জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতুল হাদীস – ২ (Dirasatul Hadith – 2) – 202407, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
১৪৮ মিনিট পড়ার সময়
১৫ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 162
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الحديث والدراسات الإسلامية [আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث – ۲ [দিরাসাতুল হাদীস – ২]
বিষয় কোড: 202407
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠ [পূর্ণমান — ৮০]
[الملاحظة : أجب عن اثنين من مجموعة (الف) وعن اثنين من مجموعة (ب) وعن اثنين من مجموعة (ج) وعن اثنين من مجموعة (د)- والاعداد بالهامش تدل على الدرجات الكاملة-]
[দ্রষ্টব্য: (الف) অংশ হতে দুটি, (ب) অংশ হতে দুটি, (ج) অংশ হতে দুটি এবং (د) অংশ হতে দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও। বাম পাশে উল্লিখিত সংখ্যা প্রশ্নের পূর্ণমান জ্ঞাপক।]


مجموعة (الف) — صحيح ابن حبان [الدرجات: ۱۰ × ۲ = ۲۰]

(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)
[হাদিসগুলোর অনুবাদ করো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]

١- عن أبى هريرة (رض) قال : كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوما بارزا للناس إذ اتاه رجل يمشى فقال يا محمد ما الايمان؟ قال ان تؤمن بالله وملائكته ورسله ولقائه وتؤمن بالبعث الأخر قال يا رسول الله فما الإسلام؟ قال لا تشرك بالله شيئا وتقيم الصلوة المكتوبة وتؤدى الزكاة المفروضة وتصوم رمضان قال يا محمد ما الإحسان؟ قال ان تعبد الله كانك تراه فان لم تكن تراه فانه يراك قال يا محمد! فمتى الساعة قال ما المسئول عنها باعلم من السائل وسأحدثك عن اشراطها إذا ولدت الأمة ربتها ورأيت العراة الحفاة رؤوس الناس فى خمس لا يعلمهن إلا الله “إن الله عنده علم الساعة” الآية- ثم انصرف الرجل فالتمسوه فلم يجدوه فقال ذالك جبريل جاء ليعلم الناس دينهم-

[১. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সামনে প্রকাশ্যে উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি পায়ে হেঁটে তাঁর নিকট আগমন করে বলল, হে মুহাম্মদ! ঈমান কী? তিনি বললেন: ঈমান হলো এই যে, তুমি বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহতে, তাঁর ফেরেশতাগণে, তাঁর রাসূলগণে, তাঁর সাথে সাক্ষাতে এবং পরকালের পুনরুত্থানে। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ইসলাম কী? তিনি বললেন: ইসলাম হলো আল্লাহর সাথে কোনো কিছু শরিক না করা, নির্ধারিত ফরজ নামাজ কায়েম করা, ফরজ জাকাত আদায় করা এবং রমজানের রোজা পালন করা। সে বলল, হে মুহাম্মদ! ইহসান কী? তিনি বললেন: তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ, আর যদি তুমি তাঁকে নাও দেখতে পাও, তবে নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন। সে বলল, হে মুহাম্মদ! কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? তিনি বললেন: এ বিষয়ে যার নিকট প্রশ্ন করা হয়েছে তিনি প্রশ্নকারী অপেক্ষা অধিক অবগত নন; তবে অচিরেই আমি তোমাকে কিয়ামতের কতিপয় আলামত সম্পর্কে অবগত করব: যখন দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে এবং যখন উলঙ্গ ও নগ্নপদ রাখালদেরকে মানুষের শীর্ষনেতা হতে দেখবে। এটি সেই পাঁচটি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ জানে না—”নিশ্চয় আল্লাহর নিকটই রয়েছে কিয়ামতের জ্ঞান” (সূরা লুকমান: ৩৪)। অতঃপর লোকটি প্রস্থান করল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, লোকটিকে আমার নিকট ডেকে আনো। সাহাবিগণ তাকে তালাশ করলেন কিন্তু কোথাও পেলেন না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ইনি ছিলেন জিবরীল (আ.), তিনি মানুষকে তাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।] (মান: ৬)

হাদিসের তাহকীক, তাকরীজ ও সনদ বিশ্লেষণ

উক্ত হাদিসটি উম্মুল আহাদিস বা “হাদিসে জিবরীল” নামে সুবিখ্যাত। ইমাম আবু হাতিম ইবনে হিব্বান তাঁর প্রখ্যাত সহীহ সংকলন সহীহ ইবনে হিব্বান (আল-ইহসান বি তারতীবি সহীহ ইবনে হিব্বান)-এ ‘কিতাবুল ঈমান’-এর অধীনে অত্যন্ত বিশুদ্ধ সনদে এটি সংকলন করেছেন (হাদিস নং: ১৬৮)। এছাড়া এই হাদিসটি ইমাম বুখারী (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫০) এবং ইমাম মুসলিম (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৯)-এ হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সনদে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সূত্রেও সহীহ মুসলিমে (হাদিস নং: ৮) এটি দীর্ঘ আকারে বর্ণিত হয়েছে।

সনদের স্তর রাবীর নাম মুহাদ্দিসীনদের অভিমত ও মান
সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) [মৃত ৫৭/৫৮ হি.] সর্বশ্রেষ্ঠ হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী, বিশ্বস্ত ও সর্বসম্মতভাবে ন্যায়পরায়ণ (আদল)।
তাবেঈ আবু যুরআ ইবনে আমর ইবনে জারীর আল-বাজালী (রহ.) কুফার অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য তাবেঈ, সিহাহ সিত্তার বর্ণনাকারী।
তাবে-তাবেঈ উমারা ইবনুল কা’কা আদ-দাব্বী (রহ.) ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন ও ইবনে হাজার আসকালানীর মতে ছিকাহ (বিশ্বস্ত ও সুদৃঢ়)।

কঠিন শব্দের তাহলীল ও শাব্দিক ব্যাখ্যা

শব্দ (আরবি) শব্দার্থ ব্যাকরণিক ও তাফসীরি বিশ্লেষণ
بَارِزًا (বারিজান) প্রকাশ্য ও উন্মুক্ত حال বা অবস্থা বুঝিয়েছে; অর্থাৎ তিনি কোনো আড়াল ব্যতীত সাধারণ সাহাবিদের সাথে প্রকাশ্যে বসেছিলেন।
لِقَائِهِ (লিকাইহি) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ মৃত্যু পরবর্তী আল্লাহর দিদার, হিসাব-নিকাশ ও রবের সামনাসামনি হওয়ার পরম বাস্তবতায় বিশ্বাস।
أَشْرَاطِهَا (আশরাতিহা) তার আলামতসমূহ جمع (বহুবচন), একবচন হলো شَرَطٌ (শারাফ/চিহ্ন)। কিয়ামতের পূর্ববর্তী নিদর্শনাবলি।
رَبَّتَهَا (রাব্বাতাহা) তার মনিব বা কর্ত্রী এর তাৎপর্য হলো কন্যা সন্তানের মায়ের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ অবাধ্যতা অথবা দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের সামাজিক প্রভুত্ব লাভ।
الْعُرَاةَ الْحُفَاةَ (আল-উরাতাল হুফাতা) উলঙ্গ ও নগ্নপদ ব্যক্তিরা বস্ত্রহীন ও জুতোহীন যাযাবর রাখাল শ্রেণি, যারা জাগতিক দিক থেকে অত্যন্ত দরিদ্র ছিল, কিন্তু কালক্রমে ক্ষমতার শীর্ষপদে আসীন হবে।

হাদিসের বিশদ ব্যাখ্যা ও মূল শিক্ষা

১. দ্বীনের ত্রিমুখী স্তম্ভ: এই হাদিসটি ইসলামের সামগ্রিক কাঠামোর ভিত্তি। এতে দ্বীনের তিনটি মৌলিক পর্যায় নির্ধারণ করা হয়েছে—(ক) ঈমান (অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস ও আকাইদ), (খ) ইসলাম (বাহ্যিক আনুগত্য ও আমল), এবং (গ) ইহসান (আন্তরিকতা, আত্মিক শুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতা)।
২. ইলম অর্জনের আদব: জিবরীল (আ.) মানুষের বেশে এসে বিনম্র ভঙ্গিতে প্রশ্ন করার মাধ্যমে উম্মাহকে প্রশ্ন করার সুন্দর শিষ্টাচার এবং ইলম অর্জনের পদ্ধতি শিখিয়েছেন।
৩. অজ্ঞতা স্বীকারের শিক্ষা: সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হওয়া সত্ত্বেও গায়েবের নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় “মা আল-মাসউনু আনহা বি আ’লামা মিনাস সাঈল” (প্রশ্নকর্তার চেয়ে উত্তরদাতা অধিক অবগত নন) বলে বিনম্রভাবে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন, যা সকল গবেষকের জন্য পথপ্রদর্শক।


(أ) ما معنى الإيمان والإسلام؟ وما الفرق بينهما؟ هل هما مترادفان أم متغايران؟ بين بالتفصيل-

[(ক) ঈমান ও ইসলামের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ কী? এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? ঈমান ও ইসলাম কি সমার্থক (মুতারাদ্দিফ) নাকি ভিন্নার্থক (মুতগায়ির)? বিস্তারিত বর্ণনা করো।] (মান: ৪)

ভূমিকা

ইসলামী আকাইদ ও ফিকহের অন্যতম মৌলিক ও স্পর্শকাতর বিষয় হলো “ঈমান” ও “ইসলাম”-এর সংজ্ঞা এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ক। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণ কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে সুবিস্তৃত ও গভীর তাত্ত্বিক গবেষণা পেশ করেছেন।

১. ঈমানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

আভিধানিক অর্থ: ‘ঈমান’ (الإيمان) শব্দটি বাবে ইফআল (إفعال) এর মাসদার; মূলধাতু হলো (أ – م – ن)। এর আভিধানিক অর্থ التصديق (দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা), الإقرار (স্বীকৃতি প্রদান করা) এবং الأمان (নিরাপত্তা ও শান্তি দেওয়া)।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় ঈমান হলো—

الإيمانُ هُوَ التَّصْدِيقُ بِالجَنَانِ، وَالإِقْرَارُ بِاللِّسَانِ، وَالعَمَلُ بِالأَرْكَانِ-

“অন্তর দিয়ে আন্তরিক বিশ্বাস স্থাপন করা, মুখে মৌখিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা শরীয়তের আহকাম পালন করা।” ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং জমহুর মুহাদ্দিসীন এ সংজ্ঞার ওপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তাসদীক ও ইকরার হলো ঈমানের মূল রুকন এবং আমল হলো তার পূর্ণতার শর্ত।

২. ইসলামের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

আভিধানিক অর্থ: ‘ইসলাম’ (الإسلام) শব্দটি বাবে ইফআলের মাসদার; মূলধাতু (س – ل – م)। এর অর্থ الاستسلام (আত্মসমর্পণ করা), الانقياد (পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করা), এবং الخضوع (মাথানত করা)।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় ইসলাম হলো আল্লাহর তাওহীদ ও সার্বভৌমত্বের সামনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দেওয়া, বাহ্যিক রুকনসমূহ (নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত) পালনের মাধ্যমে আনুগত্য প্রকাশ করা এবং শিরক ও কুফর থেকে সম্পূর্ণরূপে নিজেকে মুক্ত রাখা।

৩. ঈমান ও ইসলামের পারস্পরিক পার্থক্য

পার্থক্যসূচক দিক ঈমান (الإيمان) ইসলাম (الإسلام)
উৎপত্তিস্থল অন্তরের আমল (أعمال القلوب) যেমন বিশ্বাস, ভয়, ভালোবাসা ও একনিষ্ঠতা। বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল (أعمال الجوارح) যেমন নামাজ, রোজা, বাক্য উচ্চারণ।
পরিধি গোপন ও অভ্যন্তরীণ সত্যতার প্রতিফলন। দৃশ্যমান ও প্রকাশ্য আনুগত্যের সামাজিক রূপ।
স্থান ও মর্যাদা ঈমান হলো বৃক্ষের শিকড় সদৃশ (মূলে প্রোথিত)। ইসলাম হলো বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা ও পত্রপল্লব সদৃশ।
কুরআনী প্রমাণ সূরা আল-হুজুরাত-এর ১৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: “قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَٰكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ” (বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। বলুন, তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো, আমরা আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করেছি। কারণ ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি)।

৪. ঈমান ও ইসলাম কি সমার্থক (مترادفان) নাকি ভিন্নার্থক (متغايران)?

মুহাদ্দিসীন ও মুতাকাল্লিমীনদের মাঝে এ বিষয়ে গভীর পর্যালোচনা বিদ্যমান:

প্রথম মত (মুতারাদ্দিফ বা সমার্থক): ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং মুতাকাল্লিমীনদের একটি দলের মতে শরয়ী হুকুমের দিক থেকে ঈমান ও ইসলাম অবিভাজ্য ও সমার্থক। কারণ কোনো ব্যক্তি সত্যিকার মুমিন না হয়ে মুসলিম হতে পারে না, আবার মুসলিম না হয়েও মুমিন হতে পারে না।
দ্বিতীয় মত (মুতগায়ির বা ভিন্নার্থক): ইমাম বুখারী, ইমাম আহমাদ এবং জমহুর সালাফ ও মুহাদ্দিসীনদের মতে এ দুটি সত্তাগত ও শাব্দিক অর্থে পরস্পর ভিন্ন।
সমন্বিত সিদ্ধান্ত (القاعدة الجامعة): ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী ও ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) একটি চমৎকার নিয়মের মাধ্যমে এ বিরোধ মীমাংসা করেছেন—

“إِذَا اجْتَمَعَا افْتَرَقَا، وَإِذَا افْتَرَقَا اجْتَمَعَا”

“যখন ঈমান ও ইসলাম শব্দ দুটি একই বাক্যে বা প্রসঙ্গে একত্রে ব্যবহৃত হয় (যেমন হাদিসে জিবরীলে), তখন উভয়ের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হয় (ঈমান বোঝায় অন্তরের বিশ্বাস এবং ইসলাম বোঝায় বাহ্যিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল)। আর যখন এদের একটি এককভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা অপরটির সমুদয় অর্থকে নিজের মধ্যে শামিল করে নেয়।” সুতরাং মূল দ্বীন হিসেবে তারা অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু বিশদ বিবরণে তারা ভিন্ন ও স্তরভিত্তিক।


٢- أخبرنا الحسن بن سفيان قال حدثنا عبد الله بن عمر الجعفى قال حدثنا عبد الرحمن المحاربى عن عثمان بن واقد العمرى عن ابيه عن محمد بن المنكدر عن عروة عن عائشة (رض) قالت قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من التمس رضى الله بسخط الناس رضى الله عنه وأرضى الناس عنه ومن التمس رضى الناس بسخط الله سخط الله عليه وأسخط عليه الناس-

[২. আমাদের সংবাদ দিয়েছেন আল-হাসান ইবনে সুফিয়ান, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে উমর আল-জু’ফী, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন আবদুর রহমান আল-মুহারিবী, উসমান ইবনে ওয়াকিদ আল-উমারী থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির থেকে, তিনি উরওয়াহ থেকে, তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তোষের বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং মানুষের অন্তরকেও তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তোষের বিনিময়ে মানুষের সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হন এবং মানুষের অন্তরকেও তার প্রতি অসন্তুষ্ট ও বিদ্বেষপূর্ণ করে দেন।”] (মান: ৬)

হাদিসের তাকরীজ ও সনদ পর্যালোচনা

উক্ত হাদিসটি ইমাম ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে (হাদিস নং: ২৭৭)-এ বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনান আত-তিরমিযী-তে (হাদিস নং: ২৪১৪) হযরত আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হাদিসটির পটভূমি হলো: খলীফা হযরত মুআবিয়া (রা.) উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-কে একটি সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ উপদেশমূলক পত্র লিখতে অনুরোধ জানালে তিনি পত্রের শুরুতে সালাম দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিসটি লিখে পাঠান।

রাবীর নাম পরিচিতি ও স্তর জারহ ও তা’দীলের মান
হাসান ইবনে সুফিয়ান আন-নাসাঈ (রহ.) ইবনে হিব্বানের অন্যতম শীর্ষ শায়খ, হাফেজে হাদিস ও মুসনাদ প্রণেতা। ছিকাহ, ইমাম ও বিশ্বস্ত।
আবদুর রহমান আল-মুহারিবী (রহ.) কুফার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ। ছিকাহ ও নির্ভরযোগ্য।
মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির (রহ.) মদীনার শীর্ষ তাবেঈ, আবেদ ও মুহাদ্দিস। উচ্চমানের ছিকাহ, মুত্তাকী ও নির্ভরযোগ্য।
উরওয়াহ ইবনুয যুবায়ের (রহ.) মদীনার ফুকাহায়ে সাব’আ (সাত ফকীহ)-এর অন্যতম এবং আয়েশা (রা.)-এর ভাগ্নে। হাদিস ও ফিকহের ইমাম, সর্বসম্মত ছিকাহ।

শব্দ বিশ্লেষণ ও তাহলীল

শব্দ অর্থ ব্যাকরণিক অবস্থান ও তাত্পর্য
الْتَمَسَ (ইলতামাসা) খুঁজল বা অন্বেষণ করল فعل ماض من باب افتعال; কোনো লক্ষ্য অর্জনে নিরন্তর প্রয়াস চালানো।
بِسَخَطِ (বি-সাখাত্বি) অসন্তোষ বা ক্রোধের মাধ্যমে اسم مصدر; কারো অসন্তুষ্টিকে উপেক্ষা করে বা তার ক্রোধ সৃষ্টি করে।
أَسْخَطَ (আসখাত্বা) ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট করে দিলেন فعل ماض من باب إفعال (متعدي); কারো ওপর চরম রাগ বা ক্ষোভ চাপিয়ে দেওয়া।

হাদিসের তাৎপর্য ও চারিত্রিক শিক্ষা

১. ইখলাস ও তাওহীদের চূড়ান্ত পরীক্ষা: মুমিনের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি (রিদ্বা)। মানুষের প্রশংসা বা নিন্দাকে উপেক্ষা করে আল্লাহর আনুগত্যে অটল থাকাই হলো প্রকৃত তাকওয়া।
২. হৃদয়সমূহের নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে: বান্দা যখন রবের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন আল্লাহ তাআলা মানুষের হৃদয়ে তার প্রতি মর্যাদা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। পক্ষান্তরে, মানুষকে খুশি করতে গিয়ে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন করলে সাময়িক স্তুতি মিললেও পরিণামে অপমান ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়।
৩. নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি: শাসকদের জন্য এটি এক অনন্য চার্টার; রাজনৈতিক স্বার্থে জনগণকে তুষ্ট করতে গিয়ে শরীয়তের সীমানা লঙ্ঘন করলে সেই জনগণই একসময় বিদ্রোহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


(أ) متى ولدت عائشة (رض)؟ اذكر نبذة من حياتها-

[(ক) হযরত আয়েশা (রা.) কখন জন্মগ্রহণ করেন? তাঁর জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ আলোচনা করো।] (মান: ৪)

১. জন্ম ও বংশমর্যাদা

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) নবুওয়তের চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বর্ষের শেষভাগে (হিজরতের প্রায় আট বা নয় বছর পূর্বে, আনুমানিক ৬১৩/৬১৪ খ্রিস্টাব্দে) মক্কার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন উম্মতের শ্রেষ্ঠতম মানব হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং মাতা ছিলেন উম্মে রুমান বিনতে আমির (রা.)। তাঁর উপাধি ছিল ‘সিদ্দিকা’ এবং উপনাম ছিল ‘উম্মে আবদিল্লাহ’ (ভাগ্নে আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়েরের নামে)।

২. বিবাহ ও পবিত্র দাম্পত্য জীবন

হিজরতের পূর্বে মক্কায় অত্যন্ত বরকতপূর্ণ পরিবেশে আল্লাহর অহির নির্দেশনায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে তাঁর আকদ সম্পন্ন হয়। অতঃপর হিজরতের পর দ্বিতীয় হিজরীতে শাওয়াল মাসে মদীনা মুনাওয়ারায় তাঁর রুখসতী (বিদায়) অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে অপরিসীম ভালোবাসতেন এবং আয়েশা (রা.)-এর কক্ষেই তাঁর ওফাত ও রওজা মোবারক রচিত হয়।

৩. ইলম, প্রজ্ঞা ও হাদিস রেওয়ায়েতে অবিস্মরণীয় অবদান

হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন ইসলামের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদূষী নারী ও মুজতাহিদা।

ক্ষেত্র অবদান ও বৈশিষ্ট্য
হাদিস রেওয়ায়েত তিনি সর্বমোট ২,২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন, যা সাহাবিদের মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ সংখ্যা। তিনি ‘মুকছিরীন’ (বেশি হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী)-দের শীর্ষ কাতারে অন্তর্ভুক্ত।
ফিকহ ও ইজতিহাদ তিনি সাহাবিদের যুগে শীর্ষ ফকীহ ছিলেন। উরওয়াহ ইবনুয যুবায়ের বলেন: “আমি আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে কুরআন, ফারায়িজ, হালাল-হারাম, কবিতা ও আরবের ইতিহাসে অধিক পণ্ডিত আর কাউকে দেখিনি।”
সাহাবিদের ভুল সংশোধন ইমাম যারকাশী তাঁর গবেষণাসমূহ একত্রিত করে আল-ইজাবাহ লি-ইরাদি মা ইস্তাদরাকাতহু আয়েশাতু আলাস সাহাবাহ নামক গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেখানে বড় বড় সাহাবিদের বুঝের অসঙ্গতি তিনি কুরআনের দলীল দিয়ে সংশোধন করেছেন।

৪. ইন্তেকাল

হযরত আয়েশা (রা.) ৫৮ হিজরীর ১৭ রমজান মুবারক মঙ্গলবার রাতে মদীনায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৬ বছর। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর জানাজার নামাজে ইমামতি করেন এবং তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী রাতেই তাঁকে জান্নাতুল বাকী গোরস্থানে দাফন করা হয়।


٣- أخبرنا عمر بن محمد الهمدانى قال حدثنا ابو الربيع سليمان بن داود عن حماد بن زيد قال حدثنا ابن وهب قال اخبرنى الليث بن سعد عن خالد بن يزيد عن سعيد بن ابى هلال عن ابى سلمة بن عبد الرحمن عن أبى هريرة (رض) ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال الحياء من الإيمان والإيمان فى الجنة والبذاء من الجفاء والجفاء فى النار-

[৩. আমাদের সংবাদ দিয়েছেন উমর ইবনে মুহাম্মদ আল-হামদানী, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন আবু রাবী’ সুলাইমান ইবনে দাউদ, হাম্মাদ ইবনে যাইদ থেকে, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন ইবনে ওয়াহাব, তিনি বলেন: আমাকে সংবাদ দিয়েছেন লাইস ইবনে সাদ, খালিদ ইবনে ইয়াযীদ থেকে, তিনি সাঈদ ইবনে আবি হিলাল থেকে, তিনি আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান থেকে, তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ এবং ঈমান জান্নাতে নিয়ে যাবে; আর অশ্লীলতা/কটূবাক্য রূঢ়তা ও নির্লজ্জতার অংশ এবং রূঢ়তা ও নির্লজ্জতা জাহান্নামে নিয়ে যাবে।”] (মান: ৬)

হাদিসের তাকরীজ ও তাহকীক

উক্ত হাদিসটি ইমাম ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহ-এর ‘কিতাবুল বিররি ওয়াল ইহসান’-এ (হাদিস নং: ৬০৮)-এ সংকলন করেছেন। এছাড়া হাদিসটি ইমাম তিরমিযী (সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস নং: ২০০৯), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ১০৫১৮) এবং ইমাম হাকিম তাঁর আল-মুসতাদরাক-এ সংকলন করেছেন। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে “হাদিসুন হাসানুন সহীহ” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

শব্দকোষ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

শব্দ অর্থ ব্যাখ্যা ও ব্যবহার
الْحَيَاءُ (আল-হায়া) লজ্জাশীলতা ও সম্ভ্রমবোধ শব্দটি الحَيَاةُ (জীবন) থেকে উৎপন্ন। যার অন্তরে আত্মিক জীবন রয়েছে তার অন্তরেই লজ্জা বজায় থাকে।
الْبَذَاءُ (আল-বাযা) অশ্লীল কথা ও গালিগালাজ কদর্য ভাষা, কর্কশ ও নির্লজ্জ বাক্যালাপ যা মানুষের ভদ্রতা ও শালীনতাকে বিনষ্ট করে।
الْجَفَاءُ (আল-জাফা) কঠোরতা ও রূঢ়তা কোমলতার বিপরীত; অন্তরের নিষ্ঠুরতা ও রুক্ষ আচরণ যা অহংকার ও ঔদ্ধত্যের জন্ম দেয়।

হাদিসের মূল বার্তা ও শিক্ষা

১. লজ্জাশীলতার সুউচ্চ মর্যাদা: হাদিসে লজ্জাশীলতাকে ঈমানের অনিবার্য ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। লজ্জা মানুষকে যাবতীয় পাপকর্ম ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে জান্নাতের অধিকারী করে।
২. অশ্লীলতার ধ্বংসাত্মক পরিণতি: অশালীন উক্তি, গালিগালাজ এবং রূঢ় আচরণ অন্তরের পাশবিকতার বহিঃপ্রকাশ। তা মানুষকে আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির অপ্রিয় করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করে।
৩. চরিত্র গঠনের অনুপ্রেরণা: মুমিনের সৌন্দর্য হলো বাকসংযম ও নম্রতা; কঠোরতা ও অশ্লীলতা মুমিনের ভূষণ হতে পারে না।


(أ) ما معنى الحياء لغة وشرعا؟ وهل الحياء محمود فى جميع الأمور والأحيان؟ بين-

[(ক) হায়া (লজ্জা)-এর আভিধানিক ও শরয়ী অর্থ কী? সকল বিষয়ে এবং সর্বাবস্থায় কি লজ্জা প্রশংসনীয়? বিশদ ব্যাখ্যা করো।] (মান: ৪)

১. হায়া (লজ্জা)-এর আভিধানিক অর্থ

‘হায়া’ (الحَيَاءُ) শব্দটি আরবি حَيِيَ – يَحْيَى ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর ভাষাগত অর্থ হলো الانقباض والانزواء (সংকুচিত হওয়া, গুটিয়ে যাওয়া ও বিরত থাকা)। আল্লামা জুরজানী (রহ.) তাঁর আত-তারীফাত গ্রন্থে লিখেছেন—লজ্জা হলো মানুষের অন্তরের এমন এক পরিবর্তন বা আত্মসংকোচন, যা অপছন্দনীয় বা গর্হিত কাজের মুখোমুখি হলে সৃষ্টি হয়। শব্দটি ‘আল-হায়াত’ (জীবন) এর সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত; কারণ হৃদয়ের জীবন্ত অবস্থার পরিমাপক হলো লজ্জা।

২. শরীয়তের পরিভাষায় হায়া-এর অর্থ

শরীয়তের পরিভাষায় ইমাম নববী (রহ.) শারহু সহীহ মুসলিম-এ বলেন—

“خُلُقٌ يَبْعَثُ عَلَى تَرْكِ القَبِيحِ، وَيَمْنَعُ مِنَ التَّقْصِيرِ فِي حَقِّ ذِي الحَقِّ”

“হায়া হলো এমন এক মহৎ চারিত্রিক গুণ, যা মানুষকে যাবতীয় গর্হিত, অশ্লীল ও পাপকর্ম বর্জন করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং হকদারের প্রাপ্য আদায়ে কোনো প্রকার ত্রুটি করতে বাধা দেয়।”

৩. লজ্জা কি সকল বিষয়ে এবং সর্বাবস্থায় প্রশংসনীয়?

ইসলামী শরীয়তের চুলচেরা বিশ্লেষণ অনুযায়ী লজ্জা সর্বাবস্থায় একরকম নয়; বরং এর প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে এটি দুই ভাগে বিভক্ত:

লজ্জার প্রকার বাস্তব উদাহরণ ও ক্ষেত্র শরয়ী হুকুম ও মূল্যায়ন
প্রশংসনীয় লজ্জা (الحياء المحمود) ১. আল্লাহর নাফরমানি ও পাপকাজে লিপ্ত হতে লজ্জা বোধ করা।
২. মানুষের সামনে অশালীন বাক্য ও কদর্য আচরণ প্রকাশে লজ্জা করা।
৩. বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহে শিষ্টাচার বজায় রাখা।
ওয়াজিব ও সুন্নাত: এটি ঈমানের অবিচ্ছেদ্য শাখা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “الحياء لا يأتي إلا بخير” (লজ্জা কেবল কল্যাণই বয়ে আনে)।
নিন্দনীয় ও অপূর্ণ লজ্জা (الحياء المذموم) ১. দ্বীনের বিধান ও ইলম অর্জনে প্রশ্ন করতে লজ্জা পাওয়া।
২. অন্যায়ের প্রতিবাদ ও সৎকাজের আদেশ দিতে কুণ্ঠাবোধ করা।
৩. নিজের ন্যায্য অধিকার চাওয়া কিংবা সত্য সাক্ষ্যদানে সংকুচিত হওয়া।
হারাম ও দুর্বলতা (عجز وجبن): এটি প্রকৃত লজ্জা নয়; বরং তা হলো ভীরুতা ও শয়তানের প্ররোচনা।

শরয়ী প্রমাণ ও সালাফদের দৃষ্টান্ত

১. আল্লাহ সত্য প্রকাশে লজ্জা করেন না: কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে: “وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ” (আর আল্লাহ সত্য বলতে লজ্জা বোধ করেন না — সূরা আল-আহযাব: ৫৩)।
২. ইলম অন্বেষণে লজ্জা বর্জন: হযরত উম্মে সুলাইম (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এসে নারীর স্বপ্নদোষ ও গোসল সংক্রান্ত অতি সংবেদনশীল বিধান জানতে চেয়ে নিসংকোচে আরজ করেছিলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় আল্লাহ সত্য প্রকাশে লজ্জা করেন না, নারীর স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল ফরজ?” (সহীহ বুখারী: ১৩০)।
৩. আনসার নারীদের অনন্য প্রশংসা: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) প্রশংসা করে বলেছিলেন: “আনসার নারীরা কতই না উত্তম! দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করতে লজ্জা তাদের কখনো বাধা হতে পারেনি।” (সহীহ মুসলিম: ৩৩২)।
৪. ইমাম মুজাহিদ (রহ.)-এর অমোঘ বাণী: প্রখ্যাত মুফাসসির মুজাহিদ ইবনে জাবর (রহ.) বলেন: “لَا يَتَعَلَّمُ العِلْمَ مُسْتَحْيٍ وَلَا مُسْتَكْبِرٌ” (“লজ্জাশীল এবং অহংকারী—এ দু’জন ব্যক্তি কখনো জ্ঞান অর্জন করতে পারে না”)।

সারকথা: যে লজ্জা মানুষকে পাপ, অবাধ্যতা ও নীচতা থেকে রক্ষা করে তা সর্বদাই প্রশংসনীয় এবং ঈমানের ভূষণ। কিন্তু যে তথাকথিত লজ্জা দ্বীন শিক্ষা, সত্য প্রকাশ ও হক আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে তা শরীয়তে চরমভাবে নিন্দনীয় ও বর্জনীয়।


مجموعة (ب) — صحيح ابن خزيمة [الدرجات: ۱۰ × ۲ = ۲۰]

(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)
[হাদিসগুলোর অনুবাদ করো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]

٤- حدثنا يعقوب بن إبراهيم الدورقى حدثنا عبد الله بن ادريس قال سمعت حُصينا يذكر عن عمر بن جاوان عن الأحنف بن قيس فذكر حديثا طويلا فى قتل عثمان وقال فاذا على والزبير وطلحة وسعد بن ابى وقاص وانا كذالك إذ جاء عثمان فقال أنشدكم بالله الذى لا اله الا هو أتعلمون أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال من يبتاع بئر رومة غفر الله له؟ فابتعتها بكذا وكذا واتيته فقلت قد ابتعتها بكذا قال اجعلها سقاية للمسلمين وأجرها لك؟ قالوا اللّهم نعم-

[৪. আমাদের বর্ণনা করেছেন ইয়াকূব ইবনে ইবরাহীম আদ-দাওরাকী, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে ইদরীস, তিনি বলেন: আমি হুসাইন (ইবনে আবদির রহমান)-কে উমর ইবনে জাওয়ান হতে, তিনি আহনাফ ইবনে কায়েস থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস স্মরণ করে বলতে শুনেছি যা উসমান (রা.)-এর শাহাদাত সম্পর্কে। তিনি (আহনাফ) বলেন: অতঃপর সেখানে আলী, যুবায়ের, তালহা ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস উপস্থিত ছিলেন এবং আমিও সেখানে ছিলাম। এমন সময় উসমান (রা.) আসলেন এবং বললেন: আমি তোমাদেরকে সেই আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তোমরা কি জানো যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন—যে ব্যক্তি বিরে রুমা (রূমার কূপ) ক্রয় করবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন? তখন আমি অমুক অমুক মূল্যে তা ক্রয় করেছিলাম এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এসে বললাম: আমি তো তা এত মূল্যে ক্রয় করেছি। তিনি বললেন: তুমি তা মুসলমানদের জন্য পানি পানের উন্মুক্ত উৎস বানিয়ে দাও এবং তার সওয়াব তোমার জন্য নির্ধারিত থাকবে। তাঁরা (উপস্থিত সাহাবিগণ) বললেন: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম!] (মান: ৬)

হাদিসের তাকরীজ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

উক্ত হাদিসটি ইমামুল আইম্মাহ আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মা (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সহীহ ইবনে খুযায়মা-এর ‘কিতাবুল মানাকিব’-এ বিশুদ্ধ সনদে সংকলন করেছেন (হাদিস নং: ২৪০৬/২৫১২)। এছাড়া ইমাম তিরমিযী (সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস নং: ৩৭০৩), ইমাম নাসাঈ (সুনান আন-নাসাঈ, হাদিস নং: ৩৬০৫) এবং ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ বুখারী-তে ‘কিতাবুল ওসায়া ও কিতাবুল ওয়াকফ’-এ তালিক সূত্রে এই রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করেছেন।

ঐতিহাসিক পটভূমি: ৩৫ হিজরীতে যখন কতিপয় বিদ্রোহী ও ফিতনাবাজ দল হযরত উসমান (রা.)-এর গৃহ অবরোধ করে তাঁর পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন তিনি স্বীয় গৃহের ছাদ থেকে প্রবীণ সাহাবায়ে কেরাম—হযরত আলী, তালহা, যুবায়ের এবং সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে এই প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, যে কূপের পানি তিনি ব্যক্তিগত অর্থে কিনে মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত ওয়াকফ করেছিলেন, আজ সেই কূপের পানি পান থেকেই তাঁকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সাহাবিগণ সমস্বরে তাঁর আত্মত্যাগের সত্যতা স্বীকার করেছিলেন।

কঠিন শব্দের বিশ্লেষণ ও তাহলীল

শব্দ (আরবি) অর্থ ব্যাখ্যা ও তাহকীক
أَنْشُدُكُمْ بِاللَّهِ (আনশুদুকুম বিল্লাহ) আমি তোমাদের আল্লাহর কসম দিচ্ছি فعل مضارع من باب نصر; কাউকে কসম দিয়ে সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বান জানানো।
بِئْرَ رُومَةَ (বি’রু রূমাহ) রূমার কূপ মদীনা মুনাওয়ারার সুমিষ্ট পানির একটি বিখ্যাত কূপ, যার মালিক ছিল এক কৃপণ ইহুদি। সে চড়া দামে পানি বিক্রি করত।
يَبْتَاعُ (ইয়াবতাউ) ক্রয় করবে فعل مضارع من باب افتعال (باع – يبيع – ابتياع); অর্থ মূল্য পরিশোধ করে কেনা।
سِقَايَةً (সিকায়াহ) পানি পানের সাধারণ ব্যবস্থা জনকল্যাণে পানির উন্মুক্ত দাতব্য ব্যবস্থা বা ওয়াকফ।

হাদিসের শিক্ষণীয় দিক ও শিক্ষা

১. হযরত উসমান (রা.)-এর অনন্য দানশীলতা: ইসলাম ও মুসলমানদের প্রয়োজনে তিনি নিজের অঢেল সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে “গানীয়্যুশ শাকির” (কৃতজ্ঞ ধনী) হিসেবে জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন।
২. ওয়াকফের বৈধতা ও গুরুত্ব: জনকল্যাণমূলক কাজে স্থায়ী সম্পদ ওয়াকফ করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদকায়ে জারিয়া।
৩. কৃতঘ্নতার নিকৃষ্ট রূপ: যে ব্যক্তি গোটা মদীনাবাসীকে মিষ্টি পানি উপহার দিয়েছিলেন, ফিতনাবাজরা চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে তাঁকেই পিপাসার্ত অবস্থায় শহীদ করেছিল।


(أ) ما هى أسباب قتل عثمان (رض)؟ اكتب أثاره فى حياة المسلمين والإسلام-

[(ক) হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের কারণসমূহ কী ছিল? মুসলিমদের জীবনে এবং ইসলামের ইতিহাসে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবসমূহ লিপিবদ্ধ করো।] (মান: ৪)

ভূমিকা

ইসলামের তৃতীয় খলীফা, যুন-নুরাইন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাহাদাত ইসলামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। ৩৫ হিজরীর ১৮ জিলহজ তিনি বিদ্রোহীদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন।

১. হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের মূল কারণসমূহ

কারণ বিশদ ঐতিহাসিক বিবরণ
১. আবদুল্লাহ ইবনে সাবার গোপন চক্রান্ত ইয়েমেনের এক ইহুদি মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে সাবা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে কুফা, বসরা ও মিশরে ঘুরে ঘুরে আলী (রা.)-এর পক্ষে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালায় এবং খিলাফতের বৈধতা নিয়ে বিষবাষ্প ছড়ায়।
২. নবদীক্ষিত বেদুইনদের উচ্ছৃঙ্খলা ইসলামী সাম্রাজ্য দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় বিপুল সংখ্যক অনারব ও যাযাবর বেদুইন ইসলামে প্রবেশ করে, যাদের দ্বীনি তরবিয়ত ও প্রজ্ঞার ঘাটতি ছিল। তারা সহজেই কুচক্রীদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়।
৩. স্বজনপ্রীতির মিথ্যা অপবাদ বিদ্রোহীরা অভিযোগ তোলে যে হযরত উসমান (রা.) বনু উমাইয়ার লোকদের গভর্নর পদে প্রাধান্য দিচ্ছেন। অথচ তিনি কেবল যোগ্য ব্যক্তি ও সাহাবিদেরই নিয়োগ দিয়েছিলেন, যাদের অনেকেই খলীফা উমর (রা.)-এর আমলেও বহাল ছিলেন।
৪. কোরআন সংকলন নিয়ে বিভ্রান্তি হযরত উসমান (রা.) কুরাইশী উচ্চারণে প্রামাণ্য একক কুরআন সংকলন করে অন্যান্য ব্যক্তিগত অনুলিপি পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ফিতনাবাজরা একে “কুরআন বিকৃতি” বলে অজ্ঞ লোকদের খেপিয়ে তোলে।
৫. জাল চিঠির ষড়যন্ত্র বিদ্রোহীদের সাথে খলীফার একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতা হওয়ার পর তারা মিশর ফেরার পথে খলীফার সরকারি সিলমোহরযুক্ত এক জাল চিঠি উদ্ধার করে, যাতে মিশরীয় গভর্নরকে বিদ্রোহীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল মুনাফিকদের কূটকৌশল।
৬. মুসলমানদের রক্তপাত রোধে ধৈর্য হযরত উসমান (রা.) স্পষ্ট নির্দেশ দেন যে, তাঁর জন্য কোনো সাহাবী বা আনসার তলোয়ার তুলে মুসলমানদের রক্ত ঝরাবেন না। তিনি আত্মাহুতি দেওয়াকেই উম্মাহর অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের চেয়ে শ্রেয় মনে করেছিলেন।

২. মুসলিম জীবনে ও ইসলামী ইতিহাসে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবসমূহ

হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের মাধ্যমে উম্মাহর মধ্যে যে রক্তক্ষরণের সূচনা হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী “ফিতনার সেই দরজা” আর কখনো রুদ্ধ হয়নি:

১. উম্মাহর রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল: শাহাদাতের পর মুসলিমদের শতাব্দীপ্রাচীন ঐক্য খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সিফফিন ও জামাল যুদ্ধের মতো রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
২. বাতিল ফিরকার আত্মপ্রকাশ: এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে ইতিহাসে সর্বপ্রথম বিভ্রান্তিকর দলগুলোর জন্ম হয়—যেমন উসমান ও আলীকে কাফের ঘোষণাকারী খারেজী সম্প্রদায় এবং চরমপন্থী শীয়া দল।
৩. খেলাফতে রাশেদার অবসান: সার্বজনীন শুরাভিত্তিক খেলাফতে রাশেদার ব্যবস্থার পতন ত্বরান্বিত হয় এবং বনু উমাইয়ার মাধ্যমে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের সূচনা ঘটে।
৪. হাদিস শাস্ত্রের সুরক্ষা ও সনদ ব্যবস্থার প্রবর্তন: রাজনৈতিক ফিতনা থেকে নিজেদের স্বার্থে জাল হাদিস বানানোর প্রবণতা তৈরি হলে মুহাদ্দিসীনরা “ইসনাদ” বা সনদের যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করেন। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সীরীন বলেন: “পূর্বে সনদের কথা জিজ্ঞেস করা হতো না, কিন্তু ফিতনার পর বলা হলো—তোমাদের বর্ণনাকারীদের নাম বলো।”


٥- حدثنا محمد بن يحيى حدثنا محمد بن وهب بن عطية حدثنا الوليد بن مسلم حدثنا مرزوق بن ابى الهذيل اخبرنا الزهرى حدثنى ابو عبد الله الاغمر عن ابى هريرة (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان مما يلحق المؤمن من عمله وحسناته بعد موته علما علمه ونشره او ولدا صالحا تركه او مسجدا بناه او بيتا لابن السبيل بناه او نهرا أجراه أو صدقة أخرجها من ماله في صحته وحياته تلحقه بعد موته-

[৫. আমাদের বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে ওহাব ইবনে আতিয়্যাহ, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন আল-ওয়ালীদ ইবনে মুসলিম, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন মারযূক ইবনে আবিল হুযায়ল, তিনি বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন আজ-জুহরী, তিনি বলেন: আমাকে বর্ণনা করেছেন আবু আবদিল্লাহ আল-আগর, তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—মুমিনের মৃত্যুর পর তার যেসব আমল ও পুণ্য তার সাথে যুক্ত হতে থাকে, তা হলো: (১) এমন ইলম (জ্ঞান) যা সে শিক্ষা দিয়েছে ও প্রচার করেছে, (২) এমন নেক সন্তান যা সে রেখে গেছে, (৩) এমন মসজিদ যা সে নির্মাণ করেছে, (৪) মুসাফিরদের জন্য এমন মুসাফিরখানা যা সে প্রতিষ্ঠা করেছে, (৫) এমন নদী/নহর যা সে প্রবাহিত করেছে, কিংবা (৬) এমন সদকা যা সে সুস্থ ও জীবিতাবস্থায় নিজের সম্পদ থেকে দান করেছে; এসবের পুণ্য তার মৃত্যুর পরও তার সাথে মিলিত হতে থাকে।] (মান: ৬)

হাদিসের তাহকীক ও তাখরীজ

উক্ত হাদিসটি ইমাম ইবনে খুযায়মা তাঁর সহীহ ইবনে খুযায়মা-এর ‘কিতাবুস সাদাকাত’-এ (হাদিস নং: ২৪৯০)-এ বিশুদ্ধ সনদে সংকলন করেছেন। এছাড়া হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর সুনান ইবনে মাজাহ-তে (হাদিস নং: ২৪২), ইমাম বায়হাকী শুয়াবুল ঈমান-এ (হাদিস নং: ৩৪৪৮) বর্ণনা করেছেন। এই হাদিসের মূল বক্তব্য সহীহ মুসলিমে বর্ণিত বিখ্যাত হাদিসের সমার্থক—”ইযা মাতা আল-ইনসানু ইনকাতাআ আনহু আমালুহু ইল্লা মিন ছালাছিন…” (যখন মানুষ মারা যায় তখন তার তিন প্রকার আমল ছাড়া সব বন্ধ হয়ে যায়)। তবে ইবনে খুযায়মার এই বর্ণনায় সদকায়ে জারিয়ার সুনির্দিষ্ট ছয়টি ক্ষেত্র বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

শব্দ বিশ্লেষণ ও তাহলীল

শব্দ অর্থ ব্যাকরণিক অবস্থান ও তাত্পর্য
يَلْحَقُ (ইয়ালহাকু) পৌঁছায় বা যুক্ত হয় فعل مضارع من باب سمع (لحق – يلحق); কোনো কিছুর সাথে পরবর্তীতে এসে মিলিত হওয়া।
نَشَرَهُ (নাশারাহু) তা প্রচার ও প্রসার করেছে فعل ماض; বই লেখা, শিক্ষকতা, ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে জ্ঞানের বিস্তৃতি ঘটানো।
ابْنِ السَّبِيلِ (ইবনুস সাবীল) মুসাফির বা পথিক পথযাত্রী ব্যক্তি যে সফরের অবস্থায় আশ্রয় ও খাবারের মুখাপেক্ষী হয়।
أَجْرَاهُ (আজরাহু) প্রবাহিত করেছে فعل ماض من باب إفعال; সেচ খাল খনন করা কিংবা নলকূপ স্থাপন করে পানির ধারা অব্যাহত রাখা।

হাদিসের শিক্ষণীয় তাৎপর্য

১. চিরস্থায়ী বিনিয়োগ: পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও ইসলামের সৌন্দর্য হলো মানুষ এমন কিছু নেক কাজ রেখে যেতে পারে যার পুণ্য অনন্তকাল কবরে বসেও অর্জিত হতে থাকে।
২. জ্ঞান বিতরণের শ্রেষ্ঠত্ব: সম্পদের সদকার চেয়ে ইলমের প্রচার-প্রসার অধিক স্থায়ী ও ফলপ্রসূ, তাই হাদিসে সর্বপ্রথম দ্বীনি ইলমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো: মসজিদ, মুসাফিরখানা নির্মাণ ও পানির ব্যবস্থা করার মতো সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম সেরা মাধ্যম।


(أ) هل يجوز ايصال ثواب الفرائض للاموات؟ فما رأى العلماء فيه؟

[(ক) মৃত ব্যক্তিদের নিকট ফরজ ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো কি জায়েয? এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের অভিমত কী?] (মান: ৪)

১. ঈসালে সওয়াব (إيصال الثواب) এর মৌলিক ধারণা

শরীয়তের পরিভাষায় জীবিত কোনো ব্যক্তির সৎকাজ বা ইবাদতের পুণ্য কোনো মৃত মুমিনের রূহে প্রেরণ করাকে “ঈসালে সওয়াব” বলা হয়। নফল ইবাদতের (যেমন নফল দান-সদকা, দোয়া, কুরআন তেলাওয়াত) সওয়াব মৃতদের কাছে পৌঁছার ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে একমত। তবে ফরজ ইবাদতের ক্ষেত্রে বিধানটি গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

২. ইবাদতের প্রকারভেদ ও তার বিধান

ইবাদতের প্রকার উদাহরণ অন্যের পক্ষ থেকে আদায়ের হুকুম
১. মালী ইবাদত (عبادة مالية) জাকাত, সদকায়ে ফিতর, কাফফারা, মান্নত। সর্বসম্মতভাবে অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করা এবং সওয়াব পৌঁছানো জায়েয।
২. বাদানী ইবাদত (عبادة بدنية) দৈনিক ফরজ নামাজ, রমজানের রোজা। শারীরিক সক্ষমতা ব্যক্তির নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় সরাসরি অন্যকে দিয়ে পড়ানো যায় না; তবে ফিদয়া দেওয়া যায়।
৩. মুরাক্কাব ইবাদত (عبادة مركبة) ফরজ হজ (শারীরিক ও আর্থিক সমন্বিত)। অক্ষম বা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে বদলি হজের মাধ্যমে ফরজ আদায় ও সওয়াব পৌঁছানো সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

৩. ফরজ ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো বিষয়ে ওলামাদের অভিমত

ক. হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফী ফকীহগণের মতে, মৃত ব্যক্তির ওপর যদি কোনো ফরজ ইবাদত অনাদায়ী থেকে যায় এবং সে মৃত্যুর পূর্বে তার অসিয়ত করে যায়, তবে ওয়ারিশদের জন্য তার ত্যাজ্য সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ থেকে ফিদয়া বা কাফফারা আদায় করা আবশ্যক। এর মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহে মৃত ব্যক্তির ওপর থেকে ফরজ জিম্মাদারি রহিত হয় এবং সওয়াব পৌঁছে। তদ্রূপ বদলি হজের মাধ্যমেও ফরজের সওয়াব মৃতের রূহে পৌঁছায়।
খ. হাম্বলী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, যেকোনো ফরজ ও নফল ইবাদতের সওয়াব নিয়ত করে মৃতকে বখশিয়ে দিলে তা পৌঁছে যায়। এমনকি মৃত ব্যক্তি রোজা রেখে মারা গেলে তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে রোজা রাখতে পারবে (সহীহ বুখারীর হাদিস: “মান মাতা ওয়া আলাইহি সিয়ামুন সামা আনহু ওয়ালিয়্যুহু”)।
গ. শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে, খাঁটি শারীরিক ফরজ ইবাদত (যেমন নামাজ ও রোজা)-এর ক্ষেত্রে একের বদলে অন্যে আদায় করতে পারে না। তবে আর্থিক ফরজ (জাকাত, কাফফারা) এবং বদলি হজের সওয়াব নিশ্চিতভাবে পৌঁছে।

উপসংহার ও শরয়ী সিদ্ধান্ত

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ফরজ হজ আদায় এবং অনাদায়ী নামাজ-রোজার ক্ষেত্রে শরীয়ত নির্ধারিত ‘ফিদয়া’ প্রদান করা সম্পূর্ণ জায়েয ও মুস্তাহাব। এতে মৃত ব্যক্তির গুনাহ মাফ হয় এবং আল্লাহর দরবারে তার দায়মুক্তি ও পুণ্য পৌঁছায়।


٦- عن سعيد بن عمرو بن شرحبيل بن سعيد بن سعد بن عبادة عن ابيه عن جده انه قال خرج سعد بن عبادة مع النبى صلى الله عليه وسلم فى بعض مغازيه فحضرت ام سعد الوفاة فقيل لها اوصى فقالت فيما اوصى؟ انما المال مال سعد فتوفيت قبل ان يقدم سعد فلما قدم سعد ذكر له ذالك فقال يا رسول الله! هل ينفعها أن أتصدق عنها؟ قال نعم قال سعد حائط كذا وكذا صدقة عنها لحائط قد سماه-

[৬. সাঈদ ইবনে আমর ইবনে শুরাহবীল ইবনে সাঈদ ইবনে সাদ ইবনে উবাদাহ থেকে, তিনি তাঁর পিতা হতে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোনো এক যুদ্ধে গমন করলেন। এ সময় সাদের মাতার মৃত্যু উপস্থিত হলো। তখন তাঁকে বলা হলো: আপনি কি কোনো অসিয়ত করবেন? তিনি বললেন: কিসের অসিয়ত করব? ধনসম্পদ তো সবই সাদের। অতঃপর সাদ ফিরে আসার পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করলেন। সাদ যখন ফিরে আসলেন তখন তাঁর নিকট ঘটনাটি উল্লেখ করা হলো। তখন তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি আমার মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তা তাঁর কোনো উপকারে আসবে? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: হ্যাঁ। তখন সাদ (রা.) বললেন: আমার অমুক অমুক প্রাচীরঘেরা ফলের বাগানটি মায়ের রূহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে তাঁর পক্ষ থেকে সদকা ঘোষণা করছি—তিনি নির্দিষ্ট একটি বাগানের নাম উল্লেখ করেছিলেন।] (মান: ৬)

হাদিসের তাকরীজ ও সনদ মানদণ্ড

উক্ত হাদিসটি ইমাম ইবনে খুযায়মা তাঁর সহীহ ইবনে খুযায়মা-এর ‘কিতাবুল ওসায়া’-এ (হাদিস নং: ২৪৯২/২৫০৫) সংকলন করেছেন। হাদিসটি ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ বুখারী-এর ‘কিতাবুল ওসায়া ও কিতাবুল আদব’-এ (হাদিস নং: ২৭৫৬), ইমাম আবু দাউদ (সুনান আবু দাউদ: ২৮৭৫) এবং ইমাম নাসাঈ (৩৬৪৯)-এ হযরত সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সনদের সকল বর্ণনাকারী আনসারী পরিবারের নির্ভরযোগ্য সূত্রে গ্রথিত এবং হাদিসটি সর্বসম্মতভাবে সহীহ।

শব্দ তাহলীল ও অর্থ

শব্দ অর্থ ব্যাখ্যা
حَضَرَتْ (হাদারাত) উপস্থিত হলো فعل ماض; মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্ত বা অন্তিম কাল ঘনিয়ে আসা।
حَائِطٌ (হায়িত) প্রাচীরবেষ্টিত খেজুর বা ফলের বাগান যাকে দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। একবচন حائط, বহুবচন حِيطَانٌ।
يَنْفَعُهَا (ইয়ানফাউহা) তা তাঁর উপকারে আসবে কি? মৃত্যুর পর এই সদকার পুণ্য ও রহমত তাঁর কবরে পৌঁছাবে কি না তা জানার ব্যাকুল প্রশ্ন।

হাদিসের গভীর শিক্ষণীয় দিক

১. মৃত মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব: মৃত্যুর পরও সন্তান পিতামাতার জন্য সদকায়ে জারিয়া ও দোয়া করে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে।
২. সদকার প্রতিদান তাৎক্ষণিক ও নিশ্চিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে “না’আম” (হ্যাঁ) বলে প্রমাণ করেছেন যে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান করলে তা সরাসরি তাদের উপকারে আসে।
৩. প্রিয় বস্তু দান: হযরত সাদ (রা.) সাধারণ কোনো সম্পদ নয়, বরং তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান ও উৎপাদনশীল ফলের বাগানটি মায়ের জন্য আল্লাহর রাস্তায় দান করেছিলেন।


(أ) ما معنى الوصية لغة وشرعا؟ وما حكم الوصية؟ بين-

[(ক) অসিয়ত (الوصية)-এর আভিধানিক ও শরয়ী অর্থ কী? অসিয়তের শরয়ী বিধান (হুকুম) কী? বিশদ ব্যাখ্যা করো।] (মান: ৪)

১. অসিয়তের আভিধানিক অর্থ

‘অসিয়ত’ (الوصية) শব্দটি আরবি وصى – يوصي ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হলো الوَصْلُ (মিলিত করা বা যুক্ত করা), العَهْدُ (অঙ্গীকার বা নির্দেশ দেওয়া), এবং التقدم بالأمر (পূর্বাহ্নে কোনো কাজের চূড়ান্ত ভার অর্পণ করা)। মৃত্যুর পূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্তকে মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের সাথে যুক্ত করা হয় বিধায় একে ‘অসিয়ত’ বলা হয়।

২. শরীয়তের পরিভাষায় অসিয়তের অর্থ

ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় অসিয়ত হলো—

“تَمْلِيكٌ مُضَافٌ إِلَى مَا بَعْدَ المَوْتِ بِطَرِيقِ التَّبَرُّعِ”

“মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে কার্যকর হওয়ার শর্তে কোনো ব্যক্তিকে স্বেচ্ছায় ও বিনিময়হীনভাবে কোনো সম্পদের মালিকানা বা উপস্বত্ব (মুনাফা) অর্পণ করা।”

৩. অসিয়তের শরয়ী হুকুম ও প্রকারভেদ

ইসলামী শরীয়তে অসিয়ত সর্বাবস্থায় একই হুকুমের অধীন নয়; বরং প্রেক্ষাপটভেদে এর পাঁচটি শরয়ী হুকুম রয়েছে:

