অত্যন্ত অনাড়ম্বর ও পবিত্র জীবনযাপনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

(الف) ما معنى الزهد؟ وما مراتبه— [الدرجات: ٤]

[(ক) যুহদ (الزهد)-এর অর্থ কী? এবং এর স্তরসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]

১. যুহদের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ (معنى الزهد لغة واصطلاحاً)

  • শাব্দিক অর্থ: আরবি «الزُّهْدُ» শব্দটি ‘যাহাদা’ (زَهِدَ) ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। এর আভিধানিক অর্থ হলো—অনাসক্তি, নিস্পৃহতা, অনাগ্রহ, অসার বস্তু ত্যাগ করা, স্বল্পে তুষ্ট হওয়া বা কোনো কিছুর প্রতি মনের টান না থাকা।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়ত ও তাসাউফের পরিভাষায় যুহদের তাৎপর্য তুলে ধরে ইমামগণ বহু সুন্দর সংজ্ঞা প্রদান করেছেন:
    • ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): “যুহদ হলো দুনিয়ার মোহ ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সংকুচিত করা এবং আখেরাতের পরম সফলতার দিকে পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করা।”
    • ইমাম হাসান বসরী (রহ.): “দুনিয়ার প্রতি যুহদ মানে কোনো হালাল খাদ্যকে হারাম করে নেওয়া নয়, আর নিজের ধনসম্পদ অপচয় করাও নয়; বরং যুহদ হলো—তোমার নিজের হাতে যা আছে তার চেয়ে আল্লাহর কুদরতের ভাণ্ডারে যা আছে তার ওপর অধিক আস্থাশীল হওয়া।”
    • ইমাম জুনাইদ বাগদাদী (রহ.): “যুহদ হলো তোমার হাত সম্পদে পূর্ণ থাকলেও তোমার অন্তর সেই সম্পদের মোহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা।”

২. যুহদের বিভিন্ন স্তর (مراتب الزهد)

ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুহাদ্দিসীন কেরাম (বিশেষত ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম ও ইমাম গাযযালী রহ.) মানবীয় আমল ও আত্মিক উন্নতির ভিত্তিতে যুহদের কয়েকটি স্তর নিরূপণ করেছেন:

স্তর স্তরের নাম ও প্রকৃতি বিবরণ ও শারঈ হুকুম
১ম স্তর (ফরজ যুহদ) زُهْدُ الْعَوَامِّ (হারাম বর্জন) শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ যাবতীয় হারাম বস্তু, অবৈধ উপার্জন ও কবিরা গুনাহ থেকে সম্পূর্ণ বেঁচে থাকা। এই স্তরের যুহদ অবলম্বন করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজে আইন
২য় স্তর (মুস্তাহাব যুহদ) زُهْدُ الْخَوَاصِّ (সন্দেহ ও বাহুল্য বর্জন) সন্দেহজনক (মুশতাবাহাত) বিষয়সমূহ এবং প্রয়োজনাতিরিক্ত অতিরিক্ত ভোগবিলাস ও আরাম-আয়েশ বর্জন করা, যাতে দ্বীনদারিতে কোনো ঘাটতি না আসে। এটি মুস্তাহাব ও উচ্চ প্রশংসনীয়
৩য় স্তর (সর্বোচ্চ আত্মিক যুহদ) زُهْدُ الْعَارِفِينَ (আল্লাহ ছাড়া সব বর্জন) আল্লাহ তাআলার সত্তা ও সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে অন্য সব কিছু থেকে অন্তরকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা। অর্থাৎ যে কোনো বস্তু যা মানুষকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে, তা অন্তর থেকে মুছে ফেলা। এটি নবী-রাসূল ও সিদ্দীকগণের স্তর।

৩. ইমাম গাযযালী (রহ.)-এর শ্রেণিবিন্যাস

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযযালী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ইহয়াউ উলূমিদ্দীন গ্রন্থে ত্যাগের মানসিকতার ভিত্তিতে যুহদকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন:

  1. মুতাযাহহিদ (المتزهِّد): যে ব্যক্তি নিজের মনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা দমন করে বহু কষ্টে দুনিয়া ত্যাগ করে।
  2. যাহিদ (الزاهد): যে ব্যক্তি দুনিয়াকে ক্ষণভঙ্গুর জেনে স্বেচ্ছায় তা পরিত্যাগ করে এবং আখেরাতের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
  3. মুহাক্কিক যাহিদ (الزاهد المحقِّق): যে ব্যক্তি দুনিয়াকে এতটাই তুচ্ছ মনে করে যে দুনিয়া ত্যাগ করার বিষয়টিকেও কোনো ত্যাগই মনে করে না; কারণ অসার মাটির বিনিময়ে হীরকখণ্ড গ্রহণ করার মাঝে কোনো অহংকার থাকতে পারে না।

٥- عن ابن عمر قال: أخذ النبى صلى الله عليه وسلم بيدى أو ببعض جسدى فقال لى: يا عبد الله بن عمر كن فى الدنيا غريبًا أو عابر سبيل، وعد نفسك فى أهل القبور— [الدرجات: ٦]

[৫. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত অথবা আমার শরীরের কোনো অংশ (কাঁধ) ধরলেন, অতঃপর আমাকে বললেন: “হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর! তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস কর যেন তুমি একজন অচেনা প্রবাসী অথবা একজন পথচারী মুসাফির। আর নিজেকে কবরবাসীদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য কর।”]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

আরবি শব্দ মূলধাতু ও ব্যাকরণ অর্থ ও তাহকিক
أَخَذَ فعل ماض، باب نصر (أ-خ-ذ) তিনি ধরলেন বা স্পর্শ করলেন; শিক্ষক কর্তৃক শিষ্যের গভীর মনোযোগ আকর্ষণের নববী শিষ্টাচার।
بِبَعْضِ جَسَدِي جار ومجرور ومضاف إليه আমার শরীরের একাংশ; সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েতে এসেছে «بِمَنْكِبِي» অর্থাৎ আমার কাঁধ ধরেছিলেন।
غَرِيبًا صوت وصفة مشبهة (غ-ر-ب)، منصوب على أنه خبر كان অচেনা ভিনদেশী প্রবাসী; যে ব্যক্তি নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে পরদেশে থাকে, যার কোনো স্থায়ী নিবাস বা আত্মীয়তার দম্ভ থাকে না।
عَابِرَ سَبِيلٍ مركب إضافي منصوب على العطف পথ অতিক্রমকারী মুসাফির; যে কেবল গন্তব্যে পৌঁছার জন্য পথ চলতেই থাকে, কোনো স্টেশনে থিতু হয় না।
عُدَّ نَفْسَكَ فعل أمر مع مفعوله (ع-د-د) তুমি নিজেকে গণনা কর বা বিবেচনা কর।
أَهْلِ الْقُبُورِ مركب إضافي مجرور بـ في কবরবাসীদের অন্তর্ভুক্ত; অর্থাৎ নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো এক যাত্রী।

খ. হাদিসের দার্শনিক ও আত্মিক শিক্ষা

  1. শিক্ষাদানের নববী মনস্তত্ত্ব: নবীজি ﷺ উপদেশ প্রদানের সময় ইবনে উমর (রা.)-এর কাঁধ স্পর্শ করেছিলেন। এটি শিক্ষার্থীর মনকে চঞ্চলতা থেকে মুক্ত করে অন্তরে উপদেশের গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে।
  2. দুনিয়ার বাস্তবতার রূপক দৃষ্টান্ত:
    • পরবাসী (غريب): প্রবাসী ব্যক্তি কখনোই ভিনদেশে বিশাল প্রাসাদ গড়ে স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন দেখে না; বরং সে সর্বদা স্বদেশ (মুমিনের আসল স্বদেশ হলো জান্নাত)-এ ফিরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকে।
    • মুসাফির (عابر سبيل): পথচারীর লক্ষ্য থাকে শুধুই গন্তব্য। পথের ধারের ছায়ায় সে যতটুকু বিশ্রাম নেয়, তা কেবল পরবর্তী পথ চলার শক্তি সঞ্চয়ের জন্য।
  3. মৃত্যুচিন্তার জাগরণ: নিজেকে কবরবাসীদের একজন মনে করার অর্থ হলো দীর্ঘ আশার মোহ ছিন্ন করা। ইবনে উমর (রা.) এই হাদিসের প্রভাবে বলতেন: “সন্ধ্যা হলে সকালের আশা করো না, আর সকাল হলে সন্ধ্যার আশা করো না। সুস্থতার সময় অসুস্থতার এবং জীবনের সময় মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ কর।” (সহীহ বুখারী: ৬৪১৬)।

(الف) حلل الكلمات الآتية: كُنْ، القُبُور، عُدَّ— [الدرجات: ٤]

[(ক) নিম্নের শব্দগুলোর ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ (তাহলীল) কর: كُنْ (কুন), القُبُور (আল-কুবূর), عُدَّ (উদ্দা)।]

