জরুরি নোটিশ 🔔 নতুন: ২০২৬ সালের সকল শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা ও গাইড বই প্রকাশিত হয়েছে!

দিরাসাতুল হাদীস – ১ (Dirasatul Hadith – 1) – 202406, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ – ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১

Abswer.com Abswer.com
19 September, 2026
১৩৮ মিনিট পড়ার সময়
১৭ বার পঠিত

সরাসরি Telegram-এ সকল বই ও সাজেশন পান!

আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হয়ে সবার আগে নতুন বই ও রুটিন ডাউনলোড করুন।

টেলিগ্রামে যুক্ত হোন 🚀

পরীক্ষা কোড: 204 | প্রশ্নপত্র কোড: 161
اختبار السنة الرابعة للفاضل (البكالوريوس) الشرف، لعام ۲۰۲۱
[ফাজিল (স্নাতক) সম্মান চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২১]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة الحديث – ۱
[দিরাসাতুল হাদীস – ১]
বিষয় কোড : 202406
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن إثنين من مجموعة (الف) وعن إثنين من مجموعة (ب) وعن إثنين من مجموعة (ج) وعن إثنين من مجموعة (د)- الادعداد بالهامش تدل على الدرجات كاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: (ক) বিভাগ থেকে ২টি, (খ) বিভাগ থেকে ২টি, (গ) বিভাগ থেকে ২টি এবং (ঘ) বিভাগ থেকে ২টি প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রতিটি প্রশ্নের মান ডান পার্শ্বে উল্লেখ করা হলো।]


مجموعة (الف) — الموطأ للإمام مالك (ক বিভাগ: মুয়াত্তা ইমাম মালিক)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة)


١- عن أبي الزناد، عن الأعرج، عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال تكفل الله لمن جاهد في سبيله لا يخرجه من بيته إلا الجهاد في سبيله وتصديق كلماته أن يدخله الجنة أو يرده إلى مسكنه الذي خرج منه مع ما نال من أجر أو غنيمة-

[১. আবুয যিনাদ (রহ.) থেকে, তিনি আল-আ’রাজ (রহ.) থেকে, তিনি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন যে তাঁর পথে জিহাদে বের হয়, এবং যাকে তাঁর পথে জিহাদ এবং তাঁর বাণীর সত্যায়ন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য ঘর থেকে বের করেনি—আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন অথবা সে যে সাওয়াব বা গণিমত লাভ করেছে তা সহ তাকে তার নিজ আবাসে ফিরিয়ে আনবেন।”]

হাদীসের পটভূমি ও সনদ পরিচিতি

উক্ত হাদীসটি ইমাম মালিক (রহ.) তাঁর বিশ্ববিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ ‘আল-মুয়াত্তা’-এর কিতাবুল জিহাদ (كتاب الجهاد)-এ সংকলন করেছেন। হাদীসের সনদটি স্বর্ণসূত্রে গাঁথা অত্যন্ত বিশুদ্ধ এক সনদ (أصح الأسانيد):

  • ইমাম মালিক (রহ.): মদীনা মুনাওয়ারার সুবিখ্যাত ইমাম ও মুজতাহিদ ফকীহ (৯৩-১৭৯ হিজরী)।
  • আবুয যিনাদ (রহ.): আবদুল্লাহ ইবনে যাকওয়ান আল-কুরায়শী (৬৫-১৩০ হিজরী), মদীনার শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ী ও বিশ্বস্ত মুহাদ্দিস।
  • আল-আ’রাজ (রহ.): আবদুর রহমান ইবনে হুরমুয আল-মাদানী (মৃত্যু ১১৭ হিজরী), বিজ্ঞ তাবেয়ী ও নির্ভরযোগ্য রাবী।
  • আবু হুরায়রা (রা.): সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী প্রখ্যাত সাহাবী (মৃত্যু ৫৭ বা ৫৯ হিজরী)।

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ তরজমা ও শব্দার্থ

তরজমা: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির জন্য জামিন বা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যে তাঁর রাস্তায় জিহাদ করার উদ্দেশ্যে বের হয়; এবং যাকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা এবং তাঁর বাণীর ওপর ঈমান ও সত্যায়ন ব্যতীত অন্য কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য গৃহ থেকে বের করেনি—আল্লাহ তাকে নিশ্চিতভাবে জান্নাতে দাখিল করবেন (যদি সে শহীদ হয়), অথবা সে যে সাওয়াব বা যুদ্ধলব্ধ গণিমত অর্জন করেছে, তা সহ তাকে স্বীয় আবাসে নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন (যদি সে জীবিত থাকে)।

মূল আরবী শব্দ উচ্চারণ অর্থ ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ
تَكَفَّلَ اللهُ তাকাফফালাল্লাহু আল্লাহ যিম্মাদারী বা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন (বাব তাফা’উল থেকে ফে’লে মাযী)।
لِمَنْ جَاهَدَ লিমান জাহাদা যে ব্যক্তি জিহাদ ও প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়েছে তার জন্য।
تَصْدِيقِ كَلِمَاتِهِ তাসদীকি কালিমাতিহী তাঁর বাণীর সত্যায়ন, আল্লাহর ওয়াদা ও শরীয়তকে সত্য বলে বিশ্বাস করা।
يَرُدَّهُ إِلَى مَسْكَنِهِ য়ারুদ্দাহু ইলা মাসকানিহী তাকে তার বাসস্থান বা ঘরে ফিরিয়ে আনবেন।
مَا نَالَ مِنْ أَجْرٍ أَوْ غَنِيمَةٍ মা না-লা মিন আজরিন আও গানীমাহ সে যে পরিমাণ সাওয়াব বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করেছে তা সহ।

হাদীসের বিশদ তাশরীহ ও তাৎপর্য

  1. ইখলাস ও বিশুদ্ধ নিয়তের শর্ত: হাদীসে ‘লা ইয়ুখরিজুহু ইল্লাল জিহাদু ফী সাবীলিহী’ বাক্যাংশ দ্বারা শর্তারোপ করা হয়েছে যে, মুজাহিদের জিহাদ হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। প্রদর্শনেচ্ছা, পার্থিব খ্যাতি বা নিছক সম্পদের লোভে বের হলে আল্লাহর এই মহান জামিনদারী পাওয়া যাবে না।
  2. আল্লাহর ঐশী জামিনদারী (كفالة الله): আল্লাহ যার যিম্মাদার হন, তার ক্ষতি বা বিফলতার কোনো অবকাশ নেই। মুজাহিদ ব্যক্তি হয়তো শাহাদাত লাভ করে চিরস্থায়ী জান্নাতের মেহমান হবে, আর জীবিত ফিরে আসলে সে অফুরন্ত সাওয়াব ও হালাল গনীমতের অধিকারী হবে।
  3. উভয় অবস্থাতেই জয়ী: মুমিনের জিহাদী জীবনে কোনো পরাজয় নেই। শাহাদাত বরণ করলে সর্বোচ্চ সফলতা ‘শাহাদাত ও জান্নাত’, আর বেঁচে ফিরলে ‘গাজী ও পুরস্কৃত’।

(أ) ما معنى الجهاد وكم قسما له وما حكم الجهاد في العصر الحاضر-

[(ক) জিহাদের অর্থ কী, এর কতটি প্রকার রয়েছে এবং বর্তমান যুগে জিহাদের বিধান কী? বর্ণনা কর।]

১. জিহাদের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ (معنى الجهاد لغة وشرعا)
  • আভিধানিক অর্থ: ‘জিহাদ’ (الجِهَادُ) শব্দটি আরবী ‘জুহদ’ (جُهْد) বা ‘জাহদ’ (جَهْد) মূলধাতু থেকে নিষ্পন্ন। এর অর্থ—সর্বশক্তি নিয়োগ করা, কঠোর শ্রম দেওয়া, চরম প্রচেষ্টা চালানো, কষ্ট সহ্য করা এবং কোনো মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে সাধ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করা।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে জান, মাল, ইলম, বুদ্ধি ও বাক্য দ্বারা সর্বাত্মক সংগ্রাম ও প্রচেষ্টাকে জিহাদ বলা হয়।
    আল্লামা ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন: “জিহাদ হলো আল্লাহর দ্বীনকে বুলন্দ করার জন্য নিজের জান ও মাল দিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো।”
২. জিহাদের প্রকারভেদ (أقسام الجهاد)

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জিহাদ কেবল তরবারির যুদ্ধের নাম নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক ও বহুমুখী প্রচেষ্টা। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থে জিহাদের প্রধান চারটি স্তর ও ১৩টি উপশাখা আলোচনা করেছেন। প্রধান প্রধান প্রকারগুলো নিম্নরূপ:

জিহাদের প্রকার মূল মর্ম ও বিবরণ কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা
১. জিহাদ বিন-নফস (جهاد النفس) কুপ্রবৃত্তি, অলসতা ও নফসের দাসত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং শরীয়তের হুকুম পালনে বাধ্য করা। একে জিহাদে আকবর বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: “যে ব্যক্তি স্বীয় রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই তার আবাস।” (সূরা আন-নাযিআত: ৪০-৪১)
২. জিহাদ বিশ-শায়তান (جهاد الشيطان) ইবলীস ও তার প্ররোচনার বিরুদ্ধে সদা সতর্ক থাকা, ঈমান ও আমলকে শয়তানী ধোঁকা ও সংশয় থেকে রক্ষা করা। আল্লাহ ইরশাদ করেন: “নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু; সুতরাং তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ কর।” (সূরা ফাতির: ৬)
৩. জিহাদ বিল-ইলম ওয়াল ক্বলম (جهاد بالعلم والقلم) জ্ঞানের বিকাশ, লেখনী, দাওয়াত, বিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দ্বারা ইসলামের সত্যতা প্রমাণ এবং বাতিল মতবাদের খণ্ডন করা। আল্লাহ বলেন: “অতএব আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না এবং কুরআনের সাহায্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রবল জিহাদ পরিচালনা করুন।” (সূরা আল-ফুরকান: ৫২)
৪. জিহাদ বিল-মাল (جهاد بالمال) ইসলামের প্রচার, দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা, অসহায় মুসলিমদের সাহায্য ও জিহাদের রসদ জোগাতে অর্থ ব্যয় করা। আল্লাহ বলেন: “তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ কর।” (সূরা আত-তাওবাহ: ৪১)
৫. জিহাদ বিস-সাইফ বা ক্বিতাল (جهاد بالسيف والقتال) ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধান, মাজলুমের অধিকার পুনরুদ্ধার এবং আগ্রাসী শত্রু ও ফিতনাবাজদের প্রতিহত করতে অস্ত্র হাতে ময়দানে লড়াই করা। আল্লাহ বলেন: “আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দ্বীন সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৯৩)
৩. বর্তমান যুগে জিহাদের বিধান (حكم الجهاد في العصر الحاضر)

ইসলামী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী ক্বিতাল বা সশস্ত্র জিহাদ মূলত ফরযে কেফায়া (فرض كفاية)। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহ বা রাষ্ট্রের একটি দল তা পালন করলে বাকিরা দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে। তবে নিম্নোক্ত পরিস্থিতিতে এটি ফরযে আইন (فرض عين)-এ পরিণত হয়:

  1. যখন শত্রুপক্ষ কোনো মুসলিম ভূখণ্ডে আক্রমণ বা আগ্রাসন চালায়, তখন আক্রান্ত ভূমির সকল মুসলিমের ওপর তা প্রতিহত করা ফরযে আইনে পরিণত হয়।
  2. যখন কোনো ইসলামী রাষ্ট্রের বৈধ শাসক বা আমীর সাধারণ দেশবাসীকে জিহাদের জন্য আহ্বান (نفير عام) জানান।
  3. যুদ্ধের ময়দানে সৈন্য সামনাসামনি মুখোমুখি হলে ময়দান ত্যাগ করা হারাম এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সংশ্লিষ্ট সৈনিকদের জন্য ফরযে আইন।

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও আধুনিক যুগের জিহাদ:

  • বুদ্ধিবৃত্তিক ও মিডিয়া জিহাদ: বর্তমান বিশ্বে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার-প্রচারণা, নাস্তিক্যবাদ ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লেখনী, সোশ্যাল মিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা উম্মাহর আলিম ও তরুণ প্রজন্মের ওপর এক অন্যতম অপরিহার্য জিহাদ।
  • অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও সহায়তা: নির্যাতিত ফিলিস্তিন, কাশ্মীর ও বিশ্বের অপরাপর মজলুম মুসলমানদের মানবিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান করা এবং অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ মোকাবিলার জিহাদ অত্যন্ত কার্যকর।
  • নৈতিক ও শিক্ষাগত পুনর্জাগরণ: মুসলিম সমাজকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অনৈক্য থেকে মুক্ত করে ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলা বর্তমান সময়ের প্রধান বাস্তবসম্মত জিহাদ।

٢- عن عبادة بن الصامت قال بايعنا رسول الله صلى الله عليه وسلم على السمع والطاعة في اليسر والعسر والمنشط والمكره وأن لا ننازع الأمر أهله وأن نقول أو نقوم بالحق حيثما كنا لا نخاف لومة لائم-

[২. উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেছিলাম এ কথার ওপর যে, আমরা আনন্দে ও কষ্টে, অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থায় পূর্ণরূপে নেতার নির্দেশ শুনব ও আনুগত্য করব; এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উপযুক্ত অধিকারীদের সাথে ক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রকার বিবাদ ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত হব না; আর আমরা যেখানেই থাকি না কেন সর্বদা সত্য বলব অথবা সত্যের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকব এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করব না।”]

হাদীসের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

উক্ত হাদীসটি ইসলামের ইতিহাসে ঐতিহাসিক ‘আকাবাতুল উলা’ ও ‘আকাবাতুস সানিয়াহ’-এর ঐতিহাসিক শপথের প্রেক্ষাপটে বর্ণিত। হযরত উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.) ছিলেন আকাবার বাইয়াতে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট আনসারী সাহাবী এবং বারোজন নকীবের (নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি) অন্যতম। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন পারস্পরিক আনুগত্য ও সত্যের ওপর অবিচল থাকার এই অবিস্মরণীয় অঙ্গীকারের মাধ্যমে।

শব্দার্থ ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ

মূল আরবী শব্দ উচ্চারণ অর্থ ও তাৎপর্য
بَايَعْنَا বায়া’না আমরা বাইয়াত বা আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছি (বাব মুফা’আলাহ)।
السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ আস-সাম’ই ওয়াত-ত্বা’আহ নির্দেশ শ্রবণ করা ও তা মান্য বা বাস্তবায়ন করা।
فِي المَنْشَطِ وَالمَكْرَهِ ফিল মানশাতি ওয়াল মাকরাহ আনন্দের মুহূর্তে ও অপছন্দের বা অনীহার মুহূর্তে।
أَنْ لَا نُنَازِعَ الأَمْرَ أَهْلَهُ আল্লা নুনাযি’আল আমরা আহলাহু ক্ষমতার উপযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অহেতুক ক্ষমতা দখলের বিদ্রোহ না করা।
لَوْمَةَ لَائِمٍ লাওমাতা লা-ইম কোনো নিন্দুক বা সমালোচকের নিন্দা ও কটূক্তি।

হাদীসের শিক্ষা ও সারসংক্ষেপ

  1. ইসলামী রাষ্ট্রে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সংহতি বজায় রাখার প্রধান ভিত্তি হলো বৈধ নেতৃত্বের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য (যতক্ষণ না তা পাপে আদেশ করে)।
  2. নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে হানাহানি, চক্রান্ত ও রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়, তাই এর থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে।
  3. ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ (امر بالمعروف ونهي عن المنكر)-এর ক্ষেত্রে কোনো ভয়ভীতি বা নিন্দুকের পরোয়া করা যাবে না।

(أ) ما معنى البيعة؟ و ما حكم طاعة الامير؟ بين موضحًا-

[(ক) বাইয়াত (البيعة)-এর অর্থ কী? আমীরের আনুগত্যের শরয়ী বিধান কী? ব্যাখ্যাসহ বর্ণনা কর।]

১. বাইয়াতের পরিচয় (تعريف البيعة)
  • আভিধানিক অর্থ: ‘বাইয়াত’ (البَيْعَةُ) শব্দটি আরবী ‘বাইউন’ (بَيْعٌ) মূলধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ ক্রয়-বিক্রয় বা পারস্পরিক চুক্তি সম্পাদন করা। আরব সমাজে কোনো বেচাকেনা সম্পন্ন হলে যেমন ক্রেতা-বিক্রেতা একে অপরের হাত ধরত, তেমনি আনুগত্যের চুক্তি সম্পাদনেও একে অপরের হাত ধরা হতো বলে একে ‘বাইয়াত’ বলা হয়।
  • পারিভাষিক অর্থ: আল্লামা ইবনে খালদুন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘মুকাদ্দিমাহ’ গ্রন্থে বলেন: “বাইয়াত হলো আনুগত্যের একটি চুক্তি। অর্থাৎ বাইয়াতকারী এই মর্মে অঙ্গীকার করে যে, সে আমীর বা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি নিজের কর্তৃত্ব সমর্পণ করল এবং দীনী ও রাষ্ট্রীয় সার্বিক বিষয়ে কোনো বিরোধ না করে তার আদেশ পালন করবে।”
২. আমীরের আনুগত্যের শরয়ী বিধান (حكم طاعة الأمير)

ইসলামী শরীয়তের অকাট্য নীতি অনুযায়ী মুসলিম শাসক বা আমীরের আনুগত্য করা ওয়াজিব বা ফরয। আমীরের আনুগত্য কেবল একটি সামাজিক নিয়ম নয়, বরং এটি একটি অবিচ্ছেদ্য ঈমানী দায়িত্ব।

কুরআন মাজীদের দলীল:

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য হতে উলিল আমর তথা নেতৃবৃন্দের।” (সূরা আন-নিসা: ৫৯)

হাদীস শরীফের দলীল:

  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
    مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ، وَمَنْ يَعْصِنِي فَقَدْ عَصَى اللهَ، وَمَنْ يُطِعِ الأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي، وَمَنْ يَعْصِ الأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِي-
    “যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল, আর যে আমার অবাধ্য হলো সে আল্লাহর অবাধ্য হলো। অনুরূপভাবে যে আমীরের আনুগত্য করল সে আমারই আনুগত্য করল, আর যে আমীরের অবাধ্য হলো সে আমারই অবাধ্য হলো।” (সহীহ বুখারী: ৭১৩৭)
  • তিনি আরো ইরশাদ করেছেন: “যদি তোমাদের ওপর এমন কোনো হাবশী গোলামকেও আমীর নিযুক্ত করা হয় যার মাথাটি কিশমিশের মতো, তবুও তোমরা তার নির্দেশ শুনবে ও আনুগত্য করবে।” (সহীহ বুখারী: ৬৯৩)
৩. আমীরের আনুগত্যের শর্ত ও সীমা (حدود طاعة الأمير)

আমীরের আনুগত্য অন্ধ বা সীমাহীন নয়, বরং তা কুরআন ও সুন্নাহর অনুশাসনের অধীন। ইসলামী ফিকহের সর্বসম্মত মূলনীতি হলো:

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الخَالِقِ

“স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা বৈধ নয়।”

  • যদি আমীর কোনো স্পষ্ট হারাম বা গুনাহের নির্দেশ দেয়, তবে সে নির্দিষ্ট নির্দেশের ক্ষেত্রে তার আনুগত্য করা যাবে না। কিন্তু এজন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা অহেতুক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • আমীরের অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রেখে সত্য প্রকাশ ও গঠনমূলক নসীহত করা উম্মাহর ওপর ওয়াজিব।

٣- عن الأعرج عن أبي هريرة رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : والذي نفسي بيده لوددت أنى أقاتل في سبيل الله فأقتل ثم أحيى فأقتل ثم أحيى فأقتل فكان أبو هريرة رضى الله عنه يقول ثلاثًا أشهد بالله-

[৩. আল-আ’রাজ থেকে বর্ণিত, তিনি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমি নিশ্চিতভাবে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করি যে, আমি আল্লাহর পথে লড়াই করি এবং শহীদ হই, অতঃপর পুনরায় জীবিত হই এবং শহীদ হই, অতঃপর আবার জীবিত হই এবং শহীদ হই।” আবু হুরায়রা (রা.) তিনবার বলতেন: আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিচ্ছি।]

হাদীসের প্রেক্ষাপট ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ

উক্ত হাদীসটি শাহাদাতের অনন্য মর্যাদা ও পরাকাষ্ঠার সবচেয়ে জোরালো ও হৃদয়স্পর্শী দলীল। ইমাম মালিক (রহ.) আল-মুয়াত্তা-এ এটি সংকলন করেছেন। স্বয়ং সাইয়্যিদুল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শপথ করে নিজের অন্তরের গভীরতম সুপ্ত তামান্না প্রকাশ করছেন যে, আল্লাহর রাস্তায় বারবার জীবন উৎসর্গ করা কতই না সৌভাগ্যের বিষয়!

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হাদীসটির সত্যতা ও এর গভীর তাৎপর্য শ্রোতাদের অন্তরে বদ্ধমূল করার জন্য তিনবার শপথ করে বলতেন: “আশহাদু বিল্লাহ” (আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ সা. এই পবিত্র কথা ইরশাদ করেছেন)।

শব্দার্থ ও ভাষাগত বিশ্লেষণ

  • وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ (ওয়াল্লাযী নাফসী বিয়াদিহী): শপথের বাক্য—”সেই সত্তার কসম যাঁর কুদরতী হাতে আমার জীবন নিয়ন্ত্রিত।” রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতে এই শপথ করতেন।
  • لَوَدِدْتُ (লাওয়াদিদতু): আমি ঐকান্তিকভাবে কামনা করি, আশা পোষণ করি (মুহব্বত ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশার্থে)।
  • أُقْتَلَ ثُمَّ أُحْيَا (উকতাল সুম্মা উহয়া): নিহত হই (শহীদ হই), পুনরায় জীবিত হই। এখানে ক্রিয়া রূপান্তর শাহাদাতের পুনরাবৃত্তির বাসনা তুলে ধরে।

(أ) درجة النبوة أفضل وأكرم من درجة الشهادة فكيف تتمنى رسول الله صلى الله عليه وسلم الشهادة في سبيل الله مرارًا؟ أوضح-

[(ক) নবুওয়াতের মর্যাদা শাহাদাতের মর্যাদা অপেক্ষা অধিক উত্তম ও সম্মানিত; এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে বারবার আল্লাহর পথে শাহাদাত কামনা করলেন? ব্যাখ্যা কর।]

১. নবুওয়াত ও শাহাদাতের মর্যাদাগত অবস্থান

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগৃহীত বান্দাদের চারটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:
وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ
“আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তারা তাদের সাথে থাকবে যাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন—নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ এবং সৎকর্মশীলগণ।” (সূরা আন-নিসা: ৬৯)

এই আয়াতের ক্রমানুসারে এবং উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা অনুযায়ী নবুওয়াত হলো মানবজাতির সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ স্তর। নবুওয়াতের পর সিদ্দীকিয়াত, তারপর শাহাদাত, তারপর সালেহিয়াত। সুতরাং নবুওয়াতের মর্যাদা শাহাদাত অপেক্ষা বহু গুণে শ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত।

২. ইশকাল বা সংশয়ের স্বরূপ

এখানে যৌক্তিক প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দেয় যে, একজন ব্যক্তি যখন সর্বোচ্চ মর্যাদায় (নবুওয়াত ও রিসালাতের শিখরে) অধিষ্ঠিত, তখন তিনি তার চেয়ে নিম্নস্তরের একটি মর্যাদা (শাহাদাত) কেন শপথ করে বারবার কামনা করবেন? একজন উচ্চমর্যাদাবান ব্যক্তি নিম্নপদমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা কেন করবেন?

৩. মুহাদ্দিসীন ও উলামায়ে কিরামের প্রাজ্ঞ সমাধান

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.), ইমাম নববী (রহ.) এবং কাজীয়াজ (রহ.) সহ শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিসগণ এই প্রশ্নের অত্যন্ত সুন্দর ও যৌক্তিক জবাব প্রদান করেছেন:

  1. উম্মতের জন্য তারগীব ও শিক্ষা (تعليم الأمة وترغيبهم):
    রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই তামান্না মূলত তাঁর ব্যক্তিগত কোনো অপূর্ণতার কারণে নয়, বরং উম্মতকে শাহাদাতের সুমহান ফযীলত ও গৌরব উপলব্ধি করানোর জন্য। উম্মত যেন বুঝতে পারে যে, যে শাহাদাতকে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বারবার কামনা করছেন, সাধারণ মুমিনের কাছে তা কতখানি আকাঙ্ক্ষিত হওয়া উচিত!
  2. উভয় মর্যাদার সমন্বয় সাধন (الجمع بين الفضيلتين):
    নবী কারীম (সা.) নবুওয়াত ত্যাগ করে শহীদ হতে চাননি; বরং নবুওয়াতের মহান মর্যাদার সাথে শাহাদাতের অতিরিক্ত মর্যাদা যুক্ত করতে চেয়েছেন। যেমনটি আল্লাহ তাআলা ইতিপূর্বে হযরত যাকারিয়া (আ.) ও হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-কে নবুওয়াত ও শাহাদাত উভয় মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন।
  3. শাহাদাতের অতুলনীয় রব্বানী পুরষ্কার দর্শন:
    সহীহ হাদীসে এসেছে, শাহাদাত বরণকারী ব্যক্তি ছাড়া জান্নাতের আর কোনো অধিবাসী পুনরায় দুনিয়াতে ফিরে আসার ইচ্ছা পোষণ করবে না। কেবল শহীদ ব্যক্তিই আল্লাহর দরবারে শাহাদাতের সম্মান ও আতিথেয়তা দেখে বারবার দুনিয়ায় ফিরে গিয়ে শহীদ হওয়ার আকুল বাসনা ব্যক্ত করবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ওহীর মাধ্যমে এই অতুলনীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
  4. হাকীকী অর্থে শাহাদাত প্রাপ্তি:
    রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই পবিত্র বাসনাকে আল্লাহ বৃথা যেতে দেননি। খায়বার যুদ্ধে ইহুদী নারীর দেওয়া বিষযুক্ত গোশতের প্রতিক্রিয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দেহে আমৃত্যু ছিল। ওফাতকালে তিনি হযরত আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন, “খায়বারের বিষাক্ত খাদ্যের ব্যথা আমি এখনও অনুভব করছি, এবং আজ সেই বিষক্রিয়ায় আমার জীবনপ্রদীপ নিভে আসছে।” এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁকে স্বাভাবিক ওফাতের পাশাপাশি শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদাও দান করেছেন।

مجموعة (ب) — الموطأ للإمام محمد بن الحسن (খ বিভাগ: মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة)


٤- عن أبي سعيد الخدري رضى الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال إذا سمعتم النداء فقولوا مثل ما يقول المؤذن- عن ابن عمر رضى الله عنهما أنه كان يكبر في النداء ثلاثًا ويتشهد ثلاثًا وكان احيانًا إذا قال حيى على الفلاح قال على أثرها حيى على خير العمل-

[৪. আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন তোমরা আযানের আহ্বান শোনো, তখন মুয়াযযিন যা বলে তোমরাও তার অনুরূপ বলো।” ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আযানে তিনবার তাকবীর বলতেন এবং তিনবার তাশাহহুদ পাঠ করতেন; এবং কখনো কখনো ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’-এর পরপরই বলতেন ‘হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল’ (উত্তম কাজের দিকে আস)।”]

হাদীসের পটভূমি ও সনদ পরিচিতি

উক্ত হাদীসটি ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত সংকলন ‘আল-মুয়াত্তা’-এর কিতাবুয যিকরি ওয়াদ দুআ এবং কিতাবুস সালাত অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.)-এর প্রধান শিষ্য এবং ইমাম মালিক (রহ.)-এর প্রত্যক্ষ ছাত্র হিসেবে হাদীসের বর্ণনায় অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য ভিত্তি স্থাপন করেছেন।

হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ও শব্দার্থ বিশ্লেষণ

তরজমা: হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন— “যখন তোমরা আযান শুনতে পাও, তখন মুয়াযযিন যা বলে তোমরাও হুবহু তার অনুরূপ বাক্য উচ্চারণ কর।” আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি আযানের সময় তিনবার তাকবীর বলতেন এবং তিনবার তাশাহহুদ পাঠ করতেন; এবং কোনো কোনো সময় তিনি ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ বলার পর পরই বলতেন: ‘হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল’ (উত্তম কর্মের দিকে আস)।

মূল আরবী শব্দ উচ্চারণ অর্থ ও তাৎপর্য
النِّدَاءُ আন-নিদা আযান বা নামাযের জন্য উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করা।
مِثْلَ مَا يَقُولُ المُؤَذِّنُ মিসলা মা ইয়াক্বূলুল মুআযযিন মুয়াযযিন যা যা উচ্চারণ করে হুবহু তার অনুরূপ বাক্য।
يَتَشَهَّدُ ثَلَاثًا ইয়াতাশাহহাদু সালাসা তিনবার তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য বা কালিমা পাঠ করতেন।
عَلَى إِثْرِهَا আলা ইসরিহা তার ঠিক পেছনেই বা ঠিক পরক্ষণেই।
حَيَّ عَلَى خَيْرِ العَمَلِ হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল উত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট আমলের (নামাযের) দিকে দ্রুত আস।

হাদীসের ফিকহী ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা

  1. আযানের জবাব দেওয়ার হুকুম: জুমহুর ফুকাহায়ে কিরামের মতে মুয়াযযিনের আযান শুনে তার জবাব দেওয়া মুস্তাহাব ও সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। কোনো কোনো ফকীহ একে ওয়াজিবও বলেছেন। তবে ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ’ ও ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’-এর জবাবে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলতে হয়।
  2. ‘হাইয়্যা আলা খাইরিল আমাল’ বাক্যের পর্যালোচনা: প্রাচীন হাদীস ও আসার বিশারদগণের মতে, ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে এ বাক্যটি আযানে প্রচলিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে হযরত উমর (রা.) ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে লক্ষ্য করা গেল যে, মানুষ যেন এ বাক্য শুনে জিহাদ ছেড়ে কেবল নামাযকেই একমাত্র কাজ মনে করে শিথিল না হয়ে পড়ে, সেজন্য মূল সাধারণ আযানে এটি স্থগিত রাখা হয়। হযরত ইবনে উমর (রা.) ব্যক্তিগত আমলে কখনো কখনো এটি উচ্চারণ করতেন, যা ছিল সাহাবীর একটি ব্যক্তিগত ফযীলতপূর্ণ আমল, তবে উম্মাহর সর্বসম্মত আযানের স্থায়ী শব্দমালায় তা অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

(أ) ما معنى الأذان؟ متى وكيف شرع الأذان في الاسلام؟

[(ক) আযান (الأذان)-এর অর্থ কী? ইসলামে কখন এবং কীভাবে আযান প্রবর্তন করা হয়েছিল?]

১. আযানের পরিচয় (تعريف الأذان)
  • আভিধানিক অর্থ: ‘আযান’ (الأَذَانُ) শব্দটি আরবী ‘উযুন’ (أُذُنٌ – কান) বা ‘ইযান’ (إِذَانٌ) মূলধাতু থেকে গৃহীত। এর আভিধানিক অর্থ—ঘোষণা করা, কোনো সংবাদ জনসমক্ষে জানিয়ে দেওয়া বা কান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া।
    কুরআন মাজীদে এসেছে: وَأَذَانٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ (এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি এক সাধারণ ঘোষণা—সূরা আত-তাওবাহ: ৩)।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট ওয়াক্তিয়া ফরয নামাযের সময় শুরু হওয়ার সংবাদ নির্দিষ্ট ও প্রমাণিত কিছু আরবী শব্দমালার মাধ্যমে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করাকে আযান বলা হয়।
    ইমাম নববী (রহ.) বলেন: “আযান হলো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত বিশেষ শব্দাবলির মাধ্যমে নামাযের ওয়াক্ত প্রবেশের সংবাদ প্রদান করা।”
২. আযান প্রবর্তনের সময় ও সন

ইসলামের ইতিহাসে আযান মক্কী যুগে প্রবর্তিত হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন এবং সেখানে মসজিদে নববী নির্মাণ সমাপ্ত হলো, তখন হিজরী প্রথম সনে (১ম হিজরী) আযানের ঐতিহাসিক বিধান শরীয়তসম্মতভাবে প্রবর্তিত হয়।

৩. আযান প্রবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ঘটনা

হাদীস শরীফে আযান প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে:

  1. নামাযের সময় জ্ঞাপনের সমস্যা: মদীনায় মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে মসজিদে জামাআতে একত্রিত হওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। কোনো সুনির্দিষ্ট সংকেত না থাকায় একেকজন একেক সময় আসতেন।
  2. সাহাবীদের পরামর্শ সভা: রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে পরামর্শে বসলেন যে কীভাবে সকল মুসলমানকে একই সাথে নামাযের ওয়াক্তে সমবেত করা যায়।
    • কেউ প্রস্তাব করলেন: খ্রিষ্টানদের মতো ঘণ্টা (নাকূস) বাজানো হোক।
    • কেউ বললেন: ইহুদীদের মতো শিঙা (বূক্ব) ফুঁকা হোক।
    • কেউ বললেন: মজুসীদের মতো কোনো উঁচু স্থানে আগুন জ্বালানো হোক।
    • রাসূলুল্লাহ (সা.) এসব প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন, কারণ এতে বিধর্মীদের ধর্মীয় প্রতীকের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়।
  3. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-এর ঐতিহাসিক স্বপ্ন:
    পরামর্শ সভার পর সেই রাতেই বিশিষ্ট আনসারী সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ ইবনে আবদে রাব্বিহি (রা.) স্বপ্নে দেখতে পেলেন যে, এক ব্যক্তি হাতে একটি ঘণ্টা নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি এটি বিক্রি করবে? লোকটি জিজ্ঞাসা করল, তুমি এটি দিয়ে কী করবে? তিনি বললেন, আমরা এটি বাজিয়ে নামাযের জন্য মানুষদের ডাকব। তখন লোকটি বলল, আমি কি তোমাকে এর চেয়েও উত্তম একটি মাধ্যম শিখিয়ে দেব না? অতঃপর সেই ব্যক্তি বর্তমান আযানের সম্পূর্ণ শব্দমালা উচ্চকণ্ঠে পাঠ করে শুনিয়ে দিলেন এবং পরবর্তীতে ইক্বামতের শব্দমালাও শিখিয়ে দিলেন।
  4. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমোদন ও বিলাল (রা.)-এর আযান:
    সকালবেলা আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে স্বপ্নের কথা বিস্তারিত বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সন্তুষ্ট হয়ে বললেন: إِنَّهَا لَرُؤْيَا حَقٍّ إِنْ شَاءَ اللهُ (ইনশাআল্লাহ এটি একটি সত্য ঐশী স্বপ্ন)। অতঃপর তিনি নির্দেশ দিলেন, “তুমি বিলালের সাথে গিয়ে তাকে এই বাক্যগুলো শিখিয়ে দাও, বিলাল যেন এই বাক্যগুলো দিয়ে আযান দেয়; কারণ বিলালের কণ্ঠ তোমার চেয়েও অধিক উচ্চ ও সুললিত।” হযরত বিলাল (রা.) মদীনার আকাশে সর্বপ্রথম এই সুমধুর আযানের ধ্বনি ছড়িয়ে দেন।
  5. হযরত উমর (রা.)-এর সাক্ষ্য: হযরত বিলালের আযান শুনে হযরত উমর (রা.) নিজের চাদর টানতে টানতে ছুটে আসলেন এবং আরয করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! সেই মহান সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আমিও হুবহু একই স্বপ্ন গতরাতে প্রত্যক্ষ করেছি।” এর ফলে আযানের শরয়ী প্রামাণ্যতা আরও সুদৃঢ় হয়।

٥- عن مالك بن أبي عامر الأنصاري أن عثمان بن عفان كان يقول في خطبته إذا قامت الصلاة فاعتدلوا الصفوف وحاذوا بالمناكب فإن اهتدال الصفوف من تمام الصلاة ثم لا يكبر حتى يأتيه رجال قد وكلهم بتسوية الصفوف فيخبرونه أن قد استوت فكبر-

[৫. মালিক ইবনে আবী আমির আল-আনসারী থেকে বর্ণিত যে, উসমান ইবনে আফফান (রা.) তাঁর খুতবায় বলতেন: “যখন নামায দাঁড়িয়ে যাবে, তখন তোমরা কাতারগুলো সোজা ও সমান করে নাও এবং কাঁধে কাঁধ মেলাও; কারণ কাতার সোজা করা নামাযের পূর্ণতার অংশ।” অতঃপর তিনি তাকবীর বলতেন না যতক্ষণ না এমন ব্যক্তিরা তাঁর কাছে আসত যাদেরকে তিনি কাতার সোজা করার দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন; তারা যখন তাঁকে জানাত যে কাতারসমূহ পুরোপুরি সোজা হয়েছে, তখন তিনি তাকবীর বলে নামায শুরু করতেন।”]

হাদীসের সনদ ও প্রেক্ষাপট

উক্ত হাদীসটি খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর জামাআতের নামাযের শৃংখলা ও কাতার বিন্যাসের অসাধারণ সতর্কতা তুলে ধরে। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) তাঁর মুয়াত্তা-এ ইমাম মালিক সূত্রে এটি সংকলন করেছেন। এখানে বর্ণিত মালিক ইবনে আবী আমির আল-আনসারী ছিলেন ইমাম মালিকের দাদা, যিনি একজন শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ী এবং খলীফা উসমান (রা.)-এর বিশিষ্ট সঙ্গী ছিলেন।

শব্দার্থ ও বিশ্লেষণ

মূল আরবী শব্দ উচ্চারণ অর্থ ও তাৎপর্য
اعْتَدِلُوا الصُّفُوفَ ই’তাদিলুস সুফূফ কাতারগুলো সোজা ও ভারসাম্যপূর্ণ কর।
حَاذُوا بِالمَنَاكِبِ হাযূ বিল মানাকিব কাঁধে কাঁধ সমান্তরালভাবে মেলাও (মানাকিব হলো কাঁধের সংযোগস্থল)।
مِنْ تَمَامِ الصَّلَاةِ মিন ত思議মিস সালাহ নামাযের পরিপূর্ণতার অন্যতম অপরিহার্য উপাদান।
وَكَّلَهُمْ بِتَسْوِيَةِ الصُّفُوفِ ওয়াক্কালাহুম বিতাসবিয়াতিস সুফূফ যাঁদেরকে তিনি কাতার সোজা ও তদারকি করার জন্য কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।

হাদীস থেকে আহরিত শিক্ষণীয় দিকসমূহ

  1. জামাআতের নামাযে ইমামের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নামায শুরু করার পূর্বে মুসল্লীদের কাতার সোজা আছে কি না তা প্রত্যক্ষভাবে নিশ্চিত করা।
  2. খুলাফায়ে রাশেদীন (হযরত উমর ও হযরত উসমান রা.) মসজিদে কাতার ঠিক করার জন্য নির্দিষ্ট লোক নিযুক্ত করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে কাতার সোজা করা শরীয়তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান।
  3. মুসল্লীদের উচিত কাতার সমান করার ব্যাপারে ইমাম ও পরিচালকদের সহযোগিতা করা।

(أ) ما المراد بتسوية الصفوف في الصلاة وما حكمها؟ بين-

[(ক) নামাযে কাতার সোজা করার দ্বারা কী বোঝায় এবং এর শরয়ী বিধান কী? ব্যাখ্যা কর।]

১. কাতার সোজা করার মর্মার্থ (المراد بتسوية الصفوف)

নামাযে ‘তাসবিয়াতুস সুফূফ’ বা কাতার সোজা করার অর্থ কেবল একটি কাল্পনিক লাইনে দাঁড়ানো নয়, বরং এর সাথে কয়েকটি মৌলিক বিষয় জড়িত:

  • কাতারের সরলরেখা বজায় রাখা: কোনো মুসল্লী যেন সামনের দিকে এগিয়ে বা পেছনের দিকে পিছিয়ে না থাকে, বরং সকলের বুক ও পায়ের গোড়ালি যেন একটি নিখুঁত সরলরেখায় থাকে।
  • পারস্পরিক কাঁধে কাঁধ মেলানো: মুসল্লীগণ একে অপরের কাঁধের সাথে কাঁধ সমান্তরাল রাখবেন।
  • ফাঁকা জায়গা বন্ধ করা (سد الخلل): কাতারের মাঝে কোনো অযথা ফাঁকা জায়গা রাখা যাবে না, কারণ হাদীস অনুযায়ী ফাঁকা স্থানে শয়তান প্রবেশ করে মানুষের অন্তরে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে।
  • প্রথম কাতার আগে পূর্ণ করা: প্রথম কাতার সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ না করে পেছনের কাতার শুরু না করা এবং ক্রমানুসারে পেছনের কাতারগুলো সাজানো।
২. কাতার সোজা করার শরয়ী বিধান (حكم تسوية الصفوف)

নামাযে কাতার সোজা করার হুকুম নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে দুটি প্রধান মতামত রয়েছে:

  1. জুমহুর ফুকাহায়ে কিরামের মত (হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও অধিকাংশ হাম্বলী):
    তাঁদের মতে কাতার সোজা করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (سنة مؤكدة), যা ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ। কাতার সোজা না করলে নামায বাতিল বা ফাসিদ হবে না, তবে মুসল্লীগণ সুন্নাত বর্জনের কারণে মারাত্মক গুনাহগার হবেন এবং নামাযের সওয়াব বহুলাংশে হ্রাস পাবে। তাঁদের দলীল হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী: “কাতার সোজা করা নামাযের পরিপূর্ণতার অংশ।” পরিপূর্ণতা থাকা কোনো ফরয বা রুকন হওয়ার দলীল নয়।
  2. ইমাম বুখারী, ইবনে হাযম ও ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মত:
    তাঁদের মতে কাতার সোজা করা ওয়াজিব (واجب) এবং কাতার বাঁকা রাখা সম্পূর্ণরূপে হারাম। ইমাম বুখারী (রহ.) তাঁর সহীহ গ্রন্থে অধ্যায় রচনা করেছেন— ‘বাবো ইসমি মান লাম ইউতাম্মাস সুফূফ’ (যে কাতার সোজা করে না তার গুনাহের অধ্যায়)।
    তাঁদের দলীল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরশাদ করেছেন:
    لَتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ-
    “তোমরা অবশ্যই তোমাদের কাতারগুলো সোজা করবে, অন্যথায় আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারার (বা অন্তরের) মাঝে বৈপরিত্য ও অনৈক্য সৃষ্টি করে দেবেন।” (সহীহ বুখারী: ৭১৭)। শরীয়তের মূলনীতি হলো, যার বর্জনে শাস্তির হুমকি আসে তা ওয়াজিব।
৩. কাতার সোজা করার সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সুফল
  • সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অনুপম দৃষ্টান্ত: রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্রের কৃত্রিম সামাজিক প্রাচীর ভেঙে সবাই একই কাতারে পাশাপাশি দাঁড়ায়।
  • আত্মিক একাগ্রতা বৃদ্ধি: বাহ্যিক শৃঙ্খলা মানুষের অন্তর্জগতে শৃঙ্খলা ও খুশু-খুযু আনয়ন করে।
  • উম্মাহর সার্বিক ঐক্য: পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা মুসলমানদের পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে অটুট বন্ধনে আবদ্ধ করে।

٦- عن عبد الله بن عمر رضى الله عنهما قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا افتتح الصلاة رفع يديه حذاء منكبيه وإذا كبر للركوع رفع يديه وإذا رفع رأسه من الركوع رفع يديه ثم قال سمع الله لمن حمده ثم قال ربنا لك الحمد-

[৬. আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামায শুরু করতেন, তখন কাঁধ বরাবর দু’ হাত তুলতেন; আর যখন রুকুর জন্য তাকবীর বলতেন তখন দু’ হাত তুলতেন; আবার যখন রুকু থেকে মাথা তুলতেন তখন দু’ হাত তুলতেন এবং বলতেন: ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’, অতঃপর বলতেন: ‘রব্বানা লাকাল হামদ’।” ]

হাদীসের পটভূমি ও অনুবাদ

উক্ত হাদীসটি নামাযে রফউল ইয়াদায়ন (হাত তোলা)-এর অন্যতম মৌলিক ও প্রামাণ্য হাদীস, যা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে ইমাম মালিক এবং ইমাম মালিক থেকে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামাযের তিনটি স্থানে হাত তোলার বিবরণ এসেছে: (১) তাকবীরে তাহরীমার সময়, (২) রুকুতে যাওয়ার সময়, এবং (৩) রুকু থেকে ওঠার সময়।

মূল আরবী শব্দ উচ্চারণ অর্থ ও তাৎপর্য
افْتَتَحَ الصَّلَاةَ ইফতাহাতাস সালাহ নামায শুরু করতেন (তাকবীরে তাহরীমা বলতেন)।
حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ হাযওয়া মানকিবাঈহি উভয় কাঁধের সমান্তরাল করে।
كَبَّرَ لِلرُّكُوعِ কাব্বারা লির-রুকূ’ রুকুতে যাওয়ার জন্য আল্লাহু আকবার বলতেন।
رَفَعَ رَأْسَهُ রাফা’আ রা’সাহু রুকু থেকে স্বীয় মাথা উত্তোলন করতেন।

(أ) ما الإختلاف بين الأئمة في رفع اليدين في الصلاة؟ بين مع الأدلة-

[(ক) নামাযে রফউল ইয়াদায়ন (হাত তোলা) করার ব্যাপারে ইমামগণের মাঝে কী মতভেদ রয়েছে? দলীলসহ বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

১. তাকবীরে তাহরীমায় হাত তোলার ব্যাপারে ঐকমত্য (الإجماع على التكبيرة الأولى)

উম্মাহর সকল ফকীহ ও ইমাম একমত যে, নামাযের শুরুতে তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় উভয় হাত ওঠানো সুন্নাত। এতে কোনো ইমামের দ্বিমত নেই।

২. রুকুতে যাওয়া ও ওঠার সময় রফউল ইয়াদায়নের মতভেদ

নামাযের মধ্যে রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে ওঠার সময় হাত ওঠানো হবে কি হবে না—এ বিষয়ে আইম্মায়ে মুজতাহিদগণের মাঝে দুটি মূল দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:

মাযহাব ও ইমামগণ তাঁদের ফিকহী অবস্থান ও মূল যুক্তি প্রদর্শিত প্রধান দলীলসমূহ
১. শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব
(ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ রহ.)
তাকবীরে তাহরীমার মতো রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে সোজা হয়ে ওঠার সময়ও উভয় হাত ওঠানো সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ ও অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ।
  • হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর আলোচ্য হাদীস (সহীহ বুখারী: ৭৩৫)।
  • হযরত মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস (রা.) বর্ণিত হাদীস, রাসূলুল্লাহ (সা.) রুকুতে যেতে এবং রুকু থেকে মাথা তুলতে হাত তুলতেন (সহীহ মুসলিম: ৩৯১)।
২. হানাফী মাযহাব ও ইমাম মালিকের মশহুর মত
(ইমাম আবু হানীফা, সুফিয়ান সাওরী ও মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েত)
নামাযের শুরুতে তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে হাত তোলা সুন্নাত নয়; বরং পুরো নামাযে স্থিরতা ও একাগ্রতা বজায় রেখে হাত না তোলাই উত্তম ও স্থায়ী সুন্নাত।
  • হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) বর্ণিত হাদীস:
    أَلَا أُصَلِّي بِكُمْ صَلَاةَ رَسُولِ اللهِ؟ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلَّا فِي أَوَّلِ مَرَّةٍ-
    “আমি কি তোমাদের রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামায পড়ে দেখাব না? অতঃপর তিনি নামায পড়লেন এবং প্রথমবার ছাড়া আর হাত তুললেন না।” (সুনানে তিরমিযী: ২৫৭, সুনানে নাসাঈ: ১০২৬ – ইমাম তিরমিযী একে হাসান সহীহ বলেছেন)।
  • হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর হাদীস: “রাসূলুল্লাহ (সা.) নামায শুরুর সময় হাত তুলতেন, এরপর আর পুনরাবৃত্তি করতেন না।” (সুনানে আবু দাউদ: ৭৭৮)।
  • হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে এসে আমাদের হাত নাড়তে দেখে বললেন, “তোমাদের কী হলো যে তোমরা অবাধ্য ঘোড়ার লেজের মতো হাত নাড়ছ? নামাযে স্থিরতা অবলম্বন কর।” (সহীহ মুসলিম: ৪৩০)।
৩. মতভেদের কারণ ও সমন্বয় (سبب الخلاف والترجيح)

মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের বিশ্লেষণে দেখা যায়, উভয় পক্ষের নিকটই সহীহ হাদীসের দলীল রয়েছে:

  • হানাফী ফকীহগণের মতে, রফউল ইয়াদায়ন ইসলামের প্রাথমিক যুগে ব্যাপকভাবে চালু ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে নামাযে পূর্ণাঙ্গ একাগ্রতা ও স্থিরতা (سكون الصلاة) কায়েম করার লক্ষ্যে তা কেবল তাকবীরে তাহরীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা হয়। এ কারণেই কুফার ফকীহ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ এবং খলীফা হযরত আলী (রা.) পরবর্তীতে প্রথমবার ছাড়া হাত তুলতেন না।
  • শাফেয়ী ফকীহগণের মতে, রফউল ইয়াদায়নের হাদীস অধিক রাবী দ্বারা বর্ণিত হওয়ায় তা আমলযোগ্য।

উপসংহার: এটি ফিকহী ইজতিহাদের একটি গৌণ শাখা-প্রশাখাগত (ফুরূয়ী) মতভেদ। উম্মাহর চার মাযহাবের কোনো ইমামই অপর ইমামকে ভুল বা বিদআতী বলেননি। যিনি রফউল ইয়াদায়ন করবেন তাঁর নামাযও সুন্নাহ অনুযায়ী সহীহ, আর যিনি করবেন না তাঁর নামাযও সাহাবায়ে কিরামের সুন্নাহ অনুযায়ী সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ।


مجموعة (ج) — شعب الإيمان للبيهقي (গ বিভাগ: শুআবুল ঈমান লিল বায়হাকী)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰ (ترجم الأحاديث ثم أجب عن الأسئلة الملحقة)


٧- عن أبي هريرة رضى الله عنه عن النبى صلى الله عليه و سلم قال : الإيمان بضع وستون شعبة والحياء من الإيمان-

عن أبي هريرة رضى الله عنه عن النبى صلى الله عليه وسلم الإيمان بضع وستون أو سبعون شعبة فأرفعها قول لا اله إلا الله وأدناها إماطة الأذى عن الطريق والحياء شعبة من الإيمان-

[৭. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ঈমানের ষাটটিরও অধিক শাখা রয়েছে এবং লজ্জা হলো ঈমানের অন্যতম শাখা।” অপর এক বর্ণনায় আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ঈমানের ষাট বা সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে; তার মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা, আর লজ্জা হলো ঈমানের একটি বিশেষ শাখা।”]

হাদীসের পটভূমি ও কিতাব পরিচিতি

উক্ত হাদীসটি ইমাম আহমদ ইবনুল হুসাইন আল-বায়হাকী (রহ.) তাঁর কালজয়ী সংকলন ‘শুআবুল ঈমান’-এর মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রন্থের সূচনাতেই সংকলন করেছেন। এই হাদীসের ওপর ভিত্তি করেই তিনি ঈমানের ৭৭টি শাখাকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিতভাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন।

শব্দার্থ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

মূল আরবী শব্দ উচ্চারণ অর্থ ও তাৎপর্য
بِضْعٌ বিদ’উন আরবী সংখ্যাতত্ত্বে তিন থেকে নয় (৩-৯) পর্যন্ত অনির্দিষ্ট সংখ্যাকে বোঝায়।
شُعْبَةٌ শু’বাহ (বহুবচনে শু’আব) বৃক্ষের ডালপালা, শাখা-প্রশাখা বা কোনো সামগ্রিক জিনিসের অংশবিশেষ।
الحَيَاءُ আল-হায়া লজ্জাশীলতা, যা মানুষকে পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং ন্যায়ের পথে পরিচালিত করে।
إِمَاطَةُ الأَذَى ইমাত্বাতুল আযা রাস্তা বা মানুষের চলাচলের পথ থেকে কাঁটা, পাথর, ময়লা বা কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।

হাদীসের অন্তর্নিহিত বার্তা

  1. ঈমান কেবল একটি নির্জীব বিশ্বাসের নাম নয়, বরং ঈমান হলো একটি বিশাল মহীরুহ যার মূল ভিত্তি অন্তরের বিশ্বাস এবং যার অসংখ্য ডালপালা মানবজীবনের বিভিন্ন কল্যাণকর কাজের মধ্যে বিস্তৃত।
  2. ঈমানের সর্বোচ্চ শিখর হলো তাওহীদের কালেমা ঘোষণা এবং সর্বনিম্ন স্তর হলো মানবকল্যাণমূলক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজ (যেমন পথ থেকে কাঁটা সরানো)। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে জনকল্যাণমূলক সামাজিক কাজও ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

(أ) ما معنى الإيمان لغة وشرعًا؟ بين التوافق بين الحديثين المعارضين-

[(ক) ঈমানের আভিধানিক ও শরয়ী অর্থ কী? আপাত বিরোধপূর্ণ হাদীসদ্বয়ের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় সাধন করবে? বর্ণনা কর।]

১. ঈমানের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ (تعريف الإيمان)
  • আভিধানিক অর্থ: ‘ঈমান’ (الإِيمَانُ) শব্দটি বাবে ইফআল-এর মাসদার, যার মূলধাতু ‘আমনুন’ (أَمْنٌ – প্রশান্তি, নিরাপত্তা লাভ করা)। আভিধানিকভাবে ঈমান অর্থ হলো—তাসদীক্ব (التصديق) বা সত্য বলে স্বীকার করা, অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা এবং দ্বিধাহীন চিত্তে কোনো বিষয় মেনে নেওয়া।
    কুরআনে এসেছে: وَمَا أَنتَ بِمُؤْمِنٍ لَّنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ (আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী হই—সূরা ইউসুফ: ১৭)।
  • শরয়ী পারিভাষিক অর্থ: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত সংজ্ঞা হলো:

    الإِيمَانُ قَوْلٌ بِاللِّسَانِ، وَتَصْدِيقٌ بِالجَنَانِ، وَعَمَلٌ بِالأَرْكَانِ

    “ঈমান হলো মুখে উচ্চারণ ও স্বীকারোক্তি, অন্তরে অকাট্য সত্যায়ন ও বিশ্বাস, এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা তা বাস্তবে প্রয়োগ ও আমল করা।”

    রাসূলুল্লাহ (সা.) যা কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন তা অন্তরে বিনাদ্বিধায় সত্য বলে বিশ্বাস করা এবং আনুগত্যের সাথে তা জীবনে বাস্তবায়ন করার নামই ঈমান। নেক আমল দ্বারা ঈমানের নূর বৃদ্ধি পায় এবং পাপাচারের কারণে তা হ্রাস পায়।

২. হাদীসদ্বয়ের আপাত বিরোধ (تعارض الروايتين)

প্রশ্নোল্লিখিত প্রথম বর্ণনায় বলা হয়েছে: الإيمان بضع وستون شعبة (ঈমানের শাখা হলো ষাটটির কিছু বেশি—অর্থাৎ ৬৩ থেকে ৬৯টি)।
পক্ষান্তরে দ্বিতীয় বর্ণনায় এসেছে: بضع وستون أو سبعون شعبة (ঈমানের শাখা হলো ষাট বা সত্তরের কিছু বেশি—অর্থাৎ ৭৩ থেকে ৭৯টি)।
বাহ্যত এই দুই সংখ্যার মাঝে বিরোধ দেখা যায় যে, প্রকৃত শাখা সংখ্যা কি ষাটের কোটায় নাকি সত্তরের কোটায়?

৩. আপাত বিরোধ নিরসন ও সমন্বয় সাধন (التوفيق بين الروايتين)

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.), ইমাম বায়হাকী (রহ.) এবং কাজীয়াজ (রহ.) অত্যন্ত চমৎকারভাবে এই বিরোধ নিরসন করেছেন:

  1. অতিরিক্ত বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা (زيادة الثقة مقبولة): হাদীসশাস্ত্রের মূলনীতি হলো, বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর অতিরিক্ত তথ্য বা সংখ্যা বৃদ্ধি সর্বাগ্রে গ্রহণযোগ্য। সহীহ মুসলিমের নির্ভরযোগ্য বহু সনদে কোনো সন্দেহ ছাড়া নিশ্চিতভাবে ‘বিদউন ওয়া সাবঊন’ (সত্তরের অধিক) বর্ণিত হয়েছে। অতএব সত্তরের সংখ্যাটি অধিকতর প্রামাণ্য।
  2. আধিক্য বা প্রাচুর্য প্রকাশ (إرادة التكثير لا التحديد): আরবী ভাষা ও অলঙ্কারশাস্ত্রে ‘সাবঈন’ (৭০) সংখ্যাটি অনেক সময় সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ গণনা বোঝানোর জন্য নয়, বরং কোনো বিষয়ের ব্যাপকতা, আধিক্য ও প্রাচুর্য প্রকাশ করার জন্য রূপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন কুরআনে এসেছে: “তুমি যদি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।” এখানে উদ্দেশ্য সত্তর সংখ্যা নয়, বরং বারবার বোঝানো। সুতরাং হাদীসে ঈমানের অসংখ্য মহৎ শাখাকে বোঝানোই মূল উদ্দেশ্য।
  3. পর্যায়ক্রমিক ওহীর জ্ঞানদান (إعلام بالتدريج): রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আল্লাহ তাআলা প্রথমে ওহীর মাধ্যমে ঈমানের ষাটোর্ধ্ব প্রধান শাখা সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে আরও কিছু শাখা সম্পর্কে তাঁকে অবগত করেন যা মিলিয়ে সংখ্যাটি সত্তরের ঊর্ধ্বে পৌঁছায়। সুতরাং দুই সময়ের বর্ণনায় কোনো বিরোধ নেই, বরং এটি তথ্যের পর্যায়ক্রমিক পূর্ণতা।

٨- عن أبي هريرة رضى الله عنه أن النبى صلى الله عليه وسلم قال: أكمل المؤمنين إيمانًا أحسنهم خلقًا-

[৮. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুমিনদের মাঝে ঈমানের দিক থেকে সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ মুমিন হলো সে ব্যক্তি, যে তাদের মধ্যে সর্বাধিক উত্তম চরিত্রের অধিকারী।”]

হাদীসের সনদ ও মূল বক্তব্য

উক্ত হাদীসটি সুনানে তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ এবং ইমাম বায়হাকীর শুআবুল ঈমান-এ বর্ণিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে মানুষের ঈমান এবং তার আখলাক বা চরিত্রের মাঝে এক নিবিড় আত্মিক বন্ধন রয়েছে। যার চরিত্র যত বেশি নিষ্কলুষ ও সুন্দর, আল্লাহর দরবারে তার ঈমান তত বেশি পরিপক্ব ও কামেল।

শব্দার্থ ও বিশ্লেষণ

  • أَكْمَلُ المُؤْمِنِينَ (আকমালুল মু’মিনীন): ঈমানদারগণের মধ্যে সবচেয়ে পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী ব্যক্তি।
  • أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا (আহসানুহুম খুলুক্বা): স্বভাব-চরিত্রে, আচরণে ও মানবিক গুণাবলিতে যে ব্যক্তি সবার চেয়ে উৎকৃষ্ট।

(أ) ما هو الخلق الحسن؟ بين بعض أوصافه-

[(ক) সচ্চরিত্র (الخلق الحسن) কাকে বলে? এর কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি বর্ণনা কর।]

১. সচ্চরিত্রের পরিচয় (تعريف الخلق الحسن)
  • শাব্দিক অর্থ: ‘খুলুক্ব’ (خُلُق) শব্দের অর্থ স্বভাব, চরিত্র, মানসিকতা ও মানবীয় আচরণ।
  • পারিভাষিক অর্থ: ইমাম আল-গাযালী (রহ.) ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে বলেন: “খুলুক্ব হলো মানুষের অন্তরাত্মায় প্রোথিত এমন এক স্থায়ী স্বভাব ও মানসিক শক্তি, যার মাধ্যমে কোনো প্রকার কৃত্রিম চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তম ও প্রশংসনীয় কার্যাবলি প্রকাশিত হয়।”
  • আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)-এর বিখ্যাত উক্তি:

    هُوَ بَسْطُ الوَجْهِ، وَبَذْلُ المَعْرُوفِ، وَكَفُّ الأَذَى

    “সচ্চরিত্র হলো মানুষের সাথে প্রফুল্ল ও হাস্যোজ্জ্বল মুখে সাক্ষাৎ করা, অকাতরে মানুষের কল্যাণ ও দান-সদকায় আত্মনিয়োগ করা, এবং কাউকে কোনো কষ্ট না দেওয়া।”

২. সচ্চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি (أوصاف الخلق الحسن)

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে উত্তম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

  1. সত্যবাদিতা ও আমানতদারী (الصدق والأمانة): সদা সত্য কথা বলা এবং মানুষের ধন-সম্পদ, গোপনীয়তা ও অঙ্গীকারের শতভাগ বিশ্বস্ততা রক্ষা করা।
  2. ক্রোধ সংবরণ ও ক্ষমাশীলতা (كظم الغيظ والعفو): চরম উত্তেজনার মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অপরকে ক্ষমা করে দেওয়া। আল্লাহ বলেন: “যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)।
  3. বিনম্রতা ও কোমলতা (التواضع والرفق): অহংকার ও আত্মম্ভরিতা পরিহার করে ছোট-বড় সবার সাথে বিনয়ী আচরণ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “যে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন।”
  4. ধৈর্য ও অবিচলতা (الصبر والثبات): বিপদ-আপদে হা-হুতাশ না করে আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রতিকূল পরিবেশেও ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকা।
  5. লজ্জাশীলতা (الحياء): যাবতীয় নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা ও গর্হিত কাজ থেকে নিজেকে সংবরণ করা। হাদীসে এসেছে: “লজ্জা কেবল কল্যাণই বয়ে আনে।”
  6. প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ ও পরোপকার: জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতি সচেতন থাকা।
৩. ইসলামে সচ্চরিত্রের অনন্য মর্যাদা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلَاقًا-
“কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থানের অধিকারী হবে সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।” (সুনানে তিরমিযী: ২০১৮)। কিয়ামতের দিন মীযানের পাল্লায় সচ্চরিত্রের চেয়ে ভারী কোনো আমল থাকবে না।


٩- عن أبي هريرة رضى الله عنه أن النبى صلى الله عليه وسلم قال: اجتنبوا السبع الموبقات قالو يا رسول الله صلى الله عليه وسلم وما هن؟ قال الشرك بالله والسحر وقتل النفس التى حرم الله إلا بالحق وأكل الربا وأكل مال اليتيم والتولى يوم الزحف وقذف المحصنات المؤمنات الغافلات- (رواه البخارى)

[৯. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক মহাপাপ থেকে বেঁচে থাকো।” সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী কী? তিনি বললেন: “আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, আল্লাহ যে জীবন হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের মাল ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং সরলমনা সতী-সাধ্বী মুমিন নারীর ওপর ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া।” (সহীহ বুখারী)]

হাদীসের পটভূমি ও সাতটি ধ্বংসাত্মক অপরাধের বিবরণ

উক্ত হাদীসটি সহীহ বুখারী (কিতাবুল ওয়াসায়া ও কিতাবুল হুদূদ) এবং সহীহ মুসলিমে সংকলিত হয়েছে। হাদীসে উল্লিখিত ‘মু’বিক্বাত’ (الموبقات) শব্দের অর্থ ধ্বংসকারী মহাপাপ। এই সাতটি অপরাধ মানবসমাজের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক অস্তিত্বকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়:

  1. আল্লাহর সাথে শিরক (الشرك بالله): সবচেয়ে বড় অপরাধ ও ক্ষমার অযোগ্য জুলুম।
  2. যাদুবিদ্যা (السحر): শয়তানী উপায়ে মানুষের ক্ষতিসাধন ও ঈমান বিধ্বংসী কুফরী কর্ম।
  3. অন্যায়ভাবে নরহত্যা (قتل النفس بغير حق): নিরপরাধ মানুষের জীবন হরণ করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য মহাপাপ।
  4. সুদ ভক্ষণ (أكل الربا): অর্থনৈতিক শোষণ ও জুলুমের চরম হাতিয়ার, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল।
  5. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ (أكل مال اليتيم): দুর্বল ও অসহায়ের হক নষ্ট করে পেটে আগুন পুরে নেওয়ার সমতুল্য অপরাধ।
  6. যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন (التولي يوم الزحف): জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সংকটে দেশ ও দ্বীনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।
  7. পবিত্রা নারীর ওপর অপবাদ (قذف المحصنات): নারীর সম্মানহানি ও সমাজে ব্যভিচারের মিথ্যা গুজব রটানো।

(أ) ما الكبائر وما حكم ارتكاب الكبيرة؟ بين-

[(ক) কবীরা গুনাহ (الكبائر) কী এবং কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির শরয়ী হুকুম কী? বিস্তারিত বর্ণনা কর।]

১. কবীরা গুনাহের সংজ্ঞা ও পরিচয় (تعريف الكبائر)
  • শাব্দিক অর্থ: ‘কাবীরাহ’ (كبيرة) শব্দটি ‘কাবীর’ (كبير)-এর স্ত্রীলিঙ্গ রূপ, বহুবচনে ‘কাবায়ির’ (الكبائر)। এর অর্থ বড় অপরাধ বা মহাপাপ।
  • পারিভাষিক সংজ্ঞা: মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ কবীরা গুনাহের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন:
    • হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সংজ্ঞা: যে সকল পাপাচারের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে জাহান্নামের শাস্তির ঘোষণা, আল্লাহর গজব, অভিশাপ (লা’নত) অথবা দুনিয়াতে শরয়ী হদ (নির্দিষ্ট দণ্ডবিধি) ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিই কবীরা গুনাহ।
    • ইমাম যাহাবী (রহ.) ও ইবনে হাজার হাইসামী (রহ.): যেকোনো স্পষ্ট হারাম কাজ যা শরীয়তের অকাট্য দলীল দ্বারা নিষিদ্ধ এবং যার প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে তা-ই কাবীরাহ।
২. কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির শরয়ী হুকুম (حكم مرتكب الكبيرة)

কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ঈমান ও পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন ফিরক্বার মাঝে ঐতিহাসিক মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল:

দল ও সম্প্রদায় দুনিয়াতে তার ঈমানের হুকুম আখিরাতে তার পরকালীন পরিণতি
১. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত
(সাহাবা, তাবেয়ীন ও চার মাযহাবের মূলধারা)
সে ব্যক্তি ঈমানহারা বা কাফির হয় না; বরং সে একজন ‘ফাসিক্ব মুমিন’ বা ত্রুটিপূর্ণ মুমিন। তার মূল ঈমান অবশিষ্ট থাকে, তবে ঈমানের পূর্ণতা নষ্ট হয়। যদি সে তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। আল্লাহ চাইলে স্বীয় অনুগ্রহে তাকে ক্ষমা করে সরাসরি জান্নাত দিতে পারেন, অথবা কৃত পাপের অনুপাতে জাহান্নামে শাস্তি দেওয়ার পর অবশেষে ঈমানের বদৌলতে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। সে কখনোই কাফিরদের মতো চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না।
২. খারেজী সম্প্রদায় (الخوارج) তাদের চরমপন্থী আকীদা অনুযায়ী, কবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি সাথে সাথে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যায়। আখিরাতে সে অন্যান্য কাফিরদের মতোই চিরকাল জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে, তার কোনো মুক্তি নেই।
৩. মু’তাযিলা সম্প্রদায় (المعتزلة) তাদের মতে সে মুমিনও নয়, কাফিরও নয়; বরং ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি একটি স্বতন্ত্র স্তরে অবস্থানকারী (مَنْزِلَةٌ بَيْنَ المَنْزِلَتَيْنِ)। খারেজীদের মতো তারাও বিশ্বাস করে যে, তাওবা ছাড়া মারা গেলে সে কিয়ামতের দিন চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে, কখনো জান্নাতে যাবে না।
৩. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক দলীল
  • কুরআন মাজীদের অকাট্য আয়াত: আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন—
    إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
    “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্য যে কোনো পাপ তিনি যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আন-নিসা: ৪৮)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে শিরক ব্যতীত অন্য কবীরা গুনাহ ক্ষমাযোগ্য, যা খারেজী ও মুতাযিলাদের বাতিল মতবাদকে খণ্ডন করে।
  • হত্যাকারীকে ‘ভাই’ সম্বোধন: কিসাসের আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী (যা জঘন্য কবীরা গুনাহ) ও নিহতের অভিভাবককে পরস্পর দ্বীনী ভাই উল্লেখ করে বলেছেন: فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ (অতএব যার জন্য তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কিছু ক্ষমা করা হয়—সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৭৮)। যদি কবীরা গুনাহে ঈমান নষ্ট হয়ে যেত তবে আল্লাহ তাকে মুমিন ভাই বলতেন না।
  • রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত: নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
    شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي
    “আমার শাফাআত হবে আমার উম্মতের কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের জন্য।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৩৯, সুনানে তিরমিযী: ২৪৩৬)। কাফিরদের জন্য শাফাআত নেই; অতএব কবীরা গুনাহকারী উম্মতেরই অংশ।

مجموعة (د) (ঘ বিভাগ: সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ ও কিতাব পরিচিতি)

الدرجات — ۱۰ × ۲ = ۲۰


١٠- أكتب مقالة عن ترجمة الإمام مالك مع ذكر خصائص كتابه الموطأ-

[১০. ইমাম মালিক (রহ.)-এর জীবনী এবং তাঁর সংকলিত ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করে একটি প্রবন্ধ রচনা কর।]

ভূমিকা

ইসলামী হাদীস ও ফিকহশাস্ত্রের ইতিহাসে ইমাম দারিল হিজরাহ, সাইয়্যিদুশ শুয়ূখ ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) এক অবিস্মরণীয় ও উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তিনি ছিলেন হাদীস সংকলনের স্বর্ণযুগের প্রধান স্থপতি এবং চার প্রসিদ্ধ মাযহাবের অন্যতম মালেকী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্মৃতিবিজড়িত মদীনা মুনাওয়ারার সার্বিক ইলমী ঐতিহ্যকে তিনি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-মুয়াত্তা’-এর মাধ্যমে অমর করে রেখেছেন। নিম্নে তাঁর পুণ্যময় জীবনচরিত এবং ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

ইমাম মালিক (রহ.)-এর জীবনচরিত (ترجمة الإمام مالك)

১. নাম, বংশপরিচয় ও জন্ম

তাঁর নাম মালিক, উপনাম আবু আবদুল্লাহ, এবং উপাধি ‘ইমামু দারিল হিজরাহ’ (মদীনার ইমাম) ও ‘শায়খুল ইসলাম’। তাঁর পূর্ণ বংশপরম্পরা হলো—মালিক ইবনে আনাস ইবনে মালিক ইবনে আবী আমির ইবনে আমর আল-আসবাহী আল-মাদানী। তিনি ইয়েমেনের বিখ্যাত আসবাহ গোত্রের সন্তান ছিলেন। তিনি ৯৩ হিজরীতে (৭১১ খ্রিষ্টাব্দে) ইসলামের প্রথম রাজধানী পুণ্যভূমি মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন।

২. শিক্ষা লাভ ও প্রখ্যাত উস্তাদবৃন্দ

তিনি মদীনার ইলমী পরিবেশে লালিত-পালিত হন। বাল্যকালেই তিনি হিফযুল কুরআন সম্পন্ন করেন এবং তৎকালীন মদীনার শীর্ষস্থানীয় আলিমদের সান্নিধ্যে হাদীস ও ফিকহশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর উস্তাদগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:

  • হযরত নাফে’ মাওলা ইবনে উমর (রহ.)—যাঁর সাথে ইমাম মালিকের সনদকে মুহাদ্দিসগণ ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ (স্বর্ণালী সনদ) আখ্যা দিয়েছেন।
  • ইমাম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (রহ.)—যিনি প্রাথমিক যুগের অন্যতম প্রধান হাদীস সংগ্রাহক।
  • রাবীআতুর রায় (রহ.)—তৎকালীন মদীনার প্রধান ফকীহ ও যুক্তিবিদ।
  • ইমাম আবুয যিনাদ এবং ইমাম হিশাম ইবনে উরওয়াহ (রহ.)।
৩. অধ্যাপনা ও দরসের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা

ইমাম মালিক (রহ.) নিজে বর্ণনা করেন: “মদীনার সত্তর জন বিজ্ঞ আলিম যতক্ষণ না সাক্ষ্য দিলেন যে আমি ফতোয়া ও অধ্যাপনার যোগ্য, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি মসজিদে নববীতে দরসের মসনদে বসিনি।” তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের প্রতি এত গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন যে, কখনো বিনা ওযূতে হাদীস বর্ণনা করতেন না। দরসে বসার পূর্বে গোসল করতেন, সর্বোৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করতেন এবং উন্নত সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।

৪. চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ওফাত

তিনি ছিলেন চরম সত্যাশ্রয়ী ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব। জবরদস্তিমূলক তালাকের মাসআলায় আব্বাসীয় খলীফার অন্যায় আদেশের বিরোধিতা করায় তাঁকে নির্মম শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়, তবুও তিনি হকের ওপর অটল ছিলেন। অবশেষে ১৭৯ হিজরীর ১৪ই রবিউল আউয়াল (৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) ৮৬ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ওফাত পান এবং ঐতিহাসিক জান্নাতুল বাক্বীতে সমাহিত হন।

‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص كتاب الموطأ)

‘আল-মুয়াত্তা’ (المُوَطَّأُ) হলো ইসলামের ইতিহাসে বিষয়ভিত্তিক প্রথম প্রামাণ্য ও সুসংবদ্ধ হাদীস-ফিকহ গ্রন্থ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

বৈশিষ্ট্যের শিরোনাম বিস্তারিত বিবরণ ও বিশ্লেষণ
১. নামকরণের তাৎপর্য ‘মুয়াত্তা’ শব্দের অর্থ সুগমকৃত, বিন্যস্ত বা যা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত। ইমাম মালিক বলেন: “আমি এ গ্রন্থটি সংকলন করার পর মদীনার ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় ফকীহর সামনে উপস্থাপন করেছিলাম; তাঁরা সকলেই এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে একমত (ওয়া ত্বা-আনী) হয়েছিলেন, তাই এর নাম রেখেছি আল-মুয়াত্তা।”
২. দীর্ঘ ৪০ বছরের গভীর গবেষণা ইমাম মালিক (রহ.) এই গ্রন্থটি সংকলন ও পুনর্বিবেচনায় দীর্ঘ ৪০ বছর ব্যয় করেন। প্রায় এক লক্ষ হাদীস যাচাই-বাছাই করে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সর্বাধিক বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতগুলো এতে সন্নিবেশিত করেন।
৩. সিলসিলাতুয যাহাব (স্বর্ণালী সনদ) হাদীসশাস্ত্রের পরিভাষায় সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সনদ হলো: ‘মালিক — আন নাফে’ — আন ইবনে উমর — আনিন নাবী (সা.)’। মুয়াত্তার একটি বড় অংশ এই অতুলনীয় সনদে সমৃদ্ধ।
৪. হাদীস ও ফিকহের অপূর্ব সমন্বয় মুয়াত্তা কেবল সাধারণ হাদীসের কিতাব নয়; বরং এটি হাদীস ও ফিকহের এক অনুপম মিলনমেলা। এতে মারফূ হাদীসের পাশাপাশি সাহাবায়ে কিরামের ফতোয়া (মাওকূফ), তাবেয়ীগণের আসার (মাক্বতূ) এবং মদীনার সার্বিক আমল (আমালু আহলিল মাদীনাহ) চমৎকারভাবে সুবিন্যস্ত।
৫. উম্মাহর ঐতিহাসিক স্বীকৃতি সহীহ বুখারী রচনার পূর্বে এটিই ছিল মুসলিম উম্মাহর সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য কিতাব। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ঐতিহাসিক উক্তি করেছেন:
مَا بَعْدَ كِتَابِ اللَّهِ كِتَابٌ أَصَحُّ مِنْ كِتَابِ مَالِكٍ-
“আল্লাহর কিতাব (কুরআন মাজীদ)-এর পর যমীনের বুকে ইমাম মালিকের মুয়াত্তা অপেক্ষা অধিক বিশুদ্ধ আর কোনো গ্রন্থ নেই।”

١١- اكتب نبذة من حياة الإمام محمد بن الحسن مع بيان مزايا كتابه الموطأ-

[১১. ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং তাঁর ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

হানাফী মাযহাবের মূল ভিত্তি সংকলক, ইসলামী আইনের প্রবাদপ্রতিম মুজতাহিদ এবং ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.)-এর অন্যতম প্রধান সহচর হলেন ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (রহ.)। তিনি একদিকে যেমন কুফার আহলুর রায় (যুক্তিনির্ভর ফিকহ)-এর শীর্ষ রূপকার ছিলেন, অপরদিকে মদীনায় ইমাম মালিকের পদপ্রান্তে বসে আহলুল হাদীসের জ্ঞান আহরণ করে উভয় ধারার মাঝে এক অপূর্ব ঐতিহাসিক সেতু বন্ধন রচনা করেছিলেন। নিম্নে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাঁর রচিত ‘মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ’-এর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো।

ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

  • নাম ও বংশপরিচয়: তাঁর নাম মুহাম্মদ, পিতার নাম আল-হাসান। তিনি বনু শায়বান গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বিধায় তাঁকে ‘আশ-শায়বানী’ বলা হয়। তাঁর উপনাম ছিল আবু আবদুল্লাহ।
  • জন্ম ও শৈশব: তিনি ১৩১ বা ১৩২ হিজরীতে (৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইরাকের ওয়াসিত নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং কুফায় প্রতিপালিত হন।
  • ইলম অর্জন ও উস্তাদবৃন্দ: তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.)-এর মজলিসে যোগ দেন এবং তাঁর ওফাত পর্যন্ত তাঁর সান্নিধ্যে থাকেন। এরপর তিনি ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর অধীনে ফিকহ শাস্ত্রে পূর্ণতা লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় গমন করেন এবং ইমাম মালিক (রহ.)-এর দরবারে তিন বছরেরও বেশি সময় অবস্থান করে তাঁর কাছ থেকে সরাসরি সম্পূর্ণ ‘মুয়াত্তা’ শ্রবণ ও অধ্যয়ন করেন।
  • গ্রন্থ রচনা ও অবদান: হানাফী মাযহাবের প্রায় সকল মৌলিক গ্রন্থ ইমাম মুহাম্মদের কলম থেকেই রচিত। বিশেষত ‘যাহিরুর রেওয়ায়াহ’ (ظاهر الرواية)-এর ছয়টি মৌলিক কিতাব (আল-মাবসূত, আল-জামি’উস সাগীর, আল-জামি’উল কাবীর, আস-সিয়ারুস সাগীর, আস-সিয়ারুল কাবীর, এবং আয-যিয়াদাত) তাঁরই অবিস্মরণীয় অবদান। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন: “মুহাম্মদ ইবনুল হাসানের চেয়ে অধিক প্রাঞ্জল ও বিশুদ্ধ ভাষাজ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি আমি আর দেখিনি।”
  • ওফাত: ১৮৯ হিজরীতে (৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে) ৫৮ বছর বয়সে তিনি ইরানের ‘রে’ নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন।

‘মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ’-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব (مزايا كتابه الموطأ)

ইমাম মালিক (রহ.)-এর মুয়াত্তার যতগুলো রেওয়ায়েত বা পাঠান্তর বিদ্যমান, তার মধ্যে ‘মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ’ একটি স্বতন্ত্র, যুগান্তকারী ও অনন্য মর্যাদাপূর্ণ গ্রন্থ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

  1. হিজায ও ইরাকের ইলমের সমন্বয়: এ গ্রন্থে মদীনার ঐতিহ্যবাহী হাদীসধারা এবং কুফার গভীর ফিকহী ইজতিহাদের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। ইমাম মুহাম্মদ কেবল ইমাম মালিকের হাদীস বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং প্রতিটি অধ্যায়ে হানাফী মাযহাবের শক্তিশালী দলীল ও যুক্তি সন্নিবেশিত করেছেন।
  2. ‘ক্বালা মুহাম্মদ’ (قال محمد) শিরোনামে বিশ্লেষণ: গ্রন্থের প্রতিটি হাদীস বা আসার বর্ণনার পর ইমাম মুহাম্মদ নিজস্ব ফিকহী অভিমত পেশ করেছেন এভাবে— قَالَ مُحَمَّدٌ: وَبِهِ نَأْخُذُ… (মুহাম্মদ বলেন: এবং এ হাদীসটির ওপরই আমরা আমল করি, আর এটিই হলো ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর অভিমত)। এর ফলে হাদীস থেকে ফিকহী মাসআলা আহরণের চমৎকার পথপ্রদর্শক তৈরি হয়েছে।
  3. স্বতন্ত্র সনদ ও উচ্চমানের বর্ণনা: ইমাম মুহাম্মদ সরাসরি ইমাম মালিকের কাছ থেকে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে হাদীস গ্রহণ করেছেন। ইমাম মালিক ও তাঁর মাঝে কোনো মাধ্যম নেই। ফলে এটি একটি উচ্চস্তরের ‘মুসান্নাদ’ গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।
  4. আহলুর রায়ের ওপর মিথ্যা অপবাদের খণ্ডন: একদল মানুষ হানাফী ফিকহকে নিছক যুক্তিনির্ভর মনে করত। মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ প্রমাণ করে দিয়েছে যে হানাফী ফিকহের প্রতিটি শাখা কুরআন ও সহীহ হাদীসের অকাট্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

١٢- بين خصائص كتاب شعب الإيمان للبيهقي-

[১২. ইমাম বায়হাকী (রহ.) সংকলিত ‘শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা কর।]

ভূমিকা

পঞ্চম শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকীহ শায়খুল ইসলাম ইমাম আবু বকর আহমদ ইবনুল হুসাইন আল-বায়হাকী (৩৮৪-৪৫৮ হিজরী) সংকলিত ‘শুআবুল ঈমান’ (شُعَبُ الإِيمَانِ) ইসলামী সাহিত্যের ইতিহাসে এক অতুলনীয় ও অবিস্মরণীয় গ্রন্থ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিখ্যাত হাদীস—“ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে”—এর ওপর ভিত্তি করে ঈমানের সামগ্রিক রূপরেখা ও নৈতিক বিধানকে পূর্ণাঙ্গ সনদে বিন্যস্ত করাই এই গ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য। নিম্নে এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো।

‘শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص كتاب شعب الإيمان)

বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও স্বরূপ
১. ঈমানের ৭৭টি শাখায় নিখুঁত বিন্যাস ইমাম বায়হাকী (রহ.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের আলোকে ঈমানের মোট ৭৭টি শাখাকে চিহ্নিত করেছেন এবং গ্রন্থটিকে ৭৭টি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে সাজিয়েছেন। তিনি মানুষের অন্তরের বিশ্বাস (আকায়েদ), মুখের স্বীকারোক্তি ও জিকির, এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল—এই তিন ভাগে শাখাগুলোকে সুবিন্যস্ত করেছেন।
২. পূর্ণাঙ্গ সনদভিত্তিক সংকলন এটি কোনো সাধারণ নীতিশাস্ত্রের বই নয়, বরং একটি বিশুদ্ধ হাদীসের ‘মুসনাদ’ গ্রন্থ। ইমাম বায়হাকী প্রতিটি হাদীস তাঁর নিজ থেকে শুরু করে রাসূলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ও পূর্ণাঙ্গ সনদসহ (মুত্তাসিল সনদে) লিপিবদ্ধ করেছেন।
৩. কুরআন, সুন্নাহ ও আসার-এর অপূর্ব সমাহার প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে তিনি প্রাসঙ্গিক কুরআনের আয়াত উল্লেখ করেছেন, অতঃপর মারফূ হাদীস এনেছেন, এরপর সাহাবায়ে কিরামের মাওকূফ আসার এবং পরিশেষে তাবেয়ী ও বুযুর্গানে দ্বীনের হিকমতপূর্ণ বাণী ও দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন।
৪. হাদীসের মান ও রিজাল শাস্ত্রীয় পর্যালোচনা ইমাম বায়হাকী একজন শীর্ষস্থানীয় হাদীস বিশারদ (নাক্বাদে হাদীস) ছিলেন। কোনো দুর্বল বা সমস্যাযুক্ত রেওয়ায়েত আসলে তিনি হাদীসের সনদ, রাবীদের অবস্থা এবং ইল্লাত (সূক্ষ্ম ত্রুটি) সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা প্রদান করেছেন।
৫. চরিত্র গঠন ও আত্মশুদ্ধির এক মহা বিশ্বকোষ গ্রন্থে তাওহীদ ও নামায-রোজার মতো মৌলিক ইবাদতের পাশাপাশি ইখলাস, তাওয়াক্কুল, বিনয়, দয়া, দানশীলতা, পিতামাতার সেবা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, রাস্তা পরিষ্কার রাখা, এমনকি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও শিষ্টাচারের মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোকেও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে প্রমাণ করা হয়েছে।
৬. উম্মাহর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরবর্তী যুগের আলিমগণ এই গ্রন্থটিকে ঈমানের শাখা-প্রশাখা জানার প্রধান আকর গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইমাম আল-ক্বাযবীনী (রহ.) একে ‘মুখতাসারু শুআবিল ঈমান’ নামে সংক্ষেপ করেছেন এবং উম্মাহর ঘরে ঘরে এর শিক্ষা পৌঁছাতে ভূমিকা রেখেছেন।

উপসংহার ও সামগ্রিক পর্যালোচনা

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষ পরীক্ষা ২০২১-এর ‘দিরাসাতুল হাদীস – ১’ (বিষয় কোড: 202406) প্রশ্নপত্রটি হাদীস ও ফিকহশাস্ত্রের গভীর অধ্যয়নের এক চমৎকার সমন্বয়। এখানে একদিকে যেমন ইমাম মালিকের মুয়াত্তা-এর মাধ্যমে জিহাদ, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য ও শাহাদাতের সুউচ্চ মর্যাদা প্রতিফলিত হয়েছে; অপরদিকে ইমাম মুহাম্মদের মুয়াত্তা-এর মাধ্যমে আযান, জামাআতের নামাযে কাতার সোজা করার গুরুত্ব ও রফউল ইয়াদায়নের সূক্ষ্ম ফিকহী ইজতিহাদ আলোচিত হয়েছে। একই সাথে ইমাম বায়হাকীর শুআবুল ঈমান-এর হাদীসগুলোর মাধ্যমে ঈমানের শাখা-প্রশাখা, সচ্চরিত্রের মহত্ত্ব এবং কবীরা গুনাহ বর্জনের তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। এই প্রশ্নোত্তরগুলো ফাজিল পরীক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির উপযোগী করে সম্পূর্ণ প্রামাণ্য দলীলসহ উপস্থাপন করা হয়েছে।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ফাজিল অনার্স ৪র্থ বর্ষের ‘দিরাসাতুল হাদীস – ১’ (২০২৪০৬) কোর্সে কোন কোন কিতাব অন্তর্ভুক্ত?

দিরাসাতুল হাদীস – ১ (বিষয় কোড: 202406) কোর্সে মূলত তিনটি মৌলিক হাদীস গ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: (১) মুয়াত্তা ইমাম মালিক, (২) মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী, এবং (৩) ইমাম বায়হাকীর কিতাবু শুআবিল ঈমান।

২. মুয়াত্তা ইমাম মালিক ও মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?

মুয়াত্তা ইমাম মালিক হলো ইমাম মালিকের মূল সংকলন যা মদীনার ফিকহ ও আমলকে প্রাধান্য দেয়। আর মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ হলো ইমাম মুহাম্মদের রেওয়ায়েত, যেখানে ইমাম মালিকের হাদীসগুলোর পাশাপাশি হানাফী ফিকহের দলীল ও ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম মুহাম্মদের ফিকহী বিশ্লেষণ যুক্ত করা হয়েছে।

৩. নামাযে রফউল ইয়াদায়ন করা বা না করার ব্যাপারে শরীয়তের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কী?

তাকবীরে তাহরীমায় হাত তোলা সর্বসম্মত সুন্নাত। রুকুতে যাওয়া ও ওঠার সময় হাত তোলা শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবে সুন্নাত, আর হানাফী ও মালেকী মাযহাবে হাত না তোলাই উত্তম ও সুন্নাত। উভয় মতের পক্ষেই শক্তিশালী ও সহীহ হাদীসের দলীল রয়েছে; এটি একটি ফিকহী ইজতিহাদী বিষয়, তাই উভয় পক্ষের নামাযই সম্পূর্ণ সহীহ।

৪. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের দৃষ্টিতে কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ঈমানের হুকুম কী?

আহলুস সুন্নাহর মতে, কোনো মুসলিম কবীরা গুনাহে লিপ্ত হলে সে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত বা কাফির হয় না; বরং সে ফাসিক্ব মুমিন হিসেবে গণ্য হয়। তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে—আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, অন্যথায় শাস্তি ভোগ করার পর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

৫. ইমাম বায়হাকী (রহ.) ‘শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থে ঈমানের মোট কয়টি শাখা উল্লেখ করেছেন?

ইমাম বায়হাকী (রহ.) সহীহ হাদীসের ওপর ভিত্তি করে ঈমানের সর্বমোট ৭৭টি শাখা (شعبة) চিহ্নিত করে সেগুলোকে কুরআন, মারফূ হাদীস এবং সালাফে সালেহীনের বাণীর আলোকে বিস্তারিতভাবে সংকলন করেছেন।

টেলিটক ছবি ও স্বাক্ষর রিসাইজার (৩০০×৩০০ ও ৩০০×৮০)
সরকারি চাকরি ও ভর্তির অনলাইন আবেদনের জন্য ছবি ও সইয়ের মাপ ঠিক রাখুন ১০০% নির্ভুলভাবে।
ছবি ও সই রিসাইজ করুন ➜