হুকুম প্রেক্ষাপট ও উদাহরণ শরয়ী কারণ ও দলীল
১. ওয়াজিব (الواجبة) কারো কাছে মানুষের ঋণ, আমানত, অথবা অনাদায়ী ফরজ দায়িত্ব (যেমন জাকাত, কাফফারা) থাকলে যা লিখিত না রাখলে অন্যের হক নষ্ট হবে। হাদিস: “কোনো মুসলিমের এমন অধিকার নেই যে তার কাছে অসিয়তযোগ্য কিছু থাকবে আর সে দুই রাত কাটাবে অথচ তার অসিয়ত লিখিত থাকবে না।” (বুখারী: ২৭৩৮)।
২. মুস্তাহাব (المستحبة) ধনী ব্যক্তির জন্য তার ত্যাজ্য সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) বা তার কম সম্পদ অভাবী অ-ওয়ারিশ আত্মীয়-স্বজন বা জনকল্যাণমূলক খাতে দান করা। মৃত্যুর পর নিজের নেক আমল বৃদ্ধি এবং সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
৩. হারাম (المحرمة) শরীয়তবিরোধী কোনো কাজে (যেমন গান-বাজনা, পাপের কাজ) সম্পদ দেওয়া কিংবা ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার হীন উদ্দেশ্যে অসিয়ত করা। কুরআন: “مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَىٰ بِهَا أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَارٍّ” (কারো ক্ষতি না করে অসিয়ত কার্যকর করতে হবে — সূরা নিসা: ১২)।
৪. মাকরূহ (المكروهة) স্বল্প সম্পত্তির অধিকারী ব্যক্তি যার সন্তান ও ওয়ারিশগণ অতি দরিদ্র, তার জন্য বাইরের কাউকে অসিয়ত করা। রাসূল (সা.) সাদ (রা.)-কে বলেছিলেন: “তুমি তোমার ওয়ারিশদের সচ্ছল রেখে যাওয়া তাদেরকে মানুষের দ্বারে হাত পাতার মতো নিঃস্ব রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।”
৫. মুবাহ (المباحة) কোনো সম্পদশালী অ-ওয়ারিশ ধনী ব্যক্তিকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে কিছু অসিয়ত করা। এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বিশেষ বাধ্যবাধকতা নেই।

৪. অসিয়ত বাস্তবায়নের দুটি অমোঘ মূলনীতি

১. এক-তৃতীয়াংশের বাধ্যবাধকতা (حد الثلث): অসিয়ত কেবল মৃত ব্যক্তির মোট সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) থেকে কার্যকর হবে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করলে ওয়ারিশদের সম্মতি ব্যতীত তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
২. ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত নিষিদ্ধ: যারা কুরআনী বিধান অনুযায়ী মিরাসের অংশীদার, তাদের অনুকূলে অতিরিক্ত অসিয়ত করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—“إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ” (“নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিয়েছেন; সুতরাং কোনো ওয়ারিশের জন্য কোনো অসিয়ত নেই” — সুনান আবু দাউদ: ২৮৭০)।


مجموعة (ج) — المستدرك للحاكم [الدرجات: ۱۰ × ۲ = ۲۰]

(ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)
[হাদিসগুলোর অনুবাদ করো এবং সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দাও]

٧- حدثنا الحسين بن الحسن بن ايوب حدثنا ابو حاتم الرازى حدثنا موسى بن اسماعيل حدثنا حماد بن سلمة عن ثابت البنانى عن الحسن عن عتى بن ضمرة عن ابى بن كعب عن النبى صلى الله عليه وسلم قال لما توفى أدم غسلته الملائكة بالماء وترا وألحدوا له وقالوا هذه سنة أدم فى ولده هذا حديث صحيح الإسناد ولم يخرجاه-

[৭. আমাদের বর্ণনা করেছেন আল-হুসাইন ইবনুল হাসান ইবনে আইয়ূব, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন আবু হাতিম আর-রাযী, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন মূসা ইবনে ইসমাঈল, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনে সালামাহ, সাবিত আল-বুনানী থেকে, তিনি হাসান (আল-বাসরী) হতে, তিনি উতাই ইবনে দামরাহ থেকে, তিনি উবাই ইবনে কা’ব (রা.) হতে, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: যখন আদম (আ.) ইন্তেকাল করলেন, তখন ফেরেশতাগণ তাঁকে বেজোড় সংখ্যক বার পানি দিয়ে গোসল দিলেন, তাঁর জন্য লাহাদ (বগলী) কবর খনন করলেন এবং বললেন—এটিই আদমের সন্তানদের জন্য (কাফন-দাফনের) চিরাচরিত নিয়ম ও সুন্নাত। ইমাম হাকিম বলেন: এটি এমন এক হাদিস যার সনদ সম্পূর্ণ সহীহ, তবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাঁদের গ্রন্থে এটি সংকলন করেননি।] (মান: ৬)

হাদিসের তাকরীজ ও সনদ পর্যালোচনা

উক্ত হাদিসটি ইমামুল হাফেজ আবু আবদিল্লাহ আল-হাকিম আন-নায়সাবূরী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত হাদিস সংকলন আল-মুসতাদরাক আলাস সাহীহাইন-এর ‘কিতাবুল জানাইজ’-এ সংকলন করেছেন (হাদিস নং: ১৩৯৩)। হাদিসটি বর্ণনা করার পর ইমাম হাকিম দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মন্তব্য করেছেন: “হাযা হাদিসুন সহীহুল ইসনাদি ওয়া লাম ইউখরিজাহু” (এটি এমন সহীহ সনদের হাদিস যা বুখারী ও মুসলিম তাঁদের সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেননি)। স্বনামধন্য মুহাদ্দিস ও রিজালবিদ ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী তাঁর বিখ্যাত নিরীক্ষা গ্রন্থ আত-তালখীস-এ ইমাম হাকিমের এই রায়কে সম্পূর্ণ সমর্থন করে হাদিসটিকে “সহীহ” বলে সত্যায়িত করেছেন।

সনদের স্তর রাবীর নাম মুহাদ্দিসীনদের অভিমত ও মান
উস্তাদ আবু হাতিম আর-রাযী (রহ.) ইলমে জারহ ওয়া তা’দীলের অন্যতম শীর্ষ ইমাম ও হাফেজে হাদিস।
তাবে-তাবেঈ হাম্মাদ ইবনে সালামাহ আল-বাসরী (রহ.) ইমাম মুসলিমের অন্যতম প্রধান নির্ভরযোগ্য রাবী, সুদৃঢ় ও বিশ্বস্ত।
তাবেঈ হাসান আল-বাসরী ও সাবিত আল-বুনানী (রহ.) যুহদ, তাকওয়া ও হাদিস বর্ণনায় বিশ্বস্ততার শীর্ষ চূড়ায় অধিষ্ঠিত।
সাহাবী উবাই ইবনে কা’ব (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শীর্ষ ওহী লেখক এবং শ্রেষ্ঠতম ক্বারী সাহাবী।

শব্দকোষ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

শব্দ (আরবি) অর্থ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
وِتْرًا (উইতরান) বেজোড় সংখ্যায় حال বা অবস্থা বুঝিয়েছে; অর্থাৎ তিনবার, পাঁচবার বা সাতবার ধৌত করা।
أَلْحَدُوا لَهُ (আলহাদু লাহু) তাঁর জন্য লাহাদ কবর বানালেন কবরের তলদেশের পশ্চিম দেওয়ালে ক্বিবলার দিকে যে কুঠুরি বা কুলুঙ্গি খনন করা হয় তাকে ‘লাহাদ’ (بغلী কবর) বলে।
سُنَّةُ آدَمَ فِي وَلَدِهِ (সুন্নাতু আদামা) আদমের সন্তানদের জন্য সুন্নাত মানবজাতির জন্য জানাজা, গোসল, কাফন ও দাফনের নির্ধারিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত ঐশী নিয়ম।

হাদিসের মূল বার্তা ও শিক্ষা

১. মানব মর্যাদার ঘোষণা: সৃষ্টির সূচনাতেই ফেরেশতাদের মাধ্যমে আদি পিতা আদম (আ.)-এর গোসল ও দাফন সম্পন্ন করিয়ে আল্লাহ মানবদেহকে সম্মানিত করেছেন।
২. বেজোড় সংখ্যার গুরুত্ব: মৃত ব্যক্তির গোসলে পানি ব্যবহার বেজোড় সংখ্যায় হওয়া সুন্নাত।
৩. লাহাদ কবরের শ্রেষ্ঠত্ব: মাটি শক্ত হলে লাহাদ কবর খনন করাই সুন্নাত, যেমনটি স্বয়ং ফেরেশতাগণ দেখিয়ে গেছেন।


(الف) اذكر الطريقة المسنونة لغسل الميت مفصلاً-

[(ক) মৃত ব্যক্তির সুন্নাতসম্মত গোসলের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করো।] (মান: ৪)

ভূমিকা ও শরয়ী হুকুম

মৃত মুসলিমকে গোসল দেওয়া জীবিত মুসলমানদের ওপর ফরযে কিফায়া (فرض كفاية)। সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক মৃতদেহকে পবিত্র করা এবং মর্যাদার সাথে বিদায় জানানো ইসলামের অন্যতম প্রধান শিষ্টাচার।

গোসলের পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতা

১. গোসলদাতার যোগ্যতা: গোসলদাতা যেন দ্বীনদার, আমানতদার এবং গোসলের সুন্নাত তরিকা সম্পর্কে অভিজ্ঞ হন। তিনি মৃতের কোনো শারীরিক ত্রুটি দেখলে তা গোপন রাখবেন।
২. পর্দা ও সুগন্ধি: গোসলের স্থানটি নির্জন ও পর্দাবেষ্টিত হতে হবে। সেখানে সুগন্ধি বা আগরবাতি জ্বালানো মুস্তাহাব।
৩. সতর আবৃত রাখা: গোসল দেওয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মৃতের সতর (নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত) মোটা কাপড় দ্বারা সর্বদা ঢেকে রাখতে হবে।

ধারাবাহিক সুন্নাতসম্মত গোসলের পদ্ধতি

পর্যায় কার্যক্রমের শিরোনাম সুন্নাত পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ
১ম পর্যায় তখতায় শোয়ানো ও কাপড় বদল মৃতকে গোসলের তখতায় কিবলামুখী করে শোয়াতে হবে। পরনের স্বাভাবিক কাপড় খুলে সতরের ওপর একটি চাদর দিয়ে সতর ঢেকে নিতে হবে।
২য় পর্যায় ইস্তেনজা করানো গোসলদাতা বাম হাতে কাপড় বা গ্লাভস পেঁচিয়ে সতরের নিচে হাত ঢুকিয়ে পানি দিয়ে ইস্তেনজা করিয়ে শৌচকর্ম সম্পন্ন করবেন; সতরের দিকে কোনো দৃষ্টি দেওয়া যাবে না।
৩য় পর্যায় অযু করানো মৃতকে নামাজের অযুর ন্যায় অযু করাতে হবে। তবে মুখের ভেতর পানি প্রবেশ করানো বা নাকে পানি টানা যাবে না; বরং ভেজা তুলা বা কাপড় দিয়ে দাঁত, মাঢ়ি ও নাকের ছিদ্র পরিষ্কার করতে হবে।
৪র্থ পর্যায় মাথা ও দাড়ি ধৌত করা কুলপাতা সিদ্ধ পানি বা সাবান দ্বারা প্রথমে মাথা ও দাড়ির চুল আলতোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
৫ম পর্যায় ডান ও বাম পাশ ধৌতকরণ মৃতকে প্রথমে বাম কাতে করে ডান পাশে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পানি ঢেলে ধৌত করতে হবে। এরপর ডান কাতে করে বাম পাশ সমভাবে ধৌত করতে হবে।
৬ষ্ঠ পর্যায় পেট মর্দন ও পরিচ্ছন্নতা মৃতের পিঠের নিচে হাত দিয়ে সামান্য উঁচু করে পেটে আস্তে আস্তে চাপ দিতে হবে। কোনো নাপাক নির্গত হলে তা ধুয়ে ফেলতে হবে; এর জন্য পুনরায় অযু বা নতুন করে গোসলের প্রয়োজন নেই।
৭ম পর্যায় বেজোড় সংখ্যা ও কর্পূর ব্যবহার গোসল তিনবার সম্পন্ন করা সুন্নাত; প্রয়োজনে ৫ বা ৭ বার পর্যন্ত বেজোড় সংখ্যায় পানি ঢালা যায়। শেষবার ধোয়ার পানিতে কর্পূর (ক্বাফূর) মিশিয়ে সমস্ত শরীর ধুয়ে দিতে হবে।

গোসল পরবর্তী করণীয়

গোসল সম্পন্ন হওয়ার পর একটি পরিষ্কার শুকনা কাপড় দ্বারা মৃতের শরীর মুছে ফেলতে হবে এবং ভেজা চাদর সরিয়ে শুকনা চাদর দিয়ে আবৃত করে দ্রুত কাফনের কাপড়ে স্থানান্তর করতে হবে।


٨- حدثنا ابو بكر بن اسحاق انبانأ هشام بن على حدثنا موسى بن اسماعيل حدثنا هاود بن ابى الفرات حدثنا علباء بن احمر عن عكرمة عن ابن عباس (رض) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أفضل نساء العالمين خديجة بنت خويلد وفاطمة بنت محمد ومريم بنت عمران وأسية بنت مزاحم امرأة فرعون- هذا حديث صحيح الإسناد-

[৮. আমাদের বর্ণনা করেছেন আবু বকর ইবনে ইসহাক, তিনি বলেন: আমাদের সংবাদ দিয়েছেন হিশাম ইবনে আলী, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন মূসা ইবনে ইসমাঈল, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন হাওদাহ ইবনে আবিল ফুরাত, তিনি বলেন: আমাদের বর্ণনা করেছেন ইলবা ইবনে আহমাদ, ইকরিমা থেকে, তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: “বিশ্বজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী হলেন চারজন: খুওয়াইলিদের কন্যা খাদীজাহ, মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাহ, ইমরানের কন্যা মারইয়াম এবং ফেরাউনের স্ত্রী মুযাহিমের কন্যা আসিয়াহ।” ইমাম হাকিম বলেন: এই হাদিসটির সনদ সম্পূর্ণ সহীহ।] (মান: ৬)

হাদিসের তাকরীজ ও সনদ তাহকীক

উক্ত হাদিসটি ইমাম হাকিম তাঁর আল-মুসতাদরাক আলাস সাহীহাইন-এর ‘কিতাবু মারিফাতিস সাহাবাহ’-এ (হাদিস নং: ৪৮৫২) সংকলন করেছেন এবং সহীহুল ইসনাদ ঘোষণা করেছেন। ইমাম যাহাবীও স্বীয় তালখীসে একে সম্পূর্ণ সহীহ বলে রায় দিয়েছেন। এছাড়া হাদিসটি ইমাম ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহ-তে (হাদিস নং: ৬৯৫১), ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ-এ (হাদিস নং: ২৬৬৩) বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমেও হযরত আলী (রা.)-এর সূত্রে এর সমার্থক বর্ণনা রয়েছে: “খাইরু নিসায়িহা মারইয়ামু বিনতু ইমরান, ওয়া খাইরু নিসায়িহা খাদীজাতু বিনতু খুওয়াইলিদ”

শব্দকোষ ও তাৎপর্য

শব্দ অর্থ তাৎপর্য
أَفْضَلُ نِسَاءِ العَالَمِينَ বিশ্বজগতের শ্রেষ্ঠতম নারীগণ ঈমান, আত্মত্যাগ, সতীত্ব ও আল্লাহর আনুগত্যে সৃষ্টির ইতিহাসে শীর্ষস্থানীয় মর্যাদা লাভকারিনী।
امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ ফেরাউনের স্ত্রী জালিম শাসকের রাজপ্রাসাদে থেকেও অবিচল ঈমান রক্ষা করে শাহাদাতবরণকারী মহীয়সী আসিয়া।

চারজন নারীর অনুপম বৈশিষ্ট্যের সারসংক্ষেপ

১. মারইয়াম বিনতে ইমরান: কোনো পুরুষের স্পর্শ ব্যতীত অলৌকিকভাবে ঈসা (আ.)-কে গর্ভে ধারণকারী এবং আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে পূতপবিত্রতার প্রতীক।
২. আসিয়া বিনতে মুযাহিম: চরম অত্যাচারী ও অহংকারী ফেরাউনের ঘরে থেকেও আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী এবং জান্নাতের প্রাসাদের প্রত্যাশিনী।
৩. খাদীজাহ বিনতে খুওয়াইলিদ: ইসলামের প্রথম ঈমানদার, নবুওয়তের প্রথম আশ্রয়দাত্রী ও সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া উম্মুল মুমিনীন।
৪. ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ: সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ (জান্নাতী নারীদের নেত্রী) এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বংশধারার ধারক।


(الف) تحدث عن مناقب خديجة (رض) موجزًا-

[(ক) উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজাহ (রা.)-এর অনন্য মর্যাদা ও গুণাবলি (মানাকিব) সংক্ষেপে আলোচনা করো।] (মান: ৪)

১. পরিচয় ও উপাধি

উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজাহ বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) কুরাইশ বংশের বনু আসাদ শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। জাহেলী যুগেও তাঁর অনুপম সচ্চরিত্র, পবিত্রতা ও সততার কারণে সমকালীন সমাজ তাঁকে “আত-ত্বাহিরাহ” (পূতপবিত্র নারী) উপাধিতে ভূষিত করেছিল। তিনি ছিলেন একাধারে বিদূষী, বুদ্ধিমতী ও মক্কার অন্যতম শীর্ষ সফল ব্যবসায়ী নারী।

২. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বিবাহ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সততা, বিশ্বস্ততা ও অনন্য চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে তিনি স্বয়ং বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বয়স ছিল ২৫ বছর এবং খাদীজাহ (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০ বছর। খাদীজাহ (রা.) বেঁচে থাকাকালীন রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্য কোনো বিবাহ করেননি।

৩. খাদীজাহ (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও অনন্য মানাকিব

মর্যাদার দিক ঐতিহাসিক ঘটনা ও দলীল
১. ইসলামের প্রথম মানব ও সান্ত্বনাদাত্রী হেরা গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গৃহে ফিরে আসলেন, তখন খাদীজাহ (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে সেই ঐতিহাসিক বাণী উচ্চারণ করেছিলেন—
“আল্লাহর কসম! আল্লাহ কখনো আপনাকে অপদস্থ করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়দের সম্পর্ক বজায় রাখেন, অসহায়দের দায়িত্ব বহন করেন, মেহমানদারী করেন এবং বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন।” তিনিই উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন।
২. ইসলামের জন্য সর্বস্ব দান তিনি তাঁর বিপুল ধনসম্পদ ইসলামের প্রচার ও প্রসারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পদতলে সঁপে দেন। এমনকি শি’আবে আবি তালিবে তিন বছরের চরম বয়কটের দিনগুলোতে অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে রাসূল (সা.)-এর পাশে পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন।
৩. স্বয়ং আল্লাহর সালাম লাভ হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন: একবার জিবরীল (আ.) নবী করীম (সা.)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! খাদীজাহ একটি পাত্রে খাবার নিয়ে আপনার কাছে আসছেন। তিনি আসলে আপনি তাঁকে তাঁর রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন এবং তাঁকে জান্নাতে মোতির তৈরি এমন একটি প্রাসাদের সুসংবাদ দেবেন যেখানে কোনো কোলাহল থাকবে না এবং কোনো কষ্ট থাকবে না (সহীহ বুখারী: ৩৮২০)।
৪. রাসূল (সা.)-এর অকৃত্রিম ভালোবাসা খাদীজাহ (রা.)-এর ওফাতের বছরকে রাসূলুল্লাহ (সা.) “আমুল হুযন” (শোকের বছর) ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে খাদীজাহ ছাড়া আর কারো স্মরণে এত ব্যাকুল হতে দেখিনি; তিনি প্রায়ই খাদীজাহর বান্ধবীদের উপহার পাঠাতেন এবং তাঁর আত্মত্যাগের প্রশংসা করতেন।

٩- عن ابى ايوب ومعمر والنعمان بن راشد عن الزهرى عن عروة عن عائشة (رض) قالت ما لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم مسلما من لعنة تذكر ولا ضرب بيده شيئا قط إلا أن يضرب بها فى سبيل الله ولا سئل عن شيئ قط إلا أن يسأل مأثما كان أبعد الناس منه ولا انتقم لنفسه من شيئ قط يؤتى إليه إلا ان تنتهك حرمات الله فيكون لله ينتقم ولا خير بين أمرين قط إلا اختار أيسرهما-

[৯. আবু আইয়ূব, মা’মার ও নোমান ইবনে রাশিদ থেকে, তাঁরা জুহরী হতে, তিনি উরওয়াহ থেকে, তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো মুসলিমকে উল্লেখযোগ্য কোনো লানত (অভিশাপ) দেননি, আর তিনি নিজের হাত দিয়ে কখনো কোনো কিছুকে আঘাত করেননি—কেবল আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদের ময়দানে) আঘাত করা ব্যতীত। আর তাঁর নিকট কখনো এমন কোনো কিছু চাওয়া হয়নি যা কোনো পাপকর্মের বিষয় ছিল; পাপের বিষয় হলে তিনি তা থেকে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দূরে থাকতেন। আর তাঁর নিজের ওপর কোনো অন্যায় আচরণ করা হলে তিনি কখনো ব্যক্তিগত কারণে কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি—যতক্ষণ না আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা ও পবিত্রতা লঙ্ঘিত হতো; তখন তিনি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই শাস্তি বা প্রতিশোধ নিতেন। আর যখনই তাঁকে দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো, তিনি সর্বদা তার মধ্যে সহজতর বিষয়টিই গ্রহণ করতেন (যতক্ষণ না তা কোনো গুনাহ হতো)।] (মান: ৬)

হাদিসের তাকরীজ ও গ্রহণযোগ্যতা

উক্ত হাদিসটি ইমাম হাকিম তাঁর আল-মুসতাদরাক-এর ‘কিতাবু মাগাযী ওয়াস সিয়ার’-এ সংকলন করেছেন। হাদিসটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ সনদে সিহাহ সিত্তার মূল গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিম-এর ‘কিতাবুল ফাদায়িল’-এ (হাদিস নং: ২৩২৭, ২৩২৮) এবং ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ বুখারী-তে (হাদিস নং: ৩৫৬০ ও ৬১২৬) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে এই শাশ্বত চারিত্রিক সনদটি উদ্ধৃত করেছেন। এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুপম ব্যক্তিত্ব ও শামায়েলের এক প্রামাণ্য দলিল।

শব্দকোষ ও বিশ্লেষণ

শব্দ অর্থ ব্যাখ্যা ও ব্যবহার
مَا لَعَنَ (মা লা’আনা) কখনো অভিশাপ দেননি নবী করীম (সা.) ছিলেন ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’; তিনি অভিশাপকারী (লা’আন) হিসেবে প্রেরিত হননি।
مَأْثَمًا (মা’ছামান) গুনাহ বা পাপের কাজ اسم مكان أو مصدر ميمي; যা মানুষকে গুনাহগার বা অপরাধী করে তোলে।
انْتَقَمَ لِنَفْسِهِ (ইনতাক্বামা লি-নাফসিহি) নিজের জন্য প্রতিশোধ নিয়েছেন ব্যক্তিগত অপমান, আঘাত বা গালিগালাজের কোনো প্রতিশোধ তিনি কখনো নেননি।
حُرُمَاتُ اللَّهِ (হুরুমাতুল্লাহ) আল্লাহর সীমারেখা ও বিধান শরীয়তের ফরজ ও হারাম বিধানাবলি; যখন তা ভঙ্গ করা হতো তখন তিনি ন্যায়ের স্বার্থে কঠোর হতেন।
أَيْسَرَهُمَا (আইসারাহুমা) দুটির মধ্যে সহজতরটি اسم تفضيل; উম্মতের কষ্ট লাঘবে তিনি সর্বদা সহজ পথ বেছে নিতেন।

(الف) بين أخلاق النبى صلى الله عليه وسلم فى ضوء الحديث-

[(ক) উক্ত হাদিসের আলোকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক মাধুর্য ও মহানুভবতা বিশদভাবে আলোচনা করো।] (মান: ৪)

ভূমিকা

কুরআনুল কারীমে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর হাবীব (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন: “وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ” (নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের শীর্ষ চূড়ায় অধিষ্ঠিত — সূরা আল-কালাম: ৪)। হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণিত এই হাদিসটি নববী চরিত্রের সেই অনন্য সৌন্দর্যের বাস্তব দর্পণ।

হাদিসের আলোকে নববী চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

চারিত্রিক দিক বিশদ বিশ্লেষণ ও ঐতিহাসিক প্রমাণ
১. জিহ্বা ও মুখের পবিত্রতা রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কাউকে অভিসম্পাত দিতেন না। ওহুদের যুদ্ধে যখন তাঁর দন্ত মুবারক শহীদ হয় এবং চেহারা রক্তাপ্লুত হয়, তখন সাহাবিরা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি মুশরিকদের জন্য বদদোয়া করুন। তিনি বললেন: “নিশ্চয় আমি অভিশাপকারী হিসেবে প্রেরিত হইনি, বরং আমি রহমত ও সুসংবাদদাতা হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।”
২. অহিংসা ও ক্ষমাশীলতা তিনি ব্যক্তিগত জীবনে কখনো কোনো খাদেম, নারী বা প্রাণীর ওপর হাত তোলেননি। দীর্ঘ দশ বছর তাঁর খেদমতকারী আনাস (রা.) বলেন: “আমি দশ বছর তাঁর খেদমত করেছি, তিনি কখনো আমাকে ‘উহ’ শব্দটি বলেননি এবং বলেননি কেন এটা করলে বা কেন এটা করলে না।”
৩. ব্যক্তিগত প্রতিশোধহীনতা তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি পাহাড়ের ফেরেশতাকে মক্কাবাসীদের ধ্বংস করার অনুমতি দেননি। মক্কা বিজয়ের দিন যে কুরাইশরা তাঁকে মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়েছিল ও হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন: “লা তাছরীবা আলাইকুমুল ইয়াওম—আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত।”
৪. আল্লাহর বিধান রক্ষায় আপসহীনতা ব্যক্তিগত বিষয়ে ক্ষমাশীল হলেও আল্লাহর হুকুম ও সামাজিক সুবিচারের প্রশ্নে তিনি ছিলেন পর্বতের মতো দৃঢ়। সম্ভ্রান্ত মাখযুমী গোত্রের এক নারী চুরি করলে যখন উসামা ইবনে যায়দ (রা.) সুপারিশ করতে আসলেন, তখন রাসূল (সা.) কঠোর হয়ে বললেন: “আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাতও কেটে দিতাম!”
৫. সহজীকরণ নীতি (تيسير) দ্বীনের কোনো বিষয়ে দুটি বিকল্প থাকলে তিনি সর্বদা উম্মতের জন্য সহজটি বেছে নিতেন। তিনি বলতেন: “তোমরা দ্বীনকে সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিতৃষ্ণ করো না।”

مجموعة (د) [الدرجات: ۱۰ × ۲ = ۲۰]

١٠- اذكر نبذة من أحوال ابى حاتم محمد بن حبان البستى مع بيان منهجه فى ترتيب الأحاديث-

[১০. আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল-বুস্তী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখপূর্বক হাদিস বিন্যাসে তাঁর নিজস্ব ও উদ্ভাবনী পদ্ধতির (মানহাজ) বিশদ বিবরণ দাও।] (মান: ১০)

ভূমিকা

হাদিস সাহিত্যের সুবর্ণ যুগে যেসকল কালজয়ী মুহাদ্দিস স্বীয় প্রজ্ঞা, উদ্ভাবনী বিন্যাসপদ্ধতি এবং হাদিস ও রিজালশাস্ত্রে অতুলনীয় অবদান রেখে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হলেন ইমাম আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আল-বুস্তী (রহ.)। তাঁর প্রণীত হাদিস সংকলন সহীহ ইবনে হিব্বান ইলমে হাদিসের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

১. ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

শিরোনাম বিস্তারিত বিবরণ
নাম ও নসবনামা মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান ইবনে আহমাদ ইবনে হিব্বান ইবনে মুআয ইবনে মা’বাদ আত-তামীমী আদ-দারেমী আল-বুস্তী।
কুনিয়াত ও উপাধি কুনিয়াত হলো ‘আবু হাতিম’ (أبو حاتم) এবং উপাধি হলো ‘আল-ইমাম’, ‘আল-আল্লামাহ’, ‘হাফেজুল উম্মাহ’ এবং ‘শায়খু খোরাসান’।
জন্ম ও শৈশব তিনি আনুমানিক ২৭০ হিজরীতে (মতান্তরে ২৭৫ হি.) আফগানিস্তানের বর্তমান হেলমান্দ প্রদেশের অন্তর্গত সিজিস্তানের ‘বুস্ত’ (بست) শহরে এক সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
ইলমী সফর ও উস্তাদবৃন্দ তিনি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে তৎকালীন জ্ঞানকেন্দ্রসমূহ—খোরাসান, বলখ, বুখারা, নিশাপুর, ইরাক, হিজাজ, শাম (সিরিয়া) এবং মিশর সফর করেন। তাঁর উস্তাদদের মধ্যে অন্যতম হলেন: ইমামুল আইম্মাহ আবু বকর ইবনে খুযায়মা, হাসান ইবনে সুফিয়ান আন-নাসাঈ, আবু ইয়ালী আল-মাওসিলী এবং বিখ্যাত সুফি সাধক জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)।
বিচারপতি (কাযী) হিসেবে দায়িত্ব তিনি শুধুমাত্র মুহাদ্দিসই ছিলেন না; বরং চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন ও ফিকহে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল সমারকন্দ ও নাসা শহরে প্রধান বিচারপতি (কাযীউল কুদাত) হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন।
বিখ্যাত গ্রন্থাবলী ১. আল-মুসনাদ আস-সহীহ আলাত তাকাসীম ওয়াল আনওয়া (যা সহীহ ইবনে হিব্বান নামে পরিচিত)
২. কিতাবুত ছিকাত (বিশ্বস্ত রাবীদের জীবনী ও মর্যাদা বিষয়ক মৌলিক গ্রন্থ)
৩. কিতাবুল মাজরূহীন (দুর্বল ও অভিযুক্ত বর্ণনাকারীদের পরিচয়)
৪. রওযাতুল উকালা ওয়া নুযহাতুল ফুদালা (উচ্চাঙ্গের নৈতিক ও চারিত্রিক গ্রন্থ)
৫. মাশাহীরু উলামায়িল আমসার (বিভিন্ন শহরের প্রখ্যাত ওলামাদের ইতিহাস)।
ইন্তেকাল তিনি ৩৫৪ হিজরীর শাওয়াল মাসের শেষভাগে নিজ জন্মভূমি বুস্ত শহরে প্রায় আশি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই সমাহিত হন।

২. হাদিস বিন্যাসে ইমাম ইবনে হিব্বানের অনন্য উদ্ভাবনী মানহাজ

ইসলামী হাদিস সংকলনের ইতিহাসে ইমাম ইবনে হিব্বানের গ্রন্থটি ছিল এক বৈপ্লবিক সংযোজন। তাঁর সমকালীন মুহাদ্দিসগণ সাধারণত দুই পদ্ধতিতে হাদিস সাজাতেন—(১) বর্ণনাকারী সাহাবীদের নামের ক্রমানুসারে (মুসনাদ পদ্ধতি), অথবা (২) ফিকহী মাসআলা-মাসায়েলের অধ্যায় অনুসারে (যেমন কিতাবুত তাহারাত, কিতাবুস সালাত—সুনান বা মুসান্নাফ পদ্ধতি)। কিন্তু ইমাম ইবনে হিব্বান এই দুটি প্রচলিত পদ্ধতির কোনোটিই গ্রহণ করেননি।

তিনি সম্পূর্ণ নতুন ও কুরআন-সুন্নাহর বিধানভিত্তিক এক তাত্ত্বিক বিভাজন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তিনি তাঁর গ্রন্থের নাম রেখেছিলেন—“المُسْنَدُ الصَّحِيحُ عَلَى التَّقَاسِيمِ وَالأَنْوَاعِ” (বিভাগ ও প্রকারভেদের ভিত্তিতে প্রণীত বিশুদ্ধ মুসনাদ সংকলন)।

পঞ্চমাত্রিক মূল বিভাগ (الأقسام الخمسة):

তিনি গোটা শরীয়তকে পাঁচটি মৌলিক বিভাগে (আকসাম) বিভক্ত করেছেন এবং তার অধীনে সর্বমোট ৪০০টি উপশাখা বা প্রকার (আনওয়া) সাজিয়েছেন:

বিভাগের ক্রম বিভাগের আরবি নাম বাংলা অর্থ ও পরিধি অন্তর্ভুক্ত প্রকার (أنواع)
১ম বিভাগ الأَوَامِرُ (আল-আওয়ামির) আল্লাহ তায়ালা স্বীয় বান্দাদের যেসব কাজের সুস্পষ্ট আদেশ দিয়েছেন। ১১০টি প্রকার (أنواع)
২য় বিভাগ النَّوَاهِي (আন-নাওয়াহী) যেসব গর্হিত কাজ ও পাপ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১১০টি প্রকার (أنواع)
৩য় বিভাগ الأَخْبَارُ (আল-আখবার) বিগত উম্মতদের ঘটনাবলি, কিয়ামতের আলামত ও পরকালের সংবাদ। ৮০টি প্রকার (أنواع)
৪র্থ বিভাগ الإِبَاحَاتُ (আল-ইবাহাত) শরীয়তের অনুমোদিত, সাধারণ মুবাহ ও বৈধ বিষয়াবলির বিবরণ। ৫০টি প্রকার (أنواع)
৫ম বিভাগ أَفْعَالُ النَّبِيِّ (আফ’আলুন নাবী) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, শামায়েল ও খাস আমলসমূহ। ৫০টি প্রকার (أنواع)

পরবর্তী যুগে গ্রন্থের পুনর্বিন্যাস

ইমাম ইবনে হিব্বানের এই গভীর দার্শনিক ও বিভাগভিত্তিক বিন্যাসপদ্ধতি সাধারণ আলেম ও পাঠকদের জন্য হাদিস খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে কিছুটা জটিল ছিল। ফলে অষ্টম হিজরীর বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আমির আলাউদ্দীন আলী ইবনে বালবান আল-ফারেসী (রহ.) [মৃত ৭৩৯ হি.] এই মহান গ্রন্থটিকে সাধারণ ফিকহী অধ্যায় অনুসারে (তাহারাত, সালাত, সাওম ইত্যাদি ক্রমানুসারে) নতুনভাবে সাজিয়ে দেন। তিনি এই বিন্যস্ত সংস্করণের নাম রাখেন—“الإحْسَانُ فِي تَقْرِيبِ صَحِيحِ ابْنِ حِبَّانَ” (আল-ইহসান ফি তাকরীবি সহীহ ইবনে হিব্বান)। বর্তমান মুসলিম বিশ্বে এই বিন্যস্ত সংস্করণটিই সর্বাধিক সমাদৃত ও পঠিত।


١١- اكتب مقالة حول “صحيح ابن خزيمة” مشتملة على النقاط التالية:

[১১. নিম্নলিখিত বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত করে “সহীহ ইবনে খুযায়মা” সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ রচনা করো:] (মান: ১০)

(الف) اسم المؤلف مع رحلاته العلمية وصفاته

[(ক) গ্রন্থকারের নাম, তাঁর জ্ঞানার্জনের সফরসমূহ এবং তাঁর চারিত্রিক ও জ্ঞানগত গুণাবলি।]

১. নাম ও বংশ পরিচয়

গ্রন্থকারের পূর্ণ নাম হলো আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মা ইবনে মুগীরা ইবনে সালিহ ইবনে বাকর আস-সুলামী আন-নায়সাবূরী (রহ.)। তিনি হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসে “ইমামুল আইম্মাহ” (ইমামগণের ইমাম) উপাধিতে ভূষিত। তিনি ২২৩ হিজরীর সফর মাসে খোরাসানের ঐতিহাসিক জ্ঞানতীর্থ নিশাপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন।

২. জ্ঞানার্জনের সফরসমূহ (الرحلات العلمية)

ইমাম ইবনে খুযায়মা তাঁর শৈশবেই পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। হাদিস অন্বেষণে তিনি সে যুগের প্রায় সকল প্রখ্যাত ইসলামী ভূখণ্ড ভ্রমণ করেন। তাঁর সফরসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ইরাকের বাগদাদ, বসরা ও কুফা; হিজাজের মক্কা ও মদীনা; সিরিয়া ও শামের বিভিন্ন সীমান্ত শহর; এবং উত্তর আফ্রিকার প্রাচীন জ্ঞানকেন্দ্র মিশর ও আল-জাযিরা। তিনি বহু বছর দেশ-দেশান্তরে পরিভ্রমণ করে সমকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসদের সংশ্রব লাভ করেন। তাঁর উস্তাদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন—ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আয-যুহলী, আহমাদ ইবনে মানী’, আমর ইবনে আলী আল-ফাল্লাস এবং ইউনুস ইবনে আবদিল আ’লা (রহ.)।

৩. চারিত্রিক ও জ্ঞানগত গুণাবলি

ইমাম আয-যাহাবী তাঁর সম্পর্কে বলেন: “তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তি ও অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী, যাঁর সমকক্ষ নিশাপুরে আর কেউ ছিল না।”
১. ইজতিহাদ ও ফিকহী গভীরতা: তিনি ছিলেন স্বাধীন মুজতাহিদ ফকীহ। তিনি কোনো মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ করতেন না; বরং সহীহ হাদিসকেই চূড়ান্ত দলিল হিসেবে গ্রহণ করতেন।
২. ইবাদতগুজার ও মুত্তাকী জীবন: তিনি সারা জীবন রাতের অধিকাংশ সময় তাহাজ্জুদ ও কুরআন তেলাওয়াতে কাটাতেন। তাঁর দানশীলতা ও সততা ছিল প্রবাদতুল্য।
৩. সুন্নাহর প্রতিরক্ষায় নির্ভীকতা: জাহমিয়্যা ও মু’তাযিলাদের বিভ্রান্তিকর আকিদার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক আপসহীন প্রাচীর। তাঁর রচিত কিতাবুত তাওহীদ বাতিল মতবাদের বিরুদ্ধে এক অকাট্য দলিল।


(ب) سبب تأليفه وتسميته

[(খ) গ্রন্থটি রচনার প্রেক্ষাপট/কারণ এবং এর নামকরণের বিশদ বিবরণ।]

১. গ্রন্থটি রচনার মূল প্রেক্ষাপট ও কারণ

ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহ.) সহীহ হাদিস সংকলনের যে মহান দ্বার উন্মোচন করেছিলেন, তাঁদের পর বহু মানুষ মনে করতে শুরু করেছিল যে সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বাইরে বোধহয় আর কোনো সহীহ হাদিস অবশিষ্ট নেই। আবার কিছু মহল এমন দুর্বল রেওয়ায়েতও প্রচার করছিল যা বাতিল ফিরকাগুলোকে উসকে দিত। এই পরিস্থিতিতে ইমাম ইবনে খুযায়মা সংকল্প করেন যে, তিনি সহীহাইন ছাড়াও সহীহ হাদিসের সুবিশাল ভাণ্ডার থেকে কেবল মুত্তাসিল ও শতভাগ বিশুদ্ধ মারফু রেওয়ায়েতগুলো একত্রিত করবেন, যাতে উম্মাহর ফিকহী সমস্যার সমাধানে দলিলের কোনো সংকট না থাকে। তাঁর এই বিশুদ্ধ হাদিস সংকলনের অনুপ্রেরণা থেকেই সহীহ ইবনে খুযায়মা রচিত হয়।

২. গ্রন্থের মূল নামকরণ

গ্রন্থটি সংক্ষেপে সহীহ ইবনে খুযায়মা নামে সর্বজনবিদিত হলেও গ্রন্থকার স্বয়ং এর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুবিস্তৃত নাম নির্ধারণ করেছিলেন। গ্রন্থের মূল পাণ্ডুলিপির নাম হলো—

“مُخْتَصَرُ المُخْتَصَرِ مِنَ المُسْنَدِ الصَّحِيحِ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، بِنَقْلِ العَدْلِ عَنِ العَدْلِ مَوْصُولاً إِلَيْهِ مِنْ غَيْرِ قَطْعٍ فِي السَّنَدِ وَلَا جَرْحٍ فِي النَّاقِلِينَ”

নামের তাৎপর্য: “নবী করীম (সা.) থেকে নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ বর্ণনাকারীর মাধ্যমে অবিচ্ছিন্ন সূত্রে (মুত্তাসিল সনদে) বর্ণিত, যাতে কোনো সূত্রের বিচ্ছিন্নতা (ইনক্বিতা) নেই এবং কোনো বর্ণনাকারীর ওপর জারহ বা আপত্তি নেই—এমন সহীহ মুসনাদ সংকলনের সংক্ষিপ্ততম সারসংক্ষেপ।” এই নাম থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে তিনি হাদিস চয়নের ক্ষেত্রে কী পরিমাণ কঠোর ও আপসহীন মানদণ্ড অনুসরণ করেছিলেন।


(ج) منزلته بين كتب الحديث-

[(গ) হাদিস গ্রন্থসমূহের মধ্যে এর মর্যাদা ও স্থান।]

হাদিস সাহিত্যে সহীহ ইবনে খুযায়মার অনন্য মর্যাদা

ইসলামী হাদিসশাস্ত্রের গবেষক ও মুহাদ্দিসীনদের সর্বসম্মত গবেষণায় সহীহ ইবনে খুযায়মা-এর মর্যাদা অত্যন্ত সুউচ্চ:

মূল্যায়নের দিক মুহাদ্দিসীনদের অভিমত ও পর্যালোচনা
সহীহাইনের পরেই স্থান হাফেজ জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) তাঁর তাদরীবুর রাবী গ্রন্থে উল্লেখ করেন: সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের পর বিশুদ্ধতার দিক থেকে সহীহ ইবনে খুযায়মা-এর স্থান। এটি বিশুদ্ধতার মানে সহীহ ইবনে হিব্বান এবং মুসতাদরাকে হাকেম-এর চেয়েও অগ্রগণ্য ও নির্ভরযোগ্য।
কঠোর শর্তাবলি ইমাম ইবনে খুযায়মা কোনো বর্ণনাকারীর সততা বা মুখস্থ শক্তিতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ দেখা দিলে হাদিসটি সরাসরি বর্জন করতেন অথবা সেখানে স্পষ্ট মন্তব্য জুড়ে দিতেন। তিনি বলতেন: “যদি সনদের এই রাবী সহীহ হন তবে হাদিসটি গ্রহণযোগ্য।” এমন সতর্কতা অন্য সংকলনে বিরল।
ফিকহুল হাদিসের বিকাশ ইমাম বুখারীর মতো ইমাম ইবনে খুযায়মাও প্রতিটি হাদিসের শিরোনামে (তারাজিমুল আবওয়াব) অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সমৃদ্ধ ফিকহী ইস্তিম্বাত উপস্থাপন করেছেন। প্রতিটি হাদিস থেকে তিনি বহুবিধ শরয়ী আহকাম উদ্ভাবন করেছেন।
বর্তমান পাণ্ডুলিপির অবস্থা মূল গ্রন্থের বহু অংশ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও এর একটি বড় অংশ (কিতাবুত তাহারাত, সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ ও কিছু মানাকিব সম্বলিত প্রায় ৩,০৭৯টি হাদিস) আধুনিক যুগে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সুবিখ্যাত আধুনিক হাদিস গবেষক ড. মুহাম্মদ মুস্তফা আল-আ’যমী অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এটি সম্পাদনা ও তাহকীক করে চার খণ্ডে প্রকাশ করেছেন।

١٢- اكتب نبذة من حياة الإمام الذهبى مع ذكر منزلته فى التاريخ علم الحديث-

[১২. ইমাম আয-যাহাবী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী উল্লেখপূর্বক হাদিসের ইতিহাস ও রিজালশাস্ত্রে তাঁর অসামান্য মর্যাদা ও অবদান আলোচনা করো।] (মান: ১০)

ভূমিকা

হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাস, রিজাল পর্যালোচনা (আসমাউর রিজাল) এবং জারহ ও তা’দীলের জগতে যে মুহাদ্দিসের নাম উচ্চারিত না হলে শাস্ত্রটি অপূর্ণ থেকে যায়, তিনি হলেন সপ্তম ও অষ্টম হিজরীর সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ও হাদিস গবেষক আল্লামা শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিক, ফকীহ এবং রিজাল শাস্ত্রের অবিসংবাদিত সম্রাট।

১. ইমাম আয-যাহাবী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

শিরোনাম তথ্যাবলি ও বিবরণ
পুরো নাম ও নসব মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ ইবনে উসমান ইবনে ক্বাইমায ইবনে আবদিল্লাহ আত-তুর্কমানী আল-ফারেকী আদ-দিমাশকী আশ-শাফেয়ী।
উপাধি ও কুনিয়াত কুনিয়াত হলো ‘আবু আবদিল্লাহ’ এবং উপাধি হলো ‘শামসুদ্দীন’ (দ্বীনের সূর্য)। তাঁর পিতা আহমাদ একজন দক্ষ স্বর্ণকার (যাহাবী) ছিলেন বিধায় তাঁর পারিবারিক উপাধি হয়ে যায় “আয-যাহাবী” (الذهبي)।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন তিনি ৬৭৩ হিজরীর ১ রবিউস সানী সিরিয়ার প্রাচীন ইলমী রাজধানী দামেস্কে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি কুরআন, কিরাত ও হাদিসের মৌলিক জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করেন।
ইলমী সফর ও উস্তাদবৃন্দ তিনি দামেস্ক ছাড়াও আলেপ্পো, বালবেক, ত্রিপোলি, নাবলুস, কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, মক্কা ও মদীনা সফর করেন। তিনি এক হাজার দুইশত (১,২০০)-এর অধিক শীর্ষ শায়খের কাছ থেকে হাদিসের সনদ ও সনদপ্রাপ্ত পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করেন। তাঁর শীর্ষ উস্তাদদের মধ্যে রয়েছেন: শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা, হাফেজ জামালুদ্দীন আল-মিযযী, আল-বিরযালী এবং ইবনে দাকীকুল ঈদ (রহ.)।
কর্মজীবন ও শিক্ষকতা তিনি দামেস্কের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ হাদিস বিদ্যাপীঠ ‘দারুল হাদিস আল-আশরাফিয়্যাহ’ এবং ‘দারুল হাদিস তানকিযিয়্যাহ’-তে শায়খুল হাদিস হিসেবে অধ্যাপনা করেন। ইমাম তাজউদ্দীন আস-সুবকী এবং ইবনে কাসীর তাঁর সরাসরি ছাত্র ছিলেন।
ওফাত জীবনের শেষভাগে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান এবং ৭৪৮ হিজরীর ৩ জিলকদ রাতে ৭৪ বছর বয়সে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। ঐতিহাসিক বাবুল সাগীর গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

২. হাদিসের ইতিহাস ও রিজালশাস্ত্রে ইমাম যাহাবীর সুউচ্চ মর্যাদা

ইমাম যাহাবী (রহ.)-কে হাদিস ও ইতিহাস শাস্ত্রের “মুজাদ্দিদ” বা যুগসংস্কারক বিবেচনা করা হয়। তাঁর অবদানের প্রধান দিকগুলো নিম্নরূপ:

ক. ইলমে জারহ ও তা’দীলে ইনসাফ ও ভারসাম্যের প্রতীক

মুহাদ্দিসীনদের মধ্যে কেউ কেউ বর্ণনাকারীদের সমালোচনায় অতি কঠোর (মুতাশাদ্দিদ) ছিলেন, আবার কেউ কেউ অতি শিথিল (মু তাসাহিল) ছিলেন। কিন্তু ইমাম যাহাবী ছিলেন অনন্য “মুনসিফ” (পরম ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ)। তিনি দলিলের আলোকে নিরপেক্ষভাবে রাবীদের দোষ ও গুণ বিশ্লেষণ করতেন। কোনো ব্যক্তি আকিদায় বা মাযহাবে ভিন্নমতের হলেও তাঁর হাদিস বর্ণনার সত্যতায় কোনো ত্রুটি না থাকলে তিনি অকপটে তাঁর প্রশংসা করতেন।

খ. কালজয়ী গ্রন্থাবলী ও অনন্য সংযোজন

ইমাম যাহাবী হাদিস, ইতিহাস ও রিজালের ওপর শতাধিক অনন্য গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে কয়েকটি অমর বিশ্বকোষ সদৃশ:

গ্রন্থের নাম বিষয়বস্তু ও অনন্য বৈশিষ্ট্য
১. সিয়ারু আ’লামিন নুবালা (سير أعلام النبلاء) ইসলামী ইতিহাসের সাহাবী, তাবেঈ, মুহাদ্দিস, ফকীহ, খলীফা ও মনীষীদের বিস্তারিত জীবন ও ইলমী পর্যালোচনা সংবলিত ২৫ খণ্ডের এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্যিক গ্রন্থ।
২. তারীখুল ইসলাম (تاريخ الإسلام) হিজরী ১ম সন থেকে শুরু করে ৭০০ হিজরী পর্যন্ত সাতশত বছরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আলেমদের মৃত্যুর সনভিত্তিক ৫০ খণ্ডের সর্ববৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ।
৩. মীযানুল ইতিদাল ফি নাকদির রিজাল (ميزان الاعتدال) হাদিস শাস্ত্রের দুর্বল, প্রত্যাখ্যাত ও অভিযুক্ত বর্ণনাকারীদের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রামাণ্য চার খণ্ডের রিজাল গ্রন্থ।
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ (تذكرة الحفاظ) সাহাবিদের যুগ থেকে শুরু করে অষ্টম হিজরী পর্যন্ত শীর্ষ পর্যায়ের হাফেজে হাদিসদের মর্যাদাক্রম ও সনদ বিশ্লেষণের অনন্য প্রামাণ্য দলিল।
৫. তালখীসুল মুসতাদরাক (تلخيص المستدرك) ইমাম হাকিমের মুসতাদরাক-এর প্রতিটি হাদিসের ওপর চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ চালিয়ে সহীহ ও যঈফ নির্ধারণকারী এক যুগান্তকারী সমালোচনামূলক গ্রন্থ।

উপসংহার

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) যথাযথভাবেই মন্তব্য করেছেন: “হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রের ক্ষেত্রে আয-যাহাবীর গ্রন্থসমূহ হলো এমন আলোকবর্তিকা যা ছাড়া পরবর্তী কোনো গবেষক এক পা-ও অগ্রসর হতে পারে না।” তিনি ছিলেন হাদিসের প্রামাণিকতার অতন্দ্র প্রহরী।


উপসংহার

২০২১ শিক্ষাবর্ষের ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষের দিরাসাতুল হাদীস – ২ (বিষয় কোড: 202407) প্রশ্নপত্রটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, গভীর তাত্ত্বিক ও ভারসাম্যপূর্ণ। এই প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হাদিসের মূল পাঠ (মতন) অনুবাদ ও তাহকীক করার পাশাপাশি ইলমে হাদিসের গভীর শাখা—ঈমান ও ইসলামের তাত্ত্বিক ভেদরেখা, ইসলামী রাজনীতির সংকট ও উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের ইতিহাস, সদকায়ে জারিয়া ও অসিয়তের ফিকহী নীতিমালা, নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র চরিত্র ও চার মহীয়সী নারীর মর্যাদা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছে। একই সাথে গ্রুপ (দ)-এর মাধ্যমে ইমাম ইবনে হিব্বানের অভিনব হাদিস বিন্যাসপদ্ধতি, ইমাম ইবনে খুযায়মার কালজয়ী অবদান এবং ইমাম আয-যাহাবীর রিজালশাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যের তুলনামূলক অধ্যয়ন সম্পন্ন হয়েছে। এই সুবিন্যস্ত উত্তরমালা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনে এবং উচ্চতর গবেষণায় এক প্রামাণ্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. দিরাসাতুল হাদীস – ২ (বিষয় কোড: 202407) প্রশ্নপত্রে কোন কোন মূল হাদিসগ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত?

এই পাঠ্যক্রমে প্রধানত তিনটি মৌলিক হাদিসগ্রন্থ ও হাদিসশাস্ত্রীয় ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: (১) ইমাম ইবনে হিব্বানের সহীহ ইবনে হিব্বান (গ্রুপ-ক), (২) ইমাম ইবনে খুযায়মার সহীহ ইবনে খুযায়মা (গ্রুপ-খ), (৩) ইমাম হাকিমের আল-মুসতাদরাক আলাস সাহীহাইন (গ্রুপ-গ), এবং (৪) হাদিসগ্রন্থসমূহের সংকলন ইতিহাস ও রিজালশাস্ত্র (গ্রুপ-ঘ)।

২. সহীহ ইবনে খুযায়মা এবং সহীহ ইবনে হিব্বানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

ইমাম ইবনে খুযায়মা তাঁর গ্রন্থে কঠোরতম শর্তের ভিত্তিতে কেবল বিশুদ্ধ মুত্তাসিল সনদের হাদিস ফিকহী অধ্যায়ে সংকলন করেছেন। অন্যদিকে তাঁর ছাত্র ইমাম ইবনে হিব্বান প্রচলিত ফিকহী অধ্যায় পরিহার করে আদেশ, নিষেধ, সংবাদ, অনুমতি ও নববী আমল—এই পঞ্চমাত্রিক বিভাজনে ৪০০ প্রকারের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ উদ্ভাবনী তাত্ত্বিক মানহাজে হাদিস সাজিয়েছেন। এছাড়া বর্ণনাকারীদের মূল্যায়নে ইবনে খুযায়মা অত্যন্ত সতর্ক হলেও ইবনে হিব্বানের মধ্যে কিছুটা শিথিলতা (তাছাহুল) পরিলক্ষিত হয়।

৩. হাদিসে জিবরীলের আলোকে ঈমান ও ইসলামের সমন্বিত সম্পর্ক কী?

মুহাদ্দিসীনদের স্বীকৃত সর্বজনীন নিয়ম হলো—”إِذَا اجْتَمَعَا افْتَرَقَا، وَإِذَا افْتَرَقَا اجْتَمَعَا”। অর্থাৎ যখন ঈমান ও ইসলাম একই সাথে উল্লিখিত হয়, তখন ঈমান দ্বারা বোঝানো হয় অন্তরের অদৃশ্য বিশ্বাস ও আকিদা এবং ইসলাম দ্বারা বোঝানো হয় বাহ্যিক প্রকাশ্য আমল ও আনুগত্য। আর যখন এদের একটি শব্দ এককভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা সামগ্রিক দ্বীনকে নিজের মধ্যে ধারণ করে।

৪. জীবিত ব্যক্তির কোন কোন নেক আমলের সওয়াব মৃতদের কবরে পৌঁছায়?

সহীহ হাদিসের সর্বসম্মত বিধানে মৃত ব্যক্তির জন্য দোআ ও এস্তেগফার, নফল ও ফরজ সদকা, ওয়াকফকৃত জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো (মসজিদ, কূপ, মাদ্রাসা), প্রচারিত দ্বীনি জ্ঞান এবং নেক সন্তানের সৎকর্মের সওয়াব সরাসরি পৌঁছে। এছাড়া সামর্থ্যহীন বা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ফরজ হজ আদায় (বদলি হজ) এবং অসিয়ত থাকলে অনাদায়ী নামাজ-রোজার নির্ধারিত ফিদয়া প্রদান করলেও তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির জিম্মাদারি মুক্ত করে।

৫. রিজাল ও হাদিসের ইতিহাসে ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবীর অনন্য অবদান কী?

ইমাম আয-যাহাবী (রহ.) ছিলেন ইলমে জারহ ও তা’দীলের ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ বিচারক (মুনসিফ)। তিনি সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, তারীখুল ইসলাম এবং মীযানুল ইতিদাল-এর মতো সুবিশাল বিশ্বকোষীয় গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে হাজার হাজার হাদিস বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা নিরূপণ করেছেন এবং মুসতাদরাকে হাকেমের সহীহ ও দুর্বল হাদিসের নিখুঁত তাহকীক সম্পন্ন করে উম্মাহর নিকট হাদিসের বিশুদ্ধতার মানদণ্ড সুরক্ষিত করেছেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন