জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

আল-ফিকহ ওয়া উসূলুহু (Al-Fiqh wa Usuluhu) – 202408, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
১৯০ মিনিট পড়ার সময়
১৬ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 163
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ٢٠٢١
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
الفقه وأصوله
[আল-ফিকহ ওয়া উসূলুহু]
বিষয় কোড: 202408
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]


الفقه [আল-ফিকহ] (পূর্ণমান — ৪০)

[أجب عن اثنين من مجموعة (الف) وعن اثنين من مجموعة (ب)-]

[মجموعة (الف) থেকে দুইটি এবং مجموعة (ب) থেকে দুইটি প্রশ্নের উত্তর দাও]

مجموعة (الف) [الدرجات: ১৫ × ২ = ৩০]

١- ما معنى الفقه لغة واصطلاحًا؟ اذكر موضوعه وغرضه مفصلاً-

[১. الفقه এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? এর আলোচ্য বিষয় ও উদ্দেশ্য বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী জীবনব্যবস্থায় মানবজীবনের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সুশৃঙ্খল ও মার্জিত রাখার জন্য যে শাস্ত্রের সৃষ্টি, তা-ই হলো ফিকহ শাস্ত্র (علم الفقه)। ফিকহ কেবল আইনের সমষ্টি নয়, বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহর গভীর দার্শনিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের নির্যাস। মানবজাতির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান ফিকহের মাধ্যমে প্রস্ফুটিত হয়। ফিকহ শাস্ত্রের নির্ভুল জ্ঞান ব্যতিরেকে ইসলামের বিধিবিধান সঠিকভাবে পালন করা কোনো মুমিনের পক্ষে সম্ভব নয়। নিম্নে ফিকহের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ, এর আলোচ্য বিষয় এবং সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

১. الفقه (ফিকহ)-এর আভিধানিক অর্থ

আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘ফিকহ’ (الفِقْهُ) শব্দটি একটি মাসদার বা ক্রিয়ামূল। এর মূল ধাতু হলো ف – ق – هـ (ফা-ক্বাফ-হা)। এটি বাবে ‘সামিআ-ইয়াসমাউ’ (فَقِهَ – يَفْقَهُ – فِقْهًا) থেকে ব্যবহৃত হলে অর্থ হয় ‘জানা বা বোঝা’, আর বাবে ‘কারুমা-ইয়াকুরুমু’ (فَقُهَ – يَفْقُهُ – فَقَاهَةً) থেকে ব্যবহৃত হলে এর অর্থ হয় ‘প্রজ্ঞাবান বা ফকীহ হওয়া’।

ভাষাতাত্ত্বিক ও অভিধানবিদদের মতে ফিকহ শব্দের একাধিক আভিধানিক অর্থ রয়েছে:

  1. الفَهْمُ المُطْلَقُ (সাধারণ বোঝাপড়া বা জ্ঞান): কোনো বিষয় সাধারণ বা বাহ্যিকভাবে অনুধাবন করাকে ফিকহ বলা হয়। ইবনুল মানযূর তাঁর বিশ্বখ্যাত অভিধান লিসানুল আরব গ্রন্থে লিখেছেন: الفِقْهُ: الشَّعُورُ وَالعِلْمُ وَالفَهْمُ (ফিকহ অর্থ অনুভূতি, জ্ঞান ও বোঝাপড়া)।
  2. الفَهْمُ الدَّقِيقُ وَفَهْمُ الأَشْيَاءِ الخَفِيَّةِ (সূক্ষ্ম ও গভীর বোধশক্তি): ইমাম রাগিব আল-আসফাহানী (রহ.) তাঁর মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: الفِقْهُ هُوَ التَّوَصُّلُ إِلَى عِلْمٍ غَائِبٍ بِعِلْمٍ شَاهِدٍ (দৃশ্যমান প্রমাণের সাহায্যে কোনো অদৃশ্য বা গভীর সত্যে উপনীত হওয়ার অনন্য মেধা ও সূক্ষ্ম বোধশক্তিকে ফিকহ বলে)। অর্থাৎ নিছক ওপরের বিষয় জানা ফিকহ নয়, বরং কোনো বিষয়ের অন্তর্নিহিত রহস্য উদঘাটন করাই ফিকহ।
  3. الفِطْنَةُ وَالذَّكَاءُ (প্রজ্ঞা ও প্রখর বুদ্ধিমত্তা): সাধারণ মানুষ যা সহজে বুঝতে পারে না, বিশেষ দূরদৃষ্টি দিয়ে তা অনুধাবন করাকে ফিকহ বলা হয়।

পবিত্র কুরআনে ‘ফিকহ’ শব্দের ব্যবহারিক প্রমাণ

পবিত্র কুরআনে ‘ফিকহ’ ধাতুটি বিভিন্ন আয়াতে গভীর বোধশক্তি ও উপলব্ধির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে:

  • সূরা হূদ, আয়াত ৯১: হযরত শুআইব (আ.)-এর কওম বলেছিল:

    قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيرًا مِّمَّا تَقُولُ

    [তারা বলল: হে শুআইব! আপনি যা বলেন তার অনেক কথাই আমরা বুঝি না বা অনুধাবন করতে পারি না।]

  • সূরা আন-নিসা, আয়াত ৭৮:

    فَمَالِ هَٰؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا

    [অতএব এ সম্প্রদায়ের কী হলো যে, তারা কোনো কথাই অনুধাবন করতে সক্ষম হচ্ছে না?]

  • সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত ১২২: দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা অর্জনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

    فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ

    [অতএব তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারে?]

হাদিস শরীফে ‘ফিকহ’ শব্দের ব্যবহার

হাদিস শরীফে ফিকহ শব্দটিকে সর্বোত্তম কল্যাণ ও প্রজ্ঞার অর্থে ভূষিত করা হয়েছে:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ

    [আল্লাহ তাআলা যার সার্বিক কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর ফিকহ (প্রজ্ঞা ও বুঝশক্তি) দান করেন। — সহীহ বুখারী: ৭১; সহীহ মুসলিম: ১০৩৭]

  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জন্য নবী করীম ﷺ দোআ করে বলেছিলেন:

    اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ وَعَلِّمْهُ التَّأْوِيلَ

    [হে আল্লাহ! আপনি তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা দান করুন এবং কুরআনের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন। — মুসনাদে আহমাদ: ২৩৯৭]

২. الفقه (ফিকহ)-এর পারিভাষিক অর্থ

ইসলামী শরীয়তের পারিভাষিক দৃষ্টিকোণে ফিকহের সংজ্ঞায়ন দুটি ঐতিহাসিক ধারায় বিকশিত হয়েছে — আদি ব্যাপক সংজ্ঞা এবং পরবর্তী উসূলবিদদের সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞা।

(ক) ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.)-এর সংজ্ঞা

হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ফিকহের যে সার্বজনীন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, তা হলো:

الفِقْهُ: مَعْرِفَةُ النَّفْسِ مَا لَهَا وَمَا عَلَيْهَا

অর্থ: “ফিকহ হলো মানুষের নিজের অধিকার ও দায়িত্ব অর্থাৎ নিজের জন্য যা কল্যাণকর ও উপকারী এবং যা ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক তা সঠিকভাবে জানা।”

সংজ্ঞার বিশ্লেষণ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর যুগে ‘ফিকহ’ শব্দটি আক্বীদা, আমল এবং আখলাক — এই ত্রিমুখী সামগ্রিক দ্বীনি জ্ঞানের সমন্বিত রূপ ছিল। এজন্য তিনি আক্বীদা বিষয়ক মৌলিক গ্রন্থকে নাম দিয়েছিলেন আল-ফিকহুল আকবর (الفقه الأكبر)। পরবর্তী ফকীহগণ এ সংজ্ঞার সাথে “عَمَلًا” (ব্যবহারিক দিক থেকে) শব্দটি যোগ করেন, যাতে বিশ্বাসগত বিষয় (আক্বীদা) ও অন্তরের বিষয় (তাযকিয়া) পৃথক হয়ে ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ফিকহের সংজ্ঞা সীমাবদ্ধ হয়: مَعْرِفَةُ النَّفْسِ مَا لَهَا وَمَا عَلَيْهَا عَمَلًا

(খ) জমহুর উসূলবিদ ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞা

পরবর্তীকালে উসূলবিদ ও জমহুর ফুক্বাহার নিকট ফিকহের সর্বাধিক প্রামাণ্য ও সর্বজনগৃহীত সংজ্ঞা হলো:

العِلْمُ بِالأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ العَمَلِيَّةِ المُكْتَسَبَةِ مِنْ أَدِلَّتِهَا التَّفْصِيلِيَّةِ

অর্থ: “সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত দলীলসমূহ হতে ইজতিহাদ ও গবেষণার মাধ্যমে আহরিত ব্যবহারিক শারয়ী বিধানাবলির নির্ভুল জ্ঞানই হলো ফিকহ।”

সংজ্ঞার শর্ত ও শব্দাবলির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ (تحليل قيود التعريف)

সংজ্ঞার অংশ পারিভাষিক তাৎপর্য যা বর্জন করা হয়েছে (মুহতারিযাত)
العلم (জ্ঞান) এখানে দলীলভিত্তিক অনুধাবন বোঝানো হয়েছে, যার মধ্যে নিশ্চিত জ্ঞান (ইয়াক্বীন) এবং প্রবল ধারণা (যননে গালিব) উভয়ই শামিল। অজ্ঞতা (জহল), ভিত্তিহীন সংশয় (শাক্ক) ও কল্পনাপ্রসূত ধারণা (ওয়াহম) এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
الأحكام (বিধানাবলি) ‘হুকুম’-এর বহুবচন। অর্থাৎ শরীয়তপ্রণেতার পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি নির্দেশ, নিষেধ বা অবকাশ। বস্তুর সত্তা ও গুণাবলির সাধারণ জ্ঞান (যেমন আকাশ, বাতাস সম্পর্কে জ্ঞান) বাদ পড়েছে।
الشرعية (শারয়ী) যা সরাসরি কুরআন, সুন্নাহ ও শরীয়তের উৎস থেকে গৃহীত। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান (যেমন: আগুন পোড়ায়), গাণিতিক সত্য (দুই আর দুই চার) ও প্রচলিত ব্যাকরণিক নিয়ম বাদ পড়েছে।
العملية (ব্যবহারিক) মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সম্পাদিত কায়িক ও বাহ্যিক আমল (সালাত, সিয়াম, ক্রয়-বিক্রয়, বিবাহ ইত্যাদি)। আক্বীদা ও বিশ্বাসগত জ্ঞান (যেমন আল্লাহর অস্তিত্ব, মালাইকা, পুনরুত্থান) বাদ পড়েছে, যা ইলমুল কালামের বিষয়।
المكتسبة (অর্জিত) গবেষণা, ইস্তিম্বাত ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে যা অর্জন করতে হয়। আল্লাহ তাআলার ইলম এবং সরাসরি অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত নববী ইলম বাদ পড়েছে, কারণ তা চিন্তা ছাড়াই অর্জিত।
من أدلتها التفصيلية (সুনির্দিষ্ট দলীল থেকে) কুরআন ও সুন্নাহর নির্দিষ্ট কোনো আয়াত বা হাদিসের ভিত্তিতে গৃহীত বিধান। উসূলুল ফিকহের সামগ্রিক দলীল (যেমন ‘আমর ওয়াজিব সাব্যস্ত করে’) বাদ পড়েছে, যা ফিকহের মূলনীতি।

৩. ফিকহ শাস্ত্রের আলোচ্য বিষয় (موضوع علم الفقه)

উসূলবিদদের সর্বসম্মত নীতি অনুযায়ী, প্রত্যেক শাস্ত্রের একটি নির্দিষ্ট আলোচ্য বিষয় থাকে। ফিকহ শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হলো:

«أَفْعَالُ الْمُكَلَّفِينَ مِنْ حَيْثُ إِنَّهَا مَحْكُومٌ عَلَيْهَا بِالأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ»

[শরয়ী বিধানের আওতায় আসার দিক থেকে শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত (মুকাল্লাফ) বান্দাদের যাবতীয় কায়িক কর্ম ও আচরণ।]

অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলিম বান্দা যেসব কাজ সম্পাদন করে, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নাকি নাজায়েয, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব, মুবাহ, হারাম, মাকরূহে তাহরীমী নাকি মাকরূহে তানযীহী — তা বিচার-বিশ্লেষণ করাই হলো ফিকহের আলোচ্য বিষয়।

মানবজীবনের বহুমুখী চাহিদার প্রেক্ষিতে ফিকহের আলোচ্য বিষয়কে প্রধান চারটি মৌলিক শাখায় বিন্যস্ত করা হয়:

  1. ১. আল-ইবাদাত (العِبَادَات): বান্দার সাথে তার মহান রবের সম্পর্ক নির্ধারণকারী বিধানাবলি। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: তাহরাত (পবিত্রতা), সালাত (নামাজ), যাকাত, সাওম (রোজা), হজ, মানত এবং কাফফারা।
  2. ২. আল-মুআমালাত (المُعَامَلَات): বান্দার সাথে অপর বান্দার আর্থিক ও পারস্পরিক লেনদেন সংক্রান্ত আইন। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: বায় (ক্রয়-বিক্রয়), সালাম, সার্ফ, ইজারা (ভাড়া ও পারিশ্রমিক), শারিকাহ (অংশীদারি কারবার), মুদারাবাহ, রেহান (বন্ধক), কিফালাত (জামিনদারি) এবং ওয়াকফ।
  3. ৩. আল-মুনাকাহাত বা আহওয়ালুশ শাখসিয়্যাহ (المُنَاكَحَات / الأَحْوَال الشَّخْصِيَّة): পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কিত বিধিমালা। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: নিকাহ (বিবাহ), মোহরানা, ভরণপোষণ (নাফাকা), তালাক, খোলা, লিআন, ইদ্দত, দুধপান (রেযাআত), নসব ও হেফাযত এবং তারাকাহ ও ফারায়েয (উত্তরাধিকার বণ্টন)।
  4. ৪. আল-উকূবাত ও আল-জিনায়াত (العُقُوبَات والجِنَايَات): অপরাধ দমন, শান্তি-শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক নীতিসংক্রান্ত আইন। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: কিসাস (হত্যার বদলা), দিয়াত (রক্তপণ), হুদূদ (চুরি, ব্যভিচার, মদ্যপানের নির্ধারিত দণ্ড), তা’যীর (বিচারকের সুবিবেচনামূলক শাস্তি), এবং সিয়ার ও জিহাদ (যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি)।

৪. ফিকহ শাস্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (غرض علم الفقه وغايته)

ফিকহ শাস্ত্র কোনো তাত্বিক বিলাসিতা নয়, বরং মানবজাতির সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতকরণে এর উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী:

  1. দ্বিদাহিক মুক্তি ও চিরস্থায়ী কল্যাণ (الفوز بسعادة الدارين): ফিকহ চর্চার সর্বোত্তম উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বিধিবিধান সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে ইহকালে শান্তি ও পরকালে জান্নাতের স্থায়ী নেয়ামত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
  2. মাকাসিদুশ শরীয়াহ বা শরীয়তের মৌলিক পঞ্চ লক্ষ্য সংরক্ষণ: ফিকহের বিধানাবলি মানবজীবনের পাঁচটি অপরিহার্য ভিত্তিকে সংরক্ষণ করে:
    • হিফযুদ দ্বীন (حفظ الدين): ইবাদত ও জিহাদের মাধ্যমে দ্বীন সংরক্ষণ।
    • হিফযুন নাফস (حفظ النفس): কিসাস ও আত্মরক্ষার মাধ্যমে মানবজীবন সংরক্ষণ।
    • হিফযুল আকল (حفظ العقل): মাদক ও বিভ্রান্তি দমনের মাধ্যমে মানববুদ্ধি সংরক্ষণ।
    • হিফযুন নাসল (حفظ النسل): বিবাহ ও ব্যভিচার প্রতিরোধের মাধ্যমে বংশ ও চারিত্রিক পবিত্রতা সংরক্ষণ।
    • হিফযুল মাল (حفظ المال): ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতা ও চুরি-ডাকাতি দমনের মাধ্যমে সম্পদ সংরক্ষণ।
  3. সামাজিক ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা: ফিকহের মুআমালাত ও জিনায়াতের বিধান সমাজে জুলুম, প্রতারণা ও অন্যায় শোষণ উচ্ছেদ করে সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।
  4. নিত্যনতুন সমস্যার যুগোপযোগী সমাধান (معالجة النوازل المعاصرة): যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞান, আধুনিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে যেসব অভূতপূর্ব সমস্যার উদ্ভব হয়, ফিকহ শাস্ত্র ইজতিহাদের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সেগুলোর বাস্তবমুখী সমাধান পেশ করে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ফিকহ হলো ইসলামের প্রাণবন্ত জীবনবিধানের আয়না। যে ব্যক্তি ফিকহ অর্জন করে, সে অন্ধ অনুকরণ থেকে মুক্ত হয়ে প্রজ্ঞার আলোকে আল্লাহর আনুগত্য করতে পারে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) যথার্থই বলেছেন: “কুরআন ও সুন্নাহর পর ফিকহের চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আর কোনো বিদ্যা পৃথিবীতে নেই।”


٢- عرف البيع لغة وشرعًا- ثم اكتب أقسامه وأركانه وشروطه-

[২. البيع এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ লেখ। অতঃপর এর প্রকারভেদ, রুকন ও শর্তসমূহ লেখ।]

ভূমিকা

মানবসভ্যতার টিকে থাকা এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রধানতম মাধ্যম হলো ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসা-বাণিজ্য। মানুষ সামাজিক জীব হওয়ায় প্রত্যেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; একজনের যা প্রয়োজন তা অন্যের মালিকানায় বিদ্যমান থাকে। তাই ইসলাম জুলুম, রিবা (সুদ) ও প্রতারণামুক্ত সুষম অর্থনীতির স্বার্থে ‘বায়’ বা ক্রয়-বিক্রয়কে (البيع) বৈধ ও উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন: وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا (আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন — সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৭৫)। নিম্নে বায়ের শাব্দিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা, এর বিভিন্ন প্রকারভেদ, রুকন এবং বিশুদ্ধতার শর্তাবলি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষিত হলো।

১. البيع (বায়)-এর শাব্দিক অর্থ

আরবি ভাষায় ‘বায়’ (الْبَيْعُ) শব্দটি বাবে ‘যারাবা-ইয়াযরিবু’ (بَاعَ – يَبِيعُ – بَيْعًا) থেকে নির্গত একটি মাসদার বা ভাববাচ্য। এর আভিধানিক অর্থ হলো:

  1. مُبَادَلَةُ شَيْءٍ بِشَيْءٍ (একটি বস্তুর বদলে আরেকটি বস্তু বিনিময় করা): কোনো কিছুর বিপরীতে অন্য কিছু আদান-প্রদান করাকে বায় বলে।
  2. হস্ত প্রসারিত করা (بسط الباع): আরবরা প্রাচীনকালে ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করার সময় একে অপরের হাত প্রসারিত করে করতলে করতলে হাত রেখে চুক্তি চূড়ান্ত করত। সেখান থেকেই চুক্তিটিকে ‘বায়’ এবং উভয় পক্ষকে ‘বায়িয়াইন’ (بائعان) বলা হয়।
  3. আজদাদ (الأضداد) বা বিপরীতার্থক শব্দ: আরবি ভাষায় ‘বায়’ এমন একটি শব্দ যা ক্রয় (الشراء) এবং বিক্রয় (البيع) উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়। যিনি বিক্রি করেন তিনি বিক্রেতা (البائع), আবার ক্ষেত্রবিশেষে ক্রেতাকেও বায়ে’ বলা যায়। তবে পারিভাষিক ব্যবহারে যিনি পণ্য দেন তিনি বায়ে’ এবং যিনি মূল্য দেন তিনি মুশতারী (المشتري)।

২. البيع (বায়)-এর পারিভাষিক অর্থ

ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় বিভিন্ন মাযহাবের ইমামগণ বায়ের তাৎপর্যপূর্ণ সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন:

(ক) হানাফী মাযহাবের সংজ্ঞা

হানাফী ফিকহের সর্বজনমান্য আকরগ্রন্থ আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার এবং অটোমান সিভিল কোড মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ (ধারা ১০৫)-এ বায়ের চমৎকার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে:

«مُبَادَلَةُ مَالٍ بِمَالٍ عَلَى وَجْهِ التَّرَاضِي»

[উভয় পক্ষের পূর্ণ সন্তুষ্টি ও সম্মতির ভিত্তিতে মালের বিপরীতে মালের স্বত্ব বিনিময় করাকে বায় বলে।]

অথবা সংক্ষেপে বলা হয়: تَمْلِيكُ مَالٍ بِمَالٍ بِالتَّرَاضِي (সন্তুষ্টির ভিত্তিতে মালের বিনিময়ে অপর মালের স্থায়ী মালিকানা হস্তান্তর)।

(খ) জমহুর ফুক্বাহার (শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী) সংজ্ঞা

জমহুর ফকীহগণের মতে বায়ের পারিভাষিক সংজ্ঞা হলো:

«عَقْدُ مُعَاوَضَةٍ مَالِيَّةٍ يُفِيدُ مِلْكَ عَيْنٍ أَوْ مَنْفَعَةٍ مُؤَبَّدَةٍ عَلَى سَبِيلِ التَّأْبِيدِ لَا عَلَى وَجْهِ القُرْبَةِ»

[এমন আর্থিক পারস্পরিক প্রতিদান চুক্তি, যা নিছক দান বা নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্য ছাড়া চিরস্থায়ীভাবে কোনো বস্তু বা চিরন্তন উপকারের মালিকানা প্রদান করে।]

সংজ্ঞার তাৎপর্য: ‘মালের বিনিময়ে মাল’ শর্ত করার কারণে যা শরীয়তের দৃষ্টিতে মাল নয় (যেমন মদ, রক্ত, শূকর, মৃতদেহ) তা দিয়ে বায় সংঘটিত হতে পারে না। আবার ‘সন্তুষ্টি’ শর্ত করার কারণে জবরদস্তিমূলক চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হয়।

৩. বায়ের রুকনসমূহ (أركان البيع)

কোনো চুক্তির অস্তিত্ব যে অপরিহার্য উপাদানের ওপর নির্ভর করে তাকে রুকন বলে। বায়ের রুকন নির্ধারণে ফকীহগণের দুটি মূল দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:

(ক) হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিতে বায়ের রুকন

হানাফী উসূল অনুযায়ী বায়ের রুকন একটিই — তা হলো পারস্পরিক সম্মতি (التراضي)। কিন্তু মনের সন্তুষ্টি একটি অদৃশ্য বিষয়, তাই তা বাহ্যিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমটিই হলো রুকন। হানাফী মতে বায়ের রুকন হলো:

  • ১. আল-ঈজাব (الإيجاب – প্রস্তাব): চুক্তিকারী দুই পক্ষের যেকোনো একজনের পক্ষ থেকে প্রথম উচ্চারিত প্রস্তাবসূচক বাক্য। যেমন বিক্রেতা বলল: “আমি আপনার নিকট এই কিতাবটি ১০০ টাকায় বিক্রি করলাম।”
  • ২. আল-ক্ববূল (القبول – গ্রহণ): অপর পক্ষের পক্ষ থেকে সম্মতিসূচক উত্তর। যেমন ক্রেতা বলল: “আমি তা গ্রহণ করলাম বা ক্রয় করলাম।”
  • ৩. বায় বিল মু’য়াতাত (البيع بالمعاطاة – বাক্যহীন নগদ লেনদেন): আধুনিক বাজারে সাধারণ পণ্যের ক্ষেত্রে মুখে কিছু না বলে পণ্য তুলে নেওয়া এবং নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করাও হানাফী মতে বৈধ বায় হিসেবে সাব্যস্ত হয়।
(খ) জমহুর ফুক্বাহার দৃষ্টিতে বায়ের চারটি রুকন
রুকন আরবি পরিভাষা বিবরণ ও বাস্তবতা
১. চুক্তিকারী পক্ষদ্বয় العَاقِدَانِ (العاقد) বিক্রেতা (البائع) এবং ক্রেতা (المشتري)। উভয়কে জ্ঞানবান ও চুক্তিসক্ষম হতে হবে।
২. চুক্তির বাক্যরীতি الصِّيغَةُ (الإيجاب والقبول) চুক্তি সংঘটনের সুস্পষ্ট মৌখিক, লিখিত বা আধুনিক ডিজিটাল সম্মতিসূচক ভাষা।
৩. বিক্রিত পণ্য المَبِيعُ (المَعْقُودُ عَلَيْهِ) যে নির্দিষ্ট বস্তুটির মালিকানা বিক্রি করা হচ্ছে।
৪. নির্ধারিত মূল্য الثَّمَنُ পণ্যের বিপরীতে ক্রেতা কর্তৃক পরিশোধিত নির্ধারিত বিনিময় বা অর্থ।

৪. বায়ের শর্তাবলি (شروط البيع)

ইসলামী ফিকহে একটি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি নিখুঁতভাবে সম্পাদিত ও কার্যকর হওয়ার জন্য চার স্তরের শর্ত নির্ধারিত রয়েছে:

১ম স্তর: শুরূতুল ইন’ইক্বাদ (شروط الانعقاد – চুক্তি সংঘটিত হওয়ার শর্ত)

এসব শর্ত পাওয়া না গেলে চুক্তিটি গোড়াতেই ‘বাতিল’ (বা অস্তিত্বহীন) হয়ে যায়:

  • আকিল ও মুমায়্যিয হওয়া: ক্রেতা ও বিক্রেতাকে অবশ্যই বিবেকসম্পন্ন ও ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। পাগল বা অবুঝ শিশুর বায় সংঘটিত হয় না।
  • মজলিস এক হওয়া (اتحاد المجلس): একই বৈঠকে ঈজাব ও কবূল সম্পন্ন হতে হবে। প্রস্তাবের পর অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলে বা বৈঠক ভঙ্গ হলে চুক্তি হবে না।
  • পণ্যের অস্তিত্ব থাকা (وجود المبيع): বিক্রির সময় পণ্যটি বিদ্যমান থাকতে হবে। অনস্তিত্বশীল বস্তু (যেমন গাছের যে ফল এখনো আসেনি বা গর্ভের বাচ্চা) বিক্রি করা বাতিলে বায়।
  • পণ্যটি মাল মুতাকাওউয়িম হওয়া: শরীয়তের দৃষ্টিতে পণ্যটি বৈধ ও সংরক্ষণযোগ্য সম্পদ হতে হবে। মদ, শূকর বা রক্ত মুসলিমের জন্য মাল নয়।
  • হস্তান্তরযোগ্য হওয়া (مقدور التسليم): যা হস্তান্তর করা অসম্ভব (যেমন আকাশে উড়ন্ত বুনো পাখি বা নদীর মাছ) তা বিক্রি করা বাতিল।
২য় স্তর: শুরূতুস সিহহাত (شروط الصحة – চুক্তি সহীহ হওয়ার শর্ত)

চুক্তি সংঘটিত হওয়ার পর তা বৈধ ও পাপমুক্ত হওয়ার জন্য এসব শর্ত আবশ্যক, অন্যথায় তা ‘বায়য়ে ফাসিদ’ গণ্য হবে:

  • জাহালাত বা অজ্ঞতা দূরীকরণ: পণ্য ও মূল্যের গুণাগুণ, পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্টভাবে জানা থাকতে হবে, যেন কোনো বিবাদ সৃষ্টি না হয়।
  • গারার ও ধোঁকা মুক্ততা (عدم الغرر): চুক্তিটিতে কোনো প্রকার জুয়া, অনিশ্চয়তা বা জালিয়াতি থাকা চলবে না।
  • রিবা বা সুদ মুক্ততা: লেনদেনটি সর্বপ্রকার প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন সুদ হতে পবিত্র হতে হবে।
  • স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সম্মতি (التراضي وعدم الإكراه): জোর-জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ ছাড়া উভয় পক্ষের পূর্ণ সন্তুষ্টি থাকতে হবে।
  • ফাসিদ শর্ত থেকে মুক্ত থাকা: চুক্তির সাথে শরীয়তবিরোধী কোনো অবৈধ শর্ত যুক্ত করা যাবে না (যেমন: আমি গাড়িটি বেচব তবে এক বছর আমিই চালাব)।
৩য় স্তর: শুরূতুন নাফায (شروط النفاذ – চুক্তি কার্যকর হওয়ার শর্ত)

চুক্তিটি সহীহ হওয়ার পর সাথে সাথে স্বত্ব স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য বিক্রেতার পূর্ণ মালিকানা (الملك) অথবা বৈধ অভিভাবকত্ব/এজেন্সি (الولاية أو الوكالة) থাকতে হবে। অনুমতি ছাড়া অন্যের মাল বিক্রি করলে তাকে ‘বায়য়ে ফুদূলী’ (بيع الفضولي) বলে, যা মূল মালিকের সম্মতির ওপর স্থগিত (মাওকূফ) থাকে।

৪র্থ স্তর: শুরূতুল লুযূম (شروط اللزوم – চুক্তি অপরিবর্তনীয় হওয়ার শর্ত)

চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার পর কোনো পক্ষ এককভাবে তা বাতিল করতে পারবে না, যদি না চুক্তিতে কোনো ‘খেয়ার’ (ইখতিয়ার বা অধিকার) থাকে। যেমন: খেয়ারে শর্ত (পছন্দ করার শর্ত), খেয়ারে রুইয়াত (পণ্য না দেখে কেনার পর দেখার অধিকার) অথবা খেয়ারে আইব (পণ্যে গোপন ত্রুটি পাওয়ার পর ফেরত দেওয়ার অধিকার)। কোনো খেয়ার না থাকলে চুক্তিটি ‘লাযিম’ বা অলঙ্ঘনীয় হয়ে যায়।

৫. বায়ের প্রকারভেদ (أقسام البيع)

ফিকাহশাস্ত্রে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বায়ের নানাবিধ প্রকারভেদ আলোচনা করা হয়েছে:

(ক) শারয়ী হুকুম ও বৈধতার দিক থেকে
  1. ১. সহীহ বায় (البيع الصحيح): যা আসল ও শর্তাবলির দিক থেকে শরীয়তসম্মত এবং যা পণ্যের ওপর ক্রেতার পূর্ণ মালিকানা সাব্যস্ত করে।
  2. ২. ফাসিদ বায় (البيع الفاسد): যার মূল ভিত্তি ঠিক আছে কিন্তু কোনো শর্তে ত্রুটি রয়েছে (যেমন মূল্য বা পণ্যে সামান্য অজ্ঞতা)। ফাসিদ শর্ত বা ত্রুটি দূর করলে তা সহীহ হয়ে যায়, নচেৎ চুক্তি বাতিল করা ওয়াজিব।
  3. ৩. বাতিল বায় (البيع الباطل): যার রুকন বা মৌলিক উপাদানেই গলদ রয়েছে (যেমন মদের ব্যবসা বা অনস্তিত্বশীল পণ্যের বিক্রি)। শরীয়তের দৃষ্টিতে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।
  4. ৪. মাওকূফ বায় (البيع الموقوف): যে চুক্তি সংঘটিত হয়েছে কিন্তু কার্যকর হওয়া মূল মালিকের অনুমোদনের ওপর স্থগিত।
  5. ৫. লাযিম ও গায়রে লাযিম বায়: খেয়ারমুক্ত চুক্তি লাযিম (অপরিবর্তনীয়) এবং খেয়ারযুক্ত চুক্তি গায়রে লাযিম (বাতিলযোগ্য)।
(খ) পণ্য ও মূল্য হস্তান্তরের সময় অনুযায়ী
প্রকার পণ্য (المبيع) মূল্য (الثمن) প্রচলিত রূপ
১. সাধারণ বায় (البيع المنجز) নগদ প্রদান নগদ পরিশোধ সাধারণ নগদ ক্রয়-বিক্রয়
২. বায় মুআজ্জাল (البيع المؤجل) নগদ হস্তান্তর বাকি বা কিস্তিতে বাকিতে পণ্য ক্রয়
৩. বায়য়ে সালাম (بيع السَّلَم) ভবিষ্যতে সরবরাহ অগ্রিম পূর্ণ নগদ প্রদান কৃষি পণ্যের অগ্রিম চুক্তি
৪. বায়য়ে সার্ফ (بيع الصرف) নগদ মুদ্রা/স্বর্ণ নগদ মুদ্রা/রৌপ্য মুদ্রা বিনিময় (Money Exchange)
৫. বায়য়ে মুক্বায়াদা (بيع المقايضة) পণ্য অপর পণ্য বিনিময় প্রথা (Barter System)
(গ) লাভ-লোকসান ও মূল্য নির্ধারণের দিক থেকে
  1. ১. বায়য়ে মুসাওয়ামাহ (بيع المساومة): লাভ বা ক্রয়মূল্য উল্লেখ না করে সাধারণ দরকষাকষির মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় (বাজারে সর্বাধিক প্রচলিত)।
  2. ২. বায়য়ে মুরাবাহা (بيع المرابحة): আসল ক্রয়মূল্য উল্লেখ করে তার ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা বা লাভ যোগ করে বিক্রি করা। (আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রধান বিনিয়োগ মাধ্যম)।
  3. ৩. বায়য়ে তাওলিয়াহ (بيع التولية): কোনো লাভ বা লোকসান ছাড়া ঠিক যে দামে কেনা হয়েছিল হুবহু সেই দামেই বিক্রি করা।
  4. ৪. বায়য়ে ওয়াদিয়াহ (بيع الوضيعة): ক্রয়মূল্য প্রকাশ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ লোকসানে বা ছাড় দিয়ে বিক্রি করা।

উপসংহার

সারসংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামী ফিকহে বায় হলো পারস্পরিক সন্তুষ্টি, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক পবিত্র চুক্তি। ক্রয়-বিক্রয়ের রুকন ও শর্তাবলি মেনে লেনদেন পরিচালনা করলে তা কেবল বৈষয়িক সমৃদ্ধিই আনে না, বরং সততার সাথে ব্যবসা করার মাধ্যমে আখিরাতে নবী, সত্যবাদী ও শহীদগণের সান্নিধ্য লাভের অনন্য মর্যাদায় ভূষিত করে।

٣- أوضح مصطلح الكراهية ثم بين حكم لحوم الأتن وألبانها وأبوال الإبل مفصلاً-

[৩. الكراهية পরিভাষাটি ব্যাখ্যা কর। অতঃপর গাধীর গোশত ও দুধ এবং উটের পেশাবের বিধান বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়ত মানবজাতির আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য হালাল ও হারামের সুনির্দিষ্ট বিধান প্রণয়ন করেছে। হালাল ও হারামের এই সীমারেখার মাঝে ফিকাহশাস্ত্রে কিছু বিষয়ের জন্য ‘কারাহিয়াত’ বা অপছন্দনীয়তার (الكراهية) স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে কোন পশু ভক্ষণযোগ্য, কোনটির দুধ বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অপবিত্র এবং চিকিৎসার খাতিরে কোনো বিশেষ উপাদানের ব্যবহার জায়েয কিনা — তা ফিকহের এক অত্যন্ত মৌলিক ও প্রায়োগিক অধ্যায়। নিম্নে ‘কারাহিয়াত’ পরিভাষার সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা এবং গাধীর গোশত, দুধ ও উটের পেশাব ব্যবহারের বিস্তারিত শারয়ী বিধান দলীলসহ আলোচনা করা হলো।

১. مصطلح الكراهية (কারাহিয়াত পরিভাষা)-এর বিশদ ব্যাখ্যা

আরবি ভাষায় ‘কারাহিয়াত’ (الْكَرَاهِيَةُ) শব্দটি ক্রিয়ামূল। এর আভিধানিক অর্থ হলো ضِدُّ المَحَبَّةِ وَالرِّضَا অর্থাৎ অপছন্দ করা, অনীহা প্রকাশ করা, ঘৃণা করা বা কষ্টদায়ক মনে করা।

ইসলামী উসূলুল ফিকহের পরিভাষায়:

«مَا طَلَبَ الشَّارِعُ التَّرْكَ طَلَبًا غَيْرَ جَازِمٍ»

[শরীয়তপ্রণেতা বান্দাকে যা পরিত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন, তবে তা হারামের মতো অকাট্য বা চূড়ান্তভাবে বাধ্যকারী নয়।]

হানাফী উসূলবিদদের দৃষ্টিকোণে কারাহিয়াতের দ্বিমুখী বিভাজন

হানাফী উসূলবিদগণ (যেমন ইমাম সারাখসী, সদরুশ শরীআহ ও আল্লামা ইবনে আবেদীন) দলীলের অকাট্যতা ও নিষেধাজ্ঞার মাত্রার ওপর ভিত্তি করে কারাহিয়াতকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন:

প্রকার সংজ্ঞা ও দলীল শারয়ী হুকুম ও পরিণতি বাস্তব উদাহরণ
১. কারাহাতে তাহরীমী (كراهة تحريمية) যা বর্জন করার জন্য শরীয়ত চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে, তবে তা যন্নী দলীল (যেমন খবরে ওয়াহিদ বা কিয়াস) দ্বারা প্রমাণিত। এটি হারামের নিকটবর্তী (إلى الحرام أقرب)। এটি পরিত্যাগ করা ওয়াজিব। লিপ্ত হলে কবিরা গুনাহ হবে এবং পরকালে শাস্তির যোগ্য হবে। তবে একে হালাল মনেকারী কাফের হবে না, বরং ফাসেক ও বিভ্রান্ত গণ্য হবে। ওয়াজিব বর্জন করা, মাগরিবের ওয়াক্তে অহেতুক বিলম্ব করা, অন্যের ক্রয়-বিক্রয়ের প্রস্তাবের ওপর প্রস্তাব দেওয়া।
২. কারাহাতে তানযীহী (كراهة تنزيهية) যা বর্জন করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে কিন্তু কোনো শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়নি। এটি হালালের নিকটবর্তী (إلى الحلال أقرب)। এটি বর্জন করা সাওয়াবের কাজ এবং উত্তম চরিত্র। সম্পাদন করলে কোনো গুনাহ বা শাস্তি নেই, তবে অভ্যাস বানানো অনুচিত। দাঁড়িয়ে পানি পান করা, অহেতুক বাম হাত দিয়ে কাজ করা, ওযুর সময় অতিরিক্ত পানি অপচয় করা।

জমহুর ফুক্বাহার মত: জমহুর উসূলবিদদের (ইমাম শাফেয়ী, মালেক ও আহমাদ) মতে ‘মাকরূহ’ হলো এমন বিষয় যা বর্জন করলে সাওয়াব পাওয়া যায় আর সম্পাদন করলে কোনো গুনাহ বা শাস্তি হয় না।

২. গাধীর গোশতের বিধান (حكم لحوم الأتن / الحمر الأهلية)

আরবিতে ‘আতূন’ (أَتَانٌ)-এর বহুবচন হলো ‘উতুন’ (أُتُنٌ), যার অর্থ মাদী গাধা। ফিকাহশাস্ত্রে গাধাকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয় — ১. গৃহপালিত গাধা (الحُمُر الأَهْلِيَّة) এবং ২. বুনো গাধা (حِمَار الوَحْش / জেব্রা বা বন্য গাধা)।

(ক) গৃহপালিত গাধার গোশত (لحوم الحمر الأهلية): সর্বসম্মতভাবে হারাম

ইসলামের প্রাথমিক যুগে গৃহপালিত গাধার গোশত ভক্ষণের অনুমতি ছিল। কিন্তু হিজরী সপ্তম সনে খাইবার যুদ্ধের ঐতিহাসিক দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ এটি চিরতরে হারাম ঘোষণা করেন।

  • সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীস: হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন:

    «نَهَى النَّبِيُّ ﷺ يَوْمَ خَيْبَرَ عَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الأَهْلِيَّةِ، وَرَخَّصَ فِي لُحُومِ الْخَيْلِ»

    [খায়বারের বিজয়ের দিন নবী করীম ﷺ গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ নিষেধ করেন এবং ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দেন। — সহীহ বুখারী: ৪২১১; সহীহ মুসলিম: ১৯৪১]

  • গোশত নাপাক হওয়ার স্পষ্ট ঘোষণা: হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, খায়বারে যখন হাঁড়িতে গাধার গোশত টগবগ করে ফুটছিল, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশে এক ঘোষক উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দিলেন:

    «إِنَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يَنْهَيَانِكُمْ عَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الأَهْلِيَّةِ فَإِنَّهَا رِجْسٌ»

    [নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমাদেরকে গৃহপালিত গাধার গোশত ভক্ষণ করতে নিষেধ করছেন; কেননা তা অপবিত্র ও নাপাক। তখন হাঁড়িগুলো তৎক্ষণাৎ উল্টে ফেলা হয়েছিল। — সহীহ বুখারী: ৫৫২৮]

শারয়ী সিদ্ধান্ত: চার মাযহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত ঐকমত্য (ইজমা) অনুযায়ী, গৃহপালিত গাধার (নর ও মাদী উভয়টির) গোশত খাওয়া হারামে ক্বাতয়ী (قطعي التحريم) এবং এর গোশত নাপাকে গালীযা।

(খ) বুনো গাধার গোশত (حمار الوحش): হালাল

বুনো গাধা বা জেব্রার গোশত খাওয়া সর্বসম্মতভাবে হালাল। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত রয়েছে, হযরত আবু কাতাদা (রা.) একটি বুনো গাধা শিকার করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে সেই গোশত খেয়েছিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে খাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন (সহীহ বুখারী: ১৮২৪)।

৩. গাধীর দুধের বিধান (حكم ألبان الأتن)

ইসলামী ফিকহের একটি প্রতিষ্ঠিত ও সর্বজনগ্রাহ্য মূলনীতি হলো:

«اللَّبَنُ يَتْبَعُ اللَّحْمَ فِي الحِلِّ وَالحُرْمَةِ وَالطَّهَارَةِ»

[পবিত্রতা ও হালাল-হারামের ক্ষেত্রে পশুর দুধ তার গোশতের হুকুমের অনুগামী হয়।]

যেহেতু গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া হারাম এবং তা নাপাক ঘোষণা করা হয়েছে, সেহেতু গাধীর দুধ পান করাও হারাম ও নাপাক (نجس وحرام)। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ জমহুর ফুক্বাহা এ বিষয়ে একমত।

চিকিৎসার প্রয়োজনে গাধীর দুধ ব্যবহারের হুকুম (التداوي بلبن الأتان)

যদি কোনো জটিল রোগে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মুসলিম চিকিৎসক পরামর্শ দেন যে গাধীর দুধ ছাড়া রোগীর জীবন রক্ষার কোনো বিকল্প হালাল ওষুধ নেই, তবে শরীয়তের সাধারণ মূলনীতি الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ المَحْظُورَاتِ (চরম নিরুপায় অবস্থা নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে) অনুযায়ী কেবল জীবন রক্ষার ন্যূনতম পরিমাণ ব্যবহার করা জায়েয হবে। কিন্তু বাজারে কোনো হালাল বিকল্প বিদ্যমান থাকলে গাধীর দুধ পান বা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।

৪. উটের পেশাবের বিধান (حكم أبوال الإبل)

উটের পেশাব পবিত্র নাকি নাপাক এবং তা চিকিৎসা হিসেবে পান করা বৈধ কিনা — এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে ঐতিহাসিক ও গবেষণালব্ধ মতপার্থক্য রয়েছে। এ আলোচনার মূল ভিত্তি হলো সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত বিখ্যাত ‘হাদীসে উরাইনিয়্যীন’ (حديث العرنيين)

হাদিসের পটভূমি ও বর্ণনা

হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) হতে বর্ণিত:

«أَنَّ نَاسًا مِنْ عُرَيْنَةَ قَدِمُوا المَدِينَةَ فَاجْتَوَوْهَا، فَبَعَثَهُمُ النَّبِيُّ ﷺ فِي إِبِلِ الصَّدَقَةِ، وَقَالَ: اشْرَبُوا مِنْ أَلْبَانِهَا وَأَبْوَالِهَا، فَصَحُّوا»

[উরাইনাহ গোত্রের একদল লোক মদীনায় এসে এখানকার আবহাওয়ার কারণে পেটের কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হলো। তখন নবী করীম ﷺ তাদেরকে বায়তুলমালের উটের পালের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললেন: তোমরা উটের দুধ ও পেশাব পান করো। অতঃপর তারা তা পান করে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল। — সহীহ বুখারী: ২৩৩; সহীহ মুসলিম: ১৬৭১]

ফুকাহায়ে কেরামের মাযহাব ও বিশ্লেষণ
মাযহাব / ইমাম শারয়ী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধান প্রধান দলীল ও যুক্তি
ইমাম মালেক ও ইমাম আহমাদ (রহ.) যেসব পশুর গোশত খাওয়া হালাল (উট, গরু, ছাগল), তাদের পেশাব ও গোবর পবিত্র (طاهر)। সুতরাং উটের পেশাব পান করা সাধারণ অবস্থাতেও বৈধ। নবীজী ﷺ তাঁদেরকে উটের পেশাব পানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। শরীয়তে কোনো অপবিত্র বা হারাম জিনিস সাধারণ নির্দেশে পান করতে বলা অসম্ভব।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সকল প্রাণীর পেশাবই নাপাক (نجس)। উটের পেশাবও নাপাকে গালীযা। সাধারণ অকাট্য হাদীস: اسْتَنْزِهُوا مِنَ البَوْلِ (পেশাব থেকে বেঁচে থাকো)। উরাইনাহ গোত্রের নির্দেশটি ছিল প্রাণরক্ষার চরম জরুরি প্রয়োজনে (للضرورة)।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) উটের পেশাব নাপাক (نجاسة مخففة / সামান্য লঘু নাপাক)। সাধারণ অবস্থায় পান করা নাজায়েয। মূল বিধান হলো পেশাব অপবিত্র। তবে চিকিৎসার প্রয়োজনে যদি অন্য কোনো হালাল ওষুধ না থাকে, তবে তা পান করা জায়েয।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) ইমাম আবু ইউসুফের মতে চিকিৎসার জন্য পান করা নিঃসন্দেহে জায়েয। ইমাম মুহাম্মদের মতে চিকিৎসার প্রয়োজনেও তা মাকরূহে তানযীহী হাদীসে উরাইনিয়্যীনের স্পষ্ট চিকিৎসাভিত্তিক প্রয়োগ। হানাফী মাযহাবের অধিকাংশ ফতোয়া ইমাম আবু ইউসুফের অনুকূলে।

উপসংহার

উপরোক্ত পর্যালোচনায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে খাদ্য ও পানীয়ের প্রতিটি বিধান গভীর কল্যাণ ও প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। গাধীর গোশত ও দুধ সর্বসম্মতভাবে হারাম ও অপবিত্র; অপরদিকে উটের পেশাবের ক্ষেত্রে জমহুরের মতে তা নাপাক হলেও জীবনরক্ষা ও রোগ নিরাময়ের স্বার্থে হালাল বিকল্পের অনুপস্থিতিতে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা শরীয়তে অনুমোদিত।


٤- ما الرهن؟ وما حكمه وركنه وشرطه؟ أذكر حكم المرهون مع بيان أقسام القبض-

[৪. رهن কী? এর হুকুম, রুকন ও শর্ত কী? বন্ধককৃত বস্তুর হুকুমসহ قبض এর প্রকারভেদ উল্লেখ কর।]

ভূমিকা

মানবসমাজে আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ঋণ (قرض) একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু ঋণদাতার অর্থ সুরক্ষিত রাখা এবং ঋণগ্রহীতার ওপর আস্থার সংকট দূর করার জন্য ইসলামী শরীয়ত জামানত বা বন্ধক রাখার একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিধান প্রণয়ন করেছে। এই অর্থনৈতিক নিরাপত্তামূলক চুক্তির নামই হলো ‘রেহান’ (الرهن)। রেহান কেবল ঋণের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং সমাজে সুদমুক্ত ঋণপ্রবাহকে গতিশীল রাখে। নিম্নে রেহানের সংজ্ঞা, শারয়ী হুকুম, রুকন, শর্তাবলি, বন্ধককৃত বস্তুর হুকুম এবং দখলের (ক্ববয) প্রকারভেদ সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

১. الرهن (রেহান)-এর আভিধানিক অর্থ

আরবি ভাষায় ‘রেহান’ (الرَّهْنُ) শব্দটি একটি ভাববাচ্য বা মাসদার। এর মূল ধাতু হলো ر – هـ – ن (রা-হা-নুন)। এর আভিধানিক অর্থ দুটি প্রধান ধারায় ব্যবহৃত হয়:

  1. الثُّبُوتُ وَالدَّوَامُ (স্থায়িত্ব ও নিরবচ্ছিন্নতা): যা দীর্ঘস্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় থাকে। আরবরা বলে থাকে: مَاءٌ رَاهِنٌ (স্থির ও স্থায়ী পানি), نِعْمَةٌ رَاهِنَةٌ (চিরস্থায়ী সুখ ও নেয়ামত)।
  2. الحَبْسُ وَاللُّزُومُ (আটকে রাখা, অবরুদ্ধ করা বা বন্দি করা): কোনো জিনিসকে নিজের অধীনে আটকে রাখা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

    كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ

    [প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের বিনিময়ে অবরুদ্ধ বা দায়বদ্ধ থাকবে। — সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৩৮]

২. الرهن (রেহান)-এর পারিভাষিক অর্থ

ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় রেহানের সংজ্ঞায় ফকীহগণ বলেন:

(ক) হানাফী মাযহাবের সংজ্ঞা (আল-হিদায়া ও রদ্দুল মুহতার)

«حَبْسُ شَيْءٍ بِمَالٍ يُمْكِنُ اسْتِيفَاءُ الدَّيْنِ مِنْهُ عِنْدَ تَعَذُّرِ القَضَاءِ»

[ঋণ পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়লে যা থেকে ঋণ উসুল করা সম্ভব, এমন কোনো মালকে ঋণের বিনিময়ে আটকে রাখাকে রেহান বলে।]

(খ) জমহুর ফুক্বাহার সংজ্ঞা

«جَعْلُ عَيْنٍ مَالِيَّةٍ وَثِيقَةً بِدَيْنٍ يُسْتَوْفَى مِنْهَا كُلُّهُ أَوْ بَعْضُهُ عِنْدَ تَعَذُّرِ الوَفَاءِ»

[ঋণ পরিশোধে অপারগ হলে যা বিক্রি করে পূর্ণ বা আংশিক ঋণ উসুল করা যায়, এমন কোনো মূল্যবান বস্তুকে ঋণের জামানত হিসেবে নির্দিষ্ট করাকে রেহান বলে।]

পরিভাষা ত্রয়ী: যিনি ঋণ নিয়ে সম্পদ বন্ধক দেন তাকে ‘রাহিন’ (الرَّاهِنُ), যিনি ঋণ দিয়ে বন্ধক গ্রহণ করেন তাকে ‘মুরতাহিন’ (المُرْتَهِنُ) এবং যে বস্তুটি বন্ধক রাখা হয় তাকে ‘মারহূন’ (المَرْهُونُ) বলা হয়।

৩. রেহানের শারয়ী হুকুম (حكم الرهن)

রেহানের শারয়ী মর্যাদা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত এবং এটি সর্বসম্মতভাবে জায়েয ও মুস্তাহাব (مشروع ومستحب)

  • পবিত্র কুরআনের দলীল: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন:

    وَإِن كُنتُمْ عَلَىٰ سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُوا كَاتِبًا فَرِهَانٌ مَّقْبُوضَةٌ

    [আর যদি তোমরা সফরে থাকো এবং কোনো লেখক না পাও, তবে হস্তগত বন্ধক রাখবে। — সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৮৩]

  • সুন্নাহর দলীল: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন:

    «تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَدِرْعُهُ مَرْهُونَةٌ عِنْدَ يَهُودِيٍّ بِثَلاَثِينَ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ»

    [রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছিলেন যে, তাঁর লোহার বর্মটি এক ইহুদির নিকট ত্রিশ সা’ যবের বিনিময়ে বন্ধক রাখা ছিল। — সহীহ বুখারী: ২০৬৮; সহীহ মুসলিম: ১৬০৩]

চুক্তির প্রকৃতি: বন্ধকগ্রহীতা (মুরতাহিন) বস্তুটি দখল (ক্ববয) করার পূর্বে এই চুক্তি বাধ্যতামূলক নয়; তবে দখল সম্পন্ন হওয়ার পর বন্ধকদাতার (রাহিন) জন্য এটি ‘লাযিম’ (لازم – অপরিবর্তনীয়) হয়ে যায়। রাহিন মুরতাহিনের সম্মতি বা ঋণ পরিশোধ ছাড়া চুক্তি বাতিল করতে পারে না।

৪. রেহানের রুকন (أركان الرهن)

ফিকহবিদদের মতে রেহানের রুকন নিম্নরূপ:

  1. হানাফী মাযহাবের মতে: রেহানের রুকন হলো ঈজাব ও ক্ববূল (الإيجاب والقبول) অর্থাৎ রাহিনের পক্ষ থেকে বন্ধকের প্রস্তাব এবং মুরতাহিনের সম্মতি। আর ক্ববয বা দখল হলো চুক্তি পূর্ণতা পাওয়ার অপরিহার্য পরিপূরক শর্ত।
  2. জমহুর ফুক্বাহার মতে চারটি রুকন:
    • ১. আল-আক্বিদাইন (العاقدان): বন্ধকদাতা (রাহিন) ও বন্ধকগ্রহীতা (মুরতাহিন)।
    • ২. আস-সীগাহ (الصيغة): ঈজাব ও ক্ববূলের ভাষা।
    • ৩. আল-মারহূন (المرهون): বন্ধককৃত বস্তু।
    • ৪. আল-মারহূন বিহী (المرهون به): যে ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা হয়েছে।

৫. রেহানের শর্তাবলি (شروط الرهن)

রেহান শুদ্ধ হওয়ার জন্য চার ধরনের শর্ত পূরণ হতে হবে:

  • ১. আক্বিদাইন সম্পর্কিত শর্ত: রাহিন ও মুরতাহিন উভয়কে সুস্থ মস্তিষ্ক ও বোধসম্পন্ন (আকিল ও মুমায়্যিয) হতে হবে। অপ্রকৃতিস্থ বা অবুঝ শিশুর বন্ধক বাতিল।
  • ২. মারহূন (বন্ধকী বস্তু) সম্পর্কিত শর্ত:
    • বস্তুটি শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পদ (মাল মুতাকাওউয়িম) হতে হবে। মদ বা শূকর বন্ধক রাখা বাতিল।
    • বস্তুটি বিদ্যমান ও হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে। বাতাসে উড়ন্ত পাখি বা গর্ভস্থ বাচ্চা বন্ধক রাখা যায় না।
    • বস্তুটি রাহিনের পূর্ণ মালিকানাধীন হতে হবে।
    • অবিভক্ত অংশ না হওয়া (عدم الشيوع): হানাফী মাযহাব মতে, যৌথ সম্পত্তির অবিভক্ত অংশ (মুশা’) বন্ধক রাখা নাজায়েয, কারণ তা সম্পূর্ণ পৃথক করে কবয করা সম্ভব নয়।
  • ৩. মারহূন বিহী (ঋণ) সম্পর্কিত শর্ত: ঋণটি নিশ্চিত ও শোধযোগ্য আর্থিক দায় হতে হবে।
  • ৪. ক্ববয বা দখলের শর্ত: মুরতাহিনের হাতে বন্ধকী বস্তুটি বাস্তবে বা কার্যকরভাবে অর্পিত হতে হবে।

৬. বন্ধককৃত বস্তুর হুকুম (حكم المرهون)

মারহূনের শারয়ী মর্যাদা দুটি দিক থেকে নির্ধারিত হয় — তার ক্ষতিপূরণের দায় এবং তা থেকে উপযোগ ভোগ করার অধিকার:

(ক) মারহূন বিনষ্ট হলে দায় কার? (ضمان المرهون)
  • হানাফী মাযহাবের ফতোয়া: বন্ধকগ্রহীতার (মুরতাহিন) হাতে মারহূন বস্তুটি ঋণের সমপরিমাণ মূল্যের দিক থেকে ‘দায়বদ্ধ’ (مضمون بأقل من قيمته ومن الدين) এবং অতিরিক্ত অংশের দিক থেকে আমানত। যদি মুরতাহিনের কোনো অবহেলা ছাড়াও বস্তুটি নষ্ট হয়ে যায়, তবে ঋণের সমপরিমাণ অর্থ বিনষ্ট হয়েছে গণ্য হবে এবং ঋণ উসুল হয়েছে ধরা হবে।
  • জমহুর ফুক্বাহার ফতোয়া: মুরতাহিনের হাতে মারহূন পুরোটাই ‘আমানত’ (أمانة)। কোনো ত্রুটি বা সীমালঙ্ঘন ছাড়া তা নষ্ট হলে মুরতাহিন দায়ী হবে না এবং রাহিনের ওপর মূল ঋণ সম্পূর্ণ বহাল থাকবে।
(খ) বন্ধকী বস্তু থেকে ফায়দা বা সুবিধা ভোগের হুকুম

ইসলামে বন্ধকী বস্তু ভোগ করার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফিকহী মূলনীতি হলো:

«كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً فَهُوَ رِبًا»

[যে ঋণ কোনো প্রকার বৈষয়িক সুবিধা টেনে আনে, তা-ই সুদ।]

  • বন্ধকগ্রহীতার জন্য বন্ধকী জমি চাষ করা, ফসলের ভাগ নেওয়া, বন্ধকী বাড়ি বা দোকানে বসবাস বা ভাড়া দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও প্রত্যক্ষ সুদ (রিব্বা)। বাংলাদেশে প্রচলিত ‘বন্ধকি জমি চাষ’ করার প্রথাটি প্রকাশ্য হারাম।
  • ব্যতিক্রম (পশুর ভরণপোষণ): যদি বন্ধকী বস্তুটি দুধেল বা সওয়ারির পশু হয় এবং রাহিন তার ঘাস-পানির খরচ না দেয়, তবে মুরতাহিন নিজ খরচে তাকে খাওয়ালে খরচের সমপরিমাণ দুধ দোহন করতে পারবে বা সওয়ার হতে পারবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: الرَّهْنُ يُرْكَبُ بِنَفَقَتِهِ إِذَا كَانَ مَرْهُونًا، وَلَبَنُ الدَّرِّ يُشْرَبُ بِنَفَقَتِهِ إِذَا كَانَ مَرْهُونًا (বন্ধকী পশুর পিঠে খরচের বিনিময়ে সওয়ার হওয়া যাবে এবং খরচের অনুপাতে দুধ পান করা যাবে — সহীহ বুখারী: ২৫১২)।

৭. ক্ববয বা দখলের প্রকারভেদ (أقسام القبض)

ফিকাহশাস্ত্রে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়া এবং হস্তান্তরের দায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো ‘ক্ববয’ (الْقَبْضُ)। ক্ববয অর্থ কোনো বস্তুর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ফুক্বাহাগণ ক্ববযকে প্রধানত চার ভাগে বিভক্ত করেছেন:

ক্ববযের প্রকার আরবি পরিভাষা বাস্তবতা ও সংজ্ঞা বাস্তব উদাহরণ
১. প্রত্যক্ষ দখল القَبْضُ الحَقِيقِيُّ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সরাসরি কোনো বস্তু গ্রহণ করা এবং স্বহস্তে স্থানান্তর করা। টাকা হাতে নেওয়া, জামাকাপড় বা মোবাইল ফোন গ্রহণ করা।
২. পরোক্ষ বা আইনি দখল القَبْضُ الحُكْمِيُّ (التَّخْلِيَةُ) বস্তুটিকে সরাসরি হাত দিয়ে ধরা ছাড়া এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা যাতে গ্রহীতা যেকোনো সময় তা ব্যবহার করতে পারে (তাক্বলিয়াহ)। বাড়ির চাবি হস্তান্তর, ব্যাংকে অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়া, গুদামের ভাউচার পাওয়া।
৩. আমানতের দখল قَبْضُ الأَمَانَةِ মালিকের সম্মতিতে এমন দখল যা কোনো ক্ষতিপূরণ আবশ্যক করে না, যদি না গ্রহীতার চরম অবহেলা বা সীমালঙ্ঘন ঘটে। গচ্ছিত রাখা বস্তু (ওয়াদিয়াহ), ইজারা গ্রহীতার হাতে ভাড়ার গাড়ি, অংশীদারী মাল।
৪. ক্ষতিপূরণযুক্ত দখল قَبْضُ الضَّمَانِ এমন দখল যা নষ্ট বা ধ্বংস হলে গ্রহীতাকে অবশ্যই পূর্ণ ক্ষতিপূরণ বা বিনিময় দিতে হয়, চাই সে অবহেলা করুক বা না করুক। জবরদখলকৃত সম্পদ (মালে মাগসুব), বিক্রিত পণ্যে ক্রেতার দখল, বন্ধকী বস্তুর নির্ধারিত অংশ।

উপসংহার

সারসংক্ষেপে বলা যায়, রেহান হলো সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঋণ নিরাপত্তাদানের এক ইনসাফপূর্ণ শারয়ী বিধান। তবে রেহানকে সুদের মাধ্যম বানানো থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। বন্ধকী বস্তুর মালিকানা রাহিনেরই থাকে, মুরতাহিন কেবল তা জামানত হিসেবে আটকে রাখতে পারে; কোনোভাবেই অন্যায় সুবিধা ভোগ করতে পারে না।

مجموعة (ب) [الدرجات: ৫ × ২ = ১০]

٥- ما هى العوامل التى أدت إلى نشأة الفقه؟

[৫. ফিক্হ শাস্ত্র উদ্ভব হওয়ার কারণগুলো কী কী?]

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তের ব্যাবহারিক আইন ও বিধান সংকলনের শাস্ত্র হলো ‘ফিকহ’। বিশ্বমানবতার মহান পথপ্রদর্শক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় ফিকহ নামে কোনো স্বতন্ত্র কিতাবী শাস্ত্রের প্রয়োজন ছিল না; কেননা যেকোনো নতুন পরিস্থিতি বা সমস্যার সৃষ্টি হলে সরাসরি আসমানী অহী অথবা নববী ব্যাখ্যার মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ তার সমাধান পাওয়া যেত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাত এবং পরবর্তীতে মুসলিম সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক আইনশাস্ত্র হিসেবে ফিকহ শাস্ত্রের উদ্ভব এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতা হয়ে দাঁড়ায়। নিম্নে ফিকহ শাস্ত্রের উদ্ভবের প্রধান কারণসমূহ বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

ফিকহ শাস্ত্র উদ্ভবের মৌলিক কারণসমূহ (عوامل نشأة الفقه)

  1. ১. অহীর ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হওয়া (انقطاع الوحي بوفاة النبي ﷺ):

    রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন শরীয়তের একমাত্র প্রত্যক্ষ মুখপাত্র। তাঁর ওফাতের মধ্য দিয়ে আসমানী অহীর অবতরণ চিরতরে সমাপ্ত হয়ে যায়। ফলে পরবর্তীতে উদ্ভূত নিত্যনতুন সমস্যার সমাধানের জন্য উম্মাহর সামনে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য থেকে উদ্ভাবন ও গবেষণার (ইজতিহাদ) কোনো বিকল্প ছিল না। এই শূন্যতা পূরণেই ফিকহ শাস্ত্রের সূচনা ঘটে।

  2. ২. ইসলামী রাষ্ট্রের বিদ্যুৎগতিতে সীমানা বিস্তার (اتساع رقعة الدولة الإسلامية):

    খোলাফায়ে রাশেদীন ও উমাইয়া শাসনামলে ইসলাম আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে পারস্য, মিসর, শাম (সিরিয়া), মধ্য এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার বিশাল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন কৃষ্টি ও হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতায় অভ্যস্ত লাখ লাখ মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের বিচিত্র জীবনপ্রণালীর সাথে ইসলামী অনুশাসনের সামঞ্জস্য বিধান করার জন্য ফিকহী সিদ্ধান্তের অনিবার্য প্রয়োজন দেখা দেয়।

  3. ৩. নজিরবিহীন নতুন সমস্যা ও সামাজিক পরিস্থিতির উদ্ভব (حدوث وقائع ونوازل جديدة):

    অর্থনীতি, কৃষিব্যবস্থা, ভূমির মালিকানা (খারাজ ও উশর), সেচব্যবস্থা, নতুন মুদ্রার প্রচলন এবং বহুজাতিক পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সব অভাবনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে যার হুবহু দৃষ্টান্ত মক্কা-মদীনার সরল সমাজে ছিল না। ফলে কুরআন ও সুন্নাহর অন্তর্নিহিত ইল্লত বা কার্যকর কারণ খুঁজে বের করে সেই আলোকে নতুন বিষয়ের বিধান নির্ধারণে ফুক্বাহায়ে কেরাম ফিকহের কাঠামো দাঁড় করান।

  4. ৪. বিভিন্ন শহরে সাহাবায়ে কেরামের বিস্তৃতি ও ফতোয়া প্রদান (تفرق الصحابة في الأقاليم):

    ইসলামের দাওয়াত ও রাষ্ট্র পরিচালনার তাগিদে শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন। যেমন: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কুফায়, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) মক্কায়, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) মদীনায় এবং হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বসরার প্রধান শিক্ষক ও মুফতী হন। তাঁদের প্রত্যেকের নিকট রাসূলুল্লাহ ﷺ হতে শেখা অনন্য হাদিস ও নিজস্ব ইজতিহাদী বিচারধারা ছিল। তাঁদের সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা তাবেঈগণের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক ফিকহী পাঠশালার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।

  5. ৫. আহলুল হাদীস ও আহলুর রায়ের বৈজ্ঞানিক বিতর্ক (ظهور مدرستي الحديث والرأي):

    দ্বিতীয় হিজরীতে মদীনাকে কেন্দ্র করে হাদিসের বাহ্যিক অর্থ ও মদীনার আমলকে প্রাধান্য দিয়ে ‘মাদরাসাতুল হাদীস’ এবং ইরাকের কুফাকে কেন্দ্র করে যুক্তিনির্ভর কারণ অন্বেষণ ও কিয়াসের মাধ্যমে ‘মাদরাসাতুর রায়’ বিকশিত হয়। এই দুই ঘরানার গঠনমূলক বিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান ফিকহকে এক সুসংবদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিক শাস্ত্রে রূপদান করে।

  6. ৬. জাল হাদিসের আগ্রাসন ও শরীয়তের বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ:

    উমাইয়া যুগে রাজনৈতিক দল-উপদল (যেমন খারেজী, শীআ) এবং কুচক্রীদের পক্ষ থেকে হাদিস জাল করার অপচেষ্টা শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে উম্মাহকে ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করতে এবং কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহর ভিত্তিতে সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়া প্রণয়নের অপরিহার্য তাগিদেই ফুক্বাহায়ে কেরাম মূলনীতি সংবলিত ফিকহ শাস্ত্রের গোড়াপত্তন করেন।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ফিকহ শাস্ত্রের উদ্ভব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল ইসলামী জীবনব্যবস্থার গতিশীলতা ও চিরন্তনতার এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। বাস্তব জীবনের জটিলতা নিরসন এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধানকে প্রতিটি মানুষের দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদেই এই মহান শাস্ত্রের জন্ম হয়েছিল।


٦- اذكر فئة من أبرز العلماء الذين ساهموا فى تطور الفقه عبر التاريخ-

[৬. যে সকল আলেম ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ফিকহ শাস্ত্রের ক্রমবিকাশে অবদান রেখেছেন তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম লেখ।]

ভূমিকা

ইসলামী ফিকহ কোনো একজন ব্যক্তির প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠেনি; বরং সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে শুরু করে যুগ যুগ ধরে শ্রেষ্ঠ মনীষী, মুহাদ্দিস ও মুজতাহিদ ফকীহগণের ঐকান্তিক সাধনায় এটি এক বিশাল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনবিধানে রূপান্তরিত হয়েছে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যে সকল ক্ষণজন্মা আলেম ফিকহ শাস্ত্রের কাঠামো নির্মাণ, নিয়মতান্ত্রিক বিন্যাস ও ক্রমবিকাশে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন, নিম্নে তাঁদের উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের অবদান সবিস্তারে তুলে ধরা হলো।

১. সাহাবা যুগের শীর্ষস্থানীয় ফকীহগণ

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন ফিকহের আদি স্থপতি। আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহ.) ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শতাধিক সাহাবী ফতোয়া দিতেন, যাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন:

  • আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.): রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভূমিনীতি, কারাগার ব্যবস্থা এবং মাকাসিদুশ শরীয়াহ ভিত্তিক ইজতিহাদের পথিকৃৎ।
  • হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.): বিচক্ষণ বিচারিক ফিকহ এবং জটিল মুআমালাতের সূক্ষ্মতম সমাধানকারী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন: أَقْضَاكُمْ عَلِيٌّ (তোমাদের মধ্যে আলী সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক — সুনানে ইবনে মাজাহ)।
  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.): ফিকহের যুক্তিভিত্তিক ধারা ও ইরাকী ফিকহের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী।
  • উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.): পারিবারিক আইন, নারী ফিকহ এবং সাহাবাদের ফতোয়ার পর্যালোচনায় অনন্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী।
  • হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.): তাফসীরভিত্তিক ফিকহ ও হজের বিস্তারিত আহকামের প্রামাণ্য শিক্ষক।

২. তাবেঈ যুগের ফকীহ ও মদীনার সপ্ত ফকীহ (الفُقَهَاءُ السَّبْعَة)

প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে মদীনা মুনাওয়ারায় যে সাতজন বিশ্ববিশ্রুত তাবেঈ ফকীহ ফিকহের প্রামাণ্যতা রক্ষা করেছিলেন, তাঁরা হলেন: ১. সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, ২. উরওয়াহ ইবনুয যুবায়ের, ৩. আল-ক্বাসিম ইবনে মুহাম্মদ, ৪. খারিজা ইবনে যায়েদ, ৫. আবু বকর ইবনে আব্দুর রহমান, ৬. সুলাইমান ইবনে ইয়াসার এবং ৭. উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ। এছাড়া কুফায় আলক্বামাহ, আসওয়াদ এবং ইব্রাহীম আন-নাখয়ী (রহ.) ফিকহের ভিত্তিকে মজবুত করেন।

৩. চার মহান মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা মুজতাহিদ ইমামগণ

ইমামের নাম ও জন্ম-মৃত্যু মাযহাব ও কর্মক্ষেত্র ফিকহ শাস্ত্রে প্রধান অবদান
ইমাম আবু হানিফা নোমান ইবনে সাবিত (রহ.)
(৮০ – ১৫০ হি.)
হানাফী মাযহাব
(কুফা ও বাগদাদ)
সর্বপ্রথম ফিকহ শাস্ত্রকে অধ্যায়ভিত্তিক (তাহরাত, সালাত, বায় ইত্যাদি) সুবিন্যস্ত করেন। ৪০ জন সেরা আলেমের সমন্বয়ে বিশ্বের প্রথম ‘ফিকহ একাডেমি’ গঠন করে ইজতিহাদী পরামর্শের মাধ্যমে লক্ষাধিক মাসআলা সংকলন করেন।
ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.)
(৯৩ – ১৭৯ হি.)
মালেকী মাযহাব
(মদীনা মুনাওয়ারা)
‘ইমামু দারিল হিজরাহ’ হিসেবে খ্যাত। বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা (الموطأ) রচনার মাধ্যমে হাদিস ও ফিকহের সমন্বয় করেন এবং মদীনার সার্বিক আমলকে (عمل أهل المدينة) ফিকহের অন্যতম প্রামাণ্য উৎস সাব্যস্ত করেন।
ইমাম মুহাম্মদ ইদ্রিস আশ-শাফেয়ী (রহ.)
(১৫০ – ২০৪ হি.)
শাফেয়ী মাযহাব
(মক্কা, বাগদাদ ও মিসর)
উসূলুল ফিকহের প্রথম নিয়মতান্ত্রিক গ্রন্থ আর-রিসালাহ (الرسالة) এবং সুবিশাল ফিকহী আকরগ্রন্থ কিতাবুল উম্ম (كتاب الأم) রচনার মাধ্যমে ফিকহের মূলনীতিকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দান করেন।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)
(১৬৪ – ২৪১ হি.)
হাম্বলী মাযহাব
(বাগদাদ)
মুহাদ্দিস ও ফকীহদের সম্রাট। তাঁর সংকলিত সুবিশাল মুসনাদে আহমাদ এবং সহীহ হাদিস ও আসারভিত্তিক ফতোয়ার মাধ্যমে ফিকহকে বিদআত থেকে সুরক্ষিত রাখেন।

৪. ফিকহের বিকাশ ও সংকলনে অন্যান্য প্রখ্যাত আলেমগণ

  • ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) (১১৩-১৮২ হি.): প্রথম প্রধান বিচারপতি (ক্বাযিউল কুযাত), যিনি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও কর ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বের প্রথম আইনি গ্রন্থ কিতাবুল খারাজ (كتاب الخراج) প্রণয়ন করেন।
  • ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.) (১৩২-১৮৯ হি.): হানাফী ফিকহের মূল আকরগ্রন্থ ‘যাহিরুর রিওয়ায়াহ’-এর ৬টি মৌলিক কিতাব সংকলন করে ফিকহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
  • ইমাম শামসুল আইম্মাহ আস-সারাখসী (রহ.) (ওফাত: ৪৮৩ হি.): কারাগারের অন্ধকূপ থেকে স্মৃতিশক্তি দিয়ে ৩০ খণ্ডের সুবিশাল আইনকোষ আল-মাবসূত (المبسوط) রচনা করেন।
  • ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) (ওফাত: ৫৯৩ হি.): তুলনামূলক ফিকহের অমর মহাকাব্য আল-হিদায়া (الهداية) রচনা করেন।
  • ইমাম মুহিউদ্দীন আবু যাকারিয়া আন-নববী (রহ.) (৬৩১-৬৭৬ হি.): শাফেয়ী ফিকহের প্রামাণ্য বিশ্বকোষ আল-মাজমূ’ শারহুল মুহাযযাব এবং মিনহাজুত তালেবীন রচনা করেন।
  • ইমাম মুওয়াফফাকুদ্দীন ইবনে কুদামাহ আল-মাকদিসী (রহ.) (৫৪১-৬২০ হি.): তুলনামূলক ফিকহের সুবিশাল আকরগ্রন্থ আল-মুগনী (المغني) রচনা করেন।

উপসংহার

ফিকহ শাস্ত্রের ক্রমবিকাশে আত্মনিবেদিত এই সকল মহান ইমাম ও উলামায়ে কেরাম উম্মাহর জন্য এমন এক সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য রেখে গেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম জাতিকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিখুঁত ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান উপহার দিতে সক্ষম।


٧- ما الحكم فى لبس الحرير للرجال؟

[৭. পুরুষদের জন্য রেশম কাপড় ব্যবহারের বিধান কী?]

ভূমিকা

ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শালীনতা, পুরুষোচিত গাম্ভীর্য এবং অপচয়হীনতার নির্দেশ দিয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে পুরুষের ব্যক্তিত্ব এবং নারীর মর্যাদার মাঝে ভারসাম্য রক্ষার জন্য শরীয়ত কিছু সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান হলো পুরুষদের জন্য খাঁটি রেশমি কাপড় পরিধানের নিষেধাজ্ঞা। নিম্নে পুরুষদের জন্য রেশম ব্যবহারের শারয়ী হুকুম, কুরআন-সুন্নাহর দলীল এবং বিশেষ ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রসমূহ আলোচনা করা হলো।

১. পুরুষদের জন্য রেশম ব্যবহারের মূল শারয়ী হুকুম

ইসলামী শরীয়তের দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের জন্য খাঁটি রেশম (الحَرِيرُ الخَالِصُ / প্রাকৃতিক রেশম পোকা থেকে উৎপাদিত সিল্ক) দ্বারা তৈরি কাপড় পরিধান করা হারামে ক্বাতয়ী (حرام قطعيًا – সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ)। পক্ষান্তরে নারীদের জন্য রেশমি পোশাক ও স্বর্ণালঙ্কার ব্যবহার করা সর্বসম্মতভাবে হালাল ও বৈধ।

২. কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীলসমূহ

পুরুষের জন্য রেশম হারাম হওয়ার বিষয়টি অসংখ্য মুতাওয়াতির ও মশহুর হাদিস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত:

  • হাতে স্বর্ণ ও রেশম নিয়ে নববী ঘোষণা: হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বর্ণনা করেন:

    «أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ أَخَذَ حَرِيرًا فَجَعَلَهُ فِي يَمِينِهِ، وَأَخَذَ ذَهَبًا فَجَعَلَهُ فِي شِمَالِهِ، ثُمَّ قَالَ: إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي، حِلٌّ لِإِنَاثِهِمْ»

    [রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার রেশম নিয়ে তাঁর ডান হাতে রাখলেন এবং স্বর্ণ নিয়ে বাম হাতে রাখলেন। অতঃপর উভয় হাত তুলে ইরশাদ করলেন: “নিশ্চয়ই এ দুটি বস্তু আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং তাদের নারীদের জন্য সম্পূর্ণ হালাল।” — সুনানে আবু দাউদ: ৪০৫৭; সুনানে নাসাঈ: ৫১৪৪; সহীহ]

  • পরকালের পোশাক থেকে বঞ্চিত হওয়ার সতর্কতা: আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    «لاَ تَلْبَسُوا الْحَرِيرَ، فَإِنَّهُ مَنْ لَبِسَهُ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الآخِرَةِ»

    [তোমরা পুরুষেরা রেশম পরিধান করো না; কেননা যে ব্যক্তি দুনিয়ায় রেশম পরিধান করবে, সে আখেরাতে তা পরিধান করতে পারবে না। — সহীহ বুখারী: ৫৬৩৩; সহীহ মুসলিম: ২০৬৯]

  • রেশমের ওপর বসার নিষেধাজ্ঞাও শামিল: হযরত হুযায়ফা (রা.) বর্ণনা করেন:

    «نَهَانَا النَّبِيُّ ﷺ أَنْ نَشْرَبَ فِي آنِيَةِ الذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَأَنْ نَأْكُلَ فِيهَا، وَعَنْ لُبْسِ الحَرِيرِ وَالدِّيبَاجِ، وَأَنْ نَجْلِسَ عَلَيْهِ»

    [নবী করীম ﷺ আমাদেরকে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করতে এবং পুরুষদেরকে রেশম ও পাতলা রেশমি পোশাক পরিধান করতে এবং তার ওপর বসতে নিষেধ করেছেন। — সহীহ বুখারী: ৫৮৩৭]

৩. পুরুষদের জন্য রেশম ব্যবহারের বিশেষ অবকাশ ও ব্যতিক্রমসমূহ (الرخص والاستثناءات)

ইসলামী ফিকহে বিশেষ কিছু জরুরি অবস্থায় পুরুষদের জন্য শর্তসাপেক্ষে রেশম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে:

  1. চর্মরোগ ও তীব্র চুলকানির চিকিৎসায়: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত রয়েছে, বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) তীব্র খোসপাঁচড়া ও চুলকানিতে আক্রান্ত হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে চিকিৎসার স্বার্থে রেশমি জামা পরিধানের অনুমতি দিয়েছিলেন (সহীহ বুখারী: ২৯১৯; সহীহ মুসলিম: ২০৭৬)। সুতরাং চর্মরোগের কারণে কোনো বিকল্প না থাকলে পুরুষ রেশম পরতে পারে।
  2. চার আঙুল বা তার কম পরিমাণ নকশা ও পাড়: জামার কলার, বোতামের পট্টি বা হাতার কিনারায় চার আঙুল বা তার কম পরিমাণ রেশমের সুতা দিয়ে নকশা বা বর্ডার দেওয়া পুরুষদের জন্য জায়েয। সহীহ মুসলিমে হযরত উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ রেশম নিষেধ করেছেন তবে দুই, তিন বা চার আঙুল পরিমাণ ছাড়া (সহীহ মুসলিম: ২০৬৯)।
  3. মিশ্র রেশম (الحرير المخلوط): যদি কাপড়ে রেশমের সাথে অন্য কোনো সুতা (যেমন তুলা বা পশম) মিশ্রিত থাকে এবং সুতি সুতার পরিমাণ বেশি বা সমান হয় (হানাফী মাযহাব মতে কাপড়ের টানা সুতি হলে), তবে পুরুষদের জন্য তা পরিধান করা জায়েয।
  4. কৃত্রিম রেশম (Artificial Silk): আধুনিক প্রযুক্তিতে রাসায়নিক বা সিন্থেটিক উপায়ে তৈরি কৃত্রিম সিল্ক বা পলিয়েস্টার রেশম পোকা থেকে উৎপাদিত না হওয়ায় তা পুরুষদের জন্য পরিধান করা সম্পূর্ণ জায়েয।

উপসংহার

ইসলামে পুরুষদের জন্য রেশম হারাম করার পেছনে উদ্দেশ্য হলো পুরুষোচিত পৌরুষত্ব ও কঠোরতা বজায় রাখা, বিলাসিতা ও অহংকার দূর করা এবং পরকালের অফুরন্ত নেয়ামতের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত রাখা। কোনো ওজর ছাড়া পুরুষের জন্য রেশম পরা কবিরা গুনাহ।


٨- بأى شيئ لا يجوز الرهن؟

[৮. কোন জিনিস দ্বারা বন্ধক জায়িয নেই?]

ভূমিকা

ইসলামী ফিকহে বন্ধক বা রেহান হলো ঋণের নিরাপত্তামূলক এক বৈধ আর্থিক চুক্তি। কিন্তু প্রতিটি চুক্তি সহীহ হওয়ার জন্য তার পণ্যের কিছু সুনির্দিষ্ট শারয়ী যোগ্যতা আবশ্যক। যে বস্তুর মাঝে শরীয়তসম্মত লেনদেনের শর্তাবলি অনুপস্থিত থাকে, তা দ্বারা বন্ধক রাখা বৈধ নয়। ইসলামী ফিকহের আলোকে যে সকল বস্তু দ্বারা বন্ধক রাখা নাজায়েয ও বাতিল, নিম্নে তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

যে সকল বস্তু দ্বারা বন্ধক রাখা জায়েয নেই (ما لا يجوز رهنه)

  1. ১. যা শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘মাল’ নয় (غير متمول شرعًا):

    যে বস্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে অপবিত্র ও মূল্যহীন, তা বন্ধক রাখা সম্পূর্ণ বাতিলে রেহান। যেমন: মদ, শূকর, রক্ত, মৃতদেহ ইত্যাদি। কোনো মুসলমানের জন্য এগুলো বন্ধক রাখা বা বন্ধক হিসেবে গ্রহণ করা হারাম।

  2. ২. অনস্তিত্বশীল বা ভবিষ্যতে উৎপন্ন হওয়ার সম্ভাবনাময় বস্তু (المعدوم):

    চুক্তির সময় যে বস্তু বাস্তবে অস্তিত্বশীল নয়, তা বন্ধক রাখা যায় না। যেমন: গাছের যে ফল এখনো আসেনি, গাভীর পেটের অনাগত বাচ্চা ইত্যাদি। কেননা যা বিদ্যমান নেই তা হস্তান্তর বা কবয করা অসম্ভব।

  3. ৩. যা হস্তান্তর ও দখল করা অসম্ভব (العجز عن التسليم):

    এমন কোনো সম্পদ যার ওপর মালিকের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই এবং যা হস্তান্তর করা যায় না। যেমন: আকাশে উড়ন্ত বুনো পাখি, উন্মুক্ত নদী বা সাগরের মাছ, অথবা চুরি হয়ে যাওয়া সম্পদ ও পলাতক গাড়ি।

  4. ৪. যৌথ সম্পত্তির অবিভক্ত অংশ (الرهن المشاع):

    হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য ফতোয়া অনুযায়ী, বণ্টনযোগ্য কোনো যৌথ সম্পত্তির অবিভক্ত অংশ (মুশা’) বন্ধক রাখা নাজায়েয। কারণ রেহানের জন্য বন্ধকী বস্তু সম্পূর্ণ আলাদা করে ক্ববয (দখল) করা শর্ত; আর অবিভক্ত সম্পদে অংশীদারদের স্বত্ব মিশে থাকায় এককভাবে দখল দেওয়া সম্ভব নয়। তবে জমহুর ফুক্বাহার মতে অংশীদারদের সম্মতিতে তা বন্ধক রাখা যায়।

  5. ৫. যার কোনো আর্থিক উপযোগিতা বা মূল্য নেই (التافه الذي لا قيمة له):

    অতি নগণ্য বস্তু যা দ্বারা ঋণ উসুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। যেমন: একটি মাছি, এক ফোঁটা পানি বা একদানা শস্যদানা।

  6. ৬. যাতে বন্ধকদাতার কোনো বৈধ মালিকানা নেই (مال الغير بغير إذنه):

    অন্যের জমি, বাড়ি বা সম্পদ তার বিনা অনুমতিতে বা জবরদখল করে বন্ধক রাখা সম্পূর্ণ বাতিল ও অবৈধ।

  7. ৭. ওয়াকফকৃত সম্পত্তি ও ধর্মীয় স্থাপনা (الأموال الموقوفة):

    মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, এতিমখানা বা যেকোনো সাধারণ ওয়াকফ সম্পত্তি আল্লাহর নামে নিবেদিত হওয়ায় তা কোনো ব্যক্তিগত ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পূর্ণরূপে হারাম ও বাতিল।

  8. ৮. স্বাধীন মানুষ বা মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ:

    মানুষ আল্লাহ তাআলার সম্মানিত সৃষ্টি (وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ)। সুতরাং কোনো স্বাধীন ব্যক্তি, নিজের সন্তান, রক্ত বা শরীরের কোনো অঙ্গ বন্ধক রাখা মানবমর্যাদার পরিপন্থী এবং কঠোরভাবে হারাম।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলা যায়, যে বস্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে হালাল মাল, বর্তমানে অস্তিত্বশীল, হস্তান্তরযোগ্য, মালিকানাধীন এবং বিক্রি করে ঋণ উসুল করা সম্ভব — কেবল তা দ্বারাই বন্ধক রাখা জায়েয। এর বিপরীত যেকোনো ত্রুটিপূর্ণ বস্তু দ্বারা বন্ধক রাখা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল ও অকার্যকর।


أصول الفقه [উসূলুল ফিকহ] (পূর্ণমান — ৪০)

[أجب عن اثنين من مجموعة (الف) وعن اثنين من مجموعة (ب)-]

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: মূল প্রশ্নপত্রে উসূলুল ফিকহ অংশে مجموعة (ب) আলাদাভাবে মুদ্রিত হয়নি; শুধুমাত্র مجموعة (الف)-এর অধীনে ৯ থেকে ১২ নম্বর প্রশ্নসমূহ মুদ্রিত রয়েছে। পূর্ণ প্রস্তুতির স্বার্থে নিম্নে সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য উত্তর প্রস্তুত করা হলো।]

مجموعة (الف) [الدرجات: ১৫ × ২ = ৩০]

٩- ما الفرق بين الحديث والسنة؟ وما هى أقسام السنة فى ضوء أصول الفقه؟ بين-

[৯. الحديث ও السنة এর মধ্যে পার্থক্য কী? উসূলুল ফিকহ এর আলোকে السنة এর প্রকারগুলো কী কী? বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় মৌলিক ও চিরন্তন উৎস হলো সুন্নাহ। পবিত্র কুরআনের পর উম্মাহর বিশ্বাস ও আমলের প্রধান পথপ্রদর্শক হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র জীবনাদর্শ। তবে ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব ও উসূলুল ফিকহের পরিভাষায় ‘হাদীস’ (الحديث) এবং ‘সুন্নাহ’ (السنة) সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম ভাষাগত, সংজ্ঞাগত ও প্রায়োগিক পার্থক্য বিদ্যমান। উসূলুল ফিকহের মূল লক্ষ্য হলো সুন্নাহর প্রামাণিকতা যাচাই করে তা থেকে শারয়ী আহকাম ইস্তিম্বাত বা নিষ্কাশন করা। নিম্নে হাদীস ও সুন্নাহর মধ্যকার তুলনামূলক পার্থক্য এবং উসূলুল ফিকহের আলোকে সুন্নাহর নানাবিধ প্রকারভেদ সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

১. الحديث (হাদীস)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘হাদীস’ (الْحَدِيثُ) শব্দটি একটি বিশেষ্য। এর আভিধানিক অর্থ হলো:

  • الجديد (নতুন): যা প্রাচীন বা পুরাতনের (القديم) বিপরীত। যেহেতু আল্লাহর কালাম কুরআনুল কারীম হলো ‘ক্বাদীম’ (চিরন্তন), তাই তাঁর বিপরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণীকে ‘হাদীস’ (নতুন সৃষ্ট) বলা হয়।
  • الخبر (সংবাদ বা বার্তা): যেকোনো তথ্য বা ঘটনা যা অন্যের নিকট বর্ণনা করা হয়।
  • الكلام (কথা বা বাণী): মানুষের মুখনিঃসৃত বাক্যমালা। যেমন কুরআনে এসেছে: فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِّثْلِهِ (তারা পারলে এর সদৃশ কোনো বাণী নিয়ে আসুক — সূরা আত-তূর: ৩৪)।

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাদীস:

«مَا أُضِيفَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ مِنْ قَوْلٍ أَوْ فِعْلٍ أَوْ تَقْرِيرٍ أَوْ صِفَةٍ خَلْقِيَّةٍ أَوْ خُلُقِيَّةٍ»

[রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে সম্পর্কিত যেকোনো বাণী, কর্ম, মৌন সম্মতি এবং তাঁর সৃষ্টিগত বা চারিত্রিক গুণাবলির প্রামাণ্য বিবরণকেই হাদীস বলে।]

২. السنة (সুন্নাহ)-এর আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

আরবি ভাষায় ‘সুন্নাহ’ (السُّنَّةُ) শব্দের মূল ধাতু হলো س – ن – ن (সিন-নুন-নুন)। এর আভিধানিক অর্থ হলো:

  • الطريقة والسيرة (চলার পথ, আদর্শ বা অনুসৃত রীতি): কোনো ব্যক্তি বা সমাজের প্রচলিত জীবনপদ্ধতি — চাই তা প্রশংসনীয় হোক বা নিন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: مَنْ سَنَّ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةً حَسَنَةً... وَمَنْ سَنَّ سُنَّةً سَيِّئَةً (যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো ভালো রীতির প্রচলন করল… আর যে কোনো মন্দ রীতির প্রচলন করল — সহীহ মুসলিম: ১০১৭)।

উসূলবিদদের (উসূলিয়্যীন) পরিভাষায় সুন্নাহ:

«مَا صَدَرَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ غَيْرَ القُرْآنِ مِنْ قَوْلٍ أَوْ فِعْلٍ أَوْ تَقْرِيرٍ مِمَّا يَصْلُحُ أَنْ يَكُونَ دَلِيلًا لِحُكْمٍ شَرْعِيٍّ»

[পবিত্র কুরআন ব্যতীত রাসূলুল্লাহ ﷺ হতে প্রকাশিত এমন সকল বাণী, কর্ম ও সম্মতি — যা শরীয়তের কোনো বিধান সাব্যস্ত করার জন্য প্রামাণ্য দলীল হওয়ার যোগ্যতা রাখে।]

৩. হাদীস ও সুন্নাহর মধ্যকার তুলনামূলক পার্থক্য (الفرق بين الحديث والسنة)

সাধারণ দৃষ্টিতে উভয় পরিভাষা একে অপরের পরিপূরক হলেও উসূলবিদ ও গবেষক মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে এদের মধ্যে গভীর পার্থক্য বিদ্যমান:

পার্থক্যের দিক الحديث (হাদীস) السنة (সুন্নাহ)
১. মূল ধারণা ও প্রকৃতি হাদীস হলো ঐতিহাসিক বিবরণ বা কথামালা (الرواية والخبر)। এটি একটি বাচনিক দলিল যা সনদের মাধ্যমে সংকলিত হয়। সুন্নাহ হলো বাস্তব আদর্শ ও অনুসৃত আমল (التطبيق والعمل المستمر)। এটি শরীয়তের আইনগত রূপ।
২. ব্যাপকতা ও সীমাবদ্ধতা প্রতিটি হাদীস সুন্নাহ নাও হতে পারে। যেমন: রাসূল ﷺ-এর কিছু কাজ ছিল তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য (خصائص النبوة), অথবা কিছু হাদিস রহিত (منسوخ) হয়ে গেছে। এগুলো হাদীস হিসেবে সংকলিত হলেও উম্মতের আমলের জন্য সুন্নাহ নয়। প্রতিটি সুন্নাহ হাদীসের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক সুন্নাহ সাহাবা ও তাবেঈদের নিরবচ্ছিন্ন কর্মপরম্পরা (সুন্নাতে মুতাওয়ারাছা) দ্বারা প্রমাণিত, যার জন্য একক সনদের হাদীস জরুরি নয় (যেমন নামাযের রাকাত সংখ্যা)।
৩. শাস্ত্রীয় লক্ষ্য মুহাদ্দিসগণের মূল লক্ষ্য থাকে হাদীসের বর্ণনাকারী (রিজাল), সনদের ধারাবাহিকতা ও বিশুদ্ধতা যাচাই করা। উসূলবিদ ও ফকীহগণের মূল লক্ষ্য থাকে সুন্নাহ থেকে বিধিবিধান (আহকাম) আহরণ ও শরয়ী প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী ও আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী (রহ.)-এর ঐতিহাসিক প্রবাদ: প্রাচীন মনীষীগণ বলতেন: “ইমাম আওযায়ী ছিলেন হাদীসের ইমাম কিন্তু সুন্নাহর নন; সুফিয়ান সাওরী ছিলেন সুন্নাহর ইমাম কিন্তু হাদীসের নন; আর ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.) ছিলেন একই সাথে হাদীস ও সুন্নাহ উভয়েরই সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম।” অর্থাৎ হাদীস হলো শাস্ত্রের কাঁচামাল আর সুন্নাহ হলো তার চূড়ান্ত আইনগত রূপ।

৪. উসূলুল ফিকহের আলোকে সুন্নাহর প্রকারভেদ (أقسام السنة في أصول الفقه)

উসূলুল ফিকহে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্নাহকে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে:

১ম দৃষ্টিকোণ: স্বরূপ ও প্রকৃতির দিক থেকে (من حيث الماهية)
  1. ১. সুন্নাতে ক্বওলিয়্যাহ (السنة القولية – মৌখিক সুন্নাহ): রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র জবান মুবারক থেকে উচ্চারিত উপদেশ, নির্দেশ বা বিধান। যেমন:

    «إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ»

    [নিশ্চয়ই যাবতীয় আমলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। — সহীহ বুখারী: ১]

  2. ২. সুন্নাতে ফিলিয়্যাহ (السنة الفعلية – কর্মগত সুন্নাহ): রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বয়ং যা আমল করে দেখিয়েছেন। যেমন ওযুর পদ্ধতি, সালাত আদায়ের কায়দা এবং হজের তাওয়াফ ও সাঈ। নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন:

    «صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي»

    [তোমরা ঠিক সেভাবে সালাত আদায় করো, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ। — সহীহ বুখারী: ৬৩১]

  3. ৩. সুন্নাতে তাক্বরীরিয়্যাহ (السنة التقريرية – মৌন সম্মতিমূলক সুন্নাহ): কোনো সাহাবী রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সম্মুখে বা জীবদ্দশায় কোনো আমল করেছেন, আর নবীজী ﷺ তা দেখে বা জেনেও নিষেধ করেননি বরং নীরব সমর্থন জানিয়েছেন। যেমন: হযরত খাব্বাব (রা.) শাহাদাতের পূর্বে দু’রাকাত সালাত আদায় করার যে রীতি শুরু করেছিলেন নবীজী ﷺ তা অনুমোদন করেছিলেন; অথবা খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রা.)-এর দস্তরখানে গুঁইসাপ (দ্বব) ভক্ষণ করা নবীজী ﷺ নিষেধ করেননি।
২য় দৃষ্টিকোণ: সনদ ও রাবীর সংখ্যার দিক থেকে (হানাফী উসূলের ত্রিস্তরীয় বিভাজন)
প্রকার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য প্রজ্ঞাপিত ইলম ও মর্যাদা শারয়ী হুকুম
১. সুন্নাতে মুতাওয়াতিরা (السنة المتواترة) সাহাবা, তাবেঈ ও পরবর্তী প্রতি যুগে এত বিপুল সংখ্যক রাবী বর্ণনা করেছেন যে, তাদের পক্ষে মিথ্যার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব। العلم القطعي اليقيني
(অকাট্য ও নিশ্চিত জ্ঞান দান করে)
আমল করা ফরযে আইন; অস্বীকারকারী কাফের গণ্য হয়।
২. সুন্নাতে মাশহূরা (السنة المشهورة) প্রথম যুগে (সাহাবা যুগে) বর্ণনাকারীর সংখ্যা ১ বা ২ জন ছিল, কিন্তু তাবেঈ ও পরবর্তী যুগে এসে তাওয়াতুরের মতো খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। علم الطمأنينة
(সুনিশ্চিত মানসিক প্রশান্তির জ্ঞান)
আমল করা ওয়াজিব। এটি কুরআনের সাধারণ নির্দেশকে খাস করতে পারে। অস্বীকারকারী ফাসেক ও বিদআতী।
৩. সুন্নাতে আহাদ / খবরে ওয়াহিদ (خبر الواحد) যা তাওয়াতুর বা শুহরাতের স্তরে পৌঁছেনি; অর্থাৎ কোনো যুগে বর্ণনাকারীর সংখ্যা সীমিত ছিল। العلم الظني الغالب
(প্রবল ধারণামূলক জ্ঞান দান করে)
আকীদা ছাড়া ব্যবহারিক ফিকহের সকল ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে আমল ওয়াজিব।
৩য় দৃষ্টিকোণ: কুরআনের বিধানের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে
  1. ১. সুন্নাতে মুয়াক্কিদাহ (السنة المؤكدة للقواعد القرآنية): যা কুরআনের স্পষ্ট হুকুমকে হুবহু সমর্থন ও জোরদার করে। যেমন: সালাত কায়েম করা, মা-বাবার অবাধ্য না হওয়া।
  2. ২. সুন্নাতে মুবাইয়্যিনাহ (السنة المبينة للمجمل): যা কুরআনের সংক্ষিপ্ত বা অস্পষ্ট নির্দেশের বিশদ ব্যাখ্যা দেয়। যেমন কুরআনে সালাতের নির্দেশ আছে, কিন্তু সালাতের রুকন, রাকাত ও ওয়াক্তের বিশদ বিবরণ সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত।
  3. ৩. সুন্নাতে মুজিদাহ বা মুস্তাক্বিল্লাহ (السنة المنشئة للأحكام): যা এমন বিষয়ের নতুন শারয়ী হুকুম প্রবর্তন করে যা কুরআনে সরাসরি উল্লেখ নেই। যেমন: দাদী ও নানীর মিরাস সাব্যস্ত করা, গৃহপালিত গাধার গোশত হারাম করা, এবং পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ও রেশম হারাম ঘোষণা করা।

উপসংহার

সারসংক্ষেপে বলা যায়, হাদীস হলো সুন্নাহর বাহন আর সুন্নাহ হলো ইসলামী শরীয়তের চিরন্তন আইনি রূপ। উসূলুল ফিকহের আলোকে সুন্নাহর এই শ্রেণিবিন্যাস অনুধাবন করা ব্যতীত কোনো আলেমের পক্ষে কুরআন ও হাদীস থেকে নির্ভুল মাসআলা ইস্তিম্বাত করা কিছুতেই সম্ভব নয়।


١٠- عرف الراوى ثم بين شروطه لحجية الخبر مفصلا-

[১০. রাবী এর সংজ্ঞা দাও। অতঃপর হাদিস দলিলরূপে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য রাবীর মধ্যকার শর্তাবলি বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস সুন্নাহ আমাদের নিকট সংরক্ষিত হয়ে পৌঁছেছে একদল বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মাধ্যমে। উসূলুল ফিকহ ও উলূমুল হাদীসে এই বর্ণনাকারীকে ‘রাবী’ (الراوي) বলা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কোনো বাণী বা সুন্নাহ আমাদের নিকট প্রমাণ হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি হলো রাবীর বিশ্বস্ততা ও তাঁর সংরক্ষণ ক্ষমতার নিখুঁত মানদণ্ড। যদি রাবীর মধ্যে শারয়ী শর্তাবলি যথাযথভাবে বিদ্যমান থাকে, তবেই তাঁর বর্ণিত হাদিস শরীয়তের দলীল (হুজ্জাত) হিসেবে কার্যকর হয়। নিম্নে রাবীর সংজ্ঞা এবং হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য রাবীর অপরিহার্য শর্তাবলি সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

১. الراوي (রাবী)-এর আভিধানিক অর্থ

আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘রাবী’ (الرَّاوِي) শব্দটি ইসমে ফায়েল বা কর্তৃবাচক বিশেষ্য। এর মূল ধাতু হলো ر – و – ي (রা-ওয়াও-ইয়া)। বাবে যারাবা থেকে এর ক্রিয়ামূল হলো ‘রিওয়ায়াত’ (الرِّوَايَةُ)। এর আভিধানিক অর্থ হলো:

  1. السَّاقِي وحَامِلُ المَاءِ (পানি বহনকারী ও সেচকারী): আরবরা পানি বহনকারী উট বা পশুকে ‘রাবিয়াহ’ (راوية) বলত। রূপক অর্থে যিনি হাদিসের ইলম বহন করে তৃষ্ণার্ত মানুষের মাঝে পৌঁছে দেন, তাঁকে রাবী বলা হয়।
  2. النَّاقِلُ لِلْخَبَرِ أَوْ الشِّعْرِ (সংবাদ বা কবিতা বর্ণনাকারী): প্রাচীন আরবে যারা মুখে মুখে কবিতা বা গোত্রীয় সংবাদ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দিত তাদের রাবী বলা হতো।

২. الراوي (রাবী)-এর পারিভাষিক অর্থ

ইসলামী উসূলুল ফিকহ ও উলূমুল হাদীসের পরিভাষায় রাবীর প্রামাণ্য সংজ্ঞা হলো:

«مَنْ يَنْقُلُ الحَدِيثَ عَنْ غَيْرِهِ بِسَنَدِهِ وَيُؤَدِّيهِ إِلَى مَنْ بَعْدَهُ عَلَى وَجْهِ الرِّوَايَةِ»

[যিনি স্বীয় উস্তাদ বা পূর্ববর্তী বর্ণনাকারীর নিকট হতে সনদসহকারে হাদীস শ্রবণ ও গ্রহণ করেন এবং তা পরবর্তীতে অপর কোনো ব্যক্তির নিকট হুবহু বর্ণনা ও হস্তান্তর করেন, তাঁকেই রাবী বলা হয়।]

৩. হাদীস দলীলরূপে গৃহীত হওয়ার জন্য রাবীর আবশ্যিক শর্তাবলি (شروط الراوي لحجية الخبر)

উসূলবিদ ও ফকীহগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো রাবীর বর্ণিত খবরে ওয়াহিদ শরীয়তের দলীল (حجة شرعية) হওয়ার জন্য রাবীর মাঝে প্রধানত দুটি মৌলিক গুণ বা শর্তের সমাহার ঘটতে হবে — ১. আল-আদালত (العدالة – চারিত্রিক সততা ও ধর্মপরায়ণতা) এবং ২. আদ-দাবত (الضبط – স্মৃতিশক্তি ও নিখুঁত সংরক্ষণ ক্ষমতা)। এই দুটি গুণের অধিকারী বর্ণনাকারীকে ‘সিক্বাহ’ (ثقة – নির্ভরযোগ্য) বলা হয়।

(ক) আল-আদালত (العدالة)-এর বিস্তারিত শর্তাবলি

আদালত হলো আত্মার এমন এক সুদৃঢ় গুণ যা মানুষকে তাক্বওয়া ও শালীনতা অবলম্বনে বাধ্য করে এবং যাবতীয় পাপাচার ও নীচতা থেকে রক্ষা করে। রাবীর আদালত সাব্যস্ত হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক:

  1. ১. আল-ইসলাম (الإسلام – মুসলমান হওয়া):

    রাবীর জন্য অপরিহার্য শর্ত হলো তাকে মুসলিম হতে হবে। কোনো অমুসলিম বা কাফেরের রেওয়ায়েত শরীয়তের দলীল হতে পারে না; কেননা আল্লাহ তাআলা ফাসেকদের সংবাদের ব্যাপারে সতর্ক করে ইরশাদ করেছেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا (হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসেক তোমাদের নিকট কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও — সূরা আল-হুজুরাত: ৬)। তবে কোনো অমুসলিম যদি কুফরি অবস্থায় কোনো হাদিস শুনে থাকে এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণের পর তা বর্ণনা করে, তবে তা সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য (যেমন জুবায়ের ইবনে মুতঈম রা.-এর মাগরিবের সালাতে সূরা তূর শোনার হাদিস)।

  2. ২. আল-আকল (العقل – সুস্থ বিবেকসম্পন্ন হওয়া):

    হাদিস গ্রহণ (তাহাম্মুল) এবং বর্ণনা (আদা) উভয় সময়েই রাবীকে পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে। পাগল, মস্তিষ্কবিকৃত বা মাতাল ব্যক্তির বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে বাতিল।

  3. ৩. আল-বুলূগ (البلوغ – প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া):

    হাদীস অন্যের কাছে বর্ণনা ও প্রচারের সময় রাবীকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা বুঝমান শিশু অবস্থায় (মুমায়্যিয) হাদিস শ্রবণ ও মুখস্থ করা বৈধ। যেমন হাসান, হুসাইন, ইবনে আব্বাস ও মাহমুদ ইবনে রবী (রা.) শৈশবে হাদিস শুনে বালেগ হওয়ার পর তা বর্ণনা করেছেন এবং উম্মাহ তা সানন্দে গ্রহণ করেছে।

  4. ৪. আত-তাক্বওয়া ও ফিসক্বহীনতা (التقوى والسلامة من الفسق):

    রাবীকে যাবতীয় কবিরা গুনাহ (যেমন মিথ্যাচার, যেনা, মদ্যপান, সুদ) থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হতে হবে এবং সগিরা গুনাহের ওপর অবিচল ও অভ্যস্ত হওয়া চলবে না। যে রাবী জীবনে একবারও হাদিসের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলেছে সে ‘কাযযাব’ (কঠিন মিথ্যাবাদী) এবং তার হাদিস চিরতরে প্রত্যাখ্যাত (মারদূদ)।

  5. ৫. আল-মুরুওয়াত ও ব্যক্তিত্ব রক্ষা (المروءة):

    রাবীকে এমন সব আচরণ থেকে মুক্ত থাকতে হবে যা সমাজের চোখে ব্যক্তিত্বহীন, নির্লজ্জ ও হাস্যকর। যেমন: প্রকাশ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা, বাজারে খাবার চিবিয়ে চিবিয়ে চলাফেরা করা, বা বেহায়াপূর্ণ কৌতুক করা। এ জাতীয় কাজ মুরূওয়াত নষ্ট করে এবং সাক্ষ্যের প্রামাণিকতা ক্ষুণ্ণ করে।

(খ) আদ-দাবত (الضبط)-এর বিস্তারিত শর্তাবলি

দাবত অর্থ হলো রাবী স্বীয় উস্তাদের কাছ থেকে যেভাবে হাদিসটি শুনেছেন, ঠিক সেভাবেই কোনো প্রকার বিকৃতি, সংযোজন বা বিয়োজন ছাড়া নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা। দাবত দুই প্রকার:

  • ১. দাবতুস সদর (ضبط الصدر – স্মৃতিশক্তির নির্ভুলতা): রাবীর স্মৃতিশক্তি এত প্রখর হতে হবে যে, হাদিস শোনার পর থেকে তা অন্যের নিকট বর্ণনা করার মুহূর্ত পর্যন্ত যেকোনো সময় চাইলে হুবহু স্মৃতি থেকে তা পাঠ করতে সক্ষম হন।
  • ২. দাবতুল কিতাব (ضبط الكتاب – পাণ্ডুলিপির নির্ভুলতা): যদি রাবী কিতাব দেখে হাদিস বর্ণনা করেন, তবে সেই কিতাবটি উস্তাদের মূল কপির সাথে যথাযথভাবে মিলিয়ে সুরক্ষিত রাখতে হবে, যাতে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি তাতে কোনো পরিবর্তন বা জালিয়াতি করতে না পারে।

দাবত ত্রুটিমুক্ত হওয়ার শর্ত: রাবীর মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত ভুলভ্রান্তি (كثرة الغلط), চরম অসতর্কতা ও গাফলত (شدة الغفلة), মাত্রাতিরিক্ত ভিত্তিহীন সন্দেহ (كثرة الأوهام) এবং নির্ভরযোগ্য রাবীদের উল্টো বর্ণনা করার প্রবণতা (مخالفة الثقات) থাকা চলবে না।

(গ) হানাফী উসূলবিদগণের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ও অতিরিক্ত শর্তাবলি

ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.) এবং হানাফী উসূলবিদগণ খবরে ওয়াহিদ দ্বারা কিয়াস ত্যাগ করার ক্ষেত্রে রাবীর ব্যাপারে বিশেষ কিছু সূক্ষ্ম শর্তারোপ করেছেন:

বিশেষ শর্ত উসূলী তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ বাস্তব প্রয়োগ ও উদাহরণ
১. রাবীর ফিকাহাত বা গভীর প্রজ্ঞা (كون الراوي فقيهاً) হাদীসটি যদি প্রতিষ্ঠিত কিয়াস ও সাধারণ শারয়ী মূলনীতির বিপরীত হয়, তবে রাবীকে অবশ্যই ‘ফকীহ’ (فقيه) হতে হবে। রাবী ফকীহ হলে কিয়াসের বিপরীতেও তাঁর খবরে ওয়াহিদ গৃহীত হবে (যেমন ইবনে মাসউদ, যায়েদ ইবনে সাবিত ও আয়েশা রা.)। কিন্তু রাবী কেবল মুখস্থকারী হলে কিয়াস প্রাধান্য পাবে। ‘মুসাররাত’ (দুধেল পশুর ওলান বেঁধে রেখে বিক্রি)-এর হাদিসে হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনার বিপরীতে হানাফী ফকীহগণ ক্ষতিপূরণের সাধারণ কিয়াসকে অগ্রাধিকার দেন।
২. স্বীয় বর্ণনার বিপরীতে রাবীর ফতোয়া না থাকা কোনো রাবী একটি হাদিস বর্ণনা করার পর নিজেই যদি প্রকাশ্যে সেই হাদিসের বিপরীত ফতোয়া দেন বা আমল করেন, তবে হানাফী উসূল মতে মূল হাদিসটি রহিত (মানসূখ) বা ত্রুটিযুক্ত বলে গণ্য হয়। কুকুর পাত্রে মুখ দিলে তিনবার ধোয়ার ফতোয়া দিয়েছিলেন আবু হুরায়রা (রা.), অথচ তাঁর বর্ণিত রেওয়ায়েতে সাতবারের কথা এসেছে। ফলে হানাফী মতে তিনবার ধোয়াই ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়।
৩. উমূমে বালওয়া বিষয়ে একক রাবী না হওয়া যে মাসআলা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত (عموم البلوى), তাতে একক ব্যক্তির খবরে ওয়াহিদ হানাফী মতে ফরয বা ওয়াজিব সাব্যস্ত করতে পারে না। নামাযের রুকুতে যাওয়ার সময় রাফউল ইয়াদাইন করা বা গুপ্তাঙ্গ স্পর্শে ওযু ভেঙে যাওয়ার মতো ব্যাপক বিষয় সাধারণ মুতাওয়াতির সুন্নাহ হতে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, রাবীর আদালত ও দাবতের এই সুকঠিন ও অতুলনীয় বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের কারণেই মুসলিম উম্মাহ চৌদ্দশত বছর ধরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহকে অবিকৃত ও সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। পৃথিবীর কোনো ধর্ম বা জাতি তাদের ধর্মীয় নেতার বাণী সংরক্ষণে রাবীদের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিখুঁত যাচাই-বাছাইয়ের ইতিহাস উপহার দিতে পারেনি।

١١- ما هو حكم الإجماع؟ بين أركانه مع ذكر شروطه مفصلا-

[১১. الإجماع এর হুকুম কী? শর্তসমূহ উল্লেখপূর্বক এর রুকনসমূহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তের অকাট্য ও অপরিবর্তনীয় উৎসসমূহের ক্রমানুসারে কুরআনুল কারীম ও সুন্নাহে নববীয়ার ঠিক পরেই ‘ইজমা’ (الإجماع)-এর স্থান। এটি উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য আল্লাহ তাআলার এক অনুপম বিশেষত্ব ও সুরক্ষাকবচ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর উম্মাহর সর্বস্তরের মুজতাহিদ ফকীহগণের কোনো শারয়ী সিদ্ধান্তে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইজমা শরীয়তের বিধানের মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে এবং যেকোনো প্রকার বিভ্রান্তি ও বিভ্রান্তিকর মতবাদের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে। নিম্নে ইজমার আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ, শারয়ী হুকুম, এর রুকন এবং বিশুদ্ধতার শর্তাবলি সবিস্তারে আলোচনা করা হলো।

১. الإجماع (ইজমা)-এর আভিধানিক অর্থ

আরবি ভাষায় ‘ইজমা’ (الإِجْمَاعُ) শব্দটি বাবে ইফআল থেকে নির্গত একটি মাসদার বা ক্রিয়ামূল। এর মূল ধাতু হলো ج – م – ع (জিম-মীম-আইন)। আভিধানিক দৃষ্টিকোণে এর দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে:

  1. العَزْمُ المُصَمَّمُ (দৃঢ় সংকল্প বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ): কোনো কাজ করার ব্যাপারে মনের অটল ইচ্ছা পোষণ করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

    فَأَجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ

    [অতএব তোমরা তোমাদের কর্মপন্থা ও তোমাদের অংশীদারদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো। — সূরা ইউনুস: ৭১]
    হাদিস শরীফে এসেছে: مَنْ لَمْ يُجْمِعِ الصِّيَامَ قَبْلَ الفَجْرِ فَلَا صِيَامَ لَهُ (যে ব্যক্তি ফজরের পূর্বেই রোজার দৃঢ় সংকল্প বা নিয়ত করল না, তার রোজা হলো না — সুনানে আবু দাউদ: ২৪৫৪)।

  2. الاتِّفَاقُ (পারস্পরিক ঐকমত্য পোষণ করা): একাধিক ব্যক্তি কোনো বিষয়ে একমত হওয়া। যেমন আরবরা বলে থাকে: أَجْمَعَ القَوْمُ عَلَى كَذَا (গোত্রের সকলে অমুক সিদ্ধান্তের ওপর একমত হয়েছে)।

২. الإجماع (ইজমা)-এর পারিভাষিক অর্থ

উসূলুল ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থাবলিতে (যেমন উসূলুশ শাশী, নূরুল আনওয়ারআল-মুসতাসফা) ইজমার সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে:

«اتِّفَاقُ مُجْتَهِدِي أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ﷺ فِي عَصْرٍ مِنَ العُصُورِ بَعْدَ وَفَاتِهِ عَلَى حُكْمٍ شَرْعِيٍّ»

[রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর যেকোনো এক যুগে উম্মতে মুহাম্মদীর সকল মুজতাহিদের কোনো শারয়ী বিধানের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়াকে ইজমা বলে।]

সংজ্ঞার শব্দাবলির গভীর বিশ্লেষণ (تحليل التعريف)
  • الاتفاق (ঐকমত্য): কোনো বিষয়ের ওপর সকলের একমত হওয়া। যদি অধিকাংশ একমত হয় কিন্তু একজন মুজতাহিদও ভিন্নমত পোষণ করেন, তবে তা ইজমা গণ্য হবে না।
  • مجتهدي أمة محمد (মুজতাহিদগণ): সাধারণ মুসলিমদের মত নয়, বরং ইজতিহাদের যোগ্যতা সম্পন্ন ফকীহগণের ঐকমত্য।
  • في عصر من العصور (যেকোনো যুগে): সাহাবা যুগ, তাবেঈ যুগ কিংবা পরবর্তী যেকোনো যুগেই ইজমা সংঘটিত হতে পারে।
  • بعد وفاته (রাসূল ﷺ-এর ওফাতের পর): নবীজীর জীবদ্দশায় অহী চালু থাকায় তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত; তাই তাঁর ওফাতের পূর্বে ইজমার অবকাশ ছিল না।
  • على حكم شرعي (শারয়ী বিধানের ওপর): জাগতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা ব্যাকরণিক কোনো বিষয় নয়, বরং হালাল, হারাম, ফরয, ওয়াজিব ইত্যাদি শারয়ী বিষয়ে ইজমা হতে হবে।

৩. ইজমার শারয়ী হুকুম ও মর্যাদা (حكم الإجماع)

ইসলামী শরীয়তে ইজমা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, অকাট্য ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক দলীল (حجة ملزمة واجبة الاتباع)।

(ক) ইজমা দলীল হওয়ার সপক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর প্রমাণ
  • পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলীল: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন:

    وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا

    [আর যে ব্যক্তি তার নিকট হেদায়েতের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের অনুসৃত পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ অনুসরণ করে, তবে আমি তাকে সেই পথেই ছেড়ে দেব যা সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব; আর তা কতই না নিকৃষ্ট ঠিকানা! — সূরা আন-নিসা: ১১৫]
    ইমাম শাফেয়ী (রহ.) দীর্ঘ গবেষণার পর এই আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, মুমিনদের সামগ্রিক পথ বা ইজমা ত্যাগ করা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ; সুতরাং ইজমা মানা ফরয।

  • হাদিসে নববীর দলীল: রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মাহর ঐকমত্যকে নির্ভুল ও সুরক্ষিত ঘোষণা করে বলেছেন:

    «إِنَّ اللَّهَ لَا يَجْمَعُ أُمَّتِي عَلَى ضَلَالَةٍ، وَيَدُ اللَّهِ مَعَ الجَمَاعَةِ»

    [নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার সমগ্র উম্মতকে কোনো ভ্রষ্টতা বা ভুলের ওপর কখনো একমত করবেন না; আর আল্লাহর রহমতের হাত জামাত বা ঐক্যের ওপর রয়েছে। — জামে আত-তিরমিযী: ২১৬৭; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৯৫০]

(খ) প্রকারভেদ অনুযায়ী ইজমার হুকুম
ইজমার প্রকার বাস্তব রূপ প্রজ্ঞাপিত ইলম ও মর্যাদা শারয়ী বিধান ও হুকুম
১. ইজমায়ে সারীহ (الإجماع الصريح) কোনো যুগের সকল মুজতাহিদ প্রকাশ্যে স্ব স্ব মুখে বা লেখনীর মাধ্যমে একই সিদ্ধান্তের পক্ষে সুনির্দিষ্ট সম্মতি প্রকাশ করেন। حجة قطعية يقينية
(কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদিসের ন্যায় অকাট্য দলীল)
আমল করা ফরযে আইন। সর্বসম্মত অকাট্য ইজমা অস্বীকারকারী কাফের হয়ে যায়।
২. ইজমায়ে সুকূতী (الإجماع السكوتي) এক বা একাধিক মুজতাহিদ কোনো ফতোয়া দেন এবং সমকালীন অন্য মুজতাহিদগণ তা অবগত হয়ে কোনো আপত্তি না করে নীরব থাকেন। حجة ظنية معتبرة
(হানাফী ও জমহুর মতে গ্রহণযোগ্য প্রামাণ্য দলীল)
আমল করা ওয়াজিব। তবে এটি অস্বীকারকারী কাফের হবে না, বরং ফাসেক বা বিভ্রান্ত গণ্য হবে।

৪. ইজমার রুকনসমূহ (أركان الإجماع)

উসূলবিদদের মতে ইজমা অস্তিত্ব লাভ করার জন্য প্রধান চারটি রুকন পরিপূর্ণ হওয়া অপরিহার্য:

  1. ১. আহলুল ইজমা বা মুজতাহিদের বহুত্ব (وجود عدد من المجتهدين): ইজমার জন্য সেই যুগে একাধিক মুজতাহিদ বিদ্যমান থাকতে হবে। যদি কোনো যুগে পৃথিবীতে কেবল একজন মাত্র মুজতাহিদ বেঁচে থাকেন, তবে তাঁর একক অভিমত ইজমা হিসেবে পরিগণিত হবে না।
  2. ২. সমগ্র মুজতাহিদের পূর্ণ ঐকমত্য (حصول الاتفاق من جميع المجتهدين): ঐ যুগের সকল যোগ্য মুজতাহিদকে একই মতের ওপর একমত হতে হবে। একজন মুজতাহিদও যদি প্রকাশ্যে ভিন্নমত পোষণ করেন, তবে তা শরীয়তের পরিভাষায় ইজমা সাব্যস্ত হবে না।
  3. ৩. মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়া (إبداء الرأي صراحة أو دلالة): প্রত্যেক মুজতাহিদের সম্মতি ফতোয়া, বিচারিক রায় বা নীরব সম্মতির মাধ্যমে পরিস্ফুট হতে হবে।
  4. ৪. বিষয়বস্তু শারয়ী হওয়া (أن يكون المجمع عليه حكمًا شرعيًا): ইজমার বিষয়টিকে অবশ্যই দ্বীনের কোনো ব্যবহারিক বিধানের সাথে সম্পর্কিত হতে হবে।

৫. ইজমার শর্তাবলি (شروط الإجماع)

ইজমা বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলি পূরণ হওয়া আবশ্যক:

  • ১. মুজতাহিদগণের চারিত্রিক সততা ও ন্যায়পরায়ণতা (العدالة): সকল মুজতাহিদকে মুত্তাকী, বিশ্বস্ত ও ফিসক্বমুক্ত হতে হবে। কোনো ফাসেক বা পাপাচারীর মত ধর্তব্য নয়।
  • ২. কুফরি বিদআত থেকে মুক্ত হওয়া: মুজতাহিদকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। চরমপন্থী বিভ্রান্ত বিদআতী যাদের আকিদা কুফরি পর্যন্ত পৌঁছায়, তাদের মত ইজমার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
  • ৩. ইজমার ভিত্তি বা সনদ থাকা (مستند الإجماع): ইজমা কখনো ভিত্তিহীন অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; এর পেছনে অবশ্যই কুরআনুল কারীমের কোনো আয়াত বা সুন্নাহর কোনো দলীল ‘মুস্তাদ’ বা ভিত্তি হিসেবে বিদ্যমান থাকতে হবে।
  • ৪. ইনক্বিরাযুল আসর (انقراض العصر – যুগের সমাপ্তি কি শর্ত?):
    • ইমামে আযম আবু হানিফা ও জমহুর উসূলবিদদের মতে: ইজমা কার্যকর হওয়ার জন্য ঐ যুগের সকল মুজতাহিদের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করা শর্ত নয়; বরং ঐকমত্য সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই তা চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী হয়ে যায়। কোনো মুজতাহিদ পরবর্তীতে মত পরিবর্তন করলেও ইজমা ভাঙবে না।
    • ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের একটি রেওয়ায়েত অনুযায়ী: যুগের সকল মুজতাহিদ স্বীয় মতের ওপর বহাল থেকে ইন্তেকাল করলেই কেবল তা চূড়ান্ত ইজমায় পরিণত হয়। তবে জমহুরের মতই সর্বাধিক বিশুদ্ধ।

উপসংহার

ইজমা হলো মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ঐক্য ও সামাজিক সুশৃঙ্খলতার সর্বোত্তম নিশ্চয়তা। যুগে যুগে কুরআন সংকলন, আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত, দাদার উপস্থিতিতে ভাইয়ের মিরাস কিংবা আধুনিক যুগে যৌথ ইজতিহাদী ফতোয়ার মাধ্যমে ইজমার বিধান মুসলিম উম্মাহকে অটুট ভ্রাতৃত্ব ও অভিন্ন আদর্শে পথ প্রদর্শন করে চলেছে।


١٢- عرف القياس لغة وإصطلاحًا- ثم تحدث عن حجية القياس مفصلا-

[১২. القياس এর আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা দাও। অতঃপর القياس দলিল হওয়ার বিষয়ে প্রমাণসহ বিস্তারিত আলোচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী আইনশাস্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং ইজতিহাদের প্রধানতম হাতিয়ার হলো ‘কিয়াস’ (القياس)। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর প্রত্যক্ষ বাচনিক পাঠ্য (নস) সংখ্যায় নির্দিষ্ট ও সীমিত; অথচ মানবসভ্যতার অগ্রগতি ও কিয়ামত পর্যন্ত উদ্ভূত মানবজীবনের জটিল সমস্যা ও ঘটনাবলি অসীম ও সীমাহীন। এই সীমাহীন ও অভাবনীয় পরিস্থিতির কুরআন-সুন্নাহসম্মত নিখুঁত সমাধান উদ্ভাবনে কিয়াস এক জীবন্ত অলৌকিক ভূমিকা পালন করে। কিয়াস কোনো মনগড়া রায় নয়, বরং আসমানী অহীর অন্তর্নিহিত কারণ বা ইল্লতের ভিত্তিতে নতুন বিষয়ের বিধান উদ্ঘাটন। নিম্নে কিয়াসের আভিধানিক ও পারিভাষিক সংজ্ঞা এবং এটি শরীয়তের হুজ্জাত বা দলীল হওয়ার সপক্ষে বিস্তারিত প্রমাণাদি আলোচনা করা হলো।

১. القياس (কিয়াস)-এর আভিধানিক অর্থ

আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘কিয়াস’ (القِيَاسُ) শব্দটি বাবে যারাবা (قَاسَ – يَقِيسُ – قِيَاسًا) থেকে নির্গত একটি মাসদার বা ভাববাচ্য। এর মূল ধাতু হলো ق – ي – س (ক্বাফ-ইয়া-সীন)। আভিধানিক দৃষ্টিকোণে এর দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে:

  1. التَّقْدِيرُ (পরিমাপ করা বা পরিমাণ নির্ধারণ করা): কোনো পরিমাপকের সাহায্যে কোনো বস্তুর পরিমাণ জানা। যেমন আরবরা বলে থাকে:

    «قِسْتُ الثَّوْبَ بِالذِّرَاعِ»

    [আমি গজ বা ফিতার সাহায্যে কাপড়টি পরিমাপ করলাম।]
    অথবা قِسْتُ الأَرْضَ بِالمِتْرِ (আমি মিটার দিয়ে জমি মেপে নিলাম)।

  2. التَّسْوِيَةُ والمُمَاثَلَةُ (সমতা বিধান করা বা সমকক্ষ তুলনা করা): একটি বস্তুকে অপর একটি বস্তুর সমতুল্য মনে করা। যেমন আরবি প্রবাদে বলা হয়:

    «فُلاَنٌ لاَ يُقَاسُ بِفُلاَنٍ»

    [অমুক ব্যক্তি অমুক ব্যক্তির সমকক্ষ বা সমতুল্য হতে পারে না।]

২. القياس (কিয়াস)-এর পারিভাষিক অর্থ

ইসলামী উসূলুল ফিকহের পরিভাষায় বিভিন্ন ধারার উসূলবিদগণ কিয়াসের অত্যন্ত চমৎকার ও বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা প্রদান করেছেন:

(ক) হানাফী উসূলবিদগণের সংজ্ঞা (উসূলুশ শাশী, নূরুল আনওয়ার ও আল-মানার)

«تَعْدِيَةُ الحُكْمِ مِنَ الأَصْلِ إِلَى الفَرْعِ لِعِلَّةٍ مُشْتَرَكَةٍ بَيْنَهُمَا لاَ تُدْرَكُ بِمُجَرَّدِ اللُّغَةِ»

[নিছক আভিধানিক ভাষা দ্বারা বোঝা যায় না এমন কোনো উভয়ের মধ্যে বিদ্যমান সাধারণ কার্যকর কারণ বা ইল্লতের ভিত্তিতে মূল বিষয়ের হুকুমকে নতুন শাখা বিষয়ে প্রসারিত ও প্রয়োগ করাকে কিয়াস বলে।]

(খ) ইমাম শাফেয়ী, ইমাম গাজালী ও জমহুর উসূলবিদদের সংজ্ঞা

«حَمْلُ مَعْلُومٍ عَلَى مَعْلُومٍ فِي إِثْبَاتِ حُكْمٍ لَهُمَا أَوْ نَفْيِهِ عَنْهُمَا بِأَمْرٍ جَامِعٍ بَيْنَهُمَا»

[উভয়ের মাঝে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য বা ইল্লত বিদ্যমান থাকার কারণে কোনো সুনির্দিষ্ট জানা মূল বিষয়ের শারয়ী হুকুমকে অপর এক নতুন বিষয়ের ওপর সাব্যস্ত বা রহিত করতে একীভূত করাকে কিয়াস বলে।]

কিয়াসের চারটি রুকন (সংক্ষিপ্ত রূপরেখা)

রুকন আরবি পরিভাষা সংজ্ঞা ও ধারণা বাস্তব উদাহরণ
১. মূল বিষয় الأَصْلُ (المَقِيسُ عَلَيْهِ) যার বিধান কুরআন বা সুন্নাহর স্পষ্ট পাঠ্য (নস) দ্বারা প্রমাণিত। আঙ্গুরের মদ (খামর)
২. শাখা বিষয় الفَرْعُ (المَقِيسُ) নতুন অভূতপূর্ব বিষয়, যার বিধান নসে সরাসরি নেই। হেরোইন, ইয়াবা বা আধুনিক মাদক
৩. মূলের বিধান حُكْمُ الأَصْلِ কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত মূল বিষয়ের শারয়ী হুকুম। হারাম হওয়া ও দণ্ডনীয় হওয়া
৪. কার্যকর কারণ العِلَّةُ المُشْتَرَكَةُ উভয়ের মাঝে বিদ্যমান সাধারণ বৈশিষ্ট্য যার জন্য হুকুম দেওয়া হয়েছে। মাদকতা ও বোধশক্তি বিনষ্ট করা (الإسكار)

৩. কিয়াসের হুজ্জিয়্যাত বা দলীল হওয়ার প্রমাণাদি (حجية القياس مفصلاً)

জমহুর উম্মাহ, চার মাযহাবের মহান চার ইমাম, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈগণের সর্বসম্মত ফতোয়া অনুযায়ী, কিয়াস হলো শরীয়তের চতুর্থ অকাট্য দলীল ও নির্ভরযোগ্য উৎস (حجة شرعية وأصل معتبر)। (কেবল জাহেরী সম্প্রদায় ও কিছু পথভ্রষ্ট দল কিয়াসকে অস্বীকার করেছে)। কিয়াস শারয়ী দলীল হওয়ার সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও যুক্তির অকাট্য প্রমাণাদি নিম্নে তুলে ধরা হলো:

(ক) পবিত্র কুরআনুল কারীম হতে দলীল
  1. ১. শিক্ষা ও উপমা গ্রহণের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

    فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الأَبْصَارِ

    [অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করো। — সূরা আল-হাশর: ২]
    উসূলবিদদের মতে, ‘ই’তিবার’ (الإعتبار) শব্দের ভাষাগত অর্থ হলো এক বস্তুকে অন্য বস্তুর সাথে তুলনা করে দৃষ্টান্ত অনুধাবন করা। আল্লাহ কাফেরদের পরিণতির সাথে অন্যদের তুলনা করার নির্দেশ দিয়ে প্রকারান্তরে কিয়াসের বৈধতা প্রমাণ করেছেন।

  2. ২. গবেষণার মাধ্যমে বিধান উদঘাটন (ইস্তিম্বাত): আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন:

    وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَىٰ أُولِي الأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ

    [আর যদি তারা বিষয়টি রাসূলের নিকট এবং তাদের মধ্যকার দায়িত্বশীল আলেমদের নিকট পৌঁছাত, তবে তাদের মধ্য হতে যারা গবেষণা ও তত্ত্ব উদঘাটনে সক্ষম, তারা এর প্রকৃত হুকুম জেনে নিতে পারত। — সূরা আন-নিসা: ৮৩]
    ‘ইস্তিম্বাত’ হলো গভীর চিন্তার মাধ্যমে কিয়াস করে কুরআন-সুন্নাহ হতে অপ্রকাশ্য বিধান বের করে আনা।

  3. ৩. কুরআনে স্বয়ং কিয়াসের উপমা প্রদর্শন: কাফেররা যখন মৃত্যুর পর হাড্ডি পুনরুজ্জীবিত হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, তখন আল্লাহ ইরশাদ করেন:

    قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ

    [বলুন! যিনি এগুলোকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন, তিনিই আবার জীবিত করবেন। — সূরা ইয়াসীন: ৭৯]
    এখানে আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয়বার পুনরুত্থানকে প্রথমবার সৃষ্টির সাথে কিয়াস করে মানুষের যুক্তির সামনে সত্য উদ্ভাসিত করেছেন।

(খ) হাদীসে নববী হতে দলীল
  1. ১. মুআয ইবনে জাবাল (রা.)-এর বিশ্ববিখ্যাত হাদীস:

    রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়ামানের গভর্নর ও প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করে পাঠাচ্ছিলেন, তখন এক ঐতিহাসিক কথোপকথন অনুষ্ঠিত হয়:

    «قَالَ: كَيْفَ تَقْضِي إِذَا عَرَضَ لَكَ قَضَاءٌ؟ قَالَ: أَقْضِي بِكِتَابِ اللَّهِ. قَالَ: فَإِنْ لَمْ تَجِدْ فِي كِتَابِ اللَّهِ؟ قَالَ: فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ. قَالَ: فَإِنْ لَمْ تَجِدْ فِي سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ؟ قَالَ: أَجْتَهِدُ رَأْيِي وَلَا آلُو. فَضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ صَدْرَهُ، وَقَالَ: الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَفَّقَ رَسُولَ رَسُولِ اللَّهِ لِمَا يُرْضِي رَسُولَ اللَّهِ»

    [নবীজী ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন: তোমার সামনে কোনো বিচার উপস্থিত হলে কীভাবে ফয়সালা করবে? মুআয (রা.) বললেন: আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী। নবীজী বললেন: যদি আল্লাহর কিতাবে তা সরাসরি না পাও? বললেন: তবে রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ অনুযায়ী। নবীজী বললেন: যদি রাসূলের সুন্নাহতেও না পাও? মুআয (রা.) নির্ভীকভাবে বললেন: “তবে আমি আমার বুদ্ধি ও গভীর প্রজ্ঞা দ্বারা ইজতিহাদ ও কিয়াস করব এবং এতে কোনো ত্রুটি করব না।” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে মুআযের বুকে হাত রেখে বললেন: “সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে এমন সিদ্ধান্তের তাওফীক দিয়েছেন যা আল্লাহর রাসূলকে সন্তুষ্ট করে।” — সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯২; জামে তিরমিযী: ১৩২৭]

  2. ২. খাসআমিয়া মহিলার হাদিসে কিয়াসের বাস্তব নববী প্রয়োগ:

    এক মহিলা এসে আরজ করল: “হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতার ওপর হজ ফরয হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা আদায় না করেই ইন্তেকাল করেছেন; আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে বদলি হজ করতে পারব?” নবী করীম ﷺ তাকে কিয়াসের পাঠ দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন:

    «أَرَأَيْتِ لَوْ كَانَ عَلَى أَبِيكِ دَيْنٌ أَكُنْتِ قَاضِيَتَهُ؟ قَالَتْ: نَعَمْ. قَالَ: فَدَيْنُ اللَّهِ أَحَقُّ أَنْ يُقْضَى»

    [তুমি বলো তো, যদি তোমার পিতার ওপর কোনো মানুষের পাওনা ঋণ থাকত, তবে কি তুমি তা শোধ করতে? মহিলা বলল: হ্যাঁ। তখন নবীজী ﷺ ইরশাদ করলেন: তবে আল্লাহর ঋণ (হজ) তো শোধ পাওয়ার আরও বেশি হকদার! — সহীহ বুখারী: ১৮৫২; সহীহ মুসলিম: ১৩৩৪]
    এখানে নবীজী ﷺ হজের ইবাদতি দায়িত্বকে পার্থিব আর্থিক ঋণের সাথে হুবহু কিয়াস করে সমাধান প্রদান করেছেন।

  3. ৩. রোযাদারের চুম্বনের ক্ষেত্রে ওযুর কুলি করার সাথে কিয়াস:

    হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রোযা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করে ব্যাকুল হয়ে নবীজীর কাছে এসে বললেন: “আজ আমি এক মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি!” নবীজী ﷺ বললেন: “তুমি বলো তো, রোযা রেখে তুমি যদি ওযুর জন্য কুলি করতে, তবে কি তোমার রোযা ভেঙে যেত?” উমর (রা.) বললেন: “না।” তখন নবীজী ﷺ বললেন: “তবে এতে কেন চিন্তা করছ?” (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৮৫)। অর্থাৎ কুলি করা যেমন পানি পানের সূচনা কিন্তু রোযা ভাঙে না, তেমনি চুম্বনও সহবাসের সূচনা কিন্তু রোযা ভাঙে না।

(গ) সাহাবায়ে কেরামের ইজমা ও নিরবচ্ছিন্ন আমল
  • প্রথম খলিফা নির্বাচনে কিয়াস: নবীজী ﷺ-এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে হযরত আবু বকর (রা.)-কে খলিফা নির্বাচিত করেন কিয়াসের মাধ্যমে। হযরত উমর ও আলী (রা.) বলেছিলেন: رَضِيَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِدِينِنَا فِي الصَّلَاةِ، أَفَلَا نَرْضَاهُ لِدُنْيَانَا فِي الخِلَافَةِ؟ (রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বয়ং আমাদের দ্বীনের প্রধান স্তম্ভ সালাতের ইমামতির জন্য যাঁকে সন্তুষ্টচিত্তে মনোনীত করেছেন, আমরা কি আমাদের দুনিয়াবী নেতৃত্ব ও খেলাফতের জন্য তাঁকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করব না?)।
  • হযরত উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক আইনি ফরমান: হযরত উমর (রা.) বসরার প্রধান বিচারপতি আবু মুসা আশআরী (রা.)-এর নিকট বিচারব্যবস্থার নীতিমালা লিখে পাঠান:

    «الفَهْمَ الفَهْمَ فِيمَا تَلَجْلَجَ فِي صَدْرِكَ مِمَّا لَيْسَ فِي كِتَابِ اللَّهِ وَلَا سُنَّةِ نَبِيِّهِ، ثُمَّ اعْرِفِ الأَشْبَاهَ وَالأَمْثَالَ وَقِسِ الأُمُورَ عِنْدَ ذَلِكَ»

    [কুরআন ও সুন্নাহয় সরাসরি যা পাবে না, সে ব্যাপারে তোমার অন্তরের গভীর প্রজ্ঞা নিয়োগ করো; অতঃপর ঘটনাগুলোর সমকক্ষ ও সদৃশ বিষয়গুলো অনুসন্ধান করো এবং সেই আলোকে বিষয়গুলোকে একে অপরের সাথে কিয়াস করো। — সুনানে দারা কুতনী: ৪/২০৬]

(ঘ) আকলী বা যুক্তিভিত্তিক অকাট্য দলীল

ইসলামী শরীয়তের অন্যতম মৌলিক বাস্তবতা হলো: النُّصُوصُ مُتَنَاهِيَةٌ وَالوَقَائِعُ غَيْرُ مُتَنَاهِيَةٍ (কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট পাঠ্য নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ; পক্ষান্তরে মানবজাতির সমস্যা ও নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব সীমাহীন ও অনন্ত)। যদি কিয়াসের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে নতুন উদ্ভাবিত লাখ লাখ চিকিৎসা, বিজ্ঞান, ডিজিটাল লেনদেন ও ব্যাংকিং সমস্যার সমাধান করা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং শরীয়ত অচল হয়ে যাবে। অতএব কিয়াস শরীয়তের এক চিরন্তন অপরিহার্যতা।

উপসংহার

পরিশেষে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, কিয়াস কোনো ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহর প্রজ্ঞারই বাস্তবসম্মত সম্প্রসারণ। এর মাধ্যমেই ইসলামী শরীয়ত চৌদ্দশত বছর ধরে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো জটিল প্রশ্নের যুগোপযোগী, ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রামাণ্য সমাধান দিয়ে এসেছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত দিতে থাকবে।


উপসংহার

ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল (স্নাতক) সম্মান ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর ‘আল-ফিকহ ওয়া উসূলুহু’ (বিষয় কোড: 202408) প্রশ্নপত্রটির চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, এটি ইসলামী আইন ও আইনতত্ত্বের মৌলিক জ্ঞান পরিমাপের এক অনন্য প্রশ্নপত্র। প্রথম অংশে ফিকহের সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য, অর্থনৈতিক চুক্তি ‘বায়’ ও ‘রেহান’, খাদ্য ও পানীয়ের পবিত্রতার বিধান এবং ফিকহের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে উসূলুল ফিকহের সুদৃঢ় ভিত্তি — সুন্নাহর প্রামাণিকতা, রাবীর চারিত্রিক ও স্মৃতিশক্তির মানদণ্ড, ইজমার অকাট্যতা এবং কিয়াসের গতিশীলতার প্রমাণাদি গভীর একাডেমিক ও দলীলভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সকল সমাধান আত্মস্থ করার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কেবল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনে সক্ষম হবে না, বরং বাস্তব জীবনে ইসলামী শরীয়তের প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রয়োগে এক উজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে পারবে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফিকহ (الفقه) এবং উসূলুল ফিকহ (أصول الفقه)-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

‘উসূলুল ফিকহ’ হলো সেই সকল শাস্ত্রীয় মূলনীতি ও বিধিমালার সমষ্টি যার সাহায্যে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিধান আহরণ করা যায় (যেমন: নির্দেশ ওয়াজিব সাব্যস্ত করে, আম দ্বারা খাস করা যায় ইত্যাদি); এটি মূলত একটি ‘যন্ত্র বা মাধ্যম’। অপরদিকে ‘ফিকহ’ হলো সেই মূলনীতি প্রয়োগ করে কুরআন ও সুন্নাহ হতে আহরিত ‘ব্যবহারিক চূড়ান্ত বিধানাবলি’ (যেমন: সালাত ফরয, মদ হারাম, বেচাকেনা হালাল)। সহজ কথায়, উসূলুল ফিকহ হলো ভিত্তিপ্রস্তর বা আইন তৈরির প্রকৌশল, আর ফিকহ হলো সেই প্রকৌশলে নির্মিত পূর্ণাঙ্গ সুরম্য অট্টালিকা।

২. প্রচলিত আধুনিক ইসলামিক ব্যাংকিংয়ে ‘বায়য়ে মুরাবাহা’ কীভাবে কার্যকর করা হয়?

বায়য়ে মুরাবাহা হলো এমন এক বিক্রয় চুক্তি যেখানে বিক্রেতা পণ্যের আসল ক্রয়মূল্য ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে তার ওপর উভয়ের সম্মতিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ বা মুনাফা নির্ধারণ করে বিক্রি করে। ইসলামিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকের চাহিদামতো পণ্য (গাড়ি, ফ্ল্যাট, মেশিনারি) প্রথমে নিজ মালিকানায় ও ঝুঁকিতে ক্রয় করে এবং পরবর্তীতে গ্রাহকের নিকট আসল মূল্যের সাথে নির্ধারিত মুনাফা যোগ করে নির্দিষ্ট মেয়াদে কিস্তিতে বিক্রি করে থাকে। পণ্যের ঝুঁকি বহন এবং ক্রয়মূল্য স্বচ্ছ রাখার কারণেই এটি সুদমুক্ত ও শরীয়তসম্মত।

৩. বন্ধককৃত জমি চাষ করে ফসল নেওয়া বা বাড়ি ভাড়া দিয়ে মুনাফা ভোগ করা কেন হারাম?

ইসলামী শরীয়তের সর্বসম্মত মূলনীতি হলো: كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً فَهُوَ رِبًا (যে ঋণ কোনো প্রকার বৈষয়িক সুবিধা টেনে আনে তা-ই সুদ)। বন্ধক হলো ঋণের সুরক্ষার জন্য একটি জামানত মাত্র, এর মালিকানা বন্ধকদাতারই থাকে। বন্ধকগ্রহীতা ঋণের বিপরীতে বন্ধকী জমি চাষ করে ফসল ভোগ করলে বা বাড়ি ভাড়া দিলে সে ঋণের বিনিময়ে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা ভোগ করল, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রকাশ্য সুদ (রিব্বা)। সুতরাং বন্ধকী সম্পত্তি ভোগ করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

৪. ইজমায়ে সারীহ এবং ইজমায়ে সুকূতীর মধ্যে শারয়ী মর্যাদার পার্থক্য কী?

ইজমায়ে সারীহ (الإجماع الصريح) হলো যেখানে কোনো যুগের সকল মুজতাহিদ ফকীহ প্রকাশ্যে মৌখিকভাবে বা লেখনীতে অভিন্ন মত প্রকাশ করেন; এটি অকাট্য দলীল (حجة قطعية) এবং এর হুকুম অস্বীকারকারী কাফের গণ্য হয়। অপরদিকে ইজমায়ে সুকূতী (الإجماع السكوتي) হলো যেখানে কতিপয় মুজতাহিদ ফতোয়া দেন এবং সমকালীন অন্য মুজতাহিদগণ তা জেনেও কোনো বিরোধিতা ছাড়াই নীরব থাকেন; এটি হানাফী ও জমহুর মতে গ্রহণযোগ্য দলীল (حجة ظنية) এবং আমল ওয়াজিব হলেও এর অস্বীকারকারীকে কাফের বলা যায় না, বরং বিভ্রান্ত বা ফাসেক বলা হয়।

৫. কিয়াসের সাহায্যে কি পবিত্র কুরআনের কোনো স্পষ্ট বিধান বা হারামকে পরিবর্তন করা সম্ভব?

না, কখনোই নয়। কিয়াস হলো কুরআন ও সুন্নাহর অধস্তন একটি মাধ্যম। ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি হলো: لاَ قِيَاسَ مَعَ النَّصِّ (স্পষ্ট নস বা কুরআন-সুন্নাহর বিধানের উপস্থিতিতে কোনো কিয়াস চলে না)। কিয়াস কেবল সেই নতুন ও নজিরবিহীন বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে সরাসরি কোনো স্পষ্ট আয়াত বা হাদীস নেই। কুরআনের স্পষ্ট কোনো ফরয বা হারামকে কিয়াস দিয়ে রদবদল করার কোনো অধিকার কোনো মুজতাহিদের নেই; তা করা স্পষ্ট কুফরি ও গোমরাহী।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন