পরীক্ষা কোড: ২০৮ | প্রশ্নপত্র কোড: ১২৭
اختبار السنة الرابعة للفاضل البكالوريوس (الشرف) ، لعام ۲۰۲۴
[ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা, ২০২৪]
الحديث والدراسات الإسلامية
[আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ]
دراسة تفسير القرآن الكريم
[দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম]
বিষয় কোড: ২০২৮০১
الوقت — ٤ ساعات | الدرجات الكاملة — ٨٠
[সময় — ৪ ঘণ্টা | পূর্ণমান — ৮০]
الملاحظة : أجب عن خمسة من مجموعة (أ) وعن واحد من مجموعة (ب) والأعداد بالهامش تدل على الدرجة كاملة-
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রশ্নপত্রের নিয়ম অনুযায়ী গ্রুপ (أ) থেকে ৫টি এবং গ্রুপ (ب) থেকে ১টি—মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, শিক্ষার্থীদের সার্বিক জ্ঞানার্জন ও পূর্ণাঙ্গ রেফারেন্সভিত্তিক প্রস্তুতির সুবিধার্থে এখানে প্রতিটি গ্রুপের সকল প্রশ্নের প্রামাণ্য ও বিস্তৃত সমাধান উপস্থাপন করা হলো।]
مجموعة (أ)
الدرجة — ١٤ × ٥ = ٧٠
(ترجم الآيات الكريمة مع التفسير ثم أجب عن الأسئلة الملحقة بها)
١- إياك نعبد وإياك نستعين – اهدنا الصراط المستقيم – صراط الذين أنعمت عليهم – غير المغضوب عليهم ولا الضالين – امين – [الدرجات: ٦]
[১. মূল আয়াতের বাংলা অনুবাদ: (হে আমাদের রব!) আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি। আপনি আমাদেরকে সরল ও সঠিক পথে পরিচালিত করুন—তাদের পথে, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ ও নিয়ামত দান করেছেন; তাদের পথে নয়, যাদের ওপর আপনার গজব ও ক্রোধ আপতিত হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। (হে আল্লাহ! আমাদের এই প্রার্থনা কবুল করুন—) আমীন! (সূরা আল-ফাতিহা: ৫-৭)]
ক. আয়াতের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাকরণিক ও সাহিত্যিক রূপ নিম্নের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:
| কুরআনিক শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| إِيَّاكَ | ضمير نصب منفصل مبني على الفتح | একমাত্র আপনারই। ক্রিয়ার পূর্বে মাফ’উল এনে তাখসীস (সীমাবদ্ধকরণ ও একনিষ্ঠতা) বা তাওহীদুল ইবাদত বোঝানো হয়েছে। |
| نَعْبُدُ | فعل مضارع، باب نصر (ع-ب-د)، جمع متكلم | আমরা চূড়ান্ত বিনয় ও ভালোবাসাসহ দাসত্ব ও আনুগত্য করি। |
| نَسْتَعِينُ | فعل مضارع، باب استفعال (ع-و-ن)، جمع متكلم | আমরা একমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি। |
| اهْدِنَا | فعل دعاء بصيغة الأمر (ه-د-ي)، مع نا مفعول أول | আমাদের পরিচালিত করুন, অবিচল রাখুন ও পথ দেখান। |
| الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ | مركب توصيفي، مفعول به ثان | সরল, সুদৃঢ় ও অপরিবর্তনীয় সত্য পথ (ইসলাম ও কুরআন)। |
| أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ | فعل ماض، باب إفعال (ن-ع-م)، مع جار ومجرور | যাদের প্রতি আপনি নিয়ামত দান করেছেন (নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহীন)। |
| الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ | اسم مفعول (غ-ض-ب)، مع نائب الفاعل | যাদের ওপর আপনার ক্রোধ আপতিত হয়েছে (হাদিস অনুযায়ী ইহুদি জাতি)। |
| الضَّالِّينَ | اسم فاعل جمع مذكر سالم (ض-ل-ل) | যারা সত্যবিচ্যুত ও পথভ্রষ্ট হয়েছে (হাদিস অনুযায়ী খ্রিস্টান জাতি)। |
খ. আয়াতের তাফসীর ও সারসংক্ষেপ
সূরা আল-ফাতিহার এই শেষাংশটি সমগ্র কুরআনের নির্যাস। এখানে বান্দা মহান আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দেয় যে, ইবাদত এবং সাহায্য প্রার্থনা উভয়টিই একমাত্র আল্লাহর সাথে খাস। এরপর বান্দা আল্লাহর দরবারে মানবজীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত ‘হিদায়াত’-এর জন্য প্রার্থনা করে। সেই পথ কোনো বিমূর্ত পথ নয়, বরং তা আল্লাহ-প্রদত্ত নিয়ামতপ্রাপ্ত মহামানবদের অনুসৃত জীবন্ত পথ; যা ক্রোধগ্রস্ত ও পথভ্রষ্টদের অপসংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
(أ) ما معنى الهداية؟ بين أقسامها – [الدرجات: ٤]
১. হিদায়াতের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ (معنى الهداية)
শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘আল-হিদায়াহ’ (الْهِدَايَةُ) শব্দটি ه-د-ي (হা-দাল-ইয়া) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হলো: الدَّلاَلَةُ بِلُطْفٍ (অত্যন্ত স্নেহ ও কোমলতার সাথে পথ প্রদর্শন করা), الإرشاد (সঠিক পথ নির্দেশ করা) এবং البيان (স্পষ্ট করা)। আল্লামা রাগিব আল-ইসফাহানী (রহ.) তাঁর মুফরাদাতুল কুরআন গ্রন্থে লিখেছেন: কোমলতা ও ভালোবাসার সাথে সঠিক গন্তব্য দেখিয়ে দেওয়াকে হিদায়াত বলে।
পারিভাষিক অর্থ: শরীয়তের পরিভাষায় হিদায়াত হলো: মহান আল্লাহ কর্তৃক স্বীয় বান্দাকে এমন সত্য, ন্যায় ও মুক্তির পথ প্রদর্শন করা এবং সেই পথে চলার শক্তি ও সামর্থ্য দান করা, যা বান্দাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পরম ঠিকানায় পৌঁছে দেয়।
২. তাফসীরের আলোকে হিদায়াতের স্তর ও প্রকারভেদ (أقسام الهداية)
ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) ও আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) কুরআনের আয়াতসমূহের আলোকে হিদায়াতকে প্রধানত চারটি মৌলিক স্তরে বিভক্ত করেছেন:
- সাধারণ ও সৃষ্টিগত হিদায়াত (الهداية العامة): এটি বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টির স্বভাব ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নির্দেশিকা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: «الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَىٰ» (যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার উপযুক্ত অবয়ব দান করেছেন, অতঃপর পথনির্দেশ করেছেন) [সূরা ত্বাহা: ৫০]। যেমন—নবজাতক জন্ম নেওয়ামাত্র মায়ের বুকের দুধ পান করতে শেখা।
- দাওয়াতি ও পথপ্রদর্শনমূলক হিদায়াত (هداية الدلالة والإرشاد): নবী-রাসূল ও কিতাবসমূহের মাধ্যমে ভালো-মন্দ ও সত্য-মিথ্যার পথ স্পষ্ট করে দেওয়া। এটি সকল মানুষের জন্য সাধারণ। ইরশাদ হয়েছে: «وَأَمَّا ثَمُودُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمَىٰ عَلَى الْهُدَىٰ» [সূরা ফুসসিলাত: ১৭] এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে: «وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ» [সূরা আশ-শূরা: ৫২]।
- তাওফীক্ব ও অন্তরের হিদায়াত (هداية التوفيق والتثبيت): বান্দার অন্তরে ঈমান ও নেক আমলের বাস্তব প্রেরণা সৃষ্টি করে সত্যের পথে অবিচল রাখা। এই হিদায়াত একমাত্র আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। নবীজি ﷺ-কে লক্ষ্য করে ইরশাদ হয়েছে: «إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ» [সূরা আল-কাসাস: ৫৬]।
- আখেরাতের জান্নাতের হিদায়াত (الهداية إلى طريق الجنة): কেয়ামতের কঠিন দিবসে সিরাত পার হয়ে জান্নাতের চিরস্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছানো। জান্নাতবাসীরা বলবে: «الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَٰذَا» [সূরা আল-আ’রাফ: ৪৩]।
(ب) ما المراد بالصراط المستقيم؟ بين – [الدرجات: ٤]
১. ‘সিরাতুল মুস্তাক্বীম’-এর শাব্দিক বিশ্লেষণ
‘আস-সিরাত’ (الصِّرَاطُ) অর্থ প্রশস্ত ও সুস্পষ্ট রাজপথ। আর ‘আল-মুস্তাক্বীম’ (الْمُسْتَقِيمُ) অর্থ যা সম্পূর্ণ সরল, যাতে কোনো বক্রতা, জটিলতা বা বিভ্রান্তি নেই।
২. মুফাসসিরীনে কেরামের প্রামাণ্য ব্যাখ্যাসমূহ
সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীনদের সূত্রে সিরাতুল মুস্তাকীমের ব্যাখ্যায় কয়েকটি সমার্থক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থ বর্ণিত হয়েছে:
- ইসলাম ধর্ম (دين الإسلام): হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: সিরাতুল মুস্তাক্বীম হলো খাঁটি ইসলাম, যা ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।
- কুরআনুল কারীম (القرآن الكريم): হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণনা করেন: সিরাতুল মুস্তাক্বীম হলো আল্লাহর রজ্জু বা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, যা অনুসরণ করলে মানুষ কখনো পথভ্রষ্ট হয় না [সুনানে তিরমিযী]।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবিদের আদর্শ: হাসান বসরী ও ফুযাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) বলেন: সিরাতুল মুস্তাক্বীম হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের পুণ্যময় সুন্নাত।
- সত্যের একমাত্র রাজপথ: ইমাম বায়যাবী (রহ.) বলেন: সিরাতুল মুস্তাক্বীম হলো বিশ্বাস, কর্ম ও চরিত্রে চরমপন্থা ও শৈথিল্যের মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ পথ (طريق الاعتدال)।
٢- إن الذين كفروا سواء عليهم أأنذرتهم أم لم تنذرهم لا يؤمنون – [الدرجات: ٦]
[২. মূল আয়াতের বাংলা অনুবাদ: নিশ্চয় যারা কুফরী অবলম্বন করেছে, আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না-ই করুন, তাদের পক্ষে উভয়টি সমান; তারা কখনো ঈমান আনয়ন করবে না। (সূরা আল-বাকারাহ: ৬)]
ক. আয়াতের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| কুরআনিক শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| كَفَرُوا | فعل ماض، باب نصر (ك-ف-ر)، جمع مذكر غائب | তারা কুফরি করেছে, সত্য অস্বীকার ও ঢেকে রেখেছে। |
| سَوَاءٌ | اسم مصدر بمعنى مستوٍ، خبر مقدم | সম্পূর্ণ সমান ও অভিন্ন। তাদের কাছে সতর্কতা ও নিরবতা ফলপ্রসূতায় এক। |
| أَأَنْذَرْتَهُمْ | همزة تسوية مع فعل ماض، باب إفعال | আপনি তাদের ভীতি প্রদর্শন বা সতর্ক করলেন কি না। |
| أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ | حرف عطف مع جزم بلم | অথবা আপনি তাদের সতর্ক করলেন না। |
| لَا يُؤْمِنُونَ | فعل مضارع منفي، باب إفعال (أ-م-ن) | তারা কখনোই ঈমান আনবে না; তাদের অন্তরে মোহর লেগে গেছে। |
খ. আয়াতের শানে নুযূল ও তাৎপর্য
সূরা আল-বাকারার শুরুতে প্রথম ৫ আয়াতে মুত্তাকীদের প্রশংসা করার পর এই আয়াতে চরমপন্থী কাফেরদের মানসিক অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। এই আয়াতটি বিশেষ করে মক্কার আবু জাহেল, আবু লাহাব এবং মদিনার ইহুদি সর্দার হুয়াই ইবনে আখতাব ও কা’ব ইবনুল আশরাফদের মতো ব্যক্তিদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, যাদের অন্তরে চরম অহংকার ও বিদ্বেষের কারণে সত্য গ্রহণের সমস্ত যোগ্যতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মহান আল্লাহ তাঁর ইলমে গায়েবের মাধ্যমে পূর্ব থেকেই জানতেন যে এরা কখনো ঈমান আনবে না।
(أ) بين معنى ‘الكفر’ لغة وشرعا – [الدرجات: ٤]
১. ‘কুফর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ (معنى الكفر لغة)
আরবি ‘কুফর’ (الْكُفْرُ) শব্দটি ك-ف-ر (কাফ-ফা-রা) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত। এর মৌলিক আভিধানিক অর্থ হলো الستر والتغطية (ঢেকে রাখা বা গোপন করা)।
আরবি ভাষায় কৃষককে ‘কাফের’ (كَافِر) বলা হয়, কারণ সে মাটির নিচে বীজ ঢেকে রাখে; যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: «كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ» [সূরা আল-হাদীদ: ২০]। তেমনি অন্ধকার রাতকেও ‘কাফের’ বলা হয় কারণ তা সমস্ত বস্তুকে আঁধারে ঢেকে দেয়। সত্যকে জেনে-বুঝে ঢেকে রাখে বলেই কাফেরকে কাফের বলা হয়।
২. কুফরের পারিভাষিক অর্থ (معنى الكفر شرعا)
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় কুফর হলো: মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দ্বীনের কোনো অপরিহার্য ও মৌলিক বিষয় (ضروريات الدين)—যেমন তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, ফেরেশতা বা কুরআনুল কারীমকে অন্তরে বিশ্বাস না করা, মুখে অস্বীকার করা অথবা কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত ফরয বিধানকে অমান্য করা।
কুফরের প্রধান প্রকারভেদ:
- কুফরে জুহূদ বা ইনকার (كفر الجحود): সত্যকে অন্তরে সত্য জেনেও অহংকারবশত মুখে অস্বীকার করা (যেমন ইবলিস ও ফেরাউনের কুফর)।
- কুফরে তাকযীব (كفر التكذيب): রাসূলকে সরাসরি মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করা।
- কুফরে নফাক্ব (كفر النفاق): মুখে ঈমান প্রকাশ করে অন্তরে কুফরি গোপন রাখা।
- কুফরে ই’রায (كفر الإعراض): দ্বীন ও সত্যের প্রতি চরম উদাসীনতা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করা।
(ب) كم قراءة فى ‘أأنذرتهم’؟ اكتب – [الدرجات: ٤]
‘أَأَنْذَرْتَهُمْ’ শব্দে কিরাআতের বৈচিত্র্য ও বিশ্লেষণ
পবিত্র কুরআনের ১০ ক্বিরাআত (القراءات العشر)-এর ইমামগণের নিকট ‘أَأَنْذَرْتَهُمْ’ শব্দটিতে দুটি হামযা পাশাপাশি আসায় (اجتماع الهمزتين في كلمة واحدة) মূলত তিনটি প্রধান নিয়মে পাঠ করার রেওয়ায়েত পাওয়া যায়:
- তাহক্বীক্ব (التَّحْقِيقُ): উভয় হামযাকে নিজ নিজ মাখরাজ থেকে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা। এটি ইমাম আসিম (যাঁর সূত্রে আমাদের দেশে হাফস ক্বিরাআত প্রচলিত), ইমাম হামযাহ এবং ইমাম কিসাঈ (রহ.)-এর কিরাআত। অর্থাৎ স্পষ্ট ‘আ-আনযারতাহুম’ পাঠ করা।
- তাসহীল (التَّسْهِيلُ): প্রথম হামযাকে স্পষ্ট রেখে দ্বিতীয় হামযাকে হামযা ও আলিফের মাঝামাঝি নরম স্বরে উচ্চারণ করা। এটি ইমাম নাফে’, ইমাম ইবনে কাছীর এবং ইমাম আবু আমর (রহ.)-এর কিরাআত।
- ইবদাল ও ইশবা’ (الإِبْدَالُ مَعَ الإِشْبَاعِ): দ্বিতীয় হামযাকে দীর্ঘ আলিফ বা মাদ্দে লাযিমে রূপান্তরিত করে ৬ হরকত পরিমাণ টেনে পাঠ করা (যেমন: ‘আআআআনযারতাহুম’)। এটি ইমাম ওয়ারশ ‘আন নাফে’ এবং আবু জা’ফর (রহ.)-এর অন্যতম মশহুর পাঠপদ্ধতি।
- ইদখাল (الإِدْخَالُ): কোনো কোনো ক্বারী (যেমন ইমাম কালূন ও আবু আমর) উভয় হামযার মাঝে একটি অতিরিক্ত হালকা আলিফ সংযোগ করে পাঠ করেছেন।
٣- مثلهم كمثل الذى استوقد نارا فلما أضاءت ما حوله ذهب الله بنورهم وتركهم فى ظلمات لا يبصرون – صم بكم عمى فهم لا يرجعون – [الدرجات: ٦]
[৩. মূল আয়াতের বাংলা অনুবাদ: তাদের (মুনাফিকদের) উদাহরণ সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন প্রজ্বলিত করল; অতঃপর আগুন যখন তার চারপাশ আলোকিত করে তুলল, ঠিক তখনই আল্লাহ তাদের আলো কেড়ে নিলেন এবং তাদেরকে এমন ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিলেন যে তারা কিছুই দেখতে পায় না। তারা বধির, বোবা ও অন্ধ; সুতরাং তারা কখনোই সত্যের পথে ফিরে আসবে না। (সূরা আল-বাকারাহ: ১৭-১৮)]
ক. আয়াতের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| কুরআনিক শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| مَثَلُهُمْ | اسم مضاف إلى ضمير الجمع الغائب | তাদের দৃষ্টান্ত, উপমা বা অবস্থা। মুনাফিকদের চিত্রায়ন। |
| اسْتَوْقَدَ نَارًا | فعل ماض، باب استفعال (و-ق-د) | অগ্নি প্রজ্বলন করার চেষ্টা করল বা আগুন জ্বালাল। |
| أَضَاءَتْ | فعل ماض مؤنث، باب إفعال (ض-و-ء) | চারিদিক আলোকিত ও উদ্ভাসিত করে তুলল। |
| ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ | فعل متعد بالباء مع فاعل ومجرور | আল্লাহ তাদের আলো সম্পূর্ণ দূর করে দিলেন বা নিভিয়ে দিলেন। |
| ظُلُمَاتٍ | جمع ظُلْمَة، مجرور بفي | ঘোর অন্ধকারসমূহ (সংশয়, নিফাক ও আখেরাতের অন্ধকার)। |
| صُمٌّ | جمع أَصَمّ، خبر لمبتدأ محذوف | বধির; সত্য বাণী শ্রবণে অক্ষম। |
| بُكْمٌ | جمع أَبْكَم | বোবা; সত্য স্বীকার ও প্রকাশে অপারগ। |
| عُمْيٌ | جمع أَعْمَى | অন্ধ; সত্যের নিদর্শন দর্শনে দৃষ্টিহীন। |
খ. আয়াতের তাফসীর ও উপমার রহস্য
সূরা আল-বাকারার ১৭ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের অবস্থা ফুটিয়ে তুলতে আল্লাহ তাআলা ‘আগুনের উপমা’ (المثل الناري) পেশ করেছেন। মুনাফিকরা মুখে কালিমা পড়ে ইসলামের ছায়াতলে এসে পার্থিব নিরাপত্তা ও গনীমতের অংশ লাভ করে ঠিকই (যেমন আগুন আলো দেয়), কিন্তু তাদের অন্তরে ঈমানের স্ফুলিঙ্গ না থাকায় তাদের অন্তরের আলো ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং তারা সংশয়ের অন্ধকারে পথহারা হয়ে থাকে।
(أ) ما معنى التشبيه؟ بين عناصر التشبيه وفائدته – [الدرجات: ٤]
১. তাশবীহ (التشبيه)-এর অর্থ
শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘আত-তাশবীহ’ (التَّشْبِيهُ) শব্দটি শাব্দিকভাবে التمثيل (সাদৃশ্য স্থাপন করা), المماثلة (তুলনা করা) অর্থে ব্যবহৃত হয়।
বালাগাত শাস্ত্রের পরিভাষায়: কোনো বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এক বস্তুকে অন্য বস্তুর সাথে কোনো উপমা-অব্যয়ের সাহায্যে সাদৃশ্যপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরাকে ‘তাশবীহ’ বলা হয়।
২. তাশবীহের মৌলিক উপাদান বা রুকনসমূহ (عناصر التشبيه)
ইলমুল বালাগাত (অলঙ্কারশাস্ত্র) অনুযায়ী তাশবীহের প্রধান উপাদান হলো চারটি:
- মুশাব্বাহ (المُشَبَّهُ): যাকে তুলনা করা হয়। আলোচ্য আয়াতে منافقين (মুনাফিকদের দল)।
- মুশাব্বাহ বিহী (المُشَبَّهُ بِهِ): যার সাথে তুলনা করা হয়। আয়াতে الذي استوقد نارا (অগ্নি প্রজ্বলনকারী ব্যক্তি)।
- আদাতুত তাশবীহ (أداة التشبيه): তুলনাবাচক শব্দ বা অব্যয়; যেমন كاف (ক্বাফ), كأنّ (কাআন্না) বা مثْل (মিছল)। আয়াতে ‘كَمَثَلِ’-এর ك ও مثل হলো আদাত।
- ওয়াজহুত শাব্বাহ (وجه الشبه): যে অভিন্ন গুণের কারণে তুলনা করা হয়েছে। এখানে তা হলো: ক্ষণিকের আলো লাভ করার পর চিরস্থায়ী অন্ধকার ও হতবিহ্বলতায় নিমজ্জিত হওয়া।
৩. কুরআনিক উপমার উপকারিতা ও উদ্দেশ্য (فائدة التشبيه)
- অদৃশ্য ও আধ্যাত্মিক সত্যকে চাক্ষুষ ও দৃশ্যমান উদাহরণের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
- মুনাফিকদের আত্মপ্রবঞ্চনা ও চরম দুর্ভাগ্যকে জীবন্তভাবে তুলে ধরা।
- ভাষার সৌন্দর্য, অলঙ্কার ও প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি করা।
(ب) ما المراد بقوله تعالى: “صم بكم عمى فهم لا يرجعون”؟ [الدرجات: ٤]
আয়াতের সুগভীর তাফসীর ও ব্যাখ্যা
মহান আল্লাহর বাণী «صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ»-এর অর্থ এই নয় যে মুনাফিকদের বাহ্যিক কান, জিহ্বা বা চোখ ছিল না; বরং তারা বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি, বাকশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী ছিল। তবে মুফাসসিরীনে কেরাম এর তিনটি মূল ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
- উপলব্ধি ও হেদায়েতের অঙ্গ বিকল হওয়া: যে অঙ্গ দ্বারা সত্য গ্রহণ করা যায় না, শরীয়তের দৃষ্টিতে তা অস্তিত্বহীন। তারা কান দিয়ে কুরআনের হক বাণী শুনলেও তা অন্তরে ধারণ করেনি, তাই তারা বধির (صم); তারা মুখ দিয়ে সত্যের সাক্ষ্য দেয়নি, তাই তারা বোবা (بكم); এবং চোখ মেলে আল্লাহর কুদরত দেখেও শিক্ষা নেয়নি, তাই তারা অন্ধ (عمي)।
- ‘ফাহুম লা ইয়ারজিঊন’ (فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ)-এর অর্থ: তারা যে পথভ্রষ্টতা ও মুনাফেকির গভীর পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হয়েছে, সেখান থেকে হেদায়েত ও তওবার পথে ফিরে আসার আর কোনো সম্ভাবনা অবশিষ্ট নেই। কারণ তারা স্বেচ্ছায় সত্যের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।
٤- يكاد البرق يخطف أبصارهم، كلما أضاء لهم مشوا فيه وإذا أظلم عليهم قاموا، ولو شاء الله لذهب بسمعهم وأبصارهم، إن الله على شيئ قدير – [الدرجات: ٦]
[৪. মূল আয়াতের বাংলা অনুবাদ: বিজলীচমক যেন তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিয়ে যায়; যখনই তা তাদের জন্য চারপাশ উদ্ভাসিত করে, তারা তার আলোতে পথ চলে, আর যখন তাদের ওপর অন্ধকার নেমে আসে, তখন তারা থমকে দাঁড়িয়ে যায়। আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তবে অবশ্যই তাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দিতেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান। (সূরা আল-বাকারাহ: ২০)]
ক. আয়াতের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| কুরআনিক শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| يَكَادُ | فعل مضارع ناقص من أفعال المقاربة (ك-و-د) | উপক্রম হয়, প্রায় ঘটিয়ে ফেলে। বিদ্যুৎচমকের তীব্রতা বোঝানো হয়েছে। |
| يَخْطَفُ | فعل مضارع، باب ضرب (خ-ط-ف) | দ্রুত ছিনিয়ে নেয়, নিমিষে হরণ করে নিয়ে যায়। |
| أَبْصَارَهُمْ | جمع بَصَر، مفعول به | তাদের চোখসমূহ বা দৃষ্টিশক্তি। |
| مَشَوْا فِيهِ | فعل ماض مع جار ومجرور (م-ش-ي) | তারা সেই ক্ষণিক আলোতে পথ চলতে থাকে। |
| أَظْلَمَ | فعل ماض، باب إفعال (ظ-ل-م) | অন্ধকারাচ্ছন্ন হলো বা আঁধার ঘনিয়ে এলো। |
| قَامُوا | فعل ماض، باب نصر (ق-و-م) | তারা হতবিহ্বল হয়ে নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে রইল। |
| لَذَهَبَ بِسَمْعِهِمْ | جواب لو مع فعل متعد بالباء | অবশ্যই আল্লাহ তাদের শ্রবণশক্তি চিরতরে বধির করে দিতেন। |
| قَدِيرٌ | صيغة مبالغة على وزن فعيل (ق-د-ر) | চিরন্তন পূর্ণ শক্তির অধিকারী, সর্বশক্তিমান। |
খ. আয়াতের তাফসীর ও প্রেক্ষাপট
সূরা আল-বাকারার ১৯ ও ২০ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের দোদুল্যমান মানসিক অবস্থাকে তুলে ধরতে ‘বৃষ্টির উপমা’ (المثل المائي) পেশ করা হয়েছে। এখানে আসমান থেকে বর্ষিত মুষলধারে বৃষ্টি হলো মহাগ্রন্থ আল-কুরআন; মেঘের গর্জন হলো কুরআনের কঠোর নির্দেশাবলি ও ভীতি প্রদর্শন; আর বিদ্যুৎচমক হলো কুরআনের সমুজ্জ্বল দলীল-প্রমাণ। মুনাফিকরা যখন দ্বীনের বিজয় ও কোনো দুনিয়াবী ফায়দা দেখে, তখন তারা ইসলামের সাথে চলে; কিন্তু কোনো বিপদ বা জিহাদের আদেশ এলে তারা ভয়ে নিশ্চল ও হতভম্ব হয়ে পড়ে।
(أ) عرف النفاق مع بيان أقسامه – [الدرجات: ٤]
১. নিফাকের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচিতি
আভিধানিক অর্থ: আরবি ‘নিফাক্ব’ (النِّفَاقُ) শব্দটি ن-ف-ق (নূন-ফা-ক্বাফ) ধাতু থেকে নির্গত। এর মূল অর্থ হলো ‘সুরঙ্গ’ (نَفَق)। যেমন বনরুই মাটির নিচে এমন গর্ত খোঁড়ে যার দুটি মুখ থাকে—একটি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে এবং বিপদ দেখলে অন্যটি দিয়ে গোপনে পালিয়ে যায়। দ্বিমুখী আচরণকে আরবিতে নিফাক বলে।
পারিভাষিক অর্থ: ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় নিফাক হলো: মুখে ও প্রকাশ্যে ঈমান, আনুগত্য ও ইসলামের দাবি করা; কিন্তু অন্তরে কুফর, শিরক, অবাধ্যতা ও শত্রুতা পোষণ করা।
২. নিফাকের প্রধান প্রকারভেদ (أقسام النفاق)
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য অনুযায়ী নিফাক প্রধানত দুই প্রকার:
- ১. বিশ্বাসগত বড় নিফাক (النفاق الاعتقادي / الأكبر):
- অন্তরে কুফর ও নবীজির রিসালাতকে অস্বীকার করে দুনিয়াবী নিরাপত্তা ও ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে নিজেকে মুসলিম দাবি করা।
- এই নিফাক মানুষকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে খারিজ করে দেয় এবং এদের পরিণতি চিরস্থায়ী জাহান্নাম। পবিত্র কুরআনে এদের সম্পর্কে বলা হয়েছে: «إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ» (নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে) [সূরা আন-নিসা: ১৪৫]।
- ২. কর্মগত বা ছোট নিফাক (النفاق العملي / الأصغر):
- অন্তরে মৌলিক ঈমান বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও চরিত্র ও আচরণে মুনাফিকসুলভ মন্দ স্বভাব প্রকাশ পাওয়া। যেমন—কথা বললে মিথ্যা বলা, আমানতে খেয়ানত করা, ওয়াদা ভঙ্গ করা এবং তর্কে লিপ্ত হলে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা।
- এই নিফাক মানুষকে কাফের বানায় না, তবে সে চরম ফাসেক ও কবিরা গুনাহগার হিসেবে গণ্য হয়।
(ب) فسر قوله تعالى: “لَذَهَبَ اللهُ بسمعهم وأبصارهم” كما فسر المفسر – [الدرجات: ٤]
মুফাসসিরীনে কেরামের প্রামাণ্য বিশ্লেষণ ও সূক্ষ্ম বালাগাত
প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা নাসাফী (রহ.) ও কাজী বায়যাবী (রহ.) এই আয়াতাংশের তাফসীরে কয়েকটি গভীর তত্ত্ব তুলে ধরেছেন:
- আল্লাহর নিরঙ্কুশ কুদরত ও অবকাশ প্রদান: মেঘের যে প্রচণ্ড গর্জন এবং বিদ্যুতের যে তীব্র ঝলকানি হচ্ছিল, তাতেই তাদের কান বধির এবং চোখ চিরতরে অন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ ইচ্ছা করেই তা করেননি; বরং তাদেরকে অবকাশ (إمهال) দিয়েছেন, যাতে দুনিয়াতে তাদের ওপর আল্লাহর হুজ্জত ও প্রমাণ শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ‘সাম’ (শ্রবণশক্তি) একবচন এবং ‘আবসার’ (দৃষ্টিশক্তি) বহুবচনের রহস্য:
কুরআনুল কারীমের এক অনন্য বালাগাত হলো—শ্রবণশক্তি বোঝাতে সর্বদা ‘সাম’ (سَمْع) একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে, পক্ষান্তরে দৃষ্টিশক্তি বোঝাতে বহুবচনে ‘আবসার’ (أَبْصَار) আনা হয়েছে। কারণ শব্দ ও আওয়াজ সবদিক থেকে একভাবেই কানে প্রবেশ করে, কিন্তু দর্শনের ক্ষেত্রে আলো, কোণ, আকৃতি ও রঙের বহুবিধ পার্থক্যের কারণে দৃষ্টির দিক বহুধা বিভক্ত হয়। - শারঈ শিক্ষা: আল্লাহ চাইলে তাদের বাহ্যিক কান ও চোখ যেভাবে কেড়ে নিতে পারতেন, তেমনি তাদের অন্তরের উপলব্ধির শক্তিও আল্লাহ ছিনিয়ে নিতে পারেন। অতএব মুনাফেকির পথ পরিহার করে একনিষ্ঠ ঈমানের পথে ফিরে আসাই মানুষের একমাত্র মুক্তি।
٥- سبحان الذى أسرى بعبده ليلا من المسجد الحرام إلى المسجد الأقصى الذى باركنا حوله لنريه من آيتنا، إنه هو السميع البصير – [الدرجات: ٦]
[৫. মূল আয়াতের বাংলা অনুবাদ: পরম পবিত্র ও মহিমাময় সেই সত্তা, যিনি স্বীয় বান্দাকে (মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে) রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত—যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি; যাতে আমি তাকে আমার মহাশক্তিময় নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। (সূরা বনী ইসরাঈল/আল-ইসরা: ১)]
ক. আয়াতের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| কুরআনিক শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| سُبْحَانَ | مصدر منصوب على المفعولية المطلقة (س-ب-ح) | পরম পবিত্রতা ও ত্রুটিমুক্ত মহিমা ঘোষণা করছি। বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনার সূচনা। |
| أَسْرَىٰ | فعل ماض، باب إفعال (س-ر-ي) | রাত্রিকালে ভ্রমণ করালেন বা পরিচালনা করলেন। |
| بِعَبْدِهِ | مركب إضافي مع جار ومجرور (ع-ب-د) | তাঁর বিশেষ বান্দাকে (দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে প্রিয় নবী ﷺ-কে)। |
| لَيْلًا | ظرف زمان منصوب بالتنكير | রাতের সামান্য এক অংশে। পুরো রাত নয়, বরং রাতের অতি ক্ষুদ্র মুহূর্তে। |
| الْمَسْجِدِ الأَقْصَى | مركب توصيفي | দূরবর্তী পবিত্রতম মসজিদ (বায়তুল মুকাদ্দাস, জেরুজালেম)। |
| بَارَكْنَا حَوْلَهُ | فعل ماض مع ظرف مكان | যার চতুর্দিকে আমি পার্থিব শস্য-শ্যামলতা ও আধ্যাত্মিক নববী বরকত দান করেছি। |
| لِنُرِيَهُ | فعل مضارع منصوب بأن مضمرة بعد لام الكي | যেন আমি তাঁকে আমার নিদর্শনসমূহ সচক্ষে প্রত্যক্ষ করাই। |
খ. আয়াতের গুরুত্ব ও স্থান
পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি দ্বারা ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিযাসমূহের অন্যতম ‘ইসরা ও মি’রাজ’-এর প্রথম পর্ব অর্থাৎ মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ঐতিহাসিক পরিভ্রমণ অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এই সফরটি হয়েছিল নবুওয়াতের দশম বা একাদশ বর্ষে রজব মাসের ২৭তম রাতে।
(أ) اذكر قصة المعراج مختصرا – [الدرجات: ٤]
মি’রাজের ঐতিহাসিক ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের দীর্ঘ বিশুদ্ধ হাদিসসমূহের আলোকে মি’রাজের বরকতময় সফরটির মূল পর্যায়সমূহ নিম্নরূপ:
- প্রথম পর্ব (আল-ইসরা): রাতের এক প্রহরে জিবরাঈল (আ.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট আগমন করেন। অতঃপর ‘বুরাক’ নামক স্বর্গীয় বিদ্যুৎগতির বাহনে চড়িয়ে তাঁকে মক্কার মসজিদে হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদে আকসায় (বায়তুল মুকাদ্দাস) নিয়ে যান। সেখানে পূর্ববর্তী সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম সমবেত হন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের ইমামতি করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন।
- দ্বিতীয় পর্ব (ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ): বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে নূরের সিঁড়িযোগে জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে নবীজি ﷺ সপ্তাকাশের দিকে আরোহণ করেন। প্রথম আকাশে হযরত আদম (আ.), দ্বিতীয় আকাশে হযরত ঈসা ও ইয়াহইয়া (আ.), তৃতীয় আকাশে হযরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আকাশে হযরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আকাশে হযরত মুসা (আ.) এবং সপ্তম আকাশে বায়তুল মামুরে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময় হয়।
- তৃতীয় পর্ব (সিদরাতুল মুনতাহা ও পরম সান্নিধ্য): এরপর তিনি সৃষ্টিজগতের সর্বশেষ সীমানা ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ অতিক্রম করেন। সেখানে জিবরাঈল (আ.) থেমে যান এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ একাকী রফরফ বাহনে চড়ে মহান রাব্বুল আলামীনের খাস সান্নিধ্যে উপনীত হন।
- চতুর্থ পর্ব (শ্রেষ্ঠ উপহার): মহান আল্লাহ স্বীয় হাবীবকে তিনটি ঐতিহাসিক উপহার দান করেন: ১. উম্মতের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ, ২. সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত, এবং ৩. শিরকমুক্ত উম্মতের কবিরা গুনাহগারদের ক্ষমার সুসংবাদ। অতঃপর রাতেই তিনি পুনরায় মক্কায় নিজ হুজরায় প্রত্যাবর্তন করেন।
(ب) هل كان الإسراء فى اليقظة أم فى المنام؟ بين – [الدرجات: ٤]
ইসরা ও মি’রাজ জাগ্রত অবস্থায় না কি স্বপ্নযোগে হয়েছিল?
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং চার মাযহাবের জুমহুর উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো: ইসরা ও মি’রাজ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্বশরীরে পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় (بالروح والجسد يقظة لا مناما) সংঘটিত হয়েছিল। এটি কোনো স্বপ্ন বা কেবল আত্মিক ভ্রমণ ছিল না।
জুমহুর উলামায়ে কেরামের অকাট্য দলীলসমূহ:
- ১. কুরআনের ‘আবদ’ (بِعَبْدِهِ) শব্দ চয়ন: আরবি ভাষায় ‘আবদ’ কেবল আত্মাকে বলা হয় না; বরং দেহ ও আত্মার অবিচ্ছেদ্য মিলনকেই ‘আবদ’ বলা হয়। সুতরাং ‘আসরা বি-আবদিহী’ দ্বারা স্বশরীরে ভ্রমণই অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
- ২. ‘সুবহানা’ (سُبْحَانَ) দ্বারা সূচনার রহস্য: মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ‘সুবহান’ শব্দটি কেবল তখনই ব্যবহৃত হয় যখন কোনো মহাবিস্ময়কর ও অলৌকিক বিষয় উপস্থাপন করা হয়। স্বপ্নে মানুষ দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করা কোনো বিস্ময়কর বিষয় নয়; সশরীরে চোখের পলকে হাজার মাইলের পথ পাড়ি দেওয়াই ছিল পরম অলৌকিক।
- ৩. কুরাইশ মুশরিকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া: নবীজি ﷺ সকালে যখন মি’রাজের ঘোষণা দিলেন, তখন মক্কার কাফেররা প্রবল প্রতিবাদ, মিথ্যাচার ও উপহাস শুরু করেছিল। যদি এটি কেবল স্বপ্ন হতো, তবে কাফেররা কখনো এর বিরোধিতা করত না; কারণ মানুষ স্বপ্নে যেকোনো স্থানে যেতে পারে।
- ৪. বাহনের ব্যবহার: মি’রাজে ‘বুরাক’ নামক শারীরিক বাহনে আরোহণের স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। আত্মার ভ্রমণের জন্য কোনো পশু বা বাহনের প্রয়োজন হয় না।
অতএব, জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে ইসরা সংঘটিত হওয়া আহলুস সুন্নাহর সুদৃঢ় ও অকাট্য আক্বীদা।
٦- وكل إنسان ألزمناه طئره فى عنقه، ونخرج له يوم القيامة كتابا يلقه منشورًا – إقرأ كتبك، كفى بنفسك اليوم عليك حسيبا – [الدرجات: ٦]
[৬. মূল আয়াতের বাংলা অনুবাদ: এবং আমি প্রত্যেক মানুষের আমলনামাকে (কর্মের ফলাফলকে) তার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছি; আর কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক উন্মুক্ত গ্রন্থ, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। (তাকে বলা হবে:) তুমি তোমার আমলনামা পাঠ করো; আজ তোমার নিজের হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট! (সূরা বনী ইসরাঈল/আল-ইসরা: ১৩-১৪)]
ক. আয়াতের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| কুরআনিক শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| أَلْزَمْنَاهُ | فعل ماض، باب إفعال (ل-ز-م) | আমি তাকে অপরিহার্যভাবে যুক্ত করে দিয়েছি। যা কখনো বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়। |
| طَائِرَهُ | اسم فاعل (ط-ي-ر)، مفعول به أول | তার ভাগ্যলিপি বা আমলনামা; ভালো-মন্দ কাজের রেকর্ড। |
| فِي عُنُقِهِ | جار ومجرور مع مضاف إليه (ع-ن-ق) | তার গলায় বা স্কন্ধে; যাতে তা সর্বদা তার সঙ্গেই বিদ্যমান থাকে। |
| كِتَابًا | مفعول به ثان لـ نخرج | এক পূর্ণাঙ্গ আমলনামা বা লিখিত রেজিস্টার। |
| مَنْشُورًا | اسم مفعول منصوب على الحال (ن-ش-ر) | উন্মুক্ত ও প্রসারিত অবস্থায়, যা গোপন রাখা সম্ভব নয়। |
| اقْرَأْ كِتَابَكَ | فعل أمر للمخاطب مع مفعول به | তুমি নিজেই নিজের আমলনামা পাঠ করো। |
| حَسِيبًا | صيغة مبالغة منصوبة على التمييز (ح-س-ب) | হিসাবকারী, নিরীক্ষক বা পর্যালোচক হিসেবে। |
খ. আয়াতের তাফসীর ও মূল শিক্ষা
জাহেলি যুগে আরবরা পাখির গতিবিধি দেখে শুভাশুভ নির্ণয় করত (যাকে ‘তিয়ারাহ’ বলা হতো)। কুরআনুল কারীম এই কুসংস্কারকে চূর্ণ করে ঘোষণা করেছে যে, মানুষের সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনো পাখির গতিতে নয়, বরং তার নিজের ভালো-মন্দ আমলের ওপর নির্ভর করে। আর সেই আমলসমূহ কিয়ামতের দিন স্পষ্ট পুস্তিকাকারে হাজির করা হবে, যেখানে অণু পরিমাণ ভালো বা মন্দ বাদ পড়বে না।
(أ) ما معنى القيامة؟ صف اهوال يوم القيامة – [الدرجات: ٤]
১. কিয়ামতের অর্থ (معنى القيامة)
শাব্দিক অর্থ: আরবি ‘আল-ক্বিয়ামাহ’ (الْقِيَامَةُ) শব্দটি ق-و-م (ক্বাফ-ওয়াও-মিম) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ হলো দণ্ডায়মান হওয়া, পুনরুত্থিত হওয়া, সমবেত হওয়া বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
পারিভাষিক অর্থ: বর্তমান বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পর মহান আল্লাহর আদেশে সমস্ত মৃত মানুষ কবর থেকে পুনরুত্থিত হয়ে আল্লাহর আদালতের সামনে চূড়ান্ত হিসাব ও কর্মফলের জন্য দণ্ডায়মান হওয়ার দিবসকে ‘কিয়ামত’ বলা হয়।
২. কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য ও বিভীষিকা (أهوال يوم القيامة)
কুরআন ও হাদিসের আলোকে কিয়ামতের প্রধান প্রধান ভয়াবহতা নিম্নরূপ:
- সূর্য অতি নিকটে আগমন ও ঘামের প্লাবন: সূর্য মানুষের মাত্র এক মাইল উপরে নেমে আসবে। ফলে তীব্র উত্তাপে মানুষ নিজের পাপের মাত্রা অনুসারে ঘামের সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকবে—কারো গোড়ালি, কারো হাঁটু, কারো কোমর এবং কারো মুখ পর্যন্ত ঘামে নিমজ্জিত হবে।
- ভয়াবহ মানসিক ত্রাস: কিয়ামতের বিভীষিকায় দুধের শিশুদের চুল পেকে সাদা হয়ে যাবে এবং গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত ঘটবে। মানুষ মাতালের মতো ছুটোছুটি করবে, অথচ তারা মাতাল নয়।
- প্রিয়জনদের পলায়ন: সেই চরম মুহূর্তে কেউ কারো সাহায্য করতে পারবে না। ভাই ভাইকে দেখে পালাবে, সন্তান তার মা-বাবাকে দেখে পালাবে এবং স্বামী তার স্ত্রীকে দেখে পলায়ন করবে (সূরা আবাসা: ৩৪-৩৬)।
- পৃথিবীর ধ্বংসযজ্ঞ: পাহাড়সমূহ ধুনিত তুলার মতো বাতাসে উড়তে থাকবে, সমুদ্রগুলো প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবে এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে রক্তিম চামড়ার মতো রূপ ধারণ করবে।
(ب) ما المراد بالكتاب فى قوله تعالى: “اقرأ كتابك” وما حكم الإيمان به؟ بين – [الدرجات: ٤]
১. ‘আল-কিতাব’-এর তাৎপর্য (المراد بالكتاب)
আলোচ্য আয়াতে ‘কিতাব’ বলতে মানুষের ‘আমলনামা’ বা আমলের রেজিস্টার খাতা (صحائف الأعمال) বোঝানো হয়েছে। মানুষের সৃষ্টির শুরু থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ছোট-বড় ভালো ও মন্দ কথা, কাজ এবং গোপন সংকল্প সম্মানিত কেরামান কাতিবীন ফেরেশতাদ্বয় নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সেই আমলনামা উন্মুক্ত করে বান্দার হাতে তুলে দেবেন। মুমিন ব্যক্তিরা তা ডান হাতে পেয়ে আনন্দিত হবে এবং কাফের-মুনাফিকরা তা বাম হাতে বা পিঠের পেছন থেকে পেয়ে হায়-হুতাশ করবে।
২. আমলনামায় বিশ্বাসের শারঈ হুকুম (حكم الإيمان به)
কিয়ামতের দিন আমলনামা প্রদান করা হবে এবং তা সত্য—এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা ফরজ এবং ঈমান বিল আখিরাত (পরকালের প্রতি ঈমান)-এর অবিচ্ছেদ্য রুকন। পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে আমলনামার বিবরণ এসেছে। যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আমলনামা বা হিসাব-নিকাশকে অস্বীকার করবে, সে কাফের ও ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে।
٧- يا أيها الذين آمنوا لا ترفعوا أصواتكم فوق صوت النبى ولا تجهروا له بالقول كجهر بعضكم لبعض أن تحبط أعمالكم وأنتم لا تشعرون – [الدرجات: ٦]
[৭. মূল আয়াতের বাংলা অনুবাদ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের কণ্ঠস্বরকে নবীর কণ্ঠস্বরের চেয়ে উঁচু করো না এবং নিজেদের মাঝে পরস্পরের সাথে যেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলো না; পাছে তোমাদের সমস্ত নেক আমল নিষ্ফল ও বরবাদ হয়ে যায় অথচ তোমরা তা উপলব্ধিও করতে পারবে না। (সূরা আল-হুজুরাত: ২)]
ক. আয়াতের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| কুরআনিক শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| لَا تَرْفَعُوا | فعل مضارع مجزوم بلا الناهية، باب فتح (ر-ف-ع) | তোমরা কণ্ঠস্বর উঁচু করো না বা কর্কশ আওয়াজ করো না। |
| فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ | مركب إضافي مع ظرف مكان | নবী করীম ﷺ-এর সুমিষ্ট ও শান্ত কণ্ঠস্বরের চেয়ে উচ্চৈঃস্বরে। |
| وَلَا تَجْهَرُوا | فعل مضارع معطوف مجزوم، باب فتح (ج-ه-ر) | এবং তোমরা চিৎকার করে বা উচ্চ শব্দে কথা বলো না। |
| كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ | مركب إضافي مع جار ومجرور | তোমরা সাধারণ মানুষ যেভাবে একে অপরকে নাম ধরে চিৎকার করে ডাকো। |
| أَنْ تَحْبَطَ | فعل مضارع منصوب بأن، باب سمع (ح-ب-ط) | যাতে বরবাদ ও নিষ্ফল না হয়ে যায় (خشية أن تحبط)। |
| أَعْمَالُكُمْ | جمع عَمَل، فاعل لـ تحبط | তোমাদের জীবনের সমস্ত নেক আমল, নামাজ, রোজা ও জিহাদ। |
| لَا تَشْعُرُونَ | فعل مضارع منفي، باب نصر (ش-ع-ر) | তোমরা বুঝতেই পারবে না বা টেরও পাবে না। চরম ক্ষতির আশঙ্কা। |
খ. আয়াতের সাধারণ তাৎপর্য ও গুরুত্ব
সূরা আল-হুজুরাতকে ‘আদব ও শিষ্টাচারের সূরা’ (سورة الأخلاق والآداب) বলা হয়। এই আয়াতে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরের শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সাধারণ কোনো নেতা বা ব্যক্তি নন; বরং তিনি নিখিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহামানব। তাঁর সামনে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বরে বিনয়, কোমলতা ও সর্বোচ্চ সমীহ বজায় রাখা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। সামান্য বেয়াদবি বা অসতর্কতার ফলে আমল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার চরম সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে।
(أ) اكتب سبب نزول هذه الآية – [الدرجات: ٤]
আয়াতটির বিশুদ্ধ শানে নুযূল (سبب النزول)
সহীহ বুখারীতে (হাদিস নং: ৪৮৪৫, ৪৮৪৭) প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত ইবনে আবি মুলাইকাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
ইসলামের নবম হিজরিতে মদিনায় আরবের বনু তামীম গোত্রের এক প্রতিনিধি দল (وفد بني تميم) ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আগমন করে। তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট তাদের গোত্রের জন্য একজন আমির বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করার আবেদন জানায়।
- তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আরজ করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ক্বা’কা’ ইবনে মা’বাদ ইবনে যুরারাহকে তাদের আমির নিযুক্ত করুন।”
- কিন্তু হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বললেন: “না, বরং আপনি আল-আকরা’ ইবনে হাবিসকে তাদের নেতা মনোনীত করুন।”
- এতে আবু বকর (রা.) উমর (রা.)-কে লক্ষ্য করে বললেন: “তুমি কেবল আমার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতেই চেয়েছ!” উমর (রা.) জবাবে বললেন: “আমি আপনার বিরোধিতা করার ইচ্ছা করিনি।”
এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতিতেই উভয়ের কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা উঁচু হয়ে গেল। ঠিক তখনই মহান আল্লাহ এই সতর্কতামূলক আয়াত অবতীর্ণ করেন: «يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ…»।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে এত তীব্র খোদাভীতি সৃষ্টি হয়েছিল যে, হযরত উমর (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে এত নিচু ও ফিসফিস করে কথা বলতেন যে নবীজিকে প্রায়ই দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করতে হতো তিনি কী বলছেন! আর হযরত সাবেত ইবনে কায়স (রা.)—যাঁর কণ্ঠ প্রাকৃতিকভাবেই উঁচু ছিল—তিনি ভয়ে নিজ ঘরে দরজা বন্ধ করে ক্রন্দন করতে শুরু করেছিলেন এই আশঙ্কায় যে তাঁর আমল হয়তো বরবাদ হয়ে গেছে; অতঃপর নবীজি ﷺ তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে আশ্বস্ত করেন।
(ب) ما هو حكم رفع الصوت عند رسول الله صلى الله عليه وسلم فى حياته وبعد مماته؟ بين – [الدرجات: ٤]
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশায় তাঁর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু করার বিধান
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবদ্দশায় তাঁর সম্মুখে ইচ্ছাকৃতভাবে ও অসৌজন্যমূলকভাবে নিজের কণ্ঠ তাঁর কণ্ঠের চেয়ে উঁচু করা কঠোরভাবে হারাম এবং কবিরা গুনাহ। আর যদি কেউ নবীজিকে অবজ্ঞা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা বিদ্রোহের মনোভাব নিয়ে চিৎকার করে সম্বোধন করত, তবে তা সর্বসম্মতভাবে কুফরী এবং তার জীবনের সমস্ত নেক আমল চিরতরে বরবাদ (হবতে আমল) করে দিত।
২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওফাতের পর তাঁর সামনে ও রওজা মোবারকে কণ্ঠ উঁচু করার বিধান
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমামগণের (বিশেষ করে ইমাম মালিক ও ইমাম কুরতুবী রহ.) দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত হলো: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরেও তাঁর সম্মান, মর্যাদা ও পবিত্রতা জীবদ্দশার মতোই শতভাগ অটুট ও চিরন্তন।
এ সম্পর্কিত ঐতিহাসিক প্রমাণ ও বিধান:
- আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ফয়সালা: ইমাম বুখারী (রহ.) বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা.) মসজিদে নববীতে দেখলেন তায়েফের দুই ব্যক্তি উচ্চৈঃস্বরে কথা বলছে। তিনি তাদের ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলেন: “তোমরা কোথাকার লোক?” তারা বলল: “আমরা তায়েফবাসী।” উমর (রা.) বললেন: «لَوْ كُنْتُمَا مِنْ أَهْلِ الْبَلَدِ لأَوْجَعْتُكُمَا، تَرْفَعَانِ أَصْوَاتَكُمَا فِي مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ؟» (যদি তোমরা মদিনাবাসী হতে, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের চাবুকপেটা করতাম! তোমরা কি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মসজিদে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলছ?) [সহীহ বুখারী: ৪৭০]।
- ইমাম মালিক ও খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের ঘটনা: আব্বাসীয় খলিফা মানসুর মসজিদে নববীতে আলোচনা করতে গিয়ে উঁচু গলায় কথা বললে ইমাম মালিক (রহ.) তাকে সতর্ক করে বললেন: “হে আমীরুল মুমিনীন! এই মসজিদে আপনার কণ্ঠ উঁচু করবেন না; কেননা আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মাধ্যমে সাহাবায়ে কেরামকেও আদব শিক্ষা দিয়েছেন।” খলিফা তৎক্ষণাৎ মাথা নত করে নিজের ভুল স্বীকার করেন।
- চূড়ান্ত শারঈ হুকুম: মসজিদে নববী এবং বিশেষ করে রওজা মোবারকের সামনে শোরগোল করা, বিবাদে লিপ্ত হওয়া বা অযথা চিৎকার করা কঠোরভাবে না-জায়েয ও মাকরূহে তাহরীমী। সেখানে পরম বিনম্রতা ও হৃদয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করা ওয়াজিব।
٨- يا أيها الذين آمنوا إن جاءكم فاسق بنبإ فتبينوا أن تصيبوا قوما بجهالة فتصبحوا على ما فعلتم نادمين – [الدرجات: ٦]
[৮. মূল আয়াতের বাংলা অনুবাদ: হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসেক (অসৎ ও অবিশ্বস্ত) ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোনো খবর বা তথ্য নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই ও অনুসন্ধান করে নাও; যাতে তোমরা না জেনে কোনো সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ বা অবিচার করে না বসো এবং পরবর্তীতে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য চরমভাবে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে না হয়। (সূরা আল-হুজুরাত: ৬)]
ক. আয়াতের শাব্দিক অর্থ ও শব্দকোষ (Vocabulary Table)
| কুরআনিক শব্দ (مفردات) | মূলধাতু ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ | অর্থ ও তাহকিক |
|---|---|---|
| فَاسِقٌ | اسم فاعل (ف-س-ق)، فاعل لـ جاءكم | ফাসেক; যে ব্যক্তি প্রকাশ্য পাপ ও দ্বীনের অবাধ্যতায় লিপ্ত। |
| بِنَبَإٍ | جار ومجرور (ن-ب-أ) | গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর, তথ্য বা সংবাদের মাধ্যমে। |
| فَتَبَيَّنُوا | فعل أمر، باب تفعّل (ب-ي-ن) | তোমরা অনুসন্ধান করো, সত্যতা যাচাই করো ও নিশ্চিত হও। |
| أَنْ تُصِيبُوا | فعل مضارع منصوب بأن، باب إفعال | পাছে তোমরা আক্রমণ বা ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলো। |
| بِجَهَالَةٍ | مصدر مع جار ومجرور (ج-ه-ل) | অজ্ঞতাবশত বা সত্য উদঘাটন না করে ভুলের বশবর্তী হয়ে। |
| نَادِمِينَ | اسم فاعل جمع مذكر سالم (ن-د-م)، خبر تصبحوا | চরমভাবে লজ্জিত ও মর্মাহত অনুতপ্ত অবস্থায়। |
খ. আয়াতের তাৎপর্য ও সামাজিক সুরক্ষা
এই আয়াতটি ইসলামী বিচারব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগ ও সাংবাদিকতার মূল স্তম্ভ। ভিত্তিহীন গুজবের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা বা কাউকে অভিযুক্ত করা সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। কুরআনুল কারীম তথ্য যাচাই (Fact-checking/তাবাহ্হুন ও তাছাব্বুত)-কে ঈমানের আবশ্যিক দায়িত্ব ঘোষণা করেছে।
(أ) اكتب سبب نزول هذه الآية الكريمة – [الدرجات: ٤]
আয়াতটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও শানে নুযূল
ইমাম তাবারী, ইবনে কাছীর এবং আল্লামা কুরতুবী (রহ.) নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেছেন:
মুরাইসী যুদ্ধের পর মদিনার নিকটবর্তী বনু মুস্তালিক্ব (بنو المصطلق) গোত্রের নেতা হারেস ইবনে আবি যিরার (উম্মুল মুমিনীন জুওয়াইরিয়া রা.-এর পিতা)-সহ পুরো গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের সাথে চুক্তি করেন যে নির্দিষ্ট সময়ে তিনি যাকাত সংগ্রহের জন্য দূত পাঠাবেন।
নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবি ওয়ালীদ ইবনে উক্ববাহ (الوليد بن عقبة)-কে তাদের নিকট থেকে যাকাত সংগ্রহ করে আনার জন্য প্রেরণ করেন। ওয়ালীদ রওয়ানা হলেন; কিন্তু জাহেলি যুগে বনু মুস্তালিক্বের সাথে তাঁর গোত্রের পুরনো শত্রুতা ছিল।
এদিকে বনু মুস্তালিক্ব যখন শুনল যে নবীজির দূত আসছেন, তখন তারা পরম আনন্দ ও সম্মানের সাথে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এবং যাকাতের উট ও মাল তুলে দিতে দলবদ্ধ হয়ে নগরীর বাইরে এগিয়ে এলো। দূর থেকে তাদের সমবেত হতে দেখে ওয়ালীদ ইবনে উক্ববাহ মনে করলেন যে তারা হয়তো পুরনো শত্রুতার জেরে তাকে হত্যা করতে আসছে! তিনি চরম শঙ্কিত হয়ে পথ থেকেই মদিনায় পালিয়ে এলেন এবং নবীজি ﷺ-এর দরবারে পৌঁছে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! বনু মুস্তালিক্ব ইসলাম ত্যাগ করেছে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল!”
রাসূলুল্লাহ ﷺ এ কথা শুনে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং সত্যতা তদন্তের জন্য হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠানোর প্রস্তুতি নিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বনু মুস্তালিক্বের প্রতিনিধি দল খোদ মদিনায় এসে আরজ করলেন: “হে আল্লাহর নবী! আমরা আপনার দূতকে হত্যা করতে আসিনি; বরং তাঁকে সম্মান ও যাকাত দিতে এগিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি পথ থেকেই ফিরে এসেছেন!”
তখনই মহান আল্লাহ বাস্তব তদন্ত ছাড়া কেবল একতরফা কথার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নিষেধ করে এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন: «يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا…»।
(ب) هل يقبل خبر الفاسق وشهادته؟ اكتب موضحا – [الدرجات: ٤]
১. ফাসেকের পরিচয়
শরীয়তের পরিভাষায় যে ব্যক্তি কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকে অথবা বারবার সগিরা গুনাহ করে এবং নিজের পাপাচারের জন্য লজ্জিত হয় না, তাকে ‘ফাসেক’ (الفاسق) বলা হয়।
২. ফাসেকের সংবাদ (খবর)-এর গ্রহণযোগ্যতা
উসূলে ফিকহের নীতিমালা অনুযায়ী ফাসেকের সংবাদ সরাসরি প্রত্যাখ্যানও করা হবে না, আবার সাথে সাথে গ্রহণও করা যাবে না:
- তদন্তের বাধ্যবাধকতা (وجوب التثبت): কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ফাসেকের সংবাদে সতর্ক থাকতে হবে এবং নিরপেক্ষভাবে তা যাচাই করতে হবে।
- সত্যতা প্রমাণিত হলে: তদন্তের পর যদি পারিপার্শ্বিক অকাট্য দলীল দ্বারা সংবাদটির সত্যতা নিশ্চিত হয়, তবে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ জায়েয।
- হাদিস বর্ণনায়: ফাসেকের বর্ণিত কোনো হাদিস মুহাদ্দিসীনদের নিকট একেবারেই অগ্রহণযোগ্য (মওদূ বা মাতরূক)।
৩. বিচারিক আদালতে ফাসেকের সাক্ষ্য (শাহাদাত)-এর বিধান
আদালতের সাক্ষ্য এবং সাধারণ খবরের মাঝে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। চার মাযহাবের (হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি) সকল ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী: আদালতে কোনো ফাসেকের সাক্ষ্য (شهادة الفاسق) কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রধান দলীলসমূহ:
- পবিত্র কুরআনের নির্দেশ: মহান আল্লাহ সাক্ষ্যের মূল শর্ত নির্ধারণ করে ইরশাদ করেছেন:
«وَأَشْهِدُوا ذَوَيْ عَدْلٍ مِنْكُمْ»
“এবং তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে দুজন ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখো।” [সূরা আত-ত্বালাক: ২]। ফাসেক ব্যক্তি ‘আদেল’ (ন্যায়পরায়ণ) নয়, তাই সে সাক্ষ্যের উপযুক্ত নয়।
- মিথ্যা অপবাদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা: অপবাদ আরোপকারী ফাসেকদের ব্যাপারে আল্লাহ ইরশাদ করেন: «وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ» (তোমরা কখনোই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না; আর তারাই হলো ফাসেক) [সূরা আন-নূর: ৪]।
- হাদিসের নিষেধাজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: «لَا تَجُوزُ شَهَادَةُ خَائِنٍ وَلَا خَائِنَةٍ، وَلَا ذِي غِمْرٍ عَلَى أَخِيهِ» (কোনো খেয়ানতকারী নারী বা পুরুষ এবং কোনো বিদ্বেষপোষণকারীর সাক্ষ্য জায়েয নয়) [সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৮]।
অতএব, ব্যক্তিগত বা সামাজিক খবরে ফাসেকের বক্তব্য যাচাইযোগ্য হলেও, বিচারালয়ের বিচারিক সাক্ষ্যে ফাসেকের সাক্ষ্য সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও অকার্যকর।
مجموعة (ب)
الدرجة — ١٠ × ١ = ١٠
(تراجم المفسرين ومناهجهم)
٩- اكتب نبذة عن حياة الإمام البيضاوى ثم بين مزايا تفسيره – [الدرجات: ۱۰]
১. নাম, বংশ ও জন্ম
ইলমে তাফসীর, উসূলে ফিকহ ও কালাম শাস্ত্রের এক অনন্য দিকপাল হলেন ইমাম নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম হলো আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী আবুল খায়র নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী আশ-শিরাজী আশ-শাফেঈ। তিনি বর্তমান ইরানের শিরাজ শহরের নিকটবর্তী ঐতিহাসিক ‘বায়যা’ (البيضاء) নামক মনোরম জনপদে এক ঐতিহ্যবাহী আলেম ও কাজীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও তিনি সপ্তম হিজরি শতাব্দীর প্রথমার্ধে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
২. পারিবারিক ঐতিহ্য ও কাজী পদে অধিষ্ঠান
ইমাম বায়যাবীর পিতা ছিলেন তৎকালীন ফারস প্রদেশের প্রধান বিচারপতি (قاضي القضاة)। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর প্রজ্ঞা, সততা, দূরদর্শিতা ও অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে শিরাজ নগরীর প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ইমাম বায়যাবীর ওপর অর্পণ করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি বিচারকের পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে ইলম চর্চা, গ্রন্থ প্রণয়ন ও আত্মশুদ্ধির কাজে তাবরিজ নগরীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
৩. তাঁর অন্যান্য অমর সংকলনসমূহ
ইমাম বায়যাবী একাধারে ফকীহ, উসূলবিদ, মুতাকাল্লিম ও ব্যাকরণবিদ ছিলেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থসমূহ হলো:
- আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল (أنوار التنزيل وأسرار التأويل): যা ‘তাফসীরে বায়যাবী’ নামে সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত।
- মিনহাজুল উসূল ইলা ইলমিল উসূল (منهاج الوصول): উসূলে ফিকহের এক কালজয়ী প্রামাণ্য পাঠ্যবই।
- তাওয়ালিউল আনওয়ার মিন মাতালিইল আনযার (طوالع الأنوار): ইলমুল কালাম ও আক্বাইদের মৌলিক গ্রন্থ।
- আল-গায়াতুল কুসওয়া ফী দিরায়াতিল ফাতওয়া (الغاية القصوى): শাফেঈ ফিকহের প্রামাণ্য কোষগ্রন্থ।
- লুব্বুল আলবাব ফী ইলমিল ই’রাব (لب الألباب): আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রের সূক্ষ্ম গ্রন্থ।
৪. তাফসীরে বায়যাবীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ও অনন্য মর্যাদাসমূহ (مزايا تفسيره)
বিশ্বজুড়ে দারসে নেজামী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সর্বোচ্চ স্তরে তাফসীরে বায়যাবী পাঠ্যভুক্ত। এর প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা নিম্নরূপ:
- আল-কাশশাফের সংক্ষিপ্ত ও সংশোধিত রূপ: আল্লামা যামাখশারীর বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর ‘আল-কাশশাফ’-এর সমস্ত আলংকারিক সৌন্দর্য ও বালাগাত গ্রহণ করে তিনি তার মধ্যকার মু’তাযিলা মতবাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ অত্যন্ত নিপুণভাবে ছাঁটাই করেছেন এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আশ’আরী আক্বীদা দ্বারা তা পরিশুদ্ধ করেছেন।
- সংক্ষিপ্ততা ও চমৎকার অর্থপূর্ণতা (الإيجاز مع الإعجاز): এটি এমন এক বিস্ময়কর তাফসীর যেখানে অতি অল্প শব্দে বিশাল তত্ত্ব ও অর্থ তুলে ধরা হয়েছে। সাগরের গভীরতাকে যেন এক পেয়ালায় সংকুচিত করা হয়েছে।
- ক্বিরাআতের সূক্ষ্ম তাহকিক: তিনি মুতাওয়াতির ও মাশহুর ক্বিরাআতসমূহের পাশাপাশি শাযযাহ ক্বিরাআতও উল্লেখ করেছেন এবং তা দ্বারা বাক্যতাত্ত্বিক অর্থ কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা ব্যাখ্যা করেছেন।
- ফিকহ ও কালামের সমন্বয়: শাফেঈ ফিকহের আলোকে আহকামের আয়াতসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন এবং জাহমিয়া, জাবারিয়া ও মু’তাযিলাদের বাতিল যুক্তির দাঁতভাঙা খণ্ডন উপস্থাপন করেছেন।
- উম্মাহর শ্রেষ্ঠ আলেমদের টীকা ও হাসিয়া: মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে তাফসীরে বায়যাবীর ওপর যত বেশি হাশিয়া ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে, তা অন্য কোনো তাফসীরের ভাগ্যে জুটেনি। কাযী যাদেহ, শায়খ যাদেহ ও আল্লামা শিহাবুদ্দীন আল-খাফাজীসহ প্রায় তিন শতাধিক মুহাদ্দিস ও মুফাসসির এর ওপর গবেষণাধর্মী টীকা প্রণয়ন করেছেন।
৫. ওফাত
এই মহান তাফসীরবিদ ৬৮৫ হিজরিতে (ভিন্ন বর্ণনামতে ৬৯১ বা ৭১৬ হি.) ইরানের তাবরিজ নগরীতে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁকে সেখানকার বিশিষ্ট মনিষীদের সান্নিধ্যে দাফন করা হয়।
١٠- اكتب ترجمة الإمام القرطبى مع خصائص تفسيره – [الدرجات: ۱۰]
১. নাম, বংশ ও স্পেনীয় পটভূমি
আন্দালুসিয়ার (মুসলিম স্পেন) শ্রেষ্ঠ মুফাসসির ও ফকীহ হলেন ইমাম কুরতুবী (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম হলো আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আবি বকর ইবনে ফারহ আল-আনসারী আল-খাযরাজী আল-আন্দালুসী আল-কুরতুবী। তিনি সপ্তম হিজরি শতাব্দীর সূচনালগ্নে (প্রায় ৬০০ হি.) স্পেনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র কর্ডোভা (কুরতুবা) নগরীতে আনসারী বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
২. সংগ্রামমুখর জীবন ও মিসরে হিজরত
শৈশবে তিনি স্থানীয় মাটির পাত্র তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। পরবর্তীতে তিনি কর্ডোভার শ্রেষ্ঠ আলেমদের নিকট পবিত্র কুরআন, আরবি সাহিত্য, হাদিস ও মালেকি ফিকহ আয়ত্ত করেন। ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা কর্ডোভা দখল করে মুসলিম নিধন শুরু করলে তাঁর পিতাও শহীদ হন। অতঃপর ইমাম কুরতুবী মাতৃভূমি স্পেন ত্যাগ করে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে প্রাচ্যে হিজরত করেন। আলেকজান্দ্রিয়া ও কায়রো হয়ে তিনি মিশরের ‘মুনয়াতু আবি খাছিব’ (মিনিয়া) নামক শান্ত পল্লীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি ছিলেন পার্থিব মোহমুক্ত এক পরম জাহেদ, যিনি সাধারণ পশমি চাদর পরে নিরবচ্ছিন্নভাবে রবের ইবাদত ও গবেষণায় নিমগ্ন থাকতেন।
৩. তাঁর অন্যান্য অমর সংকলনসমূহ
- আল-জামি’ লি-আহকামিল কুরআন (الجامع لأحكام القرآن): তাঁর অমর তাফসীর গ্রন্থ (২০ খণ্ড)।
- আত-তাযকিরাহ ফী আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমূরিল আখেরাহ (التذكرة): মৃত্যু, কবর, কিয়ামত ও পরকাল বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থ।
- আল-আসনা ফী শারহি আসমাইল্লাহিল হুসনা (الأسنى): আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের গভীর ব্যাখ্যা।
- কামউ হরসি বিয-যুহদি ওয়াল কানাআহ (قمع الحرص): আত্মশুদ্ধি ও যুহদ বিষয়ক কালজয়ী রচনা।
৪. তাফসীরে কুরতুবীর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (خصائص تفسيره)
ইমাম কুরতুবীর ‘আল-জামি’ লি-আহকামিল কুরআন’ কেবল একটি তাফসীর নয়, বরং এটি ইসলামী আইনের এক বিশ্বকোষ। এর প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
- আহকাম ও ফিকহি মাসআলার ওপর প্রাধান্য: কুরআনের যে সকল আয়াতে বিধি-বিধান, হালাল-হারাম, ইবাদত, মুয়ামালাত ও দণ্ডবিধি বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর আইনি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করাই এই তাফসীরের মূল উদ্দেশ্য। এতে তিনি প্রতিটি সূরার অধীনে ‘মাসআলা ১, মাসআলা ২’ এভাবে শত শত ব্যবহারিক বিধান সাজিয়েছেন।
- তুলনামূলক ফিকহ ও গভীর ইনসাফ (عدم التعصب المذهبي): যদিও ইমাম কুরতুবী ব্যক্তিগত জীবনে মালেকি মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু তাফসীরের ক্ষেত্রে তিনি মাযহাবী অন্ধত্ব ও গোঁড়ামিমুক্ত ছিলেন। যে মাসআলায় হানাফি, শাফেঈ বা হাম্বলি মাযহাবের দলীল অধিকতর শক্তিশালী মনে হয়েছে, তিনি অত্যন্ত সততার সাথে নিজ মাযহাবের বিপরীতে সেই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
- ইসরাঈলিয়্যাতের জোরালো খণ্ডন: তাফসীরের কিতাবসমূহে অনুপ্রবেশ করা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী ও ভিত্তিহীন গল্পসমূহের তিনি তীব্র সমালোচনা ও খণ্ডন করেছেন।
- হাদিসের বিশুদ্ধতা ও সনদ যাচাই: তিনি আহকামের সমর্থনে যে সকল হাদিস উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর মূল গ্রন্থকারদের নাম (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ ইত্যাদি) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন এবং সহীহ ও দুর্বল হাদিসের পার্থক্য নির্ণয় করেছেন।
- শব্দতাত্ত্বিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ: কঠিন আরবি শব্দের ধাতুগত অর্থ, রূপতত্ত্ব, বালাগাত এবং প্রাচীন জাহেলি যুগের কবিতা (শাওয়াহিদ) দিয়ে তিনি অর্থকে সুদৃঢ় করেছেন।
৫. ওফাত
এই মহান মুফাসসির ৬৭১ হিজরির ৯ই শাওয়াল (১২৭৩ খ্রি.) সোমবার রাতে মিসরের মিনিয়া নগরীতে ওফাত বরণ করেন এবং নীল নদের তীরবর্তী সেই পুণ্যভূমিতেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন।
উপসংহার ও সামগ্রিক পর্যালোচনা
ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাজিল স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম (বিষয় কোড: ২০২৮০১) ২০২৪ সালের এই প্রশ্নপত্রটি আল-কুরআনের তাফসীর সাহিত্যের একটি অনুপম ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসকে প্রতিফলিত করে। এই প্রশ্নপত্রে একদিকে মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হিদায়াত ও সিরাতুল মুস্তাকীমের দর্শন (সূরা আল-ফাতিহা), কাফের ও মুনাফিকদের মনস্তাত্ত্বিক ও উপমাভিত্তিক চিত্রায়ণ (সূরা আল-বাকারাহ), এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক মুজিযা ‘ইসরা ও মি’রাজ’ এবং কিয়ামতের আমলনামার বিবরণ (সূরা আল-ইসরা) বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
একই সাথে সূরা আল-হুজুরাতের আলোকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি মুমিনের আদব ও সম্মান প্রদর্শন এবং সমাজে ফেতনা ও অন্যায় প্রতিরোধে তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই ও বিচারিক আদালতে ফাসেকের সাক্ষ্যের শারঈ অবস্থান অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণভাবে বিধৃত হয়েছে। সর্বোপরি, তাফসীর জগতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র—আল্লামা বায়যাবী (রহ.)-এর জ্ঞানগর্ভ সংক্ষিপ্ততা ও বালাগাত এবং ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর আহকামভিত্তিক ইনসাফপূর্ণ তুলনামূলক ফিকহের বিশ্লেষণ শিক্ষার্থীদের উচ্চতর কুরআন গবেষণায় এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ফাজিল ৪র্থ বর্ষের দিরাসাতু তাফসীরুল কুরআনিল কারীম (২০২৮০১) কোর্সে প্রধানত কোন কোন তাফসীর পাঠ্য?
এই কোর্সে প্রধানত আল্লামা নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী (রহ.) প্রণীত আনওয়ারুত তানযীল ওয়া আসরারুত তা’বীল (তাফসীরে বায়যাবী) এবং ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-কুরতুবী (রহ.) প্রণীত আল-জামি’ লি-আহকামিল কুরআন (তাফসীরে কুরতুবী)-এর নির্ধারিত সূরা ও আয়াতসমূহ গভীরভাবে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২. ইসরা ও মি’রাজ কি কেবল আত্মিক সফর বা স্বপ্ন ছিল?
না, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত অকাট্য আক্বীদা অনুযায়ী ইসরা ও মি’রাজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বশরীরে সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় (بالروح والجسد يقظة) সংঘটিত হয়েছিল। পবিত্র কুরআনে ‘আবদ’ (বান্দা) শব্দ ব্যবহার এবং মক্কার কাফেরদের তীব্র বিরোধিতাই প্রমাণ করে যে এটি একটি চাক্ষুষ শারীরিক অলৌকিক মুজিযা ছিল।
৩. মুনাফিকদের চরিত্র স্পষ্ট করতে কুরআনে কী কী উপমা দেওয়া হয়েছে?
সূরা আল-বাকারায় মুনাফিকদের জন্য দুটি চমৎকার উপমা পেশ করা হয়েছে: ১. আগুনের উপমা (المثل الناري): আলো লাভ করার পর চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া; এবং ২. বৃষ্টির উপমা (المثل المائي): আসমান থেকে বর্ষিত বৃষ্টি, বজ্রের গর্জন ও ক্ষণিক বিজলীচমকে হতবিহ্বল হয়ে পথ চলা ও দাঁড়িয়ে যাওয়া।
৪. আধুনিক সাংবাদিকতা ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সূরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতের শিক্ষা কী?
সূরা আল-হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতটি ভিত্তিহীন গুজব ও মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে বিশ্বমানবতার জন্য এক কালজয়ী সনদ। যেকোনো খবর শুনেই সত্যতা নিশ্চিত না করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা বা কাউকে আক্রমণ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। প্রতিটি তথ্যের উৎস ও সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত (Fact-check) করা মুমিনের অপরিহার্য ঈমানী দায়িত্ব।
৫. আদালতে ফাসেকের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না কেন?
বিচারিক আদালতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মূল শর্ত হলো সাক্ষীর তাকওয়া ও সততা (‘আদালাত)। যেহেতু ফাসেক ব্যক্তি প্রকাশ্য পাপাচার বা কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকে, তাই তার ওপর বিশ্বাস রাখা যায় না এবং সে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার প্রবল ঝুঁকিতে থাকে। একারণে পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূরের ৪ নম্বর আয়াতের আলোকে চার মাযহাবের সকল ইমাম ফাসেকের সাক্ষ্যকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করেছেন।
৬. তাফসীরে বায়যাবী ও তাফসীরে কুরতুবীর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
তাফসীরে বায়যাবী হলো অতি সংক্ষিপ্ত, বালাগাতসমৃদ্ধ ও কালামশাস্ত্রীয় গভীর তত্ত্বে ভরপুর এক অনন্য শাস্ত্রীয় গ্রন্থ; যা আল-কাশশাফের ভুল সংশোধন করে আহলুস সুন্নাহর পক্ষে রচিত। পক্ষান্তরে, তাফসীরে কুরতুবী হলো আহকামে কুরআন এবং চার মাযহাবের দলীলভিত্তিক তুলনামূলক ফিকহের এক সুবিশাল প্রামাণ্য বিশ্বকোষ, যেখানে অন্ধ মাযহাবী গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে বিশুদ্ধ দলীলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।