বিশ্লেষণের ধাপ ১. كُنْ (কুন) ২. القُبُورُ (আল-কুবূর) ৩. عُدَّ (উদ্দা)
صيغة (সিগাহ) واحد مذكر حاضر جمع تكسير (مفرد: قَبْرٌ) واحد مذكر حاضر
بحث (বাহাছ) فعل أمر حاضر معروف اسم جامد (اسم ذات) فعل أمر حاضر معروف
باب (বাব) نَصَرَ يَنْصُرُ نَصَرَ يَنْصُرُ (قَبَرَ يَقْبُرُ) نَصَرَ يَنْصُرُ
مصدر (মাসদার) الْكَوْنُ (হওয়া/থাকা) الْقَبْرُ (দাফন করা/কবর দেওয়া) الْعَدُّ (গণনা করা)
مادة (মূলবর্ণ) ك – و – ن ق – ب – ر ع – د – د
نوع (জিনস) معتل العين / أجوف واوي صحيح / ثلاثي مجرد سالم مضاعف ثلاثي مجرد
وزن (মিযান/ওজন) فُلْ (মূল ওজনে ছিল أُفْعُلْ) فُعُولٌ فُلَّ (মূল ওজনে ছিল أُفْعُلْ)
معنى (অর্থ) তুমি হও / জীবনযাপন কর কবরসমূহ / সমাধিভূমিগুলো তুমি গণনা কর / গণ্য কর
صرف وتصريف
(নিয়ম ও রূপান্তর)
মূল শব্দ ছিল اُكْوُنْ। তালিলের নিয়মে ওয়াও-এর পেশ পূর্ববর্তী সাকিন কাফে স্থানান্তরিত হয় এবং দুটি সাকিন (واو ও نون) একত্র হওয়ায় আলতিক্বা-উস সাকিনাইন নিয়মে ওয়াও বিলুপ্ত হয়ে كُنْ রূপ ধারণ করেছে। এটি ‘ক্বাবরুন’ (قَبْرٌ)-এর বহুবচন। আরবিতে চতুষ্পদ বা বহু বোঝাতে ‘ফু’ঊল’ (فُعُول) ওজনে জমায়ে তাকসীর গঠিত হয়। মূল শব্দ ছিল اُعْدُدْ। একই জাতীয় দুটি বর্ণ (দাল ও দাল) একত্র হওয়ায় প্রথমটির হরকত মুছে দ্বিতীয়টির সাথে ইদগাম করা হয়েছে। শেষে হালকা উচ্চারণের জন্য ফাতহা দিয়ে عُدَّ হয়েছে।
إعراب (বাক্যিক অবস্থান) فعل أمر ناقص مبني على السكون، واسمه ضمير مستتر تقديره (أنت)، وخبره (غريبًا). اسم مجرور بالإضافة بـ (أهل)، وعلامة جره الكسرة الظاهرة في آخره. فعل أمر مبني على السكون المقدر منع من ظهوره الفتح للاتباع أو الإدغام، والفاعل مستتر (أنت).

٦- حدثنا عبد الله بن ادريس عن اسماعيل وسفيان عن زبيد بن حارث عن رجل من بنى عامر قال: قال على: قال: انما أخاف عليكم اثنين: طول الأمل واتباع الهوى فان طول الأمل ينس الآخرة، وان اتباع الهوى يصد عن الحق— وان الدنيا قد ترحلت مدبرة— وان الاخرة مقبلة ولكل واحدة منهما بنون فكونوا من أبناء الاخرة فان اليوم عمل ولا حساب، وغدا حساب ولا عمل— [الدرجات: ٦]

[৬. আব্দুল্লাহ ইবনে ইদরীস বর্ণনা করেন ইসমাঈল ও সুফিয়ান থেকে, তাঁরা যুবাইদ ইবনুল হারিস থেকে, তিনি বনু আমিরের এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: হযরত আলী (রা.) বলেছেন: “আমি তোমাদের ব্যাপারে দুটি জিনিসের সর্বাধিক ভয় করি: সুদূরপ্রসারী আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ। কেননা দীর্ঘ আশা আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়, আর প্রবৃত্তির অনুসরণ সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়। জেনে রেখো! নিশ্চয়ই দুনিয়া পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে বিদায় নিচ্ছে, আর আখেরাত সম্মুখপানে দ্রুত এগিয়ে আসছে। আর এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে সন্তান-সন্ততি (অনুসারী দল)। অতএব তোমরা আখেরাতের সন্তান হও (আখেরাতপন্থী হও), দুনিয়ার সন্তান হয়ো না। কেননা আজকের দিন হলো কেবল আমলের দিন, কোনো হিসাব নেই; আর আগামীকালের দিন (কিয়ামত) কেবলই হিসাবের দিন, কোনো আমলের সুযোগ নেই।”]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

আরবি শব্দ মূলধাতু ও ব্যাকরণ অর্থ ও তাহকিক
طُولُ الْأَمَلِ مركب إضافي (ط-و-ل / أ-م-ل) সুদূরপ্রসারী আশা, দীর্ঘায়ুর কাল্পনিক আকাঙ্ক্ষা; মৃত্যুর বহু দেরি আছে ভেবে উদাসীন থাকা।
اتِّبَاعُ الْهَوَى مركب إضافي، مصدر افتعال (ت-ب-ع / ه-و-ي) কুপ্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণ, মনের পাশবিক কামনার দাসত্ব করা।
يُنْسِي الْآخِرَةَ فعل مضارع، باب إفعال (ن-س-ي) আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়; পরকালের জবাবদিহিতার ভয় অন্তর থেকে মুছে দেয়।
يَصُدُّ عَنِ الْحَقِّ فعل مضارع، باب نصر (ص-د-د) সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত করে বা ফিরিয়ে রাখে।
تَرَحَّلَتْ مُدْبِرَةً فعل ماض، باب تفعل مع حال (ر-ح-ل / د-ب-ر) পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে বিদায় নিচ্ছে; পেছনের দিকে দ্রুত প্রস্থান করছে।
مُقْبِلَةٌ اسم فاعل تأنيث، باب إفعال (ق-ب-ل) সম্মুখপানে দ্রুত আগমন করছে; ঘনিয়ে আসছে।
بَنُونَ ملحق بجمع المذكر السالم (مفرد: ابن) সন্তান-সন্ততি, অনুসারী বা অনুরক্ত দল।
الْيَوْمَ عَمَلٌ وَلَا حِسَابَ جملة اسمية بليغة আজকের দিন কেবল কর্মের ক্ষেত্র, এখানে কোনো চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ বা প্রতিদান নেই।
غَدًا حِسَابٌ وَلَا عَمَلَ جملة اسمية مقابلة আগামীকাল (কিয়ামত) কেবলই হিসাবের দিন, সেখানে কোনো নতুন নেক আমল করার সুযোগ থাকবে না।

খ. আছারের গভীর তাত্ত্বিক ও চারিত্রিক শিক্ষা

হযরত আলী (রা.)-এর এই কালজয়ী খোতবাটি মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ ছাড়াও সহীহ বুখারীর কিতাবুর্ রিক্বাক্ব-এ তা’লীক্ব হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। এতে মানবজীবনের সবচেয়ে বাস্তবমুখী দর্শন বিবৃত হয়েছে:

  1. সময়ের চিরন্তন স্রোত: মানুষের জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস তাকে দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং কবরের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। দুনিয়া ক্ষয়িষ্ণু, আর আখেরাত চিরন্তন।
  2. কর্মক্ষেত্র ও প্রতিফল ক্ষেত্রের পার্থক্য: দুনিয়া হলো পরীক্ষার হল ও বীজ বপনের ভূমি («الدنيا مزرعة الآخرة»)। এখানে মানুষ স্বাধীনভাবে আমল করতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পর কেবল কর্মের হিসাব দিতে হবে, তখন অনুতপ্ত হয়ে লাখো সিজদা দিলেও একটি নেকিও অর্জনের সুযোগ থাকবে না।

(الف) اشرح قوله عليه السلام “طول الأمل واتباع الهوى”— [الدرجات: ٤]

[(ক) হযরত আলী (আ.)-এর বাণী: “طول الأمل واتباع الهوى” (সুদূরপ্রসারী আশা ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ)-এর বিশদ ব্যাখ্যা কর।]

ভূমিকা: মানবাত্মার ধ্বংস ও নৈতিক পতনের মূল অনুঘটক হলো দুটি আত্মিক ব্যাধি—’তুলুল আমাল’ বা দীর্ঘ আশা এবং ‘ইত্তিবাউল হাওয়া’ বা প্রবৃত্তিপূজা। হযরত আলী (রা.) অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে এই দুটি ব্যাধির কার্যকারণ ও বিধ্বংসী ফলাফল উন্মোচন করেছেন।

১. ‘তুলুল আমাল’ (طول الأمل)-এর ব্যাখ্যা ও কুফল

  • অর্থ ও স্বরূপ: ‘তুলুল আমাল’ অর্থ সুদূরপ্রসারী আশা। অর্থাৎ মানুষ মনে করে সে আরও বহু বছর পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে, বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে তওবা করে নেককার হবে, এখন পাপ ও ভোগবিলাসে মেতে থাকার সময়।
  • আখেরাত বিস্মৃতির কারণ: হযরত আলী (রা.) বলেন: «فَإِنَّ طُولَ الْأَمَلِ يُنْسِي الْآخِرَةَ»—দীর্ঘ আশা মানুষকে আখেরাত ভুলিয়ে দেয়। কারণ যে ব্যক্তি মনে করে মৃত্যু অনেক দূরে, সে মৃত্যুর প্রস্তুতি, কবরের নিঃসঙ্গতা ও হাশরের ময়দানের জবাবদিহিতা সম্পূর্ণ ভুলে যায়। ফলে সে তওবা বিলম্বিত করে, ইবাদতে শৈথিল্য প্রদর্শন করে এবং ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত করার লোভী প্রতিযোগিতায় জীবন বরবাদ করে দেয়।
  • কুরআনী দলিল: আল্লাহ তাআলা সাবধান করে ইরশাদ করেন:

    ﴿ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ ۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ﴾

    “তাদেরকে ছেড়ে দিন! তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং দীর্ঘ আশা তাদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলে রাখুক; শীঘ্রই তারা (এর অশুভ পরিণাম) জানতে পারবে।” (সূরা আল-হিজর: ৩)।

২. ‘ইত্তিবাউল হাওয়া’ (اتباع الهوى)-এর ব্যাখ্যা ও কুফল

  • অর্থ ও স্বরূপ: ‘ইত্তিবাউল হাওয়া’ অর্থ কুপ্রবৃত্তি বা মনের পাশবিক চাহিদার গোলামী করা। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর আদেশ-নিষেধ এবং বিবেকের ফয়সালা উপেক্ষা করে নফসের লালসা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই হলো ইত্তিবাউল হাওয়া।
  • হক ও সত্য থেকে বিচ্যুতির কারণ: হযরত আলী (রা.) বলেন: «وَإِنَّ اتِّبَاعَ الْهَوَى يَصُدُّ عَنِ الْحَقِّ»—প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে সত্য থেকে অন্ধ ও বধির করে দেয়। কারণ প্রবৃত্তি যখন মানুষের হৃদয়ে প্রভুত্ব বিস্তার করে, তখন তার কাছে সত্য তিক্ত মনে হয় এবং অসত্য আকর্ষণীয় রূপ ধারণ করে। সে নিজের স্বার্থ ও কামনার অনুকূলে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধানকেও অগ্রাহ্য করে।
  • কুরআনী দলিল: মহান আল্লাহ হযরত দাউদ (আ.)-কে সতর্ক করে ইরশাদ করেছিলেন:

    ﴿وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَىٰ فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ﴾

    “এবং আপনি প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না; অন্যথায় তা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।” (সূরা সোয়াদ: ২৬)।

৩. উভয় ব্যাধির সমন্বিত ধ্বংসযজ্ঞ ও আত্মিক প্রতিকার

হযরত আলী (রা.)-এর বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, এই দুটি ব্যাধি একে অপরের পরিপূরক হয়ে মুমিনের ঈমানকে বিনাশ করে:

  1. তুলুল আমাল মানুষের লক্ষ্যকে আখেরাতমুখী হতে দেয় না এবং সময় অপচয়ের ফাঁদে ফেলে রাখে।
  2. ইত্তিবাউল হাওয়া অন্তরের সত্যের আলো নিভিয়ে দিয়ে তাকে পাপাচার ও বিদ্রোহের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে।

প্রতিকার: এই উভয়বিধ মারাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো—প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুকে স্মরণ করা (যিকরুল মাউত), নিজেকে কবরের যাত্রী মনে করা এবং নফসের কুপ্রবৃত্তিকে শরীয়তের পূর্ণ অনুগত করে মুজাহাদায় লিপ্ত থাকা।

مجموعة (ج) — سنن الدارمى

(ترجم الأحاديث التالية ثم أجب عن الاسئلة الملحقة بها)

٧- عن عائشة ان النبى صلى الله عليه وسلم كان يأكل طعامًا فى ستة نفز من اصحابه، فجاء اعرابى فأكله بلقمتين فقال النبى صلى الله عليه وسلم اما إنه لو ذكر اسم الله لكفاكم— فاذا أكل احدكم فليذكر اسم الله فان نسى ان يذكر فى اوله فليقل بسم الله أوله وآخره— [الدرجات: ٦]

[৭. উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবিদের মধ্য থেকে ছয়জনের একটি দলের সাথে খাবার খাচ্ছিলেন। এমন সময় এক বেদুঈন (মরুবাসী আরব) এলো এবং সে মাত্র দুই লোকমায় সেই পুরো খাবারটি একাই খেয়ে সাবাড় করে ফেলল! তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “সাবধান! নিশ্চয়ই সে যদি খাবার শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করত (বিসমিল্লাহ বলত), তবে এই সামান্য খাবারই তোমাদের সবার জন্য যথেষ্ট হতো। অতএব তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন অবশ্যই শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে (বিসমিল্লাহ বলে)। আর যদি সে শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে ভুলে যায়, তবে সে যেন (মনে পড়ার সাথে সাথে) বলে: ‘বিসমিল্লাহি আউয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ (আল্লাহর নামে খাচ্ছি এর প্রারম্ভে ও এর সমাপ্তিতে)।”]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

আরবি শব্দ (مفردات) মূলধাতু ও ব্যাকরণিক রূপ অর্থ ও তাহকিক
فِي سِتَّةِ نَفَرٍ / نَفَزٍ عدد ومعدود (ن-ف-ر) ছয় ব্যক্তির একটি দলের সাথে; প্রশ্নপত্রে মুদ্রণজনিত কারণে ‘نفز’ লেখা হয়েছে, মূলত শব্দটি ‘نفر’ (নাফার), যার অর্থ ৩ থেকে ১০ জনের ছোট দল।
أَعْرَابِيٌّ اسم منسوب إلى الأعراب বেদুঈন, মরুভূমিতে বসবাসকারী অশিক্ষিত বা রুক্ষ স্বভাবের যাযাবর আরব।
بِلُقْمَتَيْنِ تثنية لُقْمَة مع باء السببية (ل-ق-م) মাত্র দুই গ্রাসে বা দুই লোকমায়; অর্থাৎ এক নিমেষেই বিপুল খাদ্য পেটে চালান করে দিল।
أَمَا إِنَّهُ أداة استفتاح وتنبيه مع حرف مشبه জেনে রেখো, সাবধান! নিশ্চয়ই বিষয়টি এমন যে…।
لَوْ ذَكَرَ اسْمَ اللَّهِ حرف امتناع لامتناع مع جملة فعلية সে যদি আল্লাহর নাম স্মরণ করত (অর্থাৎ ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আহার শুরু করত)।
لَكَفَاكُمْ جواب لو، باب رمى (ك-ف-ي) তোমাদের সবার জন্য তা যথেষ্ট হতো, অর্থাৎ খাবারে প্রচুর বরকত ও তৃপ্তি লাভ হতো।
فَلْيَذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ لام الأمر مع فعل مضارع مجزوم সে যেন অবশ্যই আল্লাহর নাম স্মরণ করে (বিসমিল্লাহ পাঠ করে)।
فَإِنْ نَسِيَ حرف شرط مع فعل ماض (ن-س-ي) অতঃপর যদি সে ভুলে যায় (শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে)।
بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ دعاء مأثور منصوب على الظرفية আল্লাহর নামে (আহার করছি) এর শুরুতে এবং এর শেষে।

খ. হাদিসের মর্মার্থ ও বরকতের শারঈ দর্শন

ইমাম দারিমী তাঁর সুনান-এর কিতাবুল আত’ইমাহ (খাদ্য অধ্যায়)-এ এই অনন্য হাদিসটি সংকলন করেছেন। হাদিসটি মুসলিম জীবনের আহারের মৌলিক শিষ্টাচার ও বরকতের রহস্য উন্মোচন করে:

  1. খাবারে শয়তানের অংশীদারিত্ব: যে খাবারে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না, শয়তান সেই খাবারকে নিজের জন্য হালাল করে নেয় এবং খাদ্যের পুষ্টি ও বরকত হরণ করে। ফলে মানুষ যত বেশিই খায় না কেন, তার ক্ষুধা মেটে না এবং তৃপ্তি আসে না। কিন্তু বিসমিল্লাহ বললে অল্প খাবারেই বহু মানুষের ক্ষুধা নিবারণ হয়।
  2. ভুলে গেলে ক্ষতিপূরণের সুন্নাত দোয়া: কোনো ব্যক্তি যদি খাওয়ার শুরুতে অসতর্কতাবশত বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায়, তবে খাওয়ার মাঝখানে যখনই মনে পড়বে তখনই «بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ» বলে নিলে পূর্বের সমস্ত খাবারের ওপরও আল্লাহর রহমত ও বরকত শামিল হয়ে যায় এবং শয়তানের প্রভাব দূরীভূত হয়।

(الف) اكتب نبذة عن سيرة عائشة (رضى الله عنها)— [الدرجات: ٤]

[(ক) উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখ।]

ভূমিকা: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীক্বা (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহীয়সী নারী, অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ফকীহা এবং মুসলিম উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক শিক্ষক।

১. জন্ম, বংশপরিচয় ও উপাধি

  • নাম ও বংশপরম্পরা: আয়েশা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক ইবনে আবি কুহাফা আল-কুরাশিয়্যাহ আত-তাইমিয়্যাহ। পিতা ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং মাতা উম্মে রূমান বিনতে আমির (রা.)।
  • জন্ম: নবুওয়াতের ৪র্থ বা ৫ম সনে পবিত্র মক্কা মুকাররমায় এক পবিত্র ঈমানদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
  • উপনাম (কুনিয়াত) ও উপাধি (লকব): তাঁর কুনিয়াত ছিল ‘উম্মে আব্দুল্লাহ’ (ভাগ্নে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.-এর নামে রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক প্রদত্ত)। তাঁর প্রধান উপাধি হলো ‘আস-সিদ্দীক্বা’ (সত্যবাদিনী) এবং ‘আল-হুমাইরা’ (শুভ্র-গোলাপি বর্ণের অধিকারিণী)।

২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে বিবাহ

হযরত খাদিজা (রা.)-এর ওফাতের পর মহান আল্লাহর ঐশী নির্দেশে (স্বপ্নে জিবরাঈল আ. কর্তৃক প্রদর্শিত হয়ে) মক্কায় নবীজি ﷺ-এর সাথে তাঁর আকদ সম্পন্ন হয় এবং হিজরতের পর মদিনায় দ্বিতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে বিবাহোত্তর দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। নবীজি ﷺ-এর পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র কুমারী বধূ এবং নবীজি ﷺ তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন।

৩. অগাধ পাণ্ডিত্য ও হাদিস শাস্ত্রে অবদান

  • জ্ঞানের সাগরে শ্রেষ্ঠত্ব: সাহাবায়ে কেরামের যে কোনো জটিল ফিকহি, তাফসীরি বা শরীয়তের কঠিন মাসআলায় হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন চূড়ান্ত সমাধানকারী। ইমাম যুহরী (রহ.) বলেন: “যদি সমস্ত মানুষের জ্ঞান এবং নবীজি ﷺ-এর সকল স্ত্রীদের জ্ঞানকে একত্র করা হয়, তবে আয়েশা (রা.)-এর জ্ঞানের পাল্লা নিশ্চিতভাবেই ভারী হবে।”
  • মুকসিরীন মিনাল হাদিস: তিনি সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিদের অন্যতম। তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২,২১০টি। পারিবারিক জীবন, মহিলাদের একান্ত মাসআলা, নবীজি ﷺ-এর রাতের ইবাদত ও অন্তর্মুখী চরিত্র তাঁর মাধ্যমেই উম্মাহর কাছে নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।
  • চিকিৎসা ও সাহিত্য জ্ঞান: তিনি কেবল ধর্মীয় জ্ঞানেই নয়, তৎকালীন চিকিৎসাশাস্ত্র, বংশবিদ্যা (নাসাব) ও অলঙ্কারপূর্ণ আরবি কবিতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।

৪. চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও পবিত্রতার ঐশী সনদ

منافقদের কুখ্যাত অপবাদ (ইফকের ঘটনা)-এর প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্রতা ও নিষ্পাপত্ব ঘোষণা করে পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূরের ১০টি আয়াত (আয়াত ১১-২০) অবতীর্ণ করেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াত হতে থাকবে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল; লাখ লাখ দিরহাম দান করে নিজে রোজা রেখে শুকনো রুটি দিয়ে ইফতার করতেন।

৫. ওফাত ও সমাধি

৫৮ হিজরির ১৭ই রমজান মুবারক মঙ্গলবার রাতে ৬৬ বছর বয়সে তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় ইন্তিকাল করেন। তাঁর ওসিয়ত অনুযায়ী মদিনার জান্নাতুল বাক্বী কবরস্থানে রাতের আঁধারে তাঁকে দাফন করা হয়। বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর জানাজার নামাজে ইমামতি করেন।


٨- عن عبد الله بن عمر أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: إذا أكل احدكم فليأكل بيمينه وليشرب بيمينه فان الشيطان يأكل بشماله ويشرب بشماله— [الدرجات: ٦]

[৮. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন ডান হাত দিয়ে খায় এবং যখন পান করে, সে যেন ডান হাত দিয়েই পান করে। কারণ নিশ্চয়ই শয়তান তার বাম হাত দিয়ে খায় এবং বাম হাত দিয়ে পান করে।”]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

আরবি শব্দ মূলধাতু ও ব্যাকরণ অর্থ ও তাহকিক
فَلْيَأْكُلْ فعل مضارع مجزوم بلام الأمر (أ-ك-ل) সে যেন আহার করে বা খায়।
بِيَمِينِهِ جار ومجرور ومضاف إليه (ي-م-ن) তার ডান হাত দিয়ে; ইসলামে শুভ ও বরকতময় কাজের প্রতীক।
وَلْيَشْرَبْ فعل مضارع مجزوم بلام الأمر (ش-ر-ب) এবং সে যেন পান করে।
بِشِمَالِهِ جار ومجرور ومضاف إليه (ش-م-ل) তার বাম হাত দিয়ে।
فَإِنَّ الشَّيْطَانَ جملة تعليلية مؤكدة بإنّ কেননা নিশ্চয়ই শয়তান (মানবজাতির চিরশত্রু ইবলিস)।

খ. হাদিসের ফিকহি বিধান ও তাৎপর্য

  1. ডান হাতে খাওয়া ও পান করার হুকুম:
    • জুমহুর ফুকাহায়ে কেরাম (হানাফি, মালেকি, শাফেঈ): ডান হাতে আহার করা ও পানীয় পান করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং সুন্নাতে হুদা। বিনা ওজরে বাম হাতে খাওয়া মাকরূহে তাহরীমী।
    • ইমাম ইবনে হাযম, ইবনুল কাইয়্যিম ও কতিপয় মুহাদ্দিস: আদেশসূচক শব্দ («فَلْيَأْكُلْ») এবং শয়তানের অনুকরণের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার কারণে ডান হাতে খাওয়া ওয়াজিব এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বাম হাতে খাওয়া হারাম। তবে ডান হাতে কোনো ক্ষত বা রোগ থাকলে ওজরবশত বাম হাতে খাওয়া সর্বসম্মতভাবে জায়েয।
  2. শয়তানের সাদৃশ্য পরিহার: ইসলাম মুমিনদেরকে প্রতিটি পদক্ষেপে শয়তানের বৈশিষ্ট্য ও চালচলন থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত থাকতে নির্দেশ দেয়। শয়তান অহংকার ও অবাধ্যতার বশে বাম হাতে আহার ও পান করে; তাই মুমিন বিনয় ও কৃতজ্ঞতার সাথে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ডান হাত দিয়ে গ্রহণ করবে।
  3. দৈহিক অঙ্গের সঠিক বণ্টন: ইসলামে ডান হাত পবিত্র ও সম্মানিত কাজের জন্য (খাওয়া, পান করা, সালাম দেওয়া, দান-সদকা করা), আর বাম হাত নাপাকী ও অপবিত্রতা দূর করার জন্য (ইস্তিনজা, নাক পরিষ্কার ইত্যাদি) নির্ধারিত।

(الف) اكتب ترجمة عبد الله بن عمر— [الدرجات: ٤]

[(ক) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর প্রামাণ্য জীবনী সংক্ষেপে রচনা কর।]

ভূমিকা: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ছিলেন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সুন্নাতের সবচেয়ে কঠোর ও নিষ্ঠাবান অনুসারী, প্রখ্যাত ফকীহ এবং হাদিস বর্ণনাকারীদের দ্বিতীয় শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব।

১. নাম, পরিচয় ও ইসলাম গ্রহণ

  • নাম ও বংশপরিচয়: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনুল খাত্তাব আল-কুরাশী আল-আদাভী। পিতা খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এবং মাতা যয়নব বিনতে মায’ঊন (রা.)।
  • উপনাম (কুনিয়াত): আবু আব্দুর রহমান (أبو عبد الرحمن)।
  • ইসলাম গ্রহণ ও হিজরত: তিনি বাল্যকালেই পিতা উমর (রা.)-এর সাথে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পিতার সাথেই মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন।

২. সমরাঙ্গনে ও জিহাদে অংশগ্রহণ

বদর ও উহুদের যুদ্ধে তিনি যোগদানের ব্যাকুল ইচ্ছা প্রকাশ করলেও বয়স অপ্রাপ্ত (১৪ বছর) হওয়ায় রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে অনুমতি দেননি। পরবর্তীতে ১৫ বছর বয়সে খন্দকের যুদ্ধে তিনি প্রথম প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। এরপর বায়আতে রিদওয়ান, খায়বার, মক্কা বিজয়, হুনাইন, তাবুক এবং পরবর্তীকালে ইয়ারমুক ও উত্তর আফ্রিকা বিজয়ের ঐতিহাসিক অভিযানে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন।

৩. ইত্তিবায়ে সুন্নাহর মূর্ত প্রতীক

সাহাবায়ে কেরামের মাঝে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিটি ছোট-বড় সুন্নাহ হুবহু অনুসরণে হযরত ইবনে উমর (রা.) ছিলেন অতুলনীয়। সফরে নবীজি ﷺ যে যে স্থানে নামাজ পড়েছেন, যে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিয়েছেন বা যে পথে উট ঘুরিয়েছেন, ইবনে উমর (রা.) সারা জীবন পরম ভালোবাসায় ঠিক সেই স্থানগুলোতে একইভাবে নামাজ পড়তেন ও বিশ্রাম নিতেন। সাহাবায়ে কেরাম বলতেন: “সুন্নাহর অনুসরণে ইবনে উমরের চেয়ে অধিক সতর্ক আর কাউকে দেখা যায়নি।”

৪. ইলমি মর্যাদা ও হাদিস সংরক্ষণ

  • মুকসিরীন মিনাল হাদিস: হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর পরেই সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি হলেন তিনি। তাঁর বর্ণিত হাদিসের মোট সংখ্যা ২,৬৩০টি
  • ফতোয়া প্রদানে সতর্কতা: তিনি ছিলেন মদিনার সাত ফকীহর শিক্ষক। কোনো মাসআলায় পূর্ণ সুনিশ্চিত না হলে কখনো ফতোয়া দিতেন না এবং বলতেন: “তোমরা কি আমাদের পিঠকে জাহান্নামের সেতু বানাতে চাও?”
  • রাজনৈতিক নির্লিপ্ততা ও যুহদ: সাহাবায়ে কেরামের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়াননি এবং খেলাফতের প্রস্তাব বারবার ফিরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ইবাদতময় জীবন বেছে নিয়েছিলেন।

৫. ওফাত

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। অবশেষে ৭৩ হিজরিতে ৮৪ বা ৮৬ বছর বয়সে মক্কা মুকাররমায় ওফাত পান। তাঁকে মক্কার ‘যী তুওয়া’ নামক স্থানে মুজাহাজিরীনদের কবরস্থানে দাফন করা হয়।


٩- عن ابى ذرٍّ قال اوصانى خلیلى صلى الله عليه وسلم فقال: اذا طبخت حَرَقَةً (مرقةً) فأكثره ماءها، ثم انظر أهل بيتٍ من جيرانك، فاغرف لهم منها— [الدرجات: ٦]

[৯. হযরত আবু যার আল-গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার পরম বন্ধু (রাসূলুল্লাহ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ওসিয়ত করে বলেছেন: “যখন তুমি ঝোলযুক্ত কোনো তরকারি রান্না করবে, তখন তাতে পানির পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। অতঃপর তোমার প্রতিবেশীদের মধ্য থেকে কোনো পরিবারের দিকে নজর দেবে এবং তাদেরকে সেখান থেকে কিছু হাদিয়া হিসেবে পাত্রে তুলে দেবে।”]

ক. হাদিসের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)

আরবি শব্দ মূলধাতু ও ব্যাকরণ অর্থ ও তাহকিক
أَبُو ذَرٍّ (رض) جندب بن جنادة الغفاري হযরত আবু যার আল-গিফারী; ইসলামের ৫ম বা ৬ষ্ঠ সাহাবি, যুহদ ও সততার প্রতীক।
أَوْصَانِي فعل ماض، باب إفعال (و-ص-ي) আমাকে অন্তরের গভীর থেকে ওসিয়ত বা বিশেষ উপদেশ দিয়েছেন।
خَلِيلِي اسم مضاف إلى الياء (خ-ل-ل) আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু, পরম প্রিয়জন; অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ।
طَبَخْتَ فعل ماض للمخاطب (ط-ب-خ) তুমি রান্না করলে বা পাক করলে।
مَرَقَةً / حَرَقَةً اسم مفرد مؤنث (م-ر-ق) ঝোলযুক্ত গোশত বা তরকারির স্যুপ; মূল সহীহ মুসলিমে ‘مرقة’ (মারাক্বা) এসেছে, প্রশ্নপত্রে মুদ্রণ প্রমাদে ‘حرقة’ হয়েছে।
فَأَكْثِرْ مَاءَهَا فعل أمر، باب إفعال (ك-ث-ر) তার পানির পরিমাণ বৃদ্ধি কর বা ঝোল বেশি কর।
فَاغْرِفْ لَهُمْ فعل أمر، باب ضرب (غ-ر-ف) তাদের জন্য বড় চামচে তুলে দাও, পাত্রে হাদিয়া হিসেবে প্রদান কর।

খ. হাদিসের মর্মস্পর্শী সামাজিক ও চারিত্রিক শিক্ষা

  1. সামাজিক সহমর্মিতার সহজতম রূপ: ইসলাম কেবল বিত্তবানদের ওপরই দান-সদকা সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং একজন অতিদরিদ্র মানুষও চাইলে কীভাবে সমাজে দানের সংস্কৃতি জারি রাখতে পারে, তা এই হাদিসে শেখানো হয়েছে। অতিরিক্ত গোশত বা মসলা কেনার সামর্থ্য না থাকলেও তরকারিতে একটু পানি বেশি দিয়ে ঝোল বৃদ্ধি করে প্রতিবেশীর ঘরে পাঠানো সম্ভব।
  2. প্রতিবেশীর মনের আকাঙ্ক্ষার মূল্যায়ন: রান্নার সময় সুস্বাদু খাবারের সুবাস স্বভাবতই চারপাশের প্রতিবেশীর ঘরে পৌঁছায়, বিশেষত ক্ষুধার্ত শিশুদের মনে খাবারের তীব্র বাসনা সৃষ্টি হতে পারে। সেই মুহূর্তে প্রতিবেশীর ঘরে তরকারির অংশবিশেষ পাঠানো তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এক অনবদ্য মাধ্যম।

(الف) بين حق الجيران فى ضوء القرآن والسنة— [الدرجات: ٤]

[(ক) কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রতিবেশীর অধিকারসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা: ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত সুউচ্চ ও পবিত্র। একটি শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে ইসলাম প্রতিবেশীর হক আদায়কে ঈমানের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে।

১. পবিত্র কুরআনের আলোকে প্রতিবেশীর অধিকার

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর নিজের ইবাদত ও পিতা-মাতার খেদমতের নির্দেশের পাশাপাশি প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন:

﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا﴾

“আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকীন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী এবং পার্শ্ববর্তী সহচরের সাথে উত্তম আচরণ কর…” (সূরা আন-নিসা: ৩৬)।

কুরআনের আলোকে প্রতিবেশীর তিনটি শ্রেণি:

প্রতিবেশীর শ্রেণি পরিচয় প্রাপ্য অধিকার (হক)
১. তিন হকের অধিকারী প্রতিবেশী যে প্রতিবেশী একাধারে মুসলিম এবং নিকটাত্মীয়। ১. ইসলামের হক, ২. আত্মীয়তার হক, ৩. প্রতিবেশীর হক।
২. দুই হকের অধিকারী প্রতিবেশী যে প্রতিবেশী মুসলিম কিন্তু আত্মীয় নয়। ১. ইসলামের হক, ২. প্রতিবেশীর হক।
৩. এক হকের অধিকারী প্রতিবেশী যে প্রতিবেশী অমুসলিম বা ভিনধর্মী। ১. প্রতিবেশীর মানবিক ও সামাজিক হক।

২. সহীহ সুন্নাহর আলোকে প্রতিবেশীর মর্যাদা ও অধিকার

  1. উত্তরাধিকারীর সমতুল্য মর্যাদা: হযরত আয়েশা ও ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    «مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ»

    “জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে অবিরাম এত বেশি তাগিদ দিচ্ছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী (মীরাসের অংশীদার) বানিয়ে দেবেন!” (সহীহ বুখারী: ৬০১৪, সহীহ মুসলিম: ২৬২৪)।

  2. ঈমানের অন্যতম পরিমাপক: নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    «وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ! قِيلَ: وَمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»

    “আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়! জিজ্ঞেস করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল! সে কে? তিনি বললেন: যার অনিষ্ট ও কষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।” (সহীহ বুখারী: ৬০১৬)।

  3. প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রেখে খাওয়া হারাম: নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    «مَا آمَنَ بِي مَنْ بَاتَ شَبْعَانًا وَجَارُهُ جَائِعٌ إِلَى جَنْبِهِ وَهُوَ يَعْلَمُ بِهِ»

    “সে ব্যক্তি আমার ওপর পূর্ণ ঈমান আনেনি, যে নিজে পরিতৃপ্ত হয়ে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে এবং সে তা অবগত থাকে।” (মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৩০৭; সহীহ)।

৩. প্রতিবেশীর পারস্পরিক ব্যবহারিক দায়িত্বসমূহ

  • প্রতিবেশীকে কোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক কষ্ট বা জ্বালাতন না করা।
  • প্রতিবেশী ঋণ চাইলে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে ঋণ দেওয়া এবং সাহায্য করা।
  • প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া ও সেবা প্রদান করা।
  • প্রতিবেশীর সুখে আনন্দ প্রকাশ ও অভিনন্দন জানানো এবং বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া ও পাশে দাঁড়ানো।
  • প্রতিবেশী মৃত্যুবরণ করলে তার কাফন-দাফন ও জানাজায় শরিক হওয়া।
  • উপহার আদান-প্রদান করা, এমনকি তা সামান্য ঝোলযুক্ত তরকারি হলেও।

مجموعة (د)

١٠- اكتب ترجمة الامام ابن أبى شيبة ثم بين مكانته فى علم الحديث— [الدرجات: ১০]

[১০. ইমাম ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.)-এর প্রামাণ্য জীবনী রচনা কর এবং হাদিসশাস্ত্রে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা ও অবস্থান বিশদভাবে বর্ণনা কর।]

ভূমিকা: ইসলামের সোনালী যুগে ইলমে হাদিস সংরক্ষণ ও সংকলনে যে কয়জন ক্ষণজন্মা মনীষী অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলেন ইমামুল হাফেয আল-হুজ্জাহ আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাফেযে হাদিস, সুবিশাল মুসান্নাফের সংকলক এবং সিহাহ সিত্তার মহান ইমামগণের উস্তাদ।

১. নাম, বংশপরিচয় ও জন্ম

  • নাম ও উপনাম: আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবি শায়বাহ ইব্রাহিম ইবনে উসমান আল-কুফী আল-আবসী। তাঁর উপনাম (কুনিয়াত) হলো ‘আবু বকর’, তবে তিনি স্বীয় পিতামহের নামানুসারে ইতিহাসে ‘ইবনে আবি শায়বাহ’ (ابن أبي شيبة) নামেই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।
  • জন্ম: তিনি ১৫৯ হিজরিতে তদানীন্তন জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র ইরাকের ঐতিহাসিক কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।
  • অভিজাত ইলমি পরিবার: তিনি একটি অনন্য হাদিসবেত্তা পরিবারে লালিত-পালিত হন। তাঁর পিতা মুহাম্মদ, পিতামহ আবু শায়বাহ, দুই ভাই উসমান ইবনে আবি শায়বাহ ও কাসিম ইবনে আবি শায়বাহ এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র ও পৌত্র প্রত্যেকেই ছিলেন হাদিস শাস্ত্রের প্রথিতযশা মুহাদ্দিস।

২. জ্ঞানার্জন ও উস্তাদবৃন্দ

ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ শৈশবেই তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করেন এবং ইলমে হাদিস অন্বেষণে কুফা, বসরা, বাগদাদ, হেজাজ ও শাম ভ্রমণ করেন। তিনি সমকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসীনদের সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় ইলম চর্চা করেন। তাঁর প্রখ্যাত উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন:

  • ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ (রহ.)
  • ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)
  • ইমাম ওয়াকী ইবনুল জাররাহ (রহ.)
  • ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান (রহ.)
  • ইমাম হুশাইম ইবনে বাশীর (রহ.)
  • ইমাম আলী ইবনে মুসহির (রহ.)
  • ইমাম জারীর ইবনে আব্দুল হামিদ (রহ.) প্রমুখ।

৩. বিখ্যাত ছাত্রবৃন্দ

তাঁর ইলমি দরবারে সহস্রাধিক তালিবে ইলম উপস্থিত হতেন। বিশ্ববিখ্যাত হাদীস বিশারদ ও সিহাহ সিত্তার প্রায় সকল ইমামই ছিলেন তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র:

  • ইমামুল বুখারী (সহীহ বুখারীতে তাঁর থেকে রেওয়ায়েত এনেছেন)
  • ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (সহীহ মুসলিমে তাঁর থেকে সর্বাধিক ১,৫৪০টিরও বেশি হাদিস সংকলন করেছেন!)
  • ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী
  • ইমাম ইবনে মাজাহ আল-কাযভীনী
  • ইমাম আবু যুরআ আর-রাযী ও আবু হাতিম আর-রাযী প্রমুখ।

৪. হাদিসশাস্ত্রে তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা (مكانته فى علم الحديث)

ইলমে হাদিসের জগতে ইমাম ইবনে আবি শায়বাহর অবস্থান ছিল পর্বতের মতো অবিচল। মুহাদ্দিসীন কেরাম তাঁর স্মৃতিশক্তি ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে অনন্য মন্তব্য করেছেন:

  1. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): “আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ হলেন সততা ও বিশ্বস্ততার এক মূর্ত প্রতীক (صَدُوقٌ).”
  2. ইমাম আবু যুরআ আর-রাযী (রহ.): “আমি আবু বকরের চেয়ে অধিক হাদিস মুখস্থ রাখা ব্যক্তি খুব কমই দেখেছি।”
  3. হাফেয আল-ইজলী (রহ.): “তিনি ছিলেন পরম বিশ্বস্ত (সিক্বাহ), হাদিসের অগাধ হাফেয এবং ইলমের সাগর।”
  4. ইমাম যাহাবী (রহ.): “তিনি হলেন ইমাম, সাইয়্যিদুহুল হুফ্ফাজ, উম্মতের মহান আলিম এবং প্রখ্যাত আল-মুসান্নাফ গ্রন্থের রচয়িতা।”
  5. লাখো হাদিসের হাফেয: তিনি লক্ষাধিক হাদিস সনদ ও মতনসহ মুখস্থ রাখতেন। তাঁর সংকলিত মুসান্নাফ গ্রন্থটি হাদিস ও সাহাবা-তাবেয়ীগণের ফতোয়ার এক অবিনাশী জ্ঞানভাণ্ডার।

৫. কালজয়ী রচনাবলি

তিনি উম্মাহর জন্য বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন:

  • আল-মুসান্নাফ ফিল আহাদিসি ওয়াল আছার (المصنف في الأحاديث والآثار): তাঁর সর্বাধিক প্রশংসিত ও বিশালতম গ্রন্থ, যাতে প্রায় ৪০ হাজার রেওয়ায়েত সংকলিত রয়েছে।
  • কিতাবুয যুহদ (كتاب الزهد): আত্মশুদ্ধি ও পরকালীন মুক্তির হাদিস সংকলন।
  • কিতাবুল ঈমান (كتاب الإيمان): আক্বিদা ও ঈমান সংক্রান্ত হাদিস।
  • কিতাবুত তারীখ (كتاب التاريخ): সাহাবা ও তাবেয়ীদের ঐতিহাসিক জীবনী।
  • কিতাবুল আদব (كتاب الأدب): দৈনন্দিন জীবন ও নৈতিকতার হাদিস।

৬. ওফাত

এই মহান হাদিসসম্রাট ২৩৫ হিজরির মুহাররম মাসে পবিত্র কুফা নগরীতে ৭৬ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁর ওফাতে উম্মাহ এক অনন্য জ্ঞানকোষকে হারায়।


١١- بين خصائص مصنف عبد الرزاق ومكانته بين الكتب الحديثية— [الدرجات: ১০]

[১১. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং হাদিস গ্রন্থসমূহের মাঝে এর মর্যাদা ও গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে তুলে ধর।]

ভূমিকা: হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের ফতোয়া সংকলনের ধারাগুলোর মধ্যে ‘মুসান্নাফ’ ধারাটি ছিল সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। এই ধারার প্রাচীনতম ও সর্বাধিক প্রামাণ্য মাইলফলক হলো ইয়েমেনের বিখ্যাত ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস-সান’আনী (রহ.) কর্তৃক সংকলিত «المُصَنَّف» (আল-মুসান্নাফ)।

১. গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও গ্রন্থের রূপরেখা

  • গ্রন্থকার: ইমামুল হাফেয আল-হুজ্জাহ আবু বকর আব্দুর রাজ্জাক ইবনে হুম্মাম ইবনে নাফে আস-সান’আনী আল-হিমইয়ারী (১২৬ – ২১১ হিজরি)। তিনি তৎকালীন ইয়েমেনের রাজধানী সান’আর প্রধান মুহাদ্দিস ছিলেন।
  • গ্রন্থের পরিচয়: গ্রন্থটির পূর্ণ নাম ‘আল-মুসান্নাফ ফিল হাদিস ওয়াল আছার’। এটি ফিকহি অধ্যায় অনুসারে সুবিন্যস্ত। এতে মোট ২১,৩০০টিরও বেশি রেওয়ায়েত সংকলিত রয়েছে, যা ৩১টি মূল ‘কিতাব’ (যেমন: কিতাবুত তাহারাত, কিতাবুস্ সালাত, কিতাবুয যাকাত, কিতাবুল বুয়ূ ইত্যাদি) এবং শত শত পরিচ্ছেদে বিভক্ত।

২. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص الكتاب)

  1. মারফূ হাদিস ও আছারের সমন্বিত সংকলন: মুসান্নাফ পদ্ধতির মূল সৌন্দর্য হলো—এতে নবী করীম ﷺ-এর মারফূ হাদিসের পাশাপাশি সাহাবায়ে কেরামের আমল ও ফতোয়া (আছারে সাহাবা) এবং বিশিষ্ট তাবেয়ীনদের ইজতিহাদ ও ফতোয়া অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয়েছে।
  2. প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য সনদভাণ্ডার: ইমাম আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন হাদিসের উচ্চমানের সনদের (উলুউস্ সানাদ) অধিকারী। তিনি ইমাম যুহরী, মা’মার বিন রশিদ, ইবনে জুরাইজ এবং সুফিয়ান আস-সাওরীর মতো শীর্ষ ইমামদের কাছ থেকে সরাসরি শুনে হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন: আব্দুর রাজ্জাক ← মা’মার ← যুহরী ← আনাস (রা.)—যা হাদিস শাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বর্ণালী সনদ (সিলসিলাতুয যাহাব)।
  3. তুলনামূলক ফিকহের অতুলনীয় আকর: এই গ্রন্থে মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা ও ইয়েমেনের ফিকহি আছারসমূহ একত্রিত করা হয়েছে। ফলে হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি মাযহাবের ইজতিহাদ ও দলীল পর্যালোচনার জন্য এটি এক অনিবার্য উৎস।
  4. সুনান ও মুসনাদ ধারার সেতুবন্ধন: এটি কেবল সাহাবিদের নামের ভিত্তিতে সংকলিত নয় (যেমন মুসনাদ), আবার কেবল আহকাম হাদিসেই সীমাবদ্ধ নয় (যেমন সুনান); বরং এটি ফিকহ, আক্বিদা, তাফসীর, মাগাযী, আদব ও যুহদ—সবকিছুর সমন্বয়ে এক পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জ্ঞানকোষ।
  5. আমলের বিশুদ্ধ রূপ সংরক্ষণ: সাহাবায়ে কেরাম বাস্তবে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহকে কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করতেন, তার প্রামাণ্য নজির এই গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে।

৩. হাদিস শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহের মাঝে এর মর্যাদা (مكانته بين الكتب الحديثية)

দিক ও ক্ষেত্র মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
আইম্মায়ে হাদিসের ভ্রমণ তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন পায়ে হেঁটে সুদূর বাগদাদ থেকে দুর্গম ইয়েমেনের সান’আয় সফর করেছিলেন কেবল আব্দুর রাজ্জাকের কাছ থেকে এই মুসান্নাফ শোনার ও লেখার জন্য।
সিহাহ সিত্তার মূল ভিত্তি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমসহ সিহাহ সিত্তার সংকলকগণ মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক থেকে সরাসরি শত শত হাদিস তাঁদের সহীহ ও সুনান গ্রন্থসমূহে গ্রহণ করেছেন।
ইলাল ও জারহ-তা’দীলের দলিল মুহাদ্দিসীন কেরাম কোনো হাদিসের সনদ ও মতন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকের রেওয়ায়েতগুলোকে অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতেন।
হারিয়ে যাওয়া হাদিসের উদ্ধার আধুনিক যুগে এই গ্রন্থটি দীর্ঘদিন পাণ্ডুলিপি আকারে অপ্রকাশিত ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের আল্লামা হাবীবুর রহমান আল-আজমী (রহ.)-এর অক্লান্ত পরিশ্রমে বৈরুত থেকে ১১ খণ্ডে এটি সম্পাদিত হয়ে প্রকাশিত হলে তা বিশ্বজুড়ে হাদিস গবেষণায় এক নতুন বিপ্লব সৃষ্টি করে।

١٢- اكتب ترجمة سنن الامام الدارمي— ثم بين خصائصه ومميزاتة ومنزلته عند المحدثين— [الدرجات: ১০]

[১২. ইমাম দারিমী (রহ.)-এর ‘সুনান’ গ্রন্থের পরিচিতি রচনা কর এবং এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ ও মুহাদ্দিসগণের নিকট এর মর্যাদা বিশদভাবে আলোচনা কর।]

ভূমিকা: তৃতীয় হিজরি শতকে ইলমে হাদিসের বিশুদ্ধতম গ্রন্থসমূহের মধ্যে «سنن الدارمي» (সুনানে দারিমী) এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী। বিশুদ্ধ সনদের প্রাচুর্য, বিদআত ও বিকৃতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান এবং সূক্ষ্ম ফিকহি বিন্যাসের কারণে মুহাদ্দিসীন কেরাম এই গ্রন্থটিকে হাদিসের প্রথম সারির অন্যতম নির্ভরযোগ্য আকর হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।

১. গ্রন্থকার ও গ্রন্থের পরিচিতি

  • গ্রন্থকার: ইমামুল হাফেয আল-কবীর আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনুল ফাদল ইবনে বাহরাম আত-তামীমী আদ-দারিমী আস-সামারকান্দী (১৮১ – ২৫৫ হিজরি)। তিনি মধ্য এশিয়ার প্রখ্যাত ইলমি কেন্দ্র সমরকন্দের অধিবাসী ছিলেন।
  • গ্রন্থের নাম ও প্রকৃতি: গ্রন্থটি সাধারণ পাঠকদের কাছে ‘সুনানে দারিমী’ নামে খ্যাত হলেও হাদিসের পরিভাষায় মুহাদ্দিসগণ একে «المُسْنَدُ» (আল-মুসনাদ) বা «المُسْنَدُ الْجَامِعُ» (আল-মুসনাদ আল-জামে) বলে অভিহিত করেছেন। এতে মোট ৩,৫৫০টিরও বেশি হাদিস ও আছার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

২. সুনানে দারিমীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য (خصائصه ومميزاته)

  1. অনবদ্য ও সমৃদ্ধ ভূমিকা (المقدمة): সুনানে দারিমীর সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর সুদীর্ঘ তাত্ত্বিক ভূমিকা। এতে নবীজি ﷺ-এর পবিত্র শামায়েল ও চরিত্র, জাহেলি যুগের দুরবস্থা, কুরআন-সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার অপরিহার্যতা, রায় বা মতামতের ওপর সুন্নাহর প্রাধান্য, বিদআতীদের প্রত্যাখ্যান এবং ফতোয়া প্রদানে সাহাবায়ে কেরামের সতর্কতা সংক্রান্ত অত্যন্ত মৌলিক হাদিস ও আছার সন্নিবেশিত হয়েছে, যা অন্য কোনো গ্রন্থে এত সুন্দরভাবে মেলেনি।
  2. সুদৃঢ় ও উচ্চমানের সনদ (صحة الأسانيد وعلوها): ইমাম দারিমী হাদিস নির্বাচনে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তাঁর গ্রন্থে দুর্বল, মাতরূক বা ভিত্তিহীন হাদিসের সংখ্যা নেই বললেই চলে। ইমাম যাহাবী বলেন: “দারিমীর কিতাবটি সুনানের মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্বল হাদিস সংবলিত একটি গ্রন্থ।”
  3. উচ্চ সনদের সুলাসিয়াত (الثلاثيات): এই গ্রন্থে বহু হাদিস রয়েছে যা সুলাসিয়াত (ইমাম দারিমী ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মাঝে মাত্র ৩ জন রাবীর মধ্যস্থতা)। সুনানে দারিমীতে ১৫টিরও বেশি সুলাসিয়াত সনদ রয়েছে, যা সনদের অতি উচ্চ মর্যাদা (উলুউস্ সানাদ) প্রমাণ করে।
  4. সূক্ষ্ম ফিকহি তারতীব: ইমাম বুখারীর সমসাময়িক হওয়ায় ইমাম দারিমী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ফিকহি অনুচ্ছেদ (তারাজিমুল আবওয়াব) সাজিয়েছেন। প্রতিটি অনুচ্ছেদের শিরোনামের সাথে হাদিসের বক্তব্যের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান।
  5. মারফূ ও মওকূফের ভারসাম্য: এতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মারফূ হাদিসের পাশাপাশি তাবেয়ীনদের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া স্থান পেয়েছে, যা হাদিসের ব্যবহারিক প্রয়োগ বুঝতে সহায়ক।

৩. মুহাদ্দিসগণের নিকট সুনানে দারিমীর সুউচ্চ মর্যাদা ও মূল্যায়ন (منزلته عند المحدثين)

ক. সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবি:

ইসলামী বিশ্বে ‘উসূলে সিত্তা’ বা সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্থ কোনটি হবে—এ নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মাঝে তিনটি মতামত রয়েছে:

  • ইমাম ইবনে তাহির আল-মাকদিসী সুনানে ইবনে মাজাহ-কে ষষ্ঠ গ্রন্থ গণ্য করেছেন এবং পরবর্তীতে এটিই জনপরিসরে বহুল পরিচিতি পায়।
  • ইমাম রাযীন ইবনে মুআবিয়া ও ইবনুল আছীর মুওয়াত্তা ইমাম মালিক-কে ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করেছেন।
  • তবে ইমাম ইবনুস সালাহ, হাফেয আলাঈ, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী ও শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর মতো নিরপেক্ষ গবেষক ইমামগণ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে:

    «سُنَنُ الدَّارِمِيِّ أَوْلَى بِأَنْ يَكُونَ سَادِسَ السِّتَّةِ مِنْ سُنَنِ ابْنِ مَاجَهْ»

    “ইবনে মাজাহ-এর তুলনায় সুনানে দারিমী সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্থ হওয়ার অধিক যোগ্য ও অগ্রগণ্য।”

খ. দারিমীকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণসমূহ:

তুলনামূলক দিক সুনানে দারিমী সুনানে ইবনে মাজাহ
দুর্বল ও মুনকার হাদিস দুর্বল হাদিসের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য; কোনো জাল বা বানোয়াট হাদিস নেই বললেই চলে। প্রায় তিরিশটির মতো চরম দুর্বল ও মুনকার হাদিস রয়েছে।
সনদের নির্ভরযোগ্যতা রাবীগণ বিশ্বস্ত ও সুদৃঢ় হাফেয। কতিপয় বিতর্কিত রাবীর রেওয়ায়েত স্থান পেয়েছে।
মুহাদ্দিসদের সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্যতা সার্বিক সনদের বিচারে এটি সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিযীর সমমানের। একক বর্ণনায় কিছু অসংগতি পরিলক্ষিত হয়।

উপসংহার: সংক্ষেপে বলা যায়, সুনানে দারিমী কেবল একটি হাদিস গ্রন্থ নয়; বরং এটি বিশুদ্ধ হাদিস চয়ন, উচ্চমানের সনদ সংরক্ষণ এবং সুন্নাহভিত্তিক ইসলামি সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণের এক অমূল্য ঐতিহাসিক নির্দেশিকা।


উপসংহার ও সামগ্রিক মূল্যায়ন

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষের দিরাসাতুল হাদিস-৩ (বিষয় কোড: ২০২৪০৯) পাঠ্যক্রমটি হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী গবেষণামূলক দিগন্ত উন্মোচন করে। সিহাহ সিত্তার পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক যে মহান সংকলনগুলো হাদিসের সনদ ও ফিকহের মূল ভিত রচনা করেছিল—বিশেষ করে মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ এবং সুনানে দারিমী—এই তিনটি কালজয়ী গ্রন্থের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা ইসলামের প্রথম তিন শতাব্দীতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং তাবেয়ীনদের ইজতিহাদের নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।

২০২১ সালের এই প্রশ্নপত্রটিতে ইবাদত (যেমন জুমার গুরুত্ব, গোসল ও খুতবার বিধান), আত্মশুদ্ধি ও যুহদ (দুনিয়ার মোহমুক্তি, মৃত্যুচিন্তা, দীর্ঘ আশা ও প্রবৃত্তিপূজার কুফল), দৈনন্দিন সামাজিক ও মানবিক শিষ্টাচার (ডান হাতে পানাহার, বিসমিল্লাহর বরকত, প্রতিবেশীর হক), এবং হাদিসের আকর গ্রন্থ ও মুহাদ্দিসীনদের মূল্যায়ন—এই চারটি মৌলিক বিষয়ের চমৎকার সুষম সমন্বয় ঘটেছে। উপরিউক্ত প্রামাণ্য ও বিস্তারিত সমাধান শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের পাশাপাশি তাদের ইলমি ও আত্মিক জীবনে সুন্নাহর গভীর চর্চায় অনন্য পাথেয় হবে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের দিরাসাতুল হাদিস-৩ (২০২৪০৯) কোর্সে কোন কোন মূল হাদিস গ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত?

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের দিরাসাতুল হাদিস-৩ কোর্সের পাঠ্যতালিকায় প্রধানত তিনটি প্রাচীন ও প্রামাণ্য হাদিস গ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: ১. ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আস-সান’আনী (রহ.)-এর আল-মুসান্নাফ, ২. ইমাম আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ (রহ.)-এর আল-মুসান্নাফ এবং ৩. ইমাম আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আদ-দারিমী (রহ.)-এর সুনানে দারিমী

২. মুসান্নাফ ও সুনান গ্রন্থের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

হাদিসের যে গ্রন্থে কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মারফূ হাদিসসমূহ ফিকহি অধ্যায় অনুসারে সংকলিত হয় তাকে সাধারণ পরিভাষায় ‘সুনান’ বলা হয়। পক্ষান্তরে, যে গ্রন্থে মারফূ হাদিসের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যায় সাহাবায়ে কেরামের আমল ও বাণী (মওকূফ/আছার) এবং তাবেয়ীনদের ফতোয়া (মাক্বতূ) ফিকহি বিন্যাসে সাজানো হয় তাকে ‘মুসান্নাফ’ বলা হয়। মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ও মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ এই শ্রেণির শীর্ষ উদাহরণ।

৩. জুমার দিন গোসল করার বিশুদ্ধ শারঈ বিধান কী?

জুমহুর ফুকাহায়ে কেরাম (হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি মাযহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম)-এর মতে জুমার দিন গোসল করা হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বা সুন্নাতে মুস্তাহাব্বা। জুমার দিন কেউ ওজরবশত গোসল করতে না পেরে কেবল ওজু করলেও তার জুমার নামাজ কোনো প্রকার অপূর্ণতা ছাড়াই সম্পূর্ণ সহীহ হবে। তবে বিনা কারণে এই সুন্নাত বর্জন করা অনুচিত।

৪. জুমার খুতবা কি সম্পূর্ণ বাংলা বা স্থানীয় মাতৃভাষায় দেওয়া জায়েয?

জুমহুর মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কেরামের মতে মিম্বরে দাঁড়িয়ে প্রদত্ত মূল দুটি খুতবা আরবি ভাষাতেই প্রদান করা সুন্নাত ও ওয়াজিবতুল্য শারঈ বিধান। কারণ এটি একটি নির্ধারিত ইবাদত। তবে সাধারণ মানুষকে দ্বীনের নসীহত বোঝানোর স্বার্থে খুতবার পূর্বে বাংলায় বিশদ আলোচনা ও বয়ান পেশ করাই শরীয়তের সার্বিক উদ্দেশ্যের সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৫. সুনানে দারিমী গ্রন্থটিকে কেন সিহাহ সিত্তার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে?

ইমাম ইবনুস সালাহ, হাফেয আলাঈ, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী ও শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর মতে সুনানে দারিমী গ্রন্থটি সুনানে ইবনে মাজাহর চেয়ে অধিকতর বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য। এতে চরম দুর্বল, মাতরূক বা ভিত্তিহীন হাদিস নেই বললেই চলে এবং এতে বহু উচ্চ সনদের সুলাসিয়াত হাদিস রয়েছে। একারণে নিরপেক্ষ গবেষকগণ একে সিহাহ সিত্তার ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করার পক্ষে মত দিয়েছেন।

৬. বাম হাতে পানাহার করার ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কী?

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে বাম হাতে আহার ও পানীয় গ্রহণ করা মাকরূহে তাহরীমী বা না-জায়েয, কারণ এটি শয়তানের স্বভাব। ডান হাত দিয়ে খাওয়া ও পান করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তবে ডান হাতে কোনো রোগ, ক্ষত বা অপারগতা থাকলে বাম হাতে খাওয়ার শারঈ অবকাশ রয়েছে।

৭. ইসলামে প্রতিবেশীর কয়টি স্তর রয়েছে এবং তাদের অধিকার কী কী?

পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতের আলোকে প্রতিবেশী তিন প্রকার: ১. আত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশী (যার তিনটি হক: ইসলাম, আত্মীয়তা ও প্রতিবেশীর হক), ২. অনাত্মীয় মুসলিম প্রতিবেশী (যার দুটি হক: ইসলাম ও প্রতিবেশীর হক), এবং ৩. অমুসলিম প্রতিবেশী (যার একটি হক: মানবিক ও সামাজিক প্রতিবেশীর হক)। প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেওয়া এবং সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ঈমানের অঙ্গ।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন